১৫. কতিপয় ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টি

কতিপয় ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টি

সভ্য মানব সমাজে ধর্ম বহু এবং ধর্মগ্রন্থও অনেক। উহার মধ্যে কয়েকটিকে বলা হয় ঐশ্বরিক বা অপৌরুষেয় গ্রন্থ। এইখানে কয়েকখানা প্রসিদ্ধ ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হইল।

# ১. বেদ

হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদ। এই দেশের আর্য হিন্দুদের একান্ত বিশ্বাস যে, পরমপিতা ভগবান অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অগিরা– এই চারিজন ঋষিকে সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধচিত্ত দেখিয়া ঘঁহাদিগের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হইয়া, এই চারিজনের মুখ দিয়া ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব এই চারি বেদ প্রকাশ করিয়াছেন। আবার কেহ কেহ বলেন যে, বেদ সেই অনাদি অনন্ত ঈশ্বরের নিঃশ্বাসে সৃষ্ট, কোনো মানুষ ইহার রচয়িতা নহেন। বেদ অপৌরুষেয়।

হিন্দু ধর্মের যাবতীয় একান্ত করণীয় বিষয়ই বেদে বর্ণিত আছে। ঋকবেদ প্রধানত একখানি স্তোত্রগ্রন্থ। আর্য ঋষিগণ যে সকল মন্ত্র দ্বারা ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণের আরাধনা করিতেন, সেই মন্ত্রগুলিই ঋকবেদের মূলসূত্র। ঐতিহাসিকদের মতে, বেদ ঐশ্বরিক পুঁথি নহে। কেননা ইহাতে প্রাচীন মুনি-ঋষিদের ও আর্য রাজাদের ইতিহাস পাওয়া যায়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, জনপদ, যুদ্ধবর্ণনা ইত্যাদি বেদে উল্লিখিত হইয়াছে। তাহাদের মতে, ইহা আর্য সভ্যতার ইতিহাস মাত্র।

ঈশ্বর সর্বজ্ঞ। তাহার প্রণীত গ্রন্থে কখনও একদেশদর্শিতা দোষ থাকিতে পারে না। কিন্তু বেদে উহা আছে। বেদের যাবতীয় কারবা ভারতবর্ষেই সীমাবদ্ধ। ভারতের বাহিরের বর্ণনা বিশেষ কিছু বেদে পাওয়া যায় না।

ঋগ্বেদে ২১৪ জন ঋষির নাম পাওয়া যায় এবং স্ত্রীলোকের নামও আছে ১২টি। বোধ হয় যে, উহারা সকলেই বেদের কোনো না কোনোও অংশের রচয়িতা। বস্তুত বেদে লিখিত শ্লোকগুলি তৎকালীন আর্য ঋষিদের ধ্যান-ধারণা, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সৃষ্টি।

বেদ যে ঋষিগণ কর্তৃক রচিত, তৎপ্রমাণ ঋগ্বেদেই রহিয়াছে। এইখানে আমরা ঋগ্বেদের কয়েকটি সূত্রের অনুবাদ লিপিবদ্ধ করিলাম। যথা —

১. হে অশ্বযোজক ভগবান! গৌতমাদি ঋষিরা তোমার উদ্দেশে এই মন্ত্র রচনা করিয়াছেন।

২. হে মরুত! এই নমস্কারজনক স্তোত্র অন্তরে রচিত হইয়া কায়মনে তোমাতে নিবেদিত হইল।

৩. আমাদিগের যজ্ঞবর্ধক বৈশ্যানর অগ্নির উদ্দেশে পবিত্র ঘৃততুল্য এক মন্ত্র রচনা করিয়াছি।

 ৪. সোমরস অভিযুত না হইলে ইন্দ্রের প্রীতি জন্মে না, আবার অভিযুত না হইলেও মন্ত্র ব্যতিরেকে তাহার প্রীতি জন্মে না, অতএব তাহার উদ্দেশে এক মনোহর স্তোত্র রচনা করিলাম।

৫. হে মিত্রাবরুণ! দীর্ঘত যজ্ঞশীল মহর্ষি বশিষ্ঠ তোমাদিগের উদ্দেশে এক সম্মানাহ স্তোত্র প্রেরণ করিতেছেন।

বেদ যে মনুষ্য (ঋষি) প্রণীত, তাহা উক্ত মন্ত্রগুলির অবস্থা দেখিলেই বুঝা যায়।

বেদের উৎপত্তিকাল সম্বন্ধে নানা মত দেখিতে পাওয়া যায়। কেহ বলেন খ্রী. পূ. ২,০০০ বৎসর, কেহ বলেন ৫,০০০ বৎসর। বাল গঙ্গাধর তিলক বেদমন্ত্র হইতেই বেদের বয়স গণনা করিয়াছেন ৮,০০০ বৎসর। পণ্ডিতবর উমেশচন্দ্র বিদ্যারত্ন মহাশয় বলিয়াছেন যে, বেদের বয়স অন্যূন ২১,৬০,০১৭ বৎসর। আবার কেহ বলেন, বেদ অনাদি। বেদের রচনাকাল সম্বন্ধে এতই। মতানৈক্য যে, কাহারও মতেই আস্থা স্থাপন করা যায় না। তবে এইকথা স্বীকার্য যে, বৈদিক স্তোত্রনিচয় এক সময়ে রচিত নহে, উহা সময়ে সময়ে ঋষিগণ দ্বারা এক এক অংশে রচিত হইয়াছিল। বর্তমান বেদ যাহা এখন জনসমাজে ব্যবহৃত ও পঠিত হইতেছে, ব্যাস-এর পূর্বে উহা এইরূপ ছিল না। অধুনাতন পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ বেদকে পৃথিবীর আদিগ্রন্থ বলিয়া নির্দেশ করেন।

বেদের রচনাকাল সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা থাকিলেও উহার সংকলন বা লিপিবদ্ধ করিবার কাল কিছু আন্দাজ করা চলে। হিন্দুদের মতে, কলি যুগ আরম্ভ হইয়াছে প্রায় ৫,০০০ বৎসর আগে। পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির রাজত্ব করিতেন দ্বাপর যুগের শেষ ও কলি যুগের শুরুতে এবং বেদগ্রন্থের সম্পাদক মহর্ষি ব্যাস ছিলেন তাঁহার পিতামহ। সুতরাং ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে যে, গ্রন্থাকারে বেদের বয়স কিঞ্চিদধিক পাঁচ হাজার বৎসর।

মহর্ষি ব্যাস বেদের মন্ত্র সংকলন ও বিভাগ করেন বলিয়া তাহার আর এক নাম বেদব্যাস। হার রচিত মহাভারত ‘পঞ্চম বেদ’ নামে কথিত এবং অষ্টাদশ পুরাণ ইহারই রচিত বলিয়া প্রসিদ্ধ। এই পুরাণাদি গ্রন্থসমূহও হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বলিয়া পরিগণিত হয়। যদিও হিন্দু ধর্মকে বৈদিক ধর্ম বলা হইয়া থাকে, তথাপি বর্তমান হিন্দু ধর্ম হইল বৈদিক ও পৌরাণিক মতের সংমিশ্রণ। সে যাহা হউক, বৈদিক ও পৌরাণিক শিক্ষার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই —

১. ঈশ্বর এক (একমেবাদ্বিতীয়ম)।

 ২. বিশ্বজীবের আত্মাসমূহ এক সময়ের সৃষ্টি।

৩. মরণান্তে পরকাল এবং ইহকালের কর্মফল পরকালে ভোগ।

৪. পরলোকের বা পরজগতের দুইটি বিভাগ –স্বর্গ ও নরক।

৫. নরক অগ্নিময় এবং স্বর্গ উদ্যানময়।

৬. স্বর্গ সাত ভাগে এবং নরক সাত ভাগে বিভক্ত।

৭. স্বর্গ ঊর্ধদিকে এবং নরক নিম্নদিকে অবস্থিত।

৮. পুণ্যবানদের স্বর্গপ্রাপ্তি এবং পাপীদের নরকবাস।

৯. যমদূত কর্তৃক মানুষের জীবন হরণ।

১০. ভগবানের স্থায়ী আবাস ‘সিংহাসন’।

 ১১. স্তব-স্তুতিতে ভগবান সন্তুষ্ট। অর্থাৎ ভগবান তোষামোদপ্রিয়।

১২. মন্ত্র দ্বারা উপাসনা।

১৩. মানুষের আদিপিতা একজন মানুষ।

১৪. নরবলি হইতে পশুবলির প্রথা প্রবর্তন।

১৫. বলিদানে পুণ্যলাভ।

 ১৬. ঈশ্বরের নামে উপবাসে পুণ্যলাভ।

১৭. তীর্থভ্রমণে পাপের ক্ষয়।

১৮. ঈশ্বরের দূত আছে।

১৯. জানু পাতিয়া উপাসনায় বসা।

২০. সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত।

২১. করজোড়ে প্রার্থনা।

২২. মালা জপ।

২৩. নিত্য উপাসনার স্থান মন্দির।

২৪. নির্দিষ্ট সময়ে উপাসনা করা।

২৫. ধর্মগ্রন্থ পাঠে পুণ্যলাভ।

 ২৬. কার্যারম্ভে ঈশ্বরের নামোচ্চারণ। যথা –নারায়ণং নমস্কৃত্যং নবৈষ্ণব নরোত্তমম।

২৭. গুরুর নিকট দীক্ষা বা মন্ত্র গ্রহণ।

 ২৮. স্বর্গে গণিকা আছে। যথা– গন্ধর্ব, কিন্নরী, অপ্সরা ইত্যাদি।

২৯. উপাসনার পূর্বে অঙ্গ প্রক্ষালন।

৩০. দিগনির্ণয়পূর্বক উপাসনায় বসা। ইত্যাদি।

.

# ২. আমদুয়াত, ফটক ও মৃতের গ্রন্থ

প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্মপুস্তক ছিল আমদুয়াত গ্রন্থ, ফটকের গ্রন্থ এবং মৃতের গ্রন্থ। প্রাচীন মিশরীয়রা ঐগুলিকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলিয়া মনে করিত। কেননা উক্ত গ্রন্থত্রয়ের প্রত্যক্ষ কোনো রচয়িতা নাই এবং উহার আলোচ্য বিষয়সমূহের অধিকাংশই মানবজ্ঞানের বহির্ভূত। গ্রন্থত্রয়ের আলোচ্য বিষয়ের প্রায় সমস্তই পারলৌকিক জীবন বিষয়ক। মিশরীয়রা মনে করিত যে, পারলৌকিক জীবন বিষয়ক কোনো আলোচনা করা মানবীয় জ্ঞানে সম্ভব নহে। কেননা অতল ভবিষ্যতের খবর মানুষ জানিবে কি করিয়া? উহা হইবে অলৌকিক জ্ঞানসম্পন্ন কোনো অতিমানবের রচনা। সুতরাং গ্রন্থত্রয়ের রচয়িতা জ্ঞানের দেবতা থৎ এবং হাতের লেখাও তাহারই।

প্রাকপিরামিড যুগের মিশরবাসীগণ তাহাদের সমাধিমন্দিরগুলির গায়ে অথবা প্যাপিরাসে লিখিয়া বা অঙ্কিত করিয়া রাখিত মৃতের পরলোক বিষয়ক নানা রকম কম্পিত চিত্র। কালক্রমে ঐগুলির লেখক বা রচয়িতা কে কাহারা, তাহার কোনো হদিস পাওয়া যাইত না। পরবর্তী যুগের মানুষ মনে করিত যে, ঐ সমস্ত দৈব বা ঐশ্বরিক বাণী।[৩৯]।

আর্য ঋষিদের রচিত শ্লোকগুলিকে যেমন সংকলনপূর্বক উহা চারি ভাগে বিভক্ত করিয়া গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন মহর্ষি ব্যাস, প্রাচীন মিশরীয়দের সমাধিগাত্রে ও প্যাপিরাসে খচিত বিক্ষিপ্ত বাণীগুলিকেও তেমন সংকলনপূর্বক উহাকে তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছেন সেকালের কোনো ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি।

পরলোক বা অধঃজগতের বিবরণ আছে বলিয়া প্রথম গ্রন্থটির নাম আমদুয়াত গ্রন্থ। দ্বিতীয়টির নাম ফটকের গ্রন্থ দেওয়া হইয়াছে এই জন্য যে, পরলোকে প্রত্যেকটি ঘণ্টার ব্যবধানে একটি করিয়া ফটক বা গেট আছে এবং মৃতকে সেই ফটকের ভিতর দিয়া একস্থান হইতে অন্যস্থানে যাইতে হয়। তৃতীয়টি, মৃতের গ্রন্থ, পরলোকবাসীদের জীবনবৃত্তান্ত। অর্থাৎ মরার পরের জীবন। গ্রন্থত্রয়ের মধ্যে মৃতের গ্রন্থ খানাই সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। উহাতে আছে পরজগতের বিস্তৃত বর্ণনা ও ইহজগতে থাকিয়া পরজগতের জীবনকে সুখী করিবার মন্ত্র ও ফরমুলা। উহার অধিকাংশই পিরামিড যুগের অর্থাৎ প্রায় খ্রী. পূ. ৩,০০০ অব্দের রচনা এবং কতক তাহারও আগের।

আলোচ্য গ্রন্থত্রয়ের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই –

১. স্বর্গদূত কর্তৃক সমাধিস্থ ব্যক্তির সত্যপাঠ গ্রহণ।

২. পাপ-পুণ্য পরিমাপের জন্য দাড়িপাল্লা ব্যবহার।

৩. মৃত ব্যক্তির পুনর্জীবন লাভ।

৪. পাপ-পুণ্যের বিচার।

৫. পরজগতের সুখের চাবিকাঠি ইহজগতেই। ইত্যাদি।

.

# ৩. জেন্দ-আভেস্তা

পারসিকদের ধর্মগ্রন্থ ‘জেন্দ-আভেস্তা’। পারসিকেরা উহাকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলেন। তাঁহারা বলেন যে, তাঁহাদের ধর্মগুরু জোরওয়াস্টার একদা কোনো পর্বতশিখরে উপাসনায় আসীন থাকাকালে সেখানে বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎস্ফুরণের মধ্যে তাঁহার আরাধ্য দেবতা ‘অহুর মজদা’র আবির্ভাব হয় এবং তাহার নিকট হইতে তিনি জেন্দ-আভেস্তা গ্রন্থখানা প্রাপ্ত হন।

জোরওয়াস্টারের আবির্ভাব সম্বন্ধে নানা মত দৃষ্ট হয়। কেহ কেহ বলেন যে, বিখ্যাত ট্রয় যুদ্ধের পাঁচ হাজার বৎসর পূর্বে জোরওয়াস্টার বিদ্যমান ছিলেন। ঐ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল খ্রী. পূ. ১১৯৩ সালে। এই হিসাবে জোরওয়াস্টারের আবির্ভাবকাল প্রায় খ্রী. পূ. ৬১৯৩ সাল। বেরোসাসের মতে জোরওয়াস্টারের আবির্ভাব খ্রী. পূ. ২৮০০ সালে। ডাইওনিসাস লেবার্টিয়াসের মতে জোরওয়াস্টারের আবির্ভাব খ্রী. পূ. ১৭৯৩ সালে এবং স্পিগেলের মতে খ্রী. পূ. ১৯২০ সালে। স্পিগেলের মত মানিয়া লইলে, জোরওয়াস্টার ও মহাপ্রবর ইব্রাহিম একই সময়ের মানুষ। কেননা হজরত ইব্রাহিম (আ.) খ্রী. পূ. ১৯২০ সাল বা তাহার কাছাকাছি সময়ে মিশর ভ্রমণে গিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়।[৪০]

উপরোক্ত আলোচনা হইতে বুঝা যায় যে, জোরওয়াস্টারের আবির্ভাব কমপক্ষে খ্রী. পূ. ১৭৯৩ সালে। সুতরাং জেন্দ-আভেস্তা গ্রন্থখানার বর্তমান বয়স প্রায় পৌনে চারি হাজার বৎসর।

জেন্দ-আভেস্তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই —

১. উপাসনা পদ্ধতি –পারসিকগণের উপাসনার সময় একজন বিজ্ঞ ও ধার্মিক ব্যক্তি সম্মুখে দণ্ডায়মান হন, অন্যান্য সকলে তাহার পশ্চাতে শ্রেণীবদ্ধভাবে দাঁড়াইয়া থাকেন। প্রথমে তাহারা যুক্তকরে দণ্ডায়মান থাকিয়া একবার মস্তক নত করেন, পরে ভূমিলগ্ন হইয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করেন ও পুনরায় সরলভাবে দণ্ডায়মান হন।

২. ঈশ্বরের নামোচ্চারণপূর্বক কার্যারম্ভ করা। কোনো কাজের শুরুতে পারসিকগণ বলিয়া থাকেন, “বানাম বাজদ বাকসিস গারদার”।

৩. অদ্বৈত ও দ্বৈতবাদের সংমিশ্রণ। পারসিকগণ অদ্বৈতবাদ স্বীকার করেন এবং বলেন, “নেস্তেযাদ মগর যাজদান”–অর্থাৎ ঈশ্বর অদ্বিতীয়। আবার বলেন, সৎকাজের উদ্যোক্তা অহুর মজদা (পারসিকদের ঈশ্বর) এবং অসৎকাজের সৃষ্টিকর্তা আহরিমান। অর্থাৎ সৎকাজের প্রেরণাদাতা একজন এবং অসৎকাজের প্রেরণাদাতা আরেকজন। এমতাবস্থায় স্বভাবত ইহাই মনে হয় যে, হয়তো আহরিমানের কাজে বাধাদানের ক্ষমতা অহুর মজদার নাই, নতুবা তিনি ইচ্ছাপূর্বক বাধা দেন না। অর্থাৎ তিনি চক্রান্তকারী বা ভণ্ড।

৪. পরলোক সম্বন্ধে জেন্দ-আভেস্তার শিক্ষা —

ক. মৃত্যুর পর মানবদেহ দানবে অধিকার করে।

খ. মৃত্যুর পর দণ্ড ও পুরস্কার আছে।

গ. পরলোকে প্রত্যেক ব্যক্তিকে চিনাভাদ নামক পুল পার হইতে হয়। পুণ্যবানগণ অনায়াসে উহা পার হইতে পারে। কিন্তু পাপীগণ দুখ নামক দুঃখার্ণবে নিপতিত হইয়া অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করে।

 ঘ. উপাসনা ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যস্থতায় কাহারও কাহারও দুঃখভোগের কাল হ্রাসপ্রাপ্ত হইয়া থাকে।

ঙ. এই যুগের শেষ ভাগে সওসন্ত নামক একজন মহাপুরুষ অবতীর্ণ হইবেন।

 চ. ছয় দিনে জগতসৃষ্টি এবং উহার শেষদিনে মানুষসৃষ্টি। আদি মানুষটির নাম গেওমাড। ইত্যাদি।

.

# ৪. বাইবেল

 পবিত্র বাইবেল গ্রন্থ ৬৬খানা ক্ষুদ্র পুস্তকের সমষ্টি এবং উহা দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগকে বলা হয় পুরাতন নিয়ম (Old Testament), ইহাতে পুস্তকের সংখ্যা ৩৯ এবং দ্বিতীয় ভাগকে বলা হয় নূতন নিয়ম (New Testament), ইহাতে পুস্তকের সংখ্যা ২৭। মুসলমানগণ যাহাকে তাউরাত (তৌরিত) ও জব্দুর কেতাব বলেন, উহা পুরাতন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত এবং নূতন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত ইঞ্জিল কেতাব। যাহারা পুরাতন নিয়ম মানিয়া চলেন, তাহাদিগকে বলা হয় ইহুদি এবং যাহারা নূতন নিয়ম অনুসরণ করিয়া চলেন, তাহাদিগকে বলা হয় খ্রীস্টিয়ান। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই উক্ত গ্রন্থাবলীকে ঐশ্বরিক বলিয়া মনে করেন।

কিন্তু মুসলমানগণ তৌরিত, জব্বর ও ইঞ্জিল –এই নাম কয়টিকে ঐশ্বরিক বলিয়া স্বীকার করেন, গ্রন্থকে নহে। কেননা বলা হইয়া থাকে যে, হাল আমলে প্রচলিত গ্রন্থসমূহ আসল নহে, উহা কৃত্রিম। সে যাহা হউক, বাইবেলের অন্তর্গত তৌরিত, জব্বর ও ইঞ্জিল –এই গ্রন্থত্রয়ের পৃথক পৃথক আলোচনা করা যাইতেছে।

তৌরিত

ইহুদিদের মতে, একদা হজরত মূসা তুর পর্বতের চূড়ায় ভগবান জাভে (ইহুদিদের ঈশ্বর)-এর দর্শন লাভ করেন ও তাহার বাণী শ্রবণ করেন এবং জাভে-এর স্বহস্তে লিখিত দশটি আদেশ সম্বলিত দুইখানা পাথর প্রাপ্ত হন। উহাই তৌরিত গ্রন্থের মূলসূত্র। অতঃপর বহুদিন যাবত হজরত মূসা উক্ত পর্বতে যাতায়াত করিয়া ও অন্যত্র বিভিন্ন সময়ে জাভের নিকট হইতে যে সমস্ত আদেশ-উপদেশ প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহাও উক্ত গ্রন্থে হান পাইয়াছে।

হজরত মূসার ঈশ্বরের দর্শনলাভ সম্বন্ধে তৌরিতের বিবরণটি এইরূপ — “মিশর দেশ হইতে ইস্রায়েল সন্তানদের বাহির হইবার পর তৃতীয় মাসে … পরে তৃতীয় দিন প্রভাত হইলে মেঘগর্জন ও বিদ্যুৎ এবং পর্বতের উপরে নিবিড় মেঘ হইল, আর অতিশয় উচ্চরবে তুরিধনি হইতে লাগিল; তাহাতে শিবিরস্থ সমস্ত লোক কাপিতে লাগিল … তখন সমস্ত সীনয় পর্বত ধূমময় ছিল। কেননা সদাপ্রভু অগ্নিসহ তাহার উপর নামিয়া আসিলেন, আর ভাটির ধূমের ন্যায় তাহা হইতে ধূম উঠিতে লাগিল এবং সমস্ত পর্বত অতিশয় কপিতে লাগিল। আর তুরির শব্দ ক্রমশ অতিশয় বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, তখন মোশি (মূসা আ.) কথা কহিলেন এবং ঈশ্বর বাণী দ্বারা তাঁহাকে উত্তর দিলেন।” (যাত্রাপুস্তক ১৯; ১, ১৬, ১৮, ১৯)

অন্যত্র হজরত মূসা বলেন, “সদাপ্রভু পর্বতের অগ্নির, মেঘের ও ঘোর অন্ধকারের মধ্য হইতে তোমাদের সমস্ত সমাজের নিকটে এই সমস্ত বাক্য মহারবে বলিয়াছিলেন, আর কিছুই বলেন নাই। পরে তিনি এই সমস্ত কথা দুইখানা প্রস্তরফলকে লিখিয়া আমাকে দিয়াছিলেন।” (দ্বিতীয় বিবরণ ৫; ২২)

উক্ত বিবরণে দেখা যায় যে, ঐদিন তূর পর্বত ধূম্রবৎ মেঘে আচ্ছন্ন ছিল এবং মুহুর্মুহু মেঘগর্জন হইতেছিল ও বিদ্যুৎচমকে পর্বতটি অগ্নিময় দেখাইতেছিল। প্রিয় পাঠকগণের স্মরণ থাকিতে পারে যে, পার্শি ধর্ম প্রবর্তক জোরওয়াস্টারও অনুরূপ বজ-বিদ্যুতের মধ্যে পাহাড়চূড়ায় তাঁহার ধর্মবিধি জেন্দ-আভেন্তা গ্রন্থখানা পাইয়াছিলেন।

ইস্রায়েল বংশীয় মহাভাববাদী হজরত মূসা মিশর দেশে জন্মগ্রহণ করেন খ্রী. পূ. ১৩৫১ সালে এবং তূর পর্বতে খোদাতা’লার নূর দেখিতে, বাণী শুনিতে ও দশ আদেশ খচিত প্রস্তরফলক পান খ্রী. পূ. ১২৮৫ সালে। অতঃপর ৫৪ বৎসরকাল স্বীয় ধর্মমত (ইহুদি ধর্ম) প্রচার করিয়া নিবো পাহাড়ে দেহত্যাগ করেন খ্রী. পূ. ১২৩১ সালে। কাজেই তৌরিত গ্রন্থের সৃষ্টি খ্রী. পূ. ১২৮৫ ১২৩১ সালের মধ্যে। সুতরাং তৌরিত গ্রন্থের বর্তমান বয়স অন্যূন ৩,২০০ বৎসর।

তৌরিত গ্রন্থের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই —

১. ত্বকচ্ছেদ –অর্থাৎ পুরুষের লিঙ্গগ্রের চর্ম কর্তন করা। ইহা ইহুদিদের জাতীয় চিহ্ন। ইহা না করিলে সে ইহুদিদের স্বজাতীয় বলিয়া গণ্য হয় না। (লেবীয় ১২; ৩)

 ২. খাদ্য ও অখাদ্য নির্ণয় –খাদ্যাখাদ্য নির্ণয়ে তৌরিতের বিধান এইরূপ — “পশুগণের মধ্যে যে কোনো পশু সম্পূর্ণ দ্বিখণ্ড খুর বিশিষ্ট ও জাবর কাটে, তাহা তোমরা ভোজন করিতে পার। … আর শূকর তোমাদের পক্ষে অশুচি। কেননা সে সম্পূর্ণ দ্বিখণ্ড খুর বিশিষ্ট বটে, কিন্তু জাবর কাটে না। তোমরা তাহাদের মাংস ভোজন করিও না; এবং তাহাদের শবও স্পর্শ করিও না; তাহারা তোমাদের পক্ষে অশুচি।

“জলজন্তুদের মধ্যে তোমরা এই সকল ভোজন করিতে পার –জলাশয়ে, সমুদ্রে কি নদীতে স্থিত জন্তুর মধ্যে ডানা ও আঁইশ বিশিষ্ট জন্তু তোমাদের খাদ্য।… পক্ষীদের মধ্যে এই সকল তোমাদের পক্ষে ঘৃণাহ হইবে –ঈগল, হাড়গিলা, কুরল, চিল, … কাক, উষ্ট্রপক্ষী, রাত্রিশ্যেন, গাংচিল, শ্যেন, পানি ভেলা, পেঁচক, মাছরাঙ্গা, মহাপেঁচক, দীর্ঘগল হংস, শকুনী, সারস, বক, টিভি ও বাদুড়, … আর তোমাদের কোনো পশু মরিলে, যে কেহ তাহার শব স্পর্শ বা ভক্ষণ করিবে, সে সন্ধ্যা পর্যন্ত অশুচি থাকিবে।” (লেবীয় পুস্তক ১১; ৩, ৬৯, ১৩–১৯, ৩৯)

৩. অশুচিতা –অশৌচ সম্বন্ধে তৌরিতের বিধান এইরূপ — “আর সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, তুমি ইস্রায়েল সন্তানগণকে বল, যে স্ত্রী গর্ভধারণ করিয়া পুত্র প্রসব করে, সে সাতদিন অশুচি থাকিবে, … পরে অষ্টম দিনে বালকটির ত্বকচ্ছেদ হইবে [ত্বকচ্ছেদ নিয়মটির প্রবর্তক হজরত ইব্রাহিম (আদিপুস্তক ১৭; ১০-১২) ]। আর সে স্ত্রী তেত্রিশ দিন পর্যন্ত আপনার শৌচার্থ রক্তস্রাব অবস্থায় থাকিবে। যাবত শৌচাৰ্থ দিন পূর্ণ না হয়, তাবৎ সে কোনো পবিত্র বস্তু স্পর্শ করিবে না এবং ধর্মধামে প্রবেশ করিবে না।… আর যে স্ত্রী রজস্বলা হয়, তাহার শরীরস্থ রক্তক্ষরণে সাত দিবস তাহার অশৌচ থাকিবে। আর অশৌচকালে সে যে কোনো শয্যায় শয়ন করিবে, তাহা অশুচি হইবে ও যাহার উপর বসিবে, তাহা অশুচি হইবে।”  (লেবীয় পুস্তক ১২; ১৪ ও ১৯; ১৯-২০)

৪. রেতস্থলন –“আর যদি কোনো পুরুষের রেতপাত হয়, তবে সে আপনার সমস্ত শরীর জলে ধৌত করিবে।… আর যে কোনো বস্ত্রে কি চর্মে রেতপাত হয়, তাহা জলে ধৌত করিতে হইবে।… আর স্ত্রীর সহিত পুরুষ রেতশুদ্ধ শয়ন করিলে, তাহারা উভয়ে জলে স্নান করিবে।  (লেবীয় ১৫; ১৬-১৮)

৫. বিবাহ নিষিদ্ধ নারী –তৌরিত গ্রন্থে নিম্নলিখিত আত্মীয়া রমণীগণের সহিত বিবাহ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। মাতা, বিমাতা, ভগিনী, নাতিনী, বৈমাত্র ভগিনী, পিসী, মাসী, চাচী, পুত্রবধূ, ভ্রাতৃবধূ, স্ত্রীর নাতিনী (পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত), স্ত্রীর কন্যা (পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত), শাশুড়ী। (লেবীয় ১৮; ৬-১৭)

৬. অশৌচকালে যৌনমিলন নিষিদ্ধ –“কোনো স্ত্রীর অশৌচকালে তাহার আবরণীয় অনাবৃত করিতে তাহার নিকটে যাইও না।” (লেবীয় পুস্তক ১৮; ১৯)

 ৭. ঈশ্বর নামের নিন্দায় জীবনদণ্ড –“আর যে সদাপ্রভুর নামের নিন্দা করে, তাহার প্রাণদণ্ড অবশ্য হইবে। সমস্ত মণ্ডলী তাহাকে প্রস্তরাঘাতে বধ করিবে, বিদেশীয় হউক আর স্বদেশীয় হউক, সেই নামের নিন্দা করিলে উহার প্রাণদণ্ড হইবে।” (লেবীয় পুস্তক ২৪; ১৬)

অহিংসা পরম ধর্ম –এই বাক্যটিতে সকল ধর্মই একমত। অথচ ধর্মে-ধর্মে হিংসার অন্ত নাই, বিশেষত ঈশ্বর সম্বন্ধে। নিরীশ্বরবাদী (নাস্তিক) মানুষের সংখ্যা জগতে খুবই অল্প এবং প্রায় সকল ধর্মই ঈশ্বরবাদী এবং ঈশ্বরের সংজ্ঞাও প্রায় একই, তখন সমস্ত জগতে সর্বসম্মত একজন ঈশ্বর থাকা উচিত। কিন্তু আছে কি?

নামে পরিবর্তনে বিশেষ কিছু আসে যায় না। বিভিন্ন ভাষায় সূর্যের নাম বিভিন্ন। কিন্তু উহার আকৃতি ও প্রকৃতি সর্বত্রই একরূপ। কিন্তু পরমেশ্বর, অহুর মজদা, জাভে, পরমপিতা ও আল্লাহ প্রভৃতি ঈশ্বরবাচক নামগুলি যেমন ভিন্ন ভিন্ন, তেমন তাহার স্বভাব-চরিত্রও ধর্মজগতে ভিন্ন ভিন্ন। আবার প্রত্যেক ধর্মই অপর ধর্মাবলম্বী মানুষকে বলে বিধর্মী। ধর্ম বলিতে যাহা বুঝায়, তাহা যেন তাহার নিজেরটিই; অন্য আর একটিও ধর্ম নহে, ঐসব কুসংস্কার।

প্রত্যেক ধার্মিকের কাছেই আপন ঈশ্বর প্রেমের পাত্র এবং ভক্তরা তাহার প্রশংসায় মুখর। কিন্তু অন্যদের ঈশ্বর যেমন প্রশংসার অযোগ্য, তেমন ঘৃণার পাত্র। এমতাবস্থায় বিধর্মী মাত্রেই ঈশ্বরনিন্দুক এবং তৌরিতের মতে তাহারা বধের যোগ্য। কাজেই ইহাতে সৃষ্ট হইল বিজাতিবিদ্বেষ ও তাহার পরিণামে ধর্মযুদ্ধ। কে বলিতে পারে যে, কত মানুষ প্রাণ দিয়াছে পুরোহিততন্ত্রের আমলের ধর্মযুদ্ধে? সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, গণতন্ত্রের যুগে ধর্মযুদ্ধ হইয়াছে অচল বা বাতিল। কিন্তু নির্বাণোন্মুখ প্রদীপের মতো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা এখনও ঘটিয়া থাকে।

৮. খুনের বদলে খুন –এই বিষয়ে তৌরিতের শিক্ষা এইরূপ — “আর যে কেহ কোনো মানুষকে বধ করে, তাহার প্রাণদণ্ড অবশ্য হইবে।” (লেবীয় পুস্তক ২৪; ১৭)

 ইহুদি জাতির উক্ত নীতিটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করিয়াছিল — শূলদণ্ড ও ফাঁসিকাষ্ঠে। তবে বর্তমানে উহা অনেকেই পছন্দ করেন না।

৯. সুদের নীতি –“তোমার ভ্রাতা যদি দরিদ্র হয়, তবে তুমি তাহার উপকার করিবে … তুমি তাহা হইতে সুদ কিম্বা বৃদ্ধি লইবে না।” (লেবীয় পুস্তক ২৫; ৩৫, ৩৬)

১০. মানত করা –“যদি কেহ বিশেষ মানত করে, তবে তোমার নিরূপণীয় মূল্যানুসারে প্রাণীসকল সদাপ্রভুর হইবে।”  (লেবীয় পুস্তক ২৭; ২)

মানত প্রথাটি এদেশের এক শ্রেণীর লোকের মধ্যে এখনও বেশ প্রচলিত আছে। ছাগল-গরু হইতে আরম্ভ করিয়া মৎস্য, ফল-ফলাদি, এমনকি লাউ-কুমড়াদি, তরিতরকারিও মানত হইয়া মন্দির ও দরগাহে যাইয়া থাকে।

১১. উৎসর্গ –“আর যদি কেহ সদাপ্রভুর কাছে উৎসর্গের জন্য পশু দান করে, তবে সদাপ্রভুর উদ্দেশে দত্ত তাদৃশ সমস্ত পশু পবিত্র বস্তু হইবে।” (লেবীয় ২৭; ৯)

এতদ্দেশেও সদাপ্রভুর নামে পশু, বিশেষত গরু উৎসর্গের নিয়ম প্রচলিত আছে।

১২. দায়ভাগ বা উত্তরাধিকার –এই বিষয়ে তৌরিতের বিধান এইরূপ — “তুমি উহাদের পিতৃকুলের ভ্রাতাদিগের মধ্যে উহাদিগকে স্বত্বাধিকার দিবে ও উহাদের পিতার অধিকার উহাদিগকে সমৰ্পণ করিবে। …. কেহ যদি অপুত্রক হইয়া মরে, তবে তোমরা তাহার অধিকার তাহার কন্যাকে দিবে। যদি কন্যা না থাকে, তবে তাহার ভ্রাতৃগণকে তাহার অধিকার দিবে। যদি তাহার ভ্রাতা না থাকে, তবে তাহার পিতৃব্যদিগকে তাহার অধিকার দিবে। যদি তাহার পিতৃব্য না থাকে, তবে তাহার গোষ্ঠীর মধ্যে নিকটস্থ জ্ঞাতিকে তাহার অধিকার দিবে।” (গণনা পুস্তক ২৭; ৭-১১)

১৩. বিজাতিবিদ্বেষ –“আর তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু যখন তোমার সম্মুখে তাহাদিগকে (বিজাতীয়দিগকে) সমর্পণ (পরাজিত) করিবেন, এবং তুমি তাহাদিগকে আঘাত করিবে, তখন তাহাদিগকে নিঃশেষে বিনষ্ট করিবে, তাহাদের সহিত কোনো নিয়ম (সন্ধি) করিবে না বা তাহাদের প্রতি দয়া করিবে না।” (দ্বিতীয় বিবরণ ৭; ২)

১৪. বলিদানে পশু নির্বাচন –“তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশে দোষযুক্ত, কোনো প্রকার কলকযুক্ত গরু কিম্বা মেষ বলিদান করিবে না। কেননা তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তাহা ঘৃণা করেন।” (দ্বিতীয় বিবরণ ১৭; ১)

 ১৫. ব্যভিচারের ফল –“যদি কেহ পুরুষের প্রতি বাগদত্তা (বিবাহিতা) কোনো কুমারীকে নগরমধ্যে পাইয়া তাহার সহিত শয়ন করে, তবে তোমরা সেই দুইজনকে বাহির করিয়া নগরদ্বারের নিকটে আনিয়া প্রস্তরাঘাতে বধ করিবে … যদি কেহ অবাগদত্তা কুমারী কন্যাকে পাইয়া তাহাকে ধরিয়া তাহার সহিত শয়ন করে ও তাহারা ধরা পড়ে, তবে তাহার সহিত শয়নকারী সেই কন্যার পিতাকে পঞ্চাশ রৌপ্য (শেকেল) দিবে এবং তাহাকে মানভ্রষ্টা করিয়াছে। বলিয়া সে তাহার স্ত্রী হইবে; সেই পুরুষ তাহাকে যাবজ্জীবন ত্যাগ করিতে পারিবে না। (দ্বিতীয় বিবরণ ২২; ২৩, ২৪, ২৮, ২৯)

 ১৬. স্ত্রীত্যাগ –“কোনো পুরুষ কোনো স্ত্রীকে গ্রহণ করিয়া বিবাহ করিবার পর যদি তাহাতে কোনো প্রকার অনুপযুক্ত ব্যবহার দেখিতে পায়, আর সেই জন্য সে স্ত্রী তাহার দৃষ্টিতে প্রীতিপাত্রী না হয়, তবে সেই পুরুষ তাহার জন্য এক ত্যাগপত্র লিখিয়া তাহার হস্তে দিয়া আপন বাটী হইতে তাহাকে বিদায় করিতে পারিবে।” (দ্বিতীয় বিবরণ ২৪; ১)

১৭. দশ আদেশ — তৌরিত গ্রন্থ বা ইহুদি জাতির প্রাণকেন্দ্র, ঈশ্বরের স্বহস্তে দুইখানা প্রস্তরে লিখিত বিখ্যাত দশ আদেশ এই—

আমার সাক্ষাতে তোমার অন্য খোদা না থাকুক।

তুমি খোদিত প্রতিমা বানাইও না।

 তুমি অনর্থক ঈশ্বরের নাম লইও না।

বিশ্রামদিন পালন করিও।

মাতাপিতাকে সমাদর করিও।

নরহত্যা করিও না।

ব্যভিচার করিও না।

চুরি করিও না।

প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিও না।

 প্রতিবেশীর গৃহে লোভ করিও না। (যাত্রাপুস্তক ২০; ৩-১৭)

বিখ্যাত দশ আদেশ ভুক্ত তৃতীয় আদেশটি কোনো কোনো মহলের বিস্ময় উৎপাদন করে বটে, কিন্তু অধুনা ঐ আদেশটি ব্যাপকভাবেই প্রতিপালিত হইতেছে।

জব্বুর

কথিত হয় যে, হজরত দাউদ নবীর উপর জব্বুর কেতাব অবতীর্ণ হইয়াছিল। অর্থাৎ হজরত দাউদের আদেশ-উপদেশগুলিই জব্দুর কেতাব নামে অভিহিত। হজরত দাউদের জন্ম খ্রী. পূ. ১০৩১ সালে এবং মৃত্যু খ্রী. পূ. ৯৭১ সালে। সুতরাং হজরত দাউদের মৃত্যু হইয়াছে এখন (১৯৭০) হইতে ২,৯৪১ বৎসর পূর্বে। কাজেই জব্বুর গ্রন্থের সৃষ্টিকাল প্রায় উহাই।

লক্ষাধিক নবী-আম্বিয়াগণ সকলেই কিছু না কিছু ঐশ্বরিক বাণী প্রাপ্তির দাবি করিয়াছেন এবং তাঁহাদের অনেকের বাণীই প্রাচীন বিধান বাইবেলে স্থান লাভ করিয়াছে। কিন্তু যীশু খ্রীস্টের পূর্ববর্তী কোনো নবীই হজরত মূসার ধর্মবিধি ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মমত প্রচার করেন নাই। বরং প্রায় সকলেই ছিলেন হজরত মূসার মতের সমর্থক ও পরিপূরক। এমনকি হজরত দাউদও স্বতন্ত্র কোনো ধর্মমত প্রচার করেন নাই। বরং তিনি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে স্বীয় পুত্র সোলায়মানকে বলিয়াছিলেন, “আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর রক্ষণীয় বিধান রক্ষা করিয়া তাহার পথে চল, মোশির (হজরত মূসার) ব্যবস্থায় লিখিত তাহার বিধান, তাহার আজ্ঞা, তাহার শাসন ও তাহার সাক্ষ্যসকল পালন কর। (১ রাজাবলি ২; ৩)

ইঞ্জিল

 ইঞ্জিলকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলা হয়। কিন্তু ইহা তৌরিতের মতো মহাপ্রভুর নিজের মুখের বাণী নহে, যীশুর মুখের বাণী। যীশু কুমারী মরিয়মের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন, লোকাঁচারে তাহার কোনো পিতা ছিল না। তাই বলা হয় যে, তিনি ঈশ্বরের পুত্র। আর পিতার পক্ষ হইতে কথা বলিবার অধিকার পুত্রের থাকে। সেই মর্মে যীশুর আদেশ-উপদেশ ও বিধি-নিষেধসমূহকে ঈসায়ীগণ ঐশ্বরিক বাণী রূপে গ্রহণ করিয়া থাকেন।

হজরত মূসা নবীর মতো যীশু (হজরত ঈসা আ.)-ও মহাপ্রভুর দর্শন পাইয়াছিলেন। যীশুর খোদাদর্শন সম্বন্ধে বাইবেলে লিখিত বিবরণটি এইরূপ — “পরে যীশু বাপ্তাইজিত হইয়া অমনি জল হইতে উঠিলেন, আর দেখ, তাহার নিমিত্ত স্বর্গ (আকাশ) খুলিয়া গেল; এবং তিনি ঈশ্বরের আত্মাকে কপোতের ন্যায় নামিয়া আপনার উপরে আসিতে দেখিলেন, আর দেখ, স্বর্গ হইতে এই বাণী হইল, ‘ইনিই আমার প্রিয় পুত্র, হঁহাতেই আমি প্রীত।” (মথি ৩; ১৬, ১৭)

এতদ্দেশের হিন্দুগণ গঙ্গানদীর জলকে পবিত্র মনে করেন এবং মুসলমানগণ পবিত্র মনে করেন জমজম কূপের পানি। ঐরূপ ইহুদিরা (খ্রীস্টানরাও) জর্দান নদীর পানিকে পবিত্র মনে। করেন। ইহুদিদের স্বধর্মে দীক্ষা গ্রহণের সময় ঐ নদীর জলে অবগাহন করিতে হয়। উহাকে বলা হয় বাপ্তাইজ। যে সমস্ত দূরদেশবাসীদের পক্ষে ঐ নদীর জলে অবগাহন সম্ভব নহে, সেই সমস্ত দেশবাসীদের বাপ্তাইজিত হইতে হয় ঐ নদী হইতে লওয়া কিছু জল গায়ে ছিটাইয়া।

তৎকালীন ইহুদিদের ধর্মযাজক ছিলেন হজরত জাকারিয়া নবীর পুত্র হজরত ইয়াহইয়া (যোহন)। ত্রিশ বৎসর বয়ঃক্রমকালে যীশু যোহনের নিকট ইহুদি ধর্মে বাপ্তাইজিত হন। অর্থাৎ দীক্ষা গ্রহণ করেন।

যীশু বাপ্তাইজিত হইয়া জর্দান নদীর তীরে উঠিয়া দেখিতে পাইলেন যে, একটি কবুতর পাখি উড়িয়া তাহার মাথার উপর আসিতেছে। তখন তিনি ভাবিলেন যে, ঐ কবুতরটি ঈশ্বরের আত্মা। আর তিনি শুনিতে পাইলেন, কবুতরটি বলিয়া গেল, “ইনিই আমার প্রিয় পুত্র, ইহাতেই আমি প্রীত।” এই বাণীটির দ্বারাই যীশু পাইলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব।

যীশু ঈশ্বরের বাণী বা পয়গম্বরী প্রাপ্ত হন ৩০ বৎসর বয়সে। অতঃপর তিনি স্বীয় ধর্মমত (খ্রীস্টিয়ানিটি) প্রচার করিতে শুরু করেন। ধর্ম বিষয়ে তাঁহার মতামতসমূহই নূতন নিয়ম বা ইঞ্জিল কেতাব নামে পরিচিত। কাজেই ইঞ্জিল কেতাবের বর্তমান (১৯৭০) বয়স অনধিক ১৯৪০ বৎসর।

নূতন নিয়ম-এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিধান এই —

১. হিংসা করা নিষেধ –হজরত মূসা (আ.) বলিতেন যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চক্ষুর বদলে চক্ষু ও দন্তের পরিবর্তে দন্ত লইবে। কিন্তু যীশু বলিতেন, “তুমি দুষ্টের প্রতিরোধ করিও না। বরং যে কেহ তোমার ডান গালে চড় মারে, অন্য গাল তাহাকে ফিরাইয়া দাও। আর যে তোমার সহিত বিচারস্থানে বিবাদ করিয়া তোমার আঙরাখা লইতে চায়, তাহাকে চোগাও লইতে দাও। আর যে কেহ এক ক্রোশ যাইতে তোমাকে পীড়াপীড়ি করে, তাহার সহিত দুই ক্রোশ যাও।” (মথি ৫; ৩৯-৪১)

২. শপথ করা নিষেধ –হজরত মূসা (আ.) বলিতেন, “তুমি মিথ্যা দিব্য করিও না।” কিন্তু যীশু বলিতেন, “কোনো দিব্যই করিও না।” (মথি ৫; ৩৪)

৩. গোপনে দান করা –যীশু বলিতেন, “তুমি যখন দান কর, তখন তোমার দক্ষিণ হস্ত কি করিতেছে, তাহা তোমার বাম হস্তকে জানিতে দিও না।” (মথি ৬; ৩, ৪)

৪. সঞ্চয় না করা –যীশু বলিয়াছেন, “তোমরা পৃথিবীতে আপনাদের জন্য ধন সঞ্চয় করিও না; এইখানে তো কীটে-মরিচায় ক্ষয় করে এবং চোরে সিধ কাটিয়া চুরি করে। কিন্তু স্বর্গে আপনাদের জন্য ধন সঞ্চয় কর, সেইখানে কীটে ও মরিচায় ক্ষয় করে না, সেইখানে চোরেও সিধ কাটিয়া চুরি করে না।” (মথি ৬; ১৯, ২০)

যীশুর এই আদেশটি হাল জামানার অর্থনীতির পরিপন্থী। কেননা বর্তমান যুগের রাজনীতিতে অর্থনীতির ক্ষেত্রে সঞ্চয়কেই প্রথম স্থান দেওয়া হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে যীশুর এই আদেশটি ধর্মান্তরে প্রতিফলিত হওয়ার ফলে নিরীহ ধর্মভীরুদের শ্রমার্জিত অর্থ লুটিতেছে একদল ব্যবসায়ী ধর্মপ্রচারক।

৫. পরনিন্দা না করা –যীশু বলিয়াছেন, “তোমরা বিচার করিও না, যেন বিচারিত না হও। … আর তোমার ভ্রাতার চক্ষে যে কুটা আছে, তাহাই কেন দেখিতেছ, কিন্তু তোমার নিজের চক্ষে কড়িকাঠ আছে, তাহা কেন ভাবিয়া দেখিতেছ না?” (মথি ৭; ১-৩)

৬. সর্বস্ব ত্যাগ করা –একদা এক ব্যক্তি যীশুকে জিজ্ঞাসা করিল, “হে গুরু! অনন্ত জীবন পাইবার জন্য কিরূপ সৎকর্ম করিব?” যীশু বলিলেন, “নরহত্যা করিও না, চুরি করিও না, ব্যভিচার করিও না এবং তোমার প্রতিবেশীকে আপনার মতো প্রেম করিও।” সেই ব্যক্তি বলিল যে, “আমি ঐ সমস্ত আদেশ পালন করিয়াছি, এখন আমার কি ত্রুটি আছে?” উত্তরে যীশু তাহাকে বলিলেন, “যদি সিদ্ধ হইতে ইচ্ছা কর, তবে চলিয়া যাও, তোমার যাহা আছে, বিক্রয় কর এবং দরিদ্রদিগকে দান কর, তাহাতে স্বর্গে ধন পাইবে। … আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, ধনবানের পক্ষে স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করা দুষ্কর। আবার তোমাদিগকে কহিতেছি, ঈশ্বরের রাজ্যে (স্বর্গে) ধনবানের প্রবেশ করা অপেক্ষা বরং সূচীর ছিদ্র দিয়া উটের যাওয়া সহজ।”  (মথি ১৯; ২১-২৪)।

.

# ৫. কোরান

পবিত্র কোরান মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ এবং ইহা ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলিয়া পরিচিত। যে সব গ্রন্থকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলিয়া দাবি করা হয়, পবিত্র কোরান তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। বরং অতুলনীয়। পবিত্র কোরানের প্রচারক হজরত মোহাম্মদ (সা.)। তিনি ৫৭১ খ্রীস্টাব্দের ২০ এপ্রিল পবিত্র মক্কা নগরে জন্মলাভ করেন এবং শৈশবেই মাতৃ-পিতৃহীন হইয়া বহু দুঃখ-কষ্টে তদীয় পিতামহ কর্তৃক প্রতিপালিত হন। শৈশবে তিনি লেখাপড়া শিখিবার সুযোগ পান নাই। তিনি ছিলেন আশৈশব শান্ত, ধীর, সত্যবাদী ও চিন্তাশীল। যৌবনে পদার্পণ করার সাথে সাথে তিনি হন একাধারে বিশ্বাসী, ন্যায়বান, দয়ালু, নিভীক, পরোপকারী ও ক্ষমাশীলাদি শত শত সদগুণের অধিকারী এবং ভাবুক।

সেকালের আরববাসীরা ছিল নানা দলে বিভক্ত এবং তাহাদের চরিত্র ছিল নেহায়েত মন্দ। সেকালের আরব জাহানে যদিও ইহুদি ও খ্রীস্টান ধর্মের প্রাধান্য ছিল, তবুও ঐখানে মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল যথেষ্ট। মারামারি, কাটাকাটি, হিংসা, দ্বেষ, পরনিন্দা ইত্যাদি দুনিয়ার সমস্ত অন্যায়– অবিচারগুলি যেন জড়ো হইয়াছিল তখন আরবে। স্বদেশবাসীদের এহেন অধোগতি দেখিয়া ব্যথিত হইলেন হজরত মোহাম্মদ (সা.)। তিনি কেবলই চিন্তা করিতেন যে, কি করিয়া ইহাদের এই অধোগতি রোধ করা যায়, কি করিয়া ইহাদের অজ্ঞানান্ধকার দূর করিয়া জ্ঞানালোক দান ও একতাবদ্ধ করা যায়; কি রকমে দেখানো যায় ইহকাল ও পরকালের সরল পথ?

হজরতের বয়স যতই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, ততই বৃদ্ধি পাইতে থাকিল তাহার চিন্তাক্ষেত্রের পরিসর। সেই চিন্তা শুধু আরব জাহানেই সীমাবদ্ধ থাকিল না, তাহা পর্যবসিত হইল বিশ্বমানবের কল্যাণের চিন্তায়। তিনি ডুবিলেন চিন্তাসমুদ্রের গভীর তলদেশে মক্কার অদূরবর্তী হেরা পর্বতের গহ্বরে।

হজরতের বয়স তখন প্রায় ৪০ বৎসর। ৬১০ খ্রীস্টাব্দের আগস্ট মাসের ৬ তারিখ। হজরত হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্নাবস্থায় বসিয়া আছেন। এমন সময় তিনি শুনিতে পাইলেন যে, আল্লাহর ফেরেশতা জেব্রাইল আসিয়া তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিতেছেন, “আল্লাহর বাণী আপনার উপর নাজেল হইল, আপনি আল্লাহর রসূল।” এই দিন হইতে হজরত মোহাম্মদ (সা.) হইলেন পয়গম্বর, অর্থাৎ আল্লাহর প্রেরিত মহান বাণীবাহক।

ঐদিন হইতে হজরত তাহার সমস্যাসমূহের সমাধানে প্রাপ্ত হইতে থাকেন জেব্রাইল ফেরেশতার মারফত আল্লাহর বাণী এবং তাহা সাধারণ্যে প্রকাশ করিতে থাকেন ‘ভাববাণী’ রূপে। ইহকাল ও পরকাল বিষয়ে মানুষের কর্তব্য সম্বন্ধে আল্লাহর বাণীরূপে জেব্রাইল ফেরেশতার মারফত হজরত মোহাম্মদ (সা.) আমরণ যে সমস্ত আদেশ-উপদেশাদি প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহারই সঙ্কলন পবিত্র কোরান মহাগ্রন্থখানা।

পবিত্র কোরানের বিধান ব্যতীত হজরত স্বয়ং ধর্মজগতের আবশ্যকীয় অনেক বিধান প্রদান করিয়াছেন। সেই সমস্ত বিধানের সকলনকে বলা হয় পবিত্র হাদিস গ্রন্থ। ইসলাম ধর্ম প্রধানত পবিত্র কোরান ও হাদিস গ্রন্থের বিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত।

————

৩৯. প্রাচীন মিশর, শচীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, পৃ. ১২১, ১২২।

৪০, পৃথিবীর আশ্চর্য, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, পৃ. ২৭।