বিষ্ণুক্রান্তাধিশ্বরী
গড় ভবানীপুরের রাজসভার সামনে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। মহারানী ভবশঙ্করী সিংহাসনে অধিষ্ঠিতা হয়েছেন। তাঁর কোলে শিশুপুত্র প্রতাপনারায়ণ। তাঁর ডানদিকের আসনে রাজকীয় বেশে বসে আছেন ভূপতিকৃষ্ণ, বাঁদিকের আসনে রাজগুরু হরিদেব। বাকি আসনে অন্যান্য উচ্চপদাধিকারী রাজন্য এবং সামন্তবর্গ অধি বসে আছেন। বসে আছেন ভূরিশ্রেষ্ঠ’র আশেপাশের অঞ্চলের ভূস্বামীরা। আর ভবশঙ্করীর ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর আবাল্যের সঙ্গিনী, তাঁর আত্মার অংশ পঞ্চসখী।
উপস্থিত ভূস্বামীরা সঙ্গে করে আনা বিবিধ উপঢৌকন রাজ্ঞী ভবশঙ্করীর চরণে অর্পণ করলেন, তাঁকে অজস্র স্তূতিবাদে ভরিয়ে দিলেন। দলে দলে প্রজারা আজ দেখতে এসেছে তাঁদের রানীমা’কে, দানবদলনী রাজ্ঞী ভবশঙ্করীকে। তাদের মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনিতে, সৈন্যদের তূরী ও ভেরী নিনাদে, পুরস্ত্রীদের শঙ্খধনিতে, এবং কুসুমদাম ও লাজবর্ষণে মনে হতে লাগল যেন স্বয়ং ইন্দ্রসভা নেমে এসেছে বাংলার বুকে।
প্রাথমিক হর্ষধ্বনি স্তিমিত হলে মহারানী তাঁর বিশ্বস্ত সমরকর্মী এবং সেনানায়কদের পুরষ্কৃত করা শুরু করলেন। সবার প্রথমে সম্মানিত হলেন ডোম, চণ্ডাল এবং বাগদী সমাজের সর্দাররা। তারপর পুরষ্কৃত হলেন হরিহর বাগদী। ছাউনাপুরের দুর্গাধিপতি অম্বরীষ যখন তাঁর বিক্ষত শরীর নিয়ে কোনওমতে রানীর সামনে উপস্থিত হলেন, তখন ভবশঙ্করী নিজে সিংহাসন থেকে নেমে এসে তাঁর গলায় উত্তরীয় এবং মালা পরিয়ে দিলেন। অম্বরীষের দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এমনকী আমতা বাজারের যে দোকানি দাউদ খাঁ’র মুদ্রা পেয়ে দৌড়ে এসে সংবাদ দিয়েছিল, সেও দেবীর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হল না।
তার পর নকিব উচ্চৈস্বরে ঘোষণা করলেন, ‘গড় পাণ্ডুয়ার দুর্গাধ্যক্ষ দীননাথ চৌধুরী উপস্থিত হউন।’
দীননাথ চৌধুরী সামরিক বেশে রাজ্ঞী ভবশঙ্করীর সামনে উপস্থিত হয়ে প্রণত হলেন। তাঁর গালে অশৌচের দাড়ি৷ রানী ভবশঙ্করী তাঁর গলায় উত্তরীয় পরিয়ে দিলেন। পরিয়ে দিলেন চন্দনচর্চিত রাজমাল্য। অস্ফূটে বললেন, ‘বাবা, শিবশঙ্কর…’
দীননাথ ছলছল চোখে বললেন, ‘দুঃখ কীসের মহারানী? এতদিন আমি জানতাম আমার এক সন্তান বীর, আর আরেক সন্তান ভিতু, কুলাঙ্গার। আজ জেনেছি দীননাথ চৌধুরীর দুই সন্তানই সমান বীর, সমান সাহসী। দুঃখ কীসের মা? আজ তো আমার আনন্দের দিন। আজ গর্বে আমার বুক ফুলে উঠেছে মহারানী।’
সবাইকে সম্মাননা জ্ঞাপন করা হলে নকিব হাঁকল, ‘কালু চাঁড়াল হাজির হও।’
কেউ এগিয়ে এল না। হরিদেব মৃদু হেসে বললেন, ‘সে আসবে না মা। আপনি জনসাধারণের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য রাখুন।’
উঠে দাঁড়ালেন রাজ্ঞী ভবশঙ্করী। মহিষাসুর বধান্তে যেমন উঠে দাঁড়িয়েছিলেন দেবী দুর্গা, তেমনই। সূর্যের মতো দেদীপ্যমান, অগ্নির মতো প্রখর, পর্বতের মতো মহীয়ান।
গম্ভীরস্বরে বলতে শুরু করলেন ভবশঙ্করী, ‘গত কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের এই রাজ্যে কী ঘটে গেছে সে বিষয়ে আপনারা প্রত্যেকে বিশেষরূপে অবগত। তার বিশদ বৃত্তান্তর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। ভূরিশ্রেষ্ঠ’র উচ্ছেদ, এবং ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মহারাজ্ঞীকে অঙ্কশায়িনী করার বাসনায় উসমান খাঁ যে অবিমৃষ্যকারিতার পরিচয় দিয়েছিল তার যথাযথ প্রতিফল পেয়েছে সে। তার দুর্ধর্ষ সেনানায়কদের অধিকাংশই নিহত। সে নিজেও মারাত্মকভাবে আহত, বেঁচে আছে কিনা জানি না। তাকে নিজের চোখের সামনে মরতে দেখতে পারিনি, এই দুঃখ আমার এ জন্মে যাবে না।
তবে আমার বিশ্বাস এই যুদ্ধের পর বঙ্গদেশে পাঠান বীর্যবহ্নি সম্পূর্ণরূপে নির্বাপিত হয়েছে৷ তারা আর কখনও মোগলদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে কি না সন্দেহ।
এই ঘটনাপ্রবাহ আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে বাঙালিকে সদা সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রস্তুত থাকতে হবে সমস্ত অঘটনের জন্য। প্রস্তুত থাকতে হবে অস্ত্রহাতে, যাতে বিদেশীদের দল আমাদের ভূমি, অন্ন আর নারী লুণ্ঠন করতে এলে যেন সমুচিত প্রত্যুত্তর পায়। মনে রাখতে হবে বাঙালির পরিচয় তার ধর্মে, তার সংস্কৃতিতে৷ সেই ধর্মকে যারা পদদলিত করে, সেই সংস্কৃতিকে যারা সমূলে উৎসাদন করতে চায় তাদের সর্বস্ব দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। তার জন্য যদি অস্ত্রধারণ করার প্রয়োজন হয়, তাহলে অস্ত্র ধরতে হবে। যারা শুধুমাত্র রক্তের ভাষা বোঝে, রক্ত দিয়েই তাদের ঋণ শোধ করতে হবে। কোনও দয়া নয়, মায়া নয়, সহমর্মিতা নয়। আগুনের উত্তর শুধু আগুন, তরবারির উত্তর একমাত্র তরবারি।
আজ আমরা জগদীশ্বরীর কৃপায় জয়ী। কিন্তু যদি কর্মবিমুখ হয়ে সুখে আনন্দে কালাতিপাত করি তাহলে ধর্ম রুষ্ট হবেন, মা জগদম্বা বিমুখ হবেন। শাস্ত্রে বলে ধর্ম এব হতো হন্তি, ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ। ধর্মকে রক্ষা করলে ধর্মই আপনাকে রক্ষা করবে। ধর্মের কোনও শরীর নেই, কোনও অবয়ব নেই যে সে আপনাকে আপৎকালে অস্ত্রহাতে রক্ষা করতে আসবে। নিজের জাতিকে, নিজের সভ্যতাকে, নিজের সংস্কৃতিকে এবং সর্বোপরি নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষা করাই ধর্ম। আর তার জন্য অস্ত্রধারণ করতে হলে করতে হবে। বলিদান দিতে হলে দিতে হবে। রক্ত ঝরাতে হলে ঝরাতে হবে। কিন্তু সূচ্যগ্র মেদিনীও ছেড়ে দেওয়া চলবে না।
পাঠানদের এই পবিত্রভূমি আক্রমণ করার স্পর্ধা হয়েছিল কারণ আমাদের মধ্যেই একজন মানুষরূপী শয়তান হাত মিলিয়েছিল তাদের সঙ্গে। সেই নরাধম কোন হীন ব্যক্তিগতস্বার্থে এই ঘৃণ্য পথ বেছে নিয়েছিল, তার বিশদ বিবরণের মধ্যে যাওয়া নিষ্প্রয়োজন। শুধু বলে রাখি, সে একা নয়। এমন অনেক স্বজাতিদ্রোহী গণশত্রু আমাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে যারা ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য নিজের মাতৃভূমির সর্বাংশে সর্বনাশ সাধনেও পিছ পা হয় না। এরা শত্রুর থেকেও ভয়ংকর, বিষধর সর্পের থেকেও সাঙ্ঘাতিক।
সেই নরাধম পাষণ্ডের নাম চতুর্ভুজ চক্রবর্তী। এই মনুষ্যতের ব্রাহ্মণসন্তান চেয়েছিল ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের জন্য স্বীয় জন্মভূমিকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে৷ জগদীশ্বরী রাজবল্লভীর অসীম কৃপায় এবং এই দেশের অন্ত্যজ জনজাতির বীর্যবলে এই নরাধম ব্রাহ্মণের চক্রান্তজাল ছিন্ন হয়েছে। পাঠানরা পরাস্ত, বিপর্যস্ত এবং সর্বাংশে শক্তিহীন হয়েছে।
আজ থেকে গড় পাণ্ডুয়ার রাজা শ্রীভূপতিকৃষ্ণ রায়মুখুটিকে আমি ভূরিশ্রেষ্ঠ’র প্রধান সেনাপতিরূপে নিযুক্ত করছি। তিনিই তাঁর বুদ্ধি, শৌর্য এবং কূটনৈতিক দৌত্যের দ্বারা এই চক্রান্তের জাল বহুলাংশে ছিন্ন করেছেন, ভূরিশ্রেষ্ঠকে সুরক্ষিত করেছেন, এবং সর্বশেষে, চতুর্ভুজের মতো এই কুটিল হীন চক্রান্তকারীকে বন্দী করেছেন। আমি চাই চতুর্ভুজ চক্রবর্তীর বিচার স্বয়ং ভূপতিকৃষ্ণ রায়মুখুটিইই করুন।’
মহারানী তার সিংহাসনে উপবিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গদাই দাস আর লখন মহাপাত্র শৃঙ্খলিত চতুর্ভুজকে জনসাধারণের সামনে উপস্থাপিত করল। তাঁকে দেখেই বাত্যাহত তরঙ্গমালার মতো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল উপস্থিত জনগণ। ভূপতিকৃষ্ণ দুহাত তুলে জনতাকে শান্ত করলেন। তারপর চতুর্ভুজ চক্রবর্তীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমিই বলো চতুর্ভুজ, তোমার জন্য কী শাস্তি ধার্য করা উচিত।’
চতুর্ভুজ কিছু বলার আগেই উপস্থিত জনতা গর্জন করে উঠল, ‘মৃত্যুদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড।’
চতুর্ভুজকে দেখে মনে হল তাঁর শরীরে যেন আর প্রাণ নেই। তিনি হাঁটু গেড়ে মাথা নত করে বসে রইলেন। তাঁর সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে৷ শুকনো ঠোঁটদুটি কিছু বলার জন্য একবার কেঁপে উঠেই স্থির হয়ে গেল।
ভূপতিকৃষ্ণ বললেন, ‘না, মৃত্যুদণ্ড না। মরে গেলে এ বেঁচেই যাবে। আমি চাই না এই নরাধমের রক্তে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র ভূমি অপবিত্র হোক। আমার সিদ্ধান্ত এই যে, এই নরপিশাচকে গড় ভবানীপুরের বাজারের মধ্যে সারাদিন উলঙ্গ করে বেঁধে রাখা হবে। তখন যার যা ইচ্ছে এর সঙ্গে করে যেতে পারে, পদাঘাত, কশাঘাত, নিষ্ঠীবননিক্ষেপ সব কিছু। যাতে এ প্রতি মুহূর্তে অনুভব করে এভাবে বেঁচে থাকার থেকে মরে যাওয়া কতটা ভালো। যেন এ প্রতি মুহূর্তে নিজেই নিজের মৃত্যুকামনা করে। রাতে একে প্রহরী কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে, সকালে আবার বেঁধে রেখে আসবে৷ এই প্রক্রিয়া চলবে যতদিন না এই হতভাগ্য স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে।’
চতুর্ভুজ দু’হাত জড়ো করে কিছু বলতে গেলেন। হয়তো মৃত্যুভিক্ষাই করতে গেছিলেন। কিন্তু তার আগেই উপস্থিত জনতার হর্ষধ্বনিতে উত্তাল হয়ে উঠল উৎসব প্রাঙ্গণ। উন্মাদের মতো ক্রন্দনরত চতুর্ভুজকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল গদাই আর লখন। তাঁর আর্তচিৎকার কারও কর্ণগোচর হল না।
জনগণের জান্তব চিৎকারের মধ্যেই নকিব ছুটে এসে হরিদেবের কানে কানে কী যেন একটা বলল। হরিদেব চমকে উঠলেন শুনে। তিনি তৎক্ষণাৎ মহারানীর পাশে গিয়ে তাঁর কানের কাছে কিছু বললেন। মহারানীর মুখ যে অবর্ণনীয় ভাব ধারণ করল তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
ইতিমধ্যে কোলাহল স্তিমিত হয়ে এসেছিল। মহারানী নকিবকে ইঙ্গিত করলেন। নকিব উচ্চৈস্বরে ঘোষণা করল, ‘শাহেনশা জাহাঙ্গীরের প্রধান সেনাপতি, বীরচক্র, বীরোত্তম, বীরশিরোমণি, অম্বররাজ মানসিংহ প্রবেশ করছেএএএএন।’
উপস্থিত জনতা মুহূর্তে স্তব্ধ হল৷ আগত ভূস্বামী, সামন্ত, রাজন্য, স্থানিক সর্দার, সাধারণ জনগণ সবাই সাগ্রহে চেয়ে রইলেন আগমণদ্বারের দিকে।
সামান্য পরে মহাবাহু মহাবীর অম্বররাজ মানসিং তাঁর পর্বতাকার শরীর নিয়ে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেন৷ পিছন পিছন তাঁর ব্যক্তিগত রক্ষীবাহিনী। মানসিংয়ের অতিকায় অবয়ব, কঠিন মুখচ্ছবি, বিশাল গালপাট্টা সবই যেমন সম্ভ্রম উদ্রেককারী, তেমনই ভীতিপ্রদ।
মানসিং এসে প্রাঙ্গণের মধ্যস্থলে অধিষ্ঠিত হলেন। তারপর বললেন, ‘ভূরিসিট্টর পাঠানবিজয়ী বীরাঙ্গনা রানী ভবশঙ্করীকে মানসিংয়ের তরফ থেকে সপ্রশংস অভিবাদন।’
ভবশঙ্করী সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যুক্তকরে বললেন, ‘বীরশিরোমণি অম্বররাজ মানসিংহকে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ প্রণাম। আপনাকে আসন গ্রহণ করতে অনুরোধ জানাই মহারাজ মানসিংহ।’
মানসিং গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘আপনার শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ মহারানী। আমি অত্যন্ত ব্যস্ত, তাই আপনার আতিথ্য গ্রহণে অপারগ। আজ আমি এসেছি সম্রাট জাহাঙ্গীরের দূত হয়ে। আপনার বীরত্বের সংবাদ এই ক’দিনের মধ্যেই দিল্লীশ্বরের কাছে পৌঁছেছে৷ বাংলা থেকে পাঠানদের উচ্ছেদে আপনার ভূমিকার কথা জেনে তিনি অত্যন্ত প্রীত। তাই তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন কয়েকটি সনদ এবং আদেশ আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
ভবশঙ্করী বললেন, ‘আমি সম্মানিত বোধ করছি মহারাজ মানসিংহ। আপনি দয়া করে ভারতসম্রাট জাহাঙ্গীরকে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র পক্ষ থেকে প্রণাম এবং অভিবাদন জানাবেন।’
মানসিংয়ের বিশাল গালপাট্টার ফাঁক দিয়ে হাসি খেলে গেল। পরক্ষণেই তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘সম্রাট জাহাঙ্গীর আপনার জন্য কিছু উপহার এবং দুটি বার্তা পাঠিয়েছেন। আপনার অনুমতি হলে পেশ করি?’
ভবশঙ্করী বললেন, ‘অনুমতির প্রয়োজন নেই মহারাজ। অনুগ্রহ করে সম্রাট জাহাঙ্গীরের বার্তা ঘোষণা করুন।’
মানসিং বললেন, ‘ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রাজশ্রী দেবী ভবশঙ্করী, মহামতি জাহাঙ্গীর আপনার বীরত্বের কথা শুনে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছেন৷ তিনি আপনার সম্মানস্বরূপ প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা, মণি ও রত্ন প্রেরণ করেছেন। আপনি এগুলি গ্রহণ করলে শাহেনশা প্রীত হবেন।’
বলার সঙ্গে সঙ্গে মানসিংয়ের অনুচর দেহরক্ষীদের একজন একটি ক্ষুদ্র পেটিকা এনে মহারানীর পায়ের কাছে রাখল। ভবশঙ্করী শান্ত এবং প্রীতস্বরে বললেন, ‘শাহেনশাহ’র এই উপহার গ্রহন করে নিজেকে ধন্য মনে করছি। তাঁকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাবেন।’
মানসিং বললেন, ‘আপনার পতি মহারাজ রুদ্রনারায়ণ সম্রাট আকবরের সহায় এবং অনুগত মিত্ররাজ ছিলেন৷ বাদশাহ জাহাঙ্গীরের ইচ্ছা, এই মৈত্রী আরও সুদৃঢ় হোক। তাই তিনি বলে পাঠিয়েছেন এবার থেকে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র পক্ষ থেকে করস্বরূপ তাঁকে একটি স্বর্ণমুদ্রা, একটি ছাগ এবং একটি কম্বল প্রদান করলেই তিনি সন্তুষ্ট হবেন। এর বেশি তিনি চান না। ভূরিশ্রেষ্ঠ’র স্বাতন্ত্র্য এবং স্বাধীনতা চিরকাল অক্ষুন্ন থাকবে। এই চুক্তি মোগল মহাফেজখানায় সংরক্ষিত থাকবে। এমনকী বাদশাহ জাহাঙ্গীরের উত্তরাধিকারী বাদশাহদের আমলেও এই নির্দেশনামা বলবৎ থাকবে।’
ভূপতিকৃষ্ণ এবং হরিদেবসহ উপস্থিত বাকি রাজন্যরা বাক্যহারা হয়ে গেলেন। এর অর্থ আজ থেকে ভূরিশ্রেষ্ঠ প্রকৃতপক্ষে করমুক্ত রাজ্য বলে পরিগণিত হল। সম্রাট জাহাঙ্গীর সাম্মানিকরূপে যা চাইছেন তা নেহাতই প্রতীকী।
ভবশঙ্করী আবেগবিহ্বলস্বরে বললেন, ‘দিল্লীশ্বর জাহাঙ্গীরকে আমার সভক্তি প্রণাম নিবেদন করবেন মহারাজ মানসিংহ।’
আবারও মুখ খুললেন মানসিং। বললেন, ‘শুধু তাই নয়, বাদশাহ মনে করেন আপনি শুধু এই দক্ষিণবঙ্গের নন, অখণ্ড বঙ্গের শাসনকর্ত্রী হওয়ার যোগ্য। আপনারই অসাধারণ তেজোবলে পাঠানশক্তি হৃতবীর্য হয়েছে৷ সেই জন্য সম্রাট জাহাঙ্গীর একটি সনদ পাঠিয়েছেন যার দ্বারা আপনাকে তিনি একটি বিশেষ উপাধিতে ভূষিত করতে চান। তিনি চান যেন বাংলার ইতিহাসে আপনি এই নামেই পরিচিত হোন।’
উঠে দাঁড়ালেন ভবশঙ্করী, ‘কী সেই সম্রাটপ্রদত্ত উপাধি, মহারাজ?’
‘রায়বাঘিনী।’
উপস্থিত জনতার গর্জন চারিদিকে মহাঘোররবে ধ্বনিত হল, ‘রায়বাঘিনী, রায়বাঘিনী, রায়বাঘিনী।’
রোণ নদীর পাড়ের সেই অরণ্য। দিনের বেলাতেও সেখানে সূর্যালোক পৌঁছয় না, এতই গভীর সেই বনভূমি। সেখানে পাতার মর্মরধ্বনিতে, হাওয়ার শিরশিরানিতে ভেসে থাকে কোন এক অশরীরী সঙ্কেত।
সেই অরণ্যে এমন একটি অংশ আছে যেখানে কোনও পশুপ্রাণীর পা পড়ে না। কোনও পাখির কলকাকলি শোনা যায় না। এক অদ্ভুত নীরব শৈত্য ঘিরে থাকে স্থানটি ঘিরে। সেখানে একটি প্রাচীন ভগ্নপ্রায় মন্দির আছে। মন্দিরটি ভারি অদ্ভুত, তার কোনও ছাদ নেই। না, এমন নয় যে ছাদটি ভেঙে পড়েছে। ভালো করে দেখলে বোঝা যায় যে ছাদটি তৈরিই হয়নি কখনও।
মন্দিরটির গা বেয়ে একটি অতি বিশাল, অতি প্রাচীন বটগাছ। মা যেমন নবীন শিশুকে তাঁর কোঁচড়ে রক্ষা করেন, তেমনই বটগাছটি যেন বুকে জড়িয়ে রেখেছে মন্দিরটিকে।
সেই মন্দিরের সামনে, বটগাছের নীচে কুশাসনে ধ্যানে বসেছিলেন এক অতি বৃদ্ধা নারী। তার দরিদ্র বিধবাবেশ, লোলচর্ম দেহ, শ্বেতশুভ্র কেশরাজি সবই সাধারণ। শুধু অসাধারণ তাঁর চোখদুটি। সাধারণ চোখের থেকে সামান্য বড় সেই চোখদুটিতে একই সঙ্গে খেলে যাচ্ছে প্রখর কৌতুক এবং স্নিগ্ধ মায়ার আলোছায়ার জাদু।
ধীরে ধীরে নিজের প্রাণবায়ুকে সুষুম্নাকাণ্ডের শেষাংশে সংহত করলেন তিনি। তারপর এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল। মনে হল যেন দুটি বিদ্যুৎরেখা তাঁর মেরুদণ্ড ঘিরে দুটি সাপের মতো পাক খেতে খেতে ওপরে উঠতে লেগেছে।
আর সেই সঙ্গে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটা শুরু হল। ধীরে ধীরে তাঁর দেহ থেকে উড়ে যেতে লাগল ধোঁয়ার কুণ্ডলী। মনে হল যেন তাঁর সমস্ত দেহটি ধূপের মতো জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
জ্বলতে জ্বলতেই মৃদু হাসলেন বিষ্ণুক্রান্তাধিশ্বরী। কাজ শেষ হয়নি তাঁর। আবার ফিরে আসবেন তিনি। ফিরে আসবেন এই দেশে। আবার যখন কোনও অত্যাচারীর খড়্গকৃপাণের অভিশাপ নেমে আসবে এই ভূমিতে, সেদিন ফিরবেন তিনি…আবার…বারবার…।
***
