৬
শুটিং পার্টির সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের রীতিমতো গোলমাল লেগে গেল। স্থানীয় অধিবাসী মানে ঠিক স্থানীয় নয়, দু-তিন মাসের জন্য বাড়ি ভাড়া নিয়ে এখানে থাকতে এসেছে, অর্থাৎ চেইঞ্জার।
শুটিং ঝর্নার ধারে। লাইটিং হয়েছে, ক্যামেরা বসে গেছে। পাত্র-পাত্রীও তৈরি।
সোহিনীকে এখন চেনাই যায় না। সে সেজেছে ঐতিহাসিক আমলের এক রানি। অঙ্গে লাল মখমলের পোশাক, মাথায় পালক লাগানো মুকুট।
এ ফিল্মের কাহিনিতে নতুনত্ব আছে।
আধুনিক কালের গল্প।
নায়ক দেবশঙ্কর এক অতি সার্থক ও ব্যস্ত ডাক্তার। নায়িকা সোহিনী এক গরিব স্কুল
শিক্ষকের মেয়ে। মেয়েটি প্রেমে পড়েছে ডাক্তারের। কিন্তু ডাক্তার তাকে পাতাই দেয় না। ডাক্তারের প্রেম-ট্রেম নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই, সে চায় আরও সার্থকতা। অর্থাৎ আরও টাকা, আরও খ্যাতি। ইচ্ছে করলে সে কত ধনী কন্যাকে টুসকি দিয়ে ডাকলেই কাছে পেতে পারে। এক সাধারণ স্কুল মাস্টারের মেয়েকে সে পাত্তা দেবে কেন?
সোহিনী তবু ডাক্তারের কাছে বারবার আসে, অপমানিত হয়ে ফিরে যায়।
এর মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ সোহিনী স্বপ্নের মধ্যে হয়ে যায় সুলতানা রিজিয়া। আর ডাক্তার দেবশঙ্কর হয়ে যায় এক হাবসি ক্রীতদাস। সে সুলতানা রিজিয়ার প্রেমে পড়ে পাগল, যতবারই তার কাছে আসে, সুলতানা তাকে পা দিয়ে ঠেলে দেয়।
পরিচালক রাকেশ খুব বদমেজাজী মানুষ। তার থুতনিতে ফ্রেঞ্চ কাট অর্থাৎ ছাগল দাড়ি। শুটিং জোনের মধ্যে মদ্যপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এ নিয়ম সে নিজেই জারি করেছে। অথচ সব সময়ই তার মনে হয়, কখন প্যাক আপ হবে, কখন সে বোতল থেকেই কাঁচা মদ গলায় ঢালবে। একেই বলে আত্মনিপীড়ন।
স্টার্ট সাউন্ড। ক্যামেরা!
রোলিং।
আকশন।
উঁচু পাথর থেকে রিজিয়ার বেশে নেমে আসছে সোহিনী। অহঙ্কারী ভঙ্গিতে চিবুক উঁচু করা। হাতে একটা তলোয়ার। সে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল জঙ্গলের দিকে।
অন্য একটা পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সারা গায়ে আলকাতরা মাখা নায়ক দেবশঙ্কর। তার হাতে একটা স্থলপদ্ম (কাগজের)।
দেবশঙ্কর প্রথম ডায়ালগ দিতে যাবে, এমন সময় শুটিং জোনের মধ্যে চুকে পড়ল সাদা দাড়ি-চুলওয়ালা এক বৃদ্ধ। তার দু-পায়ে ঘুঙুর বাধা, হাতে লাঠি।
তিনি যেন আশেপাশে কী ঘটছে তা কিছুই দেখছেন না, সোজা এগিয়ে যাচ্ছেন ঝর্নার দিকে।
সবাই হতবাক। এ আবার কে?
রাকেশ চেচিয়ে উঠল, কাট! কাট!
বলাই বাহুল্য, এই বৃদ্ধ আমাদের পূর্ব পরিচিত রঙ্গলাল। রোজ বিকেলে তিনি এই ঝর্নার জল মাথায় ছিটোতে আসেন। মর্নিং ওয়াকের বদলে আফটার নুন ওয়াক।
শুটিং-এর সময় যাতে গন্ডগোল না হয়, সেই জন্য রাখা হয়েছে চারজন সশস্ত্র সেপাই। এখানে অবশ্য তেমন ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দু-পাঁচজন মালি, গয়লা আর কাজের লোক জড়ো হয়েছে। এখানকার চেঞ্জাররা উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, তারা চিত্র তারকাদের দেখার জন্য আদেখলাপনা করে না।
প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্টদের চোখ এড়িয়ে কী করে ভিতরে চুকে এল এই বৃদ্ধ?
রাকেশ রাগ করে মাথার টুপিটা খুলে ছুঁড়ে ফেলল মাটিতে।
প্রোডাকশনের একটি ছেলে ছুটে এসে রঙ্গলালের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, দাদু, এটা কী করলেন?
রঙ্গলাল মিষ্টি করে হেসে বললেন, তুমি আমায় দাদু বলে ডাকলে। তা আমি তোমার মায়ের বাবা, না বাবার বাবা, তা তো ঠিক মনে পড়ছে না।
এখন রসিকতা করার সময় নয়। ছেলেটি ব্যস্তভাবে বলল, দেখছেন না এখানে শুটিং চলছে?
রঙ্গলাল একই রকম মিষ্টি গলায় বললেন, তোমাদের কী হচ্ছে না হচ্ছে, তা আমাকে দেখতেই হবে কেন?
হেলোট এবার রঙ্গলালের পিঠে হাত দিয়ে বলল, এখান থেকে সরে যান, সরে যান।
রঙ্গলাল এবার বোমা ফাটার মতন প্রচণ্ড জোরে বললেন, তুই আমার গায়ে হাত দিচ্ছিস কেন রে হারামজাদা? তোর এত সাহস।
একজন সেপাই এসে বলল, হঠ্ যাইয়ে! হিঁয়াসে হঠ্ যাইয়ে।
রঙ্গলাল বললেন, কেন হঠ্ যাব? আমি এ সময় রোজ ঝর্নার কাছে আসি। আমায় কে আটকাবে? এটা গভর্নমেন্টের জায়গা।
আউটডোরে এসে জনসাধারণের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করতে হয়। তারা ক্ষেপে গেলে সব পণ্ড হয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া যত সময় নষ্ট হবে, ততই খরচ বাড়বে। টাইম ইজ মানি।
মেজাজ সামলে কাছে এসে রাকেশ হাত জোড় করে বলল, স্যার, এখানে একটা ফিল্মের শুটিং করছি, যদি দয়া করে একটু সরে যান।
রঙ্গলাল বললেন, আপনি শুটিং-মুটিং কী করছেন, তার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? আমি কেন ঝর্নাটার পাশে যেতে পারব না?
রঙ্গলাল এমন ভাব করছেন, যেন তিনি শুটিং-এর ব্যাপার কিছুই জানেন না। আসলে তিনি কৌতুক বোধ করছেন ভিতরে ভিতরে। এখানকার নিস্তরঙ্গ জীবনে কোনও বৈচিত্র নেই, ছবি অন্য কারওর সঙ্গে প্রেম করে না। তাঁকে বিষ খাওয়ারও চেষ্টা করে না। মনে হয় যেন তাঁকে সত্যিই ভালবাসে।
এখানে তবু একটা মজা হচ্ছে বেশ। তিনি যেন এক ঝগড়াটে প্রজার ভূমিকায় অভিনয় করছেন।
ওপর দিকের পাথরে দাঁড়িয়ে সুলতানা-বেশী সোহিনী মিটিমিটি হাসছে।
এবার সে নীচে নেমে এসে রঙ্গলালকে জিজ্ঞেস করল, আপনি পায়ে ঘুড়ুর পরেন কেন? নাচেন বুঝি?
রঙ্গলাল বললেন, হ্যাঁ, নাচতেও পারি।
কার কাছে নাচ শিখেছেন?
এক চানাচুরওয়ালার কাছে।
এবারে প্রোডাকশনের লোকেরা পর্যন্ত হেসে ফেলল।
সোহিনী বলল, এনার চেহারাটা ভারি সুন্দর। সাদা চুল দাড়িতে ভাল মানিয়েছে। পারফেক্ট ওল্ড ম্যান।
পরিচালকের দিকে ফিরে বলল, একে আমাদের এই শটে নিয়ে নাও না। কেলেকুট্টি হিরোর পাশ দিয়ে এই ফর্সা বৃদ্ধটি হেঁটে যাবে, চমৎকার কনট্রাস্ট হবে। একটা দুটো ডায়ালগও দেওয়া যেতে পারে।
রাকেশ কিছু না বলে কাঁধ ঝাঁকালেন। সে সোহিনীর তৃতীয় স্বামী হলেও হতে পারে, এ রকম সভাবনা দেখা দিয়েছে। সুতরাং সোহিনীর কোনও কথায় সে আপত্তি জানাতে পারে না।
সোহিনী রঙ্গলালের দিকে ফিরে বলল, আমার মায়ের বাবাকে দেখতে অনেকটা আপনার মতন ছিল। আপনাকে আমি দাদু বলবই বলব। দাদু, আপনি আমাদের সিনেমায় পার্ট করবেন।
এবারে লজ্জা পেয়ে গেলেন রঙ্গলাল।
তিনি বললেন, ধ্যাৎ! ঠিক আছে, আমি সরে যাচ্ছি।
সোহিনী তার হাত জড়িয়ে ধরে বলল, আপনি না বললে শুনব না। আপনাকে পার্ট করতেই হবে।
রঙ্গলাল বললেন, তোমাদের সিনেমা মানে তো জানি বারবার পিছন ফিরে পাছা দোলানো নাচ। ও আমার দেখতেও ভাল লাগে না।
সোহিনী নাচের মুদ্রায় দু-হাত জড়িয়ে বলল, পিছন দিকটা দেখতে ভাল লাগে না? তা হলে, এই যে, সামনের দিকটা?
দেবশঙ্কর বিরক্তভাবে বলল, এ সব কী হচ্ছে? কতক্ষণ সঙ সেজে থাকব? আমি মেক আপ তুলে ফেলব।
রঙ্গলাল প্রায় ছুটে গিয়ে ঝর্না থেকে এক আঁজলা জল তুলে নিয়ে বললেন, চালাও, তোমরা যা করছিলে, চালাও।
তিনি শুটিং জোন থেকে বেরিয়ে গেলেন।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ছবি।
সে যেন আজ একটু বেশি বেশি সেজেছে। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, লাল শাড়ি। রঙ্গলাল কাছে আসতেই সে বিমুগ্ধভাবে বলল, সোহিনী তোমার হাত ধরেছিল।
রঙ্গলাল বললেন, হাঁ। কেন, তাতে কী হয়েছে। আমার হাত ধুয়ে ফেলতে হবে নাকি?
ছবি বলল, যাং, কী যে বলো! কত লোক ওকে একটু ছুঁতে পারলে ধন্য হয়ে যায়।
কেন, খুব দামি মেয়ে বুঝি?
তুমি ওর ‘লাল আকাশ’ দেখোনি?
সিনেমা? নীল সিনেমা ছাড়া আমার অন্য কিছু ভাল লাগে না।
নীল সিনেমা?
হ্যাঁ। হিন্দি সিনেমাও সিকি পরিমাণ নীল, আর বাংলাতে কিছুই থাকে না।
ও, বুঝেছি। আচ্ছা, ওই সব ফিল্মকে নীল বলে কেন?
তা জানি না।
সোহিনী তোমার সঙ্গে কথা বলল, একদিন আমাদের বাড়িতে চা খেতে আসতে বলতে পারতে। তা হলে ওর সঙ্গে আমি আলাপ করতে পারতাম।
এক্ষুনি আলাপ করে আয় না। ওইখানে ওই ক্যামেরার সামনে ঢুকে পড়। সরবার চেষ্টা করলে সরবি না। তোকে একটা পার্টও দিয়ে দিতে পারে।
যাঃ, ওরকম অসভ্যতা আমি করতে পারব না।
তা হলে আমি যা করলাম, সেটা অসভ্যতা?
তোমাকে মানায়। তুমি যা করবে, তাই-ই তোমাকে মানায়।
রঙ্গলাল ছবির পিঠে হাত রেখে বললেন, বউয়ের কাছ থেকে কমপ্লিমেন্ট পেতে কী মিষ্টি যে লাগে!
