বেলা পাঁচটার গাড়ি – ৮

‘নীতিবাগীশ বুড়ো এসেছে—’ হিংস্রভাবে নিকি ভাবলো। চারদিকে চেয়ে দেখলে। পালাবার পথ সব বন্ধ। দরজার বাইরে অতিথিদের গলার আওয়াজ, আজ আর তাঁরা যাবেন না। ঘরে দুটি খাট, একটি নিকির নিজের, অন্যটি ভস্কোবয়নিকভের। মুহূর্তমাত্র দ্বিধা ক’রে নিকি নিজের খাটের তলায় ঢুকে পড়লো।

খাটের তলা থেকে সে টের পেলো তার অনুপস্থিতিতে অবাক হ’য়ে সবাই তার খোঁজ করছে। খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত শোবার ঘরেই এলো সবাই।

‘যাক—কী আর করা যাবে, নিকোলে নিকোলেভিচ বললেন। ‘ইউরা, তুমি যাও। একটু পরেই হয়তে। তোমার বন্ধুকে পাওয়া যাবে, তখন তার সঙ্গে খেলা কোরো।” ওঁরা ঘরেই বসলেন; পিটার্সবার্গ আর মস্কো ছাত্র-আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করতে করতে জানতেও পারলেন না আধঘণ্টাখানেক কী এক অস্বাভাবিক আর লজ্জাকর অবস্থায় তাঁরা নিকিকে আটক থাকতে বাধ্য করছেন। অবশেষে বারান্দায় বেরিয়ে গেলেন ওঁরা। সন্তর্পণে ঘরের জানলা খুলে বাইরে লাফিয়ে প’ড়ে নিকি বাগানে চ’লে এলো। গত রাত্রে একেবারে ঘুম হয়নি তার, কিছুই যেন ভালো লাগছিলো না। ‘ বয়স তার চোদ্দ, বিক্ষুব্ধ হৃদয়, বালকত্ব মনে হয় অনন্ত ও ক্লান্তিকর। সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে ভোর না-হ’তেই বাইরে চলে এসেছিলো আজ। ঘাসের উপর ভেজা গাছগুলির ছায়ার রং তখনো কালো হয়নি- ঘন ছাইরং সেই ছায়ার, ভেজা পশমের জামার মতো। কেন জানি মনে হয়, সকালের এই মোহন গন্ধ, আলোর জাফরিকাটা ঐ ছায়ার ভিজে শরীর থেকে উঠে আসছে। হঠাৎ কে যেন এক জ্যোতির্ময় পারদবিন্দু ঘাসের উপর গড়িয়ে দিলে। ধারার মতো ব’য়ে গেলে। সেই আলোর রেখা, মাটিতে উবে গেলো না। তারপর আচমক। এক বিদ্যুৎভঙ্গিতে একশাশে স’রে গিয়ে অন্তর্হিত হ’লো। সাপ! নিকি কেঁপে উঠলো।

তার অদ্ভুত এক অভ্যেস আছে। উত্তেজিত হ’লেই সে নিজের মনে চেঁচিয়ে কথা বলতে শুরু করে। তার মাকে নকল ক’রে বড়ো-বড়ো উন্নত বিষয় বেছে নেয়, আর নিজেই নিজের প্রতিবাদ করতে ভালোবাসে।

‘বেঁচে থাকাটা খুবই আশ্চর্য, কিন্তু এতো যন্ত্রণা কি পেতেই হবে? ঈশ্বর আছেন—নিশ্চয়ই। কিন্তু যদি সত্যিই তিনি থাকেন তাহ’লে আমিই তিনি।’ এই ব’লে নিকি সামনের আপেন গাছটির দিকে চোখ তুলে তাকালো। থরথর করে কাঁপছে সেই গাছ, ভেজা পাতাগুলি টিনের পাতের মতো চকচকে।

‘ওকে আমি থামতে বলবে।।’ এক উন্মাদ আবেগে মনে-মনে সে ইচ্ছে করলে, তার সমগ্র সত্তা দিয়ে, রক্তমাংসের প্রতিটি বিন্দু দিয়ে ইচ্ছে করলে, যে গাছটা তার কাঁপুনি থামাক। ‘থামো, বলছি!’ আর তক্ষুনি গাছটি তার বাধ্য হ’য়ে যেন নিশ্চলতায় জ’মে গেলো। আনন্দে হেসে উঠলো নিকি খুব খুশি হ’য়ে নদীতে ছুটলো স্নান করতে।

নিকির বাবা হলেন একজন সন্ত্রাসবাদী, নাম ডেমেন্টী ডুভোরভ। প্রথমে মৃত্যুদণ্ড হয় তাঁর–তারপর জার স্বয়ং সেই দণ্ড প্রত্যাহার ক’রে তাঁকে নির্বাসন দিয়েছেন। নিকির মা এরিস্টভ বংশজাত জর্জীয় রাজকন্য, অপরিমিত প্রশ্রয়ে স্বেচ্ছাচারী, সুন্দরী এবং এখনো যুবতী। কোনো-না-কোনো হুজুগ নিয়ে মেতে থাকেন তিনি—কতো রকম আন্দোলন, বিদ্রোহ আর বিদ্রোহী, কতো চরম মতবাদ, বিখ্যাত জনপ্রিয় অথবা দুঃখী অসার্থক অভিনেতা–তাঁর উৎসাহের তালিকা থেকে কিছুই বাদ পড়ে না।

ছেলেকেও খুব ভালোবাসেন। তার আসল নাম যদিও ইনোকেষ্টী, আদর ক’রে হাজার রকম আজগুবি সব নামে তাকে ডাকেন তিনি কখনো হয়তো ইনোচেক, কখনো নচেনকা। টিফ্লিসে তাঁর পিত্রালয়ে ছেলেকে নিয়ে গিয়ে সগর্বে দেখিয়ে এনেছেন। সেখানে নিকিকে সবচেয়ে আক্কষ্ট করেছিলো বাড়ির উঠোনের নিঃসঙ্গ গাছটি। গাছটি এক গরম দেশের দানব, দেখতে খাপছাড়া, হাতির কানের মতো বড়ো-বড়ো পাতাগুলো দক্ষিণের তপ্ত আকাশ থেকে উঠোনটিকে আশ্রয় দিয়েছে। ওটা যে গাছ, কোনো জন্তু নয়—এই ধারণাটি নিকি কখনো মেনে নিতে পারেনি।

বিপ্লবী পিতার পদবি গ্রহণ করা নিকির পক্ষে বিপজ্জনক ছিলো। ইভান ইভানোভিচের ইচ্ছে ছিলো সে তার মাতুলকুলের পদবি নেয়। নিকির মারও তাতে অমত ছিলো না। ইভান ইভানোভিচ জারের কাছে এই মর্মে আবেদন করতে চান। খাটের তলায় ব’সে নিকি যখন সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উপর বিরক্ত হ’য়ে উঠেছিলো, তখন এই ব্যাপারটা নিয়েও চিন্তা করেছিলো সে। ইভান ইভানোভিচ কোন অধিকারে তার ব্যাপারে এমন অপমানজনকভাবে মাথা গলাতে আসেন? নিকি তাঁকে মজা টের পাইয়ে দেবে।

আর ঐ এক নাডিয়া! মাত্র পনেরো বছর বয়েস হয়েছে ব’লেই কি ও-রকম নাক উঁচু ক’রে থাকবার অধিকার জন্মেছে তার? এমন বিশ্রীভাবে কথা বলে যেন নিকি এখনো সেই কচি খোকাটি আছে। ওকেও সে দেখে নেবে। ‘ওকে আমি ঘৃণা করি,’ কয়েকবার মনে-মনে বললো নিকি। ‘আমি ওকে খুন করবো। নৌকো করে নদীতে নিয়ে গিয়ে ওকে ডুবিয়ে মারবো আমি।’

মা-ও একই রকম। নিশ্চয়ই এখান থেকে যাবার সময় তাকে আর ভস্কো বয়নিকভকে যা যা ব’লে গেছেন সব মিথ্যে। ককেসাসে গেছেন না ছাই, তাদের দেখিয়ে-দেখিয়ে গাড়িতে উঠে, গেছেন তো নেমে পরের স্টেশনে, ফিরে গেছেন হয়তো পিটার্সবার্গে; ছাত্রদের দলে ভিড়ে কোথাও হয়তো দাঙ্গা বাধিয়েছেন পুলিশের সঙ্গে, — ফূর্তিতে আছেন আর কি! এদিকে নিকি এই পচা আঁস্তাকুড়ে দম আটকে মরছে। কিন্তু ওকে সবাই যতো বোকা ভাবে ততো বোকা সে নয়। নাডিয়াকে সে খুন করবেই, ইস্কুল থেকে নাম কাটিয়ে নেবে, তারপর সাইবেরিয়া চ’লে যাবে তার বাবার কাছে—দু’জনে মিলে নতুন এক বিপ্লব শুরু ক’রে দেবে।