বেলা পাঁচটার গাড়ি – ২

সে-রাত মঠে কাটালো তারা। পুরোনো দিনের খাতিরে কোলিয়া-মামাকে সেখানে একটি ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো। সেদিন ছিলো পুণ্যময়ী কুমারীর বরদানের পার্বণ। কালই তাদের চ’লে যাবার কথা দক্ষিণে, ভলগার তীরের এক মফশ্বল শহরে—যেখানে কোলিয়া-মামা এক প্রকাশকের আপিশে কাজ করেন। প্রকাশকটি স্থানীয় প্রগতিশীল খবর কাগজের মালিক। টিকিট কাটা হ’য়ে গেছে, গুছোনো মালপত্রও মঠের কুঠুরিতে তৈরি। কাছেই রেল-লাইন। শান্টিং চলছে, এঞ্জিনের করুণ হুইসিলের আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আসে বাতাসে।

সন্ধেবেলা খুব ঠাণ্ডা পড়লো। কুঠুরির জানলা দুটি মেঝে পর্যন্ত নামানো। বাইরে দেখা যায় রান্নাঘরের পেছনে অবহেলিত ছোট্ট সব্জি খেত, তারপর একফালি সদর রাস্তা, যেখানে গর্তগুলিতে জল জমে বরফ হ’য়ে আছে- আর তারপর সেই কবরখানার একটি অংশ যেখানে আজই কিছুক্ষণ আগে মারিয়া নিকোলাএভনাকে কবর দেওয়া হয়েছিলো। রান্নাঘরের সব্জিক্ষেতে বিশেষ কিছু নেই, শুধু দেয়াল ঘেঁষে একেশিয়ার ঝোপ আর কয়েক সার বাঁধাকপি, শীতে নীল আর কুঁকড়োনো। এক-একবার হাওয়া দেয় আর পাতা-হারা একেশিয়াগুলি নাচতে শুরু করে যেন তাদের দানোয় পেয়েছে। মুয়ে প’ড়ে পথের সঙ্গে চেপ্টে যায় তারা।

রাত্রে সেই ছেলেটি, ইউরা, জানলায় যেন কার হাতের টোকা শুনে জেগে উঠেছিলো। কুঠুরির মধ্যে কাঁপছে এক শুভ্রতা, রহস্যময় অন্ধকার আলো হ’য়ে উঠেছে। সেই শীতে, গায়ে তার শার্ট ছাড়া কিছু নেই, সে ছুটে জানলার ধারে গিয়ে ঠাণ্ডা কাচের উপর তার মুখ চেপে ধরলো।

বাইরে রাস্তার কোনো চিহ্ন নেই, সব্জিক্ষেত আর কবরখানা মিলিয়ে গেছে, আছে শুধু তুষারের ঝড় আর বরফের ধোঁয়ার মতো বাতাস। সেই তুষার-ঝড় প্রায় যেন ইউরাকে দেখতে পেয়েছে, জেনেছে তার ভয় দেখাবার শক্তি কতোখানি। আর তাই যেন এতো গর্জন তার, এতো তীব্র চীৎকার; ইউরাকে বশ করার জন্য চেষ্টার কোনোই ত্রুটি করলে না, হাতে-হাতে ফল পেয়ে উল্লাসে মেতে উঠলো। আকাশে পাক খেয়ে ঘুরে-ঘুরে শুভ্রতার লম্বা- লম্বা বিরাট ফালি পৃথিবীতে ঝ’রে ঝ’রে মাটিকে যেন কাফুনে ঢেকে দিলে। এই তুষার-ঝড় জগতে আজ একা, তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

জানলার তাক থেকে নেমে এসে ইউরার প্রথম ঝোঁক হ’লো কাপড় পরে নিয়ে বাইরে যায়, কিছু-একটা করতে আরম্ভ করে। তার ভয় হলো পাছে ঐ বাঁধাকপির খেতটুকু বরফের তলায় ডুবে যায়—কেউ আর খুঁড়ে না তোলে। ভয় হ’লো পাছে তার মা, খোলা মাঠে কবরে শুয়ে শুয়ে অসহায় ভাবে মাটির গভীরে ডুবে যান—আরো গভীরে, তার কাছ থেকে অনেক দূরে।

আরো একবার কান্নায় শেষ হ’লে। তার ভাবনা। মামা জেগে উঠলেন, যীশুর কথা ব’লে চেষ্টা করলেন তাকে সান্ত্বনা দিতে। তারপর হাই তুলে চিন্তিতভাবে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারা কাপড় পরতে শুরু করলে। ভোর হ’য়ে এলো।