সরল-জটিল – ৩

যে রাস্তাটা এই সব বসতির পাশ দিয়ে জঙ্গলের দিকে গেছে, সেই রাস্তা দিয়ে আসছে একটা গাড়ির বহর। অভিমন্যুর বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে। দুটো জিপ গাড়ি, তারপর একটা ট্রাক। সব গাড়িগুলি নানা বয়সি মানুষে ভর্তি। সবাই মিলে একটা গান গাইছে। পুরোনো হিন্দি সিনেমার পরিচিত গান।

প্রথমে মনে হয় পিকনিক পার্টি। আসলে এরা ফিল্মের লোকজন, আউটডোর শুটিং-এ এসেছে।

জিপ দুটো আগে আগে, ট্রাকটা পেছনে। ওপরটা খোলা। পেছনে মালপত্র রাখার জায়গায় পুরু করে বিছানা পাতা। সাত-আটজন নারী-পুরুষ বসে বা দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক মাঝখানে বলিশে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে একটি রমণী। সে যে নায়িকা তা এক নজরেই বোঝা যায়। খুব গাঢ় মেকআপ, পাতলা শাড়ি পরা। তার নাম সোহিনী।

তার আসল নাম কুরুতুলাইন হায়দার। কিন্তু এরকম খটোমটো নাম সিনেমার নায়িকার মানায় না। তাই সে নাম বদলে হয়েছে সোহিনী। ফিল্মে এরকম অনেকেই নাম বদলায়। তার ডাক নাম ছিল সোফি, সেটাও অনেকে ভুলে গেছে।

চলন্ত গাড়িতে গানের সঙ্গে নাচছেও কেউ কেউ। সোহিনী শুয়ে শুয়েই পা দিয়ে তাল দিচ্ছে।

গানটা একটু থামতেই সোহিনী বলে উঠল, ইস, আমার চোখে কী পড়ল বল তো?

পাশ থেকে ললিতা নামে মেয়েটি বলল, কই, দেখি দেখি!

গান থামিয়ে সবাই সোহিনীর চোখ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সোহিনী বলল, বিচ্ছিরি রাস্তা, যা ধুলো উড়ছে।

একজন কেউ বলল, আর বেশি দেরি নেই। আধঘন্টা, বড় জোর ফার্টি ফাইভ মিনিটস।

সোহিনী আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল, ললিতার কোমরে ওর হাত। সোহিনীর ঠোঁটি এমন লাল যেন মনে হয় একটু আগে রক্ত পান করেছে। ভারি সুন্দর আর নরম তার মুখখানি। চোখ দুটি চঞ্চল। তাকে দেখলে বোঝা যায় না, তার ব্যক্তিত্বের জোর কতখানি।

লরির একপাশে দাঁড়িয়ে চলমান জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে সোহিনী জিজ্ঞেস করল, শশীবাবু, এখানে আউটডোর শুটিং মোট ক’দিন হবে?

শশী নামে হষ্টপুষ্ট মানুষটি প্রোডাকশন ম্যানেজার। এই ট্রাকের ওপর নায়ক বা পরিচালক কেউ নেই, তারা যাচ্ছে জিপে।

শশী বলল, সাত দিনের মধ্যে প্যাঁক আপ করার ইচ্ছে আছে। বড় জোর আট দিন।

সোহিনী আবার জিজ্ঞেস করল, হোল নাইট করতে হবে ক’দিন?

শশী বলল, ঠিক দু’রাত, বড় জোর তিন রাত।

সোহিনী বলল, আর, তোমার ওই ‘বড় জোর’ নিয়ে পারি না। কোনও একটা হিসেবও কি ঠিকঠাক দিতে পারো না?

শশী মুখ ভরিয়ে হেসে বলল, সব সময় কিছুটা আগ বাড়িয়ে রাখতে হয়। তাতে কেউ কিছু বলতে পারে না।

সোহিনী মুখ ঘুরিয়ে বলল, আমাদের কটায় সময় আজ খেতে দেবে? ‘বড় জোর?’

সবাই হেসে উঠল।

শশী বলল, কেন, তোমার খিদে পেয়েছে নাকি?

সোহিনী বলল, পাবে না? কাল রাতির কিছু দাঁতে কাটিনি। লেট নাইট পার্টি হলে আমার কিছুই খেতে ইচ্ছে করে না।

শশী বাস্তব হয়ে বলল, পাউরুটি-মাখন আছে, কেক-পেস্ট্রি আছে, কমলালেবু আছে। এতক্ষণ বললেন কেন? অনেক খাবার আছে।

সোহিনী বলল, ওসব কিছু খাব না। গরম হ্যামবাগার খাওয়াতে পারবে?

শশী বলল, সে এখানে কোথায় পাবো!

সোহিনী আঙুল তুলে বলল, তা হলে আমি থিচুড়ি খাব। হয় হ্যামবাগার, অথবা থিচুড়ি। মাঝামাঝি কিছু না।

শশী বলল, এই তো পৌঁছেই থিচুড়ি রান্নার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ঘন্টাখানেক লাগবে, বড় জোর দেড় ঘন্টা!

সোহিনী একটুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমায় দশ তারিখ পুনা পৌঁছাতেই হবে। তার মধ্যে তোমাদের কাজ শেষ হয় তো ভাল, নইলে আমার উপায় নেই। তাই নারে ললিতা?

ললিতা বলল, নিশ্চয়ই, দশ তারিখ সকালের মধ্যেই না পৌঁছালে মহেশ্বরী ছলুস্থুল করবেন। ওঁর কাছে বড় জোর টর জোর চলে না। প্রতিটি মিনিট মাপা।

শশী বলল, হয়ে যাবে, হয়ে যাবে।

রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে জঙ্গলের মধ্যে একটা বর্না চোখে পড়ল। অনেকটা জলপ্রপাতের মতন। ধোঁয়ার মতন জলকণা ছিটকে উঠছে, আওয়াজটাও সুন্দর।

সোহিনী হঠাৎ বলে উঠল, এখানে একটু থামতে বলো তো!

শশী বিস্মিতভাবে বলল, কেন, এখানে থামবে কেন?

সোহিনী বলল, ওই বর্নাটা বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। একবার ওইখানটায় যাব।

এবার শশীর সহকারী ইমতিয়াজ বলে উঠল, ম্যাডাম, ওই ঝর্নটা আমাদের লোকেশনের মধ্যেই আছে। ওখানে অনেকটা শুটিং হবে। তখন তো ওখানে আসবেনই।

সোহিনী বলল, শুটিং-এর সময় ছাড়া আমরা এমন এমন কোথাও যেতে পারি না বুঝি? ওই ঝর্নটার কাছে এখনই আমার একবার যাওয়া দরকার।

শশী বলল, দরকার? তার মানে? কীসের দরকার?

সোহিনী একটা ফর্সা পা তুলে, মুচকি হেসে বলল, একবার চট করে পা ধুয়ে আসব।

ইমতিয়াজ বলল, এই যে বললেন, আপনার খিদে পেয়েছে। যত তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যায়, তত তাড়াতাড়ি রান্নার ব্যবস্থা করা যাবে।

সোহিনী বলল, খাওয়ার আগে পা ধুতে হয়। সেটাও খুব দরকারি কাজ।

শশী বলল, যত সব অদ্ভুত কথা!

স্কুলের দুটু মেয়ের মতন মুখভঙ্গি করে, দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে খুব আন্তে আন্তে সোহিনী বলল, থামবে না? আমি বলছি, তাও একটু থামবে না? আমার ইচ্ছে করছে।

শশী বলল, দেরি হয়ে যাবে যে।

সোহিনী এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তার ঠোঁটে হাসি মাখানো, চোখ দুটো যেন ধিকধিক করে জ্বলছে।

ডানার মতন দুটো হাত তুলে ওড়ার ভঙ্গি করে সে বলল, আমি যদি লাফিয়ে পড়ি, ঝর্নটার কাছে উড়ে চলে যাই।

সত্যি সত্যি সে লাফবার উদ্যোগ করতেই অন্যরা হই হই করে ধরতে গেল তাকে। শশী চিৎকার করতে লাগল, থামাও, থামাও।

ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে ট্রাকটা থেমে গেল শোনা যেতে লাগল সোহিনীর অনর্গল হাসি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *