২৫. ইতিহাসের একটা বাঁধা পথ আছে

ইতিহাসের একটা বাঁধা পথ আছে। জব চার্নক থেকে লর্ড ক্লাইভ। লর্ড ক্লাইভ থেকে ওয়ারেন হেস্টিংস। ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে লর্ড ডালহৌসি তারপর লর্ড ডালহৌসি থেকে লর্ড কার্জন। কিন্তু এটা সোজা পথ নয়। সোজা পথটা অনেকদিন হারিয়ে গিয়েছিল। রামমোহন রায়ের পর আর পথ ছিল না। তারপর আবির্ভাব হলো স্বামিজীর। স্বামী বিবেকানন্দ। কিন্তু ১৮৩৩ থেকে ১৯০২ অনেক দূর। এ-পথটারও নিশানা ঠিক ছিল না। মাঝে মাঝে তার আগাছা আর মরুভূমি। পথ খুঁজে বার করবার আগ্রহ হয় তত ছিল, ধৈর্য ছিল না। বিবেকানন্দর স্মৃতি প্রায় মুছে এসেছে। বড়বাড়িতে বাবুরা ঘুমে অচেতন। ছোটবৌঠান ‘মোহিনীসিঁদুরের মায়ায় আচ্ছন্ন। ছুটুকবাবু নতুন বউ নিয়ে উন্মত্ত। ব্রজরাখাল নিরুদ্দেশ। নিরাশ্রয় ভূতনাথ মায়াবী কলকাতার গোলকধাঁধা কূটচক্রে বিপর্যস্ত। নিবারণদের দল তখনও অসঙ্ঘবদ্ধ। সিস্টার নিবেদিতা শুধু একলা পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন।

কিন্তু সহজ পথটা দেখিয়ে দিলে লর্ড কার্জন। সিনেট হলে দাঁড়িয়ে কনভোকেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বললেন—তোমরা ভারতবাসীর মিথ্যেবাদী–সত্য, যাকে বলে truth, তা জানতে হলে জানতে হবে আমাদের কাছে—ইউরোপের কাছে।

সেদিন জবাদের বাড়ি থেকে ফেরবার পথে সিনেট হ-এর সামনে দিয়ে আসছিল ভূতনাথ। সামনেই দেখা হয়ে গেল নিবারণের সঙ্গে আবার। একলা নিবারণ নয়। কদমদা, শিবদাস, কুমুদ সবাই।

কদমদা’ বলছেন–ভালোই হলো নিবারণ, লর্ড কার্জন এক মহা উপকার করলেন আমাদের। এবার আমরা চিনতে পারবো নিজেদের।

নিবারণের চোখ দিয়ে তখন আগুনের হল্কা বেরুচ্ছে। বললে— এত বড় মিথ্যে কথা বলবে, আর আমরা সহ্য করবো কদমদা’।

কদমদা’ হাসলো, বললে—এই তো ভালো হলো রে বোকা। মনে করে দেখ স্বামিজী কী বলেছিলেন—তোমার দেবতা আজ চায় তোমার জীবন-বলি…আরো বলেছিলেন—আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত তোমার সামনে তেত্রিশ কোটি নয়, তোমার একমাত্র উপাস্য দেবতা-সে তোমার জননী জন্মভূমি, লর্ড কার্জন মনে না করিয়ে দিলে সে-তো ভুলেই গিয়েছিলুম রে।

ভূতনাথকে দেখেই নিবারণ বলে উঠলো—এই যে ভূতনাথদা’ —বড়দা’ এসেছে জানেন?

-কই না, এখনও তো আসেনি।

কদমদা’ বললে—আজকালের মধ্যেই আসবেন।

—আপনাকে চিঠি লিখেছে ব্ৰজরাখাল?

-কালই আর একখানা চিঠি পেয়েছি তার, লিখেছেন রওনা হচ্ছি—কিন্তু আমাদের আর অপেক্ষা করা যায় না। কার্জনের একখানা বই যোগাড় করতে হবে—‘Problems of the Far East’ বইখানা যেখান থেকে হোক যোগাড় করতে হবে নিবারণ–স্যার গুরুদাস চেয়েছেন বইখানা।

নিবারণ বললে—কেন?

—সিস্টার নিবেদিতার কাছে উনি শুনেছেন নাকি—বইটাতে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা লেখা আছে। কোরিয়ায় যখন ছিল কার্জন তখন ওখানকার লোকদের ধারণা ছিল চল্লিশ বছর বয়েস না হলে মানুষ বিচক্ষণ হয় না। কোরিয়ার মন্ত্রী যখন কার্জনের বয়স জিজ্ঞেস করলেন, কার্জন তখন সবে তেত্রিশ বছরে পড়েছে, কিন্তু মন্ত্রীর উত্তরে অনায়াসে বললে—চল্লিশ।

কুমুদ বললে—কথাটা হিতবাদী’তে ছাপিয়ে দিলে হয় না। কদমদা’।

কদমদা’ বললে–ছাপালে এর প্রতিকার হবে না ভাই, আমাদের এই ঘা খাওয়ার প্রয়োজন ছিল রে আজ। আমাদের এখন থেকে তৈরি হতে হবে–৩০শে আশ্বিনের জন্যে এখন থেকে তোড়জোড় করা দরকার—যেমন করে আনন্দমঠের সন্ন্যাসীরা মায়ের সামনে দীক্ষা নিয়েছিল, তেমনি করে শক্তির দীক্ষা নিতে হবে—তেমনি করে সবাই মিলে বলতে হবে—বন্দে মাতরম্‌—

পরে দেখেছিল ভূতনাথ ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ কার্জনের সেমিথ্যেবাদিতা ধরিয়ে দিয়েছিল। শুনেছিল—সিস্টার নিবেদিত নাকি মতিলাল ঘোষের কাছে ‘Problems of the Far East বইখানা নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিলেন।

রাত হয়ে যাচ্ছিলো। ওরা চলে যেতেই ভূতনাথ আস্তে আস্তে বড়বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। মনে পড়লো সেদিন নিবারণও ওই কথা বলেছিল। গাতায় আছে ‘ক্লৈব্য মাস্ম গমঃ পার্থ। ক্লৈব্য ত্যাগ করতে হবে। সত্যি সত্যি এই বসে বসে খাওয়া এ আর কতদিন চলবে! ব্রজরাখাল এসে পড়লে বাঁচা যায়। একটা কিছু চাকরি বাকরি করতে পারলে ভালো হতো। কে যোগাড় করে দেয়! কার সঙ্গেই বা তার জানাশোনা আছে!

 

বনমালী সরকার লেন-এর ভেতরে আসতেই মনে হলো যেন বাড়ির সামনে বেশ ভিড় জমেছে। এখন কীসের ভিড়!

কেমন যেন ভয় হলো। সেদিনকার মতো পুলিশ দারোগা এসেছে নাকি। সেই ছুটুকবাবুর বিয়ের দু’দিন পরেই। সেদিনও ঠিক এমনি দূর থেকে পুলিশের লালপাগড়ি দেখে চমকে উঠেছিল মনটা। কী, হলে কী বড়বাড়িতে!

কিন্তু কাছে আসতেই ভুলটা ভেঙে গেল। না, পুলিশ-সেপাই কিছু নয়। দক্ষিণের পুকুরটা সাফ করতে এসেছিল মজুররা। মাথায় গামছা জড়ানো। হপ্তার জন্যে অপেক্ষা করছে। বিধু সরকার পাওনাদারদের অকারণ দাড় করিয়ে রাখতে কেমন যেন আনন্দ পায়। একরকম অহেতুক দুর্বোধ্য আনন্দ।

সেদিনের মতো পুলিশের গণ্ডগোল হলেই হয়েছিল আর কি!

সে কী কাণ্ড! সেদিনও দূর থেকে ভিড় দেখে কারণটা বোঝ যায়নি।

তখনও বিয়েবাড়ির গন্ধ যায় নি বড়বাড়ির গা থেকে। বাড়ির সামনে এটো কলাপাতা, মাটির গেলাশ আর ভাততরকারির পাহাড় জমেছে। ওদিকটা কুকুর, মাছি আর বেরালের উৎপাত। ব্রিজ সিং লোহার গেট বন্ধ করে বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছে।

কাছে আসতেই—সে এক অদ্ভুত দৃশ্য!

–হট যাইয়ে বাবু, হট যাইয়ে।

-–ওপরে কোঁচার পত্তন, ভেতরে ছুচোর কেত্তন—বলিহারি বাবা।

দুই একজন বৃদ্ধ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভিড় দেখে উঁকি মেরে দেখে। দেখেই নাকে কাপড় দিয়ে ছি ছি করতে করতে চলে যায়।

ভূতনাথও দেখলে। দেখেই শিউরে উঠলো। সমস্ত নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল যেন তার। সকাল বেলা এ কী দৃশ্য!

—কোন্ বাড়ি থেকে ফেলেছে মশাই?

—আবার কোন বাড়ি—বলেই একজন দাত বার করে অর্থভরা। হাসি হেসে বড়বাড়ির দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে।

কিন্তু এ-বাড়ি থেকে কে ফেলবে! কে এমন পাপী হে!

–ওগো, নড়ছে নাকি ছেলেটা?

–আরে না মশাই, মরে কখন ভূত হয়ে গিয়েছে। দেখছেন শাদা হয়ে গিয়েছে অঙ্গ।

ছোট শাদা ধবধবে একটা রক্তপিণ্ড! শিশু না বলে রক্তপিণ্ড বলাই ভালো। মাংসের ডেলা। ভালো করে হাত পা চোখ নাক কান মুখ এখনও গড়ে ওঠেনি। পুষ্টি হবার আগেই আত্মপ্রকাশ করেছে হয় তো!

—ছেলে না মেয়ে—কী মশাই?

ছেলে না মেয়ে বুঝবো কেমন করে! উপুড় হয়ে পড়ে আছে। যে! আর ছোঁবে কে ওকে! আগে পুলিশের ডোম আসুক। নেড়ে চেড়ে দেখুক সে। তারপর বোঝা যাবে ছেলে কি মেয়ে। কিন্তু তবু দেরি যেন আর সয় না কারো। ছুড়িকে টেনে হিচড়ে বার করুক। দারোগা তে ঢুকেছে ভেতরে। মেজবাবুর সঙ্গে দেখা করতে! এত দেরি হচ্ছে কেন!

হাঁ করে চেয়ে থাকে সবাই। একেবারে সদ্য হওয়া মরা ছেলেটার দিকে। আর একবার গেটের ভেতরে বড়বাড়ির লম্বা শান-বাঁধানো উঠোনটার দিকে। যার কীর্তি তাকে দেখা চাই। তা না হলে তৃপ্তি হচ্ছে না ঠিক! কী রকম তার চেহারা। বয়স কত তার। ফর্সা না কালো। বিধবা না সধবা! ঝি না বউ! কে?

–দারোয়ানজী, তোমার মেজবাবু নেমেছে?

ভূতনাথ এগিয়ে গেল। ভূতনাথকে দেখে ব্রিজ সিং গেট খুলে দিলে।

ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কী ব্যাপার ব্রিজ সিং?

ব্রিজ সিং বন্দুক হাতে নিয়ে পরম বৈষ্ণবের মত বললে—সব কুছ হনুমানজী কী খেল বাবুজী—হনুমান জী নে দিয়া, হনুমানজী নে লিয়া।

বাড়ির ভেতরে কিন্তু কোথাও কোনো চাঞ্চল্য নেই। যে-যার কাজ করে চলেছে। বিধু সরকারের ঘরের দিকে চোখ পড়তেই নজরে পড়লে দারোগা সাহেব বসে আছে। বসে বসে বিধু সরকারের সঙ্গে কথা বলছে।

খেরো খাতা সামনে নিয়ে বিধু সরকার বলছে—কিন্তু মেজবাবুর তো এখন সময় হবে না দারোগা সাহেব, আজ তিনি পায়রা ওড়াতে ছাদে উঠেছেন।

–ডাকতে পাঠাও তাঁকে—সাহেব বললে।

–ডাকতে তো হদ্দ হদ্দ তিনবার পাঠালাম হুজুর, মেজবাবু কাজ না সেরে নামবেন না তো।

–কী কাজ করছেন?

—পায়রা ওড়াচ্ছেন—এখন যদি মেজাজ বিগড়ে যায় তত দিন ভর কারো মাথা আর আস্ত থাকবে না। পায়রা ওড়ানোর পরে একবার খাজাঞ্চীখানায় আসেন রোজ—তখন হিসেব পত্তোর দেখেন, পাওনা গণ্ডা বুঝে নেন। এ তো আর সরকারী পোস্টাপিস নয় হুজুর, এখানকার কানুন আলাদা।

মনে আছে ইংরেজ দারোগা সাহেব কথাটা শুনে খুশি হয়নি। হাতের লাঠিটা ঠুকছিল মেঝের ওপর বারকয়েক। মেজবাবু তখনও ছাদের ওপর পায়রা ওড়াচ্ছেন।

বেণী বলে—পায়রা ওড়াতে সবাই তো পারে না হুজুর, পায়রাগুলো চক্কর মেরে মেরে আকাশে উড়তে থাকবে আর সঙ্গে সঙ্গে মেজবাবুর হাতও তালে তালে ঘুরবে—আর আকাশের দিকে চোখ রেখে বাঁ হাতে মাঝে মাঝে একটা করে তুড়ি মারবে।

-তুড়ি মারবে কেন?

—যাহাতক না তুড়ি মারা আমি তাহাতক আমার হাতের পায়রাটা উড়িয়ে দেবে। পত পত করতে করতে সেটাও উড়ে গিয়ে বড় দলটার সঙ্গে ঘুরতে শুরু করবে-এই তো খেলা। সে দেখতে ভারী মজা শালাবাবু—এক সময়ে নেশা লেগে যায়, মাথায় বেশ ঘুরুনি ধরে—মাথার ওপর কখন সূর্যি উঠেছে–তেজ হয়েছে রোদের খেয়ালও নেই কারো, আমারও নেই, বাবুরও নেই, ভৈরববাবুরও নেই, মতিবাবু, ফটিকবাবু তারকবাবু কারোরই নেই।

-এমনি কতক্ষণ চলে?

—তা ধরুন না কেন, রোদের তেজ বাড়লে পায়রার মেহনত হয় কিনা খুব-পায়রা হলো সুখী জানোয়ার আজ্ঞে। ওই একটা একটা করে পায়রা ছাড়বো আমি, তারপর যখন সব পায়রা ছাড়লুম, তখন মেজবাবুর খেলা আরম্ভ হবে—খেলছে তো খেলছেই-–তারি মধ্যে দু’ বার কল্কে বদলে দিয়ে গেল লোচন, সে টিকে তামাক পুড়ে কখন ছাই হয়ে গিয়েছে। মেজবাবু আঙুল দিয়ে ভৈরববাবুকে ইশারা করবেন—আর ভৈরববাবু মুখের মধ্যে দুই হাতের আঙুল পুরে এমন শিস দেবে—পায়রা ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সোজা রেললাইনের মতো দু’ সার হয়ে উড়তে লাগলো। তারপর আবার শিস—নতুন কায়দায় শিস—তখন যেন ঠিক গোড়ে মালার মতো হয়ে গেল। আবার শিস—তখন থমকে দাঁড়িয়ে গিয়ে গাছের পাতায় মতন ঝর ঝর করে পড়তে লাগলো। তা শিষ দিতে পারে খুব ভালো আমাদের ভৈবরবাবু—একবার বরানগরের বাগানে গিয়ে খুব শিস দিয়েছিল আজ্ঞেসে এক কাণ্ড!

-কী কাণ্ড বেণী?

—বরানগরের বাগানে একদিন আপনাকে নিয়ে যাব আজ্ঞে। দেখবেন কী সুন্দর গাছের কেয়ারী—এক একটা গাছের ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকলে কেউ খুঁজে পাবে না আপনাকে। ওইখানেই ‘কানা-মাছি-ভোঁ-ভোঁ খেলে কিনা বাবুরা।

–কার সঙ্গে খেলে?

–কলকাতা থেকে কখনও কখনও মেয়েমানুষ নিয়ে যায় মেজবাবু, চোখে দু’পাট কাপড় বেঁধে তাদের ছেড়ে দেয় বাগানের মধ্যে। বাগানের গাছের ঝোপে বাবুরা কুঁ কুঁ আওয়াজ করে–আর তেমনি চোখ বেঁধে বাবুদের ছুঁতে হবে, ভারী মজার খেলা। আমরা এক-একবার লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি দরজার ফোকর দিয়ে।

—লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে হবে কেন—দেখা তোমাদের বারণ বুঝি?

–দেখতে আপনারই লজ্জা হবে যে শালাবাবু, একেবারে উদোম গা যে-কাপড় জামার বালাই নেই—কিন্তু একবার বেশ নতুন খেলা হয়েছিল—মেজবাবু বাগানে বস্ত্রহরণ পালা করেছিল সেবার।

—বস্ত্রহরণ, শ্রীকৃষ্ণের বস্ত্রহরণ?

—আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিক যেমন বড়বাড়ির ঠাকুরঘরে ছবি আছে দেয়ালে টাঙানো, অবিকল ওই রকম—মেজবাবু সেজেছিল কেষ্ট।

মেজবাবুর যৌবনকালে এ-রকম সখ ছিল আরো। বস্ত্রহরণ, কালীয়দমন, নৌকাবিলাস, মানভঞ্জন–নানারকম খেলা। সে-কালও নেই, সে-জাঁকজমকও নেই। ওই যে লোচন দেখছেন তামাক সাজছে একলা বসে বসে, ওর কি তখন ফুরসুৎ থাকতে নাকি। একা মানুষ দশ হাতে চিলিম তদারক করেছে তখন। আর আন্সতে কত বাবু! সারাদিন ধরেই তো আড্ডা চলেছে নাচঘরে। নাচঘর তখন দিনরাতই গুলজার। বেলোয়ারী ঝাড় আসছে। বিলেত থেকে। এই যে এখন দেখছেন দীপকের আলো—চোখে লাগে বটে, কিন্তু তার বাহার ছিল কত! একটা বেলোয়ারী ঝাড়ে সতেরোটা মোমবাতি আমিই তো নিজ হাতে জ্বালিয়েছি—সে আলো আর এ আলো। বড়মাঠাকরুণের হীরের চুড়ির ওপর সে-আলো ঠিকরে পড়ে একেবারে নাচঘর ঝকমক করে উঠতো। পশ্চিম থেকে বাঈজী আসতো, নান্নে বাঈ, জহর বাঈ কী সব নাম তাদের, আমরা গেলাশ সাজিয়ে দিয়ে এসেছি আসরে—আমাদের এই চেহারাই খোলতাই হয়ে উঠতে সেই আলোর তলায়।

কাপড় কোঁচাতে কোঁচাতে বেণী হতাশা প্রকাশ করে। বলে–এই কাপড়ের ডাই ছিল মেজবাবুর। বাড়ির মধ্যে মেজবাবুই তো ছিল বাব। কাপড়ের কি হিসেব ছিল তখন। আমরাই কত কাপড় দিয়ে দিয়েছি একে ওকে। ভৈরববাবুই কত কাপড় নিয়ে গিয়েছেন লুকিয়ে লুকিয়ে। আর সেদিন মতিবাবু এসে বললেনকই রে বেণী, কাপড় চোপড় তো ছিঁড়ে এল সব—এবার আর

পেলে তো চলছে না। তা আমি বললাম—আর সে দিনকাল নেই মতিবাবু, এখন গুণতির কাপড় সব—বিধু সরকার গুণে হাতে তুলে দেয়, একটা হারালে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে—ছিড়ে গেলে ছেড়া কাপড়ের টুকরো দেখাতে হবে—বড় কড়াকড়ি করে দিয়েছে খাজাঞ্চীবাবু।

—তা এমন দিনকাল কেন হলো বেণী?

বেণী তখন পাটির ওপর উপুড় হয়ে বসেছে। কোঁচানো কাপড়ের একটা দিক পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপে ধরে আর একটা দিকের ওপর ফর ফর করে গিলে চালায়।

একটু থেমে বলে—কী জানি কেন এমন হলে শালাবাবু। এত বড় বিয়ে গেল ছুটুকবাবুর, তা এ-বাড়ির কাজ-কম্মে আগে দেখেছি মিষ্টির ছড়াছড়ি চলে—কাগে পক্ষীতে খেয়ে কুলিয়ে উঠতে পারে না, শেষে রাস্তায় পাহাড় হয়ে যায় মিষ্টি তরকারির—আর এবার দেখুন তো-বিয়ে হলো শুকুরবার আর সোমবারের মধ্যে সব ভোঁ ভোঁ-কেউ কিছু দেখতে পেলে না। প্রত্যেকবার একটা করে ধুতি আর একখানা করে গামছা বরাদ্দ থাকতো—এবার গামছার মুখ পর্যন্ত দেখা গেল না, ভাবলাম ফুলশয্যার দিন পাবে

—তা কোথায় কী!

সত্যি সত্যি ভূতনাথেরও যেন কেমন অবাক লাগছিল। ক’বছরের মধ্যেই যেন কত কী বদলে গেল সব। কতদিন থেকে বংশীর মুখে শোনা গিয়েছে, বাবুরা হাওয়া-গাড়ি কিনবে। ছোটবাবু তো চুনীদাসীকে কিনেই দিলে একটা গাড়ি। তা সে হয় তত চুনীদাসীর পীড়াপীড়িতেই। কিন্তু বাড়ির জন্যেও তো দরকার। শেঠ, শীল, মল্লিকদের বাড়ি গাড়ি উঠেছে। ছেনি দত্তও মরবার আগে গাড়ি চড়ে গিয়েছে!

একদিন গাড়ি এসেও ছিল একটা।

ভূতনাথ তখন খেয়ে উঠেছে সবে। খেতে একটু দেরিই হয়েছে সেদিন। ভেতর বাড়ি থেকে ভাত আসতেই দেরি হলো।

বংশী বললে—আজ রান্না বাড়িতে কেলেঙ্কারি হয়ে গিয়েছে শালাবাবু, তাই এত দেরি হলো-আঁশ নিরিমিষ একাকার হয়ে গিয়েছে সব।

—সে কি।

—আজ্ঞে। বিধবাদের ভাত চড়ে সকাল-সকাল, সেজখুড়ী নিজে নিরিমিষ চড়ায়, বড়মা ছুচিবাই মানুষ, একটু সকাল-সকাল খেয়ে নেয় কিনা—কিন্তু আঁশের হেঁসেলের হাত বেড়ি সব নিরিমিষের ঘরে দিয়ে এসেছে সদু। রাত থাকতে বাসনমাজার লোক আসে কিনা, তারা ঘস ঘস করে বাসন মেজে রেখে গিয়েছে রোয়াকে, তাড়াতড়িতে আর বাসনের কুঠুরিতে রাখেনি, সদুর কাছে বাসন চেয়েছে সেজখুড়ী, সদু আর অত চোখ মেলে দেখেনি, সেই আঁশের বাসনই তুলে দিয়ে এসেছে নিরিমিষের ঘরে। ছোয়াছুয়ি হয়ে গিয়েছে, তখন দেখে ফেলেছে রাঙাঠাকমা, তার তত নজর সব দিকে, সব্বেনাশ কাণ্ড-রাঙাঠাকমা চিৎকার করে উঠলো। বলে—ফ্যাল বাতাসী, ফেলে দেও ছিষ্টি আঁশ হয়ে গেল হেঁসেলের—তা তখন ধরুন অড়র ডাল, বড়ি-শাকের ঘন্ট, সুক্ত, চালতার অম্বল, সব রান্না হয়ে গিয়েছে। রাঙাঠাকমা জিজ্ঞেস করলে—কে বামুন তুলেছে নিরিমিষ হেঁসেলে? খোঁজ, খোঁজ-সদু বলতে চায় না নিজের নাম।

তা সেই নিরিমিষ আঁশ সব আবার নতুন করে রান্না হলো কিনা—তাই এত দেরি।

তখন খাওয়া ভালো করে শেষ হয়নি। নিচে থেকে ভোঁ ভোঁ করে আওয়াজ এল। একেবারে উঠোনের ওপর থেকে শব্দ আসছে।

বংশী দৌড়ে গেল—ওই হাওয়া-গাড়ি এসেছে মেজবাবুর।

ভূতনাথও দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো উঠোনে। চক চক করছে চেহারা। আগাগোড়া লোহার। শুধু ছাদটা মোটা কাপড়ের আর চাকা চারটে রবারের। রবারের বেলুনের মতো একটা জিনিষ টেপে আর ভোঁ ভোঁ শব্দ হয়। সাড়া পেয়ে দৌড়ে এল সবাই। দাস্ত জমাদারের ছেলেমেয়েরা এসে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখে।

ইব্রাহিম ছাদের ওপর টুলে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিলো। সে-ও দেখলে। চোখ দুটো তার যেন জ্বলছে। বংশী বললে—ওই দেখুন শালাবাবু, ইব্রাহিমের গা জ্বালা করছে—দেখুন।

-কেন, ওর রাগ কীসের?

—আজ্ঞে, এবার হাওয়া-গাড়ি এল, এর পর আর কে ওর ঘোড়ার গাড়িতে চড়বে।

লোচন তামাকের বোয়েম ফেলে এসেছে। মধুসূদন তোষাখানা ছেড়ে দেখতে এসেছে। শ্যামসুন্দর ভিস্তিখানার জল ভোলা থামিয়ে দেখতে এল এক ফাঁকে। খাজাঞ্চীখানা থেকে বিধু সরকারই শুধু আসেনি। দোতলার বারান্দা থেকে ঝি-এর দল ঝিলিমিলির ফাঁক দিয়ে দেখছে।

তারপর এল মেজবাবু।

মেজবাবু আসতেই সাহেব নামলো উঠোনে। তারপর কথা হলে দুজনে। গাড়িটাকে আগা পাছতলা দেখানো হলো। দুজনে কী সব কথা হলো।

মেজবাবু বললেন—ভেড়ি গুড়-কথার সব কিছু বোঝা গেল না। কথার শেষে মেজবাবু সাহেবকে নাচঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন।

কিন্তু হাওয়া-গাড়িখানা বার-বার দেখেও যেন তৃপ্তি হয় না কারো। গাড়ি তো অনেকেই কিনেছে। কলকাতার রাস্তায় মাঝে মাঝে দেখা যায়। কিন্তু এখান যেন সকলের চেয়ে সেরা। মেজবাবু বলেছিল—কলকাতায় যত গাড়ি আছে—সকলের চেয়ে ভালো হওয়া চাই।

তা টেক্কা দেওয়ার মতো জিনিষ বটে।

শ্যামসুন্দরও অবাক হয়ে দেখছিল। এতক্ষণ কিছু কথা বলেনি। হঠাৎ বললে—গাড়ি তো হলো—চালাবে কে?

কে যেন পাশ থেকে বললে—কেন, ইব্রাহিম।

কে বললে কথাটা! কে এমন বোকা রে! যে বলেছে সে মাথা ঢাকা দিয়েছে। এমন বোকামির কথা কে আর বলতে পারে। ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম তখনও তার বাবরি চুল আঁচড়াচ্ছে। কথা বুঝি কানে গেল তার।

–ও ইব্রাহিম মিয়া, কী বলছে, শুনলে?

ইব্রাহিমের কান দুটো আরো লাল হয়ে উঠলো। ইয়াসিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুলের কেয়ারি করে দিচ্ছিলো।

ইব্রাহিম শুধু মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে আয়নাতে মুখ দেখতে লাগলো একবার। মুখ দিয়ে শুধু বেরুলো বেওকুফ।

বেওকুফের মতোই কথাটা বটে! সমস্ত দুনিয়াটাই বেওকুফে ভরা। অন্তত ইব্রাহিমের ধারণা তাই। যোধপুরের নেটিভ রাজার ঘোড়সওয়ার ছিল ইব্রাহিমের চাচা। ইয়া লম্বা চওড়া চেহারা তার। সোনা-চাদির কাজ করা প্লেট লাগানো কুর্তার বুকে আর আস্তিনে। মহারাজার ছিল পপালো খেলার সখ। সেই দু’ শ’ ঘোড়ার তদারক। একবার চাচার সঙ্গে কলকাতায় এসেছিল মহারাজার দলের ভেতর। এখানকার লাটসাহেবের বাড়ি, গঙ্গাজী আর কেল্লা দেখে যখন সবাই চলে যাবার মতলব করছে, সেই সময় চাকরির কথা হলো এখানে। এই মেজবাবুর কাছে। মেজবাবু তখন সবে নতুন ওয়েলার জোড়া কিনেছে। তারপর বেশ সুখেই দিন কেটেছে। মেজবাবুকে নিয়ে গিয়েছে বাগানবাড়ি, খড়দ’র রামলীলার মেলায়। নানা উৎসবে আমোদে মেজবাবুকে সেবা করেছে। আর এখন?

মোটরটা যখন ঘড়ঘড় শব্দ করে নড়ে ওঠে, ইব্রাহিম ঘর থেকে চুপি চুপি উঠে আসে। নিঃশব্দে দোতলার ছাদের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখে। চোখ দুটো দেখতে দেখতে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। শিকারের দিকে চেয়ে বন্য জানোয়ারের চোখও বুঝি এত নিষ্ঠুর হতে জানে না। মুখ দিয়ে নিশ্চয় কিছু শব্দ বেরোয়। অস্ফুট শব্দ। হয় তো ওই নিষ্প্রাণ হাওয়া-গাড়িটাকেই লক্ষ্য করে মাতৃভাষায় গালাগালি দেয়—বেওকুফ।

কিন্তু ইব্রাহিমের সে-আঘাত বিংশ শতাব্দীকে এতটুকু চঞ্চল করতে পারে না। হাওয়া-গাড়ি জাহাজ ভর্তি হয়ে চালান আসে চাদপাল ঘাটে। ম্যাঞ্চেস্টার থেকে রেলি ব্রাদার্সের কাপড়ের চালান আসে। আসে কলের গান, আলুর পুতুল, স্টিম ইঞ্জিন, কল-কজা, ছোট বড় মাঝারি। তার সঙ্গে এল বিলিতি আলতা, সাবান, এসেন্স, মাথার ফুলেল তেল, চুলের কাটা, রেশমি ফিতে, ঝাড়-লণ্ঠন আর বিলিতি মদ। বেঁটে, লম্বা, চ্যাপ্টা, গোল—নানা আকারের বোতলে ভরা।

 

কিন্তু তাক লেগে গেল ননীলালের মোটরগাড়িখানা দেখে। সকলের সেরা গাড়ি। যেমন লম্বা, তেমনি চকচকে, তেমনি আওয়াজ। রবারের বেলুনটা টিপলে ভারী চমৎকার একরকম শব্দ হয়। সে-শব্দ শুনে ঘোড়াগুলো তেমন করে ক্ষেপে ওঠে না। সমস্ত বাড়িটায় প্রতিধ্বনি ওঠে না। মৃদু মন্থর একটু উত্তেজনা হয় শুধু। যেন গাড়িটার কাছে দাঁড়ালে বেশ সুগন্ধ বেরোয় একটা। কিন্তু ভূতনাথের মনে হয়, গন্ধটা গাড়ির তেলের, না ননীলালের জামা-কাপড়ের, না ননীলালের সিগারেটের। ও তিনটে গন্ধই চেনা। তবু যেন নতুন ঠেকে ননীলালের কাছে দাঁড়িয়ে থাকলে।

সেদিন হাবুল দত্তর পাথুরেঘাটার বাড়িতে ছুটুকবাবুর বিয়ের দিন দেখা হয়েছিল ননীলালের সঙ্গে। সে না-দেখা-হওয়ারই সামিল। বৃন্দাবনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডোবার ধারে অতক্ষণ কথা বলার পর যখন বিয়েবাড়িতে আবার ঢুকেছে তখন ননীলাল বিদায় নিচ্ছে। সবাই ননীলালকে পেড়াপীড়ি করছে খাওয়ার জন্যে আর ননীলাল হাতজোড় করে আপত্তি জানাচ্ছে।

আরও আশ্চর্যের কথা, হাবুল দত্ত-ছুটুকবাবুর শ্বশুর—নিজে বলেছে–ননীবাবু এ কী রকম হলো—আপনি কিছু মুখে দিলেন না?

ননীলাল বলেছে—এই তো বরানগর থেকে খেয়ে আসছি, এর পর আবার কলুটোলায় আর একটা নেমন্তন্ন—মানুষের শরীর তো।

কে যেন বললেন—আপনার পায়ের ধুলো পড়েছে এ-বাড়িতে এতেই কিতাৰ্থ হয়েছে পাথুরেঘাটা।

ননীলাল চুপ করে রইল।

–নতুন মিলটা কবে চালু করছেন। বাজার থেকে শেয়ারগুলো সব তো হু হু করে উড়ে গেল সেবার। এবার যেন মনে থাকে আমাদের।

ননীলাল সিগারেটে টান দিলে। গাড়ির পাদানিতে একটা পায়ের ভর দিয়ে দাঁড়ালো। ভিড়ের পেছনের সারিতে দাঁড়িয়েও ভূতনাথ দেখলে ননীলালের বিলিতি কোট প্যান্টের ভাজগুলো কী তীক্ষ্ণ, কী স্পষ্ট। মনে হলো, ছুটুকবাবুর মলমলের গিলে করা পাঞ্জাবীর চেয়েও যেন দামী পোষাক ননীলালের। এমন কি ছুটুকবাবুর মখমল-সাটিনের বরের পোষাকের চেয়েও যেন জুমকালো! গাড়ির ভেতরে আরো দুজন কারা বসে আছে। খুব ফরসা চেহারা। দেখে মনে হয় সব সাহেব।

ননীলাল একবার সিগারেটের শেষ টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে উঠলো—তা হলে আসি এখন মিস্টার…

হাবুল দত্ত সামনে হাত জোড় করে এগিয়ে গিয়ে বললেনকড়েয়ার নতুন বিল্ডিং-এর কন্ট্রাক্টটা তা হলে যে রকম দেখছি

–ওঃ, নন ফিয়ার—আমি তো আছি।

হাবুল দত্ত বললে—আপনি তো কিছু জল গ্রহণ করলেন না–ভয় হচ্ছে—

-করবো, করবো, আপনার জামাই ছুটুক তো আমার ফ্রেণ্ড। এক ক্লাশে পড়েছি আমরা—এখন তো আত্মীয় হয়ে গেলাম। এবার থেকে না বলতে পারবো না আর..

হো হো করে বিলিতি কায়দায় হেসে ননীলাল গাড়িতে গিয়ে বসলো এবার।

সেই শেষ দেখা। সেদিন ভিড়ের মধ্যে থেকে সামনে এগিয়ে দেখা করবার ইচ্ছে হয়েছিল একবার। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। ননীলাল তখন ব্যস্ত। শুধু গাড়িটা চলে যাবার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত বিয়েবাড়ির সমস্ত গন্ধ ছাপিয়ে আর একটা গন্ধ তীব্র হয়ে নাকে এসে লেগেছিল। হয় মোটরগাড়ির তেলের, নয় সিগারেটের, নয় ননীলালের পোষাক পরিচ্ছদের। কিছুই ঠিক করে বলা যায়নি। কেমন যেন অবাক হয়ে গিয়েছিল ভূতনাথ। আদ্যোপান্ত ননীলালের সমস্ত ইতিহাসটা যেন চোখের ওপর ভেসে ওঠে। সেই ননীলাল। গঞ্জের স্কুলের বড় ডাক্তারের ফুটফুটে ছেলেটা! কী যে মোহ ছিল ওর ওপর। সেই ভূতনাথের জীবনের প্রথম চিঠিটা তো ননীলালেরই লেখা। এখনও টিনের বাক্সটা খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে। লিখেছিল—’বড় চমৎকার শহর এই কলিকাতা। কী যে সুন্দর দেশ বলিতে পারিব না। কই ভূতনাথের চোখে তো সে-সৌন্দর্য এখনও ধরা পড়লো না। তারপর সেই যেদিন স্বামিজী কলকাতায় এলেন—ননীলালের সঙ্গে হঠাৎ দেখা। স্বামিজীকে বলেছিল—বুজরুক। তারপর ছুটুকবাবুর কাছে শোনা মতিয়া বিবির বাড়িতে যাওয়া। সেই গান—’জখমী দিলকো না মেরে দুখায়া করো’—সেই শিবু ঠাকুরের গলির বিন্দির কথা। কলেজের দরজার ওপর থেকে ‘God is good’ কেটে দিয়ে ‘God is money’ লিখে দেওয়া। আর আজ অন্য এক মূর্তি!

ছুটুকবাবু বলেছিল—একদিন আমার কাছে পাঁচ শ’ টাকা ধার নিয়েছিল ননী, আর আজ তার কাছ থেকে টাকাটা ফেরৎ চাইতেই লজ্জা করবে। ছুটুকবাবু আরো বলে—এই ননীই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে ভূতনাথবাবু, কী টাকাটাই না নষ্ট করেছি বন্ধুবান্ধবদের পেছনে। এক-একজনের জন্যে এক-একটা দামী বোতল আনিয়ে রেখেছি, যার যা দরকার হয়েছে আমি যুগিয়েছি টাকা, কোথাও গিয়েছি একসঙ্গে, সমস্ত খরচা আমার, পান সিগারেট থেকে শুরু করে সমস্ত-আমার স্বার্থ কী? না তারা আমার সঙ্গে আড্ডা দেবে। আমাকে ঘিরে থাকবে চারপাশে দিনরাত—এই আমার লাভ। ছুটুকবাবু আবার বলে —অথচ আজ সাহেব মেমর পর্যন্ত খাতির করে চলে ননীকে—একটা ব্যাঙ্কও করলে সেদিন, তিনটে জুট মিল, ছ’টা কোলিয়ারির শেয়ার কিনেছে, রাতকে একেবারে দিন বানিয়ে ছাড়লে, বাহাদুর ছেলে বটে—তার ওপর আবার ওই শাঁসালো শ্বশুর, আর রূপসী বউ—অথচ একদিন শেষের দিকে এমন হয়েছিল ওর জামা করতে দিয়েছে বিলিতি দোকানে, ছাড়িয়ে আনবার পয়সা নেই—আমি দিয়েছি টাকা। .

ছুটুকবাবুর বৌভাতের দিন সেই ননীলালকে আরো ভালো করে দেখবার সুযোগ হয়ে গেল। পেছন থেকে মৃদু স্বরে ডাকলেননী।

ছেনি দত্তর সঙ্গে যে অত ঝগড়া, তার ছেলে নটবর দত্তও এসেছে নিমন্ত্রিত হয়ে। শেঠ, শীল, লাহা, মল্লিকরা সবাই যার যার গাড়ি নিয়ে এসেছে। আতর, গোলাপজল, ফুলের মালা, তামাক সিগারেটের ছড়াছড়ি। লক্ষ্মৌ থেকে রহমতউল্লা এসে তিন দিন ধরে তোড়ি, ভৈরো, দরবারি কানাড়া যত সব ওস্তাদী রাগ বাজিয়ে চলেছে। বড়বাড়ির ঐশ্বর্য আর ঐতিহ্যের আড়ম্বর কোথাও যেন হানি না হয়।

সুখচর থেকে খোদ নায়েব সেলামী পাঠিয়েছে এবার মোটারকম। এবার বিধু সরকার নিজে চলে গিয়েছিল কাছারি-বাড়িতে মেজবাবুর নিজের হাতের লেখা চিঠি নিয়ে। সেবার বড়কর্তার শ্রাদ্ধের কাজে ফাঁকি দিয়েছিল মালোপাড়ার প্রজারা। ১৮৩৩ সালের ঝড়-বৃষ্টিতে যখন ঘরবাড়ি ক্ষেত-খামার জমি-জিরেত নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, প্রজাদের দু’ সালের খাজনা মকুব করা হয়েছিল। সে-কথা মনে আছে তো! ছিয়াত্তরে মন্বন্তরের সময় প্রজারা এসে জমিদার বাড়ি থেকে ধান মেপে মেপে নিয়ে গিয়েছে, সে তো আর জমা হয়নি সেরেস্তার খাতায়। তোমাদের মনে না থাকে মনে আছে সমাজের মাতব্বরদের। সব লেখা আছে খাজাঞ্চীখানার পুরোনো রেকর্ডে। দরকার হলে বিধু সরকার সব বার করে শুনিয়ে দিতে পারে। এবার বেগার পাঠাতে হবে গাঁ পিছু একজন করে। আর মাথা পিছু আট গণ্ডা পয়সা সেলামী। বিধু সরকার এই নিয়ম করে দিয়েছিল। না দিলে পরের সনের প্রজা বিলির সময় দেখা যাবে।

এবার তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল সুখচরের চৌধুরীবাবুদের কাছারি-বাড়িতে।

বিধু সরকারের সঙ্গে গিয়েছিল মধুসূদন। তল্পী-তল্পার হিসেব রাখতে হবে। বোকা মাল নিয়ে গেলে চলবে না। আদায় পত্তোর কি যাকে তাকে দিয়ে হয়। বাবুরা না হয় যান না, তাদের সময় কোথায়? কিন্তু প্রজারা হলো জাত বদমাইস। হাজার থাকুক, কাছারিতে এসে কান্নাকাটি করা তাদের স্বভাব। এমন এমন বদ লোকও আছে যারা পেয়াদা পাঠালে কথাই বলে না। বলে— যাও যাও পেয়াদার পো, আমরা পাচ্ছিনে খেতে-জমিদার পুত্তরের বিয়েতে নজর পাঠাবো!!

বিধু সরকার ফিরে এসে বললে—সে সুখচর আর নেই হুজুর, হুজুরের ঘুমের ব্যাঘাত হবে বলে সেবার বেটারা রাত জেগে ডোবার ধারে সারা রাত ব্যাং তাড়িয়েছিল—মনে আছে আপনার?

আর সেই যেবার রাজাবাহাদুর গিয়েছিলেন দোলের সময়, মালোপাড়ার সর্দার নিজে এসে হুজুরের পা ধুইয়ে দিয়েছিল—শুনেছেন সব আপনি মেজবাবু—এখন বলে কিনা জমিদার হলো বাপের মতন, বিপদে আপদে না দেখলে তুমি আমার কিসের জমিদার–বাপ হলেও তো তেমন খেতে দেয় না ছেলেরা।

কথাগুলো মেজবাবুর ভালো লাগেনি।

ঠিক ছুটুকবাবুর বিয়ে না হলে ঘটনাটা অন্য রকম ভাবে মোড় নিতো।

কথাটা ছুটুকবাবুর কানেও গেল।

বাড়ি-বাড়ি নেমন্তন্ন করতে যাওয়ার সময় একটা করে ধুতি, আট পণ সুপুরি আর একথালা সন্দেশ—এই দেবার রীতি। চিরকাল ধরে এমনি চলে আসছে। পুরোনো খেরো খাতায় এর রেকর্ড আছে। রূপলাল ঠাকুরের কত পাওনা, দানসামগ্রী কত, চাকর-ঝিদের পাওনাগণ্ডা সমস্ত হিসেব বাঁধা ছক কাটা আছে।

কিন্তু এবার যেন একটু ত্রুটি হলো সব জিনিষে। একখানা ধুতি বা আট পণ সুপুরি গেল, একথালা করে সন্দেশও দেওয়া হলো আট শ’ তিরানব্বই ঘরে। কিন্তু সন্দেশ চিনির পাকের। ধুতিটা কিছু নিরেশ। সুপুরি কিছু পরিমাণ দাগী।

