মৌর্য – ৩৫

৩৫

সিন্ধু উপত্যকা। ভূস্বর্গ বললেও কম বলা হয়। অনেক দীর্ঘ। হিমালয় থেকে মহেঞ্জোদারো হয়ে আরব সাগর। একদিকে হিন্দুকুশ পর্বত, অপরদিকে থর মরুভূমি। মাঝখানে উঁচু উঁচু পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে গেছে সিন্ধু নদ। পাথরের পাহাড়। আঁকাবাঁকা নদীর দৃষ্টিনন্দন ঢাল যেন। নদীর স্বচ্ছ নীল জলে তার ছায়া। জলে নানা আকারের ছোট-বড় পাথরখণ্ড, নুড়ি পাথর। জলের স্রোত আছড়ে পড়ছে সাদা, নীল ও কালো পাথরের ওপর। দূর পাহাড়ের ওপর সাদা বরফ যেন সাদা মেঘের মতো উড়ছে। নদীর দীর্ঘ পথের দৃশ্য সবগুলো এক রকম নয়, এক এক জায়গায় এক এক রকম দৃশ্য।

গ্রীষ্মে কোথাও ঘাসবৃক্ষহীন খড়খড়ে পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বইছে শান্ত নীল জলরাশি, আবার বসন্তে দেখা যাচ্ছে আকাশে সাদা মেঘ, দূর পাহাড়ে সাদা বরফ, নদীতীরে লালচে ঘাস, নুড়িপাথর আর নীল জলের মাখামাখি। হিমালয় গগনস্পর্শী বৌদ্ধস্তূপকে বুকে নিয়ে যেন ঘুমোচ্ছে। আবদ্ধ স্তূপের পাদদেশে সবুজ বৃক্ষের ছায়া তটভূমি, দূরের পাহাড় ও আকাশকে যেন একই ধ্যানে আবদ্ধ করে রেখেছে। শুকনো নদীর স্রোত কি বিকাশমান সময়?

কোথাও কোথাও নদীর বহতাকে দুকূলের ঘাসজঙ্গলে নিবিড় শিশিরকণার রৌদ্রকিরণে মুক্তোর মতো ঝলমল করতে থাকা অলংকার পরিহিত নৃত্যপরায়ণ নারীর মতো মনে হয়। দূরের কুয়াশায় মুখ ঢেকে রাখা লজ্জাবতী যেন। কোথাও হয়তো গ্রীষ্মের করোজ্জ্বল বিকেল নীলাকাশ, বরফঢাকা পাহাড়ের ছাদ আর লাল ঘাসের উপকূল আঁকড়ে ধরে নীল জলের নৌকোয় চড়ে সন্ধ্যার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। সবুজ গাছগাছালির কোল ঘেঁষে বসন্তের নদী বয়ে যাওয়ার দৃশ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই। কোথাও মনে হবে নদীর ধারার মতো দুধারের পাহাড়ও যেন গতি পেয়ে চলতে শুরু করেছে। কোথাও স্থবির হয়ে আছে আকাশের মেঘের গতি, নদীর শাশ্বত স্রোত, পাহাড়ের বেড়ি পরা স্থূল স্থূল পা।

কোথাও পাহাড়ের গায়ে আঘাত পেয়ে সাদা হয়ে গেছে নীল জলের ধারা, পাহাড়ের মৃত্তিকাগুলো কি মাইসেনীয় যুগের? পাথর এখানে কষ্টে নীল অথবা লাল হয়ে আছে, স্বাভাবিক নেই। কষ্টটা কিসের? অনাদিকালের?

কোথাও স্বচ্ছ জলে ভাসছে বালির বসন, ধরে টানছে মেঘেরা, এখনই উড়াল দিয়ে পালাতে যাবে পাহাড়সমেত। এক জায়গায় মনে হবে ইতিহাস শেষ হয়ে গেছে কমিউনিস্ট ভাবধারার মতো। নদীরও গতিপথ রুদ্ধ। তবু তার দুই বুকের মাঝে বহমান এক ধারা, নদী কি নারীর মতো পাহাড় বহন করে চলে?

বর্ষায় নদীর রূপ ভয়ংকর-ভয়াল। দুই পাহাড়ের পাথর ভাঙছে সে। তীব্র শব্দ করা গর্জন। দুকূলে প্লাবন। অথচ পাহাড়গুলোয় সবুজের সমারোহ, সবুজ মালা পরে যেন পাহাড়ি মেয়ে হেলেদুলে চলে গেছে পাগলিনীর মতো।

সিন্ধু উপত্যকার এই দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক পরিবেশে খ্রিষ্টজন্মের প্রায় তিন হাজার বছর আগে গড়ে ওঠে নগরসভ্যতা। একে বলা হয় সিন্ধু (উপত্যকা) সভ্যতা। একসময় মনে করা হতো, আর্যদের আগমনের পর ভারতীয় সভ্যতার শুরু। কিন্তু মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা নগরের আবিষ্কারের পর সিন্ধু সভ্যতা প্রমাণ করে দিয়েছে, আর্যরা নয়, অনার্যরাই প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার জনক, ধারক ও বাহক। ভাবতে অবাক লাগে, পাঁচ হাজার বছর আগেও উচ্চ সভ্য মানুষেরা এই জনপদে বসবাস করেছে। বিশাল এলাকা (১ লাখ ৩০ হাজার কিমি) জুড়ে ছিল তাদের বসবাস। চীন, ব্যাবিলন, মেসোপটেমিয়া কিংবা মিসরীয় সভ্যতার সমসাময়িক এই সভ্যতার ধারক ও বাহকেরা প্রাকৃতিক সম্পদ আর সৌন্দর্যের কারণেই এতদঞ্চলে বসবাস ও গৌরবময় এই সভ্যতার সূচনা করেছিলেন। হাজার হাজার বছর পরও এই জনপদ এবং নান্দনিক ভূমি তার আকর্ষণ হারায় নি। নানা জাতি এখানে স্থায়ীভাবে থাকতে চেয়েছে।

এভাবে গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার এসেছেন। গ্রিকরা পছন্দ করেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং তক্ষশীলার শিক্ষাপদ্ধতি। সেলুকাস এ উপত্যকার উল্লেখযোগ্য অঞ্চল নিজের দখলে নিয়ে শাসন করতে শুরু করেন। সময়টা খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক।

সেলুসিড সম্রাটের আগে এই উপত্যকার এত সৌন্দর্য বোধহয় অন্য কারও চোখে পড়ে নি। এখানে সেনাশিবির স্থাপন করে তিনি ঘুরে বেড়ালেন নদীর তট ধরে। সত্তরের ওপর বয়স হয়েছে তাঁর। কোথাও এত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখেন নি। প্রতিদিনই ঘোড়া নিয়ে বের হয়ে পড়েন। ভারতীয় প্রকৃতির মধ্যে নিজের শান্তি খুঁজে বেড়ান। আপামার কথা মনে পড়ে তাঁর। এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্বের নারী ছিলেন তিনি। যুদ্ধে জয় করে নিয়ে আসা এক বন্দী রাজকুমারী। অন্যের কাছে যা ভোগ্যপণ্য। সম্রাট তাঁর গুণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে পুত্রের জন্মের এক বছর পর বিয়ে করেন। আপামা অকালে মারা গেলেন। সে কষ্ট ভুলতে পারেন নি তিনি। সিন্ধুর এই প্রকৃতি তাঁকে মুগ্ধতার পাশাপাশি শূন্যতার কাছাকাছি নিয়ে যায়। তাঁর মনে হতে থাকে, এখানে আপামা কোথাও হারিয়ে আছেন, একদিন হয়তো তাঁর সাক্ষাৎ মিলবে। এই মনোরম প্রকৃতি তাঁর কাছে এক নারী, অতিপ্রিয় নারী। যে নারী অনুভূতিতে অনুরণন তোলে, চিন্তা ও চেতনাস্রোতে ভেতর থেকে ঢেউ জাগায়।

অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, গ্রিকদের বাধা পেয়ে এখানেই এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হবে। মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হবে মৌর্য ও গ্রিক সেলুসিড বাহিনী। রক্তাক্ত দৃশ্যটা কেমন হতে পারে, সেলুকাস কল্পনার চোখে তা দেখলেন প্রাকৃতিক পটভূমিকায়। বসন্তের শুকনো নদী। জল প্রবাহ ক্ষীণ। দুই তটে লাল ঘাসের গালিচা। একটু ওপরে উঠে বিরান ভূমি। তার ওপর পাথরের পাহাড়। পাহাড়চূড়ায় সাদা বরফ। তার পশ্চাতে কুয়াশার চাদর। সর্বোপরে নীলাকাশ, সেখানে সাদা মেঘের আনাগোনা। বিকেলের সোনালি আলো যেন শিল্পের তুলিতে রাঙিয়ে তুলেছে অস্তরাগকে। সবকিছুর মধ্যেই একটা দুঃখ দুঃখ ভাব। সেলুকাসের মনের ভেতর সে দুঃখভাবটা সংক্রমিত হলো। বীরযোদ্ধা সম্রাট সেলুকাস বহু কষ্টে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস গোপন করলেন, পাছে তাঁর অনুচর দেহরক্ষীরা তা শুনে ফেলে। পূর্বাঞ্চলের জেনারেল হিসেবে আলেকজান্ডারের সময়ও এ জায়গায় এসেছিলেন। তখন এ রকমটি মনে হয় নি। তখন জয়ের নেশায় মত্ত ছিলেন। ছিলেন আলেকজান্ডারের কমান্ডে। এখন স্বাধীন সম্রাট। শীতের পাখিরা এই বসন্তেও স্বদেশে ফিরে যায় নি। নদীর জলে সাঁতার কাটছে। কোনো কোনোটি বেশ ক্ষুদ্র। বেতের একটি শাখা নুয়ে আছে সেখান থেকে একটি হাঁস জলের ওপর পা ফেলে ফেলে পাখা মেলে উড়ে এল আরেকটির কাছে। সন্ধ্যারাগের বিদায়সুরে তার হৃদয়নিংড়ানো ভালোবাসার গান সেলুকাসের হৃদয়ও স্পর্শ করল। তিনি এর মধ্যে একটি অর্থ খুঁজে পেলেন। হাহাকার করা সে অর্থ।

কেন যেন তাঁর মনে হলো কর্নেলিয়া মেয়েটা তাঁর পাশে থাকলে ভালো হতো। এসব দৃশ্য হয়তো সে-ও দেখেছে। ঝিলামের ঝিলিমিলি জলের কত গল্প যে সে করেছে, তার কোনো হিসাব নেই। এ রকম গল্প বলে নি। সিন্ধু নদের গল্পও বলেছে, এই ছোটখাটো বিষয়গুলো তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। কিন্তু সে কি জানে বিশ্বরহস্যের কত কী লুকিয়ে আছে এসব ক্ষুদ্র প্রাণীর তুচ্ছ হেলাফেলা আচরণের মধ্যে?

পরদিন সকালবেলায় সেলুকাস রুটিন কার্যক্রমের আওতায় নিজের সৈন্যদের প্যারেড পরিদর্শন করছিলেন। তাঁর সৈন্যবাহিনীর চৌকস প্যারেড তাঁকে মুগ্ধ করে। পোশাকের সঙ্গে নব নব উদ্ভাবিত অস্ত্র হাতে তাদের অপরাজেয় মনে হয়। বিশেষ করে সারিসা হাতে একজন সৈনিকের যে সংহার মূর্তি, তা সেলুকাসকে যুদ্ধ জয়ে আরও আস্থাশীল করে তোলে। নিজের এক জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেন, যুদ্ধজয়ে শারীরিক শক্তির প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন রণকৌশল এবং নতুন অস্ত্রের সাফল্যজনক উদ্ভাবন ও ব্যবহার। নতুন রণকৌশল এবং নব নব অস্ত্রের ব্যবহারই শত্রুকে বেশি বিভ্রান্ত করে দেয়। এবারের সেলুসিড আর্মি মৌর্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ইতিহাসে এক নতুন চমক এনে দেবে।

জেনারেল ফিলেকাস বললেন, মহামান্য সম্রাট, এই উদ্ভাবনের কৃতিত্ব সম্পূর্ণ আপনার। নিশ্চয় যুদ্ধের ইতিহাসে এটা এক নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।

আমাদের যুদ্ধটা হবে ভারতের মাটিতে। এখানকার প্রকৃতি ও মানুষ আমাদের বৈরী, যদিও এত সুন্দর প্রকৃতি আমি কোথাও দেখি নি। এখানকার পাহাড়, নদী আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। আমাদের পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনীর জন্য তা বাধা হবে না, কিন্তু যানবাহনের জন্য মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে। যুদ্ধের সরঞ্জাম, আহার্য, প্রভৃতির পরিবহন কিন্তু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে আছে।

জেনারেল বললেন, একই সমস্যা ওদেরও মোকাবিলা করতে হবে। আমরা এ কাজে সৈনিকদের ব্যবহার করব। এ ছাড়া ঘোড়া, খচ্চর, গাধা তো আছেই। পাহাড়ের আড়ালে থাকবে আমাদের অ্যামবুশ পার্টি। ওরা আক্রমণ করবে বলে উঁচুনিচু জায়গা পার হতে হবে। পাহাড়ের ওপরে থাকা আমাদের তিরন্দাজদের হাতেই এদের অর্ধেক শেষ হয়ে যাবে। সরাসরি আঘাতে শেষ হবে বাকিরা। ২৫-৩০ ফুট দূর থেকে আমাদের এই অস্ত্র আঘাত হানতে সক্ষম। এ ছাড়া দোরির ব্যবহার তাদের কচুকাটা করবে। গ্রিকদের বিজয়ের প্রতীক এই দোরি। ট্রয়ের যুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছে।

একজন সৈনিকের সামনে দাঁড়ালেন সেলুকাস। তার পোশাক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। নিজেও অবশ্য সামরিক পোশাক পরিধান করেছেন। জেনারেলকে উদ্দেশ করে বললেন, সামরিক পোশাকটা তার হাতের অস্ত্রের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে এবং তা দেখতে এত ভয়ংকর মনে হবে যে শত্রুসৈন্য আক্রমণের উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। সেলুকাস নিজে অস্ত্রের মতো পোশাকেও একটা নতুন সেলুসিড মাত্রা যুক্ত করেছেন। সেলুসিড আর্মিকে তা স্বাতন্ত্ৰ দিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সেলুসিড আর্মির ভয়ংকর রূপটাই দেখতে চান তিনি।

সেলুসিড আর্মির প্রস্তুতিতে সন্তুষ্ট তিনি। তবে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি দেবতাদের অলৌকিক অস্ত্রের ধারণা তাঁকে মাঝেমধ্যে শঙ্কার মধ্যে ফেলে দেয়। এখনো সে শঙ্কামুক্ত নন তিনি। জেনারেলকে কথাটি বললেনও। জেনারেল বললেন, পৌরাণিক অস্ত্রের কথা বলছেন, সম্রাট? এ ধারণা পাল্টানোর সময় এসেছে। কারণ, ট্রয়ের যুদ্ধের পর দেবতারা প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নেবেন বলে মনে হয় না।

আমি আমাদের দেবতাদের কথা ভাবছি না।

ভারতীয় দেবদেবী লঙ্কা ও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর সতর্ক হয়ে যাওয়ার কথা

তাদের নিজেদের দ্বন্দ্বই তাদের যুদ্ধে অবতীর্ণ করবে। কারণ, তাদের ন্যায়বোধ নিরপেক্ষ নয়, ভক্তদের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

মৌর্যরা এখন আর পৌরাণিক ধর্মে বিশ্বাস করে না।

তা করে না, কিন্তু অস্ত্রের নামগুলো পৌরাণিক দেবতাদের নামেই রেখে দিয়েছে। দেবতারা তাদের পুরোনো ভক্তদেরই সাহায্য করবেন।

তাহলে আমাদের দেবতারাও এগিয়ে আসবেন। কথাটা জেনারেল ফিলেকাস বিশ্বাস থেকে নয়, সেলুকাসকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন।

সেলুকাস এই জেনারেলের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে অবহিত আছেন। তিনি বললেন, ফিলেকাস, সম্রাটকে সবদিকে লক্ষ রাখতে হয়, সবাইকে সন্তুষ্ট করতে হয়। তোমার ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *