আগস্ট আবছায়া – ১.৭

১.৭

আমি সোজা চলে গেলাম আমার লেখার ঘরে, গিয়ে বসলাম টেবিলে, ফ্রানৎস কাফকার ‘চীনের মহাপ্রাচীর’ গল্পটা বের করলাম ম্যালকম প্যাসলির অনুবাদের বইটাতে। প্রথম প্যারাগ্রাফ পড়েই বন্ধ করলাম সেটা। ল্যাপটপ খুললাম, মেইলবক্সে ঢুকলাম, সুরভির ই-মেইলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম একদৃষ্টিতে। স্মৃতি প্রায় সময়েই মিথ্যা, আগে পড়া সুরভির মেইলটা মনে করে ভাবলাম আমি। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের যে স্মৃতিচারণা করেছে সে, সেটা আমার নিজের পরিষ্কার স্মৃতির সঙ্গে মেলে না কোনোভাবে। 

পরিষ্কার স্মৃতি বলে আদৌ কি আছে কিছু? নিজেকে প্রশ্ন করলাম আমি। দেকার্ত বলেছিলেন, নিজের একটা বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ জাগবে তো সব কটা বিশ্বাসই ফেলে দাও। আমাদের দর্শনশাস্ত্রে একে বলে, ‘কার্টেসিয়ান প্রিন্সিপল অব রটেন অ্যাপলস’। এক ঝুড়ি আপেলের মধ্যে যদি একটা পচা আপেল থাকে, তাহলে সব কটা আপেলই ফেলে দিতে হবে একসঙ্গে, একটা একটা করে ফেললে চলবে না, কারণ একটা আপেল পচা মানে অন্যগুলোতেও পচন ধরে থাকার আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। একটা মিথ্যা বিশ্বাস মানুষের সব বিশ্বাস বা ধারণাকে সংক্রমিত করে দিতে পারে, অতএব নতুন করে শুরু করার পথ একটাই : সব কটা বিশ্বাস ঝেড়ে ফেল, যেহেতু তোমার বিশ্বাসগুলোর মধ্যে একটা বিশ্বাস মিথ্যা ছিল বলে মনে করছ তুমি। দেকার্তই বলেছিলেন, তুমি দূর থেকে দেখলে একটা টাওয়ার, তোমার মনে হলো টাওয়ারটা বৃত্তাকার, এবার কিছুটা কাছে পৌঁছে দেখলে, না, টাওয়ারটা বর্গাকার। তোমার এই দ্বিতীয় ধারণাটা সত্য, সেটা ঠিক আছে, কিন্তু যেহেতু এই তোমারই প্রথম ধারণাটা ভুল ছিল, প্রথমবার তোমার ইন্দ্রিয় তোমাকে ঠকিয়েছিল, অতএব এর পরের বারের সঠিক দেখাটাকেও প্রশ্ন কোরো, সঠিক বলে ছেড়ে দিয়ো না বিনা প্রশ্নে, বিনা সন্দেহে। 

সুরভির বলা আমাদের প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি নিয়ে যেহেতু আমার সন্দেহ শুরু হলো, তাই দেকার্তের হিসেবে, সুরভির বলা কোনো স্মৃতিই আর বাহ্যিক প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য নয় আমার কাছে। প্রথম কথা, আমি ২০১২ সালে ওয়াসফিয়া নাজরীনের কাঠমান্ডুর সংবাদ সম্মেলনে কোনো নীলরং টি-শার্ট পরা ছিলাম না, প্রশ্নই আসে না। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে ওই রকম ফরমাল এক সংবাদ সম্মেলনে আমি গিয়েছিলাম স্যুট-প্যান্ট-টাই পরেই, যেমন কিনা স্পনসরদের জন্য নিয়ম এ-জাতীয় সংবাদ সম্মেলনে। এই একই ল্যাপটপে, সাল-তারিখ অনুসারে একটুখানি ঘেঁটেই আমি দুই মিনিটের মধ্যে বের করে ফেললাম কাঠমান্ডুর ছবিগুলো। যা ভেবেছিলাম তাই। আমার পরনে একটা ধূসররঙা স্যুট, সাদা জামা ও গলায় গাঢ় মেরুনরং এক টাই। দেখলাম ছবিগুলোতে ধরা পড়েছে ওখানে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষের মুখ এবং সে মুখগুলোর কোনোটাই সুরভির নয়। আমার স্মৃতি দ্বিতীয়বারও প্রমাণ করল যে, আমি সঠিক আর সুরভির স্মৃতি অবিশ্বাসযোগ্য। 

স্পষ্ট মনে আছে, আমার সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল সে রাতে, কাঠমান্ডুর থামেলের এক দালানের দোতলায় নেপালি খাবারের সুন্দর এক রেস্তোরাঁতে। আমাদের সেখানে দাওয়াত করেছিলেন ওয়াসফিয়ার বন্ধু আমাদের চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়, এবং ওয়াসফিয়ার নেপালি বন্ধু হিসেবে সেখানে হাজির ছিল পুরো ডিনারের মধ্যমণি সুরভি, নেপালের সমাজে তার বিশেষ এলিট অবস্থানের কারণে সবাই ব্যস্ত ছিল তাকে ঘিরে। ওই ডিনারের শেষে, রাত বারোটার দিকে, আমরা দল বেঁধে কাঠমান্ডুর নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটছি তখনই আমার প্রথম কথা হয় তার সঙ্গে, মূল ভিড় থেকে বিশ পা পেছনে হাঁটতে হাঁটতে। তখনই প্রথম এসেছিল আমার শিক্ষকতার পেশা প্রসঙ্গ, এর বাইরে ফ্রানৎস কাফকা অনুবাদে বর্তমানে ব্যস্ত থাকার কথা। সে রাতে আমাদের মধ্যে ইতালো কালভিনো বা কালভিনোর উপন্যাস ইনভিজিবল সিটিজ সে যে অনুবাদ করছে, এ-জাতীয় কথাই হয়নি কোনো। আমরা সে রাতে কথা বলেছিলাম কিছুটা কাফকা (আমি দেখলাম, সুরভি কাফকার দু-তিনটে বিখ্যাত গল্প ভালোভাবে পড়েছে) এবং বাকিটা তার বাবার বংশপরম্পরার কাঠ ব্যবসার আকার, আয়তন, আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তি ইত্যাদি নিয়ে। 

ইতালো কালভিনো প্রসঙ্গ আমাদের আলোচনায় প্রথমবার এসেছিল তার ঠিক এক মাস পরের এক ই-মেইলে। আমি তখন ঢাকায়, সুরভি কাঠমান্ডুতে, আমাদের দুজনের মধ্যে তখন চলছে প্রেমের প্রাথমিক আয়োজন—তুমুল ই-মেইল লেখালেখি। আবারও প্রমাণ বের করে ফেললাম আমি, দেখলাম আমার স্মৃতিই সঠিক, মোটামুটি সঠিক। দেখা যাচ্ছে আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার তিন মাস পরে, ২০১২-এর আগস্টের শুরুতে এক ই-মেইলে সে আমাকে প্রথমবারের মতো লিখছে, ‘তুমি কি ইতালো কালভিনো নামের এক লেখকের কথা শুনেছ? আমার ইচ্ছা আছে তার ইনভিজিবল সিটিজ নামের অদ্ভুত উপন্যাস নেপালি ভাষায় অনুবাদ করার। মেইলের তারিখ, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি ল্যাপটপের পর্দায়, ৩ আগস্ট ২০১২। 

আজ দুপুরে পড়া ‘ফ্রম ইওর সুরভি ছেত্রি হুম ইউ হ্যাভ ফরগটেন’ সাবজেক্ট লাইনের তার ই-মেইল, যেখানে সে এত নিশ্চিত, এত সন্দেহাতীতভাবে একগাদা ভুল কথা লিখে রেখেছে এবং আমি এখন তার স্মৃতির ভুলগুলো একের পর এক প্রমাণ করে যাচ্ছি ভুল হিসেবে, সেসব স্মৃতির বিপরীতে আমার নিজেরও সন্দেহযোগ্য কোনো স্মৃতি দিয়ে নয়, বরং অকাট্য কিছু বাহ্যিক প্রমাণের সাহায্য নিয়ে-এই পুরো ব্যাপারটা আমাকে মহা এক ধন্দের মধ্যে ফেলে দিল, বিরাট এক অনুসিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করাল। স্মৃতি সত্য নয়, স্মৃতি সত্য হতে পারে না, স্মৃতি প্রায়শ অসত্য হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু বাস্তবে মানুষ সত্য নিয়ে বাঁচে না, স্মৃতি নিয়েই বেঁচে থাকে। 

কথাটা মাথার মধ্যে পরিষ্কার আকার নিয়ে নেওয়ামাত্র আমি চমকে উঠলাম এ কথার তাৎপর্যের ধাক্কায়; একমুহূর্ত তুমুল আলোড়িত হলো মন। তার মানে, মানুষের জীবনের ভিত্তিই ভুল ও অসত্য কিছু ওপরে দাঁড়ানো? প্রতি মুহূর্তে মানুষ ভুলভাবে মনে করছে ও ব্যাখ্যা করছে তার অতীতকে এবং প্রতিবারই তারপর অন্তত মোটামুটি মিথ্যা কিছুর ওপরে সে দাঁড় করাচ্ছে তার বর্তমান? আপেল তাহলে সব কটিই পচা? মিথ্যা অনুমানের টাওয়ার ও সত্য দেখা টাওয়ার—দুটোই মিথ্যা? দুটোকেই সন্দেহ করতে হবে? আমরা এভাবে বেঁচে থাকব কী করে? 

পনেরোই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের কথা-আগামীকালের রাতই সেই রাত—ভাবলাম আমি। একগাদা স্মৃতির ওপরে ভর করে লেখা ইতিহাস, শোনা কথা, কানকথা, একগাদা সাক্ষীর সাক্ষ্য যা তাঁরা দিচ্ছেন আবার তাঁদের স্মৃতিকে বিশ্বাস করেই, একগাদা সাক্ষাৎকার যা সাক্ষাৎকারদাতারা দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতিগুলো অবলম্বন করেই—এই যে ঐতিহাসিক ডকুমেন্টেশনের ঘাটতির ওপরে দাঁড়ানো পনেরোই আগস্ট ১৯৭৫ এবং স্মৃতিভিত্তিক লেখা-সাক্ষাৎকার-বইয়ের ওপরে দাঁড়ানো পনেরোই আগস্ট ১৯৭৫, তা কোথায় নিয়ে ফেলেছে আমাদের? সত্য কোথায়, সে রাতের আগের পরের ও রাতটুকুর ঘটনাগুলোর মধ্যেকার সত্য ও মিথ্যা বয়ানের মাঝখানের দাগটা অন্তত মোটামুটি হলেও কোথায়? কোথায় আমি জানতে পারব যে, কে আসলে গুলি চালিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর শরীরে? ঠিক কার গুলিতে মারা গিয়েছিলেন শেখ কামাল? সত্যি কি গ্রেনেড ফেলা হয়েছিল দোতলার ওই বেডরুমে, যেখানে জড়ো হয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে, কিংবা তিন ছেলে এবং দুই ছেলের বউ? এমনকি হতে পারে না যে একসঙ্গে এক রুমে নয়, বরং বাড়িজুড়ে খুঁজে খুঁজে আলাদা আলাদা করে খুন করা হয়েছিল ওই পরিবারের মানুষগুলোকে? এমন কি হতে পারে না যে বঙ্গবন্ধুর শেষ কথাগুলো ছিল একদম, একদমই অন্য কিছু, বইতে যা যা লেখা আছে, তার কোনোটাই নয়? এমনকি হতে পারে না যে বাড়ির ভেতর থেকে অনেকক্ষণ যুদ্ধ করেছিল পরিবারের লোকজন তাদের নিরাপত্তার জন্য রাখা অস্ত্রগুলো নিয়ে, অতএব সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ যেমন সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিল, জিয়াউর রহমান, রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বে থাকা তোফায়েল আহমেদ, গোয়েন্দা সংস্থার আবদুর রউফ এঁরা সবাই, আমরা যতটুকু জানি, তার চাইতে অনেক অনেক বেশি সময় পেয়েছিলেন ভোরের ফাঁকা রাস্তা ধরে সোজা সাঁজোয়া যান ও সৈন্যভর্তি অসংখ্য গাড়ি নিয়ে নিমেষে ধানমন্ডিতে পৌঁছে বঙ্গবন্ধুকে খুনিদের হাত থেকে, মাত্র কয়েক শ আনাড়ি, অপ্রশিক্ষিত, ভীরু সৈনিকের দলের হাত থেকে সহজে বাঁচানোর? 

আমি সুরভির দ্বিতীয় মেইল খুললাম দুহাতে আমার মাথা চেপে ধরে। লক্ষ করলাম, একটু আগের মেহেরনাজের সঙ্গে ওই সোফার ওপরের অন্তরঙ্গতার পরে বাথরুমেও যাওয়া হয়নি আমার, স্রেফ প্যান্টটা টেনে নিয়ে পরেছি এবং টি-শার্ট প্রথমে পরে, পরে মেহেরনাজ চলে গেলে সেটাও খুলে খালি গায়ে বসেছি আমার এই পড়ালেখার ঘরে। 

ওর দ্বিতীয় ই-মেইলের সাবজেক্ট লাইন প্রথমটার থেকে আলাদা নয়, শুধু শেষে ইংরেজিতে ২ সংখ্যাটা বসানো : ‘ফ্রম ইওর সুরভি ছেত্রি হুম ইউ হ্যাভ ফরগটেন-22। সুরভি লিখেছে : 

‘হ্যালো, গত সপ্তাহে তোমাকে লেখা ই-মেইলের কোনো উত্তর পাইনি। আমি জানি তুমি আমাকে ভুলে গেছ, এবং সে কারণে গত মেইলে তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিলাম আমাদের প্রথম পরিচয়ের কথা, যাতে ওই সুন্দর মুহূর্তগুলো মনে করে আমার জন্য তোমার কিছুটা মায়া হয়। তোমার ধারণাও নেই যে আমি কীভাবে বেঁচে আছি, আমরা নেপালিরা কীভাবে বেঁচে আছি ২৫ এপ্রিলের পর থেকে! কীভাবে তুমি পারলে আমাকে স্রেফ একটা কল করে আমি বেঁচে আছি কি না, তা জেনে নিয়ে তারপর আর কোনো যোগাযোগ না করে থাকতে? তুমি আমাকে শেষবার কল করেছিলে মে মাসের প্রথম দিনে, আর আজ এখন মে-জুন পার হয়ে জুলাই মাস। দুই মাস আর যোগাযোগ করলে না একবারও? আমাকে ফোনে ওই দিন না পেলে তুমি নিশ্চয় তোমার জীবন থেকে আমার বিষয়টাই, আমার অধ্যায়টাই পুরো কবর দিয়ে দিতে, ভাবতে যে ২৫ এপ্রিলের ভূমিকম্পে ১০ হাজার নেপালির সঙ্গে সুরভি ছেত্রিও মারা গেছে, অতএব “সুরভি চ্যাপ্টার ক্লোজড ফরএভার”। 

‘এটুকু জানার জন্যই কি ১ মের কলটা করেছিলে তুমি? আর পরে, আমার সঙ্গে সেদিন কথা হওয়ার পরে, কি ব্যথিত হয়েছ এটা জেনে যে, সুরভি বেঁচে আছে? আমি তো ১২ মের আফটার-শকের ওই ভূমিকম্পে মারাও যেতে পারতাম। আরও ২০০ মৃত্যু হলো সেদিন, ৩ হাজার লোক আহত হলো আর তুমি ১২ মের পরে একটাবারের জন্য আমার খোঁজও নিলে না পুরো মে মাস, পুরো জুন মাসে? মে-জুন দুটো মাসজুড়ে আমিও তোমাকে লিখিনি, লিখতে পারিনি, কারণ আমরা নেপালিরা ভয়ে ওই দুই মাস বাসার বাইরে রাস্তায় রাস্তায় গাড়িতে ঘুমিয়েছি। তুমি তো আর এভাবে কাটাওনি মে ও জুন। ঢাকায় তো কোনো দুর্যোগ হয়নি। স্বাভাবিক জীবনই কেটেছে তোমাদের ওখানে, তুমি প্রচুর অবকাশ পেয়েছ আমার একটু খোঁজ নেওয়ার, কিন্তু সেই খোঁজ নাওনি তুমি একবারও। 

‘এত নিষ্ঠুর হয়ে গেলে কবে তুমি? আমাদের প্রেমের সময়ে, ২০১৩ সালজুড়ে, আমি তো এক কোমল-হৃদয় তোমাকে চিনেছিলাম, যে কিনা আমাকে ২০১৩-এর মে মাসে, ঠিক দুই বছর আগে, নাগরকোটের এক হোটেলে আমার সারা শরীরে গুনে গুনে ২৯৭টা চুমুর দাগ দিয়েছিলে (মনে আছে ২৯৭-এর কথা? ওটা আমার চায়নিজ জ্যোতির্বিদ্যার, আমার ভাগ্যের সাংকেতিক সংখ্যা, মনে আছে?)। এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আর কে পারে ওইভাবে, অত যত্ন করে ভালোবাসতে? সেই একই তুমি—আমি ভাবতেই পারি না যে সেই একই তুমি—১২ মের দ্বিতীয় ভূমিকম্পটার পরে একবার খোঁজও নিলে না আমি বেঁচে আছি কি না? পৃথিবীটা আমার জন্য এত বাসযোগ্যহীন করে দিলে কেন তুমি? পৃথিবী তো এমনিতেই হাসিমুখে বসবাসের অযোগ্য এক জায়গা, তার ওপরে তোমার এই নিষ্ঠুরতা, এই অবহেলা—আমার নিজেকে একদম মূল্যহীন, শ্বাসবন্ধ এক এতিমের মতো লাগছে। 

‘আমার মনে আছে তোমার কাছ থেকেই আমি প্রথম জেনেছিলাম জোসেফ কনরাডের হার্ট অব ডার্কনেস-এর কথা, কনরাড যে এত ভালো এক লেখক, সেই তথ্য। তুমিই আমাকে উৎসাহিত করলে কনরাড পড়তে, আর আমি একের পর এক তাঁর গল্প-উপন্যাস পড়া শেষ করতে লাগলাম। তুমিই আমাকে বুঝিয়েছিলে কনরাডের হার্ট অব ডার্কনেস শুধু কঙ্গোর জঙ্গলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ওই ডার্কনেসের হার্ট বিশ্বজনীন, মানুষের পশুসুলভ বন্যতার দেখা মেলে পৃথিবীজুড়েই, বলেছিলে যে, সভ্যতার ভেতরের অন্তঃসারশূন্যতা সব জায়গার জন্যই সত্য, তা কঙ্গো হোক আর নিউইয়র্ক, ঢাকা কিংবা কাঠমান্ডু—একই কথা। 

‘পরিষ্কার একটা কথা বলতে চাই তোমাকে আমি এখন। ২০১৩-এর সেপ্টেম্বরে, আমাদের প্রেম তুঙ্গমুহূর্তে থাকবার ঠিক মাঝখানে কাঠমান্ডুতে এসে তুমি যখন বিনা কারণে—আমার হিসেবে বিনা কারণে—আমাদের ভালোবাসার ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছিলে, তখনো আমি তোমার বুকের মধ্যে কোনো অন্ধকার দেখতে পাইনি। আমি বেশি হলে ভেবেছিলাম, এক লেখক, এক উঠতি দার্শনিক বুঝি হয় নিয়মিত প্রেম করে যাবার একঘেয়েমিতে ভুগছে, না হয় আমার আলিঙ্গন থেকে বাঁচতে চাইছে কিছুটা স্পেসের প্রার্থনা করে। আর এবার যা দেখলাম, আমার প্রতি, আমার পরিবার ও আমার দেশের অসহায়, চুরমার হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর প্রতি তোমার যে আচরণ দেখলাম, তা তোমার ভেতরের হার্ট অব ডার্কনেসকে দেখারই সমান। 

‘তুমি আসলে আমাকে দেখালে যে, ফল্টলাইনগুলো কোথায় তা জানবার পরেও যেমন জানা যায় না কবে ভূমিকম্প হবে, কোথায় ও কখন সে তার আঘাত হানবে, তেমনই ভালোবাসার সব কোমলতা ও স্নেহ-মায়া দেখে ফেলার পরেও একই মানুষের কাছ থেকে অনুমান করা যায় না তার ভালোবাসার ভেতরের দিকটা কখন ও কীভাবে এতখানি বিপরীত শক্তি নিয়ে নিজের ভালোবাসাহীনতার জান্তব পাশটা মেলে ধরবে। 

‘আর কিছুই এ মুহূর্তে আমার বলার নেই তোমাকে, কারণ আমি তোমাকে চিনি। তাই জানি, আমি এখানে যা বলছি না, তা-ও ঠিক ঠিক ধরে ফেলতে পারছ তুমি। অতএব তুমি নিশ্চিত ধরতে পারছ যে, তোমার জন্য একধরনের ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা কাজ করছে আমার মধ্যে। শুধু যদি আমি এখন পারতাম বিদেশি ভাষা ইংরেজিতে না লিখে আমার এই মেইলটা তোমাকে আমার মাতৃভাষায় লিখতে! আমি আসলে অতীতের তোমার সব আচরণের সঙ্গে মিলিয়ে তোমাকে এই প্রথম একজন মতলববাজ অন্ধকার মানুষ বলেই ভাবছি। আমাকে সে জন্য ক্ষমা কোরো। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন আমি যার কোলের মধ্যে পরম ভালোবাসায় কাটিয়েছি, তাকে নিয়ে এই ভাবনা আমার মতো বাইরে কাঠের মতো শক্ত, দেমাগি কিন্তু ভেতরে পনিরের মতো নরম এক মেয়ের জন্য ভাবা একেবারেই সহজ নয় জেনো। 

‘এখন শেষ করছি আমার আরেক প্রিয় ব্যান্ড “Editors”-এর গান “What is this thing called love”-এর কয়েকটা লাইন স্রেফ তোমার উদ্দেশে লিখে। এর এই মারাত্মক লাইনগুলো ভালো করে খেয়াল করো : 

We built this city, now we tear it to the ground 
This fight is over 
Hear the bell ringing out at the end of the final round 
All right. 

যাক, আমি কাঁদছি। রাখছি এখানেই।—তোমার সুরভি। 

পুনশ্চ: আমি তোমাকে সম্ভবত এর পরের মেইলেই লিখব আরও বড় এক হার্ট অব ডার্কনেসের সন্ধান পাওয়ার কথা। আমরা কজন বন্ধু মিলে এখানকার এক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এজেন্সির সহায়তার আমাদের ভূমিকম্প বিষয়ে এমন সব তথ্য পাচ্ছি যে শুনলে হয় তোমার বিশ্বাসই হবে না, না হয় তুমি দেয়ালে মাথা ঠুকে মরতে চাইবে, না হয় চাইবে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের মেরে ফেলতে। আমি বুঝতে পারছি যে আমি জড়িয়ে যাচ্ছি মারাত্মক এক সত্যের সাহসী উদ্ঘাটনের সঙ্গে। এতে ঝুঁকি আছে বিশাল, কারণ প্রতিপক্ষ ভয়ানক শক্তিশালী, কিন্তু তবু আমি আমার পথেই এগোব। এপ্রিলের ২৫ তারিখের পরে এবং আবার ১২ মে তারিখে এত এত যুবক-বৃদ্ধ-নারী-পুরুষ-শিশুর লাশ দেখেছি যে আমার মৃত্যুভয় পুরো কেটে গেছে। মানুষের জীবন সময় পার করার একটা ওভাররেটেড পথ, আর সেই সময়টা আমি এখন কাটাব সংগ্রামের মধ্য নিজেকে ঢেলে দিয়ে। পারলে আমার পাশে থেকো। রিগার্ডস অ্যান্ড লাভ অ্যাগেইন, সুরভি।’  

ই-মেইল পড়া শেষ হলে আমি বুঝলাম, যদিও ই-মেইলের মাঝখানে সে আমাকে অনেক তিক্ত কথা বলেছে, তবু মানুষটা সুরভি বলেই বুঝলাম যে, শেষে গিয়ে আবার সব ঠিকঠাক। বুঝলাম, আপাত-তীক্ষ্ণবুদ্ধির, অনেক পড়াশোনা করা এই নেপালি মেয়েটা আদতে বোকা এবং পৃথিবীতে এক্সপ্লয়েটেড হওয়ার জন্যই সে তৈরি। শুধু বুঝতে পারলাম না, তার এই ভয়ানক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথাটা। 

কিসের লড়াই? কিসের ভূমিকম্প ঘটার কারণ উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়ে বিরাট ঝুঁকিতে জড়িয়ে যাওয়া তার? এমন তো না যে কেউ তাকে তার রূপ, তার উত্তরাধিকারসূত্রে পেতে যাওয়া বিশাল ধনসম্পদ এবং তার ব্যতিক্রমী এক সৌন্দর্যমণ্ডিত কথাবার্তা ও চালচলনের লোভে পড়ে খেলছে তাকে নিয়ে, তথাকথিত বিশাল ষড়যন্ত্রের চোরকুঠরিতে তাকে ঢুকিয়ে তার সব কেড়ে নেওয়ার জন্যই, কারণ সেই খেলোয়াড় এটুকু দেখে ফেলেছে যে সুরভি ছেত্রি নামের ধনী এই রূপসী রাজকন্যার স্বভাবের সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে প্রতারিত হওয়ার জন্য তৈরি থাকা? 

আমার তো মনে হয় কেউ স্রেফ অল্টারনেটিভ রক ব্যান্ডের গান নিয়ে তার সঙ্গে দুই ঘণ্টা যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে কথা বলতে পারলেই, সে বিষয়ে নিজের জ্ঞান মেলে ধরতে পারলেই, সুরভি তার পেছনে অবলীলায় পরের তিন দিনের প্রতিটা মুহূর্ত দিয়ে দেবে। আবার হতে পারে আমার এ ধারণা ভুল। হতে পারে তার কাউকে পছন্দ করার ব্যাপারটা এতখানি সরল নয়, যতটা ভাবছি আমি। হতে পারে কারও চেহারা-বুদ্ধি-জ্ঞানের আকর্ষণে পড়ার জন্য সুরভির সম্পূর্ণ নিজস্ব এক আলাদা হিসাব আছে। আমার হিসেবে সুরভি অনেক গভীর ও স্থির; মেহেরনাজ যতটা টগবগে, সে ততটাই জড় ও শান্ত। তার এই বিনিশ্চল চরিত্রকে এভাবে আলোড়িত করার মতো কী ঘটনা ঘটল, তা ভেবে কোনো কূলকিনারা পেলাম না আমি। 

কী সেই তথ্য, সেই ষড়যন্ত্রের বুক ধড়ফড় বিবেচনা, যা তাকে এভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে যে সে মৃত্যুর মুখোমুখি হতেও রাজি? আমি তার বাকি মেইলগুলো পড়বার জন্য মানসিকভাবে তৈরি হয়ে নিলাম, এমনও ঠিক করলাম যে কাল-পরশুর মধ্যে তাকে একটা ফোনও দেব, আবার এ-ও মনে হলো কাঠমান্ডু ঘুরেও আসতে পারি একবার, তাতে খরচও তেমন কিছু পড়বে না-বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটা রিটার্ন টিকিট ছাড়া। কাঠমান্ডু একবার পৌঁছালে আমার সমস্ত খরচ সুরভির, সেটাই নিয়ম, আর বড় ভাইয়ার দেওয়া টাকার পুরোটা এখনো হাতে আছে আমার। 

আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে ভাবতে লাগলাম সুরভির কথা। মনে পড়ল সেই প্রথম রাতে থামেলের রেস্তোরাঁয় ডিনারের পরে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার সঙ্গে যখন আলাপ-পরিচয় হচ্ছিল, তখন আমার সামান্য ধারণাও ছিল না যে পরের দিন এই একই মেয়ের কী কঠিন এক চেহারা প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি আমি। 

সেদিনটাই ছিল ওয়াসফিয়া নাজরীনের এভারেস্ট অভিযানের পথে লুকলায় রওনা হওয়ার দিন। আমরা দুপুর বারোটার দিকে সবাই জড়ো হয়েছি আমাদের হোটেলের লবিতে। ভিড়ে গমগম করছে পুরো জায়গা, সবটাই ওয়াসফিয়াকে ঘিরে—ঢাকার দু-তিনজন সাংবাদিক, নেপালের জনা দশেক সাংবাদিক ও টিভি কর্মী, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আক্কু চৌধুরী, রাজা দেবাশীষ রায়, রেনাটা লিমিটেডের বড় কর্তারা (তারাও স্পনসরের দিকের লোক), ঢাকার কিছু এনজিও কর্মকর্তা, ওয়াসফিয়ার একগাদা নেপালি বন্ধুবান্ধব এবং আমি। সুরভি হঠাৎ আমার কাছ থেকে ফোনটা চাইল, ছবি তুলবে। সে এটাও আমাকে বলল যে, তার মোবাইল রাতে চার্জ দেওয়া হয়নি, সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। 

অন্তত জনা পঁচিশেক লোকের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি আমরা, বাইরে ওয়াসফিয়ার গাড়ি অপেক্ষা করছে তাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যাবে বলে, এয়ারপোর্ট থেকে লুকলার প্লেনে উঠবেন ওয়াসফিয়া। আমি লবির এক পাশে দাঁড়িয়ে আছি একা, বুঝতে পারছি এরা সবাই ওয়াসফিয়ার আগে থেকেই পরিচিত শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষজন; সে হিসেবে আমি অনেক নতুন, তাই দর্শকের মতো তার বিদায় দেখতে থাকা ছাড়া আমার বিশেষ কিছু করবারও নেই। 

হঠাৎ মনে আছে, চার-পাঁচজন শেরপার একটা দল ঢুকল হোটেলে, তারা ওয়াসফিয়াকে ফুলের তোড়া উপহার দিল আর মহা হইচই বাঁধিয়ে পুরো ভিড়টাকে ঠেলে নিয়ে গেল হোটেলের বাইরে। তারপর একগাদা গাড়ির হর্ন, কাদের যেন চিৎকার ‘হারি আপ, হারি আপ’, কয়েকজন আমার পা মাড়িয়ে নেমে গেল রাস্তায়, অনেক কটা গাড়ির দরজা খোলা, কে যে কাকে কোন গাড়িতে বসতে বলছে-ওয়াসফিয়ার সঙ্গে এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য—তার কোনো দিদিশা পাওয়া যাচ্ছে না। এমন সময় আমি দেখলাম, আমার মোবাইল ফোন দিয়ে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে সুরভি প্রায় উঠে যাচ্ছে একটা গাড়িতে। আমি দ্রুত রাস্তা পার হলাম, ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা খেলাম এর-তার সঙ্গে, ফুটপাতে দাঁড়াতে গিয়ে এক পা রাস্তায় পড়ে গেল আমার, নিচে পড়তে পড়তে দাঁড়ালাম এবার কোনোমতে, কোনোমতে সুরভির কাঁধে হাত দিয়ে আমার দিকে তাকে ঘোরালাম এতটাই জোরের সঙ্গে যে, সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলাম ভয়ানক গাড়লের মতো একটা আচরণ করে ফেলেছি আমি। 

সুরভি শান্ত-স্থির, তার দুই চোখ যে এত সুন্দর তা এইমাত্র দেখলাম। সেই চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য বন্ধ হলো, তার দুই গালে রক্ত ফুটে উঠেছে আমার প্রতি অসন্তোষ ও উষ্মা থেকে। আমাকে সে চোয়াল শক্ত করে বলল : ‘আই অ্যাম নট গোয়িং অ্যানিহোয়ার উইদ ইওর ফোন, ডোন্ট ওরি।’ আমি কোনোমতে উত্তর বললাম, ‘সরি’। তখনো নিজেকে আমি স্থির করে দাঁড় করাচ্ছি ভাঙা ফুটপাতে। এবার আমার সরির উত্তরে সুরভি বলল, স্পষ্ট উচ্চারণের ইংরেজিতে যে, এটা কোনো বিরাট ব্যাপার না, পুরুষেরা মেয়েদের সঙ্গে এই আচরণটাই করে থাকে সাধারণত-আগ্রাসী ও ভুল বোঝার এ এক আচরণ যাতে সে অভ্যস্ত, বিশেষ করে শিক্ষিত পুরুষদের এ ধরনের আকস্মিক অবাক করে দেওয়া আক্রমণের সঙ্গে। 

আমি লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম রীতিমতো। তাকে আবার সরি বলতে ভয় হলো এই ভেবে যে সে তখন নিশ্চিত আবার বলবে, ‘ওকে, বারবার সরি বলার দরকার নেই, আমি বুঝেছি তুমি একটা চাড়াল ধরনের মানুষ আর আমার সেই বোঝাটা তোমার সরিতে যেমন বদলে যাবে না, তেমন পুরুষেরা যে মেয়েদের সঙ্গে এমন মাঝেমধ্যেই করে থাকে, সেই সত্যও বিলীন হবে না।’ এ রকম চিন্তা থেকেই কোনো কিছু না বলে আমি আমার দিকে তার বাড়িয়ে দেওয়া ফোন হাতে নিলাম। আমাকে তখন সে তার মেইল অ্যাড্রেসটা বলে যাচ্ছে আমার কানের কাছে ঝুঁকে এসে, বলছে ফোনে তোলা ছবিগুলো পরে ই-মেইল করে দিতে, মানে যদি আমার দয়া হয়। আমি তার শ্বাসের অবিশ্বাস্য সুন্দর একটা গন্ধ পাচ্ছি নাকে, আমার চোরাচোখে দেখা তার ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো আমার দৃষ্টিশক্তিই ঘোলা করে দিয়েছে একরকম। অধোবদন চেহারায় আমি তার ই-মেইল অ্যাড্রেস লিখে নিচ্ছি ঝটপট আমার ফোনের ‘Notes’ অ্যাপে। লেখা শেষ হতেই মুখ তুলে তাকালাম, দেখলাম মানুষের ভিড় আর ভিড়, ওয়াসফিয়ার গাড়ি মাত্র রওনা হয়ে গেছে এবং সেই ভিড়ের মধ্যে কোথায়ও সুরভি নেই। 

এবার আমি একা দাঁড়িয়ে থামেলের রাস্তায়, চেনা একজন মানুষও নেই চারপাশে। আজ বিকেলেই আমার ফিরতি প্লেন যাত্রা, ঢাকার পথে। আমার মন তখন শুধু চাইছে সুরভিকে খুঁজে পেতে। আমি জানি, সে ওয়াসফিয়ার সঙ্গে এয়ারপোর্টে যায়নি, আছে আশপাশের হাজারো মানুষের ভিড়ে কোথায়ও, হয়তো এতক্ষণে তার রাগ বা রোষ কমে গেছে। আবার এমনও হতে পারে যে সুরভি নীরবে চোখের পানি ফেলেছে ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপকের এমন চণ্ডালী আচরণ দেখে, যে লোক কিনা—তার হিসেবে—একমুহূর্তের জন্য হলেও ভেবেছিল যে, সে বোধ হয় তার মোবাইল ফোন চুরি করে নিয়ে কোনো দরজা খোলা গাড়িতে উঠে পালিয়ে যাবে। আবার এটাও হতে পারে যে ঠিক এ মুহূর্তে সুরভি বসেছে আশপাশের কোনো কফিশপে একা, কাপুচিনো অর্ডার দিয়ে টেবিলে বসে ভাবছে, আজ এক বর্বর পুরুষকে একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া হলো। 

হঠাৎ বৃষ্টি নামল। আমি ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে লাগলাম সোজা, কোন দিকে তা জানি না। এবার জোর বৃষ্টি শুরু হলো। আমি পথের ধারে কোথায়ও বৃষ্টি থেকে আশ্রয় নিলাম না, কারণ সম্ভবত চাইছিলাম যে বৃষ্টির জলে আমার লজ্জাগুলো ধুয়ে যাক—পুরুষদের শতবর্ষের লজ্জা এটা, সেসব অযুত-নিযুতসংখ্যক পুরুষ, যারা মেয়েদের প্রতি আগ্রাসনের এই একই ভীমদর্শন চেহারা দেখিয়ে কোনো দিন লজ্জাটুকুও পায় না। আর আমি কিনা আজ রাস্তা ও ফুটপাতের মধ্যে হোঁচট খেয়ে পড়ে ও রকমই এক কাজ ঘটিয়ে ফেলেছি, মেয়েটার কাঁধ ধরে জোরে পেছনে টানতে গিয়ে তার ব্রার ফিতা ধরেও টেনে ফেলেছি সম্ভবত কোনো একটা কিছু আঁকড়ে আমার পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্যই, আবার সম্ভবত উদ্ভট এক চিন্তা থেকে যে, গত রাতে রেস্তোরাঁয় দেখা হওয়া নেপালের এলিট মেয়েটা হয়তো আমার ফোন নিয়ে সত্যি সত্যিই ভেগে যাবে, সম্ভবত… 

আর ভাবতে পারলাম না আমি, বৃষ্টির মধ্যে হাঁটুসমান এক উঁচু দেয়াল পার হয়ে অজস্র দোকানদার, রিকশা, অটোরিকশা ও ট্রাকের জঙ্গল পেছনে ফেলে দাঁড়ালাম এক সরোবরের সামনে এসে। স্পষ্ট চিনলাম, এটা আমার শৈশবের বরিশাল অক্সফোর্ড মিশন রোডের সরোবর, যেখানে বৃষ্টিতে সাঁতার কাটছে হাঁসের দল ও আমার চেনা দুষ্টু বন্ধুরা, বাবা-চাচাদের মতো বড়দের পাশে পাশে। তারা পানি ছিটাচ্ছে চারদিকে কোনো অর্থ ও উদ্দেশ্যবিহীন এবং বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে থাকা আমাকে ডেকেই যাচ্ছে পানিতে নামবার জন্য, তবে সাধারণভাবে ঘাট ধরে নামলে হবে না, সোজা একটা ঝাঁপ দিয়ে নামতে হবে। 

স্পষ্ট মনে আছে, সেই সরোবরের দিকে তাকিয়ে থেকে আমি কালিদাসের মেঘদূত-এর উত্তরমেঘের প্রিয় এক শ্লোক আওড়ালাম মূল সংস্কৃতিতেই। মেঘদূত-এর কিছুটা আমার 

সংস্কৃত ভাষাতেই মুখস্থ। আমি কাঠমান্ডুর ওই সরোবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, শুনলাম বরিশাইল্যা ভাষায় চিৎকার করছে আমার ছোটবেলার বন্ধুরা-মনজু, ওয়াজেদ, তমাল, মাসুম, রিজভি ও কাইল্যা কবির, আর তাদের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন, পানিতেই, আমার সামাদ কাকা, কারণ ছেলেপুলের এই দুরন্তপনা তাঁর ভালো লাগছে না আর। 

আমি রিও ডি জেনিরো শহরের বিশাল যিশুর মূর্তির মতো দুহাত বাড়িয়ে দিলাম মাটির সমান্তরালে, দুপাশে, এবং সাধু-সন্ন্যাসীর পূত কণ্ঠস্বরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বললাম : 

বাপী চাস্মিন্ মরকতশিলাবিদ্ধ সোপানমার্গা
হৈমৈ ছন্না বিকচকমৈল : স্নিগ্ধবৈদূর্যনালৈঃ।
যস্যাস্তোয় কৃতবসতয়ো মানসং সন্নিকৃষ্টং
নাধ্যাস্যম্ভি ব্যপগতশুচত্ত্বামপি প্রেক্ষ্য হংসাঃ। 

‘বর্ষার পঙ্কিলতা এড়ানোর জন্য হাঁসেরা অন্য জল ছেড়ে মানস সরোবরে চলে যায়, কিন্তু যক্ষের দিঘি চিরনির্মল, তাই মেঘ দেখেও তারা যাত্রার উদ্যোগ করে না।’ 

.

বর্ষার পঙ্কিলতার মধ্যে নীলকান্তমণি সুরভি সেদিন আমাকে ভালো পুরুষ কী করে হতে হয় এবং সে জন্য যে মানস সরোবরে যাওয়া লাগে না, সে কথা শিখিয়ে দিয়েছিল। আর আমি কাঠমান্ডু শহরের মাঝখানের বৃষ্টিবিধৌত এক সরোবরের চারপাশের ভেজা ঘাস ও লতা-গুল্ম মাড়িয়ে পায়ে হেঁটে, বৃষ্টিতে জবজবে হয়ে, হোটেলে আমার পাসপোর্ট ও লাগেজ রেখে এক অনাগ্রাসী ভদ্র-মার্জিত পুরুষ হিসেবে কখনো হাঁটতে হাঁটতে, কখনো দৌড়েই হাজির হয়েছিলাম বাংলাদেশে, কারণ এতখানিই কাঠমান্ডুতে থাকতে লজ্জা লাগছিল আমার যে, ওভাবে তক্ষুনি দ্রুত দেশে ফেরা ছাড়া আমার আর অন্য কোনো বিকল্পও ছিল না। 

ঘোর কাটল ফোনের জঘন্য রিংটোনের শব্দে। নূরের মাত্র প্রাক্তন হওয়া স্ত্রী লুনা কল করেছে। আমি দ্বিধান্বিতভাবে ফোনটা শেষমেশ নিলাম। আমি জানতাম লুনা কী বলবে, তাই আমার ইচ্ছা করছিল না তার সঙ্গে কথা বলতে। মানুষের এতখানি নীচতা, এতটা ঘোরালো প্যাচালো চেহারা দেখতে ভালো লাগে না, কারণ, তখনই আমার মনে পড়ে যায় দ্বিপদী মানুষের কাঁধ কিছুটা সামনে ঝুঁকে থাকার ভঙ্গি, যাতে করে আমার শুধু মনে হতে থাকে যে মানুষ আবার চার পায়ের জন্তুর রূপে ফিরে যেতে চাচ্ছে। লুনা তার স্বভাবসুলভ অতি-যত্নশীলা ‘শরীর এখন কেমন? খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করছেন তো? ডাক্তার কী বলল শেষে?’ ইত্যাদি ইত্যাদি দীর্ঘ কুশল বর্ণনা থামলে বলল, ‘ভাই, আপনি প্লিজ নূরকে ভালোভাবে বোঝান যে, আমার বাচ্চার জন্যই মগবাজারের ওই ফ্ল্যাট তার আমাকে লিখে দিতে হবে। সে যেভাবে আমাকে ঘোরাচ্ছে, তাতে কিন্তু আমার নারী নির্যাতনের মামলা করা ছাড়া কোনো গতি থাকবে না, তখন সে কিন্তু সোজা জেলে ঢুকে যাবে। আপনি জানেন ওই মামলায় কোনো জামিন হয় না। আমি ঠিক করেছি আমার একটা হাত পুরো আগুনে পুড়িয়ে ফেলব, ফেলে বলব নূর কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আমার গায়ে আগুন দিয়ে দেয়। আপনাকে এ কথাটা আমি এই নিয়ে চার-পাঁচবার জানালাম ভাই। আমি ওর ভালো বন্ধু, কিন্তু আপনি আমার থ্রেটটা সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না। একমাত্র আপনি, মাসুম ভাই না, স্রেফ আপনি বোঝালেই সে বুঝবে। প্লিজ, ওকে একটু বোঝান। প্লিজ, আমার এই কাজটা করে দেন, বিনিময়ে আপনি যা চান, যা চান, যা চান, আমি আপনাকে দেব, ভাই।’ 

দুই ফোনের মাঝখানে এবার দীর্ঘ এক স্তব্ধতা, আমার মনে হচ্ছে চারপাশটা ভয়ানক এলপিজি গ্যাসে ভরে গেছে, এখনই আমি ম্যাচের কাঠি জ্বালালে একটা জোর ধুপ শব্দ করে পৃথিবীর এই অংশটা হিরোশিমা শহরের মতো ঘন কালো ধোঁয়ার মেঘ হয়ে আকাশের দিকে উড়ে যাবে। আমার লুনাকে চিৎকার করে কিছু বলতে ইচ্ছা করল, কিন্তু একদিকে সে আমার এত দিনকার চেনা, আবার আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাচ্চার মা, অন্যদিকে আমি লক্ষ করলাম আমার কণ্ঠ তার প্রস্তাব শুনে পুরো অনার্দ্র, পুরো শুখা হয়ে উঠেছে, এবং আমার হাত কাঁপছে গর্ত খোঁড়ার সময় কোনো খননযন্ত্র অনেকক্ষণ ধরে রাখার পরে যেভাবে ফোরম্যানদের হাত কাঁপে, সেভাবে। 

ফোনের ওপাশে দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে লুনা আবার বলল, ‘ভাই।’ আর কিছু না। এ পাশে আমি বিশুষ্ক গলা নিয়ে আগের মতোই চুপ। আমি দেখেছি পৃথিবীর সবচেয়ে সংহতিপূর্ণ, কাঠামোর দিক থেকে টান টান শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যেও একটা ছত্রখান, একটা এলোঝেলো ভাব থাকতে হয়। জীবনও সে রকম—এলোঝেলো হান্ডুল-বাণ্ডুল, সবচেয়ে সুন্দরভাবে গোছানো জীবনের মধ্যেও থাকে সূক্ষ্ম কিন্তু স্থির এক সবচেয়ে তছনছ অবস্থা। 

আমি লুনাকে বললাম, ‘দেখি। এখন রাখো তুমি।’ 

সুরভির ওই ই-মেইল ল্যাপটপ স্ক্রিনের ওপরে ঝুলে আছে। এর শেষের দিকে, দীর্ঘ পুনশ্চর আগে, ‘Editors’ নামের ব্যান্ডের গানের লাইনটা আমার চোখে পড়ল। ‘We built this city, now we tear it to the ground।’ এর ঠিক আগে সুরভি আমাকে লিখেছে : ‘এর এই মারাত্মক লাইনগুলো ভালো করে খেয়াল করো। কী খেয়াল করতে আমাকে বলেছে সে এই লাইনটার মধ্যে? হঠাৎ আমি বুঝলাম, এই লাইনে বলা শহরটা কাঠমান্ডু। এটা ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাঠমান্ডু এবং আমার সঙ্গে শেষ হয়ে যাওয়া প্রেম নিয়ে তার এক এলিজি, একই সঙ্গে। ‘We tear it to the ground’ -কেন বলা হচ্ছে আমরা মাটিতে গুঁড়িয়ে দিয়েছি এই শহর? ভূমিকম্পের গুঁড়িয়ে যাওয়া এবং আমরা গুঁড়িয়ে দেওয়া, এ দুয়ের মধ্যে তো বিরাট ফারাক। 

তাহলে কি সুরভি বিশ্বাস করে যে তাদের ওখানে এপ্রিল ও মের ওই ভূমিকম্প ছিল মানবসৃষ্ট; এবং সেটাই তার হিসেবে ষড়যন্ত্র? আমি দ্রুত চেক করলাম ইন্টারনেটে। কিছু সাদাসিধা তথ্য পেলাম, যেমন ২৫ এপ্রিল দুপুর ১২টার ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারের অনেক বেশি হতো যদি ঘটনাটা ঘটত রাতের বেলায়। গ্রামের দিকে প্রচুর মানুষ খোলা মাঠে কাজে বেরিয়েছিল বলে তারা যেমন বেঁচে গেছে, তেমন কাঠমান্ডু শহরে অফিস ও দোকানে কাজ করতে থাকা লোকজন মারা গেছে দালানকোঠা ভেঙে পড়ার সহজ শিকার হয়ে। আহতের সংখ্যা একটা সাইটে দেখলাম ২২ হাজার, অন্য একখানে ৬৩ হাজার। জানলাম যে ভূমিকম্পের পরে বিশাল তুষারধস হয় এভারেস্ট পর্বতে এবং তাতে মারা যান ২১ জন পর্বতারোহী, এটাই এভারেস্ট অভিযান ইতিহাসের কোনো এক বছরে সর্বোচ্চসংখ্যক মৃত্যু। 

ভূমিকম্পে পর্বতারোহীদের মৃত্যুর তথ্য আমার জানা ছিল না আগে। সারা পৃথিবী থেকে এক পর্বতশিখর জয় করতে আসা অতগুলো মানুষের বিশাল তুষারধসের নিচে পড়ে ওই অসহায়, করুণ মৃত্যু এবং তাঁদের মৃতদেহ যে চিরদিনের জন্য পড়ে থাকবে বরফের ওপরে পরবর্তী বহু বহু বছরের পর্বতারোহীদের জন্য দর্শনীয় বস্তু হয়ে-হাত-পা ছড়িয়ে টানা রোদের মধ্যে, মিসরীয় মমিদের মতো কালো-চিমসে হয়ে, আর এভারেস্টের শৃঙ্গে যাওয়ার পথটুকুকে মৃত্যুর দীর্ঘ এক অ্যাভিনিউ বানিয়ে—এ বিষয়টা আমাকে শোকাতুর করে তুলল। 

ওই ভূমিকম্পের কিছু ছবি দেখলাম ইন্টারনেটে—কীভাবে কাঠমান্ডু উপত্যকার বিভিন্ন ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট গুঁড়িয়ে গেছে, যেমন কাঠমান্ডু দরবার স্কোয়ার, পাটান দরবার স্কোয়ার, ভক্তপুর দরবার স্কোয়ার, বৌদ্ধনাথ স্তুপা, শম্ভুনাথ স্তুপা ইত্যাদি। তারপর দেখলাম ১২ মের প্রথম বড় আফটারশকের ব্যাপারে উইকিপিডিয়া লিখেছে ২০০ লোকের মৃত্যু ও ২ হাজার ৫০০ লোকের আহত হওয়ার কথা, অন্যদিকে ওই একই সাইট, যারা ২৫ এপ্রিলের মূল ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ২৭ হাজার বলে দাবি করেছে (যেটা উইকিপিডিয়া আর্টিকেলে ৮ হাজার ৯৬৪), তারা ১২ মের আফটারশকে মৃতের সংখ্যা, মৃতের নাম-ধাম-ঠিকানাসহ প্রমাণ হাজির করে বলেছে যে ৭৮২ জন মারা গেছে সেদিন। 

এসব সাদাসিধা তথ্যের বাইরে কোথায়ও পেলাম না কোনো ষড়যন্ত্রের গন্ধ, এটা যে মানবসৃষ্ট ভূমিকম্প, সে রকম কোনো দাবি। ল্যাপটপ বন্ধ করে রাতের খাবার বানানোর জন্য উঠতে যাব, তখনই এ-বিষয়ক বেশ কিছু সাইট যেন আমাকে টেনে ধরল এক ঝটকায়। একটা ব্লগে একজন লিখেছে: ‘ইসরায়েলের ইহুদিরা আমেরিকার সঙ্গে মিলে ঘটিয়েছে এই নেপাল ভূমিকম্প, তারা আমেরিকার আলাস্কার HAARP-কে (High Frequency Active Auroral Research Program) ব্যবহার করে করেছে এই কাজ, যাতে করে বিশ্ববাসীর মনোযোগ ইরানে বোমা ফেলা থেকে অন্য দিকে ধাবিত হয়।’ একই বুকে আরেকজনের দাবি, ‘ইসরায়েল-HAARP মৈত্রীর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাকিস্তানকে ভূমিকম্পে গুঁড়িয়ে দেওয়া, কিন্তু শেষ মুহূর্তে বদলে যায় তাদের পরিকল্পনা, তেল-আবিবের এক গোপন বৈঠকে ঠিক করা হয় নেপালকে বলির পাঁঠা বানানোর ব্লুপ্রিন্ট।’ 

এবার অন্য এক সাইটে দেখলাম মোটামুটি দীর্ঘ এক প্রবন্ধ, তা প্রচুর টেকনিক্যাল কথাবার্তায় ভরা। অসংখ্য জিয়োলজিক্যাল শব্দবন্ধ, যার সব আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। আমি শুধু বুঝলাম লেখক বলতে চাইছেন, পৃথিবীর খুব নির্ভরযোগ্য এক ভূমিকম্প মনিটরিং থ্রেডে ২৫ এপ্রিল এবং ১২ মের ভূমিকম্পের ঠিক প্রারম্ভে মেশিনে যে কম্পনের ধেয়ে আসার চিরাচরিত চিহ্ন থাকে, তা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া এই ভূমিকম্পের ম্যাগনিচিউড (7.8 Mw), ম্যাক্সিমাম মারকালি ইনটেনসিটি (VIII), এর এপিসেন্টার নেপালের গোর্খা জেলার বারপাক গ্রাম এবং এর হাইপোসেন্টারের অবস্থান—এই চারের গণিত কোনোভাবে মেলে না কোনো সূত্রমতেই। লেখক এরপর বলছেন ভয়ংকর এক কথা : ‘এই কম্পনের মাটির নিচ দিকের গভীরতা ছিল অগভীর (shallow), যা চিরকালই মানবসৃষ্ট ভূমিকম্পের মূল কথা।’ 

আমি এ সাইটের লিঙ্ক ধরেই অন্য আরেক সাইটে গেলাম, যেখানে লেখা এক নাতিদীর্ঘ নিবন্ধের সার এই : ‘নেপাল এশিয়ার প্রথম সমলিঙ্গ বিবাহ আইনসিদ্ধ করবার পথে যাচ্ছে। তাই আমি পরিষ্কার বলতে চাই, এই ভূমিকম্পের পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র নেই, আছে ঈশ্বরের ক্রোধ।’ একই লেখক তাঁর লেখার শেষ দিকে এটাও দাবি করেছেন যে, ‘এই ভূমিকম্পের সংঘটনে ইসরায়েল ও HAARP-এর সঙ্গে ভারতের বিজেপি হাত মিলিয়েছিল এ লক্ষ্য মাথায় রেখে যে নেপাল গুঁড়িয়ে গেলে ভারত হতে পারবে পৃথিবীর এক নম্বর হিন্দু রাষ্ট্র’। এ ওয়েবসাইটের একদম নিচে দেখলাম তিনটে লিঙ্ক : একটা লন্ডনের The Guardian-এর, তারিখ ২৭ এপ্রিল ২০১৫, শিরোনাম ‘Israel begins evacuating babies born of surrogate mothers in Nepal’; আরেকটা ইসরায়েলের বড় অনলাইন পত্রিকা Ynet news.com-এর, তারিখ ২৮ এপ্রিল ২০১৫, শিরোনাম : ‘Israelis evacuated from Nepal land safely in Israel’; আর শেষটা Newsweek-এর, তারিখ ২৭ এপ্রিল ২০১৫, শিরোনাম ‘Israelis begin evacuating babies born of surrogate mothers in Nepal’। আমি তিনটে খবরই পড়লাম। ২৬ জন ইসরায়েলি শিশুর, যাদের জন্ম নেপালি মহিলাদের গর্ভে, ভূমিকম্প বিধ্বস্ত নেপাল থেকে তেলআবিবে পৌঁছানোর আনন্দময় ছবিও দেখলাম বেশ কটা। কিন্তু, লেখক বলতে চাইছেন কী করে সম্ভব ভূমিকম্পের মাত্র এক-দেড় দিনের মাথায় এভাবে প্লেন পাঠিয়ে ঠিক ঠিক লোকগুলোকে খুঁজে বের করে নেপাল থেকে প্লেনে তুলে তেলআবিবে নিয়ে আসা, যদি আগের থেকে সেই প্রস্তুতি না থেকে থাকে? এরপরই লেখক বলছেন, ‘মূল ঘটনা জানতে এই নীল-সাদা স্ট্রাইপে (ইসরায়েলের পতাকার রং) ক্লিক করুন।’ আমি তা-ই করলাম। 

সাইটটার হোম পেজে আলাস্কার গাকোনায় এক বিস্তৃত খোলা প্রান্তরে HAARP সেন্টারের ছবি—এক বিশাল মাঠজুড়ে অনেক ফ্রেম বসানো, দেখতে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তারের এক মহাসম্মিলনের মতো, ছবিতে জায়গাটার গায়ে ইংরেজি ক্যাপশনে লেখা ‘Imaging Riometer’; তারই এক পাশে বড় এক নভোথিয়েটার আকারের স্থাপনা, গায়ে লেখা AZ / EL Telescope Dome। ওয়েবসাইটের সূচিতে ক্লিক করে জানলাম, HAARP আমেরিকার এয়ারফোর্স, নেভি, ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (DARPA) -এদের যৌথ অর্থায়নে চালানো আয়নোস্ফিয়ার (পৃথিবীর ওপরের ৬০ কিলোমিটার থেকে ১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশের স্তর) গবেষণাকেন্দ্র, সহজ ভাষায় এক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন, উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির ট্রান্সমিটার, যার কাজ রেডিও কমিউনিকেশন ও সামরিক নজরদারির স্বার্থে আয়নোস্ফিয়ারকে কাজে লাগানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। 

এর পরে বেশ কিছু পেজজুড়ে অনেক শব্দতরঙ্গ-বিষয়ক পদার্থবিজ্ঞানের কথাবার্তা, অনেক সূর্যের এক্স-রে ও ইউভি রে নিয়ে আলোচনা, হুইসলার-মোড ভিএলএফ সিগন্যাল নামের এক জিনিস নিয়ে বিতর্ক। আমি সেগুলো দুর্বোধ্যতার কারণে যত দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছি, ততই মনে হচ্ছে আরও জটিলতার গভীরে ঢুকে পড়ছি যেন : প্লাজমা লাইন অবজারভেশন, জাইরো ফ্রিকোয়েন্সি হিটিং রিসার্চ, এয়ার-গ্লো অবজারভেশন, স্প্রেড এফ অবজারভেশন, এফ লেয়ারে ইলেকট্রনের ঘনত্বের অনিয়ম-এসব কথার কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। হঠাৎই এর একটু নিচে চোখে পড়ল কানাডিয়ান অর্থনীতিবিদ ও লেখক মিশেল চোসসুদোভস্কির একটা উক্তি : ‘সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ থেকে এটা স্পষ্ট অনুমান হয় যে, HAARP পুরোদমে চালাচ্ছে তার কার্যক্রম এবং HAARP-এর পক্ষে সম্ভব পৃথিবীতে বন্যা, হারিকেন, ঝড়, খরা ও ভূমিকম্প ঘটানো।’ আরও যেসব কথা পড়ে ফেললাম একশ্বাসে তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এগুলো : 

— HAARP দায়ী পৃথিবীতে হঠাৎ বড় বড় বিদ্যুৎ চলে যাবার ঘটনা, TWA ফ্লাইট 800-এর আটলান্টিক মহাসাগরে সলিলসমাধি, গালফ ওয়ার সিনড্রোম (যার মধ্যে পড়ে ক্লান্তি, পেশির ব্যথা, যুক্তিভিত্তিক চিন্তার সমস্যা, চুলকানি ও ডায়রিয়ার মতো লক্ষণ), পৃথিবীর অনেক দেশে অস্বাভাবিক বজ্রপাত (যেমন ইরান, পাকিস্তান, হাইতি, তুরস্ক, গ্রিস ও ফিলিপাইনে), নেপালের ভূমিকম্প ইত্যাদির জন্য। 

—HAARP একটা মন নিয়ন্ত্রক যন্ত্র, যা রেডিও তরঙ্গ পাঠিয়ে মানুষের মনকে প্রভাবিত ও শাসন করে। 

—আয়নোস্ফিয়ারের পরীক্ষা থেকে হঠাৎ খাঁচাছাড়া হতে পারে এত এতসংখ্যক ইলেকট্রন যে পৃথিবীর চৌম্বকীয় মেরু দুটো উল্টে যেতে পারে পুরোপুরি। 

—HAARP পৃথিবীর আবহাওয়াকে বদলে দেবার জন্য তৈরি এক মহা শক্তিশালী হাতিয়ার। এর কাজ আবহাওয়ার প্রকৃতি বদল ও স্যাটেলাইটগুলোকে অকার্যকর করে দেওয়া। 

—পৃথিবীর নানা জায়গায় মাঝেমধ্যে যে লো-ফ্রিকোয়েন্সি ব্যাকগ্রাউন্ডের গুন গুন শব্দ শোনা যায় ইদানীং, তার পেছনে আছে HAARP। 

—HAARP মানুষের আত্মাকে ফাঁদে ফেলবার এক বিস্তৃত জাল। 

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *