৫
নায়ক দেবশঙ্করের সঙ্গে সোহিনীর সাড়ে চার মাস ধরে কথা বন্ধ। অন্য সময় দেখা হলেও তারা মুখ ফিরিয়ে থাকে, কিন্তু শুটিং-এ প্রেমের দুষ্যে কিছুই বোঝার উপায় নেই। দেবশঙ্করের কোলে বসে পড়ে সোহিনী হাসতে হাসতে এমনভাবে তার গলা জড়িয়ে ধরে, যাতে তার স্তনের অনেকটা অংশ ভালোভাবে দেখা যায়।
ভোর পাঁচটা থেকে সওয়া নটা পর্যন্ত এক টানা শুটিং হয়েছে। এখন রোদ বেশ চড়া। আবার বিকেলের আগে আলো একটু নরম হলে আবার শুটিং হবে।
রাত্তিরে কেউই ভালো করে ঘুমোতে পারেনি। তাই সকালে প্যাক আপ হওয়ার পরই সবাই তাড়াতাড়ি শুতে চলে যায়। দুপুরে খাওয়ার সময় ওদের ডেকে ডেকে তুলতে হবে।
সোহিনী দিনের বেলা একবারেই ঘুমোতে পারে না, বিছানার ধারেকাছেই যায় না। পর পর দু-রাত জেগে থাকলেও তার দিনের বেলা ঘুম দরকার হয় না, এ তার অদ্ভুত ক্ষমতা।
পুরোনো আমলের কোনও জমিদারের বাগান বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। অবস্থা বেশ জীর্ণ, ভেঙে পড়ছে কয়েকটা দেওয়াল। ছাদে গজিয়ে গেছে বট গাছ, তবে এই ফিল্মটায় একটা ভুতুড়ে বাড়ির কয়েকটা সিকোয়েন্স আছে, তাতে কাজে লেগে যাবে।
দেবশঙ্করের ঘর দোতলায়, সোহিনীকে দেওয়া হয়েছে একতলায় একবারে পেছন দিকের একটা বেশ বড় ঘর, ললিতাও থাকে তার সঙ্গে।
মেক আপ না তুলে, কস্ট্যুম পরেই ঘুমিয়ে পড়েছে ললিতা, তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে সোহিনী বলল, এই বেড়াতে যাবি?
ললিতা কোনওরকমে চোখ খুলে আদুরে গলায় বলল, এখন? না-আ। বড্ড ঘুম পেয়েছে যে?
সোহিনী তাকে ধমক দিয়ে বলল, ওঠ, বেশি ঘুমোলে মুখ ফুলে যাবে, তোকে বিচ্ছিরি দেখাবে।
ললিতা বলল, আর একটু…এই রোদপুরে কেউ বেড়াতো যায়?
সোহিনী বলল, তবে থাক তুই। আর কোনওদিন আমার সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না করবি না।
সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সোহিনী।
কলকাতায় বা মুম্বাইতে তার একা একা কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সব সময় ভিড় জমে যায়। এখানে কাছাকাছি কোনও গ্রাম নেই, অনেকটাই জঙ্গল।
সোহিনী জঙ্গলের মধ্যেই হাঁটতে লাগল।
সিংভূম অঞ্চলের সব বড় বড় গাছ, ভিতরটায় প্রায় রোদই আসে না। বেশ ঠান্ডা, ছায়া ছায়া। কোনও গাছেই ফুল-টুল বিশেষ নেই, পাখিও বেশ কম, শুধু আছে নির্জনতা।
দূরে একটা বান্নার জলের ছল ছল শব্দ শোনা যাচ্ছে। সোহিনী সেই শব্দটা অনুসরণ করে এগোল।
শুধু ঝর্না নয়, সেটা ছোটখাটো একটা জলপ্রপাত। পাশে বড় বড় পাথর। খড়ি কিংবা কাঠ-কয়লা দিয়ে সেই সব পাথরে লেখা অনেক নাম। যারা এখানে বেড়াতো আসে, তারা নিজেরদের অমর করে রাখতে চায়।
ঝর্নাটার খুব কাছে এগিয়ে এসে সোহিনী আপন মনে বলে উঠলঃ
A quiet greenery, all around,
And at times an unknown wind blows,
One moutushi bird calling another,
And the sound of waters rhyming with it.
এক সময় সোহিনী খুব কবিতা পড়ত, হঠাৎ লাইনগুলো মনে পড়ে গেল।
সত্যিই একটা পাখি খুব মিষ্টি সুরে একটানা ডেকে যাচ্ছে। এটা কি মৌটুসি পাখি নাকি?
সোহিনী পাখিটাকে দেখতে পাচ্ছে না। সেও শিস দিতে লাগল। পাখিটা যেন তাকে সাড়া দিয়েছে, সেও ডাকছে, পাখিটাও ডাকছে।
হঠাৎ সে একটা খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পেলে। অল্প বয়েসি গলা।
এদিক ওদিক তাকিয়ে সোহিনী দেখল, একটু দূরে, ঝর্নার জলে পা ভুজিয়ে বড় পাথরের ওপর বসে আছে বছর দশেকের একটি ছেলে, হাফ প্যান্ট ও হলুদ টি শার্ট পরা। সে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে সোহিনীর দিকে।
সোহিনী কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, একি, তুমি একা?
ছেলেটি উত্তর দিল না।
সোহিনী আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি একা একা বসে আছ কেন?
ছেলেটি তবু চুপ।
সোহিনী বলল, তুমি বুঝি বাংলা বোঝো না? হিন্দি বলো? তুমি কৌন হায়?
ছেলেটি তবু তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে।
সোহিনী শাড়ি পরে খুব কম। জিন্স আর শার্ট কিংবা শালোয়ার কামিজই সে সচ্ছন্দ বোধ করে। কামিজের ওপর ওড়নাও ব্যবহার করে না। সে জানে, তার শরীরটা একটা বিশেষ সামগ্রী, সবাই দেখতে চায়, সে দেখাবে না কেন?
কামিজের মধ্যে বোধহয় একটা পোকা ঢুকে গেছে। সোহিনী ভিতরে হাত ঢুকিয়ে পোকাটা খুঁজতে লাগল, তাতে দৃশ্যমান হল তার ধপধপে সুগোল বুকের অনেকখানি।
সত্যিই একটা কাঠপিপড়ে ঢুকে গিয়েছিল, সেটা বার করে সে বালকটির দৃষ্টি অনুসরণ করল। সে তার বুক দেখছে।
অনেকেই ভাবে, ন-দশ বছরের ছেলেরা কিছু বোঝে না। ঠিকই বোঝে।
হেলেনটির মুখখানি ভরি সুন্দর, সারল্য মাথা। টানা টানা চোখ। কিন্তু কথা বলছে না কেন?
সোহিনী বাচ্চাদের সঙ্গে সহজেই ভাব জমাতে পারে। এই ছেলেটা তার সামনে মুখ বুঁজে থাকবে, তা হতেই পারে না।
সে কাছে আর একটা পাথরে বসে পড়ে জলে পা ডোবাল। শালোয়ারটা গুটিয়ে নিল অনেকটা। নিখুঁত তার পায়ের পাতা আর গোড়ালি।
সে হেলেনটির দিকে ফিরে বলল, তুমি কেন কথা বলছ না, আমি জানি। তুমি একটা দেবদূত। ফেরেশতা। তুমি এই মাত্র আকাশ থেকে নেমে এসেছ, তাই এখানকার ভাষা জানো না। তাই না?
হেলেনি দু-দিকে মাথা নাড়ল।
সোহিনী বলল, এর মানে কী? ভাষা জানো? তুমি দেবদূত না?
ছেরেটি আবার দুদিকে মাথা নাড়ল, সে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সোহিনীর মুখের দিকে।
সোহিনী বলল, বুঝেছি। আমি কে জানো? আমি একজন পরী। আমিও আকাশ থেকে নেমে এসেছি। আমি উড়তে পারি। তুমি পারো?
হেলেনি এবার মাথা না দুলিয়ে, মুখে বলল-না।
সোহিনী বলল, এই তো মুখ দিয়ে কথা বেরিয়েছে। তা হলে মিষ্টার দেবদূত, তুমি উড়তে শেখনি কেন? আমি শিখিয়ে দেব? তুমি আমার পিঠে চাপতে পারবে?
হেলেনি আবার হেসে ফেলল।
তারপর বলল, আমি দেবদূত না, আমার নাম রাজা।
ও, রাজা। তা রাজামশাই, এখানে একা একা বসে আছ কেন? তুমি কোথায় থাকো?
ওই দিকে।
রাজামশাইয়ের সঙ্গে তো অনেক লোকজন থাকার কথা। জানো না, এই জঙ্গলে ভাল্লুক আছে, বাঘ আছে।
বাঘ নেই।
বাঘ নেই? কিন্তু যদি ভাল্লুক এসে পড়ে?
তুমিও তো একা একা এসেছ?
আমি তো মেয়ে, ভাল্লুকরা মেয়েদের কিছু বলে না। তুমি সাঁতার জানো?
না।
এ কি! তুমি আকাশে উড়তে পারো না, সাঁতার জানো না। তা হলে রাজত্ব চালাবে কী করে? আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব। কোনটা আগে শিখবে বলো!
শুকনো পাতায় কারওর পায়ের শব্দ হতে সোহিনী পিছন ফিরে তাকাল।
প্যান্ট-শার্ট ও গামবুট পরা অভিমন্যু সরকার থমকে দাঁড়িয়েছে একটু দূরে। তার হাতে নানান ধরনের কয়েকটা গাছের চারা।
এক নজর দেখেই মানুষের চরিত্র অনেকটা বুঝতে পারে সোহিনী। এই লোকটি বিপজ্জনক নয়।
সে বলল, নমস্কার।
অভিমন্যু দারুণ অবাকভাবে বলল, এই ছেলেরি, মানে রাজা, আপনার সঙ্গ কথা বলছিল।
সোহিনী বলল, হ্যাঁ, তাতে কিছু দোষ হয়েছে নাকি?
অভিমন্যু বলল, না, তা নয়। কিন্তু…
রাজা বলল, আমি সাঁতার শিখব আগে।
সোহিনী তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি এই ভদ্রলোককে চেনো?
রাজা বলল, আমার বাবা।
অভিমন্যু বলল, প্রায় ছমাস ও একটাও কথা বলেনি।
সোহিনী বলল, তাই নাকি? আমি তো ওর বন্ধু হয়ে গেছি, তাই আমার সঙ্গ গল্প করছিল। আপনি ওকে সাঁতার শেখাননি কেন? জলের ধারে একলা বসে আছে। এখানে বেশ স্রোত।
অভিমন্যু উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইল সোহিনীর দিকে। এখনও তার বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না।
যেন অনেক দিনের চেনা, এইভাবে সোহিনী জিজ্ঞেস করল, আপনার হাতে ওগুলো কী?
অভিমন্যু বলল, কয়েক রকমের ফার্ন। আপনি, আপনাকে তো…
সোহিনী বলল, আমাকে আগে দেখেনি, এই তো? দেখবেন কী করে, আমি একজন
পরী। আকাশ থেকে নেমে এসেছি। ঠিক আছে, এখন চলি।
রাজার গালে একটা টোকা মেরে বলল, তোমার বাবাকে বলো, সাঁতার শেখাতে। আমি আর একদিন এসে তোমাকে উড়তে শেখাব।
সে উঠে দাঁড়াল।
অন্য দিক থেকে দৌড়ে এল ললিতা আর ইমতিয়াজ। অনেকক্ষণ ধরে নায়িকার পাত্তা নেই। সবাই ব্যস্ত হয়ে গেছে।
