প্ৰথম দিন – দুপুর

দুপুর ২টা 

মনুষ্য প্রজাতির এই এক স্বভাব; কোনো দুর্ঘটনা দেখলেই সারস পাখির মত গলা উঁচু করে তা দেখার প্রতিযোগিতা শুরু করবে। যতোক্ষণ পর্যন্ত সাইরেনের শব্দ শোনা কিংবা রক্তের ছাপ দেখা যাবে ততোক্ষণ তো সেখান থেকে নড়াই যাবে না। ভাবখানা এমন যেন এই মুহূর্তে দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এটাই। প্যারিসের মত শহরের মাঝে এমন এক সশস্ত্র ডাকাতি হয়ে গেল, গুলি চলল-তবুও উৎসুক জনতার অভাব নেই। 

ঘটনাস্থল পুলিশ ঘিরে রাখলেও পথচারী চলাচল বন্ধ হয়নি। শুধুমাত্র স্থানীয় বাসিন্দাদের যাবার অনুমতি থাকলেও কোনো লাভ হলো না। অযথা সময় নষ্ট। ঘটনা কী, তা জানার জন্য সকলেই দাবি করছে তারা স্থানীয় বাসিন্দা। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও, স্থানীয়দের ভাষ্যমতে সকালে বিশৃঙ্খল অবস্থা ছিল। স্বীকার করতে দোষ নেই, এতো কিছুর জন্য অবদান রাখতে পেরে আমি বেশ উল্লসিত। 

কল্পনা করুন রক্তমাখা কোনো নারীর দিকে গুলি চালিয়ে আপনি পালিয়ে যাবেন, দামি রত্নে ভর্তি থাকবে আপনার ব্যাগ। সেই ঘটনাস্থলে ফিরে আসলে কিছুটা রোমাঞ্চিত বোধ করা খুবই স্বাভাবিক। অনেকটা প্রুস্ট আর তার ম্যাডেলিনের মত। ভাবতেই ভালো লাগে। যখন কোনো পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয় তখন অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। মনিয়েরের পাশে জর্জ-ফ্ল্যানড্রিন সড়কে ছোট একটা ক্যাফে আছে। নাম লা বঁছেও। একদম উপযুক্ত জায়গা। পুরো ক্যাফে জুড়ে কথার ফুলঝুরি ছুটছে; সবাই সব দেখেছে, শুনেছে। সবাই এখন পুরো ঘটনা জানে। 

আমি এক কোণায় দাঁড়িয়ে তাদের কথায় মনোযোগ দিলাম। ধীরে ধীরে বাকিদের সাথে মিশে যেতে খুব বেশি সময় লাগলো না আমার। আলাদা করে কারো মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার ইচ্ছা নেই। 

এদের বেশিরভাগই মূল ঘটনার কিছুই জানে না। 

.

দুপুর ২টা ১৫ 

শরতের আকাশে বিধাতা যেন তুলির আঁচড় দিয়েছে। কবরস্থানে প্রচুর লোক জড় হয়েছে। পুলিশ অফিসারদের এই এক সুবিধা, তাদের শেষ বিদায় জানাতে লোকজনের অভাব হয় না। 

দূর থেকে আরম্যান্ডের স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোনদের দেখতে পেল ক্যামিল। ভালো পোশাক পরিহিত অবস্থায় একদম গম্ভীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। আরম্যান্ডের পরিবারের লোকজন বাস্তবে কেমন হবে তা সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই ক্যামিলের। তবে এখন তাদেরকে কোয়েকারদের পরিবারের মত লাগছে। 

আরম্যান্ডের মৃত্যুর চারদিন পরেও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি ক্যামিল। অবশ্য এই মৃত্যু একইসাথে তাকে মুক্তিও দিয়েছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহে হাসপাতালে গিয়ে আরম্যান্ডের হাত ধরে বসে থাকতো সে, কথা বলতো। এমনকি ডাক্তাররা যখন বলে দিয়েছে কোনো কথাই শুনতে পায় না রোগি, তখনো কথা বলা থামায়নি সে। তাই দূরে থেকেই আরম্যান্ডের বিধবা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লো সে। কয়েক মাস নিদারুণ যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাবার সময় সে অনেক কথাই বলেছে আরম্যান্ডের স্ত্রী-সন্তানকে। এখন আর কিছুই বলার বাকি নেই তার। এমনকি আজকে আসার প্রয়োজনও ছিল না ক্যামিলের; যা যা করা দরকার, সবটাই করেছে সে। 

ক্যামিল আর আরম্যান্ডের মাঝে বেশ কিছু মিল আছে। পুলিশ একাডেমিতে দুইজনের যাত্রা শুরু হয় একই দিনে। দুই তরুণের কেউই তারুণ্য পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেনি। এখান থেকেই বন্ধুত্বের সূচনা। 

আরম্যান্ডের বিখ্যাত হাড়কিপটে স্বভাবের কথা না বললেই নয়। যাবতীয় খরচের বিরুদ্ধে মৃত্যু অবধি যুদ্ধ ঘোষনা করেছিল সে। তার মৃত্যুকে তাই পুঁজিবাদের বিজয় হিসেবেই দেখে ক্যামিল। কিপটে স্বভাবই যে তাদের দুইজনকে এক করেছিল, তা নয়। বরং খাটো দুই বন্ধু তাদের দুর্বলতা পুষিয়ে দেবার জন্য অপ্রতিরোধ্য এক ক্ষুধা নিয়ে কাজ করতো। ভিন্ন উপায়ে হলেও নিজ কাজে অসীম দক্ষতাই দুইজনকে একই সুতোয় বেঁধে দেয়। 

দীর্ঘসময় ধরে মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। ক্যামিলকে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ মনে করতো আরম্যান্ড। 

দুজনের মাঝে বজায় ছিল অটুট বন্ধন। 

ব্রিগেড ভেরহোভেনের চারজনের মাঝে, এই মুহূর্তে কবরস্থানে শুধু ক্যামিলই উপস্থিত। আর এটা মেনে নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তার! 

তার সহকারী লুইস ম্যারিয়ানি এখনো পৌঁছায়নি। তবে তা নিয়ে চিন্তিত নয় ক্যামিল। লুইস যথেষ্ট দায়িত্ববোধসম্পন্ন। সে চলে আসবে—তার মত সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন কারো জন্য শেষকৃত্যানুষ্ঠানে না আসা, কোনো নৈশভোজে পাদ দেয়ার শামিল, যা অকল্পনীয় ব্যাপার। 

খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ছুতোয় আরম্যান্ডও নেই!!! 

বাকি রইলো ম্যালেভাল, বেশ কয়েক বছর ধরে যার কোনো খোঁজ পায়নি ক্যামিল। চাকরিচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত দারুণ কাজ দেখাচ্ছিল সে। মেধাবী এই তরুণকে পেয়ে বেশ সন্তুষ্ট ছিল ক্যামিল। দুজনের বিস্তর ফারাক থাকা স্বত্ত্বেও চমৎকার বন্ধুত্ব গড়ে উঠছিল ম্যালেভাল আর লুইসের মাঝে। একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসতো। যখন জানা যায় আইরিনের খুনিকে তথ্য দিয়ে যাচ্ছিল ম্যালেভাল, তখনি সব সম্পর্ক শেষ। যদিও কাজটা জেনে বুঝে করেনি সে, আদতে দোষটা তারই। সেই সময়ে, তাকে খালি হাতে খুন করতেও দ্বিধা বোধ করতো না ক্যামিল। হাউজ অফ এট্রিয়াসের মতো আরেকটা মর্মান্তিক ঘটনার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল ক্রিমিনাল ব্রিগেড। আইরিনের মৃত্যুর পর পুরোপুরি ভেঙে পড়ে ক্যামিল। কয়েক বছর হতাশায় ডুবে ছিল সে। একসময় জীবনটাও অর্থহীন হয়ে পড়ে তার। 

আরম্যান্ডের অভাব তার চেয়ে বেশি কেউ অনুভব করে না। এই মৃত্যুর সাথে সাথে ব্রিগেড ভেরহোভেনও পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। একইসাথে, এই শেষকৃত্যানুষ্ঠান ক্যামিলের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। নিজের জীবনটা আরেকবার গড়ে তোলার চেষ্টায় নামবে সে। 

আরম্যান্ডের পরিবার ক্রেমাটোরিয়ামে যাওয়ার ঠিক আগে লুইস উপস্থিত হলো। পরনে ক্রিম রঙের হুগো বস স্যুট, চমৎকার দেখাচ্ছে তাকে। 

“হাই, লুইস।” 

তবে লুইস তার চিরাচরিত জবাব দিলো না, “হ্যালো, বস।” ক্যামিলের কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে এই সম্বোধনে। তার ভাষ্যমতে, কোনো টিভি সিরিজে অভিনয় করছে না যে এতো নিয়ম মেনে চলতে হবে। 

নিজের বিষয়ে যে প্রশ্নটা মাঝে মাঝে ক্যামিলকে খোঁচায়, তা তার সহকারীর ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রাসঙ্গিক : এই লোক এখানে কী করছে? সম্ভ্রান্ত এক পরিবারে তার জন্ম। প্রতিভারও কোনো কমতি ছিল না তার। এমন প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল, যা খুব কম লোকের ভাগ্যে জোটে। তারপর ব্যাখ্যাতীতভাবে পুলিশে যোগদান করে সে, যেখানে তার বেতন একজন স্কুল শিক্ষকের বেতনের সমান। তবে তার হৃদয় ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। 

“আপনি ঠিক আছেন?” 

মাথা নাড়লো ক্যামিল। সে ঠিক আছে। সত্যি বলতে শরীর এখানে থাকলেও তার মন পড়ে আছে হাসপাতালে, যেখানে অ্যানিকে উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক দেয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ পর এক্স-রে আর সি.এ.টি স্ক্যানের জন্য নেয়া হবে তাকে। 

স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় নিয়ে বসকে লক্ষ করলো লুইস। মুখ দেখেই বুঝতে পারছে, বসের মন খারাপ। তবে এর পেছনে আরম্যান্ডের শেষকৃত্যানুষ্ঠান এককভাবে দায়ি নয়। তার মনে অন্য কিছু চলছে, সেটা কী? আর সেই অন্য কিছু, যা আরম্যান্ডের শেষ বিদায়েও বসের মনোযোগ কেড়ে নিছে, তার মানে বিষয়টা খুবই গুরুতর… 

“সকালে এক সশস্ত্র ডাকাতি হয়েছে। ওই ঘটনার তদন্ত করতে হবে আমাদের।” 

মনে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নের উত্তর এটাই কি না তা বুঝতে পারলো না লুইস। 

“অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে নাকি?” 

“একজন মহিলা…” 

“মারা গেছে?” 

হ্যাঁ, না, মানে…ভ্রু কুঁচকে গেল ক্যামিলের, এমনভাবে তাকিয়ে আছে 

যেন তার সামনে ঘন কুয়াশা। 

“না…মানে, এখনো না…”

লুইস কিছুটা অবাক হলো। কেন না, এই ধরনের কেস নিয়ে সচরাচর কাজ করে না তারা। সশস্ত্র ডাকাতির কেসে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই কম্যান্ড্যান্ট ভেরহোভেনের। তারপরও, সবকিছুরই তো একটা শুরু থাকে। কিন্তু ক্যামিলকে অনেকদিন ধরেই চেনে সে। তাই সে বুঝতে পারলো কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। ক্রকেট অ্যান্ড জোনস কোম্পানির চকচকে কালো রঙের জুতোর দিকে তাকিয়ে হালকা করে কাশি দিলো লুইস। নিজের বিস্ময়বোধ প্রকাশ পেতে দিলো না। আর এটাই তার আবেগ বহিঃপ্রকাশের সর্বোচ্চ মাধ্যম। 

“শেষকৃত্যানুষ্ঠান শেষ হওয়ার সাথে সাথে তুমি চলে আসবে। এখনো টিম তৈরি করা হয়নি…তবে আমরা একটু এগিয়ে থাকতে চাই।” 

আশেপাশে তাকিয়ে লা গুয়েনকে খুঁজলো ক্যামিল। খুব দ্রুত পেয়েও গেল। অতিকায় এই লোককে খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগার কথাও না। 

“চলো, আমাদের যেতে হবে…” 

অতীতে লা গুয়েন ছিল কমিশনার। সরাসরি তার অধীনে কাজ করতো ক্যামিল। তখন কোনো জিনিস দরকার হলে আঙুলের ইশারাই যথেষ্ট ছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূৰ্ণ ভিন্ন। 

কন্ট্রোলার জেনারেল লা গুয়েনের পাশে হাঁসের মত হেলে দুলে হাঁটছে কমিশনার মিচার্ড।

.

দুপুর ২টা ২০ 

ক্যাফে লা বঁছেও এর ইতিহাসের অন্যতম সেরা দিন আজ। এমন দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা শতাব্দীতে একবার ঘটে, এই কথা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত হলো। এমনকি যারা কিছুই দেখেনি, তারাও বিনা দ্বিধায় মেনে নিলো। একের পর এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি শোনা যাচ্ছে। কেউ দেখেছে একজন মেয়ে, আবার কেউ দু-জন। কারো মতে বন্দুক হাতে এক মহিলা ছিল, আবার কেউ বন্দুক ছাড়াই দেখেছে। এই মহিলাই সেই জুয়েলারি দোকানের মালিক? না, তার মেয়ে। সত্যি? তাকে তো কখনো নিজের মেয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে শুনিনি, তুমি কোথায় শুনলে? পালানোর জন্য একটা গাড়ি ছিল। কোন মডেলের? এর উত্তরে পুরো ফ্রান্সে যত গাড়ি আমদানী হয় মোটামুটি সবগুলোর নামই এসেছে। 

ধীরে ধীরে কফিতে চুমুক দিচ্ছি আমি। সারাদিন অনেক খাটুনি গেছে। এখন বিশ্রামের সময় 

ক্যাফের মালিক যার মুখ দেখলেই থাপড়াতে ইচ্ছে করে-তার মতে পাঁচ মিলিয়ন ইউরো হাতিয়েছে ডাকাত দল। এক সেন্ট কম না। আমি জানি না এই হিসাব সে কোথায় পেয়েছে, তবে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে তাকে। ইচ্ছে করছে হাতে একটা মসবার্গ দিয়ে নিকটস্থ কোনো জুয়েলারির দোকানে পাঠাই তাকে। ডাকাতি শেষ করে নিজের ক্যাফেতে ফিরে আসুক। ওই বলদের বাচ্চা বলদ যে হিসাব দিয়েছে, তার তিন ভাগের এক ভাগও যদি পায়, তাহলে সে অবসর নিতে পারে। এর চেয়ে বেশি কিছু তার দ্বারা আশা করা যায় না। 

আর যে গাড়িতে ওরা গুলি করলো! কোন গাড়ি? ওই যে ওখানে পড়ে আছে—দেখে মনে হচ্ছে কোনো গণ্ডার প্রবল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ডাকাত দল কি মর্টার ছুড়েছিল না কি? আর এরই সাথে শুরু হয় ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞদের আলোচনা, ঠিক যেমনটা একটু আগে হয়েছিল গাড়ির মডেল নিয়ে। ইচ্ছে করছে ফাঁকা গুলি ছুড়ে সবাইকে থামিয়ে দেই। একটু শান্তি দরকার আমার। দরকার একটু নীরবতা। 

সদর্পে হাঁটতে হাঁটতে ক্যাফের মালিক সুনিশ্চিতভাবে ঘোষণা দিলো, “পয়েন্ট টুটু ক্যালিবারের লম্বা রাইফেল।” 

এই কথা বলেই চোখ বন্ধ করলো সে। নিজ দক্ষতার কথা জানাতে পেরে বেশ তৃপ্ত সে। 

ইচ্ছে করছে বারো বোরের শটগানটা দিয়ে লোকটার মাথা উড়িয়ে দেই। যেমনটা করেছিলাম তুর্কি ভ্রাতৃদ্বয়ের সাথে। অস্ত্র হিসেবে পয়েন্ট টুটু ক্যালিবারের লম্বা রাইফেল ছিল না কি অন্য কিছু, তাতে উপস্থিত লোকজনের কিছু যায় আসে না। সবাই ঘটনা শুনতে পেরেই মুগ্ধ। এই মূর্খগুলো কিছুই জানে না। আর সাক্ষীর যদি এমন দশা হয়, তাহলে পুলিশ বাহিনীর জন্য দারুণ কিছু অপেক্ষা করছে। 

.

দুপুর ২ টা ৪৫ 

“কী…তুমি কেন এই কাজ করতে চাইছো?” সুইভেল চেয়ারে ঘুরতে ঘুরতে জিজ্ঞেস করলো কমিশনার। চেয়ারে ঘোরার জন্য প্রধান অক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তার বৃহদাকার পশ্চাৎদেশ, যা বড্ড বেখাপ্পা লাগছে। কমিশনার মিচার্ডের বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মাঝামাঝি হবে। তার চেহারায় অনেক সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয়নি। ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের চুল, সম্ভবত কলপ দেয়া। হরিণের ন্যায় দাঁতে অন্যরকম লাগে তাকে। চোখে বর্গাকার রিমের চশমা, যা তার চেহারায় আলাদা ভাবগাম্ভীর্য এনেছে। ‘জাঁদরেল’ ব্যক্তিত্ব (আদতে অন্যদের জন্য পুরোপুরি গলার কাঁটা), প্রখর বুদ্ধিমত্তা (যা সূচক হারে তার রাগকে বাড়িয়ে দিয়েছে) তাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। তবে তার পশ্চাৎদেশের কথা না বললেই নয়, যা সৃষ্টিকর্তা তাকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন। এই জিনিস নিয়ে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেন, তা সবাইকে বিস্মিত করে। মজার বিষয় হচ্ছে, যে কোনো ধরনের বিপদে তার মাথা থাকে একদম ঠাণ্ডা। প্রশ্নাতীত দক্ষতা, ব্যতিক্রমী চিন্তাধারা আর যে কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান, তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। সে এমন ধরনের বস, যে তার অধীনস্ত কর্মীদের তুলনায় দশগুণ বেশী কাজ করে। আর নিজের নেতৃত্ব গুণ নিয়ে যারপনাই খুশি সে। যখন কমিশনার পদে তাকে নিযুক্ত করা হয়, তখন চাকরি ছেড়ে দেয় ক্যামিল। তার ভাষ্যমতে, বাসায় কর্তৃত্বপরায়ণ (দুদুশে, তার প্রিয় বিড়াল, মাঝে মাঝে অস্থিতিশীল হয়ে উঠে) একজনকে সামলে, অফিসে আরেকজনের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব না। 

আবারো প্রশ্ন করলো কমিশনার : “তুমি কেন এই কাজ করতে চাইছো?” 

এমন কিছু লোক আছে, যারা আশেপাশে থাকলে মন মেজাজ ঠিক রাখা বেশ কষ্টসাধ্য। কমিশনার মিচার্ড এগিয়ে এসে ক্যামিলের পাশে দাঁড়ালো। ক্যামিলের সাথে কথা বলার সময় এমনটাই করে সে। পাশাপাশি দুজনকে, আমেরিকান সিচুয়েশনাল কমেডির চরিত্রের মত লাগছে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো নারী চরিত্র একদম রসকষহীন। 

ক্রেমাটোরিয়ামের প্রবেশপথ আগলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুইজন; সবার শেষে ঢুকেছে তারা। পুরো ঘটনা এমনভাবে সাজিয়েছে ক্যামিল, যাতে করে সে অনুরোধ করার সাথে সাথেই কন্ট্রোলার জেনারেল লা গুয়েন তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে। ক্যামিলের পুরোনো বন্ধু, একইসাথে মিচার্ডেরও বস। এখন সবাই জানে যে ক্যামিল আর লা গুয়েন বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু; লা গুয়েনের সব বিয়েতে উপস্থিত থাকা একমাত্র মানুষ ক্যামিল। সম্প্রতি নিজের দ্বিতীয় স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করে ষষ্ঠবারের মত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে তার বন্ধু কাম বস। 

যেহেতু সম্প্রতিই নিয়োগ পেয়েছে কমিশনার, এখন ‘বরের ঘরের পিসি, কনের ঘরের মাসী’ হয়েই থাকতে হবে তার। “জগাখিচুড়ি পাকানোর আগেই তাকে ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারতে হবে। তাই যখন তার বসের বন্ধু অনুরোধ নিয়ে আসলো, সে আমতা আমতা করলো। শবযাত্রার সর্বশেষ সদস্য তারা দুইজন। যদিও পুরো ব্যাপারটা ভেবে দেখার জন্য কিছু সময় প্রয়োজন, তবে তার প্রত্যুৎপন্নমতিতার বেশ সুখ্যাতি আছে। এটা নিয়ে বেশ গর্ববোধ করে সে। শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা এখনই শুরু হবে। 

কমিশনারের মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ভেরহোভেন কেন এই কেসে তার টিমকে চাইছে? একমাত্র প্রশ্ন, যার উত্তর তৈরি করে রেখেছে ক্যামিল। কেননা এটাই একমাত্র প্রাসঙ্গিক প্ৰশ্ন। 

ডাকাতি হয়েছে সকাল ১০টায়। এখনো ৩টা বাজেনি। ইতোমধ্যে গ্যালারিতে নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছে ফরেনসিক টিম। কয়েকজন অফিসার, সাক্ষীদের সাথে কথা বলছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এই কেসের দায়িত্ব এখনো কাউকে দেয়া হয়নি। ।

“আমার এক ইনফর্মার আছে,” বলল ক্যামিল। “ওদের মাঝেই…”

“ডাকাতির ব্যাপারটা তুমি আগে থেকেই জানতে?” 

নাটকীয় ভঙ্গিতে চোখ দুটো বড় বড় করে তাকালো মিচার্ড। সামুরাই যোদ্ধাদের চাহনির কথা মনে পড়লো ক্যামিলের। এই ধরনের ভঙ্গিমা বিশেষ সময়ের জন্য জমিয়ে রাখে মিচার্ড, এর মানে হয় তুমি বেশি বলে ফেলেছো কিংবা নিতান্তই কম 

“অবশ্যই না,” ক্যামিলের কণ্ঠে রাগের ছোঁয়া। (এই অংশটুকু দারুণ অভিনয় করলো সে। কণ্ঠ শুনেই বোঝা যাচ্ছে মুখের উপর এমন কথা বলায় তার আঁতে ঘা লেগেছে।) “আমি এই বিষয়ে কিছুই জানতাম না, যদিও আমার ইনফর্মারের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত না…তবে আমি কথা দিচ্ছি, প্রয়োজন হলে এই লোক সব স্বীকার করবে। আমাদের সাথে বসার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত সে। (ভেরহোভেন ভালোমতোই জানে, এই টোপ মিচার্ড গিলবেই।) এই মুহূর্তে সে সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে আছে…তাকে ব্যবহার না করাটা বোকামি হবে।” 

কথাবার্তার মোড়, নিয়মনীতির বেড়াজাল থেকে অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য সাধারণ এক চানিই যথেষ্ট। বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কন্ট্রোলার জেনারেল লা গুয়েনের দিকে তাকালো ক্যামিল। চোখে ইশারা করলো, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য। তারপর কিছুক্ষণ নিরবতা। কমিশনারের মুচকি হাসি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বুঝতে পেরেছে সে। 

“তাছাড়া এটা তো শুধুমাত্র সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা না। হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছে…” যোগ করলো ক্যামিল। 

মাথা নাড়লো কমিশনার মিচার্ড। এরপর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো ক্যামিলের দিকে, যেন কম্যান্ড্যান্টের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার পেছনের মূল উদ্দেশ্য বুঝতে চাইছে সে। হয়তো আসলে বুঝেই গেছে অথবা কিছুক্ষণের মাঝেই বুঝতে পারবে। এই নারীর প্রখর বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা আছে ক্যামিলের; একটু ভুলের আভাস পেলেই তার মেজাজ চড়ে যায়। 

তাই দেরি না করে তাকে বোঝানোর উদ্যোগ নিলো ক্যামিল, “আমাকে একটু সময় দিন। পুরো ব্যাপারটা গুছিয়ে বলছি। আমার ইনফর্মার এক লোককে চেনে, যে অন্য এক দলের সদস্য, যারা গত বছর আরেক ডাকাতির কাজে জড়িত ছিল। যদিও এটা সরাসরি এই কেসের সাথে সম্পর্কিত না, তবে বিষয়টা হচ্ছে…” 

হাত দিয়ে ইশারা করে তাকে থামিয়ে দিলো কমিশনার। যেন বলতে চাইছে, সে বুঝতে পেরেছে। একইসাথে আরেকটা ব্যাপার মাথায় রাখলো, সদ্যই চাকরিতে ঢুকেছে সে। তাই, নিজের বস আর অধীনস্ত কর্মচারীর কাজে বাঁধা দেয়ার মত অবস্থা এখনো হয়নি তার। 

“ঠিক আছে, কম্যান্ড্যান্ট। এই কেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট, জুজ পেরেইরার সাথে কথা বলবো আমি।” 

মনে মনে এমনটাই চাইছিল ক্যামিল। যদিও চেহারায় সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ পেতে দিলো না সে। 

যদি মিচার্ড এতো দ্রুত হাল ছেড়ে না দিতো, তাহলে কী করতো তা নিজেও জানে না ক্যামিল। অসমাপ্ত বাক্যটা কীভাবে শেষ করবে, তা তখনো তার মাথায় আসেনি। 

.

দুপুর ৩ টা ১৫ 

তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল লুইস। উচ্চপদস্থ হওয়ার কারণে ক্যামিলকে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ভদ্রভাবে কেটে পড়লো সে। 

গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে পকেটে থাকা ফোনটা বের করলো সে। লুইসের ভয়েস মেইল এসেছে। আগে বের হওয়ার সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে সে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটা ফোন করে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রও পেয়ে গেছে। 

“আমি আগের কিছু ফাইল ঘাটাঘাটি করলাম। মসবার্গ ৫০০ ব্যবহার করে ডাকাতির ঘটনা কেবলমাত্র একটা, তাও গত বছরের ১৭ জানুয়ারিতে। ঘটনা দুটোর মাঝে যে মিল আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর শেষের কেসটা তো খুবই ভয়াবহ…সময় পেলেই আমাকে কল করবেন।” 

দেরি না করে কল করলো ক্যামিল। 

“গত জানুয়ারির ঘটনা তো আরো বেশি ঘোলাটে,” বলল লুইস। “চারটা আলাদা দোকানে হামলা চালিয়েছিল এই দল। একজন নিহত হয়। ওদের নেতাকে তখনি শনাক্ত করা হয়েছিল। ভিনসেন্ট হ্যাফনার। জানুয়ারির ওই ঘটনার পর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি তার। কিন্তু হুট করেই ফিরে আসার পেছনে কোনো না কোনো কাহিনী আছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কারো মনোযোগ আকর্ষণ…. 

.

দুপুর ৩ টা ২০ 

হঠাৎ করেই উত্তেজনার ঢেউ বয়ে গেল ক্যাফে লা বঁছেওতে। 

উপস্থিত মানুষের বকবকানি বাধাগ্রস্ত হলো সাইরেনের তীব্র শব্দে। সবাই বাইরের দিকে ছুটে গেল। সাইরেনের আর্তনাদ ক্রমাগত বেড়েই চলছে। ক্যাফের মালিক সুদৃঢ়ভঙ্গিতে জানালো, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এসেছে। এদিকে সাধারন মানুষ মস্তিষ্কে ঝড় তুলেও মন্ত্রীর নাম মনে করতে ব্যর্থ হলো। কোনো গেম শো এর উপস্থাপক হলে তাদের এতো কষ্ট করতে হতো না। এদিকে আবারো গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। এতোক্ষণে হয়তো লাশ কিংবা নতুন কিছু পাওয়া গেছে বলে মতামত ব্যক্ত করলো কতিপয় পণ্ডিত। ক্যাফের মালিক চোখ বন্ধ করে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু ভাবছে, যেন কিছুক্ষণের মাঝে যুগান্তকারী কিছু বের হয়ে আসবে তার মাথা থেকে। সাধারণ মানুষের সাংঘর্ষিক কথাবার্তায়, পাণ্ডিত্য জাহির করার মোক্ষম আরেকটা সুযোগ এসেছে তার সামনে। 

“আমি একদম নিশ্চিত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই এসেছে।” 

এরপর চিরাচরিত ভঙ্গিতে চশমাটা খুলে, মুছতে শুরু করলো সে। 

মানুষজন রুদ্ধশ্বাস অবস্থায় বসে আছে। যেন তারা ট্যুর ডি ফ্রান্স শুরুর অপেক্ষায় আছে। 

.

দুপুর ৩ টা ৩০ 

মাথাটা কেমন ভারি ভারি লাগছে অ্যানির। শিরাগুলো যেন দপদপ করছে। 

চোখ খুলেই নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করলো সে। 

পা দুটো নাড়ানোর চেষ্টা করলো, দেখে মনে হচ্ছে বাতের ব্যথায় জর্জরিত কোনো নারী। তার চোখ মুখে তীব্র যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট। তবে কিছুক্ষণের মাঝে হাঁটু উঁচু করতে সফল হলো সে। শেষমেশ পা তুলতে পেরে যেন মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেল। একটু পর মাথা নেড়ে দেখতে চাইলো কেমন লাগে। অনেক চেষ্টা করেও একফোঁটা নাড়াতে সক্ষম হলো না। তার মাথায় কেউ যেন পাথর চাপিয়ে দিয়েছে। এমন অবস্থায় নিজের হাতের দিকে তাকালো সে। দেখতে অনেকটা কাঁকড়ার নখরের মত লাগছে। এরইমাঝে তার মনের পর্দায় কিছু ঝাপসা ছবি ভেসে উঠলো-গ্যালারি মনিয়েরের টয়লেট, চারদিকে রক্তের স্রোত, গুলির শব্দ, অ্যাম্বুলেন্সের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ, রেডিওলজিস্টের মুখ আর তার পেছন থেকে ভেসে আসছে এক নার্সের মৃদু কণ্ঠস্বর, “এমন পাশবিক নির্যাতন কোনো মানুষ করতে পারে?” আবেগ ধরে রাখতে কষ্ট হলো অ্যানির। বড় করে শ্বাস নিলো সে, এতো দ্রুত হাল ছাড়া যাবে না। 

বেঁচে থাকতে হলে, উঠে দাঁড়াতে হবে তার। 

শরীরের উপর থেকে চাদরটা সরিয়ে দিলো অ্যানি। হাতের ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলেও, তা সহ্য করে নিলো। মাথাটা চক্কর দেয়ায় একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসলো। কিছুক্ষণের মাঝেই নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেও, সাথে সাথে বসে পড়তে বাধ্য হলো; সারা শরীর জুড়ে অসহ্য ব্যথা ছড়িয়ে পড়েছে তার। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে এখন। সব ব্যথা তুচ্ছ করে আবার উঠে দাঁড়ালো সে। তবে ভারসাম্য রক্ষার জন্য পাশে থাকা টেবিলটা আঁকড়ে ধরলো। 

টয়লেটটা ঠিক বিপরীত দিকে। ক্লাইম্বারের মত হাতের সামনে যা পেল তাই ধরে এগুলো সে-হেডবোর্ড, দরজার হাতল, ওয়াশ বেসিন। শেষমেশ আয়না অবধি পৌঁছে গেল। আয়নায় চেহারা দেখে, নিজেকে প্রশ্ন করলো, হায় ঈশ্বর, এটা কে? 

এবার আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারলো না সে। কালশিটে দাগ, ভাঙা দাঁত, বাম গালের ক্ষত, যেখানের হাড়ও গুঁড়ো হয়ে গেছে, অসংখ্য সেলাইয়ের দাগ… 

তার উপর এমন পাশবিক অত্যাচার কে চালিয়েছে? 

নিচে পড়ে যাওয়া ঠেকাতে বেসিনটা ধরলো অ্যানি।

“বিছানা ছেড়ে এখানে কী করছেন আপনি?” 

ঘুরে দাঁড়াতেই অজ্ঞান হয়ে গেল অ্যানি। সময়মতো ধরে তাকে ফ্লোরে শুইয়ে দিলো নার্স। এরপর মাথাটা কোনোমতে করিডোরের দিকে বের করে বলল, “ফ্লোরেন্স, একটু এদিকে এসো তো।” 

.

দুপুর ৩ টা ৪০ 

দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলল ক্যামিল। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে লুইসও হাঁটছে তার পাশে; শ্রদ্ধা আর ভালো পরিচয়ের খাতিরে বসের সাথে সবসময় এই দূরত্ব বজায় রাখে সে। এত ছোট ছোট জিনিসের প্রতি নজর রাখা একমাত্র লুইসের পক্ষেই সম্ভব। 

গ্যালারি মনিয়েরের কাছাকাছি পৌঁছাতেই একটা জঞ্জাল চোখে পড়লো দুইজনের। আদতে ১২ বোরের বন্দুকে একদম দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া গাড়িটাই জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। 

পরবর্তীতে ক্যামিল যখন জানতে পারবে, সরাসরি যখন অ্যানি বরাবর গুলি চালানো হয়—তখন ঠিক এই গাড়িটার অন্যপাশে দাঁড়ানো ছিল সে। 

***

এই খাটো লোকটাই তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে। ইদানীং পুলিশ অফিসাররা রাজনীতিবিদদের মত হয়ে গেছে। তাদের পদমর্যাদা আর আকৃতি যেন একে অপরের বিপরীত। ক্ষুদ্রাকৃতির কারণে এই লোককে সবাই চেনে। একবার দেখলে আর ভোলা সম্ভব নয়। ক্যাফেতে উপস্থিত লোকজন ইতোমধ্যে গুঞ্জন শুরু করে দিয়েছে। তারা জানে নামটা বিদেশী, কিন্তু কোন দেশের? জার্মান, ডেনিশ, ফ্লেমিশ? একজন মতামত দিলো রাশিয়ান হতে পারে, এরইমাঝে আরেকজন বিজয়ীর ভঙ্গিতে চিৎকার করে বলল, “ভেরহোভেন! আরে, এটাই তো।” সবাই হেসে উঠলো। “দেখলে? আমি বলেছিলাম না বিদেশীই হবে।” 

রাস্তার এক কোণায় আবির্ভূত হলো ক্যামিল। ওয়ারেন্ট কার্ডও দেখাতে হলো না তার—বামন হওয়ার দরুণ কিছু বিশেষ সুবিধা আপনার প্রাপ্য। ক্যাফের জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে উৎসাহী লোকজন। ইতোমধ্যে অন্য কিছু তাদের মনোযোগ কেড়ে নিলো, কালো চুলের আকর্ষণীয় এক নারী ক্যাফেতে ঢুকেছে। ক্যাফের মালিক তাকে সাদর সম্ভাষণ জানালো। সবার চোখ ওই নারীর দিকে ঘুরে গেল। পাশের সেলুনের ওই মেয়েটা এসেছে। চারটা এসপ্রেসো অর্ডার দিলো-সেলুনের কফি মেশিনটা কাজ করছে না। 

সে সব জানে। কফি তৈরি হওয়ার সময়টুকু হাসিমুখে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো। যেন সে বোঝাতে চাইছে মানুষজনের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মত সময় তার নেই। কিন্তু লজ্জাবশত তার মুখ, যেন অন্য কিছু বলছে 

তারা পুরো ঘটনা জানতে চায়। 

.

দুপুর ৩ টা ৫০ 

ঘটনাস্থলে উপস্থিত অফিসারদের সাথে হাত মেলালো লুইস। সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইলো ক্যামিল। এই মুহূর্তেই। লুইস হতবাক হয়ে গেল। সে ভালো করেই জানে তার বস এসব শিষ্টাচার আর নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। কিন্তু এতো উচপদস্থ অফিসারের কাছ থেকে এমন ব্যবহার কেউ আশা করে না। বাম হাত দিয়ে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে, সামনে এগুলো লুইস। দোকানের পেছনে থাকা ঘরটা আপাতত পুলিশের দখলে। বসের পেছনে পেছনে সেখানে উপস্থিত হলো লুইস। দোকানের মালিকের সাথে হাত মেলালো ক্যামিল। কিন্তু তাকে বেশ অন্যমনষ্ক দেখাচ্ছে। ক্রিসমাস ট্রিয়ের মত সেজেগুজে আছে ওই নারী, গোলয়াজ ব্র্যান্ডের সিগারেট ফুঁকছে। তার হাতে শতবর্ষ আগে বিলীন হয়ে যাওয়া সিগারেট হোল্ডার। তাকে বাঁধা দিলো না ক্যামিল। ঘটনাস্থলে সবার আগে উপস্থিত হওয়া অফিসাররা ইতোমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ফেলেছে। ।

ল্যাপটপ সামনে আসতে না আসতেই লুইসের দিকে ঘুরলো ক্যামিল “আমি এদিকটা দেখছি। তুমি ওদিকে যেয়ে দেখো আর কিছু পাওয়া যায় কি না।” 

হাত দিয়ে ইশারা করে লুইসকে দরজা দেখিয়ে দিলো সে। দেরি না করে চেয়ারে বসে পড়লো। আশেপাশে কী আছে সব দেখে নিলো এক নজরে। ভাবখানা এমন যেন কোনো অশ্লীল ছবি দেখার জন্য তার একাকীত্ব প্রয়োজন। 

বসের অস্বাভাবিক আচার আচরণ কিছুটা অবাক হলেও তা প্রকাশ করলো না লুইস। লোকটার মাঝে এমন কিছু আছে যা সবার নজর কাড়ে। 

“কাজ শুরু করো,” সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থল দেখিয়ে দিলো ক্যামিল “এখানেই বাকি কাজ সারবো আমরা।” 

জুয়েলারি দোকানের বাইরের ক্যামেরার ফুটেজে আগ্রহী ক্যামিল। 

বিশ মিনিট পরের অবস্থা। ভিডিও ফুটেজের সাথে প্রথম সাক্ষীর বক্তব্য মিলিয়ে দেখছে লুইস। যেখানে বন্দুকধারী দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো ক্যামিল। 

ফরেনসিক টিম নমুনা সংগ্রহের কাজ শেষ করেছে। কাচের টুকরো থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব তুলে নিয়েছে। অপরাধস্থল থেকে ঘিরে থাকা টেপও খুলে ফেলা হয়েছে। ইন্সুরেন্স আর সার্ভের লোকজন চলে আসলে এখানকার দায়িত্বে থাকা শেষ অফিসারও চম্পট দেবে। দুই মাসের মাঝে সবকিছু ঠিক করে ফেলা হবে। এরপর নতুন কোনো বন্দুকধারীর আগমনের অপেক্ষা। যার নতুন লক্ষ্য হবে দোকানের মালিক, কর্মচারী কিংবা কোনো ক্রেতা। 

ঘটনাস্থলের দায়িত্বে আছে এক পুলিশ অফিসার। হালকা পাতলা গড়নের লোকটা বেশ লম্বা, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট, দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চিবুক, চোখের নিচের দিকটা ফুলে আছে। তার অবস্থা অনেকটা সহ- অভিনেতার মত, যার নাম কেউ মনে রাখতে পারে না। ক্যামিলের মনে হচ্ছে লোকটাকে এর আগেও অনেকগুলো ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করতে দেখেছে। তবে নাম মনে পড়ছে না। একে অপরের দিকে হাত নাড়লো তারা। 

ডাকাতির শিকার দোকানের দিকে তাকিয়ে আছে ক্যামিল। জুয়েলারি সম্পর্কে তেমন একটা ধারণা নেই তার। তবে কখনো ডাকাতি করলে এমন জায়গায় আসতো কি না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে তার। তবে সে এটাও জানে, সত্যটা সবসময় চোখের সামনে ধরা দেয় না। 

একটা ব্যাংক বাইরে থেকে দেখতে তেমন কিছু মনে না হলেও একবার ভেতরের জিনিস চুরি করতে পারলেই কেল্লা ফতে। এরপর ফিরে এসে ওই ব্যাংকটাই কিনে নিতে পারবেন আপনি 

শান্ত থাকার জন্য যা করা সম্ভব তাই করছে ক্যামিল। ওভারকোটের পকেটে হাত গুজে রেখেছে। ভিডিও ফুটেজের ওই ভীতিকর দৃশ্য বারবার দেখার পর থেকে তার হাত কাঁপা থামেনি। 

ক্যামিল এমনভাবে মাথা ঝাঁকালো যেন তার কানে পানি ঢুকেছে। যদিও মূল ঘটনা তা নয়। হঠাৎ করে নিজের মাঝে চলে আসা আবেগ দূর করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাই তার আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু তা অসম্ভব। মেঝেতে ছোপ ছোপ রক্ত একটা বৃত্ত তৈরি করেছে। যখন ওই লোকটা বন্দুক হাতে দাঁড়ানো, অ্যানি ঠিক এখানেই গোল হয়ে পড়ে ছিল। এক পা পিছিয়ে গেল ক্যামিল। ওই লম্বা পুলিশ তাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখে ফেলল। হুট করেই কাল্পনিক শটগান হাতে ঘুরে দাঁড়ালো ক্যামিল; আর পুলিশও রেডিওর দিকে হাত বাড়ালো। আরো তিন কদম পিছিয়ে ঠিক যেখানে বন্দুকধারী দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে পৌঁছে গেল ক্যামিল। এরপর কোনো কিছু না বলেই দৌড়াতে শুরু করলো। এই দেখে রেডিও হাতে নিলো ওই পুলিশ। কিন্তু ক্যামিলকে থামতে দেখে আর কিছু করলো না। চিন্তামগ্ন ভঙ্গিতে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করলো ক্যামিল। কিছুক্ষণ পর আগের জায়গায় ফিরে এসে ওই পুলিশ সদস্যকে লক্ষ্য করে হেসে দিলো সে। 

এখানে আসলে হয়েছিল কী? 

আশেপাশে ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করলো ক্যামিল। শটগানের গুলিতে চুরমার হওয়া কাচের টুকরোও তার চোখ এড়ালো না। সামনে এগিয়ে গেল সে। যে দিক দিয়ে জর্জ-ফ্ল্যানড্রিন সড়কে ওঠা যায় সেদিকে নজর দিলো। আসলে কী খুঁজছে তা নিজেও জানে না। ফটোগ্রাফিক মেমোরি থাকার কারণে যে কোনো জায়গা কিংবা মানুষের স্মৃতি তার মস্তিষ্কে অন্যরকমভাবে সাজানো থাকে। 

ব্যাখ্যাতীত হলেও সত্য, তার মন বলছে সে ভুল পথে এগুচ্ছে। এখানে কিছুই পাওয়া যাবে না। পুরোপুরি ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। 

তাই দেরি না করে সাক্ষীদের সাথে কথা বলার জন্য ভেতরে ঢুকল সে। সাক্ষীদের বিবৃতি নেয়ার কাজে নিয়োজিত অফিসারকে জানালো ‘নিজের মত করে’ কাজ করতে চায়। একে একে বই-বিক্রেতা, অ্যান্টিক ডিলার, সেলুনে কাজ করা মেয়ের সাথে কথা বলল ক্যামিল। জুয়েলারি দোকানের মালিককে ইতোমধ্যে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আর তার সহকারী কিছুই দেখেনি। ডাকাতির পুরোটা সময় হাত দিয়ে মাথা ঢেকে মেঝেতে পড়ে ছিল সে। লাজুক স্বভাবের এই মেয়ের জন্য একটু খারাপ লাগলো ক্যামিলের। তাই জিজ্ঞেস করলো কাউকে গাড়ি দিয়ে পাঠাবে কি না। জবাবে মেয়েটা জানালো, ক্যাফে লা বঁছেওতে কাজ করা এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছে। রাস্তার শেষাংশের দিকে আঙুল তাক করে দেখালো সে। যেখানে অতি উৎসাহী কিছু লোকজন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। “ঠিক আছে। এখান থেকে চলে যাও,” বলল ক্যামিল। 

সাক্ষীদের কথা শোনা আর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ দুটোই শেষ ক্যামিলের। 

ডাকাতির ঘটনা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মাত্রাতিরিক্ত চাপের কারণেই হয়তো অ্যানিকে হত্যা করতে চেয়েছিল তারা। নিজেদের উপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল ডাকাত দল। 

তবে বন্দুকধারীর এমন উন্মত্ততার ব্যাপারটা ঠিক মিলছে না। অ্যানিকে হত্যা করার যে নিরন্তর চেষ্টা….. 

*** 

ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হয়েছে, কিছুক্ষণের মাঝেই সে চলে আসবে। এরমাঝে সবার লিখিত বিবৃতিতে চোখ বুলিয়ে নিলো ক্যামিল। জানুয়ারির ওই ঘটনার সাথে প্রতিটি বর্ণনা পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে। 

“তুমি তো এই কথাই বলেছিল, তাই না?” 

“হ্যাঁ,” জবাব দিলো লুইস। “পার্থক্য শুধু এক জায়গাতেই। আজকের ঘটনায় শুধুমাত্র একটা জুয়েলারি দোকানে হামলা হয়েছে। আর জানুয়ারিতে ছয় ঘণ্টার মাঝে চারটা দোকানে।” 

নিচু স্বরে শিস বাজালো ক্যামিল। 

“মোডাস অপারেন্ডি তো পুরোপুরি এক। তিনজনের দল, জুয়েলারি দোকানে লুট করেছে একজন, আরেকজন শটগান হাতে দরজা পাহারা দিয়েছে, তৃতীয় ব্যক্তি বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষারত।”

“জানুয়ারির ওই ঘটনায় একজনের মৃত্যুর কথা বলেছিলে না?” 

হাতে থাকা নোটবুকের পৃষ্ঠা উল্টালো লুইস। 

“১৫ নাম্বার সড়কে প্রথম আক্রমণ হয়। দোকান খোলার সাথে সাথে ঝড়ের বেগে ঢুকে পরে ডাকাত দল। দশ মিনিটেরও কম সময়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। পুরো পরিকল্পনার শুধু এই অংশটুকুই সফলতার সাথে পার করে তারা। সাড়ে দশটা নাগাদ রেঁনের এক জুয়েলারিতে পৌঁছে যায়। সেখানে সেফবক্স খুলতে দেরি হওয়ায় এক কর্মচারীকে আঘাত করে। ভোঁতা কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে ওই কর্মচারী অজ্ঞান হয়ে যায়। চারদিন কোমায় ছিল সে। সেই যাত্রায় কোনো মতে বেঁচে গেলেও, পরবর্তিতে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি সে। কর্মরত অবস্থায় আঘাতের দরুণ পেনশনের আবেদন জানিয়েছে কোম্পানির কাছে।”

উদ্বিগ্ন ক্যামিল সবই শুনছে। অ্যানি কোনোমতে বেঁচে গেছে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে কষ্ট হচ্ছে ক্যামিলের। বড় করে বেশ কয়েকবার শ্বাস নিলো সে। 

“লাঞ্চের পরপর প্রায় দুইটার কাছাকাছি সময়ে ল্যুভরের কাছাকাছি এক জুয়েলারি দোকানে হামলা চালায় তারা। ইতোমধ্যে হিংস্রতা শুরু করে দিয়েছিল। এবারও ঢোকার কিছুক্ষণের মাঝে বেরিয়ে যায়। আহত অবস্থায় এক ক্রেতাকে রেখে যায় ফুটপাতের পাশে। সংকটাপন্ন হলেও রেঁনের ওই লোকের মত এতো খারাপ অবস্থা ছিল না তার।” 

“পরিস্থিতি তো ক্রমশই খারাপের দিকে যাচ্ছে,” মতামত দিলো ক্যামিল। 

“উত্তরটা একইসাথে হ্যাঁ এবং না,” বলল লুইস। “দলটা মোটেও নিয়ন্ত্রণ হারায়নি, বরং একাগ্রচিত্তে নিষ্ঠুরতার সাথে নিজেদের কাজ চালিয়ে গেছে…” 

“যাই হোক, একদিনে এতো কিছু করা তো…”

“তা ঠিক।” 

ছয় ঘণ্টার মাঝে চারটা ডাকাতি! কোনো দক্ষ দলেরও তো কালো ঘাম ছোটার কথা। অসাধারণ কর্মদক্ষতা আর শৃঙ্খলা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব না এটা। যত যাই হোক, একসময় তো ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার কথা। এমন ডাকাতি অনেকটা স্কি করার মত, দিনশেষে দুর্ঘটনা ঘটবেই। ক্লান্ত দেহের শেষ চেষ্টাই মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। 

“স্যাভ্রে সড়কের ধারে, জুয়েলারি দোকানের ম্যানেজার অবশ্য ওদের সাথে লড়েছে,” বলতে শুরু করলো লুইস। 

“ডাকাতি শেষে বের হওয়ার সময় একজনের কলার টেনে ধরে সে। ওই লোক মসবার্গ হাতে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আরেকজন ৯ মিলিমিটারের পিস্তল বের করে দুটো বুলেট ঠুকে দেয় ম্যানেজারের বুকে।” 

এটাই তাদের শেষ অভিযান ছিল কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই। হয়তো ম্যানেজারের মৃত্যু, তাদের পরিকল্পনার ইতি টেনে দেয়। 

“কতগুলো ডাকাতি সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছে, সেই হিসাব বাদ দিলেও এদের কাজের ধরণ অতুলণীয়। বেশিরভাগ ডাকাত এই ধরনের কাজ করার সময় চিৎকার করে কোনো আদেশ দেবে, বন্দুক হাতে এক মাথা থেকে আরেক মাথা অবধি হেঁটে বেড়াবে। হয়তো মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য দুই এক রাউন্ড গুলিও চালাবে। কিন্তু এই দলের সবাই বেশ গোছানো, তাদের মূল লক্ষ্য একটাই। এক কদমও ভুল পথে হাঁটে না এরা। যদি সাহসী দুই একজন তাদের পথ না আটকাতো, তাহলে হয়তো পারিপার্শ্বিক ক্ষতির পরিমাণ খুব সামান্যই হতো।” 

“লুটের পরিমাণ?” জানতে চাইলো ক্যামিল। 

“আটষট্টি লাখ ইউরোর সমপরিমাণ সম্পদ,” জবাব দিলো লুইস। “অন্তত পত্রিকায় তাই এসেছে।”

ভ্রু কুঁচকে গেল ক্যামিলের, জুয়েলাররা যে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে বলবে এই জন্য সে বিস্মিত না-তাদের ভাণ্ডারে না জানা আরো অনেক সম্পদই থাকে। তার শুধু সত্যিটা জানা দরকার। 

“এগুলো বিক্রি করলে কম করে হলেও যাট কিংবা পয়ষট্টি লাখ তো পাবেই। মাত্র একদিনের কামাই।” 

“কোনো ধারণা আছে কোথায় বিক্রি করতে পারে?” 

“সম্ভবত নুইয়ি দিয়ে পাচার করা হয়েছে, কে জানে…”

ঠিক তাই। এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতেই পারে না। গুজব আছে নুইয়ি পুরোপুরি শয়তানের আঁখরা। কখনো ওখানে অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি ক্যামিল। তবে চালাতে দোষ কী 

“খোঁজ খবর নেয়ার জন্য কাউকে পাঠিয়ে দাও।”

নোটে টুকে নিলো লুইস। বেশিরভাগ সময় কাজ বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব তাকেই পালন করতে হয়। 

*** 

এমন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট, জুজ পেরেইরা এসে পৌছালো। উজ্জ্বল নীলাভ চোখ, তবে মুখের তুলনায় নাকটা বেশ বড়। স্প্যানিয়েল কুকুরের মত ঝুলে আছে কান। কিছুটা উত্তেজিত অবস্থায় ক্যামিলের সাথে হাত মেলালো, “হ্যালো, কম্যান্ড্যান্ট।” ক্যামিলের পেছনে সদর্পে হেঁটে আসছে আদালতের মুহুরি। এই মহিলার জামার গলা বিপজ্জনক মাত্রায় নিচে নেমে আছে। বেখাপ্পা রকমের উঁচু হিল জুতো পরে হাঁটার কারণে ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে মেঝেতে। কর্মক্ষেত্রে পোশাকের ব্যাপারে তার জ্ঞান অত্যন্ত কম। কোনো সহৃদয়বান ব্যক্তির এই ব্যাপারে তার সাথে কথা বলা উচিত। 

সবাই একত্রিত হলো। ক্যামিল, লুইস আর সদ্য যোগ দেয়া দুই সদস্য। ম্যাজিস্ট্রেটকে পুরো ঘটনা বলার ভার নিলো লুইস। যথাযথ উপায়ে নির্ভুল এবং বিশ্লেষণধর্মী বর্ণনা দিলো সে (ছোটবেলায় ইকোল ন্যাশনালে দি’ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এর মত দেশসেরা প্রতিষ্ঠানে বৃত্তি পেয়েছিল, কিন্তু তার বদলে সাইন্সেস পো’তে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে)। মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনলো জুজ পেরেইরা। এক সাক্ষীর বিবৃতি অনুযায়ী, ডাকাত দল পূর্ব ইউরোপিয় ধাঁচে কথা বলছিল। সার্বিয়া কিংবা বসনিয়ার কোনো দল হতে পারে। এমন ধারণার মূল কারন, দলটার হিংস্রতা। চাইলেই তারা গোলাগুলি এড়িয়ে যেতে পারতো, কিন্তু তা করেনি। ভিনসেন্ট হ্যাফনার আর তার কুকর্মের কথা উল্লেখ করলো একজন। মাথা নাড়লো ম্যাজিস্ট্রেট। হ্যাফনারের সাথে কোনো বসনিয়ান যোগ দেয়া মানে দলটা বিপজ্জনক। এরা তো পশুরও অধম; আরো মানুষের যে ক্ষতি হয়নি তাই বিস্ময়কর, মতামত দিলো জুজ পেরেইরা। 

সাক্ষীদের জেরা করার জন্য এগিয়ে গেল জুজ পেরেইরা। সাধারণত সকালে দোকান খোলার সময় তিনজন কর্মচারী উপস্থিত থাকে-ম্যানেজার, তার সহকারী আর অন্য একটা মেয়ে, তবে আজ সকালে মেয়েটা দেরি করে এসেছিল। শেষ গুলিটা চলার সময়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় সে। ব্যাংক কিংবা দোকানে ডাকাতির সময় কাকতালীয়ভাবে যখন কোনো কর্মচারী অনুপস্থিত থাকে, সাথে সাথে তাকে সন্দেহ করা শুরু করে পুলিশ। 

“জেরা করার জন্য রেখে দেয়া হয়েছে তাকে,” উপস্থিত এক অফিসার জানালো। “বিষয়টা আমরা খতিয়ে দেখবো। আপাতত তাকে নির্দোষই মনে হচ্ছে।” 

আদালতের সেই মুহুরির চোখে মুখে বিরক্তির ভাব সুস্পষ্ট। ডান পা থেকে বাম পায়ে ভর দিচ্ছে একটু পরপর। বের হওয়ার দরজার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার নখে রক্তলাল নেইলপলিশ। পরনের জামার উপরের দুটো বোতাম খুলে যাওয়ার বুকের অতল খাঁজ এখন স্পষ্ট। সবার লক্ষ্য এখন ওই তৃতীয় বোতামটার দিকে, যা এখন নাজুকভাবে আটকে আছে। তার দিকে তাকিয়ে আছে ক্যামিল, মনে মনে তার স্কেচ করছে। প্রথম দৃষ্টিতেই যে কারো নজর কাড়তে সক্ষম সে, তবে শুধু প্রথমবারই। একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই ভিন্ন চিত্রটা চোখে পড়ে : পা দুটো বেশ লম্বা, নাকটা আবার বেশি ছোট, একটু স্থুল শরীর। আর পশ্চাৎদেশ শরীরের সাথে মানিয়ে গেলেও বেশ উঁচু, কোনো পর্বতের চেয়ে কম না। শরীর থেকে লোনা পানি আর সমুদ্রের বাতাসের ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। জেলের বউ হতে পারে। 

“ঠিক আছে,” এই বলে ক্যামিলকে নিয়ে একটু দূরে গেল জুজ পেরেইরা। “কমিশনার ম্যাডাম বললেন আপনার নাকি কোন ইনফর্মার আছে…?” 

‘কমিশনার ম্যাডাম’ শব্দটা যে তোষামুদে সুরে বলল, তা সচরাচর ‘মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়’ বলার সময় ব্যবহৃত হয়। এই দু-জনের কথাবার্তা শুনতে শুনতে বিরক্তির শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে মুহুরি। বড় করে হাই তুলল সে। 

“ঠিকই শুনেছেন,” সায় জানালো ক্যামিল। “আগামীকাল আরো কিছু তথ্য আসবে আমার হাতে।” 

“তার মানে যা বোঝা যাচ্ছে, এই কেস খুব দ্রুতই শেষ করতে পারবো আমরা?” 

“হয়তো…”

এমন জবাবে ম্যাজিস্ট্রেটকে বেশ সন্তুষ্ট মনে হলো। যদিও সে কমিশনার না, তবে কিছু বিষয় যে অনুকূলে আছে তা ভাবতেই ভালো লাগছে তার। চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো সে। মুহুরির দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকালো। 

“মাদামোয়াজেল?” 

তার কণ্ঠে চাঁছাছোলা ভাব সুস্পষ্ট। 

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *