দুই-পুরুষ

দুই-পুরুষ

ডেস্কের পাশে রাখা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের মধ্যে বেশ অনেকটা গুটখার পিক ফেলে বিশাল চেহারার লোকটা বলল, ‘ঠিক আছে। আপনি বিমলবাবুর লোক আছেন, তো সওয়াল-জবাবের কোনও বেপার নেই। লেকিন কামকাজ বুঝে নিন।’

‘হ্যাঁ স্যার…’ আর কিছু বলতে পারল না অতনু। বুকের ভেতরটায় আরও জোরে দপদপ করতে শুরু করেছে।

‘আপনি নীচের গদিতে বসুন, আমি লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনাকে কাম বুঝিয়ে দিবে।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল অতনু। একটা তীব্র আনন্দ, খানিকটা ভয় আর কী যেন একটু সঙ্গে নিয়ে চারতলার অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু এটা কি সত্যিই অফিস? একটা পোড়ো চারতলা বাড়ি। তার মধ্যে অসংখ্য খুপরি ঘর। কোনওটার জানলায় গামছা, সায়া মেলা রয়েছে। কোনওটার থেকে ক্যাঁও ক্যাঁও করে বাচ্চার কান্না আসছে। লম্বা ঝুলবারান্দাটার মধ্যে ছড়ানো ছেটানো পেঁয়াজের খোসা, গুটখার প্যাকেট, ছেঁড়া প্লাস্টিক, ঠোঙা, কোনও ঘরে মেশিন চলার ঘড়ঘড় করে উৎকট শব্দ হচ্ছে।

অন্ধকার খাড়া সিঁড়ির পলেস্তারা খসা দেয়াল ধরে নামতে নামতে অতনু ভাবল যাক গে, কেউ তো আর দেখতে আসছে না ওর অফিস। অফিস—শব্দটা আবার ঢেউ তুলল অতনুর শরীরে। কাল থেকে সত্যি সত্যি বাড়ির লোককে, পাড়ার সবাইকে বলতে পারবে ‘অফিস যাচ্ছি’, কিংবা ‘আজ বেরোতে খুব লেট হয়ে গেল।’—সিঁড়ি দিয়ে নেমে একতলার চাতালটায় পা দিতেই আবার সেই নাকে জ্বালা ধরিয়ে দেওয়া গন্ধটা। সিঁড়ির পাশেই টয়লেট, ধ্যাৎ পেচ্ছাপখানা বললেই সবচেয়ে ঠিক হয়।

জায়গাটার দিকে উঁকি মারল অতনু। কোনও দরজার বালাই নেই তবু ভেতরটা অন্ধকার। ঢোকার মুখেই একটা চৌবাচ্চা আবর্জনায় ভরতি। ভেতরের দিকে দুটো বেশ উঁচু পাদানি আবছা দেখা যাচ্ছে। বোঝাই যায় বহুদিন হল পাদানির ধারেকাছে কেউ ঘেঁষে না। একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েই ঢেলে দিয়ে চলে যায়। ভয়ংকর গন্ধে পুরো জায়গাটা মাখামাখি। ওটার ঠিক উলটো দিকে ফুট চারেক দূরে দুজন মটিয়া একটা তক্তপোশের ওপর বাবু হয়ে বসে, এনামেলের থালায় পরম তৃপ্তিতে ভাত খাচ্ছে।

তলপেটটায় অনেকক্ষণ ধরে চাপ দিচ্ছিল। কী করবে ভাবতে ভাবতে একটু বেখেয়াল হয়ে পড়েছিল অতনু। তখনই—’আমার সঙ্গে আসুন’ শব্দে ঘাড় ফেরাল।

শব্দটা তার শরীর নিয়ে ভুসো অন্ধকার থেকে আলোর সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটাকে একটু আগেই পিছন থেকে দেখেছ অতনু। ও যখন মালিকের সঙ্গে কথা বলছিল তখন লোকটা ঘরের এককোণে রাখা কম্পিউটারে কাজ করে যাচ্ছিল। আশ্চর্য, একবারের জন্যও কৌতূহলে মুখ ঘুরিয়ে অতনুর দিকে তাকায়নি।

ভদ্রলোক সামনে আসার পর কাছ থেকে বেশ ভালো করে দেখল অতনু। কাঠামো দেখে মনে হয় চল্লিশের আশেপাশে। কিন্তু চুল, মুখের খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ অধিকাংশই পাকা। চেহারার ছাপে একটা অকালবার্ধক্য। চোখ দুটো মরা ভোলা মাছের মতো নিষ্প্রভ। পরনে একটা টেরিকটের হলুদ শার্ট আর পাজামা হয়ে আসা খয়েরি ফুলপ্যান্ট। পায়ে আবার কেডস। পুরো গেটআপটাই অদ্ভুত। এই-ই আজ থেকে অতনুর অফিস কলিগ। যেমন অফিস তার তেমন কলিগ…যা…ক গেহ।

অতনু একগাল হাসি টেনে বলল, ‘আপনি কম্পিউটারে কাজ করছিলেন না?’

‘হুঁ।’

‘অ্যাকাউন্টস?’

‘হ্যাঁ।’

‘কী প্যাকেজে কাজ হয় এখানে?’

‘ট্যালি।’

যাহ শাল্লা, এ যে সবই এক নম্বরের উত্তর মারে!

‘এদিকে আসুন।’

‘হ্যাঁ চলুন’ বলে অতনু লোকটার সঙ্গে গদিতে এল। গদি একতলায়, অফিস চারতলায়।

সাদা ধপধপে ফরাস পাতা। এক পাশে রাখা ফর্সা দুটো তাকিয়া। তাকিয়ার কোলে একটা টেলিফোন। একেবারে কোণে একটা সেলফে বেশ কিছু লাল রঙের খাতা, ব্যাঙ্কের স্লিপ। সেলফের পাশে রাশভারী রকমের লোহার লকার। লকারের মুখে কমলা রঙের সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিক আঁকা। লকারের ঠিক ওপরেই দেয়ালের র‌্যাকে মাটির লক্ষ্মী-গণেশ।

‘ওখান থেকে এক্সিস ব্যাঙ্কের ডিপোজিট স্লিপ বইটা বার করুন।’ অতনু হাত বাড়িয়ে বইটা বার করতে করতে বলল, ‘আমাকে আপনি বলতে হবে না।’

‘ঠিক আছে।’

‘আচ্ছা এ-গলির সবক’টা দোকানেরই কি সুতোর ব্যবসা?’

‘হুঁ।’

এ কী লোক রে ভাই! অতনু স্লিপ বইটা লোকটার হাতে দিল।

‘চেক ভরতে পারেন?’

‘পারি।’ অতনুও শর্টকাট মারল।

‘ভরুন এগুলো,’ বলে একতোড়া চেক ধরিয়ে দিল অতনুর হাতে। প্রথম চেকটাই তিন লাখ সতেরো হাজার। হাত দুটো একবার যেন কেঁপে উঠল। একটা কাগজ, স্রেফ পাঁচ ইঞ্চি বাই তিন ইঞ্চি একটা কাগজ, এত ভারী!

স্লিপ ভরতে শুরু করল অতনু। কোনও অ্যামাউন্টই দুইয়ের নীচে নয়। আটখানা চেক। মানে মোট মিলিয়ে প্রায় বিশের মতো।

আঙুলগুলো আবার শিরশির করে উঠল।

‘হয়ে গেছে?’

‘হুঁ।’ অতনু ঠিক করে নিয়েছে লোকটার সঙ্গে ও-ও এইভাবে কথা বলবে।

‘আপনাকে বিমলবাবু পাঠিয়েছেন?’

‘হ্যাঁ। আপনি চেনেন ওনাকে?’

‘উনি তো প্রায়ই আসেন এখানে।’ বলে লোকটা একটু থামল।

তারপর বেশ ইতস্ততভাবেই জিগ্যেস করল, ‘আপনি কি এখানে অ্যাকাউন্টসের কাজে এসেছেন?’

এই তো দাওয়াই পড়ে সোনার চাঁদের এতক্ষণে বুলি ফুটছে। জিতে যাওয়ার একটা ছোট্ট আনন্দ ঝিলিক দিল অতনুর মনে। পরক্ষণেই লোকটাকে ক্ষমা করে দিয়ে ও আবার একগাল হেসে বলল, ‘হ্যাঁ। কিন্তু এখানে তো দেখলাম একটা মাত্র কম্পিউটার। তাহলে দুজনে মিলে কাজ করব কীভাবে?’

এবারে লোকটার কীরকম অদ্ভুত হাসির মতো ঠোঁট বেরিয়ে বলল ‘দুজনকে কি আর রাখবে! আপনি কাজ করলে আমাকে এখান থেকে সাইড করে দেবে।’

কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল অতনু। লোকটার মৃত চোখ দুটোর দিকে আবার তাকাল। নেহাতই নির্বিকার দুটো চোখ। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে বুকটা কেমন ধক করে ওঠে।

অতনু প্রসঙ্গ পালটাবার জন্য বলল, ‘দাদা, আপনার নামটাই তো জানা হয়নি।’

‘আমার নাম সমীর ভট্টাচার্য।’

‘আচ্ছা, আমি অতনু সান্যাল।’

‘বাহ দুজনেই বামুন’ বলে লোকটা খানিক দাঁত বার করল। কী বিচ্ছিরি মনমরা একটা হাসি।

‘বাড়ি কোথায়?’

‘হিন্দমোটর। আপনার?’

‘আমি আন্দুলে।’

‘ও বাবা সে তো বেশ দূর।’

‘ওই আর কী।…তুমি একটু বসো, আমি ওপর থেকে আসছি।’

সমীরদা উঠে যাওয়ার পর অতনু স্লিপ বইটা সেলফে তুলে রেখে সামনের দিকে তাকাতেই পেটের সব ভাত যেন একসঙ্গে গলায় ঠেলা দিয়ে উঠল। গদির উলটোদিকে ফুট কয়েক দূরে দাঁত বার করা ঢ্যাঙা বাড়িটার একেবার নীচে একটা কুলুঙ্গি মতো। বোধহয় আগেকার দিনের ভ্যাট। সেটার গায়ে কয়েক লক্ষ আরশোলা চুপচাপ বসে রয়েছে। সামনে স্তূপ করা ছাই, তরকারির খোসা, এক কোণে খানিকটা পাতলা পায়খানা। দু-চারটে বেজি সাইজের ইঁদুর ইটের ফাঁকেফোকরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এই ঘিঞ্জি দম বন্ধ করা নরকের মধ্যে বসে ওকে দিনের পর দিন কাজ করতে হবে! কান্না পেয়ে গেল অতনুর।

‘চলো’, সমীরদার গলা শুনতে পেল না অতনু।

‘কী গো ওঠো।’

‘অ্যাঁহ।’

‘কী ভাবছ?’

‘এখানটা এত নোংরা সমীরদা! কী করে থাকে সবাই?’

‘কেন ঘেন্না করছে? ও প্রথম প্রথম আমারও হত। দু-একটা দিন যাক, দেখবে তারপর সয়ে গেছে।’

খারাপ জিনিস সয়ে যাবে! চুপচাপ উঠে দাঁড়াল অতনু। জিগ্যেস করল ‘কোথায় যাব?’

‘ব্যাঙ্কে, বাবু তোমায় ব্যাঙ্কগুলো চিনিয়ে দিতে বললেন।’

‘ব্যাঙ্কে! আমি গিয়ে কী করব? আমার তো অ্যাকাউন্টসের কাজ।’

সমীরদা একটু বাঁকা হেসে ঠেস মেরে বলল, ‘বড়বাজারে কাজ করতে এসেছ। এখানে সব করতে হয়। অ্যাকাউন্টসও রাখবে, পার্টির কাছে টাকা কালেকশনেও যাবে, ব্যাঙ্কেও যাবে, আবার প্রয়োজন হলে বাবুর…,’ একটা চুটকি রহস্য রেখে থেমে গেল সমীরদা। বলল, ‘চলো।’

এম জি রোড দিয়ে মিনিট পাঁচেক চুপচাপ হাঁটার পর সমীরদা আচমকা জিগ্যেস করল, ‘তুমি কি বিমলবাবুর রিলেটিভ?’

‘না-না। আমি ওঁর ছেলে পড়াই।’

‘অ’। আবার চুপচাপ।

সত্যিই একটা চাকরির বড় প্রয়োজন ছিল অতনুর। ওর ছাত্রর বাবা বিমল সেন নাম করা অ্যাডভোকেট। প্রচুর চ্যানেল। বলব না বলব না করে শেষপর্যন্ত একদিন মাথা নুইয়ে বলেই ফেলেছিল—

‘কাকু একটা কথা ছিল।’

‘হুঁ বলো। আবার ফাঁকি মারছে, না?’

‘না-না, সে ব্যাপারে নয়, মানে…’

‘কী?’

‘আমার একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন?’

‘চাকরি?’

‘হ্যাঁ, আসলে…।’ তারপর পাঁচ দিন আগে থেকে টানা রিহার্সাল দেওয়া কথাগুলো গড়গড় করে মুখস্থের মতো বলে গেছিল অতনু। ডিভোর্সি দিদি, আলসারের মা, পুরোহিত বাবা আর ছ’টা টিউশনির অতনুর সংসার একেবারে হেঁপো রুগির মতো পাঁজর বার করে খাবি খাচ্ছে। নিপুণভাবে ছবিটাকে এঁকে দিয়েছিল কয়েক মিনিটে।

‘কম্পিউটার জানো?’

‘হ্যাঁ, অ্যাকাউন্টসের কাজ জানি।’

‘ঠিক আছে, ভালো, একটা বায়োডাটা দিয়ে যেও।’

তারপর প্রায় মাস দেড়েক, আবার একদিন, ‘কাকু আমার কোনও খোঁজ পাননি না?’

‘অ।…কম্পিউটার জানো?’

‘হ্যাঁ জানি,’ বেশ হতাশভাবে বলেছিল অতনু।

‘বায়োডাটা আছে?’

‘আছে।’

‘ঠিক আছে, কাল সকালে সাতটা নাগাদ একবার এসো।’

সাড়ে ছ-টার মধ্যে পৌঁছে গেছিল অতনু।

একটা ছোট্ট কাগজে ঠিকানা লিখে দিয়ে বিমলবাবু বলেছিলেন, ‘আজকে এগারোটা নাগাদ এর সঙ্গে দেখা করো। আমি কথা বলে রেখেছি। এ আমার ক্লায়েন্ট। সুতোর কারবার। খুব একটা যদিও দেবে না এখন। যাই হোক ঢুকে তো পড়ো আপাতত। পরে দেখা যাবে।’

‘ঢুকে পড়ো’… তার মানে…পাকা! ওফ…শব্দ এত সুন্দর হয়!

রাস্তায় বেরিয়ে খানিকটা সাইকেল চালানোর পর মাঝপথে থেমে ঠিকানার চিরকুটটা বার করেছিল অতনু। বনোয়ারিলাল কেজিয়া। ১৮৪/এ, যমুনালাল বাজাজ স্ট্রিট, সুতো পট্টি, বড়বাজার।

চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে উঠে সমীরদা বলল, ‘চলো আজকে বাসে যাব।’

‘কোথায় যাব এখন?’

‘গণেশ চন্দ্র। স্টেট ব্যাঙ্কে।’

কিন্তু আজকে বাসে যাব মানে? চেপে রাখতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেলল অতনু, ‘অন্যান্য দিন কীভাবে যান তাহলে?’

‘হেঁটে। চিন্তা নেই, আজ তুমি প্রথম বলে বাসভাড়া দিয়ে দিয়েছে। কাল থেকে তোমাকেও স্রেফ হেঁটে হেঁটে অর্ধেক কলকাতা চষতে হবে।’ বুকের ভেতর চড়াং করে উঠল অতনুর। বলে কী!

‘রাত্তিরে যখন বাড়ি ফিরি, পা দুটোয় আর কিছু থাকে না। রোজ নিজের মেয়েটাকে পায়ের ওপর দিয়ে হাঁটাই। তার মধ্যে শালা একটা কোমরের ব্যথা এসে জুটেছে। তুমি…’

সমীরদার কথাটাকে থামিয়ে দিয়ে একটা বাস এসে গেল। ভিড় বাসের মধ্যে আর কোনও কথা হল না। শুধু অর্ধেক পরিচিত দুজন পুরুষের মধ্যে দু-একবার চোখাচোখি হল মাত্র।

দুই

একটু বেশি নোনা ধরা, এখানে ওখানে চুন খসা, ইঁট বার করা অতনুদের বাড়িটা দেখতে একইরকম আছে কিন্তু মাত্র কয়েকটা দিনের মধ্যে বাড়ির পরিবেশটা যেন হুড়মুড় করে বদলে গেছে। বাবা, মা, দিদি সবাই যেন বুঝে গেছে অতনুর হাতে এখন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। সে প্রদীপ ঘষলেই মুদির দোকান, কেরোসিন, দুধ, ইলেকট্রিক বিল, সপ্তাহে দু-দিন মাছ, এমনকী কিছু শৌখিনতা করাও আর কঠোর নিষিদ্ধ নয়। বাবা পাড়ার হরিসভার নিত্য পুরোহিত। বরাদ্দ নৈবিদ্যের কুচো ফলগুলো এখন অতনুর টিফিন বাক্সে করে বড়বাজারে আসে। অফিস কালচার অতনুর বাড়িতে কোনওকালে ছিল না বলেই এখন সকাল হতে না হতেই বাড়িময় যেন হুলুস্থূল পড়ে যায়। ভাত-ডাল-তরকারি, টিফিন বাক্সে রুটি, আলুভাজা, কুচো ফল, দানাদার…অতনু লজ্জায় গুটিয়ে যায়। মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছে করে বাড়ির সবাইকে নিয়ে গিয়ে একবার অফিসটাকে দেখায়। এই দেখো, এই আঁস্তাকুড়কে তোমার অফিস বলবে? কেন ফালতু এত হইচই করছ সকলে। কথাটা গলা পর্যন্ত এসে আটকে যায়। কে যেন সান্ত্বনা দিয়ে বলে, কী হয়েছে, তবু তো অফিস, কেউ তো আর আসছে না কেমন দেখতে।

বড় অদ্ভুত জায়গা এই বড়বাজার। বড় অচেনা এখানকার মানুষজন, বেলা এগারোটা থেকে সন্ধে সাতটা পর্যন্ত সম্পূর্ণ এক অন্য পৃথিবীতে থাকে অতনু। কাজের ফাঁকেফোকরে অবাক হয়ে দেখে সারাদিন কত বিচিত্র মানুষের আসাযাওয়া, হাসি, রাগ, চিৎকার, আরশোলা, ইঁদুর আবর্জনা…আর সমীরদা। মানুষটা যে ঠিক কীরকম কিছুতেই বুঝতে পারে না অতনু। একদিন সন্ধেবেলা মুক্তারামবাবু স্ট্রিট দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুম করে অতনুকে বলল—’তুমি বাঙালি বলেই বলছি, এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি পারো পালাও। খুব বাজে জায়গা।’

‘বাজে জায়গা মানে?’ প্রশ্নটা নি:শব্দে করে ভুরু কুঁচকে তাকাল অতনু।

‘এদের ব্যবহারের জন্য দু-দিনের বেশি লোক টেকে না। পুরো কুত্তার মতো ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে।’ বলেই তারপর আবার বলল, ‘অবশ্য প্রথম প্রথম তোমায় কিছু বলবে না। দিন কয় যাক তখন নিজেই বুঝবে আমি ঠিক বলছি কি না।’

অতনু চুপ থাকল, লোকটা কী বলতে চাইছে আসলে?

‘তুমি অবশ্য ভাবছ আমি তোমাকে ভাগাতে চাইছি। ভাবাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আসলে তা নয়। তুমি ছেলেটা ভালো, তার ওপর অল্প বয়স—আমার লাইফটা তো ভোগে গেছে, তোমার এখনও সময় আছে। অন্য কোথাও চেষ্টা করো। নইলে…’

‘চেষ্টা’— শব্দটা শুনে হেসে ফেলেছিল অতনু। চাকরির চেষ্টা শব্দটা যেন কী অদ্ভুত! প্রসঙ্গটাকে পালটাবার জন্য অতনু বলল, ‘আচ্ছা সমীরদা আপনি কত দিন হল এখানে ঢুকেছেন?’ সমীরদা একটু চুপ থাকল। তারপর মুখে আঙুল ঢুকিয়ে ঠোঁটের ভেতর গোঁজা খৈনির দলাটাকে বার করে ফেলে দিয়ে বলল, ‘তাও প্রায় ন’বছর, আসলে আমার তখন আর উপায় ছিল না, এই অভাব শালা এমন খতরনাক চিজ না!’

‘অন্য কোনও জায়গায় চেষ্টা করেননি কেন?’

‘আর হল কই? এখানে উদয়াস্ত খাটতে খাটতে আর নতুন কোনও চেষ্টার এনার্জিই আসে না। সেজন্য তো তোমায় বারবার বলছি।…কোনও অ্যাফেয়ার-ট্যাফেয়ার করছ না কি?’

হঠাৎ করে এমন একটা প্রশ্নে চমকে উঠল অতনু। কিছু ভাবার আগেই বলে ফেলল ‘হ্যাঁ।’ কেন যে বলল ঠিক নিজেও জানে না।

‘ব্যস, তাহলে তো আরও গেরো। এখন বয়স কত তোমার?’

‘আঠাশ চলছে।’

‘ওর?’

‘এম এ করছে হিস্ট্রিতে। ফাইনাল ইয়ার,’ মিথ্যেগুলো নির্বিকারভাবে বেরিয়ে এল।

‘ও বাব্বা, এর পরেই তাহলে ওদিক থেকে চাপ আসবে।’ কথাটা বলেই সমীরদা আবার জিগ্যেস করল, ‘বাপের এক মেয়ে?’

‘না, ভাই আছে।’

‘তার মানে আমার মতোই কেস, ওদিকে থেকে পাওয়ার কিছু নেই। ভালো কথা বলছি, আমার মতো কুত্তার হাল হওয়ার আগে লাইন দেখো।’

লোকটা কেন বার বার এমন বলছে? ভয়ে? অতনু এসে ওর নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে?

চুপ থাকল অতনু। কেন বলল ওর একজন আছে? কোন প্রেম? কলেজে সকলের দৃষ্টি বাঁচিয়ে সেই মেয়েটার দিকে অবাক হয়ে শুধু একটি-দুটি বার তাকানো…সেই প্রেম? কবেকার পুরোনো, তবু সেই দৃষ্টি মনে পড়লে এখনও পাঁজরে নরম বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে ওঠে। তবে সে কি আজও আছে?

‘আমি তো বুঝলে তোমার মতো বয়সে, শাললাহ, এবেলা একটাকে ওবেলা একটাকে নিয়ে ঘুরতাম, পাড়ায় আমাকে সেজন্য সবাই কেষ্টঠাকুর বলত, দেখতেও ছিলাম লালটুস। একদিন তো হয়েছে একটার সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে আরেকটার মুখোমুখি পড়ে গেছি। ওহ সে কী ক্যাচাল।…হ্যাহ…হ্যাহ…’ হাতাতলি দিয়ে হেসে উঠল সমীরদা।

অতনু হাঁ করে তাকিয়েছিল সমীরদার দিকে। ন্যাতানো লোকটা হঠাৎ করে এমন যে বদলে উঠতে পারে ভাবতেও পারেনি। কাঁচাপাকা চুল, কপালে কেঁচোর মতো বলিরেখা, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পাটির দুটো দাঁত নেই, চোখের কোণে এক আঙুল গর্ত, এ লোকটা নাকি একসময় দারুণ দেখতে ছিল! এবেলা-ওবেলা মেয়ে নিয়ে ঘুরত! সব মিথ্যেই কি এমন অক্ষমতা, অসহায়তা থেকে জন্ম নেয়?

‘চলো এখানে ঢুকতে হবে’ বলে সমীরদা অতনুকে নিয়ে একটা বাড়ির ভেতর ঢুকল। বাড়িটার মাঝখানে সিমেন্টের চাতাল, চার ধারে গুমটি ঘরগুলো এক এক রকমের দোকান। চাতালের এক কোণ দিয়ে লোহার রেলিং দেওয়া সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সমীরদা বলল, ‘যদি থাকবে ঠিক করে থাকো তাহলে জায়গাগুলো ভালো করে চিনে রাখো। এরপরে একা একা আসতে হবে।’

দোতলার লম্বা বারান্দা দিয়ে খানিকটা হেঁটে একটা বড় ঘরে ভেতর ঢুকল দুজনে। অতনুদের গদির মতোই ঘরটায় সাদা ফরাস পাতা। ফরসা ঝকঝকে তাকিয়া। বেশ কিছু লোক বসে জটিল হিন্দিতে কথা বলছে। লোকগুলো ওদেরকে পাত্তাও দিল না। সমীরদাও বেশ গম্ভীরভাবে ওই ঘরটা পেরিয়ে পাশের আর একটা ঘরে গেল। এই ঘরটা আকারে একটু ছোট। একটা ঢাউস চেহারার ছেলে, হয়তো অতনুর বয়েসি কি একটু বেশি হবে, ফরাসে বসে টেলিফোনে কথা বলছে। কপালে কমলা রঙের সিঁদুরের টিপ। দু-হাতের শুধু বুড়ো আঙুল দুটোয় আংটি নেই। সমীরদা আর অতনু চটি খুলে ফরাসে বাবু হয়ে বসল।

মিনিট পাঁচেক পর ফোন রেখে ছেলেটা সমীরদার দিকে তাকিয়ে ছোপ ধরা দাঁত দেখিয়ে তাচ্ছিল্যভরা হেসে বলল, ‘আ গ্যায়া বনওয়ারি কা চেলা।’

সমীরদাও বিনয়ী হাসি দিয়ে বলল, ‘আর কী।’

ছেলেটা পকেট থেকে একটা গুটখার প্যাকেট বার করে ছিঁড়ে হাঁ করে সবটা ঢেলে নিল। তারপর অতনুর দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে বলল, ‘নয়া লেড়কা?’

সমীরদা উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ।’

‘কিতনে দিনকে লিয়ে…হ্যা-হ্যা-হ্যা…’

পিত্তি জ্বলে গেল অতনুর।

সমীরদাও ছেলেটার হাসিতে যোগ দিয়ে অতনুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলেছিলাম না, সবাই জানে এদের বেশিদিন লোক টেকে না। যা ব্যবহার…’

ছেলেটা গদির ওপর চাপানো কাঠের ডেস্কটা খুলে ভেতর থেকে একটা চেক বই বার করে খসখস করে লিখল। তারপর চেক ছিঁড়ে খামে ভরে সমীরদার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ষাট হাজারকে লিয়ে বনওয়ারি কা নিদ হারাম হো গ্যায়ে হে ক্যায়া। সোচতা ক্যায়া হ্যায় উনকে রূপ্যায়ে হম মার দেঙ্গে।’

সমীরদা আবার ক্যাবলার মতো হে হে করে খামটা নিয়ে ওর ছোট্ট হাতব্যাগটায় ভরল।

‘আচ্ছা বাবু আব চলতে হ্যায়।’

‘হাঁ-হাঁ, আও।’

অতনুও উঠে দাঁড়াল।

রাস্তায় বেরিয়ে সমীরদা বলল, ‘জীবনের থেকে সব আনন্দ শালা মুছে গেছে। একটা সময় কাউকে পরোয়া করতাম না। কেউ একটু বেচাল করলেই…এই বনওয়ারিজি এখনও আমাকে উলটোসিধা কিছু বলতে সাহস পায় না। একদিন একটু মুখখারাপ করেছিল তাতেই মুখের ওপর এমনি করে আঙুল তুলে অ্যাইসা কড়কে দিয়েছি যে আর কক্ষনো এই শর্মাকে কিছু বলার সাহস পায় না। একবার তো আমাদের পাড়ায়…’

ভিড় রাস্তায় অসংখ্য মানুষের ধাক্কা খেতে খেতে সমীর ভট্টাচার্য নামের একটা মানুষ, যে মালিকের সামনে অষ্টপ্রহর কেন্নোর মতো গুটিয়ে থাকে, তার যৌবনের সত্যি-মিথ্যে গল্প বলে যেতে থাকল আর অতনু ভাবছিল সেই মেয়েটা, তার সঙ্গে যদি আচমকা এই পথে দেখা হয়ে যায়। চিনতে পারবে? চিনতে পারলে কথা বলবে? কী কথা?

গোলকধাঁধার মতো এগলি-ওগলিতে হারিয়ে যেতে যেতে অতনু হঠাৎ খেয়াল করল সমীরদা ওর হাত ধরে টানছে। ‘আরে ওদিকে যাচ্ছ? এদিকে। অত ভুললে চলবে?’

তিন

ভোররাতের দিকে ঘুমটা ভেঙে গেল। বিছানায় উঠে বসল অতনু। এতদিন পর এসব আবার কী! ভুলেই তা গেছিল কবে। সমীরদাকে বলা মিথ্যেটা স্বপ্নের মধ্যে এসে গেল কী করে? মশারি তুলে নেমে এসে টেবিলে রাখা বোতলটা থেকে কয়েক ঢোক জল খেল। মেয়েটার নামটাও ঠিক মনে নেই। কলেজে সবাই হেমা বলে ডাকত। কিন্তু হেমা মালিনীর সঙ্গে মুখের মিল কোনওদিনই খুঁজতে চায়নি অতনু। এমনই ভিজে গেছিল।…কিন্তু…এতদিন পর…কী এসব? আবার হাস্যকরভাবে ফিরে এল কেন? বড়বাজারের ভিড় ঠেলাঠেলি গলির মধ্যে ধাক্কা খেতে খেতে পার্টির কালেকশনের একগাদা টাকা ভর্তি একটা হাতব্যাগ নিয়ে দুরু দুরু বুকে হাঁটছিল অতনু। কখন যে মেয়েটা এসে ওর হাত ধরে ভিড় কাটিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল। আশ্চর্য, শয়ে শয়ে মানুষের মধ্যে দিয়ে সোঁ সোঁ করে হাঁটছিল দুজনে। হাঁটা নয়, অনেকটা হাওয়া যেভাবে যায় ঠিক সেইভাবে। অথচ অতনু একটুও অবাক হয়নি। যেন এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। স্বপ্ন অত আজগুবি হয়! হাসতে গেল অতনু। হাসিটা এল না। শুধু একটা শব্দ হল। অকারণ একটা মোচড় দিল বুকে…ধু-স শাললাহ! জানলার সামনে এসে দাঁড়াল। পাল্লা দুটো খুলতেই ফেব্রুয়ারির শিরশিরে হাওয়া, অস্পষ্ট বাইরেটা। এখনও কাক ডাকা শুরু হয়নি। হাওয়াটা আরও মনখারাপ করে দিচ্ছে। জানলা বন্ধ করে দিল অতনু। বিছানায় বসে জ্বালা ধরা চোখ দুটোর পাতায় হাত রেখে ক্লান্তভাবে বলে উঠল, ‘কী কী…কী এসব!’

‘তারপর, কী ঠিক করলে?’ গদিতে বসে চালান গুছোতে গুছোতে ভুরু নাচিয়ে জিগ্যেস করল সমীরদা।

‘ধুর, ভাল্লাগছে না। ছেড়ে দেব,’ ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল অতনু।

সমীরদা হেসে বলল, ‘এর মধ্যেই হাঁফিয়ে গেলে। এখনও তো কিছুই দেখনি।’

‘আর দরকার নেই দেখে। কোনও মানুষ এখানে থাকতে পারবে না।’

সমীরদার মিয়োনো চোখ দুটোয় আবার একটু ঝিলিক দিয়ে উঠল। এই প্রশ্নোত্তরের খেলাটা রোজই প্রায় চলে। অথচ দুজনের কেউ যেন ক্লান্ত হয় না।

‘কাল বোধহয় একটা ঝাড় খেয়েছ না?’

‘হুঁ।’

‘কী করেছিলে?’

‘আরে তেমন কিছুই না। ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টটা দেখে রিকনসাইল করতে বলেছিল, এখন অনেকদিন মেশিন চালানোর অভ্যেস নেই তো সেজন্য কম্যান্ডটা একটু ভুলে গেছিলাম, তাতেই…’

‘তুমি কম্পিউটারে বসেছিলে!’ সমীরদা যেন চমকে উঠল।

‘হ্যাঁ, কেন?’

‘কখন?’

‘ওই আপনি যখন সিটি ব্যাঙ্কে গেছিলেন।’

‘আরে একা একা মেশিন চালাতে যেও না। ভুলভাল কম্যান্ড দিলে সব ডেটা উড়ে যাবে। বারোটা বেজে যাবে তখন।’

অতনু জানে সমীরদার আসল দুশ্চিন্তাটা ডেটা উড়ে যাওয়ার নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতার, আতঙ্কের। এই ক’দিনে একবারও কম্পিউটারের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি সমীরদা, অতনু যতবারই বলেছে ততবারই নানা জুতো দেখিয়ে এড়িয়ে গেছে।

‘আমি না থাকলে একদম মেশিন ধরবে না বুঝেছ।’

‘আমি তো ধরতে যায়নি। বনোয়ারিজি বললেন বলে…’

‘বললেও ধরবে না। স্ট্রেট বলে দেবে সমীরদা বারণ করেছে। তারপর আমি বুঝে নেব।’

‘ঠিক আছে।’ অপছন্দের ভাবটা ইচ্ছে করেই একটু বেশ প্রকাশ করে উত্তর দিল অতনু।

‘হ্যাঁ, কী বলল তারপরে শুনি?’

‘দু-চারটে ভুলভাল কথা শুনিয়ে দিল।’

সমীরদা একটা তৃপ্তি মেশানো হাসি দিয়ে বলল, ‘এ তো শুরু হল। এরপর আরও কত শুনবে, আমার যদি তোমার মতো বয়েস আর আর্থিক জোর থাকত না তালে কবে এদের মুখে লাথি মেরে চলে যেতাম।’

সমীরদার ধারণা অতনুদের অবস্থা মোটামুটি ভালো। কেন যে মানুষ ধরে নেয় অন্যরা তার চেয়ে ভালো আছে! সমীরদা মাঝেমধ্যেই অতনুকে এই কথাটা বলে। অতনু বাধা দেয় না। বরং শব্দগুলো কেমন যেন একটা অদ্ভুত আরাম দেয় ওকে।

‘তারপর, তোমার তার খবর কী?’

‘আছে।’

‘এখানে কাজ করছ বলেছ?’

‘হুঁ।’

‘কিছু বলেনি?’

‘ছেড়ে দিতে বলেছে।’

‘বলবেই তো! এটা একটা লাইফ হল? আমি তো শালা স্রেফ বিয়েটা করে ফেঁসে গেছি। তাড়াহুড়ো করে একটা ইস্যুও করে ফেললাম।’

‘সমীরদা আপনার মেয়ের বয়স কত?’

‘এই তো এবার পাঁচে পড়বে। আমার তো আবার একটা হাবা ভাই আছে জানো তো?’

‘নাহ?’

‘বলিনি? ওটাকেও তো আমায় পুষতে হয়। পুরো জাঁতাকলে পড়ে আছি।’

‘অন্য কোথাও চেষ্টা করুন।’

‘দু-র! কখন করব বলো তো? সেই সকালে বের হয়ে রাত্তিরে গিয়ে বিছানায় আছাড় খাই, চেষ্টা করার সময়টা কোথায়? তারপর…।’

কথায় বাধা দিয়ে টেলিফোনটা বেজে উঠল।

‘হ্যালো, হ্যাঁ বাবু…না এখনও আসেনি…হ্যাঁ ঠিক আছে…হ্যাঁ বলে দেব।’ ফোনটা নামিয়ে রাখল সমীরদা।

অতনু বুঝল ওপর থেকে মালিক ফোন করেছিল।

‘কী আসেনি সমীরদা?’

‘ওই পুরি…ওহ তো তুমি জানোই না। এখানে প্রত্যেক শনিবার একটা মজা হয়।’

‘মজা, এখানে। কীসের?’ অবাক হয়ে গেল অতনু।

‘আরেকটু পরে নিজেই দেখবে।…ওই দেখো বলতে বলতে এসে গেছে।’

দুটো অল্পবয়েসি বিহারি ছেলে শালপাতা চাপা দেওয়া ঝুড়ি আর মাঝারি সাইজের এনামেলের গামলা নিয়ে গদির সামনে এনে রাখল।

‘ইতনা দের কিঁউ কিয়া?’

‘ও আজ আদমি কম হ্যায় বাবু।’

‘অ্যায়সা বাহানা রোজ নেহি চলেগা বোল দেনা আপনে মালিক কো। আগলে দিন অগর ইগারা বাজে কে বাদ আওগে তো সামান লওটা দুঙ্গা।’

ছেলে দুটো চুপচাপ সমীরদার কথা শুনে মাথা নেড়ে চলে গেল।

‘ব্যাপার কী সমীরদা?’

‘কী আন্দাজ করো তো।’

‘গন্ধটা তো পেটে মোচড় দিচ্ছে।’

‘ঢাকা তুলে দেখো।’

সত্যিই তাই। ঝুড়ি ভর্তি লুচি আর গামলাটায় তরকারি।

‘এসব কার জন্য?’

‘দেখো না, কার জন্য।’

বেলা বারোটা বাজাতে না বাজতেই অতনু দেখল পিলপিল করে ভিখিরি আসতে শুরু করেছে। বেশিরভাগই মহিলা। গলিটা ভরে গেছে ভিখিরিতে। দলে দলে এসে দোকানের সামনে দাঁড়াচ্ছে আর সমীরদা শালপাতা ছিঁড়ে তার মধ্যে চারটে লুচি আর একটু তরকারি ঢেলে প্রত্যেকের হাতে ধরাচ্ছে। দিয়েই চেল্লাচ্ছে ‘যার হয়ে গেছে এখানে দাঁড়াবে না। আগে যাও, আগে যাও।’

‘অ বাবু, আমাকে তরকারি দিওনি।’

‘আমায় এখেনে তরকারি দাও।…আরেকটু দাও না গো।’

‘পুরো গালমাটা ঢেলে দেব না কি!’

‘ও দাদা, আর কতক্ষণ দাঁড়াব?’

‘তাহলে ভাগ।’

‘আর দুটো বেশি লুচি দাও না।’

‘কেন, তুই কে?’

‘ওই দেখো, ও দুবার নিচ্ছে।’

‘কে, কে দু-বার নিচ্ছে? আমি দেখতে পেলে কিন্তু কাউকে আর দেব না।’

‘কোথায় দুবার নিলাম, এটা তো পাশের বাবু দিল।’

‘দুবারই তো নিলি।’

‘কোথায় নিলাম? এই তো এসে দাঁড়িয়েছি।’

‘আ-আ-হ ভাগ ভাগ, এখান থেকে।’

‘দাদা, আমার দুজন আছি।’

‘কোথায় দুজন?’

‘এই তো’, বলে বছর কুড়ির মেয়েটা কোলের দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাটাকে দেখিয়ে দিল।

‘ও লুচি খায়?’

‘খাবে না কেন, সব খায়!’

‘শালা রাক্ষস সব।’ বলে সমীরদা ছ’টা শালপাতায় মুড়ে দিল।

অতনু হাঁ করে দেখছিল, কলকাতায় এত ভিখিরি আছে! কোথায় থাকে এরা? কোত্থেকে এল? আজ কী?

‘হাঁ করে দেখছ কী! একটু হাত লাগাও।’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, করছি’ বলে অতনুও শালপাতায় লুচি মুড়তে গেল।

‘চারটের বেশি কাউকে দেবে না।’

‘ঠিক আছে।’

‘অ নতুনবাবু আমরা তিনজন আছি। হিসেব করে দেবে।’

‘উরে শাল্লা? আবার নতুনবাবু’ সমীরদা টোন কাটল।

খাবার দিতে দিতে অতনু একফাঁকে তাকাল সমীরদার দিকে। লোকটা হঠাৎ যেন রাজার মতো হয়ে গেছে। ভীষণ ব্যস্ত এক রাজা দু-হাতে দরিদ্রকে বিলোচ্ছে। একে ধমকাচ্ছে, তাকে দয়া করছে, ইচ্ছেমতো। নির্জীব মানুষটাকে এইরকম হয়ে উঠতে দেখে ভালো লাগল অতনুর।

‘আর নেই, শেষ, ভাগ সব’ সমীরদা হাত তুলে ঘোষণা করল।

‘পয়সা দাও।’

‘একটু ঘুরে এসো।’

‘কতক্ষণ?’

‘শালা কথা দেখো! আমি কি ঠিকে নিয়ে বসে আছি না কি?’ বলে সমীরদা অতনুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখো তো ওই সেলফটার পিছনে একটা পুঁটলি আছে, ওটাকে বার করো।’

অতনু হাত বাড়িয়ে টেনে আনল ওটাকে। বেশ ভারী।

কয়েকটা ভিখিরি ঠায় সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সমীরদা তেড়ে ধমক লাগল, ‘কী হল, বলছি না ঘুরে এসো। এখানে দাঁড়ালে একটাকেও দেব না।’

মুহূর্তে সব ফাঁকা।

‘খোলো ওটাকে।’

অতনু পুঁটলিটাকে খুলল। খুচরো পয়সায় ভর্তি।

‘এবারে এখান থেকে কিছু বার করে এখানে একটা একটা করে সাজাও।’

অতনু সিকি, আধুলি আর সিকির মতো দেখতে গোল দশ পয়সাগুলো ফরাসের ওপর সাজাতে সাজাতে বলল, ‘সমীরদা, দশ পয়সা নেয়?’

‘না নিলে না নেবে, তুমি সাজাও তো।’

সমীরদার মুড আজ একেবারে অন্যরকম, কোনও এককালে লোকটা সত্যিই কি এইরকম ছিল?

সাজানো হয়ে যাওয়ার পর সমীরদা বলল, ‘বলো কী বুঝলে?’

অতনু ঠোঁট উলটো বলল, ‘দেখলাম, বুঝলাম না।’

‘আরে বাবা প্রত্যেক শনিবার এখানকার নিয়ম ভিখিরিদের দান করা। বেশির ভাগই দু-নম্বর ইনকাম তো। খানিকটা দান করে পাপ হালকা করে।’

‘সবাই এরকম দেয়?’

‘না, সবাই অবশ্য লুচি খাওয়ায় না। শুধু পয়সা দেয়। এরা আবার দুটোই করে।’

‘এই এত ভিখিরি সব কোথায় থাকে সমীরদা?’

‘কিছু কলকাতার, আর সব এদিক-ওদিক থেকে আসে।’

‘তা বলে এত!’

‘আরে, পুরো দেশটাই তো শালা ভিখারির, হ্যাহ…হ্যাহ।’

অতনু অবাক হয়ে দেখছিল কীভাবে একটার পর একটা ভিখিরি আসছে আর সাজানো পয়সাগুলো থেকে ঠিক একটা করে তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে। চোট্টামো করে কেউ একটার বেশি দুটো তুলছে না। নিলে আবার বলে যাচ্ছে, ‘দুজনে আছি, দুটো নিলাম।’

অতনুকে দেখে সমীরদা তাড়া লাগাল, ‘হাঁ করে দেখছ কী! হাত চালাও, ওদিকে তাকিয়ে থাকালে দিন পেরিয়ে যাবে।’

আধ ঘণ্টার মধ্যে সিকি-আধুলিগুলো সব শেষ। শুধু গোটা পাঁচেক দশ পয়সা, যেগুলো চোলাই করে মেশানো হয়েছিল সেগুলো পড়ে রয়েছে দেখে অতনু বলল, ‘সমীরদা, ওই দেখো, দশ পয়সাগুলো পড়ে আছে।’

‘থাকুক, মন দিয়ে কাজ করো এখন, ভুল হলে কেলেঙ্কারি হবে।’

অতনু আবার সেলস রেজিস্টার লেখায় মন দিল।

মিনিট দুয়েক যেতে যেতেই ‘কাকু দুটো নিচ্ছি’ চিৎকারে চমকে উঠে তাকাল অতনু। খালি গা, রংচটা ঢলঢলে হাফপ্যান্ট দড়ি দিয়ে বাঁধা, ছ-সাত বছরের একটা বাচ্চা দুটো দশ পয়সা তুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বুড়িকে দিল।

অসম্ভব নোংরা থান পরা ঝুলকালি মাথা বুড়িটা পয়সা দুটো নিয়ে চোখের সামনে ভালো করে মেলে ধরল, তারপর বলল, ‘আ মোলো এগুলো নিয়েছিস কেন, এ তো কচি পয়সা। রেখে দে, রেখে দে।’

বাচ্চাটার পয়সা দুটো ফেরত দেওয়ার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না।

বুড়ি আবার ধামকাল, ‘আ দুর! ও কচি পয়সা কেউ নেবে নে। রেখে দে…উহ একদিন ভিক্কে দেবে তাতেও ইয়ে’ বলে বেশ রাগের সঙ্গে পয়সা দুটো প্রায় ছুঁড়ে গদির ওপর ফেলে দিয়ে চলে গেল। অতনুর কানে ভনভন করছিল ‘কচি পয়সা’ শব্দটা। দশ পয়সার এমন আজব নাম জন্মেও শোনেনি! ফিক করে হেসে ফেলে সমীরদার দিকে তাকালও, সমীরদা গম্ভীর।

চার

এত ছোট অথচ প্রকাণ্ড একটা জীবন সকলে বয়ে বেড়াচ্ছে। সত্যি-মিথ্যে মিশিয়ে একাকার করে দিয়ে মানুষ চলেছে প্রতিদিন।—এখানটায় এসে থেমে পড়ল অতনু। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার লিখল—আসলে যে যার মিথ্যেকে নিয়ে বাঁচে। এত অসহায়, এত অসহায়…। ডায়েরি বন্ধ করে দিল। কতদিন পর আবার ডায়েরিটায় দু-কলম আঁচড় পড়ল! সকাল থেকে রাত্তির শুধু নিজেকে বেচার বাজারে বসাতে বসাতে সবুজ রঙের প্রিয় ডায়েরিটার কথা ভুলেই গেছিল। আজ রাত্তিরে হঠাৎ মনে পড়ে গেছিল ওটার কথা। অতনু ঘরে একা শোয়। পাশের ঘরে বাবা-মা আর দিদি। মাঝে দরজাটার এখানে ওখানে ফাঁকফোঁকর। এঘরে আলো জ্বলছে ওঘর থেকে বোঝা যায়। মা একটু আগেই পাশের ঘর থেকে বলেছে আর দেরি না করে শুয়ে পড়তে। ঘুম আসছে না। আজকাল এত পরিশ্রম সত্বেও কেন যে ঘুম আসতে চায় না। শুলেই দুনিয়ার ভাবনা মাথায় এরোপ্লেনের মতো উৎকট শব্দে পাক খেতে থাকে। অফিসের পরিবেশটা যেন রোজ গলা টিপে ধরে অতনুর। দম আটকে আসে। প্রতিদিন রাতে ভেঙেচুরে শেষ হয়ে বাড়ি ফিরে ঠিক করে, কাল থেকে আর যাব না। কিছুতেই না। যা হয় হোক, তখন মনে পড়ে বাড়ির অন্য তিনটে প্রাণী জিরাফের মতো গলা উঁচিয়ে আশার আকাশে মুখ ডুবিয়ে রয়েছে। অতনু শিগগিরই এখান থেকে এক্সপেরিয়ান্স জোগাড় করে বড় কোম্পানিতে চান্স পেয়ে যাবে।…কোথায় যাবে? কে দেবে? কেউ জানে না। সেই মেয়েটাও না।…আচ্ছা সে এখন কোথায়?…ধু-স, আবার ভুলভাল ভাবনা আসছে। এইসব উদ্ভট চিন্তাগুলো ভীষণ এলোমেলো করে দেয় ওকে। ভয় পেয়ে গেল অতনু। তাড়াতাড়ি লাইট নিভিয়ে মশারির ভেতর ঢুকল।

‘আমি আর থাকছি না জানো তো।’

‘মানে!’ চমকে উঠে সমীরদার দিকে তাকাল অতনু।

‘কালকেই বানোয়ারিজি একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। শুনতে পেয়ে গেছি। আমাকে কিছুদিনের মধ্যেই ভাগাবে।’

‘দুর, তাই আবার হয়!’

‘হবে না কেন, আমাকে যেখানে সাতাশশো দেয় তোমাকে সে জায়গায় আঠারোশোয় পেয়ে গেছে। আমায় তালে আর রাখবে কেন।…কী-ই যে হবে ভেবে পাচ্ছি না! এতগুলো পেট নিয়ে দাঁড়াব কোথায়?’

‘আরে ধুৎ, এতদিন এখানে রয়েছেন হুট করে অমন কেউ ভাগিয়ে দেয়!’

‘দেয় দেয়, এদের প্রাণে মায়াদয়া বলে কিছু নেই।’

‘কিন্তু আপনি চলে গেলে এত কাজ দেখবে কে?’

‘আর দেখার লোকের অভাব না কি? পৃথিবীতে কারও জন্য কিছু আটকায় না।…মাথায় আসছে না কী করব!’

সমীরদার দিকে তাকাল অতনু। গতকালের হঠাৎ রাজা হয়ে ওঠা মানুষটা আজকে কেমন যেন কেঁচোর মতো হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতরটা গুড়গুড় করে উঠল। কী বলবে ভেবে না পেয়ে মাথা নীচু করে চালানগুলো লিখতে থাকল অতনু।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর হঠাৎ সমীরদা বলে উঠল। ‘তুমি কোথাও পেলে না, না?’

অতনু নি:শব্দে মাথা নাড়ল।

‘খোঁজ লাগিয়েছিলে?’

মিথ্যে কথাটা গলার সামনে এসে দলা পাকিয়ে আটকে গেছিল। অতনু ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘হ্যাঁ। পাইনি।’

আবার চুপ।

মিনিট দুয়েক বাদে টেলিফোনটা বেজে উঠল। সমীরদা তুলল, ‘হ্যালো…হ্যাঁ বাবু…হুঁ…পাঠাচ্ছি।’ রিসিভার রেখে দিয়ে সমীরদা অতনুকে বলল, ‘ওপরে যাও। বনোয়ারিজি ডাকছেন।’ সমীরদার মুখ-চোখ মুহূর্তে কেমন যেন অন্যরকম। চোখের ভুল?

‘আমাকে? কেন?’

‘কী করে জানব? কিছু গড়বড় করেছ হয়তো। তাড়াতাড়ি যাও।’

মালিক এমনিতে অতনুর সঙ্গে খুব একটা কথাবার্তা বলে না। যা কথা সব সমীরদার সঙ্গে। আজকে হঠাৎ…!

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বুকের ভেতর দ্রুত কয়েক বার ঢিপ-ঢিপ-ঢিপ করে উঠল।

‘আসব স্যার?’

‘হু।’

‘আমায় ডেকেছেন?’

‘হাঁ, কী বেপার অতনু, তুমি বোলে কাম ঠিক ঢংসে করতে পারছ না।’

‘আমি স্যার…’

‘দেখো ভাই, তুমি বিমলবাবুর লোক আছ, সে কারণ তোমায় রাখা। লেকিন কাম না পারলে তো মুশকিল হয়ে যাবে।’

‘কিন্তু স্যার আমি তো…’

‘শুনলাম তুমি ডিউটি নেগলেক্ট করছ।’

আর কোনও কথা বলতে পারল না অতনু। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

আচমকা বিশাল চেহারাটা সামান্য দুলিয়ে হেসে উঠল বনোয়ারিজি। ‘আরে ভাই ছোড়ো উসব ফালতু বাত। তোমার কাম হামার খুব পসন্দ লাগছে। খুব মন দিয়ে কাজ করো। কুছুদিন পর তোমাকেই একা সব সামলাতে হবে। সমীর তো শালা এরমধ্যেই বুডঢা হয়ে গেল। ওর থেকে জলদি সব বুঝে নাও, ঠিক আছে।’

‘…আচ্ছা স্যার।’

‘ঠিক হ্যায়।’

অতনু ঘুরতে যাচ্ছিল।

‘অওর শুনো, সমীরকে ইসব কুছু বোলতে হোবে না।’

অতনু ঘাড় নাড়ল।

‘যাও দিল লগাকে কাম করো।’

সমীরদা…সমীরদা এইরকম করল! সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে লোকটার ওপর প্রচণ্ড ক্রোধ হল অতনুর। শালা এইভাবে পিছন থেকে ছুরি মারা! হনহন করে নেমে এল।

সমীরদা যেন ওর অপেক্ষাতেই হাঁ করে বসে ছিল। অতনু সরাসরি তাকাল লোকটার দিকে। একটা তীব্র কৌতূহল মেশানো অপরাধবোধ নিয়ে লোকটার চোখ দুটো অতনুর দিকে চেয়ে আছে। দলমোচড়া পাকানো ভিতু কেন্নোর মতো হয়ে রয়েছে লোকটা। মুহূর্তে সব যেন তালগোল পাকিয়ে গেল। বিষণ্ণ, তিক্ত একটা কটু স্বাদ নিয়ে শুধু চুপ করে তাকিয়ে থাকল অতনু।

‘কী হল, কী ব্যাপার?’

‘হুঁ?’

‘ডেকেছিল কেন?’

‘এমনিই।’

‘এমনিই মানে!’

‘এমনিই মানে কাজকর্ম্ম কেমন চলছে জিগ্যেস করলেন।’

‘ধুৎ, বলো না কী জন্য ডাকল?’

‘বললাম তো।’

‘শুধু এইজন্য?’

‘হ্যাঁ, এই-ই।’

সমীরদা কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল অতনুর দিকে। তারপর আর কোনও কথা না বলে মাথা নীচু করে কাজ করতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর আবার মুখ তুলে বেশ অনুনয়ের সুরে বলল,—’বলো না বাবা, আর কী বলল।’

‘সিরিয়াসলি বলছি, আর কিছু বলেনি, কেন, কী হয়েছে বলুন তো?’ অতনু সহজ হেসে জিগ্যেস করল।

‘নাহ, কিছু হয়নি। এমনিই…’

আর কোনও কথা হল না।

সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ এম জি রোড ধরে হাঁটছিল দুজনে। রোজ হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত রাস্তাটুকু দুজনে একসঙ্গে হেঁটেই ফেরে। কারও মুখে কথা নেই। বিকেলের ঘটনার পর সমীরদা কেমন যেন একটা গর্তের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। অতনুর দিকে তাকিয়ে কথা পর্যন্ত বলতে পারছে না। ক্রোধ নয়, মানুষটার ওপর কী যেন একটা খুব অস্বস্তি হচ্ছিল অতনুর। হাঁটতে হাঁটতে একসময় জিগ্যেস করে ফেলল, ‘ব্যাপার কী সমীরদা, এত চুপ কেন?’

‘চুপ? নাহ চুপ নয় তো।’

‘আজকেই লাস্ট কথা বলে নিন আমার সঙ্গে।’

সমীরদা তাকাল।

অতনু আলতো হেসে বসল, ‘কাজটা ছেড়ে দিচ্ছি। কাল থেকে আর আসব না।’

‘সে কী, কেন?’ রাস্তায় থেমে পড়ল সমীরদা, নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।

অতনু যতটা সম্ভব গম্ভীর গলা করে বলল, ‘তখন আপনাকে বলিনি, জানেন বনোয়ারিজি ওই সময় ওপরে ডেকে নিয়ে গিয়ে কী যাচ্ছেতাই অপমান করেছে আমায়।’

‘কী বলেছে?’ সমীরদার চোখ দুটো ঝিলিক দিয়ে উঠল।

‘বলে আমি না কি অ্যাকাউন্টসের কিচ্ছু জানি না, ডিউটি নেগলেক্ট করি। আমাকে বেকার টাকা দিয়ে পোষা হচ্ছে।’

‘সত্যিই কাল থেকে আসবে না?’

‘এরপর! শালা কুকুর না কি? এরকম চাকরি হাজারটা রয়েছে বাজারে… কী হল, থেমে পড়লেন কেন, চলুন।’

‘অ্যাঁহ…হ্যাঁ-হ্যাঁ,’ উৎসাহের একটা পুকুরে বাচ্চা ছেলের মতো ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ল সমীরদা। ‘আমি বলেছিলাম না, আমি বলেছিলাম না এ শালা মহা হারামি, এখানে থেকে লাইফ শেষ হয়ে যাবে। আরে আমার তো যা হওয়ার…’ পুরোনো কথাগুলো নতুন উত্তেজনায় বলতে গিয়ে বারবার কথা আটকে যাচ্ছিল সমীরদার। থুতু ছিটকাচ্ছিল। অতনু শুধু একদৃষ্টে চুপ করে তাকিয়ে ছিল। এত আরাম…এত আরাম লাগছে শরীরে!

এতবড় করে একমনে কথাগুলো বলে যেতে যেতে সমীরদা একবার তাকাল অতনুর দিকে। তারপর আচমকা চুপ করে গেল।

হাওড়া ব্রিজে উঠল দুজনে, হাজার হাজার মানুষ অন্ধের মতো ধাক্কাধাক্কি করতে করতে প্রাণপণ ছুটছে ট্রেন ধরার জন্য। তিরতির করে গঙ্গার হাওয়া বইছে। নদীর ওপর দিয়ে বেশ খানিকটা হেঁটে যাওয়ার পর অতনু আড়চোড়ে একবার তাকাল সমীরদার দিকে। মাথা নীচু করে হেঁটে চলেছে লোকটা। অতনু আবার নতুন করে কী যেন বলতে যাবে তখনই, ‘এমনিতে তোকে খুব ভালোবাসি রে,’ কথাটা হঠাৎ করে বলে ফেলে অতনুর হাত ধরল সমীরদা। খসখসে হাতটা ততক্ষণে ঘামে ভিজে উঠেছে।

শারদীয় দেশ

২০০৪

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *