কপালি মা
নিজের কুটিরের মধ্যে চিন্তিতমুখে পদচারণা করছিলেন এক যুবক। তাঁর মুখখানি যেমন সুন্দর তেমনই কর্তৃত্বব্যঞ্জক। যুবকের বর্ণ গৌর, দেহ সুগঠিত ও এবং দৃষ্টি খর। পরনে একটি ধুতি, পায়ে খড়ম। অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গে একটি উপবীত, দেখে বোঝা যায় ইনি জাতিতে ব্রাহ্মণ সন্তান।
কুটিরটি একটি গভীর অরণ্যের মধ্যে। একটু দূরে রোণ নদী। অরণ্যের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গিয়ে আরও দেড় ক্রোশ দূরে সে মিশেছে দামোদরের বুকে।
এই অঞ্চলের নাম দিলাকাশ। স্থানটি ভাগীরথীর দশ ক্রোশ পশ্চিমে, হিন্দুদের মহাপবিত্র তীর্থক্ষেত্র তারকেশ্বরের প্রায় চার ক্রোশ দক্ষিণে। অরণ্যটি এই দিলাকাশের প্রায় মধ্যস্থলে অবস্থিত। দিলাকাশে যে কটি গ্রাম আছে তার বাসিন্দারা বেশিরভাগই বাগদি, দুলে এবং অন্যান্য অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষ। কয়েক ঘর ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থও আছেন বটে, তবে সংখ্যায় অল্প৷ তবে বনভূমি নির্জন নয়। তার কারণ এখানে বাস করেন দিলাকাশের অধিপতি স্বয়ং, দুর্দান্ত বাগদী নরপতি শনিভাঙড়।
শনিভাঙড়ের সৈন্যদল ক্ষুদ্র নয়। বাগদীরা তো আছেই, আর আছে ভীষণদর্শন, দুর্ধর্ষ, অপ্রতিরোধ্য চণ্ডাল সৈন্যবাহিনী। এই অঞ্চল তারাই শাসন করে। এককালে লুটপাট করা ছাড়া তাদের আর কোনও কাজ ছিল না। তবে এখন অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। তার পিছনে এই সুদর্শন যুবকের অবদান অনেকখানি৷
কী করে এই ব্রাহ্মণ যুবক ডাকাতদলে এলেন, তার পিছনে এক রোমহষর্ক কাহিনী আছে।
শনিভাঙড়ের মতো দুর্ধর্ষ কঠিন মানুষকেও যিনি বশ করে রেখেছেন, তিনি শনিভাঙড়ের গুরুদেব অঘোরবজ্র। ইনি একজন বজ্রযানী কাপালিক। গুরুর আদেশ, অনুমতি বা পরামর্শ ছাড়া শনিভাঙড় কোনও কাজে হাত দেন না।
অঘোরবজ্র সচরাচর নিজের সাধনায় ব্যস্ত থাকেন। তাঁর সারাদিন কাটে পূজা আর তান্ত্রিক আচার আরাধনায়। তাঁর সাধনার চূড়ান্ত দিন হল অমাবস্যা। ওইদিন তিনি স্বহস্তে দেবীর সামনে নরবলি দেন।
শনিভাঙড়ের সৈন্যদের অন্যতম কাজ হল এই বলির জন্য আশেপাশের গ্রাম থেকে সুলক্ষণযুক্ত বালক বা কিশোরকে ধরে আনা। গ্রামবাসীদের অনুরোধ, প্রতিরোধ, হতভাগ্য বালকের পিতামাতার আর্তচিৎকার, কান্না কিছুই তাদের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। ওই দুর্দমনীয় দলের কবল থেকে নিজেদের সন্তানকে ছিনিয়ে আনবে এমন ক্ষমতা কারো নেই।
আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে এমনই এক বালককে ধরে নিয়ে এসেছিল শনিভাঙড়ের অনুগত চণ্ডালসৈন্যরা। কিন্তু সেবার এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। বালকটিকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে গুরু বলেছিলেন, ‘এর দেহে আশ্চর্য রাজলক্ষণ দেখতে পাচ্ছি শনি। একে বলি দেব না। তুই একে সন্তানস্নেহে লালন পালন কর। তোর ভালো হবে।’
সেই কিশোরই আজকের এই যুবক। নাম চতুরানন নিয়োগী। চতুরানন ক্রমেই শনিভাঙড়ের দক্ষিণহস্ত হয়ে উঠেছেন, শাসনের প্রধান সহায়৷ তিনি সাহসী, বুদ্ধিমান এবং স্থির মস্তিষ্কের মানুষ। চতুরানন জানেন যে শাসকের আধিপত্যের মূল উৎস হচ্ছে শ্রদ্ধা, ভয় নয়। হিংসা থেকে ভয় আসে, ভয় থেকে বিদ্বেষ। শুধুমাত্র অস্ত্রের জোরে কোনও রাজত্ব স্থাপন করা যায় না। রাজ্যশাসনের মূল স্তম্ভ হল শাসকের প্রতি শাসিতের সম্ভ্রমমিশ্রিত আনুগত্য।
তাই ধীরে ধীরে অরণ্য কেটে বসতি স্থাপন করেছেন চতুরানন। বাগদি ও চণ্ডাল সৈন্যদের ভূমিদান করে লুটপাটের পথ থেকে সরিয়ে এনে কৃষিকার্যে ব্যাপৃত করেছেন। রাজকর হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন উৎপন্ন ফসলের এক চতুর্থাংশ অরণ্য। প্রজাদের শিখিয়েছেন পশুপালন। অধিবাসীদের পীড়া শান্তির জন্য দেশে বৈদ্যদের এনে বাসস্থান এবং ভূমিদান করেছেন। দিলাকাশ এবং সন্নিহিত অঞ্চলে এখন অখণ্ড শান্তি ও সমৃদ্ধির পরিবেশ।
শুধু পারেননি একটি কাজ। নরবলি বন্ধ করা।
শনিভাঙড় এখন প্রৌঢ় হয়েছেন। তিনি রাজ্য শাসনের ভার পালিত পুত্র চতুরাননের হাতে ছেড়ে বিলাসী জীবন যাপন করছেন। দিনরাত মদ্যপান করেন আর মাঝেমধ্যে বিশ্বস্ত সঙ্গীদের নিয়ে শিকারে যান। শুধু একটি জিনিস তিনি আজও ত্যাগ করেননি। গুরুর প্রতি অবিচল অকুণ্ঠ আনুগত্য। সেই যে যৌবনের প্রারম্ভে গুরুর পদপ্রান্তে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই আশ্রয় আর ছাড়েননি। অঘোরবজ্র’র প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাভক্তি এখনও অটুট৷
অঘোরবজ্র এখন বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে৷ তবে তাঁকে দেখে বয়েস বোঝা যায় না। কোন এক আশ্চর্য কৌশলে তাঁর বয়েস যেন থমকে আছে৷ শুধুমাত্র চুলে সামান্য পাক ধরেছে, আর চামড়া সামান্য শিথিল। এটুকু বাদ দিলে এখনও তাঁকে দেখে কোনও বলশালী যুবকের থেকে কম কিছু মনে হয় না।
সদ্য তাঁর এক সাধনসঙ্গিনী জুটেছে। মহিলা যৌবনোত্তীর্ণা হলে কী হবে, এমন যৌন আবেদনময়ী নারী এই অঞ্চলে কেউই কোনওদিন দেখেনি। তার ওপর ইনি যেমন স্বাধীনচেতা, তেমনই হিংস্র, দুর্দান্ত এবং কোপনস্বভাবা।
কথিত আছে, শনিভাঙড়ের অনুগত সৈন্যদের মধ্যে কোনও এক অর্বাচীন যুবক একবার আকণ্ঠ মদ্যপান করে এঁকে নির্জন অরণ্যের মধ্যে পিছন থেকে জাপটে ধরেছিল। তিনি তখন সন্ধেবেলা নদী হতে স্নান করে কুটিরে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। আক্রান্ত হয়ে বিন্দুমাত্র চিৎকার করেননি তিনি। শুধু ডানহাত দিয়ে সেই হতভাগ্যের ডানচোখের
মণিটি খুঁটে তুলে আনেন ও সেটি মুখে ফেলে চুষতে চুষতে কুটিরের দিকে রওনা দেন। সেই থেকে আর কেউ এঁকে কুদৃষ্টিতে দেখার সাহস করেনি।
লোকে বলে ইনি মানুষ নন, ডাকিনী। অনেকেই নাকি এঁকে দেখেছে রাত্রিবেলা অরণ্যের মাথার উপর দিয়ে ঈশান কোণের দিকে উড়ে যেতে। তিনি নাকি মন্ত্রোচ্চারণ করে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করতে পারেন। সর্পবিষ নিবারণ করতে পারেন। পারেন বন্ধ্যা গাভীকে গর্ভিণী করতে। এমনই সব বিচিত্র লোকগাথা ঘুরে বেড়ায় এই নারীকে ঘিরে।
এই নারীটির সঙ্গে কয়েকবার দেখা হয়েছে তাঁর। প্রতিবারই তিনি এমন বুভুক্ষু চোখে তাকিয়ে থাকেন চতুরাননের দিকে যে, ভারি অস্বস্তি হয় তাঁর৷ সেই নিঃশঙ্ক, নির্দ্বিধ কামদৃষ্টি অনায়াসে পড়তে পারেন চতুরানন। তিনি জানেন, ওই নারী কী চান তাঁর কাছে।
এহেন অঘোরবজ্র এখনও প্রতি অমাবস্যায় দেবীর উদ্দেশে নরবলির প্রথা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন। তবে কতদিন আর পারবেন জানেন না। কারণ চতুরানন এই নরবলি প্রথার ঘোর বিরোধী৷ তিনি বিশ্বাস করেন না, কোনও দেবীকে প্রসন্ন করার জন্য নরবলির প্রয়োজন আছে। এই নিয়ে তিনি অনেকবার শনিভাঙড়ের কাছে অনুযোগ করেছেন। কিন্তু শনিভাঙড়ের স্পষ্ট কথা, চতুরানন যেভাবে চায় তার শাসন চালাতে পারে। কিন্তু গুরুদেবের ধর্ম-কর্মে যেন ব্যাঘাত না ঘটে।
সেই থেকে চতুরানন আর অঘোরবজ্র, দুজনের মধ্যেই ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে একটা অদৃশ্য টানাপোড়েন চলছে।
তবে একটি কাজ করতে পেরেছেন চতুরানন। এখন তাঁর শাসনাধীন অঞ্চল থেকে নরবলির জন্য কিশোর বা বালক সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এখন শনিভাঙড়ের দলকে অনেক দূর দূর যেতে হয় বলির উপযুক্ত পাত্রের সন্ধানে।
অঘোরবজ্র সদ্য একটি অদ্ভুত মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন অরণ্যের মধ্যে। সেই মন্দিরে স্থাপনা করেছেন তাঁর আরাধ্যা দেবীর মূর্তি। অঘোরবজ্র’র সাধনসঙ্গিনীর সঙ্গে সেই দেবীমূর্তির আশ্চর্য সাদৃশ্য। এখনও সেই মন্দিরে পূজাপাঠ শুরু হয়নি। আগামীকাল অমাবস্যা, মন্দির ও দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার দিন। গতকাল রাতে একটি কিশোরকে ধরে আনা হয়েছে অনেক দূরের এক গ্রাম থেকে। অঘোরবজ্র’র নতুন মন্দিরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দেবীমূর্তির সামনে প্রথম নরবলি হবে।
প্রতি অমাবস্যার দিন সকাল থেকেই বড় উচাটনের মধ্যে থাকেন চতুরানন। আজ আবার কোনও এক হতভাগ্য পিতামাতার কোল খালি হবে। দূর গ্রামের কোনও এক কুটিরে আজ সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলবে না, বাজবে না মঙ্গলশঙ্খ। কোনও মায়ের করুণ কান্নার সুর মিশে যাবে বিষণ্ণ বাতাসে।
এইদিনে বার বার নিজের কথা মনে পড়ে চতুরাননের। যেদিন তাঁকে ধরে আনা হয়েছিল সেই সুদূর গ্রাম থেকে, সেইদিন আছাড়িপিছাড়ি করে কাঁদছিলেন তাঁর বাবা-মা। শনিভাঙড়ের পাঠানো পাইকদের দু’পা জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁরা, বারবার প্রাণভিক্ষা চাইছিলেন নিজের সন্তানের। তাঁর একটি ছোট বোন ছিল। ভয়ে পাথর হয়ে গেছিল সে। বিস্ফারিত চোখে দেখছিল তার বাবার বুকে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর লোকগুলো। মা’কে চুলের মুঠি ধরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার ভাইয়ের থেকে। গ্রামের লোকেরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দূরে দাঁড়িয়েছিল। তাদের সাহস হয়নি এই চণ্ডরুষ্ট সৈন্যদলকে বাধা দেওয়ার।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন চতুরানন। কে জানে, তার মা-বাবা কেমন আছেন এখন। হারিয়ে যাওয়া সন্তানের কথা কি আর মনে পড়ে তাঁদের? সাঁঝবেলায় যখন তাঁর মা একটি প্রদীপ জ্বেলে দেন তুলসীমঞ্চের সামনে, তখন কি সন্ধ্যাতারার দিকে তাকিয়ে নিজের অভাগা ছেলেটির কথা মনে পড়ে তাঁর?
ক্রমেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসে চতুরাননের। নাহ্, এ চলতে পারে না। এই অনর্থ বন্ধ করতেই হবে। দরকার হলে বলির জন্য যে বালকটিকে ধরে আনা হয়েছে, তাকে চুরি করে তার মা বাবা’র কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। যে-কোনও মূল্যে।
আর সেটা হতে হবে এবারেই, আগামীকাল, এই অমাবস্যাতেই।
কিন্তু মুশকিল এক জায়গাতেই। বলিপ্রদত্ত বালকটিকে কোথায় রাখা হয়েছে কেউ জানে না। সে এক অজানা কুটিরে বন্দী। খুব সম্ভবত তার প্রহরায় নিযুক্ত আছে একটি ক্ষুদ্র চণ্ডালদল, যাদের শনিভাঙড়ের প্রতি আনুগত্য প্রশ্নাতীত। না, শনিভাঙড় আর সমস্ত কর্মের ভার চতুরাননের হাতে সমর্পণ করলেও এই একটি কাজের দায়িত্ব নিজের হাতে রেখেছেন। যতদিন তিনি বেঁচে আছেন, গুরুদেবের ধর্মাচরণের সমস্ত ভার তাঁর। তিনি বোধহয় কিছু আন্দাজ করেছেন। তাই বলিপ্রদত্ত বালকটিকে তিনি এমন কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন যে, চতুরাননের দল অনেক খোঁজ করেও তার সন্ধান পায়নি।
দরজায় মৃদু করাঘাত হল। চতুরানন গলা তুলে বললেন, ‘কে ওখানে? ভেতরে এসো।’
একটি নবীন কিশোর সন্তর্পণে ভেতরে প্রবেশ করেই দরজা বন্ধ করে দিল। চতুরানন প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার রামা?’
রামা হচ্ছে চতুরাননের দক্ষিণহস্ত। এই বয়সে এমন চতুর, চটপটে এবং কর্মঠ ছেলে দেখা যায় না বললেই চলে। তার ওপর তার উদ্ভাবনীকৌশলও বিচিত্র এবং অভিনব।
রামা ফিসফিস করে বলল, ‘ছেলেটার খোঁজ পেয়েছি ঠাকুর।’
শনিভাঙড়ের দলের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত নবীন বা চতুরাননের দ্বারা উপকৃত, তারা প্রকাশ্যে না হলেও অপ্রকাশ্যে এই সংবেদনশীল বুদ্ধিমান ব্রাহ্মণ যুবককেই নেতা বলে মানে। রামা ডোম তাদের মধ্যে অন্যতম।
চতুরানন উত্তেজিত হয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোথায়?’
‘সর্দারের কুটিরে।’
অবিশ্বাসের চোখে খানিকক্ষণ রামার দিকে চেয়ে রইল চতুরানন। তারপর জিগ্যেস করলেন, ‘ঠিক শুনেছিস?’
অবিশ্বাসের কারণ আছে বৈ কি। আজ অবধি বলির জন্য যাদের ধরে আনা হয় তাদের জন্য নির্দিষ্ট কুটির আছে। বলির আগে অনেক তান্ত্রিক ক্রিয়া প্রক্রিয়া থাকে। অঘোরবজ্র সেসব প্রক্রিয়া সেই কুটিরেই সম্পন্ন করেন। এইবার সেই নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে। বলির পাত্রকে এনে রাখা হয়েছে স্বয়ং শনিভাঙড়ের কুটিরে!
এর একটাই অর্থ হয়। অঘোরবজ্র’র দল ভয় পেয়েছে। তারা কোনওভাবে আঁচ পেয়েছে যে এবার চতুরানন আর তার দল এত সহজে ছেড়ে দেবে না। তাই কোনও ঝুঁকি না নিয়ে বালকটিকে স্বয়ং সর্দারের ঘরে রেখেছে। তারা জানে চতুরানন যতই চতুর, যতই দুঃসাহসী হোক না কেন, শনিভাঙড়ের ঘর থেকে তাঁর গুরুর বলির পাত্রকে চুরি করে নিয়ে যাবে এমন স্পর্ধা হবে না।
চতুরানন খানিকক্ষণ অস্থির পদচারণা করলেন৷ তারপর বাঁহাতের তালুতে একটা ঘুঁষি মেরে বললেন, ‘ওই নিষ্ঠুর কাপালিক শেষ পর্যন্ত এই ধূর্ততা করল? ছি ছি ছি। এই বলে রাখছি রামা, আমি যদি এই কাপালিক আর ওর পোষ্য বেশ্যাটির মুণ্ড আর ধড় আলাদা করে দামোদরের জলে ভাসিয়ে না দিই, তবে তোরা আমার নামে…’
রামা মৃদুস্বরে বলল, ‘আর যাই করুন কাপালি মা’কে গালমন্দ করবেন না ঠাকুর।’
‘কেন শুনি?’
‘ওঁকে দেখে এমন পাগলি পাগলি মনে হয় বটে, কিন্তু উনি খুব ভালো মানুষ, ঠাকুর। উনি আমাকে বলেছেন, উনিও চান যে অঘোরঠাকুরের এই নরবলি বন্ধ হোক।’
‘আচ্ছা? বিড়াল বলছে আঁশ ছোবে না, মাছ খাবে না, কাশী যাবে? মাগি দিন রাত অঘোরঠাকুরের শয্যায় একবার সোজা হয়ে, আরেকবার উলটো হয়ে শুচ্ছে, আর বলছে নরবলি বন্ধ করতে চায়? আর তুই সেটা এককথায় সত্যি বলে মেনে নিলি?’
রামা বলল, ‘কাপালি মা মিথ্যে বলেন না ঠাকুর।’
ভ্রু কুঁচকোলেন চতুরানন। কোপান্বিত স্বরে বললেন, ‘বটে? সেই মাগি তোরও মন জয় করে নিয়েছে তাহলে? বেশ্যামাগির পিরিতের আঠা বড় শক্ত দেখছি।’
রামা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ধমকে ওঠেন চতুরানন, ‘কী রে, চুপ করে আছিস কেন? বল কিছু? নাকি তুইও তলে তলে ওদিকে যোগ দিয়েছিস?’
রামা মাথা তোলে না। অস্ফূটে বলে, ‘কাপালি মা আমাকে ছেলে বলে ডেকেছেন ঠাকুর। ওঁর নামে গালমন্দ কোরো না, দোহাই তোমার।’
‘বটে?’
‘হ্যাঁ ঠাকুর। আরও একটা কথা আছে।’
‘কী?’
রামা আরও কাছে ঘনিয়ে আসে। ফিসফিস করে কিছু বলতে থাকে। শুনতে শুনতে ক্রমেই চোখ বিস্ফারিত হতে থাকল চতুরাননের।
গভীর রাত। একে কৃষ্ণা চতুর্দশী, তার ওপর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। অরণ্যের প্রতিটি কোণ এখন নিদ্রাভিভূত। এমনকী রাতচরা পাখিদের ডাকও শোনা যায় না।
রোণ নদীর তীরে তমসাচ্ছন্ন অন্ধকার। আজ কোনও কারণে বাতাস সম্পূর্ণ স্থির৷ চরাচর নিঃস্তব্ধ।
কিছুক্ষণ পর দেখা গেল তীরদেশের সন্নিকটস্থ একটি অতি বৃহৎ, অতি প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের নীচে কে যেন একটি অতি ক্ষীণ আলো জ্বেলেছে।
হেমন্তের শেষ। ক্ষীণতোয়া রোণের তীরে শুয়ে আছে শুষ্ক শষ্পের বিষণ্ণশয্যা। একটু পর তার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটি ছায়াশরীর। একটি ক্ষীণ মশাল জ্বলে উঠল কিছুক্ষণ পর৷ একজন সেই মশাল নদীর দিকে তুলে ধরে আন্দোলিত করতে থাকল। সেই দেখে রোণের অন্য পাড় হতে একটি শালতি ভেসে পড়ল নদীর জলে।
রোণ ক্ষুদ্র নদী। বেগবান শালতির পক্ষে হৈমন্তী রোণের এই শীর্ণ নাব্যতা অতিক্রম করা অতি সহজ। তাই কিছু পরেই শালতিটি তীরে এসে ভিড়ল। এপারের সংকেতদাতারা শালতিটিকে তীরে তুলে নিল অতি দ্রুতহস্তে।
শালতির অধিকারী মাটিতে নেমে দাঁড়ালেন। নৌকো বাওয়ার পরিশ্রমে তাঁর সারা শরীর ঘর্মাক্ত। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘সবাই এসেছে রামা?’
রামা সামান্য মাথা নুইয়ে বলল, ‘হ্যাঁ প্রভু। সবাই।’
‘আর তিনি?’
‘হ্যাঁ ঠাকুর। তিনিও এসেছেন।’
‘বটে? তাহলে পরিকল্পনা কী স্থির হয়েছে এখন?’
‘বলিটা হবে কাপালিকঠাকুরের নতুন মন্দিরের সামনে। শুনছি সেই বলি হলে কাপালিক ঠাকুর এত শক্তিধর হয়ে যাবেন যে, তাঁকে আটকাবার আর কোনও উপায় থাকবে না।’
‘তাহলে? কাপালিকঠাকুরকে আটকানো যাবে কী করে সেটা নিয়ে কিছু ভেবেছিস তোরা? নাকি শুধু এইটা বলার জন্য আমাকে ডেকেছিস এখানে?’ চতুরাননের চাপা স্বর প্রায় গর্জনের মতো শোনাল।
রামা কিছু বলার আগে অরণ্যের মধ্য থেকে একটি ক্ষীণ নুপূরনিক্বনের ধ্বনি কানে এল সবার। যেন একটি ছুনছুন শব্দ অতি মদালসা ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে এইদিকে। একটু পর একজন নারী জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হলেন। উপস্থিত সবাই তাকিয়ে রইল সেদিকে। নারীটি উচ্চতায় খর্ব, কৃষ্ণকায়, ঈষৎ পৃথুলা এবং সুস্তনী। আর চোখদুটি স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বড়।
চতুরানন ভালো করেই জানেন যে, কাম বস্তুটার সঙ্গে সৌন্দর্যের কোনও সম্পর্ক নেই। অসাধারণ সুন্দরী নারীও কারও চোখে অকামা হতে পারেন, আবার কুরূপা কোনও নারীও সার্বজনিকভাবে পুরুষের স্বপ্নভোগ্যা হতে পারেন। কিন্তু উপস্থিতি মাত্রেই দর্শকদের মধ্যে এমন কামচিত্ত উৎপন্ন করতে আর কাউকে দেখেননি চতুরানন। তিনি কোনও ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি নন, বহুতর নারীকে অঙ্কশায়িনী করেছেন। কিন্তু এই নারীর প্রতি দৃষ্টিপাতমাত্রেই একই সঙ্গে অপ্রতিরোধ্য কামাকর্ষণ এবং সুতীব্র বিরাগ অনুভব করেন তিনি।
নারীটি সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি কখনও কবরীবন্ধন করেন না। এই অন্ধকারেও তাঁর কেশরাজি উড়ছিল অশনি সংকেতের মতো। তিনি চতুরাননের দিকে কামুক দৃষ্টিতে চেয়ে একটা বক্রোক্তি করলেন, ‘শরীরটা তো চমৎকার বানিয়েছ নিয়োগীঠাকুর। কিন্তু কী করবে এই শরীর নিয়ে? একদিনও তো দেখা করতে চেয়ে আলাদা করে ডাকলে না।’
চতুরানন একটা অশ্রাব্য কঠিনবাক্য উচ্চারণ করতে যাচ্ছিলেন৷ তার আগেই রামা হাত চেপে ধরল তাঁর। তারপর ভারি কোমলস্বরে বলল, ‘ও কাপালি মা, কিছু একটা উপায় বলো না!’
যতই কামুক হোক না কেন, মাতৃসম্বোধনে সম্বৃত হয় না এমন নারী দেখেননি চতুরানন। নারীটি গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘তোরা এক কাজ কর রামা, মন্দিরের পাশে একটি ছোট ডোবা খোঁড়। খুব বড় কিছু না, একজন দুজন নামতে পারে এমন। কাজটা আজ রাতেই হওয়া চাই।’
‘তারপর?’
‘তারপর বাকিটা আমি নিয়োগীঠাকুরকে বলে দিচ্ছি। তোরা এখন যা এখান থেকে।’
নদীর তীরে দুটি শরীর তীব্র আশ্লেষে জড়িয়ে ধরেছিল একে অপরকে। মৃদু শীৎকারের ধ্বনিতে চারিদিক মুখরিত। মনে হচ্ছিল যেন দুটি বলশালী সাপে শঙ্খ লেগেছে।
এই নারীতে উপগত হওয়ার কোনও ইচ্ছাই ছিল না চতুরাননের। কিন্তু তিনি যখন ধীর পদক্ষেপে এসে চতুরাননের অনাবৃত বুকে হাত রাখলেন, তখন আচম্বিতেই তাঁর শরীরে এক আশ্চর্য পুলক শিহরন খেলে গেল যেন। কোথা থেকে মত্ত, উদগ্র কামাবেগের নাগপাশ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তাঁকে।
তারপর তিনি ধীরে ধীরে ঘুরে চতুরাননের পিছনে গেলেন। আঙুল চতুরাননের বুক থেকে উঠে এল কাঁধে। তাঁর উষ্ণ নিঃশ্বাস যেন নিয়োগীঠাকুরের পিঠে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কামাগ্নির কুণ্ড জ্বেলে দিচ্ছিল। তারপর হঠাৎ করেই তিনি পিছন থেকে জাপটে ধরলেন চতুরাননকে। সুপুষ্ট ও নরম স্তনদুটি তাঁর পিঠে ঘষতে ঘষতে কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘তোমার জন্য এত করছি ঠাকুর, আমাকে কিছু দেবে না?’
চতুরানন নিয়োগীর মাথার মধ্যে যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটে গেল। তিনি দ্রুত ঘুরে গিয়ে দুহাতে দুহাতে সেই রমণীর মুখদুটি ধরলেন। তারপর অধরে অধর ডুবে গেল, শরীরে শরীর। চাঁদের গায়ে ছলকে উঠল আরেক চাঁদের উষ্ণ জোছনা।
দুটি শ্রান্ত শরীর বেশ কিছুক্ষণ নদীর তীরে শুয়ে রইল। রাতচরা পাখির মৃদু টি টি টি ডাক শোনা যায়, আর রোণের ছলাচ্ছল জলশব্দ। তারার আলো মিহি চাদরের মতো জড়িয়ে ছিল দুটি নিলাজ শরীর। তারপর রমনীর উরু উঠে এল চতুরাননের শরীরে। ‘এত খিদে কোথায় রেখেছিলে ঠাকুর?’
ধীরে ধীরে উঠে বসলেন চতুরানন। শ্রান্তিও যে এত কোমল, এত মধুর হয়, জানা ছিল না তাঁর।
বস্ত্র পরিধান করলেন চতুরানন। তারপর ধীরস্বরে বললেন, ‘আমার কাছ থেকে যা চেয়েছিলেন, তা তো পেলেন। এবার বলুন, উপায় কী?’
‘কীসের উপায় চাও ঠাকুর? নরবলি বন্ধ হোক, তাই তো? আমিও তাই চাই।’
‘শুনেছি। রামা বলেছে। কিন্তু কেন?’
ম্লান হাসলেন রমণী, ‘আমি একজন মেয়েমানুষ ঠাকুর। তোমাদের মতো অত শক্তি, অত বুদ্ধি, অত শিক্ষা কিছুই আমাদের নেই। আমরা ন্যায়নীতি, আচার বিচার, যুদ্ধ মীমাংসা এত জটিল জিনিস বুঝি না। তবে আমরা একটা জিনিস পারি ঠাকুর, যা তোমরা শত চেষ্টা করলেও পারবে না। আমরা আমাদের শরীর থেকে আরেকটা শরীরের জন্ম দিতে পারি। প্রাণ সৃষ্টি করতে পারি। আমরা মূর্খ হতে পারি গো ঠাকুর, কিন্তু ধর্মের নামে অত নিষ্ঠুর হতে পারি না।’
চতুরানন বুঝলেন এই আপাত-উন্মাদিনী, রহস্যময়ী নারীর অন্তরে মাতৃস্নেহের আদি, অকৃত্রিম ফল্গুধারা নিঃশব্দে বয়ে চলেছে। তাই তিনি ধর্মের নামে নরবলির বিরোধী, তাই রামা তাঁকে কাপালি মা বলে ডাকে।
চতুরাননের মনের আবিলতা মুছে গেল। তিনি রমণীকে কাছে টেনে পুনরায় মুখচুম্বন করলেন। তবে এই চুম্বনের মধ্যে শ্রদ্ধা মিশে ছিল।
রমণী উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর নগ্ন স্তন চুঁইয়ে নেমে আসছিল তরল অন্ধকার। তিনি শান্তস্বরে বলতে লাগলেন, ‘যতদিন সর্দার শনিভাঙড় বেঁচে আছেন, ততদিন আপনার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না ঠাকুর। তিনি গুরুর মোহে অন্ধ। আর সর্দারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংঘাতে যাওয়াটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।৷ কারণ এখনও এই রাজ্য তাঁর নামে চলে, আপনি তাঁর প্রতিনিধিমাত্র৷’
‘অর্থাৎ?’
অর্থপূর্ণ হাসলেন সেই নারী। তারপর ধীরে ধীরে চতুরাননের কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর দেহবল্লবী থেকে এক অজানা বনজ সুগন্ধি ভেসে আসছিল৷ তিনি শান্তস্বরে বললেন, ‘সব কিছুরই তো শেষ হতে হয় ঠাকুর। সর্দারের কাল তো ফুরোল। আর কেন?’
চতুরানন নির্নিমেষে চেয়ে রইলেন। কিছু বললেন না।
‘আপনার সিংহরাশি, সিংহলগ্ন। নক্ষত্র মঘা। মঘা নক্ষত্রের অধিপতি কে জানেন? পিতৃপুরুষ। আজ রাত থেকে শনিদেব শতভিষা নক্ষত্রে মার্গী হবেন, মঙ্গল ত্রিকোণে স্বক্ষেত্রী। আজ রাত থেকে আপনার একইসঙ্গে চতুশ্চক্র এবং মহাভাগ্য রাজযোগ শুরু হচ্ছে ঠাকুর। উঠুন! এখন সময় হয়েছে নিজের হাতে শাসনক্ষমতা তুলে নেওয়ার। মনে করুন এই আপনার পিতৃপুরুষদের আদেশ।’
‘কিন্তু…কিন্তু…কীভাবে?’
ধীর নারীকণ্ঠ বলে গেল সমস্ত পরিকল্পনা। চতুরানন স্তব্ধ হয়ে শুনলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘আর অঘোরঠাকুর?’
‘তিনি যে মুহূর্তে শুনবেন সর্দার মারা গেছেন, সেই মুহূর্তে এই স্থান ত্যাগ করবেন৷ কারণ তিনি বুঝবেন যে শনিভাঙড়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সময়ও ফুরোল।’
‘আর আপনি?’
মৃদু হাসলেন সেই রহস্যময়ী রমণী, ‘আমাকেও আর দেখতে পাবে না ঠাকুর। তোমাদের সঙ্গে এই আমার শেষ দেখা৷ তবে আমি আবার ফিরে আসব। আজ না হোক কাল, কাল না হোক কয়েকশো বছর পর হোক, ফিরে আসব এই মাটিতে। যেদিন আবার কোনও রক্তপিপাসু দুরাত্মা নরসংহারের জন্য আক্রমণ করবে এই ভূমি, সেদিন আমি আসব।’
এই বলে পিছন ফিরে হাঁটতে লাগলেন সেই নারী।
ব্রাহ্মমুহূর্ত উদয়ের সময় হয়ে আসছিল৷ চতুরানন দেখলেন একটি সম্পূর্ণ নিরাবরণ নারীশরীর ধীর পায়ে হেঁটে মিলিয়ে যাচ্ছে অরণ্যের মধ্যে।
মদে চুর হয়ে ছিলেন সর্দার শনিভাঙড়। আজ বড় আনন্দের দিন। আজ গুরুদেবের স্বপ্ন সফল হবে। তাঁর স্থাপিত মাতৃমূর্তির প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবে। তাঁর মতো একজন নীচ জাতির বাগদীকে এত বড় কৃপা করেছেন গুরুদেব, এ কী কম কথা?
আজ তাই মদ আর মাংসের ঢালাও আয়োজন। যত ধরনের মদ হয়, সব আনা হয়েছে আজ, কম করে একশো জালার ওপর। দলের সবার নিমন্ত্রণ আজ। আর মাংস এসেছে কত! তিতির, বটের, কুক্কুট থেকে শুরু করে ছাগ, হরিণ, বুনো বরা, কিছুই বাদ নেই। একদিকে মস্ত মস্ত কড়াইতে মাংস রান্নার প্রস্তুতি চলছে৷ আর অন্যদিকে সর্দার মদ্যপানের আসর বসিয়েছেন তাঁর কয়েকজন বিশ্বস্ত সঙ্গীদের নিয়ে।
সর্দার যেখানে আসর বসিয়েছেন, তার একটু দূরে একটি বড় বটগাছ৷ তার নীচে গুরুদেবের প্রতিষ্ঠিত মন্দির। মন্দিরটি ভারি অদ্ভুত। তার পাশে একটি ছোট ডোবা খুঁড়েছে চতুরাননের ছেলেরা। তার ভেতরে পাথরের আস্তরণ। কেন খুঁড়েছে তা জানেন না শনিভাঙড়। তবে নিজের পালিত পুত্রের প্রতি অগাধ আস্থা তাঁর। করেছে যখন, কিছু ভেবেই করেছে নিশ্চয়ই।
ক্রমে ক্রমে মদ্যপানের পরিমাণ বাড়তে লাগল। হইহল্লা, উচ্চকিত হাসির শব্দে মুখরিত হয় উঠল স্থানটি। শালপাতায় করে শূল্যপক্ব মাংস আসতে লাগল একের পর এক। রান্নার সুঘ্রাণে চতুর্দিক আমোদিত।
কিছুক্ষণ পর কেউ একজন প্রশ্ন করল, ‘সর্দার, পুজো শুরু হবে কখন?’
শনিভাঙড় জড়িতস্বরে বললেন, ‘আজ মহাপূজা হবে রে জগন। তার আগে কত কাজ থাকে জানিস? গুরুদেব কাজকর্ম সেরে এখনই আসবেন নিশ্চয়ই।’
আরেকজন প্রশ্ন করল, ‘ছোট সর্দারকে দেখছি না যে? আর ওঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের?’
হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন শনিভাঙড়, ‘ওর আবার সাঙ্গোপাঙ্গ কী? সব সাঙ্গোপাঙ্গ আমার, এই দল আমার দল। এই এলাকা, এই জঙ্গল, এই এলাকার সব কিছু আমার, একমাত্র আমার। আমি রাজা শনিভাঙড়, আমিই সব।’
বশংবদ চেলারা মহাকোলাহলে ‘জয় রাজা শনিভাঙড়’ রবে প্রতিধ্বনি তুলল। এমন সময় রামা এসে উপস্থিত হল। তাকে দেখে হুঙ্কার দিলেন শনিভাঙড়, ‘এই যে শুয়ার, এতক্ষণে পায়ের ধুলো দেওয়ার সময় হল? বলি, ছিলে কোথায় এতক্ষণ? তুমি তো আবার ছোট সর্দারের ল্যাঙট বললেই চলে। তা মহাপ্রভু কি আসছেন, নাকি তাঁর জন্য আলাদা নিমন্ত্রণপত্র পাঠাতে হবে?’
বাকিরা হ্যা-হ্যা করে হেসে উঠল। রামা প্রণাম করে হাসিমুখে বলল, ‘ছোটঠাকুর আপনার জন্য আজ বিশেষ আয়োজন করেছেন সর্দার। এই আসছেন তিনি।’
‘বটে? তা মহারাজ কী এমন বিশেষ আয়োজন করছে শুনি?’
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। একটু পর বেশ কয়েকজন পাইক কাঁধে করে মদের জালা এনে ছোট ডোবাটির মধ্যে ঢালতে লাগল। ধীরে ধীরে মদে ভরে উঠতে লাগল ডোবাটি৷
সর্দার খানিকক্ষণ জুলু জুলু চোখে পুরো কর্মকাণ্ডটি দেখলেন। তারপর ফের হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, ‘অ্যাই, এসব কী করছিস তোরা?’
বলতে বলতেই চতুরানন দেখা দিলেন। পরনে সেই খাটো ধুতি, ঊর্ধাঙ্গ অনাবৃত। কপালে একটি সিঁদুরের টিকা। তিনি এসে সর্দারকে প্রণাম করে দাঁড়ালেন৷ তারপর বললেন, ‘সর্দার, আজ বড় আনন্দের দিন। তাই আপনার জন্য এই অভিনব আয়োজন করেছি। আসুন, এই মদের পুকুরে নেমে স্নান করে আনন্দ উপভোগ করুন।’
শনিভাঙড়ের মুখচোখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হা হা করে হেসে উঠে বললেন, ‘বাহবা, বাহবা, সাবাস। ওরে কে আছিস, আয় তোরা, ছুটে ছুটে আয়। এবার এই মদের পুকুর থেকে মদ তুলে তুলে খাব।’
বলতে বলতেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি। প্রবলবেগে টলছেন। চতুরাননের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ‘চল বেটা, তুইও চল। আজ বাপবেটায় মদের পুকুরে স্নান করব একসঙ্গে।’
সর্দারের আসরের সঙ্গীরা দেখল মদ্যপানে চুর, বেপথু বৃদ্ধ শনিভাঙড় তাঁর অতি বিশ্বস্ত পালিত পুত্র চতুরানন নিয়োগীর কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন মদের পুকুরের দিকে। তারা লক্ষ করল না, তাদের প্রত্যেকের পিছনে নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে চতুরাননের অনুগামী ছেলেরা। তাদের প্রত্যেকের হাত পেছনে। তাতে ধরা একটি করে দীর্ঘ, ধারালো ছুরি।
দুজনে মদের ডোবায় নামলেন। শনিভাঙড় হা-হা করে হাসতে হাসতে দু’হাতে গণ্ডূষ ভরে মদ্যপান করতে লাগলেন। চতুরানন কিন্তু এক ফোঁটা মদ মুখে দিলেন না। স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। যেন পালক পিতার আনন্দ উল্লাসের দর্শক হতে এসেছেন।
একটু পর চতুরানন জিগ্যেস করলেন, ‘একবার ডুব দিয়ে স্নান করবেন না সর্দার?’
ততক্ষণে সর্দারের চৈতন্য বিলুপ্তপ্রায়। স্খলিতস্বরে তিনি বললেন, ‘করব বইকি। স্নান করতে নেমেছি, ডুবকি না দিলে হয়?’
বলতে বলতে সর্দার ডুব দিলেন। চতুরানন বোধহয় এই মুহূর্তটির অপেক্ষাতেই ছিলেন। তিনি সর্দারের মাথাটা চেপে ধরলেন মদের মধ্যে।
ওদিকে তখন বিপদ বুঝে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল সর্দারের সঙ্গীরা। তবে চেষ্টাই সার। প্রত্যেকের গলার কাছে নেমে এল খরশান ছুরি! ভলকে ভলকে রক্ত ছিটকে পড়তে লাগল মাটিতে।
নিহতদের আর্তচিৎকার থেমে গেল কিছুক্ষণের মধ্যে। একটু পর মদের ডোবায় ভেসে উঠল দিলাকাশের একচ্ছত্র রাজা শনিভাঙড়ের মৃতদেহ। চারিদিকে নীরব, নিচ্ছিদ্র স্তব্ধতা। পাচকরা আগেই পালিয়েছে৷ কড়াই থেকে পুড়ে যাওয়া মাংসের ধোঁয়া উঠে পাক খেয়ে মিশে যাচ্ছে অরণ্যের বাতাসে।
একটি গাছের আড়াল থেকে দৃশ্যটি দেখছিলেন অঘোরবজ্র। জীবনে নিজের হাতে অনেক নরবলি দিয়েছেন, শ্মশানে বসে শবসাধনা করেছেন, তাঁর শরীরে ভয়ডর নেই বললেই চলে। কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর, এমন নৃশংস দৃশ্য জীবনে দ্বিতীয়বার দেখেননি তিনি। ভয়ে, আতঙ্কে তাঁর হাত-পা কাঁপতে লাগল।
তিনি পিছন ফিরে দৌড়তে লাগলেন। তাঁকে পালাতে হবে, এক্ষুনি। যে করেই হোক। ওরা তাঁকে ধরে ফেলবার আগেই এই অরণ্য ছেড়ে, এই রাজ্য ছেড়ে, এই দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।
পালাতে পালাতে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলেন অঘোরবজ্র, যার জন্য তাঁর চূড়ান্ত সাধনা অসমাপ্ত রয়ে গেল, তার বংশের সর্বনাশ করে ছাড়বেন তিনি। তিনি না হলে তাঁর সন্তান, সন্তান না পারলে অন্য কোনও উত্তরাধিকারী। আজ না হোক কাল, কাল না হোক—কয়েকশো বছর পর। কিন্তু এর প্রতিশোধ তিনি নেবেন, নেবেন, নেবেনই।
