বেলা পাঁচটার গাড়ি – ১

‘শাশ্বত স্মৃতি’ গান গাইতে গাইতে তারা চলেছে। মাঝে-মাঝে গান থামে; আর যখনই থামে, তাদের পায়ের শব্দ, হাওয়ার ঝাপটা আর ঘোড়াগুলো মিলে যেন সেই গানকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

এই মিছিলটিকে এগুতে দেবার জন্য রাস্তার লোকেরা স’রে দাঁড়াচ্ছে, কেউ-কেউ ফুলের মালাগুলোকে গুনছে, কেউ বা ক্রুশচিহ্ন আঁকছে নিজের বুকে। কৌতূহলী কয়েকজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলে, ‘কে? কাকে কবর দেওয়া হচ্ছে?’ ‘জিভাগো, কেউ হয়তো জবাব দেয়। ‘ও, তাই!’ সঙ্গে-সঙ্গে আর একজন ব’লে ওঠে : ‘না, না, জিভাগো নন, তাঁর স্ত্রী।’ ‘ঐ একই হ’লো। অন্ত্যেষ্টির আয়োজন চমৎকার হয়েছে। ঈশ্বর মৃতের আত্মাকে শাস্তি দিন।’

শেষ মুহূর্তগুলি ঝলক তুলে মিলিয়ে গেলো। তাদের যেন গোনা যায়—আর কখনো তারা ফিরে আসবে না। ‘হে পরম প্রভু, তোমার এই প্রাণীসমাকীর্ণ, ঐশ্বর্যময়ী ধরণী, এই দীন প্রাণীও তোমার।’ পুরোহিত মারিয়া নিকোলাএভনার শবদেহের ওপর মাটি ছিটিয়ে-ছিটিয়ে ক্রুশচিহ্ন এঁকে দিলেন। ‘সজ্জনের আত্মা’ গান গাওয়া হ’লো। তারপর শুরু হ’য়ে গেলো এক ভীষণ ব্যস্ততা। কফিনের মুখে আঁটা হ’লো পেরেক, নাবানো হ’লো কবরের ভিতর। চারটে কোদাল দ্রুতবেগে ভরিয়ে তুললো কবর, আর সঙ্গে- সঙ্গে ফোটা-ফোটা বৃষ্টির মতো ঝুড়ি-ঝুড়ি মাটি কফিনের ঢাকনার উপর স্বছ শব্দে ঝ’রে পড়তে লাগলো। কবরের উপর উঁচু হ’য়ে উঠলো মাটির ঢিপি, একটি দশ বছরের ছেলে সেই ঢিপি বেয়ে উঠে দাড়ালো।

যে-কোনো বড়ো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সমাপ্তির পর লোকেরা কেমন নির্বোধ ও নিঃসাড় হ’য়ে পড়ে। সেইজন্য অনেকে ভাবলে ছেলেটি বুঝি তার মৃত মায়ের বিষয়ে কিছু বলতে চাইছে।

কিন্তু ছেলেটি সেই উঁচু জায়গা থেকে মাথা তুলে হেমস্তের রিক্ত প্রকৃতির উপর চোখ বুলিয়ে নিলো; তারপর তাকালো মঠের চুড়োগুলির দিকে কেমন এক উন্মত্ত দৃষ্টিতে। তার চ্যাপ্টা মুখ আর বোঁচা নাক বিকৃত হয়ে উঠলো; লম্বা ক’রে বাড়িয়ে দিলে গলা। যদি সে নেকড়ে-শিশু হ’তো তাহ’লে কাউকে ব’লে দিতে হ’তো না যে সে এখনই আর্তনাদ ক’রে উঠবে। দুই হাতের পাতায় মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ছেলেটি। বাতাস নেমে এলো তার ওপর, ঝাপটে-ঝাপটে হিম বৃষ্টি ছিটিয়ে চাবুক মারলে তার মুখে আর হাতের পাতায়। আঁটো আস্তিনওলা কালো রঙের পোষাক পরা এক ভদ্রলোক ধীরে কবরের ওপর উঠে এলেন। ইনি মারিয়া নিকোলাএভনার ভাই; এই শোকার্ত ছেলেটির মামা। এঁর নাম নিকোলে নিকোলেভিচ ভেডেনিয়াপিন। আগে ইনি ছিলেন পুরোহিত, সম্প্রতি স্বেচ্ছায় সেই আলখাল্লা পরিত্যাগ করেছেন।

তিনি এগিয়ে এলেন ছেলেটির কাছে, তারপর তাকে নিয়ে কবরখানা থেকে বেরিয়ে পড়লেন।