তা হোক, তবু সবাই এসেছে। বাইরে থেকে কিছু বোঝবার জো নেই। রহমত উল্লা তোড়ির সুরে সমস্ত বৌবাজার কেন সমস্ত কলকাতাটা যেন মাতিয়ে তুললে। সে ক’দিন খেতে খেতে ঘুমোতে ঘুমোতে সর্বক্ষণ যেন নেশার ঘোর লেগে রইল। নহবৎএর সঙ্গে ভুগি তবলার সঙ্গত আর সঙ্গে খঞ্জনী। কাজে অকাজে যেন ভুল হতে লাগলো সবার। মেজবাবু ভুলে গেলেন মালোপাড়ার সর্দারের অপমান। অনুষ্ঠানের ত্রুটির কথা ভুলে গেল ছুটুকবাবু। সন্ধ্যেবেলা জম-জমাট হয়ে উঠলো বড়বাড়ি।

 

ভূতনাথ আবার পেছন থেকে ডাকলো-ননী—

ননীলালের তখন যাবার পালা। কনে দেখা হয়ে গিয়েছে। প্রকাণ্ড একটা হাজার বারো শ’ টাকা দামের খোকা পুতুল উপহার দিয়েছে চুড়ামণির বৌকে। খোদ প্যারিস থেকে ননীলালের এক ব্যবসাদার মক্কেল পাঠিয়ে দিয়েছে।

ননীলাল গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে। এমন সময় ফাঁক বুঝে ভূতনাথ আবার ডাকলে—ননী—

-আরে ভূতে-কী খবর, চলে আয়-বলে হাত ধরে টেনে একেবারে গাড়িতে তুলে নিলে। বললে—কোথায় আছিস এখন?

–কেন, এখেনে, বড়বাড়িতে।

–কী করছিস?

–কিছু না।

গাড়ি তখন বনমালী সরকার লেন দিয়ে চলতে শুরু করেছে। ননীলালের নতুন মোটর। এই-ই ভূতনাথের প্রথম মোটর গাড়ি চড়া। কেমন অনায়াসে এতখানি পথ চলেছে। তেমন ঝাকানি নেই। আরামে গা এলিয়ে দিলে ভূতনাথ।

হঠাৎ ননীলালই প্রথম কথা বললে চূড়োর বৌ কেমন দেখলি?

-খুব ভালল, ওরা তো রূপ দেখেই বিয়ে করে।

—কিন্তু বড় ছোট, বয়স বোধহয় দশ বছরের বেশি হবে না–ওকে নিয়ে চূড়ো কী করবে?

ভূতনাথ বললে—ওদের বাড়ির যে নিয়মই ওই—তারপর খানিকক্ষণ আবার চুপচাপ। খানিক পরে বললে—আমি আর কতদূর যাবো, এখানে নামি।

-কেন, চল আমার বাড়িতে, পটলডাঙায়।

–এত রাত্রে ফিরে আসবো আবার কী করে?

—সে জন্যে তোর ভাবনা নেই, আমার বাড়িটা চিনে রাখ— তা এখন কী করছিস?

-বললুম তো, কিছু না।

–চাকরি করবি?

—কে দেবে চাকরি?

–আমি দেবো—আমার ব্যাঙ্কে এত লোক নিচ্ছি।

-–আমি কি পারবো?

—কাজ তো তেমন শক্ত নয়—যাদের টাকা আছে, তারা এসে টাকা জমা রাখবে আমার ব্যাঙ্কে, সুদ পাবে—আর যদি তুই কারো টাকা আনতে পারিস, তার জন্যেও কমিশন পাবি। টাকা খাটানোর ভার আমার— ধর, এমন লোক যদি কেউ থাকে তোর জানাশোনা যার অনেক টাকা আছে, আমার ব্যাঙ্কে রাখলে সে সুদ পাবে—টাকাও সেফ রইল—যখন ইচ্ছে তুলে নিতে পারবে।

আরো অনেক কথা বলতে লাগলো ননীলাল। ভূতনাথ শুনতে শুনতে অবাক হয়ে যায়। টাকা ছড়ানো আছে পৃথিবীতে, শুধু নিতে জানলেই হয়। কোটি কোটি টাকার স্বপ্ন দেখে ননীলাল। ননীলাল বলে টাকা হলে আমার ধ্যান। দুনিয়ায় টাকা না থাকলে কিছুই নেই। এই মূল সত্যটি জানতে হবে। শুধু জানলে চলবে না, বিশ্বাস করলেও চলবে না, ধ্যান করতে হবে। জীবনের যা কিছু কাম্য অর্থাৎ যশ, খ্যাতি, স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, ভোগ, স্ত্রী, পরিবার, প্রতিষ্ঠা, মর্যাদা—সকলের মূলে টাকা! এই যে এখন টাকা হয়েছে—তাই সবাই খাতির করে। এমন কোনো কাজ নেই, এমন কোনো দুষ্কর্ম নেই যা করিনি আমি, কিন্তু আমি ড়ুবে যাইনি তা বলে, মদ খেয়েছি, এখনও খাই, বড়লোকের ছেলেদের সঙ্গে ভাব করেছি, আডড়া দিয়েছি, দেনা করা টাকা দু হাতে উড়িয়েছি, কী জন্যে? আরো টাকা পাবার জন্যে! আমি বিয়ে করেছি। রূপ দেখে নয় শুধু, টাকা দেখেও! রূপও চাই টাকাও চাই। তাই তো চূড়োকে বলছিলুম—

—ছুটুকবাবু কত টাকা পেয়েছে?

—কিছুই পায়নি, একটা পয়সা না, তা ছাড়া হাবুল দত্ত টাকা পাবে কোত্থেকে? আমার কাছে তো দু’ বেলা ছুটোছুটি করে টাকার জন্যে। ওর হাঁড়ির খবর আমি জানি, আমি কাজ দিলে তবে ও টাকা পাবে—আমার টাকা নিয়ে ও বড়লোক।

ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—হাবুল দত্তকে টাকা দিয়ে তোর লাভ?

-আরে, আমি কি আমার টাকা দেবে? .রামের টাকা শ্যামকে দেবো, আবার যদুর টাকা রামকে দেবো—আমার কিছুই, মাঝখান থেকে আমি খাবো লাভ—এই যে এত লোককে আমি মাইনে দিই, আমি কি আমার পকেট থেকে দিই, দিই রাম শ্যাম যদুর টাকা।

অত কথা বুঝতে পারে না ভূতনাথ। জিজ্ঞেস করলে–এখন কোথায় যাচ্ছিস?

—এখন আর কোথাও যাবে না, সোজা বাড়ি, সারাদিন খাওয়া হয়নি আজ।

—বড়বাড়িতে খাস নি কিছু?

—খেতে ওরা বলছিল খুব, কিন্তু পেটে আর জায়গা নেই। সারা বিকেলটা শুধু মদ খেয়েছি।

—মদ! কেন মদ খেয়ে টাকা নষ্ট করিস?

ননীলাল হো হো করে হেসে উঠলো।-তুই এখনও মানুষ হলি না, আরে মদ খেয়ে যারা টাকা ওড়ায় তারা ওই চূড়ামণি গোবরমণির দল—আমি মদ খেলে টাকা পাই।

—সে কী রকম?

ননীলাল বললে সে তোকে আর একদিন বোঝাববা, এমন লোক আছে কলকাতায় যাদের সঙ্গে মদ খেলে টাকা দেবে আমাকে। আমি কথা বললেই তারা কৃতার্থ—এই যে এত কারবার চালাচ্ছি, এর একটা পয়সা পর্যন্ত আমার নয়, সব পরের টাকা বিশ্বাস করবি?

ভূতনাথের কাছে বিশ্বাস না হবার মতোই কথা। এ কোন্ কলকাতার কথা বলছে ননীলাল! স্বামিজীর যখন সম্বর্ধনা হয়েছিল বাগবাজারে, সে-সভার খরচ পর্যন্ত ওঠেনি। এমনি টাকার অভাব হয়েছিল। সে-খবর ব্রজরাখালের কাছে শুনেছিল ভূতনাথ। বন্যা কি দুর্ভিক্ষের সময় গান গেয়ে গেয়ে লোকেরা চাল, কাপড়, পয়সা চেয়ে বেড়ায়। কেউ দেয় না। টাকার অভাবে কত ভালো কাজ হতে পারছে না দেশে। নইলে স্বামিজীর একটা মূর্তি তৈরি করে রাখা হতো কলকাতার একটা বড় রাস্তার মোড়ে। ব্রজরাখাল কতদিন সে-কথা বলেছে। সুবিনয়বাবু অবশ্য ব্রাহ্মসমাজে টাকা দিচ্ছেন। কিন্তু সুবিনয়বাবুর মতো লোকই বা ক’জন আছেন? টাকার অভাবে চিকিৎসার জন্যে কত ফুলদাসীর মতো মেয়েমানুষ কলেরায় মারা যাচ্ছে! নিবারণদের দল টাকা পেলে কত কী করতে পারতো। জার্মানী থেকে রিভলবার, বন্দুক, বোমা আসতো। গরীব দুঃখীদের জন্যে অন্তত একটা হাসপাতালও হতো! অথচ ননীলালের কাছে টাকাটা একটা সমস্যাই নয়।

ননীলাল বলে—টাকা পাওয়া সহজ—টাকাটা খাটানোই হলো শক্ত, টাকার বাচ্ছা হয় জানিস—সেই বাচ্ছ। পাড়ানোই হলো শক্ত কাজ।

ভূতনাথ বললে—আমার নিজের পাঁচ শ’ টাকা আছে।

কথাটা শুনে ননীলালের বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না কিন্তু! শুধু বললে–পাঁচ শ’—

–হ্যাঁ, পাঁচ শ’।

ননীলাল এবারও কোনো মন্তব্য করলে না। ভূতনাথ মনে মনে হিসেব করতে লাগলো—পাঁচ শ’ টাকা যদি ননীলালের ব্যাঙ্কে রেখে দেওয়া যায় তো বছরে পাঁচ বারোং ষাট টাকা সুদ আসে। জবার বিয়েতে একটা কিছু দেবে বলেই ছোটবৌঠানের কাছে রেখে দিয়েছে টাকাটা। যতদিন বিয়ে না হয় ততদিন ব্যাঙ্কে থাকলে কিছু সুদও আসে।

ভূতনাথ হঠাৎ বললে—আর একজনের কাছে কিন্তু অনেক টাকা আছে-লক্ষ লক্ষ টাকা।

এবার ননীলালের বেশ আগ্রহ দেখা গেল। গাড়ির বাইরে পোড়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললে—কার কাছে?

একটা আচমকা ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা আবার সোজা চলতে লাগলো।

ভূতনাথ বললে—আর অত টাকা তাঁর শুধু পড়েই আছে, কোনো কাজে লাগছে না—অবশ্য ছুটুকবাবুর মতো নয়…তা ছুটুকবাবুরা টাকা রাখেনি তোর ব্যাঙ্কে?

ননীলালের গলায় কেমন তাচ্ছিল্য ফুটে উঠলো। বললেওদের ওই বাইরেই যা চাল-চলন—নগদ টাকা নেই—সে আমি জানি—চারদিকে দেনা।

—সেদিন তত মেজবাবু গাড়ি কিনলে।

—ওই কোঁচানো ধুতি, ওই ঝি-চাকর আর গাড়ি ঘোড়া থাকলেই বড়লোক হয় না, আজকাল বড়লোকের ইয়ে বদলে গিয়েছে। ওদের আছে জমি, জমিদারি যদ্দিন তদ্দিন বড়মানুষি—তাও প্রজারা খাজনা

দিতে পারলেই ব্যাস্—সেদিন যে একটা ঘোড়া মরে গেল, এখনও কিনতে পারলে না—এদিকে মেয়েমানুষের নতুন নতুন বাড়ি হচ্ছে কেবল, পায়রার লড়াই হচ্ছে—ওসব শুধু চাল দেখানো।

ভূতনাথ খানিক চুপ করে থেকে বললে—যার কথা বলছিলাম, তাঁর কিন্তু অনেক টাকা-রাখবি তোর ব্যাঙ্কে?

—কে সে?

—সুবিনয়বাবু, আমি যেখানে চাকরি করতুম, ওই ‘মোহিনীসিঁদুরের মালিক। তিনি সব টাকা দান করে দিচ্ছেন, যদি তুই বলিস গিয়ে রাখতেও পারেন, তার মেয়ের সঙ্গেও আমার জানা শোনা আছে—জবাকে ধরলেও হয়—

-জবা?

-হ্যাঁ, ব্রাহ্ম হলে কী হবে, সুবিনয়বাবুর বাবা হিন্দু ছিলেন কিনা, ওই নাম রেখেছিলেন—মেয়েটি খুব ভালো, চিনিস নাকি?

—কী রকম চেহারা বলতো? ভূতনাথ বললে-চেহারাটা খুব ভালো—তার ওপর ব্রাহ্ম তো, লম্বা হাতা জামা পরে, ভেলভেটের কলার লাগানো ব্লাউজ, চুলটা বিনুনি করে ঝুলিয়ে দেয়, ছুটুকবাবুর কাকীদের দেখেছিস তো, ওদের রূপ অন্য রকম—আর জবাকে দেখতে আলাদা একেবারে।

ননীলাল খানিকটা ভেবে জিজ্ঞেস করলে–ব্রাহ্ম?

–হ্যাঁ, ব্রাহ্ম।

—ব্রাহ্ম মেয়েদের সঙ্গে তো এককালে খুব মিশেছি, চিনি বলে মনে হচ্ছে—খুব জেদী মেয়ে, না রে?

ভূতনাথ বললে–হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস, খুব জেদী, কিছুতেই ভাঙবে না।

–তবে চল একদিন।

ভূতনাথ বললে—সুবিনয়বাবু এখন খুব অসুস্থ-মাঝখানে তো খুবই খারাপ অবস্থা গিয়েছিল—শুনছি এখন ভালো আছেন। আমি আগে দেখে আসি একদিন একলা গিয়ে কেমন আছেন, তারপর বরং তোকে নিয়ে যাবে।

ততক্ষণে গাড়ি পটলডাঙার ধারে এসে গিয়েছে। গাড়ি বাড়ির কাছে আসতেই একটা বিরাট কুকুর চিৎকার জুড়ে দিলে।

গাড়ি থেকে নেমে ননীলাল কুকুরটাকে দু হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে ডাকলে-বদরি—

ননীলাল চলে যাচ্ছিলো। ভূতনাথ ডাকলে–ননী—

ননীলাল কুকুরটাকে বুকে নিয়ে মুখ ফেরালে—কিছু বলবি?

—তোর সেই বিন্দী, বিন্দীর কাছে আর যাস না?

ননীলালের মনে পড়লো।–ও-ও-ও-মনে পড়েছে—এখন তাকে ছেড়ে দিয়েছি—এখন আছে মিসেস গ্রিয়ারসন।

–মিসেস গ্রিয়ারসন, সে কে?

—আমার পার্টনারের বউ।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *