৬
বাড়িতে বা বাগানে—কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না নিকিকে। মামা আর ইভান ইভানোভিচ যতোক্ষণ বারান্দায় বসে কাজ করছিলেন, ইউরা নিরুদ্দেশ ভাবে ঘুরতে-ঘুরতে আন্দাজ করলো, অতিথিদের এড়াবার জন্যই গা ঢাকা দিয়েছে নিকি—আর তাছাড়া ইউরাকে তো সে নিজের সমকক্ষ ব’লেও ভাবে না।
আশ্চর্য জায়গাটি। এক মিনিট পর-পর ডেকে উঠছে হলুদ রঙের খুশি পাখি, তিন সুরের ডাক তার, তার পরেই একটু থামে, যেন সময় নেয় সেই স্বচ্ছ, ভেজা-ভেজা, বাশির মতো তীব্র মধুর স্বরকে প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেবার জন্য। বদ্ধ বাতাসে মুহ্যমান ফুলের গন্ধ যেন সূর্যের প্রবল তেজে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটকে গেছে শুধু মাত্র নিজেদের সীমাবদ্ধ এলাকাটুকুতে। আ—এরা তাকে মনে করিয়ে দেয় আন্টিবেস আর বর্ভিঘেরার কথা। ডাইনে থেকে বাঁয়ে, ব। থেকে ডাইনে বেঁকে-বেঁকে ঘুরে বেড়ালো ইউরা। তার মায়ের গলার স্বর তাকে মায়ের মতো ঘিরে ধরলো, কলে-ছাঁটা ঘাষের জমিতে, মৌমাছির গুঞ্জনে, গানের মতো মধুর পাখির ডাকে, তার মার গলা শুনতে পেলো সে। মা তাকে কাছে ডাকছেন, কখনো এখানে কখনো ওখানে দাড়িয়ে মা তার উত্তরের জন্য প্রতীক্ষা করছেন—এই মোহে ইউরার সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হ’লো।
ইউরা খালের দিকে এগিয়ে গেলো। খাল-পাড়ের ছোটো ছোটো গাছে সাজানো নকল পথ বেয়ে নিচে ঘনবন্ধ অলডার ঝোপের কাছে এসে দাড়ালো সে। গাছের ছোটো ডালপালা ভেঙে পড়ে স্তূপাকৃতি হয়েছে সেখানে, অন্ধকার আর কী স্যাঁতসেঁতে জায়গাটা। ফুল খুব কম, মোরগঝুটি ফুলের লম্বা ডাঁটিগুলিকে দেখাচ্ছে যেন সচিত্র বাইবেলের পাতা থেকে এইমাত্র উঠে- আসা কোনো মিশরসম্রাট।
ইউরা বিষণ্ণ থেকে বিষণ্ণতর হ’লো। কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। দুই হাঁটু মুড়ে ব’সে কান্নায় ভেঙে পড়লো সে।
‘হে ঈশ্বরের দূত, তুমি আমাকে সর্বদা ঘিরে থাকো, ইউরা প্রার্থনা করলে, ‘সত্যের পথ তুমি আমাকে চিনিয়ে দাও; আর আমার মাকে জানিয়ে। আমি ভালো আছি, তিনি যেন আমার জন্য চিন্তা না করেন। মৃত্যুর পরপারে যদি অন্য জীবন থেকে থাকে, হে পরম প্রভু, তাহ’লে তোমার স্বর্গীয় ভবনে, যেখানে সাধু আর সৎ মানুষের মুখ গুলি লণ্ঠনের আলোর মতো জ্বলে—সেখানে আমার মাকে তুমি আশ্রয় দিয়ো। কতো ভালো ছিলেন আমার মা, তিনি তো কখনো কোনে। পাপ করেননি। তাঁকে তুমি দয়া কোরো, হে ভগবান, আমার মাকে যেন কখনো কোনো দুঃখ পেতে না হয়। মা—মা গো!’ বুক- ভেঙে-দেওয়া যন্ত্রণার চাপে সে চাইলো স্বর্গ থেকে তার মাকে ডেকে আনতে যেন তার মা সদ্য সন্ত হয়েছেন—তারপর হঠাৎ আর সহ্য করতে না-পেরে মূর্ছিত হ’য়ে প’ড়ে গেলো।
বেশিক্ষণ অচেতন হ’য়ে রইলো না। যখন জ্ঞান হ’লো শুনতে পেলো মামা ওপর থেকে তাকে ডাকছেন। সাড়া দিয়ে সে খালের পাড় বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলো। হঠাৎ তার মনে পড়লো তার হারিয়ে-যাওয়া বাবার জন্য সে আজ প্রার্থনা করতে ভুলে গেছে—তার মা তাকে শিখিয়েছেন রোজ বাবার জন্য প্রার্থনা করতে।
কিন্তু সাময়িক জ্ঞানহীনতা এমন নতুন এক আনন্দ আর হালকা ফূর্তির আমেজ এনে দিয়েছে তার শরীরে, যে আবার প্রার্থনা করতে তার ভয় হ’লো, পাছে এই ভালো-লাগাটুকু হারিয়ে যায়। তাই মনে-মনে ভাবলো, আরেক সময় বাবার জন্য প্রার্থনা করলে ক্ষতি কী? ‘বাবা অপেক্ষা করতে পারেন, ‘ বুঝি এমন কথাও মনে হ’লো তার। বাবাকে ইউরার একটুকুও মনে নেই।
