৭
নদীর ধারের সেই মাঠে যে-গাড়ি হঠাৎ থেমে গিয়েছিলো, তারই দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি কামরায় মিশা গর্ডন[১] ব’সে ছিলো। তার বাবার সঙ্গে ভ্রমণ করছে সে—তিনি একজন ওরেনবার্গ-নিবাসী আইন-ব্যবসায়ী। এগারো বছরের বালক মিশা,- ভাবুকের মতো মুখ তার, গভীর আর কালো তার চোখ। স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র—তার বাবা, গ্রিগরি ওসিপোভিচ গর্ডন সম্প্রতি মস্কোতে এক নতুন পদে বহাল হয়েছেন। নতুন সংসার গুছিয়ে নিতে মেয়েদের নিয়ে তার মা তাদের আগেই মস্কো চ’লে গেছেন।
[১. রাশিরাতে সাধারণত গর্ডন একটি ইহুদি পাখি।]
আজ তিন দিন হ’লো মিশা বাবার সঙ্গে বেরিয়েছে।
মাঠ, উপত্যকা, গ্রাম আর শহর নিয়ে রাশিয়া তাদের চোখের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে, সূর্যের আলোয় তার রং খড়ির মতো শাদা, উত্তপ্ত ধুলো মেঘের মতো ঢেকে রেখেছে।
পথে দেখা যায় সার-বাঁধা গাড়ি-ঘোড়া। ঘুন্টিঘরের কাছে এলোমেলোভাবে ঘেঁষাঘেঁষি ক’রে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে গাড়িগুলো। দুরস্তগতি রেলগাড়ি থেকে মনে হয় যেন গাড়িগুলো অচল হ’য়ে আছে আর ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে- দাঁড়িয়ে পা নাড়ছে।
বড়ো-বড়ো ইস্টেশনে গাড়ি থামলেই যাত্রীরা ঝুপঝাপ নেমে এলোমেলো- ভাবে ছুটোছুটি ক’রে কোনো-না-কোনো খাবার দোকানে ঢুকে পড়ে। সূর্য তখন ইস্টেশনের বাগানের পেছনে অস্ত যায়, লাল রঙে ছুপিয়ে দেয় যাত্রীদের পা, রেলগাড়ির চাকাগুলিকে।
জগতে যতো রকম গতি আছে, তাদের আলাদ। ক’রে দেখলে মনে হয় আত্মস্থ ও সুচিন্তিত, কিন্তু একসঙ্গে দেখলে সেগুলো হ’য়ে ওঠে সুখের ঘোরে মাতাল——জীবনের যে-স্রোত সেগুলোকে এক ক’রে দিয়ে ঠেলে এগিয়ে নিচ্ছে, তার নেশায় মাতাল। সবাই খাটে, সংগ্রাম করে, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর উদ্বেগ তাদের টেনে নিয়ে যায়, কিন্তু তাদের সকল কর্মের এই উৎসগুলি শেষ ক’রে দিতো, থামিয়ে দিতো এই যন্ত্র, যদি না সর্বব্যাপী এক গভীর নিরাসক্তির অনুভূতি বাধা দিতো তাদের। আর এই নিরাসক্তির কারণ এক সান্ত্বনাজনক বিশ্বাস যে তাদের স্বতন্ত্র জীবনগুলি এক সূত্রে বাঁধা, এক আনন্দময় আশ্বাস যে, এই পৃথিবীতে যা-কিছু ঘটে তা শুধু এই মর্ত্য- ভূমিতেই ঘটে না—যার মাটিতে কবর দেওয়া হয় মৃতদের—সব ঘটছে—অন্য এক জগতেও, যে-জগতের নাম কারো কাছে ঈশ্বরের দেশ, কারো কাছে ইতিহাস, কারো কাছে বা অন্য কিছু।
কিন্তু মিশার মনে হয় যে তার তিক্ত দুর্ভাগ্যবশত সে এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। এক অশাস্ত উদ্বেগ এই বালক দার্শনিককে প্রায়ই আচ্ছন্ন ক’রে রাখে, এ-পৃথিবীর অন্য সকলে যে-নিরাসক্তি ভোগ করে তা তাকে স্বস্তি দেয় না, মহিমান্বিত করে না। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত তার চরিত্রলক্ষণ বিষয়ে সে সচেতন; অসুস্থ এক আত্মচেতনার সঙ্গে নিজের চরিত্রের এই ব্যতিক্রমকে সে লক্ষ করে। তার নিজের স্বভাব তাকে যন্ত্রণা দেয়, নিজেকে ছোটো মনে হয় মিশার।
তার এমন সময় মনে পড়ে না যখন এই চিন্তা তাকে বিব্রত করেনি যে পৃথিবীর আর পাঁচজন মানুষের মতোই হাত আর পা, ভাষা আর জীবনযাত্রার পদ্ধতি নিয়ে কী ক’রে সে এতো ভিন্ন হ’তে পারলো — এমন একজন হ’তে পারলো যাকে এতো কম লোকে পছন্দ করে, যাকে কেউ ভালোবাসে না? সে বুঝতে পারে না, একবার অন্য সকলের চাইতে খারাপ হ’লে আর কেন শত চেষ্টাতেও নিজেকে উন্নত করা যায় না। ইহুদি হওয়ার মানেটা কী? উদ্দেশ্য কী? অস্ত্রবিহীন এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার পুরস্কার কী, যুক্তি কী—এর জন্য কেবলমাত্র শোক ছাড়া অন্য কিছুই তো তারা পায় না।
সে তার সমস্যাটি তার বাবার কাছে উপস্থিত করেছিলো। তিনি জানালেন যে তার প্রতিপাদ্যগুলি অবাস্তব, সে যেন তার মনে এমন তর্কের স্থান আর না দেয়, কিন্তু এমন কোনো সমাধান বাবা বলতে পারলেন না যার গভীরতা তাকে আকৃষ্ট করতে পারে, অথবা অনিবার্যকে নিঃশব্দে মেনে নেবার ক্ষমতা দেয়।
ক্রমে, নিজের মা-বাবা বাদে অন্য সব পরিণতবয়স্ক ব্যক্তির প্রতি অবজ্ঞায় তার মন ভ’রে উঠলো—সমস্যার এই জট এঁরাই তো পাকিয়েছেন, অথচ খুলতে পারেন না—এতোই অক্ষম। সে নিশ্চিত জানে বড়ো হ’য়ে সব সমস্যার সমাধান করবে সে।
বড়োদের অক্ষমতার উদাহরণও সে দিতে পারে। ঐ উন্মাদ লোকটি যখন হঠাৎ রেলের কামরা থেকে ছুটে বারান্দায় বেরিয়ে গেলো, তখন বাবার যে তার পেছনে ছোটাটা উচিত হয়নি সে-কথাটাও তো ওরা কেউ ব’লে দিতে পারতো? লোকটি ধাক্কা দিয়ে বাবাকে সরিয়ে দিলো, বিদ্যুতের গতিতে চলন্ত গাড়ির দরজা খুলে বাইরে লাফিয়ে পড়লো—প্রথমে বাড়িয়ে দিয়েছিলো তার মাথাটা, দেখে মনে হ’তে পারতো এক সাঁতারু তার সাঁতারের পাটাতন থেকে ঝাঁপ দিচ্ছে। বাবা চেন টেনে তক্ষুনি গাড়ি থামালেন–তখনো তো বড়োরা কেউ বারণ করতে পারতো বাবাকে?
অথচ এখন— যেহেতু গাড়িটা একযুগ ধ’রে থেমেই আছে, এবং যেহেতু গাড়ির সমস্ত যাত্রীর মধ্যে একমাত্র গ্রেগরি অসিপোভিচ-ই শেকল টেনেছিলেন, সকলের ভাবটা এখন এই রকম যেন গর্ডন-পরিবারই এই বিরক্তিকর ঘটনার জন্য দায়ী।
এই দীর্ঘ বিলম্বের সঠিক কারণ কেউই বুঝতে পারছিলো না। কেউ বললে যে হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে থামার ফলে গাড়ির ব্রেকটা নাকি নষ্ট হ’য়ে গেছে, কেউ বললে, খাড়াই পাথরের পথের উপর নেমেছে ব’লে আবার চলবার মতো বেগ সংগ্রহ করতে পারছে না গাড়িটা। তৃতীয় মতটি হ’লো, যে যিনি আত্মহত্যা করলেন তিনি নাকি এক খ্যাতনামা ব্যক্তি; তাঁর উকিল, যিনি তাঁর সঙ্গে চলেছিলেন, জেদ ধরেছেন সবচেয়ে কাছের স্টেশন, কলোগ্রিভভকায় খবর পাঠানোর জন্য—সেখান থেকে লোকজন আসুক, যথাবিহিত একটা বিবৃতি লেখা হোক। এঞ্জিন-ড্রাইভারের সহকারী সেইজন্য টেলিগ্রাফ পোলের উপর উঠে গেলো : কলো গ্রিভভকা থেকে ওঁরা এতোক্ষণে রঙনাও হ’য়ে পড়েছেন হয়তো।
রেল-কামরার বাথরুম থেকে একটা ক্ষীণ দুর্গন্ধ ভেসে আসছিলো; ও-ডি-কোলনের সুগন্ধ তাকে ঢাকতে পারেনি—আর সেইসঙ্গে ভাজা মুরগির গন্ধ, একটু বাসি মাংসটা, নোংরা চর্বিতে মাখামাখি এক টুকরো কাগজে জড়ানো। পিটার্সবার্গ থেকে আগত কয়েকটি মহিলা —যাঁদের চুলে পাক ধরেছে, কথা বলতে গলা কাঁপে আর সর্দি-বসা বুক থেকে ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরোয়, এবং যাঁদের এখন ট্রেনের কয়লার কালি আর মুখের উগ্র রঙের মিশ্রণে জিপসিদের মতো দেখাচ্ছে—যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে মুখে পাউডার ঘষছেন আর রুমালে আঙুল মুচছেন। যেন ট্রেনের বারান্দার সংকীর্ণতার জন্যই, চপল ভঙ্গিতে কাঁধ মোচড়াতে-মোচড়াতে তাঁরা যখন গর্ডনদের কামরার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, মিশার মনে হচ্ছিলো চাপা ঠোঁটের ফাক দিয়ে ওরা যেন ফোঁশফোঁশ করছেন : ‘দ্যাখো না! কী সব লজ্জাবতী লতা রে! নিজেদের কী আশ্চর্য জীবই না জানি ভাবে ওরা। বুদ্ধিজীবী! এ-সব আবার ওদের সহ্য হয় না!’
আত্মহত্যাকারীর দেহটি নদীর তীরে ঘাসের উপর শোয়ানো আছে। ফাটা কপাল বেয়ে রক্ত বেরিয়ে এসে সারা মুখে অসংখ্য উল্কি এঁকেছে। শুকনো সেই রক্ত দেখে ঐ ব্যক্তিরই দেহের অংশ ব’লে এখন আর মনে হয় না, বাসি রক্তটা এখন তার থেকে বিচ্ছিন্ন অন্য কোনো পদার্থ হ’য়ে গেছে, স্টিকিং প্লাস্টারের মতো, কাদার মতো, ভেজা বার্চপাতার মতো। জনতার কৌতূহলী আর সমবেদনাশীল দল সারাক্ষণ ঘিরে আছে মৃতদেহটিকে। আর মৃত ব্যক্তির ভ্রমণের সঙ্গী ও বন্ধু—সেই হৃষ্টপুষ্ট রুক্ষ উকিল মশাই ভাবলেন হীন মুখ নিয়ে বিরক্তভাবে দাড়িয়ে আছেন,—তাঁকে দেখাচ্ছে যেন ঘামে ভেজা শার্ট গায়ে একটি সুসভ্য জানোয়ার। গরমে ম’রে যাচ্ছিলেন ভদ্রলোক, টুপি খুলে হাওয়া করছেন নিজেকে। সব প্রশ্নের উত্তরেই কাঁধ ঝেঁকে একবার ও ফিরে না-তাকিয়ে রাগি আওয়াজে বলছেন, ‘মাতাল ছিলো। এ ছাড়া আর অন্য কী আশা করা যায় এদের কাছে? ডিলিরাম ট্রিমেন্স —আবার কী?’
উলের পোষাক পরা লেসের রুমাল জড়ানো, রোগা একটি বৃদ্ধ। দু’একবার মৃতদেহটার কাছে গিয়ে দাড়ালো। বিধবা সে, টিভেরজিনা তার নাম তার দুই ছেলে রেলের ড্রাইভার, তাই পাশ পেয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে দুই ছেলের বৌকে নিয়ে সে চলেছে। গুরু-মার পেছন-পেছন সন্ন্যাসিনীদের মতো শাস্ত ভঙ্গিতে তার দুই বৌও তার পেছন-পেছন মৃতের কাছে এলো, গায়ের কাপড় ঘোমটার মতো ক’রে তাদের মাথার উপর গুটোনো। ভিড় স’রে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য জায়গা ক’রে দিলো।
রেলেরই এক দুর্ঘটনায় টিভেরজিনার স্বামী আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলো। মৃতের একটু দূরে এমন জায়গায় সে দাড়ালো, ভিড় সত্ত্বেও যেখান থেকে দেহটি দেখা যায়। যেন অন্য মৃত্যুটির সঙ্গে এই মৃত্যুর তুলনা ক’রে দীর্ঘশ্বাস পড়লো : ‘যার যেমন কপাল মনে-মনে সে এই কথাই যেন বললে : ‘কেউ মরে ভগবানের ইচ্ছায়, কিন্তু দ্যাখো না কাণ্ড! এই তো একজন, বিলাস-ভোগে ডুবে মাথা খারাপ হ’য়ে মরলো।
সব যাত্রীই বেরিয়ে এসেছে শবদেহটি দেখতে। কামরায় ফিরছে শুধুমাত্র মাল চুরি যাবার ভয়ে।
রেল-লাইনের উপর লাফিয়ে নামছে তারা। ফুল তুলতে তুলতে, অথবা পায়ের জড়ত। কাটাবার জন্য পাইচারি করতে-করতে তারা অনুভব করছিলো যেন গাড়ি থেমেছে ব’লেই জায়গাটার সৃষ্টি হয়েছে : যেন দুর্ঘটনাটি না-ঘটলে এই পচা জলাভূমি অথবা বিস্তৃত নদী, ঐ অট্টালিকা এবং ও-দিকের খাড়া পাড়ের গির্জেটার অস্তিত্ব থাকতো না।
এমনকি সূর্যও, আত্মহত্যার এই দৃশ্যের উপর সন্ধ্যার আলো ফেলতে- ফেলতে যখন গোয়াল থেকে বেরিয়ে আসা শাস্ত লাজুক গোরুর মতো ভিড়ের মধ্য দিয়ে উকি দিলো তখন তাকে মনে হ’লো যেন রঙ্গমঞ্চের পটে আঁকা, নিতান্তই এক স্থানীয় উদ্ভাস।
এই ঘটনা মিশাকে এমন গভীরভাবে নাড়া দিলো যে আকস্মিক আঘাতে ও সমবেদনায় সে প্রথমটায় কেঁদে ফেললে। তাদের এই দীর্ঘ রেল-পথে অনেকবার তাদের কামরায় এসে ঘণ্টার পর ঘন্টা মিশার বাবার সঙ্গে আলাপ ক’রে গেছেন ঐ মানুষটি—এখন যিনি ম’রে প’ড়ে আছেন। বলেছিলেন, মিশার বাবার নৈতিক নুরুচি, তাঁর জীবনের শান্তি, আর তাঁর বুদ্ধি তাঁকে স্বস্তির আস্বাদ দিয়েছে।
হুণ্ডি, সম্পত্তি বন্দোবন্তের দলিল, জোচ্চুরি, দেউলে হ’লে কী করতে হয়—এই সব আইন সম্বন্ধে খুঁটে-খুঁটে কতো প্রশ্নই না বাবাকে উনি করছিলেন। ‘আমি বিশ্বাস করি না।’ গর্ডনের জবাব শুনতে-শুনতে চেঁচিয়ে উঠেছেন ভদ্রলোক, ‘আইনেরও তা’হলে দয়া আছে? আমার উকিলের কথা শুনলে তো বড্ড মন-খারাপ হয়ে যায়।’
এই অস্থির অসুস্থ ব্যক্তির স্নায়ু যতোবারই শাস্ত হয়ে এসেছে, প্রথম শ্রেণীর কামরা থেকে বেরিয়ে তার ভ্রমণ-সঙ্গী তাকে ধ’রে প্রায় টানতে- টানতে নিয়ে গেছে খাবার কামরায় শ্যাম্পেনের সন্ধানে। সেই সঙ্গীটিই হৃষ্টপুষ্ট, অভদ্র, নিখুঁতভাবে দাড়ি কামানো, স্মার্ট পোষাক পরিহিত ঐ উকিল— কোনো ঘটনাতেই অবাক হবে না এমন চেহারা নিয়ে যে এখন মৃতকে আগলে দাঁড়িয়ে আছে। কী জানি কেন, তাকে দেখেই এ-কথা মনে হয় যে তার মক্কেলের অন্তহীন উত্তেজনা তার কিছু সুবিধে ক’রে দিয়েছে।
বাবা মিশাকে বললেন যে আত্মঘাতী ব্যক্তিটি হলেন বিখ্যাত, সদাশয় অথচ অত্যধিক অমিতাচারী এক কোটিপতি—তাঁর নাম জিভাগো—প্রায় অর্ধ-উন্মাদ অবস্থায় দিন-যাপন করছিলেন ইনি। মিশার উপস্থিতি হঠাৎ এক অসংযম এনেছিলো তাঁর মনে, ভদ্রলোক তাঁর মৃত স্ত্রী আর মিশার সমবয়স্ক ছেলের কথা তাদের কাছে বলছিলেন; তাঁর দ্বিতীয় সংসারের কথাও বলেছিলেন- প্রথমটির মতো সে-সংসারও তিনি পরিত্যাগ করেছেন। এ-কথা বলতে-বলতে অন্য কী কথা তাঁর মনে প’ড়ে গেছে, কী এক অজ্ঞাত ভয়ে ফ্যাকাশে হ’য়ে গেছে তাঁর মুখ, কথার খেই হারিয়ে তোলাতে শুরু করেছেন।
মিশার প্রতি অদ্ভুত তাঁর স্নেহ—তার অর্থ বোঝা যায় না—মনে হচ্ছিলো অন্য কারুর প্রাপ্যটা তাকে দিয়ে স্নেহাতুর হৃদয়কে শান্ত করবার চেষ্টা করছিলেন। বড়ো-বড়ো স্টেশনে, যেখানে প্রথম শ্রেণীর বিশ্রামাগারের বইয়ের দোকানে নানা রকমের খেলনা আর স্থানীয় জিনিষপত্র বিক্রি করে, গাড়ি থামলেই নেমে গিয়ে অজস্র উপহার কিনে এনে আচ্ছন্ন ক’রে দিচ্ছিলেন মিশাকে।
অবিশ্রান্ত মদ খেলেন ভদ্রলোক, অভিযোগ করলেন যে আজ তিন মাস ঘুম হয় না তাঁর; আর বললেন যে যদি কখনো একটু বা শাস্ত হ’তে পারেন যে-অসহ্য যন্ত্রণা তাঁকে ভোগ করতে হয় তা অন্য কারো পক্ষে অকল্পনীয়।
শেষবার ঝড়ের মতো তাদের কামরায় এলেন তিনি, গর্ডনের হাত সজোরে চেপে ধ’রে কী যেন বলতে চাইলেন, কিন্তু নিজেই বুঝলেন যে সে-কথা বলতে পারবেন না; তারপর ছিটকে বেরিয়ে বারান্দায় চ’লে গেলেন, চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাইরে।
মিশা ব’সে ব’সে জিভাগোর শেষ উপহার, উরালের ধাতু ভর্তি ছোট্টো কাঠের বাক্সটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগলো। হঠাৎ বাইরে ব্যস্ততা জেগে উঠেছে। উল্টোদিকের সমাস্তর লাইনের উপর একটা ট্রলি গড়াতে- গড়াতে এসে দাড়ালো। লাফিয়ে নামলেন একজন ডাক্তার, দু’জন পুলিশ ও চিহ্নিত টুপি মাথায় হাকিম সাহেব। নিরুত্তাপ কেজো গলায় প্রশ্ন ক’রে জ্ঞাতব্য বিষয়গুলি টুকে নিলেন ওঁরা। পুলিশ আর রেলের গার্ড বালির উপর নেমে অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে এগোলো, ছেঁচড়ে সেই শবদেহ তারা টেনে তুললো। এক চাষির বৌ সজোরে কেঁদে উঠলো। যাত্রীদের অনুরোধ করা হ’লো নিজের-নিজের জায়গায় ফিরে যেতে। গার্ড বাঁশি বাজালো, গাড়ি চললো।
