তৃতীয় দিন – বিকাল

বিকাল ৫টা ১৫ 

“কী শুনতে চাও? ভিক্টিমকে বেধড়ক পেটানো হয়েছে, ফাইল পড়ে এতটুকুই বুঝলাম।” 

ফোনে অনেকটা নাকি সুরে কথা বলে নগুয়েন। কথা শুনে মনে হয়, অনেকটা কোনো অডিটোরিয়ামে আছে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি, দৈব বাণীর মত শোনায়। নগুয়েনকে ইশ্বর প্রদত্ত কোনো বিশেষ দূত বলেই মনে হয় ক্যামিলের। 

“হত্যা চেষ্টার কোনো লক্ষণ কি আছে?” জানতে চাইলো ক্যামিল। 

“না…না, আমার তা মনে হয় না। জখম করার উদ্দেশ্যেই মারা হয়েছিল, কিন্তু খুনের জন্য নয়…”

“আপনি কি পুরোপুরি নিশ্চিত?” 

“কখনো কোনো ডাক্তারকে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে শুনেছো? রিপোর্ট দেখে যদ্দুর বলতে পারি, যদি কেউ লোকটাকে বাঁধা না দিয়ে থাকে, তাহলে চাইলেই এই নারীর মাথা তরমুজের মত ফাটিয়ে দিতে পারতো সে।” 

যেহেতু তেমন কিছুই ঘটেনি, এইবার চিন্তায় পড়ে গেল ক্যামিল। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে তার। ঘটনাস্থলে থাকা লোকটাকে কল্পনা করলো সে। শর্টগানের বাঁটটা মাথার বদলে অ্যানির চোয়ালের দিকে নেমে এলো। পরিকল্পনা ছাড়া এই লোক এক কদমও ফেলে না। 

“লাথির ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে,” জানালো নগুয়েন। “রিপোর্টে আলাদা আলাদা আটটা আঘাতের কথা বলা থাকলেও, নয়টা পেয়েছি আমি। তবে, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি না। লোকটা শুধু পাঁজরের হাড় ভাঙার চেষ্টা করেছে, এর বেশি কিছু না। আঘাতের স্থান আর লোকটার পায়ে যে জুতো ছিল, চাইলেই মেরে ফেলতে পারতো এই নারীকে। এটাই বরং আরো সহজ হতো। জায়গা মতো তিনটা লাথি দিলেই প্লীহা ফেটে যেতো। সেক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণেই মারা যেতো ভিক্টিম। সবকিছুই ভিক্টিমকে বাঁচিয়ে রাখার দিকে ইঙ্গিত করছে।” 

নগুয়েনের বর্ণনা অনেকটা সতর্কবাণীর মত শোনাচ্ছে। যেন কোনো গুরুতর অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হচ্ছে। 

যদি অ্যানিকে (পরিচয়টা আসল নয়) হত্যার উদ্দেশ্যে নাই থাকে আক্রমণকারীর (এখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে হ্যাফনার এই কাজ করে নি), তাহলে এই ডাকাতিতে অ্যানির জড়িত থাকার ব্যাপারটা এখন আর সম্ভাবনার পর্যায়ে থাকলো না। পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া গেল। 

সেক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য অ্যানি নয়, ক্যামিল। 

.

বিকাল ৫টা ৪৫ 

এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। বুসনকে দেয়া ক্যামিলের আলটিমেটাম শেষ হবে রাত আটটায়। কিন্তু এ তো শুধু কথার কথা। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েক জায়গায় ফোন দিয়েছে বুসন। এতোদিন ধরে গড়ে তোলা নেটওয়ার্কের সবার সাথে যোগাযোগ করেছে সে। এমনকি হ্যাফনারের সহচরদেরও বাদ দেয়নি। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। পরিচিত সবাইকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। আগামী দুই ঘণ্টার মাঝে কোনো সংবাদ আসতে পারে, আবার দুইদিনও লাগতে পারে। কোনো ঠিকঠিকানা নেই। যত সময়ই লাগুক, অপেক্ষা করতে হবে ক্যামিলের : এছাড়া কোনো পথ খোলা নেই তার সামনে। 

ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, ক্যামিলের বাঁচা মরা এখন বুসনের হাতে।

আইরিনের হত্যাকারী বুসনের সফলতার উপর নির্ভর করছে, ক্যামিলের পুরো জীবন। 

*** 

সোফায় বসে আছে অ্যানি। লাইট জ্বালানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি সে। বনের অন্ধকার পুরো বাড়িটাকে যেন গ্রাস করে নিয়েছে। মোবাইলের স্ক্রিন থেকে হালকা আলো এসে তার চোখে পড়ছে। নির্বিকারভাবে বসে আছে সে। কী বলবে তা মনে মনে সাজিয়ে নিচ্ছে। কথাগুলো আদৌও বলতে পারবে কি না এ ব্যাপারে দ্বিধায় ভুগছে। কিন্তু এবার ব্যর্থ হওয়া যাবে না। জীবন মরণের প্রশ্নে কোনো দ্বিধা চলে না। 

শুধু নিজের জীবনের কথা হলে আর মাথা ঘামাতো না অ্যানি। প্রাণের মায়া থাকলেও বর্তমান অবস্থান মৃত্যুকেই মেনে নিতো সে। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে আর ব্যর্থ হতে চায় না সে। 

*** 

ফারনান্ডের কার্ড খেলার ব্যাপারটাও অন্যরকম। যেভাবে নিজের ছায়া হয়ে বাঁচে, কার্ড খেলাতেও একই দশা। এতোটাই ভীত থাকে যে ইচ্ছা করেই হারে আমার কাছে। আর গাধার বাচ্চাটা ভাবে এভাবে আমাকে খুশি করছে। মুখে কোনো কিছু না বললেও, চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে শুধু কাপড় নষ্ট করা বাকি ওর। এক ঘণ্টার মাঝে দোকানের কর্মচারীরা আসতে শুরু করবে। রাতের খাবারের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে বলদটার। ইতোমধ্যেই শেফ চলে এসেছে-শুভ বিকাল, বস!-বস ডাক শুনলে খুশিতে গদগদ হয়ে যায় ফারনান্ড। 

আমার মাথায় অবশ্য অন্য চিন্তা ঘুরছে। 

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আশা করি নিজ নামের প্রতি সুবিচার করবে কম্যান্ড্যান্ট ভেরহোভেন। খুব নামডাক তার। তাই তার সক্ষমতার উপর বাজি ধরেছি, নিরাশ না করলেই হয়। 

আমার হিসাব অনুযায়ী, আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত সময় আছে। 

এর মাঝে যদি কাঙ্ক্ষিত জিনিস না পাই, তাহলে তো সব শেষ। 

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *