আগস্ট আবছায়া – ১.২

১.২

আমার রুমের দরজার সামনে আমি দাঁড়িয়ে। পুরোনো যুগের তালা নতুন যুগের এ হোটেলের দরজায়-এর মালিক চেয়েছেন হোটেলের সবকিছুর মধ্যে একটা ‘ক্ল্যাসিক’ ইফেক্ট দিতে। ব্রিফকেস থেকে লম্বা, প্রাচীন চেহারার এক চাবি বের করলাম আমি, তালায় ঢোকালাম, ঘোরাচ্ছি কিন্তু খুলছে না। হাতের সব জিনিসপত্র মেঝেয় রেখে এবার ভালোমতো এক হাতে তালা, অন্য হাতে চাবি ধরে চাবি ঢুকিয়ে দিলাম ছোট এক ফুটোর মধ্যে। তাও খুলল না তালা। এখন আবার নিচে যাওয়া ও রিসিপশন ডেস্কে গিয়ে এটা বর্ণনা করা—অনেক দুরূহ এক কাজ বলে মনে হলো আমার। তালা ভেঙেই ফেলব নাকি? লাথি মেরে, হাঁচড়ে-কামড়ে, তালার গা ধরে ঝুলে থেকে? ‘এমন কোনো তালা নেই যা চরম ভায়োলেন্সের সামনে দাঁড়াতে পারে, আর সব তালাই দুর্বৃত্তের জন্য আমন্ত্রণ মাত্র।’ মাসটা যে আগস্ট, তা-ও চকিতে খেয়াল হলো। 

বাসার তালা দাঁড়াতে পারেনি দুর্বৃত্তদের সামনে, একটুও। সে রাতে ২৫-২৬ জন মানুষ শিকার হলেন চরম ভায়োলেন্সের, এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আবারও প্রমাণ দিল তার উদ্ধতচারী আত্মার বিপর্যয়কামী শক্তির, যে শক্তি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে এক বাসার দোতলা-একতলা-সিঁড়িঘর-গার্ডরুম-উঠান-বারান্দা কলঘরজুড়ে আবারও রক্ত দিয়ে লিখল পৃথিবীর মূল ইতিহাস, যা আগাগোড়া নিষ্ঠুরতা ও রক্তপাতের, মানুষের ক্ষিপ্রগতিতে পৃথিবীতে ক্ষমতা দখলের এবং সেই ক্ষমতা দখল নিরঙ্কুশ করতে আবারও, বারবার, নির্বিচার রক্ত ঝরানোর। তৃণভূমির মজলুম থেকে হঠাৎই জল-জঙ্গল-প্রান্তরের রাজরাজেশ্বর হয়ে গেল মানুষ নিয়ানডারথালদের খুন করে। অন্যকে সহ্য করার গুণ আমাদের নয়; উদারচিত্ততা, পরহিতব্রত ও সংযমের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগ নেই। তাই আমরা চোখের ইশারায়, কানের পাশের ফিসফিসানিতে ঠিক করে ফেললাম, নিয়ানডারথালগুলোকে মেরে ফেলতে হবে। পৃথিবীতে এখন সব মানুষের প্রজাতি এক হওয়া সত্ত্বেও যদি আমরা স্রেফ গায়ের রং, ভাষা ও ধর্মের কারণে গাঁয়ের পরে গাঁ, শহরের পরে শহর অন্য মানুষদের মেরে কেটে সাফ করে দিতে পারি তো তাহলে অন্য প্রজাতির মানুষকে কেন নয়? 

সেভাবেই, আগের সম্রাটকে তার পরিবার-পরিজনসহ এক রাতের মধ্যে মেরে ফেলে ক্ষমতা নিয়ে ফেলল মানুষ, পরের ভোরেই। এই তড়িঘড়ি ক্ষমতায় আসা, তা-ও এ রকম রক্তলীলা ঘটিয়ে, মানুষের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল চিরকালীন ভয় ও উদ্বেগের ব্যাধি, এই ভয় যে এভাবে ক্ষমতার পালাবদল নিশ্চয়ই তার চক্র পূরণ করবে আবার আমার খুন দিয়েই, এই উদ্বেগ যে, যেহেতু মোটামুটি সবাই-ই আমার শত্রু, আমাকে তাই শুধু খুঁজে বের করতে হবে কারা কারা, আমার সংজ্ঞামতে, আমার শত্রু, এবং মেরে ফেলতে হবে তাদের। এভাবেই আমরা মানুষেরা হয়ে উঠলাম সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও বিপজ্জনক, সবচেয়ে গর্বোদ্ধত ও হিংসাশ্রয়ী। অতএব ইতিহাসের অন্য সব সত্য ছাপিয়ে একটা সত্যই সামনে উঠে আসে বারবার—যুদ্ধ, ক্রূরতাভরা যুদ্ধ, ক্ষমতা দখলের হুংকারে ভরা অস্ত্রের ঝলক। মঙ্গলচিহ্ন ও হিতাকাঙ্ক্ষার শোভা শুধু মানুষের তাড়া খাওয়া স্বপ্নেই দেখা সম্ভব; বাস্তবের সূর্যের নিচে এক সাল শুরু হওয়ার আগেই, অতএব, শুধু এক খসড়া ও অসম্পূর্ণ তালিকার হিসেবেই, পৃথিবীতে মঞ্চস্থ হয়ে গেল পাঁচ হাজার বড় যুদ্ধ-স্থলযুদ্ধ, জলযুদ্ধ, ধর্মযুদ্ধ, বিপ্লব, অভ্যুত্থান; শুধু ন্যায়যুদ্ধ ছাড়া আর সব, এবং এসবই পৃথিবীতে রেমিংটন, লিথগো লি-এনফিল্ড, উইনচেস্টার সেমি অটোমেটিক ও ব্রেন-লাইট-মেশিনগান আসবারও আগে। 

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এসব কী ভেবে চলেছি আমি সিজোফ্রেনিয়ার রোগীর মতো করে? হঠাৎ সংবিৎ ফিরে এল আমার। শুনেছি পৃথিবীতে এখন প্রতি তিনজনে একজন মানুষ ভুগছে সিজোফ্রেনিয়ার কোনো না কোনো লক্ষণে—মিথ্যা সন্দেহ, উদ্যমহীনতা, অস্বচ্ছ চিন্তা, গুহাবাস, উদ্বেগ, ভয়ানক বিষাদগ্রস্ততা। কার কাছে গেলে ঠিক জানতে পারব যে আমি কোনো সিজোফ্রেনিয়ার রোগী কি না? তালা খুলে গেল। আমি ভেতরে ঢুকলাম। রুমে ঢুকে ঠিক করে ফেললাম, ঘুমাব না, দরকার নেই। আর মাত্র ঘণ্টা পাঁচেক পরে, ভোর সাড়ে পাঁচটায়, এমনিতেও আমাকে ঘুম থেকে উঠতে হবে সকাল আটটা দশে মুম্বাই-ঢাকা জেট এয়ারওয়েজ ফ্লাইট ধরার জন্য। আমার ঘুমের ওষুধ অ্যালপ্রাজোলাম, আজ দীর্ঘ আট বছর ধরে আমি যা খেয়ে চলেছি ঘুম ও প্যানিক ডিজঅর্ডারের পথ্য হিসেবে, আমাকে পরিষ্কার বলে দিচ্ছে যে এখন আর ঘুমানোর জন্য যথেষ্ট সময় হাতে নেই। এ ওষুধের বায়োলজিক্যাল হাফ-লাইফ তাৎক্ষণিক রিলিজের হিসেবে ১১.২ ঘণ্টা এবং বর্ধিত রিলিজ ধরলে ১৫.৮ ঘণ্টা। অতএব এখন ওষুধটা খাওয়ার পাঁচ ঘণ্টা পরে ঘুম থেকে উঠলে রক্তের মধ্যে আনঅ্যাবজরড ঘুরতে থাকবে এর মেটাবোলাইটগুলো, এবং ওই আনমেটাবোলাইজড অ্যালপ্রাজোলামকে আমার দুই কিডনি ফিল্টার করে প্রস্রাব হিসেবে বের করে দিতে ব্যর্থ হবে, তাই হয়তো তখন এয়ারপোর্টের ঠান্ডা মেঝেতে হঠাৎ হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে একটা বিতিকিচ্ছিরি সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট ঘটিয়ে বসব আমি। না, ঘুম নিষেধ এখন। অতএব ঘুমকে বিদায় জানিয়ে, সব কাপড়চোপড় খুলে শুধু আমার গাঢ় নীল আন্ডারওয়্যার পরে থেকে আমি বসে গেলাম ল্যাপটপ নিয়ে, হোটেলের ওয়াইফাইতে ভর করে ঢুকে গেলাম ইন্টারনেটে, গুগলে সার্চ দিলাম : ‘পাম বিচ ক্রিক মার্ডারস মুম্বাই’। 

.

মাত্র কদিন আগে, আগস্টের ১ তারিখে, টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে : ২৪ বছর বয়সী এক মেয়ের মুণ্ডুকাটা লাশ পাম বিচ রোডে পাওয়া গেছে কালো এক স্যুটকেসের মধ্যে, স্যুটকেস মোড়া ছিল প্লাস্টিক দিয়ে। পুলিশ বলছে, এই মেয়ের নাম মারিয়াম শেখ, সে গোভান্দি থেকে আসা এক বিউটিশিয়ান, কাজ করত ভাশির এক বিউটি পারলারে। তার ঝগড়া হয় মালিকের সঙ্গে, তারপর সে ট্রান্সফার নিয়ে চলে যায় একই পারলারের সি-উড শাখায়। ওই মালিকই এরপর তাকে খুন করে লাশ ফেলে দেয় পাম বিচ খাঁড়িতে। তারপর ২১ বছর বয়সী আরেক মেয়ের, নাম নাগমা, লাশ পাওয়া গেছে পাম বিচ রোডের পাশের সারসোল ক্রিকে, জলাভূমির মধ্যে, ম্যানগ্রোভ শ্বাসমূলের পাশে—গলা কাটা, মুখ আগুনে পোড়ানো। লাশ মেলার বিশ দিন পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে তার স্বামী শহিদ আলি কুরেশিকে। শহিদ স্বীকার করেছে স্ত্রীকে হত্যার কথা, কারণ স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে সন্দেহ ছিল তার। তারপর আন্ধেরির এক ব্যবসায়ীর ১৬ বছরের ছেলে আদনান পত্রওয়ালা। তাকে তারই পাঁচ বন্ধু অপহরণ করে দুই কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। কিন্তু এরই মধ্যে মুক্তিপণ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কিছু লেখা নেই—তারা আদনানকে মেরে ফেলে ক্রিকের ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে লাশ ফেলে দেয়। পুলিশ আদনানের খুনি পাঁচ বন্ধুকে খুঁজছে, কিন্তু পাঁচজনের একজনকেও পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর সন্ধ্যা সিংয়ের বিষয়ে ছোট একটা রিপোর্ট। রিপোর্ট বলছে যে, এই সন্ধ্যা সিং অভিনয়শিল্পী বিজয়তা ও সুলক্ষণা পণ্ডিতের বোন, মিউজিক কমপোজার জুটি যতিন-ললিতেরও বোন। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে, কোন দিনের সকাল তা রিপোর্টে উল্লেখ নেই, কারাভে গ্রাম থেকে আসা এক কৃষক পাম বিচের রোডের পাশে মালিকের জমিতে সবজি চাষের কাজে গিয়ে দেখল একটা স্যুটকেস পড়ে আছে। পুলিশকে খবর দিল সে। পুলিশ খোঁজ তল্লাশি করে জানল স্যুটকেসের ভেতরের লাশ সন্ধ্যা সিংয়ের, ইতিমধ্যে কঙ্কাল হয়ে গেছে। সন্ধ্যা সিংয়ের লাশ পাওয়ার স্থান ও তার হাউজিং কমপ্লেক্সের বাসার মধ্যকার দূরত্ব বেশি নয়। এক বছর পরে পুলিশ সন্ধ্যা সিংয়ের ছেলে রঘুবীর সিংকে গ্রেপ্তার করে এই খুনের দায়ে মারিয়াম শেখের বাবা-মা ও ভাইয়েরা পুলিশে এফআইআর করেছিল শিভাজিনগর থানায় গিয়ে, কারণ মারিয়াম রোববার রাতে বিউটি পারলারের কাজ থেকে আর ঘরে ফেরেনি। তার ভাইয়েরা পুলিশকে জানায় যে তারা তাদের বোনের মোবাইল নম্বরে রোববার রাত থেকেই ফোন করে যাচ্ছিল, তাকে শেষ কল করা হয় রাত এগারোটায়, এরপর থেকেই দেখা যায় ফোন ‘আনরিচেবল’। ওদিকে, রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা, শহিদ আলি কুরেশি বলেছে তার সঙ্গে মারিয়াম শেখের হত্যার কোনো সম্পর্ক নেই, সে কেবল তার স্ত্রী নাগমার খুনি, আর পুলিশ বলছে, মারিয়াম শেখের বিউটি পারলারের মালিকের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই আদনান পত্রওয়ালার পাঁচ বন্ধুর এবং সন্ধ্যা সিংয়ের কঙ্কাল যে স্যুটকেসের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল, সেই একই স্যুটকেস ব্যবহার করা হয়েছিল মারিয়ামের লাশ ফেলবার কাজে, স্যুটকেস মুড়িয়ে রাখা প্লাস্টিক ছিল একই ব্র্যান্ডের। তারপর খবরের শেষে: ‘অতীতেও পাম বিচ রোডের বাসিন্দারা পুলিশকে অনুরোধ করেছেন এই এলাকায় আরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর জন্য। কারণ এই রোডের পাশের জলাভূমিতে লাশ ফেলে যাওয়ার ঘটনা এবারই নতুন নয়, আগেও বহুবার ঘটেছে এ রকম, এবং তা সংখ্যায় বাড়ছেই। পুলিশ আমাদের উত্তরে বলেছে, এলাকার পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ীদের এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে, কারণ তাদের কাছে আর সিসিটিভি বসানোর বাজেট বরাদ্দ নেই।’ 

খবরটা পড়তে গিয়ে বুঝে গেলাম কী ভয়ানক এরর হয়েছে এর বিন্যাসে। একটা ঘটনার মধ্যে ঢুকে গেছে আরেকটা—মারিয়াম শেখের মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে নাগমার আগুনে পোড়া মুখ, নাগমা শেষ হতে না হতেই আদনানের অপহরণ, তারপরই কারাভে গ্রাম থেকে আসা এক কৃষকের কথা, ঠিক আসলে বোঝাও যাচ্ছে না ওই কৃষক কার লাশ পেয়েছিল তার মালিকের চাষের জমিতে-সন্ধ্যা সিংয়ের নাকি মারিয়াম শেখের? সন্ধ্যা সিং কার কার বোন? চারটা নাম দেওয়া আছে ‘সিস্টার অব’ বলবার আগে। চারজনেরই বোন সে? আর তার খুনি-পুত্র রঘুবীর-সংক্রান্ত বাক্যের মধ্যেই নির্বিকারে, দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন ছাড়াই ঢুকে গেছে শিভাজিনগর থানার কথা, যেখানে এফআইআর দাখিল করছে মারিয়াম শেখের ভাইয়েরা। শহিদ আলি কুরেশি কেন তার স্ত্রী নাগমাকে খুন করার অতিরিক্ত অন্য কোনো খুন নিয়ে কথা বলবে? কেন বিউটি পারলারের মালিকের সঙ্গে, যে কিনা মারিয়ামের খুনি, যোগাযোগ থাকবে আদনানের পাঁচ বন্ধুর? 

কেন পত্রিকার লোকেরা ফ্যাক্টসগুলো এভাবে সাজিয়েছে? এই রিপোর্ট পড়লে কী ভাবতেন জোসেফ কনরাড? লর্ড জিম-এ তিনি লিখেছিলেন: ‘দে ওয়ান্টেড ফ্যাক্টস। ফ্যাক্টস! তারা [বিচারকেরা জিমের কাছ থেকে ফ্যাক্টসগুলো জানতে চাইল, যেন বা ফ্যাক্টের পক্ষে আদৌ সম্ভব কোনো কিছুর ব্যাখ্যা করা।’ এখানে, এই রিপোর্টে, প্রুফ রিডিং এরর, প্যারাগ্রাফিং এরর, মেকআপ এররের কালগ্রাস ঘটিয়ে ইচ্ছা করেই কি দোমড়ানো-মোচড়ানো হয়েছে ফ্যাক্টসগুলো? যেহেতু ফ্যাক্টস, শুধু ফ্যাক্টস, কোনো কিছুর সত্য ব্যাখ্যা দিতে অক্ষম, তাই কি একের জীবন অন্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে অন্য এক আসল ফ্যাক্ট লুকানোর চেষ্টা করেছেন এর প্রতিবেদক? নাকি তিনি ভেবেছেন সবই যেহেতু খুনের গল্প, তাই কী যায় আসে নামে, সবই তো শেষে গিয়ে মৃতদেহ, তাই নাগমাকে নাগমা বললেই কী আর আদনান পত্রওয়ালা বললেই কী; যে সন্ধ্যা সিং, সে-ই মারিয়াম শেখ, পনেরোই আগস্ট রাতে ধানমন্ডির বাড়িতে যে শেখ মুজিব, সে-ই জুলিয়াস সিজার, এবং আরও বড় করে দেখলে, যে খুনি শহিদ আলি কুরেশি, সে-ই রঘুবীর। 

বোর্হেসে এই ইঙ্গিত পর্যাপ্ত আছে যে ইতিহাস এক বৃত্তাকার গতিতে ঘুরে চলেছে সুস্থ-সুশৃঙ্খল এক অরাজকতার মধ্য দিয়ে—কিন্তু শুধু আপাতচোখেই বিশৃঙ্খল তা, যেহেতু একই বিশৃঙ্খলতা এখানে বারবার সংঘটিত হচ্ছে তাই ইতিহাসের ওই অরাজক অবস্থা আসলে এক সুশৃঙ্খল অবস্থাই। আমি ভাবলাম, কীভাবে বিশৃঙ্খল আকারে সুশৃঙ্খল এই চক্রাকার বর্তমান প্রতি মুহূর্তে, প্রতিটা নতুন খুন-হত্যা-গুপ্তহত্যার সঙ্গে ভারী হতে হতে পিছলে পিছলে ইতিহাসে ঢুকে যাচ্ছে তা দেখতে থাকাই যা কিছু তাৎপর্যময়, আদৌ যদি ইতিহাস পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য বলে কিছু থাকে। 

হোটেল রুমের মেঝেয় হাঁটু মুড়ে বসলাম আমি। হাঁটুর কাছে প্রচণ্ড ঝিঁঝি ধরেছে, ব্যথার এক অনুভূতি তীব্রতর হচ্ছে, যে চিন্তা করে চলেছি তাকে আর সামনে নিয়ে যাওয়ার শক্তি আমার নেই। আমি দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকলাম, সামনে ঝুঁকে ভেঙে পড়ে আমার কপাল দিয়ে ল্যাপটপের ঢাকনা বন্ধ করলাম। নিয়ানডারথালরা গেছে, প্যাসেঞ্জার পিজিয়নরা গেছে, পাইরেনিয়ান আইবেক্স নামের বুনো ছাগলেরা গেছে, এক হাজার প্রজাতির বেশি ডাইনোসরেরা গেছে, এবার দ্বিপদী মানুষেরাও যাবে, উজাড় হয়ে যাবে একে একে, মানুষের আগেকার প্রজাতির মতো বিশ লাখ বছর এদের টিকে থাকার কোনো সামান্য সম্ভাবনা নেই। মাত্র দুই লাখ বছর আগে আমরা এসেছি, আর এই আমরা এখানে থাকব আরও আঠারো লাখ বছর? এভাবে যে যাকে মেরে ফেলে, মেরে না ফেলে জীবিত রেখে কষ্ট দিয়ে, তারপর নিজেরাও মরে অন্য কোনো খুনির হাতে, যে খুনি আবার মরবে অন্য কোনো খুনির হাতে-এভাবে? এভাবে এই গ্রহে টিকে থাকব আমরা? এই গ্রহ টিকিয়ে রাখব? 

মেঝেতে শুয়ে পড়লাম। শরীর টেনে উঁচু টেবিলের পাশে গেলাম, টেবিলে শরীর ঠেস দিয়ে মাথা নিচে পা ওপরে টেবিল ছাড়িয়ে উঁচুতে শূন্যে তুললাম, তারপর ছেড়ে দিলাম পা, ওরা ভাঁজ হয়ে এল বুকের দিকে, মায়ের পেটে ৩৩-৩৫ সপ্তাহের শিশু যেভাবে ভাঁজ হয়ে থাকে অসিপিটো-অ্যান্টেরিয়র পজিশনে, সেভাবে আমি স্থির হয়ে থাকলাম বরফের মধ্যে আটকানো কোনো পতঙ্গের মতো। 

রুমের এসির ঠান্ডা বেড়েই চলেছে। আমার মাথা ওভাবেই নিচু করে রাখা। হাঁটুর ঝিঁঝি চলে গেছে, কিন্তু ওটার মতোই এক অনুভূতি হচ্ছে ঘাড়ের কাছে, মাথার পেছন দিকে। এ রকম পজিশনে থেকে পৃথিবীকে দেখতে নতুনই লাগে—সব উল্টো; ভালোই। কোনো একটা গর্ত দিয়ে আমার ডেলিভারি হয়ে গেলে আরও ভালো হতো। কষ্টে সব হু হু করে উঠল আমার বুকের মধ্যে—আইয়ারের কথা মনে পড়ল অনেক। মাথায় রক্ত জমে নিশ্চয় এই ভার ভার বোধ হচ্ছে, তবে অসুবিধা হচ্ছে না খুব একটা কারণ মাঝেমধ্যেই পৃথিবীকে উল্টো করে দেখার শখে এই একই কাজ করে থাকি আমি। জানি আর একটু পরে চোখে বিভ্রম দেখা শুরু হবে, নিশ্চয়ই এর কোনো বায়োলজিক্যাল ব্যাখ্যা আছে। ওভাবেই গর্ভের শিশুর ভঙ্গিতে কুঁকড়ে-মাথা মেঝেতে, পা ওপরে বুকের কাছে-আমি সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম যখন পৃথিবীর অনেক পাখি, অনেক ফুলবাগান, অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী আমার চোখের সামনে জ্যোতিশ্চক্র হয়ে ফুটে ফুটে উঠতে থাকবে; কিন্তু না, আইয়ারের মুখ ছাড়া অন্য কিছু ভেসে উঠল না আজ। দ্রুত চিন্তা করে যাচ্ছি আমি, ঘর বরফশীতল হয়ে উঠছে, আন্ডারওয়্যার ছাড়া আমার গায়ে একটা সুতোও নেই, ভাবছি ধনী ও গরিবের মধ্যকার এই ব্যবধানের ব্যাখ্যা কীভাবে দিলে সমস্যা কোনো সমাধানের রূপ নিতে পারে, ভাবছি নিজের অংশের ও অধিকারের জন্য লড়াই করা শুধু গরিবের জন্যই কেন বাধ্যবাধকতা, ভাবছি এসব কার্যকর কোনো প্রশ্ন নয়; মূল প্রশ্ন : ভুলটা কী হয়েছে আসলে? একই প্রশ্ন করে শুরু হয়েছিল ফরাসি বিপ্লব, তারপর বিপ্লবের শেষে শুধু সন্ত্রাসের নতুন এক বন্যাই নামল না, নতুন সম্রাট নেপোলিয়ন বল্গাহীন দাপিয়ে বেড়াতে লাগলেন তার নতুন জেতা সব রাজ্যের মাটি, বর্বরের মতো। 

বাদুড়ের শূন্যে ঝোলা পজিশন থেকে নামলাম আমি। দীর্ঘ শাওয়ার নিলাম, সাবানের ফেনায় ভরিয়ে তুললাম বাথরুমের মেঝে, যতটা পারা যায়। ফেনা, জলবুদ। হোটেল থেকে চেক-আউট করলাম সাড়ে পাঁচটায়, নন এসি একটা ট্যাক্সি নিলাম মুম্বাই এয়ারপোর্টের উদ্দেশে। ট্যাক্সিচালকের নাম রাজেশ, বিহারের এক সুঠাম যুবক, গায়ে তার স্যান্ডো গেঞ্জি, ঘামে ভিজে আছে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, সে আইয়ার নামের মুম্বাইয়ের এক পুরোনো ট্যাক্সিচালককে চেনে কি না। আমার এই অনর্থক প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না রাজেশ, অন্ধকার রাস্তা ধরে ধীরে চালাতে লাগল তার গাড়ি। অন্ধকারের মধ্যেই অনেকগুলো বেলগাছ চিনতে পারলাম হেডলাইটের আলোয়, হাইওয়েতে ওঠার ঠিক আগে। বড় শহরের রাস্তার পাশে বেলগাছ থাকা স্বাভাবিক নয়, কিন্তু আমার যে ভুল হয়নি, তাতে আমি নিশ্চিত—মোটা, সোজা গুঁড়ি, ধূসর রং, পাতা তিনটে পত্রকে বিভক্ত, গড়ন ত্রিশূলের। ভুল দেখিনি আমি। পাকুড়, বেল, বট, মান্দার—এদের আমি চিনি আমার হাতের তালুর রেখার মতো করে। 

এয়ারপোর্টে নেমে দেখি অসংখ্য ট্যাক্সি ড্রাইভার দলে দলে গল্প করছে। সকাল ছয়টা বাজে। আইয়ারের এ সময় ঘাটকোপারে সিমরান ট্রাভেলস অফিস থেকে নতুন এক দিনের জন্য গাড়ির চাবি ও গাড়ি জিম্মায় নেওয়ার কথা, কোনোভাবে এয়ারপোর্টে থাকার কথা নয়। তবু আমি ট্যাক্সি ড্রাইভারদের মুখের মধ্যে আইয়ারের মুখ খুঁজতে লাগলাম আকুল হয়ে। তাকে তার প্রাপ্য টিপসটুকু না দিয়ে মুম্বাই ছেড়ে যাচ্ছি, সে কথা মানতে পারছি না। ভাবলাম তাকে ফোন দেব, সেই ফোন নম্বর লেখা কাগজ আমার পকেটেই আছে। কিন্তু মনে হলো, তাকে ফোন দিয়ে হ্যালো বলার চাইতে অনেক সহজ কাজ হবে শ খানেক ট্যাক্সি ড্রাইভারের মধ্যে তাকে খুঁজতে থাকা। এয়ারপোর্টের সামনে ট্যাক্সি থেকে ট্যাক্সিতে ওভাবে মিনিট পাঁচেক দৌড়ে বেড়ানোর শেষে আমার মনে হলো এ রকম গুলিয়ে যাওয়া মাথা থেকেই মানুষের চিন্তার নৈরাজ্যের সূত্রপাত ঘটে, মানুষ হয় মাস মার্ডারার, না হয় উন্মাদ হয়ে যায়। এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকে গেলাম নিরাপত্তা প্রহরীদের হাতে বড় বড় কোল্ট কমান্ডো সাব-মেশিনগান ও অ্যাসল্ট রাইফেল চোরাচোখে দেখতে দেখতে। ভারতের এয়ারপোর্টগুলোর ওপরে আইএস বা লস্কর-ই-তাইয়েবা ধরনের গোষ্ঠীদের হুমকি আছে, তাই এভাবে বাচ্চা বাচ্চা সেনাদের হাতে কোল্ট কমান্ডো বা এমসিক্সটি দেখে বেশি অবাক হলাম না, জোরে শ্বাস নিয়ে এসে দাঁড়ালাম বিরাট হলঘরে, চেক-ইন কাউন্টারের সামনে। 

জেট এয়ারওয়েজের সব ফ্লাইটের চেক-ইনের লোকজন একই লাইনে দাঁড়ানো—ঢাকা, লন্ডন, দুবাই, সব একসঙ্গে। আমি মোটামুটি লম্বা এক লাইনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েছি। আমার সামনে দুই প্রবীণ ইউরোপিয়ান ভদ্রলোক, দুজনের হাতেই জার্মানির পাসপোর্ট। তাদের সামনে ভারতীয় করপোরেট এক্সিকিউটিভদের একটা সাতজনের দল। সেই দলের একটা বস আছে, আমি দলটার দিকে একঝলক তাকিয়েই বুঝে গেছি যে ওই লোকই এদের সবার বস, তার হাতে অসীম ক্ষমতা। তার চারপাশের সবাই কেমন কাঁধ ঝুঁকিয়ে, দাঁত বের করা এক হাসির আচরণ করে যাচ্ছেন তার সঙ্গে। একজন বারবার তার কাছ থেকে তার লুই ভিতঁ কেবিন লাগেজটা নিয়ে তাকে লাগেজ টানার ভার থেকে মুক্ত করতে চাইছেন, আর বস বারবারই বলছেন, ‘থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ, দ্যাটস ওকে, নট আ প্রবলেম, নট আ প্রবলেম।’ মোটামুটি অনেকক্ষণ ধরে আমি এদের দেখছি, এদের সমস্ত কথা — হিন্দি ও ইংরেজিতে, মূলত ইংরেজিতে—স্পষ্ট শুনতে ও বুঝতে পারছি। 

এরা সবাই এক পাওয়ার কোম্পানির লোক, পাওয়ার জেনারেশনের নতুন টেকনোলজি দেখতে লন্ডন হয়ে বার্লিন যাচ্ছেন, এদের বর্তমান প্রজেক্ট চলছে ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাঁচিতে। বস কোনো একটা কিছু বললেই বাকি ছয়-সাতজন সমানে হেসে উঠছেন। বস তার আস্থার ধ্রুবতা থেকে এই সাতসকালে টগবগ করে ফুটছেন নিজের অটলতার তাপে। ভালোই লাগছে দেখতে। তারপর, হঠাৎ বসের নিচের যে লোক, তিনি কী একটা কৌতুক করলেন বসকে নিয়ে, বসের সঙ্গে মন্দিরা নামের এক মেয়েকে জড়িয়ে, যে মেয়ে বোঝা গেল তাদের কোম্পানিকে সাপ্লাই দেয় বড় বড় টারবাইন। কৌতুকটা এমন যে, বস মেয়েটার সবকিছু লুটে নিয়েছে—’লুট লিয়া আপনে’—মেয়েটার শেষ বিলের টাকাপয়সা, মেয়েটার এই কোম্পানির সঙ্গে ভবিষ্যতে ব্যবসা করার আশা-ভরসা এবং ইঙ্গিতে আরও অন্য কিছু। ইঙ্গিত পরিষ্কার। বাকি পাঁচজন, যেহেতু তারা প্রত্যেক কথায় হাসছিল, লোকটার এই কথাতেও হেসে উঠল শরীর কাঁপিয়ে। ভুল করেছে ওরা, আমি ভাবলাম। হায়, ওরা এটাকেও বসেরই করা কোনো জোক ভেবেছে, কারণ এতক্ষণ ধরে বসের কথায় হাসতে হাসতে এবং বসের শরীরের এত কাছে দাঁড়িয়ে থেকে ওদের আর মাথা কাজ করছিল না। বিশেষ করে ওদের একজন, যে বারবার বসের কাছ থেকে তার কেবিন লাগেজ চাইছিল, সে তো বিশ্বাসঘাতকতাই করে বসল বসের সঙ্গে—অন্যরা যখন মোটামুটি সাধারণ হাসি হাসছে, সে তখন লুট লিয়া আপনে’ বলতে বলতে হো হো হো হাসিতে প্রায় এয়ারপোর্টের মেঝেতে পড়ে যাবার শরীরী ভঙ্গিমা করে বসল। আমি নিশ্চিত, এই সাতসকালে কাঁচা ঘুমের থেকে উঠে এয়ারপোর্টে এসে, বসের এতখানি সংস্পর্শে আসার উচ্ছলতায় সে বুঝতেই পারেনি যে জোকটা বস কাউকে নিয়ে করেননি, অন্য একজন বসকে নিয়ে করেছেন। সে হেসে প্রায় পড়ে যাচ্ছে, নিজের পেট চিপে ধরেছে, চেষ্টা করে যাচ্ছে বসকে খুশি করার, তার কৌতুকটা যে অনেক হাসির তা বোঝানোর। 

বস হঠাৎ মেঝেতে পায়ের একটা জোর টোকা দিলেন, কোমরের বেল্টের দুপাশে দুহাত রেখে সিমন বলিভারের মতো টানটান দাঁড়ালেন। সবাই থেমে গেল, তৎক্ষণাৎ, আর আমি দেখলাম ওই অধস্তনের দিকে—হঠাৎই সব বুঝতে পেরে যে এখন রক্তশূন্য মুখ হয়ে গেছে—বস তাকালেন মাত্র এক মুহূর্ত, ক্রূর এক চোখে, তার চোখের পাশের সাদাটুকু প্রকাশ্য করে, যে দৃষ্টির মধ্যে আর কোনো অভয়বাণী নেই, শুধু আছে পাষাণহৃদয় এক হুমকি যে, আমি তোমাকে সামান্য মশার মতো মাটিতে পিষে মারব, জুতো পরে নয়, স্রেফ খালি পায়েই, এবং আমার পায়ের নিচে তোমার যে রক্ত লেগে যাবে তা আমি আবার মুছব তোমার কপালেই 

আমি ওই দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম, তবে তা আমার অস্বস্তিভাব থেকে নয়, কারণ কোনো কিছুই জোরে বলা হয়নি এখানে, তাই অস্বস্তি বা কুণ্ঠার কিছু নেই এতে এক হিসেবে। আমি চোখ ফেরালাম বরং স্পষ্ট এক অপচ্ছায়াকে মুখোমুখি দেখে ফেলতে পারি, এই ভয়ে। আমি ভয় পেলাম ওই মানুষটার রুটিরুজি, তার সংসার, সংসারের সকাল-দুপুর-রাতের খাওয়া, বাচ্চার স্কুল, বউয়ের বাজারসদাই, পরনের জুতো, স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক শ্যানেল পারফিউম এবং তাদের বাড়ির গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে। অতিপ্রাকৃত এক পরিস্থিতি। আমার সামনের দুই জার্মান কিছুই বোঝেনি, তারা ভালোই আছে, সাতজনের দলটা এখন একদম সেই দাগের কাছে যেখান থেকে অপেক্ষমাণ ওই সাতকে কাউন্টারে কাউন্টারে ডিস্ট্রিবিউট করা হবে। আধামৃত লোকটা এখন পুরো দলের সবার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে আছে, বসেরটাসহ, আবার দাগের ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীর আদেশমতো সবার পাসপোর্ট যার যার হাতে সে ফিরিয়ে দিচ্ছে এবার। তার চোখ দেখেই বুঝলাম, অচিন্তনীয় এক খিদে পেয়েছে তার, এই খিদের কিছুই সমসাময়িক নয়, সবটা অনাদিকালের—হয় গোগ্রাসে খাও, না হয় তো এমন এক চিৎকার দিয়ে ওঠো যাতে করে এই বিশাল শক্তপোক্ত এয়ারপোর্ট এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে থেকে পরের মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে একটার পর একটা তার বিম, ফলস সিলিং, বিদ্যুৎ-বাতি ও দিকনির্দেশক চিহ্নগুলো নিয়ে। বস এখন খুবই শান্ত ও কর্মকুশল ভঙ্গিতে কথা বলছেন কোপেনহেগেনের টিভোলি গার্ডেনস থিম পার্ক প্রসঙ্গে, সবাই শুনছে তা, একমাত্র ওই লোকটা ছাড়া, কারণ থিম পার্কের রোলার কোস্টারের গল্প তার এত পছন্দ যে সে এখন ওই গল্প একেবারেই মাথায় নিতে পারছে না প্রচণ্ড অনুরাগ থেকে। তার অধঃপতিত চেহারাটার দিকে পেছন ফিরে আরেকবার তাকিয়ে, ইতিহাসের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত মানুষের বারবার কারণে-অকারণে সমাজবিরুদ্ধ হওয়ার ঝোঁকের কথা চিন্তা করে, আমি পা বাড়ালাম ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে। 

এরপর একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। শিঙাড়া, সিঙ্গেল শট এসপ্রেসো ও পানির অর্ডার দিলাম। আমার ফ্লাইট 9W-276 ছাড়তে এখনো পঞ্চাশ মিনিট বাকি দেখলাম এয়ারপোর্টের ভেতরেই কী সুন্দর বাগানবিলাস বনসাই লাগানো হয়েছে, টবে। ওরা যতই বলুক যে বনসাই কোনোভাবে গাছকে বামন বানানো নয়, বনসাই হচ্ছে এর দর্শককে অনুধ্যান বা গভীরতর চিন্তায় ঢোকানোর মাধ্যম, চাষির কৌশলী, নিখাদ ও সৃষ্টিশীল শ্রমের স্মারক, আমি ততই বনসাই দেখলে ভাবি এটা বামন গাছ, এর গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ঘটানো হয়েছে বুদ্ধি করে, না খাইয়ে রেখে, একে ‘স্টান্টেড’ করে দিয়ে কিংবা—চাষির ধূর্ত বুদ্ধির দোষ যদি না-ও বা দিই তো— পরিবেশের স্ট্রেস নিতে গিয়ে এ গাছকে যে হরমোন তৈরি করতে হয়েছে, তার আধিক্য ঘটানোর মাধ্যমে। গাছের হরমোন তার টিস্যুদের কাছে যে সিগন্যাল পাঠায় তার প্রত্যুত্তরে গাছের কোষ বিভাজন ঘটে দেরি করে, এবং কোষের দৈর্ঘ্য বাড়া বন্ধ হয়ে যায়। পুরোটাই শোকব্যঞ্জক, বিষাদে ভরা। এক বিশাল বটগাছ যখন মাত্র দুই ফুট উচ্চতায় তার বয়সের সব প্রকাশই দেখিয়ে চলে, সেটার মধ্যে নিষ্ঠুরতা থাকে অবশ্যই, এবং ঠিক সে কারণে, পাশবিকতা ও করুণাহীনতা আছে বলেই, বনসাই আমাদের এত প্রিয় হয়ে থাকে। 

আমি ভালো লাগা থেকে, যদিও প্রসন্নমনে নয়, দেখতে লাগলাম বাগানবিলাসের বনসাইগুলো, কমপক্ষে বিশটা হবে। একেকটাতে ফুটেছে একেক রঙের ফুল-মেরুন, লাল, গোলাপি, কমলা, হলুদ, সাদা, খয়েরি, এমনকি একই থোকায় বিভিন্ন রঙের ফুলও রয়েছে। এরা বোগেনভিলিয়া ভেরিগেটা নয়, এরা বোগেনভিলিয়া গ্লাবরা, ফুলগুলো দেখতে তাই বেশি রকম লাগছে যেন কাগজ দিয়ে বানানো। নাবিক অ্যান্টনি ডি বোগেনভিলের চেহারাটা একদিন, সময়-সুযোগমতো, ইন্টারনেটে দেখে নিতে হবে—কথাটা আমি লিখে রাখলাম আমার ছোট ‘জার্নাল’ নামের নোটবুকের পাতায়। 

কফি শেষ করে, শিঙাড়া না খেয়েই, আমি হাঁটতে লাগলাম এক কিনারার দিকে, যেখানে কাচের এক দরজার ওপাশে বাকি ইন্টেরিয়রের ডিজাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমার অনুমান যে অন্য আরও ফুলের টব থাকবে। কিন্তু না, ওখানে যেতে দেখা গেল টব নয়, পুরো দেয়ালের সামনে একটা ছোট পানির কৃত্রিম হ্রদ বানানো হয়েছে, এবং তার চারপাশজুড়ে শুধুই বিভিন্ন রং ও শেপের মর্নিংগ্লোরি ফুল। চমৎকার। ওদের আলোয় আলো হয়ে আছে গাছগুলো—বর্শার ফলার মতো সবুজ পাতা, তার মধ্যে মধ্যে মাইকের মতো ফুটে আছে ফুলেরা, যেন তারা ঘোষণা দেবে অনেক হাজার অ্যাম্পিয়ারে যে পৃথিবীতে তেমন কোনো ভুল হয়নি কিছু, শিগগিরই সবটা ঠিক করে নেওয়া হবে। মাইকের কেন্দ্র অংশে দেখলাম সাদা আভা নিয়ে ঘোষণার কেন্দ্রটাই যেন মিলিয়ে গেছে দিগন্তের ওপারে। লাল বেগুনি রং পাপড়ির কিনারে সাদা বর্ডার টানা কর্নেল জাতের মর্নিংগ্লোরিও দেখলাম আমার হাতের নাগালের ওপাশে। খুব ইচ্ছা ছিল ওদের ছুঁয়ে দেখার, কিন্তু আমার ও কর্নেল জাতগুলোর মধ্যে যে ছোট কৃত্রিম হ্রদের পানি। 

মনে পড়ল আমার নেপালি বান্ধবী, গানপাগল সুরভি ছেত্রির কথা। সে এখানে থাকলে নিশ্চয়ই বলত যে, ‘জানো তো, ওয়েসিসের একটা অ্যালবামের নাম হোয়াটস দ্য স্টোরি, মর্নিংগ্লোরি? ওদের কাছে আজকের স্টোরিটা কী জিজ্ঞেস করতে যাব, তখন মনে পড়ল একবার ফুল দিয়েই মরে যায় এই গাছ এবং এর ভোরের ফুল দুপুর বারোটা-একটা নাগাদ শুকিয়ে শূন্য হয়ে যায়। হাহ্। ঠিক এ সময় শুনলাম এয়ারপোর্টের ধ্বনিবহুল অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেমে হিন্দি ও ইংরেজিতে ঘোষণা করা হচ্ছে আমার বিষয়ে : ‘প্যাসেঞ্জার [আমার নাম ট্রাভেলিং বাই জেট এয়ারওয়েজ 9W-276 ফ্লাইট টু ঢাকা প্লিজ রিপোর্ট টু ইওর গেট ইমিডিয়েটলি। উই আর ক্লোজিং দ্য গেট ইন থ্রি মিনিটস টাইম।’ এসব ঘোষণা সব এয়ারপোর্টেই কমবেশি করা হয় আমাকে নিয়ে। ব্যস্ত না হয়ে কিংবা না দৌড়ে, শুধু একটু জোরে হেঁটে, অন্তত তিনবার পেছন ফিরে মর্নিংগ্লোরিদের ওই অনতিকালীন লাবণ্যচঞ্চলতা দেখতে দেখতে আমি হাজির হলাম আমার গেটে, ভীষণ হাঁপাচ্ছি তখন। 

ইভান তুর্গেনেভ। ইভান তুর্গেনেভের আ স্পোর্টসম্যান’স নোটবুক, ভিন্ন অনুবাদে স্কেচেস ফ্রম আ হান্টারস অ্যালবাম। বিষণ্ন, বুক চাপড়ানো মুহূর্তগুলোতে কিছুটা হলেও জীবনের প্রতি হ্যাঁ-বোধকতা টিকিয়ে রাখার জন্য এ বই পড়ার চেয়ে বড় ওষুধ আর সম্ভবত নেই। ঈর্ষা থেকে আসা অসন্তোষ, রুটিরুজির অনিশ্চয়তা থেকে আসা উদ্বেগ, অন্য মানুষের অনুদারতা থেকে আসা পীড়া, এমনকি খোদা দেখা দিচ্ছেন না বা কথা বলছেন না বলে জন্ম নেওয়া অভিমান এবং কেঁদে ফেলে হালকা হওয়া যাচ্ছে না, উল্টো ক্রোধ ও মনোভার বেড়েই চলেছে—মনের এমন যতগুলো বিরাগ-বিরূপ অবস্থা রয়েছে, তার যেকোনোটাতে, সব কটিতে, তুর্গেনেভের এ বই নতুন আলো ফেলতে পারে মেঘ করে আসা মনের ওপর। আমাজন কিন্ডলে বইটা খুললাম প্লেনের সিটে খাড়া হয়ে বসে। কারণ বেশি হেলান দিয়ে বসার আমার উপায় নেই, মেরুদণ্ডের ডিস্কের সমস্যা, লোয়ার ব্যাক পেইন। 

ইভান তুর্গেনেভের ছোটগল্প ‘বেঝিন তৃণপ্রান্তর’ : 

জুলাইয়ের সুন্দর একদিন, ঠিক তেমন একদিন যা আসে কেবল একটানা সুন্দর আবহাওয়ার অনেকগুলো দিনের শেষে। একদম ভোর থেকে আকাশ স্বচ্ছ; সূর্যের ওঠার মধ্যে কোনো আগুনের শিখা নেই, কেবল আছে মৃদু এক আরক্তিম আভা। শ্বাসরুদ্ধকর খরার সময়ে সূর্য যেমন হয়, আগুন ঝরানো, গরম আগুনের লাল গোল, তেমন না, আবার ঝড়ের আগের অন্ধকার লালও না, বরং এক উজ্জ্বল ও বন্ধুবৎসল দীপ্তি ছড়িয়ে সূর্যটা শান্ত এক ভঙ্গিতে ওপরে উঠে যেতে লাগল দীর্ঘ ও সরু মেঘের পেছন দিয়ে, ঝলক দিল একটুখানিকের জন্য, তারপর আবার নিজেকে লুকিয়ে ফেলল লাইলাকরং কুয়াশার আড়ালে। ছড়িয়ে পড়তে থাকা মেঘেদের পেলব ওপর দিকটা ঝিকমিক করে উঠছে তাদের ছোট ছোট সাপসদৃশ ঔজ্জ্বল্যে—এই উজ্জ্বলতা পালিশ করা রুপোর উজ্জ্বলতা। কিন্তু এখন আবার দ্যাখো সূর্যের নাচতে থাকা রশ্মি ঠিকরে বেরোচ্ছে-আর উচ্ছলতা নিয়ে, মহীয়ান ভঙ্গিমায়, যেনবা ডানায় ভর দিয়ে উঠছে, সেভাবে জেগে উঠল এই বিশাল জ্যোতিষ্ক। 

অবর্ণনীয় এক চিত্তপ্রসন্নতা নিয়ে পড়তে লাগলাম আমি, পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেলাম নিজেকে অবাক করে দিয়ে। কারণ, কোনো জার্নিতে ঘুম হয় না আমার, সাধারণত তা যত বড় জার্নিই হোক। স্বপ্নে দেখলাম একটা চুনিকণ্ঠী পাখি—সাইবেরিয়ান রুবিথ্রোট—স্থির উড়ে যাচ্ছে প্লেনের জানালার পাশ দিয়ে, তার জায়গা পরিবর্তন হচ্ছে না একটুও, যেন জানালা থেকে সামান্য দূরে আকাশের গায়ে লেপটে আছে সে, তার গলার কাছের লালমণি রং যেন তার রং নয়, আকাশেরই একটা রং; এবং অনেক দূর থেকে—এটা স্বপ্নে ঘটল বিরতি দিয়ে দিয়ে—একটা ভুবনচিল দেখলাম উড়ে আসছে তার দিকে, একটা দুই ফুটের শিকারি পাখি পৌঁছে যাচ্ছে এক ছয় ইঞ্চি পাখির দিকে। আমি স্বপ্নের মধ্যেই নিশ্চিত হলাম যে চিলটা চুনিকণ্ঠীকে কখনোই ধরতে পারবে না, তাদের মাঝখানের দূরত্ব কখনোই মিটবে না, তবু—কিছুটা পরিতুষ্টি থেকেই হয়তো—আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম চুনিকণ্ঠীকে সাবধান করে দেওয়ার জন্য। এয়ারহোস্টেস ছুটে এলেন আমার দিকে, সামনে-পেছনে ও পাশের সব যাত্রী হইহই করে উঠলেন কী হয়েছে ভেবে। সবার উদ্দেশে ‘সরি’ বলতে হলো আমাকে। অসুবিধা নেই, এমন হতেই পারে। সবার মনের অনেক স্তরে অনেক কিছু আছে, এবং ঘুম সব সময়ই এক অবিশ্বস্ত সঙ্গী—ঘুমের মধ্যে মানুষ মানুষকে মেরে ফেলার উদাহরণ যেমন আছে, তেমন ঘুমে মৃত্যুকে ঘনিয়ে আসতে দেখে সাময়িক হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। 

মেমোয়ারস অব হাদ্রিয়ান-এ ঘুম নিয়ে অনেক কথা বলেছেন রোমান সম্রাট হাদ্রিয়ান (জন্ম ২৪ জানুয়ারি, ৭৬ এডি-মৃত্যু ১০ জুলাই, ১৩৮ এডি)। তার কোনোটাই মনে পড়ল না আমার। এতগুলো লোকের উৎসুক দৃষ্টি এবং কিছু মিহি গলার বাঁকা হাসি আমাকে সব ভুলিয়ে দিয়েছে। স্মৃতিতে এল শুধু এটুকুই যে বৃদ্ধ বয়সে হাদ্রিয়ান বলছেন, ‘সন্ধ্যার দিকে কুয়াশা যখন মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন যেমন আর্কিপেলাগোতে পাল তোলা নাবিক দূরে একটু একটু করে দেখতে পায় মাটি, ঠিক তেমন আমি হাদ্রিয়ান, ট্রাজানের পরে ক্ষমতায় আসা রোমান সম্রাট, আমার দৃষ্টি ও বোধ দিয়ে দেখতে শুরু করেছি আমার নিজের মৃত্যুর মুখচ্ছবি।’ সাইবেরিয়ান রুবিথ্রোটটা একবার, মাত্র একবার, পেছনে ফিরলে সেই একই জিনিস দেখবে যার কথা বলেছেন হাদ্রিয়ান। 

.

ঢাকা এয়ারপোর্টে নামতেই বুকের মধ্যে খচ করে উঠল। শেষ আশা যেটুকু ছিল যে আমি মুম্বাই ঘাটকোপারের সিমরান ট্রাভেলস অফিসে গিয়ে আইয়ারকে খুঁজে বের করব, তার সঙ্গে এক বেলা খাব এবং তাকে বেশ কিছু টাকা বকশিশ দেওয়ার পর তার মুখের হাসিটা দেখব আর এভাবেই বন্ধ করব আমার জীবনের আইয়ার অধ্যায়, তা তিরোহিত হলো এয়ারপোর্টের দেয়ালে বাংলাদেশের এক ব্যাংকের বড় বিলবোর্ড দেখে। তার মানে, আমার ইন্ডিয়া শেষ, তার মানে আমি বাংলাদেশে। আর আমার পক্ষে এই নির্দিষ্ট ঘড়ির কাঁটা ঘোরাতে পারার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দীর্ঘ এক সময়ের জন্য নেই। পরে যদি আবার কোনো দিন মুম্বাই যাই, তখন হয়তো আইয়ারের কথা আমার মনেও থাকবে না, আইয়ারেরও মনে থাকবে না আমাকে, কিংবা হয়তো নির্ঘুম ওই মানুষটা তত দিনে দেখা যাবে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে ফেলেছেন কোনো এক্সপ্রেসওয়েতে তার ট্যাক্সি নিয়ে চলন্ত ট্রাকের নিচে আছড়ে পড়ে, যেমন তিনি বলছিলেন গতকালই, বলছিলেন (আমার মনে পড়ল তিনি সত্যি এমন কিছু বলেছিলেন) পৃথিবীতে বাঁচার মধ্যে যে ধোঁকাবাজি আছে তার তিনি একদিন শেষ করবেন ওভাবেই। 

‘অ্যারাইভাল’ বিল্ডিংয়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছি, দেখলাম একটা ভিড়মতো। দু-চারজনকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরের বৃত্তের মধ্যে ঢুকে গেলাম। চারজন চীনা নাগরিক, হংকং বা কোরিয়ারও হতে পারে, আমি নিশ্চিত নই, দেখলাম পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে কোনো চোরাচালানি বা অমন কোনো অপরাধে এবং পাঁচ-ছয়জন পুলিশ ও কাস্টমস কর্মকর্তা ওদের নিয়ে টানাটানি করছেন। প্লেন থেকে নামামাত্র ওদের ধরেছেন বাংলাদেশের এরা, তার মানে আগে থেকেই ওদের ব্যাপারে কোনো খবর ছিল পুলিশের কাছে। আমার অনেক জানতে ইচ্ছে করল, কী স্মাগলিং করছিল এরা? সোনা? কিডনি? ফরেন কারেন্সি? কিন্তু মনে হলো, যেটাই হোক না কেন, তাতে কিছুরই কোনো বড় হেরফের হয় না। ওরা ধরা পড়েছে এবং ওদের জীবন এখন বাংলাদেশের কোনো জঘন্য জেলখানায় ভয়ংকরতার মধ্য দিয়ে কাটবে, সেটাই বড় কথা। কিছুটা ধস্তাধস্তি দেখলাম, দেখলাম হঠাৎ গাটাগোট্টা শরীরের এক পুলিশ ইন্সপেক্টর এদের দলনেতাকে, দলনেতা বলেই মনে হলো চারজনের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা এই চীনাকে, প্রচণ্ড জোরে তার লাঠি দিয়ে পিঠ ও পাছার দিকে একটা বাড়ি মারলেন। হতভম্ব হয়ে গেল সে ও তার সঙ্গের বাকি তিনজন। একজন কান্না শুরু করল হাউমাউ করে, অন্য একজন সজোরে চিৎকার করা শুরু করল চীনা ভাষায়। ওদের জাপটে ধরে এবার হাঁটতে লাগলেন পুলিশ ও কাস্টমসের লোকেরা। 

একটা বিষয় লক্ষ করলাম যে ওদের চারজনেরই দাঁত অসম্ভব খারাপ-একজনের তো দাঁতই নেই, স্রেফ কালো কালো সুতোর মতো চিকন কিছু ঝুলছে মাড়ি থেকে, আর যে কিনা আমার হিসেবে দলনেতা, তারও সরু সরু দাঁত, ভাঙাচোরা, এবড়োখেবড়ো, কিন্তু কালো নয়, একদম হলুদ। ওর সঙ্গে থেমে থেমে বারবার কথা বলছেন এক পুলিশ, আমি হাঁটছি ঠিক পুলিশটার পেছনে এবং ওর হেঁটে যাওয়ার পুরো পথ ধরে টের পাচ্ছি মুখের দুর্গন্ধ। পুলিশ লোকটা যেমন নাকের কাছে হাত দিয়ে রেখেছেন, আমিও তেমন। ভাঙা দাঁত এগুলো, দাঁতের ট্রমা, তা থেকে জিনজিভাইটিস, পেরিওডোনটাইটিস। বাকি দুজনের দাঁতও দেখলাম ভয়ংকর ইনফেকটেড। এদের চারজনই হয়তো এমন এক গ্রাম, এমন এক কমিউনিটি থেকে এসেছে, যেখানের মানুষেরা একটা বিশেষ কিছু খায় বা চাবায়, হতে পারে কোনো নেশাদ্রব্য বা আমাদের নিরীহ পানের মতো কিছু। দাঁতের রং যা-ই হোক না কেন, চারজনেরই দেখলাম—কারণ, সব বাদ দিয়ে আমি কেবল ওদের দাঁতগুলোই লক্ষ করছিলাম—মাড়ি গাঢ় লাল, রক্ত জমে আছে যেন, আর ফুলে আছে বিতিকিচ্ছিরি রকমে। আমার মনে হলো, জেলখানার জীবন কাটানোর কষ্ট থেকে নয়, এ চারজনই মারা পড়বে স্রেফ দাঁতের অসুখে। 

‘অ্যারাইভাল’ হলে ঢোকার এসকেলেটরে চড়তে চড়তে—চীনা দলটা এগিয়ে গেল অন্য পথে, সামনের দিকে, সেই সঙ্গে মানুষের ভিড়টাও—আমার মনে পড়ল ছোটবেলার এক স্মৃতি। বরিশালে আমাদের বাসার উঠানে বেদেনিরা বসত দল বেঁধে, তারা দাঁতের পোকা বের করত যে কারও দাঁত থেকেই, আর অসম্ভব বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে আমি ভাবতাম বেদেনিদের সঙ্গে লুকিয়ে চলে যাওয়ার কথা, যেন ওদের মতোই দাঁতের পোকা বিশেষজ্ঞ হতে পারি একদিন। কোথায় চলে গেছে সেসব দিন? টানেলের ভেতরে? যে টানেলের দুপাশের দেয়ালে চুনের দাগ মাখানো, দুপাশই ভরে আছে অগুনতি হিজল ফুলের কলিতে এবং টানেলের দেয়াল চুইয়ে কুয়োর পানি পড়ছে বলে দেয়ালগুলো স্যাঁতসেঁতে, ভেজা এবং সেই ভেজার মধ্যে বসে আছে অনেক বাবুই, অনেক হরিয়াল, অনেক ধঞ্চেগাছ, অনেক বাসকপাতা আর ছোট ছোট নির্বিষ, বন্ধুবৎসল সাপের বাচ্চা? পুরো টানেলটাকে এবার আমার মনে হলো—তখন আমি ইমিগ্রেশনের লাইনের একদম পুরোভাগে, আমার ডাক পড়বে এখনই, এ রকম এক সময়ে—যে ওটা টানেল নয় কোনো, আমি যাকে টানেল ভেবেছি, সে হোগলাপাতার এক বন, ঘন সবুজ, একটুও বাতাস নেই কোথায়ও, শুধু হোগলাগাছগুলোয় খেলে যাচ্ছে সূর্যের তেরছা আলো, তাকানো যাচ্ছে না সেদিকে একটুও, চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আর ওদের গা ঘেঁষে উড়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে একটা নয়, দুটো গ্রেট এগরেট, বড় বগা, স্থির দাঁড়িয়ে থাকবে ওরা যতক্ষণ না মাছগুলো ওদের গাছের কাণ্ড ভেবে ভুল করে পায়ের কাছে এসে পড়ছে। সামান্য, বুদ্ধিহীন পাখি, সে-ও কিনা বোকা বানায় কাউকে না কাউকে; প্রতারণা করে, ঠকায়, খেয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে ঠকায়; আর তার বিশাল ঠোঁটের হঠাৎ ছোবলের নিচে অসহায়ের মতো, কণ্ঠাগত প্রাণ, কাঁপতে থাকে আমার শৈশব। ইমিগ্রেশনের সুদর্শন এক তরুণ পুলিশ অফিসার আমাকে বললেন, ‘আসুন’। আমি শৈশব থেকে জেগে আমার চল্লিশের শেষের কোঠায় পা রাখলাম আগস্টের বাংলাদেশে ঢুকব বলে। 

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *