সরল-জটিল – ৮

বাগানে হাঁটু গোড়ে বসে আগাছা তুলছে অভিমন্যু। পাজামা পরা, খালি গা।

রাজাকে আগে সে চোখের আড়াল হতে দিত না, এখন সে জানে, ফিল্মের নায়িকটির কাছে গিয়ে রাজা বসে থাকে। তাতে আপত্তি করার প্রশ্নই ওঠে না, ওই রমণীটিই তার ছেলের মুখে কথা ফুটিয়েছে।

কী করে পারল? আগে কত চেষ্টা করা হয়েছে। ডাক্তাররাও সুবিধে করতে পারেনি।

অনেকেই জিজ্ঞেস করে রাজার মা কোথায়?

বাঙালিদের বোধহয় কৌতূহল প্রবৃত্তিটা বেশি। আর সেটা চেপে রাখতেও পারে না। ছেলে আছে, বাবা আছে, আর মা থাকবে না?

মা তো মরে যেতেও পারে।

যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে নিশ্চয়ই প্রচুর সহানুভূতি পাওয়া যেত। এই বয়সে মাতৃহীন।

কিন্তু মালবিকা বেঁচে আছে। এমনকী বিবাহ-বিচ্ছেদও হয়নি তার সঙ্গে। সে অমলের কাছে চলে গেছে। অভিমন্যুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু অমল।

কেন মালবিকা চলে গেল, তার কোনও কারণ আজও খুঁজে পায়নি অভিমন্যু। সবাই জানত, ওরা একটা সুখী, মানানসই দম্পতি, ওদের একটি মাত্র সন্তান, সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান।

ছেলেকেও ভালোবাসতে পারেনি মালবিকা?

অফিসের কাজে দু-দিনের জন্য দিল্লি গিয়েছিল অভিমন্যু, যাওয়ার আগে মালবিকার সঙ্গে তার ঝগড়াঝাটিও হয়নি, বরং মালবিকা দিল্লি থেকে টুকটাক দু-একটা জিনিস আনার কথা বলেছিল। কী এমন ঘটতে পারে এই দুদিনের মধ্যে?

ফিরে এসে দেখল, মালবিকা নেই। একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি রেখে গেছে—

‘আমি অমলের কাছে চলে যাচ্ছি। আমার পক্ষে কিছুতেই অমলকে ছেড়ে থাকা সম্ভব নয়। তোমরা আমাকে যদি পারো তো ক্ষমা করো।’

রাজাকেও কিছু বলে যায়নি মালবিকা। সে রাতে মায়ের পাশেই ঘুমিয়ে ছিল। সকালে উঠে আর মাকে দেখতে পায়নি।

প্রথম দিনই শুধু কেঁদেছিল রাজা। তারপর থেকেই তার কথা বন্ধ হয়ে গেছে। বালকের সেই তীব্র অভিমান, এতদিনে সে ভাঙতে পারেনি।

অমল থাকে কানপুরে।

চাকরি ছেড়ে দিয়ে কম্পিউটার ট্রেনিং স্কুল চালাচ্ছে। নতুন ব্যবসা, নিশ্চয়ই খুব খাটতে হয়। মালবিকা তো কম্পিউটারের কিছুই বোঝে না। সে কি সাহায্য করবে?

মালবিকা চলে যাওয়ার ঠিক দুমাস পরে ছিল রাজার জন্মদিন। ঠিক আগের দিন কুরিয়ার সার্ভিসে একটা বড় প্যাকেট এসেছিল। রাজার জন্য এক প্রস্তুত নতুন পোশাক।

প্যাকেটটি খোলার পর অভিমন্যু কিছু না বলে সেটা তুলে দিয়েছিল রাজার হাতে। ভিতরে কোনও চিঠি কিংবা কার্ড নেই। রাজা সব শুদ্ধ প্যাকেটটা নিয়ে ফেলে দিয়েছিল রাস্তায়। তখনও মুখ দিয়ে কোনও শব্দ করেনি।

অভিমন্যু তার মন থেকে মালবিকাকে মুছে ফেলতে পারে। কিন্তু একটা শিশু কী করে ভুলে যাবে তার মাকে। ঠিক শিশুও তো নয়, রাজার বয়স দশ বছর, এই বয়সে সব কিছু মনে থাকে?

কোনও মেয়ের দিকেই এখন আর তাকাতে ইচ্ছে করে না অভিমন্যুর। মালবিকা তাকে চরম অপমান করে গেছে। প্রথম প্রথম রাগে, ঘেন্নায় তার মনে হত, কানপুরে গিয়ে মালবিকা আর অমল এই দুজনকেই গলা টিপে মেরে ফেলবে। সে কল্পনায় দেখতে পেলে, হিন্দি সিনেমার ভিলেনের মতো বিকৃত গলায় চিৎকার করতে করতে মালবিকার গলা টিপে ধরেছে, দম বন্ধ অবস্থায় ছটফট করছে মালবিকা, একটা চেয়ারের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অমল…।

ওসব কোনওদিনই করা সম্ভব নয় অভিমন্যুর পক্ষে। এই ধরনের মানুষরা নিজেরা যতই কষ্ট পাক, অন্যদের কষ্ট দিতে পারে না। কারওর গায়ে হাত তোলাই অভিমন্যুর পক্ষে সম্ভব নয়।

কিন্তু নরম স্বভাবের লোকরাও এই রকম বীভৎস দৃশ্য কল্পনা করে। আর যারা সত্যি সত্যি এই সব কাণ্ড করে, তারা বোধহয় কল্পনার ধার ধরে না।

এখনকার সিনেমা পার্টির এই নায়িকাটি যতই রূপসী হোক, তার প্রতিও কোনও আকর্ষণ বোধ করেনি অভিমন্যু। তার জীবনে এখন কোনও নারীর স্থান নেই। কিন্তু এই নারীটি প্রায় জাদুকরীর মতন রাজার মুখের ভাষা ফিরিয়ে দিয়েছে।

রাজাকে নিয়ে সোহিনী যখন বাগানে ঢুকল, সেদিকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েও অভিমন্যু মাটি খোঁড়ায় মন দিল।

পর পর তিনটি গাছে বড় বড় চন্দ্রমল্লিকা ফুটেছে। এখানে এক মাস থাকতে থাকতেই বাগান করার নেশা পেয়েছে অভিমন্যুকে। অবশ্য মালি এসেও সাহায্য করে।

কাছে এসে সোহিনী একটুক্ষণ অভিমন্যুর মাটি খোঁড়া দেখে জিজ্ঞেস করল, এটা কী

ফুল?

অভিমন্যু ভুরু কুঁচকে বলল, চন্দ্রমল্লিকা, আপনি চেনেন না?

সোহিনী বলল, আমি কোনও গাছই চিনি না। তবে চন্দ্রমল্লিকার নাম শুনেছি। আর একটা আছে সূর্যমুখী, তাই না? তাও শুধু নাম জানি।

অভিমন্যু দূরে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওইটা সূর্যমুখী।

সোহিনী বলল, একই জায়গায় চন্দ্র আর সূর্য, বাঃ! আর কাঁঠালি চাঁপা কোনটা? এই নামটা খুব ইন্টারেস্টিং, একই সঙ্গে কাঁঠাল আর চাঁপা, আমি চাঁপা ফুল চিনি। কাঁঠাল বিচ্ছিরি দেখতে আর চাঁপা, একজন বলেছিল আমার আঙুলের মতন।

অভিমন্যু বলল, কাঁঠালি চাঁপা এ বাগানে নেই।

সোহিনী বলল, সে কি? রাজা যে বলল, আছে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলুম, তোমাদের বাগানে কী কী ফুল আছে? ও গড়গড় করে অনেকগুলো নাম বলে গেল, তার মধ্যে কাঁঠালি চাঁপা নামটা আমার কানে লাগল। কী গো রাজা?

রাজা লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করেছে।

অভিমন্যু বলল, হয়তো অন্য কোনও বাগানে দেখেছে। কাঁঠালি চাঁপা মোটেই কাঁঠালের মতন দেখতে নয়, চাঁপা ফুলেরও মিল নেই। পাপড়িগুলো মোটা মোটা আর মাত্র তিন-চারটে, আর মদু গন্ধ আছে।

সোহিনী জিজ্ঞেস করল, আপনার চা খাওয়া হয়ে গেছে?

অভিমন্যু বলল, হ্যাঁ।

সোহিনী মুখটা নিচু করে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনার চা খাওয়ার পর বাড়িতে অতিথি এলে বুঝি তাকে চা খাওয়ান না?

অভিমন্যু প্রথমে ঠিক বুঝতে না পেরে বলল, কী বললেন? ও হ্যাঁ। আপনি চা খেতে চান?

শোহিনী হেসে বলল, হ্যাঁ। আমি চায়ের ভিখিরি।

খুরপিটা রেখে হাতের ধুলো-মাটি ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল অভিমন্যু। তখন তার মনে পড়ল, সে খালি গায়ে আছে। কোনও বাইরের মহিলার সামনে পুরুষরা খালি গায়ে থাকে না।

সে আড়াআড়িভাবে বুকের ওপর হাত রাখতেই সোহিনী আরও হেসে বলল, এক্ষুনি দৌড়ে গিয়ে আপনার জামা পরার দরকার নেই। আমরা তো ফিল্মের লোক, পুরুষদের সব রকম ভাবে দেখতে অভ্যস্ত।

তবু অভিমন্যু ছেলেকে বলল, রাজা, দৌড়ে আমার একটা জামা নিয়ে আয় তো। আর দ্যাখ ফুলমণি আছে কি না।

সেই লজ্জাটা মেয়েদের জিনের মধ্যে চুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। বংশ পরম্পরায় লজ্জাটা আরও বাড়ছে। আমি যদি খালি গায়ে ঘুরে বেড়াই, আমাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে। আমার মা বোরখা না পরে কখনও বাড়ি থেকে বেরোননি। যাক গে, আপনি ভাল মাংস রান্না করতে পারেন, তা জানি। আপনি চা বানাতেও পারেন?

হঠাৎ প্রসঙ্গ পরিবর্তনে হকচকিয়ে গিয়ে অভিমন্যু বলল, আমি মাংস রান্না করতে পারি, কে বলল আপনাকে? রাজা? রাজার সঙ্গে আপনার এত গল্প হয়? অথচ আগে ও কারওর সঙ্গেই…

ওর মায়ের সঙ্গে কি আমার কোনও মিল আছে?

একটুও না।

জানতুম। আচ্ছা, ওর মা তো বেঁচে আছেন।

আপনি তা জানলেন কী করে? এটাও রাজা বলেছে? কোনওদিন একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি।

না। এটা রাজা বলেনি। মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলেই ও চুপ করে থাকে। কিন্তু যে ছেলের মা নেই, মায়ের কথা শুনলেই তার মুখে একটা ছায়া পড়ে। আমি ওর মুখে সেই ছায়া দেখিনি। বরং যেন চাপা রাগের ঝলসানি।

কী বলছেন আপনি? আপনি এত সব লক্ষ করেন?

সিনেমার লাইনে না এলে আমি কবিতা লেখার চেষ্টা করতুম। মানুষের মুখের রেখা লক্ষ্য করতে আমার খুব ভাল লাগে। ভুরু একটু উঁচু নিচু হলে বোঝা যায় মুড বদলে যাচ্ছে।

চলুন, ভিতরে চলুন।

অভিমন্যুবাবু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব, কিছু মনে করবেন না? আপনার স্ত্রীকে আপনি ত্যাগ করেছেন, না তিনি নিজে কোথাও চলে গেছেন?

আমার স্ত্রী কোনও কারণ না দেখিয়ে আমার এক বন্ধুর কাছে গিয়ে থাকছেন। এখন কানপুরে।

আপনি কী ধরনের মানুষ? খুব রাগী?

আমার সম্পর্কে এ কথা কেউ বলেনি কখনও। আপনি যদি জানতে চান, আমার স্ত্রীর সঙ্গে খুব রাগারাগি, ঝগড়াঝাটি, মারামারি হয়েছে কিনা, তা হলে বলল, না। সে রকম কখনও হয়নি। কখনও কখনও সাধারণ কথা কাটা-কাটি, একটু বকবকি, তা তো সব ফ্যামিলিতেই হয়।

আপনি মদ খান?

কখনও কখনও খাই তো বটেই। কিন্তু যাকে মদ খাওয়া বলে, রোজ রোজ নেশা করা, তা আমার ধাতে নেই। এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন?

রাজা এসে পড়বার আগেই আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। আপনি একটু কাছে আসুন।

সোহিনী তার ঘাড়ের কানের চুল উঁচু করে ধরল। তার ঘাড়ে দুটো গোল গোল কালো দাগ। পুরোনো, কিন্তু তার ফর্সা তনুতে দাগ দুটো খুব প্রকট।

সোহিনী বলল, কোনও ফিল্মে আমার ঘাড় দেখানো হয় না। এই দাগ দুটো কীসের জানেন? আমার প্রথম হাজব্যান্ড আমার ঘাড়ে এই রকম জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দিত। সব সময় সন্দেহ করত আমাকে, তাই নানা রকম অত্যাচার করত। আমি তখন একটা সরল, বোকা বোকা মফঃস্বলের মেয়ে, এই পড়ার জগৎ ছাড়া বাস্তব সম্পর্কে কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। অনেকে বলত, আমি নাকি সুন্দর, কিন্তু নিজে ঠিক বুঝতুম না। আমার সেই হাজব্যান্ডের অত্যাচারে একদিন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলুম। তারপর অনেক ঘাট ঘুরেছি, সে সব আর বলতে চাই না। হয়তো মরে যেতেও পারতুম। খুব রিস্ক ছিল, কিন্তু এখন স্বাধীন, জানেন? এখন আমি ইচ্ছে মতন জীবনটা উপভোগ করতে পারি, ভোরবেলা বৃষ্টি গায়ে মাখি, রাতের বেলা একা একা বসে থাকি জানলার ধারে…

অভিমন্যু বলল, আপনি এসব কথা আমাকে শোনালেন কেন?

সোহিনী বলল, কী জানি। হঠাৎ মনে এল। আপনার স্ত্রীর মতন আমিও স্বামীকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলুম।

অভিমন্যু কড়া গলায় বলল, আমি সিগারেট খাই না। কোনও মেয়ের গায়ে হাত দেওয়ার মতন বর্বরতা আমি কল্পনাও করতে পারি না।

সোহিনী বলল, তবু একটা কিছু কারণ তো ছিল নিশ্চয়ই।

আমি এ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই না আপনার সঙ্গে।

আপনি রেগে যাচ্ছেন। তা বলে কি চা খাওয়াবেন না?

হ্যাঁ, চলুন ভিতরে। আমার ছেলের সঙ্গে আপনার ভাব হয়েছে। আপনাকে আমি অবশ্যই খাতির করব। কিন্তু আপনি দয়া করে আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে মাথা গলাবেন না।

সোহিনী দুলে দুলে হাসতে লাগল।

রাজা বারান্দায় এসে বলল, বাবা, তোমার দুটো জামা কেচে দিয়েছে, শুকোয়নি। আলমারি বন্ধ।

ভিতরে ঢুকে গেল অভিমন্যু।

ফিরে এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। গায়ে একটা গেঞ্জি।

সে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, আপনার কোনও ছেলে ছিল?

সোহিনী বলল, না।

অভিমন্যু বলল, স্বামীর ওপর রাগ থাকতে পারে, কিন্তু ছেলেকে ছেড়েও কেউ কী করে চলে যায়…। আপনি আমার ছেলেকে নিতে চান? নিয়ে যান।

সোহিনী এগিয়ে এসে অভিমন্যুর হাত ছুঁয়ে বলল, আপনাকে আমি রাগিয়ে দিয়েছি, আমি দুঃখিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *