১
বিহারের এক নিরিবিলি অঞ্চলে কিছুদিন ধরে বসবাস করছে একজন নিঃসঙ্গতা প্রিয় মানুষ। তার নাম অভিমন্যু সরকার। তার বয়স আটত্রিশ, বেশ দীর্ঘকায়, বাঙালিদের মধ্যে বেশ সুপুরুষই বলা যায়।
এই পাহাড়ি গ্রামটির প্রায় প্রান্ত সীমায় সে একটি ছোট বাড়ি ভাড়া নিয়েছে, বাড়িটি ছোট কিন্তু সংলগ্ন বাগান অনেকখানি। আশেপাশে আরও কিছু বাড়ি রয়েছে, তবে অধিকাংশ বাড়ি খালি, ছুটিছাটাতে বাড়ির মালিকরা বেড়াতে আসে, অন্য সময় তালাবন্ধ থাকে। এই গ্রামটির ঠিক পরেই একটি সংরক্ষিত অরণ্য।
অভিমন্যু সরকারের বাড়ি থেকে কয়েক শো গজ দূরে যে বাড়িটি দেখা যায়, সেই বাড়িতে থাকে এক বৃদ্ধ ও এক তরুণী, তাদের বাবা-মেয়ে মনে হলেও তারা স্বামী-স্ত্রী। অন্য কয়েকটি বাড়িতেও কিছু কিছু বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থাকেন সারা বছর। স্থানীয় আদিবাসী পরিচারক-পরিচারিকারা তাদের দেখাশোনা করে। এখানে অভিমন্যু সরকারের মতন একজন শক্ত সমর্থ যুবকের দিনের পর দিন একা থাকটা অস্বাভাবিক মনে হয়। তার বাড়িতে শহর থেকে কেউ বেড়াতে আসে না, সেও এখানকার অন্যদের সাঙ্গে মেশে না।
ভোরবেলা বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে অভিমন্যু। সদ্য শীত শুরু হয়েছে, বাতাস ও রোদের বড় মেলায়েম। তবে এ সময়েও এখানে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। গাছপালাগুলো ঝকঝকে-তকতকে। বেশ কিছু মরশুমি ফুল ফুটেছে। হাঁটতে হাঁটতে অভিমন্যু এক একবার থেমে কোনও গাছের পাতায় হাত বুলিয়ে খুব মমতার সাঙ্গে। ফিসফিস করে কথাও বলে মনে হয়। সে কোনও ফুল ছেড়ে না, নুয়ে গন্ধ শোঁকে।
ভারি শান্ত ও সুন্দর পরিবেশ। লালচে রঙের রাস্তা দিয়ে একটা গরুর গাড়ি চলেছে টিমটিমিয়ে। দুটো মোষ চড়াতে নিয়ে যাচ্ছে একটা বাচ্চা হলে, তার মাথায় মস্ত পাগড়ি, হাতে বাঁশি। জবা ফুলের গাছে ওড়াওড়ি করছে ভ্রমর। এই সময় একটা সাপও দেখা যায়। ঘাসের উপর দিয়ে সাপটা চলেছে এঁকেবেঁকে।
অভিমন্যুর থেকে সাপটা বেশ দূরে নয়। প্রথম কিছুক্ষণ অভিমন্যু সাপটাকে দেখতে পায় না। সাপটাও ওকে দেখেনি। দুজনেই রয়েছে আপন মনে।
বাড়ির ভেতর থেকে একটি প্রৌঢ়া আদিবাসী মেয়ে বেরিয়ে আসে একটা বেড়াল তাড়া করে। বেড়ালটি দৌড়ে পালায়। স্ত্রীলোকটি বেড়ালটির উদ্দেশ্যে গালাগালি করতে থাকে।
সেদিকে ফিরে তাকাতেই অভিমন্যু সাপটাকে দেখতে পায়। কোনও রকম ভয়ের চিহ্ন তার মুখে ফোটে না। সে বরং দু-এক পা এগিয়ে গিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে সাপটাকে লক্ষ্য করতে থাকে।
আদিবাসী পরিচারিকার নাম ফুলমণি। সে আবার বেরিয়ে এসে এক কাপ চা নিয়ে। দূর থেকে বলল, বাবু, আপনার চা।
মুখ তুলে তাকিয়ে তাকে দেখে অভিমন্যু বলল, সিঁড়ির ওপর রেখে দে।
ফুলমণি শুনতে পেল না। সে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, হারামজাদা বেড়ালটা দুধে মুখ দিয়েছে। আর দুধ নেই। গাঁয়ে দুধ আনতে যেতে হবে। এখন কালো চা খান।
অভিমন্যু হাত তুলে বলল, এদিকে আসতে হবে না, কাপটা সিঁড়ির ওপর রেখে দে।
সাপটা একটা ব্যাঙ বা পোকামাকড় কিছু ধরেছে, ঘাসের মধ্যে খানিকটা নড়াচড়া দেখা গেল। ফুলমণি সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, সাপ! সাপ!
অভিমন্যু একটুও বিচলিত হল না। খানিকটা বিরক্তভাবে বলল, অত চ্যাঁচাবার কী আছে? চুপ কর।
ফুলমণি তবু বলল, ওরে বাবা, কত বড় সাপ।
রাস্তায় গরুর গাড়িটা থামিয়ে গাড়োয়ান তড়াঁক করে নেমে ছুটে এল এদিকে। মোষ চড়ানো রাখালটিও দৌড়ছে। ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেল।
বাড়ির একটা জানলায় এসে দাঁড়ালো একটি ন-দশ বছরের ছেলে। টানটানা চোখ, ভারি সুন্দর তার মুখখানি।
অভিমন্যু হাততালি দিয়ে সাপটাকে তাড়াবার জন্য বলতে লাগল, যাঃ যাঃ।
ফুলমণি এদিক-ওদিক তাকিয়ে চেঁচাচ্ছে, ডান্ডা লে আও, একঠো টাঙ্গি লে আও!
ভিড়ের থেকে একজন বলে উঠল, বিষাক্ত সাপ, ফণা তুলেছে। একবার কটলে আর রক্ষে নেই।
বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এল বাচ্চা ছেলেরটি, তার হাতে একটা লম্বা লাঠি। তাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে ফুলমণি ধরতে গেল, কিন্তু ছেলেটি এগিয়ে আসতে চায়। ফুলমণির কাছ থেকে সে কোনওক্রমে ছড়িয়ে নিল নিজেকে।
অভিমন্যু ছক্কুমের সুরে বলল, রাজা, আর এগোবে না।
রাজা মুখ তুলে চাইল তার বাবার দিকে। রাজার মুখে কিছু একটা অস্বাভাবিক ছাপ আছে। বাবার আদেশ সে অগ্রাহ্য করতে চায়। পুতুলের মতন ভঙ্গিতে সে সামনের দিকে এগিয়ে দিল এক পা।
অভিমন্যু আবার বলল, রাজা আর এগোবে না বলছি। খবরদার এগোবে না।
রাজা তবু লাঠিটা উঁচিয়ে আবার এগোতে যেতেই ফুলমণি তার জামা চেপে ধরল। ভিড় ঠেলে একজন লোক পিছন দিক থেকে ফস করে লাঠিটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিল অভিমন্যুর দিকে। অভিমন্যু সেটা লুফে নিল।
মাঠ দিয়ে আরও দু-তিনজন লোক লাঠিসোটা নিয়ে ছুটে আসছে।
লাঠিটা নিয়ে অভিমন্যু সাপটার এত কাছে এগিয়ে গেল যে সকলেই ভয়ে চিৎকার করে উঠল। সাপটাকে ঠিক মারবার জন্য নয়, অন্য এক ভঙ্গিতে লাঠিটা চালিয়ে দিল অভিমন্যু। খানিকটা ধুলো উড়িয়ে ঘাস ছিড়ে, সেই লাঠির ঘায়ের চোটে অনেকখানি শূন্যে উঠে গেল সাপটা। তারপর ঘুরতে ঘুরতে পড়তে লাগল। ভয়ের চোটে ভিড়ের সবাই দৌড় লাগিয়েছে।
অভিমন্যু মুখ উঁচু করে দেখতে লাগল সাপটা কতটা উঁচুতে উঠছে। এতক্ষণে তার মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল। এক সময় সে ভাল হকি খেলোয়াড় ছিল। এখনও ভোলেনি। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল, সে যেন হকি খেলার পোশাক পরে আছে আগেকার মতন, তার পাশ দিয়ে অন্য খেলোয়াড়রা দৌড়ছে, তার হাতের হকি স্টিক নিয়ে সে মারছে বল।
