মহিষমর্দিনী ১৫৯৮

মহিষমর্দিনী ১৫৯৮

‘মা, ও মা, আমাকে খেতে দে না মা। বড় খিদে পেয়েছে যে।’

ভিখারিনী মা সঙ্গে সঙ্গে ছেলের মুখে আঁচল চাপা দিল। চাপা গলায় বলল, ‘চুপ চুপ। এখন কাঁদিস না বাপধন। এখন বামুন ঠাকুরেরা খেতে বসেচেন। এর পর বাকিরা খাবে৷ তারপর যা পড়ে থাকবে তোর আমার জন্যে চেয়ে নেব’খন। এখন গোল করিসনে। পেয়াদাদের কানে গেলে দূরদূর করে তাড়িয়ে দেবে।’

শিশুমন অতশত বোঝে না৷ সে শুধু বোঝে ক্ষুধার ভাষা৷ লোকজন ব্যস্তসমস্ত হয়ে চলাচল করছে৷ চারিদিকে হই হই রই রই ব্যাপার। পাচকরা মস্ত মস্ত হাঁড়িতে বিভিন্ন সুস্বাদু পদের রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত। তার সুগন্ধে চারিদিক আমোদিত৷

ক্ষুধার্ত শিশুটি বুঝতে পেরেছে ধারেকাছেই খাবার দাবারের বিপুল আয়োজন হচ্ছে। কারো দয়া হলে তার পেটে কিছু উচ্ছিষ্ট জুটলেও জুটতে পারে। কিন্তু তার আর তর সইছে না। সে ক্রমাগত ঘ্যান ঘ্যান করতে লাগল, ‘ও মা, খেতে দে না মা। বড্ড খিদে পেয়েছে মা৷ তোর পায়ে পড়ি।’

ভিখারিনী দ্রুত শিশুটির মুখে আঁচল চাপা দিয়ে মন্দিরের বাইরে এক কোণে সবার অলক্ষ্যে গুটিসুটি মেরে বসল। রান্নার গন্ধে তার নাড়িও পাক দিয়ে উঠেছে৷ গত দুদিন মা-ছেলের এক দানা অন্ন জোটেনি৷ শুনেছে, আজ নাকি এখানে মন্দির প্রতিষ্ঠা হবে বলে মস্ত খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। সেই আশাতেই এসে জুটেছে সে। এখন যদি কান্নাকাটিতে পাইকদের চোখে পড়ে যায়, তাহলে সব শেষ।

গ্রামের নাম কাষ্ঠসাঁকড়া। রাজা রুদ্রনারায়ণ রায়মুখুটি এখানে দেবাদিদেব মহাদেবের একটি আরাধনা মন্দির স্থাপনা করেছেন। আজ তার উদ্বোধন। সেই উপলক্ষ্যে এক মহোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ভূরিশ্রেষ্ঠ’র সমস্ত ব্রাহ্মণপণ্ডিত সহ উচ্চবংশজ সবাই আমন্ত্রিত। তাঁদের জন্য ভোজনসহ বিশেষ বিদায়প্রণামীর আয়োজন করা হয়েছে৷ গড় ভবানীপুরের আশেপাশের সমস্ত গ্রামে এক সপ্তাহের জন্য ‘হাঁড়ি বারণ’। সপ্তাহজুড়ে ঢালাও খাওয়াদাওয়ার এলাহি বন্দোবস্ত।

রুদ্রনারায়ণ এই আট বছরে অনেকটা বুড়িয়ে গেছেন। বিশেষ করে মহারানী স্বর্ণময়ীর পরলোক গমনের হওয়ার পর থেকে। ধর্মকর্ম ছাড়া অন্য কোনওদিকে তাঁর মন নেই। তাই বহুব্যয়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠার আয়োজন। না, এখনও অবধি দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করেননি তিনি।

পূজা সুসম্পন্ন হয়েছে। এখন ভূরিভোজ শুরু হবে। অভ্যাগতরা আসন গ্রহণ করেছেন। দেওয়ান দুর্লভ দত্ত নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারক করছেন। রাজা রুদ্রনারায়ণ এখনও গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে, দেবাদিদেবের ধ্যানে মগ্ন।

এইসময় ভূপতিকৃষ্ণ এলেন৷ সেপাইসান্ত্রীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তিনি এসেই প্রশ্ন করলেন, ‘মহারাজ কোথায়?’ উত্তর পেয়ে দ্রুত মন্দিরের দিকে প্রস্থান করলেন।

ভোজন শুরু হতে চলেছে৷ প্রথমে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা, তারপর ক্ষত্রিয় ও কায়স্থ, এবং তারপর অন্যান্য জাতের লোকেদের খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে৷ বিশাল বিশাল পাত্রের ঢাকনা সরাতেই খাদ্যের সুগন্ধে চারিদিক আমোদিত হয়ে উঠল। অমনি শিশুটি আবার কেঁদে উঠল, ‘ও মা, দুটি খেতে দে না।’

ভিখারিনী ছেলের মুখে শুষ্ক স্তনটি গুঁজে দিয়ে আরও গুটিসুটি মেরে বসল। হায় হায়, সব শেষ হয়ে যাবে!

ভাবতেই তার চোখে জল এল। বাচ্চাটারই বা দোষ কী? শেষ কবে সে পেটভরা খাবার খেয়েছে?

নিজেকে আরও গুটিয়ে নিল সে। এই তো আর মাত্র কিছুক্ষণ। তারপরেই…

কিন্তু শেষরক্ষা হল না। এক প্রহরীর চোখে পড়ে গেল মা ও ছেলে৷ প্রহরী হুঙ্কার দিয়ে উঠল, ‘এই কে? কে ওখানে?’

বুকটা ধক করে উঠল ভিখারিনীর। হায় হায়, সব ভেস্তে গেল!

প্রহরী একটা লাঠি ঠুকতে ঠুকতে সামনে এসে দাঁড়াল, ‘এই মাগি! এখানে কী করছিস? ভাগ এখান থেকে।’

ভিখারিনী কিছু বলার আগেই শিশুটি আবার কেঁদে উঠল, ‘ও মা, খুব খিদে পেয়েছে তো।’

প্রহরী খিঁচিয়ে উঠল, ‘খেতে দিতে পারিস না তো বাচ্চা বিইয়েছিস কেন? কুকুর মেকুরের জাত। চল, ওঠ এখান থেকে৷’

ভিখারিনী মা ব্যাকুল স্বরে বলল, ‘পায়ে পড়ি বাবা, তাড়িয়ে দিও না৷ দুদিন পেটে কিছু পড়েনি গো…’

প্রহরী ধমকে উঠল, ‘পেটে কিছু পড়েনি তো আমি কি করব? এখানে সব মান্যিগণ্যি লোকজনরা এসেছেন। তুই এখন ভাগ এখন এখান থেকে৷ কারও চোখে পড়লে অনর্থ হয়ে যাবে।’

ভিখারিনী কাতরস্বরে বলল, ‘ও বাবা, তোমার পায়ে পড়ি গো। আমাকে না হোক, আমার ছেলের জন্য…পাত কুড়িয়ে যা এঁটোকাঁটা যা পাব, তাই খাব। কেউ দেখতে পাবে না গো বাবা…ও বাবা…’

প্রহরী লাঠিটা তুলেছিল বোধহয় মারার জন্য। পিছন থেকে গম্ভীরস্বরে কে যেন বলল, ‘কী হচ্ছে এখানে?’

প্রহরী চমকে দেখল স্বয়ং রুদ্রনারায়ণ দাঁড়িয়ে আছেন। প্রহরী হাতজোড় করে বলল, ‘এই দেখুন না প্রভু, এখানে খাবার দাবারের ব্যবস্থা আছে শোনামাত্র এই ভিখিরি মাগিটা চলে এসেছে। শুধু খেতে দাও খেতে দাও বলে উৎপাত করছে। ওর আস্পর্ধা দেখেছেন? আদেশ দিন প্রভু, মাগিটার চুলের মুঠি ধরে বার করে দিই।’

রুদ্রনারায়ণ দেখলেন এক শীর্ণ মা সন্তানকে বুকে চেপে ধরে ভয়বিহ্বল চোখে তাঁর দিকে চেয়ে আছে। পরনের বস্ত্রটি শতচ্ছিন্ন, তাতে কোনওমতে লজ্জা নিবারণ হয়৷ পা দুখানি পথের ধুলোকাদায় মাখামাখি৷ ভিখারিনীর বুকের কাছে আঁকড়ে রাখা নগ্ন শিশুটির বুকের পাঁজর গোনা যায়৷ এমন মলিন, মর্মস্পর্শী, সর্বগ্রাসী দারিদ্র্য কখনও দেখেননি রুদ্রনারায়ণ।

তিনি শান্তস্বরে ভিখারিনীকে বললেন, ‘এসো মা, ভেতরে এসো।’

প্রহরী মরিয়া হয়ে বলল, ‘কিন্তু প্রভু, মন্দির অশুচি হবে যে। কোন না কোন জাত…’

রুদ্রনারায়ণ কিছুক্ষণ স্থির চোখে প্রহরীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রহরী কেঁপে উঠল।

ভিখারিনী ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল। তার বিশ্বাস হচ্ছিল না, এই রাজাবাবু তাকে এত স্নেহভরে মা বলে ডেকেছে।

রুদ্রনারায়ণ হেঁটে চললেন, পিছন পিছন শীর্ণ শিশুকে কোলে নিয়ে এক ভিখারিনী মা। মন্দিরের উঠোনে ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অভ্যাগত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা পংক্তিতে বসেছিলেন৷ তখনও তাঁদের পাতে আহার্য পরিবেশিত হয়নি৷ অভ্যাগতরা স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে এই দৃশ্য দেখতে লাগলেন।

খাদ্যসম্ভার যেখানে রাখা ছিল, তার সামনে এসে রুদ্রনারায়ণ নিজের হাতে একটি থালা তুলে নিলেন। সেটি ভিখারিনীর হাতে দিয়ে বললেন, ‘নিন মা। আপনার যা ইচ্ছে হয় এখান থেকে নিন।’

ভূপতিকৃষ্ণ দৌড়ে এলেন। রুদ্রনারায়ণের কানে কানে বললেন, ‘এ কী করছেন মহারাজ? ব্রাহ্মণভোজনের আগে…’

রুদ্রনারায়ণ শান্তস্বরে বললেন, ‘আমি ঠিকই করছি ভূপতি। তুমি ব্রাহ্মণভোজনের ব্যবস্থা দেখ৷ আমাকে জগজ্জননীর সেবা করতে দাও। কেউ রুষ্ট হলে বোলো এ আমার, ভূরিশ্রেষ্ঠাধিপতি রুদ্রনারায়ণের আদেশ। এতে যাঁর আপত্তি আছে, তিনি তাঁর বাসস্থান অন্য রাজ্যে নিয়ে যেতে পারেন।’

দীয়তাং ভূজ্যতাং শেষ হয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গণ শূন্য। দেওয়ান দুর্লভ দত্ত, সৈন্যাধ্যক্ষ চতুর্ভুজ চক্রবর্তী, পুরোহিত হরিদেব ভট্টাচার্য সকলে প্রস্থান করেছেন। রয়ে গেছেন শুধু রুদ্রনারায়ণ, ভূপতিকৃষ্ণ, এবং তাঁদের সেবক ও দেহরক্ষকরা। রুদ্রনারায়ণ কাষ্ঠসাঁকড়া হয়ে নদীপথে গড় ভবানীপুর ফিরবেন। সঙ্গে ভূপতিকৃষ্ণও থাকবেন। পথেই পড়বে গড় পাণ্ডুয়া। ভূপতি সেখানে নেমে যাবেন।

সবাই চলে গেলে রুদ্রনারায়ণ একবার মন্দিরে গেলেন প্রণাম করে আসবেন বলে। ভূপতি এবং অন্যান্য সিপাহী-প্রহরীরা ঘাটে গেলেন রাজার বজরাখানি প্রস্তুত আছে নাকি দেখার জন্য।

গর্ভগৃহের চাতালে উঠে মন্দিরের দরজা দুহাতে ঠেলে খুললেন রুদ্রনারায়ণ। গর্ভগৃহের ঠিক মধ্যস্থলে ফুলে, মালায়, চন্দনে, দুগ্ধে, ঘৃতে শোভিত কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ। অগুরু আর গুগ্গুলের গন্ধে চারিদিক ম-ম করছে। দেওয়ালের চারকোণে চারটে মশাল গোঁজা।

গর্ভগৃহের দরজার ঠিক মাথায় একটি ঘণ্টা। সেটি বাজিয়ে প্রণাম করতে যাবেন, সহসা একটা জিনিস দেখে থমকে গেলেন রুদ্রনারায়ণ।

চারটি ধুলোকাদা মাখা পায়ের ছাপ দরজা থেকে সোজা চলে গিয়েছে শিবলিঙ্গের দিকে। দুটি পায়ের ছাপ প্রাপ্তবয়স্ক কোনও পুরুষ বা নারীর। সম্ভবত নারীর, কারণ পুরুষের পায়ের পাতা আরও চওড়া হয়। আর তার পাশের পায়ের ছাপ দুটি শিশুর।

রুদ্রনারায়ণের মেরুদণ্ড দিয়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল। তিনি বিস্ফারিত চোখে সেই পায়ের ছাপ দেখতে লাগলেন৷ তাঁর শরীরের সমস্ত রোম দাঁড়িয়ে গেল। অবিশ্বাস্য, অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখছেন তিনি!

মন্দিরের মধ্যে গম্ভীরকণ্ঠে কে যেন বলে উঠল, ‘প্রস্তুত হও রুদ্রনারায়ণ, প্রস্তুত হও। তিনি আজ দীনাহীনা বেশে সন্তানসহ তোমাকে পরীক্ষা করতে এসেছিলেন। তুমি সেই পরীক্ষায় তাঁকে প্রসন্ন করতে পেরেছ। প্রস্তুত হও, মা আসছেন।’

বজরা চলেছে দামোদরের বুক বেয়ে, ধার ঘেঁষে ঘেঁষে। এখন গ্রীষ্মকাল, দিন দীর্ঘায়িত। অপরাহ্নের আভাসমাত্র শুরু হয়েছে৷ নদীর বুকে জল বেশি নেই। শুকনো ফুটিফাটা চড়া দেখলে কে বলবে, বর্ষাকালে এই দামোদরই দুকূল ভাসিয়ে মানুষের অশেষ কষ্টের কারণ হয়ে ওঠে।

নদীতীরে শুষ্ক ঝোপঝাড়। তারপর একটি অরণ্য। এখান থেকে ভূপতিকৃষ্ণ’র শাসনাধীন এলাকার শুরু। একটু পরেই গড় পাণ্ডুয়ার ঘাট। ভূপতি সেখানে অবতারণ করবেন।

রুদ্রনারায়ণ অন্যমনস্ক হয়ে পাড়ের দিকে তাকিয়েছিলেন। আজ মন্দিরে যা দেখলেন তার সবই কি মায়া? দৃষ্টিবিভ্রম? কার পায়ের ছাপ দেখলেন আজ তিনি? মন্দিরের মধ্যে কার স্বর শুনলেন? তাহলে কি সত্যিই জগজ্জননী মহামায়া আজ স্বয়ং ভিখারিনীর বেশে তাঁর হাত থেকে অন্নগ্রহণ করে গেলেন?

শুকিয়ে আসা দামোদরের রিক্ত শুষ্ক তীরভূমির কথা ভেবে সেই দরিদ্রা জগজ্জননীর কথা মনে পড়ছিল তাঁর। বাংলার রাজনীতি গত দশ বছরে এই শুকনো দামোদরের তীরের মতোই, সেই ভিখারিনী মায়ের মতোই হতশ্রী হয়ে পড়েছে।

এখন বাংলার সুবেদার হয়েছেন মহারাজা মানসিং। এদিকে পাঠানরা বাংলা উড়িষ্যার অধিকার ছাড়বে না, তাই তারা বাংলার বিভিন্ন ভুঁইয়াদের দ্বারস্থ হয়েছে। মানসিং-এর সঙ্গে বাংলার পাঠান আর বিভিন্ন ভুঁইয়াদের যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই আছে।

তবে মানসিং শুধু বীর নয়, যুদ্ধশাস্ত্রে মহারথী বললেই চলে। গত কয়েক বছরে তাঁর পারিবারিক জীবনে অনর্থ নেমে এসেছে। তিনি এক এক করে হারিয়েছেন তাঁর তিন পুত্রকে। ভূষণাজয়ী হিম্মৎসিং-এর মৃত্যু হয়েছে বিসূচিকা রোগে। দুর্জনসিং কত্রাভু’র যুদ্ধে মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁ’র হাতে নিহত হয়েছেন। পুত্রবিয়োগে কাতর মানসিং আজমীঢ় ফিরে গেছিলেন কনিষ্ঠপুত্র পুত্র জগৎসিং-এর হাতে শাসনভার সঁপে দিয়ে। কিন্তু জগৎসিংও অত্যধিক মদ্যপানের ফলে যকৃতের রোগে ইহলীলা সংবরণ করেছেন।

ইতিমধ্যে পাঠানরা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। কোতলু খাঁ’র মৃত্যুর পর তাঁর উজির ঈশা খাঁ মানসিং-এর কাছে আত্মসমর্পণ করছিলেন। দুইপক্ষের মধ্যে সন্ধিচুক্তি হয়। যতদিন ঈশা খাঁ বেঁচে ছিলেন ততদিন এই চুক্তি কেউ অমান্য করেননি। কিন্তু ঈশা খাঁ গত হতেই পাঠানরা আবার মাথা তুলেছে৷ এবার তাদের নেতা কোতলু খাঁ’র ভাতিজা উসমান খাঁ৷ তাদের বিদ্রোহের কথা শুনে মানসিং আজমীঢ় থেকে ফিরে এসেছেন। উড়িষ্যা আক্রমণ করে বিদ্রোহীদের উৎখাত করেছেন। বিদ্রোহীরা এখন পালিয়ে বাংলায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সহায় এখন মসনদ ই আলা ঈশা খাঁ’র পুত্র মুসা খাঁ, কেদার রায় আর মাসুম কাবুলি।

রুদ্রনারায়ণ বেশ বুঝতে পারছেন বাংলার ভাগ্যাকাশে আবার দুর্যোগের ঘনঘটা ছেয়ে আসছে। পুনর্বার এক মহাযুদ্ধ আসন্ন। কিন্তু তিনি কি আর পারবেন সেই যুদ্ধ পরিচালনা করতে?

অলস মন্থর গতিতে বজরাটি বয়ে চলেছে। এখন আকাশ আংশিক মেঘাচ্ছন্ন। গ্রীষ্মের দাবদাহ আজ কিছু প্রশমিত। দামোদরের জলে সোনার কুচির মতো ঝিলমিল করছে মেঘে ঢাকা পড়ন্ত সূর্যের আলো।

নদীর তীরে তিনটি বন্য মহিষ জল খাচ্ছিল৷ এই মহিষগুলি যেমন শক্তিশালী, তেমনই বেপরোয়া আর গোয়াঁর। তারা যে কখন ক্রুদ্ধ হবে আর কাকে কীভাবে আক্রমণ করে বসবে, কেউ জানে না।

রুদ্রনারায়ণ অলসচোখে তীরের দিকে তাকিয়েছিলেন। একটু পর তিনি দেখলেন, জঙ্গলের মধ্য থেকে একটি শ্বেতবর্ণ অশ্ব ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল৷ সেও জল খেতে এসেছে৷ রুদ্রনারায়ণ এবং ভূপতিকৃষ্ণ সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন ঘোড়াটির আরোহী এক তরুণী। তার বয়েস কুড়ি বাইশের কাছাকাছি। পরনের শাড়ি কাছা দিয়ে পরা, যা সচরাচর বাঙালি মহিলাদের মধ্যে দেখা যায় না। তরুণী যোদ্ধৃবেশে সজ্জিতা। তাঁর পৃষ্ঠদেশলগ্ন বর্মে দুটি ভল্ল, কোমরে একটি খড়্গ।

রুদ্রনারায়ণ লক্ষ্য করলেন, মহিষের দলে সামান্য চাঞ্চল্য দেখা গেল। দলের বৃহদাকার যূথপতি মহিষটি জল থেকে মুখ তুলে ঘোড়াটির দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ হুঙ্কার ছাড়ল। যেন বারণ করছে, ‘ওহে, এ আমাদের এলাকা। এখানে অন্য কারো জল খেতে আসা মানা।’

অশ্বটি ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে নদীর জলে মুখ ডোবাল। আরোহী নারী শুধু অপাঙ্গে মহিষগুলির দিকে তাকালেন, কিছু বললেন না।

মহিষযূথপতির এত অপমান বোধহয় সহ্য হল না। সেই পর্বতাকার বিশালশৃঙ্গী প্রাণীটি আরক্তচক্ষু মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অশ্বটির দিকে৷ অকস্মাৎ দুটি ভয়াল সমুন্নত শৃঙ্গ উঁচিয়ে সে ধেয়ে গেল অশ্ব এবং তার আরোহীর উদ্দেশে।

রুদ্রনারায়ণ উঠে দাঁড়ালেন। নৌবাহকদের বললেন, ‘নৌকা ঘাটের দিকে নিয়ে চলো।’ দেহরক্ষী ও অনুচরদের বললেন, ‘তোমরা অস্ত্রহাতে প্রস্তুত হও। ওই নারীকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।’

তখনই ভূপতিকৃষ্ণের ডাক শুনে তীরের দিকে ফিরে তাকালেন রুদ্রনারায়ণ। পরক্ষণেই একটি আশ্চর্য দৃশ্যের সাক্ষী হলেন তাঁরা। অশ্বারূঢ়া নারী একটি বর্শা বার করে অশ্বপৃষ্ঠে বসেই সজোরে নিক্ষেপ করলেন আক্রমণোদ্যত মহিষটির দিকে। বর্শাটি মহিষের গলা ভেদ করে সবেগে ভূমিতে প্রোথিত হয়ে গেল।

রুদ্রনারায়ণ এবং তাঁর সঙ্গীরা স্তম্ভিত। অশ্বপৃষ্ঠে বসে অমন সজোরে বর্শানিক্ষেপ করা যে কত অসম্ভব সে তাঁদের থেকে ভালো কেউ জানে না। একজন নারী যে এমন শক্তির অধিকারিণী হতে পারেন সেও তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল।

বর্শাবিদ্ধ মহিষটি মৃত্যুযন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল। সেই শুনে ঘুরে দাঁড়াল সঙ্গী মহিষ দুটি। তাদের একজন ক্ষুর দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। তার গ্রীবা বক্র, নাক দিয়ে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস পড়ছে, চোখদুটি লাল৷ রুদ্রনারায়ণ ও তাঁর সঙ্গীরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখতে লাগলেন। মহিষটি হুঙ্কার ছেড়ে তার ভয়াল শিং দুটি উঁচিয়ে কালান্তক যমের মতো ধেয়ে গেল অশ্বারোহী নারীটির দিকে।

নারীটিও বোধহয় এরকমই কিছু একটা আশঙ্কা করছিলেন। তিনি অশ্ব হতে মাটিতে নেমে পড়েছিলেন। নিমেষে তিনি তাঁর কোষ হতে একটি ভয়ালদর্শন খড়্গ নিষ্কাষিত করে দৌড়তে লাগলেন আক্রমণোদ্যত মহিষটির দিকে।

এরপরের দৃশ্যটার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না রুদ্রনারায়ণ ও তাঁর সঙ্গীরা। নারীটি দৌড়তে দৌড়তেই পথের মধ্যে পড়ে থাকা একটি গাছের গুঁড়িতে পা দিয়েই লাফিয়ে উঠলেন৷ তাঁর দু’হাতে উত্তোলিত খড়্গের গায়ে ঝলসে উঠল সূর্যের আলো। তারপর সেটি সবেগে নেমে এল মহিষটির ঘাড়ে। এক আঘাতে ধড় থেকে ছিন্ন হয়ে গেল সেই বিশালদেহী বন্যমহিষের মুণ্ড। একরাশ রক্তের স্রোত ছলকে উঠল সমগ্র দৃশ্যটির মধ্যে। মহিষের ধড় খানিকটা এগিয়ে হাঁটু ভেঙে মাটিতে পড়ে গেল।

তৃতীয় মহিষটি বোধহয় বুঝল এ সাধারণ শত্রু নয়। সে ধীরে ধীরে পিছু হটে জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

রুদ্রনারায়ণ বললেন, ‘নৌকা তীরে লাগাতে বলো ভূপতি।’

রাজার বজরা যখন তীরে ঠেকল, ততক্ষণে তরুণী নদীর জলে হাত মুখ ধুয়ে নিয়েছেন। ধুয়ে নিয়েছেন তাঁর খড়্গটিও। তিনি রুদ্রনারায়ণকে দেখে প্রণত হয়ে অভিবাদন করলেন।

রুদ্রনারায়ণ অভিভূতস্বরে বললেন, ‘তুমি কে গো মেয়ে? কী নাম তোমার? এমন আশ্চর্য যুদ্ধকৌশল তুমি শিখলে কোথায়?’

নারীটি শ্রদ্ধাবনত স্বরে বললেন, ‘অধীনার নাম ভবশঙ্করী, মহারাজ। আমি পাণ্ডুয়া গড়ের দুর্গাধিপতি দীননাথ চৌধুরীর কন্যা।’

ভূপতি উল্লাসের সঙ্গে বললেন, ‘তাই বলো! তুমি দীননাথের মেয়ে। তাই ভাবি, কার মেয়ের বাহুতে এত বল? এইবার মনে পড়েছে। তোমাকে তো ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার দেখেছি তোমার পিতার সঙ্গে গড়ে আসতে৷ সত্য, ধন্য দীননাথের যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা। আজ তোমাকে দেখে বড় আনন্দিত হলাম।’

রুদ্রনারায়ণ বললেন, ‘আমার রাজ্যে এমন দুঃসাহসিনী বলশালী নারী আছে দেখে বিশেষ প্রীত হলাম ভবশঙ্করী। তোমার পিতাকে বোলো আমার কথা। আশীর্বাদ করি, এমনই থেকো।’

ঘুম আসছিল না মহারাজ রুদ্রনারায়ণের। কয়েক বছর হল এই অনিদ্রার রোগ ধরেছে তাঁকে। বার কয়েক এপাশ-ওপাশ করলেন। তারপর উঠে পড়লেন।

বাতায়নের আবরণ সরিয়ে দিলেন রুদ্রনারায়ণ। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। সমগ্র চরাচর ভেসে যাচ্ছে অলৌকিক জ্যোৎস্নায়। দূরে নিষ্প্রদীপ গৃহস্থবাড়ির সারি। একপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে দামোদর। তার ওপাশে সারি সারি তালগাছ।

বুকটা হু-হু করে উঠল রুদ্রনারায়ণের। এমন কত রাত স্ত্রীর সঙ্গে বাতায়নের পাশে বসে কাটিয়েছেন তিনি। কত কথা হত দুজনের। নিজেদের কথা, ছোট ছোট মান অভিমান, ছোট ছোট ভালোবাসা। তবুও যে কত কথা বাকি রয়ে গেল। কত কথা যে বলাই হল না।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রুদ্রনারায়ণ। যে যায় সে বোঝে না যে যাওয়ার সময় সে সঙ্গে থাকা মানুষটারও কত কিছু নিয়ে যায়। খানিকটা বুকের পাঁজর, খানিকটা স্মৃতির সুবাস, খানিকটা দুঃখের আলো, খানিকটা আনন্দের উত্তাপ।

চোখটা জ্বালা করে উঠল রুদ্রনারায়ণের। দু’হাতে চোখের কোণ মুছলেন তিনি। কে বলে পুরুষ কাঁদে না?

ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘দুঃখ কোরো না রুদ্রনারায়ণ। যাঁর যাওয়ার কথা ছিল তিনি গেছেন। এখন যিনি আসছেন তাঁকে বরণ করে নাও রুদ্রনারায়ণ। তাঁকে সাদরে ঘরে নিয়ে এসো।’

চমকে উঠলেন রুদ্রনারায়ণ। এ তো সেই দেবীপুরের শ্মশানের সাধুবাবার স্বর! এখানে সেই স্বর ভেসে এল কোথা থেকে?

আবার সেই অশরীরী কণ্ঠস্বর কথা বলে উঠল, ‘ঝড় আসছে রুদ্রনারায়ণ! ভয়ানক ঝড়! ভূরিশ্রেষ্ঠ জ্বলেপুড়ে শ্মশান হয়ে যাবে। সেই ঝড় প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তোমার নেই। একমাত্র স্বয়ং মহামায়াই সেই প্রবল ঝঞ্ঝাবাত্যা রোধ করতে পারেন। তাঁকে ঘরে আনো রুদ্রনারায়ণ।’

‘কিন্তু তিনি কে প্রভু? তাঁকে চিনব কী করে?’

‘আজ স্বয়ং মহিষমর্দিনীকে চোখের সামনে দেখেও চিনতে পারলে না রুদ্রনারায়ণ?’

ডাক শুনে দীননাথ ব্যস্তসমস্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। এসে দেখলেন তাঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হরিদেব ভট্টাচার্য।

প্রথমে দীননাথের বিশ্বাসই হল না যে রাজপুরোহিত স্বয়ং তাঁর বাড়িতে এসেছেন। তিনি হাঁকডাক করে মহা শোরগোল ফেলে দিলেন। দ্রুত পা হাত ধোয়ার জল এল, সঙ্গে নতুন গামছা। কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ে পেতে দেওয়া হল। হরিদেব হাত মুখ ধুয়ে পিঁড়েতে বসে বললেন, ‘তারপর দীননাথ, আছ কেমন?’

দীননাথ চৌধুরী যেমন প্রবল বলশালী ব্যক্তিত্ববান মানুষ, তেমনই ধর্মভীরু৷ তিনি হরিদেবের পায়ের কাছে বসে বললেন, ‘এতটা পথ আসতে আসতে নিশ্চয়ই পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। একটু ফলারের আয়োজন করি গুরুদেব?’

হরিদেব স্মিত হেসে বললেন, ‘না না, তার দরকার হবে না। আজ একাদশী, এমনিতেই আমার উপবাস।’

‘বলুন গুরুদেব। অধমের বাড়িতে পায়ের ধুলো দিলেন, কোনও বিশেষ কারণ আছে?’

‘তা আছে বইকি। শুনেছি তোমার কন্যাটি বয়স্থা হয়েছে?’

‘তা হয়েছে প্রভু। এক কুড়ি দুই হল সবে।’

‘তা এত বড় কন্যার বিবাহের ব্যবস্থা করোনি? লোকে নিন্দেমন্দ করবে যে।’

দীননাথ সামান্য অপ্রস্তুত হলেন। কাঁচুমাচু করে বললেন, ‘আমারই কি সাধ যায় না যে ঢাকঢোল পিটিয়ে মেয়ের বিয়ে দিই? কিন্তু কী বলি ঠাকুর, আমার মেয়ে যেমন জেদি, তেমন গোঁয়ার।’

‘বটে? কী বলছে সে? আজীবন বাড়িতে বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করবে?’

‘না, ঠিক তা নয়…’

‘তবে? নাকি তোমারই মা মরা মেয়েকে কাছছাড়া করার তেমন ইচ্ছা নেই? সত্যি কথাটা বলো তো বাপু।’

কথাটা যে খুব একটা মিথ্যে তা নয়। তবে ভবশঙ্করীর অদ্যাবধি অবিবাহিত থাকার প্রকৃত কারণ অন্য৷ সেটাই সামান্য অস্বস্তির সঙ্গে রাজপুরোহিতকে নিবেদন করলেন দীননাথ।

হরিদেব শুনে কী যেন ভাবলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন, ‘তোমার কন্যার সঙ্গে একবার কথা বলা যায়?’

দীননাথ শশব্যস্ত হয়ে উঠে গেলেন। একটু পরেই ভবশঙ্করী দরজায় এসে দাঁড়ালেন।

হরিদেব ভট্টাচার্য চেয়ে দেখলেন, সদ্য যৌবনে পদার্পণ করা এক নারী। পরনের শাড়িটি গাছকোমর করে পরা। সারা গায়ে একটিও অলঙ্কার নেই। হাতে একটি তির, বোধহয় তারই অগ্রভাগ খরশান করতে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর ললাট উন্নত, হনু সামান্য চওড়া, কেশদাম কুঞ্চিত এবং চোখদুটি স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বড়। তেজোদৃপ্ত ভাব।

হরিদেব সস্নেহে প্রশ্ন করলেন, ‘সব কিছু কুশল মঙ্গল তো মা?’

ভবশঙ্করী ঘাড় নাড়লেন। হরিদেব প্রশ্ন করলেন, ‘শুনলাম তুমি নাকি একটি কঠিন ব্রত নিয়েছ, যে তোমাকে অসিযুদ্ধে পরাস্ত করতে পারবে তুমি একমাত্র তাঁকেই বিবাহ করবে?’

ভবশঙ্করী ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন। হরিদেব লক্ষ্য করলেন এই তরুণী প্রয়োজন না হলে বৃথা বাক্যব্যয় করে না।

হরিদেব চিন্তিতস্বরে বললেন, ‘তাহলে তো বিষয়টা অনেক জটিল হয়ে দাঁড়াল দীননাথ।’

দীননাথ কিছু বুঝলেন না। বললেন, ‘কীসের জটিলতা গুরুদেব?’

হরিদেব আবার ভবশঙ্করীর দিকে ফিরলেন, ‘তোমার সঙ্গে মহারাজের কয়েকদিন আগে দেখা হয়েছিল মা?’

ভবশঙ্করী একটি শব্দে সম্মতি জানালেন, ‘হুঁ।’

দীননাথ চৌধুরী হতবাক হয়ে গেলেন। ‘সে কী মা? তোর সঙ্গে মহারাজের দেখা হয়েছে? কবে? কোথায়? কীভাবে? তুই তো কিছুই বলিসনি আমাকে!’

ভবশঙ্করী যতটা কম শব্দে সম্ভব রাজা রুদ্রনারায়ণের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা বিবৃত করলেন। শুনতে শুনতে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন দীননাথ, ‘তুই এত বড় ঘটনাটা আমাকে জানাবার প্রয়োজন বোধ করলি না মা? তাঁকে কোনও কটুকথা বলিসনি তো? যথাযোগ্য সম্মান দেখিয়ে কথা বলেছিলিস তো?’

হরিদেব বললেন, ‘আহা, অত উত্তেজিত হওয়ার কিছু হয়নি দীননাথ। মায়ের যখন বলার ইচ্ছে হয়নি, তো হয়নি। এখন কথা হচ্ছে অন্য।’

‘কী কথা গুরুদেব?’

‘তুমি তো জানো মহারানী স্বর্ণময়ী দেবীর প্রয়াণের পর থেকে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি মহারাজের দ্বিতীয় বিবাহের জন্য। কিন্তু মহারাজ কিছুতেই সম্মত হননি। অবশেষে কাল মায়ের পরাক্রম দেখে রুদ্রনারায়ণ ভারি মোহিত হয়েছেন৷ তিনি চান মা ভবশঙ্করী ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মহারানীর পদ অলঙ্কৃত করুন।’

প্রবল বিস্ময়ের সঙ্গে যদি অভাবিত সৌভাগ্যপ্রাপ্তির আনন্দ যোগ হয় তাহলে মানুষ আক্ষরিক অর্থেই স্তম্ভিত হয়ে যায়। দীননাথকে দেখে মনে হল তিনি যেন এখনই মূর্ছিত হয়ে পড়ে যাবেন। হরিদেব তাঁকে ধরে না ফেললে হয়তো পড়েই যেতেন। ভবশঙ্করী ঘটিতে করে জল নিয়ে এসে পিতার ঘাড়ে মাথায় জল দিতে লাগলেন। দীননাথ একটু সুস্থ হয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘এ কী কথা শোনালেন গুরুদেব? এত সৌভাগ্য কি আমার মেয়ের কপালে লেখা ছিল? এ তো আমার স্বপ্নেরও অগোচর ছিল! জয় মা রাজবল্লভী, জয় মা বিশালাক্ষী।’

হরিদেব বললেন, ‘আহা অত উত্তেজিত হওয়ার কিছু হয়নি দীননাথ। মায়ের অনুমতিও তো নিতে হবে।’ বলে তিনি ভবশঙ্করীর দিকে ফিরলেন, ‘কী মা, তোমার অমত নেই তো?’

ভবশঙ্করী শান্তস্বরে বললেন, ‘আমার শর্ত পালন করলে আমার কোনই আপত্তি নেই।’

দীননাথ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, ‘তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? দু’দিন তলোয়ার চালানো শিখে ভাবছিস মস্ত বড় তলোয়ারবাজ হয়েছিস তুই? স্বয়ং মহারাজকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিস, এত সাহস তোর? তুই জানিস, আমি নিজে কতবার তলোয়ারের খেলায় মহারাজের কাছে পরাস্ত হয়েছি? আজ মহারাজ স্বয়ং এত বড় প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, তাঁর প্রস্তাব বা অনুরোধই আমাদের কাছে আদেশ। তোর এত সাহস হয়েছে যে তুই তোর গোঁ ধরে সেই আদেশ অমান্য করবি?’

ভবশঙ্করী মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

হরিদেব দীননাথকে বললেন, ‘আহা, অত উত্তেজিত হচ্ছ কেন দীননাথ? মায়ের যখন ইচ্ছা, তখন তাই হবে।’

দীননাথ জানেন মহারাজের বয়েস হয়েছে বটে, কিন্তু অসিচালনায় তাঁর তুল্য দক্ষ যোদ্ধা ভূরিশ্রেষ্ঠ কেন, সরকার সপ্তগ্রামেও কমই আছে। এদিকে তিনি নিজের কন্যাকেও ভালো করে চেনেন। অসিহস্তে সে একাই দশজন পুরুষের মহড়া নিতে পারে৷

তার থেকেও বড় প্রশ্ন, এমন অসম্মানজনক প্রস্তাবে মহারাজ সম্মত হবেন কি না। আর যদি এই প্রস্তাবে রুদ্রনারায়ণ অপমানিত বোধ করেন, তাহলে তারপর কী ঘটতে পারে, সেটাও ভাববার বিষয়।

হরিদেব বোধহয় দীননাথের মনের কথা বুঝতে পারলেন। বললেন, ‘আমি এরকমই কিছু আশঙ্কা করেছিলাম। কিন্তু কথা হচ্ছে মহারাজ রুদ্রনারায়ণ প্রাণান্তেও কোনও নারীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবেন না। এদিকে মা ভবশঙ্করীও তাঁর প্রতিজ্ঞা থেকে নড়বেন না৷ এবার তুমিই বলে দাও মা, এই ঘোর সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের উপায় কী।’

ভবশঙ্করী খানিকক্ষণ চুপ থেকে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘সামনেই দুর্গাপূজা। নবমীর দিন রাজবল্লভী দেবীর সামনে বলিদান হবে। সেইদিন দুইটি বলিদানের আয়োজন করতে বলুন ঠাকুরমশাই। দুই ক্ষেত্রেই একত্রে দুটি মহিষ এবং তাদের নীচে একটি করে মেষ বাঁধা থাকবে৷ একপক্ষে মহারাজ বলিদান করবেন, অন্য পক্ষে আমি। যদি দুজনেই এক কোপে বলিদানে সমর্থ হই বা শুধুমাত্র মহারাজ বলিদানে সমর্থ হন, তাহলে আমার মহারাজকে বিবাহ করতে কোনও আপত্তি থাকবে না।’

হরিদেবের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি সাগ্রহে বললেন, ‘বেশ, তবে তাই হবে। আমি এখনই মহারাজকে মা ভবশঙ্করীর অভিপ্রায় জানাচ্ছি।’

গড় পাণ্ডুয়ার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হচ্ছেন অষ্টভুজা জয়দুর্গা। মহারাজ শ্রীমন্তনারায়ণ একটি মন্দির বানিয়ে সেখানে অষ্টধাতু নির্মিত জয়দুর্গা মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দিরের ঠিক সামনে একটি মস্ত দিঘি কাটিয়েছিলেন তিনি। এ দেবোত্তর দিঘি। মন্দিরের পুজোর কাজ ছাড়া এর জল অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। লোকমুখে এর নাম দুর্গাপুকুর।

সেই দিঘির পাশে ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভবশঙ্করী। গ্রীষ্মের সন্ধ্যার ঝিরিঝিরি বাতাস বয়ে যাচ্ছিল জলরাশির উপরিভাগ জুড়ে। সেই বাতাসে উড়ে যাচ্ছে তাঁর খোলা চুল। পরনে বিধবার বেশ। অঙ্গে একটি আভূষণ নেই। আজ তিনি রিক্ত, শূন্য, দরিদ্র।

চারিদিকে নিবিড় ঘন নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই, প্রাণের সাড়া নেই।

আজ দুর্গাধ্যক্ষ দীননাথের আদেশে জয়দুর্গা মন্দির জনশূন্য৷ চারিদিকের অন্তত কয়েক ক্রোশ দূরান্ত অবধি কোথাও একটিও জীবিত প্রাণী নেই। সবাইকে আজ রাত্রিতে মন্দির থেকে দূরে থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র পাঁচজনকে বাদ দিয়ে। ভবশঙ্করীর পঞ্চসখী, পঞ্চচণ্ডী।

এই পাঁচজন তাঁদের নেত্রী ভবশঙ্করীকে বৃত্তাকারে ঘিরে দাঁড়িয়েছিলেন। কারও শরীরে একটিও সুতো নেই। নেই কোনও আভূষণ, কোনও আবরণ। প্রত্যেকেই কৃষ্ণাঙ্গী, শ্যামা এবং সুগঠিত শরীরের অধিকারিনী।

ভবশঙ্করীর পঞ্চসখী একে একে তাঁর যাবতীয় পোশাক খুলে নিলেন। তারপর তাঁরা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলেন ভবানী মন্দিরের মধ্যে।

সেই গ্রীষ্মের ঘনঘোর রাত্রিতে, অন্ধকার আকাশের নীচে, নীরব গম্ভীর প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে দেবী ভবশঙ্করী ভবানীদিঘিতে ঝাঁপ দিলেন।

আজ চৈত্রসপ্তমী। আজ কালরাত্রি।

ধীরে ধীরে জলের তলায় তলিয়ে যাচ্ছিলেন ভবশঙ্করী।

কিশোরীবেলা থেকেই একটা স্বপ্ন বারবার বারবার হানা দিত ভবশঙ্করীর ঘুমের মধ্যে। তিনি দেখতেন যে তিনি যেন অন্য এক নারীর শরীরের মধ্যে বসবাস করছেন। সেই নারী উচ্চতায় খর্ব, গাত্রবর্ণ কৃষ্ণকায়, ঈষৎ পৃথুলা এবং সুস্তনী। আর তাঁর চোখদুটি স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বড়। তিনি কখনও কবরীবন্ধন করেন না। তাঁর কেশরাজি উড়তে থাকে উড়তে থাকে তাঁর মুক্ত স্বাধীন ইচ্ছের মতই।

আর তিনি বুঝতে পারতেন যে এই স্বপ্নের নারীর সঙ্গে তাঁর কোনও না আদিম জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক আছে। তিনি অনুভব করতেন সেই শরীরের মধ্যে সদাসর্বদাই যেন আগুন জ্বলছে। শীতল এক অগ্নিকুণ্ড৷ কখনও কখনও সেই আগুন কামাগ্নি হয়ে জ্বালিয়ে দিত তাঁর প্রতিটি অঙ্গ। মনে হত সর্বশরীরে যেন বিষ ঢেলেছে কোনও কালনাগিনী। ঘুমের মধ্যেই উদগ্র কামনার মদমত্ততায় ছটফট করতেন ভবশঙ্করী। তাঁর নবোদ্ভাসিত কামচেতনা যেন কার জন্য সদ্যস্ফূট পদ্মদলের মতো উন্মুখ হয়ে থাকত।

এই অসহনীয় কামবাসনার অগ্নি ধীরে ধীরে নির্বাপিত হত একসময়। তখন তাঁর শরীর জুড়ে নেমে আসত হিমবাহের শৈত্যস্রোত৷ আর সেই নির্বাপিত কামনা ভস্মের মধ্য থেকে জেগে উঠত এক অলৌকিক, মহাজাগতিক অনুভব। তিনি বুঝতে পারতেন যে তাঁর পৃষ্ঠের নিম্নভাগ থেকে দুখানি বিদ্যুতের শিখা সুষুম্নাকাণ্ড বেয়ে ব্রহ্মতালু অবধি অনবরত যাতায়াত করছে৷ সেই শিখা তাঁর কণ্ঠে পৌঁছত, তাঁর অন্তর ছেয়ে যেত এক অদ্ভুত প্রশান্তি, অনাবিল আনন্দ, আশ্চর্য জ্যোতিতে। আর তারপর যখন সেই বিদ্যুজ্জ্যোতি ব্রহ্মতালুতে পৌঁছত, তখন তাঁর মনে হত তিনি যেন আর ইহজগতে নেই৷ এই বিস্তৃত আকাশ, মহাকাশ, ছায়াপথ পেরিয়ে, ব্রহ্মাণ্ডের অসীম শূন্যতা পেরিয়ে অন্যতর ভূমায় উপনীত হয়েছেন তিনি। মনে হত যেন তিনি যেন উড়ছেন। উড়ছেন স্বাধীন ইচ্ছার মতো, অন্তত বিস্তারের মতো, অন্তহীন ভালোবাসার মতো।

কিন্তু যৌবনে পদার্পণের পর সেই নারী যেন একদিন অকস্মাৎ হারিয়ে গেলেন ভবশঙ্করীর জীবন থেকে। যে নারীর সঙ্গে ক্রমে একাত্ম হতে শুরু করেছিলেন ভবশঙ্করী, মনে হত তাঁরা যেন দুই শরীরে একই মানুষ, সেই উগ্রস্বভাবা, স্বাধীনচেতা নারী যেন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেলেন ভবশঙ্করীর অলৌকিক স্বপ্নজীবন থেকে।

কখনও, আর কখনও এই স্বপ্ন হানা দেয়নি তাঁর শয়নের মধ্যে।

জলের মধ্যে ডুবে যেতে যেতেই ধ্যানস্থ হলেন ভবশঙ্করী। বাল্যকালে ভবশঙ্করী এবং তাঁর সঙ্গিনীদের প্রিয় ক্রীড়া ছিল কে কতক্ষণ জলের নীচে শ্বাস বন্ধ করে রাখতে পারে। বলা বাহুল্য সেই জলক্রীড়ায় চিরকাল ভবশঙ্করীই জয়ী হয়ে এসেছেন। সেই অভ্যাসজাত শক্তি নিজের মধ্যে পুনরায় জাগ্রত করলেন তিনি। তার কারণ আছে।

ফিরে এসেছেন তিনি। তিনদিন আগে আবার সেই নারী ফিরে এসেছেন তাঁর স্বপ্নে। যেন বিস্মৃত অতীতের কোন গহীন অন্ধকার থেকে আবার ধূমকেতুর মতো উদিত হয়েছেন ভবশঙ্করীর সেই চণ্ডোগ্রা দ্বিতীয় সত্ত্বা।

এই তিনদিন একই স্বপ্ন দেখেছেন ভবশঙ্করী। এই দিঘির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। আগের থেকে আরও অনেক বেশি আদিম, উগ্র, এবং আরণ্যক হয়েছেন। স্নিগ্ধ শারদ জ্যোৎস্না যেন বনজ লতা, দুধের সর জড়িয়ে আছে তাঁর সারা শরীর। মৃদু হাওয়ায় উড়ছে তাঁর উন্মুক্ত কেশরাজি। পৃথুল পৃষ্ঠদেশে, স্ফীত ত্রিবলীতে, নিবিড় নিতম্বে ঝলসে উঠছে শরীরী অহঙ্কার।

তারপর সেই নারী ধীরে ধীরে ঘাটের ধাপ বেয়ে জলের মধ্যে নেমে যেতে লাগলেন। ধীরে কিন্তু নিশ্চিন্তে, এক অদম্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।

যখন গলা অবধি উঠে এসেছে জলস্তর, তখন সেই নারী ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখে বিচিত্র এক হাসি। ভবশঙ্করী বিস্মিত হয়ে দেখলেন, তিনি নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে আছেন! যেন অন্য এক ভবশঙ্করী দূর থেকে এই ভবশঙ্করীকে দেখছেন।

ইঙ্গিত বোঝেন ভবশঙ্করী। এ তাঁর জন্মসিদ্ধ ক্ষমতা। আজ এই মুহূর্তে তাঁকে এই দিঘিতে অবগাহন করতে হবে। কেন, তা তিনি জানেন না৷ শুধু জানেন যে এ আমন্ত্রণ অমোঘ।

দিঘির একদম তলদেশে এসে স্থিত হলেন ধ্যানস্থ ভবশঙ্করী। চারদিকে নারকীয় অন্ধকার।

তলদেশে স্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের চোখের সামনে আলোর আভাস দেখতে পেলেন ভবশঙ্করী। যেন প্রদীপের একটি মৃদু শিখা জ্বলে উঠল প্রথমে। তারপর দ্রুত, অতি দ্রুত বাড়তে থাকল তার ঔজ্বল্য। তারপর যেন দপ করে আগুন ধরে গেল তাঁর সামনে, সেই নিকষকালো জলরাশির মধ্যে। ভবশঙ্করী দেখলেন তাঁর সামনে একটি দীর্ঘাকার, খড়্গাকৃতি অগ্নিপিণ্ড আবির্ভূত হয়েছে। ততক্ষণে তাঁর শ্বাস শেষ হয়ে আসছিল প্রায়৷ তিনি সেই অগ্নিখড়্গটি হাতে ধরে দ্রুত উঠে আসতে লাগলেন।

গড় ভবানীপুরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হচ্ছেন দেবী রাজবল্লভী৷ দেবী মহাজাগ্রতা, মহোগ্রা, রক্তবলিপ্রিয়া রাজরাজেশ্বরী। তাঁর দর্শনমাত্রে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় বলে জনশ্রুতি।

আজ মন্দিরের সামনে লোকে লোকারণ্য৷ বহুদূর দূর থেকে দলে দলে মানুষ এসেছে এক অদ্ভুত কাণ্ড নিজের চোখে দেখবে বলে। এমন কাণ্ড ভূভারতে না কেউ শুনেছে, না কেউ দেখেছে৷

মন্দির প্রাঙ্গণের সামনের অনেকটা জায়গা বাঁশ আর শালবল্লা দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে৷ তার মধ্যস্থলে দুটি বিশাল আকৃতির যূপকাষ্ঠ। চারিদিকে সৈন্যদের কড়া প্রহরা, যাতে উৎসাহী জনগণের চাপে বেড়া ভেঙে না পড়ে। সেনাপতি চতুর্ভুজ চক্রবর্তী স্বয়ং শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন।

জনগণের উৎসাহের শেষ নেই। কেউ বলছে ‘মেয়েমানুষের অত গুমোর ভালো নয়৷ মহারাজ দয়া করে পায়ের তলায় ঠাঁই দিচ্ছেন, তাই না কত ভাগ্যি। তিনি আবার মহারাজের সঙ্গে লড়াই করবেন।’ কারো মতে, ‘শুনেছি মেয়ে নাকি অস্ত্রচালনায় বিশেষ নিপুণ। দেখি এক কোপে দুটো মোষ আর একটা ভেড়া কাটতে পারে কিনা। পারলে তবে বুঝব এত অহঙ্কার মানায়।’

এমনকী এই শর্তে সম্মত হওয়া মহারাজের উচিত হয়েছে কি না সে নিয়েও মৃদু তর্কবিতর্ক শুরু হয়েছে।

ভূপতিকৃষ্ণ পূজার আয়োজনের তদারকি করতে ব্যস্ত৷ আর কেউ লক্ষ্য না করলেও হরিদেব লক্ষ্য করেছেন যে তাঁর মুখখানি সামান্য গম্ভীর। ভূপতির এক অধীনস্ত কর্মচারীর কন্যা রাজ্যের মহারানী হয়ে তাঁর ওপর আধিপত্য করবেন এটা বোধহয় ভূপতি মেনে নিতে পারছেন না, এও হতে পারে যে, ভূপতি হয় তো ভাবছিলেন যে রাজা রুদ্রনারায়ণের অপুত্র অবস্থায় মৃত্যু হলে তিনিই গড় ভবানীপুর আর গড় পাণ্ডুয়া মিলে অখণ্ড ভূরিশ্রেষ্ঠ’র অধিপতি হবেন। এখন মহারাজ রুদ্রনারায়ণের যদি দ্বিতীয় বিবাহের পর পুত্রসন্তান জন্মায়, তাহলে তাঁর সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

চিন্তিত হলেন হরিদেব ভট্টনারায়ণ। আজ অবধি দুই পক্ষের মধ্যে রাজ্যাধিকার নিয়ে কখনও কোনও মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়নি। এখন যদি সেই দুর্ঘট ঘটে, তাহলে সে বড়ই চিন্তার বিষয়।

পূজায় মনোসংযোগ করলেন হরিদেব। রাজা রুদ্রনারায়ণ রক্তাম্বর পরে পূজায় বসেছেন৷ ধূপ ধূনা গুগ্গুলের গন্ধে চারিদিক আমোদিত। মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে মধ্যে বেজে উঠছে শঙ্খ, ঘণ্টা, কাঁসর, ঝাঁঝর ও ঢাক। নাটমন্দির বিশিষ্টজনে পরিপূর্ণ, অন্যেতর জনসাধারণ মন্দির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে ভক্তিভাবের সঙ্গে পূজার্চনা প্রত্যক্ষ করছেন।

একটু পর হরিদেব উঠে দাঁড়ালেন। গম্ভীরস্বরে আদেশ করলেন, ‘বলিদানের আয়োজন করা হোক।’

সঙ্গে সঙ্গে দশ বারোজন বলশালী পুরুষ মন্দিরের পুকুর থেকে চারটি মহিষ এবং দুটি ভেড়াকে স্নান করিয়ে দুটি যূপকাষ্ঠে সংযুক্ত করে দিল। এক একটি যূপকাষ্ঠে দুটি করে মহিষ এবং তার নীচে একটি করে মেষ৷

হরিদেব পূজার থালি হাতে প্রাঙ্গণে নেমে এলেন। পশুগুলির কপালে সিঁদুরের তিলক এঁকে দেবীকে নিবেদন করলেন। তারপর উদাত্তস্বরে বললেন, ‘আসুন মহারাজ।’

মহারাজ রুদ্রনারায়ণ রায়মুখুটি খড়্গহস্তে নেমে এলেন। তাঁর শালপ্রাংশু দেহ, বলিষ্ঠ বাহু এবং প্রশস্ত বক্ষ দেখলে বোঝা যায় যে এই পড়ন্ত যৌবনেও তাঁর শরীরে যথেষ্ট শক্তি। মহারাজ হরিদেবকে প্রণাম করলেন। তারপর এদিক-ওদিক চাইতে লাগলেন।

হরিদেব বললেন ‘উতলা হবেন না মহারাজ। তিনি ঠিক আসবেন।’

কেউ লক্ষ্য করেনি, সেই লোকারণ্যের মধ্যে এক ভিখারিনী মা তার শিশুপুত্রটিকে কোলে নিয়ে ভিড় ঠেলে ঠেলে একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পরনের শাড়িখানি শতচ্ছিন্ন, পা দুখানি ধূলায় মলিন, চুলগুলি জটপাকানো। কোলের শিশুটি বড়ই রুগ্ন৷ সে চুপ করে মায়ের কোলে বসে আছে৷ ভিখারিনীর সবই দরিদ্র, শুধু চোখের দৃষ্টি ছাড়া।

জনগণের মধ্যে গুঞ্জন বাড়তে বাড়তে কোলাহল ধারণ করল। কোথায় সেই নারী? যিনি মহারাজকে প্রতিস্পর্ধায় আহ্বান করেছিলেন? তিনি কি ভয় পেলেন?

দূর হতে অশ্বক্ষুরধ্বনি শোনা গেল। একটি ঘোড়া এসে থামল মন্দির প্রাঙ্গণের সামনে। তার ওপর বসে আছেন এক নারী। দেখে মনে হয় যেন স্বয়ং মহাশক্তি মহামায়া মানুষী মূর্তি ধরে উপস্থিত হয়েছেন। পরনে লালরঙের শাড়ি। আঁচল কোমরে বাঁধা। কুঞ্চিতকেশদাম মাথায় খোঁপা করে চূড়ার মতো গ্রন্থিত৷ হাতে একটি মহাকায় খড়্গ। তিনি ঘোড়া থেকে নেমে দৃপ্তপায়ে প্রাঙ্গণের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন।

সমস্ত গুঞ্জন কোলাহল মুহূর্তে স্তব্ধ। উপস্থিত জনগণের ঔৎসুক্য এখন চরমে। প্রত্যেকের দৃষ্টি এখন প্রাঙ্গণের মধ্যস্থলে।

ভবশঙ্করী প্রথমে মন্দিরে এসে দেবীকে প্রণাম করলেন। তারপর প্রাঙ্গণে এসে প্রণাম করলেন রাজপুরোহিত এবং মহারাজকে। হরিদেব দুটি সিন্দুরচর্চিত জবার মালা এক এক করে মহারাজ রুদ্রনারায়ণ এবং ভবশঙ্করীর গলায় পরিয়ে দিলেন। তারপর ভবশঙ্করী তাঁর খড়্গটি তুলে দিলেন হরিদেবের হাতে।

হরিদেব খড়্গটি হাতে নিয়ে সামান্য চমকে উঠলেন। চকিতের জন্য তাঁর মনে হল, খড়্গটি যেন জীবন্ত!

হরিদেব খড়্গটি নিয়ে মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করলেন, দেবীর পায়ে ছুঁইয়ে তার গায়ে লেপে দিলেন মন্ত্রপূত সিঁদুর আর চন্দন। তারপর যখন তিনি খড়্গটি নিয়ে প্রাঙ্গণের দিকে হাঁটতে লাগলেন, তখন তাঁর মনে হল যেন তাঁর চেতনার মধ্যে অকস্মাৎ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এক রক্তপায়ী দানব। তাঁর সমস্ত স্নায়ুর মধ্যে এক অলৌকিক উল্লাস জেগেছে, মাথার মধ্যে কে যেন উন্মাদের মতো চিৎকার করে চলেছে! রক্ত চাই, রক্ত চাই, রক্ত, রক্ত, রক্ত!

ভীত হলেন হরিদেব। তিনি ভবশঙ্করীর হাতে খড়্গ তুলে দিয়ে বললেন, ‘এ খড়্গ তুমি কোথায় পেলে মা?’

ভবশঙ্করী স্থির চোখে হরিদেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্বয়ং মা জয়দুর্গা আমাকে এই খড়্গ দিয়েছেন, গুরুদেব।’

ভিখারিনীর স্থির ওষ্ঠদুটি এবার সচল হল। মনে হল বিড়বিড় করে কী যেন মন্ত্র পড়ছে সে। ক্রমে মন্ত্রের গতি দ্রুত হল। চোখের দৃষ্টি ভবশঙ্করীর দিকে। তার দৃষ্টি একাগ্র, যেন সমস্ত মন, বুদ্ধি, চিত্ত এক বিন্দুতে পুঞ্জীভূত হয়েছে৷ কোলের শিশুটি স্থির।

যূপকাষ্ঠের দুই ধারে দুইজন খড়্গহস্তে দাঁড়ালেন। চারিদিকে শ্বাসরুদ্ধ নিস্তব্ধতা। দর্শকরা যেন নিঃশ্বাস ফেলতেও ভুলে গেছে। হরিদেব ভট্টনারায়ণ বলিদানের মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে ইশারা করা মাত্র দুইটি খড়্গ একই সঙ্গে আকাশে উত্থিত হল এবং নীচে নামল। চারটি মহিষ এবং দুটি মেষের মুণ্ড গড়িয়ে গেল প্রাঙ্গণের মাটিতে। পূজারীরা বলির রক্ত এবং ছিন্নমুণ্ড নিয়ে ছুটে গেলেন মন্দিরের মধ্যে৷

জনগণ সহর্ষ উল্লাসে ফেটে পড়ল। এরকম অসম্ভব রোমাঞ্চকর দৃশ্য তারা জীবনে দেখেনি। চারিদিক হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল চারিদিক। জয় দেবী রাজবল্লভীর জয়! জয় মহারাজ রুদ্রনারায়ণের জয়! জয় ভূরিশ্রেষ্ঠ’র জয়!

ভবশঙ্করী যূপকাষ্ঠ থেকে বৃদ্ধাঙ্গুলে বলির রক্ত নিলেন। সেটি দিয়ে তিলক এঁকে দিলেন মহারাজ রুদ্রনারায়ণের কপালে। তারপর নিজের গলার জবার মালা খুলে মহারাজের গলায় পরিয়ে দিয়ে অস্ফূটে বললেন, ‘আপনাকে আমার পতিত্বে বরণ করলাম মহারাজ। আপনার মতো মহাবীরের জায়া হব, এ আমার সৌভাগ্য। আজ আমার জীবন যৌবন ধন্য হল।’

এই বলে ভবশঙ্করী তাঁর অশ্বে আরোহণ করলেন। তারপর অশ্ব দ্রুত ধাবমান হল প্রান্তরের দিকে।

ভিখারিনীর মন্ত্রোচ্চারণ থেমে গেছিল আগেই। এবার সে ধীরে ধীরে পিছু হটে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। তাকে আর দ্বিতীয়বার দেখা গেল না।

রোণ নদীর তীরে একটি গহন অরণ্য। এত নিবিড় যে দিনের বেলাতেও মাটিতে সূর্যালোক এসে পৌঁছয় না। আদিম বৃক্ষকাণ্ডের গায়ে শৈবালদলের ঘন আচ্ছাদন। তাতে জড়িয়ে থাকে অজানা গুল্মলতা। অরণ্যের বুকে নিঃশব্দ পদচারণা করে বেড়ায় বুনো শুয়োর, বুনো কুকুর, শিয়াল, হরিণ, বাঘরোল, গোসাপ আদি বন্যপ্রাণীর দল। অতি বৃহৎ অজগরের দল জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ ও প্রাচীন বৃক্ষশাখা। গাছের কোটর থেকে উঁকি দেয় তক্ষকের দ্বিখণ্ডিত জিহ্বা। ঘাসের বুক চিরে গোখরো ও কেউটিয়ার সর্পিল শরীর এগিয়ে যায় নির্দিষ্ট শিকারের দিকে।

সমস্ত অরণ্য জুড়ে এক অজানা নৈঃশব্দ্য ঘিরে থাকে সবসময়। অরণ্যের কোণে কোণে যেন কোনও আদিম আশঙ্কার ছায়া। কতকাল এখানে কোনও মানুষের পা পড়ে না।

এখন অপরাহ্নের শেষ। রোণ নদীর জলে হেমন্তের সূর্য মেটে সিঁদুররঙা আলো ছড়িয়ে অস্তে যাওয়ার উপক্রম করছেন। নদীর ধারে মানুষপ্রমাণ মৃত কাশফুলগুচ্ছ। শেষে রোণ এখন সদ্যপ্রসূ রুগ্না নারীর মতো শীর্ণকায়া। তার জল নিস্তরঙ্গ।

নদীর বুকে একটি বিন্দু জেগে উঠল। খানিক পর বিন্দুটি কিঞ্চিৎ বড় হলে বোঝা গেল একটি ডিঙি অতি দ্রুত তীরের দিকে এগিয়ে আসছে। তার একজনই আরোহী।

ডিঙি তীরে এসে ভিড়ল। আরোহী লাফিয়ে নামলেন ডিঙি থেকে। কয়েকটি কুমির তীরে রোদ পোহাচ্ছিল। তারা সরসর করে জলে নেমে গেল।

আরোহীটি ডিঙি থেকে একটি পুঁটুলি তুলে কাঁধে নিয়ে জঙ্গলের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালেন। উচ্চতায় মধ্যম আকৃতির হলে কী হবে, তাঁর শরীর পাথরে কোঁদা। পরনে আঁট করে পরা ধুতি, ঊর্ধ্বাঙ্গে একটি পিরান। কোমরে দীর্ঘ তরবারি। লোকটির চোখ অচঞ্চল এবং মর্মভেদী।

মানুষটি জঙ্গলের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা অংশ লক্ষ করে ভেতরে ঢুকে গেলেন। অনেক কাল পরে এখানে এলেন তিনি। পথ চিনতে একটু সময় লাগবে।

বেশ কিছুক্ষণ পর লোকটি যেখানে এসে থামলেন সেখানে একটি অতি বিশালাকৃতির বটগাছ শাখা প্রশাখা বিস্তার করে রেখেছে৷ এই সে এক প্রাগৈতিহাসিক বনস্পতি।

বটগাছের নীচে একটি প্রাচীন ভগ্নপ্রায় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। মন্দিরটির বিশেষত্ব হচ্ছে, তার ছাদ নেই। না, ভেঙে পড়েনি। খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় মন্দিরটি তৈরিই করা হয়েছিল ছাদবিহীন। বটগাছের ঝুরি নেমে এসে বহু যত্নে আষ্টেপৃষ্ঠে বুকে জড়িয়ে রেখেছে মন্দিরটিকে।

কাঁধের পুটুলি নামিয়ে রাখলেন মানুষটি। সেখান থেকে দুটি ছোট মশাল বার করে এনে একটি মাটিতে পুঁতে দিলেন৷ অন্যটি জ্বালিয়ে এগিয়ে গেলেন মন্দিরের দিকে।

মন্দিরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েক বার পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন তিনি। হেমন্তের শেষ, সাপেদের শীতঘুমে যাওয়ার সময়। তবু সাবধানের মার নেই। কোঁচড় থেকে কিছু পিষ্ট সর্পগন্ধা’র শিকড় বার করে মন্দিরের মধ্যে ছুড়ে দিলেন।

এবার মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলেন মানুষটি। মাটি ফাটিয়ে মেঝের দখল নিয়েছে আগাছার দল। চারদিকের দেওয়ালে কালের করাল চিহ্ন। শুধু অক্ষত রয়ে গেছে একটিই জিনিস, মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর পাথরের মূর্তিটি।

দেবীমূর্তিটি ভারি অদ্ভুত। তিনি দ্বিভূজা। বামপদটি অগ্রবর্তী করে বামহাতে ধৃত পানপাত্র হতে কিছু পান করছেন। দক্ষিণহস্তে বজ্রকর্ত্রী। বামস্কন্ধে ভল্লসদৃশ একটি দীর্ঘ অস্ত্র৷ দেবীর দুই পায়ে দুইটি মূর্তি পদদলিত। আর দেবীর চোখদুটি সামান্য স্ফীত, দেবী বিশাল অক্ষির অধিকারিণী।

দেবী বজ্রযোগিনী। সেনসাম্রাজ্যের শাসনামলে রাঢ় থেকে সমতট, পুণ্ড্র থেকে তামলিপ্তি, সমগ্র গৌড়বঙ্গের পূজিতা, আরাধ্যা দেবী।

কিছুক্ষণ স্থিরচোখে সেই দেবীর দিকে চেয়ে রইলেন পুরুষটি। এককালে তাঁর পূর্বপুরুষ এই মন্দির আর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন এখানকার নাম ছিল দিলাকাশ। পূর্বপুরুষ ছিলেন বৌদ্ধতন্ত্রশাস্ত্রে মহাডাক, মহাকাপালিক। তখন এই মন্দিরে দেবীর ষোড়শোপচারে মহাপূজা হত। নিয়মিত নরবলি হত। মহিষ, মেষ, ছাগবলির তো কথাই নেই। মদ্যে মাংসে তুষ্ট দেবী তাঁর সেবকের ইচ্ছাপূরণ করতেন।

পুঁটুলিটি ভিতরে নিয়ে এলেন লোকটি। একে একে বার করে আনলেন বিভিন্ন পূজার উপকরণ। বংশপরম্পরায় তিনি শুনেছেন, তাঁর পূর্বপুরুষ নাকি এক অভাবনীয় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে পালিয়ে গেছিলেন এই অঞ্চল ছেড়ে৷ সেই বিপর্যয় এমন অকস্মাৎ এসেছিল যে পূজ্য দেবীকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার সময় অবধি পাননি। শুধু নিয়ে গেছিলেন একজনকেই, তাঁর সাধনসঙ্গিনীকে।

তাঁর সাধনসঙ্গিনী ছিলেন মহাডাকিনী বিদ্যাধরী। লোকপ্রবাদ বলে, অত্যন্ত গূঢ় বৌদ্ধবিদ্যার অধিকারী বিদ্যাধরী ছিলেন স্বয়ং নিগুডাকিনীর বংশজা। কিছু কিছু সাধনায় তিনি তাঁর ভৈরবকেও অতিক্রম করে গেছিলেন। তিনি ইচ্ছেমতো শূন্যমার্গে বিচরণ করতে পারতেন। পারতেন প্রাকৃতিক ঝড়-ঝঞ্ঝা সৃষ্টি করতে বা রোধ করতে। এমনকী পঞ্চস্কন্ধের মায়াভ্রম রচনাতেও সিদ্ধহস্তা ছিলেন।

তবে তিনি বিখ্যাত ছিলেন তাঁর একটি অতি বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য।

বিদ্যাধরী ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা নারী। প্রবল স্বেচ্ছাধীন নারী। তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমন শক্তি এ জগতে কারো ছিল না। নিজের গণ্ডি তিনি নিজেই কাটতেন, নিজের অধিকারের সীমা নিজেই নির্ধারণ করতেন। কারো শাসন শুনতেন না, কোনও বাধা মানতেন না।

হাত জড়ো করে নিজের পূর্বপুরুষের প্রতি প্রণাম উৎসর্গ করলেন মানুষটি। লোকে বলে তাঁর সেই পূর্বপুরুষ নাকি নিজের আরাধ্যা দেবীকে সাধনসঙ্গিনীর আদলেই গড়েছিলেন। মূর্তিকল্পনা দেবী বজ্রযোগিনীর অনুরূপ, কিন্তু সাধনক্রম অন্য। ডাকিনী বিদ্যাধরী ছিলেন খর্বকায়া, সুস্তনী, কুঞ্চিতকেশা এবং মদ্যমাংসপ্রিয়া। তাঁর চোখদুটি ছিল বিশাল এবং টানাটানা৷ এই দেবীও তাই, বিশালাক্ষী, মদ্যমাংসরুধিরপ্রিয়া এবং উড্ডয়নপারঙ্গমা। তাই দেবীর মন্দিরের কোনও ছাদ নেই! যাতে দেবী ইচ্ছেমতো পরিভ্রমণ করতে পারেন!

পূজাসামগ্রী একত্রিত করে বজ্রপর্যাঙ্কাসনে বসে দেবী বিদ্যাধরী বিশালাক্ষীর পূজায় বসলেন মানুষটি। এই দেবীর যে-কোনও উপাসনাই একটি পূর্ণাঙ্গ সাধনপন্থা। যে সাধক একবার দেবী বজ্রযোগিনীর উপাসনা করেন, তাঁর অন্য কারো সাধনা করার দরকার নেই। তিনি একাকী নায়িকা, স্বয়ংসম্পূর্ণা, স্বয়ংইচ্ছাধীনা।

ক্রমেই দেবী উড্ডীয়ানচণ্ডিকা বিদ্যাধরীর ধ্যানে ডুবে যেতে লাগলেন এই রাজ্যের আদি অধিপতি শনিভাঙড়ের গুরুদেব অঘোরবজ্রের উত্তরাধিকারী। অনেকদিন, অনেক শতাব্দী পর অঘোরবজ্রের উত্তরাধিকারীর কাছে সু্যোগ এসেছে তাঁর প্রতি কৃত মহা অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়ার। মা বজ্রযোগিনী বিদ্যাধরী তাঁর সহায় হোন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *