উড়নচণ্ডী ১৫৯০

উড়নচণ্ডী ১৫৯০

দীননাথ বনের প্রান্তে এসে উচ্চৈস্বরে হাঁক দিলেন, ‘মা আমার, গেলি কোথায়?’

কোনও উত্তর পেলেন না। চিন্তিত হলেন দীননাথ। তাঁর মেয়েটি বড় দুরন্ত। কয়েকজন সমবয়সি দুরন্ত মেয়ে জুটিয়ে রাতদিন দস্যিপনা করে বেড়ায়। শৈশবেই মাতৃহীন মেয়েটি শিশুকাল থেকে বাপের সঙ্গে সঙ্গে থাকতে থাকতে ভুলেই গেছে যে সে কন্যা, পুত্র নয়।

অবশ্য দীননাথও যে কন্যাকে অবল রূপে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তা নয়। তবে যা চেয়েছিলেন তার ফল তো তাঁকে ভুগতেই হবে।

ভূরিশ্রেষ্ঠ’র প্রধান শাখার রাজত্বভার এখন বহন করছেন রাজা দেবনারায়ণের অধস্তন পঞ্চম পুরুষ, রাজা রুদ্রনারায়ণ। ইনি সম্পর্কে ভূপতিকৃষ্ণ’র খুল্লতাত। মহাবীর শ্রীমন্তনারায়ণের সময় থেকেই ভূরিশ্রেষ্ঠ’র অনুজশাখা পান্ডুয়াগড় বা পেঁড়োর গড়ের রাজবংশের শুরু। তবে দুই শাখা’র মধ্যে রাজত্ব নিয়ে মতান্তর দূরে থাক, বরং রাজা শ্রীমন্তনারায়ণের শাখাই ভূরিশ্রেষ্ঠ’র প্রধান রাজবল রূপে পরিগণিত হয়ে এসেছে এতদিন। রাজা শ্রীমন্তনারায়ণ, তাঁর পুত্র মহেন্দ্র থেকে শুরু করে ভূপতিকৃষ্ণ’র পিতা গোপীমোহন, প্রত্যেকে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সৈন্যবাহিনীর প্রধান পদ অলঙ্কৃত করেছেন।

তবে আপাতত ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সৈন্যবাহিনীর অধ্যক্ষ হচ্ছেন কুশলী যোদ্ধা চতুর্ভুজ চক্রবর্তী। তার কারণ ভূপতিকৃষ্ণ নবীন এবং অনভিজ্ঞ। সাহসী এবং বুদ্ধিমান বলে চতুর্ভুজের ভারি সুনাম। তাঁর বলদর্পেই এখনও অবধি পাঠান সেনা ভূরিশ্রেষ্ঠ’র ভূমি থেকে দূরে থেকেছে। ভূপতিকৃষ্ণ আপাতত সৈনাপত্যের কাজে চতুর্ভুজ চক্রবর্তীকে সহায়তা করেন। চতুর্ভুজ অবসর নিলে তিনিই ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সৈনাপত্যের ভার গ্রহণ করবেন।

ভূপতিকৃষ্ণ’র দক্ষিণহস্ত হলেন পেঁড়োর দুর্গাধ্যক্ষ দীননাথ চৌধুরী। শালপ্রাংশু মহাভুজ বলশালী পুরুষ। এমন চওড়া কাঁধ, শক্ত বুক আর সবল বাহু এই অঞ্চলে দ্বিতীয় নেই। আর যুদ্ধশাস্ত্রেও তিনি মহারথী। তিরন্দাজি আর বর্শাচালনায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে তাঁর বিশেষত্ব অসি এবং খড়্গচালনায়। দীননাথ যখন দুহাতে দুটি ভীমদর্শন অসিহস্তে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন, তখন তাঁর সেই রূপ ভয়ংকর।

দীননাথ চৌধুরীর দুটি সন্তান, প্রথমটি কন্যা, দ্বিতীয়টি পুত্র। ঘরনি সর্বমঙ্গলাদেবী দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের পর প্রয়াত হন। পুত্র শিবশঙ্কর ধাত্রীক্রোড়ে মানুষ। আর কন্যা?

দীননাথের কন্যার মতো দুর্জয় এবং দুঃসাহসী কন্যা ভূরিশ্রেষ্ঠে

দ্বিতীয় নেই। গৌড় বা সপ্তগ্রামেও আছে কিনা সন্দেহ। যবে থেকে সে দু’পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে তবে থেকেই সে পিতার অনুকরণে শারীরিক কসরতের চেষ্টা করত৷ দীননাথ যেখানেই যেতেন কন্যাকে নিয়ে যেতেন। কারণ পিতা ছাড়া আর কারও ক্ষমতা ছিল না এই দুর্দান্ত মেয়েটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ছোট থেকেই মেয়ে অস্ত্রশাস্ত্র নিয়ে নাড়াঘাঁটা করতে অভ্যস্ত। তাতে ইন্ধন জুগিয়েছে দীননাথের অধীনস্থ কয়েকজন অস্ত্রকুশল সেনানী।

ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সৈন্যবাহিনীর স্তম্ভ হচ্ছে বিখ্যাত বাগদী সেনারা। তারা দুর্গাধীপতির কন্যাকে পরমস্নেহে কাছে টেনে নিয়ে বিভিন্ন অস্ত্রচালনা এবং শারীরযুদ্ধের বিভিন্ন গোপন কৌশল শিখিয়েছে। শিখিয়েছে নৌচালনা, যুদ্ধকৌশল, জঙ্গলযুদ্ধের বিভিন্ন প্রকরণ। স্বয়ং দীননাথ শিখিয়েছেন ভল্ল এবং অসিচালনা।

অতএব এই বারো তেরো বছর বয়সেই মেয়ে বিভিন্ন অস্ত্রচালনায় রীতিমতো দক্ষ হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, তার নেতৃত্বগুণও অসাধারণ। বেশ কিছু সমবয়সি মেয়ে জুটিয়ে সে আশেপাশের এলাকা রীতিমতো ত্রস্ত করে রেখেছে।

আজ দীননাথ দুর্গে যাননি। সকালে উঠে কিছু শরীরচর্চা করে, স্নানাদি শেষ করে শাস্ত্রপাঠ করছিলেন। এমন সময় শিবশঙ্কর এসে জিগ্যেস করল, ‘দিদি কই, বাবা?’

মেয়েটি যেমন উদ্দণ্ডমার্তণ্ড, ছেলেটি আবার তেমনই নরম সরম শান্তশিষ্ট। নিজের মায়ের কোমল স্বভাব পেয়েছে। দীননাথ সেই জন্য ছেলেকে সামান্য বেশিই স্নেহ করেন। তিনি বললেন, ‘দেখ গিয়ে বনে জঙ্গলে দস্যিপনা করে বেড়াচ্ছে হয়তো। কেন, কিছু চাই?’

‘দিদি বলেছিল আমার জন্য একটা হরিণের ছানা এনে দেবে৷ কই, দিল না তো।’

দীননাথ উঠে পড়লেন। তাঁর মেয়েও তাঁর মতোই এক কথার মানুষ। ভাইকে যখন বলেছে হরিণছানা এনে দেবে, এনে দেবেই। তার মানে এখন বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে!

বনের কাছে এসে প্রথম ডাকে সাড়া না পেয়ে চিন্তিত হলেন দীননাথ। জঙ্গলটা ভালো নয়। সাপখোপ, শিয়াল, জংলি কুকুর, শিয়াল, বুনো শুয়োর, কী নেই? তবে সবার থেকে ভয়ঙ্কর হচ্ছে বুনো মোষের দল। জংলি কুকুরগুলো অবধি তাদের এড়িয়ে চলে।

দীননাথের হাতে সবসময়ই একটা বর্শা থাকে। তিনি সেইটে উদ্যত করে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লেন।

সতর্কভাবে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক যাওয়ার পর একটা মৃদু কুউউ শব্দ শুনতে পেলেন দীননাথ। তাঁর সতর্ক কান বলল, এ শব্দের উৎস কোনও পাখি নয়। বরং মানুষ। তাঁর বাগদী সেনারা জঙ্গলযুদ্ধে গেলে এই শব্দের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখে।

শব্দের উৎস অনুসরণ করে অতি অল্পসময়ের মধ্যে জঙ্গলের মধ্যেই একটি অপেক্ষাকৃত খোলা জায়গায় এসে পৌঁছলেন। একনজরেই বোঝা যায় যে অনেক পরিশ্রমের পর জায়গাটি এমন রূপ নিয়েছে। দীননাথ অনুমান করলেন, এ তাঁরই কন্যা এবং তাঁর সঙ্গীসাথীদের কর্মকুশলতার ফল।

একটু পরেই একদিকের ঝোপঝাড় প্রবলভাবে আন্দোলিত হয়ে উঠল। একটু পরেই একটি হরিণশাবকের গলা ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে দীননাথের কন্যারত্ন উপস্থিত হল।

দীননাথ চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘কোথায় ছিলিস এতক্ষণ?’

কন্যাটি একমুখ হেসে জবাব দিল, ‘এটাকে ধরতে গেছিলাম।’

‘কেন?’

‘ভাই চাইল যে।’

‘চাইলেই হল? ভাই চাইলেই তুই দৌড়ে গিয়ে একটা হরিণছানা ধরে আনবি?’

‘ভাই যে বলল পুষবে?’

‘আর হরিণছানাটার মায়ের বুঝি কষ্ট হবে না ওকে ছেড়ে থাকতে?’

মাতৃহীন মেয়ের বুকে কথাটা তিরের মতো বিঁধল। সে তো করুণচোখে হরিণছানাটির দিকে চাইল একবার। বাবাঠাকুর যে কথাটা বলেছেন অক্ষরে অক্ষরে সত্য। সে নিজে মায়ের স্নেহ পেয়েছে কি পায়নি, তার মনেও নেই। এই নিরীহ হরিণছানাটিও কি তার মতোই অভাগী হয়ে বড় হবে? এদিকে ভাইয়ের কাছে সে সত্যবদ্ধ। তাকে হরিণছানা এনে দেবে কথা দেওয়া আছে। তাহলে?

দীননাথ মেয়ের সঙ্কট বুঝলেন। তিনি স্নেহের পুত্তলিকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ওকে ছেড়ে দাও মা। আমি বরং বেত্রচণ্ডী থেকে চমৎকার কাঠের হরিণ এনে দেব ভাইয়ের জন্য, কেমন?’

একগাল হেসে ফেলে হরিণশিশুটিকে ছেড়ে দিল মেয়ে। হরিণশিশুটি তড়বড় করে দৌড়ে পালাল। তবে সে কিছুক্ষণের জন্য। একটু পরেই সে ফিরে এসে দীননাথের প্রায় পায়ের কাছে বসে ঘাসপাতা খেতে লাগল। ভঙ্গিটা যেন, কী গো, ধরেই ছেলে দিলে যে বড়? আরেকবার না ধরলে খেলব কী করে শুনি এই ধরনের।

একটু পরে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে মা হরিণী উঁকি দিল। হরিণছানা এবার ছোট্ট ছোট্ট পায়ে তার মায়ের কাছে কোলের কাছে গিয়ে মুখ গুঁজে বসে গিয়ে পরম নির্ভরতার সঙ্গে মায়ের দুধ খেতে লাগল।

দীননাথ দেখলেন, তাঁর কন্যাটি সেদিকে বুভুক্ষু চোখে চেয়ে আছে। দেখে ভারি কষ্ট হল তাঁর। তিনি অন্যদিকে মুখ সরিয়ে নিলেন।

তখনই তাঁর মনে হল যেন ঝড় উঠছে। আশেপাশের গাছের শাখাগুলি আন্দোলিত হতে থাকল। প্রথমে মৃদু, তারপর প্রবলভাবে। অথচ কোথাও কোনও বাতাসের প্রবাহ নেই। আকাশ নির্মল, নীল।

পাঠানদের অতর্কিত আক্রমণ নয় তো? চোয়াল কঠিন হল দীননাথের। আসুক ম্লেচ্ছর বাচ্চারা! যত জন পারে আসুক। আজ সবক’টাকে যদি বুনো শুয়োরের মতো পশ্চাদ্দেশে শূল ঢুলিয়ে না মেরেছেন, তবে তাঁর নামও দীননাথ চৌধুরী নয়।

কিন্তু দীননাথ সবিস্ময়ে দেখলেন তাঁর চারপাশে যে কটি দীর্ঘশীর্ষ বৃক্ষ আছে, তাঁর প্রতিটি শাখায় একটি করে তাঁরই কন্যার বয়সি বেশ কয়েকটি কন্যা উপস্থিত হয়েছে৷ তারা যেন মানুষ নয়, এক একটি শাড়ি পরিহিতা শাখামৃগ।

দীননাথের বিস্ময়ের আরও অনেক কিছুই বাকি ছিল। একটু পরেই সেই মেয়েগুলি অত্যুচ্চ শাখাপ্রশাখাগুলি বেয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে শুরু করল। দীননাথ অবাক হয়ে দেখলেন তিনি মেয়েগুলিকে শাখামৃগ ভেবে কিছু ভুল করেননি। তারা গাছের শাখাগুলি বেয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে অতি অনায়াসে। একজন এই ঝাঁপ দিল এক শাখা থেকে অন্য শাখায়! আঁতকে উঠলেন দীননাথ। কিন্তু মেয়েটি অতি অনায়াস দক্ষতায় অন্য শাখাটির প্রান্তদেশ ধরে সেটি বেয়ে উঠে গেল বৃক্ষটির শীর্ষদেশে।

দীননাথ চারিদিকে চেয়ে দেখলেন তাঁর মাথার ওপরে বৃক্ষরাজির মধ্যে দিয়ে উঁকি দেওয়া ক্ষুদ্র আকাশটি জুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে কয়েকটি অলৌকিক কন্যা। তাদের গায়ে ছিটকে পড়ছে গ্রীষ্মের রৌদ্র।

একটু পরেই তারা গাছের ডাল বেয়ে নেমে এল মাটিতে। এবার দীননাথ চিনলেন এদের। এরা সবাই তাঁর অধীনস্থ ধীবর, চণ্ডাল, ব্যাধ, পুলিন্দ, শবর সৈন্যদের মেয়েরা। এদের নিয়েই তাঁর কন্যা নিজের দল বানিয়েছে।

দীননাথের মেয়ে সবার সঙ্গে বাবার পরিচয় করিয়ে দিল, ‘ওর নাম বেতাই, ওর নাম মঙ্গলা, ওর নাম জয়া, ও মকর, ও ওলাই…’

মেয়েকে থামালেন দীননাথ। চোখ পাকিয়ে কৃত্রিম হুঙ্কার দিলেন, ‘তোরা গাছ বেয়ে অমন উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিলিস কেন?’

মেয়েগুলি ঝকঝকে দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘আমাদের উড়তে ভালো লাগে যে!’

দীননাথের কন্যা বলল, ‘বুঝলে বাবা, আমাদের গাছ বাইতে খুব ভালো লাগে। আরও ভালো লাগে এক গাছ থেকে অন্য গাছে হনুমানের মতো লাফিয়ে যেতে৷ ও পাড়ার যদুখুড়ো আমাদের কী নাম দিয়েছে জানো?’

‘কী?’

‘উড়নচণ্ডীর দল।’

দীননাথ হেসে ফেললেন। তারপর সবাইকে তাড়া দিয়ে বললেন, ‘চল চল, এই জঙ্গলে আর থাকতে হবে না। বাড়িতে নারিকেলের নাড়ু আর তক্তি আছে। সবাই খাবি চল।’

মেয়েরা লম্ফঝম্প করে দীননাথের পেছন নিল। সঙ্গে সঙ্গে চলল ছানাকে নিয়ে মা হরিণীও।

দীননাথ বাড়ি এসে দেখলেন রাজা ভূপতিকৃষ্ণর খাস পাইক রামাই দাওয়ায় তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। তার আচরণে অধৈর্য ছটফটানি। দীননাথ তাকে জিগ্যেস করলেন, ‘কী রে রামাই, তুই এখানে? কী হয়েছে?’

রামাই দীননাথকে অভিবাদন করে বলল, ‘এক্ষুনি বড় রাজবাড়ি যেতে হবে হুজুর। ছোট রাজা বেরিয়ে গেছেন। আপনাকে বলে গেছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গড় ভবানীপুড়ে পৌঁছতে।’

দীননাথ আর দেরি করলেন না। কাজের মেয়েটিকে বললেন মেয়েদের নাড়ু আর তক্তি দিতে। নিজে পোশাক পরে, কোমরে একটি তরবারি ঝুলিয়ে, পিঠে একটি বর্শা বেঁধে ঘোড়ায় চড়ে গড় ভবানীপুরের বড় রাজবাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলেন।

দীননাথ বড় রাজবাড়ি পৌঁছে দেখলেন সেখানে বিস্তর লোক জড়ো হয়েছে। রাজা রুদ্রনারায়ণ চিন্তিত মুখে পায়চারি করছেন। সেনাপ্রধান চতুর্ভুজ চক্রবর্তী উপস্থিত আছেন, উপস্থিত আছেন দেওয়ান দুর্লভ দত্ত। এছাড়াও কোষাধ্যক্ষ রামরতন সরকার, এবং রাজপরিষদের অনেক গণ্যমান্যরা উপস্থিত আছেন। রাজা রুদ্রনারায়ণের ডানদিকে বসে আছেন ভূপতিকৃষ্ণ।

দীননাথ রাজা রুদ্রনারায়ণকে প্রণাম করে সভার এক কোণে বসলেন। সভার কাজ শুরু হল।

রুদ্রনারায়ণ বললেন, ‘আজ সকালে কোতলু খাঁ’র পত্র নিয়ে তার সেনাপতি উসমান খাঁ এসেছিল। কোতলু খাঁ আবার চেষ্টা করছে পাঠানদের একত্রিত করে বাংলা বিহার দখল করার। আমাদের সাহায্য চেয়েছে।’

চতুর্ভুজ চক্রবর্তী বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ‘সে কী? এখনও তার বাংলা বিহার উড়িষ্যার সুলতান হওয়ার শখ যায়নি?’

‘না সেনাপতি মশাই, যায়নি। তার সঙ্গে এখন মাসুম খাঁ কাবুলি, ভাটির ঈশা খাঁ, কেদার রায় যোগ দিয়েছে। তার বিশ্বাস, শীঘ্রই সে আবার বঙ্গ বিহার উড়িষ্যা পুনরুদ্ধার করতে পারবে।’

সভার সবাই চুপ করে পরিস্থিতি অনুধাবন করার চেষ্টা করতে লাগলেন। ভারতের পূর্বভাগে এখন টালমাটাল সময়। চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে।

সসাগরা ভারতবর্ষ এখন শাসন করছেন সম্রাট আকবর। তিনি বাংলা বিহার উড়িষ্যা নিজের সার্বভৌম অধিকারে আনার জন্য বদ্ধপরিকর।

কয়েক বছর আগেও বাংলা বিহার উড়িষ্যার শাসনকর্তা ছিলেন সুলেইমান কররানী। সুলেইমান বিবিধ উপঢৌকন, নজরানা ইত্যাদি পাঠিয়ে আকবরকে ঠান্ডা রেখেছিলেন। সম্রাট আকবরও চক্ষুলজ্জার খাতিরে সুলেইমান কররানীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারছিলেন না। সুযোগ এল সুলেইমানের পর দাউদ খাঁ কররানী শাসক হওয়ার পর।

দাউদ খাঁ ছিলেন কূটনীতিতে অনভিজ্ঞ এবং একগুঁয়ে মানুষ। তিনি সম্রাট আকবরের অধীনতা অস্বীকার করে নিজের নামে মুদ্রা চালু করলেন এবং খুতবা পাঠ করালেন। এইবার আকবরের হাতে বাংলা অধিকারের সুবর্ণ সুযোগ এল। তিনি মুনিম খাঁ নামে তাঁর এক বিশ্বস্ত সঙ্গীকে খান-ই-খানান উপাধি দিয়ে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করে

বাংলায় পাঠালেন, সঙ্গে রাজা তোডরমল্ল। বহুদিন ধরে বহু যুদ্ধের পর কটকের যুদ্ধে দাউদ খাঁ পরাস্ত হলেন। তিনি শুধু উড়িষ্যা শাসন করার অধিকার পেলেন, বাংলা আর বিহার সুবা’র সুবেদার নিযুক্ত হলেন মুনিম খাঁ।

কররানীরা গৌড়ের রাজধানী তাণ্ডায় সরিয়ে নিয়ে গেছিলেন। মুনিম খাঁ রাজধানী আবার লক্ষ্ণৌতিতে নিয়ে এলেন। বিজয়গর্বে অন্ধ মোগল সৈন্যরা গৌড়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কমলা’র মন্দির অপবিত্র করল। দেবী ক্রুদ্ধ হয়ে গৌড় ত্যাগ করলেন। গৌড় নগরীতে ছড়িয়ে পড়ল দুরারোগ্য মহামারী। দলে দলে মানুষ মরতে লাগল। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে দেহ সৎকার করার লোক পাওয়া দুষ্কর। চৌদ্দ জন মোগল সেনাপতি সহ বহু উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী মৃত্যুমুখে পতিত হলেন। এমনকী মুনিম খাঁ স্বয়ং দশদিন রোগভোগের পর ইহলীলা সংবরণ করলেন।

দাউদ খাঁ দেখলেন, এই সুযোগ। তিনি আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেছিলেন যে এই কয়েক বছরে বাংলার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি আমূল বদলে গেছে। পরিস্থিতি আর তাঁর অনুকূলে নেই।

ইতিমধ্যে বাংলায় কয়েকজন ভুঁইয়া বড় প্রবল হয়ে উঠেছিলেন। এদের মধ্যে মুখ্য ভুঁইয়া ছিলেন তাহেরপুরের কংসনারায়ণ, ভাদুড়িয়ার জগৎনারায়ণ, সাঁতোরের গদাধর সান্যাল, সিন্দুরীর ঠাকুর কালিদাস রায় এবং দিনাজপুরের গোপীকান্ত রায়। এই ভুঁইয়ারা এককালে বাংলায় পাঠান শাসনের মস্ত সহায় ছিলেন। কিন্তু একটি বিশেষ ঘটনার পর এঁরা সদলবলে পাঠান পক্ষ ত্যাগ করে মোগলপক্ষ অবলম্বন করেন। আর সেই কারণটি হলেন একজন মানুষ।

রাজীবলোচন রায়, অর্থাৎ কালাপাহাড়।

রাজা শ্রীমন্তনারায়ণের বংশ চিরকালই বীরের বংশ৷ সেই বংশের চতুর্থ পুরুষ হলেন দুইজন, গোপীমোহন রায় এবং রাজীবলোচন রায়। রাজীবলোচন রায়ের বীরত্ব এবং অসাধারণ সাহসিকতা দেখে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র লোকে বলাবলি করত যে স্বয়ং শ্রীমন্তনারায়ণ দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি এমনই অমিত বলশালী ছিলেন যে মত্ত মহামাতঙ্গকে কেবলমাত্র তার শুণ্ড আকর্ষণ করে বশীভূত করতে পারতেন।

উড়িষ্যাধীপ মুকুন্দদেবের সঙ্গে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রুদ্রনারায়ণের মিত্রতা চুক্তি ছিল। সুলেইমান কররানী একবার গড় মান্দারণ অধিকার করতে এসে রাজীবলোচনের নেতৃত্বাধীন উড়িষ্যা-ভূরিশ্রেষ্ঠর যৌথবাহিনীর কাছে পর্যুদস্ত হন। রাজীবলোচনের পরাক্রম দেখে সুলেইমান একটি কঠিন সত্য হৃদয়ঙ্গম করেন, যতদিন রাজীবলোচন বিপক্ষে আছেন ততদিন উড়িষ্যাবিজয় তাঁর কাছে স্বপ্নই থেকে যাবে৷

কুশলী নরপতি মনুষ্যচরিত্র সম্পর্কে সবিশেষ অবগত ছিলেন৷ তিনি মৈত্রী স্থাপনের ছলনায় রাজীবলোচনকে তাণ্ডায় ডেকে আনেন! কন্যা দুলারি বেগমের সঙ্গে কৌশলে রাজীবলোচনের পরিচয় করিয়ে দেন।

শাস্ত্রে ঘৃত এবং অগ্নির একত্রস্থাপনের কথা কে না জানে! এক্ষেত্রেও তাই হল। রাজীবলোচন সুলতানতনয়ার প্রেমে পড়লেন। তিনি দুলারি বেগমকে নিজ ঘরনির সম্মান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু হিন্দু সমাজে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হল। হিন্দু সমাজপতিরা, বিশেষত রাজা মুকুন্দদেব এর ঘোর বিরোধিতা করলেন।

কিন্তু রাজীবলোচন সামান্য পুরুষ ছিলেন না। তাঁর সিদ্ধান্ত পর্বতের মতো অটল ছিল। জেদী এবং প্রতিজ্ঞায় অটল রাজীবলোচন সুলতানতনয়ার প্রেমে অন্ধ হয়ে শেষাবধি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করলেন। সুলেইমান কররানীর গোপন অভিলাষ পূর্ণ হল। বাংলায় হিন্দুরাজত্ব প্রতিষ্ঠার আশাবহ্নি দ্বিতীয়বারের জন্য নির্বাপিত হল।

এরপরের ইতিহাস শুধু রক্তপাত আর হিন্দুধর্মের লাঞ্ছনার ইতিহাস। ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজবংশের কুলপ্রদীপ, মহাতেজা, মহাবীর হিন্দুসূর্য রাজীবলোচন রায় তীব্র হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে হিন্দু মন্দির ধ্বংসে মেতে উঠলেন। কাশী থেকে কামাখ্যা হয়ে শ্রীক্ষেত্রের শ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির, কিছুই অক্ষত রইল না। কালাপাহাড় জগন্নাথদেবের দারুবিগ্রহ ত্রিবেণীতে নিয়ে এলেন। সেখানে গঙ্গার ঘাটে শত শত ধর্মপ্রাণ হিন্দুর সামনে সেই মূর্তি খণ্ডবিখণ্ড করে তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন।

শুধু রক্ষা পেল ভূরিশ্রেষ্ঠ’র যাবতীয় মন্দির। না, নিজের জন্মভূমিতে কোনও হত্যালীলা বা ধ্বংসকার্য চালাননি কালাপাহাড়। মাতৃভূমির প্রতি কোথাও কি কোনও গুপ্তটান লুকিয়ে ছিল ওই ধর্মত্যাগী কালাপাহাড়ের বুকে?

এতদিন ধরে যে হিন্দু ভূম্যধিকারীরা পাঠান সুলতানদের রাজসহায়ক হয়ে সার্বিক সমর্থন জুগিয়ে গেছিলেন, কালাপাহাড় কাণ্ড এঁদের তীব্র পাঠান বিদ্বেষী করে তুলল। এঁরা গোপনে সম্রাট আকবরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুলতানী শাসনের বিরুদ্ধে ইন্ধন জোগাতে লাগলেন। মারি অরি পারি যে কৌশলে! দাউদ খাঁ’র অবিমৃষ্যকারিতা সম্রাট আকবরের সামনে বঙ্গ বিহার উড়িষ্যা জয়ের সুবর্ণ সুযোগ এনে দিল।

মুনিম খাঁ’র এন্তেকালের পর দাউদ খাঁ অবশিষ্ট কিছু পাঠান দলপতিদের একত্রিত করে আবার বিদ্রোহী হলেন। এবার সম্রাট আকবর হোসেন কুলী খাঁ’কে খান ই জাহান উপাধি দিয়ে পাঠালেন দাউদ খাঁ’কে দমন করতে। অবশেষে দুই পক্ষ আকমলের পার্বত্য অঞ্চলে একে অপরের সম্মুখীন হলেন।

সেই ঘোরযুদ্ধে দাউদ খাঁ সবংশে নিহত হলেন। তাঁর পুত্র জুনেইদ খাঁ মারা গেলেন মোগল বাহিনীর গোলার আঘাতে। জাহান খা, মুজফফর আলি, কালাপাহাড় সহ অন্যান্য পাঠান দলপতিরা প্রবল বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শাহাদাৎ বরণ করলেন। বাংলায় পাঠান আধিপত্য নিশ্চিহ্ন হল।

কিন্তু এই পরাজয়ের পেছনে একটি গুহ্য কারণ ছিল। ক্রমে সেই কাহিনী প্রকাশ্যে আসছে।

কোতলু খাঁ ছিলেন দাউদ খাঁ কররানীর অন্যতম প্রধান সেনাপতি। আকমহলের যুদ্ধের নির্ণায়ক দিনে, যেদিন যেদিন দাউদ ধৃত হলেন হোসেন কুলী খাঁ’র সৈন্যদের হাতে, সেদিন কোতলু খাঁ’র উপর নির্দেশ ছিল রাজমাতঙ্গ বাঘদলনকে নিয়ে মোগল সেনানীর দক্ষিণভাগ আক্রমণের। কিন্তু কোতলু খান লোহানীকে সেদিন কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে দেখেনি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যেন উধাও হয়ে গেছিলেন দাউদ খাঁ কররানীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপ্রধান!

সেদিন কোথায় গেছিলেন তিনি?

উত্তর পাওয়া গেল কয়েকদিনের মধ্যেই। যখন হোসেন কুলী খাঁ কোতলু খাঁ’কে উড়িষ্যার শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ করলেন। আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতে লাগল ছবিটা।

সেই কোতলু খাঁ রুদ্রনারায়ণের কাছে সংবাদ পাঠিয়েছে মোগলদের বিরুদ্ধে সাহায্য চেয়ে অবিশ্বাস্য ব্যাপার!

দুর্লভ দত্ত বললেন, ‘কিন্তু তার এত সাহস হল কোথা থেকে?’

চতুর্ভুজ বললেন, ‘সাহস আজ থেকে নয়, অনেক দিন থেকেই হচ্ছে দত্ত মশাই। পাঠান হচ্ছে বিষাক্ত কেউটের জাত। একেবারে নির্মূল না করলে বার বার ফণা তুলবেই। হোসেন কুলী খাঁ’র সময়ে এই কোতলু খাঁ গর্তের মধ্যে কুণ্ডলী গুটিয়ে ছিল। ফণা বার করে মুজফফর খাঁ’র সময় থেকেই। চারিদিকে চর পাঠিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিল সে। মীর্জা আজিজ কোকার সময় থেকেই সে আবার উড়িষ্যার গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে। কালীগঙ্গার লড়াইতে হেরে হয়েও তার শিক্ষা হয়নি। তারপর মাসুম খাঁ কাবুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সপ্তগ্রামের মীর্জা নাজাৎকে কম নাস্তানাবুদ করেছিল কোতলু খাঁ? মীর্জা নাজাৎ কোনওক্রমে পর্তুগিজদের কাছে পালিয়ে তার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।’

ভূপতিকৃষ্ণ বললেন, ‘কিন্তু শাহবাজ খাঁ তো কোতলু খাঁ’কে বোতলে পুরে ফেলেছিলেন শুনেছিলাম।’

শাহবাজ খাঁ হলেন মীর্জা আজিজ কোকার পর নিযুক্ত বাংলার সুবেদার। তিনি কোতলু খাঁ’কে মোগলমারির যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন বটে, কিন্তু কোতলু খাঁ’র প্রাণবধ করেননি, তাকে নিরাপদে উড়িষ্যাতে পালাতে দিয়েছিলেন। সেই অপরাধে সম্রাট আকবর তাঁকে কারাদণ্ড দেন।

রুদ্রনারায়ণ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘শাহবাজ মানুষটা ভালো ছিলেন, বীর ছিলেন, কিন্তু বিচক্ষণ ছিলেন না। নইলে ঈশা খাঁ, কোতলু খাঁ, মোগল সাম্রাজ্যের এমন দুর্দান্ত ধূর্ত শত্রুদের পরাস্ত করে কেউ ছেড়ে দেয়?’

দুর্লভ দত্ত বললেন, ‘তা কোতলু খাঁ এখন আছে কোথায়?’

উত্তর দিলেন ভূপতিকৃষ্ণ, ‘আমার চরেরা সংবাদ এনেছে সে এখন রায়পুর দুর্গে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। চারিদিক থেকে পাঠান দলপতিরা দলে দলে গিয়ে তার সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। আমাদের এখনই সতর্ক হওয়া দরকার।’

রায়পুর দুর্গ গড় মান্দারণ থেকে প্রায় পঁচিশ ক্রোশ উত্তর পূর্বে। সেখান থেকে গড় মান্দারণ আক্রমণ করা কোনও ব্যাপার না।

‘আর রাজা মানসিংহ?’

শাহবাজ খাঁ’র পর বাংলার সুবেদার হয়েছিলেন ওয়াজির খাঁ হেরেবি। কিন্তু তাণ্ডার অস্বাস্থ্যকর জলবায়ু তাঁর সহ্য হল না। এক বছরের মধ্যে তাঁর এন্তেকাল হল। অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে সম্রাট আকবর তাঁর প্রধান সহায় অম্বরাধিপতি মানসিংহকে বঙ্গদেশে পাঠিয়েছেন পাঠান দমনে। সঙ্গে তাঁর তিন সুযোগ্য পুত্র, হিম্মৎসিং, দুর্জনসিং এবং জগৎসিং।

রুদ্রনারায়ণ বললেন, ‘তিনি এখন জাহানাবাদে দারুকেশ্বরের তীরে শিবির ফেলেছেন। বাংলার সালার-এ-সুবা সৈয়দ খাঁর কাছে বলে পাঠিয়েছিলেন যে, সৈয়দ খাঁ যেন সসৈন্যে সেখানে পৌঁছে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। কিন্তু গোপন সূত্রের সংবাদ এই যে সৈয়দ খাঁ জানিয়েছেন সৈন্য জোগাড় করে আসতে তাঁর একটু বিলম্ব হবে। একে তাণ্ডা আর লক্ষ্ণৌতি মহামারীতে প্রায় জনশূন্য। তার ওপর বর্ষা আসন্ন। খাঁ সাহেব বলে পাঠিয়েছেন রাজা মানসিংহ যেন বর্ষাকালটা ওখানেই অবস্থিতি করেন।’

‘হুঁ। এখন কোতলু খাঁ’র বক্তব্য কী?’

‘সে চাইছে রায়পুর দুর্গ থেকে পাঠান সৈন্যদের নিয়ে রাজা মানসিংহ-এর জাহানাবাদের শিবিরে অতর্কিতে হামলা চালাবে। আমরা যেন তাকে সাহায্য করি।’

‘আর এই প্রস্তাবে সম্মত না হলে?’

‘তাহলে আগে ভূরিশ্রেষ্ঠ, পরে জাহানাবাদ।’

ভূপতিকৃষ্ণ ক্রুদ্ধভাবে উঠে দাঁড়ালেন, ‘কী এত সাহস ওই পাঠানের বাচ্চাটার? আসুক একবার! ওর যুদ্ধ করার সাধ জন্মের মতো মিটিয়ে দেব।’

চতুর্ভুজ ইঙ্গিতে বসতে বললেন ভূপতিকৃষ্ণকে, ‘অত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই কুমার। যুদ্ধ জেতা হয় বুদ্ধি আর কূটকৌশলে, আবেগ দিয়ে নয়। শত্রুকে দুর্বল ভাবে বোকারা।

কোতলু খাঁ’র সঙ্গীসাথীরা কেউ সামান্য যোদ্ধা নয়, প্রত্যেকেই সমরকুশল সেনাপতি। তাছাড়া তার হস্তীবাহিনী দুর্ধর্ষ। রণশৃঙ্গার, বাঘদলন, বালসুন্দর, এরা আকারে যেন পর্বতপ্রমাণ, তেমনই সুশিক্ষিত। রাজা মানসিংহ এমনি এমনি গোলন্দাজ বাহিনী আনাননি বেহার থেকে। আমাদের এখন কৌশল করে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে।’

রুদ্রনারায়ণ সমর্থন করলেন তাঁর সেনাপতির কথা। তারপর বললেন, ‘আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয়েছে। কোতলু খাঁ এই আমন্ত্রণ কি শুধু আমাদেরই পাঠিয়েছে? না কি অন্য কোনও রাজা বা ভুঁইয়াদেরও?’

দুর্লভ দত্ত বললেন, ‘যদি পাঠিয়েও থাকে, তাহলে তেমন আর একজনই আছেন।’

‘কে?’

‘মল্লভূমের রাজা হাম্বীর মল্লদেব।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *