২১. আজ এতদিন পরে ভাবতে যেন কেমন লাগে

আজ এতদিন পরে ভাবতে যেন কেমন লাগে। সে-মানুষগুলো, সে-দিনগুলো কোথায় গেল। সেই লঘুপক্ষ দিন আর রাত গুলো। উঠে বসে ধীরে সুস্থে চলা, ভাবা আর বাঁচা! দিন যেন আর ফুরোয় না, রাত যেন আর কাটে না। সূর্য উঠতে যেন বড় আস্তে আস্তে! ড়ুবতে যেন বড় দেরি করে। গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে সময়ের চাকা! হচ্ছে, হবে। অত তাড়া কিসের। তামাক খাও। আর একটু জিরোও। সমস্ত দিন তো পড়ে রয়েছে। কত কাজ করবে করো না!

সে অনেকদিন আগের ঘটনা। সেবার হুজুগ উঠলে চৈত্রমাসের অমাবস্যার দিন মহাপ্রলয় হবে! প্রলয় মানে এক ভীষণ কাণ্ড! কলিযুগ শেষ হয়ে যাবে। পাঁজিতে লিখেছে—অমাবস্যা তিথিতে দ্বাদশ ঘটিকা সপ্তম পল ত্রয়োদশ দণ্ড গতে ঘাতচন্দ্র দোষ।

ভৈরববাবু এসে বললেন—লোচন, দে বাবা, ভালো করে তামাক খাইয়ে দে—আর তো কটা দিন।

লোচনও কথাটা শুনেছিল। বললে-বলেন কি ভৈরববাবু কলি উল্টে যাবে?

—উল্টে যাবেই তো, কলির চারপো পূর্ণ হয়েছে যে— উল্টোবে না!

লোচন বললে—উল্টে গেলে কী হবে?

ভৈরববাবু বললেন—সত্য যুগ শুরু হবে।

লোচন বললে—আমরা দেখতে পাবো তো?

—বেঁচে যদি যাস তো দেখতে পাবি বৈকি—কিন্তু বেঁচে থাকলে, তত—কী হয় আগে দেখ?।

লোচন সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়লো। বললে—বাঁচবো না ভৈরববাবু—বলেন কি!

ভৈরববাবু ইকো টানতে টানতে বললেন-বাবুর বাঁচবে কিনা তাই আগে দেখ! বাবুরা বাঁচলে তবে তো চাকর-বাকরেরা। মনে কর, সাততলা বাড়ির মতো উচু জল দাঁড়িয়ে গেল এখানে, কলকেতা শহর হয় তত সমুদ্র হয়ে গেল—তখন কোথায় থাকবি তুই, আর কোথায় থাকবো আমি—মেজবাবু পর্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছে।

সমস্ত কলকাতার লোকগুলো ভয় পেয়ে গেল। যেখানে যায়, সেখানেই ওই আলোচনা। রাস্তার ধারে নোয়াকগুলোতে আড়া বসে। জোর আলোচনা চলে।

নিশা ছুটি নিয়ে দেশে চলে গেল। বলে—যদি বেঁচে থাকি তো আবার ফিরে আসবো শালাবাবু, মরবার আগে জমি-জিরেতের পাওনাগণ্ডা সব বুঝে নেই তোমরে গেলে কে আর দেবে।

লোচন বলে—পেট ভরে ভাত খেয়ে নে বংশী—এ জন্মে আর খেতে পাবি কি না-পাবি।

বংশীও বড় ভয় পেয়ে গিয়েছে। বলে—কী হবে শালাবাবু? বোনটার জন্যেই ভাবি, বিয়ে দিয়েছিলুম, আট কুড়ি টাকাও খরচ হয়ে গেল, সোয়ামীও বাঁচলো না ওর। এখানে যাহোক ছোটমা’র পায়ের তলায় বসে দু’মুঠো খেতে পাচ্ছিলুম—কিন্তু এখন এ কী কাণ্ড বলুন তো!

এক-এক করে দিন যায়। চৈত্র মাসের অমাবস্যা এগিয়ে আসে। একদিন ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে গিয়ে সুবিনয়বাবুর কাছে কথাটা পাড়লে ভূতনাথ। আপনি কিছু শুনেছেন স্যার?

সব শুনে সুবিনয়বাবু বললেন—শেষ দিনটার জন্য অত ভয় পাও কেন ভূতনাথবাবু, গানেরও তো সম্ আছে, ছন্দেরও তে যতি আছে, কিন্তু নদী যেখানে থামে, নদী যেখানে শেষ হয়, সেখানে একটা সমুদ্র আছে বলেই তো শেষ হয়—তাই শেষ হয়েও তার তো কোনো ক্ষতি নেই—

I have come from thee-why I know not;
But thou art, God! What thou art;
And the round of eternal being is the pulse of
thy beating heart.

জানো ভূতনাথবাবু-ফল যখন পাকে, তখন ডাল থেকে ছিঁড়ে পড়াই তার গৌরব, কিন্তু শাখা ত্যাগ করাকে যদি সে দীনতা বলে মনে করে তবে তার মতো কৃপার পাত্র আর কে আছে—কথা বলতে গেলে সুবিনয়বাবুর আর মাত্রাবোধ থাকে না।

শেষে সেই অমাবস্যা তিথি এল। সমস্ত বাড়িতেই যেন একটা উত্তেজনা। ইব্রাহিম সহিসও আজ অসুখের ভান করে কাজে আসেনি। তোষাখানা, ভিস্তিখানা, খাজাঞ্চিখানা আজ যেন থম থম করছে। রান্নাবাড়ির কাজ সকাল সকাল শেষ হয়ে গিয়েছে। ব্ৰজরাখাল তখন ছিল এখানে। কিন্তু তারও দেখা নেই।

বিকেল বেলা ভূতনাথ ব্ৰজরাখালকে বলেছিল—আজ সন্ধ্যেবেলা একটু সকাল-সকাল ফিরো ব্ৰজরাখাল।

ব্ৰজরাখাল বলেছিল—কেন?

-কী সব শুনছি হবে—পাঁজিতে লিখেছে?

-তুমিও যেমন বড়কুটুম, পাঁজির কথা বিশ্বাস করো, অত ‘দৈবের ওপর বিশ্বাস করলে কাজ চলে না, ওটা মৃত্যুর চিহ্ন কাপুরুষতা!’

—কিন্তু পাঁজি কি মিথ্যে লিখেছে? কত জ্ঞানী পণ্ডিত লোকদের লেখা সব।

ব্রজরাখাল বলেছিল—রেখে দাও পাজিওয়ালাদের জ্ঞান; জ্ঞানের পরেও আছে বিজ্ঞান, ঠাকুর বলতেন—“যে দুধের কথা একেবল কানে শুনেছে, সে অজ্ঞান, যে দুধ দেখেছে সে জ্ঞানী, আর যে দুধ খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে, সে হলো বিজ্ঞানী’। যাই বলো বড়কুটুম আমার ও-পাঁজিতে বিশ্বেস নেই-জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাইরে ওরা বলে হাসতে হাসতে চলে গিয়েছিল নিজের কাজে।

ব্ৰজরাখাল বিশ্বাস করেনি, সুবিনয়বাবুও গুরুত্ব দেননি, কিন্তু মেজবাবু সেদিন বাড়ি থেকে বেরোলেন না। সকাল সকাল খানা সেরে নিলেন। নাচঘরেই সেদিন আড্ডা বসলো। ভৈরববাবু এলেন গোঁফে তা দিয়ে। বগলেশ-আঁটা জুতোজোড়া সন্তর্পণে দরজার পাশে রেখে-ফরাসের ওপর গিয়ে বসলেন। মতিবুও এলেন। ছাতাটা একপাশে রেখে কোঁচানো ওড়না আর কোঁচা সামলে বসলেন এগিয়ে। সকলেরই বাকা সিঁথি, বাবরি চুল। আর এলেন বড়মাঠাকরুণ। ভারিক্কি চেহারা। হাতে পানের ডিবে। বারো গাছা করে মোটা বেঁকি চুড়ি দু’হাতে। টাঙ্গাইলের কড়কড়ে দাঁতওয়ালা চওড়া পাড়ের শাড়ি। এসেছে তিনকড়ি। তিনকডির বয়েস কালে চেহারা ভালো ছিলো বোঝ যায়। নাকে হীরের নাকছাবি। গালভর্তি পানদোক্তা। মোটাসোটা মেয়েটি। এককালে হাসিনী আসার আগে ওই ছিল সুয়োরাণী। তারপর আসে হাসিনী। হাসিনী বয়সে কচি। গায়ের গয়না তারই বেশি। বেশি কথা বলে। ছটফটে। চুলবুল।

মেজবাবু গড়গড়ায় মুখ দিয়েই হুঙ্কার দিলেন—বেণী-বেণী

বেণী এলে মেজবাবু বললেন—রূপলাল ঠাকুরকে ডেকে নিয়ে আয় তো।

ভৈরববাবু বললেন—আজ্ঞে পাজি আমি নিজে দেখেছি—রাত বারোটা বেজে সাত পল ত্রয়োদশ দণ্ডে ঘাতচন্দ্রদোষ।

মেজবাবু বললেন—না, না, রূপলাল আসুক না, যদি মহাপ্রলয় হয়ই তো ঠাকুর মশাই বা কেন বাদ যাবেন—সকলের একযাত্রা হওয়াই তো ভালো।

মতিবাবু বললেন—আজ্ঞে আমি তো গিন্নীকে বলে এসেছি, আজ সব যেন একঘরে এসে শোয়—কিন্তু ঘুম কি আর কারো আসবে। সবাই জেগে বসে আছে।

ভৈরববাবু বললেন—কলিযুগ শেষ হয়ে গেল, একরকম বাঁচা গেল স্যার। ছোটলোকদের আস্পর্ধা দিন দিন যেমন বাড়ছিল, সত্যযুগ এলে আবার জিনিষপত্তরের দাম কমবে, জামাকাপড় সস্তা হবে, আট আনা মণ চাল কিনবে-চাই কি দামই লাগবে না।

মতিবাবু বললেন—সে গুড়ে বালি, এ রামরাজত্ব তো নয়, এবার ইংরেজের রাজত্ব। এখানে অবিচার চলবে না আর।

মেজবাবু বললেন—সেদিন বেহ্মজ্ঞানী শিবনাথ শাস্ত্রী মশাই-এর সঙ্গে দেখা হয়েছিল জানেন!

সবাই উন্মুখ হয়ে উঠলো।

মেজবাবু বললেন—জিজ্ঞেস করলাম—কী বুঝছেন? তিনি বললেন—মানুষের ডাকে যেমন দেবতার আসন টলে, তেমনি মানুষের পাপেও তাঁর আসন টলে।

—তা মিথ্যে তিনি বলেন নি স্যার, টলবেই তো, এই যে কলিযুগে প্রজারা জমিদারকে মানতে চায় না, ব্রাহ্মণকে ভক্তি করে না, এ-ও পাপ বৈকি স্যার।

মেজবাবু একটু পরে বললেন—ক’টা বাজলো দেখে তো?

—এই তো সবে সন্ধ্যে সাতটা বেজে চল্লিশ মেজবাবু বললেন—তাহলে এখন তো অনেক দেরি, তা হলে বলে বড়মাঠাকরুণের দিকে তাকালেন।

বড়মাঠাকরুণ পান সাজতে সাজতে বললেন—আজকে আর গাইতে বোলো না হাসিনীকে। কাবোর মেজাজ ভালো নেই।

মেজবাবু বললেন—গান না হয় না হলে, তুমি তবে ওইগুলো বার করো, বরফও তত এসেছে।

বড়মাঠাকরুণ তাতেও নারাজ। বললেন—তোমার মতিচ্ছন্ন হচ্ছে দিন দিন। আজকে কোথায় বসে বসে জপতপ করবার দিন।

—তবে সিদ্ধিই হোক, সিদ্ধির সরবৎ, গরমটাও পড়েছে খুব, বেশ করে পেস্তা বাদাম বেটে, একটু ল্যাভেণ্ডার দিয়ে…কী বলে। ভৈরববাবু?

ইতিমধ্যে রূপলাল ঠাকুর এসে পড়লেন। গায়ে গরদের চাদর। পায়ে খড়ম।

পাশের ঘরের ফাঁক দিয়ে সবাই দেখেছিল। ভূতনাথ, লোচন, আরো সবাই। আজকে প্রায় সকলের ছুটি। সকাল সকাল রান্নাঘরের পাট শেষ।

বংশী তাড়াতাড়ি এসে বললে—শালাবাবু, ওদিকে সব্বনাশ হয়েছে-শিগগির আসুন!

ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কী হলো রে বংশী?

একরকম জোর করেই টানতে টানতে ভূতনাথকে বাইরে নিয়ে এল বংশী।

বংশী বললে—শিগগির চলুন একবার জানবাজারে—ওসব পরে দেখবেন আজ্ঞেও সমস্ত রাত ধরেই চলবে আজ।

ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কেন?

—আজ্ঞে, এখুনি খবর এসেছে জানবাজারের বাড়ি থেকে, ছোটবাবর অসুখ—-আমাকে ছোটমা ডেকে বলে দিলেন—তোর শালাবাবুকে নিয়ে যা।

সেই রাত্রেই বেরোলো ভূতনাথ। সঙ্গে বংশী। রাস্তায় বেরিয়ে বংশী বললে—এমনি করেই প্রাণটা খোয়াবেন ছোটবাবু, ও ছাই-ভস্ম খেয়ে-খেয়ে পেটে একেবারে ঘা হয়ে গিয়েছে, আজ থেকে তো নয়, সেই বিয়ের আগে থেকে—মানুষের শরীর কত সয়, বলুন?

জানবাজারের অন্ধকার গলিতে ছোটবাবুর ল্যাণ্ডেলেট দাঁড়িয়ে আছে। ঘোড়া দুটো চুপচাপ মাথা নিচু করে পা ঠকছে।

বংশী একেবারে সোজা গিয়ে কড়া নাড়তে লাগলো—বিন্দাও বিন্দা

বৃন্দাবন দরজা খুলে দিয়েছে।

বংশী বললে—ছোটবাবু আমার কেমন আছে বৃন্দাবন?

বৃন্দাবন বললে—এখনও জ্ঞান হয়নি। যা না ওপরে যা–বাবুর কাছে নতুন-মাও বসে আছে।

বংশী সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বললে—চলে আসুন শালাবাবু, ছোটমা বলছে রাত বারোটার আগে যেমন করে হোক ছোটবাবুকে বড়বাড়িতে নিয়ে যেতেই হবে—বারোটার পর কি হয় কে জানে।

ছোটবাবুর ঘরের কাছে পৌঁছতেই ভেতর থেকে কে যেন পায়ের শব্দ পেয়ে বেরিয়ে এল। ভূতনাথকে দেখে একটুখানি ঘোমটা টেনে দিলে। বললে-কে, বংশী এলি? ভালোই হয়েছে।

বংশী বললে—আমার বাবু কেমন আছে এখন নতুন-মা?

—এখনও জ্ঞান হয়নি বংশী, ডাক্তার ডেকেছিলুম, বড় ভয় করছে।

—কই দেখি—বলে বংশী ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। ভূতনাথও গেল পেছন-পেছন। চুনীবালার দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। বেশ সুন্দরী দেখতে। কিন্তু যেন বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বোধ হয় অনেকক্ষণ ধরে সেবা করছে একটানা।

বৃন্দাবন এসেছিল ঘরে। বললে–মা তুমি এবার খেয়ে নাও গে–বংশী তো রয়েছে।

নিঃসাড় নিস্পন্দ হয়ে পড়ে আছে ছোটবাবু। ধপধপে ফরসা রং-এর মানুষটা। ওষুধ খেয়ে বোধ হয় বেহুশ হয়ে গিয়েছে। বংশী গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে একবার স্পর্শ করলো। মনে হলো বংশী যেন ছোটবাবুকে জাগিয়ে তুলতে চায়। সেই দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বংশীর চোখ দুটো যেন একেবারে পাথরের মতো নিষ্প্রাণ কঠিন হয়ে এসেছে। ভূতনাথের মনে হলো—বংশীর এ রূপ যেন দেখেনি কখনও আগে। এই মুহূর্তে ছোটবাবু উঠে দাঁড়িয়ে তাকে চাবুক মারলে যেন বংশী খানিকটা স্বস্তি পেতো। যেন প্রাণ ফিরে আসতে বংশীর শরীরে।

সেই রকম চেয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ একেবারে ফেটে পড়লো বংশী। বললে—ও ছাই-ভস্মগুলো তুমি কেন খাও নতুন-মা? নিজে না হয় গেলো কিন্তু আমার ছোটবাবুকে কেন গেলাও বলতে পারে?

বংশীর কথায় ভূতনাথও কেমন যেন চমকে উঠলো।

চুনীবালা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে বংশীর দিকে একবার চাইলে। মনে হলো–বংশীর এ ধরনের কথার জন্যে যেন চুনীবালা প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু কিছু উত্তর ও দিলে না।

বংশী আবার হঠাৎ বলে উঠলো—ছোটবাবু মরলে তোমরা বাঁচো, না নতুন-মা?

এতক্ষণে যেন কথা খুঁজে পেল চুনীবালা। দৃঢ়কণ্ঠে বলতে গেল—বংশী…

বংশী আবার চিৎকার করে বলে উঠলো—হাঁ, নিশ্চয় বলব, হাজার বার বলবো, তোমাকে আমি ভয় করি নাকি?

চুনীবালা চাপা গলায় বললে—চেঁচাতে হয় বাইরে গিয়ে চেঁচা।

—কেন, অত দরদ কিসের, বিষগুলো খাওয়াবার সময় মনে থাকে না। কার দৌলতে খেতে পরতে পাচ্ছো? কার দৌলতে রাজরাণী হয়েছে?

চুনীবালা নিজেকে সামলে নিয়ে বললে-বংশী তোর তো বড় আস্পর্ধা দেখছি…

বৃন্দাবন এসে বংশীর হাত ধরলে এবার। বললে–চুপ কর তুই বংশী, একে সারাদিন মার খাওয়া হয়নি, তুই আর জ্বালাসনে।

বংশী কান্নার মতো হাউহাউ শব্দ করে উঠলো—খায়নি তো কার কি, বারণ করতে পারে না ছোটবাবুকে যে ও বিষগুলো খেও না?

চুনীবালা যেন স্বগতোক্তির সুরে বলে উঠলো—বিয়ে করা বউ-এর কথা যে শোনে না, সে শুনরে আমার কথা—কথা শুনলি বৃন্দাবন।

বংশী বললে—বিয়ে করা বউ-এর কথাই যদি ছোটবাবু শুনবেন তো ছোটমা’র আমার দুঃখ কিসের? এই আমার শালাবাবু সাক্ষী আছেন, ছোটমা’র কপাল যে পুড়িয়েছে তার কখখনো ভালো হবে না, কখনো ভালো হবে না—এই বলে রাখছি আমি—তারপর ভূতনাথের দিকে চেয়ে বললে—আসুন শালাবাবু, ধরুন তো একবার।

সেই ছ’ ফুট লম্বা শরীর। কাঁচা সোনার মতো গায়ের রং। সারা শরীরে আতরের ভুর ভুর গন্ধ। ভারিই কি কম। বৃন্দাবনও এসে হাত লাগালে। তারপর তিন জনে মিলে ধরে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাড়িতে তোলা! গাড়ি ছাড়বার আগে বৃন্দাবন ভূতনাথকে বললে—আপনাকে একবার নতুন-মা ডাকছে।

–কে ডাকছে?

—আমার নতুন-মা।

—কোথায়? বলে ভূতনাথ বৃন্দাবনের সঙ্গে বাড়ির ভেতরে যেতেই দেখলে দরজার একপাশে চুনীবালা দাঁড়িয়ে আছে। বললে—আমায় ডেকেছিলেন?

চুনীবালা বললে—তুমি বড়বাড়িতে নতুন ঢুকেছে বুঝি, আগে দেখিনি। তা একটা কাজ তোমায় করতে হবে।

ভূতনাথ বললে—বলুন?

–ছোটকর্তাকে তত তাড়াহুড়ো করে তোমরা নিয়ে চললে, শরীরের অবস্থা ওঁর বড় খারাপ, ডাক্তার নড়া-চড়া করতে বারণ করেছিলেন, কাল একবার খবর দিয়ে যাবে কেমন থাকেন উনি?…পারবে আসতে?…নইলে শান্তি পাবে না মনে।

ভূতনাথ কি বলবে ভেবে পেলে না।

চুনীবালা আবার বললে—আর এই ওষুধটা নাও—ডাক্তার বলেছিলেন যন্ত্রণা হলে এটা খাওয়াতে। রাত্রে যদি ব্যথা বাড়ে তো…তাহলে তুমি আসবে তত ঠিক?

পরের দিন যাবার কথাই দিয়েছিল ভূতনাথ। কিন্তু ঠিক পরের দিনই যাওয়া হয়নি।

সেদিন রাত্রে ছোটমা’র ঘরেই নিয়ে গিয়ে একেবারে তুলেছিল ছোটবাবুকে।

ছোটমা’র হাতে ওষুধের শিশিটা দিয়ে ভূতনাথ বলেছিল— ছোটবাবুর জন্যে এই ওষুধটা দিয়েছে নতুন-মা।

শিশিটা না নিয়ে বৌঠান বলেছিল—ও ওষুধ তুমি রাস্তায় ফেলে দিও ভূতনাথ—ওতে বিষ থাকতে পারে।

তারপর বৌঠানের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িবারান্দার তলায় ভূতনাথ অনেকক্ষণ বসেছিল। রাস্তায় সেদিন লোকের ভিড়। অত রাত্রেও গঙ্গাস্নান করতে চলেছে দলে দলে। মহাপ্রলয়ের আগে মানুষ পুণ্যসঞ্চয় করে মরবে। পরলোকের পাথেয়স্বরূপ। ওপরের নাচঘরে তখনও মেজবাবুর আড়া চলছে। শেষ পর্যন্ত হাসিনীর গান হয়েছে, নাচও হয়েছে। তারপর নাকি মদও চলেছে। মহাপ্রলয়ই যদি হয় তা হলে মনে কেন মিছিমিছি আপসোস থেকে যাবে।

রাত তখন এগারোটা। বংশী এল। বললে–ছোটবাবুর এতক্ষণে জ্ঞান হয়েছে শালাবাবু-শশী ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে। গেল। তারপর বললে—ছোটবাবুর জ্ঞান হতেই পালিয়ে এসেছি আজ্ঞে, যে-রাগী মানুষ, আমাকে এখন সামনে পেলে খুন করে ফেলবে হয়তো।

ভূতনাথ বললে–কেন?

—আজ্ঞে আমিই তো নতুন-মা’র বাড়ি থেকে ছোটমা’র ঘরে এনে তুলেছি। ছোটবাবু তো আমাকেই দুষবে।

তারপর ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বাজলো। পৌনে বারোটা। বারোটা বাজলো। আজ আর সারা বাড়ি নিঝুম নয়। আজ ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে। উদগ্র প্রতীক্ষায় উদগ্রীব হয়ে আছে মানুষ। এবার কী ঘটে। তারপর বাজলে সাড়ে বারোটা। একটা। দুটো। তিনটে। রাত পুইয়ে গেল নিশ্চিন্তে নির্বিবাদে।

কিছুই ঘটলো না। প্রতিদিনকার মতো পুরোনো সূর্য ইব্রাহিমের ছাদের কোণ দিয়ে উঠলো আকাশে। তারপর সেই দাসু মেথরের উঠোন ঝাঁট দেওয়া। তোষাখানায় চাকরদের হৈ-হল্লা। ভিস্তিখানায় জল তোলার শব্দ। লোচনের হুঁকো পরিষ্কার করা। নাথু সিং-এর ডন-বৈঠক। খাজাঞ্চীখানায় বিধু সরকারের বক্তৃতা। ইয়াসিন সহিসের ঘোড়া ডলাই-মলাই। রান্নাবাড়ির পাশে সদুর তরকারির ঝুড়ি নিয়ে বসা। যদুর মা’র বাটনা বাটা। ঘরে ঘরে দিনগত পাপক্ষয়। বদরিকাবাবুর টাকঘড়ি নিয়ে ঘরে ঘরে ঘড়িতে দম দিয়ে বেড়ানো। কোথাও কোনো পরিবর্তন নেই। শুধু ছোটবাবুর ল্যাণ্ডোলেটটা আর ঘোড় জোড়া আজ প্রথম বুঝি এ-বাড়িতে রাত কাটালো। ছোটবাবুর আস্তাবল বাড়িটাকে আজ আর খালি পড়ে থাকবার অগৌরব বহন করতে হয়নি। এ-ঘটনা আজই বুঝি প্রথম! রাস্তায় বেরিয়ে ভূতনাথ এই কথাগুলোই ভাবছিল।

 

রাত হয়ে এসেছে। এত রাতে মদ কোথায় কিনতে পাওয়া যাবে কে জানে। কোথায় দোকান তাও জানা নেই। একটি মাত্র জায়গা আছে। সেখানে গেলে এখন পাওয়া যেতে পারে। জবাদের বাড়ির ঠাকুর হয় তো এখন সেখানে রাস্তার ওপর ইট পেতে মাটির ভাঁড় নিয়ে বসেছে। আর সেই গান গাইছে ‘পোড়ারমুখী কলঙ্কিনী রাই লো’—কিন্তু এত রাত্রে অত দূরেই বা সে যায় কী করে। হঠাৎ বংশীর সঙ্গে মুখোমুখি।

বংশী বললে—এত রাতে কোথায় চলেছেন শালাবাবু?

কিন্তু বৌঠান তো বংশীকেও বলতে বারণ করে দিয়েছে। বংশীর কথার উত্তরে কী বলা যায় ভেবে পেলে না ভূতনাথ। বললে—তুই কোত্থেকে বংশী?

—চিন্তার আবার জ্বর এসেছে শালাবাবু, মাস্টারবাবু নেই, গিয়েছিলাম শশী কবিরাজের কাছে—কিন্তু আপনি চললেন কোথায় আজ্ঞে?

কেমন যেন বিব্রত বোধ করলে ভূতনাথ।

বংশী বললে—কোথায় আপনি যাচ্ছেন তা আমি জানি শালাবাবু। সন্ধ্যেবেলা থেকেই আপনাকে ডাকছে ছোটমা, আমার তো সন্দেহ হলে, বলি, ছোটবাবুর শরীরটা এখনও ভালো করে সারেনি, রাতের বেলা আজকাল বাড়িতেই থাকছেন, তবু শালাবাবুকে কেন ডাকে ছোটমা।

ভূতনাথ বললে—ছোটবাবু আজকাল বাড়ি থাকছে?

শুনে কেমন যেন অবাক হয়ে গেল ভূতনাথ। এ-খবরটা তো জানা ছিল না।

বংশী বললে—ওঠবার কি সাধ্যি আছে তেমন! কোনো রকমে একবার ছোটমা’র ঘরে যান, আর নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়েন। ডাক্তার মানা করেছে যে। বলেছে, যদ্দিন না সেরে ওঠেন একেবারে ওঠা-হাঁটা বন্ধ। কী-চেহারা কী হয়েছে শালাবাবু, দেখলে আপনার কান্না পাবে মাইরি।

–মদ খাওয়া ছেড়েছেন নাকি?

–ও বিষ কি আর কেউ ছাড়তে পারে আজ্ঞে! এই আমিই দেখুন না কেন—আজকাল যখন ছোটবাবু শয্যাশায়ী থাকেন, গেলাশে ঢেলে দিই, তা একটু-আধটু জল মিশিয়ে দিই শালাবাবু, মনে হয় মানুষটাকে তো আমিই মেরে ফেলেছি। ডাক্তার পই পই করে বলেছে, ও-খেলে আর বাঁচবে না। তবে কার কথা কে শোনেসেই আগৈকার মতনই খাচ্ছেন, আর আমিই সেই বিষ নিজের হাতে ঢেলে দিচ্ছি। সকালবেলায় এক-একদিন নিজের ঘরের জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ান, বাইরে চেয়ে দেখেন একবার দিনের বেলাটায় তত নেশা থাকে না বাবুর, কিন্তু সন্ধ্যে হলেই

আন বরফ, আন বোতল—তবু ভালো যে নতুনমা’র বাড়ি যাবার ক্ষেমতা নেই, ক্ষেমতা থাকলে কি আর ছাড়তেন—ঠিক ছুটতেন। মাগী ওকে কী বশই যে করেছে–

তারপর হঠাৎ থেমে বংশী বললে—হ্যাঁ, ভালো কথা, জানেন সেদিন নতুন-মা যে বড়বাড়িতে এসেছিল–শোনেন নি?

—কবে? টের পাইনি তো কিছু?

—আপনি টের পাবেন কি করে, তখন আপনি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, রাত তখন অঢেল, নাথু সিং এসে চুপি চুপি আমায় খবরটা দিলে। বললে-বংশী, রূপোদাসীর মেয়ে চুনীবালা এসেছে। ছোটবাবুর কাছে যেতে চায়, গেট খুলবো?

আমি ভাবলাম—চুনীবালা এসেছে ছোটবাবুর কাছে, ক’দিন যেতে পারেননি বাবু, বাবু শুনলে যদি আবার অনখ বাধায়, বললাম–দাঁড়া—বলে সোজা ছোটমা’র কাছে দৌড়ে গেলাম। ছোটমা তখন পূজো সেরে সবে উঠেছে। কথাটা শুনেই রেগে একেবারে আগুন! ছোটমা’কে দেখেছেন তো ওই রকম ভালোমানুষ, কিন্তু রাগলে আবার ওই মানুষেরই চেহারা বদলে যায়। বললেন—ছোটবাবুর গাড়ির চাবুকটা নিয়ে দু’ ঘা মারতে পারবি রাক্ষুসীর পিঠে-পারবি বংশী—আর না পারিস তো ডাক নাথুসিংকেই ডাক—আমিই তাকে বলছি।

আমার কেমন ভয় হলো দেখে। ছোটমা বললে—পারবি না?

বললাম—জানতে পারলে ছোটবাবু আমার মাথাটা আর আস্ত রাখবে না ছোটমা।

–আমিও এ-বাড়ির ছোটবউ, যা বলছি কর গিয়ে—চাবুক মেরে পিঠের চামড়া তুলে রক্ত বের করে দিগে যা।

বললাম—মেয়েমানুষের গায়ে হাত তুলতে কেবল বাধে, নইলে…

–ওকে তুই মেয়েমানুষ বলিস, ডাইনি ও, তুই না পারিস নাথু সিংকে ডাক। ও যদি বড়বাড়ির মাটি ছুঁয়েছে তো তোদের সকলের চাকরি যাবে বলে দিচ্ছি—আর যদি যা বললুম করতে পারিস তো তোদের দু’ ভাই-বোনের জীবনে কখনও খাওয়া-পরার ভাবনা থাকবে না—এই বলে দিচ্ছি।

ছোটমা’র চিৎকারে তখন মেজমা, বড়মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।

মেজমা বললে—কী হলো রে ছোট?

সব শুনে মেজমা হেসেই আকুল। বললে—তুই অবাক করলি আমাদের, পুরুষমানুষের চরিত্তির তো তসর কাপড়—ওর আবার শুদ্ধ-অশুদ্ধ কি? তোর সব তাতেই বাড়াবাড়ি—আমার রাঙামাকেও দেখেছি, আর মেজকর্তাকেও দেখেছি—ওসব মনে করতে গেলে কবে গলায় দড়ি দিতুম।

বড়মা বললে—তোর সবই আদিখ্যেতা ছোটবউ।

তা বললে বিশ্বাস করবেন না শালাবাবু, সেই রাতের বেলা গেলাম। নাথু সিং নিয়ে গেল গেটের সামনে। নতুন-মা তার নতুন কেনা মোটর গাড়িতে করে এসেছে। আমাকে দেখে ডাকলে— বংশী ছোটবাবু কেমন আছে?

বললাম—একটু ভালো।

—ওষুধ খাচ্ছেন তো?

–খাচ্ছেন।

—আমাকে ভেতরে নিয়ে চল একবার—নতুন-মা বললে।

তা তখন কী আর বলবো! মিথ্যে কথাই বললুম আজ্ঞে। বললাম—বাবু যে মানা করে দিয়েছে তোমাকে আসতে দিতে মাইরি বলছি নতুন-মা, বলেছে—তোর নতুন-মা যদি আসে তো ঢুকতে দিবি নে বাড়িতে—ওর মুখ দেখতে চাইনে।

–নতুন-মা কী যেন ভাবলে কতক্ষণ। বললে-বলেছে ওই কথা?

–আজ্ঞে, আমি কি মিথ্যে মিথ্যে বলতে গিয়েছি—আমার লাভ কি বলো?

–তবে আমার সামনে বলুক ও-কথা, নিজে আমাকে ছোটকর্তা বলুক চলে যেতে নিজের কানে না শুনে আমি যাচ্ছিনে। এপথে আমি নিজে আসিনি, ছোটকর্তাই নিয়ে এসেছে আমাকে।

-কী বিপদেই যে পড়েছিলুম শালাবাবু সেদিন কী বলবো। ছিল রূপো দাসীর মেয়ে, হয়েছে রাজরাণী, সে কেন অত সহজে হাল ছাড়বে। জানবাজারের বাড়ি, চারটে দাসী, তিনটে চাকর, মোটর গাড়ি ও হাতে যেন চাঁদ পেয়ে গিয়েছে! আর কী চাই। নষ্ট মেয়েমানুষের তো কেবল ওই দিকেই নজর। ছোটবাবুর অসুখ বলে তো ওর রাতে ঘুম হচ্ছে না একেবারে!

ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—তা গেল শেষ পর্যন্ত চলে গেল চুনীবালা?

—তা কি আর আমি দেখতে গিয়েছি শালাবাবু, যাবে না তো করবে কী? আমি নাথু সিংকে গেট বন্ধ করতে বলে চলে এসেছি। তারপর আর কি হয়েছে জানি না—আমার তখন অন্য ভাবনা।

-কীসের ভাবনা?

—ভাবনা নয়? বলেন কী? ছোটবাবু যদি শোনে সব তত অনখ বাধাবে না? তখন আমার চাকরিটা ঠেকাবে কে? চিন্তার হাত ধরে আবার তো সেই দেশে গিয়ে না খেয়ে মরবে। দেশে কি জমিদারি আছে আমার যে ভাঙাবো আর খাবো। সেই যে কথায় আছে না—’তোর ভাবনা কি লো ভাবি’… আমার তো আর তা নেই শালাবাবু।

–তা বলে ছোটমা তোকে আর ছাড়বে না বংশী-এত করছিস তুই ছোটমা’র জন্যে।

বংশী বললে—কিন্তু ছোটমা’র কথা কে শুনবে শালাবাবু, ছোটকর্তাই আমল দেয় না তো শুনবে বাড়ির লোকে! এই যে এত রাতে আপনি ছোটমা’র জন্যে মদ কিনতে যাচ্ছেন-–

সাপ দেখে সরে আসার মতো ভূতনাথ এক পা পিছিয়ে এল!—তুই কী করে জানলি বংশী?

বংশী নির্বিকারভাবে সঙ্গে চলতে চলতে বললে—বলবে আবার কে শালাবাবু, এতদিন বড়বাড়িতে চাকরি করছি, সব জানতে পারি, চাকর-বাকর যদি না জানে তো জানবে পাড়ার পাঁচজনে? আমি যা জানি তা ছোটমাও জানে না, মেজমাও জানে না, ছোটকর্তা মেজকর্তা কেউ জানে না, কোন ঘরে কার রাত কাটে, কবে চুপি চুপি বড়বাড়িতে ডাক্তার আসে, দাই আসে, ওষুধ-বিষুধ, রোগ-জারি, সব টের পাই আমরা। এই তো গেল-বছরে বড়বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে সক্কালবেলা লোকের ভিড়, পুলিশ পেয়াদা, হৈ চৈ, কাক-চিল-শকুনির পাল–সবাই অবাক হয়ে দেখে কী?, একটা একদিনের মরা ছেলে—সবে জন্মেছে আজ্ঞে। সব জানি, কে ফেলেছে—কোন্ ঘর থেকে বেরিয়েছে-কিন্তু আমরা চাকর মনিষ্যি, আমাদের অত সাত-সতেরোতে থাকার কী দরকার। পুলিশ এল—জিজ্ঞাসাবাদ করলে—বললুম-কিচ্ছু জানি না বিত্তান্ত —চুকে গেল ল্যাটা।

ভূতনাথ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে—আচ্ছা, ছোটমা হঠাৎ এই বিষ কিনতে দিলে কেন জানিস বংশী।

বংশী খানিক চুপ করে রইল। তারপর বললে—মাইরি শালাবাবু, আপনি বামুন মানুষ, আপনার এই পা ছুঁয়ে বলতে পারি, ছোটমা’কে আমি ঠাকুর দেবতার মতো ভক্তি করি, ছোটমা’র দুঃখু ঘোচাতে আমি প্রাণ দিতে পারি আজ্ঞে। লোচন, মধুসূদনকাকা ওরা তো তাই হিংসে করে, বলে—আর জন্মে তুই ছোটমা’র পেটের ছেলে ছিলি। তা পেটের ছেলে তো ছোট কথা হলো হুজুর, পেটের ছেলেই কি দেখতে পারে সব মা’কে তেমন মায়ের মতন আবার মা তো হওয়া চাই। তা সেদিন সন্ধ্যেবেলা বাবু ঘরে এসেছে, আমিই ডেকে এনেছি তাকে। মা ডাকতে পাঠিয়েছিল। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনছি আজ্ঞে।

ছোটমা বলছে—তুমি আবার যাবে নাকি ওখানে?

ছোটবাবুর তখনও বিষ পেটে পড়েনি কিছু। জ্ঞান আছে বেশ। বললে-যাই যদি তো তোমার কী!

–-ছোটকর্তার তো ওই রকমই কথার ঢং।

ছোটমা বললে-নাই বা গেলেনা গেলে হয় না?

–বউ-এর আঁচল ধরে থাকি তেমন বংশে জন্ম নয় আমার ছোটবউ।

ছোটমা যেন কিছুক্ষণ ভাবলে। তারপর বললে—আঁচল ধরে থাকতে বলছি না, কিন্তু আঁচল না ধরেও তো ঘরে থাকা যায়।

–ঘরে বসে তোমার মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকবে নাকি?

—চেয়ে থাকতে ভালো না লাগে চেও না, মুখ ফিরিয়ে থেকো—আমি তোমার সেবা করবো।

ছোটবাবুর হাসির শব্দ শুনতে পেলুম আজ্ঞে। অপগেরাজ্যির হাসি। একটু পরে ছোটবাবু বললে সেবা করতে জানো তুমি ছোটবউ?

ছোটমা বললে—একবার পরখ করেই দেখোনা সেবা করতে জানি কিনা।

ছোটবাবু বললে—আমি তত তোমার যশোদাদুলাল নই, পাথরের কিংবা সোনা-রূপোর ঠাকুরদেবতাও নই—আমি মানুষ, রক্তমাংসের মানুষ—আমাকে সেবা করতে পারবে? ভেবে দেখো।

ছোটমা’র গলা শুনতে পেলুম—এতে ভাববার কিছু নেই, হিন্দু মেয়েদের স্বামীসেবা শিখতে হয় না।

ছোটবাবু আর একবার হেসে উঠলো আজ্ঞে, সেই অপগেরাজ্যির হাসি। বললে—আমি তো তেমন স্বামী নই ছোটবউ। বড়বাড়ির পুরুষমানুষের জন্মের আগে থেকে মদ খেতে শেখে, মানুষ হয় ঝি-চাকরের কোলে, আটদশ বছর বয়সে অন্দরমহলে ঢোকা বন্ধ তাদের, বয়সকালে রক্ষিতা রাখে, পাল্লা দিয়ে বাবুগিরি করে, মোসাহেব পোষে—এমন স্বামীকে সেবা করে খুশি করা তোমার কম্ম নয় ছোটবউ।

—একবার পরখ করেই দেখো না তুমি।

ছোটবাবু বললে-মিথ্যে পরখ করা ছোটবউ, মেহনতই সার হবে, ঘরের বউরা সে পারবে না, বড়বাড়ির কোনো বউই পারেনি আজ পর্যন্ত, শুধু বড়বাড়ি কেন, দত্তবাড়ি, মল্লিকবাড়ি, শীলবাড়ি, শেঠবাবুদের বাড়ির কোনো বউ চেষ্টাও করেনি পারেও নি। ওতে অনেক ল্যাঠা, সে পারে ওরা—ওই বাগানবাড়ির মেয়েমানুষেরা–ওরা কায়দা-কানুন জানে।

ছোটমা’র গলার শব্দ কেমন কঁদো কাঁদো শোনালো আজ্ঞে। বললে—এই তোমার পায়ে ধরে বলছি ওগো—দেখো, কেউ পারেনি, কিন্তু আমি পারবো-ওরা সবাই বড়লোকের ঘরের মেয়ে, আমায় গরীবের ঘর থেকে এনেছে। আমি পারবে—তুমি যা বলবে তাই করবো, যেমন করে সাজতে বলবে তেমনি করে সাজবো, যেমন করে কথা বলতে বলবে তেননি করে বলবো,, তোমার মাথা টিপে দেবো, পা টিপে দেবো।

—গান গাইতে পারবে?

ছোটমা বললে—গান তো বাবার কাছে শিখেছিলাম, সেই সব গান যদি তোমার পছন্দ হয় গাইবো।

—নাচ?

ছোটমা বললে—নাচিনি কখনও, কিন্তু শিখিয়ে নিলে তাও পারবে—তোমার জন্যে আমি সব পারি জানো।

ছোটবাবু এবার হঠাৎ বললে—আর মদ? মদ খেতে পারবে? যেমন করে চুনীবালা মদ খায়?

খানিকক্ষণ চুপচাপ। কোনো কথা শুনতে পেলাম না আজ্ঞে। ছোটমা বুঝি ভাবতে পারেনি ছোটকর্তা এমন কথা বলতে পারে। আমিও কেমন যেন বোব হয়ে গেলাম। নিজের সোয়ামী কেমন করে একথা বিয়ে-করা ইস্তিরীকে বলতে পারে আজ্ঞে! ও মদ আর বিষ তো একই জিনিষ, সেই বিষ নিজের ইস্তিরীকে কেমন করে খাওয়াতে পারে মানুষ! তা ছোটবাবু তো আজ্ঞে মানুষ নেই আর। নতুন-মা’র কাছে থেকে থেকে মানুষটার মধ্যে আর কিছু নেই হুজুর। কিন্তু ধন্যি আমার ছোটমা, মা তো নয় সাক্ষাৎ সতীলক্ষ্মী। তা মা-ও সেই কথা বললে—আমার মা’র মতন উপযুক্ত কথাই বললে।

ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে–কী বললে?

—বললে–তা খাবো, মদই খাবো, তুমি হাতে করে তুলে দিলে আমি বিষও খেতে পারি হাসিমুখে।

ছোটবাবু হেসে উঠলো। বললে—কিন্তু নিয়ম তো তা নয়, আমি তুলে দেবো না, তুমিই বরং আমার হাতে গেলাশ তুলে দেবে ছোটবউ।

—তা-ই দেবো, আমি মদ খেলে তুমি যদি ঘরে থাকো তো তা-ই করবো।

শুনতে শুনতে আমার শরীর হিম হয়ে এল শালাবাবু! শেষকালে ছোটমা বিষ গিলবে আর আমরা তাই দেখবো! মনে হলো-বড়বাড়িতে একটি মানুষ ছিল যার পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করতে বুক ভরে যায়, তা সে মানুষটাও গেল। কী যে কষ্ট হলো মনটার ভেতর! মনে হলো গিয়ে মানা করি ছোটমা’কে বলি যে খেয়ো না তুমি, ও বিষ খেলে তুমি বাঁচবে না মা—কিন্তু চাকর হয়ে জন্মেছি, ছোট মুখে বড় কথা মানায় না।

—চলে গেল ছোটবাবু। আমিও অন্ধকারে চলে আসছিলাম আজ্ঞে, কিন্তু ছোটমা ডাকলে। গেলাম।

বললে-তোর শালাবাবুকে একবার ডেকে নিয়ে আয় তো।

বললাম—এখুনি?

ছোটমা বললে হ্যাঁ এক্ষুণি, বলবি খুব জরুরী দরকার। এখনি যেন একবার আসে আমার কাছে।

তাই তো তখন আপনাকে ডেকে আনলাম—তা আমি সব জানি, আমার কাছে আপনি লুকোতে পারবেন না আজ্ঞে।

ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে কিন্তু এ জিনিষ কোথায় কিনতে পাওয়া যায় তাও আমি জানি না—কত দাম তাও জানি না। শুধু এই দশটা টাকা আমায় দিয়েছে বৌঠান।

বংশী বললে–ছোটবাবুর মদের আলমারির চাবি তো আমার কাছে, আমি জেনে ফেলবে বলেই আপনাকে কিনতে দিয়েছে ছোটমা, কিন্তু আমি হলে ও বিষ হাতে তুলে দিতে পারতাম না শালাবাবু।

ভূতনাথ বললে—তুই কি বলিস আমি টাকা ফিরিয়ে দিয়ে আসবো?

–তাই-ই দিন আজ্ঞে—সেই-ই ভালো হবে বরং।

—তবে ফিরে চল। তাই ভালো—ফিরিয়েই দিয়ে আসি টাকা–বলিগে আমি পারবো না।

বংশী বললে—কিন্তু আমার নাম করতে পারবেন না শালাবাবু, বলবেন না যেন আমি বলেছি সব কথা।

আবার সেই পথেই ফিরলো ভূতনাথ। বললেন রে বংশী, তা কখনও বলি।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *