1 of 2

রক্তের দাগ ছিল (নভেলেট)

রক্তের দাগ ছিল (নভেলেট)

নিজের টেবিলে বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ‘শার্লক হোমস অমনিবাস’ পড়ছিল দশরথ সামন্ত। সারাটা জীবন ধরে সে ছিল তদন্ত-পাগল কনস্টেবল। বছরপাঁচেক হল রিটায়ার করেছে। রিটায়ার করার সময়েও সে প্রায়-কনস্টেবলই ছিল। কারণ, প্রোমোশন সে নেয়নি—নিলে সরাসরি তদন্তের জায়গা থেকে তাকে হয়তো সরে যেতে হত।

চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর হঠাৎই একটা ডিটেকটিভ এজেন্সির বিজ্ঞাপন দশরথের চোখে পড়ে। ‘প্রাইভেট আই ডট কম’ নামের ডিটেকটিভ এজেন্সি একজন বয়স্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট চাইছে। তদন্তের অভিজ্ঞতা থাকলে ভালো হয়।

একমুহূর্তও দেরি না-করে দশরথ সেখানে অ্যাপ্লাই করেছিল এবং ইন্টারভিউর ডাক পেয়েছিল।

ইন্টারভিউ নিয়েছিল এজেন্সির মালিক ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী। বছর তিরিশ-বত্তিরিশের টগবগে যুবক। লম্বা ফরসা চেহারা। মুখে কোথায় যেন একটা বেপরোয়া ভাব লুকিয়ে রয়েছে।

ইন্টারভিউর সময় দশরথ কাষ্ঠ হেসে ইন্দ্রজিৎকে বলেছিল, ‘সময়মতো প্রোমোশন নিলে আমি স্যার পুলিশ কমিশনার হয়ে রিটায়ার করতে পারতাম—কিন্তু করিনি। কারণ, ওই যে বললাম, ডায়রেক্ট তদন্তের প্রতি দুর্দান্ত টান। ঠিক যেন সন্তানের প্রতি মায়ের টান! তদন্ত—মানে, ইনভেস্টিগেশান—ছাড়া আমি একটা মোমেন্টও থাকতে পারি না। তদন্ত আমার ধ্যান-জ্ঞান-প্রাণ।’

ইন্দ্রজিৎ বেঁটেখাটো বৃদ্ধ মানুষটাকে দেখছিল। কাঁচাপাকা চুল, তোবড়ানো গাল, কালো চওড়া ফ্রেমের চশমা, কপালের বাঁ-দিকে একটা ছোট আঁচিল। বয়েসের ভারে চোখের রং খানিকটা ঘোলাটে হয়ে এলেও তা থেকে চনমনে ভাব উধাও হয়ে যায়নি। তা ছাড়া মাইনে খুব কম শুনেও মানুষটির উৎসাহে বিন্দুমাত্রও ভাটা পড়েনি।

‘আমাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিটেকটিভের পোস্টে নিলে আপনি আর-একটা ব্যাপারে মোস্ট বেনিফিটেড হবেন, স্যার। প্রচুর রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা কাহিনি আমি গুলে খেয়েছি। আর গত পঞ্চাশ বছর ধরে শার্লক হোমস আমার গুরু, আমার দেবতা। আমার এই এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটি আপনার তদন্তের কাজে হেভি হেল্প করবে, স্যার। যেমন ধরুন, দীনেন্দ্রকুমার রায়, পাঁচকড়ি দে থেকে শুরু করে আজকের তপজ্যোতি বর্মন, হরিহর ধর পর্যন্ত সবার লেখাই আমার নখদর্পণে। যখনই দরকার তখনই আমার কাছ থেকে রেডি রেফারেন্স পেয়ে যাবেন। পাঁচকড়ি দে-র ”নীলবসনা সুন্দরী” কি আপনি পড়েছেন, স্যার? সেখানে…।’

দশরথের পাঁচালি শুনতে-শুনতে ইন্দ্রজিতের মাথা ঘুরতে শুরু করেছিল। ও কোনওরকমে বৃদ্ধ মানুষটিকে থামিয়ে বিদায় দিয়েছে। এবং পরে ঠান্ডা মাথায় অনেক বিচার-বিবেচনা করে তাকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়ে দিয়েছে।

প্রাইভেট আই ডট কম-এর অফিস ম্যাডান স্ট্রিটে—দুটি মাঝারি মাপের ঘর নিয়ে আধুনিকভাবে সাজানো।

বাইরের ঘরটা রিসেপশান গোছের। একপাশে বড় টেবিলে পার্সোনাল কম্পিউটার নিয়ে বসে আছে জিনি রায়। ও একইসঙ্গে রিসেপশানিস্ট, টাইপিস্ট এবং ইন্দ্রজিতের সেক্রেটারি। বয়েস বাইশ-চব্বিশ হবে। ফরসা রোগা চেহারা। মুখের তুলনায় চোখ দুটো বেশ বড় মাপের। ঠোঁটে গাঢ় চকোলেট রঙের লিপস্টিক। চোখের পাতার ওপরে হালকা রঙের আস্তর। আর পারফিউমের সুগন্ধ ওকে চাদরের মতো জড়িয়ে রয়েছে।

ভগবান জিনিকে রূপ দিয়েছেন—তবে বুদ্ধির বিনিময়ে। কিন্তু তাতে জিনিস কোনওরকম দুঃখ আছে বলে মনে হয় না। ও সবসময় নিজের সাজগোজ নিয়েই ব্যস্ত। অফিস ছুটির পর ওকে দিয়ে একটি মিনিটও ওভারটাইম করানো যায় না। হাবভাব দেখে মনে হয়, বিশাল বড়লোকের মেয়ে—চাকরি করছে নেহাতই সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু আসলে তা নয়।

জিনির মুখোমুখি চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আছে দশরথ। ‘শার্লক হোমস অমনিবাস’ পড়তে-পড়তে ওর বারবার হাই উঠছিল বিনা কাজে এভাবে বসে থাকা যায়! সক্রিয় তদন্তের কোনও সুযোগ নেই। শুধু বিশ্রাম। মাইনেটাই কি সব!

দশরথ বই বন্ধ করে একটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর ল্যামিনেট করে বাঁধানো একটা ফটো দ্বিতীয় ড্রয়ার থেকে বের করল। ফটোটা টেবিলে সুন্দরভাবে দাঁড় করাল।

দশরথের দেবতা শার্লক হোমসের ছবি।

দশরথ ধূপকাঠি-দেশলাই বের করল ড্রয়ার থেকে। তারপর ধূপ জ্বেলে শার্লক হোমসকে আরতি করল বারকয়েক। কষ্ট করে একটা হাই চেপে বলল আপনমনেই, ‘হে শার্লক হোমস, যে করে হোক একটা কেস এনে কোম্পানিটার বউনি করিয়ে দাও, বাবা।’

জিনি একটা ছোট আয়না নিয়ে নিজের মেকাপ ঠিক করায় ব্যস্ত ছিল। একবার আড়চোখে দশরথকে দেখল। তারপর ছোট একটা ‘হুঁঃ’ শব্দ করে নিজের কাজে মন দিল।

দশরথের আরতি শেষ হতে-না-হতেই ভেতরের ঘরের কাচের দরজা খুলে গেল। বাইরের ঘরে এসে দাঁড়াল ইন্দ্রজিৎ। ডানহাতের আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। কপালে ভাঁজ।

জিনির দিকে একপলক তাকিয়ে দশরথের টেবিলের দিকে এগিয়ে এল ইন্দ্রজিৎ, বলল, ‘দশরথদা, আজকের দিনটা গেলে চোদ্দোদিন হবে। চোদ্দোদিন হল অফিস খুলেছি, একটা কেসের খবর নেই! শুধু শো-কেস হয়ে বসে আছি! বাবা প্রথমেই বলেছিল, আমার পয়সা নষ্ট কর ক্ষতি নেই। তবে তোর ওই ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলে নষ্ট করিস না। এখন বোঝো ঠ্যালা—।’

দশরথ সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘চিন্তা করবেন না, স্যার। আজ গুরুকে মন-প্রাণ দিয়ে হেভি ডেকেছি। আজ একটা-না-একটা কেস আসবেই।’ ঘরের ডিজিটাল ক্লকের দিকে একবার তাকিয়ে, ‘এখনও তো বারোটা বাজেনি—।’

‘না, বারোটা বেজে গেছে—আমার কোম্পানির।’ বিরক্তভাবে সিগারেটের টান দিল ইন্দ্রজিৎ, ‘কী করে তোমাদের মাইনে দেব কে জানে!’

জিনি এতক্ষণ সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, ওদের কথাবার্তায় বিন্দুমাত্রও ভ্রূক্ষেপ করেনি। কিন্তু ইন্দ্রজিতের শেষ কথাটা কানে যেতেই চট করে ফিরে তাকাল ওর দিকে। করুণ অথচ আদুরে গলায় বলল, ‘মাইনে হবে না! কী বলছেন, স্যার!’

ইন্দ্রজিৎ তখন স্বপ্ন-দেখার চোখে ঘরের একটা কাচের জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল। আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল, ‘আমাদের কোম্পানি দাঁড়াবেই। দরকার শুধু একটা কেস। জাস্ট একটা কেস।’

দশরথ শার্লক হোমসের ফটোর সামনে হাতজোড় করে বলল, ‘প্লিজ, জাস্ট ওয়ান কেস—।’

ইন্দ্রজিৎ সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘তোমার গুরুর বাড়ির ঠিকানাটা কী ছিল মনে আছে, দশরথদা?’

‘মনে নেই আবার!’ দাঁত দেখিয়ে একগাল হাসল দশরথ: ‘২২১বি, বেকার স্ট্রিট।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইন্দ্রজিৎ বলল, ‘ঠিক বলেছ। আমরা একেবারে বেকার হয়ে গেলাম। বেকার—স্ট্রিট বেগার।’

দশরথ জ্বলন্ত ধূপকাঠিটা পাশেই একটা জানলার তাকে ধূপদানিতে বসিয়ে দিয়েছিল। ইন্দ্রজিতের শেষ কথাটা শুনেই হাত বাড়িয়ে ধূপদানিটা নিল। আর-একদফা ঘুরিয়ে দিল শার্লক হোমসের ফটোর সামনে। তারপর চোখে-মুখে তীব্র ভক্তি প্রকাশ করে কাঁচুমাচু ভাবে বলল, ‘প্রভু, একটা কেস—জাস্ট একটা। তা হলেই…।’

ভেতরের ঘরে টেলিফোন বেজে উঠল।

ইন্দ্রজিৎ প্রায় ছুটে গিয়ে টেলিফোন ধরল।

‘হ্যালো—।’

‘হ্যালো, প্রাইভেট আই ডট কম?’ ভারী গলায় কেউ জানতে চাইল।

‘ইয়েস—।’

‘আমার নাম মহেন্দ্র সেন। সল্ট লেকে থাকি। কাগজে আপনাদের অ্যাড দেখেছি। তাই একটা জরুরি ব্যাপারে ফোন করছি। আমাদের ফ্যামিলির ব্যাপারে একটু আলোচনা ছিল। সেটা আপনাদের অফিসে গিয়ে বলতে চাই। বুঝতেই পারছেন, সিক্রেসিটা খুব ইমপরট্যান্ট।’

‘অবশ্যই, অবশ্যই! আপনি এখনই আমাদের অফিসে চলে আসুন। ঠিকানাটা জানেন তো? পাঁচ নম্বর ম্যাডান স্ট্রিট। দোতলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে। আমরা আপনার জন্যে ওয়েট করছি।’

‘আপনি কে কথা বলছেন জানতে পারি কি?’

‘আমি এই কোম্পানির চিফ ডিটেকটিভ—ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী।’

মহেন্দ্র সেন ‘ও. কে.’ বলে লাইন কেটে দিলেন।

ইন্দ্রজিতের বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছিল। হাতের নিভে যাওয়া সিগারেটটা ও টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিল। দু-হাত মুঠো করে ঝাঁকিয়ে উল্লাসের ভঙ্গি করল—ব্যাটসম্যানকে বোল্ড আউট করার পর বোলাররা যেমন করে। তারপর প্রায় নাচতে-নাচতে চলে এল বাইরের ঘরে। উত্তেজিতভাবে বলল, ‘জিনি, দশরথদা—চটপট সবকিছু সাজিয়ে-গুছিয়ে নাও। এক্ষুনি আমাদের প্রথম ক্লায়েন্ট আসছেন! কথা শুনে মনে হল লাখপতি কি কোটিপতি হবে।’ আনন্দে হাতে হাত ঘষল ইন্দ্রজিৎ ‘আমাদের কোম্পানির প্রথম কেস।’

দশরথ একবার চোখ তুলে ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকাল। একবার চোখ বুজল। বোধহয় কাউকে কৃতজ্ঞতা জানাল। তারপর শার্লক হোমসের ফটোটাকে প্রায় গড় হয়ে প্রণাম করার চেষ্টা করল।

জিনি নিজের টেবিলটা চটপটে হাতে গুছিয়ে নিল। কম্পিউটারের কিবোর্ডে খটাখট করে কয়েকটা বোতাম টিপল। তারপর নিজের মেকাপ মেরামত করতে শুরু করল।

দশরথ শার্লক হোমসের ফটোটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে ফেলল। টেবিলটা টিপটিপ করে সাজিয়ে নিল। তারপর নিজের পোশাকটা ঠিকঠাক করে নিয়ে গুছিয়ে বসল।

ইন্দ্রজিৎ ঢুকে গেল ভেতরের ঘরে। নিজের গদিওয়ালা চেয়ারে বসে নতুন একটা সিগারেট ধরাল। তারপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর বিষয়ে লেখা একটা মোটা ইংরেজি বই নিয়ে পড়তে শুরু করল।

প্রাইভেট আই ডট কম-এর তিনজনেই প্রথম ক্লায়েন্টের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

সল্ট লেকে চার নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে চোখ-ধাঁধানো বাড়ি বলতে একটাই—’সেন কটেজ।’ স্যান্ড স্টোন আর গ্রানাইট দিয়ে আধুনিক ধাঁচে তৈরি তিনতলা বাড়ি। দরজা-জানলায় মেহগনি কাঠ আর টিন্টেড গ্লাস।

ইন্দ্রজিতের রানি-রং মারুতি ভ্যান বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ঠিক বিকেল চারটেয়। গাড়ি থেকে নামল ইন্দ্রজিৎ, জিনি, আর দশরথ।

মারুতি গাড়ির জানলার কাচে, নিজের ছায়া দেখছিল জিনি, মাথার চুল ঠিকঠাক করে নিচ্ছিল। হঠাৎই বাড়িটার দিকে চোখ পড়তে ও একেবারে হতবাক হয়ে গেল। ওর ঠোঁট চিরে আবছাভাবে বেরিয়ে এল: ‘ফ্যানট্যাস্টিক!’

দশরথ হেসে বলল, ‘এই অট্টালিকা যদি কটেজ হয়, স্যার, তা হলে হিমালয়কে আপনি উইয়ের ঢিবি বলতে পারেন।’

ইন্দ্রজিৎ সামান্য মাথা নাড়ল। চোখ থেকে ‘রে বান’ সানগ্লাসটা খুলে পকেটে রাখল। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘দশরথদা, যা-যা বলেছি মনে আছে তো! তুমি চোখ-কান খোলা রাখবে, কোনও কিছু যেন নজর এড়িয়ে না যায়।’ ইন্দ্রজিৎ ঘুরে তাকাল জিনির দিকে: ‘জিনি, আমি যখন সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব, তখন তুমি শর্টহ্যান্ডে নোট নিয়ে যাবে। কোনও কথা যেন বাদ না যায়।’

জিনি তখনও মুগ্ধ চোখে বাড়িটা দেখছিল। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ও বলল, ‘এটা বাড়ি নয়—স্বপ্ন। এরকম একটা স্বপ্নের বাড়িতে এরকম অঘটন ঘটেছে এটা ভাবা যায় না।’

জিনি একটু বেশিরকম স্বপ্ন দেখে—বৈভবের স্বপ্ন। এ-ধরনের স্বপ্ন দেখা বোধহয় ওর শখ।

দশরথ চটপটে গলায় বলল, ‘চলুন, স্যার, আমরা তদন্তে নেমে পড়ি। শুধু-শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই—।’

পাথর বসানো পথ ধরে বাড়ির সদর দরজার দিকে এগোতে-এগোতে ইন্দ্রজিতের কয়েক ঘণ্টা আগের কথা মনে পড়ছিল। যখন মহেন্দ্র সেন ওর ম্যাডান স্ট্রিটের অফিসে এসে হাজির হয়েছিলেন।

মহেন্দ্রকে দেখেই ইন্দ্রজিতের মনে হল, উনি লাখপতি নন—কোটিপতি।

মহেন্দ্রর চেহারা মোটাসোটা, পরনে ধবধবে পাঞ্জাবি আর সরু পাজামা। গা থেকে ভুরভুর করে আতরের গন্ধ বেরোচ্ছে। ডানহাতের চার আঙুলে মোটা-মোটা চারটে সোনার আংটি। তাতে যথাক্রমে হীরা, চুনি ও পান্না বসানো—চার নম্বর পাথরটা ইন্দ্রজিৎ চিনতে পারল না।

মহেন্দ্রর গলায় সোনার ডগ চেন। বাঁহাতের বাহুতে সোনার তাবিজ। তাতেও বড় মাপের তিনটে পাথর।

মহেন্দ্রর বয়স খুব বেশি হলে পঁয়তাল্লিশ হবে। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা—সোনারও হতে পারে। মাথায় শতকরা সত্তরভাগই টাক। থলথলে মুখে ঘাম। দোতলায় সিঁড়ি বেয়ে উঠে সামান্য হাঁফাচ্ছেন।

ইন্দ্রজিতের অফিসে ঢুকেই মহেন্দ্র জরিপ-নজরে সবকিছু মেপে নিচ্ছিলেন। বোধহয় বুঝতে চাইছিলেন প্রাইভেট আই ডট কম ওঁর সমস্যার সমাধান করতে পারবে কি না।

ইন্দ্রজিতের মুখোমুখি চেয়ারে বসে আরামের একটা সংক্ষিপ্ত শব্দ করলেন মহেন্দ্র। তারপর পকেট থেকে পাঁচশো পঞ্চান্নর প্যাকেট বের করলেন—নিজে একটা নিলেন, ইন্দ্রজিৎকেও একটা দিলেন। সুরেলা শব্দ তোলা বিদেশি লাইটার দিয়ে দুজনের সিগারেট ধরালেন।

ইন্দ্রজিৎ ইন্টারকমে জিনিকে ডেকে নিল। জিনি শর্টহ্যান্ডের খাতা আর পেনসিল নিয়ে তৈরি হয়ে বসল। দশরথ তখন দরজার কাছে কান পেতে দাঁড়িয়ে। তদন্তের কৌতূহল ওকে সিটে বসে থাকতে দেয়নি।

মহেন্দ্র যেন একটু সময় নিয়ে বলতে শুরু করলেন।

‘ইন্দ্রজিৎবাবু, আমার বাবা জিতেন্দ্রনাথ সেন বেশ বড়লোক। মানে, লাস্ট ফিনানশিয়াল ইয়ারে আমরা ইনকাম ট্যাক্স দিয়েছি বারো কোটি টাকা। আমাদের কোম্পানির নাম হয়তো আপনি শুনে থাকবেন—”সেন কেমিক্যাল প্রোডাক্টস”।’

ইন্দ্রজিৎ মাথা নাড়ল—নামটা ও শুনেছে। শুধু ও কেন, পশ্চিমবঙ্গের সবাই হয়তো শুনে থাকবে। ‘সেন কেমিক্যাল প্রোডাক্টস’ দারুণ নামজাদা কোম্পানি।

‘আপনাদের প্রবলেমটা কী হয়েছে একটু বলবেন?’

‘হ্যাঁ—বলছি। ব্যাকগ্রাউন্টটা না-বললে প্রবলেমটার গুরুত্ব বোঝা যাবে না।’ একটু থেমে মহেন্দ্র সেন আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমাদের ফ্যাক্টরি দুটো—গড়িয়ায়, আর সোনারপুরে। বেশ বড় মাপের ফ্যাক্টরিই বলা যায়। বাবা-ই সবকিছু দেখেন—মানে, দেখতেন। তা ছাড়া লোকজন তো আছেই। আমরা খুব একটা সময় দিতে পারি না।’

‘আমরা মানে!’

ছোট করে দুবার কাশলেন মহেন্দ্র। তারপর বললেন, ‘আমরা মানে আমি, আমার ছোটভাই সুরেন্দ্র, আর ছোটবোন নবনীতা। আমরা আমাদের কাজকর্ম, শখ-আহ্লাদ নিয়ে থাকি। সে যাকগে, যা বলছিলাম—।’

মহেন্দ্রকে বাধা দিল ইন্দ্রজিৎ: ‘একটু আগে আপনি বললেন আপনার বাবা সবকিছু দেখেন—মানে, দেখতেন। ”দেখতেন” বলছেন কেন? এখন কি আর উনি দেখেন না?’

‘না—কারণ, পাঁচদিন আগে উনি কিডন্যাপড হয়েছেন।’

‘কিডন্যাপড হয়েছেন!’

‘হ্যাঁ। গত সোমবার ভোররাতে একটা শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমার ঘর দোতলায়। আর বাবা একতলায় বড় একটা ঘরে থাকতেন। আমি সিঁড়ির কাছে আসামাত্রই দেখতে পাই কয়েকটা কালো ছায়া কিছু একটা পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি চিৎকার করে উঠতেই তাদের মধ্যে একজন আমার দিকে রিভলভার তুলে শাসায়। বলে, ”চেঁচালে বা পুলিশে খবর দিলে আপনার বাবাকে খতম করে দেব। পরে আপনাকে ফোন করব। যান, ঘরে চলে যান। গিয়ে চুপটি করে শুয়ে থাকুন। সকালে কেউ জিগ্যেস করলে বলবেন জিতেনবাবু কোম্পানির কাজে ট্যুরে গেছেন। যা-যা বললাম মনে থাকে যেন!

‘আমি ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছিলাম। সেই অবস্থাতেই কোনওরকমে ঘরে ফিরে গেছি।’

‘বাড়ির সবাই খবরটা জেনেছে?’ ইন্দ্রজিৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি শুরু করল। শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিল।

‘হ্যাঁ—সকালে সুরেন আর নবনীতা জেনেছে। আর পরানদাও জেনেছে।’

‘পরানদা কে?’

‘বাবার আমলের কাজের লোক। বয়েসে বাবার চেয়েও অনেক বড়। আমাদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে।’

‘কিডন্যাপারদের কোনও ফোন এসেছিল? টাকা-পয়সা কিছু চেয়েছে?’

‘হ্যাঁ, সোমবার সকালে ওরা ফোন করেছিল। পুলিশে কিছু জানাতে বারণ করেছে। তবে টাকা-পয়সা এখনও কিছু চায়নি—বলেছে, পরে জানাবে। তারপর থেকে আর কোনও ফোন আসেনি।’

ইন্দ্রজিৎ কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তা করছিল। মহেন্দ্র সেন আশা-ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎই খেয়াল হওয়াতে হাতের নিভে যাওয়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে রেখে দিলেন। তারপর বললেন, ‘মিস্টার চৌধুরী, আপনি আজ বিকেলে আমাদের বাড়িতে একবার আসুন। স্পটটা একবার দেখে নিন। তা ছাড়া আমার কতকগুলো পারসোনাল কথাও বলার আছে। আমাকে লেখা বাবার একটা চিঠিও আপনাকে দেখাব। আর তার ওপর রয়েছে অনিমেষ সরকারের সমস্যা। বাবার ছোটবেলার বন্ধু—উনি গত পরশু আমাদের সল্ট লেকের বাড়িতে এসে উঠেছেন। বাবা নেই, অথচ…সে এক বিরাট সমস্যা—।’

‘তার মানে! আবার কীসের সমস্যা?’

‘ব্যাপারগুলো এখানে ঠিক ডিসকাস করা যাবে না। আপনি প্লিজ আমাদের বাড়িতে আসুন—তখন সব খুলে বলব।’

‘আমি একা নয়—আমরা তিনজনে আজ বিকেল চারটের সময় আপনাদের বাড়িতে যাব।’

তাই এসেছে ইন্দ্রজিৎ—সঙ্গে জিনি আর দশরথ।

কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলল। একজন বয়স্ক কাজের লোক। বোধহয় পরান—ভাবল ইন্দ্রজিৎ।

জমকালো ড্রয়িং-কাম-ডাইনিং স্পেসে ওদের আপ্যায়ন করে বসাল পরান।

প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই হাজির হলেন মহেন্দ্র। হেসে বললেন, ‘আপনারা এসেছেন—ভীষণ খুশি হয়েছি।’

ইন্দ্রজিৎ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ঘরটা দেখছিল। এরকম ঘর হিন্দি ছবিতেই দেখা যায়। আসবাবপত্রও ঘরের সঙ্গে মানানসই। দূরে, ঘরের শেষ প্রান্ত থেকে, সুন্দর বাঁক নেওয়া সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার দিকে।

‘আপনারা বসুন—আগে একটু চায়ের ব্যবস্থা করি।’ মহেন্দ্র সৌজন্য করে বললেন।

‘না, মিস্টার সেন। আগে বরং একটু কাজ সেরে নিই।’ ইন্দ্রজিৎ গা-ডুবে-যাওয়া সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল: ‘চলুন, আপনার বাবার ঘরটা আগে দেখি—।’

জিনিকে চোখের ইশারা করে পা বাড়াল ইন্দ্রজিৎ। জিনি ওর শর্টহ্যান্ড খাতা আর পেনসিল নিয়ে ইন্দ্রজিতের ছায়া হয়ে গেল।

মহেন্দ্র ইন্দ্রজিৎদের পথ দেখিয়ে দক্ষিণদিকে নিয়ে গেলেন। সেখানেই জিতেন্দ্রনাথের শোওয়ার ঘর। ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে একজন পুরুষের সঙ্গে চাপা গলায় একান্তে কিছু কথাবার্তা বলছিল। ইন্দ্রজিৎদের দেখে চট করে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলল।

মহেন্দ্র সেন আলাপ করিয়ে দিলেন।

‘আমার ছোট ভাই, সুরেন—আর বোন, নবনীতা। ইনি ডিটেকটিভ ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী। বাবার কিডন্যাপিং-এর ব্যাপারে আমি ওঁর হেল্প চেয়েছি। তোদের তো আগেই বলেছিলাম…।’

নবনীতা হঠাৎই খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে ওর উদ্ধত শরীরে নানারকম ভাঙচুর হতে লাগল।

অনেকক্ষণ পর হাসি থামিয়ে বেশ কষ্ট করে ও বলল, ‘বড়দা, তোমার এই গুডি-গুডি ইমেজটা এবার ছাড়ো তো! ভেতরে-ভেতরে তো আমাদেরই মতো তেষ্টায় মরে যাচ্ছ। অথচ মুখে একটা বেড়াল-তপস্বীগোছের ভাব ফুটিয়ে রেখেছ। নাঃ, সিনেমা-লাইনটাই তোমার আসল লাইন ছিল। কেন যে ফর নাথিং একটার-পর-একটা নতুন-নতুন বিজনেস ট্রাই করে যাচ্ছ কে জানে!’

‘নীতা! ইন্দ্রজিৎবাবু আমাদের গেস্ট। ওঁর সামনে তুমি কিন্তু লিমিট ছাড়িয়ে যাচ্ছ! বাবা এখন কীরকম কষ্টের মধ্যে কী অবস্থায় আছে কিছুই জানি না। যে করে হোক বাবাকে ফিরিয়ে আনা আমাদের প্রথম কর্তব্য—।’

‘কর্তব্য!’ আবার একদফা কাচের-চুড়ি-ভাঙা হাসি। সে-হাসির মধ্যে শঙ্খচূড়ের বিষ ছিল। তারপর হাসি থামতেই: ‘জানি, বড়দা, আসল কথাটা বলতে তোমার ভদ্রতায় আটকাচ্ছে। ও. কে., আমি বলে দিচ্ছি—’ ইন্দ্রজিতের দিকে ঘুরল নবনীতা: ‘ওয়েল মিস্টার শার্লক হোমস, আসল ঘটনা হল বাবাকে আমাদের খুব তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে আনা দরকার। নইলে টাকার তেষ্টায় আমরা মরে যাব—তিনজনেই—বড়দা, ছোড়দা, এবং আমি। বাবা ছাড়া আমাদের টাকার জোগান দেবে কে! কী ছোড়দা, কিছু ভুল বলছি?’ সুরেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে নবনীতা জানতে চাইল। তারপর আবার ইন্দ্রজিৎকে লক্ষ করে: ‘পুলিশের ওপরে আমাদের কনফিডেন্স নেই—তাই প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এবার দেখুন চেষ্টা করে, বাবাকে ফিরিয়ে আনতে পারেন কি না! তবে যা করার চটপট করুন—নইলে আমাদের যা ড্রাই অবস্থা! মরুভূমির চেয়েও খারাপ…।’

ইন্দ্রজিৎ বেশ খুঁটিয়ে নবনীতাকে দেখছিল। জিনিও। তবে ও বোধহয় নবনীতার সাজগোজ লক্ষ করছিল।

নবনীতার ফরসা সুন্দর চেহারা। টানা-টানা চোখ, শ্যাম্পু করা চুল। চোখের কোলে অল্পবিস্তর দ্রুত জীবনযাপনের ছাপ। পরনে দামি চুড়িদার। গলায় সোনার চেন, কানে সাদা পাথর বসানো দুল—বোধহয় হিরেই হবে। এইসব জাতের বড়লোকেরা কখনও নকল গয়না পরে না। শুধু নকল জীবনের পিছনে ছোটে।

‘ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে আমি পরে ডিটেইলে কথা বলব। আগে জিতেনবাবুর ঘরটা একবার দেখে নিই।’

ইন্দ্রজিতের কথার উত্তরে সুন্দর করে হাসল নবনীতা। বলল, ‘আপনার সঙ্গে ডি-টে-ই-লে কথা বলতে আমার বেশ ভালো লাগবে। য়ু লুক স্মার্ট। আপনাকে ডিটেকটিভ হিসেবে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। টা-টা…।’ হাত তুলে আঙুল নাড়ল নবনীতা: ‘আমি দোতলায় আছি—দরকার হলেই ডাকবেন। আই উড লাভ টু কাম।’

মহেন্দ্র মুখ-চোখ লাল করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। নবনীতা চলে যাওয়ার পর চাপা গলায় শুধু বললেন, ‘অসভ্য! মডেলিং-এর লাইনে আর কত ভদ্রতা শিখবে! অথচ ওকে নিয়ে মায়ের অনেক আশা ছিল…।’

‘আপনাদের মা-কে দেখছি না—।’ ইন্দ্রজিৎ বলল।

‘আমাদের মা নেই। প্রায় পনেরো বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’

সুরেন্দ্র এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এখন একটু ফাঁক পেয়ে বললেন, ‘আমাকে কি এখন থাকতে হবে, ইন্দ্রজিৎবাবু?

ইন্দ্রজিৎ অবাক হয়ে সুরেন্দ্রর দিকে তাকাল। কারণ, গলার স্বর বেশ মেয়েলি। হয়তো সেইজন্যই কম কথা বলেন।

‘না, আপনি এখন যেতে পারেন—আমি পরে ডেকে নেব।’

সুরেন্দ্র চলে যেতেই মহেন্দ্রকে সঙ্গে করে ঘরের ভেতরে পা রাখল ইন্দ্রজিৎ।

ঘরে ঢুকে প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে সেটা বিশাল মাপের একটা অয়েল পেইন্টিং। টকটকে সিঁদুর পরা এক মাঝবয়েসি মহিলা। ছবিটা মালা-চন্দনে সাজানো।

‘আমার মা—।’ মহেন্দ্র বললেন।

ইন্দ্রজিৎ এবার ঘরটার দিকে মনোযোগ দিল।

বিলাসবহুলভাবে সাজানো প্রকাণ্ড ঘর। ভোমরার শব্দ করে এয়ারকুলার চলছে দেওয়ালে বিদেশি কোয়ার্ৎজ ঘড়ি। পশ্চিমের রোদ একটা কাচের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে মার্বেল পাথরের মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ঘরের বাঁদিকে ঘেঁষে কারুকাজ করা মেহগনি কাঠের খাট—তাতে ধবধবে সাদা বিছানা।

সেদিকে আনমনাভাবে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে আচমকা মহেন্দ্রর মুখোমুখি ঘুরে দাঁড়াল ইন্দ্রজিৎ: ‘আপনার ছোটবোন যা বলে গেল, সে-কথা কি ঠিক? জিতেনবাবু না থাকায় আপনারা টাকার অভাবে কাহিল হয়ে পড়েছেন?

মহেন্দ্র ইতস্তত করতে লাগলেন।

ইন্দ্রজিৎ এয়ারকুলার অফ করে দিল। একটা জানলার পাল্লা সামান্য খুলে দিল। তারপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটে বের করে একটা সিগারেট ধরাল। মহেন্দ্রকে অফার করল, কিন্তু তিনি আলতো করে বললেন, ‘এখন না—পরে।’

‘বলুন, নবনীতা কি ঠিক বলেছেন? আমার কাছে লুকোনোর চেষ্টা করবেন না।’ ঘরে এয়ারকুলারের ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও মহেন্দ্র পকেট থেকে রুমাল বের করে কাল্পনিক ঘাম মুছলেন। তারপর খানিকটা সময় নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ—ঠিকই বলেছে। বেশ কয়েক বছর আগে বাবা একটা এগ্রিমেন্ট করেছিলেন। তাতে আমরা—মানে, আমি, সুরেন্দ্র আর নবনীতা—মাসে মাসে একটা ফিক্সড টাকা পাব। তার বাইরে টাকার দরকার পড়লে সেটা বাবার কাছে চাইতে হবে। সেই এগ্রিমেন্টে আমরা সই করেছিলাম—না-করে উপায় ছিল না।’

মহেন্দ্র চুপ করে গেলেন। দুটো হাত সামনে জড়ো করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।

ইন্দ্রজিৎ ঘরটা খুঁটিয়ে দেখা শেষ করল। একটা জানলার কাছে গিয়ে বাইরের রাস্তাটা একবার দেখল। তারপর ঘুরে তাকাল মহেন্দ্রর দিকে: ‘আপনার বাবার ওপরে কারও রাগ ছিল?’

‘মনে তো হয় না। তবে বিজনেসের ব্যাপারে কোনও জেলাসির ব্যাপার থাকলেও থাকতে পারে।’

‘হুঁ। আসলে আমি কিডন্যাপিং-এর মোটিভটা বুঝতে চাইছি। কিডন্যাপাররা এখনও টাকা চায়নি বলে আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে।’ আচ্ছা, কিডন্যাপিং-এর সময় কি ধস্তাধস্তি হয়েছিল?’

‘দোতলা থেকে আমি সেরকম কিছু টের পাইনি। তবে আপনাকে বলতে ভুলে গেছি—বাবার বিছানার চাদরে বেশ খানিকটা রক্তের দাগ ছিল।’

‘রক্তের দাগ!’ ইন্দ্রজিতের শরীরটা চাবুকের মতো টান-টান হয়ে গেল: ‘কোথায় সে চাদরটা? দেখি—।’

‘দাঁড়ান, নিয়ে আসছি—।’ বলে মহেন্দ্র চলে গেলেন।

ইন্দ্রজিৎ সিগারেট খেতে-খেতে ভাবছিল। কোটিপতি জিতেন্দ্রনাথের তিন ছেলেমেয়ে। তিনজনেই বোধহয় বড়লোকি চালে আয়েস করতে শিখেছেন। কেউই বিয়ে-থা করেননি। অথচ সবাই খরচ করতে ভালোবাসেন। বাবা কিডন্যাপড হয়েছেন বলে কারওরই তেমন দুশ্চিন্তা নেই। একমাত্র দুশ্চিন্তা খরচের টাকা পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে। নবনীতার কথাগুলো হয়তো রূঢ়, কিন্তু মনে হয় না ও একবর্ণও মিথ্যে বলেছে।

সিগারেটের শেষ-হয়ে-আসা টুকরোটা ইন্দ্রজিৎ জানলা দিয়ে ছুড়ে দিল বাইরে।

এমনসময় মহেন্দ্র চাদর নিয়ে ফিরে এলেন—সঙ্গে দশরথ ও পরান।

দশরথ ইন্দ্রজিতের কাছে এসে চাপা গলায় বলল, ‘স্যার, আমি একটু বাড়ির চারপাশটা ঘুরে দেখছিলাম—মানে, ইনভেস্টিগেট করছিলাম আর কি!’ আড়চোখে সন্দেহ এবং আশঙ্কার নজরে মহেন্দ্রকে কয়েকবার দেখল দশরথ: ‘আপনি একা একটু পরানের সঙ্গে কথা বলুন। ওর কাছে প্রচুর মেটিরিয়াল আছে। ডক্টর পঞ্চানন ঘোষাল তাঁর ”অপরাধ-বিজ্ঞান” বইতে বলেছিলেন, ইনভেস্টিগেশানে বাড়ির কাজের লোকদের রোল খুব ভাইটাল। আমি আপনার হয়ে পরানকে একটু-আধটু কোশ্চেন করছিলাম…।’

ইন্দ্রজিৎ হেসে জিগ্যেস করল, ”অপরাধ-বিজ্ঞান” তুমি পড়েছ, দশরথদা?’

‘হ্যাঁ, মানে, ছোটবেলায় অল্প-অল্প পড়েছিলাম।’

ইন্দ্রজিৎ মহেন্দ্রকে বলল, ‘মিস্টার সেন, চাদরটা দিন—।’

চাদরটা নিয়ে বিছানায় রাখল ইন্দ্রজিৎ। উলটেপালটে রক্তের দাগ লাগা জায়গাটা বের করল।

বেশ বড় একটা রক্তের ছোপ। তার খুব কাছে ছোট মাপের আরও দুটো ছোপ।

ইন্দ্রজিৎ চাদরটা ভাঁজ করে দশরথের হাতে দিল: ‘এটা সাবধানে রাখো, দশরথদা। এটা ল্যাবে পাঠাতে হবে।’

যেন লাখ টাকা দামের একটা শৌখিন কাচের গ্লাস অতি সাবধানে নাড়াচাড়া করছে, এইরকম ভঙ্গিতে চাদরটা গ্রহণ করল দশরথ। ওর কাছে এটা লাখ টাকার সূত্র।

চাদরটার দিকে মুগ্ধ অথচ সাবধানি চোখে তাকিয়ে ও জানতে চাইল, ‘আমি কি এখন যেতে পারি, স্যার?’

‘হ্যাঁ, যাও—জিনির কাছে বোসো গিয়ে।’

দড়ির ওপর পা ফেলে সন্তর্পণে হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গিতে দশরথ চলে গেল।

ইন্দ্রজিৎ মহেন্দ্রকে বলল, ‘আপনি জিতেনবাবুর লেখা একটা চিঠি আমাকে দেখাবেন বলেছিলেন। আর অনিমেষ সরকার নামে একজনের কথা বলছিলেন…অনিমেষবাবু এখন কোথায়? বাড়িতে আছেন?’

‘না, উনি একটু বেরিয়েছেন। এলে আপনাকে খবর দেব।’

‘ঠিক আছে। ও-ব্যাপারে পরে আপনার সঙ্গে কথা বলব। তার আগে পরানের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।’

অদ্ভুত চোখে পরানের দিকে একপলক তাকিয়ে একটু দ্বিধাগ্রস্তভাবে মহেন্দ্র চলে গেলেন।

জিতেন্দ্রনাথের ঘরের ডানদিকে একটা টেবিল আর তিনটে চেয়ার পাতা ছিল। ইন্দ্রজিৎ সেখানে গিয়ে বসল—পরানকেও বসতে বলল।

লম্বা, রোগা, তোবড়ানো গাল, গালে খোঁচা-খোঁচা সাদা দাড়ি। দেখেই বোঝা যায়, পরানের ওপর দিয়ে বহু ঝড়-জল বয়ে গেছে। ওর বড়-বড় চোখ দুটোয় কেমন এক সতর্ক ছাপ ছিল।

ওর কাছে বাড়ির লোকজন সম্পর্কে জানতে চাইল ইন্দ্রজিৎ।

পরান খানিকক্ষণ ইতস্তত করে তারপর মুখ খুলল। জিতেন্দ্রনাথের তিন ছেলেমেয়ে সম্পর্কে ওর মতন করে বলল।

ছোড়দি সিনেমা-লাইনে কীসব করে। মাঝে-মাঝে টি-ভি.-র বিজ্ঞাপনে ছোড়দিকে দেখায়। দিন-রাত্তির শুধু সাজগোজ করছে আর দুনিয়ার ছেলেবন্ধুর সঙ্গে রাত-বিরেতে বাড়ি ফিরছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায়। অকে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। প্রত্যেকবারই বড়বাবু টাকা দিয়ে ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট সামলেছে। ছোড়দির ছোট-বড় জ্ঞান নেই। যখন যা মুখে আসে বলে দেয়। বড়বাবুকে দিন-রাত টাকার জন্য বিরক্ত করত। এখন বড়বাবু নেই—তাই জোঁকের মুখে নুন পড়েছে। তা ছাড়া বড়বাবুর বন্ধু অনিমেষবাবু দারুণ কড়া ধাতের মানুষ। এখন ওনার দাপটে তিন ভাই-বোন সবসময় কাঁচুমাচু হয়ে থাকে।

ছোড়দা গানবাজনা নিয়ে থাকে। প্রায়ই বাড়িতে গানবাজনার আসর বসিয়ে কান ঝালাপালা করে দেয়। বড়বাবু অনেকদিন বারণ করেছে, কিন্তু ছোড়দা তাতে কান দেয়নি। বরং নানান জলসার জন্য বড়বাবুর কাছে টাকা চাইত। শুনছিলাম, কী একটা ব্যবস্থা করে নাকি তিরিশজনের দল নিয়ে ফরেনে গানবাজনা করতে যাবে। তার জন্য গত শনিবার বড়বাবুর কাছে টাকা চাইছিল। আর ছোড়দা ছোড়দির চেয়ে বড় হলেও ছোড়দিকে বেশ ভয় পায়।

বড়দা মহেন্দ্র এমনিতে খুব ভদ্র। তবে ব্যবসা করার একটা রোগ আছে। সেই কোন বয়েস থেকেই জেদ ধরেছে বাবার ব্যবসা নয়—সে নিজের হাতে গড়া ব্যবসাকে বড় করে তুলবে। বড়বাবু বহুবার বারণ করেছে, কিন্তু বড়দা নিজের জেদ থেকে সরেনি। অথচ প্রতিবারই নতুন-নতুন ব্যবসা ফাঁদার জন্য বড়বাবুর কাছ থেকে টাকা চাইতেন। বড়বাবু প্রথমটা রাগারাগি করতেন বটে, কিন্তু শেষমেষ টাকা দিয়ে দিতেন। এই তো, গত শনিবারই বড়বাবুর সঙ্গে বড়দার কথা কাটাকাটি হয়ে গেল—ওই টাকা নিয়েই।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরান বলল, ‘শনিবার দিনটা বড়বাবুর খুব খারাপ গিয়েছে। টাকার জন্যে একের-পর-এক বিড়ম্বনা। আমি ওই জানলা দিয়ে স-ব দেখেছি। প্রথমে এল ছোড়দি, তারপর ছোড়দা—আর, সবশেষে বড়দা। তিনজনের সঙ্গেই বড়বাবুর রাগারাগি হল। কিন্তু ওই রাগারাগিই সার। ছেলেমেয়ের জন্যে অন্ধ স্নেহ—কী আর করবেন! টাকা-পয়সা সব দিয়ে-থুয়ে শেষ পর্যন্ত মায়ের ওই ফটোর সামনে গিয়ে কান্নাকাটি করতে লাগলেন—’ ইশারা করে মিসেস সেনের অয়েল পেইন্টিংটার দিকে দেখাল পরান: ‘মা চলে গিয়ে বড়বাবু আরও কাবু হয়ে পড়েছেন। মা ছিলেন সত্যিকারের গৃহলক্ষ্মী। …সবই আমাদের কপাল! মা-মরা ছেলেমেয়েগুলোর একটাও মানুষ হল না। অথচ বড়বাবুর কত আশা ছিল!’

শেষ কথা দুটো বলেই জিভ কাটল পরান। অনুনয় করে বলল, ‘আমাকে মাপ করবেন, স্যার। বাড়ির কাজের লোক হয়ে অনেক আস্পর্ধার কথা বলে ফেলেছি। এসব কথা যেন বড়দা-ছোড়দারা জানতে না পারেন। আসলে দোষ তো আমারও নয়। বড়বাবুদের সঙ্গে জীবনের অনেকগুলো বছর জড়িয়ে গেছে। বড়দাদের সব আমিই কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। বড়বাবু আমার সঙ্গে কক্ষনও চাকরের মতো ব্যবহার করতেন না। বরং একা-একা দুঃখ করতেন। বলতেন, পরান, তোর মা-কে আমি কথা দিয়েছিলাম ছেলেমেয়েদের আমি মানুষ করে তুলব। তুই তো জানিস, ওদের জন্যে আমি কী পরিশ্রম করেছি—কত কষ্ট সয়েছি! কিন্তু তার ফল কী হল? শূন্য! আমার বুকটা একেবারে শূন্য হয়ে গেছে রে, পরান, শূন্য হয়ে গেছে…।’

কথাগুলো বলতে-বলতে পরানের চোখে জল এসে গিয়েছিল। পরনের গেঞ্জি দিয়ে চোখ মুছতে লাগল ও।

ইন্দ্রজিতের কাছে পারিবারিক ছবিটা ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছিল। ছেলেমেয়েদের লোভের উৎপাতে অতিষ্ঠ এক স্নেহময় ধনী পিতা। সত্যি, জিতেন্দ্রনাথের জন্য বেশ কষ্ট হয়!

‘শেষদিকটায় বড়বাবু প্রায়ই বলতেন, ওদেরকে শিক্ষা দেওয়া দরকার। উচিত শিক্ষা। যাতে ওরা স্নেহ-ভালোবাসা ভাঙিয়ে আমার কাছ থেকে আর সুযোগ নিতে না পারে। লোভ ওদের শেষ করে দিয়েছে। ওদের কাছে সম্পর্কের আর কোনও দাম নেই।’

কথা শেষ করে হতাশায় মাথা নাড়ল পরান।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ইন্দ্রজিৎ। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে, পরান—তুমি এখন যাও। এসব কথা আর কাউকে বলার দরকার নেই। যদি সে-রকম বুঝি, তা হলে তোমার সঙ্গে পরে আবার কথা বলব।’

পরান উঠে দাঁড়াল। ইন্দ্রজিৎকে নমস্কার করে ধীরে-ধীরে চলে গেল ঘর ছেড়ে।

কবজি উলটে ঘড়ি দেখল ইন্দ্রজিৎ। প্রায় ছ’টা বাজে। ঘরের কোয়ার্ৎজ ওয়াল-ক্লকটা পাঁচ মিনিট ফাস্ট। নাকি ইন্দ্রজিতেরটা পাঁচ মিনিট স্লো।

এমন সময় মহেন্দ্র সেন ঘরে এসে ঢুকলেন। স্মিত হেসে বললেন, ‘মিস্টার চৌধুরী, আসুন, একটু চায়ের ব্যবস্থা করেছি। দরকার হলে চায়ের পর আবার কাজ শুরু করবেন…।’

‘চলুন—’ বলে মহেন্দ্রকে অনুসরণ করে ড্রইং-ডাইনিং স্পেসে এসে হাজির হল ইন্দ্রজিৎ আর জিনি।

এসে দেখল দশরথ চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া শুরু করেছে।

চা খেতে-খেতে ইন্দ্রজিৎ জিতেন্দ্রনাথের একটা ফটো দেখতে চেয়েছিল। মহেন্দ্র উত্তরে বলেছেন, ‘চা শেষ করে আমার ঘরে চলুন—ফটোও দেখাব, আর চিঠিটাও দেখাব।’

সুতরাং জিনি আর দশরথকে সোফায় বসিয়ে রেখে ইন্দ্রজিৎ মহেন্দ্রর সঙ্গে দোতলায় গেলেন। জিনি তখন মুগ্ধ চোখে ঘরে নানান আসবাবপত্র দেখছে। আর দশরথ এমনভাবে ড্রইং-ডাইনিং স্পেসে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন স্রেফ ঘ্রাণশক্তি দিয়েই সে যাবতীয় রহস্য উদঘাটন করে ফেলবে।

দোতলায় নিজের ঘরের ইন্দ্রজিৎকে বসিয়ে মহেন্দ্র একটা ডেস্কের কাছে গেলেন। একটা ভাঁজ করা চিঠি বের করে ইন্দ্রজিতের হাতে এনে দিলেন।

‘আমাদের লেখা বাবার শেষ চিঠি। হাতের লেখাটা বাবার—আমরা চেক করে দেখেছি।’

ইন্দ্রজিৎ চিঠিটা খুলে দেখল।

কাগজের দু-পিঠে কালো কালি দিয়ে লেখা। বেশ বড় চিঠি।

‘চিঠিটা পড়ে আমাদের মনে হয়েছে, বাবা যেন জানতেন উনি আর বেশিদিন নেই। এটাকে কি আপনি সিক্সথ সেন্স বলবেন?’

‘আপনার কি ধারণা জিতেনবাবু আর বেঁচে নেই?’

‘সে-রকমই তো মনে হচ্ছে। কিডন্যাপাররা যখন আর কোনও সাড়া শব্দ করছে না…।’

ইন্দ্রজিৎ হাসল: ‘যে-হাঁস সোনার ডিম পাড়ে তাকে কখনও কেউ খতম করে! হয়তো অন্য কোনও কারণে কিডন্যাপাররা চুপচাপ রয়েছে। তারপর…সময় এলে…আপনাদের ফোন করবে।’

ইন্দ্রজিৎ এবার চিঠিটা পড়তে শুরু করল। এয়ারকুলারের ঠান্ডা বাতাসে ওর বেশ শীত-শীত করছিল। মহেন্দ্রকে ওটা কমিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল।

চিঠিতে তিন ছেলেমেয়েকেই সম্বোধন করেছেন জিতেন্দ্রনাথ। তারপর লিখেছেন:

‘…পনেরো বছর আগে তোমাদের মা সীমন্তিনী যখন চলে যায় তখন আমি তাঁকে কথা দিয়েছিলাম, তোমাদের মানুষের মতো মানুষ করব। কিন্তু ব্যবসার চাপ, অন্ধ স্নেহ, আর তোমাদের লোভ আমার প্রতিজ্ঞা ছত্রখান করে দিয়েছে। এখন একা, গোপনে, তোমাদের মায়ের ছবির কাছে চোখের জল ফেলা ছাড়া আমার আর কোনও গতি নেই। ভুল আমারই—আমিই তোমাদের ঠিকমতো শাসন করতে পারিনি। আর শাসন করার পক্ষে এখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে।

পিতা হিসেবে আমি ব্যর্থ হয়েছি। তোমাদের মানসিক অত্যাচারে আমি ক্লান্ত। আমার সামনে আর কোনও পথ খোলা নেই। তাই যে-একমাত্র পথ খোলা আছে সেই পথেই আমি যাব। না, না—ভুলেও ভেব না আমি সুইসাইড করার কথা ভাবছি। আমার সেই একটিমাত্র পথ হল একটা নিষ্ঠুর গোপন কথা তোমাদের সামনে তুলে ধরা। এ-কথা জানাতে আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু এখন আর ফেরার কোনও পথ নেই। তোমরাই এই কাজে আমাকে বাধ্য করেছ।

আমার যত ধন-সম্পত্তি, গাড়ি-বাড়ি, ফ্যাক্টরি—কোনও কিছুরই মালিকানা আমার একার নয়। আমি শতকরা মাত্র কুড়িভাগের মালিক—বাকি আশিভাগের মালিক আমার ছোটবেলার বন্ধু অনিমেষ সরকার। ওরা আরামবাগের বনেদি বড়লোক। আমার সঙ্গে ওর নিয়মিত টেলিফোনে যোগাযোগ আছে। অনিমেষ যে-কোনও মুহূর্তে এসে দলিলমাফিক ওর অংশ বুঝে নিলে আমার—এবং তোমাদের—অবস্থা হবে পথের ভিখিরির মতো। কিন্তু অনিমেষ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। ছোটবেলায় আমরা ছিলাম হরিহর-আত্মা। তাই কখনও ও এইসব সম্পত্তিতে ওর অংশ আছে বলে ভাবেনি। ধম-কর্ম পুজো-আচ্চা নিয়েই এখন ও জীবন কাটায়। আর আমি সুখে আছি জানলেই ও সুখী।

সম্প্রতি অনিমেষকে আমি আমার মানসিক দূরবস্থার কথা জানিয়েছি। ও তাতে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। লোভকে ও ঘৃণা করে। লোভীদের আরও বেশি। আমি ওকে চিঠি দিয়ে বলেছি, এখানে এসে ওর সমস্ত সম্পত্তি বুঝে নিয়ে ও যেন আমাকে মুক্তি দেয়। ও উত্তরে আসবে বলে জানিয়েছে। যে-কোনও দিন ও এসে হাজির হতে পারে। ওকে অমান্য বা অসম্মান করার সাহস আমার নেই—আশা করি তোমরাও তা করবে না। অবশ্য ও খুব কড়া ধাতের সাত্ত্বিক মানুষ। অভব্যতা দেখলে ও সঙ্গে-সঙ্গে শাস্তি দিতে পারে। তা ছাড়া এই বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা—সবকিছুরই তো ও আশিভাগের মালিক। ভাবছি, আমার কুড়ি ভাগও ওকে লিখে দিয়ে আমি মুক্তি নেব। তোমরা হয়তো মামলা করতে চাইবে…করে দেখো,অনিমেষ তার কেমন জবাব দেয়। ও কখনও অন্যায়ের কাছে কাবু হতে শেখেনি। ওকে সব দিয়ে দিলে আমি হয়তো পথের ভিখিরি হব, কিন্তু তাতে আমার আপত্তি নেই। তার বদলে অন্তত সুখ-শান্তি তো ফিরে পাব। তাই এখন আমি অনিমেষের আসার অপেক্ষায় দিন গুনছি।

যদি আমার হঠাৎ করে কিছু হয়, তাই তোমাদের সব কথা জানিয়ে রাখলাম।

ইতি—

হতভাগ্য

জিতেন্দ্রনাথ সেন

চিঠিটা বারদুয়েক খুঁটিয়ে পড়ল ইন্দ্রজিৎ। তারপর বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন—উনি যেন জানতেন ওঁর খারাপ কিছু একটা হবে।’

‘হ্যাঁ—সেটাই তো আপনাকে বলছিলাম। চিঠিটা বাবার বেডরুমে একটা টেবিলের ওপরে পেপারওয়েট চাপা দেওয়া ছিল।’

‘আপনার বাবার একটা ফটো দেখাতে পারেন?’

‘একমিনিট। এক্ষুনি নিয়ে আসছি।’ মহেন্দ্র ফটোর জোগাড় করতে চলে গেলেন।

ইন্দ্রজিৎ দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল। সঙ্গে-সঙ্গে কানে এল মিহি গলার কেউ গান গাইছে। সুরেন্দ্র গলা সাধছেন।

শুনে হাসি পেয়ে গেল ইন্দ্রজিতের। গানের জন্য এ-গলা তৈরি হয়নি। এ-গলা তৈরি হয়েছে শুধু দেহকে মাথার সঙ্গে জুড়ে রাখার জন্য। তবে একটা ব্যাপার ইন্দ্রজিতের ভালো লাগল। সুরেন্দ্র একজন নামী গায়িকার গাওয়া গানই প্র্যাকটিস করছেন। অর্থাৎ সুরেন্দ্র গায়ক নয়, গায়িকা হওয়ারই চেষ্টা করছেন।

মহেন্দ্র একটা অ্যালবাম নিয়ে ফিরে এলেন। তার একটা পৃষ্ঠা খুলে ইন্দ্রজিৎকে দেখালেন। বছরতিনেক আগে চারদিনের ফুরসত পেয়ে জিতেন্দ্রনাথ তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে সিঙ্গাপুর বেড়াতে গিয়েছিলেন। ফটোটা সেখানেই তোলা। আলো-ঝলমলে একটা রাস্তায় জিতেন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে। পিছনে দূরে একটা বাড়ির মাথায় গ্লো-সাইনে তৈরি একটা ড্রাগনের ছবি দেখা যাচ্ছে।

জিতেন্দ্রনাথকে খুঁটিয়ে দেখল ইন্দ্রজিৎ।

লম্বা দোহারা চেহারা। মাথায় বিস্তৃত টাক—শুধু দু-কানের পাশে চুলের ঝালর। চোখে চশমা নেই। নিশ্চয়ই কনট্যাক্ট লেন্স পরেছেন। প্যান্ট-শার্ট পরা জিতেন্দ্রনাথকে বেশ সুপুরুষই দেখাচ্ছে। ইন্দ্রজিতের মনে হল, সীমন্তিনী মারা যাওয়ার পর উনি অনায়াসেই বিয়ে করতে পারতেন।

ইন্দ্রজিৎ বলল, ‘এই ফটোটা আর এই চিঠিটা—’ হাতের চিঠিটা দেখাল ইন্দ্রজিৎ, ‘আমি একটু রাখছি। কপি করে কাল বা পরশু আপনাকে ফেরত দেব।’

মহেন্দ্র রাজি হয়ে ঘাড় নাড়লেন। ফটোটা অ্যালবাম থেকে খুলে ইন্দ্রজিতের হাতে দিলেন।

‘আমি এবার আপনার ভাই-বোনের সঙ্গে একটু কথা বলব…তারপর নীচে যাচ্ছি।’

ইঙ্গিতটা ধরতে পেরে মহেন্দ্র নির্লিপ্ত মুখে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন।

ইন্দ্রজিৎ পায়ে-পায়ে সুরেন্দ্রর ঘরে গিয়ে হাজির হল।

সুরেন্দ্রর ঘরের দরজা খোলাই ছিল। এ-ঘরে এসি নেই।

বড় মাপের ঘর। ঘরের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ আর লতা মঙ্গেশকারের বাঁধানো ফটো ঝুলছে। এখানে-ওখানে হারমোনিয়াম, তানপুরা, তবলা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। গোটা ঘরটায় কেমন অগোছালো ভাব। শিল্পীর ঘর বোধহয় এরকমই হয়।

ঘরের ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে একটা শৌখিন শো-কেস। তাতে যত রাজ্যের ক্যাসেট। আর একপাশে শিভাস রিগালের বোতল এবং চারটি নকশা-কাটা কাচের গেলাস। শো-কেসের ওপরে বসানো রয়েছে চার হাজার পি. এম. পি. ও.-র একটি সনি সাউন্ড সিস্টেম। তার স্পিকার দু-দিকের দেওয়ালে বসানো।

সুরেন্দ্র হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছিলেন। ইন্দ্রজিৎকে দেখেই গানবাজনা থামিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সৌজন্যেই হাসি হেসে বললেন, ‘আসুন—।’

মেঝেতে দামি কার্পেট পাতা ছিল। সেখানে ইন্দ্রজিতকে বসতে অনুরোধ করে সুরেন্দ্র নিজেও বসলেন।

‘আমাকে কিছু জিগ্যেস করবেন?’

‘হ্যাঁ।’ মাথার চুলে হাত বুলিয়ে নিয়ে বলল ইন্দ্রজিৎ, ‘আপনার বাবার কিডন্যাপিং সম্পর্কে আপনার কি আইডিয়া?’

একটু ইতস্তত করে সুরেন্দ্র চাপা গলায় বললেন, ‘ওপেনলি বলব?’

‘অফ কোর্স!’

‘আমার মনে হয় এটা দাদার কাজ!’

ইন্দ্রজিৎ চমকে উঠল। সুরেন্দ্রকে এমনিতে দেখে ওর ভিতু মনে হয়েছে। সুরেন্দ্র যে ওঁর দাদার নামে এরকম অভিযোগ করতে পারেন সেটা ও কল্পনাও করেনি। মনে-মনে নিজের কানটা মুলে দিল ইন্দ্রজিৎ। একজন তুখোড় ডিটেকটিভকে সবরকম সম্ভাবনার কথা হিসেবে রাখতে হয়।

‘আপনার এরকম মনে হল কেন?’

‘দাদা নিত্যনতুন বিজনেস দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে। সেজন্যে ওর মাঝে-মাঝেই অনেক টাকার দরকার হয়। এই তো শুনলাম এখন না কি গ্লাসউলের ফ্যাক্টরি খুলবে বলে ভাবছে। আসলে দাদার ব্যবসার কোনও মাথা নেই…।’

ইন্দ্রজিৎ বাধা দিয়ে বলল, ‘যাঁর ব্যবসার মাথা নেই তাঁর কিডন্যাপিং-এ মাথা থাকবে?’

‘খুব থাকবে!’ প্রায় মুখ ভেংচে বললেন, সুরেন্দ্র, ‘হাতে টাকা পাওয়ার জন্যে দাদা মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর ব্যবসার বুদ্ধি না-থাকলে কি কারও মাথায় বদমাইশি বুদ্ধি থাকতে পারে না!’

‘তাই যদি হয়, তা হলে মহেন্দ্রবাবু আমার কাছে গেলেন কেন? এতে তো ওঁরই অসুবিধে হবে—।’

‘সাধ করে কি আর গেছে! আসলে আশপাশের লোকজন পাঁচরকম কথা বলছে, তাই।’

ইন্দ্রজিৎ কিছুক্ষণ চুপ করে কী ভাবল। তারপর আচমকা বলল, ‘আপনি তো লাস্ট শনিবার জিতেনবাবুর সঙ্গে খুব তর্কাতর্কি করেছেন। গানবাজনার দল নিয়ে আপনি কোন বিদেশে যাচ্ছেন?’

সুরেন্দ্রর মুখ থেকে পলকে সব রক্ত সরে গেল।

‘কে বলেছে আপনাকে? নিশ্চয়ই পরানদা!’

সুরেন্দ্রর গলা মেয়েলি হলে কী হবে, ওঁর বুদ্ধির কোনও ঘাটতি নেই। ভাবল ইন্দ্রজিৎ।

‘যে-ই বলুক—ব্যাপারটা তো সত্যি।’

মাথা নীচু করলেন সুরেন্দ্র। কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে তাকালেন ইন্দ্রজিতের দিকে ‘বাবার কালচার বলে কিছু ছিল না। গানবাজনার লেভেলটা বাবা ঠিক বুঝত না।…মা কিন্তু এরকম ছিল না।’

‘আপনার অনেক স্বপ্ন আছে, সুরেন্দ্রবাবু।’ রবীন্দ্রনাথের ছবির দিকে তাকিয়ে বলল ইন্দ্রজিৎ, ‘স্বপ্ন সবারই থাকে—স্বপ্ন থাকাটা দোষের নয়। তবে কথাটা কী জানেন, জিতেনবাবুরও হয়তো কিছু স্বপ্ন ছিল…।’

‘সেটা আমরা তিন ভাই-বোনে চুরমার করে দিয়েছি!’ খানিকটা ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন সুরেন্দ্র।

‘ওঁর অনেক দুঃখ-কষ্ট ছিল।’

‘দুঃখ-কষ্ট আমার নেই! আপনি জানেন, আমার এই মেয়েলি গলার জন্যে কত অপমান আমাকে ছোটবেলা থেকে সহ্য করতে হয়েছে—এখনও হয়! আমার ছোটবোন পর্যন্ত আমাকে এ-নিয়ে ব্যঙ্গ করে, খোঁটা দেয়!’

ইন্দ্রজিৎ উঠে দাঁড়াল: ‘নিশ্চয়ই এই দুঃখ-কষ্টের প্রতিবাদে আপনি জিতেনবাবুকে কিডন্যাপ করেননি?’

সুরেন্দ্রর ফরসা মুখে রক্তের ঝলক ঝাপটা মারল। কথা বলতে গিয়ে উত্তেজনায় ওঁর গলা চিরে গেল: ‘বাঃ, চমৎকার! এই না-হলে ডিটেকটিভ! আপনি বরং আমাকে অ্যারেস্ট করুন। অনিমেষকাকা বাড়িতে থাকলে আপনার এই ইনসাল্টের যোগ্য জবাব দিত। আপনার আর নবনীতার মধ্যে কোনও ডিফারেন্স নেই দেখছি!’

সুরেন্দ্রর অভিমান ইন্দ্রজিৎকে ছুঁয়ে গেল। ও বলল, ‘সরি, আমি ঠিক সিরিয়াসলি কথাটা বলিনি। এমনি ঠাট্টা করে বলছিলাম…।’

সুরেন্দ্র একটু স্বাভাবিক হলেন। দাঁত দিয়ে বারদুয়েক ঠোঁট কামড়ালেন। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন।

‘আচ্ছা, আপনার বাবার বন্ধু অনিমেষ সরকার কি খুব কড়া ধাতের লোক?’

‘হ্যাঁ…বাবার তুলনায় তো বটেই!’

‘জিতেনবাবুর চিঠির কথা তো আপনি সব জানেন!’

‘হ্যাঁ—দাদা সবাইকে ওটা পড়ে শুনিয়েছিলেন।’

‘চিঠির কথা সব সত্যি?’

ইতস্তত করে সুরেন্দ্র বললেন, ‘প্রথমটা তো বিশ্বাস হতে চায়নি। পরে, অনিমেষকাকা আসার পর বুঝলাম, শুধু সত্যি নয়—হাড়ে-হাড়ে সত্যি। টাকা-পয়সা, কোম্পানি—সবকিছুরই কন্ট্রোল অনিমেষকাকার হাতে।’

মনে-মনে হেসে ফেলল ইন্দ্রজিৎ। সবকিছুর কন্ট্রোল হাতে থাকায় অনিমেষবাবুর ‘অনিমেষকাকা’ হয়ে উঠতে আর দেরি হয়নি। এ-দুনিয়ায় লক্ষ্মী বড় শক্তিশালী!

‘আচ্ছা, সুরেন্দ্রবাবু—থ্যাঙ্ক য়ু ফর কোঅপারেশান। পরে দরকার হলে আবার কথা বলব। আপনার ছোটবোনের ঘরটা কোনদিকে?’

অদ্ভুত চোখে ইন্দ্রজিতের দিকে তাকিয়ে বারান্দার শেষ প্রান্তের একটা ঘরের দিকে আঙুল দেখালেন সুরেন্দ্র। তারপর চাপা গলায় বললেন, ‘একটু কেয়ারফুল থাকবেন। খরচের টাকায় টান পড়ায় নীতা খুব চটে আছে। কাল ও অনিমেষকাকার কাছে টাকা চাইতে গিয়েছিল—অনিমেষকাকা স্রেফ ”না” করে দিয়েছেন। নীতা অনিমেষকাকার ওপরে একেবারে ফায়ার হয়ে আছে। বাবা ফিরে না এলে আমাদের এই দম আটকানো অবস্থা কাটবে না।’

সুরেন্দ্র ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ইন্দ্রজিৎকে বিদায় দিলেন।

ইন্দ্রজিৎ মার্বেল পাথরের বারান্দায় পা ফেলে নবনীতার ঘরের দিকে এগোল।

ঘরে ঢুকতেই এয়ারকুলারের ঠান্ডা ছোঁয়া ইন্দ্রজিৎকে জড়িয়ে ধরল। আর একইসঙ্গে হালকা পারফিউমের গন্ধ ওকে আদর করল।

ঘরে কোথাও আলতো মিউজিক বাজছিল—কিন্তু শব্দটা ঠিক কোন দিক থেকে আসছে সেটা ঠাহর করা যাচ্ছিল না।

দরজার পাল্লা ঠেলে ঢোকার সময় নক করেছিল ইন্দ্রজিৎ। আর তখনই বিছানায় শুয়ে থাকা নবনীতা ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে ছিল ইন্দ্রজিতের দিকে। সুন্দর করে হেসে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল: ‘কাম অন ইন, শালর্ক। বড়দা বলছিল আপনার নাম না কি ইন্দ্রজিৎ? তা ইন্দ্রের সঙ্গে কতটা মিল আপনার?’

কথা বলতে-বলতে বিছানায় উঠে বসল নবনীতা। অবাধ্য চুলগুলোকে মাথার এক মনোরম ঝাঁকুনিতে পিঠের দিকে ফেরত পাঠাল। তারপর তেরছা চোখে তাকিয়ে রইল ইন্দ্রজিতের দিকে—যেন একটু আগের প্রশ্নটার জন্য অপেক্ষা করছে।

‘ধর্ম-টর্ম কিংবা দেবতা নিয়ে আমার তেমন একটা চর্চা নেই, ম্যাডাম। আমার কারবার অধর্ম আর শয়তান নিয়ে। বাট আই ডু লাভ ইট।’

‘ও—’ করে অদ্ভুত এক শব্দ করল নবনীতা। বসে-বসেই শরীরটাকে লাট্টুর মতো ঘুরিয়ে পা দুটো বিছানার বাইরে ঝুলিয়ে দিল। ভুরু কপালে তুলে প্রশংসার ঢঙে বলল, ‘স্মার্ট! স্মার্ট! আই ডু লাভ ইট। বিউটি আর ব্রেইন একই শরীরে…উঃ, ভাবা যায় না!’

দেওয়ালে নবনীতার অনেকগুলো ফটোগ্রাফ পোস্টারের মতো করে লাগানো ছিল। তাতে নবনীতাকে নানান পোশাকে দেখা যাচ্ছে। পোশাকগুলোর বেশিরভাগই বিদেশের সি-বিচে মানানসই।

অবশ্য নবনীতার এখনকার পোশাকটাও অনেকটা সেই ধরনের। পোশাকটা ম্যাক্সিগোছের, তবে গোড়ালি পর্যন্ত নয়। হালকা নীল আর সাদা জমিতে সুতোর কাজ করা। কাপড়টা এমনই স্বচ্ছ যে, বোঝা যাচ্ছে নবনীতা অন্তর্বাস পরেছে।

‘বলুন, মিস্টার, ডিটেকটিভ, আমার কাছ থেকে ডিটেইলে কী জানতে চান?’ ঠোঁট উলটে বলল নবনীতা। একটু থেমে তারপর: ‘ওই চেয়ারটায় বসতে পারেন—’ ইশারায় হাততিনেক দূরের একটা চেয়ার দেখাল ‘…অথবা এইখানটায় বসতে পারেন।’ বিছানায় ঠিক ওর পাশটায় আলতো চাপড় মারল নবনীতা। তারপর খিলখিল করে জলতরঙ্গ শুনিয়ে দিল।

ইন্দ্রজিৎ বখে-যাওয়া মেয়েটাকে একপলক দেখল। তারপর চেয়ারটায় গিয়ে বসল।

‘আপনি মডেলিং করেন?’

বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছিল নবনীতা। পা দোলানো থেমে গেল: ‘কেন, আপনার আপত্তি আছে?’

হাসল ইন্দ্রজিৎ: ‘কেউ নিজের ইচ্ছায় উচ্ছন্নে গেলে আমার আপত্তি করার কী আছে!’

‘উচ্ছন্নে! কী বলতে চান আপনি! জানেন ফ্যাশান টি-ভি চ্যানেলে আমাকে দেখিয়েছে!’

‘বুঝেছি—আপনি নিজেকে ভীষণ দেখাতে চান। কিন্তু কেউ যদি দেখতে না-চায়?’

রাগে থমথম করছিল নবনীতার মুখ। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত ছুড়ে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, ওকে ইশারায় থামতে বলল ইন্দ্রজিৎ। তারপর: ‘ধীরে, ম্যাডাম, ধীরে। আমি আপনার বড়দা বা ছোড়দা নই। আর, বড়লোক হলেই কি অসভ্য হতে হবে!’

নবনীতার ভেতরটা কিছু একটা করার জন্য নিশপিশ করছিল। ওর চোখে আগুন জ্বলছিল। আক্রোশ-ভরা চোখে ইন্দ্রজিৎকে দেখছিল ও।

‘আপনার বাবাকে কিডন্যাপ করার পেছনে কার হাত আছে বলে মনে হয়?’ শান্ত গলায় জিগ্যেস করল ইন্দ্রজিৎ।

নবনীতা রাগে গুম করে ছিল। কাটা-কাটা জবাব দিল ‘জানি না।’

‘আপনার ছোড়দা বলছিলেন যে, মহেন্দ্রবাবুর হাত থাকলেও থাকতে পারে—।’

‘হুঁঃ! ছোড়দা পুরুষ না কি! শুধু অন্যদের হিংসে করে। নিজের ইমপোটেন্সি ঢাকতে অন্যের নামে কাদা ছেটায়।’

‘অনিমেষবাবু কেমন লোক?’

‘খুব ভালো—’ ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল নবনীতা, ‘শুধু বাবার ঠিক উলটো। ওই লোকটা যে সত্যি-সত্যি সবকিছুর মালিক সেটা ওর কথাবার্তায় বোঝা যায়। এক নম্বরের কঞ্জুস! সবসময় পুজো-আর্চ্চা নিয়ে থাকার ভান করে, গেরুয়া পাঞ্জাবি পরে—বলে, ওটা নাকি খুব পবিত্র রং। আসলে পুরোটাই ঢং।’

ইন্দ্রজিৎ মনে-মনে সবকিছু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল।

অনিমেষ সরকারের ওপরে তিন ভাই-বোনের রাগ থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ, শুনে যতদূর মনে হচ্ছে, কড়া ধাতের কঞ্জুষ মানুষ কখনও স্নেহকাতর পিতার বিকল্প হতে পারে না। সুতরাং জিতেন্দ্রনাথকে ফিরিয়ে আনাটা দারুণ জরুরি। কিন্তু তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন? বিছানার চাদরের ওই রক্তের দাগ বলতে চাইছে কিডন্যাপাররা নিষ্ঠুর, হিংস্র। কিন্তু ওই রক্ত কি সত্যিই জিতেন্দ্রনাথের? নাকি অন্য কারও? ল্যাব রিপোর্ট পাওয়ার আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।

‘অনিমেষ সরকার কি এ-বাড়িতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছেন?’ ইন্দ্রজিৎ জানতে চাইল।

‘মানিয়ে নেওয়ার আর কী আছে!’ হাত উলটে জবাব দিল নবনীতা, ‘উনিই প্রায় সবকিছুর মালিক। দিব্যি খাচ্ছেন-দাচ্ছেন-ঘুরছেন, এনজয় করছেন—আর আমাদের তেষ্টার ছটফটানি দেখছেন। বিনাপয়সার সার্কাস।’

ইন্দ্রজিৎ বিদায় নিতে যাচ্ছিল—হঠাৎই একতলার ড্রইং-ডাইনিং স্পেস থেকে প্রবল ধমকানির চিৎকার ওর কানে এসে ঢুকল।

ভরাট গলায় কেউ চিৎকার করে বলছে, ‘ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী আমাদের বাড়িতে এসেছেন চারটের সময়—আর এখন প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। অথচ তোমরা কেউ আমাকে খবরটা দেওয়ার দরকার মনে করোনি! মহেন্দ্র, জিতেনের কাছে আগেই শুনেছিলাম তুমি একটু স্টুপিড টাইপের। এখন দেখছি ও ঠিকই বলেছে। কমনসেন্স বলেও তোমার কিছু নেই। তোমার কাছে সেন্সের মানে একটাই: ননসেন্স।’

ইন্দ্রজিৎ বারান্দায় চলে এল। সেখান থেকেই পাখির চোখে দৃশ্যটা দেখতে পেল।

জিনি আর দশরথের সোফার কাছাকাছি একটা জটলা মতন। সেখানে মহেন্দ্র, পরান এবং আরও একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে।

ইন্দ্রজিৎ লক্ষ করল, নবনীতা দরজা ফাঁক করে নীচের তলার ঘটনা দেখতে চেষ্টা করছে।

ইন্দ্রজিৎ তরতর করে সিঁড়ি নামতে লাগল। নামতে-নামতেই কথাবার্তাগুলো ওর কানে আসছিল।

মহেন্দ্র মিনমিন করে বলছিলেন, ‘না…মানে…আপনি বাড়িতে নেই। কী করে খবর দেব ঠিক বুঝতে…।’

‘না-বোঝার কী আছে! তোমাদের কাছে তো আমার মোবাইল নাম্বার রয়েছে!’

আর কোনও উত্তর নেই। মহেন্দ্র মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

ইন্দ্রজিৎ ওঁদের সামনে এসে দাঁড়াল। ওর খুব খারাপ লাগছিল। হয়তো মহেন্দ্রদের এরকম রুক্ষ শাসনের লাগামেই রাখা দরকার, কিন্তু তাই বলে পরানের সামনে, বাইরের গেস্টদের সামনে!

অনিমেষ সরকারকে ভালো করে দেখল ইন্দ্রজিৎ।

মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, চোখে হাই-পাওয়ার চশমা, নাকটা অস্বাভাবিক মোটা, গালে হালকা চাপদাড়ি।

পরনে, নবনীতা যেমনটি বলেছিল, গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা। হাতে সাধারণ একটা লাঠি। হয়তো চলার সময় ভর দেওয়ার দরকার হয়। লাঠিটা দেখে নতুন বলে মনে হল।

ইন্দ্রজিৎ পরিচয় দিয়ে একগাল হাসতেই অনিমেষ সরকারের মুখের রুক্ষতা কেটে গেল। কপালে ফুটে ওটা বিরক্তির ভাঁজও গেল মিলিয়ে।

‘আসুন, মিস্টার চৌধুরী, আমার ঘরে আসুন। আপনাদের আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি হয়নি তো?’

ইন্দ্রজিৎ বিনীতভাবে জানাল যে, না, হয়নি। তারপর বলল, ‘আপনি ঘরে যান—ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ওঁদের সঙ্গে দু-মিনিট কথা বলেই যাচ্ছি—’ ইশারা করে দশরথ আর জিনিকে দেখাল ইন্দ্রজিৎ।

‘ওইটা আমার ঘর—মানে, আপাতত ওখানেই আশ্রয় নিয়েছি।’ জিতেন্দ্রনাথের ঘরের লাগোয়া একটা ঘর দেখালেন অনিমেষ। তারপর লাঠিতে ভর দিয়ে সামান্য খুঁড়িয়ে হেঁটে এগোলেন সেই ঘরের দিকে।

পরান ইতস্তত পায়ে ওঁকে অনুসরণ করল।

মহেন্দ্র অপ্রস্তুতভাবে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ‘আমি আসছি’ বলে চলে গেলেন।

ইন্দ্রজিৎ জিনির পাশে সোফায় গিয়ে বসল।

‘জিনি, ভেবেছিলাম দোতলায় গিয়ে ইন্টারোগেট করার সময়েও তোমাকে সঙ্গে থাকতে বলব, তুমি নোট নেবে—কিন্তু তাতে সিচুয়েশানটা এত এমব্যারাসিং হয়ে যেত যে…’ কথা শেষ করল না ইন্দ্রজিৎ।

জিনি মুখ ভার করে বলল, ‘বসে-বসে শুধু বোর হচ্ছি। দশরথদা যত রাজ্যের ডিটেকটিভ গল্প শুনিয়ে আমাকে আরও বোর করে দিচ্ছে।’

দশরথ আমতা-আমতা করে হেসে বলল, ‘ইনভেস্টিগেশানের মূল মন্ত্রটা ওঁকে বোঝাতে চাইছিলাম।’

‘সেটা কী?’ ইন্দ্রজিৎ জানতে চাইল।

দশরথ গম্ভীরভাবে বলল, ‘ইনভেস্টিগেট, ইনভেস্টিগেট, ইনভেস্টিগেট। শুধু তদন্ত করে যাও, তা হলেই ফল মিলবে।’

ইন্দ্রজিৎ হেসে ফেলল। তারপর জিনিকে বলল, ‘কয়েকটা ইমপরট্যান্ট পয়েন্ট খুব তাড়াতাড়ি লিখে নাও। পরে হয়তো মাথা থেকে বেরিয়ে যাবে।’

জিনি নোট-প্যাড আর পেনসিল নিয়ে তৈরি হল।

ইন্দ্রজিৎ সংক্ষেপে গড়গড় করে কিছু তথ্য আর কিছু মন্তব্য বলে গেল। জিনি পেশাদারি ঢঙে সেগুলো শর্টহ্যান্ডে লিখে নিল।

দশরথ কান খাড়া করে ইন্দ্রজিতের কথাগুলো শুনতে লাগল, আর মাঝে-মাঝে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়তে লাগল।

ডিক্টেশান দেওয়া শেষ হতেই ইন্দ্রজিৎ অনিমেষ সরকারের ঘরের দিকে পা বাড়াল।

মার্বেল পাথরের মেঝেতে আলোর কুচির নকশা ছড়িয়ে ছিল। তার উৎস খুঁজতে মুখ তুলে ওপরে তাকাল ইন্দ্রজিৎ।

কাট গ্লাসের ঝাড়লণ্ঠন থেকে আলোর টুকরো নানান দিকে ঠিকরে পড়ছে।

অনিমেষ সরকারের ঘরটা মাপে ছোট, তবে ছিমছামভাবে সাজানো। ঘরের এককোণে একটা ছোট টেবিলের ওপরে পাশাপাশি শিব ও কালীর ফটো—তাতে চন্দনের টিপ লাগানো।

খাটের ওপরে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন অনিমেষ। ইন্দ্রজিৎকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন: ‘আসুন, আসুন। ওই চেয়ারটায় বসুন।’

আগে ততটা খেয়াল করেনি, কিন্তু এখন ইন্দ্রজিৎ লক্ষ করল, অনিমেষ সরকারের গলার স্বরটা কেমন যেন ফ্যাঁসফেসে।

ওঁর দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারটায় বসল ইন্দ্রজিৎ।

‘বলুন, জিতেনের খোঁজখবরের কোনও হদিশ পাওয়া গেল?’

কপালে ভাঁজ ফেলে ইন্দ্রজিৎ বলল, ‘এখনও পর্যন্ত পাইনি। তবে কতকগুলো ব্যাপারে খুব খটকা লাগছে। কিডন্যাপাররা মুক্তিপণ চাইতে এত দেরি করছে কেন। তারপর, কিডন্যাপিংটা যেভাবে হয়েছে—মানে, বাড়িতে এসে যেভাবে ওরা জিতেন্দ্রনাথকে তুল নিয়ে গেছে, তাতে কাজটা যে খুবই রিস্কি ছিল…। আই মিন, কিডন্যাপাররা হেভি রিস্ক নিয়েছিল। জেনারালি এতটা রিস্ক ওরা নেয় না। কিন্তু নিলই যখন, তা হলে টাকা চাইতে দেরি করছে কেন? যারা এত ডেসপারেট…।’

‘ঠিকই বলেছেন। জাস্টিফায়েড পয়েন্ট। তবে ওরা হয়তো চাইছে, কটা দিন যাক—ব্যাপারটা থিতিয়ে পড়ুক, তারপর…।’

‘কী জানি!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল ইন্দ্রজিৎ: ‘ওসব যাকগে, এবারে আপনার কথা বলুন। এ-বাড়িতে কেমন লাগছে?’

‘ভালো কী করে লাগবে বলুন!’ কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা একটা টি-টেবিলে নামিয়ে রাখলেন অনিমেষ: ‘যার সঙ্গে এতদিন পর দেখা করতে এলাম সে-ই নেই। তার ওপর এরকম বাজে খবর…আমার মনটাই কেমন ডিপ্রেসড হয়ে গেছে।’

‘মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র, নবনীতা ওদের কেমন বুঝছেন?’

‘হুঁঃ!’ প্রবল বিরক্তির একটা শব্দ করলেন অনিমেষ, ‘একেবারে উচ্ছন্নে গেছে! যে-কোনও কারণেই হোক, জিতেন ওদের বড্ড লাই দিয়ে মানুষ করেছে। আমাকে ও পরপর বেশ কয়েকটা চিঠিতে ওর দুঃখের কথা লিখেছিল। লাস্ট চিঠিটা পেয়েছিলাম দিনপনেরো আগে। এই দেখুন—’ খাট ছেড়ে উঠে পড়লেন অনিমেষ। দেওয়ালের সুদৃশ্য হুকে ঝোলানো ওঁর কয়েকটা জামাকাপড়ের কাছে গেলেন। সেগুলোর পকেট হাতড়ে-হাতড়ে একটা ভাঁজ করা চিঠি বের করলেন। সেটা খুলে একবার দেখে নিয়ে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে ইন্দ্রজিতের কাছে এলেন: ‘এটা পড়ে দেখুন, তা হলেই মোটামুটি সব বুঝতে পারবেন…।’

ইন্দ্রজিৎ চিঠিটা নিয়ে পড়ল।

হাতের লেখা যে জিতেন্দ্রনাথের তাতে কোনও সন্দেহ নেই। প্রাণের বন্ধুকে নিজের প্রাণের কথা লিখেছেন জিতেন্দ্রনাথ। বন্ধুকে এ-বাড়িতে আসার জন্য বারবার করে অনুরোধ করেছেন। বলেছেন, ‘…তোর বিষয়-সম্পত্তি তুই এবারে বুঝে নে। আমাকে মুক্তি দে। আমি বিবাগী হয়ে কোথাও চলে যাই। সংসারে আমার আর লোভ নেই।’

ইন্দ্রজিৎ চিঠিটা ফেরত দিয়ে জিগ্যেস করল, ‘আপন এ-চিঠির জবাব দেননি?’

‘না। ফোনে কথা বলেছিলাম।’ পা টেনে-টেনে খাটে গিয়ে বসলেন অনিমেষ, ‘ওকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম, তুই শক্ত হাতে ছেলেমেয়ের রাশ টেনে ধর। সব ঠিক হয়ে যাবে। ওদের শাসন করার সময় এখনও পেরিয়ে যায়নি।’

‘আপনার পায়ে কী হয়েছিল?’

‘পায়ে!’ ইন্দ্রজিতের আচমকা এই প্রশ্নে অনিমেষ কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘বছরদশেক আগে হিমাচল প্রদেশে বেড়াতে গিয়ে পায়ে চোট পেয়েছিলাম। ফিমার বোনের শ্যাফট ভেঙে গিয়েছিল। ডাক্তাররা স্টিলের প্লেট বসিয়ে ওটা মেরামত করেছে বটে, তবে পায়ে একটু দোষ থেকে গেছে।’ কথা শেষ করে মলিন হাসলেন অনিমেষ। চোখ থেকে চশমাটা খুলে পাঞ্জাবির খুঁট দিয়ে কাচ দুটো মুছলেন। তারপর আলোর দিকে চশমাটা তুলে ধরে কাচদুটো পরখ করে চশমাটা আবার চোখে দিলেন।

‘আপনি এ-বাড়িতে এসেই যখন শুনলেন জিতেনবাবু কিডন্যাপড হয়েছেন, তখন পুলিশে ইনফর্ম করার কথা বলেননি?’

‘না, বরং অন্যরকম সাজেশানই দিয়েছিলাম। মহেন্দ্রকে বলেছিলাম, পুলিশে খবর দিলে ব্যাপারটা পাঁচকান হবে। এতে সবারই লজ্জা। তা ছাড়া কিডন্যাপাররা শাসিয়েছে। পুলিশে ইনফর্ম করলে হয়তো জিতেনের বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যাবে। হয়তো জিতেনের সঙ্গে কোনওদিনই আমার আর দেখা হবে না…।’

গলার স্বর ভেঙে গিয়ে বুজে এল। অনিমেষ সরকার মুখ নীচু করলেন। পকেট থেকে নীল-কালো চেক-চেক একটা রুমাল বের করে চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ মুছলেন। তারপর কিছুটা সময় নিয়ে মুখ তুললেন। শক্ত গলায় বললেন, ‘সেইজন্যেই আমি পুলিশে খবর দিতে বারণ করেছি। জিতেনের বাড়িতে আমি এই প্রথম এলাম, অথচ ওর সঙ্গে দেখা হবে না—এটা ভাবা যায় না।’

‘জিতেনবাবু ফিরে আসার জন্যে আপনি কতদিন ওয়েট করবেন?’

‘দেখি…আরও সপ্তাদুয়েক তো বটেই! আশা করছি এরমধ্যে কিডন্যাপাররা যোগাযোগ করবে। ওরা যা-ই টাকা দাবি করুক দিয়ে দেব। টাকার অঙ্কে জিতেনের দাম মাপা যায় না। ও আমার কোন ছোটবেলার বন্ধু! জানেন, একবার…।’

জিতেন্দ্রনাথকে নিয়ে স্মৃতিচারণ শুরু করলেন অনিমেষ। স্কুলের গল্প, কলেজের গল্প, একসঙ্গে বেড়ানোর গল্প, বিয়ের গল্প, ব্যবসার গল্প…গল্পের আর শেষ নেই।

ইন্দ্রজিৎ মোটেই বিরক্ত হচ্ছিল না, বরং গভীর মনোযোগে শুনছিল। অনিমেষের কয়েকটা গল্প এমনই যে, খুব অন্তরঙ্গ বন্ধু ছাড়া জানা সম্ভব নয়।

কথার মাঝে পরান ঘরে এসে ঢুকল। অনিমেষের চায়ের কাপ-প্লেট তুলে নিয়ে ও চলে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই ওর চোখ পড়ল ইন্দ্রজিৎদের দিকে।

পরান যেন সামান্য অবাক হল। কিন্তু কিছু বলল না। আপনমনেই কীসব বিড়বিড় করতে-করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ইন্দ্রজিৎ অনিমেষ সরকারকে দেখছিল আর ভাবছিল কিডন্যাপিং-এর পিছনে এ-বাড়ির কেউ নেই তো! মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র, নবনীতা—ওঁরা কি স্রেফ টাকার লোভে জিতেন্দ্রনাথকে কিডন্যাপ করতে পারেন? আর অনিমেষ সরকার? উনি কি কিডন্যাপ করাতে পারেন জিতেন্দ্রনাথকে? কিন্তু সে নিশ্চয়ই টাকার লোভে নয়। অন্য আর কী কারণ থাকতে পারে?

কুয়াশা দিয়ে তৈরি একটা ছবি ইন্দ্রজিতের চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিল। ছবিটা স্পষ্ট হতে গিয়েও বারবার অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।

অনিমেষ সরকারের গল্প শেষ হলে ইন্দ্রজিৎ বলল, ‘একটুকরো কাগজে আপনার অ্যাড্রেস আর সেল-ফোন নাম্বারটা একটু লিখে দেবেন?’

‘কেন বলুন তো! এ-বাড়ির ফোন নাম্বার তো আপনি জানেন!’

‘না, আপনার সঙ্গে আমার আলাদা কথা বলার দরকার হতে পারে—।’

‘ঠিক আছে, লিখে নিন।’

‘আমার পেনের রিফিল শেষ হয়ে গেছে।’ মিথ্যে কথা বলল ইন্দ্রজিৎ।

তখন নিমরাজি হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলেন অনিমেষ। হাতে ধরা রুমালটা পকেটে রেখে পা টেনে কোণের টেবিলটার কাছে গেলেন। ড্রয়ার থেকে পেন বের করে একটা ছোট প্যাডের কাগজে খসখস করে ঠিকানা আর ফোন নম্বর লিখলেন। তারপর পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে নিয়ে ইন্দ্রজিৎকে দিলেন।

‘কী মনে হচ্ছে, মিস্টার চৌধুরী? এই কেসটা আপনি সলভ করতে পারবেন?’

ইন্দ্রজিৎ হাসল: ‘সলভ তো করতেই হবে! এটা আমার প্রথম কেস।’

‘উইশ ইউ বেস্ট অফ লাক।’ হাসলেন অনিমেষ।

ইন্দ্রজিৎ বেরিয়ে এল ঘর থেকে। আপাতত ওর কাজ শেষ। তবে মারুতি ভ্যানে ওঠার আগে পরানের সঙ্গে একবার কথা বলে নিতে ও ভুলল না।

ফেরার পথে স্টিয়ারিং-এ বসে ইন্দ্রজিৎ অনেক কথা বলল। দশরথ নানান প্রশ্ন করল ওকে। প্রশ্নের ঢংগুলো এমন যে, সে যেন কোনও অপরাধীকে থানায় ডেকে এনে জেরা করছে।

ইন্দ্রজিৎ হাসিমুখে দশরথের সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল, আর জিনিকে বলল কথাবার্তাগুলো যতটা সম্ভব টুকে নিতে।

‘কাল অফিসে এগুলো ওয়ার্ড প্রসেস করে আমাকে একটা ড্রাফট প্রিন্ট-আউট দিয়ো।’

জিনি বলল, ‘ও. কে., স্যার।’

উল্টোডাঙ্গা-ভি. আই. পি.-র মোড়ে গাড়ি আসতেই ইন্দ্রজিৎ ঘড়ি দেখল। রাত প্রায় নটা। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে। জিনি আর দশরথদারও বোধহয় একই অবস্থা। তাই ও বলল, ‘এসো, এখানে কোনও একটা রেস্তরাঁয় আমরা ডিনার সেরে নিই। জিনি, তুমি বাড়িতে একটা ফোন করে দাও। আমি তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করে দেব।’

রাস্তার পাশ ঘেঁষে গাড়ি পার্ক করল ইন্দ্রজিৎ। ওরা গাড়ি থেকে নামল।

জিনি বলল, ‘আমি চট করে একটা ফোন করে আসছি।’

ও চলে যেতেই নিজের পেটে হাত বোলাল ইন্দ্রজিৎ: ‘দশরথদা, পেটে একেবারে ছুঁচোয় ডন মারছে। তোমারও নিশ্চয়ই একই অবস্থা?’

দশরথ একগাল হেসে বলল, ‘না, স্যার। পুলিশে চাকরি করার সময় ইউনিয়ন করতাম। তখন হাঙ্গার স্ট্রাইক করে-করে খিদে সহ্য করার অভ্যেস হয়ে গেছে।’

ইন্দ্রজিৎ হো-হো করে হেসে ফেলল।

‘প্রথমেই সবাইকে জানাই—বিছানার চাদরে যে-রক্তের দাগ পাওয়া গেছে, সেটা মানুষের রক্ত নয়…মুরগির রক্ত।’

ইন্দ্রজিতের কথা শেষ হতে-না-হতেই দশরথ চাপা গলায় বলল, ‘মোরগেরও হতে পারে।’

সে-কথা ইন্দ্রজিতের কানে গেল বলে মনে হল না। ও তখন কৌতূহল নিয়ে বসে থাকা মানুষগুলোর মুখের দিকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছে।

ওঁরা সকলেরই চমকে উঠলেন।

অনিমেষ সরকার, মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র, নবনীতা—আর পরান।

প্রথম চারজন সোফায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে ছিলেন। আর পরান একপাশে সংকুচিতভাবে দাঁড়িয়ে।

‘কী বলছেন, মিস্টার চৌধুরী!’ অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠলেন অনিমেষ সরকার, ‘মানুষের রক্ত নয়! মুরগির রক্ত—!’

‘মোরগেরও হতে পারে।’ আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল দশরথ।

‘হ্যাঁ—মুরগির রক্ত।’

দশরথ আবার বিড়বিড় করল। কী বলল ঠিক বোঝা গেল না, তবে অনুমান করা গেল।

‘তা হলে বাবার কোনও বিপদ হয়নি!’ এবারে সুরেন্দ্র কথা বললেন।

ইন্দ্রজিৎ সুরেন্দ্রর কথাটা যেন শুনতে পেল না। সোফায় হেলান দিয়ে আরাম করে বসে চোখ বুজে বলল, ‘এই ইনফরমেশানটা ল্যাব থেকে পাওয়ার পরই আমি অন্য অ্যাঙ্গল থেকে ব্যাপারটা অ্যানালিসিস করতে শুরু করলাম…।’

হঠাৎই চোখ খুলে হাসল ইন্দ্রজিৎ: ‘আর তখনই সব কেমন ঠিকঠাক খাপে-খাপে মিলে গেল। এবং কিডন্যাপিং রহস্যের উত্তরটা ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে।’

‘সেন কটেজ’-এর ড্রইং কাম ডাইনিং স্পেসে বসে কথা হচ্ছিল। ঘড়ির কাঁটা প্রায় সাতটার ঘরে পৌঁছে গেছে। বিচিত্র ঢঙের সুন্দর-সুন্দর সব বাতি ঘরটাকে প্রায় দেওয়ালির রাত করে তুলেছে। কিন্তু এখন আবহাওয়া খানিকটা থমথমে। সবাই কেমন যেন গম্ভীর। এমনকী নবনীতাও। আজ, এই মুহূর্তে, যেন গৃহকর্তার অভাবটা টের পাওয়া যাচ্ছে।

রহস্যটা খতিয়ে দেখতে মাত্র তিনদিন সময় নিয়েছে ইন্দ্রজিৎ। জিনির টাইপ করে দেওয়া তথ্য, নিজের স্মৃতি আর বুদ্ধিকে বারবার ব্যবহার করে তারপর একটা অনুমানে পৌঁছেছে। তারপর অনিমেষ সরকারের লিখে দেওয়া ঠিকানা আর ফোন নম্বর ওকে একটা প্রায়-সিদ্ধান্তের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

সুতরাং, পুরোপুরি তৈরি হওয়ার পর ও মহেন্দ্র সেনকে ফোন করেছ। জানিয়েছে, আজ সন্ধ্যায় চায়ের আসরে ও সব রহস্যের জট খুলবে। চেষ্টা করবে, কিডন্যাপড হয়ে-যাওয়া জিতেন্দ্রনাথকে ফিরিয়ে আনতে।

‘…কিডন্যাপাররা টাকা চাইতে দেরি করায় আমার প্রথম খটকা লেগেছিল। তা হলে কিডন্যাপিংটা যে বা যারা করিয়েছে তারা খুবই বড়লোক? তাদের টাকার দরকার নেই?’ একে-একে মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র এবং নবনীতাকে দেখে নিল ইন্দ্রজিৎ: ‘সাধারণত কিডন্যাপিং-এর কেসে যেটা হয়, পণবন্দিদের লুকিয়ে রাখাটা ভীষণ রিস্কি বলে কিডন্যাপাররা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে ব্যাপারটায় তাড়াহুড়োর বদলে কেমন যেন ডিলি-ড্যালি গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল।

‘সেদিন আপনাদের সবার সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হল, কিডন্যাপিং-এর মতো দুঃসাহসিক কাজ করার সাহস আপনাদের কারও নেই। আশা করি আমার এই মন্তব্যকে আপনারা প্রশংসা হিসেবে নেবেন। যাই হোক, বাকি আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি অনিমেষবাবুকে কয়েকটা কথা বলতে চাই—আর সেইসঙ্গে আপনাদের সবাইকে জানাতে চাই, জিতেন্দ্রনাথকে কে কিডন্যাপ করেছে।’

সবাই উসখুস করতে লাগলেন। এ-ওর দিকে অস্বস্তির চোখে দেখতে লাগলেন।

অনিমেষ বললেন, ‘বলুন, কী বলতে চান—।’

হাসল ইন্দ্রজিৎ—অপরাধীকে ধরে ফেলার হাসি: ‘দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি—জিতেন্দ্রনাথকে আপনিই কিডন্যাপ করেছেন।’

সবাই অবাক চোখে তাকালেন অনিমেষ সরকারের দিকে। ঘরে আলোচনা আর গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। দশরথ মুখের একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে চোখ বুজে মাথা নাড়তে লাগল।

‘একমিনিট!’ সবাইকে কথা থামাতে ইশারা করল ইন্দ্রজিৎ: ‘আর-একটা কথা অনিমেষবাবুকে আমার বলার আছে। জিতেন্দ্রনাথ সেনের সঙ্গে আপনার সারা জীবনেও আর দেখা হবে না। আপনি যদি একশো বছরও এ-বাড়িতে অপেক্ষা করেন, তা হলেও তাঁর দেখা পারেন না।’

‘কেন, জিতেন কি আর বেঁচে নেই?’ অনিমেষ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন।

‘সে তো আমার চেয়ে আপনি ভালো জানেন—।’ চোখ মটকে বাঁকা হাসল ইন্দ্রজিৎ।

‘বাবা…বাবাকে কি মেরে ফেলা হয়েছে?’ মিহি গলায় প্রশ্ন করলেন সুরেন্দ্র।

‘বাবা কি এ-বাড়িতে আর কখনও আসবেন না?’ মহেন্দ্র।

‘কীসব কোড ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলছেন। স্টপ বিটিং অ্যারাউন্ড দ্য বুশ।’ নবনীতা।

হাত তুলে সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলল ইন্দ্রজিৎ। তারপর: ‘অনিমেষ সরকার যতদিন এ-বাড়িতে আছেন ততদিন জিতেন্দ্রনাথের এ-বাড়িতে আসা সম্ভব নয়। ওঁরা দুজন হরিহর-আত্মা হলে ওঁদের দুজনকে একসঙ্গে পাওয়া ইমপসিবল।’

‘কেন? অনিমেষ প্রশ্ন করলেন।

‘কারণ, আপনারা দুজনে একই লোক। হরিহর-আত্মা নন—একই আত্মা।’

পলকে সবাই চুপ করে গেলেন। নিস্তব্ধতা পুরু মোলায়েম চাদরের মতো বিছিয়ে গেল সারাটা ঘরে।

অনেক—অনেকক্ষণ পর জিতেন্দ্রনাথের গলায় কথা বললেন অনিমেষ, ‘থ্যাংকু ইউ, মিস্টার চৌধুরী।’ এবং পরচুলা, চাপদাড়ি ও চশমা খুলে ফেললেন। নাকের ডগা থেকে টেনে খুলে নিলেন একদলা প্লাস্টিসিন।

‘বাবা!’ মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র এবং নবনীতা।

পরান ছুটে গিয়ে জিতেন্দ্রনাথের পা জড়িয়ে ধরল। কান্না-ভাঙা গলায় ডুকরে উঠল, ‘বড়বাবু! আপনি বড়বাবু!’

জিতেন্দ্রনাথ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে দাঁড় করিয়ে দিলেন, বললেন, ‘হ্যাঁ রে, আমি। আর কোনও চিন্তা নেই।’

এবার ইন্দ্রজিতের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনি খুব প্রমিসিং ডিটেকটিভ, মিস্টার চৌধুরী। এখন বলুন তো, আমাকে আপনি কী করে সন্দেহ করলেন?’

ইন্দ্রজিৎ মাথার ঝাঁকড়া চুলে একবার হাত বুলিয়ে নিল। তারপর: ‘প্রথম সন্দেহ হল, আপনি জিতেন্দ্রনাথের লেখা বহু চিঠির কথা বলেছেন, একটা চিঠি আমাকে দেখিয়েছেনও—কিন্তু আপনার লেখা কোনও চিঠির কথা বলেননি। বাড়িতে আপনার লেখা কোনও চিঠিও পায়নি কেউ। সবসময়েই অনিমেষ সরকার ফোন করে কথা বলতেন।

‘দ্বিতীয়: আপনার লাঠিটা নতুন। আর আপনার সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটাটা মাঝে-মাঝে ঠিকঠাক স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছিল।

‘তৃতীয়: আমি যখন সন্দেহ থেকেই আপনাকে অ্যাড্রেস আর ফোন নাম্বার লিখে দিতে বলছিলাম, আপনি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না।

‘চার নম্বর: আপনার রুমাল। আমি আর আপনি যখন সেদিন ও ঘরে বসে—’ ইশারা করে ঘরটার দিকে দেখাল ইন্দ্রজিৎ: ‘—কথা বলছিলাম তখন আপনি রুমাল বের করে চোখ মোছার ভান করছিলেন। সেইসময়ে পরান চায়ের কাপ-প্লেট নিতে ঘরে ঢুকেছিল। আপনার হাতের রুমালটা দেখে ও চমকে উঠেছিল। আমি পরে ওর সঙ্গে কথা বলেছি। ওটা জিতেন্দ্রনাথের রুমাল। সে-রুমাল আপনার পকেটে গেল কেমন করে!’

‘অবশ্য তখন আমি আপনাকে কিডন্যাপিং-এর নাটের গুরু বলে সন্দেহ করেছিলাম। পুরোপুরি জিতেন্দ্রনাথ বলে ভাবিনি।’

‘সেটা ভাবলেন কখন?’

‘ওই রক্তের রিপোর্টটা পাওয়ার পর। তখন বুঝলাম, পয়সা থাকলে একটা নকল কিডন্যাপিং-এর ব্যবস্থা করা কোনও কঠিন ব্যাপার নয়। তা ছাড়া টাকা আদায়ের ব্যাপারে কিডন্যাপারদের যেন কোনও মাথাব্যথাই ছিল না। এ ছাড়া আর-একটা ব্যাপার সবচেয়ে উদ্ভট ছিল…।

‘কোনটা?’

‘আপনার ওই ”মালিক” বন্ধু অনিমেষ সরকারকে হঠাৎ করে ”জন্ম” দেওয়া। আগে তো কখনও আপনি অনিমেষ সরকারের কথা ছেলেমেয়েদের বলেননি! তা হলে হঠাৎ করে এই ক্ষমতাবান ”বন্ধু” এল কোত্থেকে!

‘আসলে, মিস্টার সেন—আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কম-বেশি দুটো করে ব্যক্তিত্ব আছে। একটা নরম, আর-একটা কঠিন। একজনের কাজ ভালোবাসা, অন্যজনের কাজ শাসন করা। যদিও ব্যাপারটা অ্যাবসলিউটলি আপনাদের ফ্যামিলির ব্যাপার—তবুও বলছি, আপনার একটা পারসোনালিটি বহুদিন ধরে ঘুমিয়ে ছিল। অনিমেষ সরকার। আপনি জিতেন্দ্রনাথ আর অনিমেষ—দুজনকেই সজাগ রাখুন। তবে দুজনের মধ্যে ব্যালান্সটা আপনাকেই মেইনটেইন করতে হবে। বেশি ভালোবাসাও যেমন ঠিক নয়, বেশি শাসনও তাই। যদি আপনি এবার থেকে এটা মেইনটেইন করতে পারেন তা হলে সবার ভালো হবে। আর সীমন্তিনীদেবীও খুশি হবেন।’

সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ইন্দ্রজিৎ। সকলের দিকে একবার দেখে নিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘বয়েসে ছোট হয়েও অনেক অপ্রিয় কথা বললাম—হোপ ইউ উডন্ট মাইন্ড। আমাদের কাজ শেষ—আমরা এবার যাই।’

‘একমিনিট, মিস্টার চৌধুরী।’ উঠে দাঁড়ালেন জিতেন্দ্রনাথ। তারপর পরানকে বললেন, ‘পরান, আমার চেকবইটা নিয়ে আয় তো।’

পরান তাড়াতাড়ি চলে গেল জিতেন্দ্রনাথের ঘরের দিকে।

জিতেন্দ্রনাথ ইন্দ্রজিতের কাছে এসে আন্তরিক গলায় বললেন, ‘আপনার কথায় আমি কিছুই মনে করিনি। বরং আপনার কথাগুলো মনে রাখার চেষ্টা করব। আসলে মেন্টাল টরচারে-টরচারে আমি দিশেহারা হয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। তারপর, ঝোঁকের মাথায় এসব করে ফেলেছি…।’

চেকবই এসে গিয়েছিল। জিতেন্দ্রনাথ পেন নিয়ে খসখস করে একটা পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক লিখে দিলেন। নামের জায়গায় এসে থমকালেন তিনি, ‘কী নামে হবে চেকটা?’

‘প্রাইভেট আই ডট কম।’

‘কত টাকার চেক দিলে, বাবা?’ নবনীতা জিগ্যেস করল।

জিতেন্দ্রনাথ ওর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘দ্যাট ইজ নান অফ ইওর ব্লাডি বিজনেস, লেডি।’

ইন্দ্রজিৎ বুঝল জিতেন্দ্রনাথ তাঁর নতুন ভূমিকা শুরু করে দিয়েছেন।

ওরা তিনজনে বেরিয়ে এল ‘সেন কটেজ’ থেকে।

মারুতি ভ্যানে ওঠার পর দশরথ বলল, ‘স্যার, কাল সকালে এই চেকটা শার্লক হোমসের ছবিতে ঠেকিয়ে তারপর ব্যাঙ্কে জমা দেবেন।’

ইন্দ্রজিৎ হাসল। গাড়ি স্টার্ট দিল।

জিনি বলল, ‘আমাদের মাইনে নিয়ে আর তা হলে কোনও চিন্তা রইল না।’

ইন্দ্রজিৎ বলল, ‘আজকেও ডিনার সেরে গেলে কেমন হয়?’

‘আমি, স্যার, ঠিক এই রিকোয়েস্টটাই করব ভাবছিলাম। কিন্তু সংকোচ আর লজ্জা এসে আমার কণ্ঠরোধ করেছিল। যদিও আমার হাঙ্গার স্ট্রাইকের অভ্যেস আছে, তবুও…।’

মারুতি ভ্যানের মিউজিক সিস্টেম অন করে দিল ইন্দ্রজিৎ। সুরের ঝংকারে দশরথের শেষ কথাগুলো আর শোনা গেল না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *