৩
মা যতোদিন বেঁচে ছিলেন ইউরা জানতে পারেনি যে তার বাব। বহুপূর্বেই তাদের ত্যাগ ক’রে কখনো সাইবেরিয়ায়, কখনো অন্য কোথাও ঘুরে-ঘুরে তাদের বিপুল বিত্ত মদ আর স্ত্রীলোকের পেছনে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তার মা তাকে বাবার কথা বলতেন, সে জানতো ব্যবসার খাতিরে বাবাকে অন্যত্র বাস করতে হয়—তিনি কখনো থাকেন পিটার্সবার্গে, কখনো বা তাঁকে যেতে হয় বড়ো-বড়ো মেলার কোনে। একটিতে, সাধারণত ইরবিট শহরে।
মা তেমন সবল ছিলেন না কোনোদিনই, কিন্তু যখন তাঁকে যক্ষ্মায় ধরলো, তখন থেকে চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ ফ্রান্স বা ইটালির উত্তরে যেতেন মাঝে- মাঝে। ইউরা দু’বার তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলে।। কতো সময় অচেনা লোকেদের সঙ্গে থাকতে হয়েছে তাকে, বদলি হ’তে হয়েছে এক থেকে অন্য কোনো সংসর্গে। এই সব বদলে তার অভ্যেস হ’য়ে গিয়েছিলো; আর এই অপরিচ্ছন্ন পটভূমিকায়, অন্তহীন রহস্যের পরিবেশে, তার বাবার অনুপস্থিতিও তার মনে কোনো প্রশ্ন তোলেনি।
তার আবছা মনে পড়ে তার খুব ছেলেবেলার কথা, যখন তারই পদবির সঙ্গে কতো অসংখ্য জিনিসের নামই না সে যুক্ত হ’তে দেখেছে। জিভাগো- কারখানা, জিভাগো-ব্যাঙ্ক, জিভাগো-টাইপিন, জিভাগো-ভবন — এমনকি একটা জিভাগো-কেকও ছিলো, এখনো মনে আছে। ‘জিভাগোর বাড়ি! মস্কোর কোনো স্নেজগুলাকে এটুকুর বেশি বলতে হ’তো না; যেন বলা হয়েছে—’টিম্বটুতে নিয়ে চলো!” তক্ষুনি সেই স্লেজ গাড়ি আপনাকে নিয়ে চ’লে যেতো পৃথিবীর প্রাস্তে এক মায়াময় রাজত্বে। গ্রামের মতো শাস্ত সেই বাড়ির বাগান ঘিরে ফেলতো আপনাকে; ফারগাছগুলোর ভারি ভারি ডালে বসতে গিয়ে কাকেরা তুষারকণা ছিটিয়ে দিতো, তাদের ডাক প্রতিধ্বনি তুলতো চুল্লিতে কাঠ পোড়ার মতো শব্দ ক’রে, অভিজাত কুকুরের পাল রাস্তা পার হ’য়ে ছুটে আসতো সেই পরিষ্কার জায়গাটুকু থেকে, যেখানে বাড়ি তৈরি হচ্ছে আর আলো জ্বলছে ঘন হ’য়ে আসা সন্ধ্যায়। হঠাৎ মিলিয়ে গেলো সব। তারা গরিব হ’য়ে পড়লো।
