সরল-জটিল – ১০

১০

ললিতা আর কথা বললেন সোহিনীর সঙ্গে।

রাত তিনটে পর্যন্ত সবাই বাইরে বসে ছিল, সোহিনী ছাড়া। সেখানেই পান-আহার হয়েছে। এক সময় মৃত্যু-টৃতুর কথা ভুলে গিয়ে গানও গেয়েছে কয়েকজন। অনেকটা ক্যাম্প ফায়ারের মতন।

মধ্যে দু-একবার ঘরে এসে ললিতা দেখেছে, আলো জ্বলছে, চিং হয়ে শুয়ে আছে সোহিনী, চোখ খোলা, বইও আর পড়ছে না।

তিনটে থেকে পাঁচটা পর্যন্ত দু-ঘন্টা ঘুমিয়ে নিয়েছে ললিতা। জেগে আছে সোহিনী। এবারও কোনও কথা বলল না।

ললিতা তৈরি হওয়ার জন্য চলে গেল বাথরুমে।

ফিরে এসে দেখল, সোহিনী এর মধ্যে উঠে পোশাক বদলে ফেলেছে। নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়েছে ব্যস্ত ভাবে।

একটু ঠেস দিয়ে ললিতা বলল, কী ব্যাপার?

সোহিনী গম্ভীর ভাবে বলল, আমিও ফিরে যাচ্ছি।

অনেকটা ভুরু তুলে ললিতা বলল, তার মানে?

সোহিনী বলল, মানেটা খুব সোজা। আমি মত বদলে ফেলেছি।

কাল রাতিরে অত কাণ্ড করে, সবার সঙ্গে ঝগড়া করে—

কাল আমার মুড অনারকম ছিল।

এর নাম মুড? ধন্য মেয়ে বাবা! সবাই বলাবলি করছিল—তুই সত্যিই যাচ্ছিস আমাদের সঙ্গে?

সত্যিই যাচ্ছি। সবাইকে বলবি, কাল আমি তোদের সঙ্গে রসিকতা করেছি। আসলে আজ আমার ইচ্ছে হয়েছে, তাই যাব তোদের সঙ্গে।

সবাই হই হই করে উঠল সোহিনীকে দেখে।

রাকেশ আর দেবশঙ্করের আলাদা আলাদা গাড়ি। দেবশঙ্কর তো কথা বলবেই না, বরং অনেক দিন পর সোহিনী নিজের থেকেই তাকে বলল, শুভ মর্নিং, দেব।

রাকেশ চায় সোহিনীকে তার নিজের গাড়িতে তুলে নিতে।

সোহিনী কিছুতেই রাজি হল না। সে যাবে ললিতাদের সঙ্গে ট্রাকে। যেমনভাবে এসেছিল।

ভাল করে গাড়ি-টিডি পেতে তার জন্য জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। সোহিনীর মতন নায়িকারা আলাদা গাড়িতেই যায়, কিন্তু এটা তার খেয়াল।

ললিতার পাশে বসেছে, কিন্তু একটাও কথা বলছে না। দু-পাশের দৃশ্যের দিকেও তার মন নেই।

এক সময় ললিতা লক্ষ্য করল, সোহিনীর দু-চোখ দিয়ে জল গড়ছে।

প্রত্যেক ফিল্মেই বেশ কয়েকবার কাঁদতে হয়। শট এন জি হলে একই দৃশ্যে বারবার কাঁদা। তাই অন্য সময়ে আর কাঁদা আসে না।

ললিতা জিজ্ঞেস করল, তোর কী হয়েছে, সত্যি করে বল তো? এ রকম তো আগে কখনও দেখিনি? এখানে নতুন করে কারও প্রেমে পড়েছিলি?

সোহিনী আন্তে আন্তে ঘাড় নাড়ল।

ললিতা আবার জিজ্ঞেস করল, সেই জন্যই থেকে যেতে চেয়েছিলি?

সোহিনী বলল, হ্যাঁ। কিন্তু আমার জায়গা তো নকল জগতে, এই ছবির জগতে, এখানে এই প্রকৃতির মধ্যে আমাকে মানাবে না।

ললিতা বলল, তা হলে যাকে ভালবেসেছিলি, তাকে তোদের সঙ্গে আসতে বললি না কেন?

সোহিনী এবার ফ্যাকাসে ভাবে হেসে বলল, তার বয়স যে বড় কম। সে আমার ভালবাসা বুঝবে না।

তারপর সে মুখ ঢেকে ফেলল দু-হাতে।

সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *