সরল-জটিল – ৭

ললিতা জিজ্ঞেস করল, এ ছেলেটি কে?

সোহিনী বলল, ওর নাম রাজা। ও আকাশে উড়তেও জানে না, জলে সাঁতার কাটতেও জানে না। আমি ওকে উড়তে শেখাব বলেছি।

ললিতা অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে ভুরু তুলে বলল, ও এই বয়সেই উড়তে শিখবে কী রে? আর একটু বয়স হোক।

তুই কত বয়সে উড়তে শিখেছিস রে ললিতা?

তা উনিশ তো হবেই। কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ি। এক রাতে বাড়ি ফিরিনি।

কার সঙ্গে উড়লি? মামাতো-পিসতুতো ভাইটাই?

যাঃ। একটা ইয়েলো রঙের স্পোর্টস কার হাঁকিয়ে ঘুরত। পুলিশ কমিশনারের ছেলে ইন্দ্রজিৎ দুবে। দারুণ হ্যান্ডসাম। প্রথম প্রথম রাজি হইনি, তারপর একদিন ওর গাড়িতে উঠতেই…

কোথায় নিয়ে গেল? গোয়া?

না, পুনায় ওদের একটা বাগান বাড়ি ছিল। সেখানে ওদের আরও তিনজন বন্ধু, তাদের গার্লফ্রেন্ড, আমার এমন ভয় করছিল, ঝোঁকের মাঝায়…

বুঝেছি। সেই ইন্দ্রজিৎ দুবে তো পরে মালাবার হিলসে খুন হয়ে গেল। ততদিনে তুই এ লাইনে এসে গেছিস?

হাঁ, একটা ছোট রোল পেয়েছিলাম শ্যাম বেনেগালের ছবিতে। তুই খুব লাকি, সোহিনী, প্রথম ফিল্মেই হিরোইন।

সে চান্স না পেলে আমি মরেই যেতাম বোধহয়। এক ইবলিশের বাচ্চার সঙ্গে আমার প্রথম বিয়ে হয়েছিল, মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে, আমাকে মারত—উঠে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা চকোলেটের বার হাতে নিল সোহিনী।

একটা চেয়ারে কাঠের পুতুলের মতন স্থির হয়ে বসে আছে রাজা। তার দৃষ্টি শুধু সোহিনীর দিকে।

সোহিনী চকোলেটটা রাজাকে দিয়ে বলল, এই আমার লেটেস্ট বয়ফ্রেন্ড। কী ফেইথফুল দেখ, সব সময় আমার সঙ্গে লেগে আছে।

ললিতা বলল, নয় থেকে নব্বই সব পুরুষই তোর অ্যাডমায়ারার।

সোহিনী হেসে ফেলে বলল, কাল শুটিংয়ের মাঝখানে এক ধপধপে দাড়িওয়ালা বুড়ো, সে কিন্তু আমায় পাত্তা দেয়নি। বোধহয় আমাকে চেনেই না।

ললিতা বলল, তুই একটু চেষ্টা করলেই ওই বুড়োর মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারিস।

সোহিনী বলল, আপাতত আমি আমার এই বাচ্চা বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে মজে আছি। জানিস, এ নাকি সাড়ে চার মাস ধরে একটাও কথা বলেনি। শুধু আমার সঙ্গে কথা বলেছে।

সে কি, কথা বলত না? কেন?

ইচ্ছে হয়নি। আমারও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে দিনের পর দিন কথা না বলে… রাজা, তোমার বাড়িতে কে কে আছে?

রাজা বলল, বাবা।

আর কেউ না?

না।

মা নেই। তোমার মা কোথায়?

রাজা আবার চুপ করে রইল।

সোহিনী তাকাল ললিতার দিকে।

ললিতা বলল, আমাদের এখন রেডি হতে হবে না?

সোহিনী বলল, এ বেলা আমার নেই। আমি এখন রাজাদের বাগান দেখতে যাব। ওদের বাগানে নাকি কাঁঠালি চাঁপার গাছ আছে। সে ফুল আমি কখনও দেখিনি।

ললিতা বলল, আমি দেখেছি। দারুণ গন্ধ।

রাজা এর মধ্যে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে। দরজার কাছে গিয়েও পিছন ফিরে সোহিনী বলল, তোরা কিন্তু আমার পিছন পিছন আসবি না। ওই ইমতিয়াজটাকে বার করবি, যেন খুঁজতে না যায়। আমি হারিয়ে যাব নাকি?

রাজার হাত ধরে বেরিয়ে পড়ল সোহিনী।

আজ আকাশ মেঘলা। হঠাৎ বৃষ্টি এসে পড়তে পারে, তাই আজ ইনডোর শুটিং-এর ব্যবস্থা চলছে। সেট তৈরি হচ্ছে দোতলার টানা বারান্দায়। বাতাসে ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব।

হাঁটতে হাঁটতে সোহিনী জিজ্ঞেস করল, রাজা, তোমাদের কে রান্না করে গো?

রাজা বলল, ফুলমণি। বাবাও রান্না করে। বাবা মাংস রাঁধে।

তাই নাকি? তোমার বাবার রান্না আমাকে খাওয়াবে না?

এখানে রোজ মাংস পাওয়া যায় না।

তোমার বাবা রান্না ছাড়া আর কী কী পারে?

অঙ্ক পারে। বাবা সব অঙ্ক জানে। আর বাঁশি বাজাতে জানে।

বাঃ, অঙ্ক পারে, আবার বাঁশি বাজাতেও পারে? তোমাদের বাড়ি কোথায়? কলকাতায়?

না। জামসেদপুরে।

হঠাৎ থমকে গেল সোহিনী।

একটু দূরে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে পরিচালক রাকেশ। তারপর কথা শেষ করে সে হেঁটে আসতে লাগল এদিকেই।

সোহিনী বলল, এই, এই, চলো, আমরা লুকিয়ে পড়ি।

বড় বড় গাছের মাঝে মাঝে রয়েছে কিছু আগাছার ঝোপ। রাজার হাত ধরে টেনে নিয়ে সোহিনী একটা ঝোপের আড়ালে বসে পড়ল।

রাকেশ সেই ঝোপটার কাছে এসেই দাঁড়িয়ে পড়ল। সে অবশ্য ওদের দেখতে পায়নি।

পকেট থেকে একটা ব্র্যান্ডির পাইট বার করে চুমুক দিল একটা।

রাকেশ একসঙ্গে অনেকটা মদ্যপান করে নেশা করে না। সারা দিন ধরে যখনই সময় পায়, তখনই একটু একটু চুমুক দেয়। অনেকে বুঝতেই পারে না।

আরও একটা চুমুক দিয়ে সে প্যান্টের জিপ খুলে ফেলল। তারপর ছেড়ে দিল ছড়ছড় করে।

ঘোঁয়ায় নাক কুঁচকে গেল সোহিনীর। কিন্তু এখন এখান থেকে সরে যেতে গেলে রাকেশ দেখে ফেলতে পারে।

রাজা হেসে ফেলতে যাচ্ছিল। সোহিনী তাকে চেপে ধরে মুখে হাত চাপা দিল।

কাজ সেরে চলে গেল রাকেশ।

রাজা জিজ্ঞেস করল, ও লোকটা কে?

সোহিনী বলল, ও আমাদের টিমের একজন।

রাজা আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি ওকে ভয় পাও কেন?

সোহিনী এর উত্তর না দিয়ে একটু হাসল।

ইদানীং রাকেশ তার খুবই প্রেমে পড়েছে, তাকে ভয় পাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। এখন রাকেশের সঙ্গে কথা বলতে তার ইচ্ছে করছিল না।

রাকেশের চোখে পড়ে গেল অনেকক্ষণ কথা বলতে হত। তাতে অধৈর্য হয়ে উঠত না রাজা? তার হিংসেও হতে পারত। এমনকী রাজাকে দেখে রাকেশেরও হিংসে হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *