২৪. এর পর থেকে ভূতনাথের জীবনে

এর পর থেকে ভূতনাথের জীবনে সব যেন কেমন ওলট-পালট হয়ে গিয়েছে। কোথায় ছিল ভূতনাথ আর এক ধাক্কায় কোথায় গিয়ে পড়লো। নিবারণদের দল যে কী আগুন জ্বললো দেশে! ব্ৰজরাখালও একদিন হঠাৎ এসে হাজির হলো। আর ছোটবৌঠান! কিন্তু…কিন্তু সে কথা থাক। প্রকাশ ময়রার কথাই ধরা যাক প্রথমে। সেদিন কী কুক্ষণেই যে প্রকাশের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

প্রকাশ ময়রা। সামনে আভূমি নিচু হয়ে প্রণাম করলে।–পেন্নাম হই ঠাকুর মশাই, চিনতে পারলেন আমাকে?

—আরে তুমি—কী খবর! কতদিন তোমার ওখানে জিলিপী খেতে গিয়েছি, দেখি তুমি নেই।

—জিলিপীর ব্যবসা উঠিয়ে দিলাম ঠাকুর মশাই, লাভের গুড় সব পিঁপড়েয় খেয়ে ফেলতে আজ্ঞে, ও হলো না আমার, দেনায় মাথার চুল পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যাচ্ছিলো, শেষে দুগ্যা বলে দোকান একদিন দিলাম তুলে।

–এখন করছো কী?

—কিছুদিন ঘটকালীর কারবার ধরলাম, তেমন ঘরে বরে বিয়ে দিতে পারলে দু পয়সা থাকবারই কথা, বেশ হচ্ছিলোও, মাঝে মাঝে নেমন্তন্ন-আশটা মিলতো, এই গেল ফানে চাকদা’র ঘোষাল বাড়ির ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম কলকাতায়। ও-বাড়ি দু’দিন আর বরের বাড়ি দু’দিন খাওয়া হলো, মাংস করেছিল, তিন রকম মিষ্টি, আমাদের বর্ধমানের মনোহরা আনিয়েছিল—এমনি বড়ো বড়ো মাপের, তা মাথা পিছু চারটে করে দিয়ে গেল পাতে।

ভূতনাথ আবার জিজ্ঞেস করলে–তা এখন করছো কী?

–আজ্ঞে আপনাদের আশীৰ্বাদে এদানি ননীবাবুর আপিসে একটা কাজ পেয়েছি।

–কোন্ ননীবাবু?

—ননীবাবুকে চেনেন না? নতুন আপিস খুলেছেন, তা শ’ তিন চার লোক খাটে, আরো অনেক লোক ভর্তি হবে শুনছি। তিন তিনটে কোলিয়ারি—পটলডাঙার সরকার বাড়ির জামাই যে, পাকা সাহেব মানুষ কিনা, এমন ইংরিজী বলেন ঠাকুর মশাই, বোঝে কার সাধ্যি? তা আপনি এখন আছেন কোথায়?

—সেই বড়বাড়িতেই—আর যাবো কোথায়?

প্রকাশ বললে—বিয়ে থা…?

—করিনি।

—সে কি ঠাকুরমশাই, কুলীন ব্রাহ্মণ আপনারা, সেকালে হলে গণ্ডা দশেক বিয়ে করলে আপনার আর চাকরি করে খেতে হতো না। বলেন যদি তাহাতে আমার একটা সন্ধান আছে।

–আচ্ছা, পরে একদিন দেখা করে প্রকাশ, আমার একটু তাড়াতাড়ি আছে আজ—বলে ভূতনাথ চলে এসেছিল। ছুটুকবাবুর বিয়ের দিন সেটা। সন্ধ্যেবেলা বরযাত্রী যেতে হবে।

বংশী বলেছিল—বিকেল বিকেল বাড়ি ফিরবেন আজ্ঞে, চুলটা ছেটে দাড়িটা কামিয়ে নেবেন তাড়াতাড়ি। বাড়ি সুদ্ধ, কামাবে কিনা আজকে হাতে সময় রেখে না এলে সন্ধ্যে উৎরে যাবে একেবারে।

ছোটবৌঠান ডেকে বলেছিল—জামা জুতো তোমার পছন্দ হয়েছে তো ভূতনাথ?

আজ তিন দিন থেকে নবৎ বসেছে নহবৎ খানায়। কাশীর বাজিয়ে। এক একটা রাগ ধরে আর ঝাড়া দেড় ঘণ্টা দু’ ঘণ্টা ধরে কালোয়াতি চলে তার ওপর। মীড়ে, গমকে, মূছনায় সারা বৌবাজারটা যেন মেতে ওঠে। বনমালী সরকার লেন-এ কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখে। ভেতরের উৎসবের কিছুটা আভাস পাবার চেষ্টা করে।

ব্রিজ সিং মাঝে মাঝে বন্দুকটা বাগিয়ে তাড়া করে—ভাগো, ভাগো হিঁয়াসে—রাস্তা ছোড়ো

একজন হুমড়ি খেয়ে সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে—ওই দ্যাখ—ওই দ্যাখ-উ-উ-ই—

গায়-হলুদের তত্ত্ব যাবে। রান্নবাড়ি থেকে বারকোষ, থালা, ঝুড়ি মাথায় লোক বেরোচ্ছে তত বেরোচ্ছেই। নতুন কাপড় পিরেন পেয়েছে সবাই। পুরোনো ঝি-রা পেয়েছে গরদের থান। নাথু সিং আছে সামনে। পাগড়ি লাল রং করেছে। হাতে বাঁশের লাঠি। পেতলের পাত বাঁধানো। দাসু জমাদার ছেলেমেয়ে নিয়ে নতুন কাপড় পরে দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে। ইব্রাহিমও ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছে। জাফরির ফাঁক দিয়ে বউরাও উঁকি মারছে হয় তো!

শাখ বেজে উঠলো।

বিধু সরকার আজ উড়নি চড়িয়েছে গলায়। সামনে এসে ধমক দেয়।—সব সার বেঁধে চলবি, সার যেন কেউ না ভাঙে, রাস্তার এক পাশ দিয়ে।

প্রথমে বাসন-কোসন। ঘড়া, পিলসুজ, থালা, বাটি, গাড়। চল্লিশটা লোক। তারপর মশলা-পত্তোর। পান সুপুরি লবঙ্গ এলাচ। তারপর কাপড় জামা সেমিজ। তাও জন পঞ্চাশ। তারপর মিষ্টি মিষ্টির ললাকের আর শেষ নেই! ছানার খাবারের পর ক্ষীরের খাবার, তারপর নোনতা। তারপর দই-এর হাঁড়ি। গয়নার বাক্স নিয়ে চলেছে নাথু সিং সকলের আগে আগে।

বিধু সরকারের হাতে লিস্ট। এক একজনের নাম ধাম লেখে আর ছাড়ে।এক শ’ চল্লিশ দফালোচন দাস, এক শ’ একচল্লিশ শ্যামসুন্দর ভুইয়া, এক শ’ বিয়াল্লিশন পরামাণিক—তুই কে? তোর নাম কি রে বেটা, নাম বল—কা’র লোক—বাড়ি কোথায়?

শাঁখ বাজাতে বাজাতে চললো মিছিল। ব্রিজ সিং গেট খুলে দিলে। বনমালী সরকার লেন ছাড়িয়ে মিছিল গিয়ে পড়লো বৌবাজারের মোড়ে।

বাহার হলে রাত্তির বেলা। বিরাট দোতলা বাড়ির সমান চতুর্দোলা। ছুটুকবাবু তার ওপরে বসে। নিচের রাস্তায় সার সার গাড়ি চলেছে আস্তে আস্তে। জুড়ি, চৌঘুড়ি, ছয়ঘুড়ি, আটঘুড়ি ল্যাণ্ডের সঙ্গে জোতা। চতুর্দোলার সামনে কিছুটা দূরে বাঁশের ময়ুরপঙ্খীতে খেমটার নাচ চলেছে। মেজবাবুর সঙ্গে আরো তিন চারটে গাড়িতে মোসাহেব নকলবাবুদের ভিড়। হৈ হল্লা চলেছে। দেড় মাইল দু’ মাইল লম্বা মিছিল। কত রকমের গাড়ি। ল্যাণ্ডো, ফিটন, বগি, ল্যাণ্ডোলেট, দশ ফুকরে ব্রাউনবেরি, ব্যারুষ। আর সামনে রোশনচৌকি বাজতে বাজতে চলেছে সঙ্গে—আর মাঝে মাঝে তুবড়ি ফুটছে এক-একবার—আর তারই দু’পাশে রাস্তার দু’ধার দিয়ে লম্বা হয়ে চলেছে খাস গেলাশের আলোর ঝাড়।

আশে পাশে বাড়ির জানালা দরজায় লোকজনের ভিড়। সারা কলকাতা যেন গম গম করছে।

বংশী বললে—ছুটুকবাবুকে বেশ দেখাচ্ছেনা, শালাবাবু?

মেজবাবুর ইচ্ছে ছিল বাঁধা রোশনাই-এর ব্যবস্থা করবেন। বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার দুই ধার জুড়ে একেবারে গ্যাস লাইন বসে যাবে। ছোকরাদের কাঁধে খাস-গেলাশের ঝাড় যা গেল তা তো গেলই। তার ওপর দু’পাশে বাঁধা আলোর ঝড়।

ভৈরববাবু বললেন—বাঁধা রোশনাই দেখেছিলুম কালীকেষ্ট ঠাকুরের ছেলের বিয়েতে-লাখ টাকা খরচা হয়েছিল।

এদিকে কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের বাড়ি দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ত্রীটের পশ্চিম দিকের শেষাশেষি আর ওদিকে কন্যা পক্ষের বাড়ি রামবাগানের কাছাকাছি। প্রায় আধ-ক্রোশের দূরত্ব। সমস্তটা জুড়ে বাঁধা রোশনাই।

কিন্তু খাস-গেলাশ নিয়েও বিপদ আছে বৈকি! ছেলে ছোকরাদের রাস্তা থেকে ধরে এনে তাদের দু’চারটে পয়সা দিয়ে ঝাড় বওয়াতে হয়। কিন্তু বর যখন কনের বাড়িতে ঢুকলো তখন তাদের নিয়ে মুশকিল। যে যেদিকে পারে ছিটকে পালিয়ে যায়।

ভৈরববাবু সিগারেট টানছিলো। বললে—এ আর কী খাসগেলাশ দেখছিস—আগে ছিল দু’ আনায় যোল বাতির প্যাকেট। সেটা হচ্ছে খাঁটি তিমি মাছের চর্বি—আর এ তো নকল মোম।

বংশী বললে—আমি আর যাবো না শালাবাবু, আমি এখান থেকে ফিরি—ছোটমা’র শরীরটা ভালো নয়।

—সে কী, কী হয়েছে বৌঠানের? শুনিনি তো কিছু।

—না শুনেছেন তো ও শুনে আর কাজ নেই আপনার—ও না শোনাই ভালো।

ছোটবৌঠানের শরীর খারাপের কথা কখনও আগে কানে আসেনি। তাই খবরটা যেন কেমন অস্বাভাবিক লাগলো ভূতনাথের কাছে। জিজ্ঞেস করলে—সত্যি, কী অসুখ রে বংশী?

—সে শুনে কাজ নেই আপনার–তবে যদি পারেন তো চটপট চলে আসবেন খাওয়া-দাওয়া সেরে গান-বাজনার মধ্যে যেন জমে যাবেন না আবার।

–-কেন, কিছু ভয়ের ব্যাপার আছে নাকি?

—তা ভয়ের ব্যাপার না থাকলে কি আর শুধু শুধু বলছি? কাল তো সকাল বেলা বারোটার সময় ঘুম ভেঙেছে আজ্ঞে।

—কেন, ছোটমা তো আগে খুব সকাল-সকাল উঠতে?

—আগে উঠতে—কিন্তু আজকাল অন্য রকম, কাল তেঁতুল গোলা জল খাইয়ে তবে জ্ঞান ফিরিয়েছি আজ্ঞে।

—কেন, এমন হলো কেন?

—আজ্ঞে, বলি আর কাকে, নিজে নিজের ভালো বুঝতে না শিখলে আমি কী করবো–যাক, আমার কী, আমি হুকুমের চাকর বৈ তো নয়—কে বাঁচলো, কে মরলো তা আমার দেখার কী দরকার—বলে মাঝ পথ থেকে ফিরে গেল বংশী।

ধীরে ধীরে মন্থর গতিতে চতুর্দোলা চলেছে। পাথুরেঘাটায় দত্তবাড়িতে গিয়ে একেবারে থামবে এ মিছিল। সামনের ময়ূরপঙ্খীতে খেমটা নাচ, নকলবাবুদের গাড়িতে হৈ হুল্লোড় আর দু পাশে ছেলে-ছোকরাদের কাঁধে খাস-গেলাশের ঝাড়। রোশনচৌকির তালে তালে মিছিল চলেছে। বৌবাজার স্ট্রীটের দু পাশের বাড়ির জানালা দরজায় মেয়ে পুরুষের ভিড়।

–বাঃ, বরকে বেশ মানিয়েছে দ্যাখ।

–ও মা, কী সুন্দর নাচছে দেখো।

—হ্যাঁগা, কনের বাড়ি কোথায় গা?

সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কনস্টেবল চলেছে পাহারা দিতে দিতে। আগে, পেছনে, পাশে। বাইরের কেউ যেন না ঢুকে পড়ে ভেতরে। খুব হুঁশিয়ার। কোনো ছোকরা যেন খাস-গেলাশের ঝাড় নিয়ে

পালায়।

–এই শালা, ভাগো, উধার ভাগ যাও!

মাঝে মাঝে ভৈরববাবু, মতিবাবু, তারকবাবুর উল্লাস-ধ্বনি শোনা যায়। কেয়াবাৎ বুড়ো বাঈজী—ঘুরে ফিরে–

মেজবাবুর দল বরের চতুর্দোলার পেছনেই। আজ বেশ রঙ-এ আছেন মেজবাবু। দিল-দরিয়া মেজাজ। এক-একটা তুবড়ি ফোটে আর হা-হা-হ্যাঁ করে ওঠে মোসাহেবদের দল। গাড়ির তলা থেকে বোতল বেরোয়। বনেদী রক্ত আরো গরম হয়ে ওঠে।

ছুটুকবাবুর বন্ধুরাও আছে পেছনে। কান্তিধরের গলার জোর বেশি। কোত্থেকে একটা ছোট টিনের বাক্স যোগাড় করেছে। সেইটেই ড়ুগিতবলা করে বাজায়। মাঝে মাঝে চিৎকার করে ওঠে—আহা-হা, তালে ভুল হলো যে, মেরে খোঁপার খাঁচা উড়িয়ে দেবো বেটির।

কিন্তু বিপদ বাধলো ঠনঠনের শিবু ঠাকুরের গলির ভেতর ঢুকে। আস্তে আস্তে মিছিল ঢুকছে গলির ভেতর। পাথুরেঘাটায় কনের বাড়ি যেতে হলে এ-গলি পেরোতে হবে। চতুর্দোলা বরকে নিয়ে, ঢুকে পড়েছে। মেজবাবুর গাড়িও ঢুকেছে। ছুটুকবাবুর বন্ধুদের গাড়িও ঢুকতে যাবে এমন সময় ওপাশ থেকে সমবেত গলার আওয়াজ এল—বল হরি, হরি বোল—বল হরি, হরি বো-ও-ও—সঙ্গে খোল কর্তালের হরি-সঙ্কীর্তন।

রাত্রের অন্ধকারে কিছু দেখতে না পাওয়ার কথা কিন্তু খাসগেলাশের আলোয় সমস্ত গলিটা তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দেখা গেল গলির ওপাশ থেকে আর একটা মিছিল আসছে। বিয়ের বরযাত্রীর মিছিল নয়। আনন্দ উৎসব নয়। শবযাত্রা!

কে যেন বললে-কে মরেছে গো?

—কে জানে, কোন্ শালা মরেছে, মরবার আর সময় পেলে না।

সত্যি তো! মরবার সময়-অসময় নেই! মরলেই হলো! আর ঠিক এই সময়েই তার শবযাত্রা! বর বেরিয়ে যাক, বরযাত্রীরা বেরিয়ে যাক—তবে ত!

মেজবাবু কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।—দেখে তো ভৈরব, কে? কে মরলো আবার!

ভৈরববাবু গাড়ি থেকে নামলো। সাধারণ কেউ নয় নিশ্চয়ই। নইলে এত জাঁক। পালিশ করা সেগুন কাঠের খাট। ফুলে একেবারে ছেয়ে গিয়েছে, ভরে গিয়েছে। ধামা-ধামা খই ছড়াচ্ছে। আনি দোয়ানি টাকা ছড়াচ্ছে। রোশনাই রয়েছে। লোকজন প্রচুর। পেছনে ল্যাণ্ডে গাড়ি, হাম, ব্ৰাউনবেরি, ব্যারুষ ওদের দলেও রয়েছে। সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। চিৎকার করছেবল হরি হরি বো-ও-ও-..

ভৈরববার কোঁচা হাতে নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে খবর দিলে—সর্বনাশ হয়েছে মেজকত্তা—ছেনি দত্ত মারা গিয়েছে।

সবাই শুনলে। ছেনি দত্ত! ঠনঠনের ছেনি দত্ত! মেজবাবুর পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী। এত দিনে মারা পড়লে তাহলে। মেয়েমানুষ নিয়ে খড়দ’র রামলীলার মেলায় রেষারেষি হয়েছে বছরের পর বছর। গঙ্গার বুকে নৌকোয়, পানসিতে প্রতিযোগিতা। পায়রা ওড়ানো নিয়ে সেদিন পর্যন্ত লড়াই হয়েছে, মামলা হয়েছে আদালতে। মেজবাবুর হাসিনীর ওপর বরাবরের হিংসে ছিল ছেনি দত্তর। ছোটবাবুর চুনীবালাকেও কতবার ভাঙচি দিয়ে বার করে আনবার চেষ্টা হয়েছে জানবাজারের বাড়ি থেকে। ছোটবাবুর দেখাদেখি নিজের মেয়েমানুষের গা গয়নায় মুড়ে দিয়েছে। বাড়ি করে দিয়েছে চিৎপুরে। সেই ছেনি দত্তর মৃত্যু!

মেজবাবু বোতলটা আর একবার মুখে তুললেন। তারপর বললেন–তা বলে ও সব শুনছি না, আমাদের বর আগে যাবেই।

সরু গলি। বর, বরযাত্রী গেলে আর জায়গা থাকে না। শবযাত্রা পিছিয়ে যাক। কিম্বা অন্য রাস্তা ঘুরে যাক। অন্য রাস্তা খোল পড়ে আছে। নিমতলায় যাবার রাস্তার অভাব নেই।

মেজবাবু আবার বললেন—বলে দাও ওদের ভৈরব—বর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে?

ভৈরববাবু গেল।

কিন্তু ওরাও নাছোড়বান্দা। ছেনি দত্ত ছিল ঠনঠনের রাজা। মরে গিয়েছে বলে রাজত্বও চলে গিয়েছে নাকি? ছেলেরা নেই নাকি? জ্বল জ্বল করছে বংশ। নাতি, নাতনী, আত্মীয়, কুটুম, স্বজন, বন্ধুবান্ধব, মোসাহেব, চাকর, দারোয়ান সবই আছে।

ওপাশে ছেনি দত্তর বড় ছেলে—নটে দত্তরও তখন মেজাজ গরম। সে-ও ফুর্তি করতে জানে। বাপের মৃত্যুতে সে কি কম শোক পেয়েছে নাকি! শোক তোলবার জন্যে সে-ও বিকেল থেকে অনেক গেলাশ খালি করে ফেলেছে। বললে—কুছ পরোয়া নেই–-আগে আমরা যাবো, ওরা ওদের বরকে পিছে হটিয়ে নিক, পাথুরেঘাটায় যাবার বহুৎ রাস্তা পড়ে আছে।

লাগলো ঝগড়া। মুখোমুখি দুই দল থমকে দাঁড়িয়ে, কেউ নড়বে না।

এরা বলে—ওরা নড়ুক।

ওরা বলে—ওরা নড়ুক।

মেজবাবু এবার গরম হয়ে উঠলেন। ছেনি দত্ত মরেও জ্বালাতে এসেছে! বললেন—ভৈরব, ব্রিজ সিংকে ডাকো তো একবার।

ব্রিজ সিং আজ রেশমী মুরেঠা পরেছে। সাদা লম্বা প্যান্ট। গায়ে গলাবন্ধ কোট আর বুকে গুলী ভরা চামড়ার বেল্ট, হাতে বন্দুক। কাছেই ছিল দাঁড়িয়ে। ভৈরববাবুর ডাকে গোঁফে চাড়া দিয়ে এসে হাজির হলো।

সেলাম করে বললে–হুজুর—

মেজবাবু বললেন—ফায়ার করো।

করুক ফায়ার। ভৈরববাবু, মতিবাবু, তারকবাবু সবাই মনে মনে খুশি। করুক ফায়ার। বোঝা যাক কে কত বড় বাবু।

ফায়ার করলে ব্রিজ সিং। কিন্তু আকাশের দিকে মুখ করে।

সমস্ত শিবু ঠাকুরের গলি কাঁপিয়ে সে-শব্দ আকাশে গিয়ে ফাটলো।

আর একবার। আবার আর একবার–

হৈ হৈ করে ততক্ষণে পুলিশ কনস্টেবল দৌড়ে এসেছে মেজবাবুর কাছে। ইন্সপেক্টর সাহেবও দৌড়ে এসেছে।

—হোয়াটস্ আপ, কী হলো? দারোগা সাহেব মেজবাবুর সঙ্গে কী কথা বললে যেন কানে কানে।

রোশনচৌকির দল ততক্ষণে বাজনা থামিয়ে দিয়েছে হতবুদ্ধি হয়ে। খাস-গেলাশের ছেলেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে লাইন ভেঙে পালাচ্ছে। হৈ হৈ হট্টগোল চারদিকে। আশে পাশের বাড়ির জানালা খুলে যারা এতক্ষণ বর দেখছিল তারা দমাদম দরজা বন্ধ করে দিলে। বড়লোকের ব্যাপার। দরকার কী হ্যাঙ্গামে!

ইতিমধ্যে পুলিশ আর দারোগার দল কি কল টিপে এল কে জানে। দেখা গেল শবযাত্রা পিছু হটছে। পিছু হটতে হটতে একেবারে শিবু ঠাকুরের গলির মুখে গিয়ে এক পাশে এসে দাঁড়ালো। নটে দত্ত দাতে দাত ঘষছে তখন। পুলিশ দারোগা পাশে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। মেজবাবুর গাড়ি সপারিষদবরের চতুর্দোলার পেছন পেছন মন্থর গতিতে এগিয়ে চললো। ভূতনাথ এতক্ষণ চুপ চাপ দেখছিল। কেমন যেন অবাক হচ্ছিলো দেখে। এত বড় একটা সমস্যার এমন নির্বিরোধ সমাধান হলো দেখে অবাক হবারই কথা। বড়বাড়ির এই জয়যাত্রা। সেদিন হয় তো নির্বিঘ্নেই গন্তব্য স্থানে পৌঁছুতে পেরেছিল—কিন্তু ইতিহাসের অদৃশ্য ইঙ্গিত এড়াতে পারে নি কেন শেষ পর্যন্ত। সেদিনও তো বন্দুকের ফায়ার করা চলত। দারোগা পুলিশকে ঘুষ দেওয়া চলতো। কিন্তু বদরিকাবাবু জানতে–সেখানে ইতিহাস বড় নির্মম। দারোগাকে ঘুষ দিয়ে তার গতি ফেরানো যায় না।

ছোটবৌঠান পুরোনো সিন্দুকের ডালা খুলে একদিন বলেছিল—এ যা কিছু দেখছে ভূতনাথ, সব আমার—এই হীরের কঙ্কন, মোতির চূড়, পান্নার কান আর মিছরিদানা চুড়ি, সব স-অ-অ-ব-

ভূতনাথ সিন্দুকের ভেতর মাথা নিচু করে দেখেছিল—ফাঁকা সিন্দুক। একটা কণাও আর বাকি নেই কোথাও। সিন্দুকের প্রত্যেকটি কোণ নিঃস্ব। হা হা করছে অন্ধকার প্রেতগর্ভ খালি সিন্দুকটা। কিন্তু তবু ছোটবৌঠানের অপ্রকৃতিস্থ দৃষ্টির সামনে কিছু বলতে সাহস পায়নি সেদিন।

ছোটবৌঠান তখন টলছে। গায়ের শাড়িটা খুলে খুলে পড়ে যাবার উপক্রম করছে বার বার। সমস্ত শরীর আঙুরের থোলোর মতো টলমল করে ছোটবৌঠানের। আবার বললে ছোটবৌঠানএই সব দিতে পারি, কিন্তু তুই আমাকে কী দিবি বল?

ভূতনাথ বলেছিল—কী চাও তুমি ছোটবৌঠান—আমি তো গরীব মানুষ।

—তোকে আমি বড়লোক করে দেবো ভূতনাথ, ভয় কী? এই বাড়ি, বড়বাড়ির সব সম্পত্তি দিয়ে যাবো, তুই আরাম করে থাকবি এখানে—পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে।

কী জানি ভূতনাথের কেমন যেন ভয় হয়েছিল সে-কথা শুনে। ছোটবৌঠান কী বলছে তা সে নিজেই জানে না। ছোটকর্তা যে এখনও বেঁচে! এ বলে কী ছোটবৌঠান!

ভয়ে ভয়ে ভূতনাথ বলেছিল—আমি কিছু নিতে চাই না বৌঠান। আমি কিছুই চাইনে।

ছোটবৌঠান নেশার ঘোরে হাউ হাউ করে কেঁদে ভাসিয়েছিল সেদিন। বলেছিল—তুই বেইমান, মস্ত বড় বেইমান, বেইমান তুই ভূতনাথ।

পাশের ঘরেই ছোটকর্তা অসুখে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। হয় তো কান্না শুনতে পাবে ছোটবৌঠানের। ছোটবৌঠানের মুখে হাত চাপা দিয়েছিল ভূতনাথ। বলেছিল

কিন্তু সে-সব কথা এখন থাক!

 

পাথুরেঘাটার দত্ত বাড়িতে তখন বরের চতুর্দোলা পৌঁছে গিয়েছে। এক শ’ শাখ বেজে উঠেছে একসঙ্গে। অন্দরমহল থেকে হুলুধ্বনি কানে এল। কন্যাকর্তা সামনে এগিয়ে এসে ছুটুকবাবুকে কোলে করে আসরে নিয়ে গেলেন। বিরাট পূজোবাড়ি জুড়ে বরের আসর বসেছে। গোলাপ জল ছড়িয়ে দিয়ে গেল সকলের গায়ে। গোড়ের মালা দিলে সকলের হাতে হাতে।

মেজকর্তা গিয়ে বসেছেন একেবারে আসরের মধ্যেখানে। আসর আলো হয়ে গিয়েছে।

ছুটুকবাবুর শ্বশুর ব্যবসাদার লোক। স্টাণ্ড রোডে আটার কল বসিয়েছেন। ঢালাই লোহার ব্যবসাও আছে। কিন্তু তারও গায়ে গিলেকরা মলমলের দামী পাঞ্জাবী। সামনে এগিয়ে এলেন হাসিমুখে। বললেন—ছোটকর্তাকে দেখছিনেকই?

-না, তার শরীরটা খারাপ হয়েছে আজ, আসতে পারলে না আর।

—বিশেষ কিছু ভয়ের ব্যাপার নাকি?

-না, শরীরটা তার প্রায়ই খারাপ হয়—আসবার ইচ্ছে ছিলো খুব।

আরো দু’একটা কথা হলো।

—এই আমার বড়জামাই, পটলডাঙার সরকার এরা।

—এই আমার…এঁকে তো দেখেছেন।

—আর, এই হলো—

চারিদিকে ঝাড় লণ্ঠন। আলো জ্বলছে। ইলেটি ক আলো এ-বাড়িতেও হয়েছে। তবু বাহার হিসেবে ঝুলছে টানা পাখাগুলো। এখনো খোলা হয়নি। বড় বড় আয়না চারদিকের দেয়ালে টাঙানো, মানুষ সমান উঁচু। দেয়ালে পঙ্খের ছবি আঁকা। ফুল লতা পাতা। সবুজের ওপর কালো নীল হলদে রং-এর কাজ। ভূতনাথ একপাশে আড়ষ্ট হয়ে সব দেখছিল। এখানে তার যে কী পরিচয় দেবার আছে! কী পরিচয়ে এখানে এসেছে সে। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতেই মুশকিলে পড়ে যেতে হবে।

হঠাৎ বাইরে সোরগোল উঠলো।

সঙ্গে সঙ্গে মোটরের শব্দ। কোনো সম্মানিত অতিথি যেন এসে গিয়েছে। কয়েকজন মোটর দেখতে ছুটলো। মোটরগাড়িটা একেবারে সামনের ঘেরা জায়গাটার ভেতর ঢুকে পড়েছে বুঝি। কয়েকটা ঘোড়া ভয় পেয়ে শব্দ করে উঠলো। গোঁ গোঁ আওয়াজ চলছে মোটরের। তারপর একটা বিকট শব্দ করে যন্ত্রটা থেমে গেল একেবারে।

হাবুল দত্ত দু’পুরুষের বড়লোক। কিছুদিন আগেও খাটো ধুতি পরেছেন ওঁর বাবা। যখন কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট তৈরি হয়, সেই সময়ে লটারিতে বহু টাকা হাতে এসে যায় তার। সেই টাকা খাটিয়ে বড়বাজারের লোহাপটিতে দোকান করেছিলেন। সঙ্গে ছিল আর একজন কর্মকারের ছেলে। বুদ্ধি তারই। টাকাটা হাবুল দত্তর বাবার। তারপর কোথায় গেল কামারের ছেলে, আর কোথায় গেল তার শেয়ার। পুরো মুনাফাটা এসে গেল দত্তবাড়ির কবলে। কী একটা বড় রকমের ঠিকেদারিতে বেশ লাভ হতে লাগলো কয়েক বছর ধরে। তখন কিনলেন আটার কল। কল দেখতে সে কী ভিড় রাস্তায়। চাকাটা বন বন করে ঘোরে আর একটা নল দিয়ে পেষা আটা বেরিয়ে আসে। আটা না পিষে চালও পিষতে পারে। ছাতু তৈরি করতে পারো। তারপর এই পাথুরেঘাটার বাড়ি দেখছেন। মেয়েদের বড় বড় ঘরে বিয়ে। লক্ষ্মীর বরপুত্র হয়ে মারা গেলেন তিনি। তখন সমস্ত সম্পত্তি হাতে এল নাবালক হাবুল দত্তর।

ভূতনাথ হাঁ করে দেখছিল—হাবুল দত্তর দিকে। ছুটুকবাবুর শ্বশুর। উঠতি বড়মানুষ। নতুন উঠছে এখন। বড়বাড়িতে মেয়ে দিতে পেরেছে এটা ওঁরই গর্ব। আজ ওঁর আত্মীয়স্বজনের অভাব নেই। হাবুল দত্তকে কোনো দিকে দেখতে হচ্ছে না। সবাই রয়েছে। এবার একটা নতুন পাটকল করবার ইচ্ছে আছে। আর কয়লার খনি। ব্যবসা-বাণিজ্য কল-কারবার যে-রকম বাড়ছে চারদিকে, তাতে কয়লার চাহিদা বেড়ে যাবে ক্রমেই। এই দেখুন না, রাণীগঞ্জে গিয়েছিলাম—এখনও অনেক খনি পড়ে রয়েছে। নিতে পারলে টাকা রাখবার জায়গা থাকবে না। আর শুধু তো জমিদারিতে চলছে না কারো। অজন্মা হলো গ্রামে তো প্রজারা দিলে না খাজনা। তা বলে তো আর রাজস্ব বন্ধ থাকবে না। রাত কাবার না হতে হতে কালেক্টরিতে খাজনা জমা করে আসতে হবে। প্রজা ঠেঙিয়ে আর কতকাল আয় হবে বলুন। তারপর বেহ্মরা যে-কাণ্ড করছে, সব প্রজারা লেখাপড়া শিখতে লেগে গিয়েছে দেশে। মেয়েরা পর্যন্ত লেখাপড়া শিখছে মশাই। শেষে এমন দিন আসবে যখন ছোটলোক প্রজা-পাঠক আর মানতেই চাইবে না জমিদারদের। তখন? তখন গাড়ি-ঘোড়া, পাল্কি, বেয়ারা, বাবুয়ানি চলবে কী করে!

হাবুল দত্ত গল্প জমাতে পারে বেশ। বললেন—ছোটবেলায় আপনারাও দেখেছেন, আমিও দেখেছি, চিৎপুর রোডের ওপরেই যে ঠিকে গাড়ির আড্ডা ছিল, ওইখানে থাকতো বটুবাবু। সারাদিন ভোর থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত বটুবাবু বসে থাকতো। একটা বেঞ্চির ওপর। একটা হাত-গড়গড়া ছিল, তাইতে তামাক পুড়ছে। দিনরাত খ্যাচ খ্যাচ করতে গাড়োয়ানদের সঙ্গে। ঘোড়ার দানা কম দিয়েছে, কি ভালো ডলাই-মলাই হয়নি দেখতাম সারাদিন ওই একভাবে বসে। বাঙালীর ছেলে অমন কেউ পারবে মশাই, ও হিন্দুস্থানী বলেই তো পারতো।

ভৈরববাবু বললে—বাঙালীদের কেবল বাবুয়ানিই সার।

হাবুল দত্ত বললেন—তবে শুনুন, আমার আপিসে একজন বাঙালী ছোকরাকে রেখেছিলাম—দশ টাকা মাইনে দিতাম, একদিন দেখি ফুলদার রেশমী মোজা পায়ে আর ডসনের বাড়ির বার্নিশ করা জুতো পরে আপিসে এসেছে। এদিকে নানা রকম ফুর্তি টুর্তি করে শরীরটাকে তো অকেজো করেই রেখেছিল। একদিন বলা নেই কওয়া নেই ফট্‌ করে মরে গেল—আর দেখুন তো মাড়োয়ারীদের—ওরা লক্ষ টাকা আয় না হলে এখনও মশারি কেনে না মশাই।

মেজবাবু এতক্ষণ গম্ভীর হয়ে শুনছিলেন। এবার কথা বললেন। বললেন—কিন্তু ওরা বড় চশমখোর, কী বলেন।

–তা যদি বলেন তবে আমিও একটা গল্প বলি—শুনুন—হাবুল দত্ত পায়ের ওপর পা দিয়ে বসলেন।

—সেদিন নতুন যে হ্যারিসন রোড হয়েছে না, ওইখান দিয়ে যাচ্ছি, টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, হঠাৎ একটা মাড়োয়ারীর ছেলে দেখি আমার সামনে এসে বলছে—এক পয়সায় দুটো দেশলাই, কিনবেন বাবু?

আমি তো চমকে উঠলাম। গুলজারীলাল আমাদের পুরোনো বন্ধু। বড়বাজারের অতবড় লোহা মার্চেন্ট, তার ছেলে কিনা রাস্তায় দেশলাই বেচছে।

গুলজারীলালকে ধরলাম সেদিন দর্মাহাটায়। বললাম—তোমার ছেলে কিনা শেষে দেশলাই বেচছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে!

গুলজারীলাল বললে—ওটা যে আমাদের নিয়ম ভাই। পাঁচ বছর বয়েস থেকে কিছু না কিছু আয় করতে হবে-দিনে অন্তত তিন আনা।

আমি তো শুনে অবাক! তিন আনা পয়সা আয় করলে তবে নাকি সেদিন পুরো খোরাকি পাবে, আদ্দেক আনলে আধ-খোরাকি, আর কিছুই না আনতে পারলে উপোস—তা দেখবেন এই কলকাতাই একদিন মাড়োয়ারীতে ভরে যাবে মশাই। হ্যারিসন রোডে যতগুলো বাড়ি হলে সব তো মাড়োয়ারীদের।

হঠাৎ গল্পে বাধা পড়লো। কে যেন একজন শশব্যস্তে এসে বললে–ননীবাবু এসেছেন কর্তাবাবু!

—ননীবাবু? কোথায়? বলে হাবুল দত্ত ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়লেন।

হাবুল দত্ত উঠে যেতেই ভৈরববাবু বললেন—না স্যার, বেয়াই মশাই লোহার ব্যবসা করে করে একেবারে মাড়োয়ারী হয়ে উঠেছে দেখছি—রস কষ নাস্তি।

মেজবাবু পান চিবুচ্ছিলেন। বললেন—যা বলেছো—টাকাটা চিনেছে খুব।

মতিবাবু বললে—তা আপনার সঙ্গে হাবুল দত্তর সম্পর্কটা কিসের স্যার। আপনি মেয়ে নিয়ে গিয়ে খালাস। আপনি তো আর ছেলে বেচতে আসেন নি এ-বাড়িতে?

কিন্তু ভূতনাথ তখন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছে। ননীবাবু এসেছে। কোন্ ননীবাবু! ডাক্তারবাবুর ছেলে ননীলাল! তাকেই এত খাতির! কয়েকজন কর্তাব্যক্তি উঠে গেলেন বাইরে। ভূতনাথ একবার বাইরে এসে দাঁড়ালো সবার অলক্ষ্যে। লোক গিস গিস করছে। সামনে খোলা জায়গাটায় ঘোড়ার গাড়ির ভিড়। মাঝখানে একটিমাত্র মোটর। বিয়েবাড়ির রোশনাই লেগে সমস্ত মোটরটা চক চক করছে। গোল গোল চারটে চাকা। মাথার ওপর ছাদের মতন করে মোটা চটের কাপড়ে ঢাকা। কয়েকজন তাই-ই হাঁ করে দেখছে।

বেশ জ্বল জ্বল করছে চেহারাটা। জানবাজারের চুনীবালাকেও এমনি গাড়ি কিনে দিয়েছে ছোটবাবু। এখন তো এমনি চুপচাপ। একটু কল চালালেই ভোঁ ভোঁ শব্দ করে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে চলবে। পেছন দিয়ে ধোঁয়া বেরোবে।

—এই, হাত দিবিনি কেউ।

–গাড়ির কাছে কে যায়?

চারদিকে ছুটোছুটি। লাল বনাতের কাপড়ের ওপর দিয়ে বরযাত্রীরা এসেছে—সেটা ধুলোয় ধুলো হয়ে উঠেছে। ফুলের মালার টুকরো-টাকরা ছড়িয়ে আছে সারা জায়গাটায়। ফুলের গন্ধ! রান্নার গন্ধ! চারদিকে যেন নানা রকম গন্ধের উৎসব। বড়বাড়ির লোকজন ঝেটিয়ে এসেছে এখানে।

লোচন যাচ্ছিলো পাশ দিয়ে। ভূতনাথ ডাকলে—কী, লোচন নাকি? চলেছে কোথায়?

লোচন থেমে গেল। বললে—এই যে শালাবাবু, দেখি কুটুম বাড়ির তামাক-বিড়ির ব্যবস্থাটা কেমন, পরশু তত আবার বড়বাড়িতে আমাকেই সব করতে হবে কিনা।

ভূতনাথ বললে-বদরিকাবাবুকে দেখেছো নাকি লোচন? এসেছেন তিনি?

–না আজ্ঞে, তিনি তো এলেন না, বললাম অতো করে। তিনি পাগল-ছাগল মানুষ, বললেন—আমি চলে গেলে ঘড়ি মেলাবে কে? তা ইদিকে দেখেছেন—ব্যবস্থার কোনো ছিরিছাঁদ নেই, ফুলের মালা, আতরপানি, সবই তো করেছে কিন্তু আসল জিনিষই বাদ দিয়েছে।

—আসল জিনিষ কী?

—আজ্ঞে, লক্ষ্য করছেন না, মেজবাবুর মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠেছে!

–কেন?

-আমি তো সেই জন্যেই ঘুরঘুর করছি, সন্ধ্যে থেকে এতখানি হুজুৎ গেল, তার ওপর রাস্তায় ছেনি দত্তর বাড়ির কাছে যে কাটা হয়ে গেল, এর পর মেজবাবুর কি মেজাজ ঠিক থাকে? গাড়িতে সঙ্গে যা ছিল, সব তত ভৈবববাবু, মতিবাবু, তারকবাবু ওঁয়ারা শেষ করে দিয়েছে। আমি তো তাই তখন থেকে ভাবছি এ কী রকম বড়লোক, তামাকের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেনি!

সত্যিই তো! ভূতনাথের এতক্ষণে খেয়াল হলো। মেজবাবু যেন অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে মুখ বুজে রয়েছেন। বিয়ে সেই রাত বারোটার পর। সুতহিবুক লগ্ন। ততক্ষণ মেজবাবুর মতো বরকর্তা কি উপোস করে থাকবেন নাকি! লোচনের কিন্তু সব দিকে নজর আছে। মেজবাবু চিৎকার করে ডাকলেন—লোচন

-–ওই ডাকছেন, আসি হুজুর—বলে এক ঝটকায় লোচন ঘরে ঢুকে গেল।

ওপাশে পূজোবাড়ির দরদালানের ওপর ছুটুকবাবুকে বসিয়েছে। মোটা-সোটা শরীর। দূর থেকে বোঝা যায়, বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেজে-গুজে বেশ সুন্দর মানিয়েছে বরকে। মাথার রঙিন পালক লাগানো রেশমী পাগড়িটা এখন নামিয়ে রেখেছে। কিন্তু সাটিনের চুমকি-বসানো পাঞ্জাবীর ওপর হীরের লকেট বসানো হারটা ঝকমক করছে। দু’হাতে তাগা, আর কানে মুক্তোর কান—মনে হয় যেন ঠিক সোনার কার্তিকটি। পাশে কান্তিধর, পরেশ, সবাই রয়েছে। লাল মখমলের তাকিয়ায় মাঝে মাঝে হেলান দিচ্ছে। ছুটুকবাবুর তো নেশাটা-আশটার দরকার হবে। রাত বারোটা পর্যন্ত থাকবে কী করে!

ভূতনাথ এবার বারান্দা পেরিয়ে নেমে রাস্তার সামনে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ যেন মনে হলো চেনা মুখ একজন লোক তার দিকে চেয়ে আছে। খানিক চেয়ে থাকতেই লোকটা সামনে এগিয়ে এল। এ কি! বৃন্দাবন না! চুনীদাসীর চাকর!

বৃন্দাবন সামনে এসে দাত বার করে হাসতে লাগলো।

ভূতনাথ বললে—তুমি এখানে?

বৃন্দাবনের আর সে চেহারা নেই। এই রাত্রের অন্ধকারেও যেন কামিজের ফাঁক দিয়ে গলার কণ্ঠা দেখা যায়। পানের ছোপ লাগা দাঁতগুলো মিশিমিশে কালো। শেষ ফোকা বিড়িটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলে বৃন্দাবন।

ভূতনাথ আবার জিজ্ঞেস করলে—এত রাতে এখানে কী করতে?

—আপনার কাছেই এইছিলাম।

—আমার কাছে? ভূতনাথ আরো অবাক হয়ে গেল।–আমার কাছে কী করতে?

বৃন্দাবন খানিক ইতস্তত করলো যেন। বললে—একটু কথা ছিল, আসুন না, একটু নিরিবিলিতে আসুন—বলছি।

আর একটু নিরিবিলিতে এসে দাঁড়াতে হলো। হৈ চৈ হট্টগোল যা কিছু সব পাশে ফেলে এসে দাঁড়ালো গলিটার কোণে। এটো কলাপাতার পাহাড় জমেছে রাস্তার কোণে। ঝুড়ি ভরতি এনে ফেলছে ওখানে। কয়েকটা কুকুর খাওয়া-খাওয়ি লাগিয়েছে তাই নিয়ে। খাসগেলাশের নেভানো ঝাড়গুলো কাত করে রেখেছে দেয়ালের গায়ে। নকল মোম পোড়ার গন্ধও আসছে নাকে।

বৃন্দাবন বললে—এখানে নয় আজ্ঞে, ওই দিকটায় চলুন—আর একটু নিরিবিলি চাই।

ভূতনাথ আরো নিরিবিলিতে সরে চললো। এখানটায় একটা পুরোনো ভোবা বোজানো হচ্ছে। গাড়ি গাড়ি আবর্জনা বুঝি দিনের বেলা ফেলা হয় এখানে। সবটা বুঝি বোজানো হয়নি এখনো। আবর্জনাতে বুঝি আগুন লাগানো হয়েছে। ওদিকটা দুর্গন্ধময় ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে।

বৃন্দাবন বললে—আপনাদের বড়বাড়ি গিয়েছিলাম এখন।

–কেন?

–দরকার ছিল যে আপনার সঙ্গে গিয়ে দেখলাম সবাই এবাড়িতে, তাই হাঁটতে হাঁটতে আবার এলাম এখেনে, পা দুটো একেবারে টন টন করছে—বংশী কোথায়?

ভূতনাথ বললে-বংশী তো আসেনি।

—আসেনি তত ভালোই হয়েছে—ও বেটা ভারী বজ্জাৎ। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলছি জানতে পারলে মুণ্ডু খেয়ে ফেলবে আমার।

—কিন্তু বংশীর ওপর তোমার অত রাগ কেন বৃন্দাবন?

—আজ্ঞে, বংশীই তো যতো নষ্টের গোড়া, ছোটবাবুকে ফুসলে নিয়ে গেল কে শুনি? সেই যে কথা আছে না, ‘মাছ খায় না যতনে, পাতে তিনটে খোলসে’-ও হলে তাই শালাবাবু, ওকে আপনি চিনবেন না সহজে, ওর মতলব যে আলাদা, নইলে ছোটবউরাণীকে মদ ধরায় ও

—এ সব তোমায় কে বললে বৃন্দাবন?

–শুনতে পাই আজ্ঞে সব, নতুন-মা ও-বাড়িতে যে অতদিন ছিল, সবাইকে জানে যে—ওই বাড়িতে কাজ করে মধুসূদন বড়লোক হয়ে গেল, বালেশ্বরে জমি-জিরেত কিনেছে, লোচন তামাক সাজে টিপে টিপে, কিন্তু তলে তলে ওদিকে ঠিকে নিয়েছে ঠেলাগাড়ির, দর্মাহাটায় গেলেই দেখতে পাবেন–আর ওই যে আপনাদের বিধু সরকার—বিধু সরকারকে দেখেছেন নিশ্চয়ই

ভূতনাথ ঘাড় নাড়লো।

—ওই বিধু সরকার, আপনাকে আজ বলে রাখি, বাবুদের জমিদারী দেখবার তত সময় নেই, কত বিঘে জমিতে কত ধান হয়, তারও হিসেব রাখেন না, রাখবার সময় কখন, কিন্তু নায়েবের সঙ্গে যোগসাজস করে কী সব্বনাশ যে করছে তা একদিন না একদিন টের পাবেন—নইলে সুখচরের যে-জমিতে সোনা ফলতত সেই জমিতে এখন তিন মণ ধানও হয় না। প্রেজা বিলির যখন সময় হয়, তখন সেলামী যা আসে তার কি আদ্দেকও ওঠে বাবুদের খাজাঞ্চীখানায়?

ভূতনাথ যেন কেমন অবাক হলো। বললে-এতো কথা তত তোমার জানবার কথা নয় বৃন্দাবন–তুমি সব জানলে কী করে?

বৃন্দাবন চুপ করে রইল। তারপর খানিক পরে বললে—জানে সবাই শালাবাবু, ওই বংশী, লোচন, মধুসূদন, ইব্রাহিম, যদুর মা, সৌদামিনী, বিধু সরকার, এমন কি বিরিজ সিং পর্যন্ত সবাই জানে। জানেন না কেবল বাবুরা আর বিবির আর জানেন না আপনি পারা কখনও চাপা থাকে আজ্ঞে?

ভূতনাথ বললে-কিন্তু তোমার নতুন-মা?

—আমার নতুন-মা’র কথা বলছেন?

–হ্যাঁ, চুনী দাসী! ছিলো তো ঝিয়ের মেয়ে—সেই বা কী ভালো করছে শুনি ছোটবাবুর? ছোটবাবুর ওই তো শরীর, ওঁকে মদ খাইয়ে, টাকা দুয়ে নিয়ে কী সাশ্ৰয়টা হচ্ছে শুনি?

–তবে বলি শুনুন,—বৃন্দাবন আবার চারদিকে চেয়ে দেখে নিলে ভালো করে। বললে-নতুন-মা’র আমি পেটের ছেলেও নই সাতপুরুষের জ্ঞাতি-কুটুমও নই যে তার কোলে ঝোল টানবে, কিন্তু একথাও বলি, দশটাও নয় বিশটাও নয়, ছোটবাবুর ওই একটি তো মেয়েমানুষ, মেয়েমানুষ না হলে বাবুদের চলবেও না, কিন্তু আপনাদের শুধু-শুধু নতুন-মা’র ওপরে জ্বালা কেন বলুন তো? আর মেজবাবুর ক’টা মেয়েমানুষ গুণে দেখুন তো—পায়রার পেছনে, মোসায়েবের পেছনে তিনি কত টাকা উড়োচ্ছেন—আর ছোটবাবু তো কোথাও যান না, শুধু আসেন নতুন-মা’র কাছে, আর মদ খান–কিন্তু নতুন-মাকে মদ খাওয়াতে কে শেখালে শুনি? এখন যদি ছোটবাবু ছেড়ে দেন নতুন-মাকে, নতুন-মা’র এখন বয়স হয়েছে, এ-বয়েসে আবার কার কাছে গিয়ে হাত পাতেন বলুন তো-নতুন গাড়িটা পর্যন্ত বেচে দিতে হলো সেদিন—চলে কী করে? এক মণ চাল তা-ই কিনতে লাগে তিন টাকা—দশ আনা সের ঘি, পাঁচ আনা সরষের তেল—আর আমরা এতগুলো লোক বাড়িতে দু’বেলা খেতে

ভূতনাথের কেমন যেন রাগ হলো। বললে—কিন্তু মদ সোড আর বরফের খরচ তো ঠিক জুটছে।

বৃন্দাবন বললে—সে জুটছে কি না-জুটছে আমি আর পাপ মুখে তা বলতে চাইনে।

ভূতনাথ বললে—তা ছাড়া ছোটবৌঠান তার বিয়ে-করা বউ, তার কথা তোমার নতুন-মা একবার ভেবে দেখে না। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তার কেমন করে কাটে, ছেলে নেই, স্বামী থেকেও নেই, মেয়েমানুষ হয়ে মেয়েমানুষের এতবড় দুঃখ বুঝতে পারে না। ভাববা: তো একবার নিজের মা-বোনের কথা?

বৃন্দাবন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। খানিকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলে না। তারপর বললে—আপনি এতবড় কথা বললেন?

কাঁদো কাঁদো হয়ে এল বৃন্দাবনের মুখ। ছল ছল করে এল বৃন্দাবনের চোখ। সেই পাথুরেঘাটার গলির ভেতর অন্ধকারেও ভূতনাথ দেখলে—বৃন্দাবন যেন হঠাৎ বড় ঘা খেয়েছে। হঠাৎ যেন বোমা ফাটার মতো বৃন্দাবন বললে–ওই চুনী দাসী আমার কে হয় জানেন?

—কে?

তারপর এক নিমেষে যেন নিজেকে সামলে নিয়ে বৃন্দাবন বললে —না থাক, দরকার নেই–তার চেয়ে আমি যে-কথা বলতে এসেছি তাই বলি।

ভূতনাথ বাধা দিয়ে বললে—চুনী দাসী তত শুনেছি রূপোদাসীর মেয়ে-রূপোদাসী তোমার কে?

বৃন্দাবন মাথা নাড়তে লাগলো-না, না-না।

-কেন, বলতে বাধা কী?

—না শালাবাবু, যে-কথা কেউ জানে না এক আমি আর চুনী দাসী ছাড়া, সে কথা বলতে পারবো না আমি-বরং যে-কথা বলতে এসেছি, সেটা বলে নিই। পেটের দায়ে সবই করি, কিন্তু লজ্জা, সরম, আমাদেরও আছে শালাবাবু, নতুনমা’র চাকর বলে সবাই জানে আমাকে, তাই জানুক। দেশে থাকলে আমাদের দু’বেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, এমন আকালের দেশ, কিন্তু দেশে-গাঁয়ে সমাজ আছে, পঞ্চায়েৎ আছে—এ সব জানলে ‘এক ঘরে’ করবে যে।

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ভূতনাথ বললে—তা আমাকে কী করতে হবে বলে?

-আপনি সব পারেন শালাবাবু!

—আমি? যেন বিদ্রূপের মতো শোনালো কথাটা।

বৃন্দাবন বললে—আমি বংশীর কাছে গিয়েছিলাম, তা বংশী আমাকে তেড়ে মারতে এল। মধুসূদনের মুখে শুনলাম ছোটবৌঠানকে মদ ধরিয়েছে বংশী, ভালোই করেছে, তার উপযুক্ত কাজই করেছে। সেদিন নাকি সাত ঘণ্টা অজ্ঞান অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল, শেষে ডাক্তার ডাকতে হয়। বংশীর হাতেই মদের আলমারির চাবি কি না, কর্তা-গিন্নী দুজনে বেহুশ হয়ে পড়ে থাকলে বংশীরই সুবিধে, দুই ভাই-বোনে দেশে ফিরে গিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে থাকবে।

ভূতনাথ প্রতিবাদ করতে গেল—সব মিথ্যে কথা বৃন্দাবন।

বৃন্দাবন সে-কথা কানে না তুলে বলতে লাগলো—আর করবে–ই বা কেন, লোচন দর্মাহাটায় ঠেলাগাড়ির ঠিকেদারি নিয়েছে, মধুসূদন জমি-জিরেত কিনেছে দেশে, বিধু সরকারও কাজ গুছিয়ে নিয়েছে বেশ, কেউ বাদ যায়নি, চাকরি যদি চলেও যায়, কারো অসুবিধে হবে না, পারলাম না শুধু আমি।

ভূতনাথ বললে—পারোনি কেন?

—আজ্ঞে আমিও পারিনি, আপনিও পারেননি, অথচ বৌঠানের সঙ্গে আপনার ভাব—ছোটবৌঠানের সিন্দুকে গয়না-গাটি যা আছে তাই-ই একটা একটা করে ফুরোতে জীবন কেটে যাবে, মদের নেশায় কোথায় থাকবে চাবির গোছা আর কোথায় থাকবে হিসেব—তা আপনি না নেন, নেবে বংশীবংশী আর ওর বোন চিন্তা।

 

রাত গভীর হয়ে এল। বিয়েবাড়িতে নহবৎ-এ কানাড়ার আলাপ বড় করুণ আবেদন জানাচ্ছে। এই মুহূর্তে কানাড়ার মূৰ্ছনার মধ্যে যেন জবা, ছোটবৌঠান, চুনী দাসী ছাড়াও রাধা, আন্না, সকলের মনের নিভৃততম কামনাটি মূর্ত হয়ে উঠতে লাগলো ভূতনাথের মনে। কলকাতার এই নির্জনতম অংশে পচা ডোবার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হলো—আবার যেন সকলের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলেছে সে। বাইরে থেকে সবাই পরস্পর-বিরোধী—কিন্তু আসলে সবাই এক। কেউ ঘৃণা দিয়েছে, কেউ তাচ্ছিল্য, কেউ ভালোবাসা, কেউ বা স্নেহ, কেউ করেছে বিদ্রূপ। কিন্তু সকলের সঙ্গে আজ এই মুহূর্তে ওই কানাড়া রাগিণীর মূছনার পটভূমিকায় এক নিবিড় যোগ স্থাপন হয়ে গেল হঠাৎ। যে তাচ্ছিল্য করেছে, যে কেবল বিদ্রূপ করেছে, তার সঙ্গে যে ভালোবেসেছে তার আর কোনো পার্থক্য রইল না। ওরা সবাই এক। সবাই এক। এখানে এই অন্ধকার পরিপ্রেক্ষিতে যেন সকলের অন্তস্তল পর্যন্ত এক অলৌকিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। হয় তো এ শুধু অন্ধকারের ছলনা কিম্বা হয় তো কানাড়া রাগিণীর ভুল বকা, নয় তো এইটেই বোধ হয় অনন্তকালের চরমতম সত্য!

হঠাৎ সচেতন হয়ে ভূতনাথ বললে— আচ্ছা, আমি আসি বৃন্দাবন—দেরি হয়ে যাচ্ছে ওদিকে আবার।

বৃন্দাবন বললে—তা হলে ওই কথাই রইল শালাবাবু।

—কী কথা?

বৃন্দাবন বললে—চুনী দাসী আমাকে পই পই করে বলে দিয়েছে যে।

-কী বলে দিয়েছে?

—আজ্ঞে সবার কাছে নতুন-মা শুনেছে যে, ছোটমা’র সঙ্গে আপনার খুব মাখামাখি—আপনাকে জামা-কাপড়-জুতো দিয়েছে ছোটমা, আপনাকে একটু পেয়ারের চোখে দেখে তিনি। বিধু সরকার তো সরাতেই চেয়েছিল আপনাকে বড়বাড়ি থেকে, খোরাকির খাতা থেকে নামও কেটে দিয়েছিল, কিন্তু ছোটমা’র কথাতেই তো রাখতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। তাই আপনাকে

একবার জানবাজারে দেখা করতে বলেছে নতুন-মা।

ভূতনাথ বললে—কেন, আমি কী করতে পারবে তার?

—তা জানিনে শালাবাবু, কিন্তু দেখা করতে আপনার দোষটা কী?

ভূতনাথ খানিকক্ষণ কি যেন ভাবলে। বললে—কিন্তু যে রকম ব্যাপার দেখছি, তাতে হয় তো বড়বাড়িতে আমি বেশিদিন থাকবো বৃন্দাবন।

—সে আপনি পারবেন না আজ্ঞে, ছোটমা আপনাকে ছাড়বে না।

ভূতনাথের রাগ হলো কথাটা শুনে। বললে—কেন ছাড়কে, ছোটবৌঠান আমার কে শুনি? আমি যদি ছেড়ে চলে যাই —কে আমায় আটকাতে পারে?

—পারে শালাবাবু, আটকাতে পারে ছোটমা, মধুসূদন কাকা সব বলেছে যে-নইলে ভেবে দেখুন না, এত লোক থাকতে এত রাতে আপনার সঙ্গে এত কথা বলি?

ভুতনাথ বললে–আচ্ছা, এখন তাহলে তুমি এসো বৃন্দাবন।

–তা হলে আপনি আসছেন তো?

—কথা দিতে পারছি না আমি কিন্তু ভেবে দেখি।

—আসবেন কাল ঠিক।

সে-কথার উত্তর না দিয়ে ভূতনাথ হন হন করে বিয়েবাড়ির দিকে চলে গেল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *