সরল-জটিল – ৯

সন্ধ্যেবেলাতেই এল সেই চরম দুঃসংবাদ।

এখানে টিভি নেই, টেলিফোন নেই সব বাড়িতে। রেডিও আছে, তা কেউ মন দিয়ে শোনে না। কাছাকাছি একটা ছোট শহর যোলো কিলোমিটার দূরে, প্রোডাকশন ম্যানেজার শশী সেখানে গিয়েছিল কিছু জিনিসপত্র কিনে আনবার জন্য।

সেখানে নাকি একটা ওষুধের দোকানে (সে দোকানে মদের বোতলও পাওয়া যায়) বসে রেডিওর খবর শুনেছে।

বেনারসের কাছে একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে জগৎ শা-র। তাঁর স্ত্রী আর ছোট ছেলেটিও গাড়িতে ছিল, কেউ বেঁচে নেই।

শশী সেখান থেকে মুম্বাইতে টেলিফোন করেও জেনেছে যে খবরটি সত্যি।

জগৎ শা এই ছবির প্রোডিউসার।

শশীর মুখে খবরটা শুনে রাকেশ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিল, তারপর শুয়ে পড়েই কয়েক মিনিটের জন্য অজ্ঞান। শুধু প্রয়োজনক নন, জগৎ শা রাকেশের কাকা।

এরপর আর শুটিং চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

এ ছবির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল। তা ছাড়া জগৎ শা-র শেষকৃত্যের সময় রাকেশকে উপস্থিত থাকতেই হবে। এখন সম্পত্তি ভাগাভাগিরও প্রশ্ন আছে।

সুতরাং, প্যাক আপ। প্যাক আপ।

দুটি গাড়ি সব সময় মজুত থাকে, ব্যবস্থা হয়ে গেল আরও দুটি গাড়ির। বেরিয়ে পড়তে হবে ভোর রাতে।

সবাই জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে লাগল। আজ আর রাতিরে কারও ঘুম হবে না। জগৎ শা মুম্বাইয়ের ফিম্ম-মহলে হোমড়া-চোমড়া ব্যক্তি। আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে তাঁর টাকা ঢালা আছে, এখন প্রচুর সোরগোল হবে।

সে নিজের ঘরের বিছানায় আধ-শোয়া হয়ে একটা বই পড়ছে। আজ সারা রাত তার শুটিং হওয়ার কথা ছিল। এখন তার ছুটি।

ললিতা ঘরে ঢুকে বলল, ছি ছি ছি, কী কাণ্ড!

সোহিনী মুখ তুলে তাকাল।

ললিতা আবার বলল, আজ শুটিং হবে না বলে সবাই ঢক ঢক করে মদ গিলতে বসে গেছে!

সোহিনী বলল, কাজ হবে না, এখন ওদের যদি ইচ্ছে হয়, তাতে আপত্তির কী আছে?

ললিতাকে কেউ একজন বলেছিল, তার মুখে ভাল এক্সপ্রেশন ফোটো না বলে সে বড় পার্ট পায় না। সেই জন্য ললিতা এখন কথা বলার সময় যখন তখন ভুরু তোলে, ঠোঁট কাঁপায়, ধুতনিতে আঙুল ছোঁয়ায়।

সে চোখ বড় বড় করে বলল, বাঃ, একজন লোক মারা গেছে, অত বড় একজন মানুষ—

সোহিনী বলল, অত বড় মানে কি মহাপুরুষ?

তুই কী বলছিস? ফিল্ম ওয়ার্ল্ডের একজন জায়ান্ট!

জায়ান্ট মানে তো মহাপুরুষ নয়। রাকেশ ছাড়া উনি আমাদের কারোর আত্মীয়, স্বজন বা প্রিয়জনও নন। আমাদের সঙ্গে শুধু টাকার সম্পর্ক। মারা গেছেন সেটা দুঃখের কথা, তা বলে বসে বসে তার জন্য শোক করাও তো মোটেই স্বাভাবিক নয়।

তুই সব সময় বেশ গুছিয়ে কথা বলিস সোহিনী। ওই জগৎ শা-কে আমি কিন্তু দেখেছি। দেখেছি, মানে, চিনতাম।

ওর সঙ্গে হোটেল থেকেছিস?

বাঃ, কী যে বলিস!

অত ঢাক ঢাক গুড় গুড় করার কী আছে? আমাকে ও তো ইস্কিত দিয়েছিল। তখনই আমি রটিয়ে দিলুম, রাকেশের সঙ্গে আমার আশনাই চলছে।

রটিয়ে দিয়েছিস? সত্যি সত্যি হয়নি।

আমাদের জীবনে আর সত্যি বলে কিছু আছে নাকি? সবই তো মিথ্যে? গরিবের মেয়ে, সুলতানা রিজিয়া, পরের ছবিতে মেয়ে পুলিশ-অফিসার, তারপর লক্ষ্মী-এর বাইজি, এর মধ্যে আমার নিজের পরিচয় কোনটা?

তুই জিনিসপত্র গুছিয়ে নিবি না?

নাঃ! আমি যাব না ভাবছি।

যাবি না মানে? কোথায় থাকবি!

এই বাড়িটা তো আরও সাতদিনের জন্য ভাড়া নেওয়া আছে।

অ্যাঁ? তুই এখানে একলা থাকবি? পাগল হয়েছিস নাকি?

পাগলরা বুঝি একলা থাকে? ওই জগৎ শা-র ফিউনারালে গিয়ে আমার চোখের জল ফেলতে হবে, আমার একদম ইচ্ছে করছে না।

চোখের জল ফেলা তো আমাদের পক্ষে সব থেকে সহজ।

তুই গিয়ে খুব কান্নার এক্সপ্রেশন দে, তোর অনেক ছবি উঠবে। ললিতা, ওই জানলাটা খুলে দে তো। আজ চাঁদ উঠবে।

তুই সত্যি যাবি না?

না।

ললিতা ঝট করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

একটু বাদে তার বদলে ফিরে এল ইমতিয়াজ। তার হাতে একটা গ্লাস ভর্তি রাম।

সোহিনী তাকে দেখেই বলল, ওই দরজার কাছে দাঁড়াও, আর এগোবে না।

ইমতিয়াজ থমকে গিয়ে বলল, ম্যাডাম, কী শুনছি? ললিতা গিয়ে যা বলল—

সোহিনী বলল, একটা বই পড়ছি, এত লোক এসে কথা বলছে, দু-পাতা এগোতে পারছি না। হ্যাঁ, যা শুনলেছো, তা সত্যি। আমি যাচ্ছি না।

ইমতিয়াজ অভিনয় করে না, সে পরিচালকের সহকারী, তার মুখে ফুটে উঠল খাটি বিস্ময়। সে বিহুলভাবে বলল, কেন?

সোহিনী বলল, আমার ইচ্ছে করছে না।

ইচ্ছে করছে না?

হ্যাঁ, আমার ইচ্ছের বুঝি কোনও মূল্য নেই?

এখানে…একা একা…

একাকী তো থাকতে চাই। প্রোডাকশনের জগলুল আর আলি আমার দেখাশুনো করবে। ওদের তো এখন না ফিরলেও চলবে। আমি ওদের পেমেন্ট করে দেব।

সোফি, তুমি বুঝতে পারছ না।

ইমতিয়াজ, আমি তোমাকে আগেই বলে দিয়েছি, তুমি আমার নাম ধরে ডাকবে না। আমাকে তুমি করেও বলবে না।

আই অ্যাম সরি, আই অ্যাম সরি। ম্যাডাম, আপনি বুঝতে পারছেন না, জগৎ শা-র

ফিউনারালে আপনি না গেলে প্রেসে কত রকম কথা রটবে। খুব খারাপ এফেক্ট হবে। অবশ্যই যাওয়া উচিত।

তার জন্য তোমার এত মাথা ব্যথা কেন?

তুমি এখন আলমোস্ট টপ পজিশনে আছ। সাউথ থেকে সূর্যকুমারী ধাঁ ধাঁ করে উঠে আসছে। মহেশজির ছবিতে যদি ও চান্স পায়।

মহেশজির সঙ্গে আমার কন্ট্রাষ্ট হয়ে আছে। এর পরের দুটো ছবিরও তোমাকে এ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।

সোফি, আমি তোমার ভালোর জন্য বলছি।

আবেগের চোটে ঘরের মধ্যে কয়েক পা চলে এসেছে ইমতিয়াজ। খানিকটা নেশায় চকচক করছে তার দু’চোখ।

সোহিনী হঠাৎ চড়া গলায় বলল, শাট আপ! বলেছি আমার নাম ধরে ডাকবে না। নাউ, লিভ মি অ্যালোন।

ধমক খেয়ে চুপসে গেল ইমতিয়াজ।

মিনমিন করে বলল, আমি একবার মাত্র একটা দোষ করে ফেলেছি, তা তুমি কিছুতেই ক্ষমা করতে পারো না? আমি সত্যি সত্যি তোমার ওয়েল উইশার।

সোহিনী এবার দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখল।

একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল ইমতিয়াজ। সোহিনীর মেজাজকে সবাই ভয় পায়।

মিনিট পাঁচেক বাদে ফিরে এল ললিতা। তার সঙ্গে শশী।

শশীর মুখ দেখলে সব সময় মনে হয়, তার ঘাড়ে সারা পৃথিবীর দায়িত্ব। তার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, এ দাড়ি কখনও বাড়ে না আবার দাড়ি কামানো চকচকে মুখও দেখা যায় না।

শশী বলল, কুরুতুলাইন, তুমি নাকি এখানে থেকে যেতে চাইছ?

সোহিনী এবার বইটা মুড়ে রেখে উঠে বসে বলল, আজ কী ব্যাপার হল, সবাই কি আমার সোহিনী নামটা ভুলে গেল?

শশী বলল, তোমাকে তো সেই প্রথম থেকেই দেখছি। তোমার নামটা তো বদলে দিলেন দিলীপকুমার, মনে আছে? তিনি কিন্তু এখনও তোমায় এই নামেই ডাকেন।

সোহিনী বলল, কিন্তু আপনাকে এই নামে ডাকার অধিকার দেওয়া হয়নি।

আগে তোমার এত মেজাজ ছিল না। তুমি আমাকেও ধমকে কথা বলছ?

শশীদা, জানেনই তো এক-একদিন আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। তখন একটা কিছু বই না পড়লে আমার মাথা ঠিক হয় না। কেউ আমাকে বই পড়তে দিচ্ছে না। এই ললিতাটাই যত নষ্টের গোড়া। তোমার ওই কথাটা বাইরে গিয়ে সবাইকে বলার কী দরকার ছিল?

বাঃ! বলব না? তুমি পাগলামি করতে চাইলে আমরা সবাই মেনে নেব?

শশীদা, আমি যদি এখানে আরও কয়েকটা দিন থেকে যাই, তাতে কোনও অসুবিধে আছে?

অসুবিধে আছে তো বটেই।

টাকাপয়সা যা লাগে আমি দিয়ে দেব।

টাকাপয়সা ছাড়াও অনেক অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে হবে।

কীসের অ্যারেঞ্জমেন্ট? আমার খাওয়া-টাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আলি ব্যবস্থা করে দেবে।

আজ রাত্তিরেই পুলিশ পোস্টিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে?

পুলিশ? পুলিশ কেন?

তোমার সিকিউরিটি লাগবে না? তোমার কিছু একটা বিপদ হয়ে গেল সবাই আমাকে দুষবে। আমি পুরোনো লোক, আমার দায়িত্বজ্ঞান আছে।

বিপদ? কী বিপদ হবে?

তোমার মতন মেয়ের কী বিপদ হতে পারে, তা তুমি বোঝা না? তুমি কি কচি খুকি?

ঠিক আছে, পুলিশের ব্যবস্থা করুন।

তুমি থাকবে?

ইয়েস! অ্যান্ড ডাট ইজ ফাইনাল।

এরপর রাকেশ যখন এল, তার মধ্যে সোহিনীর বইটির মাত্র দু-পাতা পড়তে পেরেছে।

রাকেশ নিজের থেকে আসতে চায়নি।

ললিতার কাছে প্রথম কথাটা শুনে সে রেগে উঠে বলেছিল, ঠিক আছে, যেতে চায় না তো যাবে না। তার আমি কী করব?

সবাই তাকে বুঝিয়েছে যে এখন রাগারগির সময় নয়। অর্ধেকের বেশি শুটিং হয়ে গেছে, এখন এই ফিল্ম শেষ না হলে সবাই ক্ষতি এই অবস্থায় টিম স্পিরিট ঠিক রাখতে হবে।

জগৎ শা-র অন্ত্যেষ্টী অনুষ্ঠানে সোহিনী উপস্থিত না থাকলে খুবই খারাপ দেখাবে। তা নিয়ে অনেক কথা উঠবে। রাকেশের সঙ্গে তার সম্পর্কই বা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

রাকেশ দীর্ঘকায়, সুপুরুষ। প্রথম দিকে তার কাকার প্রোডাকশনে সে অভিনেতা হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রথম ছবিতেই সে বাতিল হয়ে যায়। তার একটু তেতোলামির দোষ আছে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে সেটা আরও বেড়ে যায়। হলিউডের তারকা ব্রুশ উইলিসও তেতোলা, সে সেটা অনেকটা চেষ্টা করে সারিয়েছে। আর এমন কায়দা করে থেমে থেমে কথা বলে যে তেতোলামিটা বোঝা যায় না। রাকেশ সে রকম ম্যানেজ করতে পারেনি।

তারপর পরিচালনায় এসে পর পর দুটো ছবি হিট।

রাকেশ সোহিনীর বিছানার এক পাশে বসে নরম গলায় বলল, সোফি, তুমি এখানে থেকে যেতে চাইছ?

সোফি বলল, হ্যাঁ, কয়েকটা দিন। একটু নিরিবিলিতে থাকব।

রাকেশ বলল, সত্যি, এখন সবাই ওখানে কান্নাকাটি করবে, কেউ কেউ ন্যাকা সজে বাড়াবাড়ি করবে ক্যামেরার সামনে, এর মধ্যে যেতে কারই বা ভালো লাগে। কিন্তু তুমি এখানে থাকলে আমাকেও যে থেকে যেতে হয়!

কেন?

বাঃ! তুমি থাকবে আর আমি চলে যাব? তা হয় নাকি? অথচ ওদিকে আমি না গেলো…

তুমি না গেলো তো চলবেই না। তোমার নিজের আংকল। তোমাকেই সব কাজ করতে হবে। তা ছাড়া জগৎ শা-র ছেলেরিও মারা গেছে। বিষয়-সম্পত্তির কী হবে, …তুমি যাও।

সোফি, তোমাকে ফেলে আমি কী করে যাব? এখন তোমাকে আমি ছেড়ে যেতে পারব না। এই সময় তোমাকে আমি পাশে চাই।

এই সময়ে আলাদা আলাদা থাকাই ভাল। প্রেসের লোকেরা সর্বক্ষণ চারপাশে ঘোরাঘুরি করবে।

আমার একটা অনুরোধ শুনবে সোফি? প্লিজ চলো আমার সঙ্গে।

রাকেশ, আজ বুঝি তুমি ডিংক করেনি?

হঠাৎ একথা জিজ্ঞেস করছো কেন?

তোমার গলাটা বেশ বেশি নরম শোনাচ্ছে।

আমি কখনও তোমার সঙ্গে কড়া গলায় কথা বলি? অন্যদের সঙ্গে বলি। তুমি এখানে এখনই বা কেন একা একা শুয়ে থাকবে। বাইরে সবাই এক সঙ্গে বসে আছে। চলো, চলো।

রাকেশ সোহিনীর একটা হাত ধরে টানল।

সোহিনী হাত ছাড়িয়ে না নিয়ে বলল, শোন রাকেশ, তোমাকে একটা কথা বলি। একটা সময় ছিল, যখন আমি সবার কথা শুনে চলতুম। যে যা বলত, কেউ জোর করলেও প্রতিবাদ করার সাহস হত না। তারপর অনেক কিছু ঘটে গেছে আমার জীবনে। এখন আমি স্বাধীন। জানি, আমি বেশি বেশি জেদি হয়ে গেছি। যেটা ইচ্ছে নয়, অন্য কেউ হাজার জোর করলেও আর তা থেকে আমাকে টলাতে পারে না। আমি এখানে থেকে যাব ঠিক করেছি, থাকব। আমাকে জোর করে কোনও লাভ হবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *