০৮. শহরটি প্রায় স্পষ্ট দুভাগে ভাগ করা

শহরটি প্রায় স্পষ্ট দুভাগে ভাগ করা। হুগলী নদীর ধার ঘেঁষে যেখানে পুরোনো কেল্লা ছিল, সেই অঞ্চলেই শ্বেতাঙ্গ রাজপুরুষদের ঘনবসতি। গ্রেট ট্যাঙ্ক বা লাল দীঘির দক্ষিণ আর পশ্চিম দিকে সাহেবদের সুন্দর সুন্দর বসত বাড়ি। এর মাঝখান দিয়ে চলে গেছে কোর্ট হাউস স্ট্রিট নামে একটি প্রশস্ত রাস্তা। আর একটু দক্ষিণে গাছপালা ঘেরা চৌরঙ্গি এবং বেরিয়াল গ্ৰাউণ্ড রোডের পাশে পাশেও কয়েকটি বাগানবাড়ি রয়েছে ধনী সাহেবদের। নতুন কেল্লা তৈরি হয়েছে গভীর জঙ্গল সাফ করে এবং লড়াইয়ের সুবিধের জন্য রাখা হয়েছে অনেকখানি ফাঁকা ময়দান। তার নাম এসপ্ল্যানেড। এই এসপ্লানেড শব্দটির মানেই হচ্ছে দুর্গ এবং নগরীর অট্টালিকা শ্রেণীর মাঝখানের জায়গা।

আদিবাসীদের পল্লী মোটামুটি শহরের উত্তরাঞ্চল জুড়ে। পাস্ত্রী, শিক্ষক ও কিছু কিছু দোকানদার ছাড়া অন্য সাহেবরা এই নেটিভপাড়ায় বেশী আসে না। অবশ্য ধনী নেটিভবাড়ির উৎসবে নিমন্ত্রণে সাহেবরা আসে মাঝে মাঝে। বেলগাছিয়ায় দ্বারকানাথ ঠাকুরের রূপকথাতুল্য প্রমোদ ভবনে নেমন্তন্ন পাবার জন্য রাজপুরুষেরা পর্যন্ত লালায়িত হয়ে থাকে। নেটিভদেরও সাহেবপাড়ায় যাবার বিশেষ কোনো বিধিনিষেধ নেই যদিও, কিন্তু বিনা কাজে কেউ চট করে ওদিকে যেতে ভয় পায়। সন্ধের পর গড়ের মাঠে মাতাল গোরারা দিশী লোকদের মেরে হাতের সুখ করে নেয়, এমন জনশ্রুতি আছে। কলকাতা থেকে যারা কালীঘাটে তীর্থ করতে যায়। তারাও অন্ধকার নামবার আগেই বেলাবেলি ফিরে আসে অথবা রাত্রিবাস করে সেখানেই।

বউবাজার পার হয়ে লালবাজার দিয়ে সাহেবপাড়ায় ঢুকতে গেলেই প্ৰথমে চোখে পড়ে সুপ্রিম কোর্ট ভবনটির সুউচ্চ চূড়া। উপনিবেশ স্থাপনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আদালতের প্রতিষ্ঠা করে ইংরেজ চমকে দিয়েছে ভারতবাসীকে। ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য ইংরেজের জাতীয় বৈশিষ্ট্য এবং একথা ইংরেজ সগর্বে প্রচার করে। দিশী লোকদেরও ধারণা হয়ে গেছে যে ইংরেজ রাজত্বে সুবিচার পাওয়া যায়। মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসীর স্মৃতি লোকের মন থেকে মুছে গেছে। সেও তো প্রায় ষাট সত্তর বছর আগেকার ঘটনা।

ইংরেজ দেশটা শাসন করলেও এখনো পর্যন্ত পাকাপাকি সনদ নিয়ে এদেশের রাজা হয়ে বসেনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষটা ইজারা নিয়েছে, কিন্তু তাদের কার্যকলাপের জন্য মাঝে মাঝে বৃটিশ পার্লামেণ্টের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। এদেশেও তাদের ব্যবহার অতি সতর্ক। নেটিভদের সঙ্গে পরামর্শ না করে ইংরেজ চট করে কোনো সামাজিক নীতি বদল করে না। প্ৰথম দিকে ক্ষৌরকার, ঝাড়ুদার, খানসামা, দালাল ও ফড়ে শ্রেণীর কিছু কিছু লোক সাহেবদের সংস্পর্শে এসে দু-চারটি ইংরেজি শব্দ শিখতে শুরু করে। সাহেবরা তাদের দিয়েই কাজ চালাতো। এখন সম্ভ্রান্ত, সম্পন্ন ঘরের লোকেরাও ইংরেজি শিক্ষা গ্ৰহণ করছে এবং তাদের মাধ্যমে সাহেবরাও জানতে পারছে যে এ দেশটা শুধু কুৎসিত, কদৰ্য চেহারার নির্বোধ মানুষেই ভরা নয়, এদেশে আছে সুদীর্ঘকালের জ্ঞান-সম্পদ এবং আরও বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এদেশের কোনো কোনো অতি দরিদ্র মানুষও বিনা কারণে অহংকারী হতে পারে।

আরও একটি ব্যাপার জানতে পেরে সাহেবদের আত্মশ্লাঘায় খানিকটা গোপন ঘা লেগেছে। অনেক সাহেব যেমন নেটিভদের স্পর্শ করতে ঘৃণা করে, তেমনি অনেক নেটিভও ঘৃণায় সাহেবদের ছোঁয় না। কিংবা দৈবাৎ ছয়ে ফেললেও গঙ্গায় স্নান করে আসে। আমি যাকে পায়ের তলায় রাখতে চাই এবং রাখতে পারি, সে কাতরভাবে আমার কাছে দয়া ভিক্ষা করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে যদি বিনা প্রতিবাদে পায়ের তলায় শুয়ে থাকে এবং মনে মনে আমাকেও তার পায়ের তলায় রাখে, তাহলে সুখটা ঠিক সম্পূর্ণ হয় না।

যাই হোক, ভয় বা ঘৃণার চেয়ে ইংরেজদের সম্পর্কে এখন ভক্তি ভাবটাই অবশ্য বেশী প্রবল। কয়েক শতাব্দীর অরাজকতায় জনসাধারণ একেবারে বিধ্বস্ত অবস্থায় পৌঁছেছিল। নবাবী আমল উচ্ছন্নে গেছে বলে কারুর মনে কোনো খেদ নেই। তখনকার জঘন্য অত্যাচারের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে সজাগ। সিরাজ-উদ্দৌল্লা, মীরকাশীম, প্রতাপাদিত্য ইত্যাদি নামগুলি ভবিষ্যতের নাট্যকারদের হাতে গৌরবান্বিত হবার অপেক্ষায় আপাতত ইতিহাসের অবহেলিত অন্ধকার কক্ষের দলিল দস্তাবেজে নিহিত। এখন লোকের চোখে ওরা নারীলোলুপ, রক্তশোষণকারী এবং দস্যু। লম্পট এবং দসারা যে এখনো নেই তা নয়, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে এখন নালিশ করা যায়। এবং সুবিচারও দুর্লভ নয়। ক্ষেত্রমণি নামী একটি নাবালিকার ওপর পাশবিক অত্যাচারের অভিযোগে সুবিখ্যাত বসাক পরিবারের সন্তান হরগোবিন্দর সম্প্রতি কারাদণ্ড হয়েছে। এমন কথা কয়েকশো বছরের মধ্যে কেউ শোনেনি। যার পিতার লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পত্তি আছে, সে কি না। সামান্য একটি দরিদ্র বালিকার কারণে জেল খাটে! মাত্র কিছুদিন আগেও তো বিশ তঙ্কায় ওরকম একটি ক্রীতদাসী পাওয়া যেত।

ইংরেজের এই ন্যায়বিচারের প্রতীক। ঐ সুপ্রিম কোর্টের চূড়া। লোকে এই পথ দিয়ে যাবার সময় ভক্তিভরে সেদিকে তাকায়। এখনো কেউ জানে না যে বিচার ব্যবস্থার এই আড়ম্বর ইংরেজ জাতির একটি বিলাসিত মাত্র। প্রয়োজনের সময় এসব বিলাসিত ছেটে ফেলতে তারা একটুও দ্বিধা করে না।

কোনো এক পর্ব উপলক্ষে আজ আদালতের ছুটি। সুপ্রিম কোর্ট ভবনের সিঁড়িতে একজন মধ্যবয়স্ক গ্রাম্য মানুষ তার স্ত্রী ও দুটি শিশু পুত্রকন্যা নিয়ে বসে আছে। তারা ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত এবং বিভ্রান্ত। পাঁচদিন পাঁচ রাত তারা হেঁটেছে, তারপর নৌকোয় হুগলী নদী পার হয়ে আজই দুপুরে পৌঁছেচে আর্মেনিয়ান ঘাটে। ওপরে উঠে কলকাতা শহরের রূপ দেখে তারা হতভম্ব হয়ে গেছে। একসঙ্গে এত সারিবদ্ধ পাকা বাড়ি তারা কখনো দেখেনি, দেখেনি এত বিচিত্র রকমের পোশাক পরা মানুষজন। এমনকি এর আগে স্বচক্ষে কোনো গোরা সাহেব দেখার সৌভাগ্যও হয়নি তাদের।

লোকটির নাম ত্ৰিলোচন দাস, স্ত্রীর নাম থাকোমণি, ছেলেটি ও মেয়েটির নাম দুলালচন্দ্র ও গোলাপী। ওরা এসেছে কুষ্টিয়ার ভিনকুড়ি গ্রাম থেকে। ত্ৰিলোচন বংশানুক্রমে রায়ত, চাষবাস ছাড়া কিছুই জানে না। পর পর দু বছরের আকালে সে বড়ই বিপাকে পড়েছিল। কয়েকদিন আগে তার বসতবাড়ি পুড়ে যাওয়ায় সে সর্বস্বান্ত হয়েছে। এই পরিবারটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সাম্প্রতিকতম অবদান।

ত্ৰিলোচন দাস জানতেই পারেনি। কবে তার জমিদার বদল হয়ে গেছে। সে জানে আকাশে কোন জাতের মেঘ উড়লে বৃষ্টি হয়, কখন ধানে পোকা লাগে, নদীতে কখন ষাঁড়াষাঁড়ির বান আসে। সে আকাশ, মাটি, রোদ, বৃষ্টি, নদী ও গাছপালার খবর রাখে, সে জানে না দেশ কাকে বলে, সে জানে না জমিদাররা কীভাবে বদলায়। তবে, সে এইটুকুও জানে যে জমিদারকে খাজনা না দেওয়াটাই বড়ই পাপের কথা। মুখের রক্ত তুলেও জমিদারের খাজনা মিটিয়ে দিতে হয়। পরপর দু বছর আকাল হলে কেঁদে পড়ে জমিদারের হাতে পায়ে ধরতে হয়। পাইক-বরকন্দাজের কাছ থেকে সে সময় কিছু উত্তম মধ্যম জোটে বটে, কিন্তু কিছু একটা ব্যবস্থাও হয়ে যায়।

এবার সে দেখলে নতুন একজন নায়েবকে এবং সঙ্গে নতুন পাইক বীরকন্দাজদের। এবং সে শুনলো যে তাকে তিনগুণ খাজনা দিতে হবে। সে ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারলো না। তাদের গ্রামে দু-পাঁচঘর বামুন কায়েত ছাড়া আর সবাই চাষী। সব চাষীরই এক অবস্থা। কেউ কিছুই বুঝলো না। খাজনা না পেলে পাইক-বরকন্দাজরা জোরজুলুম করে লোকের ঘর থেকে ঘটিবাটি কেড়ে নিতে লাগলো। ত্ৰিলোচন দাসের ঘরে সেরকম বিশেষ কিছুই পাওয়া গেল না বলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো তার বাড়িতে। সেই আগুনের পাশে দাঁড়িয়েই নায়েবমশাই তামাক টানতে লাগলেন। ত্ৰিলোচন তার পা ছুঁতে গেল, তিনি পা ছাঁটা দিয়ে বললেন, আরে ছুসনি, ছুসনি। ব্যাটা ভগবানকে ডাক গিয়ে। ভগবান ছাড়া কেউ তোদের আর বাঁচাতে পারবে না।

আগে জমিদার অত্যাচারী, অর্থািপশাচ হলেও প্রজারা জানতে পারতো সেই মানুষটা কেমন। সেইসব জমিদার নিজেদের স্বার্থেই আকালের বছর চাষীকে ধান দাদন দিত। কারণ, চাষীকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে না রাখলে পরের বছর সে চাষ করবেই বা কী করে আর জমিদারের ঋণই বা শোধ হবে কীভাবে। মরা মানুষের কাছ থেকে তো খাজনা আদায় করা যায় না। কিন্তু এখন অবস্থা অন্যরকম হয়ে গেছে। চাষীর কাছ থেকে খাজনা আদায় করতে না পারলে জমিদারেরাও ঠিক সময়ে নির্দিষ্ট টাকা জমা দিতে পারতো না ইংরেজ কোম্পানির ভাঁড়ারে। তার ফলে লর্ড কর্নওয়ালিশ করে দিলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। জমিদাররা যেভাবে হোক, যত ইচ্ছে হোক খাজনা আদায় করুক, বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব দিতে হবে কোম্পানিকে। বারবার জমিদারি হস্তান্তরে কোম্পানির ক্ষতি হয়। কোম্পানি নির্দিষ্ট টাকা পেলে আর জমিদারদের ব্যাপারে মাথা গলাবে না।

ফলে জমিদারির প্রতি আকৃষ্ট হলো নতুন ধনীরা। নুন, কাপড় এমনকি বোতলের ছিপির কারবার করে যারা হঠাৎ বড়লোক হয়েছিল, তারাও টপটপ মহালের পর মহাল কিনে জমিদার হয়ে বসলো। খাজনা বাড়াবার অধিকার তাদের, যেমন করে হোক খাজনা আদায়ের অধিকারও তাদের। এই সব নতুন জমিদাররা বসে রইলো কলকাতায়, প্রজাদের সঙ্গে তাদের চক্ষুষ দর্শনও হলো না, কর্মচারীরা টাকা আদায় করে আনতে লাগলো। নতুন জমিদাররা হম্যমালা নির্মাণ করতে লাগলো শহরে এবং ড়ুবে রইলো বিলাসিতায়।

আধুনিকতম বিলাসিত হলো সংস্কৃতি চৰ্চা। প্রজা নিপীড়নের টাকায় সঙ্গীত, শিল্প এবং ধর্ম সংস্কারের খুব হুজুগ দেখা দিল। এদিকে কর্মচারীরা খাজনা আদায় করতে না পারলে ছোট চাষীদের উচ্ছেদ করে সেই জমি খাস করে দিতে লাগলো বড় চাষীদের। বাঙলায় শুরু হলো ভূমিহীন কৃষকশ্রেণীর উদ্ভব। তাদের মধ্যে অনেকে আবার জীবিকার সন্ধানে আসতে লাগলো শহরে। কলকাতার দিকে প্রবাহিত হতে লাগলো অবিরাম এক জনস্রোত। আমাদের এ ত্ৰিলোচন দাস সেই নতুন ভূমিহীনদের একজন।

ইদানীং প্রজা-নিগ্ৰহের নানারকম কাহিনী বৃটিশ শাসকদের কানে পৌঁছেচে, এমনকি খোদ বিলেতেও সে খবর গেছে। তাই প্রজাদের তত্ত্বতল্লাশ করার জন্য জেলায় জেলায় পাঠানো হচ্ছে ম্যাজিস্ট্রেট। জমিদাররাও নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য স্থাপন করেছে ল্যাণ্ড হোন্ডার্স সোসাইটি। অ্যাসোসিয়েশন, সোসাইটি, সভা, সংবাদপত্র ইত্যাদি ইওরোপীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ আলোকপ্ৰাপ্ত নেটিভরাও সত্বর ব্যবহার করতে শিখে নিয়েছে।

ত্ৰিলোচন দাস কোনোদিন ভগবানকে দেখেনি, সাধারণ মানুষ কখনো তাঁর দেখাও পায় না। কিন্তু তার ধারণা ছিল, খুব চেষ্টা করলে কোনোক্রমে জমিদারের দেখা পাওয়া যেতেও পারে। এই বংশানুক্রমিক বিশ্বাস তার মধ্যে বদ্ধমূল ছিল যে, কেঁদে পায়ে পড়তে পারলে জমিদারের দয়া হবেই। লাথি মারুন আর কয়েদ বেড়ি করেই রাখুন, নিজের প্রজাকে তিনি শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারবেন না। কর্মচারীদের শরীরে দয়া মায়া থাকে না, কিন্তু হাজার হোক জমিদার একজন মানী লোক।

ত্ৰিলোচন দাসের ক্ষুদ্র কল্পনাশক্তিতে জমিদার বাড়ির একটাই ছবি ফুটে ওঠে। ছোট ছোট অনেক বাড়ির মধ্যে একটি বিশাল প্ৰাসাদ, সেখানে লোহার ফটক আর সেই ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে মাথায় পাগড়ি বাঁধা শাস্ত্রী। কলকাতা শহরটিকেও সে সেইরকমই কল্পনা করে রেখেছিল। গিয়েই জমিদার বাড়ি দেখতে পাবে।

কিন্তু এখানে যে শয়ে শয়ে জমিদারবাড়ি। এখানে রাস্তায় বহু লোকের মাথায় পাগড়ি। এখানে কেই কারুকে চেনে না। এবং ত্ৰিলোচন দাস তার জমিদারের নামও জানে না। সে মাত্র শুনেছিল যে তার জমিদার প্রভু থাকেন। কলকাতায়।

ভিড়ের মধ্যে দিশেহারা হয়ে গিয়ে ত্ৰিলোচন তার স্ত্রী-পুত্ৰ-কন্যা নিয়ে এদিক ওদিক দৌড়েছে। যেখানেই একটু বসতে গেছে, অমনি লোকের তাড়া খেয়েছে। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছে এখানে। ছুটির জন্য আদালত পাড়া ফাঁকা।

সুপ্রিম কোর্ট ভবনটিকেও ত্ৰিলোচন দাসের জমিদার বাড়ি বলেই মনে হয়, কিন্তু ভেতরে জনমনিষ্যি নেই। ত্ৰিলোচন এদিক ওদিক উকিঝুঁকি দেবারও সাহস পায়নি। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, এই নিরালাতেই তারা রাতটা কাটিয়ে দেবে ঠিক করেছে। কাল কী হবে, তার কিছুই জানে না। বাচ্চা দুটো ঘ্যান ঘ্যান করছে অনেকক্ষণ থেকে, থাকোমণি একগলা ঘোমটা দিয়ে বসে আছে, জেগে আছে না ঘুমোচ্ছে, বোঝা যায় না।

একটু অন্ধকার হবার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁক ঝাঁক মশা এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মশা তো নয় যেন চড়ুই পাখির বাচ্চা। ত্ৰিলোচন দাস ঝাপঝাপ করে চড় চাপড় চালাচ্ছে নিজের গায়ে। থাকোমণির এতেও ইশ বোধ নেই। পুঁটুলীটাতে মাথা দিয়ে ত্ৰিলোচন দাস শুয়ে পড়লো।

বাবা মা দুজনকেই চুপচাপ হয়ে যেতে দেখে বাচ্চা দুটো কান্না আরও বাড়িয়ে দিল। ছেলেটির থেকে মেয়েটির গলার জোর আরও বেশী। বিরক্ত হয়ে ত্ৰিলোচন দাস দু-জনের পিঠে কয়েকখানা বিরাশী সিক্কার কিল বসিয়ে দিল। এইবার নড়ে উঠলো থাকোমণি। হাত দিয়ে ছেলেমেয়ে দুটিকে আড়াল করে সে ঝঙ্কার দিয়ে বলে উঠলো, মেরোনি! মেরোনি বলচি! ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই!

ত্ৰিলোচন দাস বললো, চিঁড়ে গেলে না কেন? চিঁড়ে গিলতে বলো। ফের কনিলে আমি ঠেঙিয়ে শেষ করবো।

থাকোমণি বললো, আমাদের ক্যান নে এলে হেথায়? আমাদের ভিনকুড়ি ফিরে দে এসো।

গ্রাম ছেড়ে আসবার জন্য ত্ৰিলোচন দাস নিজেও এখন মনে মনে আফসোস করছে বটে, কিন্তু সেকথা স্বীকার করবে। কেন। সে মুখঝামটা দিয়ে বললো, ভিটে মাটি চাঁটি হয়ে গিয়েছে, সেথায় থাকবে কি গাছতলায়?

এর উত্তরে থাকোমণি জানতে চায় যে এখানেই বা কোন রাজবাড়িতে থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে।

আর উত্তর না দিয়ে ত্ৰিলোচন দাস রাগে গরগর করে। সে নিরীহ চাষী, নিজের স্ত্রী ছাড়া আর কারুর ওপর সে রাগ দেখাবার সুযোগ পায়নি কখনো।

দুটি বড় পুঁটলির মধ্যে রয়েছে তাদের যথাসর্বস্ব। বেশ কিছু চিঁড়ে আর পাটালি গুড়ও এনেছে সঙ্গে করে। কদিন ধরে ক্রমাগত শুকনো চিঁড়ে চিবুতে চিবুতে ছেলেমেয়ে দুটির গাল ছিঁড়ে গেছে। তারা আর চিঁড়ে খেতে চায় না, ভাত চায়। বিদেশ বির্ভুয়ে এসে ত্ৰিলোচন দাস ভাত জোটাবে কোথা থেকে।

একটু পরে ছেলেমেয়েরা খিদের জ্বালায় সেই চিঁড়ে গুড়ই খেয়ে নিলো খানিকটা। ছেলেটা সিঁড়ির ক-ধাপ নেমে গিয়ে ছচ্ছড় করে পেচ্ছাপ করে দিল সুপ্রিম কোর্টের দেয়ালের গায়। ফিরে এসেই বললো, জল খাবো।

ত্ৰিলোচন দাস বললো, হারামজাদ!

ছেলেটা তবু নাকি নাকি গলায় বলতে লাগলো, জঁল খাঁবো। জঁল খাঁবো!

মেয়েটা হেঁচকি তুললো একবার। থাকোমণি বললো, আমারও তেষ্টা নেগেছে। সারারাত কি গলা শুষিয়ে থাকবো! ত্ৰিলোচন দাস তিতিবিরক্ত হয়ে উঠলো। আবার একথাও বুঝলো যে এর পর থেকে ওরা অনবরত তাকে জল জল করে জ্বালিয়ে খাবে।

চিঁড়ে আর গুড় আনা হয়েছে দুটো মাটির হাঁড়িতে। একটা বোঁচকা খুলে একটা কাঁথার ওপর চিঁড়েগুলো সব ঢেলে, হাঁড়িটা খালি করে নিয়ে ত্ৰিলোচন দাস উঠে দাঁড়ালো। আসবার সময় কাছেই সে একটা বড় দীঘি দেখে এসেছে।

থাকোমণি বললো, দুলালকে সাথে নে যাও!

কিন্তু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাবার ইচ্ছে হচ্ছে না। ত্ৰিলোচন দাসের। সে আর কিছুই না বলে হন হন। করে হাঁটতে লাগলো।

শুক্লপক্ষ, তাই আকাশের আলো আছে, পথঘাট খুব অন্ধকার নয়। কিন্তু একটুখানি এসেই থমকে গেল ত্ৰিলোচন দাস। যদি পথ ভুল হয়ে যায়? পেছন ফিরে একবার দেখে নিয়ে সে সাবধানে আস্তে আস্তে চলতে লাগলো, প্রতিটি পদক্ষেপ গুণে গুণে। গ্রাম দেশে মাঠের মধ্যে আলেয়া দেখে পথ হারিয়ে ফেললে এই রকম পা গুণে গুণে হাঁটতে হয়।

দীঘিটার এক পারে বসে। কয়েকটা শিয়াল মন দিয়ে ডাকছে তারস্বরে। আর একটা কী যেন বড় জানোয়ার খানিকটা দূরে খুব জোরে জোরে ভর-র ভস ভর-র ভস করে নিশ্বাস নিচ্ছে। কয়েকটা বাগি গাড়ির ঘোড়া ঘাস খেতে এসেছে ওখানে, কিন্তু অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় দূর থেকে ত্ৰিলোচন দাস সেগুলোকে চিনতে পারলো না। তার গা ছমছম করতে লাগলো। রাশি রাশি জোনাকি বার্তাসের ঝাপটায়। কখনো আলো কখনো অন্ধকারের ঢেউ হয়ে দুলছে।

পুকুরে নেমে প্রথমেই জল থাবড়ে পানা সরানো অভ্যোস ত্ৰিলোচন দাসের। এ দীঘির জল স্বচ্ছ টলটলে, ইংরেজদের খুব সাধের গ্রেট ট্যাঙ্ক বা লাল ডিগি, তারা এর জল পান করে না বটে কিন্তু ছুটির দুপুরে ছিপ ফেলে বসে অথবা সস্তরণ প্রতিযোগিতায় নামে। হঠাৎ কোথাও আগুন লাগলে এই জল ব্যবহার করা হবে বলে দীঘিটি সংরক্ষিত। নেটিভদের এখানে আসা নিষেধ।

হাঁটু পর্যন্ত নেমে জল থাবড়ে ত্ৰিলোচন দাস প্রথমে মুখ ধুয়ে ভালো করে কুলকুচো করলো খানিকক্ষণ। নিজে জল পান করলো পেট ভরে। তারপর হাঁড়ি ভরে জল নিয়ে যেই উঠতে গেছে, অমনি রে রে করে তেড়ে এলো দুই যমদূত।

ইংরেজ রাজত্বের পাহারাওয়ালা হলেও তাদের চেহারা ও পোশাক অনেকটা নবাবী আমলের সেপাইদের মতন। মোচ আর জুলফি একসঙ্গে জোড়া। গাঁজার নেশায় চোখ টকটকে লাল। নিশুতি রাতে সাহেবপাড়ার মধ্যে এই দীঘিতে একজন হাবিজাবি চেহারার লোককে নামতে দেখে তারা যত না ক্রুদ্ধ তার চেয়ে বেশী অবাক। দুজনে মিলে ত্ৰিলোচন দাসের ঘাড় চেপে ধরে এমন হল্লা শুরু করে যে ত্ৰিলোচন দাস কিছুই বুঝতে পারে না। তারপর পিঠের ওপর দুম দাম শুরু হলে সে ভাবে এই বুঝি জমিদারের পেয়াদা এসেছে। তাতে সে খানিকটা নিশ্চিন্ত হয় এবং এই গোলমালের মধ্যে মাটির হাঁড়িটা তার হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়।

মাতাল ধরার জন্য পাহারাওয়ালারা এখন সঙ্গে ড়ুলির মতন একটা জিনিস রাখে। কোনো মাতাল বেশী বেগড়বাই করলে সেই ড়ুলির মধ্যে ভরে প্রায় বোঁচকার মতন বেঁধে ফেলে বুলিয়ে নিয়ে যায়। ত্ৰিলোচন দাসের পা সোজা আছে দেখে তারা ওকে ড়ুলিতে না ভরে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে চললো।

ত্ৰিলোচন এবার কেঁদে কঁকিয়ে বলে উঠলো, ওগো আমার বউ ছেলে মেয়ে সঙ্গে আছে, তাদের নিয়ে আসি। ওগো—

কে শোনে কার কথা। ততক্ষণে পাহারাওয়ালাদ্বয় ত্ৰিলোচন দাসের ট্যাক হাতড়ে দেখে নিয়েছে যে সেখানে কিছু নেই, সুতরাং তারা আরও নির্দয় হয়ে তাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল কোতোয়ালির দিকে। ত্ৰিলোচন দাস যত চিৎকার করে তারা তাকে তত বেশী প্ৰহার করে।

এদিকে থাকোমণি পক্ষীমাতার মতন দুই ডানায় ছেলে মেয়েকে আগলে বসে রইলো ঠায়। প্রহরের পর প্রহর কেটে গেল, তার স্বামী এলো না। সে আর কী করবে, শুধু প্ৰতীক্ষ্ণ করা ছাড়া? শেয়ালগুলো ডাকতে ডাকতে তাদের কাছে চলে আসছে। এক সময় দূরে দু-তিন বার গুড়ুম গুড়ম করে বন্দুকের শব্দ হলো। কিসের যেন একটা শোরগোল উঠলো। এ সব কিছুতে থাকোমণির সবঙ্গে ভয়ের কাটা দেয়। সাহেবদের বাড়ির বাগানে শেয়াল ঢুকে পড়লে সাহেবরা জানলা দিয়ে বন্দুক চালায়। দু-একটা শেয়াল মরলে উল্লাসের ধুম পড়ে যায়।

জল জল করে ছেলে-মেয়ে দুটো বেশ কিছুক্ষণ কাৎরে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়লো। ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়লো আর মেয়েটা হেঁচকি তুলতে লাগলো। তারপর গীর্জার গম্বুজের আড়ালে চাঁদ ঢলে পড়লে মেয়েটি কয়েকবার ওয়াক তুলে শুরু করলো বমি। থাকোমণি তাড়াতাড়ি মেয়ের মুখ চাপা দিল নিজের হাতে। কিন্তু ওতে ভেদবমি থামে না। এর নাম ওলাওঠা।

শহরে এমন কোনো বাড়ি নেই যে বাড়িতে অন্তত একজন না। একজন ওলাওঠায় মরেনি। তবু গ্রামের তুলনায় শহর নিরাপদ। শহরে বিলিতি দাওয়াই পাওয়া যায় এবং পয়সা দিলে চিকিৎসক বাড়িতে আসে। সে চিকিৎসকদের মুখ চোখ দেখলেই খানিকটা ভক্তি হয়। গ্রামে একবার ওলাবিবির নজর লাগলে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। ওলাওঠার ভয়ে বহু লোক গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে এসে কলকাতায় আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। গ্রাম থেকে যখন ভোর হতে লোকে পালায়, তখনও বারবার ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে, ওলাবিবি তাড়া করে আসছে কিনা। এই ওলাবিবিই পরে এসিয়াটিক কলেরা নামে চিহ্নিত হয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম মানবধ্বংসকারীর ভূমিকা নিয়েছে।

বমির ফাঁকে ফাঁকে মেয়েটি জল জল বলে গোঙাতে লাগলো। তার ভাই দুলালচন্দ্ৰ জেগে উঠেছে। এবং বাবা বাবা বলে ড়ুকরে উঠলো। কয়েকবার। তার বাবা সে ডাক শুনতে পেল না। কিন্তু লাঠি ঠিকঠকিয়ে এলো আর দুজন পাহারাওয়ালা। এ রকম জায়গায় একজন স্ত্রীলোককে কাচ্চাব্বাচ্চা নিয়ে বসে থাকতে দেখে তারাও অবাক হলো কম নয়। তারা পথের পাহারাওয়ালা, আদালত ভবন পাহারা দেওয়া তাদের দায়িত্ব নয়। এর জন্য দুজন আলাদা সেপাই থাকে। কিন্তু সারাদিন তাদের পাত্তা নেই।

একজন পাহারাওয়ালা চেঁচিয়ে উঠলো, হুকুমদার!

সেই বাজখাঁই গলা শুনে দুলালচন্দ্র আরও জোরে ও বাবা, বাবাগো বলে কেঁদে উঠলো। থাকোমণি বললো, ওগো আমাদের ঘরের লোক কোথায় গেল! মেয়েটা কেমন কেমন করতিছে!

অচেনা স্ত্রীলোকের গলা শুনলে প্রথমে যে বিষয়ে কৌতূহল জাগে সেটি যাচাই করার জন্য পাহারাওয়ালা দুজন উঠে এলো সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ। হাতের জাহাজী লণ্ঠনটা উঁচিয়ে ধরলো থাকামণির মুখের কাছে। থাকোমণিকে যুবতী এবং স্বাস্থ্যুবতী দেখে তারা পরস্পর চোখাচোখি করলো এবং এই বিষয়ে এক মত হলো যে, তাহলে একে কোতোয়ালিতে নিয়ে যাবার নাম করে ধরা যায়।

একজন হুঙ্কার দিয়ে উঠলো, উঠা! উঠা! ওঠাকে আ! রেন্ডি কাঁহিকা।

থাকোমণি আরও সিটিয়ে গেল দেয়ালের দিকে। তখন একজন পাহারাওয়ালা তার শাড়ির আঁচল ধরে টানলো, অন্যজন ধরতে গেল তার কোমর।

থাকোমণি বললো, ওগো তোমাদের পায়ে পড়ি, আমার মেয়েটারে বাঁচাও!

এবার পাহারাওয়ালাদের আলো পড়লো মেয়েটির ওপরে। মেয়েটি তক্ষুণি ওয়াক তুলে হুড় হুড় করে বমি করলো অনেকখানি। এই বমি পাহারাওয়ালা চেনে। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে তাদের চোখ উঠলো। কপালে।

আর দ্বিরুক্তিমাত্র না করে তারা পেছন ফিরে দৌড় লাগালো। তাদের সেই দৌড়েবার ভঙ্গি দেখে মনে হয় যেন অবিকল দুটি ল্যাজ তোলা বলীবর্দ।

খানিকটা পরে মেয়েটির কণ্ঠস্বর অনেক ক্ষীণ হয়ে এলো, তখনো বলতে লাগলো, জল, জল।

ছোট বোনের কষ্ট দেখে ছ বছরের শিশু দুলালচন্দ্র বললো, মা, আমি জল নে আসবো?

দ্বিতীয় হাঁড়িটা খালি করে নিয়ে সে এগিয়ে গেল খানিকটা। কোন দিকে সে দীঘিটা দেখেছিল, ঠিক ঠাহর করতে পারলো না। তার ভয় করছে। তার ক্ষুদ্ৰ বুকটিতে দারুণ অভিমান জন্মেছে। বাবার ওপরে। কেন বাবা ফিরে এলো না। সে আবার প্রাণপণে ডাকলো, বাবা, বাবা!

সেই রিনারিনে শিশুকণ্ঠের ধ্বনি ঠিকরে ফিরে এলো শহরের কঠিন বাড়িগুলির দেয়াল থেকে। কেউ সাড়া দিল না। একটা বলগা ছাড়া একলা ঘোড়া এদিকে কপকপিয়ে ছুটে আসতেই সে ভয় পেয়ে দৌড়ে ফিরে এলো মায়ের কাছে। তার মা বললো, থাক, তোকে আর যেতি হবে না।

কথায় বলে, মাঝ রাতের ভেদবমি রাত শেষ হবার আগেই থেমে যায়। হলোও তাই। খানিক পরে মেয়েটি একেবারে নেতিয়ে গেল। সে ঘুমিয়েছে ভেবে একটু নিশ্চিন্ত হলো তার মা।

চাঁদ হেলে গেছে। আকাশে এখন খেলা করছে ছেড়া ছেড়া মেঘ। এতক্ষণ অসহ্য গরমের পর শেষ রাতে ঠাণ্ডা বার্তাস ভেসে আসছে। এখন পৃথিবী কী শান্ত, সুন্দর। ভোগী, চোর এবং সাধু, যারা রাত জাগে, তারাও এই শেষ প্রহরে ঘুমকে আলিঙ্গনে জড়ায়। থেমে গেছে নর্তকীর পায়ের নূপুর। মাতালরাও এতক্ষণে গড়াগড়ি দিয়েছে। ঘুমন্ত নগরীর ওপর বিছিয়ে রয়েছে এক অনৈসৰ্গিক সৌন্দর্যের ওড়না।

থাকোমণি আর দুলালচন্দ্ৰও ঘুমিয়ে পড়েছিল এক সময়। দিনের আলো ফুটে গেলেও ঘুম ভাঙলো না।

ক্ৰমে পথে লোক চলাচল শুরু হলো। সাহেবরা এ দেশে এসে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমোয়। আগে জেগে ওঠে তাদের নফর, বেহারা, খানসামা, দুধওয়ালা, ভিস্তিওয়ালার দল। যাতায়াতের পথে তারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে লাগলো।

পবিত্র ধমধিকরণের সিঁড়িতে ছড়ানো রয়েছে চিঁড়ে, গুড়, ছেড়া কাঁথা। তার মধ্যেই শুয়ে আছে এক গ্ৰাম্য স্ত্রীলোক ও বালক। আর পাশেই বছর পাঁচেকের একটি বালিকা পুরীষ ও বমিতে মাখামাখি হয়ে মরে কাঠ হয়ে পড়ে আছে। তার মুখের ওপর ভন ভন করছে নীল ড়ুমো ড়ুমো মাছি।

ধুড়ুম করে বিরাট শব্দে সাতটার তোপ পড়তেই থাকোমণি ধড়ফড় করে উঠে বসলো। সামনেই কিছু লোককে সারবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে বুকে তুলে নিল তার মৃত কন্যাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *