৯
দিঘির কিনার ঘেঁষে শালুক ফুটেছে। ফুলের বোঁটা কেটে-কেটে তাদের নৌকো চলেছে, শব্দ হচ্ছে খসখস, ফুল গুলি স’রে স’রে যাচ্ছে জলের বুকে ত্রিভুজ এঁকে। ফুলের ফাঁক দিয়ে কালো জল দেখে মনে হয় ফালি-কাটা তরমুজের রস।
নিকি আর নাডিয়া শালুক ফুল তুলছিলো। একই ফুলের শক্ত পিছল বোঁটা ধরলো দুজনে। এমনভাবে তারা দুজনেই একসঙ্গে সেই বোঁটায় টান দিলো যে মাথা ঠুকে গেলো তাদের, আর নৌক। এমনভাবে পারের দিকে ঘুরে গেলো যে মনে হ’লো যেন কাছি দিয়ে কেউ টানছে। সেখানে বোঁটাগুলি আরো ছোটো আর জড়ানো; শাদা শাদা ফুল গুলি, ভেতরে রক্তের রেখা-আঁকা হলুদ ডিমের কুসুমের মতো তাদের রং, ডুব দিয়ে-দিয়ে ভেসে উঠতে লাগলো সারা শরীরে জল মেখে। নৌকোর একধারে ঝুঁকে পড়ে বাচ্চারা এমনভাবে ফুল ছিঁড়ে চললো যে নৌকো ক্রমেই হেলে পড়তে লাগলো একপাশে।
‘স্কুলে যেতে অসহ্য লাগে আমার,’ বললে নিকি, ‘এবার আমার নতুন জীবন শুরু করার সময় হয়েছে—নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে হবে আমাকে এখন।’
‘ও মা—আর আমি যে তোমার কাছে বর্গমূলের অঙ্কটা বুঝে নেবো ভেবেছিলাম। আলজেব্রায় আমি এতো খারাপ যে এবার আর-একটু হ’লেই ফেল করতাম।’
নিকি বুঝলো যে তাকে ঠাট্টা করা হচ্ছে। বর্গমূলের কথা ব’লে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে আমি কতো ছেলেমানুষ—এখনো আলজেব্রার অঙ্কই শুরু করিনি।
কিন্তু আহত হয়েছে এমন ভাব সে দেখালো না। মুখে নিস্পৃহ এক ভঙ্গি ফোটাবার চেষ্টা ক’রে—চেষ্টা করতে-করতেই অবশ্য বুঝছিলো কী বোকামি— জিজ্ঞেস করলো, ‘বড়ো হ’য়ে তুমি কাকে বিয়ে করবে?’
‘সে অনেক পরের কথা। করবোই না হয়তো কাউকে এখনো ও-বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করিনি আমি।’
ও:-তুমি বুঝি ভাবলে আমার কোনো কৌতূহল আছে তোমার বিয়ের খবর জানতে?’
‘তা না-থাকলে জিজ্ঞেস করতে এলে কেন?’
‘তুমি একটা হাবা।’
দু’জনের ঝগড়া শুরু হ’য়ে গেলো। সকালবেলার নারীবিদ্বেষের কথা স্মরণ ক’রে নিকি নাডিয়াকে ভয় দেখালো যে এই মুহূর্তে চুপ না-করলে সে তাকে জলে ডুবিয়ে মারবে। ‘চেষ্টা ক’রেই দ্যাখো না,’ নাডিয়া জবাব দিলো। অমনি নিকি নাডিয়ার কোমর আঁকড়ে ধ’রে তাকে জলে ফেলে দেবার চেষ্টা করতে লাগলে।। মারামারি করতে-করতে টাল সামলাতে না-পেরে তারা দু’জনেই জলে প’ড়ে গেলো।
দু’জনেই সাঁতার জানে, কিন্তু শালুকে হাত-পা জড়িয়ে গিয়ে দম আটকে এলো তাদের। অবশেষে এক সময় পায়ের নিচে কাদা ঠেকলো। পাড় বেয়ে যখন ডাঙায় উঠে এলো তখন জামা-জুতো থেকে ঝর্নার ধারার মতে। জল বেরুচ্ছে। নাডিয়ার চাইতেও নিকি বেশি ক্লান্ত হ’য়ে পড়েছে।
এমনকি গত বসন্তেও যদি এমন কাণ্ড ঘটতো, তাহ’লে এই উত্তেজনা প্রশমিত হবার পরেই তারা নিশ্চয়ই চীৎকার ক’রে গাল পাড়তো দু’জনে দু’জনকে; আর তারপরই হয়তো ভেজা গায়ে পাশাপাশি এলিয়ে প’ড়ে হাসতে শুরু ক’রে দিতো।
কিন্তু আজ তারা ব’সে থাকলে। — পাশাপাশি, একটাও কথা না-ব’লে। সমস্ত ঘটনাটার অস্বাভাবিকত্ব মনে ক’রে তাদের নিশ্বাস পড়ছে না। নীরব বিরক্তিতে নাডিয়া যেন ভেতরে-ভেতরে টগবগ ক’রে ফুটছে, আর নিকির সমস্ত শরীর যন্ত্রণায় অবশ, তার মনে হচ্ছে হাত-পা বুঝি কালো আর নীল হ’য়ে গেছে ব্যথায়, আর তার পাজর ভেঙে গেছে টুকরো-টুকরে। হ’য়ে।
শেষ পর্যন্ত নাডিয়াই প্রথম কথা বললো। বয়স্কদের মতো শান্ত গলায় সে বললে, ‘তুমি সত্যি একটা পাগল।’ ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত।’—ঠিক সেই একই রকম বয়স্ক ভঙ্গিতে নিকি জবাব দিলো।
জলের গাড়ির মতে। সারা রাস্তা ভিজিয়ে বাড়ি ফিরলো দু’জনে। পথে সেই ধূলিধূসরিত সর্পসংকুল ঢালু জমিটা তাদের পার হ’তে হ’লো, যেখানে ভোরবেলা নিকি সাপ দেখেছিলো।
নিকির মনে পড়লে। তার গত রাত্রের উত্তেজনার কথা। মনে পড়লো ভোরে সে ছিলো প্রাকাম্যের অধিকারী, তখন সে আদেশ করেছিলো প্রকৃতিকে। এখন কী আদেশ দেবো আমি—নিকি ভাবলে। সবচেয়ে বড়ো কামনা আমার এখন কী? হঠাৎ বুঝতে পারলো নাডিয়ার সঙ্গে আবার সে জলে পড়তে চায়; এই মুহূর্তে শুধু এই তার পরম বাঞ্ছনীয়। আবার কবে এমন ঘটনা ঘটবে? উত্তরটা জানবার জন্য কী না করতে পারে সে!
