বালঘাকপুর ১৪৭৪

বালঘাকপুর ১৪৭৪

গ্রীষ্মের উষ্ণ সন্ধ্যা৷ করতোয়ার পাশ দিয়ে একদল শৈব সন্ন্যাসী হেঁটে চলেছিল ঘোড়াঘাট দুর্গের দিকে৷ সন্তোষ পেরিয়ে উত্তর পূর্বে আরও কয়েক ক্রোশ হাঁটা পথ। পথটি জঙ্গলে আকীর্ণ। তারই ছায়ায় ছায়ায় সন্ন্যাসীর দল স্থানে স্থানে বিশ্রাম নিয়ে এগিয়ে চলেছিল গন্তব্যের দিকে৷

এখন গৌড়েশ্বর হচ্ছেন রুকনুদ্দিন বারবাক শাহ। নৃপতি যেমনই সূক্ষ্মদ্রষ্টা, তেমনই কৃতকর্মা দণ্ডধর। রাজ্যাধিকার লাভের পূর্বে ইনি পিতা নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের প্রতিভূরূপে ত্রিবেণী সপ্তগ্রাম শাসন করতেন। পিতার এন্তেকাল হওয়ার পর লক্ষ্ণৌতির সিংহাসনে আসীন হয়ে প্রবল প্রতাপে ইকলিমে সপ্তগ্রামের সঙ্গে ইকলিমে লক্ষ্ণৌতি, ইকলিমে সোনারগাঁও, এবং আরসাহ-এ বঙ্গাল শাসন করছেন।

গৌড় নগরী হচ্ছে বালঘাকপুর, অর্থাৎ বিবাদনগরী। দিল্লির শাসনকর্তারা যাঁকেই পূর্ব ভারতের শাসনকর্তা করে পাঠান না কেন, তিনি গৌড়ে পদার্পণ করা মাত্র বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। তাছাড়া রাজপ্রাসাদের মধ্যে আভ্যন্তরীণ বিবাদ তো আছেই। যেমন রাজা গণেশের পৌত্র শামসউদ্দিন আহমদ শা’। এঁর মতো নিষ্ঠুর, অত্যাচারী, ক্রোধী শাসক গৌড়ের সিংহাসনে কমই বসেছেন। অকারণ রক্তপাতে এঁর আশ্চর্য রুচি ছিল। অকথ্য অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে শামসউদ্দিনকে হত্যা করে তাঁরই দুই নফর, সাদি খান আর নাসির খান। তারপর সাদি এবং নাসির নিজেরাই সিংহাসনের জন্য মারামারি কাটাকাটি করে ফৌত হল। সিংহাসন এল ইলিয়াস শাহী বংশের নাসিরউদ্দিনের হাতে, যে ইলিয়াস শাহী বংশকে উৎখাত করে রাজা গণেশ কিছুদিনের জন্য হলেও গৌড়ে হিন্দু রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।

দলপতির বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। নূর কুতুব আলম নামের ওই ম্লেচ্ছ দরবেশ জৌনপুর থেকে ইব্রাহিম শর্কিকে ডেকে না নিয়ে এলে আজ তাদের এই সঙ্কুল পথ অতিক্রম করে অনির্দেশ্য ভবিষ্যতের পথে পা বাড়াতে হত না। গৌড়বঙ্গের বুকে মুসলমানি শাসন চিরকালের জন্য নির্বাপিত হত।

কিন্তু নিয়তি, নিয়তিই প্রবল সর্বত্র৷ গৌড়বঙ্গের মুসলমানি দরবেশদের জীবনের প্রধান সার হচ্ছে ধর্মের প্রচার ও প্রসার। অথচ হিন্দু সন্ন্যাসীদের জীবনের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত আত্মোন্নতি। হিন্দু সমাজের সার্বিক দুঃখনাশনের প্রতি তাদের কোনও উদ্যোগই নেই।

আজ মুসলমানি ওলি আউলিয়া দরবেশদের ধর্মপ্রসারে আগ্রহের যোগ্য উত্তর দিতে হিন্দু সন্ন্যাসীরা যদি সদলবলে রাজা গণেশের পেছনে একত্রিত হতেন, তাহলে কি আজ এই দিন দেখতে হত? একটাকিয়া ভাদুড়ি বংশের উজ্জ্বলতম কুলপ্রদীপ রাজা গণেশনারায়ণকে পরাস্ত করে এমন শক্তি ভূভারতে আর কার ছিল? কে ছিলেন না তাঁর রাজসভায়? ছিলেন শিখরভূমের প্রখ্যাত পণ্ডিত পদ্মনাভ, ছিলেন আচার্য কুল্লুকভট্ট, আর ছিলেন মন্ত্রীমহোদয় চতুরশিরোমণি স্বয়ং নরসিংহ নাড়িয়াল। প্রত্যেকেই কৃতবিদ্য পুরুষ। আর সবার মাথার ওপর ছিলেন প্রখর সূর্যস্বরূপ স্বয়ং রাজা গনেশনারায়ণ রায়ভাদুড়ি স্বয়ং।

করতোয়ার বুকে দিনমণি অস্ত গেলেন৷ সেই দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন যুবাপুরুষ। এই অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিল কোটিবর্ষ, রাজধানী দেবকোট। রাজা বাণ, রাজকুমারী ঊষার দেবকোট। এখান থেকেই ঊষাকে হরণ করে নিয়ে গেছিলেন কৃষ্ণপুত্র অনিরূদ্ধ। এই পুণ্ড্রবর্ধন মহা পবিত্র দেশ। বিদ্রোহী কেবট্টরাজা দিব্বোক, রাজা ভীমের দেশ। আর এই মহাপবিত্র দেশে শাসন করবে একদল ম্লেচ্ছ যবন?

না, এখনও হিন্দুর আশা শেষ হয়নি। এই অত্যাচারী ম্লেচ্ছ তুর্কি পাঠান শাসন হতে গৌরবঙ্গকে মুক্ত করতেই হবে৷ শত শত নিহত হিন্দুর আত্মা, হিন্দু নারীর আর্তনাদ, মন্দিরের গর্ভগৃহ গড়িয়ে পড়া রক্ত, এসবের প্রতিবিধান হবেই হবে। সেই উদ্দেশেই এই ক্ষুদ্রদলটি যাত্রা করেছেন ঘোড়াঘাট দুর্গের দিকে। গড় মান্দারণের যুদ্ধে নিহত শত সহস্র হিন্দুর রক্ত, শত সহস্র ধর্ষিতা হিন্দু নারীর কান্নার প্রতিবিধান করতেই হবে। ওই পাপিষ্ঠ ইসমাইল গাজীকে ধ্বংস করতেই হবে। এ স্বয়ং নরসিংহ নাড়িয়ালের প্রয়াত আত্মার আদেশ।

গড় মান্দারণ জাহানাবাদ মহকুমায়। গৌড় হতে উড়িষ্যায় প্রবেশের প্রধানতম পথের উপর অবস্থিত এই দুর্গ অধিকার করে রেখেছিলেন উৎকলাধিপতি কপিলেন্দ্রদেব। তাঁরই প্রতিভূ হয়ে রাজা গজপতি গড় মান্দারণ শাসন করতেন। রুকনুদ্দিন বরবক শাহ আর উৎকলরাজের মধ্যে ঘোর বিরোধ বেধে উঠেছিল এই গড় মান্দারণের অধিকার নিয়ে। সুলতান বারবাক শাহ রাজা গজপতিকে আদেশ করেছিলেন তাঁর বশ্যতা স্বীকারের জন্য। রাজা গজপতি প্রথমে বশ্যতা স্বীকারের ভান করে কয়েক মাস কালহরণ করলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল এই সুযোগে উৎকল হতে কিছু সুদক্ষ তেলেঙ্গা সৈন্য আনিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করবেন। কিন্তু সেই সুযোগ পেলেন না।

গড় মান্দারণের অধিকার নিয়ে শুধু গৌড়েশ্বর নয়, আরও এক প্রবলপ্রতাপী শত্রুর সঙ্গে বৈরিতা হয়েছিল কপিলেন্দ্রদেবের। ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রাজবংশের সঙ্গে।

শনিভাঙড় নামের এক ধীবর দামোদর আর রোণ নদীর সঙ্গমস্থলে প্রতিষ্ঠা করেছিল এই ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজ্য। শনিভাঙড়ের গুরু ছিলেন অঘোরবজ্র নামের এক বজ্রযানী সন্ন্যাসী। তাঁর নির্দেশে শনিভাঙড় গ্রামবাসীদের বাচ্চা চুরি করে এনে নরবলি দিত।

এইভাবেই একদিন শনিভাঙড় নিকটবর্তী গ্রামের একটি শিশুকে চুরি করে আনে নরবলির জন্য। কিন্তু শিশুটির শরীরে রাজলক্ষণ দেখে অঘোরবজ্র শনিভাঙড়কে আদেশ দেন শিশুটিকে প্রতিপালন করতে। এই শিশুর নামই চতুরানন নিয়োগী।

চতুরানন বড় হয়ে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র শাসনভার হাতে নেন। কথিত আছে চতুরানন নিয়োগী তাঁর পালকপিতা শনিভাঙড়কে মদের মধ্যে ডুবিয়ে হত্যা করেছিলেন। শনিভাঙড়ের গুরুদেব অঘোরবজ্রকে আর সেই অঞ্চলে দেখা যায়নি।

চতুরানন নিয়োগী তাঁর কন্যার বিবাহ দেন ফুলিয়ার সদানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সেই থেকে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র ব্রাহ্মণ রাজবংশের শুরু।

বর্তমানে ভূরিশ্রেষ্ঠ শাসন করছেন রাজা কৃষ্ণনারায়ণ। তাঁর রাজকার্যে সহায় হচ্ছেন তাঁরই অনুজ শ্রীমন্তনারায়ণ। শ্রীমন্তনারায়ণের মতো বীর, বুদ্ধিমান, রাজনীতিজ্ঞ অসাধারণ বীরপুরুষ এই রাঢ়দেশে কমই জন্মেছেন। রাজা কৃষ্ণনারায়ণ ভূরিশ্রেষ্ঠ’র দক্ষিণ দিকের কিয়দংশ তাঁর এই অসমসাহসী এবং পরাক্রমশালী সহোদরকে দিয়েছেন স্বাধীনভাবে রাজ্যশাসনের জন্য। শ্রীমন্তনারায়ণ কিন্তু অগ্রজের আশ্রয় ত্যাগ করেননি। তিনি এখনও সমগ্র ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান পুরুষ।

গড় মান্দারণের অধিকার নিয়ে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সঙ্গে উড়িষ্যা রাজের অনেক দিন ধরেই বিবাদ চলছিল। রুকনুদ্দিন বারবাক শাহ বুদ্ধিমান পুরুষ। তিনি গড় মান্দারণ দখল করার জন্য ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রাজা কৃষ্ণনারায়ণের সঙ্গে হাত মেলালেন। সেই কাজে তাঁর সহায় হলেন ইসমাইল গাজী নামের এক অত্যন্ত বুদ্ধিমান, করিৎকর্মা অথচ অমানুষিক নৃশংস এক কোরেশবংশীয় প্রবল যোদ্ধৃপুরুষ।

ইসমাইল গাজীর জন্ম আরব দেশের মক্কা শহরে। তিনি একদল সঙ্গী নিয়ে আরব থেকে রওনা হয়ে পারস্যের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে আসেন, এবং সুলতান বারবাক শাহ’র রাজধানী লক্ষ্ণৌতিতে পৌঁছন। তখন লক্ষ্ণৌতির উত্তরে ছুটিয়া-পাটিয়া নামে এক খরস্রোতা নদী ছিল। বর্ষাকালে এই নদীতে বন্যা হয়ে প্রচুর প্রাণহানি এবং ধনহানি ঘটত। সুলতান বারবাক শাহ প্রচুর চেষ্টা করেও এই নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। ইসমাইল গাজী আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেই নদীর ওপর একটি বাঁধ নির্মাণ করেন। শুধু তাই নয়, এই বাঁধের ওপর দিয়ে হাতি ঘোড়াও চলতে পারত।

সুলতান প্রসন্ন হয়ে ইসমাইল গাজীকে প্রভূত সম্মান দিলেন, তাঁকে লস্কর-উজীর পদে বরণ করলেন। তারপর তিনি ইসমাইল গাজীকে আদেশ দিলেন ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে গড় মান্দারণ আক্রমণ করার।

গড় মান্দারণের সেনাধ্যক্ষ রাজা গজপতি কম বড় বীর ছিলেন না। তাঁর অধীনস্থ উড়িষ্যা এবং তেলেঙ্গী সৈন্যবাহিনী প্রবলপ্রতাপে ইসমাইল গাজীর সৈন্যবাহিনীকে আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করে ফেলল। সুলতানের বাহিনী পরাস্ত হয় হয়, এমন সময় শ্রীমন্তনারায়ণ ঝড়ের গতিতে রাজা গজপতির সৈন্যদলের পশ্চাদভাগ আক্রমণ করলেন। উড়িষ্যা সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। রাজা গজপতি নিহত হলেন। গড় মান্দারণের স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হল।

বিজয়ী পাঠানসেনা দুর্গ অধিকার করে লুণ্ঠন ও অত্যাচারে ব্যাপৃত হল। এ আশ্চর্যের কিছু নয়। পাঠান সুলতানের রাজস্ব আদায় হয় দুইভাবে। প্রথম হল খরজ। সুলতান প্রতিটি ইকলিমকে বেশ কিছু রাজস্ব-অঞ্চলে ভাগ করেন, যাদের বলে মহাল। কয়েকটি মহাল নিয়ে একটি শিক। প্রতিটি শিকের মালিক একজন শিকদার৷ শিকদার রাজস্ব আদায় করে তার সিংহভাগ সুলতানকে দেন৷ আর দ্বিতীয় হল গনীমাহ। অর্থাৎ লুণ্ঠনলব্ধ সম্পদ। সৈন্যরা লুঠ করে যে সম্পদ আহরণ করে তার এক পঞ্চমাংশ রাজকোষে যায়। তাই পরাজিতদের ধনসম্পত্তি লুণ্ঠনে সুলতান এবং তাঁর প্রেরিত সর-ই-লস্কর এবং সিপাহ সালারদের সোৎসাহ সমর্থন ছিল। আর পাঠান সেনাদের হিন্দু-নারীলোলুপতার তুলনা নেই। তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই হিন্দুদের মরণান্তিক আর্তনাদে মান্দারণের আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল। হিন্দু-পুরুষদের ছিন্ন মুণ্ড, আর হিন্দু-পুরনারীদের লুণ্ঠিত সম্ভ্রম মান্দারণের পথে ঘাটে লুটিয়ে পড়তে লাগল।

শ্রীমন্তনারায়ণ ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি ইসমাইল গাজীকে বললেন পাঠান সৈন্যদের এই নারকীয় উল্লাস বন্ধ করতে। কিন্তু বিজয়মদগর্বী ইসমাইল গাজী এই প্রস্তাব শুনবেন কেন? তিনি শ্রীমন্তনারায়ণের কথা হেসেই উড়িয়ে দিলেন। ক্রুদ্ধ শ্রীমন্তনারায়ণ এবার নিজের সৈন্যদের আদেশ দিলেন পাঠান সৈন্য ধ্বংস করতে৷

ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সৈন্যবাহিনীর ক্ষিপ্ত রোষানলে পাঠান সৈন্য পতঙ্গের মতো দগ্ধ হতে লাগল। প্রমাদ দেখে ইসমাইল গাজী নিজের নিজের সৈন্যদের লুণ্ঠন ও ধর্ষন থেকে নিবৃত্ত করে তাদের গড় মান্দারণ ত্যাগ করার আদেশ দিলেন। শ্রীমন্তনারায়ণকে শান্ত করার জন্য প্রভূত ধনরত্নাদি এবং অশ্ব ও হস্তী উপহার দিলেন। কিন্তু দুপক্ষের মধ্যে বিবাদের আগুন সেই যে জ্বলে উঠল, তা আর নিভল না।…

সন্ধ্যা হয় দেখে সন্ন্যাসীর দল একটি অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার বৃক্ষতলের নীচে আশ্রয় নিলেন। কাছেই একটি ছোট পুকুর ছিল, সেখানে হাত মুখ ধুয়ে এলেন। মশাল জ্বলে উঠল। এখানে দূর দূর অবধি লোকবসতি নেই। তাই কারো চোখে পড়ার আশঙ্কা কম। সন্ন্যাসীরা নিজেদের বয়ে আনা পুঁটুলি খুলে কিছু চিড়া, গুড় এবং কলা বার করলেন। মশালের আলোয় তাঁদের সবল সুঠাম দেহ ঝকঝক করতে থাকল। দেখে কে বলবে এঁরা সন্ন্যাসী?

রাতের আহার সমাপ্ত করে তাঁরা নিজেদের মধ্যে মৃদুস্বরে কথা বলতে লাগলেন। একজন দলপতিকে প্রশ্ন করলেন, ‘এদিককার সংবাদ কী ভায়া?’

দলপতি বললেন, ‘মহিসন্তোষের লড়াইতে কামতারাজ কামেশ্বর ওই ম্লেচ্ছ গাজীটাকে হারিয়ে দিয়েছিলেন বলে শুনেছিলাম। আবার শুনছি রাজা কামেশ্বর নাকি কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেছেন। তাঁর সঙ্গে এখন গাজীর খুব দহরম মহরম। কোনটা যে সত্যি, আর কোনটা যে মিথ্যে বোঝা মুশকিল।’

অন্য একজন বললেন, ‘একদিক থেকে কিন্তু ভালো। যত এই ধোঁয়াশা বজায় থাকবে, আমাদের পক্ষে কার্যোদ্ধার করা তত সুবিধা হবে। লক্ষ্ণৌতিতে আমাদের লোক যেন ঠিকসময়ে প্রস্তুত থাকে।’

দলপতি বললেন, ‘সে প্রস্তুত আছে৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভান্দসী রায় কি আমাদের কথা শুনবেন?’

‘আমার মনে হয় শুনবেন। তিনি কার্যগতিকে সুলতানের অধীনতা স্বীকার করেছেন বটে, কিন্তু লক্ষ্ণৌতির রাজদরবারে ইসমাইল গাজীর প্রভাব যেভাবে বাড়ছে তাতে তিনি এবং অন্যান্য হিন্দু রাজন্যরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন।’

কথাটা মিথ্যা নয়। এমনিতে সুলতান বারবাক শাহ যথেষ্ট সুবিবেচক শাসক। তাঁর রাজসভায় অনন্ত সেন, কেদার রায়, ভান্দসী রায়, বিশ্বাস রায়, নারায়ণ দাস, গন্ধর্ব রায়, জগদানন্দ রায়, এমন প্রচুর হিন্দু উচ্চপদে রাজকার্যে নিযুক্ত। তাঁর ভুঁইয়া আর শিকদারেরা অধিকাংশই হিন্দু। তাঁর সভাপণ্ডিত মুকুন্দ, রাজবৈদ্য বা অন্তরঙ্গ হলেন অনন্ত সেন। বিচার বিভাগের শীর্ষে আছেন সুন্দর এবং শ্রীবৎস। এছাড়াও সুলতান হিন্দু পণ্ডিতদের যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। পণ্ডিত বৃহস্পতি মিশ্রকে রায়মুকুট উপাধি দিয়েছেন, মালাধর বসুকে গুণরাজ খাঁ বলে সম্মান জ্ঞাপন করেছেন।

সুলতানি শাসকদের প্রতাপ এখনও নগরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। গ্রামাঞ্চল শাসন এবং সেখান থেকে খরজ আদায় করার দায়িত্ব এখনও হিন্দু ভুঁইয়াদের হাতেই আছে। বলা বাহুল্য, সুলতানের ওপর ইসমাইল গাজীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এঁদের সশঙ্কিত করে তুলেছে।

‘কিন্তু ওখানে গিয়ে আমাদের কর্মপদ্ধতি কী হবে?’

‘ভান্দসী রায় আমাদের দিকে ঝুঁকেই আছেন বলে সংবাদ পেয়েছি। আপাতত তাঁর সঙ্গে দেখা করা আশু কর্তব্য৷ আশা করি আলোচনা করে একটা পথ বেরোবে।’

‘রাজা কামেশ্বরের সঙ্গে ভান্দসী রায়ের কীরকম সম্পর্ক?’

‘শুনেছি অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক। আর সেই জন্যই ভাবছি সত্যিই যদি রাজা কামেশ্বর ওই গাজীর প্রভাবে ইসলাম গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে ভান্দসী রায়কে উত্তেজিত করা আমাদের পক্ষে অনেক সহজ হবে।’

‘সহজ না হলেও এই কাজ আমাদের করতেই হবে।’ হিসহিসিয়ে উঠল দলপতির কণ্ঠস্বর, ‘এই মুহূর্তে হিন্দুদের আশা ভরসা করার মতো একটিই রাজ্য গৌড়বঙ্গে টিঁকে আছে, ভূরিশ্রেষ্ঠ। আমি জানি শ্রীমন্তনারায়ণের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে ওই কুচক্রী গাজী এখন সুলতানকে প্ররোচিত করছে ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করার জন্য। ওর ইচ্ছে ভূরিশ্রেষ্ঠ থেকে শুরু করে আঠেরো ভাঁটি হয়ে উড়িষ্যা পর্যন্ত দখল করে ভোগ করবে। কিন্তু আমি, নরসিংহ নাড়িয়ালের সন্তান বিদ্যাধর নাড়িয়াল, জীবন থাকতে সেই কাজ হতে দেব না। আমি কেন, আমার সন্তান সন্ততিরাও এই বাংলার ভূমিতে হিন্দুরাজত্ব স্থাপন করার জন্য আজীবন প্রাণপাত করে যাবে। রাজা শ্রীমন্তনারায়ণের সেরকমই আদেশ।’

ভান্দসী রায় খর্বাকার, কৃষ্ণকায় এবং অমিত শক্তিধর মানুষ। তিনি একটি পীঠীতে বসে আরক পান করছিলেন। ঊর্ধাঙ্গ অনাবৃত, নিম্নাঙ্গে একটি ধুতি, গলায় উপবীত ঝুলছে৷ দুইদিকে দুই শীর্ণকায়া রমণী বীজনে ব্যপৃত। পানপাত্রটি আরকে পূর্ণ করতে করতে তিনি আরক্তচোখে প্রশ্ন করলেন, ‘তা আপনাদের কী পরিকল্পনা? এতে আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি? আর সাহায্য করলে আমার প্রাপ্য কী?’

নিজের মনেই তিক্ত হাসি হাসলেন বিদ্যাধর৷ হিন্দু ভূম্যধিকারীদের এই ‘আমার প্রাপ্য কী?’ প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই চোখের পলকে এই সুবিশাল জম্বুদ্বীপ বিধর্মী অত্যাচারী যবনদের পদাধীন হয়ে পড়ল। একজন পাঠান বা তুরুস্কু সর্দার কিন্তু এমতক্ষেত্রে এই প্রশ্ন করবেন না। তিনি জানেন তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তির তুলনায় তাঁর জাতির, তাঁর ধর্মের প্রাপ্তি অনেক বড়। ম্লেচ্ছ যবনদের এই দিকটি শ্রদ্ধা করেন বিদ্যাধর। সমস্ত জাতি যেন একসূত্রে গাঁথা। পথের ফকির দরবেশ থেকে শুরু করে রাজ্যের শাসক, প্রত্যেকের জীবনের একটি মাত্র উদ্দেশ্য, ইসলামের প্রসার। তারজন্য যে কোনও পন্থা অনুসরণ করতে তাদের কোনও কুণ্ঠা নেই। সে ন্যায় হোক, অন্যায় হোক, মানবিক হোক, অমানবিক হোক, কিছুতেই কিছু এসে যায় না। ইসলামের প্রসার ঘটলেই হল। তাদের জীবনের তিনটি মাত্র উদ্দেশ্য, হিন্দু পুরুষের জাতিনাশ, হিন্দু নারীর সতীত্বনাশ, হিন্দুর ধর্মনাশ।

বিদ্যাধর বললেন, ‘আপনার প্রাপ্য আমি এখনই বলতে পারি। সে হচ্ছে কামতাপুর রাজ্যের ওপর আপনার একচ্ছত্র অধিকার। আপনি এতে সম্মত হলে আমাদের পরিকল্পনা আপনাকে বিশদে জ্ঞাত করতে পারি।’

পিত্তলের পানপাত্রটি এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ভান্দসী রায় বললেন, ‘বলুন আচার্য বিদ্যাধর।’

‘আপনি নিশ্চিত যে রাজা কামেশ্বর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন?’

‘ঠিক নিশ্চিত নই। তবে রাজা যে ইসমাইল গাজীর একজন অনুগত ভক্ত হয়ে পড়েছেন যে বিষয়ে নিশ্চিত।’

‘কিন্তু আক্রমণকারীদের প্রতি এত অনুরক্তি কেন? মহীসন্তোষের যুদ্ধে তো গাজী পরাস্ত হয়েছিলেন শুনেছিলাম।’

‘হ্যাঁ। তারপর ইসমাইল গাজী আবার আক্রমণের প্রস্তুতি নেন।

যুদ্ধের আগে রাতে রাজা কামেশ্বর স্বপ্নাদেশ পান গাজীর শরণাপন্ন হওয়ার। ব্যাপারটাকে তিনি দৈবী আদেশ মনে করে গাজীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।’

হতাশ হয়ে মাথা নাড়লেন বিদ্যাধর। তারপর বললেন, ‘এখন ইসমাইল গাজী কোথায়?’

‘তিনি রাজা কামেশ্বরের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। আপাতত কামতাপুরের রাজপ্রাসাদে আছেন। চরমুখে শুনেছি তিনি নাকি রোজই রাজাকে ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে শিক্ষা দিচ্ছেন।’

ভুরু কুঁচকোলেন বিদ্যাধর। তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘ইসমাইল গাজী সবসময় তাঁর সঙ্গে কয়েকজন পীর বা দরবেশকে সঙ্গে চলেন শুনেছি। কথাটা কি ঠিক?’

‘হ্যাঁ। তাঁর সঙ্গে সবসময়ই বারোজন পীর থাকেন। তাঁরা এখানেও এসেছেন। এখন ঘোড়ায় চড়ে কামতাপুরের গ্রামাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে ইসলামধর্মে দীক্ষা দিচ্ছেন।’

‘গ্রামের লোকজন তাঁদের কথা শুনছে?’

‘তাঁরা বলে বেড়াচ্ছেন যে ইসমাইল গাজী একজন দৈবী ক্ষমতাসম্পন্ন পুরুষ। অলৌকিক কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করে রাজা কামেশ্বর তাঁর শরণাপন্ন হয়েছেন। তাই প্রজাদেরও উচিত রাজার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইসলামের পতাকাতলে আসা।’

‘স্বাভাবিক। আচ্ছা, এই পীর দরবেশদের মধ্যে সবাইকে আপনি চেনেন?’

হাসলেন ভান্দসী, ‘আমি রাজা কামেশ্বরের মতো মূর্খ নই আচার্য। এই বারোজন দরবেশের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার এক একজন চর ছায়ার মতো সেঁটে আছে। এদের প্রত্যেকের গতিবিধি আমার নখদর্পণে। আমার রাজত্বে আমি এত সহজে ইসলামের প্রসার হতে দেব না।’

প্রীত হলেন বিদ্যাধর নাড়িয়াল। যাক, অন্তত একটি বিষয়ে ঐক্যমত্য হয়েছে৷ ভান্দসী রায় বুদ্ধিমান এবং স্বার্থপর। আপাতত এই দুটি হলেই তাঁর চলবে।

‘আমিও বাংলার মাটিতে এই যবন পাঠানের রাজত্ব উৎখাত করতে চাই রায়মশাই। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন এই ইসমাইল গাজীর মতো ধর্মপ্রচারকদের প্রতিহত করা। দেশের মানুষের ধর্ম আর রাজার ধর্ম যদি আলাদা হয়, তাহলে রাজাকে উৎখাত করা সহজতর হয়। শাসক বিধর্মী হলে অসুবিধা নেই, দেশের মানুষের ধর্ম যদি ঠিক থাকে তাহলে কালক্রমে তিনি দেশের ধর্ম গ্রহণ করবেনই করবেন। কিন্তু প্রজারা যদি দলে দলে ধর্মান্তরিত হতে থাকে, তাহলে তা দেশের পক্ষে ভয়ের ব্যাপার বইকি। ইসমাইল গাজীকে প্রতিহত করার একটি উপায় আমার মাথায় এসেছে। কিন্তু তার জন্য আপনার সাহায্য অত্যন্ত প্রয়োজন।’

ভান্দসী রায় পানপাত্রটি মুখে তুলতে গিয়ে থেমে গেলেন, ‘কী সেই উপায়?’

একের পর এক গ্রাম, নগর, কসবাহ পিছনে ফেলে রাতের অন্ধকারে তিনটি ঘোড়া দ্রুত দৌড়চ্ছিল লক্ষ্ণৌতির দিকে। ভোর হবে হবে প্রায়। কাল সকালে জোহরের নামাজের আগেই পৌঁছতে হবে লক্ষ্ণৌতিতে। দ্রুত পেরিয়ে গেল বালুকর্ণিকাঘাট, অগ্রদ্বিগুণ, নাজিপুর, এই পথের প্রথম তিনটি কসবাহ। এর পর আসবে একটি অতি বৃহৎ দিঘি। ইসমাইল গাজী ছুটিয়া-পাটিয়া নদীর ওপর বাঁধ দেওয়ার পর সেই জমা জলে নতুন করে এই দিঘির সৃষ্টি। লোকে এর নাম রেখেছে পাটিয়া দিঘি।

রাত্রির শেষ প্রহরে দিঘির তীরে তিনটি ঘোড়া থামল। ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া আরোহীরাও পথশ্রমে ক্লান্ত।

আরোহীদের মধ্যে প্রথম জন ঘোড়া থেকে নেমেই শরীরটা কোমর থেকে পিছন দিকে হেলিয়ে দিলেন। এতক্ষণ ঘোড়ার ওপর বসে বসে কোমর ধরে গেছে। বেশবাস দেখে বোঝা যায় ইনি একজন রাজপুরুষ। তিনি সোজা হয়ে দ্বিতীয় জনকে বললেন, ‘কী আচার্য মশাই, পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েননি তো?’

বিদ্যাধর ঘোড়া থেকে নেমে বললেন, ‘পিতাঠাকুর নিজের হাতে আমাকে অস্ত্রচালনা, যুদ্ধবিদ্যা, অশ্বারোহণের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এত সহজে ক্লান্ত হওয়ার লোক আমি নই রায়মশাই।’

ভান্দসী রায় তৃতীয় জনকে বললেন, ‘দরবেশ মশাই! ঘোড়া থেকে নামতে আজ্ঞা হোক।’

তৃতীয় যে দীর্ঘদেহী পুরুষটি অশ্ব হতে অবতরণ করলেন, তাঁর পরনে লম্বা জোব্বা। মাথার আবরণটিও প্রায় কপাল অবধি নেমে এসেছে। তার ফাঁক দিয়ে শুধু তাঁর দীর্ঘ শ্মশ্রু নজরে পড়ে। তিনি নেমে একবার আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘ফজরের নামাজ আদাহ করার ওয়ক্ত এসে গেছে। আমি ওই বিল থেকে ওযু করে আসি।’

পুরুষটি দিঘির দিকে চলে গেলে বিদ্যাধর ফিসফিস করে ভান্দসী রায়কে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনার কথায় নির্ভর করে এঁকে সঙ্গে করে তো আনলাম। কিন্তু কার্যসিদ্ধি হবে তো? নাকি সুলতানের রাজসভায় গিয়ে উলটো গাইবেন? তাহলে কিন্তু দুজনেরই গর্দান যাবে।’

ভান্দসীর দাঁতগুলো পড়ন্ত চাঁদের আলোয় মৃদু ঝিকমিকিয়ে উঠল। তিনি বললেন, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন আচার্য মশাই। একে যে পরিমাণ সোনাদানা আর ভূমিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। এ আমার কেনা গোলাম হয়ে আছে৷ তাছাড়া আরও একটি বাঁধন আছে।’

শেষের কথাটা বুঝলেন না বিদ্যাধর, ‘আরও একটি বাঁধন বলতে?’

চোখ মটকালেন ভান্দসী, ‘আছে। চম্পাবাই।’

আরও বিস্মিত হলেন বিদ্যাধর, ‘চম্পাবাই? তিনি কে?’

ভান্দসীর স্বর আরও নিচু হয়ে এল, ‘চম্পাবাই একজন নগরনটী, এই অঞ্চলেরই মানুষ। মেয়েমানুষ বললেই চলে। দরবেশ সাহেব এইদিকে একবার ইসলামের দাওয়াত দিতে এসে চম্পাবাইয়ের আতিথ্য স্বীকার করেন, বুঝলেন কী না? সেই থেকেই চম্পাবাই জনমনোরঞ্জনের পারিবারিক ব্যবসা ছেড়ে বোরখা নেকাব পরে পাঁচ ওয়ক্তের নামাজী হয়ে গেছেন। দরবেশ সাহেবের খুব ইচ্ছে চম্পাবাইকে নিকাহ করেন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যে এই নারীর যা পারিবারিক ইতিহাস, তাতে ইসমাইল গাজী এই নিকাহতে মত দেবেন বলে মনে হয় না।’

এতক্ষণে পরিকল্পনাটা অল্প অল্প করে পরিষ্কার হতে লাগল বিদ্যাধর নাড়িয়ালের সামনে। এখন তিনি বুঝতে পারলেন, ভান্দসী রায় কেন তাঁর পরিকল্পনা শুনে তৎক্ষণাৎ একমত হয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর

মনে যে কী আছে সেটা খুলে বলেননি। শুধু কাল সন্ধেবেলা এই দরবেশ সাহেবকে নিয়ে তিনজনে মিলে বেরিয়ে পড়েছেন লক্ষ্ণৌতির উদ্দেশে।

আজ এইমাত্র বিদ্যাধর বুঝতে পারলেন যে রাজনীতির অঙ্গনে ভান্দসী রায় তাঁর থেকেও অনেক বড় ক্রীড়াবিদ। এতদিন অবধি বিদ্যাধরের মনে হচ্ছিল, তাঁর একজন ভান্দসী রায়কে চাই, যে বিদ্যাধরকে তাঁর উদ্দেশ্য অবধি পৌঁছে দেবে৷ তিনি এখন বুঝলেন যে, আসলে ভান্দসী রায়ের একজন বিদ্যাধর নাড়িয়ালের প্রয়োজন ছিল, যাকে ভান্দসী নিজের উদ্দেশ্যসাধনের জন্য ব্যবহার করবেন। আজ ক্রীড়নক আর ক্রীড়াপুত্তলির ভূমিকা উলটে গেছে।

বিদ্যাধর কৃতাঞ্জলিপুটে বললেন, ‘আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম রায়মশাই। আমাকে ক্ষমা করবেন।’

ভান্দসী রায় অট্টহাস্যে ফেটে পড়তে গিয়েও থেমে গেলেন, তারপর চাপাস্বরে বললেন, ‘সবই জানি আচায্যিমশাই। আপনি চিন্তা করবেন না, এ ছাড়াও আমার এমন একটি গোপন অস্ত্র আছে যার সন্ধান আমি আপনাকেও জানাইনি। সেই ব্রহ্মাস্ত্রের মার নেই।’

‘কী সেই অস্ত্র।’

‘সময় আসুক, ঠিক বলব। ইসমাইল গাজীর গর্দান যাক, ভুরশুটের জয়দুর্গা মন্দিরে আমি আর শ্রীমন্তনারায়ণ জোড়া মহিষ বলি দেব। সেই কথাই হয়ে আছে। মা মা গো, রক্ষা করো মা।’

ততক্ষণে পূবের সূর্য উদিত হবে হবে করছে। দীর্ঘদেহী তৃতীয় পুরুষটি তাঁর কাঁধে বেঁধে রাখা একখণ্ড কাপড় মাটিতে বিছিয়ে নামাজ আদায় করছিলেন। নামাজ শেষ হলে উঠে প্রসন্নস্বরে বললেন, ‘বলুন রায়সাহিব, এবার কী করতে হবে?’

ভান্দসী রায়ও ততোধিক প্রসন্ন হেসে বললেন, ‘এবার কিছু নাস্তা পানি নসিব হোক দরবেশ সাহিব? লক্ষ্ণৌতি আর মাত্র কয়েক দণ্ডের পথ, দাখিল দরওয়াজা বেশি দূর নয়।’

কাঁটাদুয়ার গড়প্রাসাদের ছাদে পশ্চিমাস্য হয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করছিলেন ইসমাইল গাজী। রাজা কামেশ্বর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ভারি ভক্তিভরে নামাজের ভঙ্গি লক্ষ্য করছিলেন। আর কয়েকদিন তো মাত্র, তারপরেই তো মুরশিদ তাঁকে নিজে হাতে সেই অনাবিল শান্তিময় ধর্মে দীক্ষিত করবেন। এখন থেকেই সব শিখে রাখা দরকার।

এমন সময় দরওয়ান এসে সংবাদ দিল ঘোড়াঘাট দুর্গের অধিপতি ভান্দসী রায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। সঙ্গে খান-ই-জাহান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ, কয়েক টুকরি সর-ই-খেল সহ দুইজন সিপাহসালার এবং এবং ইসমাইল গাজীর অনুগত সঙ্গী নুরুদ্দিন ওসমান।

ইসমাইল গাজী চিন্তিত হলেন। ইউসুফ শাহ শুধু খান-ই-জাহানই নন, সুলতান বারবাক শাহ’র পুত্রও বটে। তিনি এখানে এমন অসময়ে? আর তাঁর সঙ্গে গাজী সাহেবের খাস খাদেম নুরুদ্দিন ওসমান কেন? সৈন্যই বা কীসের জন্য?

রাজা কামেশ্বর কয়েক দিন আগে অবধি স্বাধীন রাজা ছিলেন। তখন গৌড়ের সুলতান বা তাঁর প্রতিনিধি এইভাবে তাঁর রাজ্যের সীমার মধ্যে ঢুকলে যুদ্ধ বেধে যাওয়া অনিবার্য ছিল। কিন্তু এখন তিনি সুলতানের খাস লস্কর-উজিরের দাসানুদাস। তিনি অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য ব্যগ্র হয়ে এগিয়ে গেলেন। অবশ্য তাঁকে বেশি দূর যেতে হল না। উভয়েই দেখলেন খান-ই-জাহান অত্যন্ত দ্রুতপদে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে আসছেন। পেছনে নুরুদ্দিন ওসমান, ভান্দসী রায় এবং দুইজন সিপাহ সালার সহ কয়েকজন সৈন্য।

শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ ছাদে এসে অধিষ্ঠিত হলেন। বাকিরা তাঁর দুইপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন। ইসমাইল গাজী অভিবাদন জানিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার মালিক? খোদাবন্দ কি আমার জন্য কোনও জরুরি পয়গাম পাঠিয়েছেন? বান্দাকে এত্তেলা দিলেই তো লক্ষ্ণৌতি গিয়ে উপস্থিত হতাম। এর জন্য এত তকলিফ উঠাবার কী জরুরত ছিল?’

শামসউদ্দিন বয়সে নবীন। তিনি একসময়ে ইসমাইল গাজীর একান্ত ভক্ত ছিলেন। তাঁর পিতা যে এই দুরূহ কর্মের ভার তাঁকেই সঁপে দেবেন সে তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি। কিন্তু রাজকর্তব্য বড় কঠিন জিনিস। সময়ে সময়ে সে নিজের পিতা বা সন্তানকেও রেহাই দেয় না, আর ইনি তো বেতনভুক কর্মচারী মাত্র।

নিজের স্বর যথা সম্ভব কঠোর করে শামসউদ্দিন বললেন, ‘ইসমাইল গাজী, তোমার নামে সুলতানের রাজদরবারে অভিযোগ এসেছে যে তুমি সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চলেছ। সুলতান জানতে চেয়েছেন, এর মধ্যে কতটা সত্যতা আছে?’

ইসমাইল গাজী চতুর মানুষ৷ মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর বিরুদ্ধে অনেকদিন ধরেই কেউ বা কারা ষড়যন্ত্রের সলতে পাকাচ্ছিল৷ তিনি তা বুঝতে পারেননি। অথচ তাঁর বোঝা উচিত ছিল। হাজার হোক, এই দেশ কাফের বুতপরস্তদের দেশ। এই নাপাক ইবলিশের বাচ্চারা যে এত সহজে নিজের দেশকে শান্তির ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে আসতে দেবে না, তা তিনি আগেই আন্দাজ করেছিলেন। শুধু সেই দিন যে এত তাড়াতাড়ি আসবে, ভাবেননি।

ইসমাইল গাজী তাঁর বিশ্বস্ত তরবারিটি সদাসর্বদাই নিজের সঙ্গে রাখেন, নামাজ করার সময়েও। তরবারির অগ্রভাগেই তিনি এই খর্বাকৃতি, কৃষ্ণবর্ণ, প্রেত উপাসক বঙ্গালিদের ইসলামের শান্তির ছায়াতলে আনবেন, এই তাঁর মনোগত বাসনা। এই বুতপরস্ত কাফেরদের কালেমার পতাকাতলে আনতে হলে তরবারি ছাড়া উপায় নেই। তাই তরবারি তাঁর শয়ন স্বপন জাগরণের সদাসঙ্গী।

তিনি ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, ‘শাহ ই বঙ্গালের সঙ্গে নিমকহারামি করার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। কোন খবিশের বাচ্চা এই অন্যায় অভিযোগ এনেছে আমার নামে?’

শামসউদ্দিন ধমকে উঠলেন, ‘ভদ্রভাবে কথা বলো ইসমাইল গাজী। খান-ই-জাহানের সামনে এই বত্তমিজি করার সাহস হল কী করে তোমার?’

ইসমাইল গাজী সতর্কভাবে বললেন, ‘বেয়াদপি মাফ করবেন খান-ই-জাহান। কিন্তু কীভাবে বিদ্রোহ করতে চলেছি জানতে পারি কি?’

‘আমাদের কাছে প্রমাণ আছে যে তুমি রাজা কামেশ্বরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুবা বাংলার উত্তরে আলাদা সুলতনৎ কায়েম করতে চলেছ।’

‘অসম্ভব! এ সর্বৈব মিথ্যা।’

‘আমাদের কাছে সাক্ষী, প্রমাণ সব আছে।’

‘কীসের প্রমাণ? কোন সাক্ষী?’

শামসউদ্দিন দরবেশ নুরুদ্দিন ওসমানের দিকে ফিরলেন, ‘কী ওসমান সাহিব, আপনিই বলুন।’

নুরুদ্দিন জিভ বার করে শুকনো ঠোঁটটা একবার চেটে নিলেন। তারপর কম্পিতস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি অনেকবার স্বকর্ণে গাজী সাহিবকে রাজার সঙ্গে সরকার তেজপুর, সরকার পিনজেরা আর সরকার ঘোড়াঘাট নিয়ে নতুন সুলতনৎ কায়েম করার কথা বলতে শুনেছি।’

ইসমাইল গাজী নুরুদ্দিনের দিকে দু’পা এগিয়ে গর্জে উঠলেন, ‘বেইমান, নিমকহারাম। এরকম সর্বৈব মিথ্যা বলার আগে তোর জিভ খসে পড়ল না কেন?’

ইসমাইল গাজীকে এগিয়ে আসতে দেখে সর-ই-খেল আর সিপাহসালাররা তরবারি কোষমুক্ত করল। শামসউদ্দিন তীব্র স্বরে বললেন, ‘সাবধান ইসমাইল গাজী! নিজের এখতিয়ারের বাইরে যেও না। আর এক পা এগোলে তোমাকে বন্দী বানাতে বাধ্য হব।’

গনগনে আগুনে চোখ নিয়ে ভান্দসী রায়ের দিকে তাকালেন ইসমাইল গাজী, ‘এই সাজিশ তোরই নাপাক সর থেকে বেরিয়েছে, তাই না কাফের?’

শামসউদ্দিন এবার উত্তেজিত হয়ে নিজের তরবারি কোষমুক্ত করলেন, ‘শেষবারের মতো তোমাকে সাবধান করছি ইসমাইল গাজী, নিজের ভাষা সংযত করো। ভান্দসী রায় খোদাবন্দের নিয়োজিত একজন উজির। তাঁর সম্পর্কে এমন মন্তব্য করার স্পর্ধা হয় কী করে তোমার?’

ভান্দসী রায় তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমাকে তরবারির ভয় দেখিও না ইসমাইল গাজী৷ আমিও আমার তরবারি দিয়ে ঘোড়ার ঘাস কাটি না। তোমার অহঙ্কারের উচিত জবাব দিতে পারি। নেহাত খান-ই-জাহান সামনে আছেন বলে ওঁর সম্মানার্থে চুপ আছি। নইলে তোমার মতো বিশ্বাসঘাতককে কী করে শায়েস্তা করতে হয় সে আমার ভালোই জানা আছে।’

ইসমাইল গাজী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই শামসউদ্দিন রাজা কামেশ্বরের দিকে ফিরলেন, ‘আপনিই বলুন, ইনি আপনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আলাদা সালতানৎ বানাতে যাচ্ছিলেন কি না?’

ইসমাইল গাজী ভেবেছিলেন তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য এর থেকে বড় সাক্ষ্য আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু তিনি বিস্মিত হয়ে শুনলেন রাজা কামেশ্বর স্থির স্বরে বলছেন, ‘আপনি ঠিকই শুনেছেন। আমি আর গাজী সাহেব মিলে স্থির করেছি তেজপুর, পিনজেরা আর ঘোড়াঘাট সরকার দখল করে কামরূপের সঙ্গে সংযুক্ত করব। ইসমাইল গাজী হবেন ইকলিমে কামরূপ আর ইকলিমে সোনারগাঁ’র সার্বভৌম সুলতান, খলিফৎ আল্লাহ। আমি আপনাকে সতর্ক করছি, আমাদের এই পরিকল্পনায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এ আল্লাহ’র দ্বারা পূর্বেই বিধিনির্দিষ্ট।’

ক্ষিপ্ত ইসমাইল গাজী তড়িৎগতিতে তরবারি বার করে রাজা কামেশ্বরকে আঘাত করতে গেলেন। কিন্তু তাঁর সামান্য দেরি হয়ে গেল। তার আগেই ঝলসে উঠল খান-ই-জাহান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ’র তরবারি। আর ইসমাইল গাজীর মাথাটা ছিটকে পড়ল ছাদের একপাশে৷ ধড়টা ছটফট করতে করতে একসময় স্থির হয়ে গেল।

শামসউদ্দিন তরবারি কোষবদ্ধ করে একজন সিপাহসালারকে বললেন, ‘এর মাথাটা এই কাঁটাদুয়ারেই গোর দেবে, আর ধড়টা গোর দেবে মান্দারণ দুর্গের সামনে, যেখানে ও অজস্র নিরীহ মানুষের রক্তপাতের কারণ হয়েছে, সেখানেই।’

পূর্ণিমার চাঁদে আরকের নেশা সম্ভবত কিছু বেশি হয়ে থাকবে। কারণ কাঁটাদুয়ার গড়প্রাসাদের ছাদে বসা তিনটি শরীরের মধ্যে দুটি শরীর অল্প অল্প টলছিল। অথচ পান বেশি হয়নি। অতি উৎকৃষ্ট গৌড়ীয় শরাবের সঙ্গে তিতির পাখির শূল্যপক্ব মাংস, হিং আদা দিয়ে কষা কষা মেষমাংস, করতোয়ার বরালি মাছ ভাজা, এবং কিছু শুকনো ফল, এই হচ্ছে আজকের সান্ধ্যাহ্নিকের উপকরণ। এই শুকনো ফলগুলি

খান-ই-জাহানের উপহার। শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে তিনি বেশ কিছু দুর্মূল্য মসলিন কাপড়, মুক্তার হার, চন্দনের ছড়া এসবও উপহার দিয়ে গেছেন।

গ্রীষ্মের মনোরম বাতাস বয়ে আসছে করতোয়ার দিক থেকে। গৌড়ের আখ আর গুড় পৃথিবী বিখ্যাত। গৌড়ের নামই হয়েছে গুড় থেকে। সেই গুড়ের থেকে তৈরি আরক যে অতি উৎকৃষ্ট হবে তাতে আর সন্দেহ কী?

ভান্দসী রায় একটি আখরোট আর খোবানি মুখে দিয়ে বললেন, ‘আহা, চমৎকার খেতে! যেমন স্বাদ তেমনই সুতার। কী রাজামশাই, কী বলেন?’

রাজা কামেশ্বর নারকেলের ফুল দিয়ে তৈরি একধরনের মদ নিজের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি কামরূপের এই বিশেষ সুরা ছাড়া অন্য পানীয় স্পর্শ করেন না। এতে মৌতাত যেমন দ্রুত হয়, থাকেও দীর্ঘক্ষণ। তিনি মাছ মাংসের ভক্ত, ফলমূল ছোঁন না। তিনি তিল দিয়ে ভাজা বরালি মাছ একথাবা মুখে ফেলে বললেন, ‘সে তুমি জানো মিত্র। আমি ঘোর মাংসাশী মানুষ। ফলমূল আমার একদম পোষায় না। তুমি বরং আরও একটু আরক আনাতে বলো হে।’

সেবকরা আশেপাশেই প্রস্তুত ছিল। তার তৎক্ষণাৎ একটি পূর্ণ কলসি এনে রাখল সামনে।

মদ্যপান করছিলেন না একজনই। তিনি একটুকরো আম মুখে দিয়ে বললেন, ‘তাহলে রাজা কামেশ্বরই আপনার গোপন অস্ত্র ছিলেন, রায়মশাই?’

ভান্দসী রায়ের শ্বদন্তদুটি পূর্ণচন্দ্রের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল। খুক খুক করে খানিকটা হেসে তিনি বললেন, ‘শাস্ত্রে বলে শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ। আমি বলি ম্লেচ্ছে ম্লেচ্ছং সমাচরেৎ। ওরা যেমন শঠতার আশ্রয় নিয়ে সম্রাট পৃথ্বীরাজকে পরাস্ত করেছিল, ওদেরও তেমন শঠতার আশ্রয় নিয়েই নিশ্চিহ্ন করতে হবে।’

রাজা কামেশ্বর ঈষৎ স্খলিতস্বরে বললেন, ‘অহোম রাজ্যের সীমানা স্পর্শ করলে এই ম্লেচ্ছ যবনদের মাথা এভাবেই ধড় থেকে আলাদা করে দেওয়া হবে। সে প্রকাশ্য যুদ্ধেই হোক বা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে। তবে এসব ছলচাতুরির জাল বিছোতে হলে বন্ধু ভান্দসীর মতো বুদ্ধিমান লোক হওয়া চাই।’

খুক খুক করে হাসলেন ভান্দসী রায়। তারপর তৃতীয় ব্যক্তিকে বললেন, ‘এবার কী আদেশ আচার্য?’

বিদ্যাধর মদ স্পর্শ করেন না। তিনি অল্প অল্প আখের রস পান করছিলেন। শুনে বললেন, ‘আপাতত বাংলা থেকে পাঠান শাসন অপসৃত হওয়ার আশু কোনও আশা দেখছি না। হিন্দু নরপতিদের রাজ্য ও ক্ষমতা ক্ষুদ্র। তার ওপর তাঁরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এত ব্যস্ত হয়ে থাকেন যে, সমগ্র ভারতবর্ষের কথা তাঁদের মনেই পড়ে না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে এই পাঠান নরপতিদের থেকেও প্রবলতর কোনও শক্তির আগমনের জন্য। আর আমার মন কী বলছে জানেন রাজা?’

‘কী বলছে আচায্যি মশাই?’

‘তারা আসছে।’

জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ’র পত্রখানি পাঠ করছিলেন প্রৌঢ় শ্রীমন্তনারায়ণ। ফতে শাহ’র সঙ্গে এখন ভারি মিত্রতা হয়েছে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র। দু’পক্ষের মধ্যে প্রায়ই পত্র এবং বিবিধ উপঢৌকনাদির আদান প্রদান হয়। এই মিত্রতার অবশ্য যথেষ্ট কারণও আছে।

রুকনুদ্দিন বারবাক শাহ’র এন্তেকালের পর প্রত্যাশিতভাবেই সুলতান হয়েছিলেন শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ। নতুন সুলতান পিতার একটি গুণ পেয়েছিলেন, ন্যায়পরায়ণতা। আর বারবাক শাহ’র একটি গুণ তাঁকে চিরতরে ত্যাগ করেছিল, পরধর্মসহিষ্ণুতা। পাণ্ডুয়া জয় করে তিনি নারায়ণ ও সূর্যমন্দির ধ্বংস করলেন। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর নির্মাণ করলেন বাইশ দরওয়াজা মসজিদ। ব্রহ্মশিলা নির্মিত বিরাট সূর্যমূর্তির পিছনে খোদাই করালেন, ‘খলিফত আল্লা ফিল আরাদিন সুলতান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ’র রাজত্বকালে ৮৮২ হিজরির ১ মহরম এই মসজিদ নির্মিত হল।’

শ্রীমন্তনারায়ণকে আবার সক্রিয় হতে হল। গড় মান্দারণের যুদ্ধের পর পরই ইসমাইল গাজী শ্রীমন্তনারায়ণের ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি প্রতিনিয়ত ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণ করার ব্যাপারে সুলতান বারবাক শাহকে উত্তেজিত করতেন। কিন্তু কূটনীতির খেলায় রাজা কৃষ্ণনারায়ণও কম দড় নন। তিনি তাঁর বংশের একজন সুদর্শন, প্রিয়ভাষী এবং কূটনৈতিক দৌত্যে দক্ষ যুবক মুকুটরামকে প্রভূত উপঢৌকন সহ লক্ষ্ণৌতি পাঠালেন বারবাক শাহ’র প্রীতি উৎপাদনের জন্য। বারবাক শাহ বুদ্ধিমান শাসক ছিলেন। তিনি মুকুটরামের কথার সত্যতা অনুধাবন করতে পেরে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র প্রতি বিদ্বেষভাব ত্যাগ করলেন।

এর পরেই রাজা কৃষ্ণনারায়ণ এবং রাজা শ্রীমন্তনারায়ণ ঘোড়াঘাটের দুর্গাধিপতি ভান্দসী রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ইসমাইল গাজীর করুণ পরিণতি ঘটে।

মুকুটরাম শুধু দৌত্যকার্যে নয়, কূটনীতিতেও প্রখর বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি লক্ষ্ণৌতি ত্যাগ করার আগে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে গোপনে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আসেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন বারবাক শাহ’র আপন ভ্রাতা, জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ।

কৃষ্ণনারায়ণ জানতেন যে পাঠান শাসকদের মধ্যে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রায়শই গোলযোগ লেগে থাকে। তিনি কৌশলে ফতেহ শাহ’র মনের সংগোপনে লালিত উচ্চাকাঙ্ক্ষাটির গোড়ায় নিয়মিত জলসিঞ্চন করতে থাকলেন।

অচিরেই তার ফল ফলল। শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ যেদিন ভূরিশ্রেষ্ঠ আক্রমণের উদ্যোগ নিলেন, সেইসময় ফতেহ শাহ বিদ্রোহী হলেন। ইউসুফ শাহ’র আর ভূরিশ্রেষ্ঠ জয় করা হল না। এরপর ইউসুফ শাহ গতায়ু হলে ফতেহ শাহ সুলতান আল সালাতিন উপাধি ধারণ করে গৌড়ের সিংহাসনে আসীন হলেন। পাঠান শাসন আর ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজবংশের মধ্যে বহুবর্ষব্যাপী সদ্ভাব স্থাপিত হল।

সেই ফতেহ শাহ একটি পত্র পাঠিয়েছেন মিত্র শ্রীমন্তনারায়ণের কাছে। শরফনামার রচয়িতা ইব্রাহিম কায়ুম ফারুকি সুলতানের নামে একটি প্রশস্তি রচনা করেছেন। সুলতান সেটিই পাঠিয়েছেন প্রিয় মিত্রকে।

ভ্রাতুষ্পুত্র দেবনারায়ণের কাছে সেটি পাঠ করছিলেন শ্রীমন্তনারায়ণ, ‘কী চমৎকার, স্বর্গলোকই তোমার অত্যুচ্চ প্রাসাদের চূড়া। এর ফটককে যথার্থই বলা যায় ফটক-আল-মাওয়া। বাকেলের হাত থেকে যেমন হরিণ পালিয়ে গেছিল, তেমন তোমার শত্রুদের হাত থেকে সৌভাগ্য চলে যাচ্ছে। ওয়ামক যেমন আজরার অঞ্চল ধারণ করেছিলেন, তেমনই তোমার উচ্চ মর্যাদা স্বর্গকে স্পর্শ করছে। স্বর্গের দেবদূতরা এবং আমরা প্রতি মুহূর্তে বলছি যে তুমি মহিমান্বিত জালালউদ্দিন ওয়াদ দুনিয়া…’

ভ্রাতুষ্পুত্রের দিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে চোখ তুলে তাকালেন শ্রীমন্তনারায়ণ। দেখলেন রাজা দেবনারায়ণের চোখ দুটি অশ্রুভারাক্রান্ত, মুখখানি মলিন। তিনি পত্রটি সরিয়ে রাখলেন। মৃদুস্বরে ডাকলেন, ‘দেব।’

দেবনারায়ণ সচকিত হয়ে উঠলেন। ছি ছি ছি, পূজ্যপাদ পিতৃব্য তাঁকে গৌড় বাদশাহ’র পত্র পড়ে শোনাচ্ছেন, আর তিনি অন্যমনস্ক? তিনি হাত জোড় করে বললেন, ‘ক্ষমা করবেন খুড়ামশাই। আসলে মনটা ঠিক…’

বাকিটা আর বলতে পারলেন না দেবনারায়ণ। তাঁর স্বর বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এল। তিনি অন্যদিকে মুখ ফেরালেন। শ্রীমন্তনারায়ণের মুখখানিও মলিন হয়ে এল। তিনি দেবনারায়ণের কাঁধে একবার হাত রেখে উঠে গেলেন।

দেবনারায়ণের একমাত্র সন্তান বসন্ত বিসূচিকা রোগে আক্রান্ত। বৈদ্য-কবিরাজ প্রত্যেকে নিদান দিয়ে গেছেন যে বসন্ত’র বাঁচার আশা নেই বললেই চলে। সেই থেকে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রাজপ্রাসাদের সর্বত্র একটা অশ্রুত মলিন কান্নার শব্দ ভাসে।

দেবনারায়ণ উঠে পড়লেন। খুল্লতাতকে প্রণাম করে বললেন, ‘আজ আমার মন ভালো নেই খুড়ামশাই। অনুমতি দিন, আজ উঠি?’

শ্রীমন্তনারায়ণ বিষণ্ণমুখে অনুমতি দিলেন। দেবনারায়ণ রাজভবন থেকে বেরিয়ে দরওয়ানকে বললেন, ‘ঘোড়ার ব্যবস্থা করতে বলো। আমি একটু বেরোব। কোনও সিপাই সান্ত্রী প্রয়োজন নেই।’

দেবনারায়ণ ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে গেলেন। শ্রীমন্তনারায়ণের পুত্র মহেন্দ্রনারায়ণ এদিকেই আসছিলেন। তিনি রাজা দেবনারায়ণকে একা যেতে দেখে উদ্বিগ্ন হলেন। দেশের অবস্থা ভালো না। রাজা দেবনারায়ণ একাকী গেলেন কোথায়?

এমন সময় শ্রীমন্তনারায়ণ বেরিয়ে এলেন। তাঁর মুখটি যেমন চিন্তাক্লিষ্ট তেমনই বিষাদাচ্ছন্ন। মহেন্দ্র এগিয়ে এসে প্রণাম করে বললেন, ‘কী হয়েছে পিতাঠাকুর?’

‘বসন্তকে নিয়ে দেব ভারি দুশ্চিন্তায় আছে মহেন্দ্র। তার মন ভালো নেই, চিত্ত বিক্ষিপ্ত। অথচ চারিদিকে শত্রুর জ্বলন্ত নিঃশ্বাস। সংবাদ পেয়েছি সুলতান ফতেহ শাহ’র কিছু হাবশি খোজা ভারি অবাধ্য হয়ে উঠেছে। তারা প্রকাশ্যেই সুলতানের আদেশ অমান্য করছে। সুলতান তাঁদের সামলাতে পারছেন না।’

‘কিন্তু পিতা, সুলতান তো দুর্বল নন।’

‘না, দুর্বল একেবারেই নন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ফতেহ শাহ যতটা সাহসী, ততটা কৌশলী নন। তাঁর বিশ্বস্ত উজির মালিক আন্দিল হাবশিদের নেতা খাজা বারবাককে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বটে। কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। আমার আশঙ্কা, খুব শীঘ্রই সুলতান ফতেহ শাহ’র পতন ঘটবে। এই হাবশিদের বিশ্বাস নেই। একে তারা এই দেশের লোক নয়, তার ওপর তারা স্বভাবেও নিষ্ঠুর আর নৃশংস। তুমি এক কাজ করো, গড় ভবানীপুর আর পেঁড়োর দুর্গে আরও পাইক বরকন্দাজ পাঠাও। সীমান্ত অঞ্চল সুরক্ষিত করো। দুর্গাধ্যক্ষদের বলে দাও সদা সতর্ক থাকতে। চরেদের বলে দাও চারিদিকে যেন চোখ কান খোলা রাখে।’

মহেন্দ্রনারায়ণ মাথা নেড়ে চলে গেলেন। এখান থেকে পেঁড়োর দুর্গ প্রায় অর্ধদিনের পথ।…

দেবনারায়ণ যখন রোণ নদীর পাশে এসে ঘোড়া থেকে নামলেন তখনও দুপুর হয়নি। এখন হেমন্তকাল। ধানের খেতগুলি বিধবার সিঁথির মতো রিক্ত ও শূন্য হয়ে পড়ে আছে। নদীর ধারে কিছুটা জমি অনাবাদী, শুকনো ঝোপঝাড়ে ভরে আছে জায়গাটা৷ চাষের জমির একপাশে একটি ছোট ডোবা। তাতে ফুটে আছে পদ্ম আর শালুক।

উদাস মুখে নদীর দিকে চেয়ে রইলেন দেবনারায়ণ। নদীর ধারে মরা কাশফুলের গুচ্ছ। ভূরিশ্রেষ্ঠ’র আরাধ্য দেবী হলেন দেবী জয়দুর্গা৷ কয়েকদিন আগেই রাজবাড়িতে দেবী জয়দুর্গার শারদীয় পূজা সম্পন্ন হয়েছে৷ অবশ্য এবারের পূজার ধুমধাম অনেকটাই কম।

সন্তানের কথা ভাবতে ভাবতে দেবনারায়ণের চোখ জলে ভরে এল। ওই একটিই মাত্র সন্তান তাঁর৷ প্রায় সমস্ত বৈদ্যরা জবাব দিয়ে গেছেন। আর মাত্র কয়েকটি মাস।

ভাবতে ভাবতে সম্পূর্ণ অন্য জগতে চলে গেছিলেন দেবনারায়ণ। সম্বিত ফিরল কার যেন স্বরে, ‘রাজন, এখানে একাকী কেন?’

দেবনারায়ণ দেখলেন তাঁর সামনে একজন দীর্ঘদেহী জটাজূটধারী সন্ন্যাসী। বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলে কী হবে, দেহখানি সবল ও সুদৃঢ়। আশ্চর্য উজ্জ্বল চক্ষু। দেবনারায়ণ প্রণত হলেন, ‘বলুন সন্ন্যাসীদেব, অধমের প্রতি কী আদেশ?’

‘আমি ক্ষুধার্ত রাজন। কিছু ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করি।’

দেবনারায়ণ সবিনয়ে বললেন, ‘অনুগ্রহ করে রাজভবনে চলুন দেব। সন্ন্যাসীসেবার সুযোগ দিন।’

দুজনে যখন রাজভবনে পৌঁছলেন, তখন শ্রীমন্তনারায়ণ নিজের ভবনে গেছেন দ্বিপ্রাহরিক আহার সমাপনের জন্য। রাজভবন শান্ত এবং নিশ্চুপ। সন্ন্যাসী ভবনে প্রবেশ করেই স্থির হয়ে গেলেন। নাক উঁচু করে কী যেন শুঁকলেন। তারপর হাতের আঙুলের কর গুণে কী যেন গণনা করলেন। তারপর অস্ফূটে বললেন, ‘আশ্বিনে বৃষ রাশিতে কৃত্তিকা, নিশ্চিত মৃত্যুযোগ দেখতে পাচ্ছি। কী ব্যাপার রাজন। গৃহে অমঙ্গলের ছায়া কেন দেখতে পাচ্ছি?’

দেবনারায়ণ আর পারলেন না। বাষ্পরূদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘আমার একমাত্র সন্তান কঠিন বিসূচিকা রোগে আক্রান্ত ঠাকুর। সে বোধহয় আর বাঁচবে না।’

বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন।

সন্ন্যাসী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলেন৷ তারপর বললেন ‘আমাকে আপনার সন্তানের কাছে নিয়ে চলুন রাজন।’

নিজেকে সামলালেন দেবনারায়ণ, ‘কিন্তু ঠাকুর, আপনি যে বললেন আপনি ক্ষুধার্ত।’

সন্ন্যাসী গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রাজকুমার মৃত্যুশয্যায়। এই অবস্থায় অন্নগ্রহণ করি কী করে?’

সন্ন্যাসীঠাকুরকে অন্তঃপুরে প্রবেশ করতে দেখে রানিমা উঠে দাঁড়ালেন। কেঁদে কেঁদে তাঁর চোখদুখানি ফুলে গেছে। তিনি অবগুণ্ঠনটি মাথায় টেনে প্রণাম করলেন সন্ন্যাসী ঠাকুরকে। সন্ন্যাসী আশীর্বাদ করে বালক বসন্তের কাছে উপস্থিত হলেন। দেখলেন একটি শিশু নির্জীব অবস্থায় পালঙ্কে শুয়ে আছে। দেহখানি কঙ্কালসার, মুখে স্পষ্ট মৃত্যুর ছায়া৷

সন্ন্যাসীঠাকুর শিশুটিকে কোলে নিলেন। তারপর দেবনারায়ণ আর রানিমাকে বললেন, ‘আপনারা বাইরে যান। আমি দরজা বন্ধ করে কিছু ক্রিয়া করব। যতক্ষণ না এই শিশুর কান্নার স্বর শুনতে পান, দরজা খুলবেন না।’

রাজা দেবনারায়ণ আর রানিমা দুরুদুরু বক্ষে ঘরের বাইরে গেলেন। সন্ন্যাসী ঠাকুর দরজা বন্ধ করে দিলেন।

ধীরে ধীরে দ্বিপ্রহরের বেলা পড়ে এল। হেমন্তের ম্লান বিকেল যেন অন্ধকারের মলিন বসন টেনে দিতে লাগল ভূরিশ্রেষ্ঠ’র আকাশে। রাজা দেবনারায়ণ আর রানিমা ঠায় বসে আছেন দরজার বাইরে। কোনও দাস দাসীকে কাছে আসতে দেননি। দুজনেই ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলে গেছেন। অপেক্ষা করছেন কখন কান্নার শব্দ শোনা যায়।

একটু পর কার যেন মৃদু পদশব্দ শোনা গেল। ধীরে ধীরে শ্রীমন্তনারায়ণ এসে বসলেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের পাশে। তিনি সবই শুনেছেন। কোনও কথা বলে তিনিও চুপচাপ বসে রইলেন।

সন্ধ্যা নেমে এল। শঙ্খনাদের ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। জয়দুর্গার মন্দিরে বেজে উঠল সন্ধ্যারতির ঘণ্টা। এমন সময় সমস্ত শব্দ চাপা দিয়ে ঘরের ভেতর থেকে তীব্র কান্নার শব্দ ভেসে উঠল।

ধড়মড় করে উঠে বসলেন তিনজনেই। দেবনারায়ণই প্রথমে দরজা খুললেন। তারপর ঘরে ঢুকে থমকে গেলেন।

বাকি দুজন ঢুকে দেখলেন যে শিশু এতদিন দৌর্বল্যের জন্য মাথা তুলে খাদ্যগ্রহণ করতে পারছিল না, যে এখন দিব্যি মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছে আর তারস্বরে চেঁচিয়ে জানান দিচ্ছে যে সে ক্ষুধার্ত।

আর সন্ন্যাসী?

তিনি বজ্রাসনে বসে আছেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, দেহে প্রাণ নেই। মেরুদণ্ড ঋজু, মুখে একটি অদ্ভুত প্রশান্তি। আর তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে একটি অদ্ভুত চন্দনগন্ধ।

শব্দ করে কেঁদে উঠলেন রানিমা। দ্রুত কোলে তুলে নিলেন তাঁর স্নেহের পুত্তলিকে। দেবনারায়ণ সাষ্টাঙ্গপ্রণিপাত হলেন। তাঁরও বুক ভেসে যাচ্ছিল চোখের জলে। তবে এ অশ্রু আনন্দের অশ্রু।

কাঁদছিলেন না শুধু একজনই। তিনি স্তম্ভিত হয়ে সন্ন্যাসীর দিকে প্রস্তরমূর্তির মতো তাকিয়ে ছিলেন। একটু পরে তাঁর মুখ থেকে অস্ফূটে উচ্চারিত হল একটিই শব্দ, ‘আচার্য বিদ্যাধর?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *