অগ্নিপরিখা

অগ্নিপরিখা

উন্মুক্ত সভাপ্রাঙ্গণ আজ লোকে লোকারণ্য৷ গড় ভবানীপুরের রাজসভায় সচরাচর এত মানুষের সমাগম হয় না। কিন্তু আজ বিশেষ দিন। রাজ্ঞীর বিশেষ আদেশে আজ গড় ভবানীপুরের রাজসভায় ভবানীপুর এবং পাণ্ডুয়ার সমস্ত রাজন্যবর্গকে উপস্থিত থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

একটু পর মহারানী ভবশঙ্করী শ্বেতশুভ্র শাড়ি পরিধানান্তে, বামহস্তে কোষবদ্ধ তরবারি ধারণ করে অধিষ্ঠান হলেন। মনে হল স্বয়ং রাত্রিদেবী নি}Åতি যেন রুদ্র-ঊষার রূপ ধারণ করে সভাস্থলে উপস্থিত হয়েছেন।

উপস্থিত রাজন্যরা রাজ্ঞীকে অভিবাদন জানিয়ে নিজ নিজ আসনে উপবিষ্ট হলেন। চারিদিকে শান্ত নীরবতা নেমে এল।

মহারানী ভবশঙ্করী চারিদিকে তাকিয়ে বললেলন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই কাষ্ঠসাঁকড়ার মন্দিরে আমার এবং আমার সঙ্গিনীদের ওপর ঘটা আমার আক্রমণের সংবাদ জানেন। আপনারা এও জানেন কীভাবে আমার সঙ্গিনী বীরাঙ্গনারা ওই নারীলোভী শয়তানদের সমূলে ধ্বংস করেছে৷

এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর আমার মনে হয়েছে যে আমাদের মধ্যে, অর্থাৎ ভূরিশ্রেষ্ঠ’র উচ্চতম রাজন্যবর্গের মধ্যে এমন কেউ আছেন যাঁর সঙ্গে উসমান খাঁ’এর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে৷ তাঁর সাহায্য ব্যতীত উসমান এই অকস্মাৎ আক্রমণের পরিকল্পনা রচনাই করতে পারত না।

আমি জানি না আমাদের মধ্যে কে সেই গুপ্তশত্রু। আমরা এও জানি না কেনই বা তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে পারি এমন কোনও প্রমাণও আমার হাতে নেই। আর বিনা প্রমাণে কাউকে অভিযুক্ত করা ভূরিশ্রেষ্ঠ’র ন্যায়সংবিধান অনুমোদন করে না।

তাই আপাতত আমি কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই সিদ্ধান্ত আজ থেকেই বলবৎ হবে।

প্রথম সিদ্ধান্ত, ভূপতিকৃষ্ণ রায়মুখুটিকে আজ থেকে আর ভবানীপুর এবং পাণ্ডুয়ার যৌথবাহিনীর উপমুখ্য সেনাপতি পদ থেকে অপসারিত করা হল। তিনি এবার থেকে শুধু গড় পাণ্ডুয়ার সর্বাধিনায়করূপে পরিগণিত হবেন এবং আমার আদেশ মান্য করবেন।

সেনাবাহিনীর প্রধান চতুর্ভুজ চক্রবর্তী এবার থেকে শুধুমাত্র গড় ভবানীপুরের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেন। তিনি আগের মতোই আমার আদেশ মান্য করবেন।

দেওয়ান দুর্লভ দত্ত এবার থেকে রাজস্ব সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ে রাজগুরু হরিদেব ভট্টনারায়ণের অনুমতি নেবেন। এই বিষয়ে রাজগুরু আমার আদেশ মান্য করবেন।

ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সমস্ত সমর্থদেহ যুবক যুবতীদের সামরিক শিক্ষাদানের যে পরম্পরা আমি শুরু করেছিলাম, তাকে যেন আরও জোরদার করা হয়। আজ থেকে জাতিনির্বিশেষে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সমস্ত যুবক যুবতী যেন অস্ত্রচালনার প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়। আমি চাই কাল যদি ওই বিধর্মী উসমান খাঁ ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করে, তাহলে সমস্ত বাঙালি যুবক যুবতী যেন অস্ত্রহাতে রুখে দাঁড়াতে পারে। এই ভূমিতে কোনও ধর্ষকামী বহিরাগতর প্রবেশাধিকার নেই।’

জনসাধারণ হর্ষধ্বনি করে উঠল। কোলাহল স্তিমিত হলে চতুর্ভুজ চক্রবর্তী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মহারানী। আপনি আমাদের সর্বাধিনায়িকা। আপনার আদেশ মান্য করতে আমি বাধ্য। শুধু বিনীতভাবে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই। আপনার এই আদেশের কারণ জানতে পারি?’

‘কারণ আমি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি সেনাপ্রধান। তবুও যদি আরও স্পষ্ট করে জানতে চান তো বলি, আমি জানি না আপনাদের মধ্যে কে সেই বিভীষণ। তাই আমি গড় পাণ্ডুয়া এবং গড় ভবানীপুরের সেনাবাহিনীর আধিপত্য এক হাতে রাখতে চাই না, সে তিনি সেনাপ্রধানই হোন বা উপসেনাপ্রধান। যাতে প্রয়োজনের সময় একজন যদি বিশ্বাসঘাতকতা করেন তাহলে আমি অন্যজনের থেকে সাহায্য পেতে পারি।’

চতুর্ভুজ বিষণ্ণ অথচ গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘আকৈশোর আমি প্রাণমন দিয়ে এই ভূমিখণ্ড এবং এই রাজবংশের সেবা করেছি। আপনার সন্দেহের কথা জেনে আজ বড় ব্যথিত বোধ করছি মহারানী। যাই হোক, আপনার আদেশ সর্বতোমান্য। আশা করি আমি শীঘ্রই এই অপবাদের নিরাকরণ করতে পারব।’

দুর্লভ দত্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমারও একই বক্তব্য। তবে মহারানীর বিচারবুদ্ধির উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে। আমি নিশ্চিত, উপযুক্ত সময়ে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নেবেন।’

রানী কঠিনস্বরে বললেন, ‘আমি সংবাদ পেয়েছি রাজ্যের বিভিন্ন জমির চরিত্র বদল করে আপনি প্রভূত অর্থের অধিকারী হয়েছেন৷ আমি আদেশ দিচ্ছি, এক সপ্তাহের মধ্যে সেই অসাধু উপায়ে অর্জিত অর্থ আপনি রাজকোষে জমা দেবেন। নচেৎ আপনাকে কারারূদ্ধ করা হবে।’

দুর্লভ দত্ত আমূল কেঁপে গেলেন। মহারানী যে সর্বসমক্ষে তাঁকে এইভাবে অপমান করবেন, তা তাঁর স্বপ্নেরও অগোচর ছিল। তিনি বিহ্বলভাবে আসনে বসে মাথা নীচু করে রইলেন।

ভবশঙ্করী বললেন, ‘আমার আদেশ যেন অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়৷ এর বিন্দুমাত্র অন্যথা হলে অমান্যকারীকে প্রাণদণ্ড দিতে আমার হাত কাঁপবে না, মনে থাকে যেন।’

নিজের ঘরে ক্রুদ্ধ বাঘের মতো পায়চারি করছিলেন মানুষটি। ক্রোধে তাঁর মুখ থমথম করছে।

পীতমুণ্ডি সামনে নির্বাক হয়ে বসেছিল। খানিক পর গলা খাঁকরে বলল, ‘আপনাকে আজ খুবই উত্তেজিত মনে হচ্ছে মহোদয়।’

মানুষটি হাঁটা থামিয়ে স্থির চোখে পীতমুণ্ডির দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর হিসহিসিয়ে বললেন ‘আজ প্রকাশ্য রাজসভায় যে অপমান আমাকে করা হয়েছে, সে আমার সহ্যের বাইরে। এর প্রতিশোধ আমি নেব পীতমুণ্ডি, চরমতম প্রতিশোধ। ওই অহঙ্কারী নারী বুঝবে আমার ক্রোধের আগুন কতটা ভয়ানক।’

হাতে হাত ঘষল পীতমুণ্ডি। হলুদ দাঁত বার করে বলল, ‘এই তো চাই। খাঁ সাহেব তো সেদিন বলছিলেন, ‘সবর রাখ পীতমুণ্ডি। আমাদের দোস্ত একটি আতিশ ফিশাঁ, জ্বালামুখী। ও যেদিন জাগবে, সেদিন ভুরশুটের ওই খুবসুরত নাজনীন আর ওর তখত আমার পায়ে এসে লুটিয়ে পড়বে, দেখে নিস। দোস্তকে ভুরশুটের তখতে বসিয়ে তবে আমার শান্তি।’

দাঁতে দাঁত ঘষলেন মানুষটি। চাপা হিংস্রস্বরে বললেন, ‘আমার সমস্ত শরীর রাগে জ্বলে যাচ্ছে পীতমুণ্ডি। আমি ওই নারীকে আমার সামনে সামূহিক ভাবে দলিত, মথিত হতে দেখতে চাই। আমি চাই উসমানের নগণ্যতম পাইক বরকন্দাজরাও যেন ওকে সর্বসমক্ষে ধর্ষণ করে। তবেই আমার গায়ের জ্বালা মিটবে।’

পীতমুণ্ডি অনুনয়ের সুরে বলল, ‘ক্রোধ সংবরণ করুন প্রভু।’ কথাটা যেন কানেই গেল না তাঁর৷ তিনি উন্মত্তের মতো নিজের চুল টেনে ধরে বললেন, ‘একটা সাধারণ গৃহস্থ ঘরের মেয়ে, যাকে মহারাজ দয়া করে নিজের শয্যায় ঠাঁই দিয়েছিলেন, সে আজ সেই ক্ষমতাবলে নিজেকে এই রাজ্যের রাজরাজেশ্বরী ভাবছে? আমাকে প্রকাশ্য সভায় এতবড় অপমান করে? এত স্পর্ধা হয় তার? রক্তের দোষ পীতমুণ্ডি, এসব হচ্ছে রক্তের দোষ! পথের কুক্কুরীকে দেবীপূজার আসনে বসালে যা পাপ হয়, এ হচ্ছে সেই পাপের ফল।’

পীতমুণ্ডি উৎসাহিত হয়ে বলল, ‘এই তো চাই৷ তাহলে এই চৈত্র গাজনের দিনেই খাঁ সাহেবের সাঙ্গোপাঙ্গদের গাজনসন্ন্যাসী সেজে গড় ভবানীপুর আক্রমণ করতে বলি?’

তিনি খানিক চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘না, এখন না৷ ওই নারীকে আমি অত্যন্ত ভালো করে চিনি৷ তুমি যা ভাবছ, ওই শয়তানীও নিশ্চয়ই সে কথা ভেবে রেখেছে। আমি নিশ্চিত, চৈত্র গাজনের দিন সমস্ত রাজ্য জুড়ে চূড়ান্ত প্রহরা থাকবে। আমি অন্য কথা ভাবছি৷

আমাদের গোপন পথটি রোণের পার্শ্ববর্তী জঙ্গল পেরিয়ে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মধ্যে যেখানে উন্মুক্ত হয়েছে, সেখান থেকে ছাউনাপুর বেশ খানিকটা দূর। ছাউনাপুরের ঠিক আগে একটি গ্রাম আছে, নাম বাশুণ্ডিকা বা বাসডিঙ্গা। সেখানে একটি বিস্তীর্ণ প্রান্তর আছে।

আমার ইচ্ছে কী জানো পীতমুণ্ডি? আমার ধারণা ভবশঙ্করী গাজনের সময় উসমানের আক্রমণ আশঙ্কা করবে। তাই তার আদেশমতো সেইদিন ভূরিশ্রেষ্ঠ’র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও চূড়ান্ত সতর্ক অবস্থায় থাকবে।

তারপর তারা যখন দেখবে যে সেইদিন কোনও আক্রমণ হল না, সেইদিনের পর থেকে তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ঢিলে পড়বেই পড়বে।

জ্যৈষ্ঠমাসের মাসে অমাবস্যা ফলহারিণী কালীপূজার দিন। ভবশঙ্করী ছাউনাপুরে দেবী ভবানীর এক মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছে। সে প্রতি অমাবস্যায় সেখানে পুজো দিতে যায়৷ আমি নিশ্চিত যে, সে এইবারও সে সেখানে পুজো দিতে যাবে। তখন সে নিশ্চিন্ত, অনুদ্বিগ্ন। কারণ গাজনের সময় যে আক্রমণ সে আশঙ্কা করেছিল, তা ঘটেনি।

আমি চাই ওই দিন রাত্রির অন্ধকারে উসমানের সমস্ত সৈন্য আমার আবিষ্কৃত গোপন পথে ভূরিশ্রেষ্ঠ’য় প্রবেশ করুক। এবং এবার আর হিন্দু সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে নয়, তারা নিজেদের পাঠানযোদ্ধৃমূর্তি ধারণ করে পূর্ণশক্তিতে ছাউনাপুর আক্রমণ করুক। আমি দেখছি কীভাবে সেনাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করে নিষ্ক্রিয় রাখা যায়৷ তুমি এক কাজ করো, আমার এই পরিকল্পনার কথা খাঁ’ সাহেবকে জানাও। তারপর দেখা যাক তিনি কী বলেন।’

জঙ্গলের মধ্যে এদিক-ওদিক চাইতে চাইতে এগিয়ে আসছিলেন হরিদেব। তাঁর সঙ্গে আসছিল দুজন বাগদী সর্দারও।

ভূরিশ্রেষ্ঠ’র অধিবাসীদের একটি বড় অংশ হল ডোম, চণ্ডাল, এবং বাগদীরা। এরা হরি ঠাকুরের একান্ত অনুগত, অন্ধ ভক্ত বললেই চলে।

বাগদী সর্দারদের একজনের নাম বিশে, আরেকজনের নাম রঘু৷ দুজনেই হরিদেবকে সাক্ষাৎ ভগবানের অবতার মনে করে৷

জঙ্গলের মধ্যে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর বিশে ইতস্তত করে ডাকল ‘ঠাকুর…’

অন্যমনস্কভাবে হরিদেব বললেন, ‘হুঁ। কিছু বলবি?’

‘আপনি কিন্তু এখনও বললেন না আমাদের কেন এখানে ডেকে এনেছেন।’

‘একটা রাস্তা খুঁজছি বিশে। এখান থেকে ভূরিশ্রেষ্ঠ’য় ঢোকা যায় এমন একটা রাস্তা৷ যে রাস্তার খোঁজ কেউ রাখে না।’

সর্দার দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর রঘু হাতজোড় করে বলল, ‘ঠাকুর, এই জঙ্গলের প্রতিটা গাছ আমরা চিনি৷ এখানে এমন কোনও রাস্তা নেই যা আমাদের জানা নেই। আপনি বৃথাই খোঁজাখুঁজি করছেন।’

হরিদেব অন্যমনস্ক সুরে বললেন, ‘না রে রঘু। এমন একটা রাস্তা তো আছেই যার খোঁজ কারও কাছে নেই, শুধু একজন ছাড়া৷ আর সে রাজদরবারে বসে আছে। সে এই পথ না দেখিয়ে দিলে উসমানের সাহস হত না রানীমার ওপর আক্রমণ করার। সেই রাস্তাটা খুঁজে পেতে হবেই।’

ধীরে ধীরে তিনজনে রোণ নদীর তীরে এসে উপস্থিত হলেন। সূর্যের রং যেন তপ্ত কাঞ্চন। জ্যৈষ্ঠের দ্বিপ্রহর ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মার্তণ্ডদেব যেন ধরিত্রীদহনে উদ্যত।

বৃদ্ধ দেহে এত পরিশ্রম সহ্য হয় না। গলাটা তেষ্টায় ঠা ঠা করছে।৷ কিন্তু তার মধ্যেও হরিদেবের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে দুশ্চিন্তার ঘূর্ণিঝড়।

আকাশের দিকে একবার তাকালেন হরিদেব। সেই রাজা গণেশের সময় থেকে তাঁর পরিবারের একটিই লক্ষ্য, একটিই সাধনা, বাংলার রাজবংশের স্বার্থরক্ষা করা। আর তার জন্য তাঁরা সব কিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।

জ্যোতিষবিদ্যায় মহা পণ্ডিত তিনি৷ ভবশঙ্করীর কোষ্ঠী নিজের হাতে প্রস্তুত করেছেন। আর সেই কোষ্ঠী দেখে নিজেই স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন।

রানীর রাশি সিংহ, লগ্নও তাই। নক্ষত্র মঘা। গোত্র কাশ্যপ। বৃহস্পতি তুঙ্গস্থ। শনি এবং রাহু ষষ্ঠস্থানে একত্রিত, দেবী জন্মেছেনই শত্রুহন্তা যোগ নিয়ে। দ্বাদশে কেতু। অর্থাৎ দেবী ক্রমেই আধ্যাত্মিক মোক্ষলাভের দিকে আকর্ষিত হবেন। স্বেচ্ছায় রাজ্যাধিকার ত্যাগ করাও বিচিত্র নয়।

সিংহরাশির অধিপতি রবি, দেবী মাতঙ্গী। অধিদেবতা শিব, প্রত্যধিদেবতা বহ্নি। রাজ্ঞী ভবশঙ্করীর এখন মঙ্গলের মহাদশা চলছে। অর্থাৎ দেবী এখন যে যুদ্ধে রত হবেন, তাতেই জয়লাভ করবেন। জ্যৈষ্ঠ মাসে সিংহ রাশিতে মঘা নক্ষত্র রাজসুখ বহন করে।

মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ইচ্ছে জন্ম নিল হরিদেবের মনে। উসমান খাঁ যদি ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করে, তাহলে যেন এই জ্যৈষ্ঠ মাসেই করে। এই মাসে দেবী অযোধ্যা, অপরাজেয়া।

খানিক পর ফিরতে লাগলেন হরিদেব। আনমনে হাঁটছেন, এমন সময় হঠাৎ তাঁর হাত থামাল বিশে। হরিদেব চমকে উঠলেন। সামনের দিকে তাকিয়ে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

তাঁদের সামনে মস্ত ফণা তুলেছে একটি সাপ৷ যেমন তেমন সাপ নয়, সাপেদের রাজা, শঙ্খচূড়। তার দৈর্ঘ্য এতই বড় যে ফণাটি প্রায় তাঁদের মাথা ছুঁই ছুঁই। তার ধীর এবং গভীর হিসহিসানি শোনা মাত্র হরিদেবের বুকের ভেতর ভয়ে পাথর হয়ে গেল।

হরিদেব এই প্রথম আবিষ্কার করলেন যে প্রবল ভয় এবং আতঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের ঘুম পায়। তাঁর সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে আসতে লাগল। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে, যেন আর খুলে রাখা যায় না।

হয়ত পড়েই যেতেন হরিদেব, যদি না তাঁকে বিশে ধরে ফেলত। রঘু একবার ডাকল, ‘ঠাকুর, শরীর ঠিক আছে?’

হরিদেব চোখ খুলে দেখলেন সাপটির মস্ত কালো লেজ জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে৷ তিনি চকিতে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বললেন, ‘ওই দিকে আমাকে নিয়ে চল বিশে।’

বিশে অবাক হল, ‘কী বলছেন কী ঠাকুর? ও কী জিনিস জানেন? ওর এক ছোবলে হাতি অবধি মারা পড়ে, আর আপনি যেচে ওর পিছু নিচ্ছেন?’

উত্তেজিত হলেন হরিদেব, ‘আমি লক্ষণ বুঝি বিশে, লক্ষণ বুঝি। ও এখানে এমনি আসেনি, আমাকে ডাকতে এসেছিল। চল চল।’

দুজনে দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘না ঠাকুর। ওদিকে যাব না আমরা। আমাদের ওদিকে যাওয়া মানা আছে।’

‘সে কী? এই যে বললি তোরা নাকি এই জঙ্গলের সব গাছ চিনিস?’

‘তা চিনি ঠাকুর। তবে ওই উত্তর পূর্ব কোণের একটু অংশ বাদ দিয়ে। ওখানে যাওয়া আমাদের মানা।’

‘কেন?’

‘ওখানে কপালি মায়ের থান আছে ঠাকুর। সে অনেক পুরোনো থান। আমাদের বাপ দাদারা বলে এসেছে এই বন জঙ্গলের সব জায়গায় আমরা যেতে পারি, শুধু ওই কপালি মায়ের থান ছাড়া।’

‘কোন কপালি মা? কীসের থান?’

‘সে অনেক পুরোনো গল্প ঠাকুর। শুধু আমরা, মানে বাগদীদের সর্দাররা জানি। আমাদের বাপ দাদারা বলে গেছে ওদিকে যেন কখনও না যাই। গেলে অঘোরবাবার অভিশাপ লাগবে।’

জঙ্গলের মধ্যে মন্দির…অঘোরবাবা…হরিদেবের মাথার মধ্যে কী যেন একটা টিকটিক করতে লাগল। তিনি বললেন, ‘কী নাম বললি? কপালি মা?’

‘হ্যাঁ ঠাকুর৷ বাপ দাদারা অবশ্য মায়ের আরেকটা নামও বলতেন, দেবী বিদ্যেধরী।’

খুশিতে ঝলমল করছিল উসমানের মুখ। তালুতে ঘুঁষি মেরে বললেন, ‘শাব্বাশ দোস্ত। এই তো চাই। এইবার দেখব, ভুরশুট আর ওই ভুরশুটের ওই রেণ্ডিটাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচায়।’

আগন্তুক মানুষটি মাথা নিচু করে কী যেন ভাবলেন। বোধহয় সমগ্র পরিকল্পনাটি মনে মনে ঝালিয়ে নিলেন একবার৷ তারপর বললেন, ‘এখনও অবধি তো এই পরিকল্পনায় কোনও ত্রুটি আমার নজরে পড়ছে না। কী পীতমুণ্ডি, তোমার নজরে কিছু পড়ছে?’

পীতমুণ্ডি খানিক ভেবে বলল, ‘দাঁড়ান, পুরোটা একবার আউড়ে নিন। তাহলে হয়তো কোনও খুঁত বেরোলেও বেরোতে পারে।’

‘আচ্ছা। বলছি। উসমান খাঁ গোপন পথে ভুরশুটে ঢুকেই আশেপাশের এলাকা আক্রমণ করতে থাকবেন। সেই সংবাদ পাওয়া মাত্র আপনি আপনার সৈন্য নিয়ে পাঠান সৈন্যদের ধাওয়া করবেন। পাঠান সৈন্য এমন ভাব করবে যেন তারা এই আক্রমণের সামনে পড়ে দিশেহারা হয়ে গেছে। তারা উত্তরে ছাউনাপুরের দিকে পালাতে থাকবে।

আমাদের মিত্র ছাউনাপুর অবধি পাঠানদের তাড়া করে তারপর গড় ভবানীপুর ফিরে আসার উদ্যোগ নেবেন। কারণ হিসেবে জানাবেন ছাউনাপুরের দুর্গে স্বয়ং মহারানী রয়েছেন। নিজেকে রক্ষা করতে তিনি নিজেই সক্ষম। তাছাড়া ছাউনাপুরের দুর্গের সৈন্যরা তো আছেই। এদিকে গড় ভবানীপুর অরক্ষিত অবস্থায় থাকবে। তখন যদি পাঠানদের অন্য একটি দল এই সুযোগে রাজধানী আক্রমণ করে?

কিন্তু কেউ জানবে না যে সেই রাতে ছাউনাপুরের দুর্গ খালি থাকবে।

ভবানীমন্দির দুর্গের বাইরে অবস্থিত। রানী মন্দিরে প্রবেশ করবে মধ্যরাত্রে। তিনি মন্দিরে প্রবেশ করামাত্র আমাদের মিত্রের দূত ছাউনাপুরের দুর্গাধিপতিকে জানাবে যে রানীর আদেশ আছে, সেই রাতে দুর্গ যেন খালি থাকে। দুর্গাধ্যক্ষ’র যদি সন্দেহও হয়, তাহলেও তার সাহস হবে না এই বিষয়ে মহারানীর সঙ্গে পরামর্শ করার। কারণ মহারানী একবার পুজোয় বসলে তাঁকে বিরক্ত করার মতো স্পর্ধা দুর্গাধ্যক্ষর হবে না।

ফলত তখন রানী মন্দিরের মধ্যে মাত্র কয়েকজন বিশ্বস্ত সঙ্গিনীসহ পূজায় রত। ছাউনাপুর দুর্গ সৈন্যশূন্য। আমাদের মিত্র তাঁর বাহিনী নিয়ে গড় ভবানীপুরের পথে প্রস্থানোদ্যত। আর ভবানীমন্দিরের সামনে অপেক্ষামান খাঁ সাহেবের সৈন্যদল।

এবার এই পরিকল্পনার দুটি অংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, পাঠানবাহিনী যেন ঠিক সন্ধের মুখে ভুরশুটে প্রবেশ করে। সেখান থেকে আক্রমণ-পলায়নের অভিনয় করে তাদের রাত্রের মধ্যেই বাসডিঙ্গা পার করে ছাউনাপুর পৌঁছতে হবে। কারণ এই গোলযোগ যদি দিনের বেলা হয়, তাহলে পাঠানসেনা ছাউনাপুর পৌঁছনোর আগেই আগেই রানী কোনও না কোনওভাবে এই সংবাদ পেয়ে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হবেনই। আর মহারানী সংগ্রামে অবতীর্ণ হলে আমাকেও বাধ্য হয়ে তাঁর সঙ্গে যোগদান করতে হবে। আমি খাঁ সাহেবের কোনও সাহায্যেই আসতে পারব না। আর তিনি যদি একবার তাঁর খড়্গ হাতে রণভূমিতে উত্তীর্ণ হন, তাহলে রাজ্যের মধ্যে এমন একটিও মানুষ থাকবে না যে ভবশঙ্করীর কথায় দেশের জন্য জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পিছপা হবে।

তাই আক্রমণের সময়টা নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক বা দু’দণ্ডের হেরফেরে সমস্ত পরিকল্পনা শেষ হয়ে যেতে পারে।’

‘ক’জন সিপাহি নিয়ে যাব দোস্ত?’

‘খুব বেশি না। তাতে দ্রুত চলাফেরা করতে বা ঝটিকা আক্রমণে অসুবিধা হতে পারে।’

‘তাহলে শ’খানেক বাছাই করা ফৌজি নিয়ে যাই?’

ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন রহস্যময় আগন্তুক, ‘আগেরবার পঞ্চাশজন মেয়েছেলে আপনার বাছাই করা সত্তরজন মর্দ এ মোমিনকে কচুকাটা করেছিল, মনে আছে?’

উসমান খাঁ গম্ভীর হয়ে গেলেন।

‘কম করে পাঁচশো জন নিয়ে আসবেন। আপনার বাহিনীর সেরা পাঁচশোজন। অন্তত দশজন বিশ্বস্ত সিপাহ সালার। আমার ধারণা রানীর সঙ্গে এবারেও পঞ্চাশ থেকে একশোজন অস্ত্রধারী সঙ্গিনী থাকবে। আশা করব, আপনার বাহিনীর পাঁচশো বাছাই করা যোদ্ধা অন্তত একশোজন নারীকে পরাস্ত করতে পারবে।’

উসমান খাঁ গম্ভীরমুখে বললেন, ‘আপনি কি আমার ফৌজকে বেইজ্জত করতে এসেছেন?’

হা-হা করে হেসে উঠলেন এই ষড়যন্ত্রজালের মূল চক্রী। উসমানের কাছে গিয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করে বললেন, ‘আরে, রাগ করছেন কেন খাঁ সাহেব, আমি তো সামান্য মশকরা করছিলাম! এবার বলুন দেখি, ছাউনাপুর থেকে আমাদের রানীমাকে আপনার হেরেমে কীসে চড়িয়ে নিয়ে আসবেন? ঘোড়ায়? নাকি তাঞ্জামে?’

তিনজনেই হিংস্র উল্লাসে হেসে উঠলেন। সামনে রাখা মদ্যপূর্ণ পানপাত্র তুলে তাতে চুমুক দিয়ে অজানা আগন্তুক বললেন, ‘একটাই অনুরোধ খাঁ সাহেব, আপনার বিয়ত খুশ হয়ে গেলে পরের সুযোগটা যেন আমি পাই। আমার অনেক হিসেব মেটানোর আছে ওই নারীর সঙ্গে।’

উসমানের অধীন পাঁচশো অশ্বারোহী সৈন্য অত্যন্ত ধীরে, অতি সাবধানে অরণ্যপথ অতিক্রম করছিল। যদিও এত সতর্কতার কোনও প্রয়োজন ছিল না৷ কারণ তারা ছাড়া এই পথের সন্ধান আর কেউ জানে না।

দুপুর শেষ হয়ে বিকেল হয় হয়। উসমান খাঁ তাঁর কাফেলাকে আদেশ দিলেন শিবির স্থাপন করতে। আজ ভালো খাওয়া দাওয়া আর বিশ্রামের প্রয়োজন। সন্ধের অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই ভুরশুটে প্রবেশ করতে হবে। ওখানে পীতমুণ্ডি অপেক্ষা করবে তাঁদের জন্য। সেখান থেকে বাকি নাটকের শুরু। ছাউনাপুর পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় শেষরাত হবে। আজ বদরের পুরা চাঁদ হলে হলে হয়ত আরেকটু কম সময় লাগত। কিন্তু আজ আবার হিলাল, নয়া চাঁদরাত। অন্ধকারে পথ চলতে একটু সময় তো লাগবেই।

সিপাইরা রান্নাবান্না বসিয়েছে৷ আসার পথে কয়েকটা বাছুর ধরে এনেছে ওরা। আজ রাতে গোস্ত বিরিয়ানি৷ উসমান খাঁ খানাপিনার বড়ই শওকিন। যেখানেই যান খাস পাচক মেহবুবকে সঙ্গে নিয়ে যান। ছোকরার হাতে জাদু আছে৷ অল্প সামগ্রী নিয়ে এমন হরেক কিসিমের সুস্বাদু পাকওয়ান বানাতে আর কাউকে দেখেননি উসমান।

জঙ্গলের মধ্যেই একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলেন উসমান। কাল খোদার সওগাত হাতে আসতে চলেছে তাঁর। আশা করছেন যে ছাউনাপুর দুর্গে ফজরের নামাজ পড়েই ওই খুবসুরত অওরাতের সঙ্গে মুলাকাত করতে পারবেন তিনি।

তাছাড়া ভুরশুট হাতে এলে অন্য প্রচুর সুবিধাও আছে। এ রাজ্যে খাদ্য শস্যের অভাব নেই, মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধে রসদ নিয়ে ভাবতে হবে না। তাছাড়া এই রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনী তাঁর অধীনে আসবে। এখানে একবার ঘাঁটি গাড়তে পারলে শুধু মোগল কেন, পুরো সুবে বঙ্গাল ইশারায় নাচাতে পারবেন।

ভাবতে ভাবতে হাঁটছিলেন উসমান। তাই বোধহয় খেয়াল করেননি যে তিনি পথ হারিয়ে ফেলেছেন। যখন বুঝলেন তখন দেখলেন যে তিনি একটি অত্যন্ত নির্জন স্থানে এসে পৌঁছেছেন।

নির্জন স্থান? কথাটা মনে হতেই সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে উঠলেন তিনি। এই জঙ্গল তো সম্পূর্ণই নির্জন। তাঁরা ছাড়া আর কেউ নেই। তাও এই শব্দটি তাঁর মাথায় এল কেন?

চারিদিকে তাকিয়ে উসমান বুঝলেন, এর কারণ কী।

বঙ্গালের মৌসম-এ-গর্মা বড়ই প্রখর, বড়ই উগ্র। জঙ্গলের মধ্যে পেঢ়-পওধা আছে বলে একটু ঠন্ডক মেহসুস হয় বটে, তবে এই জায়গাটা বড্ড ঠান্ডা। গায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঠান্ডা। তার ওপর চারিদিকে কোনও শব্দ নেই। না কোনও জানওর, না কোনও পঞ্ছীর ডাক। এমনকী উসমান বুঝলেন তিনি যে মাটিতে পড়ে থাকা ডালপাতা মাড়িয়ে হাঁটছেন, সেই শব্দও তাঁর কানে আসছে না।

হতভম্ব হয়ে গেলেন উসমান। তিনি কি পাগল হয়ে গেছেন?

মাথা তুলে তাকিয়ে উসমান দেখলেন তাঁর সামনে একটি অতি বিশাল, অতি প্রাচীন বটগাছ। এত উঁচু এত বিশাল বটগাছ জীবন কমই দেখেছেন তিনি।

উসমান আস্তে আস্তে এগিয়ে সেই আদিম বটগাছটির অন্য দিকে গিয়ে দাঁড়ালেন। দেখলেন যে তাঁর সামনে একটি অত্যন্ত অদ্ভুতদর্শন প্রাচীন মন্দির। না, প্রাচীন বলে অদ্ভুত নয়। এমন প্রাচীন মন্দির অনেক দেখেছেন উসমান, ভেঙেছেনও অনেক। মন্দিরটি অদ্ভুত অন্য কারণে। এই মন্দিরের কোনও ছাদ নেই।

সামান্য এগিয়ে আরও ভালো করে মন্দিরটি দেখলেন উসমান। না, ছাদটা ভেঙে পড়েনি। ছাদটা কখনও তৈরিই হয়নি।

আরও দু’পা এগোলেন উসমান। আরে, বহোৎ আশ্চর্যের জিনিস!

হঠাৎ করেই উসমানের মনে হল মন্দিরটা যেন জ্যান্ত। তিনি যেমন মন্দিরটার দিকে তাকিয়ে আছেন, ঠিক তেমনই মন্দিরটাও তাঁর দিকে একাগ্রদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আর সেই দৃষ্টিতে সামান্য কৌতুকের সঙ্গে মিশে আছে অনেকটা অবয়বহীন ক্রোধ।

উসমান দুঃসাহসী বীরপুরুষ। তাঁর শৌর্য বীর্য পরাক্রম সবই অত্যুৎকৃষ্ট। তবুও কোন অজানা কারণে তাঁর শিরদাঁড়া নেমে একটা ভয়ের স্রোত নেমে গেল। গা’টা শিউরে উঠল। থরথর করে কাঁপতে থাকলেন তিনি।

মন্দিরের দিকে চোখ রেখে যেদিক দিয়ে এসেছিলেন, সেদিকে পিছোতে থাকলেন উসমান। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে হল মন্দিরের দৃষ্টিটাও যেন তাঁর দিকে ঘুরে যাচ্ছে। যেন ওই ভগ্নপ্রায় ইটের স্তূপ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে তাঁর চলে যাওয়া।

উসমান চকিতে পিছন ফিরলেন। আর ফিরেই দৌড়তে লাগলেন।

বিকেল হয়ে সবে সন্ধে নেমেছে। খানাকুলের কোতোয়াল হরিহর বাগদী দিনের কাজকর্ম শেষ করে ঘরে যাওয়ার উদ্যোগ করছিলেন। এমন সময় তাঁর সহায়ক ভোলানাথ এসে বলল, ‘প্রভু, একজন আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।’

‘বল, কোতোয়ালি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। যেন কাল সকালে আসে।’

‘বলেছি প্রভু। কিন্তু কিছুতেই যেতে চাইছে না। বলছে এক্ষুনি দেখা করতে চায়। নইলে নাকি মহা অনর্থ হবে।’

বিরক্ত হলেন হরিহর। এমন অনর্থ কোতোয়ালিতে রোজই লেগে থাকে। তাতে এত সহজে উদ্বিগ্ন হলে চলবে?

‘বল যত অনর্থই হোক, আমার এখন ওসব শোনার সময় নেই। আর কাল সকালের আগে সময় হবেও না।’

ভোলানাথ তবুও গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে হরিহর ধমকেই উঠলেন, ‘কী হল, কথা কানে গেল না?’

ভোলানাথ আমতা আমতা করে বলল, ‘গেছে প্রভু। কিন্তু ইয়ে…’

‘কী ইয়ে?’

‘ছেলেটাকে কিছু বলতে ভয় লাগছে।’

খানিকক্ষণ ক্রুদ্ধ অবিশ্বাসের চোখে ভোলানাথের দিকে চেয়ে রইলেন তিনি। খানাকুলের কোতোয়ালের সহায়ক নাকি একটা ছেলেকে দেখে ভয় পাচ্ছে? তাও নিজের কোতোয়ালিতে বসে!

‘আচ্ছা আসতে বল। দেখি সে কেমন ভয় দেখানো প্রাণী।’

যে ছেলেটা এসে দাঁড়াল, তাকে দেখে সত্যিই বিস্মিত হয়ে গেলেন হরিহর। তার সবল বলিষ্ঠ শরীরের প্রতিটি পেশি যেন কোনও দক্ষ ভাস্করের নিপুণ শিল্পকর্ম। একমাথা কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, খালি গা, পরনে একটা নেংটি। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য তার চোখ দুটো। এ যেন মানুষের দেহে কোনও সাপের চোখ। অক্ষিগোলক দুটি প্রায় সম্পূর্ণ কালো। চোখের পলক পড়ছে না। অমন শীতল খুনে চাউনি জীবনে দেখেননি হরিহর।

‘কী হয়েছে? কী চাস তুই?’ প্রশ্ন করলেন হরিহর।

‘জঙ্গলের মধ্যে অস্তর নিয়ে মানুষ ঢুকেছে। অনেক মানুষ। তাঁবু গেড়েছে। তাদের দাড়ি আছে, গোঁফ নেই। গরু কেটে খাচ্ছে।’

শোনামাত্র সতর্ক হলেন অভিজ্ঞ কোতোয়াল। উঠে বসে জিগ্যেস করলেন, ‘কোন জঙ্গল?’

ছেলেটি যেদিক নির্দেশ করল সেটি খানাকুলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দামোদরের তীরবর্তী জঙ্গল। তার একটু পরেই রোণ এসে দামোদরে মিশেছে।

‘গরু খাচ্ছে? মুসলমান? অস্তর আছে হাতে?’

‘হ্যাঁ। অনেক অস্তর। অনেক লোক। আর অনেক ঘোড়া।’

এবার উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন কোতোয়াল হরিহর মুখুটি, ‘ঠিক বলছিস তুই?’

ছেলেটি সেই শীতল নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল হরিহরের দিকে। হরিহর অবশ্য এবার আর ভয় পেলেন না৷ তিনি বুঝে গেছেন যে ছেলেটি তাঁকে সাহায্য করতেই এসেছে। ছটফট করে উঠলেন তিনি, ‘তার মানে পাঠানরা আবার আসছে৷ আগের বার শয়তানদের শিক্ষা হয়নি। তাই আবার এসেছে। এক্ষুনি গড় ভবানীপুর যেতে হবে, এক্ষুনি। সেনাপতিকে খবর দিতে হবে।’

‘কী করে যাবে?’

থমকে গেলেন হরিহর, ‘কী করে যাব জেনে তুই কী করবি?’

‘আমার কাছে ঘোড়া আছে। বুড়ি, কিন্তু তেজি ঘোড়া। আমার সঙ্গে চলো। তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।’

বুড়ি ঘোড়া, আবার তেজি? কোতোয়াল ধন্দে পড়লেন। ছোঁড়া ঠিকঠাক বলছে তো? নাকি এ আবার পাঠানদের পাঠানো চর? ওই জঙ্গল থেকে ভুরশুটে ঢুকতে হলে খানাকুল হয়েই ঢুকতে হয়। তিনি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে পাঠানদের কথা শুনেই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে এই ছোঁড়া পাঠানদের ভুরশুটে ঢোকা আরও সহজ করে দিচ্ছে না তো? তিনি এবার পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘তুই জানলি কী করে ওরা ওখানে আছে?’

‘আমি তখন জঙ্গলে ছিলাম। ওদের দেখলাম। অনেক লোক। অনেক ঘোড়া। অনেক অস্তর।’

‘জঙ্গলে কী করছিলিস তুই?’

‘মায়ের কাছে ছিলাম।’

‘মা? কার মা? তোর মা জঙ্গলে থাকে?’

‘হ্যাঁ।’

অবিশ্বাসের চোখে ছেলেটার দিকে চেয়ে রইলেন অভিজ্ঞ কোতোয়াল। ছেলেটা পাগল নয় তো?

‘কে তোর মা? কী নাম তোর মায়ের? তোর বাপেরই বা নাম কী?’

‘আমার বাপের নাম চতুরানন নিয়োগী। আর মায়ের নাম বিদ্যাধরী, যোগিনী বিদ্যাধরী।’

থরথর করে কেঁপে উঠলেন ভূরিশ্রেষ্ঠ’র বাগদী সমাজের মাথা হরিহর বাগদী। মনে হল যেন হাঁটু ভেঙে পড়েই যাবেন তিনি। কোনওমতে সেরেস্তার গদিতে বসে পড়লেন। ভোলানাথ দৌড়ে এল, ‘কী হল প্রভু? শরীর খারাপ করছে? জল দেব?’

হরিহর খানিক বিহ্বলভাবে ঝিম মেরে রইলেন। তারপর যখন উঠে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর চালচলন পুরো পালটে গেছে। উত্তেজিত স্বরে ভোলানাথকে বললেন, ‘কোতোয়ালির সবাইকে বল জঙ্গল থেকে ভুরশুটে ঢোকার পথে চৌকি লাগাতে। ওখান থেকে যে-ই ঢোকার চেষ্টা করবে তারই যেন মুন্ডু কাটা হয়। কোনও প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসাবাদ করার দরকার নেই।’

তারপর আগত যুবককে বললেন, ‘চল বাপ। তোর বুড়ি ঘোড়াতে চেপে ছাউনাপুর চল একবার৷’

যুবকটি প্রস্থানোদ্যত হল। হরিহর তাঁর তরবারির কোষ কোমরে আঁটতে আঁটতে বললেন, ‘তোর নামটা তো বললি না বাপ।’

যুবকটি না ফিরেই উত্তর দিল, ‘কালু চাঁড়াল।’

মন্দিরের মধ্যে গর্ভগৃহে প্রবেশ করলেন রাজ্ঞী ভবশঙ্করী। আজ এই ফলহারিণী অমাবস্যার দিন তন্ত্রমতে পূর্ণাভিষিক্ত হবেন তিনি।

মন্দিরের মধ্যে ভবশঙ্করী ছাড়া উপস্থিত আছেন চতুর্ভুজ চক্রবর্তী, দুর্লভ দত্ত, এবং রাজপুরোহিত হরিদেব ভট্টনারায়ণ, কয়েকজন উচ্চপদস্থ রাজন্যবর্গ, এবং রাজ্ঞীর চিরসঙ্গী পঞ্চসখী। অনুপস্থিত একজনই, ভূপতিকৃষ্ণ।

মন্দিরের বাইরে উলঙ্গ কৃপাণ হাতে পাহারা দিচ্ছে মহারানীর বাছাই করা একশো জন যোদ্ধৃনারী। তাঁরা প্রত্যেকে হয় স্বয়ং ভবশঙ্করী অথবা তাঁরা ঘনিষ্ঠতম পঞ্চসখীর দ্বারা প্রশিক্ষিত। এবং এঁদের অধিকাংশই কাষ্ঠসাঁকড়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

আজ পূজায় বসেছেন হরিদেবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, নবদ্বীপবাসী একজন তান্ত্রিক সাধক, তাঁর উপাধি ভট্টাচার্য, কৌলিক উপাধি মৈত্র।

মৈত্রমশাই পূজা শুরু করলে৷ প্রথমে মা ভবানীর আবাহনী পূজা। তারপর রানীর পূর্ণাভিষিক্ত হওয়ার পরিক্রমা। সেই সময়ে স্বয়ং রাজ্ঞী, মৈত্রমশাই আর হরিদেব ভট্টাচার্য ছাড়া আর কেউই থাকবেন না মন্দিরের মধ্যে।

পূজা শুরু হল। আর ঠিক সেই সময় মন্দিরের সামনে এসে থামল একটি খর্বকায়, লোলচর্মা বৃদ্ধা ঘোটকী। তার পিঠে দুজন মানুষ।

হরিহর ঘোড়ার পিঠে চেপে ঘোড়সওয়ারকে জাপটে ধরে চেপে বসেছিলেন। ছোটবেলায় পক্ষীরাজ ঘোড়ার কথা তিনি শুধু কল্পকাহিনীতেই শুনেছিলেন। আজ স্বচক্ষে দেখতে পেলেন।

এমন নয় যে ঘোড়াটি নবীন, সতেজ, উন্নতশির কোনও অশ্ব। তাকে দেখে বোঝাই যায় যে এই শ্বেতকেশ ঘোটকীটি বৃদ্ধা, খর্বকায়, লোলচর্ম এবং অথর্বও বটে। দেখার মধ্যে আছে তার চোখ দুটি। সাধারণ অশ্বের চোখের থেকে বড় সেই চোখের সুতীব্র, শানিত, স্থির দৃষ্টির সামনে দাঁড়ালে ভারি অস্বস্তি হয়।

হরিহর ঘোড়ায় চেপে কালু চাঁড়ালকে বললেন, ‘এই বুড়ি বেতো ঘোড়া, থুক্কুরি, ঘুড়ি আমাদের নিয়ে দৌড়তে পারবে তো?’

জবাবে কালু সেই বৃদ্ধা ঘোটকীর পেটে খোঁচা দিয়ে বলল, ‘হুরর হট, চল মাই। তাড়াতাড়ি ছাউনাপুর পৌঁছতে হবে।’

তারপর থেকেই হরিহরের মনে হল তিনি যেন একটি জ্যামুক্ত তিরের ওপর সওয়ার হয়েছেন। সেই বৃদ্ধা, অথর্ব, লোলচর্ম অশ্বটি যেন অকস্মাৎ অযুততুরঙ্গতুল্য শক্তিতে দৌড় দিল গন্তব্যের দিকে।

কালু চাঁড়ালকে সজোরে আঁকড়ে ধরে সেই ঘোটকীর পিঠে ভীতভাবে বসেছিলেন হরিহর। এই অভিজ্ঞতা তাঁর কল্পনারও বাইরে ছিল। নিমেষের মধ্যে একে একে পেরিয়ে যাচ্ছে গ্রাম, মাঠ, বনপথ। তারপর যখন সেই অশ্ব এক লাফে দামোদরের বিস্তীর্ণ জলবিহীন নদীচর পার করে ওপারে পৌঁছল, তখনই চোখ বুজলেন হরিহর। যা বোঝার বুঝে গেছেন তিনি।

অশ্বটি ছাউনাপুর দুর্গের সামনে অবস্থিত ভবানীমন্দিরের সামনে এসে থামল। হরিহর ঘোড়া থেকে নেমে খানিক স্থির হয়ে দাঁড়ালেন৷ তাঁর মাথা ঘুরছিল। তারপর তিনি সেই বিশালাক্ষী ঘোটকীর সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হলেন।

প্রণাম শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েই তিনি উন্মত্তের মতো দৌড়তে লাগলেন…না ভবানীমন্দিরের দিকে নয়। দুর্গের প্রধান ফাটকের দিকে।

মৈত্রমশাইয়ের উদাত্ত মন্ত্রোচ্চারণ ছড়িয়ে যাচ্ছিল মন্দিরের মধ্যে, ‘তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি। তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াত। অঘোরেভ্যথ অঘোরেভ্যো ঘোরঘোরতরেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ সর্বতেভ্যঃ নমস্তে অস্তু রুদ্ররূপেভ্যঃ। বালায় নমো বালপ্রমথনাথায় নমঃ সর্বভূতদমনায় নমো মনোন্মনায় নমঃ…’

পূজা মধ্যপর্যায়ে এখন। এবার হোমযজ্ঞ শুরু হবে। হরিদেব আহৃত সমিধগুলি একত্রিত করতে শুরু করলেন।

ছাউনাপুরের দুর্গাধিপ অম্বরীষের কক্ষে ঢুকেই থমকে গেলেন হরিহর। কক্ষের মধ্যে শুধু অম্বরীষ নয়, বসে আছেন অন্য এমন একজন মানুষ, যাঁকে স্বপ্নেও এখানে আশা করেনননি তিনি। হরিহর থতমত খেয়ে গেলেন।

অম্বরীষ বললেন, ‘কী ব্যাপার হরিহর? তুমি এমন অসময়ে এখানে?’

হরিহর হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘এক বিশাল পাঠান সৈন্যদলকে খানাকুলের জঙ্গলে দেখা গেছে প্রভু। আমার ধারণা আজ রাতেই…’

অম্বরীষ ঢুলুঢুলু চোখে সামান্য হেসে বললেন, ‘ভয়ের কী আছে হরিহর? তোমার ধারণা আজ রাতেই সেই পাঠানসৈন্য ছাউনাপুর আক্রমণ করবে, আর তাই সেই সংবাদ দিতে দৌড়ে এসেছ এখানে, তাই তো?’

হরিহর স্তম্ভিত এবং বাক্যহারা হয়ে গেলেন।

অম্বরীষ আবার হাসলেন, ‘ভয়ের কিছু নেই হরিহর। যা হওয়ার যা হবেই, সবই ভবিতব্য। তুমি আর আমি কেন নিমিত্তের ভাগী হই বলো? আজ রাত্রের নাটিকাতে তোমার একটা কাজ জুটে গেল মনে হচ্ছে। এসো, তালরসের উৎকৃষ্ট মদ এনে রেখেছি, ঝট করে দু’পাত্তর মেরে দাও দিকি। গায়ে বল পাবে।’

অন্যজনের দিকে তাকিয়ে কম্পিতস্বরে হরিহর বললেন, ‘প্রভু…শেষ পর্যন্ত আপনিও…’

ভূপতিকৃষ্ণ উঠে এসে দৃঢ়ভাবে হরিহরের দুই কাঁধ চেপে ধরলেন। বললেন, ‘পাগলামি কোরো না হরিহর। যা বলছি শোনো। আজ, এই মুহূর্তে আমি ছাউনাপুর দুর্গ খালি করার আদেশ দিচ্ছি৷ তারপর আমি বেরোব, খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে। আজ তুমি সারারাত আমার সঙ্গে থাকবে আর যা বলব অক্ষরে অক্ষরে তাই পালন করবে, বুঝলে? নইলে তোমার গর্দান নেব। কথাটা মনে থাকে যেন।’

‘কিন্তু…কিন্তু কেন প্রভু?’

‘আজ রাতে ভবানীমন্দির আক্রান্ত হবে। পাঠান সর্দার উসমান খাঁ ধেয়ে আসছে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে। আজই আমাদের চূড়ান্ত পরীক্ষার দিন।’

হরিহর বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে ভূপতিকৃষ্ণ’র দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘পাঠান সর্দার যে আসছে সে কথা আপনি জানলেন কী করে?’

রহস্যময় হাসি হাসলেন ভূপতিকৃষ্ণ। বললেন, ‘আমাদের দলে উসমানের লোক থাকতে পারে, আর উসমানের দলে আমাদের লোক থাকতে পারে না?’

পূজা শেষ হলে জয়ধ্বনি দিলেন হরিদেব ভট্টাচার্য, ‘সবাই বলুন, জয় মা ভবানীর জয়।’

সকলে প্রতিধ্বনি করলেন, ‘জয় মা ভবানীর জয়।’

‘জয় দেবাদিদেব মদমহেশ্বরের জয়।’

সকলে প্রতিধ্বনি করলেন ‘জয় মদমহেশ্বরের জয়।’

‘জয় মা মহেশ্বরী রাজবল্লভীর জয়।’

সকলে প্রতিধ্বনি করলেন ‘জয় মা রাজবল্লভীর জয়।’

‘জয় মহামায়া জয়দুর্গার জয়।’

সকলে প্রতিধ্বনি করলেন ‘জয় মহামায়া জয়দুর্গার জয়।’

‘জয় মা বজ্রযোগিনীর জয়।’

সকলে প্রতিধ্বনি করলেন ‘জয় মা বজ্রযোগিনীর জয়।’

‘জয় মহাযোগী অঘোরবজ্র’র জয়।’

একমাত্র চতুর্ভুজ চক্রবর্তী প্রতিধ্বনি করলেন, ‘জয় অঘোরবজ্র’র জয়।’

বলেই থেমে গেলেন তিনি৷ চারিদিকে চেয়ে দেখলেন সবাই প্রণাম করতে ব্যস্ত৷ তিনিও প্রণাম করে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে গেলেন মন্দির থেকে। সবার অলক্ষ্যে হরিদেবের মুখে একটি স্মিত হাসি খেলে গেল।

মন্দিরের প্রধান দরজা থেকে দুর্গের ফাটক একটু দূরে। এটুকু রাস্তা হেঁটেই অতিক্রম করলেন তিনি। ফাটকের সামনে এসে উচ্চকণ্ঠে আদেশ দিলেন, ‘কে আছিস দরজা খোল।’

মন্দির ছেড়ে সবাই চলে গেছে। রয়ে গেছেন শুধু ভবশঙ্করী, হরিদেব, পূজারী মৈত্রমশাই আর ভবশঙ্করীর পাঁচ সঙ্গিনী।

ভবশঙ্করী বললেন, ‘ষড়যন্ত্রীটিকে তো নির্ভুলভাবে নিশ্চিত করা গেল। ওকে পালাতে দিলেন কেন? ওটাকে ধরে আজ মায়ের সামনে বলি দিলেই তো সব ঝামেলা মিটে যেত।’

‘না মা, যেত না। আমি চাই ও নিজের পরিকল্পনা নিয়ে এগোক। ও জানে যে ও ধরা পড়ে গেছে। এবার ও তাড়াহুড়ো করবে, মরিয়া হয়ে উঠবে। এবং প্রতি পদক্ষেপে ভুল করবে। আমি চাই ও উসমানের দলবলকে এখানে নিয়ে আসুক। ও না গেলে উসমান আসবে না।’

‘আর আসার পর?’

স্মিত হাসলেন হরিদেব, ‘বাকি দায়িত্ব ভূপতির। আপাতত আমরা আমাদের কাজ শেষ করি। পূর্ণাভিষেক হয়ে যাক। তারপর পাঠানসেনা দেখুক, মা ভবানীর উন্মত্ত খড়্গের ক্রোধ কত ভয়ঙ্কর।’

মৈত্রমশাই বললেন, ‘এবার পূর্ণাভিষেকের প্রক্রিয়া শুরু হবে মা। প্রথম কাজ দেবীকে পশ্চিমাস্যা করে স্থাপিত করা।

হরিদেব মাতৃমূর্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ভবশঙ্করী মৃদুস্বরে বললেন, ‘মূর্তি স্পর্শ করার প্রয়োজন হবে না গুরুদেব।’

ভবশঙ্করী ভবানীমূর্তির পাদদেশে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তারপর ধীরে ধীরে ঘোরাতে লাগলেন পাদপীঠটিকে।

পাদপীঠ আবর্তিত হওয়ার সঙ্গে মূর্তিটিও আবর্তিত হতে থাকল। আর একইসঙ্গে সরে যেতে থাকল দক্ষিণদিকের দেওয়ালটিও।

দেবীমূর্তি সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমমুখী হল। দক্ষিণদিকে দেওয়ালটি সম্পূর্ণভাবে সরে গেছে। প্রদীপের আলোয় দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে একটি সিঁড়ি নেমে গেছে পাতালে।

হরিদেব আর মৈত্রমশাই হতবাক হয়ে গেছিলেন। তবে তাঁরা দ্রুতই নিজেদের সামলে নিলেন। তাঁরা জানেন আজ রাত্রে এমন অনেক কিছু ঘটবে যা তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল।

ভবশঙ্করীর একটা কলাপাতা টেনে নিলেন। তাতে সিঁদুর আর চন্দন দিয়ে একটি সংকেত আঁকলেন। তারপর সেটি বেতাইয়ের হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা নিয়ে যা। ভূপতিকে দিবি।’

বেতাই কলাপাতাটি হাতে নিয়ে সেই গোপন পথ দিয়ে মিলিয়ে গেল।

ভবশঙ্করী বাকি চারজনকে বললেন, ‘তোরা বাইরে যা। দেখ সবাই প্রস্তুত কী না।’

চতুর্ভুজের কথার কেউ উত্তর দিল না। তিনি ফাটকের দরজা ঠেলে দেখলেন যে দরজা খোলা।

সম্পূর্ণ ফাঁকা দুর্গপ্রাঙ্গণ পার হয়ে, সিঁড়ি ভেঙে তিনি যখন অম্বরীষের ঘরে পৌঁছলেন তখন দেখলেন, দুর্গাধ্যক্ষ অম্বরীষ রায় একা একা বসে মদ্যপান করছেন। তাঁর চোখ দু’খানি আবেশে বুজে এসেছে। সামনে কিছু ফলমূলাদি রাখা।

চতুর্ভুজকে দেখেই লাফিয়ে উঠলেন অম্বরীষ। দ্রুত প্রণত হয়ে বললেন, ‘প্রণাম প্রভু। আপনি এখানে? কোনও আজ্ঞা আমার জন্য?’

চতুর্ভুজ দ্রুত বললেন, ‘মহারানী আদেশ দিয়েছেন ছাউনাপুর দুর্গ খালি করে দিতে। তোমার সৈন্যদের এখনই এখান থেকে চলে যেতে বলো। আর তুমিও ঝটপট কেটে পড়ো দেখি।’

অম্বরীষ অবাক হওয়ার ভান করলেন, ‘সে কী প্রভু? রানীমা’র এমন অদ্ভুত আদেশ কেন?’

‘আজ তাঁর তান্ত্রিকমতে পূর্ণাভিষেক। পূর্ণাভিষেকের পর এমন কিছু আচার-আচরণ আছে যা পালন করতে গেলে জন্য মন্দিরের আশেপাশে কোনও পুরুষ থাকলে চলবে না।’

অম্বরীষ ইতস্ততভাবে বলল, ‘কিন্তু দুর্গ অরক্ষিত রেখে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? স্বয়ং রানীমা রয়েছেন। তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারটাও তো দেখতে হবে।’

‘মহারানীর নিরাপত্তার নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না অম্বরীষ।’ কঠিনস্বরে বললেন চতুর্ভুজ, ‘তিনি নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে যথেষ্ট সক্ষম। তাছাড়া এই মুহূর্তে তাঁর নিজের হাতে প্রশিক্ষিত একশো জনের সশস্ত্র প্রমীলাবাহিনী মন্দির প্রাঙ্গণ রক্ষা করছে। তোমাকে যা বলা হচ্ছে তাই করো। আর হ্যাঁ, এ বিষয়ে রানীমা’কে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন নেই। তিনি পুজোয় বসেছেন। আমাকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন তাঁকে যেন কোনওভাবে বিরক্ত করা না হয়।’

অম্বরীষ প্রণত হলেন, ‘যথা আজ্ঞা প্রভু। বলছিলাম যে মহারানী এখানে এসেছিলেন তাঁর হাতি দনুজদলনীর পিঠে চড়ে। সে এখন দুর্গের বাইরে বাঁধা আছে। তাকেও কি সঙ্গে করে নিয়ে যাব?’

চিন্তায় পড়লেন চতুর্ভুজ। তারপর বললেন, ‘সে হস্তী না হস্তিনী?’

‘হস্তিনী, প্রভু।’

‘তাহলে থাক। তুমি তো এককালে মাহুত ছিলে, হাতির পরিচর্যা কী করে করতে হয় ভালোই জানো। তাকে খাবার দাবার দিয়ে বেঁধে রেখে যাও। আর হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি করো। মধ্যরাতের আগেই যেন দুর্গ খালি হয়ে যায়।’

‘যথা আজ্ঞা প্রভু।’

খানাকুলের দিকে ঘোড়া ছোটালেন চতুর্ভুজ। তাঁর বুক ধকধক করছিল। ওই শয়তান গুরুদেব নিশ্চয়ই তাঁর পূর্বপুরুষদের ব্যাপারে জেনে গেছে৷ নইলে হঠাৎ করে অঘোরবজ্র’র নামে জয়ধ্বনি দিত না। আর তিনিও বোকার মতো সেই ফাঁদে পা দিলেন।

এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খাঁ সাহেবের দলবলকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসতে হবে। আর আসতে হবে তাঁর ধরা পড়ে যাওয়ার সংবাদ ভূপতির কাছে পৌঁছনোর আগেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁদের ছাউনাপুর আক্রমণ করতে হবে।

আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হলেন চতুর্ভুজ। ছাউনাপুর থেকে গড় পাণ্ডুয়া অনেক দূর। ভূপতির কাছে খবর পৌঁছতে অনেক সময় লাগবে। আর মহারানী নিশ্চয়ই এখন পূজা ছেড়ে তাঁকে ধাওয়া করবেন না। সবচেয়ে বড় কথা আজ রাতে যে আক্রমণ হবে সে কথা ওঁরা জানেন না। ফলে তাঁকে নিয়ে একটা গোলযোগ পাকিয়ে ওঠার আগেই ছাউনাপুর পৌঁছে রানীকে বন্দী করতে হবে।

আরও জোরে ঘোড়া ছোটালেন চতুর্ভুজ। তাঁর বহুদিনের শখ একটা হাতি পোষার। মা বজ্রযোগিনীর দয়া হলে ওই দনুজদলনীর পিঠে কাল সকালে তিনিই চড়বেন।

যেতে যেতে চতুর্ভুজ বুঝতে পারছিলেন একটা খটকা তাঁর মনের মধ্যে খচখচ করছে। দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করা থেকে বেরিয়ে আসা অবধি অম্বরীষ ছাড়া আর অন্য কোনও সেনা তাঁর চোখে পড়ল না কেন? দুর্গ কি আগে থেকেই খালি ছিল?

ঘোড়া থেকে নেমে পীতমুণ্ডিকে জড়িয়ে ধরলেন উসমান, ‘শাব্বাশ পীতমুণ্ডি! একবার ভুরশুট হাতে পাই, তারপর দেখবে তোমাকে সোনা জহরতে কেমন ভরিয়ে দিই।’

পীতমুণ্ডি হেঁ-হেঁ করে বলল, ‘খাঁ সাহেব হাত ঝাড়লেই পর্বত, সে কী আর জানি না?’

‘দোস্ত কোথায়?’

‘আজ্ঞে, উনি আসছেন। তবে একা।’

‘একা কেন?’ ভুরু কুঁচকে গেল উসমানের, ‘কথা ছিল দোস্ত তার দলবল নিয়ে আমাদের আক্রমণ করার নাটক করবে, আমরা ছাউনাপুরের দিকে পালাতে থাকব। দোস্ত কি আমাদের ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করছে নাকি?’

‘আজ্ঞে না খাঁ সাহেব। আপনাকে ধোঁকা দিয়ে আমরা বাঁচতে পারব? আসলে পরিকল্পনায় সামান্য রদবদল হয়েছে। মহারানী প্রথমে ঠিক করেছিলেন শুধুমাত্র তিনি আর গুরুদেবই পূজায় বসবেন। কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে ভূপতিকৃষ্ণ, দুর্লভ দত্ত, আর আপনার দোস্তকেও ডেকে নিয়েছেন। তবে চিন্তা নেই, আজ রাতে ছাউনাপুর দুর্গ খালিই থাকবে৷ সেক্ষেত্রে আর বাকি নাটকের আর দরকার কী? এই তো, বলতে বলতেই প্রভু এসে গেছেন।’

চতুর্ভুজ ঘোড়া থেকে নেমেই বললেন, ‘আমি ধরা পড়ে গেছি। ওই শয়তান রাজপুরোহিত কোনওভাবে আমার পরিচয় জানতে পেরে গেছে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখনই।’

উসমান অবাক হলেন।তারপর বললেন, ‘সে কী! ধরা পড়লে কী করে?’

চতুর্ভুজ পুরো ঘটনাটি বিবৃত করলেন। তারপর বললেন ‘শুধু বুঝতে পারছি না, ওই শয়তানটা অঘোরবজ্র’র ব্যাপারে জানল কী করে। নিশ্চয়ই ও সেই জঙ্গলের মধ্যে কপালি মায়ের মন্দিরের খোঁজ পেয়েছে।’

‘মন্দির? কোন মন্দির?’ সতর্ক আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন উসমান।

বিহ্বল চোখে উসমানের দিকে তাকালেন চতুর্ভুজ, ‘আমার দেখিয়ে দেওয়া যে গোপন পথ ধরে আপনারা এসেছেন, তারই একদিকে আমার পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত একটি মন্দির আছে। আমরা চিরকাল তাকে কপালী মায়ের মন্দির বলে জেনে এসেছি। ও মন্দির সবার থেকে আলাদা, সবার থেকে বিশিষ্ট। মা যাতে ইচ্ছেমতো ভ্রমণ করতে পারেন, তাই সেই মন্দিরের ছাদ নেই।’

কেউ যদি তখন উসমানের মুখের ভাব লক্ষ্য করত, তাহলে দেখতে পেত একইসঙ্গে সেখানে খেলা করে যাচ্ছে বিস্ময়, ভয়, আর আতঙ্ক।

উসমানের দিকে তাকালেন চতুর্ভুজ, ‘ওরা নিশ্চয়ই সেই মন্দিরের খোঁজ পেয়েছে। নইলে…নইলে…উফফ…কোনওমতে পালিয়ে এসেছি খাঁ সাহেব…আজ খুব বাঁচা বেঁচে গেছি।’

উসমান নিজের মনের ভাব গোপন করে বললেন, ‘সেক্ষেত্রে কি আজ আক্রমণ করা উচিত হবে? তার মানে তো ওরা সৈন্যসামন্ত নিয়ে প্রস্তুত হয়েই থাকবে।’

‘না। থাকবে না। কারণ ওরা জানে না যে আজ আক্রমণ হবে। ওদের লক্ষ্য হবে এখন আমাকে বন্দী করা। তার জন্য সৈন্যসামন্তের প্রয়োজন নেই, ভূপতি বা রানীমা’ই যথেষ্ট।’

‘কিন্তু সে তো ধরা পড়ার সময়েই আপনাকে বন্দী করতে পারত। করল না কেন?’

‘কারণ তখন পুজো চলছিল। আমি যে মুহূর্তে বুঝতে পেরেছি যে ধরা পড়ে গেছি, সেই মুহূর্তে ওদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছি।’

উসমান চিন্তিতমুখে বললেন, ‘তাহলে আমাদের এখন কী করা উচিত?’

‘আপনাদের উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছাউনাপুরের দিকে যাত্রা করা।’

‘আমাদের মানে? আপনি আমাদের সঙ্গে যাবেন না?’

‘না। কারণ সৈন্যসামন্ত ছাড়া আপনার সঙ্গী হওয়া না হওয়া একই ব্যাপার। আমাকে যে করে হোক এখন ভবানীপুর ফিরতেই হবে।’

‘তার কারণ?’

‘পরিস্থিতিটা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন। আমার ধারণা ইতিমধ্যেই ভূপতির কাছে আমার ব্যাপারে জানিয়ে সংবাদ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু ছাউনাপুর থেকে গড় পাণ্ডুয়া অনেক দূর। তার কাছে সংবাদ পৌঁছতে সময় লাগবে৷ এবার ভূপতি আমাকে পাকড়াও করার জন্য তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে সরাসরি ভবানীপুর আসতে পারে। অথবা ছাউনাপুরে গিয়ে মহারানীর সঙ্গে মিলিত হয়ে যৌথভাবে ভবানীপুর আসতে পারে৷ যাই ঘটুক না কেন, আমাকে যে করে হোক গড় ভবানীপুরের সৈন্যদের বোঝাতে হবে যে ভূপতি আপনার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, রানীকে বন্দী করেছে এবং এখন গড় ভবানীপুর আক্রমণ করতে আসছে। এই বলে আমি সৈন্য নিয়ে ছাউনাপুরের দিকে রওনা দেব৷ আশা করি, আমার পৌঁছাবার আগেই আপনারা কাজ সেরে ফেলতে পারবেন।’

উসমান খাঁ’র মুখ থেকে অন্ধকারের মেঘ কেটে গেল। তিনি চেঁচিয়ে তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন। তারপর চতুর্ভুজকে বললেন, ‘ঠিক আছে দোস্ত। যত জলদি পারেন ছাউনাপুর আসুন।’

বিশে, রঘু, হরিহর কোতোয়াল আর আরও দুজন বাগদী সর্দার ভুপতিকৃষ্ণকে গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল বাশুড়ির মাঠে। সঙ্গে ডোম আর চণ্ডাল পাড়ার সর্দাররাও।

ভূপতি বললেন, ‘ভাইয়েরা, আজ আমাদের দেশ বিপন্ন। পাঠান সর্দার উসমান খাঁ তার পাঁচশো জন বাছা বাছা সিপাহ সালার নিয়ে ঢুকে পড়েছে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মধ্যে। তাদের লক্ষ্য ছাউনাপুরের ভবানী মন্দির। যেখানে মহারানী ভবশঙ্করী পূজা করছেন। আজ তান্ত্রিকমতে পূর্ণাভিষিক্তা হবেন তিনি। তাদের উদ্দেশ্য মহারানীকে বন্দী করা এবং আমাদের মাতৃভূমিকে পদানত করা। আপনারা জানেন পাঠানরা যে জনপদ দখল করে, তার কী অবস্থা হয়! কীভাবে তারা সেই রাজ্যের সমূহ সর্বনাশ করে, সেই জনপদের প্রতিটি নারী কী ভয়ানক অসম্মানের শিকার হয়, কীভাবে সেই রাজ্যের সম্পদ লুণ্ঠিত হয়। আপনারা কী চান ভূরিশ্রেষ্ঠ’রও সেই গতি হোক?’

সমস্বরে উত্তর এল, ‘না, চাই না।’

ভূপতি বললেন, ‘বলতে বড়ই দুঃখবোধ হচ্ছে যে এ সব সম্ভব হয়েছে আমাদেরই এক সঙ্গীর জন্য। আমরা জানতে পেরেছি আমাদের সেনাপতি চতুর্ভুজ চক্রবর্তী একজন বিশ্বাসঘাতক। অর্থের লোভে, রাজ্যের লোভে, আর কোনও এক হীন প্রতিশোধস্পৃহা পূরণ করতে শত্রুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে সে। এই মুহূর্তে সে পলাতক। গড় ভবানীপুরের দিকে যাচ্ছে সে। আমার ধারণা সেখান থেকে সে নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে উসমানের সঙ্গে যোগ দেবে।

এই মুহূর্তে আমি, গড় পাণ্ডুয়ার রাজা ভূপতিকৃষ্ণ রায়মুখুটি, ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মহান রাজবংশের উত্তরাধিকারী, মহারাজ রুদ্রনারায়ণ এবং মহারানী ভবশঙ্করীর একনিষ্ঠ সেবক, আপনাদের কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি, এই দুঃসময়ে আমাদের সহায় হোন। দেশের এই সঙ্কট সময়ে আমি দেশের ভূমিপুত্রদের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করছি।’

এই বলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন ভূপতি। নিজের উষ্ণীষখানি মাটিতে নামিয়ে রাখলেন।

সর্দারদের মুখে কোনও কথা নেই। জ্যৈষ্ঠের উত্তপ্ত হাওয়া ঝাপটা ধুলোর পাখসাট খেয়ে নাচতে লাগল এই ক্ষুদ্র জমায়েত ঘিরে।

প্রথম কথা বলল ডোম পাড়ার সর্দার কানাই ডোম, ‘অমন করে বলবেন না রাজামশাই। আপনি আমাদের মা বাপ। শুধু বলুন কী করতে হবে! ডোম পাড়ার সব মদ্দা মেয়ে আজ আপনি যা বলবেন তাই করবে। ডোমেরা মরা পোড়ায়, মারে না। আজ ডোমেরা মারবেও, পোড়াবেও।’

এগিয়ে এল চণ্ডাল পাড়ার সর্দার কানাই, ‘আপনি রাজা মানুষ। আপনার কি মুকুট খুলে রাখা শোভা দেয় রাজামশাই? ও কি আপনার মুকুট? ও রাজ্যের মুকুট। ওকে ওভাবে মাটিতে রাখা কি ঠিক? বলুন কী করতে হবে। আজ আপনার জন্য, রানীমায়ের জন্য, এই দেশের জন্য আমাদের সব্বার জান কবুল।’

হরিহর বাগদী কোতোয়াল, তার কথার মধ্যে একটা রাজকীয় ভাব আছে। সে গম্ভীরভাবে বলল, ‘প্রভু, উঠে দাঁড়ান। রাজ্যের মুকুট ধুলোয় পড়ে আছে, এ আমরা দেখতে চাই না। এ শুধু আপনার দায় না, আমাদেরও দায়। রাজ্য শুধু রাজার নয়, প্রজাদেরও। বাগদীদের লাঠি আর তলোয়ার কী জিনিস আজ বুঝবে ওই পাঠানের বাচ্চা। শুধু আদেশ করুন, কী করতে হবে।’

উঠে দাঁড়ালেন ভূপতি৷ উষ্ণীষ মাথায় পরলেন। তারপর বললেন, ‘আপনাদের পল্লিতে যারা যারা আছে, সে জোয়ান হোক, বুড়ো হোক, ছেলে হোক, মেয়ে হোক, সবাইকে মাটি খোঁড়ার যন্ত্রপাতি নিয়ে আসতে বলুন। আর হরিহর, তুমি কয়েকজনকে দিয়ে ছাউনাপুর দুর্গে যাও। অম্বরীষ এখনও আছে ওখানে। ওখানে প্রদীপ জ্বালাবার জন্য ঘি আর তেলের জালা এনে রাখা আছে। সেসব নিয়ে এসো। তারপর বাকি কী করতে হবে সে অম্বরীষকে বলে রাখা আছে, বিশদে জেনে নিও।’

‘দুর্গাধ্যক্ষ অম্বরীষ ওখানে এখন কী করছেন প্রভু?’

‘খুব সম্ভবত তার নতুন প্রেয়সীর সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করছে।’

হেসে ফেললেন হরিহর, ‘কে সেই নতুন প্রেয়সী প্রভু? দনুজদলনী?’

‘আর কে?’ এই বলে চারিদিকে তাকালেন তিনি, ‘বাবা কালু, কোথায় গেলি বাপ আমার?’

সাপের মতোই নিঃশব্দে ভূপতির পাশে এসে দাঁড়াল কালু। হিসহিসিয়ে বলল, ‘চলো।’

তার পাশে সেই বৃদ্ধা, শ্বেতকেশী, লোলচর্ম ঘোটকী। ভূপতি তার সামনে প্রণত হলেন, ‘মায়ের চরণে সন্তানের প্রণাম। চলুন মা! ওই বিশ্বাসহন্তা গড় ভবানীপুর পৌঁছনোর আগেই আমাদের সেখানে পৌঁছতে হবে।’

উসমান যখন সেই প্রান্তরের সামনে এসে দাঁড়ালেন তখন মধ্যরাত। চারিদিকে জনমানুষের চিহ্ন অবধি নেই। প্রান্তর পার হয়ে বহুদূরে দেখা যায় ছাউনাপুর দুর্গের অন্ধকার অবয়ব। যেন একদলা বিশালকায় অন্ধস্তূপ অপেক্ষা করছে কখন সে জ্বলে উঠবে সর্বনাশের আগুনে, তার জন্য।

পিছন থেকে তাঁর প্রধান সহচর সাহেবুদ্দিন ইলতাশজাদে এসে জিগ্যেস করল, ‘হুজুর-এ-আলা, ইন্তেজার কীসের? হামলা বোলা যাঁয়ে?’

উসমান খাঁ কিছু বললেন না৷ তাঁর শরীরের সমস্ত অঙ্গ, রক্তের প্রতিটা কণিকা চিৎকার করে বলছিল, ঝাঁপিয়ে পড়ো উসমান। দখল করো ওই কাফের অওরাতকে, ও তোমার হক, তোমার গনীমাহ’র মাল। তারপর দখল করো এই রাজ্য, ছারখার করে দাও এই বঙ্গাল ভূমি।

কিন্তু তিনি বহুযুদ্ধের অভিজ্ঞ সেনানী। তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল অপেক্ষা করতে। যতক্ষণ না কোনও সঙ্কেত পান, ততক্ষণ যেন অপেক্ষা করেন। সব কিছু যতটা সহজ ভাবছেন ততটা সহজ নাও হতে পারে।

তিনি ধীরস্বরে ডাকলেন, ‘পীতমুণ্ডি। দোস্ত কোনও ইশারা বা সঙ্কেতের কথা বলে যায়নি?’

পীতমুণ্ডি পাশের ঘোড়াতে বসেছিল। বলল, ‘না খাঁ সাহেব। তিনি তো আলাদা করে কোনও সঙ্কেতের কথা বলেননি। সরাসরি ছাউনাপুর আক্রমণ করতে বলেছেন। অপেক্ষা কীসের? যাওয়া যাক।’

উসমান খাঁ তবুও স্থির রইলেন। তারপর হঠাৎ একটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করলেন, ‘পীতমুণ্ডি। তুমি একবার আমাকে বলেছিলে তোমার বাবা নাকি গড় পাঁড়ুয়াতে কাজ করতেন। তোমার একটি বড়ি বহেন আছে। মেহেরবানি করে তোমার বাবার নামটা একটু আমাকে জানাবে?’

পীতমুণ্ডি যেন সামান্য কেঁপে গেল প্রশ্নটা শুনে। বলল, ‘হঠাৎ এ কথা কেন প্রভু?’

‘দোস্ত আমাকে একবারও বলেনি যে সে ছাউনাপুরের দুর্গ খালি করে এসেছে। কিন্তু তার আসার আগেই তুমি আমাকে বলেছিলে যে আজ রাতে ছাউনাপুর খালি থাকবে। দোস্ত জানাবার আগে এই কথা কী করে জানলে তুমি?’

চতুর্ভুজ যখন গড় ভবানীপুরের রাজপ্রাসাদের সামনে তাঁর ঘোড়া থেকে নামলেন তখন মধ্যরাত৷ চারিদিক শুনশান। রাজপ্রাসাদের কয়েকটি কক্ষে প্রদীপ জ্বলছে এখনও।

চতুর্ভুজ একবার ভাবলেন, আগে নিজের গৃহে যাবেন। সেখানে তাঁর গৃহিণী আছেন, সন্তানরা আছে। তাঁদের নিয়ে একেবারে উধাও হয়ে যাবেন। কেউ আর তাঁদের ধরতে পারবে না।

তারপরেই নিজেকে সংযত করলেন তিনি। ছিঃ, তিনি না চতুর্ভুজ চক্রবর্তী, ভূরিশ্রেষ্ঠ’র প্রধান সৈন্যাধিপতি? আর মাত্র কয়েক দণ্ড, তারপরেই ছাউনাপুরের ভবানীমন্দিরে আছড়ে পড়বে উসমান খাঁ’য়ের ক্রোধবহ্নি। সকালের মধ্যেই তাঁকে তাঁর সৈন্যসামন্ত সহ পৌঁছতে হবে ছাউনাপুর। তারপর সেখান থেকে উসমানের সঙ্গে যেতে হবে গড় পাণ্ডুয়া! ভূপতিকৃষ্ণকে স্বহস্তে বধ করতে চান তিনি। আর ওই শয়তান রাজপুরোহিতটাকে একবার হাতে নাতে ধরতে পারলে তো অভুক্ত জংলি কুকুর দিয়ে জ্যান্ত খাওয়াবেন তিনি…।

ভাবতে ভাবতে বোধহয় একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলেন চতুর্ভুজ। সম্বিত ফিরতে দেখলেন তাঁর পাশে তাঁর দুই বিশ্বস্ত সহচর গদাই দাস আর লখন মহাপাত্র এসে আবির্ভূত হয়েছে।

প্রথমে চমকে উঠেছিলেন চতুর্ভুজ। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘ভবানীপুরের সমস্ত সৈন্যরা কোথায়?’

‘নিজের নিজের ছাউনি বা বাড়িতে প্রভু। কেন, কিছু হয়েছে?’

চতুর্ভুজ উত্তেজিতস্বরে বললেন ‘সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড হয়েছে। এক্ষুনি সংবাদ পেলাম ভূপতি আর উসমান খাঁ হাত মিলিয়ে ছাউনাপুর আক্রমণ করেছে। মহারানী ওদের হাতে বন্দী। দু’পক্ষে ভয়ানক যুদ্ধ চলছে। গড় দোগাছিয়া থেকে সৈন্য যাচ্ছে ছাউনাপুরের দিকে। এক্ষুনি ভেরী বাজাও, শিঙা ফুঁকে দাও। সবাইকে প্রস্তুত হতে বলো। যে করে হোক সকালের মধ্যে ছাউনাপুর পৌঁছতেই হবে।’

বলতে বলতে প্রাসাদের দ্বিতলে উঠে এলেন তিনজনে। সামনেই মন্ত্রণাকক্ষ। তিনি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘বাকি সামন্ত আর দলপতিদের ডাকো। এখনই আমাদের মন্ত্রণায় বসতে হবে। আর যা বললাম, শিঙা ফুঁকে দাও, ভেরী বাজিয়ে দাও।’

‘যথা আজ্ঞা প্রভু।’ বলে দুজন অন্তর্হিত হল।

দরজা খুলে মন্ত্রণাকক্ষে প্রবেশ করলেন চতুর্ভুজ৷ কক্ষের ঠিক মধ্যস্থলে একটি সিংহাসন। তার দু’পাশে কয়েকটি কেদারা। সিংহাসনে রানী বসেন। আর কেদারাতে বাকিরা।

ঘরের মধ্যিখানে একটি মস্ত প্রদীপ জ্বলছে। তার আলো পড়ছে সিংহাসনের ওপরে। সিংহাসনের ওপারে ঘন অন্ধকার। প্রদীপের শিখার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন চতুর্ভুজ৷ যা করছেন, ঠিক করছেন তো? পূর্বপুরুষের অভিশাপ রক্ষার দায় রাখতে গিয়ে স্বদেশ স্বভূমিকে বিধর্মী-শাসকের হাতে তুলে দেওয়ার পাপ তাঁকে স্পর্শ করবে না তো?

যাই করুন, মা বজ্রযোগিনী তো আছেন। তিনিই সব পাপ থেকে তাঁকে রক্ষা করবেন। ভাবতে ভাবতেই দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে স্বগতোক্তি করে উঠলেন চতুর্ভুজ, ‘জয় মা বজ্রযোগিনী। রক্ষা করো মা।’

বলার সঙ্গে সঙ্গে সিংহাসনের ওপারের অন্ধকারটা নড়ে উঠল যেন। সেখান থেকে চেনা গলায় কে যেন বলে উঠল, ‘এবার আপনার মা আর আপনার সহায় হলেন না চক্রবর্তীমশাই।’

চমকে উঠলেন চতুর্ভুজ। ত্বরিতে নিজের তরবারি কোষমুক্ত করলেন। ভয় পাওয়া স্বরে বলে উঠলেন, ‘কে, কে ওখানে?’

ধীরে ধীরে সেই অন্ধকার অবয়ব এগিয়ে এসে দাঁড়াল সিংহাসনের ঠিক পিছনে। আলোকবৃত্তের মধ্যে ফুটে উঠল একটি চেনা মুখ।

ভূপতিকৃষ্ণ হেসে বললেন, ‘আপনার ভুলটা কোথায় হয়েছিল জানেন চক্রবর্তীমশাই? মা ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন বটে, তবে তার আগে ভক্তের উদ্দেশ্য আর মনোবৃত্তি দেখে নেন। তিনি এই প্রপঞ্চময় জগতের সর্বেশ্বরী, অন্ধ উন্মাদিনী নন। যে শয়তান দুটো পয়সার লোভে, ক্ষমতার লোভে নিজের মাতৃভূমিকে ধর্ষকদের হাতে তুলে দেয়, জগন্মাতা তার প্রার্থনা শুনবেন, এ কথা ভাবার দুঃসাহস আপনার হল কী করে!’

চতুর্ভুজ কিছু বলার আগেই মন্ত্রণালয়ের দরজা খুলে গেল। চতুর্ভুজ চকিতে পিছনে ফিরে দেখলেন গদাই আর লখন উন্মুক্ত তরবারি আর শিকল হাতে দাঁড়িয়ে আছে৷ তাদের পিছনে কয়েকজন বাছাই করা সৈন্য।

পীতমুণ্ডির তালু অবধি শুকিয়ে গেল ভয়ে। সে ভীতস্বরে বলল, ‘আজ্ঞে সেনাপতিমশাই নিজেই আমাকে বলে গেছিলেন যে তিনি ছাউনাপুর দুর্গ খালি করিয়ে আসবেন। নিশ্চয়ই তাড়াহুড়োয় আপনাকে বলতে ভুলে গেছেন।’

উসমান খাঁ পীতমুণ্ডির দিকে স্থির চোখে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘কাষ্ঠসাঁকড়ায় হামলা করতে যাওয়ার আগে আমরা আমতার বাজারে দই চিঁড়ে খাচ্ছিলাম। সেখানে যখন তুমি দোকানিকে কড়ি দিতে যাও তখন তোমার হাত থেকে একটা পয়সা মাটিতে পড়ে যায়৷ আমার মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ওটা মোহর, সুলতান দাউদ খাঁ’য়ের মোহর। কিন্তু তখন তাড়াহুড়োয় ছিলাম বলে আর গা করিনি৷ এবার বলো তো পীতমুণ্ডি, আমতার বাজারে দাউদ খাঁ’র মোহর মাটিতে ফেলে তুমি কাকে কী সঙ্কেত দিতে গেছিলে?’

পীতমুণ্ডি কাতরস্বরে বলল, ‘কাউকে কোনও সঙ্কেত দিতে যাইনি খাঁ সাহেব। নেহাত অসাবধানে…’

‘তোমার কাছে তো শুধু কড়ি থাকার কথা ছিল পীতমুণ্ডি। মোহর থাকার তো কথা ছিল না। সেদিন সঙ্গে মোহর নিয়ে ঘুরছিলে কেন?’

পীতমুণ্ডির গলার কণ্ঠা দু’একবার ওঠানামা করল। গলায় স্বর ফুটল না।

‘সেদিন যা ঘটেছিল তার প্রতিটি মুহূর্ত নিজের মনের মধ্যে খতিয়ে দেখেছি পীতমুণ্ডি। সেদিন আমরা কাষ্ঠসাঁকড়ার মন্দিরে পৌঁছবার আগেই ভবশঙ্করীর ফৌজ পুরো তৈয়ার ছিল। তাদের কাছে আমাদের হামলার খবর আগেভাগে পৌঁছল কী করে?’

পীতমুণ্ডি হাউমাউ করে উঠল, ‘সত্যি বলছি প্রভু, মরা মায়ের দিব্যি খেয়ে বলছি, আমার ওপর মিথ্যে সন্দেহ করছেন।’

‘তাই বুঝি?’ ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন উসমান, ‘আমি খবর নিয়ে জেনেছি ভবশঙ্করীর একটি ছোট ভাই ছিল, তার নাম শিবশঙ্কর। সে স্বভাবে একটু নাজুক কিসিমের ছিল বলে তার বাপ তাকে দিনরাত সবার সামনে ডরপোক, না-মর্দ বলে বেইজ্জত করত। আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে সে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। যাওয়ার আগে সে নাকি তার ইয়ারদোস্তদের বলে গেছিল সে দেখিয়ে দেবে যে অস্ত্র না ধরেও দেশের সেবা করা যায়। তাকে চেনো নাকি পীতমুণ্ডি?’

এবার পীতমুণ্ডিও স্থির চোখে চেয়ে রইল উসমানের দিকে। বলল, ‘আমি আবারও বলছি, আপনি ভুল ভাবছেন উসমান খাঁ।’

উসমান খাঁয়ের চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠল। তিনি বলশালী পুরুষ, এক ঝটকায় পীতমুণ্ডির ঘাড় ধরে তাকে তুলে ধরলেন, তারপর সাহেবুদ্দিনকে বললেন, ‘এটাকে একটা ঘোড়ার পিঠে বাঁধ। ঘোড়াটা যেন আমার পিছন পিছন চলে।’

পীতমুণ্ডিকে ঘোড়ার পিঠে বাঁধা শেষ হতে না হতেই অকস্মাৎ সেই প্রান্তরের চারিদিক থেকে শঙ্খধ্বনি বেজে উঠল। সাহেবুদ্দিন উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘এ নিশ্চয়ই চতুর্ভুজের কোনও চরের সঙ্কেত। এবার হামলা করার হুকুম দিন হুজুর।’

উসমান প্রথমে ভাবলেন হুকুম দেবেন কি না। তারপর ভাবলেন না দিয়েই বা উপায় কী? এতদূর এসে যদি ফিরে যান তাহলে নিজের ফৌজের কাছেই ছোট হয়ে যাবেন তিনি। যা হবে দেখা যাবে। তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘হামলা বোল।’

উসমান খাঁ’র ঘোড়া দৌড়তে লাগল প্রান্তরের মধ্য দিয়ে, পিছনে পিছনে তাঁর ক্ষুধার্ত হায়েনার দল। তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘আল্লাহু আকবর।’ বাকিরা সমস্বরে বলে উঠল, ‘আল্লাহু আকবর।’

‘নারায়ে তকবীর!’

‘আল্লাহু আকবর!’

মধ্যরাতের অন্ধকারে, মাঠের ধুলো উড়িয়ে, একদল শ্বাপদ ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে চলল ছাউনাপুর দুর্গের দিকে। তাদের চোখে দুরন্ত লোভ।

ক্রমেই সেই দল প্রান্তরের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছল। আর একটু পরেই দুর্গের সীমানা। অকস্মাৎ চারিদিক থেকে গগনবিদারী ধ্বনি উত্থিত হল, ‘জয় ভবানী, জয় শিবানী।’

মুহূর্তের মধ্যে ধাবমান ঘোড়ার রাশ টেনে ধরলেন উসমান খাঁ। তাঁর ঘোড়া সামনের দুটি পা ঊর্ধ্বাকাশে তুলে তীব্র হ্রেষারবে দিগবিদিক বিদীর্ণ করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল তাঁর অনুসারী যোদ্ধারাও। আর তারপর তাঁদের বিস্মিত করে প্রান্তরের চারিদিকে জ্বলে উঠতে থাকল ভীষণ অগ্নিকুণ্ড।

চকিত বিস্মিত উসমান চারিদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন সেই প্রান্তরের সীমানা বরাবর খোঁড়া হয়েছে গভীর পরিখা। শুকনো বৃক্ষশাখায় পরিপূর্ণ সেই পরিখায় জ্বলে উঠেছে বিধ্বংসী বহ্নি।

তবে অবাক হওয়ার তখনও বাকি ছিল উসমান খাঁ’য়ের। তিনি আগুনের আলোয় দেখলেন পরিখার সামনে উলঙ্গ ভল্ল এবং কৃপাণ হাতে সশস্ত্র সৈন্যবাহিনী। তাঁর অভিজ্ঞ চোখ বুঝে গেল, এ ছাউনাপুরের সৈন্যবাহিনী। এবং তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে এই অঞ্চলের যত ডোম, চণ্ডাল আর বাগদী পুরুষেরা।

দাঁতে দাঁত ঘষলেন উসমান। আজ দেখা যাক কাদের রক্তে জোশ বেশি! পাঠানদের নাকি এই কাফেরদের।

উসমান লক্ষ্য করলেন, তাঁরা এই মুহূর্তে যেখানে আছেন সেখান থেকে আর ছাউনাপুর দুর্গের মধ্যে একটি সরু পথ আছে৷ যেন পরিখার বৃত্তটি সেখানে শেষ হতে গিয়েও হয়নি, সামান্য চওড়া একটি পথ খোলা রয়েছে। উসমান খাঁ চেঁচিয়ে তাঁর সৈন্যবাহিনীকে সেই পথ ধরে এই আগুনের বেড়া পার হতে আদেশ দিলেন। তিনি নিজেও তাঁর অশ্বটিকে সেদিকে চালনা করতে যাবেন, সহসা তীক্ষ্ণ বৃংহণ তাঁকে স্থবির করে দিল।

ক্ষণকাল পর একটি বৃহদাকার হস্তিনী তার রাজকীয় শুণ্ড সমেত সেই সামান্য চওড়া পথ দিয়ে এই অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করল। তার পিছন পিছন অস্ত্রধারিণী নারীযোদ্ধাদের দল। তাদের উন্মুক্ত অসির উপর পরিখার আগুনমালা ঝলসাচ্ছে।

উসমান তাকিয়ে দেখলেন, সেই হস্তিনীর ওপর এক ভয়ঙ্করী দেবীমূর্তি৷ এই অন্ধকারেও ধকধক করে জ্বলছে তাঁর বিশাল চোখদুটি। তাঁর কপালে সিঁদুর আর রক্তচন্দনের ত্রিপুণ্ড্রক৷ কোমরে কোষবদ্ধ ভগবতীদত্ত কৃপাণ। হাতে একটি অদ্ভুত অস্ত্র। এমন অস্ত্র কখনও দেখেননি উসমান।

উসমানের দল আরও একত্রিত হয়ে দাঁড়াল। ছাউনাপুরের সৈন্যবাহিনী আর তার ভূমিপুত্রদের সম্মিলিত দল আরও এগিয়ে এল তাদের দিকে।

দনুজদলনীর পিঠ থেকে চিৎকার করে উঠলেন ভবশঙ্করী, ‘ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সন্তানরা শোনো! এই বিধর্মীর দল আজ তোমাদের মাটি, ভাত, আর নারী অধিকার করতে চায়। ওরা চায় আমরা যেন ওদের পদানত হয়ে থাকি, ওদের নিজেদের শাসক বলে মেনে নিই, নিজেদের ধর্ম, সম্পত্তি, সম্ভ্রম, সব ওদের হাতে তুলে দিই। তোমরা কি তাই চাও?’

চারিদিক প্রকম্পিত করে সমস্বরে উত্তর এল, ‘না মহারানী! চাই না।’

‘তাহলে ধ্বংস করো! বধ করো এই পশুদের। পুড়িয়ে মারো ওই আগুনে, যাতে ওদের রক্তের একটি ফোঁটাও যেন এই পবিত্র ভূমি স্পর্শ না করে। যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না প্রতিটি বিধর্মী প্রাণীর দেহ ওই অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হয়৷ যুদ্ধ করো নিজের জন্য, নিজের দেশের জন্য, নিজের ধর্মের জন্য। যুদ্ধ করো নিজের সর্বস্ব দিয়ে, যুদ্ধ করো শেষ নিঃশ্বাস অবধি, তোমাদের দেহ থেকে মুণ্ড খসে গেলে যাক, হাত থেকে যেন অস্ত্র না খসে।’

চারিদিক কাঁপিয়ে রণধ্বনি উঠল ‘জয় ভবানী, জয় শিবানী।’

উসমান খাঁ চিৎকার করে উঠলেন, ‘আল্লাহু আকবর।’ তাঁর পাঠান সেনাও প্রতিধ্বনি করল, ‘আল্লাহু আকবর।’

ঘোর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।

মহারানী পর্বাতাকার দনুজদলনীকে মহাঘোররবে শত্রুসৈন্যমধ্যে চালিত করলেন। দুর্গাধ্যক্ষ্য অম্বরীষ তার মাহুতরূপে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। সেই মহাগজের পেছন পেছন একদল কালরাত্রিরূপা যুধ্যমানা নারীবাহিনী উন্মুক্ত কৃপাণ হাতে শত্রুসৈন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

পাঠানসেনার সামনে এখন ঘোর বিপদ। তাদের সামনে উড়নচণ্ডী ভয়ঙ্করী নারীবাহিনী, আর বাকি তিনদিকে ছাউনাপুরের সৈন্যসহ ডোম- চণ্ডাল-বাগদীদের সমবেত বাহিনী।

তবে তারাও পাঠান। এতকাল এই বঙ্গভূমি মহাপ্রতাপে শাসন করেছে। দিল্লীশ্বর মোগলরাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা তুলে ধরেছে। তাদের সাহস, বীর্যবত্তা, সমরকৌশল সবই শ্রেষ্ঠ। তারাও রণ হুঙ্কার সহ বিপুল বেগে শত্রুসৈন্যকে আক্রমণ করল।

দুইপক্ষের রণহুঙ্কারে, অস্ত্রে-অস্ত্রে, আঘাতে-সংঘাতে উত্থিত ঘোর কলরোল মধ্যরাত্রিকে ভীতসন্ত্রস্ত, রক্তাক্ত করে তুলল। কারও বুক ফুঁড়ে গেল বল্লম, কারও মাথা কাটা গেল তরবারির এক কোপে, কেউ বা এক হাত বা পা হারিয়ে মাটিতে পড়ে আর্তনাদ করতে থাকল। তার মধ্যেই হাওয়ার তেজে পরিখার আগুন জ্বলে উঠেছে দ্বিগুণ বেগে। তার উত্তাপ ঝলসে দিচ্ছিল যুদ্ধরত প্রতিটি প্রাণীকে।

মহারানীর হাতের রুদ্রাগ্নি গর্জে উঠছিল মুহুর্মুহু। আর তার সঙ্গে প্রতিবারেই এক বা একাধিক পাঠানসেনা ভূপাতিত হচ্ছিল। যুদ্ধে নিপাতিত হচ্ছিলেন ভূরিশ্রেষ্ঠ’র একাধিক সৈন্যসর্দারও। তবে তার থেকে দ্রুতবেগে নিঃশেষিত হচ্ছিল পাঠানসেনা। আর প্রতিটি নিহত পাঠানসৈন্য’র দেহ নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল সেই পরিখা মধ্যস্থ অগ্নিকুণ্ডে।

রাজ্ঞী ভবশঙ্করী শত্রুদলনী মহাকালীরূপ ধারণ করে শত্রুধ্বংসে রত ছিলেন। কোথায় তাঁর শ্রীমণ্ডিতা লাবণ্যময়ী রূপ? এই রূদ্রাণী ভয়ঙ্করী সংহারিকা মূর্তি এল কোথা থেকে? সেই দিকে চেয়ে ক্ষণকালের জন্য ভীত হলেন উসমান। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর গর্বের বাহিনী প্রায় নিঃশেষিত। তাঁর পাশে আর কেউ নেই।

নিজের অশ্বটিকে সজোরে দনুজদলনীর দিকে চালিত করলেন উসমান। তিনি তার কাছে প্রায় পৌঁছবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়াল দনুজদলনী।

উসমান খাঁ তার হাতের ভল্লটি নিক্ষেপ করলেন অম্বরীষের দিকে। ভল্লটি অম্বরীষের দেহ সজোরে ভেদ করল। কিন্তু মহাবীর অম্বরীষ তাতে বিচলিত হলেন না। শ্বাসরূদ্ধস্বরে ভবশঙ্করীকে বললেন, ‘আমি ঠিক আছি মা৷ আপনি যুদ্ধ করুন।’

রানী রোষকষায়িত লোচনে উঠে দাঁড়ালেন দনুজদলনীর পিঠে। হাতে তুলে নিলেন তাঁর রুদ্রাগ্নি! গোলাকৃতি অগ্নিপিণ্ড ধেয়ে গেল উসমানের দিকে।

উসমান তাঁর দিকে ধেয়ে আসা নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। আর তখনই তাঁর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল একজন। একটা বিস্ফোরণের শব্দ তাঁকে বধির করে দিল প্রায়।

উসমান চোখ খুলে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর সামনে সাহেবুদ্দিনের মৃতদেহ। তার মাথার খুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে প্রায়। শুধু পা দুটি কাঁপছে থরথর করে। নিজের প্রাণ দিয়ে প্রভুর অন্নঋণ শোধ করে গেছে বীর পাঠান সাহেবুদ্দিন ইলতাশজাদে।

ক্রোধে, আর রিরংসায় উন্মাদপ্রায় হয়ে গেলেন উসমান। ভল্ল চাই, এই মুহূর্তে একটা ভল্ল চাই তাঁর। ওই অওরতকে এখান থেকেই গেঁথে ফেলবেন তিনি।

চারিদিকে তাকিয়ে পাগলের মতো একটা ভল্ল খুঁজছিলেন উসমান খাঁ। আর তখনই তাঁর চোখে পড়ল ঘোড়াটি। তাঁর ঘোড়ার পিছনে পিছনে ঘুরছে। তার পিঠে বাঁধা একটি দেহ।

এক কোপে দড়ির বাঁধন কাটলেন উসমান। তারপর পীতমুণ্ডির ঘাড় ধরে সামনে নিয়ে এলেন। তার কণ্ঠার কাছে তরবারি ধরে চিৎকার করে বললেন, ‘কী মহারানী, চিনতে পারো একে?’

নিজের শূল হাতে তুলে নিয়েছিলেন ভবশঙ্করী। সেটি উসমানের দিকে নিক্ষেপ করতে গিয়েও থেমে গেলেন।

আবার চিৎকার করে উঠলেন উসমান, ‘চোখের সামনে নিজের ভাইকে মরতে দেখতে চাও?’

ভবশঙ্করী শূলহস্তে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন পীতমুণ্ডির দিকে। তাঁর মুখে এই প্রথম ক্রোধের বদলে বিভ্রান্তি ফুটে উঠল।

সেই দোলাচল লক্ষ্য করলেন উসমান। ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে। প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর হা হা করে হেসে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘পাঠানদের হারানোর খুব শখ তোমার, তাই না? এত হিম্মত তোমার? এত বড় যোদ্ধা হয়েছ তুমি? হা হা হা, এবার বলো দেখি তোমার কী চাই? নিজের জিত, নাকি নিজের ভাইয়ের মওত?’

ভবশঙ্করী শূল নামালেন না, কিন্তু তাঁর হাত কাঁপতে লাগল। তিনি নির্নিমেষে নিজের প্রাণের থেকেও প্রিয় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

আবার হুঙ্কার দিলেন উসমান, ‘নেমে এসো রানী, এসে আমার পায়ের কাছে বসে মাফি চাও। সরে যেতে বলো নিজের ফৌজকে। তাহলে আমি তোমার ভাইয়ের জান বকশ দিলেও দিতে পারি।’

ভবশঙ্করী বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন নিজের ভাইয়ের দিকে। কী করবেন তিনি? আত্মসমর্পণ করে ভাইয়ের প্রাণ বাঁচাবেন? নাকি রাজধর্ম পালন করবেন?

মাথা তুলে নিজের দিদির দিকে চাইল শিবশঙ্কর। ধীরে ধীরে তার মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল। ছোটবেলায় দিদি তার জন্য হরিণছানা ধরে আনলে যেমন হাসত সে, ঠিক সেই হাসি। তারপর কণ্ঠার কাছে ধরে রাখা তরবারিটা নিজের গলায় আমূল গেঁথে নিল সে।

শিবশঙ্করের গলা থেকে ফিনকি দিয়ে পড়া রক্ত মাটি স্পর্শ করার আগেই ভবশঙ্করীর শূল ছুটে গেল উসমান খাঁয়ের দিকে।

শূলবিদ্ধ উসমান খাঁ মাটিতে পড়ে যেতে যেতে দেখলেন তাঁরই দলের দুই সেনানী ঝড়ের বেগে এসে তাঁকে তুলে নিল নিজেদের ঘোড়ায়। তারপর উসমান খাঁ’র অচৈতন্য দেহটা নিয়ে তারা একলাফে পরিখা পার হয়ে মিলিয়ে গেল অন্ধকার দিগন্তের দিকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *