জয়দুর্গার খড়্গ
‘হঠাৎ এই সিদ্ধান্তের কারণ জানতে পারি মা?’
‘ধরে নিন আমার ইচ্ছা। এই বৎসরের মহাশিবরাত্রির পূজা আমি কাষ্ঠসাঁকড়ার শিবমন্দিরেই অর্পণ করতে চাই।’
‘আপনি ভূরিশ্রেষ্ঠ’র একচ্ছত্রাধিপ রাজ্ঞী। আপনার ইচ্ছাই আমাদের কাছে আদেশ। কিন্তু এতদিন রাজধানীতে না থাকলে রাজ্যশাসনে যদি কোনও শৈথিল্য দেখা দেয়?’
‘তা কেন হবে? দুর্লভ দত্ত আছেন, চতুর্ভুজ চক্রবর্তী আছেন, আপনি আছেন, ভূপতিকৃষ্ণ আছেন। আপনারা থাকতে আমার ভয় কী?’
সামান্য ইতস্তত করলেন হরিদেব, ‘আপনার কথা যথার্থ মা৷ কিন্তু…আপনি এতদিন রাজ্যছাড়া থাকবেন…আমার অত্যন্ত অস্বস্তি হচ্ছে। আপনি শুধু রানী নন, একজন গৃহকর্ত্রীও বটে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন একজন পরিচারিকা যেমন গৃহিণীর ভূমিকা নিতে পারে না, তেমনই বেতনভুক কর্মচারীরাও রাজ্যের প্রকৃত দায়িত্ব কর্তব্য পালন করতে পারেন না। আপনার অভাব অনুভূত হবে মা।’
‘হলে হোক। কিন্তু আমি অন্তত একটি মাস আমার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত কাষ্ঠসাঁকড়া শিবমন্দিরে থাকতে চাই। কিছু ব্রত আছে, কিছু মানত রক্ষার ব্যাপার আছে।’
‘কিন্তু মা, আপনি তো দেশের পরিস্থিতি জানেন। মানসিংহ বর্ধমান এসে পৌঁছেছেন। ইসমাইল খাঁ’র সেনাপতি ঘিয়াস খাঁ ইতিমধ্যেই তাঁর সৈন্যসামন্ত নৌবহর নিয়ে প্রস্তুত। আমার কাছে সংবাদ আছে মানসিংহ ভাটির পথ ধরে যমুনা বা ইছামতী পার হয়ে যশোর আক্রমণ করবেন, আর ইসলাম খাঁ আক্রমণ করবেন নদীপথে। যে কোনওদিন দক্ষিণবঙ্গে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতে পারে। ওদিকে উসমান খাঁ যে তার পাঠানো পত্রের উত্তর পেয়ে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে আছে, সে অনুমান করাও কষ্টকর নয়। শুনেছি সে যেমন ধূর্ত, তেমনই নৃশংস। তার সঙ্গে প্রতাপের কোনও সন্ধিচুক্তি হওয়াও বিচিত্র নয়। ফলে এই সুযোগে সে যদি ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করে, তাহলে আপনার নেতৃত্ব ছাড়া সে আক্রমণ প্রতিহত করা দুষ্কর হবে মা।’
ভবশঙ্করী বিচিত্র হাসলেন। বললেন, ‘চিন্তা করবেন না গুরুদেব। উসমানের অত স্পর্ধা হবে না। আর মাত্র মাসখানেকের ব্যাপার। ওই সময়টুকুর জন্য আপনারা তো রইলেন।’
হরিদেব অপ্রসন্ন মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। কথাগুলো তাঁর মনঃপূত হয়নি।
চতুর্ভুজ সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘আপনি বিন্দুমাত্র চিন্তা করবেন না রানীমা। আমরা সবাই এখানে রইলাম। আপনি নিশ্চিন্তে ব্রতকর্তব্য পালন করে আসুন।’
ভবশঙ্করীর প্রসন্নমুখে বললেন, ‘আপনার ওপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে সেনাপতিমশাই। আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আপনি এবং দেওয়ানমশাই আমার অভাব অনুভূত হতে দেবেন না।’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হরিদেব, ‘ঠিক আছে মা। আপনার যখন ইচ্ছে হয়েছে তখন গিয়ে থাকুন না হয়। তবে ভূপতিকৃষ্ণ’র অধীনস্থ সৈন্যবাহিনীর একটি অংশ সদা সর্বদা ওই মন্দির এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পাহারা দেবে, এই আদেশ দিন।’
দপ করে জ্বলে উঠল ভবশঙ্করী চোখদুটি, ‘না, একদম না। ভূপতিকৃষ্ণ’র কোনও সাহায্য আমার লাগবে না। আপনার কি আমার যুদ্ধক্ষমতার ওপর বিশ্বাস নেই গুরুদেব? আপনি কী ভাবেন, আমি জানি না কীভাবে নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়?’
হরিদেব অবিবাহিত, নিঃসন্তান৷ এই পরিবারকেই তিনি নিজের পরিবার বলে মনে করে এসেছেন। এই যুবতীকে তিনিই রানী করে এনেছিলেন। তিনি দেখেছেন কীভাবে ধীরে ধীরে এক সাধারণ গ্রাম্য যুবতী ক্রমে নিজের অধিকারে, প্রতিভায়, কর্মদক্ষতায় এই রাজ্যের অবিসংবাদী নেত্রী হয়ে উঠলেন। দেখেছেন, কীভাবে এই নারী নিজেকে আরও দৃঢ় করে তুলেছেন। এই তেজস্বিনী নারীকে তিনি যেমন শ্রদ্ধা করেন, তেমনই অপার স্নেহ। মহারাজের মৃত্যুর পর সেই স্নেহ আরও বর্ধিত হয়েছে।
হরিদেব এও জানেন, ভবশঙ্করী একবার যা করবেন বলে মনস্থ করেন, তা করেই ছাড়েন। তাঁকে বুঝিয়ে সেই সংকল্প থেকে বিচ্যুত করা শিবেরও অসাধ্য। তাই তিনি শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলেন, ‘তাহলে আমি চাই আপনি গড় পাণ্ডুয়ার দুর্গাধ্যক্ষ দীননাথকে আদেশ দিন, তিনি যেন আপনার কাষ্ঠসাঁকড়ায় অবস্থানকালে আপনার সুরক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেন।’
ভবশঙ্করী কিছুক্ষণ ভালোবাসার দৃষ্টিতে রাজপুরোহিতের দিকে চেয়ে রইলেন। তিনি সর্বান্তকরণে জানেন যে এই রাজপ্রাসাদে যদি অন্তত একজনও নিঃস্বার্থভাবে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি এই বৃদ্ধ।
অকস্মাৎ তিনি সশব্দ অট্টহাস্যে ফেটে পড়লেন। এই রাজপ্রাসাদে বহুদিন তাঁকে কেউ এমন পাগলপারা হাসতে দেখেনি। প্রত্যেকে তাঁর দিকে আশ্চর্যান্বিত হয়ে চেয়ে রইলেন।
হাসি থামিয়ে ভবশঙ্করী আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে বললেন, ‘গুরুদেব, গড় পাণ্ডুয়ার দুর্গাধিপতি দীননাথ চৌধুরীকে আমার থেকে বেশি চেনে এমন কেউ ভূরিশ্রেষ্ঠে আছে বলে মনে হয় না। তিনি যদি শোনেন যে তাঁর অধীনে প্রশিক্ষিত কোনও শিষ্য বা শিষ্যার নিরাপত্তার জন্য তাঁকেই নিয়োগ করা হচ্ছে, তাহলে তিনি হয়ত সেই লজ্জাতেই দামোদরে আত্মাহুতি দেবেন। আমি চাই না আমার কাষ্ঠসাঁকড়ার মন্দিরে অবস্থানকালে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সৈন্যবাহিনীর একজনও আমার সুরক্ষায় নিযুক্ত হোক।’
হরিদেব কাতরস্বরে বললেন, ‘তাহলে অন্তত আমার একটি অনুরোধ রাখুন। আপনার সঙ্গিনীদের নিয়ে যান মা, আর দেবী জয়দুর্গার খড়্গটি কখনও কাছছাড়া করবেন না।’
‘যথা আজ্ঞা গুরুদেব।’ প্রণত হলেন রাজ্ঞী ভবশঙ্করী।
রোণ নদীর তীরে সেই ঘন অরণ্য। আজ ফাল্গুনী অমাবস্যা। অমারাত্রির নিকষকালো অন্ধকারে স্থানটি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। আকাশ থেকে কৃষ্ণবর্ণ মেঘের মতো ঘন অন্ধকার চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল অরণ্যে আদিম মহাদ্রুমরাজির শরীর বেয়ে। সেই অন্ধকার, বড় রহস্যময়।
সেই অন্ধকারের মধ্যে মাতৃজঠরে ঘুমিয়ে থাকে শিশুর মতোই দেবী বিদ্যাধরী বিশালাক্ষীর মন্দিরটি ঘুমিয়েছিল আদিম মহাদ্রুমের আশ্রয়ে।
একটু পরে মনে হল অরণ্যের পথে যেন সাড়া জেগেছে৷ প্রথমে অল্প, তারপর উজ্জ্বল আলোর আভাস জেগে উঠল অরণ্যের মধ্যে। দেখা গেল দুজন মানুষ জঙ্গলের পথ ধরে এদিকে এগিয়ে আসছেন।
আলোর আভাস পেয়ে যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠল মন্দিরটি। সেই আদিম বটবৃক্ষটির ঝুরিতে অল্প স্পন্দন জেগে উঠল।
আগন্তুক দুজনের মধ্যে একজনের মাথা সম্পূর্ণ কেশহীন। তাঁর মসৃণ মুণ্ডিতমস্তকে মশালের আলো ঠিকরে পড়ছিল। তাঁর চোখেমুখে ভয়। বোঝা যায়, এত রাতে এমন গহীন অরণ্যে আসার অভ্যাস নেই তাঁর।
তিনি অন্যজনকে প্রশ্ন করলেন, ‘ভুরশুটে কি আর জায়গা ছিল না আলোচনার? এই জঙ্গলের মধ্যেই আসতে হল? সাপখোপ কী না কী আছে…’
অন্যজন হাতের মশালটি মন্দিরের সামনে মাটিতে পুঁতে দিলেন। শান্তস্বরে বললেন, ‘প্রথমত, রানীর আদেশে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র গুপ্তচর বাহিনী এখন আগের থেকে অনেক সতর্ক। কখন কোথায় রানীর চর ঘুরছে সে আমিও জানি না। হতে পারে আমার বসতবাটির ওপরেও এখন নজর রাখা হচ্ছে৷ তাই এই স্থানটিই সবচাইতে বেশি নিরাপদ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে ওই মন্দির।’
মুণ্ডিতমস্তক আগন্তুকটি পায়ে পায়ে মন্দিরের কাছে এগিয়ে এলেন। তারপর ভালো করে নিরীক্ষণ করে বললেন, ‘এমন আশ্চর্য মন্দির তো কখনও দেখিনি আগে৷ দেখে মনে হয় এর অনেক বয়েস। কিন্তু এর মাথায় ছাদ নেই কেন?’
মৃদু হাসলেন অন্যজন। বললেন, ‘হ্যাঁ, অনেক বয়েস মন্দিরের৷ কম করে দেড়শো বছরেরও বেশি পুরোনো। এর মাথায় ছাদ নেই, কারণ যিনি এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, তিনি সদামুক্ত, সদাস্বাধীন, সদাচঞ্চলা। তিনি যেন যখন ইচ্ছা, যেমন ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা সেখানে পরিভ্রমণ করতে পারেন। তাই এই মন্দিরের ছাদ নেই।’
মুণ্ডিতকেশ মানুষটি আরও আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘এমন দেবীর কথা তো কখনও শুনিনি। কে ইনি?’
প্রথমজন ধীরস্বরে বললেন, ‘ইনি বৌদ্ধতন্ত্রের অন্যতম শক্তিশালী দেবী বজ্রযোগিনীর একটি বিশেষ রূপ। এই রূপের নাম বিদ্যাধরী। দেবী বজ্রযোগিনীর বিদ্যাধরী রূপের মূল ভাবটি হল মহারাগ। এই মহারাগ হল এমন এক অনুভূতি যা স্বার্থপরতা ও মায়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে সকল সাধকের জাগতিক অনুভূতি অত্যন্ত প্রবল, দেবী বিদ্যাধরী সেই সাধকের সমস্ত অনুভূতিগুলিকে বুদ্ধসুলভ গুণাবলিতে রূপান্তরিত করেন। দেবী একজন অনুত্তরযোগতন্ত্র ইষ্টদেবতা। ইনি সর্ববুদ্ধডাকিনী নামেও পরিচিতা। তার অর্থ সকল বুদ্ধের সার।’
মুণ্ডিতকেশ মানুষটি দেবীর উদ্দেশে প্রণাম করলেন। তারপর বললেন, ‘সবই তো বুঝলাম। কিন্তু আলোচনার জন্য এখানে আসার উদ্দেশ্যটা বুঝলাম না।’
অন্য মানুষটি সামান্য হাসলেন, ‘সে অনেক পুরোনো গল্প পীতমুণ্ডি। এখন সেসব বলার সময় নয়। শুধু জেনে রাখো, এই অঞ্চলের প্রকৃত অধিকারী ছিলেন শনিভাঙড় নামের এক বাগদী রাজা। তাঁকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে তাঁরই পালিতপুত্র এই ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজ্য দখল করেন। আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন শনিভাঙড়ের গুরুদেব। এই মন্দির তাঁরই প্রতিষ্ঠিত। তাঁকে অত্যন্ত অন্যায্যভাবে এই মন্দির থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল।
‘আমি শনিভাঙড়ের সেই বিতাড়িত গুরুদেবের উত্তরাধিকারী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের মধ্যে এই ভাবনা চারিয়ে দেওয়া হয়েছে যে সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে হবে। একদিন না একদিন আমাদের সামনে সুযোগ আসবে, সেই অন্যায়ের উপযুক্ত উত্তর দেওয়ার নেওয়ার। সেদিন যেন কেউ তার কর্তব্যকর্ম থেকে বিচ্যুত না হয়।
‘‘আজ, এই দেড়শো বছর পরে সেই সু্যোগ এসেছে। সুযোগ এসেছে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র এই অবৈধ রাজবংশকে সমূল উৎসাদনের৷ তাই তোমাকে এখানে ডেকে আনা। আমি চাই, সেই পুণ্যকর্মের সূচনা আমার পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরের সামনেই হোক।’
পীতমুণ্ডি তার মুণ্ডখানি হেলিয়ে দিয়ে বলল, ‘তাই হবে। বলুন, কী আদেশ।’
‘হ্যাঁ, যা বলব মন দিয়ে শোনো। আজ থেকে এক মাস পর মহাশিবরাত্রি। সেদিন মহারানী ব্রত উদযাপনের জন্য কাষ্ঠসাঁকড়ার মন্দিরে অধিষ্ঠান করবেন। তাঁর সঙ্গে কোনও প্রহরী বা সৈন্যদল থাকবে না, তাঁর কয়েকজন সঙ্গিনী ছাড়া। উসমান খাঁ’কে গিয়ে বলো, এই হচ্ছে ভূরিশ্রেষ্ঠ অধিকার করার সুবর্ণ সুযোগ।’
পীতমুণ্ডি সাগ্রহে বলল, ‘তাহলে খাঁ’সাহেবকে বলি কালই সৈন্যসামন্ত নিয়ে ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করতে?’
প্রথমজন খানিক স্থির চোখে চেয়ে রইলেন তারপর পীতমুণ্ডির দিকে। তারপর তিক্তস্বরে বললেন, ‘মাথার চুলের সঙ্গে কি তোমার বুদ্ধিও ঝরে পড়ে গেছে? তোমার কী ধারণা, রানীমা মন্দিরে ব্রতপালনে গেছেন বলে রাজ্য সম্পূর্ণ অরক্ষিত? উসমান খাঁ আক্রমণ করা মাত্র ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সৈন্যদল অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে বসে থাকবে?’
পীতমুণ্ডি অপ্রতিভ কণ্ঠে বলল, ‘না, তা নয়। তবে রানীমা যখন রাজধানীতে নেই, তখন সৈন্যসামন্তরাও নিশ্চয়ই প্রহরায় একটু ঢিলেমি…’
‘ঠিক তার বিপরীত। রাজ্যের সৈন্যসামন্ত সেনাপতিরা সবাই এখন অতিরিক্ত সতর্ক। উসমান খাঁ’য়ের দলের টিকি দেখা মাত্র ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সমস্ত সৈন্যবাহিনী রে-রে করে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপর। আর সুশিক্ষিত পারাবতদল এই সংবাদ রানীমার কাছে পৌঁছতে অর্ধদণ্ডের বেশি সময় নেবে না। কাষ্ঠসাঁকড়া থেকে গড় ভবানীপুর মাত্র অর্ধদিবসের পথ। রানীমা একবার যদি তাঁর অজেয় খড়্গ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তাহলে কিন্তু খাঁ সাহেবের শরীরের একটি টুকরোও কবরস্থ করার জন্য খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
‘আপনি কি উসমান খাঁ’য়ের বীরত্বে সন্দেহ প্রকাশ করছেন?’
প্রথমজন ক্রোধমিশ্রিত কৌতুকের সঙ্গে পীতমুণ্ডির দিকে চেয়ে রইলেন, তারপর বললেন, ‘তুমি উসমান খাঁ’এর পোষ্য সিন্ধুকী হতে পারো পীতমুণ্ডি। নিজের অন্নদাতা প্রভুর প্রতি তোমার আনুগত্যও প্রশংসনীয়। কিন্তু এই নারীকে আমি তোমার চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি চিনি৷ ভবশঙ্করীর সামনে দাঁড়াবার সৌভাগ্য তোমার বোধহয় হয়নি। আমার ধারণা ওঁর সামনে দাঁড়ালে তুমি রাজসভাতেই প্রস্রাব করে ফেলবে।’
পীতমুণ্ডি হেঁ-হেঁ করে হাসল। তার পেশা হিন্দু নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে, কৌশলে বা শক্তিপ্রয়োগে পাঠান আফগানদের অঙ্কশায়িনী করা। এই অপমান গায়েই মাখল না সে৷ প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু, আপনি তো ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সৈন্যবাহিনীর একপ্রকার অধিনায়ক। আপনি যদি আপনার সৈন্যবাহিনীকে সক্রিয় হওয়ার আদেশ না দেন তাহলে তো প্রতিরোধের প্রশ্নই ওঠে না।’
‘তোমার কী হয়েছে পীতমুণ্ডি? বিষমেহ নাকি উপদংশ?’
পীতমুণ্ডি হকচকিয়ে গেল, ‘কেন প্রভু?’
‘শুনেছি এসব রোগে বুদ্ধিভ্রংশ হয় কি না, তাই জিগ্যেস করছি। তোমার কী ধারণা, তোমার প্রভু ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করা মাত্র আমি সদলবলে তার দলে যোগ দেব? আমি কি তোমার মতো নপুংসক বীট? বরং আমিই সর্বাগ্রে অস্ত্রধারণ করে উসমানের দলবলের সম্মুখীন হব, যাতে আমার দিকে কেউ সন্দেহের আঙুল না তুলতে পারে।’
পীতমুণ্ডি বিরসবদনে প্রশ্ন করল, ‘তাহলে উপায়টা কী?’
‘গড় মান্দারণের ধ্বংসাবশেষ থেকে কাষ্ঠসাঁকড়া অবধি পৌঁছনোর একটি গোপন পথ আছে। তার সংবাদ কেউ রাখে না। শুধু আমার কিছু বিশ্বস্ত অনুচর ছাড়া। তারা সেই পথ উসমানকে চিনিয়ে দেবে। উসমান খাঁ যেন অত্যন্ত গোপনে, অতি সন্তর্পণে অল্প কয়েকজন অনুচর নিয়ে রাত্রের মধ্যে কাষ্ঠসাঁকড়া পৌঁছবে। আজ থেকে আর চৌদ্দদিন পর পূর্ণিমা। সেই রাত্রে রানীমা একাকী পূজায় বসবেন। যদি সেই রাতে উসমান ভবশঙ্করীকে বন্দী করতে পারে, তাহলে ভূরিশ্রেষ্ঠ তার পদানত হতে কয়েকদিনের বেশি সময় লাগবে না।’
মশালের নিভন্ত আলোয় পীতমুণ্ডির মুখে ঔজ্জ্বল্য ফুটে উঠল। একগাল হেসে বলল, ‘খাঁ সাহেব ভবশঙ্করীকে শয্যাসঙ্গিনী করার জন্য বড়ই উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন। সফল হলে প্রচুর ধনরত্ন তো পাবই, এমনকী অগ্রিম হিসেবে কয়েকটি রৌপ্যমুদ্রাও দিয়েছেন। দেখবেন?’
এই বলে পীতমুণ্ডি তার মুষ্ঠি খুলে ধরল। ম্লান আলোয় তেরোটি মলিন রৌপ্যমুদ্রা খিলখিল করে হেসে উঠল।
আমতা গ্রামের সাপ্তাহিক হাট বসে বৃহস্পতিবার। আমতা অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু গ্রাম। নদীপথে সহজেই আসা যায়। তাছাড়া রুদ্রনারায়ণ এই গ্রাম থেকে নবদ্বীপ এবং বর্ধমান যাওয়ার সুগম পথ নির্মাণ করিয়েছিলেন। তাই বৃহস্পতিবার হাটটি বাণিজ্যবিপণি এবং লোকসমাগমে পরিপূর্ণ থাকে।
হাটের একপ্রান্তে একটি খোড়ো ছাউনি দেওয়া বিপণি। সেখানে জনৈক ব্যাপারী, দই, চিঁড়া এবং বিভিন্ন ফলমূলাদি নিয়ে বসে। সেই বিপণির সামনে বারোজন সন্ন্যাসী ফলার কিনে গোগ্রাসে খাচ্ছিলেন।
ব্যাপারী আড়চোখে বার বার তাকাচ্ছিল এই দলটির দিকে৷ জীবনে সাধু সন্ন্যাসী সে কম দেখেনি। কিন্তু এরকম সন্ন্যাসীর দল এই প্রথমবার তার নজরে পড়ল।
প্রথমত দলের প্রত্যেকে বিশাল আকৃতির অধিকারী। তাদের বাহু এবং কাঁধের বিপুল পেশি আর দেহের উন্মুক্ত স্থানে ক্ষতচিহ্ন দেখে বোঝা দায়, এরা সন্ন্যাসী না যোদ্ধা। দ্বিতীয়ত, তাদের সদা সতর্ক চোখের চাউনি৷ শীতল, চোখগুলো সতর্কভাবে ঘুরছে। তৃতীয়ত, তাদের গৈরিক বসন, রুদ্রাক্ষের মালা, পাদুকা, সবই সদ্য কেনা হয়েছে৷
সবচাইতে বড় সন্দেহের ব্যাপার হচ্ছে যে এদের মধ্যে একজন ছাড়া কেউ কোনও কথা বলছে না। না ব্যাপারীর সঙ্গে, না নিজেদের মধ্যে। একমাত্র যে কথা বলছে, তার মাথায় একটিও চুল নেই। এমন মসৃণ, চকচকে ইন্দ্রলুপ্ত কমই দেখেছে ব্যাপারী৷ তার ওপর সেই কেশবিহীন মুণ্ডটি অস্বাভাবিক রকমের পীতবর্ণ।
পীতবর্ণ মুণ্ডিতমস্তক মানুষটি ফলার খাওয়া শেষ হলে মুখ প্রক্ষালন করে ভারি মিষ্টস্বরে ব্যাপারীকে বলল, ‘বড় ভালো খেলাম ভাই। তোমার দোকানের দই, চিঁড়া, গুড় সবই অতি উৎকৃষ্ট। ফলফলাদির তো কথাই নেই৷ এবার বলো তো দেখি, এর জন্য ক’টি কড়ি দিতে হবে?’
ব্যাপারী মনের ভাব গোপন রেখে বিনীতভাবে বলল, ‘বারো জনের জন্যে বারো কড়িই যথেষ্ঠ সন্ন্যাসীঠাকুর।’
পীতবর্ণ শুনে প্রসন্ন হল। কোমরের গেঁজ থেকে ক’টি কড়ি বার করে ব্যাপারীর হাতে দিয়ে বললেন, ‘তুমি সৎ ব্যবসায়ী গো ব্যাপারী। এই নাও তোমার প্রাপ্য।’
এই বলে ব্যাপারীর হাতে বারোটি কড়ি গুণে দিয়ে সেই মুণ্ডিতকেশ সন্ন্যাসী বাকি একাদশ সঙ্গীকে নিয়ে চলে গেল। কিন্তু সে খেয়াল করল না, অসাবধানে তার কোমরের গেঁজ থেকে আরও একটি জিনিস মাটিতে পড়ে গেল।
ওরা চলে গেলে এদিক-ওদিক তাকাল ব্যাপারী। তারপর সে মাটিতে পড়ে থাকা ক্ষুদ্র বস্তুটি তুলে নিল। দেখল, সেটি একটি রৌপ্যমুদ্রা। তার দুদিকে আরবি হরফে কী যেন লেখা।
ব্যাপারী দ্রুত তার বিপণির ঝাঁপ বন্ধ করল। তার গোবাহিত শকটটি বিপণির পিছনেই রাখা। বাহক গরুদুটি নিশ্চিন্ত মনে ঘাস চিবোচ্ছিল। তাদের শকটে যুক্ত করে কশাঘাত করে চাপা স্বরে আদেশ দিল ব্যাপারী, ‘কিশোরী, বিনোদী, দৌড়ো, জোরে দৌড়ো। যে করেই হোক বিকেলের আগে গড় পাণ্ডুয়া পৌঁছতে হবে।’
আজ ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী। আজ মহাশিবরাত্রি।
সকাল থেকেই ব্যস্ত রাজ্ঞী ভবশঙ্করী। তাঁর একান্ত অনুগত পরিচারিকাদের দল তাঁকে পূজার আয়োজনে সাহায্য করছে। সকাল থেকে মন্দির প্রাঙ্গণ গঙ্গাজলে ধৌত করা হয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গণ ফুলের মালায় সজ্জিত। মন্দিরের একপাশের ফলের স্তূপ, কাঁচা দুধ আর গঙ্গাজলের কলস রাখা।
আজ মহাদেব এবং দেবী পার্বতীর বিবাহতিথি। উদ্ভিন্নযৌবনা হৈমবতী যেমন প্রায় প্রৌঢ় মহেশ্বরকে নিজের স্বামীরূপে স্বীকার করেছিলেন, তেমনই তিনি যৌবনের শেষপ্রান্তে উপনীত রুদ্রনারায়ণ রায়মুখুটিকে বরণ করেছিলেন নিজের পতিত্বে। অর্থ নয়, রাজত্ব নয়, প্রতিপত্তি নয়, মহারাজের বীর্যবত্তাই তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
পুজোর আয়োজন করতে করতে চোখে জল চলে এল ভবশঙ্করীর। আহা, তাঁর জন্মজন্মান্তরের সৌভাগ্য যে অমন মহাবীর এবং স্নেহময় পুরুষকে নিজের পতিরূপে পেয়েছিলেন তিনি।
প্রেম, স্নেহ, শৌর্য, সবেতেই অদ্বিতীয় ছিলেন রুদ্রনারায়ণ। ভবশঙ্করীকে কোনওদিন কোনও কিছুতে মানা করেননি, সমস্ত কর্মে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে বলতেন। ভবশঙ্করী যখন প্রশ্ন করতেন, ‘আপনি কি আমাকে স্বাধীনভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন?’
তখন রুদ্রনারায়ণ হেসে বলতেন, ‘যদি আমি অনুমতিই দেব, তাহলে এই সিদ্ধান্ত আর তোমার স্বাধীন সিদ্ধান্ত কী করে হয় শঙ্করী? নিজের বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নাও। তুমি আমার ধর্মপত্নী, দাসী নও।’
দু’ফোঁটা চোখের জল নেমে এল ভবশঙ্করীর গাল বেয়ে। মনে মনে বললেন, ‘হে মহেশ্বর, হে দেবাদিদেব, জগতের কোনও কিছুই তোমার কাছে অবিদিত নয়। প্রার্থনা করি জনমে জনমে যেন ওঁকেই স্বামী রূপে পাই।’
এমন সময় ওলাই আর বেতাই এসে সামনে দাঁড়াল। দ্রুত শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছে নিলেন ভবশঙ্করী। প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে? তোরা এখানে কেন?’
ওলাই বলল, ‘খুড়োমশাই এসেছেন। তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।’
ভ্রুকুঞ্চন করলেন ভবশঙ্করী, ‘তোর আবার খুড়োমশাই কবে ছিল ওলাই? তোর তো তিনকূলে কেউ নেই বলেই শুনেছিলাম। খুড়োমশাই আবার এলেন কোথা থেকে?’
বেতাই নিস্পৃহস্বরে বলল, ‘পেঁড়োর গড়ের কোতোয়ালকে আমরা খুড়ো বলেই ডাকি। সে যদি তোমার মনে না থাকে তো সে তোমার দোষ।’
ভবশঙ্করীর হাত কেঁপে গেল। তিনি দ্রুত আঁচলে হাত মুছে ধড়মড় করে উঠে বসলেন। তারপর প্রায় দৌড়েই গেলেন মন্দিরের দরজার বাইরে।
দীননাথ প্রৌঢ় হয়েছেন বটে তবে তাঁর বলিষ্ঠ শরীরে তার ছাপ পড়েনি। নিজের কন্যাকে উদগ্র হয়ে দৌড়ে আসতে দেখে তাঁর হাতে ধরা ভল্লটি সামান্য কেঁপে গেল। তারপর তিনি রাজোপযুক্ত ভব্যতার সঙ্গে প্রণত হয়ে বললেন, ‘ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মহারানীকে গড় পাণ্ডুয়ার দুর্গাধ্যক্ষ দীননাথ চৌধুরীর প্রণাম।’
থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন ভবশঙ্করী৷ তাঁর ইচ্ছে করছিল সমস্ত রাজকীয় আচার বিসর্জন দিয়ে পিতার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে৷ কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলালেন। আঁচল দিয়ে উদগত অশ্রু মুছে আবেগকম্পিতস্বরে বললেন, ‘বলুন দুর্গাধিপ, এখানে আপনার আগমনের হেতু কী।’
দীননাথ চৌধুরী একটি রৌপ্যমুদ্রা ভবশঙ্করীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আজ আমতার সাপ্তাহিক হাটে এমন বারোজন সন্ন্যাসীকে দেখা গেছে যাদের আচার-আচরণ অতীব সন্দেহজনক। তাদের একজনের হাত থেকে এই রৌপ্যমুদ্রাটি মাটিতে পড়ে গেছিল। আমার একজন চেনা লোক এটি আমাকে দিয়ে গেছে। দেখলেই বুঝবেন যে এ কোতলু খাঁ’র রৌপ্যমুদ্রা।’
মুহূর্তের মধ্যে ভবশঙ্করীর সমস্ত আবেগ এবং আবেশ অন্তর্হিত হল। তিনি মুদ্রাটির দিকে পলক চেয়ে কঠিনস্বরে বললেন, ‘এর অর্থ কী?’
‘এর অর্থ উসমান খাঁ’এর বেশ কিছু অনুচর সন্ন্যাসীর ভেক ধরে ভূরিশ্রেষ্ঠে অনুপ্রবেশ করেছে।’
‘বেশ। এই সংবাদ আপনি ভূপতিকৃষ্ণকে জানিয়েছেন? বা চতুর্ভুজ চক্রবর্তীকে?’
দীননাথ চুপ করে রইলেন। ভবশঙ্করী দেখলেন তাঁর মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর।
‘বুঝেছি। জানাননি। তার কারণ জানতে পারি?’
‘সমগ্র ভূরিশ্রেষ্ঠ এখন কঠিন প্রহরার বেড়াজালে আবদ্ধ। গড় ভবানীপুর আর গড় পাণ্ডুয়া, দুই জায়গাই ঘিরে ফেলা হয়েছে বাছাই করা সৈন্যদল দিয়ে। স্থলপথ হোক বা জলপথ, ভূরিশ্রেষ্ঠতে ঢোকার এমন কোনও পথ নেই যেখানে সশস্ত্র সেনাচৌকি বসানো হয়নি। প্রতিটি যাত্রীকে, সে ভিখিরিই হোক বা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, তাকে ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ না করে ভূরিশ্রেষ্ঠতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না৷ এই লৌহকঠিন প্রহরা এড়িয়ে এরা আমতা অবধি পৌঁছল কী করে?’
‘এ প্রশ্নের উত্তর তো ভূপতিকৃষ্ণ বা চতুর্ভুজই দিতে পারবেন। আপনি ওঁদের জানাননি কেন?’
ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন দীননাথ, ‘নিশ্চয়ই ভূরিশ্রেষ্ঠতে প্রবেশের এমন কোনও গোপন পথ আছে যা আমাদের অজানা। এমন পথের সংবাদ একমাত্র তিনিই জানতে পারেন যিনি এই রাজ্যের সমস্ত কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানেন, এবং সেই পথ শত্রুপক্ষকে চিনিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারেন। এত সাহস কোনও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ছাড়া অন্য কারোর হওয়া অসম্ভব। আমি জানি না ভূরিশ্রেষ্ঠ’র উচ্চতম রাজন্যবর্গের মধ্যে কে সেই বিভীষণ। যতক্ষণ আমি এই বিষয়ে নিঃসন্দেহ না হচ্ছি, ততক্ষণ আমি এই সংবাদ কাউকে দিতে চাই না।’
ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবলেন ভবশঙ্করী। বললেন, ‘আচ্ছা। তাহলে আপনি কী আশঙ্কা করছেন? এই বারোজন সন্ন্যাসীবেশী পাঠান ভূরিশ্রেষ্ঠ অধিকার করবে? এদের শায়েস্তা করতে তো গড় পাণ্ডুয়া বা গড় ভবানীপুরের সাধারণ দ্বাররক্ষীরাই যথেষ্ট।’
‘আমার ধারণা, এরা শুধু পথপ্রদর্শক। এদের সঙ্গে আরও বেশ কিছু সৈন্যসামন্ত আশেপাশে গা ঢাকা দিয়ে আছে। আজ রাতে আমি একটা আক্রমণের আশঙ্কা করছি। আর সেই আক্রমণ পাণ্ডুয়া বা ভবানীপুর দুর্গের ওপর হবে না।’
‘কোথায় হবে?’
‘কাষ্ঠসাঁকড়ার শিবমন্দিরে। যেখানে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রানী সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় বসবাস করছেন। তাঁকে বন্দিনী করতে পারলেই উসমান খাঁ’র উদ্দেশ্য সফল।’
ভবশঙ্করী মুহূর্তে বুঝলেন, দীননাথের উদ্বিগ্ন হয়ে এখানে দৌড়ে আসার কারণ। শুধুমাত্র রাজকর্তব্য নয়, তাঁকে টেনে এনেছে পিতার উদ্বিগ্ন হৃদয়।
ভবশঙ্করী বললেন, ‘পাণ্ডুয়ার দুর্গাধ্যক্ষ নিশ্চয়ই তাঁর প্রিয়তম শিষ্যার যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে সম্যকরূপ অবগত। তাছাড়া আমি একা নই। আমার প্রিয় পাঁচ সঙ্গিনীও উপস্থিত। তাদের সমরনৈপুণ্য নিয়েও নিশ্চয়ই আপনার মনে কোনও সন্দেহ নেই।’
‘আজ্ঞে না মহারানী। আপনার বা আপনার সঙ্গিনীদের যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই। শুধু মনে করিয়ে দিই, পাণ্ডুয়ার দুর্গাধ্যক্ষ তাঁর প্রিয়তম শিষ্যাকে শুধু যুদ্ধবিদ্যা নয়, সামরিক কৌশলও শিখিয়েছিলেন। যে কোনও যোদ্ধার সমর কৌশলের প্রথম নীতিই হচ্ছে নিজের ক্ষমতাকে বড় করে, এবং শত্রুর ক্ষমতাকে খাটো করে না দেখা।’
মাথা নাড়লেন ভবশঙ্করী, ‘হ্যাঁ সত্য কথা বটে। কিন্তু এখন আপনি কী চাইছেন?’
‘আমি চাইছি আক্রমণ হোক। আপনার আদেশ অনুসারে পাণ্ডুয়ার সমস্ত যুবতীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধ বিদ্যায় নিপুণ করে তোলা হয়েছে৷ তাদের মধ্যে বাছাই করা পঞ্চাশ জন এখানে সাধারণ ব্রতচারিণীর বেশে থাকুক। বেশবাস দেখে মনে হবে তারা যেন পুজো দিতে এসেছে। বেতাই, মঙ্গলা, জয়া, মকর আর ওলাই, প্রত্যেকের অধীনে দশ জন করে থাকবে। আমি আমার বিশ্বস্ত সৈন্যদল নিয়ে কিছু দূরে সমগ্র পরিস্থিতির উপর নজর রাখব। আপনাদের যুদ্ধক্ষমতার ওপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে। কিন্তু যদি দেখি পরিস্থিতি প্রতিকূল, তাহলে আসরে অবতীর্ণ হওয়া ছাড়া আমার উপায় থাকবে না।’
ভবশঙ্করী বললেন, ‘আমি যদি আপনার এই পরিকল্পনা অনুমোদন না করি? আপনাকে এসব থেকে দূরে থাকার আদেশ দিই?’
‘সেক্ষেত্রে আমি এই মুহূর্তেই পাণ্ডুয়ার দুর্গাধ্যক্ষর পদ থেকে পদত্যাগ করব৷ আপনি গড় পাণ্ডুয়ার দুর্গাধিপকে আপনার আদেশ মানতে বাধ্য করতে পারেন, কারণ তিনি আপনার বেতনভুক ভৃত্য। কিন্তু স্বাধীন দীননাথ চৌধুরীকে নয়। দীননাথ চৌধুরী সেটাই করবে, যেটা সে উচিত মনে করে।’
হেসে ফেললেন ভবশঙ্করী। স্বভাবে তিনি তাঁর পিতার অবিকল প্রতিচ্ছবি। তাঁর দুর্জয় সাহস আর অনমনীয় জেদ, দুটিই তিনি পিতার থেকে পেয়েছেন। দীননাথ চৌধুরীর কথার নড়চড় হয় না।
‘বেশ। তবে তাই হোক।’
পূর্ণিমার রাত। পূজায় বসেছিলেন ভবশঙ্করী।
পুজো তখন মধ্যপথে। ভবশঙ্করী গম্ভীরস্বরে আবৃত্তি করছেন, ‘প্রভুং প্রাণনাথং বিভুং বিশ্বনাথং জগন্নাথনাথং সদানন্দভাজম্! ভবদ্ভব্যভূতেশ্বরং ভূতনাথং শিবং শঙ্করং শম্ভুমীশানমীডে…গলে মুণ্ডমালং তনৌ সর্পজালং মহাকালকালং গণেশাধিপালম্…জটাজূটগঙ্গোত্তরঙ্গৈর্বিশালং শিবং শঙ্করং শম্ভুমীশানমীডে…’
মন্দিরের মধ্যে কেউ নেই। সমস্ত প্রাঙ্গণ শুনশান। ভবশঙ্করীর স্তোত্রপাঠ ছাড়া আর কোথাও কোনও শব্দ নেই।
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নিঃসাড়ে এগিয়ে আসছিল ওরা। কম করে সত্তরজন। প্রত্যেকের শরীর, মাথা এবং মুখ কালো কাপড়ে আবৃত। শ্বাপদসুলভ ক্ষিপ্র অথচ সতর্ক পদক্ষেপে নিঃশব্দ ঘাতকের মতো এগিয়ে আসছিল।
মন্দিরের কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়াল দলটি। দলপতি একজনকে আদেশ দিল, ‘গিয়ে দেখে আয়, কজন আছে৷’
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল মন্দিরের দিকে। মানুষটি দাঁড়াল মন্দির প্রাচীরের এপাশে। ওপাশে একটি বড় আমগাছ। বিড়ালের মতো লাফিয়ে উঠল মানুষটি প্রাচীরের ওপর। তারপর সতর্ক চোখে চতুর্দিকে জরিপ করতে লাগল।
খানিক পর প্রাচীর থেকে নেমে দাঁড়াল সে। তারপর নিচু হয়ে দৌড়ে ফিরে এল দলপতির কাছে, ‘কেউ নেই মালিক। শুধু একজন জেনানা বসে আছে মন্দিরের মধ্যে।’
দলপতির কপালে ভাঁজ পড়ল, ‘আশ্চর্যের ব্যাপার! সৈন্যসামন্ত না থাক, অন্তত পুজো দিতে অন্য জেনানারা তো থাকবে। কী বলো পীতমুণ্ডি?’
পীতমুণ্ডি চিন্তিতস্বরে বলল, ‘ঠিক কথাই বলছেন খাঁ সাহেব। আজ শিবরাত্রি, এখন তো মন্দির মেয়েদের ভিড়ে ভিড়াক্কার থাকার কথা। তার ওপর স্বয়ং রানীমা যখন উপস্থিত আছেন, মন্দির তো জনশূন্য থাকার কথা নয়।’
উসমান খাঁ খানিক কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘এমন কি
হতে পারে যে পুজোর সময় হয়নি বলে বাকি জেনানারা এখনও আসেনি?’
‘কিন্তু হলেও মন্দির প্রাঙ্গণ ফাঁকা থাকার কথা নয়। স্বাভাবিক অবস্থায় এখন এখানে পুজোর ডালা হাতে প্রচুর সধবা পুরনারীদের অপেক্ষা করার কথা। আমি তো ভাবছিলাম যে আজ এখানে হামলা করে শুধু রানীমা কেন, আপনি আপনার পুরো ফৌজের শখ মেটাবার জন্য যত ইচ্ছে কাফের বউদের গনীমাহ’র মালের মতো তুলে নিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু এখন তো দেখছি ব্যাপার অন্যরকম।’
উসমান খাঁ বললেন, ‘হুম! আমার তো এবার সন্দেহ হচ্ছে সব ঠিকঠাক আছে কী না। কী হে পীতমুণ্ডি, আমরা কি তাহলে ফিরেই যাই নাকি? যাওয়ার আগে অবশ্য তোমার মুণ্ডুটা কেটে রেখে যাব, রাস্তার খোঁজ যখন পেয়েই গেছি।’
পীতমুণ্ডির শিরদাঁড়া দিয়ে সামান্য হিমস্রোত বয়ে গেল। তবে সে ঘাবড়াল না। পীতমুণ্ডি অনেক দিনের অভিজ্ঞ সিন্ধুকী, উসমান খাঁ’য়ের বহু কুকর্মে সে সাহায্য করে চলেছে। এমন অনেক হুমকি শুনেছে বহুবার। সে বলল, ‘সে কী! এতেই ভয় পেয়ে গেলেন নাকি? আপনি তো জানেন, এখন এখানে শুধু জেনানা! কোনও পুরুষ নেই। সেই জেনানারা কেন এসে পৌঁছয়নি সেটা অবশ্য ভেবে দেখতে হবে। আমার মনে হয়, সবাই এখন মন্দিরের পিছনে নদীর ঘাট থেকে জল তুলে আনতে গেছে শিবলিঙ্গের মাথায় ঢালবে বলে। আমি বলব, এই সুযোগ। এখনই হামলা করুন। বাকি জেনানাদের ধরে আনতে আপনার সৈন্যদের একটু বেশি কষ্ট হবে, এই যা।’
‘বলছ?’
‘বলছি।’
শিবলিঙ্গের ওপর সোনার উপবীত পরাতে পরাতেই গোলযোগের শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন ভবশঙ্করী। যাক, ওরা এসে গেছে তাহলে। প্রণাম সেরে নিজের জয়দুর্গাদত্ত খড়্গটি হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
আগন্তুকের দল মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকেই চিৎকার করে উঠল, ‘আল্লাহু আকবর।’
কেউ সাড়া দিল না। কিছুক্ষণ নিঃশব্দ বাতাস বয়ে গেল শুধু। তারপর মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে একা ভবশঙ্করী তাঁর খড়্গ নিয়ে এসে দাঁড়ালেন।
দাঁতে দাঁত ঘষলেন উসমান খাঁ। এই তাহলে সেই বদতমিজ খুবসুরত অওরাত। আঃ! তাঁর পুরুষাঙ্গ উত্থিত হতে শুরু করল। আজ সারা রাত আগে তিনি, তারপর তাঁর সৈন্যদল।
উসমান খাঁ আদেশ দিলেন, ‘যা! রেণ্ডিটাকে ধরে চুলের মুঠি ধরে এখানে নিয়ে আয়। এই অওরাত আজ রাতের জন্য সবার।’
উত্তেজিত দুজন সৈন্য খালি হাতেই ছুটে গেল ভবশঙ্করীর দিকে।
ভবশঙ্করী নিশ্চুপ। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর শরীর সামান্যতম কম্পনও দেখা গেল না। শুধু চোখের কোণদুটি সামান্য আরক্ত হয়ে উঠল।
সৈন্য দুজন হুঙ্কার দিয়ে বলল, ‘কী রে কুত্তি? নিজে যাবি, নাকি চুলের মুঠি ধরে…’
মূহূর্তে ভবশঙ্করীর ডানহাতটি অর্ধবৃত্তাকারে সামান্য উত্থিত হয়ে ভূমির সমান্তরালে চালিত হল। দুটি মুণ্ড গড়িয়ে গেল কিছুদূর। মস্তকবিহীন ধড়দুটি দাঁড়িয়ে রইল কয়েকমুহূর্ত, তারপর ধপ করে পড়ে গেল মাটিতে৷ ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসছে রক্তের স্রোত।
উসমান খাঁ মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তারপর চিৎকার করে আদেশ দিলেন, ‘আরে! দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? ওই কসবি অওরাতটাকে ধরে নিয়ে আয়।’
বাকি সৈন্যরা দৌড়তে যাবে এমন সময় আশ্চর্য ঘটনা ঘটল।
মন্দির প্রাঙ্গণে কয়েকটি গাছ ছিল। সহসা মনে হল, গাছের শাখায় শাখায় যেন ঝড় উঠেছে। উসমান খাঁ আর তার দলবল একবার মাথা তুলে তাকাল ওপরে। তারপর তারা যা দেখল, তেমন দৃশ্য তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
তাদের বিহ্বল চোখের সামনে এক এক করে নারী নেমে আসতে লাগল মাটিতে। উসমান খাঁ’য়ের মনে হল যেন হাওয়ায় ভর দিয়ে উড়ে আসছে ওরা, ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো। তাদের পরনে শাড়ি, হাতে উন্মুক্ত তরবারি, আরক্ত চক্ষু, চুল উড়ছে ডাকিনীর মতো।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে উসমানের খাঁয়ের দলকে ঘিরে দাঁড়াল। তারপর চারিদিক প্রকম্পিত করে চিৎকার করে উঠল, ‘জয় ভবানী, জয় শিবানী।’
প্রথম আঘাত হানলেন ভবশঙ্করীর পাঁচ মুখ্য সহচরী। পাঁচটি ছিন্ন মুণ্ড ছিটকে পড়ল মাটিতে।
আকস্মিক আক্রমণ সামলে ঘুরে দাঁড়াল পাঠানসেনা। তারাও মহাবীর। তাদের ভয়ে স্বয়ং মোগল সাম্রাজ্য কম্পমান। তারাও হুঙ্কার দিয়ে কোষমুক্ত করল তাদের তরবারি। অস্ত্রের ঝনঝনানি, রণহুঙ্কার আর আর্তনাদের শব্দে ভরে উঠল চারিদিক।
উসমান খাঁ’য়ের পাঠান রক্ত মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। তিনি তাঁর অসি নিষ্কাষিত করে ধাবিত হলেন ভবশঙ্করীর দিকে।
উসমানের অসির প্রথম আঘাত অবলীলায় প্রতিহত করলেন ভবশঙ্করী। উসমান বুঝলেন, ইনি সহজ নারী নন।
তিনি এবার পিছিয়ে গেলেন। তারপর উন্মুক্ত অসিহস্তে আবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর।
এইবার ভবশঙ্করী খড়্গহস্তে পূর্ণরূপে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। ক্ষিপ্র এবং ক্ষিপ্ত বাঘিনী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বার বার ঝলসে উঠল তাঁর খড়্গ। উসমান খাঁ আগে আক্রমণ করছিলেন, এবার প্রতিরোধে যেতে বাধ্য হলেন। তিনি বুঝে গেছেন, এই নারী শারীরিক শক্তিতে তাঁর থেকে ন্যূন হলে কী হবে, ক্ষিপ্রতা এবং তরবারি চালনায় তাঁর তুলনায় বহুগুণ কুশলী। তিনি ক্রমেই পিছোতে লাগলেন।
আক্রমণ ঠেকাতে ঠেকাতে এক পর্যায়ে ভবশঙ্করীর এক লাথিতে মন্দিরের প্রায় দ্বারপ্রান্তে এসে ছিটকে পড়লেন উসমান। তখন তাঁর সারা শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। পোশাক ছিন্নবিচ্ছিন্ন। বাম বাহুর ক্ষত এতই গভীর যে মনে হচ্ছে যে কোনও মুহূর্তে বাহুটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
মন্দিরের দ্বার ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন উসমান। চারিদিকে তাকালেন। তাঁর সত্তরজন সৈন্যদের প্রায় সবাই হয় মৃত বা মারাত্মক আহত। জনা পাঁচেক এখনও লড়ে যাচ্ছে। ডাকিনীদলেরও অনেকে আহত এবং ভূপাতিত বটে, তবে তাদের মধ্যে যারা এখনও ভীমারূপে যুদ্ধরত, তাদের সংখ্যা তিরিশের চেয়ে কম না।
ঠিক এই সময়ে বহু পুরুষকণ্ঠে রণহুঙ্কার শুনতে পেলেন উসমান। রণক্লান্ত ঘোলাটে চোখে দেখলেন অন্তত একশো জন সশস্ত্র পুরুষ সৈন্য মন্দিরের প্রাচীর পেরিয়ে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করছে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে একজন বিশালদেহী ভল্লধারী পুরুষ। তিনি চেঁচিয়ে বললেন, ‘উসমান খাঁ’র গায়ে কেউ যেন হাত না দেয়। উসমান খাঁ একমাত্র আমার।’
কে যেন উসমানের কাঁধ খামচে ধরল পিছন থেকে। তাঁকে টেনে মন্দির প্রাঙ্গণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল৷ চেঁচিয়ে উঠলেন উসমান, ‘কওন হারামের অওলাদ টানছিস আমাকে? মর্দ হোস তো আমাকে ছেড়ে দে। আজ এদের শেষ করেই যাব।’
পিছন থেকে পীতমুণ্ডি বলল, ‘প্রভু, এবার ক্ষান্ত দিন। এখন পালাতে না পারলে আমাদের মুণ্ডুখানা এখানেই রেখে যেতে হবে। ওরা এসে গেছে।’
‘কারা ওরা? ভূপতির লোক?’
‘না প্রভু। ভূপতি জানেনই না যে এখানে আজ আক্রমণ হবে। এরা খুব সম্ভবত রানীমার বাপ দীননাথ চৌধুরীর লোক। মেয়ে আপনাকে ছেড়ে দিলেও দিতে পারে, কিন্তু মেয়ের বাপ যদি একবার আপনাকে হাতের কাছে পায়, আপনার শরীরের প্রতিটি টুকরো কুকুরকে দিয়ে খাওয়াবে।’
কোনওক্রমে দাঁড়াতে পারলেন উসমান। তারপর পীতমুণ্ডিকে ধরে খোঁড়াতে খোঁড়াতে মিলিয়ে গেলেন অন্ধকারের মধ্যে।
‘গুরুদেব, আপনার প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আপনার রজ্জুতে সর্পভ্রম হচ্ছে। আপনি সম্পূর্ণ অকারণে আমার ওপর দোষারোপ করছেন।’
রাত্রি গভীর হলে কী হবে, গড় পাণ্ডুয়ার রাজপ্রাসাদের একটি কক্ষে দীপালোক এখনও প্রজ্জ্বলিত। সেই প্রায়ান্ধকার ঘরে ভূপতিকৃষ্ণ এবং হরিদেব মুখোমুখি বসেছিলেন।
‘ভূপতি, তোমাকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখছি। তোমার প্রতি আমার স্নেহও কারও অজানা নয়৷ কিন্তু বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে তোমার আচার-আচরণ আমার কাছে অত্যন্ত অদ্ভুত এবং অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে।’
‘আপনার অস্বস্তি হয় এমন কোনও আচরণ আমি করিনি গুরুদেব।’
‘করেছ।’
‘আবার ক্ষমা চাইছি গুরুদেব। তবু আমি মনে করি আপনার ধারণা ভ্রান্ত।’
মাথা নামিয়ে কী যেন ভাবলেন হরিদেব। তারপর গম্ভীরভাবে বললেন ‘ভূপতি, আমি তোমার প্রয়াত পিতার থেকেও বয়সে বড়। শুধুমাত্র হ্যাঁ অথবা না’তে আমার দুটি প্রশ্নের উত্তর দেবে তুমি?’
‘আদেশ করুন গুরুদেব।’
‘তুমি কি সমগ্র ভূরিশ্রেষ্ঠ’র একচ্ছত্র সম্রাট হতে চাও?’
মুহূর্তের মধ্যে হরিদেবের পায়ে প্রণত হলেন ভূপতিকৃষ্ণ, ‘আপনার পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করছি গুরুদেব, এমন পাপচিন্তা আমার মনে উদয় হওয়ার আগে যেন আমার মস্তক শতধা বিদীর্ণ হয়ে যায়।’
‘বেশ বেশ। বিশ্বাস করলাম। এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন। তুমি কি মনে মনে ভবশঙ্করীকে কামনা করো?’
ভূপতিকৃষ্ণ’র মুখ দেখে মনে হল তাঁর মুখ থেকে কেউ যেন সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে। তিনি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন হরিদেবের দিকে। তাঁর ওষ্ঠ দু’খানি খানিক কম্পিত হয়ে স্থির হয়ে গেল। তারপর স্খলিতস্বরে বললেন, ‘কী বলছেন গুরুদেব?’
‘করলে আমাকে বলো ভূপতি। বিধবাবিবাহে আপত্তি না থাকলে তোমার মনের ইচ্ছা জানাও আমাকে। পরাশর সংহিতায় বিধবাবিবাহের স্পষ্ট নির্দেশ আছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস রাজ্যের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে আমি ভবশঙ্করীকে রাজি করাতে পারব।’
ভূপতিকৃষ্ণ সপ্রতিভ পুরুষ। কিন্তু দেখা গেল তাঁর সমস্ত বুদ্ধিমাত্রা এখন অন্তর্হিত। তুতলে গেলেন তিনি, ‘কী বলছেন গুরুদেব? তিনি আমার মাতৃসমা। এমন অশ্লীল ভাবনা আমার মনে উদয়…’
ত্বরিতে উঠে দাঁড়িয়ে ভূপতির দুই কাঁধ সবলে খামচে ধরলেন হরিদেব, ‘যদি এই দুই প্রশ্নেরই উত্তর না হয়, তাহলে বলো ভূপতি, গত দুই মাস তুমি কোথায় কোথায় গেছিলে? তোমার সন্ধান পাওয়া যায়নি কেন? রুদ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর তুমি গড় ভবানীপুর যাওয়া পরিত্যাগ করেছ কেন?’
আকস্মিক আক্রমণে প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলেন ভূপতি। কিছুক্ষণ পর তাঁর স্বাভাবিক স্বর ফিরে এল। তারপর তিনি বললেন, ‘তাহলে শুনুন গুরুদেব। গত কয়েকমাস আমি কোথায় ছিলাম, কী করছিলাম।’
দুর্লভ দত্ত হাঁউমাউ করে উঠলেন, ‘কী বলছেন কী গুরুদেব? আপনি মনে করছেন যে আমিই সেই নরাধম যে উসমান খাঁ’য়ের দলবলকে কাষ্ঠসাঁকড়ার পথ দেখিয়ে এনেছিলাম?’
‘আপনি এনেছিলেন কী না জানি না। তবে এমন কেউ এনেছিল যাঁকে আপনি চেনেন।’
দুর্লভ দত্ত কাতরস্বরে বললেন, ‘গুরুদেব, আপনি আমাকে এ কথা বলতে পারলেন? আমি এতদিন ধরে এই রাজপরিবারের সেবা করে এসেছি। কোনওদিন কর্তব্যকর্মে অবহেলা করিনি। আর আজ আপনি আমার নামে এত বড় অভিযোগটা আনতে পারলেন?’
হরিদেব কঠিনস্বরে বললেন, ‘আমাকে মূর্খ ভাববেন না দত্তমশাই। আপনি কী ভাবেন, আমি রাজস্ববিভাগের কোনও সংবাদ রাখি না?’
দুর্লভ দত্ত হাত কচলাতে কচলাতে বললেন, ‘কেন গুরুদেব? কোথাও কোনও অনিয়ম আপনার নজরে এসেছে কি?’
হরিদেব গর্জে উঠলেন, ‘বোকা সাজবেন না দত্তমশাই। এই রাজ্যের কোথায় আউয়াল জমি, কোথায় সুনা জমি, কোথায় লাল জমি, কোথায় বা জঙ্গলবুড়ি বা মণ্ডলী তালুক, সব যেমন আপনার নখদর্পণে, তেমনই আমারও। এই রাজ্যের সমস্ত গ্রাম্যমণ্ডল, চৌধুরী, ইজারাদার, পত্তনিদার সবাই যেমন আপনার ঘনিষ্ঠ, তেমন আমারও। রানীমা যুদ্ধকর্মে এবং শাসনে যতটা পটু, দেওয়ানি বা রাজস্ব কাজকর্মে ততটা নয়। আপনি সেই সুযোগে নিঃশব্দে জমির চরিত্র বদল করেছেন। আওয়াল জমির কর বর্ধিত করেছেন, সুনা জমিকে আওয়াল জমি ঘোষণা করেছেন, এবং এই বর্ধিত রাজস্বের কিছুই রাজকোষে জমা পড়েনি।’
দুর্লভ দত্ত বললেন, ‘মিথ্যা! আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ গুরুদেব। ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি, আমি আজ অবধি রাজস্বের একটি তঙ্কাও এদিক-ওদিক করিনি।’
হরিদেব কঠোরস্বরে বললেন, ‘করেছেন। আমার কাছে তার স্পষ্ট প্রমাণ আছে। একটা কথার শুনে রাখুন দত্তমশাই। চাণক্য বলেছেন মাছ কখন জল খায় আর রাজপুরুষ কখন উৎকোচ গ্রহণ করেন সে ভগবানও জানেন না। কিন্তু এই রাজ্যে আমি ভগবানেরও ওপরে। আমার আদেশ, আপনি সমস্ত অবৈধ উপার্জন এই মুহূর্তে বন্ধ করুন। কারণ পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত উত্তপ্ত৷ এই সময়ে রাজ্যশাসনের ক্ষেত্রে কোনও প্রকার বিচ্যুতি কিন্তু রাজদ্রোহের সমান বলে পরিগণিত হবে।’
দুর্লভ দত্ত প্রণত হলেন, ‘যথা আজ্ঞা গুরুদেব। ইয়ে, বলছিলাম যে একেবারে শুকনো মুখে ফিরে যাবেন? নাকি সামান্য মাধ্বী আনতে বলব?’
ক্রূর চোখে দুর্লভ দত্ত’র দিকে খানিক চেয়ে রইলেন হরিদেব। তারপর তাঁর মুখের ভাব সামান্য সহজ হয়ে এল। হেসে বললেন ‘আনতে বলুন তাহলে। কিন্তু মদে বিষ মেশাবেন না তো?’
দুর্লভ দত্ত ধড়াস করে হরিদেবের পায়ে পড়ে গেলেন।
চতুর্ভুজ চক্রবর্তী তাঁর হস্তধৃত পাত্রে চুমুক দিয়ে সামান্য আরক্ত নয়নে বললেন, ‘আমাকে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত করার স্পর্ধা আপনার হল কী করে গুরুদেব?’
হরিদেব গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আমার সঙ্গে এইভাবে, এই ভাষায় কথা বলার স্পর্ধা আপনারই বা হল কী করে সেনাপতিমশাই?’
চতুর্ভুজের চিবুক শক্ত হয়ে উঠল, ‘গুরুদেব, ভুলে যাবেন না আমি ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সেনাপতি। রাজ্ঞী ভবশঙ্করীর পর এই রাজ্যে আমিই দ্বিতীয় মুখ্যপ্রধান। আমার সঙ্গে কথা বলার আগে আপনি কিছু ভব্যতা পালন করবেন আশা রাখি।’
‘তা সেনাপতিমশাইয়ের কাছে কোনও সংবাদ থাকে না কেন যে কখন কেউ রাজ্যের মধ্যে গুপ্তপথে প্রবেশ করছে?’
‘সে উত্তর আমি আপনাকে দেব না গুরুদেব। আপনি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নন। যাঁর কাছে আমার জবাবদিহি করার কথা আমি তাঁর কাছেই এই প্রশ্নের উত্তর দেব।’
হরিদেব ক্রুদ্ধচোখে চেয়ে রইলেন চতুর্ভুজের দিকে। তারপর বললেন, ‘বেশ। তাই দেবেন। কিন্তু সেদিন যদি উসমান খাঁ’য়ের পরিকল্পনা সফল হত, তাহলে কী অনর্থ ঘটে যেত আপনার ধারণা আছে?’
‘না, আমার কোনও ধারণা নেই। সব ধারণা শুধু আপনারই আছে, তাই না গুরুদেব?’ ব্যঙ্গ ঝলসে উঠল চতুর্ভুজ চক্রবর্তীর স্বরে, ‘শুনুন গুরুদেব। যদি সেদিন মহারানী পরাস্তও হতেন, তাঁকে এই রাজ্যের বাইরে নিয়ে যাওয়ার আগে ওই ম্লেচ্ছ পাঠানদের একজনও জীবিত থাকত না। চতুর্ভুজ চক্রবর্তীর সৈন্যদলের সেই ক্ষমতা আছে।’
উঠে দাঁড়ালেন হরিদেব। গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘আপনার কথা যদি সত্যি বলে মেনেও নিই, তাহলেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। আমি জানি ভূরিশ্রেষ্ঠতে প্রবেশের সমস্ত পথে এখন সেনাচৌকি বসেছে। তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে মাছিটি গলবার উপায় নেই। অথচ তা সত্ত্বেও অন্তত সত্তর জন পাঠান সৈন্য কাষ্ঠসাঁকড়া অবধি পৌঁছে গেল। এবং পৌঁছল এমন সময়ে যখন সেখানে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রানী সৈন্যপ্রহরা ব্যতীত মাত্র কয়েকজন সঙ্গিনী নিয়ে অবস্থান করছেন। প্রথম প্রশ্ন, উসমান খাঁ জানল কী করে রানীমা এখন ওখানে ব্রতপালন করার জন্য অবস্থান করবেন, তাও প্রায় অরক্ষিত অবস্থায়? এই সংবাদ ওদের কাছে পৌঁছে দিল কে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, কী সেই গোপন পথ যেখান দিয়ে এত সহজে ভূরিশ্রেষ্ঠতে প্রবেশ করা যায়? অথচ তার সংবাদ রাজ্যের সেনাপ্রধান, গুপ্তচর প্রধান এমনকী স্বয়ং রাজ্যাধিপের কাছেও নেই?’
চতুর্ভুজ গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘এ প্রশ্ন আমার মনেও উদয় হয়েছে গুরুদেব৷ ইতিমধ্যেই আমার লোকজন এই ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে। প্রহরা চতুর্গুণ বাড়ানো হয়েছে। গুপ্তচরপ্রধান রঘুকে বলা হয়েছে সমস্ত রাজকর্মচারীদের উপর নজর রাখার জন্য। আমি জানি কাষ্ঠসাঁকড়ার ঘটনা আমারই বাহিনীর ব্যর্থতা। এজন্য আমি নিজেও অত্যন্ত লজ্জিত। তবে কথা দিচ্ছি, এই ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটবে না।’
ভবশঙ্করী হাত জড়ো করে বললেন, ‘পাণ্ডুয়া গড়ের দুর্গাধিপতিকে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মহারানীর সবিশেষ কৃতজ্ঞতা ও প্রণাম।’
দীননাথ চৌধুরী সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মহারানীর সম্মান ও জীবন রক্ষা করতে পেরেছি, এ আমার পরম সৌভাগ্য।’
দুজনেরই চোখ ছলছল করছিল। ভবশঙ্করী বহুকষ্টে নিজেকে সামলালেন। তারপর একটি পুঁটুলি নিজের বাপের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মহারানী কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কিছু উপহার তাঁর রক্ষাকর্তার হাতে তুলে দিতে চান। তিনি সেটি গ্রহণ করলে মহারানী নিজেকে ধন্য মনে করবেন।’
দীননাথ অতি দীনভাবে সেই পুঁটুলিটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘এতে কী আছে মহারানী?’
ভবশঙ্করী বললেন, ‘চিঁড়েভাজা, তিলের নাড়ু, আর নারিকেলতক্তি। ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রানী নিজের হাতে এগুলি প্রস্তুত করেছেন। তিনি জানেন যে গড় পাণ্ডুয়ার দুর্গাধ্যক্ষ এই তিনটি খাবার বড় পছন্দ করেন।’
দীননাথ পুঁটুলিটি বুকে ধরে নুইয়ে পড়লেন। তিনি যখন মুখ তুললেন, তখন তাঁর কঠিন গাল বেয়ে নোনতা জলের ধারা নেমে এসেছে। তিনি কিছু বলার আগেই মুখ ফিরিয়ে নিলেন ভবশঙ্করী। তারপর শাড়ির আঁচলপ্রান্ত দিয়ে নিজের চোখ মুছে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন। বেগবান অশ্ব ধুলো উড়িয়ে ছুটে গেল গড় ভবানীপুরের দিকে।
দীননাথ নিজের ঘোড়ায় চড়ে বসলেন। তাঁর বহুদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী ঘোড়াটি ধীরে ধীরে তাঁদের বাড়ির দিকে চলতে থাকল। কন্যার দেওয়া পুঁটুলিটিকে নিজের বুকের কাছে চেপে ধরে রেখেছিলেন দীননাথ। চোখের জলে জলে তাঁর বুক ভেসে যাচ্ছিল। এতদিন বাদে, এই এত ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও তাঁর মেয়ে মনে রেখেছে, তিনি কী খেতে ভালোবাসেন। তাঁর মা ত্রিপুরাসুন্দরীও এমন ছিলেন। ছেলে কী খেতে ভালোবাসে, কী পরতে ভালোবাসে, কী পছন্দ করে, কী অপছন্দ করে সবই তাঁর নখদর্পণে থাকত।
সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল দীননাথের। কে মা, আর কে মেয়ে। মেয়ে যে কখন মা হয়ে ওঠে সে রহস্য বোধহয় পুরুষ কোনওদিনই ভেদ করতে পারবে না।
একটু পর দীননাথের ঘোড়া অকস্মাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। দীননাথ যেন এক ঘোরের মধ্যে ছিলেন। ঘোড়া থামতেই তাঁর ঘোর কেটে গেল। তিনি চোখ মুছে হাঁটু দিয়ে ঘোড়ার পেটে খোঁচা মেরে বললেন, ‘কী রে, চল।’
ঘোড়াটি একটি পা’ও চলল না। দীননাথের মনে হল তিনি যেন একটি প্রস্তর কঠিন প্রাণীর পিঠে বসে আছেন। প্রাণীটির শরীরের সমস্ত পেশি শক্ত এবং স্পন্দনহীন।
দীননাথের আবেশ কেটে গেল। তিনি চোখের জল মুছে চারিদিকে তাকালেন।
দেখলেন, পথের পাশে একটি অতি বৃহৎ বটগাছ। তার নীচে বসে আছেন এক বৃদ্ধা এবং এক যুবক। বৃদ্ধাকে দেখলে বোধ হয় তিনি বোধহয় এক শতাব্দী পার করে এসেছেন। তাঁর অস্থিসার শুষ্কদেহে, কোটরগ্রস্ত চোখে, লোলচর্মে, শতচ্ছিন্ন শাড়িতে, ধূলিধূসরিত পায়ে, উড়ন্ত শ্বেতকেশরাজিতে যেন এক আদিম প্রাগৈতিহাসিক বার্ধক্য জড়িয়ে আছে।
যুবকটি অতি সবল এবং বলিষ্ঠ। তার পেশিবহুল পাথরকোঁদা শরীরে যৌবনের যে ঔদ্ধত্য ফুটে বেরোচ্ছে তার তুলনা নেই৷ অথচ তার আচার-আচরণে স্ফূটিত সভ্য সম্ভ্রম দেখে মনে হয় এ কোনও উচ্চবংশের সন্তান না হয়ে যায় না।
দীননাথ ঘোড়া থেকে নামলেন। তারপর সেই দরিদ্র বৃদ্ধার কাছে গিয়ে বললেন, ‘এ কী মা! এখানে এমন বসে আছেন কেন?’
বৃদ্ধা দন্তবিহীন মুখে সামান্য হেসে বললেন, ‘বড় খিদে পেয়েছিল বাবা। তাই এখানে মায়ে পোয়ে বসে আছি। কেউ যদি দুটি খাবার দেয়।’
দীননাথ শশব্যস্ত হয়ে হাতে ধরা পুঁটুলিটি বৃদ্ধার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই নিন মা। কী খাবেন, খান।’
বৃদ্ধা সেখান থেকে এক মুঠো চিঁড়েভাজা আর তিলের নাড়ু তুলে যুবকটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই নে বাবা, খা। বাপধন আমাদের খেতে দিয়েছে। এ কত বড় সৌভাগ্য বল দেখি!’
যুবকটি কোনও কথা না বলে গোগ্রাসে চিঁড়ে আর নাড়ু খেতে লাগল। দীননাথ ভারি প্রীত হলেন। ক্ষুধার্ত মানুষকে তৃপ্তি করে খেতে দেখলে তাঁর বড় আনন্দ হয়।
একটু পর দীননাথ যুবককে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার নাম কী ভাই?’
যুবকটি সুমিষ্ট অথচ গম্ভীরস্বরে বলল, ‘কালু চাঁড়াল।’
‘বাহ বাহ। খাও বাবা, মন ভরে খাও। আমার মেয়ে নিজের হাতে বানিয়ে দিয়েছে। ভালো হয়নি?’
বৃদ্ধা ফোকলা মুখে হেসে বলল, ‘মায়ের তোয়ের করা খাবার কখনও খারাপ হয় গো? তোমার মেয়ে হলেন স্বয়ং বিশ্বজননী। তাঁর হাতে তোয়ের করা খাবার তো মহাপ্রসাদ গো বাবা।’
দীননাথ বৃদ্ধার পায়ে প্রণত হলেন, ‘আশীর্বাদ করুন মা, আমার মেয়ে যেন সুস্থ থাকে, আনন্দে থাকে, ভালো থাকে। আমার আর কিছুই চাইবার নেই।’
আচম্বিতে বৃদ্ধার গলার স্বর পালটে গেল। তিনি অপেক্ষাকৃত সবল এবং বলিষ্ঠকণ্ঠে বললেন, ‘তোর মেয়ের কপালে বড় ঝঞ্ঝাট আসতে চলেছে রে দীননাথ। তোর মেয়েকে সাবধান হতে বল। কয়েকদিন আগেই যে বিপদ কাটিয়ে উঠেছে সে কিছুই না। তার থেকেও বহুগুণ বড় সঙ্কট আসতে চলেছে তার জীবনে।’
দীননাথ বাক্যহারা হয়ে গেলেন। কম্পিতস্বরে বললেন, ‘কী বলছেন মা? কে আপনি? এত কিছু আপনি জানলেন কী করে?’
‘আমি সব জানি বাবা, আমি সব দেখি, সব লক্ষ্য রাখি৷ এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড আমার বিচরণক্ষেত্র।’
দীননাথের হাত পা কাঁপতে লাগল। বৃদ্ধা আবার হাসলেন। বললেন, ‘আজ থেকে বহু বছর আগে একজনকে কথা দিয়েছিলাম, যেদিন এই রাজ্যের ওপর অমঙ্গলের কালো ছায়া নেমে আসবে, সেদিন আমি আবার এখানে ফিরে আসব। তাই এসেছি বাপ। মহারাজ রুদ্রনারায়ণ আমাকে আর আমার ছেলেকে মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন সবার আগে ভোগ দিয়েছিলেন। সেই থেকে আমি এই রাজপরিবারের অন্নঋণে বাঁধা পড়ে আছি বাবা।’
দীননাথ বৃদ্ধার সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হলেন, ‘মা। আমার মেয়েকে রক্ষা করুন মা। এই রাজ্যকে রক্ষা করুন।’
‘তোর মেয়ে স্বয়ং জগন্মাতার অংশ বাপ আমার। তার ক্ষতি করে তেমন রাক্ষস জন্মায়নি এখনও। এক কাজ কর, হরিদেবকে বল রোণ নদীর পাশের জঙ্গলে অঘোরবজ্র’র মন্দিরের খোঁজ করতে। তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। আরও একটা কথা বলি। ভূপতি কিন্তু তোর মেয়েকে ভালোবাসে। সমাজের নিন্দের ভয়ে সেসব প্রকাশ্য বলতে পারে না বটে, কিন্তু ও যা করছে সে তোর মেয়ের ভালোর জন্যই। তোর মেয়ে যেন ভূপতিকে অশ্রদ্ধা না করে।’
দীননাথ বিহ্বলস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কে মা? কী নাম আপনার?’
বৃদ্ধা স্নিগ্ধ হেসে বললেন, ‘আমার নাম জেনে কী করবি বাছা? যা বললাম তাই কর। তাও যদি নাম জানতে চাস তাহলে শুনে রাখ, আমার নাম বিদ্যেধরী। লোকে রহস্য করে ডাকে, যোগিনী বিদ্যেধরী।’
আগন্তুক কঠিনস্বরে বললেন, ‘আপনার লজ্জা হওয়া উচিত খাঁ সাহেব।’
উসমান খাঁ’য়ের বাম বাহুখানির ওপর হেকিমি পরিচর্যা চলছিল৷ সেই দুঃস্বপ্নের পর প্রায় একমাস কেটে গেছে। বহুকষ্টে তাঁর দেহের অধিকাংশ ক্ষত নিরাময় হয়েছে, শুধু বামবাহুর গভীর ক্ষতটি দগদগ করছে।
উসমান ডানহাতে পানপাত্র মুখে তুলে বললেন, ‘আমার না হয় লজ্জা হওয়া উচিত বুঝলাম৷ তা তুমিই বা এতদিন তোমার দুম তোমার দুপায়ের মধ্যে গুঁজে রেখেছিলে কেন বেরাদর?’
আগন্তুকের চোখ দু’খানি ধক করে জ্বলে উঠল, ‘নিজের অওকাতের মধ্যে থেকে কথা বলুন খাঁ সাহেব। ওই কাফের অওরাতের সঙ্গে লড়তে গিয়ে আপনিও তো আপনার দুম নিজের দু’পায়ের ফাঁকে গুঁজে পালিয়ে এসেছিলেন, মনে নেই?’
উসমান ত্বরিতে তাঁর তরবারি তুলে আগন্তুকের গলায় ধরলেন, ‘তোমার এত জুররত যে উসমান খাঁ’এর ডেরায় এসে তাকেই তৌহিন করো? আমি এখনই তোমার গর্দান নেব।’
আগন্তুক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে তরবারিটি সরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এসব তলোয়ারবাজি ওইদিন দেখানো উচিত ছিল খাঁ সাহেব, এখন নয়। এখন কী করবেন সেইটে ভাবুন। প্রতাপের কাছে তো দূত পাঠিয়েছিলেন। প্রতাপ কী বলল?’
উসমান খাঁ তরবারি রেখে বিরসমুখে বসে রইলেন।
উসমান খাঁ’য়ের হয়ে পীতমুণ্ডি উত্তর দিল, ‘প্রতাপাদিত্য বলে পাঠিয়েছেন খাঁ সাহেব যখন মোগলদের সঙ্গে লড়াই করবেন, তখনই তিনি অস্ত্র শস্ত্র সৈন্যসামন্ত দিয়ে সাহায্য করবেন। ভূরিশ্রেষ্ঠ’র বিরুদ্ধে তিনি অস্ত্রধারণ করবেন না।’
আগন্তুক হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন, ‘প্রতাপের মতিগতি বোঝা ভার। ও যে কখন যে কী করবে, সে ও নিজেও জানে না। তবে প্রতাপকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। শুনেছি মানসিং আর রাঘবরায় প্রায় মৌতলা অবধি পৌঁছে গেছেন। ওদিকে ইসলাম খাঁ তাঁর নৌবহর নিয়ে ধূমঘাটের দিকে এগোচ্ছেন। এখন প্রতাপের সময় কোথায়, খাঁ সাহেবকে সাহায্য করার? বরং এখন যদি খাঁ সাহেব মানসিংহ’র বাহিনীকে পিছন থেকে আক্রমণ করে বিপর্যস্ত করে প্রতাপকে যুদ্ধটা জিততে সাহায্য করেন, তাহলে হয়ত পরে প্রতাপ সাহায্য করলেও করতে পারে।’
গর্জে উঠলেন উসমান খাঁ, ‘কভি নেহি। আমার এখন একটাই নিশানা, ভুরশুট আর ভবশঙ্করী। ওই অওরাতকে হাতের মুঠোয় না পেলে আমার বেইজ্জতির জ্বালা মিটবে না।’
আগন্তুক বাঁকা হেসে বললেন, ‘তাহলে কী করবেন ভেবেছেন কিছু?’
‘আর ওসব চোরের মাফিক হামলা নয়। এবার আমি সরাসরি ভুরশুট আক্রমণ করব।’
‘তাহলে কচুকাটা হবেন। খাঁ সাহেব, আপনি বীর বটে, কিন্তু বোধ বিবেচনা ব্যাপারটা বোধহয় আপনার আসে না। রানী ভবশঙ্করীর ব্যাপারে আপনি সম্যকরূপে অবগত নন। তাঁর শৌর্য, বীর্য, সাহস সবই তো নিজের চোখে দেখেছেন। তার ওপর তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারিণী এবং অত্যন্ত প্রজাবৎসল। প্রজারা তাঁকে স্বয়ং জগদ্ধাত্রীর চোখে দেখে৷ তিনি যদি তাঁর অজেয় খড়্গ হাতে একবার রণভূমিতে আবির্ভূত হন, তাহলে সৈন্যদলের কথা তো বাদই দিলাম, রাজ্যের প্রতিটি প্রাণী শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে যাবে।’
‘তাহলে উপায়?’
‘অপেক্ষা করুন। আমি দেখছি কী করা যায়। তবে তার আগে হঠাৎ করে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে কোনও কাজ করে বসবেন না যেন।’
দীননাথ চৌধুরীর কথা শুনে ভুরু কুঁচকে গেল হরিদেবের। বললেন, ‘কোন না কোন বৃদ্ধা মহিলা, তার কথায় তুমি এত উতলা হয়ে উঠে দৌড়ে এলে কেন দীননাথ?’
‘আপনি তাঁকে দেখেননি গুরুদেব। দেখলে আপনিও উতলা হতেন।’
‘যোগিনী বিদ্যাধরী? এই নাম বললেন উনি?’
‘হ্যাঁ গুরুদেব।’
‘হুম। কাষ্ঠসাঁকড়ার মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন রুদ্রনারায়ণ এক দরিদ্র মহিলাকে সবার আগে ভোগ দিয়েছিল বটে, তার কোলে একটি রুগ্ন শিশুসন্তানও ছিল। কিন্তু তার তো এখন বুড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়।’
‘সে জানি না গুরুদেব। তবে তিনি আপনাকে বলেছেন রোণ নদীর পাশের জঙ্গলে অঘোরবজ্র’র মন্দিরের খোঁজ করতে।’
আনমনে বিড়বিড় করতে লাগলেন হরিদেব, ‘বিদ্যাধরী…অঘোরবজ্র…এই নামগুলো কোথায় যেন শুনেছি বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু কোথায় যে শুনেছি…’
ভবশঙ্করী বললেন, ‘আর কিছু বলেননি উনি? এতই যদি জানেন, তাহলে আমাদের মধ্যে কোন বিশ্বাসঘাতক লুকিয়ে আছে সেটাও তো বলে দিতে পারতেন। ভূপতিকৃষ্ণ, চতুর্ভুজ চক্রবর্তী না দুর্লভ দত্ত? নাকি অন্য কেউ?’
ঢোক গিললেন দীননাথ, ‘ইয়ে, তিনি বললেন ভূপতিকৃষ্ণ আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করেন মহারানী, তিনি যা করছেন আপনার এবং রাজ্যের ভালোর জন্যই করছেন। তাঁকে যেন আপনি অসম্মান না করেন।’
ভুরু কুঁচকে গেল ভবশঙ্করীর। হরিদেব বললেন, ‘এ বিষয়ে আমিও একমত। আমার মনে হয় ভূপতিকৃষ্ণকে আমাদের সন্দেহের তালিকার বাইরে রাখাই যায়।’
‘কিন্তু ভূপতিকৃষ্ণ’র বেশ কিছু আচার-আচরণ আমার কাছে যথেষ্ট সন্দেহজনক মনে হয়েছে গুরুদেব।’
‘সে বিষয়ে আমি ভূপতির সঙ্গে কথা বলেছি মা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভূপতি নির্দোষ। আপনাকে না জানিয়ে সে কয়েকদিন রাজধানীতে অনুপস্থিত ছিল বটে, তবে তা রাজ্যের কোনও হিতকর্ম সাধনের জন্যই।’
ভবশঙ্করী কিছু বলার আগেই প্রহরী এসে অভিবাদন জানিয়ে বলল, ‘দূত এসেছে মহারানী। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।’
মুহূর্তের মধ্যে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন ভবশঙ্করী, ‘কার দূত? উসমানের? আসতে বল। আগের বার ছিন্ন পত্র পাঠিয়েছিলাম, এবার ছিন্ন দেহ পাঠাব।’
প্রহরী ভীতস্বরে বলল, ‘না মহারানী, মহারাজ প্রতাপাদিত্য’র দূত।’
কোনও কোনও মানুষকে প্রথম দর্শনেই ভালো না লেগে পারা যায় না। প্রতাপাদিত্যর দূতকে দেখে ভবশঙ্করীর সেই কথাই মনে হল। দেখে বোঝা যায় মানুষটির বয়েস হয়েছে যথেষ্ট, কিন্তু একমাথা কোঁকড়া চুলে, চোখের কোণের কৌতুকে, স্নিগ্ধ হাসিতে, আর সুঠাম শরীরে যৌবন যেন যাই যাই করেও যায়নি। এমন সুষম শারীরিক কাঠামো কমই দেখেছেন মহারানী। ইনি আকারে না স্থূল, না কৃশ। উচ্চতায় না দীর্ঘকায় না খর্বকায়। শরীরে পেশির বাহুল্য নেই, অথচ দেখে মনে হয় পুরুষটি অত্যন্ত বলশালী। এমন ছিপছিপে, ধারালো, অথচ স্নিগ্ধ সৌম্য ব্যক্তিত্ব সচরাচর দেখা যায় না।
তিনি অভিবাদন করে বললেন, ‘ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মহারানী দেবী ভবশঙ্করীকে যশোরেশ্বর প্রতাপাদিত্য’র দূতের সশ্রদ্ধ প্রণাম।’
ভবশঙ্করী স্মিত হেসে বললেন ‘আসন গ্রহণ করুন দূত। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি কোনও সাধারণ বার্তাবহ নন, মহারাজ প্রতাপাদিত্যর কোনও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী। আমার অনুমান কি ঠিক?’
আগন্তুক সামান্য হেসে বললেন, ‘আপনার অনুমান অভ্রান্ত দেবী। আমি মহারাজ প্রতাপাদিত্যর অন্যতম প্রধান সেনাপতি। আমার নাম শঙ্কর চক্রবর্তী।’
সভাস্থ বাকিরা চমকে উঠলেন। শঙ্কর চক্রবর্তী শুধু প্রতাপাদিত্যর সেনাপতিই নন, প্রতাপের প্রধানতম সহায়, ডানহাত বললেই চলে। তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধি, দুরন্ত যুদ্ধকৌশল, অপরিসীম সাহস, অপরিমেয় বীর্যবত্তা প্রবাদপ্রতিম। সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের জীবিত সেনানায়কদের মধ্যে ইনিই শ্রেষ্ঠতম। সেই শঙ্কর চক্রবর্তী নিজে এসেছেন সংবাদ নিয়ে?
হরিদেব বললেন, ‘আপনার মতো বীরোত্তমকে স্বাগত জানাতে পেরে এই রাজসভা নিজেকে ধন্য মনে করছে চক্রবর্তীমশাই।’
শঙ্কর চক্রবর্তী বিনীতভাবে বললেন, ‘আমিও বীরোত্তমা মহারানী ভবশঙ্করীর সভায় উপস্থিত থেকে নিজেকে ধন্য মনে করছি মাননীয় রাজগুরু।’
দীননাথ সসম্ভ্রমে গলা খাঁকরে বললেন, ‘আপনার কথা অনেক শুনেছি চক্রবর্তীমশাই। লোকে বলে আপনি নাকি ভাটি অরণ্যের অদৃশ্য দেবতা। আপনার শুধু নাম শোনা যায়, দেখা যায় না। যেভাবে ভাটির বাঘ অতর্কিতে আক্রমণ করে মানুষ শিকার করে, আপনিও সেভাবেই শত্রুনিপাতনে সিদ্ধশস্ত্র।’
হেসে ফেললেন শঙ্কর চক্রবর্তী, ‘বাড়িয়ে বলা বাঙালির স্বভাব।’
হরিদেব সামান্য ইতস্ততভাবে বললেন, ‘কিন্তু চক্রবর্তীমশাই, আমাদের কাছে সংবাদ আছে যে মোগল বাহিনীর সঙ্গে প্রতাপাদিত্যর সংঘর্ষ এখন প্রায় নির্ণায়ক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এবং এই মোগল বনাম পাঠান-বারোভুঁইয়া যুদ্ধে ভূরিশ্রেষ্ঠ মোগলপক্ষ অবলম্বন করেছে। এমন ঘোর সঙ্কটের সময় আপনি ধূমঘাট ছেড়ে শত্রুশিবিরে কেন?’
‘আমি জানতাম, এই প্রশ্ন উত্থাপিত হবে। আমি এখানে এসেছি মহারাজ প্রতাপাদিত্যর একটি বিশেষ বার্তা নিয়ে।
প্রথমে বলি, কাষ্ঠসাঁকড়ার মন্দিরে মহারানী ভবশঙ্করী যেভাবে পাঠানদের পরাস্ত করেছেন সে সংবাদ মহারাজে কাছে পৌঁছেছে৷ মহারাজের সঙ্গে উসমান খাঁ’এর সন্ধিচুক্তি আছে বটে, কিন্তু মহারাজ বীরের সম্মান দিতে জানেন। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মহারানীর জন্য দুটি উপহার পাঠিয়েছেন। সে দুটি গ্রহণ করে আমাদের কৃতার্থ করুন মহারানী।’
এই বলে শঙ্কর প্রহরীর দিকে ঈঙ্গিত করলেন। একটু পরেই শঙ্করের দুজন সঙ্গী কক্ষের মধ্যে প্রবেশ করল৷ একজনের হাতে একটি রুপোর চুপড়ি। আরেকজনের হাতে একটি অদ্ভুতদর্শন বস্তু।
শঙ্কর চক্রবর্তী উঠে দাঁড়িয়ে রুপোর চুপড়িটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘মহারাজ আপনার এবং ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মঙ্গলকামনায় দেবী যশোরেশ্বরীর কাছে বিশেষ পূজার আয়োজন করেছিলেন মহারানী। এই নিন সেই পূজার প্রসাদী নির্মাল্য।’
ভবশঙ্করী তাঁর আসন থেকে নেমে এসে চুপড়িটি গ্রহণ করে মাথায় ঠেকালেন। তারপর আবেগাপ্লুত স্বরে বললেন, ‘মহারাজকে বলবেন, তাঁর শুভেচ্ছা এবং দেবী যশোরেশ্বরীর এই আশীর্বাদ আমি মাথা পেতে নিলাম।’
শঙ্কর চক্রবর্তী বললেন, ‘আর দ্বিতীয় উপহারটি হচ্ছে এই,’ বলে অদ্ভুতদর্শন বস্তুটি ভবশঙ্করীর হাতে তুলে দিলেন তিনি।
ভবশঙ্করী দেখলেন বস্তুটি লোহার তৈরি। আকারে কামানের মতো হলেও বহুলাংশে ছোট এবং নলটি অপেক্ষাকৃত লম্বা। কামানের পিছনে একটি উল্লম্ব দণ্ড রয়েছে। সেটি নাড়াচাড়া করা যায়।
তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘এটি কী চক্রবর্তীমশাই?’
‘এটি মহারাজ প্রতাপাদিত্যর একটি বিশেষ অস্ত্র। মহারাজের নৌসেনাধ্যক্ষ রডা স্থানীয় কামারদের সাহায্যে করেছিলেন। এটি প্রকৃতপক্ষে হাতে বওয়া যায় এমন একটি হাতকামান। এতে বারুদের গোলা ভরে লক্ষ্যের দিকে চালনা করলে শত্রুপাতন অবশ্যম্ভাবী। মহারাজ এর নাম দিয়েছেন রুদ্রাগ্নি। এই রুদ্রাগ্নি আপনার হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন তিনি।’
অভিভূত হয়ে গেলেন মহারানী ভবশঙ্করী। বললেন, ‘কিন্তু এই মুহূর্তে তো আমার থেকে মহারাজ প্রতাপাদিত্যর কাছে এই অস্ত্রের প্রয়োজন বেশি। তাও তিনি এই রুদ্রাগ্নি আমার কাছে উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ মহারানী।’
‘কিন্তু কেন?’
‘কারণ মহারাজ জানেন যে উসমান খাঁ তার পরাজয়ের অপমান সহজে মেনে নেবে না। সে আবার ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করবে, এবং এবার আরও কৌশল এবং সর্বশক্তি দিয়ে। মহারাজ চান সেই যুদ্ধে যেন এই অব্যর্থ, অমোঘ শত্রুঘাতী আয়ুধ আপনার হাতে থাকে।’
‘কিন্তু তাও আমার বিস্ময় যাচ্ছে না মহামান্য সেনাপতি।’ মুখ খুললেন হরিদেব, ‘এই আয়ুধের প্রয়োজন এখন মহারাজ প্রতাপাদিত্যর সবথেকে বেশি। তাও তিনি হঠাৎ ভূরিশ্রেষ্ঠ’র উপকারের জন্য তাঁর এই বিশেষ অস্ত্র উপহার রূপে আমাদের হাতে তুলে দিলেন কেন?’
বিষণ্ণ হাসলেন শঙ্কর চক্রবর্তী। সেই হাসিতে কতটা অসহায়তা, কতটা অপরাগতা মিশে ছিল তা বোঝা দায়। অমন সুঠাম ব্যক্তিত্বব্যঞ্জক মুখে এই কষ্টের অভিব্যক্তি দেখতে অস্বস্তি হচ্ছিল ভবশঙ্করীর।
‘আপনাদের বলতে বাধা নেই রাজগুরু, আমরা যারা মহারাজের ঘনিষ্ঠতম বৃত্তে আছি, তারা জানি যে যশোরের পতন এখন সময়ের অপেক্ষামাত্র। আমরা জানি আমাদের বেশ কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গী এখন আমাদের প্রতি বিরূপ হয়ে মোগলদের মুখাপেক্ষী হয়েছেন। শুধুমাত্র আমি, ঢালীসৈন্যদের অধিপতি কালী, নৌবাহিনীর অধ্যক্ষ রডা, খ্বাজা কামাল এবং মহারাজের আবাল্যসঙ্গী সূর্যকান্ত, এই কজন ব্যতীত একদা যাঁরা মহারাজের অনুগত অন্নদাস ছিলেন, তাঁরাও একে একে বিমুখ হয়েছেন।’
‘তাঁরা যে বিমুখ হয়েছেন সে সংবাদ আপনি জানলেন কী করে? আর তাঁরা বিমুখ হলেনই বা কেন?’
‘তাঁরা কেন বিমুখ হয়েছেন, এই প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না রাজগুরু। আমি মহারাজ প্রতাপাদিত্যর শুধু প্রধান সেনাপতি নই, আবাল্য বন্ধুও বটে। অন্নদাতা বন্ধুর অসম্মান হয় এমন কোনও উক্তি আমার মুখ থেকে বেরোবে না। আর যদি জিগ্যেস করেন কী করে জানলাম, তাহলে জানাই, মহারানীর প্রেরিত দূত মহারাজকে এই বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন। মহারাজ তারপরেই আমাদের গুপ্তচর বাহিনীর প্রধান সুখন হাড়িকে বিশেষ গুপ্তচর কর্মে নিয়োগ করেন।’
তাঁর প্রেরিত দূতের কথা শুনে ভবশঙ্করী এত বিস্মিত হলেন যে প্রথমে কথাই বলতে পারলেন না। সেই অবসরে বলে যেতে লাগলেন শঙ্কর চক্রবর্তী, ‘সুখন হাড়িই আমাদের জানাল, যেসব রাজন্যবর্গ এককালে মহারাজের একান্ত অনুগত ছিলেন, তাঁরা এখন বিভিন্ন কারণে গোপনে মোগলপক্ষে যোগদান করেছেন। আপনার প্রেরিত দূত মহারাজকে সতর্ক না করলে আমরা জানতেই পারতাম না যে, মহারাজের বিশেষ অনুগৃহীত ভবানন্দ মজুমদার, যশোরের উত্তর সীমান্তের কিল্লাদার মহাতাব রায়, নলডাঙার রণবীর খাঁ, কুশদহের জমিদার রাঘব সিদ্ধান্তবাগীশ, এঁরা সকলে প্রতাপের উচ্ছেদসাধনের জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন।’
ভবশঙ্করী বিস্ময়ের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছিলেন। তিনি বললেন, ‘কিন্তু আমি তো কোনও দূত…’
শঙ্কর চক্রবর্তী সেদিকে লক্ষ্যই করলেন না। তাঁর দৃষ্টি যেন এই সভার পরিসর ছাড়িয়ে সুদূরে ধাবিত। বললেন, ‘আপনার দূত আমাদের যে উপকার করেছেন, তার তুলনা হয় না৷ আমরা জানি যে দেবী যশোরেশ্বরী প্রতাপের প্রতি বিমুখ হয়েছেন। নিজের খুল্লতাতকে সবংশে হত্যা করে প্রতাপ যে অমার্জনীয় পাপ করেছিলেন, তার প্রায়শ্চিত্তর সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাই মহারাজ প্রতাপাদিত্য আর তাঁর নিজের সুরক্ষার কথা ভাবছেন না৷ তিনি তাঁর নিয়তিকে মেনে নিতে প্রস্তুত৷ তাই তিনি তাঁর সর্বোত্তম আয়ুধটি আপনার সাহায্যের সামান্য প্রতিদানস্বরূপ আপনার কাছে প্রেরণ করেছেন।’
‘কিন্তু চক্রবর্তীমশাই!’ এতক্ষণে ভাষা খুঁজে পেলেন ভবশঙ্করী, ‘আমি তো কোনও দূতকে মহারাজ প্রতাপাদিত্যর কাছে পাঠাইনি।’
মূহুর্তের মধ্যে বাস্তবের জমিতে নেমে এলেন শঙ্কর চক্রবর্তী। তিনি ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘সে কী? এ তো বড় আশ্চর্যের কথা! আপনার অজান্তে আপনার কোন দূত যশোরের এত বড় উপকার করে গেলেন?’
‘সে তো আমিও বুঝতে পারছি না। আপনি সেই দূতের নাম জানেন?’
‘জানি বইকি৷ তাঁর নাম ভূপতিকৃষ্ণ রায়মুখুটি।’
ভবশঙ্করীকে দেখে মনে হল তাঁর মাথায় যেন বজ্রপাত হয়েছে। স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। অস্ফূটে বললেন, ‘তাহলে ভূপতিই ধূমঘাটে গিয়ে…’
‘হ্যাঁ মহারানী। ভূপতিকৃষ্ণ আজ থেকে কয়েক মাস আগে মহারাজ প্রতাপাদিত্যর সঙ্গে একান্তে দেখা করেন। তিনি তাঁর দৌত্যকর্মবলে প্রতাপের থেকে এই প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেন যে, যদি কখনও প্রতাপাদিত্যর সঙ্গে উসমান খাঁ’র সামরিক চুক্তি হয়ও, তাহলেও যেন প্রতাপাদিত্য ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ না করেন। এই প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে তিনি প্রতাপকে তাঁর আপাত-পক্ষাবলম্বী সমস্ত বিশ্বাসঘাতকদের চিহ্নিতকরণে সাহায্য করেন।
আজ মহারাজ প্রতাপাদিত্য আপনার প্রেরিত দূতের সেই সাহায্যের প্রতিদান দিচ্ছেন মাত্র। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, যশোর সদা সর্বদা ভূরিশ্রেষ্ঠ’র পাশেই থাকবে।’
ভবশঙ্করীর মুখ থেকে তাঁর অজান্তেই দুটি শব্দ উৎক্ষিপ্ত হল, ‘কিন্তু কেন?’
স্মিত হাসলেন শঙ্কর। বললেন, ‘কারণ তিনি চিরকাল চেয়েছিলেন তাঁর যেন আপনার মতো একটি বীরাঙ্গনা কন্যা হয়, তাই।’
এই বলে উঠে দাঁড়ালেন শঙ্কর চক্রবর্তী। বিনীতভাবে প্রণাম করে সহাস্যে বললেন, ‘এবার তাহলে প্রস্থানের অনুমতি দিন মহারানী। কাল সন্ধের মধ্যে আমাকে মৌতলা পৌঁছতে হবে। সেখানে মানসিংহ নামের জনৈক বৃদ্ধ রাজপুত আমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।’
ভবশঙ্করী অভিবাদন জানিয়ে বললেন, ‘মহারাজ প্রতাপাদিত্যকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাবেন৷ আমি আশা করি মানসিংহ এবং মহারাজের মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও মিত্রতামূলক চুক্তি হবে। বাংলার মাটিতে অযথা লোকক্ষয় হবে না। এবং আমি আপনার সঙ্গে পুনর্বার আলাপ করার সুযোগ পাব।’
শঙ্কর চক্রবর্তীর মুখে অপূর্ব হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘সে বোধহয় হবে না মহারানী। আমি মনেপ্রাণে জানি এই যুদ্ধে যশোরের পতন হবে। মানসিংহ জয়ী হবেন। প্রতাপের প্রাচীন পাপ রাঘবরায়ের রূপ ধরে তার সর্বাংশে সর্বনাশ করবে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমার আবাল্য বন্ধুর জন্য যুদ্ধ করে যাব। কেন জানেন? সেটা হল বিশ্বাস। প্রতাপ আমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন। আর এই পৃথিবীতে বিশ্বাসের থেকে বড় দাম আর কীসের হয় রানীমা? জেনে রাখুন, এই বিশ্বাসহীন পৃথিবীতে শঙ্কর চক্রবর্তীরা হারতে পারে, কিন্তু নষ্ট হতে পারে না।’
ভবশঙ্করী বিহ্বল ওষ্ঠদুটি কম্পিত হল। কিন্তু কোনও স্বর ফুটল না।
শঙ্কর চক্রবর্তী শরীরের ঊর্ধ্বাংশ নুইয়ে প্রণত হলেন, ‘আপনার এবং ভূরিশ্রেষ্ঠ’র ভালো হোক মহারানী। এই আমাদের প্রথম, এবং হয়তো শেষ দেখা।’
