৪
১৯০৩ সালের এক গ্রীষ্মের সকাল। মায়ের মৃত্যুর ঠিক দু-বছর পরে ইউরা তার মামার সঙ্গে ঘোড়ায় টানা এক খোলা গাড়ি চ’ড়ে মাঠের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। ইভান ইভানোভিচ ভস্কোবয়নিকভের সঙ্গে দেখা করতে চলেছে তারা। ইনি একজন শিক্ষক, এঁর লেখা পাঠ্যবইগুলির খুব কাটতি; থাকেন ডুপ্লিয়ানকাতে। কলোগ্রিভভ, এক রেশম ব্যবসায়ী আর শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক, তাঁরই জমিদারি এই গ্রাম।
কাজানের দিব্যকুমারীর স্মৃতিবার্ষিকী আজ। ধানকাটার মরশুম চলছে এখন, কিন্তু পরবের জন্য, কি হয়তো দুপুরবেলার বিশ্রামের জন্য, কাউকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। অর্ধেক-নিড়োনো খেতগুলো রোদ্দুরে ঝলসে যাচ্ছে, জেলখানার কয়েদির আধখানা কামানো মাথার মতো। মাথার উপর গোল হ’য়ে উড়ে বেড়াচ্ছে পাখিরা। আর পাকা গমের শিষগুলি খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—একেবারে স্তব্ধ। সদর রাস্তা থেকে একটু দূরে কাটা শস্যের স্ত‚পের পেছন থেকে হঠাৎ কয়েকটি লম্বা শিষ মাথা উঁচু ক’রে দাঁড়িয়ে ওঠে, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হ’তে পারে ওরা যেন ধীরে নড়ছে, জমির ঠিকেদার যেন ওরা, কোথায় কী কাজ হচ্ছে তার তদারকি করতে-করতে সুদূর দিগন্তে হেঁটে বেড়ায়।
‘এই সব জমি জমিদারের, না চাষিদের নিজের?’ নিকোলে নিকোলেভিচ পাভেলকে জিজ্ঞাসা করলেন। পাভেল সেই প্রকাশকের কাছে ফাইফরমাস খাটার কাজ করে। এখন সে গাড়ি চালাচ্ছে। কাঁধ উঁচু ক’রে, ঘাড় কুঁজো ক’রে, অদ্ভুত ভঙ্গিতে এক পায়ের উপর আরেক পা দিয়ে ব’সে যতোটা সম্ভব বুঝিয়ে দিচ্ছে যে গাড়ি চালানো আসলে মোটেও তার কাজ নয়।
‘মালিকের।’ পাইপে আগুন ধরিয়ে পাভেল তাতে টান দিলে। অনেকক্ষণ চুপচাপ। ঘোড়ার পিঠে চাবুক পড়লো, গাড়ির মুখ অন্যদিকে ঘুরতেই পাভেল বললে, ‘আর এই সব জমি আমাদের—। আরে ধুশ, শালা—’ ঘোড়াগুলিকে গাল দিয়ে উঠলো সে। এঞ্জিনচালক যে-ভাবে তার কলকব্জা’র দিকে দৃষ্টি রাখে ঘোড়াগুলির ল্যাজ আর কাধের উপর সে ঠিক সেইভাবে নজর রেখেছে। কিন্তু পৃথিবীর অন্য যে-কোনো ঘোড়ার যা স্বভাব, এই ঘোড়া দুটোরও তা-ই, সামনেরটি অতিশয় সরল হৃদয়ে শান্ত চিত্তে গাড়ি টানছে[১]; আর পেছনের ঘোড়াটা রাজহাসেব মতো এমনভাবে ঘাড় বেঁকিয়ে আছে যে অনভিজ্ঞের মনে হ’তে পারে সে এক্কেবারে কুঁড়ের বাদশা—ঘণ্টার আওয়াজে তাল দিয়ে দিয়ে লাফানো ছাড়া যার আর কোনো কাজ নেই।
[১. গাড়িটা ট্রয়কা জাতীয়, কিন্তু এক ঘোড়ার বদলে দুই ঘোড়ায় টানছে।]
ভম্বোবয়নিকভের লেখা জমি ও কৃষি বিষয়ে একটি বইয়ের প্রুফ নিয়ে চলেছিলেন নিকোলে নিকোলেভিচ। এদিকে আবার সেন্সর ক্রমশ কড়া হচ্ছে : প্রকাশক লেখককে বলেছেন বইটা আর-একবার আগাগোড়া প’ড়ে দিতে।
‘এদিককার লোকেরা যা-সব শুরু করেছে, পাভেলকে লক্ষ ক’রে মামা বললেন, ‘এই তো সেদিন এক ব্যাবসাদারের গলা কাটলো, আবার শুনছি জেমস্কির[২] আস্তাবলটা পুড়িয়ে দিয়েছে। কী মনে হয় তোমার? তোমাদের গাঁয়ের লোকেরা সব বলছে কী?’
[২. জেমস্কি (zomsky) গ্রামীন বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে।]
কিন্তু পাভেলের মত, স্পষ্ট বোঝা গেলো, এ-বিষয়ে বড় কড়া— যে সেন্সরের ইচ্ছা-অনুসারে কৃষি-সমস্যা বিষয়ে ভস্কোবয়নিকভ-এর তীব্র মতামতগুলোকে নরম করার দরকার হচ্ছে—তার চেয়েও কড়া। ‘কী আশা করেন ওদের কাছ থেকে? নাগালের বাইরে চলে গেছে ওরা। বড্ড বেশি ভালো ব্যবহার করা হয়েছে ওদের সঙ্গে—আরে আমাদের জাতের লোকেদের সঙ্গে কি এ-রকম ব্যবহার করতে আছে? একবার লাই দিয়ে দেখুন না ওই চাষাদের, প্রত্যেকে প্রত্যেকের উপর ঝাঁপিয়ে প’ড়ে টুটি চেপে ধরবে- আরে চল ব্যাটা, চল।’
ইউরা মামার সঙ্গে আরো একবার ডুপ্লিয়ানকাতে এসেছিলো। তার ধারণা ছিলো সে রাস্তা চেনে—তাই যখনই দেখেছে পথের দু-পাশে, সামনে পেছনে, এলোমেলো কিছু গাছ নিয়ে ছোটো ছোটো বন—চেনা লেগেছে তার, আশা করেছে এইবার রাস্ত। ডাইনে বেঁকবে, আর সে দূরে দেখতে পাবে অস্পষ্ট ছবির মতে। কলগ্রিভভের জমিদারির দশ মাইল জোড়া উন্মুক্ত পল্লী-প্রকৃতি—দূরে নদীর জল রোদে কেমন ঝকঝকে, আর সেই নদীর পেছনে রেল-লাইন। কিন্তু প্রত্যেকবারই ভুল করেছে। মাঠের পর মাঠ, আর মাঠকে গ্রাস ক’রে বন। ক্রমান্বয়ে উন্মোচিত এই বিশাল প্রকৃতির দৃশ্যাবলী যাত্রীদের মনে এক বিপুল ব্যাপ্তির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে— তাদের ভাবায়, স্বপ্ন দেখায় ভবিষ্যতের।
পরে যে-সব বই লিখে নিকোলে নিকোলেভিচ বিখ্যাত হয়েছিলেন তার একটাও এই সময়ে লেখা হয়নি, কিন্তু তাঁর ধ্যান-ধারণাগুলি সম্পূর্ণ আকার নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তবু, তিনি নিজে জানতে পারেন নি যে তাঁর সময় আসন্ন।
শিগগিরই তাঁর সমসাময়িক লেখক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত দার্শনিকদের মধ্যে তিনিও গণ্য হবেন, এমন একজন ব’লে স্বীকৃত হবেন যিনি ওঁদের সকলের সঙ্গে একই চিন্তায় অংশ নিয়েও শুধুমাত্র সেই চিন্তার ভাষা ছাড়া অন্য সকল বিষয়ে ভিন্ন। এঁরা প্রত্যেকে ব্যতিক্রমহীনভাবে একটা-না-একটা বুলি আঁকড়ে থাকেন, সন্তুষ্ট থাকেন কথা আর বাইরের খোলসটা নিয়ে; কিন্তু তিনি, সন্ন্যাসী নিকোলে, ধর্মযাজক নিকোলে, যিনি একই সঙ্গে টলস্টয়ের শিষ্য আর আদর্শবাদী বিপ্লবী, এখনো তাঁর প্রব্রজ্যা শেষ হয়নি। তাঁর আকৃতি এমন এক নীতির জন্ম, আবেগে যার জন্ম, অথচ মূর্ত যার অবয়ব, যা পথ দেখিয়ে দেবে, এই পৃথিবীকে বদলে দেবে, ডেকে আনবে মঙ্গলকে; এমন এক চিন্তা যা এমনকি শিশুর কাছে অথবা মূর্খ বোকার কাছেও বিদ্যুতের মতো, বজ্রের মতো স্পষ্ট। তাঁর আকৃতি নতুনের জন্য।
মামার কাছে থাকতে ভালো লাগতো ইউরার। মামা তাঁকে তার মায়ের কথা মনে করিয়ে দেন। মায়ের মতোই তাঁর মুক্ত মন আর অপরিচিতকে গ্রহণ করার উন্মুখতা। সমস্ত প্রাণীর প্রতি তাঁর অভিজাত সমতাবোধ; তিনিও এক পলকে সব-কিছু বুঝে ফেলেন। যে-কোনো ভাবনার উন্মেষের সঙ্গে-সঙ্গে তার অর্থ ও প্রাণ হারিয়ে যাবার আগেই তিনি তা প্রকাশ করতে পারেন।
মামা যে তাকে ডুপ্লিয়ানকাতে নিয়ে যাচ্ছেন ইউরা তাতে খুশি হয়েছে। সুন্দর গ্রাম ডুপ্লিয়ানকা। এই গ্রামও তার মাকে মনে পড়িয়ে দেয় — মা প্রকৃতি ভালোবাসতেন, ইউরাকে প্রায়ই গ্রামে হাঁটতে নিয়ে যেতেন।
নিকি ডুডোরভের সঙ্গে দেখা করার জন্যও উদগ্রীব হ’য়ে আছে সে, যদিও নিকি ইউরার চাইতে বয়সে দু-বছরের বড়ো ব’লে তাকে খুব সম্ভব অবজ্ঞার চোখেই, দেখে। নিকি ইস্কুলের ছাত্র, ভস্কোবয়নিকভের বাড়িতে থাকে। ইউরার সঙ্গে হাত ঝাঁকাবার সময় শরীরের সব শক্তি খাটিয়ে এমনভাবে হাতটাকে নিজের দিকে ঝাঁকায় আর মাথাটা এতে। নিচু করে যে কপালের উপর চুল এসে প’ড়ে আধখানা মুখই ঢেকে দেয় তার।
