যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী ১৬০৮

যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী ১৬০৮

‘মা, উসমান খাঁ-এর দূত এসেছে পত্র নিয়ে।’

রানী ভবশঙ্করী চোখ তুলে প্রহরীর দিকে তাকালেন। কোলে ন’বছরের শিশুসন্তান। তাকে বিছানায় শুইয়ে ঘুম পাড়াচ্ছিলেন। প্রহরীকে বললেন, ‘দূতকে সভায় আসতে বলো। বাকিরা এসেছেন?’

‘হ্যাঁ রানীমা। দেওয়ানমশাই, সেনাপতিমশাই, রাজপুরোহিত, সবাই এসেছেন।’

‘আর ভূপতিকৃষ্ণ?’

‘না মা, তিনি আসেননি।’

ভ্রুকুঞ্চন করলেন রানীমা। মহারাজ রুদ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর থেকেই গড় ভবানীপুরে ভূপতিকৃষ্ণর আসা যাওয়া অনিয়মিত হয়ে গেছে। বিষয়টা অনেকেই লক্ষ্য করেছেন। এ নিয়ে কানাঘুষোও শুরু হয়েছে রাজপরিষদদের মধ্যে। সে সংবাদও তিনি পেয়েছেন।

মহারাজ রুদ্রনারায়ণের সঙ্গে ভবশঙ্করীর বিবাহ হয়েছিল মহা ধুমধাম করে। গড় ভবানীপুর আর গড় পাণ্ডুয়ার সমস্ত বাড়িতে এক সপ্তাহ উনান ধরানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল৷ বিবাহের সমস্ত ব্যয় বহন করা হয়েছিল রাজপরিবারের পক্ষ থেকে। দীননাথ চৌধুরী অবশ্য তাঁর সর্বস্ব দিতে চেয়েছিলেন মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে। কিন্তু মহারাজ রুদ্রনারায়ণের তাতে কঠোর আপত্তি ছিল। শুধুমাত্র শাঁখা, পলা, সিঁদুর, একটি লালপেড়ে শাড়ি এবং চিরসঙ্গী খড়্গ, এই নিয়ে বিয়ে করতে এসেছিলেন ভবশঙ্করী।

আর এসেছিলেন তাঁর আবাল্য সঙ্গিনীরা। বেতাই, মঙ্গলা, জয়া, মকর আর ওলাই। এই পঞ্চকন্যা ভবশঙ্করীকে ছাড়া কোথাও যান না। ভবশঙ্করীও এঁদের চোখে হারান। এঁরা কেউ বিবাহ করেননি। ভবশঙ্করীই এঁদের ধ্যান এবং জ্ঞান।

বিয়ের এক বছরের মাথায় রানীর শরীরে গর্ভসঞ্চারের লক্ষণ দেখা যেতে রাজপ্রাসাদে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। সারা রাজ্য জুড়ে এয়োস্ত্রীরা রানীর সুস্থ সন্তানকামনায় ব্রতপালন করলেন। উল্লসিত দীননাথ দণ্ডী কাটলেন রাজবল্লভী মন্দিরের সামনে। সাধভক্ষণের দিন গড় ভবানীপুর আর গড় পাণ্ডুয়ার সমস্ত সন্তানবতী এয়োস্ত্রীরা নিমন্ত্রিত হলেন। সোনার গহনা, তৈজসপত্র এবং অন্যান্য উপঢৌকনাদিতে তাঁদের ভরিয়ে দেওয়া হল।

যথাকালে রাজ্ঞী ভবশঙ্করী একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন। রাজ্যজুড়ে সাতদিনের উৎসব ঘোষণা করা হল। বিভিন্ন রাজ্য থেকে নবজাতকের জন্য প্রচুর উপঢৌকন এল। তবে শ্রেষ্ঠ উপহার এল মল্লভূমের পক্ষ থেকে। তারা একটি স্বর্ণনির্মিত তরবারি পাঠাল রাজপুত্রের জন্য, ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক বন্ধুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ। রাজপুরোহিত হরিদেব শিশুটির নাম দিলেন প্রতাপনারায়ণ।

কেবলমাত্র একজন ক্রমেই সরে যেতে লাগলেন এই আনন্দ উৎসবের বৃত্ত থেকে৷ ভূপতিকৃষ্ণ।

তবে রুদ্রনারায়ণ আর ভূপতিকৃষ্ণ’র মধ্যে সৌহার্দ্যের কোনও ঘাটতি হল না। ভূপতিকৃষ্ণ আসেন, মহারাজের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে শলাপরামর্শ করেন, তারপর বেরিয়ে যান। একবারও মহারানী বা খুল্লতাতপুত্রের সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজন বোধ করেন না।

এদিকে মহারাজের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে লাগল। দিনে দিনে তিনি শীর্ণ হয়ে যেতে লাগলেন। আহারে রুচি নেই, উঠে বসতে কষ্ট হয়, কথা বলতে গেলে শ্বাসকষ্টের টানে কথা শেষ করতে পারেন না।

মহারানী ভবশঙ্করী প্রাণমন ঢেলে দিলেন স্বামীর সেবায়। খাওয়া দাওয়া ভুলে গেলেন। সারাক্ষণ শুধু এক চিন্তা, এক উদ্দেশ্য, কী করে মহারাজ সুস্থ হয়ে উঠবেন। আনন্দ নেই, হাসি নেই, প্রসাধন নেই, আভরণ নেই, এমনকী সন্তানের দিকেও তাঁর মন নেই তেমন।

আর ভূপতিকৃষ্ণ রোজ আসেন। খুল্লতাতের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, তারপর কিছু না বলে চলে যান। শুধু দু’ফোঁটা

চোখের জল রুদ্রনারায়ণের পায়ের পাতা বেয়ে গুল্ফের দিকে বয়ে যেতে থাকে।

রাজবৈদ্যরা অনেক চেষ্টা করেও রোগনির্ণয় করতে পারলেন না। দেশবিদেশ থেকে অনেক বৈদ্য, হেকিম এলেন। দৈব ঔষধির সন্ধানে লোক দৌড়ল কামরূপ পর্যন্ত৷ এমনকী সুবেদার মানসিং অবধি দূতমাধ্যমে বলে পাঠালেন যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে তিনি দিল্লি, বারাণসী বা কাশ্মীর থেকে বিশেষ বৈদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন।

কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। অবশেষে একদিন সবাইকে কাঁদিয়ে মহারাজ রুদ্রনারায়ণ রায়মুখুটি সাধনোচিত ধামে প্রয়াণ করলেন। দেবীপুরের সাধুর কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। শোকে মগ্ন ভূরিশ্রেষ্ঠ’র ঘরে ঘরে সেদিন অঘোষিত অরন্ধন পালিত হল।

কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। তাকে চলতেই হয়। ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মতো রাজ্য শাসকহীন হয়ে থাকবে এ ভাবাই যায় না। অথচ প্রতাপনারায়ণ তখনও নাবালক, তাকে রাজ্যাধিকার দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।

অবশেষে রাজপরিষদের অনুরোধে রাজ্ঞী ভবশঙ্করী রাজ্যের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিলেন। হরিদেব লক্ষ্য করলেন যে ভূপতিকৃষ্ণ এই সিদ্ধান্ত না সমর্থন করলেন, না বিরোধিতা। এত বড় পটপরিবর্তন নীরবে মেনে নিলেন শূরশ্রেষ্ঠ শ্রীমন্তনারায়ণের উত্তরপুরুষ।

সিংহাসনে আসীন হয়েই রানী ভবশঙ্করী কঠিন রাজমূর্তি ধারণ করলেন। আদেশ দেওয়া হল ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সবক’টি দুর্গ সংস্কার এবং পুনর্নির্মাণের। ব্রাহ্মণেতর সমস্ত যুবক এবং যুবতীদের জন্য অস্ত্রচালনাশিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হল। যুবতীদের অস্ত্রবিদ্যার ভার নিলেন রাজ্ঞীর সহচরী পঞ্চকন্যা।

তারকেশ্বরের কাছে একটি পত্তনে তিনি একটি নতুন দুর্গ নির্মাণ করলেন। সেই নতুন সেনানিবাস বা ছাউনির নামে স্থানটির নাম হল ছাউনাপুর। দুর্গের প্রধান দ্বারের সামনের রানী ভবশঙ্করী একটি ভবানী মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন। মন্দিরের নির্মাণকৌশল শুধুমাত্র তিনি জানলেন, আর জানল যারা বানিয়েছে তারা। মন্দির প্রতিষ্ঠার পর তাদের আর কেউ কোনওদিন দেখতে পেল না।

রানী ভবশঙ্করী নিজে ঘোড়ায় চড়ে রাজ্য পরিদর্শনে বেরোতে শুরু করলেন। নিয়মিতভাবে প্রজাদের অভাব অভিযোগ শুনতেন এবং সেইমতো প্রতিকারের চেষ্টা করতেন। অল্পদিনের মধ্যেই চারিদিকে মহারানী ভবশঙ্করীর নামে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। জনসাধারণ তাঁকে সসম্মানে প্রজাপালক জগদ্ধাত্রীর আসনে বসাল।

ভবশঙ্করীর সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে দীর্ঘ ন’বছর কেটে গেল। কিন্তু ভূরিশ্রেষ্ঠ’র বাইরে বাংলার রাজনীতিতে উথাল-পাথাল ঘটে যাচ্ছিল৷ ভূরিশ্রেষ্ঠ যতই শান্তিতে থাকুক না কেন, তিনি জানতেন নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও সে আগুন এড়াতে পারে না। আজ না হোক কাল, এই দিন আসবেই। অবশেষে সেই দিন এসেছে।

ভবশঙ্করী ধাত্রীকে বললেন শিশুপুত্রকে ভেতরে নিয়ে যেতে৷ তারপর নিজের বেশবাস ঠিক করে সভাগৃহে উপস্থিত হলেন।

সভাস্থ প্রত্যেকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন করলেন, একমাত্র রাজগুরু হরিদেব ছাড়া৷ রানী ভবশঙ্করী গুরুদেবকে প্রণাম জানাতে হরিদেব স্বস্তিবাচন উচ্চারণ করে আশীর্বাদ করলেন।

কিন্তু হরিদেব ভট্টনারায়ণের চোখে একটি বিষয় এড়াল না। যে তরুণীকে তিনি নিজে বিবাহদৌত্য করে রাজবধূরূপে নিয়ে এসেছিলেন, ইনি তিনি নন। সেই সজীবতা, প্রফুল্লতা সবই অন্তর্হিত হয়েছে৷ ভবশঙ্করী চিরকালই অল্প কথা বলতেন। এখন রীতিমতো বাকসংযম অভ্যাস করছেন। দিনে একবার মাত্র অন্ন গ্রহণ করেন। রাত্রিবেলা ফলাহার৷ সেই অপরূপ লাবণ্য কোথায় অন্তর্হিত হয়েছে কে জানে! সমস্ত দেহে উদাসী কাঠিন্যের ভাব। বর্ষার পত্রেপুষ্পে পল্লবিত শাখাটি যেন অকস্মাৎ হেমন্তের বৈরাগ্যবিধুর শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ডে পরিণত হয়েছে।

ভবশঙ্করী প্রহরীকে বললেন, ‘দূতকে আসতে বলো।’

একটু পর উসমান খাঁ-এর দূত এসে উপস্থিত হল। তার হাতে একটি পত্র। দেওয়ান দুর্লভ দত্ত পত্রটি নিয়ে পড়তে লাগলেন। পড়া শেষ হলে তিনি যখন মুখ তুললেন, তখন সেই মুখে থমথমে অন্ধকার। তিনি গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘উসমান খাঁ লিখে পাঠিয়েছে যে সে মোগলদের বিরুদ্ধে বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ তার সঙ্গে আরও অনেক পাঠান আফগান দলপতি এবং ছোটবড় কিছু ভুঁইয়া যোগ দিচ্ছে। সেই যুদ্ধে সে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সহযোগিতা চায়।’

ভবশঙ্করী নিরুত্তাপস্বরে বললেন, ‘আর যদি সহযোগিতা না করি?’

দূত উদ্ধতস্বরে উত্তর দিল, ‘তবে তার সমুচিত জবাব পাবেন। উসমান খাঁ’ বাহুবলে ভূরিশ্রেষ্ঠ নিজের অধীনস্থ করবেন। এমনিতেই ইসলামে নারীশাসন নাপাক। মহারানী যেন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই কথাটা মনে রাখেন।’

ভবশঙ্করী সদাসর্বদা তাঁর কৃপাণ নিজের কোমরে কোষবদ্ধ রাখেন। এ তাঁর আজন্মের শিক্ষা। উত্তর শোনামাত্র তাঁর দক্ষিণহস্ত কটিবন্ধস্থিত কৃপাণ স্পর্শ করল। তারপরেই তাঁর চোখ পড়ল উপস্থিত সভাসদদের দিকে। তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁকে উত্তেজিত হতে নিষেধ করছেন।

চতুর্ভুজ চক্রবর্তী আসন থেকে উত্থিত হয়ে বললেন, ‘মহারানীর ক্রোধের কারণ সঙ্গত। কিন্তু তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিই যে দূত অবধ্য। আমাদের কর্তব্য আমাদের উত্তর তার হাত দিয়ে প্রেরকের কাছে পাঠানো।’

দূতব্যক্তিটি বোধহয় কিছু অভব্য দেহভঙ্গিমাসহ সেনাপতি মহোদয়ের বক্তব্যের উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই ভবশঙ্করী দুর্লভ দত্ত’র হাত থেকে উসমান খাঁ-এর পত্রটি ছিনিয়ে নিলেন। তারপর প্রচণ্ড ক্রোধে সেটি কুটিকুটি করে ছিঁড়ে সেই ছিন্নপত্র দূতের মুখে ছুড়ে দিয়ে সক্রোধে বললেন, ‘যাও দূত, এই ছিন্নপত্র কুড়িয়ে নিয়ে নিজের প্রভুর কাছে নিয়ে গিয়ে বলো হিন্দু রাজ্যে দূত অবধ্য বলে আজ তুমি বেঁচে গেলে। নইলে তোমার অপবিত্র দেহ নিয়ে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র কুকুরেরা পথে পথে কাড়াকাড়ি করে মরত।’

দূত কোনও অভিবাদন ছাড়াই সভা ত্যাগ করল। তার মুখের কঠিন বক্র হাসি কারও নজর এড়াল না।

দুর্লভ দত্ত বললেন, ‘দূতকে সমুচিত উত্তর দেওয়া গেছে। কিন্তু এরপর আমাদের কর্তব্য কী?’

রানী ভবশঙ্করী বললেন, ‘সীমান্ত অঞ্চলে প্রহরা আরও কঠিন করুন। সমস্ত দুর্গাধ্যক্ষদের বলুন সেনাদের প্রস্তুত থাকতে। যেসব যুবক যুবতীরা অস্ত্রাভ্যাস শিক্ষা করছে তাদের নিয়মিত কুচ করতে আদেশ দিন।’

দুর্লভ দত্ত বললেন, ‘রানীমার আদেশ শিরোধার্য৷ কিন্তু এক্ষেত্রে আমার কিছু বক্তব্য আছে।’

‘বলুন।’

‘গৌড়বঙ্গের রাজনীতির গতিপ্রবাহ আপনার অজানা নয় মা। সারা বঙ্গদেশ জুড়ে যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে তাতে বিজয়লক্ষ্মী কোন পক্ষকে বরণ করে নেবেন সে আমরা এখনও জানি না। এখন কি আমাদের পক্ষে উসমান খাঁ’র সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাতে যাওয়া উচিত?’

চতুর্ভুজ চক্রবর্তী বললেন, ‘আমি এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি দত্তমশাই। আপনি কি বারো ভুঁইয়াদের বিদ্রোহের কথা বলছেন?’

‘হ্যাঁ সেনাপতিমশাই।’

‘কিন্তু আপনার তো জানার কথা যে, এখন বারো ভুঁইয়াদের বিদ্রোহ বহুলাংশে ছন্নছাড়া। মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁ’র এন্তেকাল হয়েছে অনেক আগেই। বিক্রমপুরের চাঁদ রায় আর কেদার রায়ও আর নেই।’

‘কিন্তু যশোরেশ্বর প্রতাপাদিত্য এখনও বেঁচে আছেন।’

‘হ্যাঁ, সে আছেন। কিন্তু প্রতাপাদিত্য অসমসাহসী এবং মহাবীর হলে কী হবে, স্বভাবে বড়ই হঠকারী। তাঁর আত্মীয়স্বজন, এমনকী ঘনিষ্ঠ রাজন্যরা অবধি তাঁর অকারণ নিষ্ঠুরতায় বিক্ষুব্ধ। তিনি এখন বেগতিকে পড়ে সুবেদার ইসলাম খাঁ’র সঙ্গে সন্ধিপ্রস্তাবে সম্মত হয়েছেন। এদিকে ভূষণাও এখন মোগলদের পদানত। তাহলে বিদ্রোহীদের মধ্যে আর রইল কে?’

সভার কেউ উত্তর দিলেন না।

‘রয়েছে একমাত্র সেই উসমান খাঁ, কোতলু খাঁ’র ভ্রাতুষ্পুত্র। যে এখনও স্বপ্ন দেখে চলেছে সুবে বাংলায় আবার পাঠান আফগান আধিপত্য কায়েম হবে। ফলে উসমান খাঁ’য়ের সঙ্গে মোগলদের-এর সংঘর্ষ এক প্রকার বিধিনির্দিষ্টই ছিল। এক্ষেত্রে আমরা কেন মোগলদের পক্ষ নেব না বলতে পারেন?

‘এবার ধরুন কাল যদি প্রতাপাদিত্য আর উসমান খাঁ হাত মেলান? সেক্ষেত্রে?’

‘সেটা অবশ্যই চিন্তার। এমনিতেই প্রতাপের মতিগতির হদিশ পাওয়া ভার। কবে যে কী করেন বোঝা মুশকিল।’

‘তাহলেই বিপদটা বুঝুন। উসমান খাঁ যদি এগারসিন্দূরের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তাণ্ডার পথ ধরে উত্তর দিক থেকে ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করে, আর প্রতাপ যদি তার ধূমঘাটের দুর্গ থেকে নবদ্বীপ হয়ে তার সেনাবাহিনী প্রেরণ করে, তবে আমরা দু’দিক থেকে সেই আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত আছি তো?’

প্রত্যেকে গভীর অভিনিবেশ সহকারে কথাটি বিবেচনা করতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর চতুর্ভুজ চক্রবর্তী বললেন, ‘প্রতাপাদিত্যর কখন কী মতিগতি হয় তা বোধহয় দেবী যশোরেশ্বরী নিজেও জানেন না। নইলে কার্ভালহো’র মতো মোগল নৌবাহিনী তথা আরাকানদস্যু বিজয়ী নৌসেনাপতিকে কেউ অকারণে অমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে না। তাছাড়া তার নামে আরও অনেক অপ্রীতিকর সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। এর কতটা সত্যি, কতটা মিথ্যা বলা মুশকিল।’

ভবশঙ্করী একটু অস্বস্তির সঙ্গে নড়েচড়ে বসলেন, ‘সেনাপতি মশাই, আপনি আমাকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশদে জানান।’

এর উত্তরে চতুর্ভুজ চক্রবর্তী যা জানালেন তা এইরকম।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহী ভুঁইয়াদের সঙ্গে মোগলদের সংঘর্ষ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। কোতলু খাঁ মারা যাওয়ার পর মানসিং-এর সঙ্গে কোতলু খাঁ’র উজির ঈশা খাঁ’র একটা সন্ধি চুক্তি হয়। কিন্তু এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার দুই বছরের মধ্যেই ঈশা খাঁ কবরের মাটি নিলেন। অতঃপর উসমান খাঁ এই চুক্তি মানতে অস্বীকার করে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে ভাওয়াল আক্রমণ করলেন। আর সেই আক্রমণে তাঁর সঙ্গী হলেন উজির ঈশা খাঁ’র পুত্র দাউদ খাঁ!

মানসিং নিজে ভাওয়াল গিয়ে এদের পরাস্ত করেন। কিন্তু এদের চূড়ান্তভাবে উৎখাত করার আগেই অন্য বিপদ উপস্থিত হল। বীরকুঞ্জর কেদার রায় বিদ্রোহী হয়ে উসমান খাঁ, দাউদ খাঁ, এবং মসনদ ই আলা ঈশা খাঁ’র পুত্র মুসা খাঁ’র সঙ্গে যোগ দিলেন।

মানসিং এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য ঢাকায় সৈন্যবাহিনী পাঠালেন বটে, কিন্তু বহুদিন অবধি মোগল সৈন্য ইছামতী নদী পার করতে পারেনি। অবশেষে মানসিং স্বয়ং শাহপুরে উপস্থিত হয়ে অগভীর জলস্তর দেখে ইছামতীতে নিজের হাতি নামিয়ে দিলেন। মোগল সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে তাঁকে অনুসরণ করল। বিদ্রোহীরা পরাস্ত হয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে গেল, উসমান খাঁ-এর দল আত্মগোপন করল এগারসিন্দুরের জঙ্গলে। মানসিং-এর মোগল বাহিনীর সঙ্গে কেদার রায়ের নৌবাহিনীর ভীষণ নৌযুদ্ধ শুরু হল।

এর পরের খবর কেউ জানে না। শুধু এটুকু সংবাদ এসেছে যে কয়েক বছর প্রবল যুদ্ধের পর মহাবীর কেদার রায় পরাস্ত হয়েছেন। শ্রীপুর ও সন্দ্বীপ মোগলদের হস্তগত হয়েছে।

এদিকে বাদশাহ আকবরের এন্তেকাল হয়েছে। এখন তাঁর পুত্র সেলিম তথা জাহাঙ্গীর ভারতসম্রাট। তিনি মানসিংকে বাংলার সুবেদারের পক্ষ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। মানসিং-এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে পাদশাহ’র একান্ত বিশ্বস্ত সেনানী, তাঁর ধাত্রীমাতার সন্তান জনৈক কুতব উদ্দিন খাঁ কোকা। সেই কোকা’ও গতবছর বর্ধমানের ফৌজদার শের ইসতালজ, ওরফে শের আফগানের এর সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত হয়েছেন শের আফগান নিজেও। আর তারপরেই তাঁর অনিন্দ্যসুন্দরী স্ত্রী মেহেরউন্নিসা ঠাঁই নিয়েছেন বদশাহ জাহাঙ্গীরের হারেমে। এখন তাঁর নাম নূরজাহান। জগতের আলো!

বাতাসে জোর গুজব, এই নারীরত্নটিকে অঙ্কশায়িনী করার জন্যই মানসিংকে সরিয়ে কুতব খাঁ কোকাকে বাংলায় পাঠিয়েছিলেন পাদশাহ জাহাঙ্গীর।

বাংলার পাঠান শাসকদের সঙ্গে মোগলদের চিরকালই সাপে নেউলের সম্পর্ক ছিল। শের আফগানের ঘটনার পর পাঠানরা এখন সর্বশক্তি দিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে মোগলদের একটা মরণকামড় দেওয়ার জন্য। কিন্তু জাহাঙ্গীরও কম কুশলী রাজনীতিক নন। তিনি বাংলার সুবেদার করে পাঠিয়েছেন এক দুর্ধর্ষ মোগল সেনাপতিকে, ইসলাম খাঁ। ইসলাম খাঁ দায়িত্ব নিয়েই পশ্চাদ্ধাবন শুরু করেছেন তাঁর প্রধান শত্রুর প্রতি। উসমান খাঁ।

এদিকে ভুঁইয়াদের মধ্যে শেষ পরাক্রমশালী ভুঁইয়া প্রতাপাদিত্য কী করবেন কেউ জানে না। শুধু এটুকু সংবাদ এসেছে কার্ভালহো’র মতো মোগলবিজয়ী সমরকুশলীকে, সন্দেহের বশে কারারূদ্ধ করে হত্যা করেছেন। তাহলে কি তিনি এবার এই বিবাদে পাঠানদের সহায় হবেন? যদি তাই হয়, তাহলে এই ঘোর রাজনৈতিক সঙ্কটে কোন পক্ষ অবলম্বন করবে ভূরিশ্রেষ্ঠ?

প্রশ্নটা সভার মধ্যস্থলে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্নের মতো ঝুলে রইল। প্রতাপ যেমন হঠকারী, তেমনই বীর। এখন তাঁর যৌবনের সেই তেজ অনেকাংশেই অস্তমিত। তবুও, সিংহ বৃদ্ধ হলেও সিংহই থাকে৷

সভার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করলেন রাজ্ঞী ভবশঙ্করী নিজে। গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘আপনারা জানেন যে এই বংশের কলঙ্ক রাজীবলোচন রায় পাঠানদের প্ররোচনায় ধর্মান্তরিত হয়ে কালাপাহাড় নাম নেন৷ তারপর তিনি হিন্দুদের ওপর যে অকল্পনীয় অত্যাচার করেছিলেন তার ক্ষমা নেই। সেই থেকে আমার স্বামী পাঠান আফগানদের মন থেকে ঘৃণা করতেন। তিনি আজ বেঁচে থাকলে মোগলদের পক্ষ নিতেন বলেই আমার বিশ্বাস। তাই আমার সিদ্ধান্ত এই যুদ্ধে ভূরিশ্রেষ্ঠ মোগলদের পক্ষ নেবে৷ আপনারা কী বলেন?’

চতুর্ভুজ চক্রবর্তী মাথা নেড়ে বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন মহারানী। মহারাজ রুদ্রনারায়ণ বেঁচে থাকলে তিনিও এই সিদ্ধান্তই নিতেন।’

দুর্লভ দত্ত আমতা আমতা করে বললেন, ‘তার থেকে নিরপেক্ষ থাকলে ভালো হত না?’

ভবশঙ্করী কঠিনস্বরে বললেন, ‘দেশ ও জাতির সঙ্কটকালে নিরপেক্ষ থাকাটা পাপ দেওয়ানমশাই। অন্যায় এবং অবিচারের সময়ে নিরপেক্ষ থাকা মানে প্রকারান্তরে অত্যাচারীর পক্ষ নেওয়া। এই পাঠান আফগান দস্যুরা বাঙালি জাতির ওপর যে বর্বর অত্যাচার নামিয়ে এনেছে, তার বিরুদ্ধে না দাঁড়ানো মেরুদণ্ডহীনতার নামান্তর। সঙ্কটকালে পক্ষ নিতেই হয় দেওয়ানমশাই। নিজের দেশ, জাতি, সম্প্রদায়, সংস্কৃতি, সবকিছু রক্ষার জন্য একটা পক্ষ নিতেই হয়। এমন নয় যে আমি মোগলদের হিন্দু সমাজের একান্ত বান্ধব বা মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করি। কিন্তু পাঠানদের মতো উন্মাদ, নৃশংস এবং তীব্র হিন্দুবিদ্বেষী দস্যুদের নির্মূল করার জন্য মোগলদের হাত ধরা ছাড়া আমাদের পথ নেই।’

রাজপুরোহিত হরিদেবও সহমত হলেন, ‘তাছাড়া মোগলরা দেশশাসনের জন্য অনেকাংশে হিন্দুদের উপর নির্ভরশীল। আকবরের সভার অধিকাংশ জ্ঞানীগুণী মানুষই হিন্দু ছিলেন। এমনকী যে অম্বররাজ মানসিংহ, যিনি একাই বাংলার ভুঁইয়াদের বিদ্রোহ প্রশমিত করেছেন, তিনি এখনও সমরাঙ্গণ জাহাঙ্গীরের প্রধান সহায়।’

‘কিন্তু তিনিও তো হিন্দু ভুঁইয়াদের ওপর কম অত্যাচার করেননি।’ দুর্লভ যুক্তি দেন।

‘তিনি মোগল সম্রাটের পক্ষ নিয়ে পাঠান সহায়ক হিন্দু ভুঁইয়াদের দমন করছেন দেওয়ানমশাই। এ তাঁর রাজকর্তব্য ছিল। কিন্তু নিজের ধর্মকর্তব্য ভোলেননি। তিনি পাঠানদের পরাস্ত করেও সন্ধির প্রস্তাব অনুসারে উড়িষ্যা শাসনের অধিকার দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু জগন্নাথক্ষেত্র ছাড়া। কেদার রায়কে পরাস্ত করে তাঁর ইষ্ট শিলামাতা দেবীকে সসম্মানে নিজের রাজ্যে নিয়ে গেছেন দেবীকে প্রতিষ্ঠা করে পূজা করবেন বলে, পাঠানদের মতো হিন্দুর দেবতাকে অসম্মান করেননি।’

‘কিন্তু মানসিংহ তো শুনেছি নিজের দেশে ফিরে গেছেন।’

‘হ্যাঁ। কিন্তু গুজব শুনছি মানসিং নাকি ফিরে আসছেন। জাহাঙ্গীর তাঁকে আবার বাংলায় পাঠাচ্ছেন একটি বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে।’

‘কী সেই দায়িত্ব?’

‘যশোরেশ্বর প্রতাপাদিত্যের সমূল উৎপাটন।’

সকলে অবিশ্বাসের চোখে হরিদেবের দিকে চেয়ে রইলেন। যে সংবাদ রাজ্যের প্রধান গুপ্তচরেরা অবধি পায়নি, সে সংবাদ ইনি পেলেন কী করে?

সবার সপ্রশ্ন দৃষ্টি দেখে মাথা নত করে কী যেন ভাবলেন হরিদেব। তারপর ভবশঙ্করীর দিকে বললেন, ‘প্রতাপের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে মা। যে নিজের পিতৃতুল্য খুল্লতাতকে সবংশে হত্যা করে, নিজকন্যার বিবাহবাসরে সামান্য রঙ্গতামাশার জন্য নিজের জামাতাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়, বৃদ্ধা গৃহপরিচারিকার বুকের আঁচল সরে যাওয়ার জন্য যে সেই হতভাগিনীর স্তনকর্তনের মতো ঘৃণ্য কাজ করতে পারে, তার সামূহিক সর্বনাশের সময় উপস্থিত হয়েছে৷’

রাজ্ঞী ভবশঙ্করী অস্বস্তির সঙ্গে নড়েচড়ে বসলেন।

‘আমার এক সতীর্থ থাকে গঙ্গার পূর্বপাড়ে কালীক্ষেত্র নগরে। তার নাম জিয়া গঙ্গোপাধ্যায়। স্ত্রীবিয়োগের পর জিয়া সন্ন্যাস গ্রহণ করেছে, নাম নিয়েছে কামদেব ব্রহ্মচারী।

‘‘কালীক্ষেত্র নগরীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী মাতা মহাকালী ভারি জাগ্রতা দেবী৷ তাঁর কৃপায় লোকে অসাধ্যসাধন করে বলে জনশ্রুতি। কামদেব সেই কালীক্ষেত্র কালীর পূজারি। তার সাধনার খ্যাতি সুদূর বারাণসী অবধি প্রসারিত। অম্বররাজ মানসিংহও তাঁকে ভারি ভক্তিশ্রদ্ধা করেন৷

কামদেবের পুত্র লক্ষ্মীকান্ত আমার একান্ত অনুরক্ত। তার মধ্যস্থতাতেই আমার আর মানসিংহ’র মধ্যে একটা অপ্রত্যক্ষ সংবাদ যোগাযোগ চিরকালই ছিল।

‘‘এই লক্ষ্মীকান্ত ছিল প্রতাপের একান্ত অনুচর৷ কিন্তু প্রতাপের উদ্ধত ব্যবহার, স্বহস্তে স্ববংশনাশ, অস্থির আচার আচরণ দেখে সে আপাতত প্রভুর প্রতি বিরূপ হয়েছে। সেইই আমাকে জানিয়েছে যে জাহাঙ্গীরের আদেশে মহারাজা মানসিং আবার ফিরে আসছেন বাংলাদেশে। তার সঙ্গে আসছেন রাঘবরায়, কচুরায় নামেই যাঁর সমধিক প্রসিদ্ধি।’

সভাস্থ প্রত্যেকে হতভম্ব হয়ে গেলেন। রাঘবরায় আর মানসিং যে যৌথভাবে প্রতাপাদিত্যকে দমন করতে আসবেন এ সংবাদ তাঁদের স্বপ্নের অগোচর!

ভবশঙ্করী কিছুক্ষণ ভ্রুকুঞ্চন করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘প্রতাপাদিত্য’র সঙ্গে যোগাযোগ করা আমাদের আশু কর্তব্য। ভূপতিকৃষ্ণ কোথায় আছেন এখন?’

চতুর্ভুজ চক্রবর্তী অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, ‘ভূপতিকৃষ্ণ কয়েকদিনের জন্য রাজ্যের বাইরে কোথাও গেছেন।’

‘কোথায় গেছেন?’

চতুর্ভুজ চক্রবর্তী সামান্য অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, ‘কোথায় গেছেন আমায় বলে জাননি।’

চতুর্ভুজের সঙ্কট বুঝলেন মহারানী। ভূপতিকৃষ্ণ যতই চতুর্ভুজের অধীনস্থ হোন না কেন, তিনি ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রাজবংশের সন্তান। চতুর্ভুজের পক্ষে ভূপতিকে চোখে চোখে রাখা সম্ভব নয়।

ভবশঙ্করী তীব্রস্বরে বললেন, ‘দেওয়ান মশাই, ভূপতির সন্ধানে চারিদিকে লোক পাঠান। আমি চাই এক সপ্তাহের মধ্যে ভূপতিকৃষ্ণ যেন আমার সামনে এসে উপস্থিত হোন। এ আমার আদেশ। আপনারা এখন যেতে পারেন৷ সেনাপতিমশাই, আপনি একটু থেকে যান। আপনার সঙ্গে কথা আছে।’

চতুর্ভুজ ত্রস্ত হয়ে বসে রইলেন।

এই এগারসিন্দূরের জঙ্গলের মশার উৎপাত বড় বেশি৷ এতদিন বঙ্গালের মাটি আঁকড়ে পড়ে আছেন উসমান খাঁ, এই দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ সবই দেখেছেন তিনি। কিন্তু এমন বেহুদা জায়গা আর দ্বিতীয়টি দেখেননি তিনি। অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে না আসতেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশা তাঁকে আর তাঁর দলের লোকজনকে নাস্তানাবুদ করে তোলে। নারিকেলের ছোবড়ার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানীয় ভেষজ মিশিয়ে সারা রাত জ্বালিয়ে রাখলে তাও কিছুটা বাঁচোয়া। কিন্তু সেই ধূম্র এই দুর্গের মধ্যে বদ্ধ বাতাসে এমন পাক খেতে থাকে যে নিঃশ্বাস নেওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে।

শুধু মশা কেন, এখানকার মানুষজনও যেমন গোঁয়ার, তেমনই অবাধ্য৷ তার ওপর তাদের ভাষাও বড় বিচিত্র। উসমান খাঁ বাংলা আর ওড়িয়া, দুটো ভাষাই খুব ভালো জানেন। কিন্তু এই এগারসিন্দূরের অধিবাসীদের বাংলা বড় জটিল। উসমান খাঁ তার অর্ধেক বোঝেন, অর্ধেক বোঝেন না। জঙ্গলাকীর্ণ দুর্গে বাস করতে ক্রমেই আরও ক্ষিপ্ত হচ্ছিলেন উসমান খাঁ।

আজ সকাল থেকেই মদ্যপানে চুর হয়েছিলেন উসমান খাঁ। এমনিতেই তিনি মহাকায় মহাশক্তিধর পুরুষ। একদিনে একটি গোটা পাঁঠার গোস্ত খেয়ে হজম করতে পারেন। মদ্যপান করেন বৃহৎ জালা দুহাতে ধরে। সচরাচর রাত্রিযাপন করেন দুটি নারীর সঙ্গে। তাদের দুজনকেই পরেরদিন ক্ষতবিক্ষত এবং চেতনাহীন অবস্থায় দুর্গপ্রাকারের বাইরে ফেলে আসা হয়। যেদিন নারীদেহ জোটে না সেদিন সারারাত বাছাই পালোয়ানদের সঙ্গে কুস্তি লড়েন। আর মনের মধ্যে পুষে রাখা ক্ষিপ্ত হিংস্র রাগটাকে উসকে দিতে থাকেন। তাকে ধিকধিক জ্বলতে দেন, ক্রমাগত ইন্ধন জোগান। যাতে এই ক্রোধ একদিন মোগল আর তাদের সহযোগী কাফেরদের পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।

আর সেই ক্রোধে ঘৃতাহুতি দিয়েছে কালকের ঘটনা।

বড় আশা করে মুসা খাঁ, দাউদ খাঁ, কেদার রায় এদের সঙ্গে ষড় করে মোগলদের উৎখাত করার একটা বড় পরিকল্পনা করেছিলেন উসমান। সেসব আশায় ওই রাজপুতের বাচ্চা কবেই প্রস্রাব করে দিয়েছে।

মুসা খাঁ আর দাউদ খাঁ এমনিতেই ইবলিশের বাচ্চা, ওদের ওপর উসমানের তেমন ভরোসাও ছিল না কোনওদিন। কিন্তু কেদার রায়ের মৃত্যু উসমানের বুকে বাজের মতো বেজেছিল। হ্যাঁ, মর্দ ছিল বটে লোকটা। কাফের হলে কী হবে, সাচ্চা মর্দ। ওরকম ভয়ডরহীন, দুর্ধর্ষ, বেপরওয়াহ মহাবীর কাফেরদের মধ্যে খুব বেশি দেখেননি উসমান। কেদার রায়ের কথা মনে পড়লে এখনও নিজের অজান্তেই তাঁর মাথা শ্রদ্ধায় ঝুঁকে আসে।

শেষ বাকি আছে একজনই। যশোরের প্রতাপ। তাকে দলে টানতে পারলেই একটা বড় জিত হাসিল হবে উসমানের। প্রতাপ আপাতত ইসলাম খাঁ’য়ের সঙ্গে সন্ধি করেছে বটে। তবে উসমান বড় ভালো করে চেনেন প্রতাপকে। ওর সন্ধিচুক্তির বিন্দুমাত্র দাম নেই। ওকে শুধু খোয়াব দেখাতে হবে যে বঙ্গাল থেকে মোগলদের খেদালে ওর নাম সবচেয়ে বেশি ঢিনঢোড়া পেটা হবে। তাতেই প্রতাপ আপ্লুত। নাম, শোহরত এসব ছাড়া ওর আর কিছু চাই না।

তবে এর মধ্যে একটাই কাঁটা ছিল, ভুরশুট। সরকার সাতগাঁওয়ের সবথেকে বেশি রাজস্ব আসে যেখান থেকে। সারা বঙ্গাল যুদ্ধে ছারখার হয়ে গেলেও আজ অবধি ভুরশুটের ওপর তার আঁচ পড়েনি। আজ অবধি যতবার পাঠানদের সঙ্গে ভুরশুটের যুদ্ধ হয়েছে, প্রতিবারই হেরেছে পাঠানরা। বিশেষ করে যে যুদ্ধে চাচাজান শহিদ হলেন…

রাতের রান্নার গোস্ত মাঝে মাঝে নিজেই কাটেন উসমান। রক্ত না দেখলে রাত্রে তাঁর ঘুম হয় না৷ আজ বিকেলেও তিনি একটা কচি বাছুরকে এনে রেখেছিলেন কুপিয়ে কুপিয়ে কাটবেন বলে৷ চাচাজানের কথা মাথায় আসতেই উসমান খাঁ বুঝতে পারলেন যে ক্রোধের বিষ তাঁর শিরায় শিরায় আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

বাছুরের গলাটা আড়াই প্যাঁচে কাটার বদলে এক কোপে ধড় থেকে আলাদা করে দিলেন তিনি। রক্ত ছিটকে উঠে তাঁর হাত মুখ ভিজিয়ে দিল।

অথচ ভুরশুটের রাজারা কিন্তু একসময় পাঠানদের মস্ত সহায় ছিল। গড় মান্দারণ নিয়ে উড়িষ্যার সঙ্গে ভুরশুট-পাঠানদের মধ্যে যুদ্ধ কম হয়নি। কিন্তু যখন বাংলার বড় বড় ভুইঁয়ারা মোগলদের বিরুদ্ধে পাঠানদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গাওয়াতের ঝাণ্ডা তুলে ধরলেন, তখন কী করে আর কেনই যে ভুরশুটের রাজারা মোগলদের পক্ষ নিলেন সে এখনও বোঝেন না উসমান খাঁ।

তবে এতদিন ভুরশুট নিয়ে তিনি তেমন মাথাও ঘামাননি। ঘামালেন যেদিন ওই সেলিম উর্ফ জাহাঙ্গীর নামের হারামজাদাটা শের আফগানকে খুন করিয়ে তার বেহেস্তী হুরীর মতো সুন্দরী বিবি মেহেরউন্নিসাকে নিকাহ করার জন্য দিল্লি তুলে নিয়ে গেল। পাঠান আফগান সব মাফ করতে পারে কিন্তু ঘরের আওরাতদের ইজ্জত নিয়ে কোনও সমঝোতা নয়৷ এরপরেও যে পাঠান বা আফগান জালিম মোগলদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে না সে বেশক কায়র আর জাহিল ইনসান।

কিন্তু এই যুদ্ধে প্রতাপ ছাড়া আর তাঁর সঙ্গে কান্ধা সে কান্ধা মিলিয়ে লড়ার লোক কই? রয়েছে এই ভুরশুট। এমনিতেই উসমান খাঁ ঘোরতর শরিয়তী ইনসান। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে অওরাতদের একমাত্র জায়গা হচ্ছে বিস্তার আর রসুইখানা। আর এই ভুরশুটের তখত-এ-মালকিন একজন অওরাত? তওবা তওবা! শরিয়ত মোতাবেক আওরত মানেই শস্যক্ষেত্র। তাই তো কাফের আওরত পেলেই সেই শস্যক্ষেত্রে বীজ বপন করতে ছাড়েন না উসমান খাঁ, আর তার সঙ্গীসাথীরা।

কয়েকদিন আগে তাই ক্ষমাঘেন্না করেই ভুরশুটে একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন উসমান খাঁ। নেহাত চট করে আক্রমণ করাটা ভালো দেখায় না তাই পাঠানো। নইলে কাফের অওরাতের শাসনে থাকা এসব ছোটখাটো রাজ্য দখল করতে উসমান খাঁ’র মতো জিহাদি গাজী’র একটা হুঙ্কারই যথেষ্ট।

কিন্তু কাল সেই দূত ফিরে এসেছে৷ ফিরে এসেছে উসমান খাঁ’এর পত্রের ছিন্ন টুকরো নিয়ে। ওই কাফের অওরাত নাকি উসমান খাঁ’র পত্রটি ছিঁড়ে দূতের মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে৷

সেই থেকে ক্রোধে উসমান খাঁ’এর শরীর জ্বলে যাচ্ছে। এই অপমান, তাও এক কাফের অওরাতের থেকে? এই নাপাক অওরাতের এত বড় জুররত?

তাঁর রাগ কিছুতে শান্ত হচ্ছিল না। বয়ে যাওয়া রক্তের দিকে তাকিয়েছিলেন উসমান। এমন সময় প্রহরী এসে খবর দিল, ‘গুস্তাখি মাফ হুজুর, আপনার সঙ্গে কেউ একজন মোলাকাত করতে এসেছেন।’

‘কে?’

‘নাম বলেননি হুজুর। শুধু এটুকু বলেছেন ভুরশুট থেকে এসেছেন।’

ভুরু কুঁচকে গেল উসমান খাঁ’এর। তিনি হাত মুখ মুছে আগন্তুককে ভেতরে আসতে বললেন।

লোভে চোখ দুটো চকচক করছিল উসমান খাঁ’এর। এই তো, শুনেছেন, পরওরদিগার তাঁর বান্দার খোয়াইশ শুনেছেন। তাঁর সামনে যিনি বসে আছেন তাঁর পরিচয় পেয়ে প্রথমে চমকে গেছিলেন উসমান খাঁ। এ কি খ্বোয়াব, নাকি হকিকত? আর তারপর আগন্তুক যে প্রস্তাব পেশ করলেন সেটা শুনে উসমানের খাঁ-এর মাথা পুরো ঘুরে গেল। খুদা মেহেরবান! তিনি ঠিক লোককেই পাঠিয়েছেন উসমান খাঁয়ের কাছে।

‘তাহলে আপনি বলছেন আপনি আমাদের সব রকমের সাহায্য করতে প্রস্তুত?’

‘হ্যাঁ, যা জানতে চাইবেন, সব জানাব। যা করতে চাইবেন তাতে সাহায্য করব। ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সম্পদ, রাস্তাঘাট, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সৈন্যবাহিনী সব আমার নখদর্পণে। ওই রাজ্যকে আমার থেকে ভালো আর কেউ চেনে না। আমার পক্ষ থেকে আপনি সবরকমের সহযোগিতা পাবেন।’

‘আর তার বদলে আপনার কী চাই?’

আগন্তুকের মুখে একটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল, ‘ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সিংহাসন, আবার কী।’

উসমান মনে মনে হাসলেন। উসমান খাঁ আর তার সঙ্গীসাথীদের চেনে না এই ধূর্ত কাফের। কোনও রাজ্য বা জনপদ জয় করার পর পাঠান দলপতি তাঁর সৈন্যসামন্তদের এক সপ্তাহের জন্য খুল্লমখুল্লা ছুট দেন ইচ্ছেমতো লুটতরাজ চালাবার জন্য৷ এই লুটের মালকে বলে গনীমাহ, শরিয়ত অনুসারে যার একটা অংশ পাঠান দলপতিরও প্রাপ্য৷

দলপতির আদেশ পাওয়ার পর ত্রস্ত জনপদটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাঠান আফগান সৈন্যরা আর নির্মমভাবে ধর্ষণ করতে থাকে বিজিত জনপদটিকে। তখন তাদের রূপ দেখলে জঙ্গলের পশুরাও লজ্জা পায়।

ক্ষুধার্ত শ্বাপদের মতো জিভ নিয়ে ঠোঁট চেটে নিলেন উসমান। একবার ভুরশুট হাতে আসুক। তারপর সেখানে রাজত্ব করার জন্য কিছু পড়ে থাকে কি না সেটা এই বেওকুফ গদ্দারটা ভালো করেই বুঝবে।

‘কিন্তু সেটা সম্ভব কী করে?’ প্রশ্ন করলেন উসমান।

আগন্তুক ধীরস্বরে উত্তর দিতে থাকলেন। শুনতে শুনতে উসমান খাঁ-এর মুখে এক বিচিত্র হাসি খেলে গেল। বেশক্! ওই বদত্তমিজ অওরত এবার তার গুস্তাখির সাজা পাবে। দাঁতে দাঁত ঘষলেন উসমান।

নিজের সিংহাসনে বসে প্রতাপাদিত্য চোখ সরু করে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর দুই ভ্রু ভয়ঙ্কর কুঁচকে আছে। দূতের স্পর্ধা দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছেন। এ কি জানে না কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে?

‘আপনি কী চাইছেন স্পষ্ট করে বলুন। আপনার কথা বুঝতে আমার অসুবিধা হচ্ছে।’ গম্ভীরকণ্ঠে প্রায় ধমকেই উঠলেন প্রতাপ।

‘আমার অনুরোধ, আপনি ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকুন মহারাজ। স্বজন স্বজাতি ধ্বংসের মতো পাপ দ্বিতীয়বার করবেন না।’

ধ্বক করে উঠল প্রতাপের চোখদুটো। এই দুতের এত স্পর্ধা যে স্বয়ং যশোরেশ্বর প্রতাপাদিত্যর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকেই উপদেশ দেয়?

ব্যক্তিটি বোধহয় প্রতাপের মনের কথা বুঝতে পারলেন। স্বর নরম করলেন, ‘আমাকে ভুল বুঝবেন না মহারাজ। আপনি এই মুহূর্তে ভারতবর্ষের পূর্বভাগের শ্রেষ্ঠতম হিন্দু নরপতি। আপনার অবিদিত নেই যে এই মুহূর্তে বাংলা উড়িষ্যার অধিকার নিয়ে মোগল পাঠানদের মধ্যে যুদ্ধ অন্তিম পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে সংবাদ পেয়েছি যে আপনার সঙ্গে পাঠান দলপতি উসমান খাঁ’এর সন্ধিপ্রস্তাব নিয়ে কথাবার্তা চলছে। আমরা জানি যে উসমান খাঁ আমাদের রাজ্য ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করতে অত্যন্ত উদগ্রীব। আপনার কাছে আমাদের সবিনয় নিবেদন, আপনি এই কুচক্রে পড়ে যেন আরেক হিন্দু রাজ্যের সর্বনাশ করতে উদ্যত হবেন না। ব্যস, এইটুকুই।’

‘বটে?’ বাঁকা হাসলেন প্রতাপ। হুঁ, লোকটা সব সংবাদ নিয়ে আটঘাট বেঁধেই এসেছে বটে। তবুও বাজিয়ে দেখতে ক্ষতি কী?’

‘আপনি সংবাদ রাখেন দেখছি। আপাতত বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁ’র সঙ্গে আমার সন্ধি চলছে সে খবরও আপনার কাছে নিশ্চয়ই আছে। তাহলে আপনার কেন মনে হচ্ছে যে আমি উসমান খাঁ’এর সঙ্গে হাত মেলাব?’

একটা স্মিত হাসি খেলে গেল আগন্তুকের মুখে। তিনি চেষ্টাকৃত বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, ‘মহারাজ, নিজের বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনি কি আগে মোগল বা পাঠানদের সঙ্গে করা সন্ধিচুক্তি কখনও অমান্য করেননি?’

প্রশ্নটা শুনে এবার সিংহাসনে সোজা হয়ে বসলেন প্রতাপ। তাঁর বৃহদায়তন বপু, স্ফীত অক্ষিকোটর, চোখের কোণে জমে থাকা কালি, জুলফির ঈষৎ শুভ্র কেশরাজি, ঈষৎ কাঁপতে থাকা হাত পা ইঙ্গিত করছে যে মহাবীর প্রতাপাদিত্যের সেই প্রতাপ এখন অস্তমিত।

যে প্রতাপাদিত্য যৌবনে আগ্রায় বসবাসকালীন যশোর থেকে প্রেরিত যাবতীয় রাজকর নিজ আয়ত্বাধীন করে কূটকৌশলে দিল্লীশ্বরের কাছ থেকে যশোর রাজ্যশাসনের অধিকার আদায় করেছিলেন, ইনি সেই প্রতাপাদিত্য নন। যে প্রতাপাদিত্য পিতামহের বাৎসরিক শ্রাদ্ধের আয়োজনে আমন্ত্রিত হয়ে অকারণে, সম্পূর্ণ সন্দেহের বশে নিজের পিতৃব্যকে সবংশে নাশ করেছেন, ইনি সেই প্রতাপ নন।

যে প্রতাপাদিত্য উড়িষ্যা থেকে যুদ্ধ করে উৎকলেশ্বর শিবলিঙ্গ এবং গোবিন্দদেবের মূর্তি নিয়ে এসেছেন, শের খাঁ থেকে শুরু করে অগণন মোগল সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করেছেন, ইনি তিনি নন।

আগন্তুকের স্বরে সম্ভ্রমমিশ্রিত কৌতুক স্বর খেলে গেল, ‘আপনি বহুবার নিজের দেওয়া কথা নিজেই অমান্য করেছেন মহারাজ। আশা করি সেসব কথা আপনাকে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সে আপনার কূটনীতি, আপনিই ভালো বুঝবেন। আমি শুধু একটিমাত্র অনুরোধ নিয়ে এসেছি। যদি কখনও আপনার সঙ্গে উসমান খাঁ’য়ের চুক্তি হয়, তাহলে কথা দিন, আপনি কখনও ওই বিধর্মী ম্লেচ্ছটির সঙ্গে একত্রিত হয়ে ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করবেন না।’

প্রতাপাদিত্য বললেন, ‘বটে? তা আমি উসমান খাঁ-এর সঙ্গে চুক্তি করতে পারি, এ কথা আপনাকে কে বলল?’

‘এ আবার কাউকে বলে দিতে হবে মহারাজ? এই মুহূর্তে মোগলদের চরমতম শত্রু দুইজন। আপনি আর উসমান খাঁ। ঈশা খাঁ, কেদার রায়, চাঁদ রায় নিহত। অন্যান্য ভুঁইয়ারা মোগলদের পদানত। এখন বাঙালির স্বাধীনতার পতাকা বহন করার গুরুদায়িত্ব একমাত্র আপনারই কাঁধে। উসমান খাঁ যে আপনার সঙ্গে হাত মেলাতে চাইবে এ জানার জন্য তো গণৎকার হওয়ার প্রয়োজন নেই মহারাজ।’

প্রতাপাদিত্য’র মুখের ভাব সামান্য প্রসন্ন হল। আগন্তুক এটাই আশা করেছিলেন। প্রতাপাদিত্য’র একটিই দোষ, আত্মঅহমিকা। আর সেটিই তাঁর প্রধানতম শত্রু। প্রতাপ নিজেকে ছাড়া আর কাউকে চেনেন না, নিজের থেকে শ্রেষ্ঠ আর কাউকে মানেন না। প্রতাপ এমনই অসমসাহসী যুদ্ধবীর যে তিনি বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভুঁইয়া ঈশা খাঁ’কে অবধি হিজলির যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন।

তিনি সঠিক এবং কৌশলী কূটনীতি অবলম্বন করলে হয়ত অখণ্ড বাংলার নিঃস্বপত্ন আধিপত্য লাভ করতে পারতেন৷ কিন্তু প্রতাপকে তিক্ত অথচ হিতকারী এবং সৎ পরামর্শ দেবে, যশোর রাজ্যে এমন কে আছে? কার ঘাড়ে কটা মাথা?

বসন্ত রায় যদি বেঁচে থাকতেন, আর প্রতাপ যদি তাঁর অনুগত হতেন, তাহলে হয়ত আজ যশোর সমগ্র পূর্বভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজ্য বলে পরিগণিত হত। কিন্তু সে তো হবার নয়৷ কারণ প্রতাপ নিজেকে তো অখণ্ড বঙ্গের একচ্ছত্র সম্রাট মনে করেন। তিনি হিজলি জয় করে যেই শুনলেন চাঁদ রায় কেদার রায় মোগলদের বিরোধিতা করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, অমনি বিক্রমপুর আক্রমণ করে বসলেন!

তাঁর একটাই দাবি, একটাই চাহিদা, একটাই বাসনা, মোগলদের যদি দমন করতে হয় তাহলে একমাত্র তিনিই করবেন, আর কেউ না। বাকি সবাই তাঁর বশ্যতা স্বীকার করবে, তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেবে৷ আর কেউ তাঁকে ছাপিয়ে যাবে না, আর কেউ তাঁর থেকে বিখ্যাত হবে না। তিনিই সর্বোত্তম, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ।

এই আত্মম্ভরিতাই প্রতাপের সর্বশ্রেষ্ঠ শত্রু। দেবাদিদেব মহাদেবকে তুষ্ট করার জন্য যেমন এক ঘটি দুগ্ধমিশ্রিত গঙ্গাজল আর ধুতরো ফুল যথেষ্ট, তেমনই প্রতাপকে তুষ্ট করার জন্য সর্বোত্তম উপায় তাঁর সদাজ্বলন্ত অহমিকায় ইন্ধন সঞ্চার করা।

আগন্তুক যে প্রতাপের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে উত্তমরূপে অবগত সে তাঁর আলাপ লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়।

প্রতাপ বললেন, ‘দেখুন, আমার বয়েস হয়েছে। আপনার কাছে স্বীকার করতে বাধা নেই, আমি আজকাল প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে তেমন আর যাই না। তার জন্য আমার জ্যেষ্ঠপুত্র উদয়াদিত্যই যথেষ্ট। হ্যাঁ, স্বীকার করছি যে উসমানের সঙ্গে আমার কিছু প্রাথমিক কথাবার্তা চলছে। কিন্তু সে কেবলমাত্র আমি আর উসমানই জানি। সে ব্যাপারে আপনি অবগত হলেন কী করে?’

স্মিত হাসিতে ভরে গেল আগন্তুকের মুখ, ‘ভূরিশ্রেষ্ঠ’র গুপ্তচরবাহিনী মধ্যে আমারও একটি নিজস্ব গুপ্তবাহিনী আছে মহারাজ। তাদের কাছ হতে আমি এমন সব সংবাদ পাই যা আপনি কল্পনা করতে পারবেন না।’

সশব্দে হেসে ফেললেন প্রতাপ। হাসি থামলে আগন্তুককে সস্নেহে বললেন, ‘আপনি ভূরিশ্রেষ্ঠ’র অন্যতম রাজপ্রতিনিধি হতে পারেন বটে, কিন্তু গুপ্তচরদৌত্যে আপনারা আমার কাছে শিশু। আপনি ভুলে যাবেন না আমি বঙ্গেশ্বর প্রতাপাদিত্য।’

‘জানি মহারাজ। আপনার বীর্যবত্তা, অপরিমেয় সাহস আর যুদ্ধকৌশলের কাহিনী ইতিমধ্যেই প্রবাদে পরিণত। তবুও বলছি, এমন একটি গুপ্তসংবাদ আমি আপনাকে দিতে পারি যা আপনার স্বপ্নেরও অগোচর। এবং আপনার ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনা বহুলাংশে এর ওপরেই নির্ভর করবে।’

‘বটে! কী সেই অতি বিশিষ্ট সংবাদ শুনি।’

‘তার আগে কথা দিন যে আপনি উসমান খাঁ’য়ের হাতে হাত মিলিয়ে ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করবেন না।’

খানিক দোনামোনা করলেন প্রতাপ। যৌবনের প্রতাপ হলে এতক্ষণে একে বন্দী করে এর পেট থেকে কথা টেনে বের করে কুপিয়ে কুপিয়ে কাটার আদেশ দিতেন৷ যেমন ভাবে হত্যা করেছিলেন কার্ভালোকে, শুধুমাত্র আরাকানরাজ সেলিম শা’কে খুশি করতে৷ কিন্তু এই প্রতাপ প্রৌঢ়, আগের থেকে অনেক ধৈর্যশীল।

কয়েকমুহূর্ত ভেবে বললেন, ‘আচ্ছা, কথা দিলাম। এমনিতেই ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করে আমার কোনও লাভ নেই। আমার প্রধান শত্রু এখন ইসলাম খাঁ। বাধ্য হয়ে সন্ধি করেছি বটে, কিন্তু যতদিন না ওটাকে ধরে এনে ধূমঘাটে রাস্তায় উলঙ্গ করে হাঁটাচ্ছি…’

‘ইসলাম খাঁ একা নয় মহারাজ। মানসিংহ জাহাঙ্গীরের দ্বারা আদিষ্ট হয়ে আবার ফিরে আসছেন বাংলায়। আর এবার তাঁর একমাত্র লক্ষ্য যশোর এবং আপনি।’

খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে আগন্তুকের দিকে চেয়ে রইলেন প্রতাপাদিত্য। তারপর বললেন, ‘এই সংবাদের উৎস কী?’

আগন্তুক এতক্ষণ সপ্রতিভ কথা বলছিলেন। তাঁর শারীরিক ভঙ্গিমায় এবার সামান্য অস্বস্তি ধরা পড়ল। তিনি বললেন, ‘মহারাজ, গুপ্তদৌত্যের মূলনীতি তো আপনি জানেন। গোপন সংবাদদাতার পরিচয় সর্বদাই গোপন রাখতে হয়৷ তবে এটুকু বলতে পারি তিনি আপনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত বৃত্তের মধ্যেই বিরাজ করেন।’

‘বটে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ। এও বলে রাখি, আপনার কিছু সিদ্ধান্ত আপনার বেশ কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গীদের বিব্রত করেছে। এই মুহূর্তে যাঁদের ওপর আপনি ভরসা করে আছেন তাঁদের সবাই যে প্রকৃতপক্ষে আপনার অনুগত বা শুভাকাঙ্ক্ষী তা নয়।’

‘স্পষ্ট করে বলুন। কার কথা বলছেন? ভবানন্দ মজুমদার? মুকুট রায়? কালিদাস? মহিউদ্দিন? মদনমল্ল? নাকি রঘু?’

আগন্তুক আরও বিব্রত। বিনীতভাবে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, ‘মহারাজ, আপনাকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিই, দূত অবধ্য। আমি শুধু আপনার ভালো চাই বলেই…’

‘নাম বলুন।’ গর্জে উঠলেন বাংলার বাঘ প্রতাপাদিত্য, ‘কে সেই বিশ্বাসঘাতক? খোজা কামাল? শঙ্কর? নাকি সূর্যকান্ত?’

আগন্তুক এবার ভীত হলেন। প্রতাপের রুদ্ররূপকে ভয় পায় না, এমন মানুষ বঙ্গদেশের রাজন্যবৃত্তে অতি বিরল। প্রতাপের ক্রোধবহ্নি সর্বগ্রাসী। যিনি নিজকন্যার বিবাহ আসরে জামাতার সঙ্গে আসা ভাঁড়ের রঙ্গরসিকতায় উত্তেজিত হয়ে সদ্যবিবাহিত জামাতাকেই হত্যার আদেশ দিতে পারেন, তাঁর ক্রোধ যে কীরূপ মারাত্মক, সে বুঝিয়ে বলার দরকার নেই।

আগন্তুক বিনয়ে নুইয়ে পড়লেন, ‘মহারাজ প্রতাপাদিত্য, আপনি বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্য। আমি আপনার দীন সাহায্যপ্রার্থী, আপনার সদয় কৃপাদৃষ্টি যাঞ্ছা করি। আপনার ক্রোধদীপ্তি যেন এই দেশের ভবিষ্যৎ ভস্ম না করে, এটুকুই অনুরোধ।’

প্রতাপ কিঞ্চিৎ শান্ত হলেন। তারপর জিগ্যেস করলেন, ‘সংবাদ যে সত্য সে কী করে বুঝব?’

‘সে বিষয়ে আমার ওপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই মহারাজ।’

ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন প্রতাপ, ‘আসুক মানসিংহ। মোগলদের ওই ভাড়া করা হিন্দুজাতির কলঙ্ক রাজপুতটাকে বুঝিয়ে দেব কত ধানে কত চাল। যশোর থেকে শুরু করে মাতলা হয়ে রায়মঙ্গল, চাকশ্রী অবধি আঠেরোটি দুর্গ আমার অধীনে। আমার নৌবাহিনীর তুল্য নৌশক্তি শুধু ছিল কেদার রায়ের। পিয়ারা, মহলগিরি, পশত, বালাম, পলওয়ার, সব মিলিয়ে কম করে দশ হাজার রণতরী আছে আমার। তাদের নেতৃত্বে আছে ফ্রেডরিক ডুডলি। তিরন্দাজ বাহিনীর দায়িত্বে সুন্দর আর ধুলিয়ান বেগ। আমার কুকি সেনাদলের নাম শুনেছেন আশা করি। তাদের শখ হচ্ছে শত্রুর মুণ্ড কেটে নেওয়া। তাদের নেতা রঘুকে আপনি চেনেন না। আর পদাতিক সৈন্য? কম করে বাহান্ন হাজার ঢালী আছে আমার পদাতিক সৈন্যবাহিনীতে। আর যুদ্ধকালে…’

‘তাদের নেতৃত্ব দেন সেনাপতি কালী। সবই জানি মহারাজ। তবে আমি আমার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করছি। আমার কাছে সংবাদ আছে যে আপনার কার্যকলাপে আপনার বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গীসাথী অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। আরও শুনুন, মানসিংহ এই অভিযানে একা আসছেন না। তাঁর সঙ্গে আরও একজন আসছেন।’

‘কে?’

‘রাঘবরায়।’

প্রতাপের স্তিমিত এবং নির্জীব চোখদুটি খানিকক্ষণ আগন্তুকের দিকে চেয়ে রইল। তারপর তিনি মাথা পিছনে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। অবশেষে, তাঁর কর্মফলের বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে চলেছে।

সেই ভয়ঙ্কর রাতের কথা মনে পড়লে এখনও তাঁর বুকে অনুশোচনার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। তাঁর উগ্র ক্রোধ, অপরিমিত অহং আর ক্ষমতার লোভে যে মহা অনর্থ ডেকে এনেছিল সেদিন তার তুলনা হয় না। বসন্তরায় তাঁর পিতার বাৎসরিক শ্রাদ্ধের আয়োজনে প্রতাপকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। প্রতাপ যখন মহাসমারোহে প্রবেশ করছেন, তখন তিনি শুনলেন বসন্তরায় বলছেন, ‘প্রতাপ এসেছে? ভালো। গঙ্গাজল আনো।’

শ্রাদ্ধের আয়োজনে বসে পিতৃব্য বসন্তরায় গঙ্গাজল চেয়েছিলেন আচমণের জন্য। এদিকে বসন্তরায়ের প্রিয় তরবারির নামও গঙ্গাজল। প্রতাপ ভাবলেন বসন্তরায় তাঁকে হত্যার জন্য নিজের তরবারি আনতে বলছেন। ব্যস, এই সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতেই সর্বনাশ ঘটে গেল। সেদিন প্রতাপের তরবারি ঝলসে উঠেছিল সর্বনাশী সর্ববিধ্বংসী অশনির মতো। শুধু নিজের পিতৃতুল্য পিতৃব্যকেই নয়, ক্রোধান্ধ প্রতাপ একে একে হত্যা করেছিলেন বসন্তরায়ের প্রায় সবক’টি সন্তানকে, গোবিন্দ, জগদানন্দ, পরমানন্দ, রূপরাম, মধুসূদন এবং মাণিক্য।

সেই কালান্তর রাত্রিতে বসন্তরায়ের বংশলোপ হয় দেখে তাঁর ধর্মপত্নী কনিষ্ঠ সন্তান রাঘবরায়কে নিয়ে কচুবনে আত্মরক্ষা করেন। সেই থেকে রাঘবরায় কচুরায় নামে প্রসিদ্ধ।

বসন্ত রায়ের জামাতা রূপরাম রায় এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে, এবং কচুরায়ের জীবন বাঁচাতে বদ্ধপরিকর হন। তখন মসনদ ই আলা ঈশা খাঁ’ জীবিত ছিলেন। রূপরাম রায় উপায়ান্তর না দেখে ঈশা খাঁ’র দ্বারস্থ হন।

ঈশা খাঁ’র সেনাপতি ছিলেন বলবন্ত। বলবন্তের সমতুল্য বীর তখন বাংলাদেশে কমই ছিল। আর শুধু বীরত্ব নয়, কূট পরিকল্পনাতেও তিনি প্রতাপের থেকে কোনও অংশে কম ছিলেন না। বলবন্ত কৌশলে কচুরায়কে যশোর থেকে উদ্ধার করে এনে দিল্লি পাঠিয়ে দেন।

এখন সেই কচুরায় যুবক হয়েছেন, আর প্রতাপ প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। মানুষকে তার কৃতকর্মের ফল এই জীবনেই মিটিয়ে যেতে হয়। প্রতাপ বুঝলেন, মা যশোরেশ্বরী বিমুখ হয়েছেন। মানসিং আর রাঘবরায়ের এই যৌথ অভিযান বোধহয় বিধিনির্দিষ্টই ছিল।

চোখ খুললেন প্রতাপ। ক্লান্তস্বরে বললেন, ‘বুঝলাম। আমার যা কর্তব্য আমি করব। আপনার সংবাদের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। হ্যাঁ, আমি কথা দিচ্ছি, উসমানের সঙ্গে আমার সন্ধি হোক বা না হোক, যশোরের দিক থেকে ভূরিশ্রেষ্ঠ সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *