সরল-জটিল – ৪

প্রতি রাতেই রঙ্গলালের একবার ঘুম ভাঙে। রাত্রির তৃতীয় প্রহরে।

এই সময় নিস্তব্ধতা ঝিমঝিম করে চতুর্দিকে। হ্যাঁ, নিস্তব্ধতারও একটা শব্দ আছে।

রঙ্গলালের ঘুম ভাঙা মানে একেবারে জেগে ওঠা। তিনি আর শুয়ে থাকতে পারেন না, নেমে পড়েন খাট থেকে।

ছবি শোয় অন্যো একটা খাটে। এখানে বড় খাট নেই। ছবির এখন গভীর ঘুম।

বিছানার পাশে টর্চ থাকে। রঙ্গলাল টর্চ জ্বলে ভালো করে দেখে নিলেন, কোনও সাপ ঢুকে পড়েছে কি না। সাপ সম্পর্কে ভয় তাঁর প্রায় বাতিকের মতন।

এইবার রঙ্গলাল কিছুক্ষণ সারা বাড়ি ঘুরবেন। কোনও কারণ নেই, এমনই। এ ঘর, ও ঘর, বারান্দা, এমনকী উঁকি মারবেন রান্নাঘরেও।

ওকালতি থেকে রিটায়ার করেছেন পাকাপাকি, টাকাপয়সা জমিয়েছেন যথেষ্ট। এখন আর কোনও কাজ নেই। স্বাস্থ্য ফেরাবার নামে এখানে বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছেন প্রায় তিন মাস। কিন্তু এখন আর তাঁর মন টিকছে না।

রাত্তিরের দিকে একটু একটু শীত করে। তাই শোওয়ার ঘরের সব জানলা বন্ধ। এ ঘরে আবার ফিরে এসে তিনি একটা জানলা খুলে ফেললেন।

এখন শুক্লাপক্ষ, পরিষ্কার আকাশে ফফফট করছে জ্যোৎস্না। জ্যোৎস্নার নরম আলোয়

গাছপালার চেহারা সব বদলে যায়। রঙ্গলাল অবশ্য শুধু চোর দেখেন না, মানুষ খোঁজেন। এ সময় চোর-টোররা আসে না? আসা তো উচিত।

সাপ সম্পর্কে অত ভয় থাকলেও রঙ্গলালের কিন্তু চোর-ডাকাতের ভয় নেই।

এরকম নিরলা জায়গায় তিনি যুবতী স্ত্রীকে নিয়ে রয়েছেন মাসের পর মাস। সেই জন্য তিনি সঙ্গে রিভলবার রেখেছেন। একবার আনাড়ি নন, চালাতেও পারেন ভালই। ছাত্র বয়েসে এন সি সি-র ট্রেনিং নিয়েছিলেন, পরেও অভ্যাস বজায় রেখেছেন।

হিন্দিত একটা প্রবাদ আছে! পহেলা প্রহরে সবকই জাগে, দুষ্ট্রা প্রহরে যোগী, তিসরা প্রহরে চৌরা জাগে, চউঠা প্রহরে যোগী।

তার মানে এই তৃতীয় প্রহরে তো চোরদের ঘুরে বেড়ার কথা। তারা এদিকে আসে না কেন?

একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে পেশন ফিরতেই তিনি চমকে উঠলেন।

ঘুমের মধ্যে ছবি এদিকে পাশ ফিরেছে। তার মুখে এসে পড়েছে জ্যোৎস্নার মৃদু আলো।

গাছপালার মতন মানুষের মুখও জ্যোৎস্নায় এমনভাবে বদলে যায়? রঙ্গলাল আগে কখনও দেখেননি তো।

ছবির মুখখানি যেন চেনাই যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে ইতালিয়ান ভাস্কর্য।

বৃদ্ধ বয়েসে তরুণী ভার্ঘা। তাও বিয়ে হয়ে গেল প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর। চুল-দাড়ি সব পাকা বলে রঙ্গলালকে যতটা বুড়ো দেখায়, সেই তুলনায় তাঁর শরীর এখনও বেশ মজবুত আছে। কামনা-বাসনা আছে যথেষ্ট।

এই বয়েসের অনেক লোক চুল-দাড়িতে কল্প মেখে ছোকরা সেজে ঘুরে বেড়ায়। রঙ্গলাল ওসব পছন্দ করেন না। বিয়ের পর একবার ছবিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুমি কি চাও, আমি চুল কালো করি?

ছবি মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিল, না, না, না, আমার নকল জিনিস একবারেই ভাল লাগে না। এই ভাল, আপনাকে অনেকটা আমার বাবার মতন দেখায়!

ছবির ঘুম ভাঙেনি।

রঙ্গলালের খুব ইচ্ছে হল, ওকে ডেকে তুলবে। দুজনে পাশাপাশি বসে কিছুক্ষণ জ্যোৎস্না দেখলে কেমন হয়?

তারপর আপনি মনে হাসলেন।

আচমকা ঘুম ভাঙলে অনেককেই বিরক্ত হয়। বিয়ের পর দু-তিন বছর জ্যোৎস্না কিংবা চাঁদ-টাঁদ দেখতে ভাল লাগে। তারপর মনে হয় এসব ন্যাকামি।

তা ছাড়া বাবার বয়সি স্বামীর সঙ্গে এ রকম আদিখোতা একেবারেই মানায় না।

রঙ্গলালের মুশকিল এই, তার যে এত বয়স হয়ে গেছে, সেটা প্রায়ই ভুলে যান। মাঝে মাঝে চ্যাংডামি করতে ইচ্ছে করে। খুব ঝাল মাংস খেতে পারেন। বৃষ্টিতে ভিজতে পারেন খালি গায়ে। অন্ত্য এসব দেখে ভাবে বুড়োর বুঝি ভিমরতি হয়েছে।

ছবিকে তো তিনি তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে করেননি।

কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। নিজের সম্পর্কে কিছুই গোপন করেননি। অল্প বয়সে প্লুরিসি হয়েছিল বলে কখনও বিয়েই করবেন না ঠিক করেছিলেন। বন্ধুবান্ধবরা অবশ্য বলেছিলেন, ওতে কিছু যায় আসে না, ও রোগটাকে অত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। আদালত থেকে রিটায়ার করার বছরে হঠাৎ মনে হয়েছিল, এরপর তিনি নিঃসঙ্গ জীবন কাটাবেন কী করে?

রঙ্গলালের এটা প্রথম বিয়ে, কিন্তু ছবির তা নয়। কলেজে পড়ার সময় সে একটা ভুল বিয়ে করেছিল। দেড় বছরের মাথায় সে বিয়ে ভেঙে যায়, সে উপলক্ষে দারুণ ঝড় এসেছিল ছবির জীবনে, নষ্ট হয়ে গিয়েছিল মানসিক ভারসাম্য, চিকিৎসা করতে হয়েছিল অনেকদিন। সোজা কথায় মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল, সে কথা ছবি নিজেই স্বীকার করেছে রঙ্গলালের কাছে।

এসব জেনেশুনেই ছবিকে বিয়ে করেছিলেন রঙ্গলাল। এখন অবশ্য ছবির ব্যবহারে তার কোনও চিহ্নই পাওয়া যায় না।

রঙ্গলালের মনে হয়, বউটা একটু একটু পাগল থাকলে তো ভালই হত।

তার আরও মনে হয়, ছবির বয়স্ক স্বামীটি বেশ নির্ভরযোগ্য, কিন্তু সে জন্য ছবি কতদিন কৃতজ্ঞ থাকবে? লুকিয়ে লুকিয়ে অন্য যুবকের সঙ্গে তার প্রেম করতে ইচ্ছে করে না? সেটাই তো স্বাভাবিক।

ছবি অন্য কারওর সঙ্গে প্রেম করবে রঙ্গলাল কি সেটা মেনে নিতে পারবে? রঙ্গলাল সেটাই দেখতে চান। একটা কিছু ঘটুক না। নিছক নিঃসঙ্গ জীবন তাঁর পছন্দ হয় না?

আবার জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইলেন বাইরে।

এক সময় হঠাৎ তার মনে হল, দূরের ছাতিম গাছটার আড়ালে কী যেন নড়াচড়া করছে। বেশ বড়সড় কোনও প্রাণী।

প্রথমে তিনি ভাবলেন, ভালুক নাকি?

এখানে এসে তিনি অনেকবার শুনেছেন, পাশের জঙ্গলটায় ভালুক আর হয়না আছে। এ পর্যন্ত একটাও চোখে পড়েনি অবশ্য।

ভালুক রাত্রিরবেলা বেরিয়ে আসতে পারে।

গাছের আড়াল থেকে একটু সামনে আসতেই রঙ্গলাল বুঝতে পারলেন, ভালুক নয়, 

মানুষ।

খুব আন্তে আন্তে হাঁটছে মানুষটি। এই কি তবে চোর? আসুক, আসুক।

আর একটু কাছে আসতে রঙ্গলাল চিনতে পারলেন। এ তাঁর প্রতিবেশী অভিমন্যু। হাতে একটা লাঠি। একবার মাটির দিকে টর্চও জ্বালাল।

এত রাতে মাটিতে কি কিছু খুঁজছে অভিমন্যু?

এ বাড়ির দিকেই আসছে, নিশ্চয়ই চুরির উদ্দেশ্যে নয়। দেখলেই বোঝা যায়, শিক্ষিত মানুষ, সচ্ছল অবস্থা। এই ধরনের লোক ডাকাতি দলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে কিন্তু ছিঁচকে চোর হয় না।

ছবির জন্য আসছে?

ছবি গভীরভাবে ঘুমুচ্ছে। অভিমন্যু সে উদ্দেশ্যে এলেও ছবিকে ডাকবে কী করে? রাত্রিরবেলা ছবি লুকিয়ে লুকিয়ে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে এই ছোকরাটির সঙ্গে দেখা করবে, এটা সম্ভব নয়। রঙ্গলালের পাতলা ঘুম, তা ছবি জানে।

যদি সত্যি সত্যি অভিমন্যুর সঙ্গে ছবির কোনও সম্পর্ক হয়ে থাকে, তা হলে ওদের পক্ষে সুবিধে হবে, রঙ্গলালকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেওয়া। কিংবা একবারে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতেও পারে। যে রকম গল্পে উপন্যাসে থাকে।

বাস্তব জীবনেও এরকম হয় কখনও কখনও।

সেই যে রশিদ আলি নামে একজন এম এল এ ছিল, তাঁকে বিষ খাইয়ে খুন করেছিল তার স্ত্রী নফিসা, সেই বিষ জোগাড় করে এনেছিল নফিসার প্রেমিক নাসিরুদ্দিন। স্বামীকে বিষ খাইয়ে তার পাশেই নফিসা শুয়ে ছিল সারা রাত।

ওরা হয়তো ধরা পড়ত না, স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়া যেত, কিন্তু রশিদ আলি যে শাসক দলের এম এল এ, সুতরাং তার আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে খবরের কাগজে তো লেখালেখি তো হবেই। এক কাগজে প্রেমিকটির কথা উল্লেখ করা থেকেই শুরু হয়ে গেল তদন্ত, তার পর সব ফাঁস হয়ে গেল।

রসূল কল্পনা করলেন, তিনি বিষ খেয়ে মরে পড়ে আছেন, তার পাশে শুয়ে আছে ছবি।

তিনি আবার হাসলেন। অত সহজ নাকি? উকিলরা কখনও খুন হয় না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *