সরল-জটিল – ২

এ বাড়ির কোলাহল শুনতে পাওয়া গেল কিছু দূরের আর একটা বাড়িতে। ঘরের মধ্যে টেবিলে বসে এক বৃদ্ধ ব্রেকফাস্ট খাচ্ছেন। বৃদ্ধটির নাম রঙ্গলাল মিশ্র, যদিও তাঁর মাথার চুল সব সাদা, দাড়িও কাঁচাপাকা, তবু তিনি বেশ ছটফটে ধরনের মানুষ। ডবল ডিমের ওমলেট, অনেকগুলো টোস্ট, মাখন-মার্মেলেড, ফলের রস এরকম অনেক খাবার তিনি বেশ তৃপ্তির সঙ্গে খাচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর ছিপছিপে তরুণী স্ত্রী।

রঙ্গলাল বললেন, ওখানে গোলমাল হচ্ছে কীসের?

রঙ্গলালের স্ত্রী ছবি জানলার কাছে দাঁড়াল। বাইরে তাকিয়ে বলল, কী জানি, বুঝতে পারছি না।

তারপর ভৃত্যের উদ্দেশ্যে বলল, রামপূজন, ও বাড়িতে কী হচ্ছে দেখে আয় তো!

রামপূজন বাটনা বাটা ছেড়ে দৌড়ে গেল।

রঙ্গলাল একটা টোস্টে কামড় দিয়ে বললেন, ও বাড়ির লোকটা কেমন যেন অদ্ভুত। কারোর সঙ্গে মেলে না। কখনো বাড়ির বাইরেও যায় না।

ছবি বলল, রাত্তিরে বেরোয়।

রঙ্গলাল ভুরু কুঁচকে বললেন, রাত্তিরে বেরোয়? তুই জানলি কী করে?

ছবি বলল, আমি দু-একদিন দেখেছি। একটা টর্চ নিয়ে জঙ্গলের দিকে যায়।

রঙ্গলাল বললেন, রাত্তিরে একা একা জঙ্গলে যায়? কেন?

ছবি বলল, তা আমি কেমন করে জানব?

রঙ্গলাল বললেন, জোয়ান মরদ, ওর বউ নেই। বাড়িতে কোনও মেয়েমানুষ আসে না। দু-তিন মাস হল বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে, না? এর মধ্যে কেউ ওর সঙ্গে দেখা করতে আসেনি।

ছবি বলল, বউ আছে বোধহয়। কিংবা ছিল। একটা ছেলে তো রয়েছে দেখছি।

রঙ্গলাল বললেন, ওটা ওর নিজের ছেলে! ও ছেলেটা তো বোবা, এ পর্যন্ত ওর মুখে একটাও শব্দ শুনিনি।

ছবি বলল, ছেলেটা কথা বলে না। কিন্তু শব্দ করে। একদিন আমি ওকে খুঁ খুঁ করে

কাঁদতে শুনেছি।

রঙ্গলাল জিজ্ঞেস করলেন, তুই কোথায় ওকে কাঁদতে শুনলি?

ছবি বলল, একদিন ওদের বাগানে দুপুরবেলা একটা গুলমোহর গাছের নীচে ছেলোট একা একা কাঁদছিল।

রঙ্গলাল বললেন, বোধহয় ওর মা মরে গেছে। আহা বেচার। কিন্তু ওর বাপটা আবার বিয়ে করেনি কেন? এ বয়সের ছেলেরা যদি কোনও মেয়েমানুষের সঙ্গ না পায়, তা হলে তাদের জীবনটা রুক্ষ হয়ে যায়।

ছবি বলল, ছেলোটাকে ডাকলে কাছে আসে না।

রঙ্গলাল বললেন, বউ মরেছে বলেই কি সারা জীবন ব্রহ্মচারী হয়ে থাকতে হবে? ভেরি ব্যড ফর হেলথ।

ছবি বলল, ওর বউ মরেছে তা ধরে নিচ্ছেন কেন? অন্য কিছুও হতে পারে।

রঙ্গলাল বললেন, সে যাই হোক। বউ থাকলেও অন্য মেয়ে মানুষ দেখলে পুরুষের শরীর চনমন করে। তাতে মগজ খোলসা হয়। ওই জোয়ান মরদটা মাসের পর মাস কোনও মেয়ের সঙ্গে কথাও না বলে থাকে কী করে?

তারপর দুষ্টু হেসে আবার বললেন, হ্যাঁরে ছবি, ওই লোকটা গোপনে তোর সঙ্গে ভাব করার চেষ্টা করেছে?

ছবি মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, আমি কোনও উটকো লোকের সঙ্গে কথা বলি নাকি? ওই লোকটাকে নিয়ে আপনার এত মাথা ব্যথা কেন?

রঙ্গলাল বললেন, কৌতূহল একটা ভাল গুণ, বুঝলি? মানুষ সম্পর্কে যার কৌতূহল নেই, তার জীবনটা অতি বিস্বাদ হয়!

জানলার বাইরে থেকে রামপূজন বলল, ও বাড়ির বাগানে একটা সাপ বেরিয়েছে, মস্ত বড় সাপ!

সাপ শুনেই রঙ্গলাল মাটি থেকে পা তুলে নিলেন। মুখ বিকৃত করে বললেন, এই নামটা শুনলেই আমার গা ঘিনঘিন করে। এই জায়গটার আর সব ভাল, কিন্তু বড় সাপের উপদ্রব।

খাবারের প্লেটটা ঠেলে দিয়ে বললেন, খাওয়ার ইচ্ছেটাই চলে গেল। বাকিটা তুই খেয়ে নে।

টেবিলের ড্রয়ার খুলে তিনি একজোড়া নাচের ঘুঁঙুর বার করলেন।

সেই ঘুঁঙুর নিজের পায়ের বাঁধতে বাঁধতে বললেন, যাই, লোকটার সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করে দেখি।

উঠে দাঁড়িয়ে দু-পায়ে ঝুমঝুম শব্দ করে বললেন, সাপ আমার ধারে কাছে যেতে পারবে না কখনও।

একটা লাঠি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন রঙ্গলাল। ছবি মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।

অভিমন্যুর বাড়ির বাগানে এখন আর বাইরের কেউ নেই। একটু আগেই যে অনেক লোক জমেছিল, তা বোঝা যায় না।

একটা গোলাপ ফুল গাছের কাছে মাটিতে আসন পিঁড়ি হয়ে বসে আছে অভিমন্যু। তার হাতে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস। গাছটায় কিছু ফুল ফুটে আছে। দু-একটা আধফোটা এবং কয়েকটা ফোটা কুঁড়ি। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে একটা না ফোটা কুঁড়ি মন দিয়ে দেখছে অভিমন্যু।

সিঁড়িতে বসে তার ছেলে রাজা একটা বইয়ের পাতা ছিঁড়ছে। তার পড়ার বই। এক একটা পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ছিঁড়ে উড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়ায়।

বাগানের গেট খুলে, ঝুমঝুম শব্দ করতে করতে রঙ্গলাল মিশ্র এগিয়ে এলেন অভিমন্যুর দিকে। বেশ কাছে এসে দাঁড়ালেন। তবু অভিমন্যু গ্রাহ করল না।

রঙ্গলাল নাচের ভঙ্গিতে জেরে জেরে পা ঠুকলেন কয়েকবার।

অভিমন্যু এবার ফিরে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কোনও বিস্ময় নেই। এই বৃদ্ধাটি আগেও দু-একবার দেখা করতে এসেছেন নিজের থেকেই, অভিমন্যু তেমনি আমল দেয়নি। এখন সে একটু বিরক্তই হল।

রঙ্গলাল বললেন, নমস্কার। শুভ মনিং।

অভিমন্যু বিরক্তি গোপন করে বলল, নমস্কার।

রঙ্গলাল বললেন, আপনার বাগানে নাকি একটা গোখরো সাপ বেড়িয়েছিল।

অভিমন্যু বলল, গোখরো কিনা জানি না। একটা সাপ এসেছিল ঠিকই।

রঙ্গলাল বললেন, পালায়নি তো? মারতে পারলেন?

অভিমন্যু বলল, শুধু শুধু মেরে কী হবে? জঙ্গলের দিকে ছেড়ে দিয়ে এলাম।

রঙ্গলাল চোখ বড় বড় করে বললেন, মারলেন না? অত সাপের ওপর দয়া করবেন না। এখানে সব বিপজ্জনক সাপ ঘুরে বেড়ায়। হীরালাল বসুর ছেলেটা তো সাপের কামড়ে মারা গেল। Prevention is better than cure. এই দেখুন না, আমি কী ব্যবস্থা নিয়েছি।

অভিমন্যু বলল, এটা কী ব্যাপার?

রঙ্গলাল বললেন, Vibration! শব্দ তরঙ্গ। সাপ কানে শুনতে পায় না জানেন তো? বাতাসে এরকম শব্দ তরঙ্গ উঠলে ওরা শরীরে টের পায়, তক্ষুনি দূরে পালায়।

তিনি আবার বুমবুম শব্দ করলেন।

অভিমন্যু বলল, কিন্তু শব্দটা তো নিজের কানেই খারাপ লাগবে।

রঙ্গলাল বললেন, একটু নাচ প্র্যাকটিস করে নেবেন, তখন আর খারাপ লাগবে না।

আপনার বাড়িতে অতিথি এলে বুঝি চা খেতেও বলেন না?

অভিমন্যু বলল, আমি দুঃখিত, আমাদের দুধ নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি ব্ল্যাক টি খাবেন?

রঙ্গলাল বললেন, দুধ নষ্ট হয়ে গেছে তো আমাদের কাছে চেয়ে পাঠাননি কেন?

প্রতিবেশীর কোনও কিছুর প্রয়োজন হলে বা বিপদে-আপদে পরস্পর সাহায্য করাই তো সমাজের ধর্ম।

অভিমন্যু চুপ করে রইল।

রঙ্গলাল বললেন, আপনার বাড়িতে যে কাজ করে, তার নাম কী যেন? তাকে একবার ডাকুন না।

অভিমন্যু হাঁক দিল, ফুলমণি, ফুলমণি।

ফুলমণি বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই তার উদ্দেশ্যে রঙ্গলাল বললেন, এই মেয়ে চায়ের দুধ নেই তো আমাদের বাড়ি থেকে আনতে যাওনি কেন? যাও, ছুটে একবাটি দুধ নিয়ে এসো, তারপর আমাদের দু-কাপ চা খাওয়াও।

ফুলমণি পিছন ফিরতেই তিনি বললেন, আর শোনো, একটা মোড়া বা চেয়ার-টেয়ার

কিছু এখানে দিয়ে যাও তো আমার জন্য। আমি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারি না।

তারপর তিনি এক গাল হেসে অভিমন্যুকে বললেন, আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করছি,

তাই না? খুব সিরিয়াস কোনও কাজ করছিলেন?

অভিমন্যু গম্ভীরভাবে বলল, এই একটা জিনিস দেখছিলাম।

রঙ্গলাল বললেন, মানুষ একা একা নিরিবিলিতে থাকতে চাইলেও অন্যরা তা দেয় না। আমাদের দেশে খাঁটি নির্জন জায়গা কোথাও নেই। আমার মশাই একটু বকবক করা স্বভাব। এক সময় উকিল ছিলাম কিনা। আদালতে লক্ষ্য লক্ষ্য বস্তৃতায় কথার ফুলঝুরি ছুটিয়েছি। আপনি কী জিনিস দেখেছিলেন।

অভিমন্যু বলল, কী করে আন্তে আন্তে ফুল ফোটে তাই দেখেছিলাম।

রঙ্গলাল বললেন, তা দেখে কী হবে?

অভিমন্যু বলল, কিছুই হবে না। এমনিই।

রঙ্গলাল বললেন, ডারউইন সাহেবের মতন নতুন কিছু আবিষ্কার করবেন নাকি?

অভিমন্যু চুপ করে রইল। সে বুঝিয়ে দিতে চাইল, এ সব কথার সে উত্তর দেবে না।

ফুলমণি একটা মোড়া এনে পেতে দিল।

তাতে বসার পর কন্ঠস্বর বদলে রঙ্গলাল বললেন, এমনি এমনিও মানুষ অনেক কিছু করে বটে। শখের জন্য। একটু আগে এখানে সাপ বেরিয়েছিল। অনেক সময় কাছাকাছি জোড়া সাপ থাকে, তাও আপনি মাটিতে এইভাবে বসে আছেন দেখে আপনার সম্পর্কে আমার কৌতূহল বাড়ছে। আচ্ছা সরকারবাবু, আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেবেন? সাধারণ পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গরা কি রং চেনে? নানান রঙের বৈচিত্র্য বুঝতে পারে?

অভিমন্যু বলল, আমি ঠিক জানি না।

রঙ্গলাল বললেন, তা হলে প্রকৃতিতে এত রঙের বাহার কেন? এই যে এত রকমের ফুল, এত রঙের বাহার, কত রকম সূক্ষ্ম ডিজাইন, এর কোনোটাই কিন্তু মানুষের জন্য নয়। মানুষের জন্য ফুল ফোটে না। মানুষকে এরা গ্রাহাই করে না। ওরা শুধু কীট-পতঙ্গদের চেনে।

হাতের লাঠিটা তুলে কয়েকটা ফুল দেখিয়ে বললেন, এই যে দেখুন না, এই ফুলগুলো বেশ্যার মতন সেজেগুজে বসে আছে, কখন একটা কালো কুচ্ছিৎ ভোমরা কিংবা মৌমাছি এসে ঢলাঢলি করবে!

অভিমন্যু এবার বিস্মিতভাবে মুখ ঘুরিয়ে রঙ্গলালের দিকে চেয়ে রইল। লোকটিকে সে যে রকম বিরক্তিকর বকবকানি বুড়ো ভেবেছিল, ঠিক সে রকম নয়।

বৃদ্ধ আবার বললেন, ফুল নিয়ে কত কাব্য লেখা হয়েছে, কত গান বাঁধা হয়েছে, ফুলেরা তার কিছু জানে! এই যে আকাশ, চাঁদ-তারা, তা নিয়েও কি কম কাব্য করা হয়েছে?

ওরা মানুষের কথা জানেই না। মানুষের যা কিছু সৃষ্টি, মানুষের চোখে যা কিছু সুন্দর, সব নিজের জন্য।

একটু ঝুঁকে এসে এক চোখ টিপে বললেন, মেয়েদের ব্যাপারেও ওই একই কথা। বেশিরভাগ পদ্যই তো মেয়েদের নিয়ে লেখা হয়, কিন্তু কটা মেয়ে তা বোঝে? একটা মেয়েকে নিয়ে আপনি ঝুড়ি ঝুড়ি পদ্য লিখে তাকে শোনাতেন যান, দেখবেন একটু পরে সে হাই তুলছে। আমার এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেকবার, আপনার হয়নি?

সামনের রাস্তা দিয়ে দুটো মোষ ছুটে গেল। তার পেছন পেছন বাঁশি হাতে রাখাল ছেলেটি। রাজা সেই দিকে তাকিয়ে সিঁড়ি থেকে নেমে এল। অভিমন্যু রঙ্গলালের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইল রাজার দিকে।

রঙ্গলাল বিষয় বদলে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে মশাই?

অভিমন্যু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, আমার নাম অভিমন্যু সরকার। আমি একজন সাধারণ মানুষ।

রঙ্গলাল বললেন, আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, আপনি কে? আমি উত্তর দিতাম, আমি বাঁদরদের বংশধর। মাত্র কয়েক লাখ বছর আগে মানুষ হয়েছি। এখনও অনেক বাঁদরামি যায়নি? হে হে হে।

রাজা এগিয়ে যাচ্ছে গোটের দিকে। অভিমন্যু গলা চড়িয়ে বলল, রাজা, ওদিকে যাসনি। বাইরে যাবি না।

রঙ্গলাল বললেন, ওকি শুনতে পারে? যারা বোবা হয়, তারা কালোও হয়।

অভিমন্যু ঝাঁঝালো সুরে বলল, আমার ছেলে বোবা নয়। কথা বলতে পারে। কিন্তু কথা বলে না।

রঙ্গলাল বিস্মিতভাবে বললেন, পারে। তবু কথা বলে না কেন? ওইটুকু বাচ্চা!

রাজা একবার ফিরে তাকাল অভিমন্যুর দিকে। স্পষ্টভাবে বাবার কথা অবহেলা করে সে ছুট দিল গেটের দিকে।

-বাইরে যাবি না -বাইরে যাবি না বলতে বলতে অভিমন্যু উঠে দাঁড়াল। তারপর সেও ছুটে গেল ছেলেকে ধরতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *