রোগক্ষয়–শিক্ষালাভ

রোগক্ষয়শিক্ষালাভ

মানুষ যেমন বিষের ধুঁয়ো এটম বম বানিয়ে তার আপন ভাইকে অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে মারতে শিখেছে—ঠিক তেমনি এমন মানুষেরও অভাব নেই যাঁরা মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করার জন্য সমস্ত কল্পনাশক্তি, সর্বশেষ রক্তবিন্দু ক্ষয় করতে প্ৰস্তুত আছেন। কেন জানিনে, আজ হঠাৎ এঁদেরই একজনের কথা মনে পড়লো। এই প্ৰাতঃস্মরণীয় পুরুষের নাম মসিয়ো লুই ভোতিয়ে।

আমি তখন জিনীভায়। এক অচেনা ভদ্রলোক এসে আমার সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ করলেন, লেজাঁয় তাঁর যক্ষ্মারোগীর সানাটোরিয়ামটি আমি যদি দেখতে যাই তবে তিনি অত্যন্ত খুশি হবেন। ফ্রান্স, জর্মনি, সুইটজারল্যান্ডে বিস্তর সানাটরিয়া দেখেছি, সর্বত্রই সব গুণীর মুখে একই কথা, যক্ষ্মার বিশেষ কোনো চিকিৎসা নেই, তবে রোগী যদি মনস্থির করে ফেলে যে, যমকে চোখের জলে নাকের জলে না করা পর্যন্ত সে মরবে না, অর্থাৎ বিছানায় শুয়ে শুয়েই সে হিম্মৎ নামক অস্ত্রখানি দিয়ে তার সঙ্গে লড়াই দেবেই দেবে, তবে হয়ত, হয়ত কেন, নিশ্চয়ই সে বীরকে বাঁচাবার একটা চেষ্টা করাতে কিছুমাত্র আপত্তি নেই।’

আমি ডক্টর ভোতিয়েকে এ-কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে তিনি ভারী খুশি হলেন। বললেন, ‘আপনি যখন এ তত্ত্বটা জানেন আপনারই বিশেষ করে লেজাঁতে আসা উচিত।’ তবু আমার যেতে ইচ্ছা করছিল না; কারণ যক্ষ্মার হাসপাতাল দেখা কিছুমাত্র আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা নয়। কিন্তু ভোতিয়ে সেই শ্রেণীর লোক যাঁরা খানিকটে হোসে, খানিকটে যুক্তিতর্ক দিয়ে, খানিকটে অনুনয়-বিনয় করে গররাজি লোককে নিমরাজি নিজের পারে পটিয়ে টেনে নিয়ে যেতে পারেন। আমি খানিকটে ধস্তাধস্তি করেছিলুম, কিন্তু তখন যদি জানতুম যে ভোতিয়ে মুসসোলীন এবং লয়েড জর্জের কাছ থেকে আপন হাসপাতালের জন্য টাকা বাগাতে সমর্থ হয়েছেন, তাহলে নিশ্চয়ই আপত্তি না করে সুবোধ ছেলেটির মত সুড়সূড় করে লেজ চলে যেতুম।

লেজাঁ যেতে হয় চেন-রেলওয়ে ধরে। এমনই ভয়ঙ্কর খাড়া পাহাড়ের উপর যক্ষ্মা সানাটরিয়ামগুলো বানানো হয়েছে যে সাধারণ ট্রেন, এমন কি মোটরও সেখানে পৌঁছতে পারে না।

হোটেল আছে; কিন্তু যখন নিতান্ত এসেই গিয়েছি তখন সানাটরিয়ামের ভিতর থাকলেই তো দেখতে পাবো বেশি।

মসিয়ো ভোতিয়ে, মাদাম, এমন কি বাচ্চা দুটো পর্যন্ত আমাকে দিল-খোলা অভ্যর্থনা জানালেন। বাচ্চা দুটোর বয়স ছয় আর আট। এদের জন্ম হয়েছে এই সানাটরিয়ামেই। তারা সুস্থ। শাঁখানেক যক্ষ্মরোগীর সঙ্গে তারা খায়-দায় খেলাধূলা গল্পগুজব করে-বাপ-মা’র তাতে কোনো ভয় নেই। আমিই তাহলে ডির্যাব কেন?

মসিয়ো ভোতিয়ে বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, যক্ষ্মা রোগটা ছেলেছোকরাদেরই হয় বেশি। বরং এ রোগটার সবচেয়ে বড় ডেরা খাটানো রয়েছে কলেজে কলেজে। কলেজের ছোকরারা এ রোগে মরেও সবচেয়ে বেশি। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক রোগী কিংবা নিতান্ত বাচ্চাকে বাঁচানো অনেক সহজ।

‘তার প্রধান-প্রধান কেন, একমাত্র কারণ, যক্ষ্মা হলেই তাদের পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। তারা তখন ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে। ভাবে, পড়াশোনা যদি নাই করতে পারলুম তবে দু’পাঁচ বৎসর পরে সেরে গিয়েই বা করব কি? খাবো কি? সংসারই বা পাতবো কি দিয়ে?

‘তাই তারা রোগের সঙ্গে লড়বার আর কোনো প্রয়োজন দেখতে পায় না, সব হিম্মত হারিয়ে ফেলে, এগিয়ে মৃত্যুর হাতে আপন জানটি ভেট দেয়।’

মসিয়ো ভোতিয়ে বললেন, যাবে থেকে আমি যক্ষ্মা রোগ নিয়ে কাজ আরম্ভ করেছি তখন থেকেই আমি কাজে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে, অবসর সময়ে অহরহ ভেবেছি। এর কোনো প্ৰতিকার করা যায়। কিনা? শেষ পর্যন্ত আমি যে প্ৰতিকার আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি তারই ভিতরে আজ আপনি আমি বসে কথা বলছি—তার নাম ‘সানাটরিয়া ইউনিভেসিতের’, অর্থাৎ ‘বিশ্ববিদ্যালয় আরোগ্যায়তন’।

‘এখানে শুদ্ধৃমাত্র কলেজের ছেলেমেয়েদের নেওয়া হয়। এবং জিনীভা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের বন্দোবস্ত, যেন আমাদের রোগীদের টার্ম হিসেবে নেওয়া হয় অর্থাৎ এরা জিনীভায় ক্লাস না করে ক্লাস করছে এই সানাটোরিয়ামে। এরা এখানেই পড়াশোনা করে, সুইটজারল্যান্ডের সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপকরা এখানে এসে মাঝে মাঝে লেকচার দিয়ে যান, তাছাড়া যক্ষ্মবৈরী বহু নিমন্ত্রিত রবাহুত গুণী এখানে এসে দু’দশ দিন থেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় নানাপ্রকারে সাহায্য করে যান।

‘বুঝতেই পারছেন, ‘যে-সব বিষয় নিলে ভয়ঙ্কর বেশি খাটতে হয়, সেগুলোর ব্যবস্থা এখানে নেই। তাই নিয়ে ছেলেমেয়েরাও বেশি কান্নাকাটি করে না, তারা জানে, সে ধরনের পড়াশোনা করলে তাদের শরীর কখনো সারবে না। তারা খুশি কোনো কিছু একটা নিয়ে পাশ দিতে পারলেই; কাজেই বিজ্ঞানের ছেলে দর্শন নিতে আপত্তি করে না, ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছেলে ইতিহাস উৎসাহের সঙ্গেই পড়ে।

‘অবশ্য স্বাস্থ্যের অবস্থার উপর পড়াশোনার মেকদার নির্ভর করে। আমাদের সব সময় কড়া নজর, কেউ যেন বড্ড বেশি না খাটে। কিছুদিন থাকার পর রোগীরাও তত্ত্বটা বুঝে ফেলে, আর নূতন রোগীদের ধমক দিয়ে ব্যাপারটা তাদের কাছে জলের মত তরল করে দেয়। আমাকে তো আজকাল এ-নিয়ে বিলকুল মাথা ঘামাতে হয় না। ওদের চিকিৎসার দিকে এখন আমি আরো বেশি সময় দিতে পারি।’

একটুখানি চোখ টিপে মুচকি হেসে বললেন, ‘পড়াশোনা বিশেষ হয় না, সে তো বুঝতেই পারছেন। তা নাই বা হল। ছেলেমেয়েরা সাহস তো পায় বেঁচে থাকবার, সেইটেই হল আসল কথা। জিনীভা বিশ্ববিদ্যালয়ও আমার কলটা বেশ বুঝতে পেরেছেন, আমিই তাদের খোলাখুলি বলে রেখেছি, এখানে মধ্যযামিনীর তৈল ক্ষয় নিষিদ্ধ, বেশি পড়াশোনা এখানে হতেই পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষেরা তো আর হৃদয়হীন পাষাণ নন; এখান থেকে যারা পরীক্ষা দেয়, তাদের প্রতি তারা সদয়, আর যারা সেরে উঠে বাকি টার্মগুলো জিনীভায় কাটায় তাদের প্রতিও মোলায়েম ব্যবহার করেন।’

দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কিন্তু টাকা পাই কোথায়? অঢেল টাকার দরকার। আমি পনেরো বছর ধরে তামাম ইয়োরোপ চষে বেড়াচ্ছি। টাকার জন্য। মুসসোলীনি, লয়েড জর্জ থেকে আরম্ভ করে যেখানে যে আমাকে সামান্যতম সাহায্য করতে পারে তারই দরজায় হ্যাট পেতে ভিক্ষা মেঙেছি।

‘এখন আমার ইচ্ছা এ-প্রতিষ্ঠানটিকে ইন্টারনেশনাল–সার্বজনীন সার্বভৌমিক করার। ভারতবর্ষ থেকে যদি রোগী ছাত্র আসে। তবে তার জন্য যেন এখানে আমি ব্যবস্থা করতে পারি, সেও যেন নিরাময় হয়, সঙ্গে সঙ্গে জিনীভা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি নিয়ে ফিরতে পারে। আপনাদের দেশে তো রাজা মহারাজদের অনেক টাকা-দানখয়রাতও তারা করেন। শুনেছি।’

আমি মনে মনে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললুম, ‘এককালে রাজ-রাজড়ারা বিস্তর দান-ধ্যান করতেন এ-কথা সত্যি, আজকালও যে একেবারেই নেই সে-কথা আমি বলব না। আপনি যদি স্বয়ং ভারতবর্ষে আসেন তবে একটা চেষ্টা দিয়ে দেখতে পারি। আমার দ্বারা যোগসূত্র স্থাপনের যেটুকু সামান্য সাহায্য সম্ভবপর–

ডক্টর ভোতিয়ে আমার দু’খানা হাত চেপে ধরে নীরবে আমার চোখের দিকে সকৃতজ্ঞ নয়নে তাকিয়ে রইলেন।

আমি দেশে ফিরে এলুম। তারপর লেগে গেল ১৯৩৯-এর লড়াই। সুইটুজারল্যান্ড ছোট্ট দেশ। সীমান্ত রক্ষার জন্য ভোতিয়ের মত ডাক্তারকে উর্দি পারে ব্যারাকে ঢুকতে হল–অবশ্য ডাক্তারের উর্দি। কিন্তু তার এ-দেশে আসাটা আর হয়ে উঠল না।

***

মসিয়ো লুই ভোতিয়ে সুইটুজারল্যান্ডের লেজাঁ নামক স্থানে যে ‘আরোগ্যায়তন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেখানে যক্ষ্মা সারানোর সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়া শেখানোর অভিনব সমন্বয় বহু সুইজারল্যান্ডবাসীর হৃদয়মন আকৃষ্ট করেছে। তারা অকৃপণ হস্তে এপ্রতিষ্ঠানে অর্থদান করেছেন এবং তাদেরও ইচ্ছা। এ-প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে ক্রমে বিশ্বজনের সম্পদ হয়ে উঠুক। কিন্তু উপস্থিত জাতীয়তাবাদ নামে যে বর্বরতা পৃথিবীকে শতধা বিভক্ত করে দিচ্ছে, তার সামনে মসিয়ো ভৌতিয়ে নিরূপায়। তাই আমার বিশ্বাস, যতদিন সুইটজারল্যান্ডে বিশ্বকল্যাণের জন্য সর্বাঙ্গসুন্দর ব্যবস্থা না হয়, ততদিন এ দেশে আমাদেরও চুপ করে বসে থাকা অনুচিত হবে। লেজাঁতে যে প্রতিষ্ঠান সম্ভবপর হয়েছে, এদেশেই বা তা হবে না কেন? বরঞ্চ এদেশে তার প্রয়োজন অনেক বেশি; কারণ এদেশের ছাত্র-সমাজে যক্ষ্মরোগের যে প্রসার তার সঙ্গে অন্য কোন দেশেরই তুলনা হয় না। অম্মদেশীয় যক্ষ্মবৈরী সজ্জন সম্প্রদায় আশা করি কথাটা ভেবে দেখবেন।

কিন্তু এ-হেন গুরুতর বিষয় নিয়ে মাদৃশ অর্বাচীন জনের অত্যধিক বাগাড়ম্বর অশোভনীয়। আমার উচিত, যোগাযোগের ফলে আমার যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়েছে সেইটে পাঁচজনকে শুনিয়ে দেওয়া। তারপর কে কি করল না করল তা নিয়ে আমার মাথা ঘামাবার প্রয়োজন নেই।

লেজাঁয় যক্ষ্মরোগের জন্য কি চিকিৎসা করা হয়, সে সম্বন্ধে সালঙ্কার বিবৃতি দেবার প্রয়োজন নেই। দক্ষিণ ভারতের মদনপল্লীর আরোগ্য-বরমে’ যে-সব ব্যবস্থা আছে, সেগুলো তো আছেই তার উপর লেজ এবং ডাভোসের অন্যান্য মামুলী সানাটরিয়াতে যক্ষ্মরোগ বাবদে যে-সব গবেষণা অষ্টপ্রহর করা হচ্ছে, তার ফলও মসিয়ো ভোতিয়ে অহরহ পাচ্ছেন।

সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাদান। এবং তার এক প্রধান অঙ্গ নানা দেশের নানা গুণীকে লেজাঁতে নিমন্ত্রণ করে তাদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করা। তার জন্য ভোতিয়ের প্রতিষ্ঠানে একটি চমৎকার লেকচার থিয়েটার আছে। অন্যান্য সানাটরিয়াতে এরকম হলের প্রয়োজন হয় না।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমি লেজাঁ পৌঁছবার ঠিক কয়েকদিন আগে দু-তিনজন বড় বড় ‘পণ্ডিতের গুরু গুরু ভাষণের গুরুভোজনের ফলে ছেলেমেয়েরা ঈষৎ কাতর হয়ে পড়েছিল। তাই বোধ করি, মসিয়ো ভোতিয়ে একটা জব্বর রকমের জোলাপের ব্যবস্থা করেছিলেন। মসিয়ো ভোতিয়ে আমাকে সোজাসুজি বললেন, ‘আপনি একটা লেকচার দিন। জর্মন কিংবা ফ্রেঞ্চ, যে-কোনো ভাষায়!

আমি বললুম, ‘আপনি যদিও জাতে সুইস, আপনার মাতৃভাষা ফরাসি এবং আপনি ফরাসি ঐতিহ্যে গড়ে-ওঠা বিদগ্ধজন। কাজেই আপনিও নেপোলিয়নের মত ‘অসম্ভব’ কথাটায় বিশ্বাস করেন না এবং তাই আপনার পক্ষে এ অনুরোধ করাটা অসম্ভব নয়; আমি কিন্তু ফরাসি নয়, আমি অসম্ভব’ কথাটা জানি এবং মানি। আমার পক্ষে বক্তৃতা দেওয়া অসম্ভব।

এগারো বৎসর হয়ে গিয়েছে, সম্পূর্ণ কথোপকথনটা আমার আজ আর মনে নেই। তবে চোখ বন্ধ করলে যে ছবিটি এখনো মনের ভিতর দেখতে পাই, তাতে আছে-এক বিরাট ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন যেন আমার দিকে দু’বাহু বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে আর আমি ক্রমেই পিছু হটে হটে শেষটায় দেয়ালের সঙ্গে মিশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি। আর পিছু হটবার জায়গা নেই। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দুহাত আমার গলা টিপে ধরেছে। হাত দুখানি বলছে, ‘এতগুলো রোগীকে আপনি নিরাশ করবেন?’

আমি অস্ফুট কণ্ঠে বলেছিলুম,

‘পড়েছি যবনের হাতে
খানা খেতে হবে সাথে।’

***

ঝটপট ইশতিহার বেরিয়ে গেল ‘ভারতীয় অমুক কাল সন্ধ্যায় লেজাঁর ‘সানাতরিয়াঁ ইউনিভের্সিতের সুইসে’ একখানা ভাষণ দেবেন। বিষয়…। লেজাঁর তাবৎ সানোতরিয়ার অধিবাসিকৃন্দকে সাদর নিমন্ত্রণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভোতিয়ে সাহেবের প্রতিষ্ঠানের পাঁচজন তো আসবেনই, অন্যান্য সানাতরিয়াঁর আরো বহু দুশমনকে ডাকা হয়েছে আমার মুখোশ খসাবার জন্য-কিন্তু ধর্ম সাক্ষী, আমি অনেক মুখোশ পরেছি বটে, পাণ্ডিত্যের মুখোশ কখনো পরি নি।

ভোতিয়ে বললেন, ‘চলুন, হলটার ব্যবস্থা কি রকম হল দেখবেন।’

লোকটা নিশ্চয়ই স্যাডিস্ট। এই যে সামনে পুজো আসছে, আমরা তো কখনো বলির মোষটাকে হাড়িকাঠ। দেখিয়ে চ্যাটাস চ্যাটাস করে ঠোঁট চাটিনে।

গিয়ে দেখি মধ্যিখানে বেশ খানিকটে জায়গা ফাঁকা রেখে চতুর্দিকে চেয়ার বেঞ্চি পাতা হয়েছে। তবে কি আমাকে ওখানে ফেলে জবাই করা হবে-আমার ছট্‌ফটানির জন্য ব্যাপক ব্যবস্থা করা হয়েছে? কি হবে বৃথা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে? গর্দিশ, গর্দিশ, সবই কপালের গর্দিশ।

তোতিয়ে ব্যবস্থাটা দেখে চ্যাটাস চ্যাটাস করলেন, অদৃশ্য সাবানে হাত দুটো কচলালেন। বুঝলুম, আমার অনুমান ভুল নয়। জবাইটা জব্বর ধরনেরই হবে।

ফ্রম থর্ন টু থর্ন অর্থাৎ কাঁটায় কাঁটায় সাতটায় ভোতিয়ে আমাকে সেই হলে নিয়ে ঢোকালেন।

দেখি ফাঁকা জায়গাটা ভরে গিয়েছে বিস্তর হুইল-চেয়ারে। যে-সব রোগীর পায়ের হাড়ে যক্ষ্মা অথবা যাদের নড়াচড়া করা বারণ, তাদের আনা হয়েছে হুইল-চেয়ারে করে। জন দুই শুয়ে আছে লম্বা লম্বা কৌচ সোফায়। পরে জানলুম, যারা নিতান্তই খাট ছাড়তে পারে না তাদের জন্য ঘরে ঘরে ইয়ার ফোনে’র ব্যবস্থা করা হয়েছে।

একজন দেখি হুইল-চেয়ারে বসে পাইপ টানছে। তখন আমার গর্দানে ঘি মালিস করা হচ্ছে—অর্থাৎ কে যেন যা-তা আবোল-তাবোল বকে আমার পরিচয় দিচ্ছে। ভোতিয়ে আমার পাশে বসে-পাছে আমি শেষমূহুর্তে পালাবার চেষ্টা করি। কানে কানে জিজ্ঞেস করলুম, ‘পাইপ সিগারেট খাওয়া যক্ষ্মরোগীদের বারণ নয়?’ ভোতিয়ে বললেন, ‘ভিতরে তামাক না থাকলে নিশ্চয়ই বারণ নয়।’ আমি বললুম, অর্থাৎ?’ অর্থাৎ বেচারীর যক্ষ্মা হওয়ার পূর্বে সে দিনরাত পাইপ টানত। অভ্যাসটা সম্পূর্ণ ছাড়তে পারে নি বলে এমন খালি-পাইপ কামড়ায়। ধুঁয়ো বেরুচ্ছে না বলে দাঁত কিড়ি মিড়ি খায়, আর হরেন্দরে প্রতি মাসে গোটা সাতেক ভাঙে। কিন্তু ছেলেটা পাইপ বাবদে জিউরি। ‘ব্রায়ার’ ছাড়া অন্য কোনো পাইপ চিবোতে রাজী হয় না।’

আপনি ভাবছেন, শ্রোতারা যক্ষ্মরোগী, তাই তাদের বিবৰ্ণ বিশীর্ণ মুখচোখ। আদপেই না। আপেলের মত লাল গাল প্রায় সব্বায়ের, চোখে মুখে উৎসাহ আর উত্তেজনা। যার দিকে তাকাই সেই যেন আমায় হাসিমুখে অভ্যর্থনা করে নিচ্ছে, সবাই যেন বলছে, ‘কি ভয় তোমার? এত দূর দেশ থেকে এসেছে, যা-ই বলো না কেন আমরা কান পেতে শুনবো।’

তবু আমি মনে মনে গুরুদেবকে স্মরণ করলুম আমাকে ত্ৰাণ করার জন্য।

তারপর কি হল?

তারপর কি হল? ভয়ে আমার হাত-পা পেটের ভিতর সেঁধিয়ে গিয়েছে; আর আজ যদি আপনাদের কাছে স্বীকারও করি যে তারা বক্তৃতা-শেষে আমার দিকে পচা ডিম আর পচা টমাটো ছুড়েছিল, তাহলেও আপনাদের চারখানা হাত গজাবে না।

আমি কি বলেছিলুম?

সে বকবকানি আপনারা তো প্রতি হপ্তায় শোনেন। নূতন ক’রে বলে আর কি লাভ?

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *