২৬. কিডন্যাপারের পদসংকেত

২৬. কিডন্যাপারের পদসংকেত

আমি চলে এলাম আমার ডেরায়। কল্পনা চিটনিসের পাশের বাড়িতে। এক বাড়িতে পাশাপাশি ঘরে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নিশ্চয় পূর্বাভাসের পথনির্দেশে। এখন বুঝলাম, সেই সিদ্ধান্ত কতটা নিরাপদে রেখেছে আমাকে। নইলে ফেঁসে যেতাম আগেই। আগুন আর ঘি পাশাপাশি রাখলে আগুন ঘি-কে গলাবেই। কল্পনার মতো শরীরী আগুন রেহাই দিত না আমাকে। ওর মতলব ছিল সেইটাই। কিন্তু আমার মতলব ছিল আরও গভীরে। সেই মতলব নিশ্চয় এতক্ষণে বিজ্ঞ পাঠক এবং সুচতুরা পাঠিকার অগোচরে থাকেনি।

ভিন্ন আবাসে থাকলেও বুদ্ধিমতী পুলিশ পুঙ্গবী কিন্তু আমাকে বিশ্বাস করতে পারেননি। জানলা থেকেই লক্ষ্য করেছিলাম, প্লেন ড্রেসে পুলিশ চর মোতায়েন করা হয়েছে বাড়ির সামনে। যাতে আমি চম্পট দিতে না পারি—রাতের আঁধারে।

শয্যাগ্রহণ করে, দু’হাতের দশ আঙুল পরস্পর সংলগ্ন করে মাথার তলায় দিয়ে, চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম রবি রে-তনয়ের কথা। ছেলেটা পয়লা নম্বরের বিচ্ছু নিঃসন্দেহে। বাপের উদ্দামতা আর মায়ের সর্পিল চিন্তাধারার রেশ নিশ্চয়। জিন-দৌলতে এসেছে তার মধ্যেও। আমার খুব ন্যাওটা হয়ে গেছিল ঠিকই। যখন তখন আমার ডেরায় এসে দুরন্তপনা করত। এটা-সেটা দেখতে চাইত। আমার ডেঞ্জারাস কীর্তিকলাপের কাহিনি শুনতে চাইত। কিন্তু, কী আশ্চর্য, বাপের প্রসঙ্গ ভুলেও তুলত না। শিশু মনোবিদরা এই সহজ সতর্কতার কি ব্যাখ্যা করবেন, তা জানি না। আমি কিন্তু আমার সহজ যুক্তি দিয়ে বুঝেছিলাম, পিতৃ প্রসঙ্গ সযত্নে। এড়িয়ে যাওয়ার পিছনে রয়েছে সযত্ন পিতৃ-স্মৃতি। স্মৃতির সেই মণিকোঠা কারুর কাছে উন্মােচন করতে চায় না। ওটা ওর ঠাকুর ঘর। কাউকে সেখানে ঢুকতে দিতে চায় না। সেখানকার কোনও কথা বাইরে আনতে চায় না। অথচ সব স্মৃতিই রয়েছে চেতন মনে অবচেতনে যায়নি। দশ বছর বয়স যে ছেলের, সে যদি মনের জোরে মনের মধ্যে একটা প্রকোষ্ঠ সম্পূর্ণ নিজস্ব করে রাখে, তাহলে তা ভাবনার ব্যাপার বইকি। মনের রোগ এই থেকেই দেখা যায়। ফিলিংস অব ইনসিকিউরিটি। নিরাপত্তাহীনতা বোধ। সেল্ফকিডন্যাপিং কেস ইদানিং, আকছার ঘটতে দেখা যাচ্ছে এই কারণেই। এই ডিভোর্স-কণ্টকিত সমাজে।

সোমনাথ হয়তো সেই পথের পথিক।

আমার অতীত কার্যকলাপ জানবার আগ্রহ ওর মধ্যে দেখেছিলাম একটু বেশি মাত্রায়। একদিন আমার ট্রফির বাক্স খুলে ঘাঁটতে বসেছিল, আমাকে না জানিয়ে। কতজনের কত উপকার করেছি, কত জনে কত পুরস্কার প্রদান করেছে, সে সব। ঠেসে রেখে দিতাম একটা চেন-টানা ব্যাগে। সেই ব্যাগে ছিল একটা পঞ্চকোণ রূপোর তারকা। বেশ ভারি। প্রতিটি কোণ ছুঁচের মতো সরু। ওপরে লেখা আমার নাম।

হাতের চেটোর মতো বড় মেডেলটা নিয়ে ও যখন উল্টেপাল্টে দেখছে, আমি দেখে ফেলেছিলাম আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাখা ব্যাগ নিয়ে ওর কৌতূহল। আমার মোটেই ভাল লাগেনি। ব্যাগটা হাত থেকে নিয়ে, চেন টেনে দিয়ে, মাচায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম।

রূপোর তারকাটা সসামনাথকে প্রেজেন্ট করেছিলাম। বলেছিলাম, হিরো হওয়ার এই প্রাইজ দিলাম তোকে। হিরো হবি জীবনে, এই আমার আশীর্বাদ।

গোয়েন্দাগিরি বড় বেপরোয়া পেশা। এ পেশা গ্রহণ করব, এমন সাধ বা শখ। কলেজ জীবনে আমার ছিল না। ছিল আমার আর মৃগাঙ্ক রায়ের প্রাণের বন্ধু। প্রেমচাঁদ মালহোত্রার। পাঞ্জাব তনয়, ধর্মে শিখ। একে নম্বরের ডানপিটে আর হুল্লোড়বাজ। স্কটিশ চার্চ কলেজে আমাদের এই ত্রয়ীকে সমীহ করে চলত ললনারা। কারণ আমাদেব বাক্যবাণ ছিল বড় তীক্ষ্ণ। চোখাচোখা। বিশেষ করে প্রেমচাঁদের। যেহেতু ওর নামের আগে প্রেম আছে, সুতরাং হৃদয়ে প্রেম থই থই করছে, এই জাতীয় রসাল মন্তব্য টুকুস টুকুস কার সহপাঠিনীরা ছুঁড়ে দিলেই ও টকাস টকাস জবাব দিয়ে যেত। কিছু কিছু টিপ্পনি আজও মনে আছে। যেমন, হে প্রিয়ংবদা, তোমার ওই সূক্ষ্ম চাহনির ছুঁচ আমার এই মোটা চামড়ায় লাগলে ভোতা হয়ে যাবে। অথ, সখী, হঠাৎ ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাচ্ছ কেন আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে? তোমার ওই লিপস্টিক কমিউনিকেশন ব্যর্থ যাবে এই চঁড়ালের কাছে। ঠোঁট যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঙ্গবিশেষ বিশেষ বিশেষ প্রক্রিয়া সাধনের জন্যে, তা কি আমার অজানা নয়? অথবা, সিলিকন বুক নাকি? অত দেখান হচ্ছে কেন?

লজ্জায় লাল হয়ে আমোদিনী কন্যাটি তখন পালাবার পথ পেত না, আর এক দুঃসাহসিনী মিঠে মিঠে হেসে বলে যেত—বুঝেছি, ওটা পদাঘাতের সংকেতে নয়, একেই বলে ম্যাকো পোজ ফর দ্য রাইট ম্যান। বাট, মাই ডিয়ার ইয়ং লেডি, আই অ্যাম দ্য রং ম্যান।

বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সপার্ট প্রেমচাঁদ এরকম কত কাণ্ডই করেছে কলেজ লাইফে। ওর চোখে কোনও সংকেত এড়িয়ে যায়নি। কোন কন্যার চোখে দ্যুতি ফুটিয়েছে অথবা পা ঠুকে চলেছে। অথবা ডান পাকে বিশেষ কোণে প্রেমাদের দিকে ফিরিয়ে রেখেছে অথবা বুকের ওপর দু’হাত বিশেষ কায়দায় ভাঁজ করে নিরুপম বক্ষপিণ্ডকে উঁচিয়ে রেখে, এসব ভ্যালেনটাইন বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সংকেত মাঠে মারা যেত কাঠখোট্টা প্ৰেমৰ্চাদের কাছে।

প্রেমচাঁদ প্রসঙ্গ নিয়ে আচমকা এত কথা লিখলাম কেন? কল্পনার কাণ্ড দেখে সব যে মনে পড়ে গেল। হরেক বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আমার ওপর প্রয়োগ করে গেছে কল্পনা। কিন্তু এই ঘি তাতে গলেনি। প্রেমাদের কথা আরও বেশি করে মাথায় খেলে যাচ্ছিল সোমনাথ হাওয়া হয়ে যাওয়ার পর থেকেই।

আমি ডিটেকটিভ হব, কস্মিনকালেও ভাবিনি। আমার সেই যোগ্যতাই নাকি নেই। মুখ ফেঁড় প্রেমচাঁদ তো সোজাসুজি আমাকে বলত, ভেড়ুয়া বাঙালি। আমিও তেড়ে উঠে বলতাম, তেড়িয়া শিখ, শুধু কৃপাণ চালিয়েই যাবি সারাজীবন।

কিন্তু ভাগ্যচক্রে আমি যখন শখের গোয়েন্দা হলাম, রিস্ক কম বলে, স্রেফ হবি তো—প্রেমচাঁদ তখন সিরিয়াস হয়ে গোয়েন্দাগিরিকে পেশা করে নিয়ে একটু একটু করে জাল ছড়িয়ে দিয়ে ঘাঁটি পেতে বসল গোটা পৃথিবী গ্রহটায়। শিখ জাতটা একটা জাত বটে। আজকে ওর গোয়েন্দা সংস্থা টেক্কা দেয় আমেরিকার এফবিআই-কে, ওর কীর্তিকলাপের খবর রাখে ইণ্ডিয়ার ‘র’ অর্থাৎ রিসার্চ অ্যাণ্ড অ্যানালিটিক্যাল উইং। এই সাইবার আর হাইটেক ক্রাইমের যুগে পেছিয়ে নেই শিখ নন্দনের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।

সেই নির্ভীক শিখ বন্ধুর শরণ নেওয়া মনস্থ করলাম চিৎ হয়ে শুয়ে কড়িকাঠ নিরীক্ষণ করতে করতে।

 

ঝিমুনি এসেছিল কিছুক্ষণের জন্যে। সমস্ত সত্তা যখন সজাগ থাকে, তখন মগজে তন্দ্রা প্রলেপ লাগিয়ে যায়, মগজ কিন্তু ঘুমোয় না। মানুষের মগজ জন্ম মুহূর্ত থেকে ঘুমোয় না। মগজ অতন্দ্র। মগজ আজও অজানা রহস্য।

তাই ভোর রাতে উঠে পড়েছিলাম আমার বডি অ্যালার্মের সংকেতে। এবার বেরোতে হবে। নিখোঁজ সোমনাথকে খুঁজতে যেতে হবে।

ঠিক সেই সময়ে বেজে উঠেছিল আমার স্যাটেলাইট টেলিফোন। পুলিশ পুঙ্গবীব কাঠ-কাঠ ধারালো কথাগুলো কানের পর্দায় বিঁধে বিঁধে গেছিল—মিস্টার ইন্দ্রনাথ রুদ্র?

স্পিকিং।

কিডন্যাপারের টেলিফোন কল ব্যাক আপ করা হয়েছে। চোরাই মোবাইল থেকে ফোন করা হয়েছিল।

আমিও তাই আন্দাজ করেছিলাম। সব কিডন্যাপার তাই করছে।

ইয়েস, ম্যাডাম।

 

পাহাড়ের ঢালে তখন বোদ এসে পড়েছে।

পুলিশ পুঙ্গবী বললেন, গেমস ফ্রিক কোথায় পড়েছিল, মিঃ রুদ্র? ঢাল বেয়ে নেমে গেলাম একটু একটু করে। মাটি এখানে আলগা। কাল বিকেলেই এক দফা হেঁটেছি, মাটি তোলপাড় করেছি পায়ের জুতো দিয়ে। হেঁটে গেলাম পাশ কাটিয়ে। সরু পথটা বাঁচিয়ে হাঁটছি। সোমনাথ ওই পথ দিয়েই নেমেছে। ওর পায়ের ছাপ যেন নষ্ট না হয়ে যায়। ওর ফুট প্রিন্ট স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—গতকাল যে রকম দেখেছিলাম, সেইভাবেই রয়েছে।

পৌঁছে গেলাম গাছপালার জায়গায়। এখান থেকেই জমি পাথুরে হতে হতে চলেছে। মাটির ভাগ কম। তাতে ঘাবড়ালাম না। পায়ের ছাপ পড়ুক, গতকাল তো দেখে গেছি, কোথায় পড়েছিল গেমস ফ্রিক খেলনা। ঢাল বেয়ে শর্টকাট করলাম। পুলিশ পুঙ্গবী দুবার হড়কে গেলেন।

পৌঁছে গেলাম ঘেসো জমিটায়, যেখানে গতকাল পড়ে থাকতে দেখেছি গেমস ফ্রিক টয়। সোমনাথের পদচিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এদিকে-সেদিকে।

হেঁট হলেন পুলিশ পুঙ্গবী। নরুন চোখে দেখে গেলেন প্রতিটি ফুট প্রিন্ট। মুখ তুললেন, এই ছাপগুলো আপনার জুতোর?

হ্যাঁ। এখন যা পায়ে রয়েছে।

পা তুলে, জুতোর তলদেশ ধরলাম ভদ্রমহিলার চোখের সামনে। কোনও মহিলাকে এভাবে জুতো দেখানো অতিশয় অভদ্রতা। কিন্তু পুলিশি তদন্তে এ সব। তুচ্ছ ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে নেই। পুলিশ পুঙ্গবীও দিলেন না। চারু নয়নে সুচারুভাবে আমার পাদুকার তলদেশ নিরীক্ষণ করলেন। যেন, আয়নায় মুখ দেখাছেন। যৎকিঞ্চিৎ পরিহাসের প্রয়াস সামলে নিলাম। কারণ, এই মুহূর্তে তিনি কাঠার নয়না। এবং স্থিতধী। সূচিপৃক্ষ চাহনি নিবদ্ধ সোমনাথের বিশেষ প্যাটার্নের শু-প্রিন্টের ওপর। কয়েক জায়গায় ঘাড়ে ঘাড়ে পড়েছে জুতোর ছাপ। খেলনা। নিয়ে মেতে ছিল নিশ্চয় ঘেসো জমিতে। তারপর নেমে গেছে ঢাল বেয়ে। আমি। ফলো করলাম সেই ফুট প্রিন্ট-সাধারণ চোখে যা অদৃশ্য।

অদৃশ্য পুলিশ পুঙ্গবীর চোখেও। তাই বললেন, চললেন কোথায়?

পায়ের ছাপের পিছনে।

আপনি কি ব্লাডহাউণ্ড?

গত জন্মে ছিলাম।

ঘাসের মধ্যে বিলীয়মান সোমনাথ-পদচিহ্ন ফুট আষ্টেক এসেই অদৃশ্য হয়ে গেছে। এইখান থেকে যেন ডানা মেলে উড়ে গেছে ছেলেটা।

তীক্ষ্ণ নয়া পুলিশ পুঙ্গবী তা লক্ষ্য করলেন। বললেন, কেউ যদি তুলেই নিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তো তার পায়ের ছাপ থাকবে। অথবা ধস্তাধস্তির চিহ্ন। কিছুই তো দেখছি না। কারণ তারে আচমকা তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তাই যদি হয়, পুলিশ পুঙ্গবীর ভুরুযুগল গাণ্ডীব ধনুর মতো বক্র—তাহলে যে তুলে নিয়ে গেছে, তার পায়ের ছাপ তো থাকবে।

আমি জবাব দিলাম না। দিতে পারলাম না। ডানা মেলে উড়ে যায় না একটা মানুষ। হনুমানের মতো লাফ দিয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে যায় না। সোমনাথের পায়ের ছাপ কিন্তু আচমকা আর নেই। জমির দিকে নজর রেখে তিন-চার গজ দূরে এসে থমকে দাঁড়ালাম।

মাটিতে জাগ্রত রয়েছে অস্পষ্ট পাদুকাচিহ্ন।

এই জুতোর গোড়ালি বড়। সোমনাথের জুতোর গোড়ালির চাইতে বড়।

হেঁট হলাম গোড়ালির পিছনে। জুতোর ডগা যেদিকে ফিরে থাকা উচিত, তাকালাম সেদিকে। ডগা ফিরে রয়েছে সোমনাথের শেষ পদচিহ্ন যেখানে রয়েছে, সেইদিকে।

সোমনাথ-পদচিহ্নকে কেন্দ্রবিন্দু করে একটা চক্কর মারলাম—বড় গোড়ালিওলা জুতোকে দিয়ে মনে মনে একটা বৃত্ত ভেবে নিয়ে।

কিন্তু নেই। নেই আর কোনও ফুটপ্রিন্ট। অথচ থাকা উচিত ছিল। বড় গোড়ালির ছাপ পড়েছে আধখানা। তারপর আর কিছু নেই। পুরো জুতোর ছাপ তো নেই-ই গোড়ালির ছাপটাও পুরো পড়েনি। কিন্তু পয়েন্টিং করে রয়েছে সোমনাথের জুতোর ছাপের দিকে।

মনে মনে কল্পনা করে নিলাম ঘটনা-দৃশ্য। কল্পনা দিয়ে বানিয়ে নিলাম কী কী ঘটেছিল, কেমনভাবে ঘটেছিল। এমন ঠাণ্ডাতেও মনে হল, বুঝি ঘামছি।

এদিকের এই পাহাড়ি ঢলে শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে রাশি রাশি। ঢাল বেয়ে পা টিপে টিপে জান্তব চরণে উঠে এসেছে একটা লোক। ঝোপের আড়ালে আড়ালে উঠেছে, শুকনো পাতা মাড়িয়ে মাড়িয়ে উঠেছে, অথচ বনচর শিকারি পশুর মতো পায়ের শব্দ জাগ্রত করেনি এতটুকু। তাই কিছু শুনতে পায়নি সোমনাথ। শুকনো পাতা আর ভাঙা ডাল মাড়িয়ে এইভাবে নিঃশব্দ চরণে আসতে পারে শুধু বনের মাংসাশী শিকারি বেড়াল জাতীয় প্রাণি। ঝোপ ভেদ করে সেই মানুষ-বনচর সোমনাথকে দেখতে পায়নি—কিন্তু তার গেমস ফ্রিকের আওয়াজ শুধু কানে শুনে উঠে এসেছে ঢাল বেয়ে একটু একটু করে। তারপর প্যান্থার লম্ফ মেরে দশ বছরের ছেলেটাকে তুলে নিয়ে গেছে এমনই বিদ্যুৎসম ক্ষিপ্রতায় যা চোখে না দেখলে প্রত্যয় হবে না। চেঁচানোর সুযোগটুকুও দেয়নি সোমনাথকে। এইভাবে যারা মানুষ গায়েব করে, তারা জানে, আগে খপ করে কীভাবে মুখ বন্ধ করতে হয়, সঙ্গে সঙ্গে শূন্যপথে বড়ি তুলে নিয়ে যেতে হয়।

কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিলাম চারদিকে। দশ ফুট দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না।

সোমনাথও দেখতে পায়নি দশ ফুট দূরের ঝোপের মধ্যে গা ঢেকে ওত পেতে থাকা আততায়ীকে।

গলা শুকিয়ে এসেছিল আমার কিডন্যাপিং সিনটা কল্পনা করতে গিয়ে! পুলিশ পুঙ্গবী একদৃষ্টে চেয়েছিলেন আমার ভাবনা-ক্লিষ্ট চোখের দিকে।

এখন বললেন খুব আস্তে, আপনি ধোঁকায় পড়েছেন? চোখে ধোঁয়া দেখছেন?

হয়তো কণ্ঠস্বরে কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গের প্রলেপ ছিল। কিন্তু আমি তা গায়ে মাখিনি। শুকনো গলায় বলেছিলাম, ম্যাডাম, এ কাজ যে করেছে, তার কমব্যাট এক্সিপিরিয়েন্স আছে।

দ্বন্দ্বযুদ্ধে ওস্তাদ?

ইয়েস, ম্যাডাম। শিকারি জন্তুর মতো পেছন নিতে পারে, ছোঁ মেরে শিকারকে তুলে নিয়ে যেতে পারে, দশ ফুট লাফিয়ে আসে উড়ন্ত পাখির মতো, চেঁচানোর সুযোগ দেয় না, টুটি টিপে ধরে, মুখ বন্ধ করে দিয়ে।

যেন গা হিম হয়ে গেল ম্যাডাম পুলিশের, অন্তত মুখ দেখে তাই মনে হয়েছিল আমার। অথচ পাহাড়ের মেয়ে তিনি, বিলক্ষণ ডাকাবুকো।

কিন্তু মানুষ-শিকারি নন। সোমনাথকে যে নিয়ে গেছে, সে পোক্ত ম্যান-হান্টার। এই পাহাড়ে সে ঘাপটি মেরে নজর রেখেছে আমাকে আর সোমনাথকে বেশ কয়েকদিন ধরে। মুখস্থ করেছে দু’জনের সমস্ত গতিবিধি। কোথায় হাঁটি, কোথায় দাঁড়াই-সমস্ত। সে জানত আমি কোথায় থাকি, সোমনাথ কোথায় থাকে, আর তার মা এখন কাছে নেই। নজরে নজরে রেখেছিল বলেই জেনেছিল কখন একা-একা বেরিয়ে গেল সোমনাথ। ছোঁ মেরেছে ঠিক তখনই।

এ হেন লোকেদের অসাধ্য কিছু নেই। এর জন্যে দরকার স্পেশ্যাল ট্রেনিং। যে ট্রেনিং আছে আমারও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *