১৮. ধর্মতত্ত্ব : উদ্ভব ও বিকাশের ইতিবৃত্ত

অষ্টাদশ অধ্যায় – ধর্মতত্ত্ব : উদ্ভব ও বিকাশের ইতিবৃত্ত (Theology : Chronicle of the Origin and Development)

ধর্মতত্ত্ব : উদ্ভব ও বিকাশের ইতিবৃত্ত

জীবন জিজ্ঞাসাই ধর্মতত্ত্বের উদ্ভব। জ্ঞানের মহাসমুদ্রেরই নাম ধর্মতত্ত্ব। এক জীবনে এই মহাসমুদ্র মন্থন প্রায় অসম্ভব। এটি মানবজ্ঞানের অসীম দিগন্তের প্রাথমিক উৎস। জীবনের উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করতে, জীবনের গতিপথ নিয়ন্ত্ৰণ করতে, জীবনের সুখ-শান্তি অন্বেষণ ও জীবনকে প্রশান্তিপূর্ণ করতে আর্ত, অর্থার্থী, ভক্ত, জিজ্ঞাসু–ত্রিতাপ জ্বালায় দগ্ধ দুর্বল সবল নির্বিশেষে মানুষ যেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে তার নাম ধর্ম। ইন্দ্ৰীয় অনুভূতিশীল জীবন ধর্ম ধারণ করে না এমন মানুষ দুর্লভ। বস্তুত বাঁচাবাড়ার মর্মউপলব্ধির স্থিত জ্ঞানই হল ধর্মতত্ত্ব (theology)।

ইন্দ্রিয় অনুভূতিশীল অধিকাংশ মানুষের মননে ধারণকৃত এই ধর্মবিশ্বাসও আবার মিশ্র এবং দ্বান্দ্বিক। এদের মধ্যে এক শ্রেণির বিশ্বাস পরকাল বলে কিছু নেই, তবে দুনিয়াতে ধর্মের দরকার আছে। কারণ, ন্যায়-অন্যায়ের বিচার বলে একটা ভীতি মানুষের মধ্যে কাজ না করলে সমাজজীবন অন্যায় অপরাধে ভরে যেত। মানুষের সমাজই মানুষের কাছে বাসযোগ্যতা হারাত। ব্যবসা, বাণিজ্য, লেনদেন, মানুষের কাছে বাসযোগ্যতা হারাত। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সবকিছুতে একটা চূড়ান্ত পতন ঘটত। মানব সমাজ একটা অরণ্যে রূপ নিত। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, রাহাজানি ইত্যাদিতে সামাজিকজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত। এখানে মন্দ কর্মের শাস্তি হিসেবে স্বর্গ-নরকের ভীতি মানুষের মধ্যে কাজ করে এবং কল্যাণ কর্মে উৎসাহ সৃষ্টি করে। এতে সামাজিক সুস্থতা বজায় থাকে, নৈতিক অবক্ষয় থেকে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়া যিনি সৎ জীবন-যাপন করেন, মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন এই বিশ্বজগতের একজন মহান স্রষ্টা আছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক, আমাদের সমগ্র জীবনের সৎকর্ম ও অসৎকর্মের হিসাব গ্রহণকারী। একজন মানুষ তার কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে শান্তিতে জীবনযাপন করছে অপর একজন মানুষ তার কোন কষ্ট নেই, সাধনা নেই, হঠাৎ করে অস্ত্রের মুখে তা লুট করে নিয়ে মহা আনন্দে দিনাতিপাত করছে। মনে একটু দ্বন্দ্বও নেই, দ্বিধাও নেই। অথচ আর একজন মানুষ কাউকে একটা কটু কথা বলে রাতে অশান্তিতে ঘুমাতে পারছে না। পরদিন ভোরে তার কাছে যেয়ে ক্ষমা চাচ্ছে। এই দুজনের পরিণতি কি একই? আমাদের বিবেকের অন্তর অবলোকনে এই দুই ব্যক্তির মানদণ্ড এক হতে পারে? ব্যক্তি, সমাজ তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে মানুষদের স্বপক্ষের শক্তির অভ্যুদয় কখন হয়? সে কি এ জগতেই এর প্রতিবিধান পায়? না, সে পরকালের অপেক্ষায় থেকে এর প্রাতবিধান পাবে তার নিশ্চয়তা কোথায়? প্রকৃতি মানুষের এই জিজ্ঞাসা এবং দ্বান্দ্বিক চিন্তা নিরসনে আপাতত একটি ভারসাম্য রক্ষা করে। আপাত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি তথা সুখ-দুঃখ, ন্যায়-অন্যায়ের দুয়ের মাঝখানে একটি সমন্বয় সৃষ্টি করে রাখে প্রকৃতি।

বঞ্চিতের বাঞ্ছা পূরণ আর অত্যাচারির শাস্তি বিধানের মধ্যবর্তী এটি একটি অপেক্ষমান ভারসাম্য ব্যবস্থা। প্রকৃতির এ ব্যবস্থাপনায় রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য—

এ’ দুয়ের মাঝখানে নিশ্চয় আছে কোথা মিল,
নহিলে নিখিল, এত বড় প্ৰবঞ্চনা
কখনো সহিতে পারিত না।
সব তার আলো,
কীটে কাটা পুষ্পসম একেবারে হয়ে যেত কালো।

হ্যাঁ, প্রকৃতিই এই পাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। কালো থেকে আলোতে পৃথক করে স্রষ্টার ‘অসাম্যে’র-উৎপত্তির উত্তর খুঁজতে সহায়তা করে। সে জানতে চায় সৃষ্টি জগতের এ বিরাট বিস্ময়! আর সে যখন সত্য আবিষ্কারে ব্যর্থ হয়— তখনই তার মনে সৃষ্টি হয় সন্দেহ ও অবিশ্বাস। তাই বলা যায়, সত্য আবিষ্কারের ব্যর্থতা থেকেই নাস্তিকতার জন্ম। তখন ভিন্ন উপলব্ধির উপস্থিতির কারণেই বিশ্বাস দুই মেরুতে অবস্থান নেয়। এর এক পক্ষে ‘স্রষ্টা আছেন’, আরেক পক্ষে ‘স্রষ্টা নাই’– এই আস্তিক (Atheists) নাস্তিক (Theists) দ্বন্দ্বে দুপক্ষের বিশ্বাসই বস্তুত না- দেখে— তাই আরেক পক্ষ এই ঝামেলায় না জড়িয়ে এড়িয়ে গিয়ে বলেন— ‘তিনি আছেন থাকুন, আমার দরকার বোধ হচ্ছে না’। এই তৃতীয় পক্ষও দর্শন জগতে অজ্ঞেয়বাদী (Agonostics) অভিধায় ভূষিত হয়ে আছেন। যদিও এই ‘থাকা-না- থাকা’ এবং ‘দেখা না-দেখা’র নানা দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে ধর্মগ্রন্থগুলিতে। আবার হাজার ব্যথিতের বেদনা থেকেও নানা অভিমানে উচ্চারিত হয় ‘পৃথিবীতে স্রষ্টা বলে কেউ নেই’। এদের অভিমানের উত্তরে কোরআনে সুরা ক্বাফ-এর ৬ ও ৭ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন— ‘তারা কি তাদের ঊর্ধ্বস্থিত আকাশের দিকে তাকিয়ে

ধর্মতত্ত্ব : উদ্ভব ও বিকাশের ইতিবৃত্ত ৬২১

দেখে না যে, আমি কীভাবে ওটা নির্মাণ করেছি এবং তাতে কোনো ফাটলও নেই। আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং তাতে উদগত করেছি নয়নপ্রীতিকর সর্বপ্রকার উদ্ভিদ’ (৫০: ৬-৭)।

কে এই ঘোষক? কত বড় তার শক্তি, কী তার কৌশল, একি কোন সম্ভাব্য ঘোষণা? কত বড় আকাশ, কোথায় তার সীমা-পরিসীমা, পৃথিবী জুড়ে কত পর্বত ও পর্বতমালা, কী তার বিস্তৃতি কী তার উচ্চতা। এক হিমালয়ই পৃথিবীর বিস্ময়, পৃথিবীকে ভাসিয়ে দিতে পারে এমন বন্যার স্রোত তাতে বাঁধা আছে। আর পৃথিবীর মহাদেশসমূহ মিলিয়ে এই যে বিশাল মৃত্তিকার জগৎ, কে একে বিছিয়ে দিয়েছেন, আর কে এ পর্বতমালা নিজ কর্মশক্তিতে স্থাপন করেছেন। একি কোন ব্যক্তিত্বের পক্ষে সম্ভব? এখানেই আসে সংশয়, বিশ্বাস হয়ে যায় বিভ্রান্ত। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মনিষ্ঠা, সৃষ্ট জীবসমূহের দেহ বিধানের সূক্ষ্মতা, সৃষ্টি-জগতের বৈচিত্র্য, এসবের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞজনেরা হন বিস্মিত, চমকিত। শেষ পর্যন্ত এর সমাধান খুঁজতে গিয়ে এক মহাশক্তিকে স্বীকার করেন। মেনে নেন এর অন্তরে-গভীরে কোন এক মহাশক্তি আছেন। কেউ কেউ বলেন এর নাম প্রকৃতি। কিন্তু এই মহা শক্তিকে শুধু ‘প্রকৃতি’ নামে নামবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করলে এগুলোর প্রকৃত স্রষ্টার সন্ধান উন্মোচিত হয় না। প্রকৃতির দৃশ্যমান এসব ভিন্ন ভিন্ন শক্তিকে স্বাতন্ত্র্য পরিচয়ে স্বীকৃতি দিলে সৃষ্টি হয়ে যায় পৃথক পৃথক স্রষ্টা। প্রকৃতপক্ষে কি তাই? প্রকৃতি কী? প্রকৃতি তো এই আকাশ, বাতাস, নদী, সাগর, পর্বত ইত্যাদি। এই নামবাচক শব্দগুলো তো প্রশ্নের উত্তর হয় না। প্রশ্নের উত্তর হতে হবে কর্তাবাচক অর্থাৎ এগুলোর স্রষ্টা, প্রতিপালক ও পরিচালক। ‘প্রকৃতি’ বলতে কি সে অর্থ প্ৰকাশ পায়?

যেমন লালন শাহ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, ‘কে বানাইল এই রঙমহল খানা’? কেননা এই রঙমহল খানায়ই একদল চরম ভোগ-বিলাসে আনন্দ-ফূর্তিতে মাতিয়ে বেড়ায়, আরেকদল ক্ষুধার জ্বালায় ভুখা-নাঙ্গার ন্যায় তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে আহাজারি করে মরে। তাছাড়া ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা-জলোচ্ছ্বাসসহ প্রকৃতির তাণ্ডবে যে-নির্বিচার প্রাণহানি ঘটে, তাতে শিশু-কিশোরসহ নিষ্পাপ মানুষের নির্মম মৃত্যু, অসৎ মানুষের আরাম আয়াশ ও সুখভোগের অবিশ্বাস্য দৃশ্য আর সৎ ও স্রষ্টায় সমর্পিত ব্যক্তির দুঃখ-দুর্দশা দেখে মানুষ স্রষ্টার মহত্ত্ব অনুধাবনে বিভ্রান্ত হয়। প্রশ্ন উত্থাপিত হয় স্রষ্টার ‘ন্যায় বিচার’ নিয়ে। সাধারণ মানুষের অতৃপ্ত মনে এসব দুর্ভেয় রহস্য এখনো অনুন্মোচিত। এই অতৃপ্ত মনের অংশীদার হয়ে বিধাতার কাছে রবীন্দ্রনাথাও তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় প্রশ্ন রেখেছেন—

আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রি ছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে।
আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন, শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নিভৃতে নীরবে কাঁদে।
আমি যে দেখিনু, তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।
কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে বাঁশি সংগীতহারা,
অমাবস্যায় কারা
লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপ্নের তলে।
তাইতো তোমায় শুধাই শুধু অশ্রু জলে
যাহারা তোমায় বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের করিয়াছ ক্ষমা, তুমি বেসেছ ভালো?

মূলত জগতের নানা অসংগতির কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক তথা ধর্মতাত্ত্বিকদের কাছ থেকে যে-সব ধারণা আমরা পাই— সেই বিষয়গুলিকেই ধর্মতত্ত্বের অন্যতম উপাদান বলে গণ্য করি। এ বিষয়ে বাঙালি প্রকৃতিবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী তথা ধর্মবিশ্বাস প্লাবিত মহাপুরুষদের চেয়ে সর্বাধিক অগ্রগণ্য চিন্তক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪ খ্রি.)। যিনি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার (১৯০২) ‘নিষ্কাম কর্মের’ একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপস্থাপক এবং ভাষ্যকর। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ধর্মতত্ত্ব অনুশীলন (১৮৮৮ খ্রি.) গ্রন্থে ‘দুঃখ কি?’ ‘সুখ কি?’ ‘ধৰ্ম্ম কি?” ‘মনুষত্ব কি?’— ইত্যাদি জটিল জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজেছেন গুরুশিষ্যের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে। কেউ কেউ মনে করেন বঙ্কিম সফোক্লিসের ইডিপাস নাটকে বর্ণিত নিয়তিবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছেন-

‘নিয়তিতত্ত্ব দ্বিবিধ— একটি হল বিশুদ্ধ নিয়তিবাদ বা এশীয় নিয়তিবাদ ওয়াদিপাউসের জীবন যার প্রতিফলন। আমাদের ইচ্ছাকে শাসন করছে এক অলৌকিক শক্তি, আমাদের ভাগ্য যেন পূর্ব-নির্ধারিত। আর এক জাতীয় নিয়তিবাদ আছে, তা অপেক্ষাকৃত সংশোধিত; আমাদের ক্রিয়াকলাপ আমাদের ইচ্ছার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আবার আমাদের ইচ্ছাসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও আমাদের ব্যক্তিত্ব। এখানে এক যৌথ ভূমিকার দর্শন মেলে।

মিলের ব্যাখায় মানুষের যে দ্বৈত সত্তার উপস্থিতি দেখা যায়, সে-সম্পর্কে বঙ্কিমের যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা হল-

‘সাংসারিক ঘটনা-পরম্পরা ভৌতিক নিয়ম ও মনুষ্যচরিত্রের অনিবার্য ফল। মনুষ্য-চরিত্র মানসিক ও ভৌতিক নিয়মের ফল; সুতরাং অদৃষ্ট মানসিক ও ভৌতিক নিয়মের ফল; কিন্তু সেই সকল নিয়ম মানুষের জ্ঞানাতীত বলিয়া অদৃষ্ট নাম ধারণ করিয়াছে।’ (কপালকুণ্ডলা, পরিষৎ সংস্করণ, পৃ. ৯৮-৯৯)।

ইসলামে তিনটি প্রধান ধর্মতত্ত্ব

১. ওয়াহাদাতুল ওজুদ তত্ত্ব: এই তত্ত্বের দ্রষ্টা স্পেনদেশীয় শেখুল আকবর মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি (১১৬৫-১২৪০খ্রি.) ইসলামি বিশ্বে তিনি মুহিউদ্দিন— যার অর্থ ‘ধর্মের পুনরুজ্জীবন দানকারী’। আর মুসলিম বিশ্বের বাইরে তিনি ‘ডক্টর ম্যাক্সিমাস’ নামে পরিচিত। বহু জ্ঞানী, তাত্ত্বিক, সুফি, অলি, দরবেশের সান্নিধ্যে কখনো ডুব দিয়েছেন তত্ত্বের সাগরে, কখনো নিমগ্ন হয়েছেন নির্জনতায়। আরাবি যেখানে গিয়েছেন, সেখানেই খোঁজ করেছেন সাধক আর জ্ঞানীব্যক্তিকে আর অদ্ভুতভাবে পেয়েও গিয়েছেন তিনি। আবু আব্বাস আর উরাবি তাঁর প্রথম আধ্যাত্মিক গুরু। বহু জনের সোহবতের পর ইউনুস বিন ইয়াহহিয়া আল হাসেমি – যিনি বড়পির কাদির জিলানি (র.) এর শিষ্য ও খলিফা, তাঁর কাছে কাদেরিয়া তরিকায় দীক্ষা নেন। আরাবির এই গুরু তাঁকে কাবাঘরের সম্মুখে আবদুল কাদির জিলানি (র.)-এর খিরকা প্রদান করেন।

ইবনুল আরাবি সর্বআল্লাহবাদ তথা ‘ওয়াহাদাতুল-অজুদ’ নামে একটি ধারণা বা দর্শনতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা দেন। সকল সৃষ্টিই আল্লাহর প্রকাশ-সকল প্রকাশ‍ই আল্লাহর সত্তা-তাঁরই বিকশিত রূপ। বহুর মধ্যে দিয়ে একক অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে। একটি গাছের কাণ্ড, শাখা, প্রশাখা, পাতা, ফুল, ফল ইত্যাদির কোনটিই আলাদা আলাদাভাবে গাছ নয়- গাছের অংশ, সবগুলো মিলিয়েই গাছ। আরো পরিষ্কার করে বলা যায়, একজন কণ্ঠশিল্পীর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে অনেক বাদ্যযন্ত্র মিলে সমন্বিত হয়েই গান হয়। শুধু তবলার বোল বা বাঁশির সুর বা হারমোনিয়মের সুরই গান নয়। অনেক কিছু মিলে একটি গান, গান হয়ে ওঠে। আরাবির মতে, সকল সৃষ্টি মিলেই স্রষ্টার প্রকাশ। সকল সৃষ্টিই তাঁর, তিনিই প্রকাশিত সকল সৃষ্টিতে-লা মাওজুদা ইল্লালাহ অর্থাৎ ইল্লালাহ ছাড়া কোন কিছুই মওজুদ নেই বা আল্লাহ ছাড়া কোন অস্তিত্ব নেই। একের মধ্যেই আমরা বাঁচি এবং মৃত্যুর পরেও আমরা সেই একের ভেতরেই অবস্থান করব। ‘এক ছাড়া বহুর অর্থ নেই। বহু ছাড়া এক অর্থহীন। বহু হল আর্শির প্রতিবিম্বের ন্যায় প্রকৃত বস্তুর ছায়া। সমগ্র জগৎ একের প্রতিবিম্ব বা ছায়া। মূল প্রতিবিম্বের মধ্যে কোন দ্বৈত নেই। গুণ যেমন দ্রব্যের মধ্যে অনুসৃত হয়ে আছে, তেমনিভাবে বহুও একের মধ্যে মিশে আছে। আবার খাদ্য যেমন দেহের হয়ে আছে, তেমনিভাবে এক বহুতে অন্তর্লীন হয়ে আছে। এক পরম আধ্যাত্মিক দ্রব্য বহুর মধ্যে মিশে আছে এবং বহুকে নিয়ন্ত্রিত করছে। বহু বা অংশসহ এক একটি সমগ্র।’ (ড. রশীদুল আলম, মুসলিম দর্শনের ভূমিকা, পৃ. ৪৩৮) ইবনুল আরাবি বলেন : ‘সমগ্র বিশ্বজগৎ একটি সার্বিক আত্মা, মানবমনের চেয়ে উন্নততর ঐক্যের নির্দেশক। স্রষ্টা ও সৃষ্টির আত্মা, মানবমনের চেয়ে উন্নততর ঐক্যের নির্দেশক। কাজেই স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে যে পার্থক্য নির্দেশ করা যায়, তা হল প্রতিটি বস্তুর বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও তা সত্তা (real) নয়, সত্তার দিক মাত্র। এক সাধারণ গুণ সব রূপকে অতিক্রম করেছে, সব বৈশিষ্ট্যকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বহুর দুটি দিক আছে। বহু পরস্পর পৃথক এবং এক থেকেও পৃথক। আবার বহু পরস্পরের অভিন্ন এবং একের সঙ্গেও অভিন্ন। প্রথমটি পার্থক্যের দিক, দ্বিতীয়টি অভিন্নতার দিক। (ঐ) তিনি আল্লাহর অন্তর্বাপিতা ও অতিবর্তিতা-দুই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ সব সীমার ঊর্ধ্বে। ঐশী নামসমূহ বিশ্বজগতের কারণ। নামের মধ্য দিয়ে ঐশী সত্তার প্রকাশ ঘটে। আরাবি বলেন, সব প্রেরিত পুরুষই প্রজ্ঞা কিন্তু আদি প্রজ্ঞা নন। সার্বিক প্রজ্ঞার যে নীতি পৃথিবীর সমুদয় বস্তুতে অনুসৃত হয়ে আছে, তা হল ঐশী চেতনা। ‘ইনসানে কামিল’ ব্যক্তিই এই চেতনার অধিকারী। ‘ইনসানে কামিল’ বা পরিপূর্ণ মানুষ-এর ধারণাটিও প্রথম ব্যক্ত করেন ইবনুল আরাবি।

ওয়াহেদ অর্থ এক আর ওজুদ অর্থ দেহ। ওয়াহেদাতুল ওজুদ মানে একদেহ। ওয়াহেদাতুল ওজুদ বলতে বোঝায় সকল সৃষ্টিই একদেহের অন্তর্গত বা এক অঙ্গেরই অন্তর্ভুক্ত। ওয়াহাদাতুল ওজুদ একটি মতবাদ বা একটি সুফিধারা। এই ধারার সুফিগণ মনে করেন, সৃষ্টিতে যত বৈচিত্র্য বা ভিন্নতাই থাকুক না কেন, আসলে সকল কিছুই এক হতে সৃষ্টি, একেরই বিকশিত রূপ; এক ঐশী পদার্থের বিভিন্ন রূপভেদ মাত্র। সেজন্য এই ধারার বক্তব্য হল : আল্লাহই সব এবং সবই আল্লাহর অর্থাৎ এ বিশ্বজগৎ আল্লাহসত্তাময়। আল্লাহ ব্যতীত দ্বিতীয় কোন সত্তা নেই। সমগ্র সৃষ্টি তাঁর পরিচয় বহন করে। বাংলায় এই দর্শনটিকে বলা হয় সর্বআল্লাহবাদ (pantheism)। ইবনুল আরাবি এ দর্শনের প্রবক্তা। তিনি এই দর্শনের ওপর বহু গ্রন্থ লিখেন।

হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন : আমি গুপ্ত ভাণ্ডারে ছিলাম। আপনার পরিচয় প্রকাশের জন্য এই সৃষ্টি করলাম।’ সুতরাং আল্লাহ নিজেই ইচ্ছা করে প্রকাশিত হলেন। তাই এই রূপ অর্থাৎ সৃষ্টি তাঁর প্রকাশিত রূপ। তিনি এই সৃষ্টির মাধ্যমে গুপ্ত (বাতেন) থেকে প্রকাশ (জাহের) হলেন। আবার এই সৃষ্টি একদিন তাঁর ইচ্ছাতেই বিলয় হবে, তখনও তিনিই থাকবেন। সুতরাং তিনিই ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। তিনি ছাড়া আর কিছুই নেই। সুরা আল হাদিদে আল্লাহ বলেন : ‘তিনি প্রথম (আউয়াল), তিনি শেষ (আখের) তিনি প্রকাশমান (জাহির) তিনি অপ্রকাশমান (বাতিন) এবং তিনি সকল বিষয়ে পরিজ্ঞাত।’ (৫৭:৩) আল্লাহ পবিত্র কোরানে বার বার বলেছেন তিনি ‘সর্বব্যাপী এবং সর্বজ্ঞ’ ‘পূর্ব পশ্চিম সব আল্লাহর। যে দিকেই মুখ ফিরাও না কেন, সে দিকেই আল্লাহ আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১১৫) ‘আল্লাহ সব কিছু দেখেন’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত:১৫৬)।

কোরানের এ সকল আয়াতের ওপর ভিত্তি করেই ইবনুল আরাবি বলেন, সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টা আছেন। সৃষ্টি তাঁর, তাঁরই ইচ্ছা, তাঁরই প্রকাশ, তাঁরই চিহ্ন, তাঁরই মহিমা, তাঁরই পরিচয়। এ কারণেই আরাবি বলেন : আমি যে দিকে তাকাই, আমার চোখ তাঁকে ছাড়া আর কিছুই দেখে না, আমার কান তাঁর কথা ছাড়া কিছুই শোনে না। এ দর্শনের মূল কথা আরো স্পষ্ট বোঝা যায়, ইবনুল আরাবি এবং এই ধারার মতাবলম্বনকারীদের কলেমার ব্যাখ্যা থেকে। তাঁরা বলেন: ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহ’ এর অর্থ : ‘নেই (লা) ইল্লাললাহ ব্যতীত।’ তার মানে ইল্লাললাহ তথা আল্লাহই সব, তিনিই সব (হামা ওস্ত)। আল্লাহ ব্যতীত দ্বিতীয় কোন সত্তা নেই। তিনিই পরম সত্তা। আল্লাহই সকল সত্তার ঐক্য। সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর প্রকাশ প্রত্যেকটি বস্তুই আল্লাহর নিদর্শনসমদৃদ্ধ। সকল স্থানেই তিনি আছেন। আর সৃষ্টি যদি পৃথক সত্তা হয়, তবে দুটো সত্তার সত্যতাকে স্বীকৃতি দিতে হয়। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই; সৃষ্টি হল স্রষ্টারই বিকাশ মাত্ৰ। এই ধারার সুফিগণ ব্যাখ্যা করে বলেন, এই কথার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর সৃষ্টি জগতের সকল ধূলিকণা স্বয়ং আল্লাহ। কথাটি হচ্ছে, সবকিছুতেই আল্লাহর নিদর্শন রয়েছে। আল্লাহ তাঁর নিজগুণে অস্তিত্বশীল— যা পাওয়া যায় তাঁর সৃষ্টি জগতের প্রতিটি অনু পরমাণুর মধ্যে। তাঁদের অন্যতম জিকির হচ্ছে : ‘লা মওজুদা ইল্লাললাহ’ মানে ইল্লাললাহা (আল্লাহ) ছাড়া (আর) কোন কিছুই মওজুদ নেই বা অস্তিত্ব নেই।

‘সমগ্র সৃষ্টিই আল্লাহর বিকশিত-প্রকাশিত রূপ; দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সকল রূপই আল্লাহর’– এ অভিব্যক্তি, যা ইবনুল আরাবি (র.) একটি দার্শনিকতত্ত্ব রূপে প্রতিষ্ঠা দিলেও তা এর আগে প্রকাশ পায় হজরত আবু ইয়াজিদ আল বোস্তামি মাঝে। পরে বায়েজিদ বোস্তামি আল জুনায়েদ, আবদুল করিম জিরি, হজরত হোসাইন বিন মনসুর হাল্লাজ, মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি এর মাঝে। বায়োজিদ এই স্তরে এসে বলেন : ‘মহিমা আমার।’ ইবনুল ফরিদ বলেন : ‘আমিই সে।’ ইবনুল আরাবি বলেন : আমিই ঐ নূর— যা লা মোকামে বিদ্যমান ছিল, নিজের আলোকে তখন আমি নিজেই দর্শক ছিলাম।’ মনসুর হাল্লাজ বলেন : ‘আমিই সত্য।’ ইসলামের মহানবি (সা.) বলেন : ‘যে আমাকে দেখলো, সে আল্লাহকে দেখলো।’

তুরস্ক ও আলবেনিয়ার সুফিদের মাঝে ওয়াহাদাতুল ওজুদের প্রভাব বেশি। এই ধারার সুফিগণ প্রেমে বিশ্বাসী, ফানায় আগ্রহী।

২. ওয়াহেদাতুশ শহুদ তত্ত্বঃ ওয়াহেদাতুল ওজুদ বা অদ্বৈতবাদের বিপরীতে ওয়াহেদাতুশ শহুদ বা দ্বৈতবাদ বিকাশ লাভ করেন। এই মতের প্রবক্তা হিসেবে হযরত রকুন উদ্দিন আল-উদ্দৌলা কে মান্য করা হয়। পরবর্তী সময়ে হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্‌শবন্দ এই মতবাদকে পরিশীলিত করেন। আরো পরে হজরত আহমেদ সরহিন্দি মুজ্জাদ্দেদ আল ফেসানি এই মতবাদকে যুক্তির আশ্রয়ে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর অগণিত শিষ্যদের মধ্য দিয়ে মূর্ত করে তোলেন।

ওয়াহেদাতুশ শহুদ অনুসারে আল্লাহ ও বিশ্বজগৎ দুটি পৃথক সত্তা। আল্লাহ স্রষ্টা আর বিশ্বজগৎ তাঁর সৃষ্টি। সুতরাং দুটি এক নয়— দুটি পৃথক সত্তা। সৃষ্টিতে স্রষ্টার প্রকাশ বা মাহাত্ম্যের নিদর্শন থাকলেও তা কখনো স্রষ্টার মর্যাদা পেতে পারে না বা সমতুল্যও হতে পারে না। সৃষ্টি হচ্ছে মূলের প্রতিবিম্ব। প্রতিবিম্ব কখনো মূল হতে পারে না। কারণ ‘স্রষ্টা অসীম, অনন্ত ও অখণ্ড সত্তা— যা সর্বপ্রকার ধরন, সম্বন্ধ, বাহ্যিকতা, আত্মিকতা, উদ্ভাবন, হৃদয়ঙ্গম, ব্যাখ্যা, অতীন্দ্রিয় অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, প্রত্যক্ষকরণ, যুক্তি, চিন্তা ও ধারণার অতীত। ঐশী প্রত্যাদেশ অর্থাৎ ওহি বা ইলহাম ব্যতীত তাঁর কোনো কিছুই জানা সম্ভব নয়। (ড. ফকির আবদুর রশিদ, সুফিদর্শন, পৃ. ২৪৯)। এই মতবাদীগণ বলেন, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। ইবাদত যিনি গ্রহণ করেন তিনি প্রভু আর ইবাদত যিনি করেন তিনি বান্দা তথা দাস। দাস সেজদায় নত হয়ে সকল কিছু বিলিয়ে দেয় স্রষ্টায় সমীপে-প্রার্থনা করে দয়া ও করুণা, ইহলোক ও পরলোকের মঙ্গল। এখানে স্রষ্টার ইচ্ছার কাছেই সমর্পিত দাসের ইচ্ছা। চরম দাসত্ব অর্জনই দাসের আরাধনা, দাসের প্রার্থিত ধন। নৈকট্যের শেষ স্তর বা মোকাম হচ্ছে শর্তহীন দাসত্ব-নির্ভেজাল দাসত্ব। যদিও দাসত্ব প্রকাশে প্রেমের প্রকাশ বা প্রেমজাত উপলব্ধি থাকে, তবু প্রভু এবং দাস দুইটিই আসলে দুইটি অস্তিত্ব, দুইটি আলাদা সত্তা। দুই সত্তা না হলে ইবাদতের রূপ প্রকাশ পায় না। নিবেদন এবং গ্রহণই ইবাদতের লক্ষ্য।

ওয়াহদাতুল ওজুদ বা অদ্বৈতবাদীগণ যে বলেন, ‘প্রেম-কেবল প্রেমই আল্লাহকে লাভ করার একমাত্র পথ’-এ কথা ওয়াহেদাতুশ শহুদ বা দ্বৈতবাদীগণ মানেন না। তাঁরা বলেন, প্রেম আল্লাহকে পাওয়ার একমাত্র পথ নয় বরং দাসত্ব লাভের একটি পথ ছাড়া আর কিছুই নয়। ওয়াহেদাতুল ওজুদপন্থিগণ যেখানে বলেন: হামা ওস্ত তথা তিনিই সব, সেখানে ওয়াহেদাতুশ শহুদপন্থিগণ বলেন : হামাআজ উসত তথা সবই আল্লাহ হতে।’ এই মতের অনুসারীগণ আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে দাসত্ব করে, তাঁর সন্তুষ্টি বিধানের মধ্য দিয়ে পরকালে মহান প্রভুকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নিজেদের বিনীতভাবে নিবেদন করে। এই মতের অনুসারীগণ শরিয়তকে বেশি প্রাধান্য দেন।

এই মতবাদটিকে যথার্থ বলে মনে করেন না ওয়াহেদাতুল ওজুদপন্থিগণ বা অদ্বৈতবাদীগণ। তারা মনে করেন, ওয়াহেদাতুল ওজুদের বিরুদ্ধে ভোগবাদী ও বস্তুবাদী রাজা বাদশাহগণ প্রবর্তন করেন ওয়াহেদাতুশ শহুদ এবং এই মতবাদ স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে আলাদা করার মধ্যে দিয়ে কোরানের মৌল চেতনা থেকে দূরে সরে গিয়েছে। তারা বলেন, সৃষ্টির ভেতরে স্রষ্টা রয়েছেন। যেমন রয়েছে দুধের ভেতর মাখন— যা আপত দৃষ্টিতে প্রতিভাত হয় না।

৩. হামে উস্ত তত্ত্ব: চিশতিয়া তরিকার অনুসারীগণ আল্লাহকে হক (সত্য) ও ওয়াহুদ (প্রেমময়) বলে বিশ্বাস করে। তারা আল্লাহকে প্রেমময় বলে জানে ও মানে বলে তাদের কাছে স্রষ্টা ও সাধকের সম্পর্ক মাশুক ও আশেক এবং তারা সবসময় প্রেমে উদ্বেলিত হৃদয়ে স্রষ্টার নৈকট্য প্রার্থনা করেন। কোরান এবং হাদিসের আলোকেই তারা গভীর বিশ্বাসে দৃঢ় অবস্থানে গিয়ে দাঁড়ায় যে, সকল কিছুই ধ্বংসশীল এবং আল্লাহ কেবল আল্লাহই সত্য, তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। তাঁদের জিকির ও অজিফা হচ্ছে ‘লা মাওজুদা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত আর কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই, কোন কিছুরই মওজুদ নেই এবং লা মাকসুদা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন উদ্দিষ্ট নেই। ‘সবই আল্লাহ’- সুফি পরিভাষায় এ তত্ত্বকে বলে ‘হামে উস্ত’ তত্ত্ব।

চিশতিয়া তরিকার অনুসারীদের আরেকটি বিশ্বাস, আল্লাহ আছেন মানুষের মাঝে। এ ক্ষেত্রে তারা কোরানে বর্ণিত সামীপ্য তত্ত্বকে গ্রহণ করে থাকেন। কোরানে এমন আয়াত আছে যেখানে আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি আছেন মানুষের প্রাণশিরা বা শাখারগেরও নিকটবর্তী। ফলে তারা মানবদেহকে রহস্যের আধার বলে মনে করেন। তারা দেহ ও আত্মা-দুটোরই গুরুত্ব দেন। এই তরিকার অনুসারীগণ বিশ্বাস করেন, আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হচ্ছে প্রেমের সম্পর্ক। আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রেমকে বোঝানো যায় না, প্রেমকে বোঝাতে হয় উপলব্ধি দিয়ে। তারা ঐশী প্রেমকে প্রাধান্য দেন। প্রেমে পাগল হয়ে তারা সামা বা গান করেন— ভাবের আতিশায্যে তারা নাচেন, কাঁদেন। সামা বা গানকে তারা ইবাদতের অঙ্গ বলে মনে করেন। তারা বলেন, আল্লাহ নিজে প্রেমিক। তিনি প্রেমের কারণেই মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তার প্রেম দিয়েই আল্লাহকে পাওয়া সম্ভব। শুষ্ক ইবাদত, নিছক লোকদেখানো অনুষ্ঠান তাদের কাছে গৌণ। এই তরিকার সাধকগণ সরকারের দান-অনুদান, সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন না। তারা গুরুর নির্দেশে, গুরুর দেয়া রীতি-নীতি মেনে সাধনা করেন। গাঁজা, আফিং, ভাং, চরশ ইত্যাদি মাদক এই তরিকায় নিষিদ্ধ।

এরিস্টটলের (৩৮৪-৩২২ খ্রি.পূর্ব) দর্শন সম্পর্কে পশ্চিমা খ্রিষ্টীয় জগতের পণ্ডিত মানুষেরা অবগত হওয়ার অব্যবহিত পরে মুসলমানদের মধ্যে মুক্তচিন্তার সম্প্রসারণ ঘটে। ইহুদী ও মুসলমানরাই ছিলেন তাঁদের শিক্ষক। মুসলমানদের মধ্যে তখন মুক্তিচিন্তার কিছু চর্চা ছিল। প্রাচীন গ্রিক দর্শনের অভিঘাতে তখন মুসলমানদের মধ্যে মুক্তচিন্তার সম্প্রসারণ ঘটে। মুক্তচিন্তার অধিকারী আবু রুশদ (১১২৬-৯৮) এরিস্টটলের দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হন এবং বেশ কিছু বই লেখেন। সেই বইগুলো খ্রিষ্টান দেশগুলিতে যুক্তিবাদের এক তরঙ্গ তুলেছিল। আবু রুশদ জড়পদার্থকে শাশ্বত বলে মনে করতেন এবং আত্মার অমরত্বে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর দর্শনকে সাধারণভাবে সর্বেশ্বরবাদ বলা হয়। কিন্তু গোঁড়া ইসলামি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ পরিহার করার জন্য তিনি দুই সত্যের তত্ত্ব প্রচার করেন। তাঁর সে তত্ত্বে দুইটি পরস্পরবিরোধী ও আলাদা সত্যের সহ-অবস্থানের কথা ঘোষিত হয়। একটি দার্শনিক এবং অপরটি ধর্মীয়। কিন্তু এতেও তিনি স্পেনের খলিফার দরবার থেকে বহিষ্কৃত হওয়া থেকে বাঁচতে পারেননি। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষকতার ফলে সেখানে মুক্ত চিন্তাবিদদের একটা গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। তাঁরা মনে করতেন যে সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহের পুনরুত্থান এবং অন্যান্য অপরিহার্য ধর্মমত (dogma) ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সত্য হতে পারে কিন্তু যুক্তির দিক থেকে বিচার করলে মিথ্যা। সরল মনের মানুষ এটিকে এভাবে দেখতে পারে, যেমন কেউ বলছে আত্মার অমরত্বের তত্ত্বটি রবিবার সত্য কিন্তু সপ্তাহের অন্য দিনগুলিতে নয়। অথবা পয়গম্বরের ধর্ম বসার ঘরে মিথ্যা কিন্তু রান্নাঘরে সত্য। পোপ একবিংশ জন (১২৭৬-৭৭) এই বিপজ্জনক আন্দোলন ধ্বংস করে দেন এবং দু কূল রক্ষাকারী ‘দ্বৈত সত্য’ নীতিকে বাতিল ঘোষণা করেন। আবু রুশদের এই কল্পনা এবং এরূপ আরও ধ্যান-ধারণার প্রসারের ফলে দক্ষিণ ইতালির আকুনো নামক স্থানের অধিকারী থমাসের (মৃ. ১২৭৪) ধর্মতত্ত্বের উদ্ভব ঘটে। তিনি ছিলেন অতি সূক্ষ্ম চিন্তার অধিকারী এবং সন্দেহবাদের (scepticism) প্রতি তাঁর স্বাভাবিক টান ছিল। যে এরিস্টটলকে এত দিন অবিশ্বাসের পথ প্রদর্শক বলে মনে করা হত, তিনি তাঁকে চলতি গোঁড়া ধর্মের তালিকায় স্থান দিলেন এবং এমন এক অভিনব খ্রিষ্টীয় দর্শন নির্মাণ করলেন যা এখনো রোমান ক্যাথলিক গির্জার কাছে প্রামাণিক সত্য বলে স্বীকৃত। কিন্তু এরিস্টটল ও যুক্তিবাদ দুই-ই ধর্মবিশ্বাসের জন্য বিপজ্জনক মিত্র এবং থমাস একজন সন্দেহবাদীর মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব মিলিয়ে ফেলার চেয়ে সম্ভবত সন্দেহ সৃষ্টির মাধ্যমে একটি বিশ্বাসী মনের নিশ্চিত ভাবনাকে অনিশ্চিত করে তুলতে চেয়েছিলেন বেশ জোরালো ভাষায়।

সব সময়ই এখানে-সেখানে কিছু কিছু মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এবং গোপনে প্রতিষ্ঠিত ধর্ম বিশ্বাস করতেন না, কিন্তু তা কোন মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনেনি। তিন নবী পৃথিবীকে প্রতারিত করেছেন— এ রকম ধর্মবিরোধী উক্তি তেরো শতকেও চালু ছিল। এ রকম উক্তি মুক্তমনা সম্রাট ফ্রেডরিখের (মৃ. ১২৫০) বলে মনে করা হত এবং তাঁকে ‘প্রথম আধুনিক মানুষ’ বলে বিবেচিত করা হয়। একইরকম আদর্শ ব্যক্ত করা হয়েছে ‘তিন আংটি’ নামক গল্পে। কম করে হলেও সেটা একই রকম পুরাতন। জনৈক মুসলমান শাসক একজন ধনী ইহুদির কাছ থেকে চাপ দিয়ে কিছু টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিতে চাইলেন। তিনি তাকে দরবারে ডাকেন এবং তার জন্য একটি ফাঁদ পাতা হল। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘বন্ধু! আমি প্রায়ই শুনে থাকি যে আপনি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি। তাহলে আপনি বলুন ইহুদি, মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের অনুসৃত তিনটি ধর্মের মধ্যে কোনটিকে আপনি সবচেয়ে সত্য বলে মনে করেন।’ ইহুদি লোকটি বুঝলেন তাঁকে আটকানোর জন্যে একটি ফাঁদ পাতা হয়েছে এবং জবাবে বললেন :

‘জাঁহাপনা, একদা একজন ধনী ব্যক্তির ধনসম্পত্তির মধ্যে একটি মূল্যবান আংটি ছিল। তিনি ইচ্ছা করলেন যে পুরুষানুক্রমে সেটি তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যেই থাকুক। সুতরাং তিনি একটি উইল করলেন। বলা হয় যে, তার মৃত্যুর পর তার ছেলেদের মধ্যে যার কাছে এই আংটিটি পাওয়া যাবে, তাকেই তার উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যে ছেলেকে তিনি আংটিটি দিলেন, সে-ও তার বাবার পথ অনুসরণ করল এবং এভাবে আংটিটি বংশানুক্রমে হাতবদল হতে থাকল। অবশেষে সেটি এমন একজনের কাছে গেল যার ছিল তিন পুত্র। তিনি তিন পুত্রকেই সমানভাবে ভালোবাসতেন। আংটিটি কাকে দেবেন সে বিষয়ে মনস্থির করতে না পেরে তিনি প্রত্যেককেই গোপনে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে আংটিটি তাকেই দেবেন। তাদের সন্তুষ্টির জন্য তিনি একজন স্বর্ণকারকে ডেকে আরো দুটি আংটি তৈরি করলেন। আসল আংটির সঙ্গে সেই নতুন দুটি আংটির এতটাই মিল যে তিনি নিজেও আসলটিকে চিনতে পারলেন না। মৃত্যুশয্যায় তিনি প্রত্যেক পুত্রকে একটি করে আংটি দিলেন। ফলে তিনজনই নিজেকে বাবার উত্তরাধিকার বলে দাবি করল। কিন্তু কেউ তার স্বত্ব প্রমাণ করতে পারল না, কারণ আংটিগুলির পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব ছিল না। তাই আদালতে সে মামলা আজও চলছে। জাঁহাপনা, তিন জাতিকে ঈশ্বর যে তিনটি ধর্ম দিয়েছেন, সেগুলি সম্পর্কেও ওই একই কথা খাটে। তারা প্রত্যেকেই মনে করে যে তাদের ধর্মটিই সত্য। কিন্তু সত্যিই কোনটি সত্য সেটি একটি প্রশ্ন। আংটির মত যার আজও কোন মীমাংসা হয়নি।’ (J.B. Bury, A History of Freedom of Thought, 1914 )।

এই সন্দেহবাদী গল্পটি আঠারো শতকে বেশ খ্যাতিলাভ করেছিল। জার্মান কবি লেসিং (১৭২৯-১৮৮১) এই কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে তাঁর বিখ্যাত নাটক Nathan the Sage (মহাবিজ্ঞ নাথান, ১৭৭৯) লিখেছিলেন। অসহিষ্ণুতা অযৌক্তিকতা প্রমাণ করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। তবে ধর্মের মূল উৎস হচ্ছে বিশ্বাস। এ বিশ্বাস ব্যক্তির জন্মসূত্র সমাজসূত্র, শাস্ত্রসূত্র ইত্যাদি নানা অভিঘাতে স্থিত হতে পারে। আবার পরিবর্তনও হতে পারে যেমন মানবিক বিপর্যয়ে বাঁচা-বাড়ার আশ্রয় লাভে এই বিশ্বাস বিঘ্নিতও হতে পারে। বিশ্বাস কখনো প্রচ্ছন্ন হতে পারে। যেমন ‘ঈশ্বর আছেন’ কিংবা সন্দেহাতীতভাবে সুনির্দিষ্ট হতে পারে। যেমন ‘আল্লাহ চান মক্কা অভিমুখী হয়ে আমরা প্রতিদিন পাঁচবার তাঁর ইবাদত করি।’ মূল্যবোধ জাতীয় বিশ্বাসসমূহই শুধু ধর্মের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং ধর্ম হচ্ছে এক ধরনের বিশ্বতত্ত্ব (Cosmology), বিশ্বের একক চিত্রায়ন। যেমন— ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ এক (One God), এই বিশ্বের স্রষ্টা, যিনি আমাদের কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞাত এবং আমরা যা কিছু করি তার জন্য আমাদের তাঁর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এসবেরই মধ্যে আমরা বিশ্বতত্ত্ব (Cosmology) খুঁজে পাই। কারণ এসবই হচ্ছে বিশ্বের একক চিত্র।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব : বাঙালির ধর্মচিন্তার বৈশিষ্ট্য

বিভিন্ন ধর্মের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে মিলের মাঝে যে অমিল আর অমিলের মাঝে যে মিল আছে তাকে অনুসন্ধান করাই তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের কাজ। আর এই কাজের প্রধান লক্ষ্য ধর্মগুলির মধ্যে যে মানবীয় আচরণ বিদ্যমান তাকে সমন্বিত ধারায় উপস্থাপন করে সমাজে বিভিন্ন ধর্মের সহঅবস্থানকে সুসংহত করা। পূর্বে (দ্বিতীয় অধ্যায়) উপস্থাপিত চারটি ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্ট ও ইসলাম) চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এর প্রথম দুটি অর্থাৎ হিন্দু ও বৌদ্ধ এই ভারতীয় জনপদেই উদ্ভূত ধর্ম। আর খ্রিষ্ট ও ইসলাম এই জনপদে বহিরাগত ধর্ম। হিন্দু ধর্মের বৈশিষ্ট্য বহুমুখী স্রোতধারার সমন্বিত রূপ। তাই এই ধর্মের চারিত্রে সহনশীলতা এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ দর্শনভিত্তিক মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখের উৎস অনুসন্ধান এবং দুঃখ-যন্ত্রণা-শোক-তাপ থেকে পরিত্রাণের উপায় নির্দেশনাই ধর্মসমূহের প্রধান দিক। যেমন খ্রিষ্টধর্মে পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করে মানুষকে সেবার মাধ্যমে আপন করে নেয়ার বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। ইসলাম ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য সুশাসন ও ন্যায়বিচার। সেই সাথে স্রষ্টার একাত্ববাদের সাথে জগতের কোন শক্তির সমতুল্য না করা। ঐতিহাসিক দিক দিয়ে খ্রিষ্ট ও ইসলাম ধর্ম চরিত্রগতভাবে সেমেটিক। তাই সঙ্গত কারণেই এই দুটি ধর্মে স্ব স্ব জনপদের সমকালীন জীবনবোধের প্রতিফলন যেমন উন্মোচিত হয়েছে তেমনি উপমহাদেশে উদ্ভূত হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বৈশিষ্ট্যেও এই জনপদের জীবনবোধের প্রতিফলন এঁদের স্বমহিমায় স্বাতন্ত্র্য করে রেখেছে। তাই বহুত্বের মধ্যে ঐক্যই (Unity in Diversity) এই জনপদে আচরিত ধর্মগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

আমরা সবাই স্বধর্মকে বড় মনে করি এবং অন্য ধর্মকে ছোট মনে করি। এটা নিছক অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই বর্তমান বিশ্বে তুলনামূলক ধর্মের (Comparative Religion) চর্চা এবং গবেষণা খুব বেশি করা প্রয়োজন। অবশ্য ইউরোপ এবং আমেরিকাতে গত শতকেই Comparative Religion অধ্যয়নের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ধর্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ইউজারি (Widgery) তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেন : ‘তুলনামূলক ধর্ম হল প্রচলিত ধর্মগুলিকে নিরপেক্ষ এবং পর্যাপ্ত তুলনা, যেখানে তাদের পারস্পরিক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য, সংযোগ এবং সম্বন্ধ সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়।’

ধর্মের তুলনামূলক ইতিহাসের উপর সর্বপ্রথম লিখিত সুবিন্যস্ত গ্রন্থ প্রণয়ন করেন মুসলিম পণ্ডিত শাহ রাস্তানি (মৃ. ১১৫৩)। উপজাতীয়দের ধর্ম বাদ দিয়ে তিনি সকল পরিচিত ধর্মের তুলনামূলক বিশ্লেষণ লিপিবদ্ধ করেন। তিনি ধর্মগুলোকে চারভাগে ভাগ করেন। কিতাব ভিত্তিক ধর্ম যেমন ইহুদি ধর্ম, কিতাবানুরূপ ধর্ম যেমন- জরথুস্ত্রীয় এবং মনুশাস্ত্রীয় ধর্ম, দর্শনভিত্তিক এবং স্বরচিত ধর্ম যেমন বৌদ্ধ এবং হিন্দুধর্ম।

আমাদের আলোচ্য এই জনপদে আচরিত চারটি ধর্মের খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম ধর্ম বহিরাগত এবং স্বমহিমায় প্রচারিত ও প্রসারিত হলেও ধর্মদুটির উৎসস্থলের চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখা সর্বক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি। স্থানীয় ধর্মের অঙ্গিভূত বেশকিছু রিচুয়াল ও সাংস্কৃতিক উপাচার আত্মীকরণের মধ্য দিয়ে সহঅবস্থানের ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে সম্প্রীতির সমন্বয় সাধন করতে হয়েছে। এই প্রচলিত পদ্ধতিরই নাম আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি। এরও আছে নানা চড়াই উৎরাই, সাধনা ও সংগ্রামের ইতিহাস। যেমন আরবের ইসলাম আর বাংলার ইসলাম মেজাজে অনুশীলনে এক নয়। ইরান যেমন আরবের কোরানিক ধর্ম নিয়েছে আরবের সমাজ-সংস্কৃতি নেয়নি। বাঙালি মুসলমানরাও অনেকটা তাই। তবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কোন কোন দেশে ইসলামে স্বদেশের সাংস্কৃতিক মিশ্রিত স্বাতন্ত্র রূপ আছে তা বাংলার ইসলামে অতটা নেই। যেমন ইন্দোনেশিয়ার ইসলামে হিন্দুমুসলিম সমন্বিত সংস্কৃতিতে বিকশিত হয়েছে যেটি বাংলার ইসলামে অনুপস্থিত। ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমদের নাম ‘সুকর্ণপুত্রী’, ‘মেঘবতী’ হতে বাধা নেই, কিন্তু বাংলার ইসলামে তা অসহনীয়। সেখানে জাতীয় বিমান সংস্কার নাম ‘গরুড় এয়াওয়েজ’ কিংবা টাকার নোটে গণেশের ছবি ব্যবহৃত হতে বাধা নেই কিন্তু বাংলার ইসলামি রাষ্ট্রে তা না-জায়েজ। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একবার মুসলমান মেয়েদের নাম সুনীতি, সুরুচি, সুহাসিনী, মালতি ইত্যাদি রাখার প্রস্তাব রেখেছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজে তাঁর এই স্ববিরোধ মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। প্রতিবাদীরা ‘শহীদুল্লাহ্’ শব্দের হিন্দু ঐতিহ্যে রূপান্তর করে ‘বলীনারায়ণ’ রাখার প্রস্তাব দিয়ে একটি নামফলক বিশ্ববিদ্যালয়-কক্ষে সেঁটে দেয়। এরপর শহীদুল্লাহর সমন্বিত সংস্কৃতির প্রস্তাব এদেশে আর অগ্রসর হয়নি।

ধর্মের সমাজবিজ্ঞান

আজকের দিনে প্রায়ই ধর্মকে গণ্য করা হয় বৈষম্য, মতভেদ আর অনৈক্যের উৎস হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা হল অর্থ আর সাম্রাজ্যের পর ধর্ম হল মানবজাতিকে একত্র করার তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি। ধর্মকে তাই সংজ্ঞায়িত করা যায় এক অতিমানবীয় ক্রমে বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা মানুষের বিধি ও মূল্যবোধের ব্যবস্থা হিসেবে। (Yuval Noah Harari, Sapiense, P. 204 )। ধর্ম একটি মৌল ও সর্বজনীন মানবীয় প্রতিষ্ঠান। ধর্মের অস্তিত্ব নেই বা ছিল না, এমন কোন মানবসমাজের কথা জানা যায় না। ধর্ম মানুষের সমাজজীবন, রাজনৈতিক জীবন, অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বস্তুত সকল সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ধর্ম এবং এটা জীবনের সকল ক্ষেত্রে সর্বোতভাবে ভূমিকা পালন করে। সুতরাং সাধারণভাবে বলা যায়, ধর্মের সমাজবিজ্ঞান জ্ঞানের এমন এক শাখা যা ধর্ম এবং ধর্মীয় বিষয়াদির উপর নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা করে সমাজবিজ্ঞানের আলোকে তা বোঝার চেষ্টা করে। এই বিদ্যা কোন নির্দিষ্ট মূল্যবোধের অধীনে থেকে ধর্মের বিচার করে না। যেমন— ‘এই ধর্ম সঠিক আর ওই ধর্ম বেঠিক’। সমাজবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা অগুস্ত কোঁতে (Auguste Comte ) এর মতে, ধর্ম হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি খ্রিষ্টান ধর্মের বিকল্প হিসেবে সমাজবিজ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাও করেছিলেন। এজন্য ধৰ্ম এবং সমাজবিজ্ঞান নিয়ে বিরোধও দেখা দেয়। তবে তার এই মতবাদ পরবর্তীকালে কেউ আমলে না আনলেও সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন, সাথে সাথে এই ভূমিকার পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত কারণ ও পরিস্থিতির উপরও আলোকপাত করেন। প্রাচীন সমাজে ধর্মের ভূমিকার ব্যাখ্যাও তারা দিতে সচেষ্ট হন।

যখন পশ্চিম সমাজে পুঁজিবাদের ক্রমবিকাশ ঘটে তখন Max Weber এর মতে, ধর্মই ছিল সকল মূল্যবোধের উৎস এবং এটাই সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বরূপ নির্ধারণ করে। তাঁর মতে, সমাজের ক্রমবিকাশে ধর্মের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে, অতীতে ঐক্য বজায় রাখার জন্য সমাজের কতকগুলো নিয়ামকের প্রয়োজন ছিল এবং ধর্মই তা সরবরাহ করত।

ধর্মই মানুষকে বিচার বুদ্ধি এবং ব্যবহার বিধি দিয়েছে। এটাই মানুষের আবেগ এবং সহানুভূতি সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ করে। সামাজিক ঐক্য, আবেগের বহিঃপ্রকাশ এবং সমাজের নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য বিষয়ে যেহেতু ধর্মের ভূমিকা রয়েছে সেহেতু ধর্মের সমাজবিজ্ঞানের বিষয় না হয়ে পারে না।

ধর্মের সমাজবিজ্ঞান যেহেতু সমাজবিজ্ঞানেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ সেহেতু ধর্মীয় বিষয়গুলোর বিকল্প হিসেবে পরিসংখ্যানমূলক কিছু নৈর্ব্যত্তিক উপাত্তের প্রবর্তন করে। কিন্তু মানবজাতির অন্তর্নিহিত অনুভূতি বুঝার জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। সমাজবিজ্ঞানীদের বুঝতে হবে যে, ধর্মে বিশ্বাসী জনগণের নিজস্ব চিন্তাভাবনা রয়েছে। এগুলো বোঝার জন্য যদি আমরা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণ এবং সাক্ষাৎকার পদ্ধতির সাহায্য নিই, তাহলে দেখতে পাব প্রত্যেকটি মানুষই তার চিন্তাজগতে পারত্রিক প্রজ্ঞা প্রয়াসে নিবিষ্ট। এই নিবিষ্টতাই মানব চিন্তনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

সমাজবিজ্ঞানীদের আলোচ্যবিষয় হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল বিষয়, আচারপর্ব এবং সমাজ ও দল গঠনে এর প্রভাব। অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের মত সমাজবিজ্ঞানও সমাজের অনেক প্রচলিত বিশ্বাসকে উল্টে দিতে পারে। এই অর্থে বলা যায়, ধর্মের সমাজবিজ্ঞান মানবতাকেও বুঝতে সাহায্য করে। বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে একে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। নিম্নে তাঁদের কতিপয় সংজ্ঞা উপস্থাপন করছি :

Yinger তাঁর Religion, Society & Individual নামক গ্রন্থে বলেছেন, ‘The sociology of religion is the scientific study of the ways in which society, culture and personality’। অর্থাৎ, ধর্মের সমাজবিজ্ঞান হল সমাজ, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিত্ব সম্পর্কিত ধর্মের বিজ্ঞানসম্মত অধ্যয়ন। তিনি আরও বলেন, ‘সমাজ ও ধর্ম সম্বন্ধ বিষয়ক সাধারণ সূত্রাবলি আবিষ্কারের একটি প্রয়াস হচ্ছে ধর্মের সমাজবিজ্ঞান।’

Wikipediaতে বলা হয়েছে, ‘The sociology of religion is primarily the study of the practices, social structures, historical backgrounds, development, universal themes and roles of religion in society. There is particular emphasis on the recurring role of religion in nearly all societies on Earth today and throughout recorded history’।

অর্থাৎ, ধর্মের সমাজবিজ্ঞানের আলোচ্যবিষয় হচ্ছে আচরণ, সামাজিক কাঠামো, ঐতিহাসিক পটভূমি, ক্রমবিকাশ, বিশ্ব ধারণা এবং সমাজে ধর্মের ভূমিকা। বর্তমান এবং অতীতের সকল সমাজের ধর্মের পুনরাবৃত্তিতে জোরালো প্রভাব রয়েছে।

Bryan Wilson Religion in Sociological Perspective গ্রন্থে বলেছেন, ‘The sociology of religion is a discipline that objectively hold various religions and religious phenomena and sociologically understand them’। অর্থাৎ ধর্মের সমাজবিজ্ঞান বিদ্যার এমন এক শাখা যা ধর্ম এবং ধর্মীয় বিষয়াদির উপর নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা করে সমাজবিজ্ঞানের আলোকে তা বোঝার চেষ্টা করে। তিনি আরো বলেন, ‘It is not a discipline which judges religion in certain value; this religion is right, that religion is wrong’। অর্থাৎ, এই বিদ্যা কোন নির্দিষ্ট মূল্যবোধের অধীনে থেকে ধর্মের বিচার করে না; যেমন- ‘এই ধর্ম সঠিক আর ঐ ধর্ম বাতিল’।

M. Hamilton তাঁর The Sociology of Religion (1994) নামক গ্রন্থে বলেছেন, ‘Sociology of religion is the study of the beliefs, practices and organizational forms of religion using the tools and methods of the discipline of sociology’। অর্থাৎ ধর্মের সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের পদ্ধতি ও উপাদানসমূহের সাহায্যে ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, বিশ্বাস এবং আচারপর্বসমূহ পর্যালোচনা করা।

B.B. Sharma, ‘Sociology of religion is a classical sociology that study of religion was primarly concerned with two broad issues : (i) How did religion contribute to the maintence of social order? (ii) What was the relationship between religion and capitalist society? These two issues were typically combined in the argument that industrial capitalism would undermine traditional religious comitment and thereby threaten the cohesion of society. More recently, the subject has been narrowly defined as the study of religious institutions’ (P-935)। অর্থাৎ, ধর্মের সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে এমন একটি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সমাজতত্ত্ব যা দুইটি বৃহত্তর বিষয় নিয়ে আলোচনা করে : (১) ধর্ম কীভাবে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে; (২) পুঁজিবাদী সমাজের সাথে ধর্মের সম্পর্ক কেমন হতে পারে? তবে এই শেষ আলোচনা হতে এটা প্রমাণিত হতে পারে যে, শিল্পোন্নত সমাজের প্রভাব কমে আসায় সামাজিক শৃঙ্খলা হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। অতি সম্প্রতি এই বিষয়টাকে সংকুচিত করে নাম দেওয়া হয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানবিদ্যা।

American Sociological Association-এর এক নিবন্ধে Michael Roemer, ‘Religion has been an important dimension of all societies and continues to play an influential role in virtually all aspects of contemporary life. The sociology of religion seeks to understand religion in its varied manifestations as a social institution, as a cultural practice, and as a pattern of belief and activities that are shaped by social conditions and that, in turn, shape these conditions’। অর্থাৎ সব সমাজেরই উল্লেখযোগ্য একটি মাত্রা হচ্ছে ধর্ম এবং আজও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব অক্ষুণ্ন রয়েছে। ধর্মের সমাজবিজ্ঞান ধর্মকে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বোঝার চেষ্টা করে। এটি সংস্কৃতি চর্চা হিসেবে এবং একটি বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের ধরন হিসেবে যা সামাজিক অবস্থা দ্বারা রূপায়িত হয় এবং পালাক্রমে যা এসব পরিস্থিতির রূপ নির্ধারণ করে।

William H. Swatos, Jr. Editor Encyclopedia of Religion and Society নামক গ্রন্থে বলেন, ‘The task of the sociology of religion in three ways; first, to further the understanding of the role of religion in society; second, to analyze its significance in and impact upon human history; and, third to understand the social forces and influences that in turn shape religion (Hamilton 1994). A single assumption is, however, embedded in all three statements: The sociologist of religion is concerned with religion only insofar as it relates to the context in which it inevitabley exists. It is this relational quality that distinguishes the strictly socilogical from a wide wariety of other disciplines that have interests in this area (McGuire 1987)।’ অর্থাৎ ধর্মের সমাজবিজ্ঞানের মূল কাজ তিনটি : (১) সমাজে ধর্মের ভূমিকা সম্বন্ধে বাড়তি জ্ঞান অর্জন করা; (২) মানবজাতির ইতিহাসে এর গুরুত্ব ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা; (৩) ধর্মের উপর সামাজিক শক্তির প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা (Hamilton 1994)। এই তিনটি কাজেরই একটি একক বৈশিষ্ট্য রয়েছে- ধর্মের সমাজবিজ্ঞানী ধর্মের বাহ্যিক অনস্বীকার্য গুণাবলি নিয়েই আলোচনা করে। এটা হচ্ছে একটি আপেক্ষিক গুণ যা সমাজবিজ্ঞানকে এক্ষেত্রে অন্য সব বিদ্যা থেকে আলাদা করে তুলে।

Ronald L. Johnston তাঁর Religion in Society নামক গ্রন্থে বলেন, One of the central concerns of contemporary sociology of religion is tracing the interaction of social factors and religion, not pretending or even hoping to discover origion, but only influences on and modifiers or religion. In an important sence it makes little difference to the social scientist whence religion came anyway. The fact that it exists is more than sufficient to merit our attenton and analysis।’ অর্থাৎ সমকালীন ধর্মের সমাজবিজ্ঞানের মূল আলোচ্যবিষয় হচ্ছে ধর্মের সাথে অন্যান্য সামাজিক নিয়ামকগুলোর ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়ার ধরন খুঁজে বের করা, ‘উৎপত্তি’ অনুসন্ধানের ভান বা চেষ্টা করা নয়। শুধুমাত্র ধর্মের উপর সমাজের প্রভাব এবং এর রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করাই মুখ্য উদ্দেশ্য।

বাঙালির ধর্মচিন্তা গ্রন্থের উদ্দেশ্যও তাই। এই গ্রন্থে বাঙালি জনজীবনে অনুসৃত প্রধান চারটি (হিন্দু, বৌদ্ধ, খিষ্ট ও ইসলাম) ধর্মের দর্শনগত দিক সন্ধান সাপেক্ষে এর সামাজিক প্রভাব উপস্থাপনের মাধ্যমে সম্প্রদায় সম্প্রীতি ও সর্বোপরি মানব ঐক্য রচনাই মুখ্য উদ্দেশ্য। আর এ উদ্দেশ্য পূরণে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে বসবাসরত অপরাপর সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির আচরিত ধর্মজীবনের সমাজদর্শন সম্পৃক্ত করে বাঙালির ধর্মজীবনে এক অখণ্ড মানবমণ্ডলীর অবয়ব উপস্থাপনের সদিচ্ছা প্রতিফলিত হয়েছে। তাই সঙ্গত কারণেই গ্রন্থের উপস্থাপন চারিত্রে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অবয়বটি প্রাধান্য পেয়েছে। কেননা তুলনামূলক ধর্মালোচনার মধ্য দিয়েই পরধর্ম সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি ও সম্প্রীতি সম্প্রসারণের লক্ষ্য অর্জনের একটি অন্যতম সহায়ক পথ। এই উপমহাদেশে এই প্রয়াস নতুন নয়। ইতিহাস সন্ধিৎসায় দেখা গেছে, ইসলামের আগমনের পরে প্রকৃতপক্ষে সুফিদের হাত ধরেই পরধর্মে সহিষ্ণুতার পথটি প্রশস্ত হয়। সেই সাথে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির লক্ষে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব আলোচনার প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে।

এই উপমহাদেশে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের সূত্রপাত করেন মোগল সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৬)। ভারতে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির লক্ষে তিনি ফতেপুর সিক্রিতে আয়োজন করেছিলেন আন্তঃধর্মীয় সংলাপ (Interreligious Dialogue )। এই সংলাপের মাধ্যমেই তিনি সকল ধর্মের সারাৎসার সমন্বয় করে তৈরি করেছিলেন দ্বীন-ই-ইলাহী বা স্রষ্টার ধর্ম। আকবরের জীবদ্দশায় ঐকান্তিক উদ্যোগ ছিল নতুন এ ধর্মমত চালু করার; কিন্তু লোকান্তরণের পর দ্বীন-ই-ইলাহী লীন হয়ে যায়। আকবরের দ্বিতীয় কাজটি ছিল ‘সুল-হি-কুল’ বা সর্বজনীন শান্তি নামে জাতীয় নীতি প্রণয়ন। আকবরের লক্ষ্য ছিল পরধর্মসহিষ্ণু ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিভিত্তিক একটি কল্যাণধর্মী সমাজ নির্মাণ। এই ধারাবাহিকতায় গীতাসংকলক শঙ্করাচার্য (৭৮৮-৮২০) ভারতীয় আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (১৮২৪-১৮৮১) প্রমুখ এই উপমহাদেশে ধর্মসংস্কারের অন্যতম উদ্যোক্তা পুরুষ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। এর আগে মোগল সম্রাট শাহজাহান পুত্র দারাশিকো (১৬১৫-১৬৫৯) এই উপমহাদেশে হিন্দুধর্ম ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে মিলন ঘটানোর অভিপ্রায় রচনা করেছিলেন মজমাউল বাহরায়েন (দুই সমুদ্রের মিলন)। কাদেরিয়া তরিকার অনুসারি দারাশিকোর সুফিবাদী চেতনায় রচিত ওয়াহিদাতুল সাওয়ানিহ্ (১৬৪০) আরেকটি সম্প্রীতিমূলক গ্রন্থ। ফারসি ভাষায় উপনিষদ অনুবাদ তাঁর অমর কীর্তি। এর প্রায় আড়াই শ’ বছর পর তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে এগিয়ে আসেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)। লর্ড বেন্টিংকের সহায়তায় হিন্দুসমাজে প্রচলিত সহমরণ প্রথা (সহীদাহ প্রথা) রোহিত করা তাঁর অন্যতম প্রধান কীর্তি। একেশ্বরবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি আরবি-ফারসি ভাষায় রচনা করেন তুহুফাউল মুয়াহহিদ্দীন (একেশ্বরবাদীদের জন্য উপহার)। ‘নিরাকার ব্রহ্মোপসনাই প্রকৃষ্ট’–এই মতবাদের উপর ভিত্তি করে তিনি প্রবর্তন করেন ব্রাহ্মধর্ম।

ধর্মের সামাজিক ভূমিকা

বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয় বলেছেন, বিশ্বের সব ধর্মের রয়েছে তিনটি অপরিহার্য অংশ। প্রথমটি, ফিলসফি অব রিলিজিয়ন, দ্বিতীয়টি, রিচুয়ালস অব রিলিজিয়ন এবং শেষটি, এসেন্স অব রিলিজিয়ন। শেষটির অর্থ ধর্মের সারসত্য— যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ধর্ম সমন্বয়ের সৌধ।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে একটি রাষ্ট্রে বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মানুসারিদের মধ্যে সহঅবস্থানের সূত্র অনুসন্ধান সুকঠিন নয়, অর্থাৎ সকল ধর্মের দর্শনগত মিল প্রায় অভিন্ন। ধর্মের ধর্মানুসারিদের প্রধান উদ্দেশ্য একটি নিয়ন্ত্রিত ও পরিশীলিত জীবনযাপনের মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্যকে অর্থবহ করা। আর জীবনকে অর্থবহ করতে এবং প্রশান্তিপূর্ণ করতে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হয়। পৃথিবীতে ধর্ম চূড়ান্ত অর্থ সম্পর্কিত অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকে। যেমন, জীবনের উদ্দেশ্য কী? মানুষের ভোগান্তির কারণ কী? পরকালের স্বরূপ কেমন হতে পারে! এসব প্রশ্নের উত্তর মানুষের জীবনকে অর্থবহ (ultimate meaning) করে তোলে। কেননা মানুষের জীবনে একটি ধর্মীয় প্রজ্ঞার স্থিতি না থাকলে মানুষ বিপর্যস্ত হয়। আর স্রষ্টা ও সৃষ্টি রহস্যকে ঘিরেই প্রসারিত হয় এই প্রজ্ঞা। ধর্মহীন জীবন হচ্ছে উদ্দেশ্যহীন, এতে সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য থাকে না। পক্ষান্তরে, ধর্মেবিশ্বাসীরা মনে করে তাদের জীবন একটি স্বর্গীয় পরিকল্পনার আওতাধীন পরিচালিত হচ্ছে। চূড়ান্ত অর্থ সম্পর্কিত প্রশ্নোগুলোর উত্তর পেয়ে ধর্ম বিশ্বাসীরা জীবনের এমনকি ভোগান্তিরও একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পায়। তেমনি মৃত্যু ও অসুস্থতার মত দুঃসময়ে মানুষ যেসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আশ্রয় নেয় এগুলোও দুঃখানুভূতির ক্ষেত্রে অনেক প্রশান্তি ( emotional comfort ) যোগায়। তাদের মতে, অন্য যে কোন বিপদ আপদেও ধর্মের আশ্রয় নিলে মনের প্রশান্তি পেতে পারে। ধর্ম শুধু দৈনন্দিন জীবনের দিক নির্দেশনাই দেয় না, বরং মানুষের আচরণবিধিও নিয়ন্ত্রণ (social control) করে। ধর্ম মানুষকে নতুন পরিবেশে খাপ খেতে (adaptation) সাহায্য করে। নতুন কোথাও অভিবাসন গড়ে তুললে ধর্মই অপরিচিত পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে। নিজেদের ভাষাকে ধরে রেখে পুরাতন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করে ধর্ম নতুন পরিবেশে তাদের সংস্কৃতির ধারবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ সামাজিক সংহতি (social solidarity) রক্ষায়ও ধর্মের ভূমিকা আছে। কেননা ধর্মীয় শিক্ষা এবং আচার- অনুষ্ঠান একক বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করে। যাঁদের পরিচয় হয়, ‘আমরা হিন্দু,’ ‘আমরা বৌদ্ধ’, ‘আমরা খ্রিষ্টান’, ‘আমরা মুসলমান’ ইত্যাদি। বিয়ের সময় যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হয় সেই অনুষ্ঠান নবদম্পতিকে বৃহত্তর সম্প্রদায়ের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হতে সাহায্য করে। তেমনি জন্ম এবং মৃত্যুর সময়কার অনুষ্ঠানাদির একই ভূমিকা থাকে। Kingsley Davis বলেন, ‘Religious ritual is the active side of religion’। ধর্মের সাংস্কৃতিক (ritual) দিকগুলোর মধ্য দিয়ে উৎসবে আনন্দে, দুঃখ-বেদনায় পরস্পরের মিলন ঘটিয়ে এক সৌহার্য্যপূর্ণ বাতাবরণ সৃষ্টি করে। ডুরখেইম এর মতে, ধর্ম হচ্ছে পৃথিবীটাকে পবিত্র করার প্রচেষ্টা এবং এর আলোকে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের প্রবর্তন করা। এই পরিবেশের মধ্যেই এক অপরের প্রকৃত বন্ধু খুঁজে পায়। প্রকৃত বন্ধু কে? এর উত্তরে প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে উল্লেখিত হয়েছে :

উৎসবে ব্যসনে চৈব দুর্ভিক্ষে রাষ্ট্রবিপ্লবে
রাজাদ্বারে শশ্মানে যষ্ঠিষ্ঠতি সঃ বান্ধবঃ।

তাই বাঙালির ধর্মানুষ্ঠানে এখন সোৎসাহে উচ্চারিত হয়— ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার।’ যদিও ইসলামি আইনশাস্ত্রে এটি অনুমোদন দেয় না।

কেননা ইসলামী আইন যে যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, ইসলামী আইনতত্ত্ব (Jurisprudence) সেই যুক্তির সন্ধান দেয়। শক্তি প্রয়োগের ভয়ে আইন মানা আর যুক্তির প্রবর্তনায় আইন মানা ভিন্ন বস্তু। দ্বিতীয়টি অনেক উচ্চ স্তরের। ইসলামী আইনের উৎস হচ্ছে পবিত্র কোরআন এবং হাদীস। কোরআন শরীফের মধ্যে ইসলামী আইনের মৌলিক ইঙ্গিত রয়েছে এবং হাদীস শরীফে তার ব্যাখ্যাগত বিন্যাস আছে। হাদীস বেত্তাগণ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হাদীসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন এবং সেই সমস্ত ব্যাখ্যায় মূল আইনের তাৎপর্যের উপর বিভিন্ন প্রকারের গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইমাম আবু হানিফা কোনও একটি বিষয়ের উপর যে প্রকারের গুরুত্ব আরো করেছেন, অবিকল সেই গুরুত্ব ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল হয়ত দেননি। কিন্তু এঁদের উভয়ের প্রতিবেদনের মধ্যে ব্যাখ্যাগত পার্থক্য কিছুটা থাকলেও মূল উৎসটা চিরন্তন থাকছে, কারণ তার মূল উৎস হচ্ছে কোরআন শরীফ। সেই কারণেই বিভিন্ন ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে কোরআন শরীফের যথার্থ তাৎপর্য নির্ধারণ করবার অধিকার প্রতিটি মূসলমানদের থাকে। যাঁরা ইসলামী আইনে বিশেষজ্ঞ তাঁদের উপর দায়িত্ব তাই গুরুতর— তাদেরকে এই মূল তাৎপর্য নির্ধারণ করতে হয়। বাংলাদেশে যাঁরা ইসলামী আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন তাঁদের সাধারণত আরবী ভাষায় জ্ঞান নেই এবং সে কারণেই তাঁরা উৎস থেকে অর্থ আবিষ্কার করতে সক্ষম হন না। আইনতত্ত্বের ইসলামী প্রতিশব্দ ফিকহ। ‘ফিকহ’ শব্দটির মূল অর্থ উপলব্ধি ও কোনও কিছুর জ্ঞান। (Ahmad Hasan, The Early Development of Islamic Jurisprudence) ।

অবশ্য যে-সকল বিধিনিষেধ রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং যা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্য পালনীয় তার অধিকাংশেরই উৎস এখনও ধর্ম। যেমন মুসলিম পারিবারিক আইনের উৎস : কোরান, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। এগুলি মুসলিম সমাজে হাম্বলি, হানাফি, মালিকী ও শাফেয়ি— এই চারটি মাযহাব ( School of Thoughts) দ্বারা পরিচালিত হয়। ঠিক এমনিভাবে হিন্দু সমাজেও তাদের জীবনপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয় যে ধর্মীয় বিধান দ্বারা তার একটির নাম মিতাক্ষরা আর অপরটির নাম দায়ভাগ। বিজ্ঞানেশ্বর নামে এক পণ্ডিত ব্যক্তি একাদশ শতাব্দীতে মিতক্ষরা প্রণয়ন করেন। মিতক্ষরা যাজ্ঞবল্ক প্রণীত স্মৃতিশাস্ত্রের ধারাবাহিক ব্যাখ্যা। উভয় বাংলার বাঙালি হিন্দু ব্যতীত উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে মিতক্ষরা হিন্দু আইন হিসেবে প্রচলিত। জীমুত বাহন নামে অপর পণ্ডিত ব্যক্তি ত্রয়োদশ (মতান্তরে চতুর্দশ) শতাব্দীতে দায়ভাগ প্রণয়ন করেন। দায়ভাগ উভয় বাংলার হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত মান্য হিন্দু আইন। বস্তুত এই দুটি ধর্মশাস্ত্রই উপমহাদেশের হিন্দু সমাজে প্রচলিত আইনের প্রধান উৎস।

ধর্ম মানুষের জীবনাচরণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও অর্থনীতিও নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন হিন্দুধর্মে সুদকে নিন্দনীয় করা হয়েছে। সংস্কৃতে সুদকে ‘কুসীদ’ বলা হয়। বেদে ‘কুসীদ’ বা সুদকে নিন্দনীয় কাজ হিসেবে উল্লেখ করে সমাজে কুসীদজীবীর স্থান অনেক নিচে দেখানো হয়েছে। এছাড়া প্রাচীন হিন্দুসমাজে সুদখোরের নিন্দা করে একটি প্রবাদও চালু ছিল— ‘ন গচ্ছেৎ শুণ্ডিকায়লং’ অর্থাৎ সুদখোরের বাড়িতে যেয়ো না। কোরানে ঘোষিত হয়েছে : আল্লাযীনা ইয়া কুলুনার রিবা-লা-ইয়াকূমূনা ইল্লা-কামা-ইয়াকূমুল্লাযী ইয়াতাখাব্বাতুহুশশাইতা-নু মিনাল মাছছি যা-লিকা বিআন্নাহুম কা-লূ ইন্নামাল বাইউ মিছলুর রিবা-। ওয়া আহাল্লাল্লা-হুল বাই’আ ওয়া হাররামার রিবা-ফামান জাআহু মাওইজাতুম মির রাব্বিহী ফানতাহা-ফালাহু মা- ছালাফা ওয়া আমরুহ ইলাল্লা-হি ওয়া মান ‘আ-দা ফাউলাইকা আসহা-বুন্না-রি হুম ফীহা-খা-লিদূন’।

অনুবাদ : যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দণ্ডায়মান হবে, যেভাবে দণ্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছে : ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লাহ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়েছে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। (ইফা)। এই বর্ণনার মূল বক্তব্য হল— ‘আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম’ (সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৫)। সুদ হারাম হওয়ার মানে হল কোন কিছু বিক্রি করার সময় অতিরিক্ত যা পেতে চায়, সেটা হারাম। এটি সুদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যে পুঁজি বিনিয়োগে শ্রম যুক্ত নেই অথচ মুনাফা প্রাপ্তি আছে, যখন অর্থ নিজেই অর্থ উৎপাদন করে। অর্থাৎ যে অর্থ পণ্য উৎপাদন ছাড়াই অর্জিত হয়, তা অবৈধ। ইরাকের বাকের সদর (১৯৩৮-১৯৭৯) উদ্ভাবিত সুদমুক্ত এই আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার নাম ‘মুদারাবা’।

ধর্মের অনেক সামাজিক ভূমিকা রয়েছে যেমন হিন্দুসমাজের কারো সন্তান জন্মসংবাদে বলেন ‘আয়ুষ্মান ভবঃ’ (দীর্ঘজীবী হউক)। মৃত্যুসংবাদে বলেন ‘লোকান দিব্যান্ স গচ্ছতু’ (তিনি দিব্যলোকে অধিষ্ঠান করুন)। মুসলিম ধর্মানুসারিরা বলেন, ‘ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন’ (তিনি যে পথে গিয়েছেন আমিও শীঘ্রই সেই পথের অনুবর্তী হব)। হিন্দু ধর্মানুসারি সাক্ষাতে কাউকে ‘নমস্কার’ জানায়। কাউকে নমস্কার জানানো মূলত সর্বজীবে অন্তর্যামীরূপে অবস্থিত পরমাত্মাকেই প্রণতি নিবেদন করা হয়, কোন মানুষ্যদেহকে নয়, মুসলিম ধর্মানুসারিদের অনুসৃত বাক্য ‘আসসালামু আলাইকুম’– (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হউক)— এ সবই ধর্মের সামাজিক ভূমিকার প্রশান্তিপূর্ণ দিক।

আগামী দিনের ধর্মীয় সম্প্রীতি

মানব জাতির পরম শত্রু শয়তান সম্বন্ধে লেবাননের বিখ্যাত আরবি লেখক খলিল জিবরান (১৮৮৩-১৯৩১) একটি চমৎকার গল্প লিখেছেন। জিবরান জাতে আরব ও ধর্মে খ্রিষ্টান ছিলেন আর লিখতেন তাঁর মাতৃভাষা আরবিতে। তাঁর গল্পটির প্রাথমিক অংশটুকুই এখানে উদ্ধৃত হল:

একদিন এক পাদ্রি সাহেব জনহীন এক প্রান্তরের উপর দিয়ে একা একা বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ এক করুণ আর্তনাদ তাঁর কানে ভেসে এল। তিনি থমকে দাঁড়ালেন। এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলেন কে একজন রাস্তার পাশের খাদে আহত অবস্থায় পড়ে আছে, সারা অঙ্গে তার ক্ষত চিহ্ন। মাথা আর বুকের ক্ষতস্থান থেকে তখনো রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। পাদ্রিকে দেখতে পেয়ে লোকটি কাতর কণ্ঠে বলে উঠল : দয়া করে আমাকে বাঁচান, যন্ত্রণায় আমি মারা যাচ্ছি, দোহাই আমার একটুখানি সদয় হোন। পাদ্রি সাহেব ধাধায় পড়লেন। লোকটি কে হতে পারে? ভাবলেন হয়ত চোর-ডাকাতই হবে। ধরা পড়ে বেদম মার খেয়েছে। এমন লোককে সাহায্য করতে গেলে নিজেই না জানি কী বিপদে পড়ে যাই। বেঁচে উঠলে তো লোকে বলবে আমি বোধ করি চোরের সাথী আর মরলে তো বলবে আমিই ওকে খুন করেছি। বাবা অত হাঙ্গামে গিয়ে কাজ নেই। এই ভেবে পাদ্রি সাহেব সামনে পা বাড়ালেন। মুমূর্ষু লোকটি আবারও আর্তনাদ করে উঠল : দোহাই, আমাকে এভাবে ফেলে যাবেন না, স্যার। আমি মারা যাচ্ছি, দয়া করে আমাকে বাঁচান। পাদ্রি সাহেবের মনে দ্বিধা জাগল : আর্তের সাহায্য না করাও তো অন্যায়। লোকটি পাগল-টাগলও তো হতে পারে, পাগলামি করতে গিয়েই হয়ত পড়ে গেছে খাদে। উঃ! ক্ষতস্থান থেকে এখনো যেভাবে রক্ত ঝরছে দেখলেই তো ভয় হয়। তবে আমি হচ্ছি আধ্যাত্মিক অসুখ-বিসুখের চিকিৎসক, দেহের ক্ষত আমি কী করে সারাব?

ফের পা বাড়ালেন তিনি নিজের গন্তব্য পথের দিকে।

দেখে আহত লোকটি আরো জোরে কাকুতি মিনতি করত লাগল : আমাকে চিনতে পারলেন না, স্যার? কাছে এলে হয়ত চিনতে পারবেন : আমরা তো দীর্ঘকালের সহকর্মী, বন্ধুও বলা যায়। আপনি পাদ্রি, লোকের পথপ্রদর্শক, মানুষের উদ্ধার-কর্তা। আর আমাকে এ সামান্য দয়াটুকুও করতে আপনার ইচ্ছা হচ্ছে না, স্যার? আমি চোর নই, ডাকু নই পাগল-ছাগলও নই। আর একটু কাছে এসে দাঁড়ান স্যার, আমার পরিচয়টা না হয় বলেই ফেলি। এবার পাদ্রি সাহেবের কৌতূহল গেল বেড়ে, এগিয়ে এসে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন লোকটার মুখের দিকে। লোকটির কেমন এক অদ্ভুত চেহারা, বুদ্ধির সঙ্গে ধূর্ততার, সৌন্দর্যের সঙ্গে বীভৎসতার, দুষ্টুমির সঙ্গে কোমলতার সে এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ। এমন চেহারা পাদ্রি এর আগে আর কখনো দেখেননি, বিস্মিত পাদ্রি জিজ্ঞাসা করলেন : তুমি কে?

মুমূর্ষু লোকটি ক্ষীণকণ্ঠে বলল : আমাকে ভয় পাবেন না স্যার। আসলে আপনি আর আমি বহুকালের পুরনো দোস্ত। আমাকে ধরে একটুখানি নদীর ধারে নিয়ে চলুন, ক্ষতস্থানগুলি ধুয়ে একটু বেঁধে দিন। অন্তত রক্ত পড়াটা তো বন্ধ হোক। পাদ্রির বিস্ময়ের ঘোর যেন কিছুতেই কাটতে চায় না। বললেন : আগে বল তুমি কে? আমি তো তোমাকে মোটেও চিনতে পারছি না। কোনদিন দেখেছি বলেও তো মনে পড়ে না। আহত লোকটি এবার অস্থির কণ্ঠে বলে উঠল : আমার পরিচয়, স্যার, আপনি ভাল করেই জানেন, দিনে আপনি হাজার বার নিয়ে থাকেন আমার নাম। ধরতে গেলে আমি আপনার প্রাণের চেয়েও প্রিয় …। পাদ্রি সাহেব এবার আর ধৈর্যরক্ষা করতে পারলেন না। ধমকে উঠলেন : তুমি একটা আস্ত জোচ্চোর, ডাহা মিথ্যেবাদী, বলছি তোমার এ পাপ মুখ আমি জীবনে কখনো দেখিনি, তবুও…। যাগগে, যদি বাঁচতে চাও তা হলে খুলে বল তুমি কে? মুমূর্ষু লোকটি এবার মরিয়া হয়ে আর একটু সরে এল পাদ্রির দিকে। ভালো করে তাকিয়ে দেখল পাদ্রির দুই চোখের পানে। দেখতে দেখতে ওর বিষণ্ন মুখে ফুটে উঠল এক বাঁকা ব্যঙ্গ-হাসি। তারপর ধীরস্থির গম্ভীর কণ্ঠে বলল: ‘আমি শয়তান’। ধর্ম-ভীরু পাদ্রি শুনেই আঁতকে উঠলেন। হায় হায় কী গজব!

কী গজব! আমাকে কিনা আজ তোমার নারকীয় মুখ দেখতে হল! চির অভিশপ্ত তুমি মর, মর। মরে জাহান্নামে যাও।

বলতে বলতে হন্ হন্ করে পাদ্রি সাহেব হাঁটা শুরু করলেন সামনের দিকে। নাছোড়বান্দা শয়তান আবারও কাতর কণ্ঠে বলে উঠল : দোহাই আমাকে এভাবে ফেলে যাবেন না, স্যার। আমাকে বাঁচান, শিগগির আমার ক্ষতস্থান বেঁধে দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করুন।

অগ্নি-দৃষ্টি হেনে পাদ্রি রুষ্টস্বরে বললেন : যে হাতে রোজ রোজ আমি ঈশ্বরের তর্পণ করে থাকি সে হাত আমি কিছুতেই তোমার না-পাক দেহে লাগাতে পারব না। শয়তান এবার এক হাতের কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে রক্ত সিক্ত মাথাটা সামান্য আলগা করে বলল : আপনি নিজের পায়েই নিজে কুড়াল মারছেন স্যার, অথচ তা বুঝতে পারছেন না। জানেন, আপনার সব রকম সুখশান্তির মূলে কিন্তু আমি। আর আপনি আমাকেই কিনা দিচ্ছেন অভিশাপ! আমার অস্তিত্বের উপর আপনার জীবন, জীবিকা, ধন-দৌলত, সুখ-সমৃদ্ধি সব কিছুই তো নির্ভর করে। আর আপনি কিনা আজ আমার এ রকম দুর্দিনে আমার প্রতি সামান্য এ দয়াটুকু দেখাতেও নারাজ। আপনার জীবন-ধারণের একমাত্র হাতিয়ার তো আমি, একমাত্র পুঁজি তো আমার নাম। আমার নাম ভাঙ্গিয়েই তো আপনার যতসব হালুয়া-রুটি। আমি আছি বলেই তো আমার ভয় দেখিয়ে নিজের সব রকম তুকতাকের সাফাই গাইতে পারেন সরল বিশ্বাসী মানুষের কাছে। আমার ভয় দেখিয়ে জীবনে কত ধন রোজগার করেছেন একবার ভেবে দেখুন দেখি। আমি মরে গেলে আপনাকেও কি স্রেফ উসে মরতে হবে না? আজ যদি আমার মৃত্যু ঘটে তা হলে কাল থেকে আপনিও কি সম্পূর্ণ বেকার হয়ে যাবেন না? মনে রাখবেন দুনিয়া থেকে আমার নাম মুছে গেলে, নির্ঘাত আপনার পেশারও ঘটবে ভরাডুবি। কাল থেকে আপনার ঘরেও জ্বলবে স্রেফ লালবাতি। ভেবে দেখুন, সারাজীবন গ্রামে গ্রামে ঘুরে শয়তানের খপ্পরে না পড়ার জন্য লোককে ইনিয়ে বিনিয়ে কত উপদেশ খয়রাত করেছেন আপনি? বিনিময়ে গরিবের ক্ষেতের কত ফসল, কত ফলমূল, দুঃখের কত সন্ধ্যা সোনাদানা আপনার ঘরে আর আপনার আলখাল্লার পকেটে আশ্রয় নিয়েছে একবার হিসাব করে দেখুন। আমি না থাকলে তাবিজ-মাদুলি আর ঝাড় ফুঁকের জন্য কেইবা আপনার দোরগোড়া মাড়াবে বলুন তো! গাঁয়ের লোকেরা যখন শুনবে তাদের পরম শত্রু শয়তান আর ইহজগতে নেই তখন তারা কি আপনার শরণাপন্ন হবে? তখন হাঁস-মুরগি আর ছাগল দুম্বার কল্লাটা কে আর আপনার পাতে তুলে দিতে গরজ করবে বলুন? অতএব আমি মরলে শুধু যে আমি মরব তা নয় আপনিও মরবেন এবং মরবেন ঝাড়ে-বংশে। শয়তানের এ সুচিন্তিত আর সারগর্ভ বক্তৃতা শোনার পর পাদ্রির যেন মুহূর্তে ধ্যানচক্ষু খুলে গেল। তখন বিনাবাক্যে তৎক্ষণাৎ তিনি আহত শয়তানের বিশাল দেহটা নিজের কাঁদে তুলে নিলেন। শয়তানের ক্ষতস্থান থেকে চুইয়ে পড়া রক্তে তাঁর সাদা ধবধবে লম্বা আলখাল্লাটা ভিজে রক্তাক্ত হয়ে গেল। পাদ্রি সাহেবের সেদিকে কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই। শয়তানের দেহভারে তাঁর নিজের দেহটা ধনুকের মত বেঁকে পড়েছে। তবুও প্রাণপণে অত বড় দেহটা তিনি একাই বয়ে নিয়ে গেলেন নিজের বাড়ি এবং বেশ আলতোভাবে অতি প্রিয়জনের মত শুইয়ে দিলেন নিজের সযত্নে পাতা ধবধবে বিছানায়। তারপর স্বহস্তের সেবাযত্নে শয়তানকে নিরাময় করে তুললেন অল্পদিনের মধ্যেই। (Edward W. Said, The Orientalism, P. 27 )।

সেই থেকে আবার নব উৎসাহে ও নতুন উদ্যমে ঈশ্বরভক্ত পাদ্রি ও ঈশ্বরোদ্রোহী শয়তান সহ-অংশীদার হয়ে সগৌরবে আর অতি সাফল্যের সাথে নিজ নিজ পেশা চালিয়ে যাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান তথা co-existence-এর এমন চমকার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি মিলবে কিনা সন্দেহ। ঈশ্বরকে আমরা দেখতে পাই না কিন্তু ঈশ্বরভক্ত পাদ্রিকে দেখতে পাই। তিনি এবং তাঁর অনুরূপ পেশার লোকের ঈশ্বরের স্বনির্বাচিত প্রতিনিধি। ঈশ্বরের বিপরীতে শয়তানকে না দাঁড় করালে চিত্রটি পূর্ণাঙ্গ হয় না। তাই ঈশ্বর-রূপী কল্প-মূর্তির স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে বিপরীত কল্প মূর্তি শয়তানের আবির্ভাবও অপরিহার্য। তবে জিজ্ঞাস্য : মানুষ কেন ঈশ্বর আর শয়তানে বিশ্বাস করে? যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে এ যাবৎ কোন দার্শনিক ধর্মবেত্তাই এ জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।

১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর বিশ্ববিশ্রুত গ্রন্থ অরিয়েন্টালিজম প্রকাশ করে প্রাচ্যসম্পর্কিত ধারণা সারা পৃথিবীর সাধারণ ও বিশেষজ্ঞজনদের চিরায়ত বিশ্বাসকে পুনর্পাঠ বাধ্য করে তোলেন। সাঈদ-এর বইটি মূলত ছিল নিকট প্রাচ্যের ধর্ম ইসলাম ও তার অনুসারিদের উপর প্রাচ্যতাত্ত্বিক অপপ্রচারের প্রত্যুত্তর। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তায় এবং ধর্মচিন্তায় ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে সাঈদ বর্ণিত এই ব্যঙ্গ গল্পের মর্মবাণী স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পশ্চিমা পণ্ডিত তথা ধর্মবিশেষজ্ঞদের ওই কপট সম্পর্কের সম্প্রসারণ বাঙালির ধর্মচিন্তায় সক্রামিত হোক এটা প্রত্যাশিত নয়। এ কারণে বাঙালির ধর্মচিন্তায় কৃত্রিমতাবর্জিত সুসম্পর্কের উত্তরণ ঘটানোর প্রথম পদক্ষেপই হওয়া দরকার রাজনীতি থেকে ধর্মের বিযুক্তিকরণ।

কিন্তু কে করবেন এই “বিযুক্তিকরণ’? ধর্ম যেখানে শাসকের কাছে অস্ত্র, সেখানে শাসকের কাছ থেকে এই প্রত্যাশা পূরণ দুঃস্বপ্ন! যে অস্ত্র প্রয়োগ করেই তাকে ক্ষমতায় থাকা না থাকার ঝুঁকি নিতে হয়, শাসক সে অস্ত্র হাতছাড়া করবেন না— এটাই স্বাভাবিক। ফলে রাজনীতিতে ধর্মলেবাসী ‘সাধু’ আর ধোকাবাজ ‘শয়তান’-এর সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক চুক্তি একটি অনিবার্য ব্যাপার! এই ‘সাধু’ ও ‘শয়তান’ এর বন্ধুত্ব বিচ্ছিন্ন করতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত শুভ শক্তির জাগরণ। কী করে সম্ভব এই জাগরণ? এই জাগরণের অন্যতম উপায় হতে পারে রাজনীতি থেকে ‘ক্ষমতামোহ’ আর ধার্মিকতা থেকে ‘ধর্মমোহ’ সরিয়ে মানুষকে সর্বমানবিক বোধে উজ্জীবিত করা। কে নেবেন এই উজ্জীবিত করার দায়িত্ব?

গীতা গ্রন্থে এ ব্যাপারে অনেক আগেই বলে দেয়া হয়েছে : ‘যখন সত্যের সাথে অসত্যের লড়াই হয়, তখন সত্য একা দাঁড়ায়। অসত্যের বাহিনী থাকে বিশাল, তার পিছনে থাকে মূর্খ, লোভী, স্বার্থপর ও বিশ্বাসঘাতকেরা।’ তখন সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সম্মিলিত শুভ শক্তির উত্থান ব্যতীত গত্যন্তর থাকে না। আর তা না হলে একা নিজেকেই আগে এগিয়ে যেতে হয়।

নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

J.B. Bury, A History of Freedom of Thought, Cambridge, 1914. M.M. Pickthall, Meaning of the Glorious Koran; London, Knopf, 193০

Dr. Maurice Bucaille, The Bible, The Qur’an and Science; Editions Robert Lafont, Paris, France, 1975

William James, The Varieties of Religious Experience: A study in Human Nature, Penguin Books Ltd, Penguin Classics 1985

Yuval Noah Harari, Sapiense: A Brief History of Humankind; England, 2014

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ধর্ম্মতত্ত্ব অনুশীলন; (বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড); কামিনী প্রকাশালয়, কলকাতা, ১৯৯১

ড. মুহম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, কুরআনের পরিভাষা; কামিয়াব প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৯৮

ড. আমিনুল ইসলাম, মুসলিম ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন; মাওলা ব্রাদার্স, চতুর্থ মুদ্রণ, ঢাকা, ২০০৮

মাওলানা আবদুর রাহীম হাযারী, সুফিতত্ত্বের আত্মকথা; নবরাগ প্রকাশনী, ঢাকা, চতুর্থ প্রকাশ, ২০০৮

সদরউদ্দিন আহমদ চিশতি, মসজিদ দর্শন; র‍্যামন পাবলিশার্স, ঢাকা, ২০১৩

শফিকুর রহমান, পার্থিব জগৎ; জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা, দ্বি. সং. ২০১৩

ড. সৈয়দ আবদুল লতিফ, কোরআন ও মানুষের মন; (অনুবাদ : মোহাম্মদ দরবেশ আলী খান), বর্ণায়ন, ঢাকা, ২০১৪

মোস্তাক আহামাদ, বিশ্ববিখ্যাত সুফিদের তত্ত্বরহস্য; জিনিয়াস পাবলিকেশনস, ঢাকা ২০১৫

শ্রীমৎ বিদেহানন্দ ব্রহ্মচারী (সংকলিত ও সম্পাদিত) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা; শ্ৰীশ্ৰী জ্যোতিশ্বর গীতা শিক্ষা সংঘ (জ্যোগীশিস), ঢাকা, প্র. প্র. ২০১৬

মাহমুদুল হাসান নিজামী, ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মবিশ্বাস: প্রধান ধর্মগুলোর ইতিহাস; রোদেলা প্রকাশনী, ঢাকা, প্র. প্র. ২০১৮

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *