৫
‘দারিদ্র্য-সমস্যার স্নায়ুতন্ত্র হ’লো—’ নিকোলে নিকোলেভিচ পরিমার্জিত পাণ্ডুলিপি থেকে পড়লেন।
‘“নির্যাস” আরো ভালো হবে—’ এই ব’লে ইভান ইভানোভিচ গেলি-প্রুফে সংশোধন করলেন।
ঢাকা বারান্দার আধো-অন্ধকারে ব’সে কাজ করছিলেন দু-জনে। চার- পাশে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে ফুল গাছে জল দেবার ঝারি, খুরপি আর কোদাল, একটা ভাঙা চেয়ারের পিঠের উপর একটা বর্ষাতি রাখা, মস্ত ভারি ভারি গলোশগুলো[১] কর্দমাক্ত অবস্থায় এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, মাথাগুলো বেঁকে পড়েছে মেঝের উপর।
[১. গলোশ : বৃষ্টি ও বরফে ব্যবহারের জন্য রবারের জুতো।]
‘অপর পক্ষে, জন্ম ও মৃত্যুর হার প্রমাণ করে নিকোলে নিকোলেভিচ প’ড়ে শোনালেন।
“এ-বছরের” কথাটা যোগ ক’রে দাও,’ ব’লে ইভান ইভানোভিচ নিজেও কাগজে কথাটা লিখে রাখলেন। কিছু নতুন খসড়া আবার তৈরি হ’লো। গ্রানাইটের টুকরোগুলি কাগজ-চাপার কাজ করছে।
কাজ শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গে নিকোলে নিকোলেভিচ বিদায় নিতে চাইলেন। ‘ঝড় আসছে। এখন যেতে হয়।’
“না, না, যাবে কোথায়? তোমাকে যেতে দিচ্ছি না এখন। এসো, একটু চা খাওয়া যাক এবার।
‘কিন্তু সন্ধের আগেই যে আমার শহরে পৌঁছনো দরকার।’
‘ও-সব বাজে কথা ব’লে লাভ নেই। আমি শুনবো না।’
বাগানে চা দেওয়া হ’লো। তামাক আর সূর্যমুখী ফুলের মেশানো গন্ধ ডুবিয়ে দিয়ে সামোভার থেকে হঠাৎ কাঠকয়লার ধোঁয়া পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলো। একটি দাসী ট্রে-তে সাজিয়ে নিয়ে এলো ঘন ক্রীম, জাম-ফল, আর পনিরের পিঠে। পাভেল নাকি নদীতে স্নান করতে গেছে, ঘোড়া দুটোকেও নিয়ে গেছে সঙ্গে। নিকোলে নিকোলেভিচ সুতরাং অপেক্ষা করতে বাধ্য হলেন।
‘চলো না, চা হ’তে-হ’তে নদীর ধার থেকে ঘুরে আসি’, ইভান ইভানোভিচ বললেন।
কলোগ্রিভভের সঙ্গে বন্ধুতার খাতিরে স্বয়ং নায়েব-মশাইয়ের বাড়ির দুটো ঘর ব্যবহার করার অধিকার পেয়েছেন তিনি। সামনে নিজস্ব এক টুকরো বাগান নিয়ে বাড়ি, পার্কের এক অবহেলিত কোণ ঘেঁষে। লম্বা রাস্তার পাশেই সাবেক কালের গাড়ি আসার রাস্তা, এখন ঘন ঘাসে আচ্ছন্ন। জঞ্জাল জমা করার নালার দিকে গাড়ি চলে এই পথ দিয়ে, তা ছাড়া অন্য কোনো কাজের জন্য আর আজকাল কেউ ব্যবহার করে না। কোটিপতি কলো গ্রিভভ মানুষটি প্রগতিশীল, আজকের এই বিপ্লবের জন্য দরদ আছে তাঁর প্রাণে–সস্ত্রীক তিনি বাইরে থাকেন। এখানে আছে কেবল তাঁর দুই মেয়ে, নাডিয়া আর লিপা; তাদের সঙ্গে থাকেন তাদের শিক্ষয়িত্রী, আর পরিচারকবৃন্দ।
ডাঃ জি ভা গো
२
নকল হ্রদ আর ছাঁটা ঘাসের জমি দিয়ে ঘেরা নায়েব মশাইয়ের বাড়ি আর বাগান। পুরু মেহেদির বেড়ায় পার্ক থেকে আলাদা হ’য়ে আছে। সেই বেড়ার ধার ঘেঁষে দুজনে হাঁটতে লাগলেন আর একটুক্ষণ পর পর ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে ছোটো ছোটো চড়ুইয়ের দল ডানা ঝাপটে উড়ে যেতে লাগলো তাদের সামনে দিয়ে। মৌচাকে মৌমাছির মতো মেহেদির ঝোপে বাসা পেতেছে এই পাখিরা, পরস্পরের কানে কতো কথাই না বলে, সরু নালার মধ্য দিয়ে জল ব’য়ে চলার মতো শব্দে ওদের কিচিরমিচির ঝোপগুলিকে ভ’রে রেখেছে।
গাছপালার ঘর, মালির ঘর, ভাঙা পাথরের স্তূপ—কে জানে কোন আমলের—ছাড়িয়ে গেলেন দু’জনে। সাহিত্য ও চিন্তার জগতে নতুন কোনো প্রতিভার স্বাক্ষর পড়েছে কিনা এই নিয়ে কথা বলছেন তাঁরা।
‘প্রতিভাবান কেউ নেই, এ-কথা বলা যায় না, নিকোলে নিকোলেভিচ বললেন, ‘তবে তাঁরা বড়ো নিঃসঙ্গ। এখন তো আবার “দলে”র হুজুগ উঠেছে, সাধারণ লোকের প্রধান লক্ষণই হ’লো এই যে তারা দল বেঁধে থাকে, তাদের গুরু সলোভিয়েভ, কাণ্ট বা মার্ক্স, যে-ই হোক না। কিন্তু সত্য যারা খোঁজে তারা একাই খোঁজে, এবং এই সত্যকে যারা যথেষ্ট ভালোবাসে না তাদের সঙ্গে এই প্রকৃত সত্যকামীদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হ’য়ে যায়। ক’টা জিনিসই বা আছে, বলো, এই পৃথিবীতে, যার আনুগত্য আমরা মনে-প্রাণে স্বীকার করতে পারি? সত্যিই খুব কম। এইজন্য আমার মাঝে-মাঝে মনে হয় শরীর ক্ষয়শীল, কিন্তু আত্মা যে অমর এ-কথা বিশ্বাস না করলে বাঁচা যায় না—কারণ অমরত্ব মানেই তো জীবন, অমরত্ব জীবনের আরো অর্থপূর্ণ এক নাম। আত্মার প্রতি, খৃষ্টের প্রতি আস্থা না-থাকলে সত্যকে জানা যায় না। —কিন্তু তুমি বিরক্ত হচ্ছো। একটা বর্ণও তোমার মাথায় ঢোকেনি—জানি আমি।’
‘হু,’ ইভান ইভানোভিচ জবাব দিলেন। রোগা চেহারা, সোনালি রঙের চুল, ঈল মাছের মতো অস্থির স্বভাব, আর থুৎনিতে ছোট্ট একটু দুষ্টু দাড়ি থাকায় তাঁকে দেখতে হয়েছে লিঙ্কনের সমসাময়িক কোনো আমেরিকান ভদ্রলোকের মতো। একটি হাত সর্বদাই ন্যাস্ত আছে সেই দাড়ির ডগায়। কেবলই সেই দাড়ি হাতে পাকিয়ে তার ডগাটা কামড়াতে থাকেন। ‘আমার কিছুই বলবার নেই অবশ্য। তুমি তো জানো, এ-বিষয়ে আমার মত তোমার থেকে ভিন্ন। কিন্তু তুমি যখন ঐ দলের কথা তুললেই তখন জিজ্ঞেস করি, পুরুঠাকুরের আলখাল্লা ছাড়বার সময় কেমন লেগেছিলো তোমার? অন্তত তখনকার মতো একটু ভয় যে পেয়েছিলে এ-কথা আমি বাজি রেখে বলতে পারি। ওরা খুব শাপ-শাপান্ত করেনি তোমাকে?”
‘তুমি প্রসঙ্গটা বদলাতে চাইছো। তা যাই হোক—না, আমাকে শাপ- শাপান্ত করেনি ওরা; ও-সব আর হয় না আজকাল। তা খানিকটা বিশ্রী লেগেছিলো বইকি, কিছু-কিছু ফলও ভুগতে হয়েছে। যেমন ধরো, অনেকদিন পর্যন্ত আমাকে আর সরকারি চাকরি দেবে না, মস্কো বা পিটার্সবার্গে আমার যাওয়া বারণ। কিন্তু এ-সব খুব ছোটো কথাই। আমি একটু আগে বলছিলাম -যীশুর প্রতি আস্থা রাখতে হবে আমাদের। বুঝিয়ে বলছি কথাটা। এ-কথাটা তুমি বুঝতে পারছো না যে আমি নাস্তিক হ’তে পারি, ঈশ্বর যে আছেন বা কেন তাঁকে থাকতে হবে তা না-জানতে পারি—আর তবু পারি বিশ্বাস করতে যে মানুষের বাসা প্রকৃতির মধ্যে নয়, ইতিহাসের মধ্যে, আর ইতিহাস বলতে আমরা যা বুঝি তার আরম্ভ যীশুতে, তাঁরই বাণীর উপর তিনি তাকে প্রতিষ্ঠা ক’রে গেছেন। এখন — ইতিহাস কী, বলো তো? ইতিহাস সেই কাজেরই আরম্ভের নাম, মানুষ অনেক, অনেক শতাব্দী ধ’রে ধারাবাহিকভাবে যা ক’রে যাচ্ছে—যার লক্ষ্য হ’লো মৃত্যুর হেঁয়ালির সমাধান করা, যাতে কিনা মৃত্যুকেও শেষ পর্যন্ত জয় করা যায়। সেইজন্যই মানুষ সিম্ফনি রচনা করে, আবিষ্কার করে ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক তরঙ্গ আর গণিতের অসীম। কিন্তু আত্মার জাগরণ ভিন্ন এ-ভাবে এগুলো সম্ভব নয়। আধ্যাত্মিক ক্ষমতা না-থাকলে এই আবিষ্কার করতে পারবে না তুমি, আর তার জন্য যা-কিছু প্রয়োজন সব আমরা পাবো যীশুর বাণীতে। সেটা কী? প্রথমত, জীবনের পরম নির্যাস আপন প্রতিবেশীর জন্য প্রেম। এই প্রেম যদি একবার আমাদের হৃদয় ভ’রে তোলে তাহ’লে তাকে উপচে প’ড়ে নিঃশেষিত ক’রে ফেলতে হয় নিজেকে। আর দ্বিতীয়ত, যে-ছুটি ধারণা আধুনিক মানুষের প্রধান আশ্রয় বলা চলে—যা ছাড়া আধুনিক মানুষকে কল্পনা করা যায় না–ব্যক্তির সত্ত্বাকে স্বাধীন ও জীবনকে আত্মত্যাগ রূপে দেখা।–মনে রেখো, এই সমস্ত চিন্তা এখনো নতুন। প্রাচীন জগতে এই অর্থে কোনো ইতিহাসের চেতনা ছিলো না। তৎকালীন রক্তপাত আর পাশবিকতা, নিষ্ঠুরতা আর বিষাক্ত কালিগুলাদের মধ্যে আমরা এমন ধারণার আঁচটুকু পাই না যে যে-কেউ অপরকে দাসে পরিণত করে সে নিজেই অধম। সেকালের ব্রোজ ও মর্মরের স্তম্ভগুলির অমরত্বকে মনে হয় মৃত ও দাম্ভিক। তবু মাত্র খৃষ্টের জন্মের পরই মানুষ ও মহাকাল সহজে নিশ্বাস ফেলতে শুরু করলো। শুধুমাত্র তাঁর আবির্ভাবের পরেই মানুষ ভবিষ্যতে বাস করতে শিখেছে। কুকুরের মতো গর্তে প’চে আর তারা মরবে না, বরং তাদের মৃত্যু আসবে নিজের বাড়িতে, ইতিহাসের পাতায়। যখন তারা সেই মৃত্যুরই বিজয়ে রত—সেই লক্ষ্যের কাছেই নিজেদের তারা উৎসর্গ করেছে। উঃ, আমি শুয়োরের মতো ঘামছি। এ তো প্রায় একটা বোবা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কথা বলবার মতো।’
‘তোমার ওই দূরদর্শন তত্ত্ব থেকে আমাকে রেহাই দাও—ডাক্তারের বারণ আছে—আমার ধাতে সয় না।’
‘নাঃ, তুমি একটা অপদার্থ। আচ্ছা, থাক এ-সব কথা। আরে—কী অপরূপ দৃশ্য! ভাগ্যবান বটে তুমি—অবশ্য যদিও এখানেই থাকো, কখনো বোধ হয় চোখ তুলেও তাকাও না।’
সূর্যের আলোয় নদীটা যেন জঙ্গছে, এতো উজ্জ্বল যে চোখে আঘাত করে। কেঁপে-কেঁপে বেঁকে-বেঁকে চলেছে যেন কোনে। ধাতব পদার্থ। হঠাৎ ভাঁজের পর ভাঁজ পড়লো জলের বুকে : একটি ফেরি-স্টীমার গাড়ি, ঘোড়া আর একদল চাষি নিয়ে এপার থেকে ওপারে পাড়ি দিচ্ছে।
‘আরে, মাত্র পাঁচটা বাজলে। নাকি এতোক্ষণে! সিজরান থেকে ট্রেন আসে—ঠিক পাঁচটা বেজে পাঁচ মিনিটে।’
অনেক দূরে সমতল জমির উপরে হলুদ আর নীলে মেশানো পরিচ্ছন্ন একটি রেলগাড়ি দেখা যাচ্ছে, ডানদিক থেকে বাঁ দিকে চলেছে, দূর থেকে কতো ছোটো মনে হয়। হঠাৎ তাঁরা দেখলেন, গাড়ি থেমে গেলো। এঞ্জিনের মুখ থেকে শাদা বাষ্প বেরুতে লাগলো, পরমুহূর্তেই শুনতে পেলেন বিপদসূচক বাঁশি বাজছে।
‘আশ্চর্য ব্যাপার।’ ভস্কোবয়নিকভ বললেন, ‘কিছু একটা হয়েছে মনে হচ্ছে। এই জলার ধারে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়লো কোন কর্মে? নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে। চলো, চা খাওয়া যাক।’
