দুর্গেশনন্দিনী
৯৯৭ বঙ্গাব্দের এক উষ্ণ সন্ধ্যাবেলায় একজন অশ্বারোহী পুরুষ বিষ্ণুপুর থেকে মান্দারণের পথে যাচ্ছিলেন। সূর্য অস্তাচলগামী দেখে তিনি তাঁর ঘোড়াটি দ্রুত ছোটাতে শুরু করলেন। সামনে বিস্তীর্ণ প্রান্তর। বঙ্গদেশে এই সময়ে প্রায়ই নিদারুণ ঝড়বৃষ্টি হয়ে থাকে। এই জনহীন প্রান্তরে যদি কালবৈশাখী ঝড় আছড়ে পড়ে, তাহলে বিপদের সমূহ সম্ভাবনা।
প্রান্তর পার হওয়ার আগেই দিনমণি অস্তে গেলেন। ক্রমে আকাশের বুকে দেখা দিল ঐরাবতকায় জলধরদল। সন্ধ্যাবেলাতেই চারিদিকে এমন ঘোরতর অন্ধকার নেমে এল যে অশ্বচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।
অল্পকালের মধ্যেই কালবৈশাখী আছড়ে পড়ল প্রান্তরের বুকে। আর তার সঙ্গে মুষলধার বৃষ্টি। এই অন্ধকারে কোনও দিশা স্থির করা অসম্ভব। পথিক এবার সত্যিই পথ হারালেন।
অশ্বারূঢ় যুবা হাতের বল্গা ঢিলে করে দিলেন। ঘোড়াটি সুশিক্ষিত। সে সাবধানে তার প্রভুকে পিঠে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগল। এভাবে কিছুদূর যাওয়ার পর ঘোড়াটি এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াল। ঠিক সেইসময়ে আকাশের একদিক থেকে অন্যদিক চিরে ঝলসে উঠল বিদ্যুতের তরবারি। সেই চকিত আলোয় তিনি দেখলেন, সামনে একটি শ্বেতপাথরের দেবমন্দির।
যুবাপুরুষটি সোপানশ্রেণী পার হয়ে মন্দিরের দরজায় উপস্থিত হলেন। দরজা খুলতে গিয়ে দেখলেন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
তিনি বিস্মিত। এই নির্জন প্রান্তরস্থিত মন্দিরে এমন দুর্যোগের ভিতর থেকে মন্দিরের দরজা বন্ধ করল কে?
কিন্তু তাঁর কাছে ভাবার সময় ছিল না। প্রবল বৃষ্টি পথিকের সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিচ্ছিল। তিনি প্রবল বেগে দরজায় করাঘাত করতে লাগলেন৷ কিন্তু কেউ দরজা খুলে দিল না। পথিকের একবার ইচ্ছে হল প্রবল পদাঘাতে কবাট মুক্ত করেন৷ কিন্তু তাতে দেবালয়ের অমর্যাদা হবে, এই ভেবে নিজের ইচ্ছা সংবরণ করলেন৷ তিনি আরও জোরে করাঘাত করতে লাগলেন। কাঠের দরজা সেই প্রবল প্রহার আর সহ্য করতে পারল না। একটু পরেই দরজা খুলে গেল।
যুবা যেই মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করলেন, অমনি একটি আর্তচিৎকার তাঁর কর্ণগোচর হল। সেই সঙ্গেই খোলা দরজা দিয়ে ধেয়ে আসা প্রবল বাতাসে নিভে গেল মন্দিরের মধ্যে জ্বলতে থাকা প্রদীপটি। ফলে মন্দিরের মধ্যে কে আছে, এ কীসের মন্দির, আগন্তুক কিছুই বুঝতে পারলেন না। তিনি দেবমূর্তির উদ্দেশে প্রণাম করলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীরস্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘কে আছ এই মন্দিরের মধ্যে?’
কোনও উত্তর এলো না। তবে অলঙ্কারের মৃদু ঝঙ্কারশব্দ শোনা গেল। আগন্তুক আর প্রশ্ন করলেন না। দরজা বন্ধ করে পিঠ ঠেকিয়ে বসে বললেন, ‘তুমি বা তোমরা যেই হও না কেন, শোনো। আমি এই দরজার সামনে বসলাম। আমাকে বিরক্ত কোরো না। বিরক্ত করলে, যদি পুরুষ হও তৎক্ষণাৎ ফলভোগ করবে। আর যদি নারী হও, তবে নিশ্চিন্ত থাকো। রাজপুতের হাতে ঢাল তলোয়ার থাকতে নারীর অমর্যাদা হবে না।’
ক্ষীণস্বরে বামা কণ্ঠে প্রশ্ন এল, ‘আপনি কে?’
আগন্তুক বললেন, ‘কণ্ঠস্বরে বুঝেছি, আপনি নারী। আমার পরিচয় জেনে কী হবে?’
উত্তর এল, ‘আমরা বড়ই ভয়ে আছি।’
আগন্তুক বললেন, ‘আমি যে হই না কেন, আমার পরিচয় জেনে আপনাদের কাজ নেই। তবে দুশ্চিন্তা করবেন না, আমি উপস্থিত থাকতে আপনাদের ভয়ের কোনও কারণ ঘটবে না।’
রমণী উত্তর দিলেন, ‘আমরা বড় বিপদের মধ্যে আছি। আমার সহচরী এখনও মূর্ছিতা হয়ে আছেন। আমরা আজ বিকেল বেলায় এই শৈলেশ্বর শিবমন্দিরে পুজো দিতে আসছিলাম। পথিমধ্যে পাঠান দস্যুরা আমাদের আক্রমণ করে। আমাদের সঙ্গীসাথীরা সেই আক্রমণের মুখে পড়ে পালিয়ে যায়। আমরা কোনওমতে এই মন্দিরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিই। ইতিমধ্যে ঝড় শুরু হলে পাঠানরা চলে যায়। না হলে আমাদের যে আজ কী গতি হত…’ বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠস্বর কেঁপে গেল।
যুবাপুরুষ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন, ‘আপনাদের বাসস্থান কোথায়?’
‘গড় ভবানীপুর, ভূরিশ্রেষ্ঠ।’
ততক্ষণে ঝড়ের প্রকোপ কমে এসেছিল। আগন্তুক উঠে বললেন, ‘আমার এই বিষয়ে কিছু জানার আছে। আপনারা অপেক্ষা করুন, আমি পাশের গ্রাম থেকে কিছু প্রদীপ আর তেল নিয়ে আসি।’
রমণী বললেন, ‘তার প্রয়োজন নেই। এই মন্দিরের সেবায়েত কাছেই থাকে। এখন আকাশ পরিষ্কার। জ্যোৎস্নার আলো পাবেন। বেরিয়েই দেখবেন তার কুটির। তার কাছে আগুন জ্বালাবার সমস্ত সামগ্রী পাবেন।’
আগন্তুক মন্দির থেকে বেরিয়ে দেখলেন সত্যিই সামান্য দূরে একটি কুটির দেখা যাচ্ছে৷ তিনি দ্রুতপদে সেখানে গিয়ে দরজায় করাঘাত করলেন। ভিতর হতে আর্তনাদ ভেসে এল, ‘দোহাই খাঁ সাহেব, আমাকে মেরো না। আমি গরিব মানুষ বটে, আমার কাছে টাকা কড়ি মোহর কিচ্ছু নেই।’
যুবক গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘ভয় নেই, দরজা খোলো। আমি হিন্দু।’
একটু পরে জানালায় একটি ভয়ার্ত মুখ দেখা গেল। আগন্তুককে দেখে তার বোধহয় কিছু ভরসা জন্মাল। তারপর দরজা খুলে কৃতাঞ্জলিপুটে বলল, ‘বলুন প্রভু। অধীনের প্রতি কী আদেশ?’
আগন্তুক কী কী লাগবে জানিয়ে একটি আকবরী মোহর বাড়িয়ে দিলেন সেবায়েতের দিকে। দরিদ্র সেবায়েতের চোখ লোভে চকচক করে উঠল।
যুবাপুরুষটি মন্দিরে ফিরে এসে প্রদীপ জ্বালালেন৷ উজ্জ্বল আলোয় দেখা গেল দুইজন নারী জড়োসড়ো হয়ে মন্দিরের এক কোনায় বসে আছেন। যিনি কথা বলছিলেন তিনি প্রবীণা। অন্য নারীটি নবীনা। তিনি মূর্ছাভঙ্গের পর উঠে বসেছেন। প্রবীণার অবগুণ্ঠন কপাল অবধি। নবীনার অবগুণ্ঠন সমস্ত মুখ আবৃত করে আছে।
যুবাপুরুষ বললেন, ‘হ্যাঁ, এইবার বলুন।’
নারী দুইজন দেখলেন তাঁদের সামনে একজন অতি সুদর্শন দীর্ঘদেহী বলশালী যুবক দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখশ্রী অনিন্দ্যসুন্দর, স্কন্ধ প্রসারিত, বক্ষ বিশাল এবং সবল বাহুদুটি আজানুলম্বিত। যুবকের কোমরে কোষবদ্ধ তরবারি। পিঠে ঢাল, এবং একটি বর্শা। ভাষাতেই বোঝা গেছিল যুবক এতদ্দেশীয় নয়। এইবার পোশাক আশাক দেখে বোঝা গেল ইতি একজন রাজপুত যোদ্ধা।
আলাপে জানা গেল নবীনা ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রাজধানী গড় ভবানীপুরের ধনীতম শ্রেষ্ঠী নরহরি সরকারের কন্যা। নাম তিলোত্তমা। প্রবীণা তাঁর সহচরী এবং পরিচারিকা, নাম বিমলা। ভূরিশ্রেষ্ঠ এমনিতে নিরুপদ্রব রাজ্য। শাসক বুদ্ধিমান, দয়াবান এবং সশক্ত। কিন্তু রাজ্যের বাইরে পাঠান আফগানদের উৎপাত ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তারা নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর অত্যাচার করে, শস্য এবং গবাদি পশু কেড়ে নিয়ে যায়। পথে কোনও নারীকে একাকিনী পেলে শ্লীলতাহানি করে। ক্রমেই তাদের সংখ্যা বাড়ছে, উৎপাতও বাড়ছে।
আগন্তুক প্রশ্ন করলেন, ‘এরা কোন পথ দিয়ে যাতায়াত করে, কোথায় থাকে বলতে পারেন?’
বিমলা বললেন, ‘এরা ঘোড়ায় চড়ে চলাফেরা করে। ঝড়ের মতো আসে আর সব কিছু নষ্ট করে দিয়ে চলে যায়। তবে শুনেছি রায়পুরের কাছে একটা বড় দুর্গ বানিয়েছে।’
রায়পুরের দুর্গের কথা যুবকের অজানা নয়। তিনি জানতে চান অন্য কিছু। যেমন বিদ্রোহী পাঠানদের রসদ সংগ্রহের উৎস কী! তারা কোন পথে যাতায়াত করে, কোথা থেকে শস্য, খাদ্য এসব সংগ্রহ করে ইত্যাদি। আপাতত যা বোঝা যাচ্ছে যে এখনও অবধি লুঠতরাজই এদের প্রধান জীবিকা। কিন্তু কথাটা তাঁর নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। এত বড় সৈন্যদলের খাদ্যসামগ্রী শুধু লুঠের মাধ্যমে সংগৃহীত হচ্ছে? এ কি সম্ভব?
যুবককে চিন্তিত দেখে বিমলা প্রশ্ন করলেন, ‘কী ভাবছেন কুমার?’
যুবক নিজের প্রশ্নের কথা জানালেন। এইবার প্রথমবারের জন্য মুখ খুললেন তিলোত্তমা। মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘মনে হয় আমার পিতাঠাকুরের সঙ্গে কথা বললে আপনার প্রশ্নের উত্তর পেলেও পেতে পারেন।’
তাই তো! আগন্তুকের মনে পড়ে গেল এই কন্যার পিতা একজন শ্রেষ্ঠী। সমস্ত রকমের পণ্যের চলাচল, আদান প্রদান পথের ব্যাপারে তাঁর থেকে আর ভালো কে জানবে?
ভাবতে ভাবতেই মন্দিরের বাইরে বেশ কিছু অশ্বক্ষুরধ্বনি শোনা গেল। যুবাপুরুষটি চকিতে উঠে দাঁড়ালেন। পাঠান দস্যুরা নয় তো? নারী দুইজন পুনরায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে জড়াজড়ি করে বসে রইলেন।
যুবকটি দরজা ফাঁক করে দেখলেন তাঁর অশ্বটির বল্গা ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছেন আরেক অশ্বারোহী পুরুষ। তাঁকে ঘিরে অশ্বারূঢ় সৈন্যদল। বল্গাধারী পুরুষটি হাঁক পাড়ল, ‘প্রভু, আমি বিকা রাঠোর। আপনি কোথায় আছেন? মহারাণা আমাদের পাঠিয়েছেন আপনার সাহায্যের জন্য।’
যুবাপুরুষ দরজা খুলে বাইরে এলেন। উচ্চৈঃস্বরে বললেন, ‘আমি এখানে বিকা। তুমি এসেছ খুব ভালো হয়েছে। আমি তোমাদেরই অপেক্ষায় ছিলাম।’
বিকা রাঠোর ঘোড়া থেকে নেমে অভিবাদন করল, ‘এতক্ষণ ধরে আপনারই খোঁজ করছিলাম প্রভু৷ ঝড়বাদলের মধ্যে আপনাকে খুঁজতে গিয়ে ভারি হয়রান হয়েছি।’
যুবাপুরুষটি স্মিতহাস্যে বললেন, ‘আমি জানতাম, পিতাজি আমার খোঁজ করতে তোমাকে পাঠাবেনই। শোনো বিকা, দৈব ইচ্ছায় আমার কাছে কোতলু খাঁ’র গোপন যাতায়াত পথের হদিশ জানার একটা উপায় এসেছে৷ আমি তার খোঁজ করতে ভূরিশ্রেষ্ঠ যাচ্ছি। সঙ্গে দুজন জেনানা আছেন। তোমরাও সঙ্গে চলো৷ আশা করছি শত্রুদের একেবারে নিকেশ করেই পিতাজির কাছে দর্শন দিতে পারব।’
নরহরি সরকার ঘোর বৈষয়িক মানুষ হলে কী হবে, কন্যাঅন্তপ্রাণ। তিনি বার বার কন্যার শিরশ্চুম্বন করলেন, মস্তক আঘ্রাণ করলেন৷ গলার মুক্তোর হার খুলে বিমলাকে দিলেন চরম বিপদের সময়েও কন্যার সঙ্গ না ছাড়ার জন্য। তারপর দুই রোরুদ্যমানা নারীকে অন্তঃপুরে পাঠিয়ে আগন্তুককে গদগদস্বরে বললেন, ‘আপনি আমার একমাত্র কন্যার মর্যাদা রক্ষা করেছেন। কী করে এই ঋণ শোধ করব জানি না। শুধু এইটুকু প্রতিজ্ঞা করতে পারি, এই নরহরি সরকার জীয়ন্তে আপনার ক্রীতদাস হয়ে থাকবে।’
আগন্তুক দু’পা অগ্রসর হয়ে নরহরির দুই হাত ধরে ফেললেন, ‘ছি ছি ছি, এমন বলবেন না সরকার মশাই। আপনি আমার পিতার বয়সি, পিতৃতুল্য। তাছাড়া এই পাঠান রাজত্বে হিন্দুর দুঃখ হিন্দু না দেখলে আর কে দেখবে বলুন?’
নরহরি সরকার আগন্তককে আদর করে বসালেন। অন্দর হতে পাথরের পাত্রে বেলের শরবত, প্রচুর ঘৃতভর্জিত লোচিকা এবং উৎকৃষ্ট ব্যঙ্গন এল। যুবাপুরুষটি গোগ্রাসে আহার্য গ্রহণ করতে লাগলেন।
যুবাপুরুষটি খাদ্য গ্রহণ করে শান্ত এবং প্রসন্ন হলেন। তাঁর প্রক্ষালন শেষ হলে নরহরি সরকার প্রশ্ন করলেন, ‘বলুন, আর কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি? তার আগে আমার আরও একটি প্রশ্ন আছে।’
‘আপনার পরিচয় জানতে চাই।’
যুবাপুরুষ কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে রইলেন৷ তারপর বললেন, ‘আমি জগৎসিং। অম্বরাধিপতি রাজা মানসিং-এর কনিষ্ঠ পুত্র।’
ঘরের মধ্যে বজ্রপাত হলেও বোধহয় নরহরি সরকার এত চমকিত হতেন না। এই মুহূর্তে তিনি যা শুনলেন সে তাঁর স্বপ্নেরও অগোচর ছিল। তিনি তৎক্ষণাৎ কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান হলেন। বললেন, ‘কী সৌভাগ্য! স্বয়ং জগৎসিং আজ আমাকে অনুগ্রহ করেছেন। আমি আপনার পরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিলাম না প্রভু। আমাকে ক্ষমা করবেন।’
জগৎসিং দ্রুত নরহরি সরকারের হাত ধরে ফেললেন, ‘আমাকে লজ্জিত করবেন না সরকারমশাই। আপনার পরিবারের সাহায্য করতে পেরেছি এ আমার পরম সৌভাগ্য৷’
নরহরি সরকার বললেন, ‘আদেশ করুন প্রভু, কী সেবা করতে পারি?’
জগৎসিং বললেন, ‘কোতলু খাঁ’র বাহিনীর রসদ সরবরাহের পথের সন্ধান চাই সরকারমশাই। পিতাজি আমাকে এই কাজেই পাঠিয়েছেন। এই পথ বন্ধ করতে পারলেই পাঠানদের শায়েস্তা করা অনেক সহজ হবে।’
নরহরি সরকার বললেন, ‘দেখুন, আমরা ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ের গোপন সংবাদ অন্যকে দেওয়া আমাদের পক্ষে গর্হিত অপরাধ। কিন্তু আপনি আমার কন্যার প্রাণ ও সম্মান রক্ষা করেছেন। তাই আপনাকে বলতে বাধা নেই। কিন্তু এখানে একটি বিষয় আছে।’
‘কী বিষয়?’
‘যে পথের কথা জানাব, সেটি অত্যন্ত গোপন। পুরো পথে পাঠানদের সতর্ক প্রহরা আছে। প্রথমে দামোদর বেয়ে খাদ্যশস্য, অস্ত্র শস্ত্র ইত্যাদি এসে পৌঁছয় একটি ঘাটে। ঘাটটি হচ্ছে রোণ যেখানে দামোদরের সঙ্গে মিশেছে, ঠিক সেখানে। কাছে একটি গ্রাম আছে, নাম বন্দিপুর। সেই ঘাট থেকে রায়পুর দুর্গ অবধি একটি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটি পথ আছে৷ সম্পূর্ণ পথটিই পাঠানদের সতর্ক প্রহরার মধ্যে থাকে। এই পথে অতর্কিত আক্রমণ চালালে আপনার মনস্কামনা সিদ্ধ হলেও হতে পারে৷ তবে সাবধান, অল্প সৈন্য দিয়ে আক্রমণ করতে যাবেন না। আফগান সর্দার বাহাদুর খাঁ স্বয়ং সেই পথ রক্ষা করছেন। তাঁর মতো কুটিল এবং ধূর্ত যোদ্ধা কোতলু খাঁ’র শিবিরে দ্বিতীয়টি নেই।’
উঠে দাঁড়ালেন জগৎসিং, ‘আমরা রাজপুত যোদ্ধা সরকারমশাই। অমন অনেক বাহাদুর খাঁ’এর মহড়া এক হাতে নিতে পারি। তাছাড়া অধিক সৈন্য সঙ্গে নিলে শত্রুদের চোখে পড়ার সম্ভাবনা আছে৷ আপনি চিন্তা করবেন না। এই সাহায্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।’
জগৎসিং বেরিয়ে গেলে খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে বসে রইলেন নরহরি। তিনি প্রাজ্ঞ এবং ভূয়োদর্শী মানুষ। হঠকারিতা আর বীরত্বের মধ্যে পার্থক্য জানেন। কী ভেবে তিনি একটি পত্র লিখতে বসলেন। মল্লরাজ বীর হাম্বিরের অন্যতম পার্ষদ নৈয়ায়িক মথুরেশ মিশ্র হলেন অদ্বৈত আচার্যের পৌত্র। তিনি নরহরি সরকারের বিশেষ বান্ধবও বটে। তাঁকে বিষয়টি জানিয়ে রাখা ভালো৷
বন্দিপুর গ্রামের পশ্চাদ্ভাগ বেষ্টন করে একটি অরণ্যপথ চলে গেছে দামোদর ও রোণ নদীর সঙ্গমস্থল অবধি। সেই বনেরপথ ধরে বৃক্ষরাজির আড়ালে থেকে ক্ষুদ্র দলটি ধীরে ধীরে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল।
একটু পর দলটি উদ্দিষ্টস্থানে উপস্থিত হল। শূন্য নদীতীর। গ্রীষ্মের উষ্ণ বাতাস বয়ে যাচ্ছে জলের বুক ছুঁয়ে৷ তীরে একটি অস্থায়ী ঘাট রয়েছে। ঘাটটি দৈর্ঘ্যে বেশ বড়। অন্তত চারটি নৌকা সেখানে পরপর নোঙর করা যেতে পারে।
জগৎসিং কোমরে বাঁধা ক্ষুদ্র মশক থেকে খানিকটা পণীর মুখে ঢেলে দিলেন। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলেন জঙ্গলের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটির। বোঝা গেল, এ হল পাঠান প্রহরীদের বাসস্থান। সব মিলিয়ে পনেরো থেকে ষোলোখানি কুটির। প্রতি কুটিরে তিনজন করে প্রহরী থাকলেও পঞ্চাশের অধিক হবে না। তাঁরা অনায়াসে এদের মহড়া নিতে পারেন।
জগৎসিং মদ্যপান ছাড়া থাকতে পারেন না। তিনি ফের কিঞ্চিৎ মদ গলায় ঢাললেন। তারপর নীরবে আক্রমণের ইশারা করলেন। দুজন করে রাজপুত যোদ্ধা প্রতিটি কুটিরের পেছনে অবস্থান নিল।
কিন্তু জগৎসিং লক্ষ করলেন না যে দিগন্তে দুটি বিশাল নৌকোর মাস্তুল দেখা দিয়েছে।…
চারিদিক নিস্তব্ধ। জগৎসিং সতর্কচোখে চারিদিক দেখে নিলেন একবার। তারপর তাঁর ভীমনাদে সেই নিস্তব্ধ অরণ্যবেষ্টিত নদীতীর প্রকম্পিত হল, ‘জয় ভবানী, জয় মা অম্বে।’
রাজপুত সৈন্যরা উন্মুক্ত তরবারি হাতে ঝটিতি প্রতিটি কুটিরে ঢুকে পড়ল। জগৎসিং আশা করছিলেন, এর পরেই পাঠান আফগান যোদ্ধাদের আর্তনাদে এই শান্ত অরণ্য উন্মত্ত হয়ে উঠবে। কিন্তু কই, তার তো কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না!
বিকা রাঠোর, মহেশদাস, নাড়ুচরণ প্রমুখ রাজপুত দলপতিরা হতবুদ্ধি হয়ে কুটির থেকে বেরিয়ে এল। বিকা রাঠোর প্রশ্ন করল, ‘কই প্রভু, কুটিরে কেউ তো নেই!’
জগৎসিং ভ্রুকুঞ্চন করে বললনে, ‘তাই তো! পাঠান আফগানের বাচ্চাগুলো গেল কোথায়?’
এমন সময় নাড়ুচরণ নদীর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিতস্বরে বলল, ‘ওই দেখুন প্রভু।’
এইবার জগৎসিং-এর চোখ গেল নদীর দিকে। দুটি অতি বৃহৎ বালাম নৌকো এদিকেই আসছে। আর তাদের সামনে বেশ কয়েকটি ডিঙি আর সুলুক। তারা এখন প্রায় মাঝনদীতে৷ সুলুকগুলি বোধহয় তাঁদের লক্ষ্য করেছে। অমনি তাদের দাঁড়ের গতি বেড়ে গেছে।
জগৎসিং বুঝলেন চালে একটি মস্ত ভুল হয়ে গেছে৷ পাঠানরক্ষীরা তাদের সুলুক নিয়ে এগিয়ে গেছিল রসদবাহী নৌকো দুটিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসতে৷ তাই কুটিরগুলি ফাঁকা ছিল। তারা এখন ফিরে আসছে দ্রুতগতিতে।
বিকা রাঠোর জিগ্যেস করল, ‘এখন কী করব সর্দার? আপাতত পিছিয়ে যাই? পরে আবার ফিরে আসি? নাকি ওদের জন্য অপেক্ষা করব?’
জগৎসিং আরক্তচক্ষে বললেন, ‘অবশ্যই অপেক্ষা করব বিকা। দেখছ না ওরা নিজেরাই কেমন পতঙ্গের মতো রাজপুত তরবারি আগুনে পুড়বে বলে এগিয়ে আসছে?’
মহেশদাস বলল, ‘কিন্তু হুজুর, দেখে মনে হচ্ছে এই বালাম নৌকোয় পাঠানদের রসদ আসছে। এই রসদ এখন এখান থেকে রায়পুর দুর্গে যাবে। অর্থাৎ একে রক্ষা করার জন্য নিশ্চয়ই আরও পাঠান সৈন্য আসবে৷ সেক্ষেত্রে ঘোর যুদ্ধ হবে। এখন আমরা সংখ্যায় অল্প। এখন সরাসরি ওদের মুখোমুখি হওয়ার থেকে জঙ্গলে লুকিয়ে ওদের পিছু নেওয়াটা কি অধিক বুদ্ধিমানের কাজ হবে না? তারপর রাতের অন্ধকারে ওদের আক্রমণ করলাম না হয়।’
জগৎসিং হুঙ্কার দিলেন, ‘রাজপুত কখনও পিছু হটে না বিকা। আর তারা রাতের অন্ধকারে চোরের মতো শত্রুকে আক্রমণ করে না। তৈরি হও, আজ পাঠানরক্তে এই নদীর ঘাট ভিজিয়ে তবেই যাব।’
পিছন থেকে গম্ভীরকণ্ঠে উত্তর এল, ‘এমনিতেও তোমার পিছু হঠার উপায় নেই জগৎসিং৷’
জগৎসিং ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলেন তাঁদের ঠিক পিছনে বিশাল পাঠান সৈন্যদল দাঁড়িয়ে। তাঁদের সামনে উন্মুক্ত তরবারি হাতে বাহাদুর খাঁ!
বাহাদুর খাঁ বাঁকা হাসি হেসে বললেন, ‘ব্যাপারটা কী জানো জগৎসিং, তোমার সাহস বড্ড বেশি। শুধু বুদ্ধিটা যদি বাপের মতো পেতে!’
রাত হলে কী হবে, আকাশে আজ পূর্ণশশীর উদয় হয়েছে। জোৎস্নার আলোয় ধৌত উন্মুক্ত পথেপ্রান্তরে ঘোড়া ছোটাতে কোনও অসুবিধা হচ্ছিল না ছোট সৈন্যদলটির। তাদের বড় তাড়া, আজ রাতের মধ্যেই রায়পুর পৌঁছতে হবে৷ আর কোতলু খাঁ’র হাতে তুলে দিতে হবে একটি মস্তবড় উপহার, জগৎসিং।
জগৎসিং রক্তাক্ত এবং মূর্ছিত। তাঁকে একটি ঘোড়ার পিঠে বেঁধে রাখা হয়েছে। বাকি রাজপুত দলপতিরা সকলেই নিহত হয়েছেন। তাঁদের দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে দামোদরের জলে। বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে শুধু জগৎসিংকে। কারণ মৃত জগৎ সিংহের চেয়ে জীবিত জগৎ সিংহের মূল্য পাঠানদের কাছে অনেক বেশি। তাই তাঁর প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাহাদুর খাঁ কম চেষ্টা করেননি। সঙ্গে সঙ্গে শুশ্রূষার ব্যবস্থা করেছেন, রক্তপাত বন্ধ করেছেন। দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়েছেন রায়পুর দুর্গের দিকে। অনেক আগেই একজন দূত রায়পুর ছুটে গেছে এই বিজয় সংবাদ নিয়ে৷ কোতলু খাঁ নিশ্চয়ই সাগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাঁদের জন্য।
বাহাদুর খাঁ মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছিলেন, কোতলু খাঁ’র সহায়ক পত্র লিখছে রাজা মানসিং-এর উদ্দেশে, ‘অম্বররাজ মানসিং, তোমার কনিষ্ঠপুত্র জগৎসিং আমাদের হাতে বন্দী। যদি নিজের পুত্রকে জীবিত ফেরত পেতে চাও তো বাংলা ছেড়ে চলে যাও। তোমার পুত্রকে অক্ষতদেহে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব। আর যদি এই হিতবাক্যে কর্ণপাত না করো তাহলে তোমার পুত্রকে হত্যা করে গড় মান্দারণের সামনে একটি উচ্চ স্তম্ভের উপরে ঝুলিয়ে রাখা হবে।’
তবে বাহাদুর খাঁ মানসিংহকে চেনেন। তিনি জানেন যে রাজপুতের কাছে তার ক্ষাত্রধর্মের থেকে বড় কিছু নেই। যদিও চিন্তাব্যাকুল সৈন্যাধ্যক্ষরা মানসিংকে পরামর্শ দেবেন যে, এরপর আর যুদ্ধ না চালিয়ে জগৎসিংকে উদ্ধার করে সমগ্র বাহিনীসহ সেলিমাবাদে ফিরে যাওয়া যাক। পরে সৈয়দ খাঁর সৈন্যরা এসে পৌঁছালে না-হয় শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করা যাবে। কিন্তু অম্বররাজ ক্ষত্রপতি মানসিংহ নিজের অহঙ্কারে অটল থাকবেন।
তিনি রুদ্রকণ্ঠে বলবেন, আমি রাজপুত। যে আফগান পাঠানদের তাদের পিতৃভূমি আফগানিস্থানে পঙ্গু করে দিয়েছি, তাঁদের ভয়ে বাংলা ছেড়ে পালিয়ে যাব? রাজপুত নামে কলঙ্ক লেপন করব? এক জগৎ সিং গিয়েছে—যাক। তাঁর জন্য এক হাতে অশ্রুজল মুছব আর অন্য হাতে কোতলু খাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করব।
পাঠান সৈন্যদল তখন একটি বিস্তীর্ণ জনহীন প্রান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল৷ তার একদিকে মল্লভূমের ঘন অরণ্য। বাহাদুর খাঁ জানেন, এই প্রান্তর অতি সাবধানে অতিক্রম করতে হবে তাঁকে৷ কারণ মল্লভূম এখনও এই যুদ্ধের আবহে কোনও পক্ষ নেয়নি।
অন্য কোনও রাজ্য হলে বাহাদুর খাঁ এত সতর্কতা নেওয়ার কথা ভাবতেনই না। কোতলু খাঁ’র সেনাপতি তিনি। কাকে ভয় তাঁর? কিন্তু মল্লভূমের কথা আলাদা। মল্লরাজ হাম্বিরের মতো সাহসী, দুর্ধর্ষ এবং নৃশংস যোদ্ধা কাফেরদের মধ্যে দ্বিতীয়টি দেখেননি বাহাদুর খাঁ।
দাউদ খাঁ কররানী একবার মল্লভূম আক্রমণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার ফলাফল পাঠানদের পক্ষে ভয়াবহ হয়েছিল। মুণ্ডমাল গড়ের যুদ্ধে পাঠান বাহিনীকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল মল্লভূমের বাগদী এবং লায়েক সৈন্যরা।
শুধু তাই নয়, পাঠান সৈন্যদের ছিন্নমুণ্ড নিয়ে মালা তৈরি করে ওদের কোন এক রক্তখাকী দেবীকে উপহারও দিয়েছিলেন হাম্বীর মল্লরাজ। সেই যুদ্ধে বাহাদুর খাঁ নিজেও ছিলেন। মুণ্ডমাল গড়ের যুদ্ধের বিভীষিকা এখনও তাঁর স্বপ্নের মধ্যে হানা দেয়।
অরণ্য শেষ হলেই দামোদরের তীর। সেখান থেকে রায়পুর বেশিদূর নয়। আরও দ্রুত ঘোড়া ছোটালেন বাহাদুর খাঁ।
বাহাদুর খাঁর ঠিক আগে আগে তিনজন অশ্বারোহী ছিল। প্রান্তরের শেষে দিগন্তজুড়ে মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। তার আলোয় চিকচিক করছে দামোদরের তীরের বালুচর।
বাহাদুর খাঁ দেখলেন, একটি বিশাল রাতচরা পক্ষী তার ডানার বিস্তার মেলে উড়ে যাচ্ছে পূর্ণিমার চাঁদের বুক ঘেঁষে। তার তীক্ষ্ণ টি টি টি ডাক ছড়িয়ে পড়ল চরাচর জুড়ে৷ হয়ত সেই দেখে সামান্য অন্যমনস্ক হয়েছিলেন বাহাদুর খাঁ। হুঁশ ফিরল, যখন তিনি দেখলেন অরণ্য শেষ হওয়ার ঠিক আগে তাঁর অগ্রবর্তী তিনটি ঘোড়াই অকস্মাৎ মুখ থুবড়ে পড়ল।
পুরো কাফেলাটি দাঁড়িয়ে গেল তৎক্ষনাৎ। জ্যোৎস্নার আলোয় দেখা যাচ্ছিল তিনটি ঘোড়ারই গলায় তির বিঁধে আছে।
একটু পরে ভূপাতিত অশ্ব তিনটির আরোহীরা উঠে দাঁড়াল৷ না, তাদের গায়ে কোনও তির বিদ্ধ হয়ে নেই।
একটু পর ধীরে ধীরে অরণ্যের অন্ধকার থেকে একটি বিশাল দল বেরিয়ে এসে অর্ধবৃত্তাকারে তাঁদের ঘিরে দাঁড়াল৷ দলের প্রত্যেকের হাতে সড়কি আর খাটো তরবারি। আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক সবলদেহী পুরুষ। জ্যোৎস্নার বিপরীতে মুখ দেখতে না পেলেও তার বিশাল আকৃতি, কাঁধ অবধি নেমে আসা ঘন বাবরি চুল আর দুই হাতের বর্শা দেখেই তাকে চিনলেন বাহাদুর খাঁ।
হাম্বির মল্লরাজের প্রধান দেহরক্ষী চণ্ডীচরণ লায়েক। মুণ্ডমাল গড়ের যুদ্ধে এই চণ্ডীচরণ একাই কম করে চল্লিশ জন পাঠান সৈন্যকে সড়কি ফেঁড়ে পরপারে পাঠিয়েছিল। স্বচক্ষে দেখেছেন বাহাদুর খাঁ। তিনি নিজেও এর হাত থেকে বহু কষ্টে বেঁচে ফিরেছিলেন। সেই থেকে তাঁর ধারণা এ কাফের মানুষ না, স্বয়ং শয়তান।
বাহাদুর খাঁ ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালেন। চণ্ডীচরণ ধীরে ধীরে তাঁর দিকে এগিয়ে এল। বাহাদুর খাঁ বুঝতে পারছিলেন এই গ্রীষ্মেও তাঁর শীত করছে। দু’পায়ে সামান্য কাঁপুনি।
চণ্ডীচরণ তাঁর একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর সামান্য কৌতুকের স্বরে বলল, ‘বন্দেগি খাঁ সাহেব। অনেকদিন পর দেখা, সেই মুণ্ডমাল গড়ের মোলাকাতের পর৷ তারপর, আছ কেমন? খবর সব শরিফ তো?’
বাহাদুর খাঁ’র গলা শুকিয়ে গেছিল৷ তিনি কোনওক্রমে বললেন, ‘কী চাই?’
চণ্ডীচরণ ভারি বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘তুমি তো শুনেছি কোতলু খাঁ’য়ের ডান হাত গো। তোমার কাছে কী চাই বলো দেখি? কোতলু খাঁ’কে খবর পাঠিয়ে তার ডান হাতটাই চেয়ে নিই নাকি?’
কথাটা শুনে বাহাদুর খাঁ আমূল কেঁপে গেলেন। তিনি জানেন তাঁর সঙ্গে টুকরির যে কজন সৈন্য আছে, এই ইবলিশ কাফেরের বাচ্চা একাই তাদের মাটিতে গেঁথে ফেলতে পারে। তার ওপর তার সঙ্গে এখন তার মল্লভূমের দুর্ধর্ষ বাগদী সৈন্যদল। এই প্রান্তরে তাঁদের কেটে পুঁতে দিলেও কেউ কোনও খোঁজ পাবে না।
বাহাদুর খাঁ যতটা সম্ভব সাহস জড়ো করে বললেন, ‘মশকরা কোরো না। কী চাই সাফ সাফ বলো। আমি এখন কোতলু খাঁ’র কাছে একটা অত্যন্ত জরুরি কাজে যাচ্ছি।’
চণ্ডীচরণের চলাফেরা কিঞ্চিৎ শ্লথ। কিন্তু পদক্ষেপ ভারী এবং নির্দিষ্ট। সে বাহাদুর খাঁ’র পিছনের ঘোড়াটির কাছে এসে বলল, ‘তুমি ভারি ভালো মানুষ খাঁ সাহেব। সেই মুণ্ডমাল গড়ের মোলাকাতের সময় থেকেই জানি। আমি যদি তোমার কাছে কিছু চাই তো, তুমি কিছুতেই না করতে পারবে না। কী, ঠিক বলছি তো?’
বাহাদুর খাঁ গলায় জোর এনে বললেন, ‘সাফ কথা সাফ সাফ বলো চণ্ডীচরণ।’
ঘোড়াটির পিঠে অচৈতন্য জগৎসিং এর দেহ বাঁধা ছিল। চণ্ডীচরণ মধুরস্বরে বলল, ‘বহুদিন থেকে আমার একটা আরবি ঘোড়ার শখ, বুঝলে। ভাবছি এই ঘোড়াটাকে সঙ্গে নিয়েই যাই। তুমি বন্ধু মানুষ, আশা করি কিছু মনে করবে না।’
বাহাদুর খাঁ’র কিছু বলার আগেই তাঁর প্রধান সহচর ওমর ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে কোষমুক্ত তরবারি হাতে ধেয়ে গেল, ‘মালাউনের বাচ্চা! তোর সাহস কী করে হয়….’
বাহাদুর খাঁ দেখলেন পূর্ণচন্দ্রের সুগোল বৃত্তের মধ্যে ঝলসে উঠল একটি তরবারি৷ তারপর ওমরের কাটা মুণ্ডটি গড়াতে গড়াতে তাঁর পায়ের কাছে এসে থামল।
চণ্ডীচরণ ভারি দুঃখের সঙ্গে বলল, ‘ব্যাপারটা কী জানো খাঁ সাহেব? তোমাদের, মানে পাঠানদের সাহস বড্ড বেশি। শুধু বুদ্ধিটা যদি মোঘলদের মতো পেতে।’
রুদ্রনারায়ণ তাঁর দেওয়ান দুর্লভ দত্ত আর সেনাপ্রধান চতুর্ভুজ চক্রবর্তী’র সঙ্গে বিশেষ আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ দরজায় প্রবল করাঘাত। দরয়ান দরজা খুলে দিতেই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন নরহরি সরকার। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘প্রণাম মহারাজ। আপনাকে এভাবে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু গত রাতে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেছে যেটা আপনাকে না জানালে রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য ঘোর বিপদ আসতে পারে।’
রুদ্রনারায়ণ ইশারায় নরহরি সরকারকে বসতে বললেন। দুর্লভ দত্ত দরয়ানকে বললেন জল নিয়ে আসতে৷
জল খেয়ে খানিক সুস্থ হলেন নরহরি। তারপর রুদ্রনারায়ণের দিকে হাত জোড় করে বললেন, ‘প্রভু, কাল রাতে ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেছে। বন্দিপুর গ্রামের কাছে কোতলু খাঁ’র সৈন্যদের সঙ্গে রাজা মানসিং-এর ছেলে জগৎসিং-এর একটা ছোটখাটো লড়াই হয়। তাতে জগৎসিং পরাস্ত হন। কোতলু খাঁ’র সেনাপতি বাহাদুর খাঁ জগৎসিংকে বন্দী করে রায়পুর দুর্গে নিয়ে যাচ্ছিল৷ পথে মল্লরাজ হাম্বীরের সৈন্যরা তাদের আটকায়। তারা বাহাদুর খাঁ’র কবল থেকে জগৎসিংকে ছিনিয়ে নিয়ে বিষ্ণুপুর নিয়ে গেছে।’
দুর্লভ দত্ত উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন, ‘কী বলছেন কী সরকারমশাই!’’
নরহরি সরকার দুর্লভের চোখে চোখ রেখে বলেলেন, ‘শ্রেষ্ঠীদের নিজস্ব সংবাদ ব্যবস্থাকে হেয় করে দেখবেন না দেওয়ানমশাই। মহারাজের গুপ্তচরবাহিনীর প্রতি কোনও অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি না। কিন্তু আমাদের কাছে এমন কিছু কিছু সংবাদ আসে যা তাদের কাছেও….’
চতুর্ভুজ দত্ত চোখ ছোট করে জিগ্যেস করলেন, ‘সে তো বুঝলাম সরকারমশাই। আপনি যা বললেন তার সত্যতা সম্বন্ধে আপনি নিশ্চিত তো?’
‘নইলে আর এত পড়িমরি করে দৌড়ে আসব কেন? আমার সংবাদ কখনও মিথ্যে হয় না প্রভু।’
রুদ্রনারায়ণ উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত পদচালনা করতে লাগলেন। উত্তেজিতস্বরে বললেন, ‘এ তো সাঙ্ঘাতিক সংবাদ। আমাদের তো এক্ষুনি মল্লভূমিতে লোক পাঠাতে হয়। দেওয়ানমশাই, আপনি এক্ষুনি ভূপতিকে নিয়ে রওনা হয়ে যান। পরিস্থিতিটা একবার স্বচক্ষে দেখে আসুন। আর সেনাপতি মশাই, আপনি সৈন্যদের প্রস্তুতি নিতে বলুন। এই অপমান কোতলু খাঁ এত সহজে মেনে নেওয়ার লোক নয়। আমি আশঙ্কা করছি একটা বড় যুদ্ধ আসন্ন।’
চতুর্ভুজ বললেন, ‘কিন্তু ভূপতি চলে গেলে পেঁড়োর গড় রক্ষা করবে কে?’
‘কেন? দীননাথ আছে তো। সে একাই একশো।’
ভূপতিকৃষ্ণ রুদ্রনারায়ণের কক্ষে প্রবেশ করে সসম্মানে অভিবাদন করলেন। তারপর বিনম্রস্বরে বললেন, ‘আমাকে স্মরণ করেছেন
মহারাজ?’
মহারাজ রুদ্রনারায়ণ উদাসমুখে তাকিয়েছিলেন বাতায়নের দিকে।
তিনি ভূপতির দিকে না তাকিয়েই বললেন, ‘বসো ভূপতি। তোমার সঙ্গে কথা আছে।’
ভূপতি অস্বস্তির সঙ্গে আসনে উপবেশন করলেন৷ মহারাজের মতিগতি তাঁর ভালো লাগছে না।
সদ্য একটা মস্ত বড় যুদ্ধ শেষ হয়েছে৷ তাতে বিজয়ী হয়েছে মোগল-মল্লভূম-ভূরিশ্রেষ্ঠ’র যৌথ সৈন্যবাহিনী। কোতলু খাঁ’র পাঠান আফগানবাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত। কিন্তু তাও মহারাজের মনে শান্তি নেই কেন? এই উদাসীন বৈরাগ্য ঘিরে আছে কেন তাঁকে?
নিজের গ্রাস থেকে জগৎসিংকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার অপমান সহজে মেনে নেননি কোতলু খাঁ। দুইদিন পরেই তিনি সসৈন্যে ভীমরবে আক্রমণ করেছিলেন গড় মান্দারণ।
নিশ্চুপ বসে থাকেননি মানসিংও। সৈয়দ খাঁ’র প্রতিশ্রুতি মতো সৈন্য আসার আর অপেক্ষা করেননি তিনি। প্রাণপ্রিয় কনিষ্ঠসন্তানকে যারা মৃতপ্রায় করে বন্দী বানিয়েছিল, সেই ম্লেচ্ছ দুর্বৃত্তদের প্রতি নিজের অল্পসংখ্যক সৈন্য এবং রাজপুতসুলভ ক্ষাত্রক্রোধ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন অম্বররাজ মানসিং৷ তাঁর সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করেছিলেন বীর হাম্বিরমল্ল আর ভূরিশ্রেষ্ঠাধিপতি রুদ্রনারায়ণ।
সেই যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল কোতলু খাঁ-এর। যদিও তাঁর দলপতিরা প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল। পাঠানদের দুঃসাহস, বীরত্ব সবই প্রবাদপ্রতিম। কিন্তু মহাপরিক্রমশালী ক্ষত্রপতি অম্বররাজ মানসিং-এর ক্রোধবহ্নি নির্বাপিত করা অসাধ্য।
আর মল্লভূমের সৈন্যরা যখন কপালে সিঁদুরের টিকা লাগিয়ে, হাতে ভয়াল খড়্গহাতে বীভৎস কুলুকুলু রবে চারিদিক প্রকম্পিত করে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, অর্ধেক পাঠান আফগান সৈন্য ভয়েই রণভঙ্গ দিল। মুণ্ডমালঘাটের যুদ্ধের ইতিহাস ভোলেনি তারা।
কোতলু খাঁ যুদ্ধের মধ্যেই গুরুতর আহত হয়ে প্রাণত্যাগ করলেন। কেউ জানত না, তিনি এক প্রাণঘাতী রোগে ভুগছিলেন। রুগ্ন শরীরে এই আঘাত সহ্য করতে পারলেন না তিনি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পাঠান আক্রমণের অবসান হল। কোতলু খাঁ’র বৃদ্ধ উজির ঈশা খাঁ পরাজিত ও মৃত পাঠান অধিপতির তিন পুত্র নসীব খাঁ, লোদি খাঁ এবং জামাল খাঁ’কে নিয়ে মানসিং-এর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। সঙ্গে উপঢৌকন হিসেবে ছিল দেড়শো হাতি এবং প্রচুর মূল্যবান উপঢৌকন। প্রীত মানসিং পাঠানদের সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করলেন। তাদের উড়িষ্যা শাসনের অধিকার দিলেন, তবে পুরী এবং জগন্নাথক্ষেত্র ছাড়া৷ বিজয়ী ভূরিশ্রেষ্ঠ সেনা ঘোর কলরবে বিজয়োল্লাস করতে করতে নিজের রাজ্যে ফিরে এল।
কিন্তু সেই বিজয়োল্লাসে শামিল হলেন না একজন।
যুদ্ধশেষে যে রুদ্রনারায়ণ গড় ভবানীপুরে ফিরে এলেন তিনি যেন অন্য মানুষ। যে রুদ্রনারায়ণ ভীমপ্রহরণহস্তে যুদ্ধে গেছিলেন ইনি যেন সেই মহাপরাক্রান্ত পাঠানবিজয়ী বীর নন। তাঁকে দেখে মনে হয় যেন এক পরাজিত, বিধ্বস্ত, অপমানিত সামান্য ভূম্যধিকারী!
রুদ্রনারায়ণ অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। ভূপতিকৃষ্ণ কিছু পর আবার ইতস্তত করে জিগ্যেস করলেন, ‘খুড়ামশাই, আপনি ডেকেছিলেন। কিছু বলবেন?’ রুদ্রনারায়ণ ভূরিশ্রেষ্ঠ’র মহারাজ হতে পারেন, কিন্তু রক্তের সম্পর্কে তিনি ভূপতির খুল্লতাতও বটে।
রুদ্রনারায়ণ নিশ্চুপ। নিবাত নিষ্কম্প দাঁড়িয়ে রইলেন।
‘কী হয়েছে খুড়ামশাই? আপনি পাঠানবিজয়ী বীর রুদ্রনারায়ণ, অম্বররাজ মানসিং-এর প্রধান সহায়, কঠিনহস্তে ভূরিশ্রেষ্ঠ শাসন করছেন। কিন্তু ইদানীং আপনাকে এত ক্লান্ত এবং ম্লান দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে আমাকে বলুন। আমাকে সব কিছু খুলে বলুন। আমার সর্বস্ব দিয়ে আপনার মনের মলিনতা দূর করব, প্রতিশ্রুতি দিলাম।’
খোলা বাতায়নের দিকে চেয়েছিলেন রুদ্রনারায়ণ। গ্রীষ্মের প্রখর দারুণ দগ্ধ দ্বিপ্রহরের পর নেমে আসছে সন্ধ্যার শীতল উত্তরীয়৷ কুলায়প্রত্যাশী পাখিদের কলকাকলিতে চারিদিক মুখরিত। দিনান্তে গরুর দল ফিরে আসছে গোহালে৷ তাদের ক্ষুরের ধুলোয় অস্তায়মান সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে দিগন্তপ্রান্তে এক আশ্চর্য মায়া-আলোর বলয় সৃষ্টি করেছে।
এই বিহানবেলায় গড় ভবানীপুরের ঘরে ঘরে বেজে উঠছে মঙ্গলারতির শঙ্খঘণ্টার শব্দ, জ্বলে উঠছে সন্ধ্যাপ্রদীপ। সেদিকে তাকিয়ে রুদ্রনারায়ণ অস্ফূটে বললেন, ‘ভূপতি, এত রক্ত কেন?’
ভূপতিকৃষ্ণ শুনতে পাননি সে কথা। তিনি সাগ্রহে বললেন, ‘কিছু বললেন মহারাজ?’
সামান্য কম্পিতস্বরে রুদ্রনারায়ণ বললেন, ‘জানো ভূপতি, সেদিন যুদ্ধশেষে রাত্রিবেলা আমি কী করছিলাম? মশাল হাতে একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম সেই যুদ্ধক্ষেত্রে। জানি না কেন। বোধহয় আমার নিয়তিই আমাকে সেদিন নিয়ে গেছিল ওখানে। সেখানে কী দেখলাম জানো?’
চুপ করে রইলেন ভূপতি। যুদ্ধের শেষে যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য তাঁর অজানা বা অচেনা নয়। অজানা নয় মহারাজ রুদ্রনারায়ণেরও।
‘দেখলাম চারিদিকে মৃত সৈন্যদের দেহ। কারও হাত নেই, কারও পা নেই। কারও অর্ধচ্ছিন্ন মুণ্ড কোনওমতে দেহের সঙ্গে লেগে আছে৷ কারও চোখের মধ্যে বিদ্ধ হয়ে আছে একটি তির। কারও বুকে বিদ্ধ হয়েছে তীক্ষ্ণধার ভল্ল। কারও বা মাথার পিছনদিক গোলার আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ। শিয়াল আর কুকুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে কাঁচা মাংসের লোভে। তাদের উল্লাসের চিৎকার আর মাংস কাড়াকাড়ির হিংস্রধ্বনি ভেসে আসছে আশপাশ থেকে। উফ, নরকও বোধহয় এত ভয়ানক নয়।
এমন সময় কোথা থেকে একটা ক্ষীণ আর্তনাদ শুনতে পেলাম। একটা গোঙানির শব্দ, একটা কাতরোক্তি। দৌড়ে গিয়ে দেখলাম এক হতভাগ্য উঠে বসার চেষ্টা করছে কোনওমতে। পোশাক দেখে বুঝলাম সে আফগান, শত্রুপক্ষের লোক। তার ডান হাতটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন। বাম ঊরু ভেদ করে একটি ভল্ল গেঁথে আছে মাটিতে। তার সারা শরীর রক্তে ভেসে গেছে৷ এতক্ষণে তার মৃত্যু হওয়ার কথা। কিন্তু কোনও এক অলৌকিক মন্ত্রবলে এখনও বেঁচে আছে সে!
আমি তার কাছে দৌড়ে গেলাম। কোমরে বাঁধা মশক বার করে লোকটার মুখে জল ঢেলে দিলাম। সে আমার হাতটা ধরে আমার দিকে একটা অদ্ভুত চোখে তাকালো জানো? শোনা যায় না এমন অস্ফূটস্বরে শুধু বলল, ‘মেরা বাচ্চা…মেরা বাচ্চা…কেয়া হোগা মেরে বাচ্চেকো…’ তারপরেই চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল তার, মাথাটা আমার কোল থেকে মাটিতে পড়ে গেল।
আমি সেখানে স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম ভূপতি। এই লোকটা একজন সাধারণ সৈন্য। রাজা, মহারাজা, সুলতান, সেনাপতি বা উচ্চপদস্থ কেউ নয়। মৃত্যুর আগে সে ঈশ্বরের নাম করেনি, তার অন্নদাতা প্রভু’র নাম করেনি, যার নামে জয়ধ্বনি দিয়ে সে এই সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার নাম করেনি, নিজের পিতামাতা, স্ত্রী বা প্রেয়সীর নাম করেনি। শুধু নিজের সন্তানের নাম করেছে। মরার আগের মুহূর্তেও তার একমাত্র চিন্তা সে মারা যাওয়ার পর তার সন্তানের কী হবে। এত ভালোবাসা কোথা থেকে আসে ভূপতি? মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও নিজের সন্তানের প্রতি এমন ভালোবাসা জমে থাকে একজন পিতার বুকে? এত স্নেহ? এত মায়া?’
ভূপতিকৃষ্ণ নরমস্বরে বললেন, ‘মহারাজ, আপনি শুধু বীর নন, শাস্ত্রজ্ঞও বটে। আপনি তো জানেন, আমাদের জন্ম মৃত্যু সবই ঈশ্বরের হাতে। আমাদের ভাগ্যবিধাতা কপালে যা লিখে রেখেছেন, তাই হবে। আপনি তাতে এত বিচলিত হচ্ছেন কেন মহারাজ? আপনি তো নিয়মিত গীতাপাঠ করেন। আপনি তো জানেন আত্মা অবিনশ্বর, শুধু তার শুধু জন্ম থেকে জন্মান্তর, রূপ থেকে রূপান্তর ঘটে। নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি, নৈনং দহতি পাবকঃ…’
ঘুরে দাঁড়ালেন রাজা রুদ্রনারায়ণ। তাঁর চোখের কোণে টলটল করছে জল! ‘শুধু ধর্ম আর ধর্ম! শুধু শাস্ত্র আর শাস্ত্র! তোমাদের দয়া হয় না ভূপতি? মানুষের প্রতি দয়া? একজন পিতার প্রতি দয়া? একজন সন্তানের প্রতি করুণা? আমার কী হবে ভূপতি? আমি তো যোদ্ধা, যুদ্ধক্ষেত্রে বীরগতি প্রাপ্ত হতে ভয় পাই না৷ কিন্তু আমি যদি কাল মহাকালগ্রাসে পতিত হই ভূপতি, কার মুখ মনে করে যাব? আমার যে সন্তান নেই। কার চাঁদমুখ মনে করে চোখ বুজব ভূপতি, বলতে পারো?’
ভূপতি চুপ করে রইলেন। মহারাজ রুদ্রনারায়ণ সন্তানহীন৷ তাঁর স্ত্রী, মহারানী স্বর্ণময়ী চিররুগ্না। রাজবৈদ্য বলে দিয়েছেন গর্ভধারণ মাত্রেই রানীমায়ের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। রুদ্রনারায়ণ এতটাই পত্নীগতপ্রাণ যে দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করার কথা চিন্তা করেননি। এই নিয়ে ভূরিশ্রেষ্ঠ’র রাজন্যবর্গ কম চিন্তিত নন। গুরুদেব হরিদেব ভট্টনারায়ণ থেকে বরিষ্ঠ রাজপদাধিকারীরা তাঁকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন দ্বিতীয় স্ত্রীবিবাহের জন্য। কিন্তু রুদ্রনারায়ণ প্রতিবারই সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ভূপতিকৃষ্ণ উত্তর করার আগেই দরজায় ঠকঠক শব্দ হল৷ ভূপতিকৃষ্ণ দ্বার খোলবার জন্য উঠতে যাচ্ছিলেন৷ কিন্তু তার পূর্বেই কক্ষে প্রবেশ করলেন রাজপুরোহিত হরিদেব ভট্টাচার্য।
রুদ্রনারায়ণ এবং ভূপতিকৃষ্ণ দুজনেই উঠে দাঁড়িয়ে রাজপুরোহিতকে প্রণাম করলেন। হরিদেব স্বস্তিবাচন উচ্চারণ করে দুজনকে আসন গ্রহণ করতে বললেন৷ তারপর মাটিতে নিজের সাধনালব্ধ বাঘছালটি বিছিয়ে তার ওপর উপবেশন করে বললেন, ‘এদিক দিয়েই দেবীপুর যাচ্ছিলাম৷ শুনেছি সেখানে নাকি এক মস্ত তান্ত্রিক সাধু এসেছেন৷ তিনি নাকি সর্বজ্ঞ পণ্ডিত, লোকের মুখের দিকে চেয়ে তার ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন৷ ভাবলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিই যখন, তাহলে একা কেন, মহারাজকেও সঙ্গে নিয়ে যাই। তবে ভাবিনি যে ভূপতিকৃষ্ণ বাবাজীবনও এখানে উপস্থিত থাকবেন। তা, এদিকে এখন সব কুশল মঙ্গল তো? আমার সঙ্গে যেতে আপত্তি নেই তো?’
রুদ্রনারায়ণ কিছু বলার আগেই ভূপতিকৃষ্ণ বলে উঠলেন, ‘আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না গুরুদেব। কখন যেতে হবে বলুন।’
‘এখনই। দেবীপুর এখান হতে এক ঘণ্টার পথ।’
শ্মশানের ঈশান কোণের এই অংশটি রাত্রিকালে সচরাচর অন্ধকার থাকে। কিন্তু আজ সেখানে মশাল জ্বালিয়ে আলোকিত করা হয়েছে। ওখানে একটি বহু প্রাচীন বটবৃক্ষ এবং তার নীচে একটি সাধনপীঠ আছে৷ সেখানে ধুনি জ্বালিয়ে একজন সাধু বসেছিলেন। তিনি বয়সে প্রৌঢ়৷ শ্বেতশুভ্র শ্মশ্রুগুম্ফশোভিত মুখমণ্ডল। পরনে একটি লাল রঙের ধুতি, ঊর্ধ্বাঙ্গে কিছু নেই৷ গলায় ঝুলছে রুদ্রাক্ষ আর পদ্মবীজের মালা৷ সাধুর শরীরে চন্দন এবং সিঁদুরে চর্চিত বিভিন্ন মুদ্রা অঙ্কিত। তিনি চোখ বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন ছিলেন।
একটু পর তাঁর সামনে তিনজন দর্শনার্থী এসে উপস্থিত হলেন। তিনজনেই সাধুবাবার সামনে প্রণত হলেন৷ প্রথমজন বললেন, ‘প্রণাম মুনিবর। অধীনের নাম হরিদেব ভট্টাচার্য। জাতিতে ব্রাহ্মণ, নিবাস গড় ভবানীপুর। আপনার আগমনের সংবাদ পেয়ে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি।’
সাধুবাবা তাঁর নিমীলিত নয়ন উন্মোচিত করলেন। তাঁর দৃষ্টি স্থির, তীক্ষ্ণ এবং তীব্র। তিনি গম্ভীরস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কী চাই তোদের? বার বার আসিস কেন তোরা? আমি তো বলেছি, আমি কোনও টাকাকড়ি বা গুপ্তধনের সন্ধান দিতে পারব না, কোনও দুরারোগ্য ব্যাধি সারানোর ক্ষমতাও আমার নেই। আমি বন্ধ্যা গাভী বা নারী, কাউকেই মন্ত্রবলে গর্ভবতী করতে পারি না। আমি বশীকরণ, মারন, উচাটন, এসব কিছুই পারি না। পারি শুধু ঈশ্বরের নামগান করতে। তাও তোরা আমাকে এসে এত বিরক্ত করিস কেন?’
ভূপতিকৃষ্ণ নতমস্তকে বললেন, ‘আমরা ধনসম্পত্তি, মারন, উচাটন, বশীকরণ, কিছুই চাই না প্রভু। শুধু আপনার আশীর্বাদ চাই।’
সাধুবাবা সামান্য হাসলেন। তারপর ভূপতিকৃষ্ণর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, ‘বড় উচ্চবংশের সন্তান তুই। পিতৃপুরুষের সুকৃতির প্রারব্ধ আছে তোর ওপর। তবে ঝড় আসবে একদিন, মস্তবড় ঝঞ্ঝা। সেদিন তোর ঘাড়ে মস্তবড় দায়িত্ব আসবে। ভয় নেই, স্বয়ং দেবী বিশালাক্ষী রাজবল্লভী তোকে রক্ষা করবেন!’
ভূপতিকৃষ্ণ প্রণত হলেন। বললেন, ‘আজীবন যেন মাতৃভূমির সেবা করে যেতে পারি প্রভু, সেই আশীর্বাদ দিন।’
সাধুবাবা এবার রুদ্রনারায়ণের দিকে তাকালেন। মুখ গম্ভীর হয়ে গেল তাঁর। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করলেন। তারপর চোখ খুলে বললেন, ‘মা তোর ঘরে আসতে চাইছেন, তাতেও তোর এত আপত্তি?’
রুদ্রনারায়ণ কিছু বুঝলেন না। তিনি নিশ্চুপ চেয়ে রইলেন সাধুবাবার দিকে।
সাধুবাবা বললেন, ‘মা আসবেন তোর ঘরে৷ তবে কন্যা নয়, রণরঙ্গিনী প্রেয়সীর রূপে। তিনি তাঁর গর্ভে তোর সন্তান ধারণ করবেন। তবে তোর কপালে বেশিদিনের পিতৃসুখ নেই। পিতা হওয়ার পরপরই মৃত্যু হবে তোর। কারণ মায়ের রজোঃতেজ সহ্য করার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নেই। তুই ফিরে যা। স্ত্রী’র সেবা কর। তিনি আর বেশিদিন নেই। তারপর মা আসবেন তোর ঘরে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।’
রুদ্রনারায়ণ কেঁপে উঠলেন। কাতরস্বরে বললেন, ‘আমার স্ত্রীকে কি বাঁচিয়ে রাখার কোনও উপায়ই নেই প্রভু? তাঁকে যে বড় ভালোবাসি।’
সাধুবাবা তর্জনী তুলে ধরলেন। তারপর বললেন, ‘আমার কথা মিথ্যা হয় না। তোর স্ত্রী বাঁচবেন না। তোর আবার বিবাহ হবে। সেই বিবাহ থেকে তোর সন্তান হবে৷ পিতা হওয়ার পরপরই জীবনদীপ নির্বাপিত হবে তোর। আর জগজ্জননী স্বয়ং এক ভয়ানক বিপর্যয় থেকে তোর বংশকে রক্ষা করবেন৷ ফিরে যা, ফিরে যা! এ নিয়তির বিধান, এই বিধান খণ্ডাবে এই পৃথিবীতে এমন সাধ্য কারও নেই।’
