১৬. সখেদ

সখেদ

কতোক্ষণ ধরে সে মূর্তির মতো স্থির হয়ে আছে নিজেও জানে না। কাজটা করার আগে অনেক সময়ই তাকে এই কষ্টটুকু করতে হয়। একদম ঝিম মেরে পড়ে থাকে, কেউ টেরই পায় না এক আদমসন্তান ঘাপটি মেরে আছে তাদের আশেপাশে। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। কিন্তু আজ কেন জানি তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত বলে হয়তো।

আলগোছে সে ঢোক গিলল। টের পেলো গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। বেশি জল পান করলে প্রস্রাবের বেগ পাবে, তাই ইচ্ছে করেই কম পান করেছে এখানে আসার আগে।

এখন সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত। ঐ এক চৌকিদারকে বাদ দিলে সুনসান কবরস্তানে সে ছাড়া জীবিত কেউ নেই। হাড্ডিসর্বস্ব লোকটা কবরস্তানের প্রবেশপথের পাশে ছোট্ট টিনের ছাউনির নিচে বসে বিড়ি ফুকে যাচ্ছে। অন্ধকারে তার আবছায়া অবয়ব দেখা গেলেও স্পষ্ট নয়। দূর থেকে বিড়ির আগুনটা দেখাচ্ছে ছোট্ট লালবিন্দুর মতো, বিড়িতে টান পড়তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে সেটা।

গাছের উপর থেকে খলিলুল্লাহ দেখতে পাচ্ছে চৌকিদার একের পর এক বিড়ি শেষ করে যাচ্ছে, থামার কোন লক্ষণই নেই। লোকটার বিড়িপ্রীতি দেখে তার মেজাজ বিগড়ে গেল। এত বিড়ি খেলে তো পাদ দিলেও বিড়ির গন্ধ বের হবে!

কবরস্তানের সুপরিচিত সেই গন্ধটাও টের পেলো খলিলুল্লাহ। দূরে কোথাও আগরবাতি জ্বলছে। কোন কবর থেকে ওটা ভেসে আছে সে জানে। সন্ধ্যার পর নিজে জ্বালিয়ে গেছে সদ্য গোর দেয়া একটি লাশের নিকটাত্মীয় সেজে। কবরটা দেয়া হয়েছে বিকেলে। তো, মৃতের নিকটজনেরা শোকে কাতর, কবরে যে আগরবাতি জ্বালিয়ে দেয়া দরকার, তাদের কি সেই খেয়াল আছে?

যাক, আত্মীয়স্বজনদের একজন ভুলটা বুঝতে পেরে সন্ধ্যার পর পর যখন কবরস্তানে এসেছিল চৌকিদার তখন নিজের ঝুপড়ি ঘরে বসে ঝিমুচ্ছে। খলিলুল্লাহকে ঢুকতে দেখেছে সে, আগরবাতি জ্বালাতেও হয়তো দেখে থাকবে কিন্তু বের হয়ে যেতে দেখেনি। কবরস্তান তো পার্ক নয় যে, মানুষজন ঘুরে বেড়াবে। ভর সন্ধ্যায় একজন মানুষ প্রয়োজন ছাড়া এক মুহূর্তও এখানে থাকবে না। লোকটা ধরেই নিয়েছে আগরবাতি নিয়ে আসা মৃতের আত্মীয়টি চলে গেছে অনেক আগে।

কিন্তু খলিলুল্লাহ আদৌ কবরস্তান থেকে বের হয়নি। চৌকিদারের অলক্ষ্যে বড় একটা গাছে উঠে পড়ে সে। সেই থেকে গাছের উপরে বসে অপেক্ষা করে যাচ্ছে। ভেবেছিল, প্রত্যন্ত গ্রামের এই কবরস্তানের পাহারাদার সন্ধ্যার পর পর নিজের ঘরে গিয়ে আরাম করে ঘুমাবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে লোকটা নিশাচর, সন্ধ্যা গাঢ় হবার পর কবরস্তানের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছে। কিছুক্ষণ। খলিলুল্লাহর মাথায় আসে না, কবরস্তানে টহল দেবার কী দরকার। এখানে কি মানুষ সোনাদানা রেখে যায়? কী এমন জিনিস আছে যে, সন্ধ্যার পরও টহল দিতে হবে? এখানে যে জিনিস আছে তার মূল্য তো বোঝে কেবল সে!

তবে কি তার খবরটা এখানেও পৌঁছে গেছে?

না। অসম্ভব।

কালিন্দী নামের এই গ্রামে পত্রিকা পৌঁছায় কি না সন্দেহ। আর পৌঁছালেও পড়ার মতো মানুষজন খুব বেশি নেই-এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। এই কবরস্তানের আশেপাশে যে গ্রামগুলো আছে, সেখানে পত্রিকা পড়ে উদ্বিগ্ন হবার মতো কেউ থাকারও কথা নয়। দুয়েকজন যদি খলিলুল্লাহর খবরটা পড়েও থাকে, মনে হয় না এ নিয়ে মাথা ঘামাবে। তাদের গ্রাম থেকে বহু দূরের এক শহরে খলিলুল্লাহ নামে একজন কবরস্তানে ঢুকে কবর থেকে লাশ তুলে….

একটা শব্দে তার চিন্তায় ছেদ পড়ল। আবছা আলোয় দেখতে পেলো চৌকিদার উঠে দাঁড়িয়েছে এখন, আড়মোড়া ভাঙছে সে। বসে থাকতে থাকতে লোকটার হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে গেছে হয়তো। খলিলুল্লাহর রক্ত হিম করে দিয়ে লোকটা এবার এগিয়ে আসতে থাকলো গাছটার দিকে। বড় ডালটা শক্ত করে ধরে নিঃশাস স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো যাতে কোন রকম শব্দ না হয়। চৌকিদারের ভাবসাব বুঝতে পারছে না। সে কি টের পেয়ে গেল?

ঠিক গাছের নিচে এসে দাঁড়ালো লোকটা। উপরের দিকে না তাকালেও তার ভাবভঙ্গি ভালো ঠেকছে না খলিলুল্লাহর কাছে। যদি তাকে গাছের উপরে লুকিয়ে থাকতে দেখে ফেলে তাহলে কী করবে-আগেভাগেই ঠিক করে নিলো সে। একে শায়েস্তা করা তার পক্ষে কঠিন কিছু হবে না-নিজেকে আশ্বস্ত করলো খলিল। গাছ থেকে এক লাফ দিয়ে ঘাড় মটকে দিতে পারবে অনায়াসে। কিন্তু তাতে করে আজকের শ্রমটাও পণ্ড হয়ে যাবে।

না।

নিজেকে শুধরে দিলো। পণ্ড হবার প্রশ্নই আসে না। বরং দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছেটা বাস্তবায়ন করার সুযোগ চলে আসতে পারে!

ফর্‌-ফর্‌ করে একটা শব্দ আবারও খলিলের ভাবনায় বিঘ্ন ঘটালো।

চৌকিদার গাছের নিচে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে শুরু করেছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সে। কিন্তু কাজ শেষে যখন আবারও ছাউনির নিচে গিয়ে বসলো তখন মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল তার। ভেবেছিল লোকটা ঘুমানোর আগে প্রস্রাব করে নিচ্ছে, এরপর সোজা চলে যাবে ঝুপড়ি ঘরে, ভোরের আগে আর ঘুম থেকে উঠবে না।

আরও বেশি অধৈর্য হয়ে উঠল সে। ক্ষিধের চোটে তার হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে জড়িয়ে ধরে থাকা গাছের ডালটা কামড়ে খেয়ে ফেলতে!

কিন্তু এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। গাছের ডালটা দু হাতে শক্ত করে ধরে চোখ বন্ধ করে রাখলো কিছুক্ষণ। সে জানে, চোখ খোলা রেখে অপেক্ষা করা বেশি কষ্টকর। একটু তন্দ্রার মধ্যে থাকলে অপেক্ষার সময় দ্রুত চলে যায়।

চোখ বন্ধ করতেই খলিলের মাথায় নানান ভাবনা এসে জড়ো হলো। তাকে নিয়ে তোলপাড় চলছে শহরে। পত্রিকাগুলো একটু বেশিই হাউকাউ করছে এ নিয়ে। মানুষজনেরও খেয়েদেয়ে কাজ নেই। তারা পত্রিকা পড়বে, আবার খবর পড়ে হাউকাউ করবে, চায়ের দোকানে বসে গালগল্প করবে এসব নিয়ে।

সবগুলো বেকার! একটারও কাজ নেই। পত্রিকা কি পড়ার মতো কিছু? ওটা হলো ঠোঙা বানানোর জিনিস! আরে বাবা, লাশ তো লাশই। এতই যদি লাশের প্রতি দরদ থাকে তাহলে মাটি দিয়ে চলে যাস কেন, বাসায় রেখে দিতে পারিস না?! সেই তো কবর দিয়ে চলে যাস, এরপর কোন খোঁজ থাকে? ক দিনের মধ্যেই পচে-গলে মাটির সাথে মিশে যায় ওগুলো। কোন কাজেই আসে না।

খলিলের আরও মনে পড়ে যায় কীভাবে কিশোর বয়সে কবরস্তানে কাজ করার সময় গোরখোদক আলীম মিয়াকে তরুণী আর কম বয়সি নারী লাশের সাথে সঙ্গম করতে দেখে ফেলেছিল। তারপর উঠতি যৌবনের প্রচণ্ড তাড়নায় সে-ও একদিন আলীম মিয়ার পথ অনুসরণ করতে শুরু করে; অল্পদিনের মধ্যে আসক্তও হয়ে পড়ে। সঙ্গমের সময় তীব্র উত্তেজনায় লাশের শরীরে কামড় দিতো সে। এভাবে লাশের মাংসের স্বাদ লাভ করে। তারপর কবে থেকে যে লাশের মাংস খেতে শুরু করে দেয় সে কথা ঠিক করে বলতে পারবে না।

এক ঘরে দুই পীর থাকে না-তাদের দুজনের বেলায়ও এ কথা ফলেছিল। এক তরুণী লাশ দাফনের পর পর তাদের দুজনেরই সম্ভোগের ইচ্ছে জেগে ওঠে। কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠ আলীম মিয়াকে ডিঙিয়ে ও কাজ করা তার। পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। তারপরও তক্কে তক্কে ছিল খলিল। গভীর রাতে ঐ তরুণীর কবরের দিকে আলীম মিয়াকে যেতে দেখে খলিলের খুব ঈর্ষা জেগে ওঠে। যেন তার মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে ঐ বুড়ো গোরখোদক। প্রচণ্ড ক্রোধে অন্ধ হয়ে যায় সে।

কবরের ভেতরে সেই লাশের সাথে সঙ্গমরত অবস্থায় গোরখোদককে গলা। টিপে হত্যা করে ফেলে। কবরের গর্তটা আবারও মাটি দিয়ে ভরাট করে দিলে চিরতরের জন্য আলীম মিয়া নামের লোকটি নিখোঁজদের তালিকায় চলে যায়। একজন গোরখোদকের লাপাত্তা হওয়া নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায়নি কেউ।

আলীম মিয়ার অনুপস্থিতিতে পুরো কবরস্তানে একচেটিয়া রাজত্ব কায়েম করে ফেলে খলিল। একদিন পোস্টমর্টেম করা বেওয়ারিশ এক তরুণীর সাথে সঙ্গম করতে গিয়ে লাশের কাটা বুকের সেলাই খুলে যায়, বের হয়ে আসে তরুণীর হৃদপিণ্ডটা। প্রচণ্ড ক্ষুধায় ছিল বলে লাশের কলিজা খেয়ে ফেলে সে। তার কাছে খুবই উপাদেয় মনে হয়-সেই থেকে লাশের কলিজা খাওয়ার অভ্যেস হয়ে যায় তার।

চারপাশ কাঁপিয়ে কেমন অদ্ভুত এক শব্দ হলো!

চোখ খুলে গেল খলিলের, দেখতে পেলো কুচকুচে রাত নেমেছে। বিরাণ কবরস্তানে কেউ নেই। কিছুক্ষণ লাগলো তার চোখ সয়ে আসতে। চৌকিদার কখন নিজের ঝুপড়ি ঘরে চলে গেছে টেরই পায়নি। বুঝতে পারলো, এতোক্ষণ ঘুমে ঢলে পড়েছিল সে। হঠাৎ টের পেলো কবরস্তানের সুপরিচিত গন্ধটা তীব্র ঠেকছে। যেন শত শত আগরবাতি জ্বালানো হয়েছে!

এত রাতে এখানে কে আসবে আগরবাতি জ্বালাতে?!

খলিলের একটু ভয় হলো। ভালো করে অন্ধকারের দিকে তাকালো সে, কিন্তু একটাও ছোট লালবিন্দু চোখে পড়ল না। যদিও গন্ধের তীব্রতা বলে দিচ্ছে অনেকগুলো আগরবাতি জ্বলছে এখানে।

নিজের বুকে থুতু দিলো সে। ছোটবেলায় অন্য অনেকের মতো এভাবেই ভয় তাড়াতো। কাজটা করে আপন মনেই হেসে ফেলল। কবরস্তান নিয়ে সাধারণ মানুষজনের মধ্যে যে ভীতি কাজ করে তার মধ্যে সেরকম কোন কিছু নেই। দুনিয়াতে এমন কোন কবরস্তান নেই যেখানে একা থাকতে ভয় পাবে সে। ভালো করেই জানে, মৃতেরা কিছু করতে পারে না, জীবিত মানুষ হলো যতো সমস্যার মূলে! দুনিয়ার সবকিছু নিয়ে মাথা ঘামায় তারা। এমন কি মৃতদের নিয়েও! তাদের কারণেই খলিলুল্লাহকে শহর ছেড়ে এই অজপাড়াগায়ে চলে আসতে হয়েছে।

এখানে আসার পর ভেবেছিল পুরনো অভ্যেসটা বুঝি ছেড়েই দিতে হবে। কিন্তু এই কবরস্তানটি আবিস্কার করার পর তার লালসা আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। খুবই নির্জন জায়গায় কবরস্তানটি অবস্থিত। মাত্র একজন তালপাতার সেপাই-ঐ চৌকিদার-পাহারা দেয়। আশেপাশে কোন বসতিও নেই। চারপাশে ক্ষেতের পর ক্ষেত, ঝোঁপঝাঁড় আর জলাভূমি। জায়গাটা খুঁজে পাবার পর তিনদিন অপেক্ষা করেছে, অবশেষে আজ সুযোগটা চলে আসে।

পাশের গ্রামের একজন মারা গেলে তার জন্য গোর খোঁড়া হয় দুপুরের দিকে। আসরের নামাজের পরই সেই লাশ গোর দেয়া হয়। গোর দিতে আসা লোকজনের সাথে মিশে যায় সে। তাদের কথাবার্তা শুনে বুঝেছে, বেশ অল্প বয়সি এক তরুণী মারা গেছে, বয়স বিশের কোঠায়ও পড়েনি। লোকজনের ফিসফাস থেকে আরও জানতে পেরেছে, গতরাতে মেয়েটা গলায় ফাঁস দিয়েছে প্রেমিকের কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে। কবরে লাশ নামানোর সময় উঁকি মেরে দেখেছে খলিল, মেয়েটা শুধু কম বয়সিই নয়, দেখতেও বেশ সুন্দর। লাশটা দেখার পর পরই পরিকল্পনা করে ফেলে সে।

কিন্তু এই মুহূর্তে কবরস্তানের পরিবেশ কেমনজানি ঠেকছে। পনেরো বছর বয়স থেকে কবরস্তানে কাজ শুরু করেছে খলিল, কখনও এতটা গা ছমছম অনুভূতি হয়নি। আশেপাশে ভালো করে তাকালো। অন্ধকারে কিছু দেখতে না পেলেও ঘাসের উপর দিয়ে কারো হেঁটে চলার শব্দ তার কানে আসছে!

তারপরই বুঝতে পারলো। এরকম শব্দ রাতের বেলায় কবরস্তানে হরহামেশাই শোনা যায়। অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, খাটাশ আর শেয়াল থাকে এসব গ্রাম্য কবরস্তানে। এমনকি শহরের যে কবরস্তানে দীর্ঘদিন কাজ করেছে সেখানেও বাঘডাশ আর শেয়ালের উপদ্রব ছিল।

চারপাশটা আরেকবার ভালো করে দেখে নিয়ে প্রায় নিঃশব্দে গাছ থেকে নেমে এলো সে। খাটাশ আর শেয়াল নিয়ে তার কোন দুর্ভাবনা নেই। ওদের সাথে সহাবস্থানেই বিশ্বাসী।

সন্ধ্যার পর যে আগরবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছিল সেটা নিভে গেছে বহু আগেই, তাই নতুন কবরটা কোথায় সেটা আন্দাজ করে এগিয়ে গেল খলিলুল্লাহ। পা টিপে টিপে বেড়ালের মতো নিঃশব্দে চলে এলো সেখানে। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল এবার। কোমর থেকে যেটা বের করে আনলো সেটা রাজমিস্ত্রিদের ব্যবহৃত কোণির মতো একটা জিনিস। সত্যি বলতে, এটা একটা কোণিই, তবে হাতলের সমকোণি অংশটা সোজা করে চাকুর মতো আকৃতি দিয়েছে কোমরে রাখার সুবিধার্থে। আর বহুমুখি ব্যবহারের জন্যে কোণির কোণগুলোও ধারালো করে নিয়েছে একটু। এই একটা অস্ত্রই তার শিকার কাজের জন্য যথেষ্ট।

কোণিটা সদ্য কবর দেয়া মাটির ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো সে। নতুন কবর বলে মাটি আলগা করতে কোন বেগই পেতে হলো না।

দশ মিনিট পর কবরের উপরের দিকে বেশ খানিকটা মাটি সরিয়ে বাশের চটি আর বাঁশের টুকরো সরিয়ে কবরটার ভেতরে ঢোকার মতো জায়গা বের করে নিতে পারলো। এর আগে সব সময় কবর থেকে লাশ তুলে কাজ সারলেও ধরা পড়ে যাবার পর থেকে কৌশল কিছুটা পাল্টে নিয়েছে। সবচেয়ে নিরাপদ আর উপদ্রবহীন কাজটাই করবে এখন। বুদ্ধিটা সে পেয়েছে একজনকে তরমুজ খেতে দেখে-তরমুজকেই পাত্র বানিয়ে খাচ্ছিল লোকটা!

বড়সর গর্তটা দিয়ে সোজা নেমে পড়ল কবরে। অন্ধকার তার জন্যে কোন সমস্যা তৈরি করবে না। যে কাজটা করবে সেটার জন্য আলোর দরকারও নেই। সদ্য গোর দেয়া লাশটার পা সরিয়ে একটু জায়গা করে নিয়ে বসে পড়ল খলিলুল্লাহ। কাফনের কাপড়টা সরিয়ে লাশের বুকটা উন্মোচিত করলো এবার। ভালো করেই জানে, অল্পবয়সি এক তরুণীর লাশ। মেয়েটা দেখতেও বেশ সুন্দর।

কুমারি!

খলিলের জিভে জল এসে পড়ল। কাজটা করার আগে একটু মওজ করার ইচ্ছে জেগেছে তার। কবরের ভেতরে এটা খুব অনায়াসেই করা যাবে। গাঢ় অন্ধকারে লাশের বুকে হাত রাখতেই আঁৎকে উঠল সে।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আবারও হাতড়ালো নিশ্চিত হবার জন্য। এবার পুরোপুরি ভিরমি খেলো।

একটা পুরুষ শুয়ে আছে কবরে! এটা কিভাবে সম্ভব?

পরক্ষণেই খলিল বুঝতে পারলো, অন্ধকারে হয়তো গুলিয়ে ফেলেছে, নেমে পড়েছে ভুল কবরে। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল তার। লাশটার বুকের চামড়ার ভাঁজ বলে দিচ্ছে হাড্ডিসার এক বুড়োই হবে। তারচেয়ে বড় কথা, এটা কয়েকদিনের পুরনো। পেটটা ফুলে আছে, পচা গন্ধ বের হচ্ছে ভকভক করে।

ধুর!

এই বুড়োকে শিকার বানানোর কোন ইচ্ছে তার নেই। এই কবরের পাশেই নিশ্চয় নতুন কবরটা আছে। অগত্যা ঠিক করলো, একটু কষ্ট করে হলেও পাশের কবরটা খুঁড়ে ভুলের মাশুল দেবে।

আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো সে। গর্ত দিয়ে মাথাটা বের করে তাকালো চারপাশে। যেমনটা আশা করেছিল, পুরো গোরস্তান সুনসান। চৌকিদারের ঝুপড়ি ঘর থেকেও কোন আলো আসছে না। বাতি নিভিয়ে ব্যাটা নিশ্চয় বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।

খলিল আস্তে করে দু-হাত বাইরে এনে মাটি আঁকড়ে ধরে শরীরটা তোলার চেষ্টা করতেই তার রক্ত জমে হিম হয়ে গেল।

কে জানি তার পা দুটো শক্ত করে ধরে রেখেছে! একটা চিৎকার বেরিয়ে আসছিল গলা দিয়ে, কিন্তু সেটা আটকাতে সমর্থ হলো। দম বন্ধ হয়ে গেছে তার। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। পরক্ষণেই মনে হলো, কাফনের কাপড়ের সাথে হয়তো পা-টা আটকে গেছে।

উদভ্রান্তের মতো পা-দুটো জোরে জোরে লাথি মেরে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু কোন লাভ হলো না। সে নিশ্চিত, নীচ থেকে কেউ শক্ত করে তার পা-দুটো ধরে রেখেছে!

জীবনে কখনও এতটা ভয় পায়নি খলিল। কিশোর বয়স থেকে কবরস্তানে কাজ করেছে, তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা মনে হয় এই জায়গাটাকে। অন্য মানুষদের মতো গোরস্তান নিয়ে কোন ভীতি তার নেই। কখনও কোন অশরীরি কিছু চোখেও পড়েনি। লোহা-লক্করের ভাগাড় থেকেও কবরস্তান তার কাছে বেশি মনোরম।

তাহলে এখন এমন কী জিনিস নীচ থেকে তার পা ধরে রেখেছে??

ঐ বুড়োটা!

না।

খলিল কয়েকবার জোর করে শাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো। নিশ্চয় কোনো আগাছা, কিংবা অন্যকিছুর সাথে তার পা-টা আটকে আছে। কখনও এরকম পরিস্থিতিতে পড়েনি বলে আজ হয়তো তার মনেও ভয় ঢুকে পড়েছে। কবরে যে বুড়ো শায়িত আছে সে একটা লাশ। ওর কোন ক্ষমতা নেই। ক-দিন পর পচে গলে নিঃশেষ হয়ে মাটিতে মিশে যাবে।

বুকের সমস্ত সাহস জড়ো করে খলিল আরও জোরে পা চালালো, কিন্তু স্পষ্টতই টের পেলো বুড়োটা তার পা দুটো শক্ত করে ধরে আছে!

শুধু ধরেই নেই, বুড়োটা সম্ভত হাসছে!

খলিলকে আরও এক ধাপ ভড়কে দিয়ে বুড়োর হাড্ডিসার আঙুলগুলো তার পায়ের গোড়ালি থেকে কিলবিল করে উঠে আসছে হাঁটুর দিকে!

কয়েক মুহূর্তের জন্য দম বন্ধ হয়ে গেল তার। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কবরস্তানের অন্ধকারের দিকে। বুকের ভেতর দলা পাকানো চিৎকারটা আর দমিয়ে রাখতে পারলো না, বুক বেয়ে সেটা উঠে এলো গলা অবধি।

কিন্তু ওই পর্যন্তই।

আরেকটা হাড্ডিসার হাত পেছন থেকে শক্ত করে তার মুখটা চেপে ধরলো! তারপর আরেকটা হাত তার মাথার উপর চেপে বসলো প্রবলভাবে। প্রচণ্ড শক্তিতে তার মাথাটা ঠেসে নামিয়ে দিতে শুরু করলো নিচের দিকে। নীচ থেকে বুড়োর হাত আরও জোরে টান দিতেই সে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারালো। ধপাস করে পড়ে গেল কবরের ভেতরে।

কিন্তু বুড়োটার উপরে গিয়ে পড়ল না সে। যদিও তার পা ধরে আছে। এখনও!

খলিল আবার চিৎকার দেবার চেষ্টা করলো, কিন্তু এবারও কেউ তার মুখটা চেপে ধরলো প্রচণ্ড শক্তিতে। হাত-পা ছোঁড়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। আরও কয়েকটি হাত ধরে আছে তার হাত-পা!

কয়েক মুহূর্ত পর টের পেলো, ঐ বুড়োটা বসে আছে তার মুখোমুখি। কোন কথা বলছে না; অন্ধকারে দেখতে না পেলেও তার কাছে মনে হলো লোকটা মিটিমিটি হাসছে।

কবরের দু-পাশের দেয়াল টের পাচ্ছে খলিল। তার পিঠ ঠেকে আছে আরেক দেয়ালে। সেই মাটির দেয়াল ভেদ করে দুটো শক্ত আর হাড্ডিসার হাত বের হয়ে তার মুখটা চেপে ধরে আছে। দু-পাশের মাটির দেয়ালে হাত রেখে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো এবার, কিন্তু সেই দেয়াল দুটো কেমনজানি কাঁপছে! মনে হচ্ছে ওপাশ থেকে কেউ মাটি খুঁড়ে বের হয়ে আসতে চাইছে!

কবরের মাটির দেয়াল ফুঁড়ে আরও চারটে শক্তিশালী হাড্ডিসার হাত তার দু-হাত শক্ত করে ধরে ফেলল! তার দু-পা দু-হাতে চেপে ধরে বসে আছে। বুড়ো লাশটা।

অনেক কষ্টে উপরের দিকে তাকালো খলিল। কবরের গর্তটা বুজে আসছে! কেউ একজন উপর থেকে গর্তটা ঢেকে দিচ্ছে দ্রুত।

জিন্দা দাফন হতে যাচ্ছে সে! জিন্দা লাশের সাথে!

এলোমেলো হয়ে গেল খলিলের মাথা। হঠাৎ টের পেলো তার বুকে কিছু একটা বিঁধছে!

ওহ্‌।

সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো তার কোণিটা এখন বুড়োর হাতে, আর সেটা তার বুক বরাবর চেপে ধরে রাখা হয়েছে!

তার কলিজা খাবে নাকি?!

অবিশ্বাসের সাথে ভাবনাটা তার মাথায় চলে এলো। টের পেলো বুকে হাতুড়ি পেটা শুরু হয়ে গেছে। তার সাধের কলিজাটা রীতিমতো লাফাচ্ছে যেন। কোরবানির পশুর মতো বুঝে গেছে ওটার পরিণতি কী হতে পারে!

কোণিটা আস্তে করে খলিলের বুকে সেঁধে গেল, যেন মাখনের ভেতরে ছুরি চালানো হয়েছে!

তার বুকে জমে থাকা চিৎকার গলার কাছে এসে আটকে ছিল এতোক্ষণ, সেই চিৎকারের দলা ফুউস্স্ শব্দ করে বেরিয়ে গেল বুকের ফুটো দিয়ে। কোণিটা আস্তে করে একটুখানি ঘুরে গেল, একবার ডানে, আরেকবার বাঁয়ে। যেন চলাচল করার জন্য রাস্তা করে নিচ্ছে! তারপর খলিলের ভীতিটাকে তীব্র করে দিয়ে কোণিটা নিচের দিকে নামতে শুরু করলো এবার। নাভির ঠিক নিচে এসে থেমে গেল ওটা।

খলিল টের পাচ্ছে তার কলিজাটা রীতিমতো কাটা কইমাছের মতোই লাফাচ্ছে এখন। ছটফট করতে থাকা তার জীবন্ত কলিজাটা খপ করে ধরে ফেলল বুড়োর হাড্ডিসার আঙুলগুলো। আস্তে করে টেনে কিছুটা বের করে ফেলল ওটা। বুকটা কেমন খালি খালি লাগলো তার।

এবার সুপরিচিত সেই শব্দটি শুনতে পেলো সে।

খচ! ফচ! ফকত! গবগব!

হায় হায়! বুড়োটা তার কলিজা খাচ্ছে!

খুব আয়েশ করে যে খাচ্ছে সেটা খাওয়ার শব্দ শুনেই বুঝতে পারছে। জীবনে বহুবার এ কাজ করেছে সে। চেটেপুটে খাওয়ার শব্দটা কবরের ভেতরে প্রকটভাবে কানে বাজছে তার।

খলিলুল্লাহ টের পেলো তার নিঃশাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সময় ফুরিয়ে আসছে তার, একটু পরই ভবের লীলা সাঙ্গ হবে। বুকটা ফেটে যাবার উপক্রম হলো। মুখটা এখনও ধরে আছে শক্ত হাতদুটো। হাত-পা একটুও নড়াতে পারছে না।

খলিল জানে, এটাই মৃত্যুর আগ মুহূর্ত। শুধু নিজের কলিজা খাওয়ার শব্দটাই শুনতে পাচ্ছে এখন।

আহ্! কী আয়েশ করেই না খাচ্ছে বুড়োটা!

*

ধরমর করে উঠে বসার চেষ্টা করলো খলিলুল্লাহ কিন্তু পারলো না। তার হাত পা শক্ত করে বাধা!

চিৎকার দিতে গিয়ে টের পেলো মুখে কিছু একটা ঠেসে দেয়া হয়েছে। ভাগ্য ভালো, নাকটা এখনও মুক্ত আছে, সেটা দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে পারলো। আর চোখটাও বাধা নেই।

চোখ পিট পিট করে দেখলো অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি ঘর। তার মনে পড়ে গেল একটু আগে কবরের কথা। কিন্তু এটা সেই কবর নয়-খলিল নিশ্চিত। আবছা অন্ধকার হলেও ঘরটা যে বেশ বড় সেটা বোঝা যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর চোখেদুটো অন্ধকার সয়ে এলে দেখতে পেলো একটা ঝুপড়ি ঘরে পড়ে আছে সে। বেশ শক্ত করে তার হাত-পা-মুখ বাঁধা। একটা চৌকির চারটা পায়ার সাথে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। মুখে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে গামছাজাতীয় কিছু।

কিন্তু সে এখানে কেন?!

কবর!

জিন্দা লাশ!

তার কলিজা…!

যাহোক, একটু আগে যে দুঃস্বপ্ন দেখছিল সেটা বুঝতে পেরে এই বন্দিদশায়ও যারপরনাই স্বস্তি বোধ করলো সে। বুঝতে পারলো, গাছের ডালে বসে অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সেই ঘুমেই দেখেছে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নটা। তারপর হয়তো গাছ থেকে নিচে পড়ে গেছিল, আর তাতেই জ্ঞান হারায়। কেউ একজন তাকে সেখান থেকে এই ঘরে নিয়ে এসেছে।

কিন্তু কে নিয়ে এসেছে? আর এটা কোথায়?

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জবাবটা পেয়ে গেল। বেড়ালের মতো নিঃশব্দে তার কাছে চলে এলো একটা অবয়ব। ঘরের আবছায়া আলোয় চেহারাটা স্পষ্ট বোঝা গেল না। কিন্তু তার উপরে ঝুঁকে বিশ্রি হাসি দিতেই চিনতে পারলো।

চৌকিদার!

“খলিলসাহেব…কেমন আছেন?”

হাড্ডিসর্বস্ব লোকটার কথায় চমকে উঠল সে। এই লোক তার নাম জানে?!

“তাজ্জব হইছেন?” ময়লা দাঁত বের করে হাসলো বুড়ো। “তাজ্জবের কী আছে! আপনে তো বিখ্যাত হয়া গেছেন…সিনেমার হিরোগোর মতন!”

খলিল বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল চোখে চেয়ে রইলো। দুঃস্বপ্নের রেশ কেটেছে কি না বুঝতে পারছে না।

“পেপারে আপনের খবরটা আমি পড়ছি!” নিঃশব্দে হাসলো চৌকিদার।

পত্রিকাগুলোর উপরে খলিলের পুরনো রাগটা আবার জেগে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। এরা তার সহজ-সরল জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছে।

“আপনের একটা বেলাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি দিসিলো…এহন আপনেরে দেইখ্যা মনে হইতাছে ছবিটা বহুত পুরানা।”

খলিল একমত না হয়ে পারলো না। পত্রিকায় তার যে ছবিটা ছাপা হয়েছে। সেটা প্রায় পাঁচ বছর আগে শহরের কবরস্তানের পাশে এক ফটোস্টুডিওতে তুলেছিল। পত্রিকার সাংবাদিক এই ছবির খোঁজ কিভাবে পেলো সেটা অবশ্য তার কাছে বিরাট এক রহস্য।

“অবস্থা বেগতিক দেইখা শহর থেইক্যা পলাইয়া আইছেন এই গাওগেরামে…” লোকটা বলতে লাগলো বিড়বিড় করে। “জান বাঁচাইতে আইস্যাও অভ্যাস ছাড়বার পারেন নাই মনে হইতাছে।”

চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলো না খলিল।

“এর আগেও এইহানে ঢুকছেননি? ওইসব খাইছেন-টাইছেন…?” প্রশ্নটা খুব আমুদে ভঙ্গিতে করলো চৌকিদার।

পিটপিট করে চেয়ে রইলো লোকটার দিকে, এরচেয়ে বেশি কিছু করার ক্ষমতা এ মুহূর্তে তার নেই-ও।

“মাথা নাড়াইলেই হইবো…”

খলিল বুঝতে পারছে না উত্তরটা দেবে কিনা।

“কী হইলো…জওয়াব দেন…খাইছেননি?”

মাথা দোলালো সে।

“হায় হায়…পথম কেসেই ধরা খাইছেন!” কপট আফসোস করলো। বুড়ো। “আপনের কপাল তো আসলেই খারাপ।”

এ ব্যাপারে খলিলের মনেও কোনো সন্দেহ নেই। কপাল তার আসলেই খারাপ। সম্ভবত শনি ভর করেছে। শহরে এক জ্যোতিষিকে সে চিনতো, সব সময়ই লোকটাকে ভণ্ড ভেবে অবজ্ঞা করেছে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তার কাছ থেকে একটা পাথর নিলে আজ এ দশায় পড়তে হতো না হয়তো।

“কুন লাশটারে টার্গেট করছিলেন, খলিলসাহেব?”

এ প্রশ্নের জবাব মাথা নেড়ে কীভাবে দেবে বুঝতে পারলো না।

“আইজকা যেটা দাফন দিছে…ওইটা?”

কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে, তবে মুখ বন্ধ থাকায় সেটা নাক দিয়ে বের হয়ে গেল।

মাথা নেড়ে নোংরা দাঁত বের করে হাসতে লাগলো বুড়ো। “আপনের টেস্ট তো ভালাই…এক্কেবারে কচি একখান বাইছ্যা নিছেন!”

খলিল বুঝতে পারছে বাতিকগ্রস্ত এক বুড়োর খপ্পরে পড়েছে সে। এই বানচোত তার সাথে এরকম গালগল্প করে যাবে রাতভর, তারপর সকাল হলেই পুলিশের হাতে তুলে দেবে। দুঃখের বিষয়, বাতচিত না করে মুরদার মতো পড়ে থেকে সারা রাত শুনে যেতে হবে এর বকবকানি।

সঙ্গে সঙ্গে একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় চলে এলো তার-সারা রাত! তাহলে হাতে বেশ কিছুটা সময় আছে।

খলিল যেন আশার আলো দেখতে পেলো। সমস্যা নেই, এই লোকের বকবকানি চলুক। সকালে কোনোভাবে যদি সে হাত-পায়ের বাধন খুলে ফেলতে পারে তাহলে হারামজাদার কি অবস্থা করবে সেটাও মনে মনে ঠিক করে ফেলল। মরামানুষের কলিজা খাওয়া কুখ্যাত খলিলুল্লাহকে নাজেহাল করার শাস্তি এতটাই ভয়ঙ্কর হবে যে…

“কী ভাবতাছেন, মিয়া?”

বুড়োর কথায় খলিলের চিন্তায় ছেদ পড়ল।

চৌকিদার ভুরু কুঁচকে চেয়ে আছে তার দিকে। বন্দির চিন্তাভাবনা পড়ার চেষ্টা করছে সে। “আমার কলিজা খাইবার ধান্দা করতাছেননি!” মুচকি হেসে বলে উঠল এবার। “মজা পাইবেন না!” মাথা নেড়ে ঠোঁট ওল্টালো বুড়ো। “আমার বয়স বাষট্টি…বেশিও হইবার পারে। গায়ে-গতরে মাংস নাই…” কথাটা বলে এবার খিক খিক করে হেসে উঠল। যেন নিজের কথায় নিজেই বেশ মজা পেয়েছে।

“তয় ওর কলিজাটা খুব স্বােয়াদের হইব…” কথাটা বলেই ঘরের এককোণে তাকালো বুড়ো।

চৌকিদারের দৃষ্টি অনুসরণ করে রীতিমতো ভিরমি খেলো খলিল।

ঐ অল্পবয়সি মেয়েটা…আজকেই গোর দেয়া হয়েছে যাকে! কাফনের কাপড়টা নেই। সাদা-ফ্যাকাশে নগ্নদেহের মেয়েটি পড়ে আছে মেঝেতে। যেন ঘুমাচ্ছে। ডাকলেই উঠে বসবে!

খলিলের বুক কেঁপে উঠল। বুড়োর দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো সে। তার দৃষ্টিতে উপচে পড়ছে বিস্ময়।

“আপনে যেইটা মনে করছেন সেটাই না,” চৌকিদার তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল। “ওর কলিজা আমি খামু না!” চোখেমুখে লালসা ফুটে উঠল তার। “মাইয়াটা অনেক সুন্দর, না?”

খলিল টের পেলো তার বুক ওঠানামা করছে। নিঃশ্বাস নিতে বেগ পাচ্ছে। সে।

“বাসি কলিজা খাইতে খাইতে মুখের স্বােয়াদ নষ্ট হয়া গেছে,” আফসোস করে বলল চৌকিদার।

কথাটা শুনে খলিলের বুক কেঁপে উঠল। কপাল কুঁচকে তাকালো বুড়োর দিকে, বোঝার চেষ্টা করলো মজা করে বলেছে কিনা।

“তয় আপনেরটা খুব স্বােয়াদের হইবো!” সত্যি সত্যি মুখে জল এসে গেছে তার। ঠোঁটদুটো ভিজে গেছে। “বয়স তো বেশি না…কতো হইবো?” একটু থেমে মনে মনে হিসেব করে নিলো যেন। “…তিরিশ-বতিরিশ?”

খলিল ফ্যাল ফ্যালে চোখে চেয়ে রইলো।

“শইলডাও মাশাল্লা!…এক্কেবারে ষাড়ের মতন তাগড়া!”

খলিল টের পেলো তার নিঃশ্বাস আবার ঘন হয়ে আসছে। জোরে জোরে ওঠানামা করছে বুক।

চৌকিদার এবার সুপরিচিত সেই কোণিটা হাতে তুলে নিলো। তার চোখেমুখে দুর্বোধ্য অভিব্যক্তি।

দৃশ্যটা দেখে দম বন্ধ হয়ে গেল খলিলের।

কোণিটার বাঁকানো দুই প্রান্তের ধার আঙুল দিয়ে পরখ করে দেখলো বুড়ো। “বাহ্! জিনিসটা তো ভালা-ই!” প্রশংসার সুরে বলল চৌকিদার। “খুব কামের জিনিস মনে হইতাছে।”

খলিলের মাথায় একটা ভাবনাই এই মুহূর্তে সামান্য আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে-এই লোক তার সাথে মজা করছে আসলে!

“আমিও আপনের মতন এই জীবনে বহুত কলিজা খাইছি…তয় সবই মরা মাইনষের!” বুড়োর চোখেমুখে তিক্ততা।

খলিলের চোখজোড়া কোটর থেকে ঠিকরে বের হবার উপক্রম হলো এবার। এ জীবনে কখনও তার মতো আরেকজনের মুখোমুখি হবে সেটা দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। ছোটার জন্য হাঁসফাঁস শুরু করে দিলো সে কিন্তু দড়ির বাঁধন একটুও আলগা করতে পারলো না।

“জিন্দা মানুষের কলিজা খাওনের খুব শখ আছিল…” জিভ দিয়ে ভেজা ঠোঁটদুটো চেটে নিলো বুড়ো। “…ভাবছিলাম কুনোদিন এই শখ পূরণ হইবো না…” খলিলের বুকে কোণিটা ছোঁয়ালো এবার। “টাটকা কলিজা…একদম গরম থাকবো! পুরা জিন্দা! কাটা কই মাছের মতন ফাল পারবো!” একটু থেমে আবার বলল, “ইশ! না জানি কতো স্বােয়াদের হইবো এইটা!”

খলিল টের পেলো প্রচণ্ড যন্ত্রণা তৈরি করে কোণিটা ঢুকে যাচ্ছে তার বুকের ভেতরে!

এটা একটা দুঃস্বপ্ন!-মনে মনে এই কামনাই করলো সে। কিন্তু সুতীব্র যন্ত্রণাটা বলে দিচ্ছে, যা কিছু হচ্ছে বাস্তবেই হচ্ছে।

প্রচণ্ড জোরে চিৎকার দিলেও মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের হলো না তার। বরং বুকের ভেতর থেকে বের হয়ে এলো তার সাধের কলিজটা!

সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসার আগে চোখের সামনে বুড়ো চৌকিদারকে আয়েশ করে নিজের কলিজাটা খেতে দেখলো খলিলুল্লাহ।

ইশ! তারও ইচ্ছে ছিল জীবিত মানুষের কলিজা খাওয়ার!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *