৫
লিটন ভয়-পাওয়া বিস্ফারিত চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “মাক্কালী বলছি, আমি কিছু জানি না স্যার। আপনাদের কোনও ভুল হচ্ছে।”
“ভুল হচ্ছে মাদারচোদ? ভুল হচ্ছে হ্যাঁ?” কল্লোল ঠাস করে লিটনের গালে একটা থাপ্পড় কষাল।
লিটনের ঢাকুরিয়ার ভাড়ার ঘরে ঢুকেছি আমরা তিনজন। বিজন, কল্লোল আর আমি। বাইরে থিক থিক করছে পুলিশ। ওর অটোটা অলরেডি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করতেই লিটনের ঠিকানা পাওয়া গিয়েছিল। গড়িয়া-গোলপার্ক রুটের গাড়ি। গতকাল রাত দশটা অবধি রুটেই ছিল। একাধিকবার বাচ্চাদের নিয়ে আসতে যেতে দেখেছে লোকে। ফোর্স খবর পেয়ে লিটনের ভাড়ার খুপরি চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। চন্দনের থেকেও লিটন বেশি জরুরি হয়ে ওঠে আমাদের কাছে। ওর গাড়িটা অপরাধের সরাসরি সাক্ষ্য। কল্লোল আর বিজনের মধ্যে লিটনকে গ্রেফতার করা নিয়ে মন কষাকষি হয়। কল্লোল চাইছিল তখনই ঘুম ভাঙিয়ে লিটনকে অ্যারেস্ট করতে। বিজনের প্রস্তাবনা ছিল ওকে বেকায়দায় গ্রেফতার করা, যাতে কোনওভাবেই ও অস্বীকার করতে না পারে। শেষমেশ আমরা প্রায় ভোর পাঁচটা অবধি অপেক্ষা করি।
সাড়ে পাঁচটা নাগাদ লিটনের দরজা খোলে। লিটন একটা টুথব্রাশ নিয়ে বেরিয়ে দরজার সামনেটায় দাঁড়িয়ে দাঁতন করে। কুলকুচি করে জল ফেলে, দরজার পাশে নর্দমায়। তারপর আবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
“মালটা বাথরুম করতে বেরোবে এবার। পাবলিক টয়লেট ইউজ করে। তার আগে ওকে আটকাতে হবে।” বিজন পাশ থেকে বলেন।
লিটন হাতে একটা মগ আর একটা সাবানকেস হাতে নিয়ে বেরোয়। খালি গা। কাঁধে একটা সবুজ গামছা। বিজন দ্রুত হেঁটে ওর পাশে গিয়ে কাঁধে হাত রাখেন। লিটন চমকে তাকায়। বিজনকে ঠেলে ফেলে পালাতে চেষ্টা করে। আমি আর কল্লোল পিছন থেকে এগিয়ে যাই। কল্লোল পিছন থেকে ঘাড়ের কাছে খিমচে ধরেন। আমি কষিয়ে পিছনে একটা লাথি মারতেই লিটন মুখ থুবড়ে রাস্তায় পড়ে।
কল্লোলের থাপ্পড়ে লিটনের ঠোঁট কেটে গিয়েছিল। চিবুকের কাছে রক্ত লেগে। রাস্তার ধুলোবালি আর রক্তমাখা চেহারাটা আবার বলল, “মায়ের দিব্যি স্যার। আমি অটো চালাই। এসবের কিছু জানি না।”
“জানো না, না?” বিজন বিকৃত গলায় বলে ওঠেন। তলপেটে বুট সমেত একটা লাথি কষান। লিটন কুঁকড়ে উঠে বলে, “উফ স্যার। প্রস্রাব পেয়েছে।
“করে দে। যতক্ষণ না বলছিস, প্রস্রাব-পায়খানা এখানেই করতে হবে। আমাদের সামনে। বল তো মহিলা অফিসারের সামনে কোমরের লুঙ্গিটা খুলে দিই। হাগতে-মুততে সুবিধা হবে তোর।”
“না স্যার! না।” লিটন আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকায়।
“তবে সত্যি বল।”
“সত্যি স্যার। আমি চন্দনের হয়ে শুধু অটো চালাতাম। বাকি কিচ্ছু জানি না।”
“চব্বিশে ফেব্রুয়ারি মাঝরাতে তোর অটো নিয়ে কোথায় গিয়েছিলিস?”
“স্যার। কোথাও না স্যার। আমি এখানে ছিলাম না।”
“আবার বাজে কথা!” কল্লোল ফের লিটনের তলপেটে একটা ঘুসি মারে। লিটন আর চাপতে পারে না। ছ্যারছ্যার করে প্রস্রাব করে দেয়। পেচ্ছাপের দুর্গন্ধ আর পেটের পচা গ্যাসের গন্ধে লিটনের ঘর ভরে যায়। বিজন সে-সব পাত্তা দেন না। বিজন রেগে গেলে অন্য মানুষ হয়ে যান, আগেও দেখেছি।
হাঁটু মুড়ে লিটনের কাছে বসে বলেন, “তোর বাড়িতে কে কে আছে?”
“কেউ নেই স্যার। আমি একা থাকি।” লিটন পেচ্ছাপের মধ্যে থেবড়ে বসে বলে।
“কেউ নেই!” বিজন কল্লোলের দিকে তাকিয়ে বলেন, “বাহ্, তা হলে তো ভালোই হল, এটার পিছনে এখানে সময় নষ্ট কোরো না কল্লোল, গাড়িতে পোরো। বলতে চাইলে ভালো, না হলে গোটা কেসটা এর নামে দিয়ে এনকাউন্টারে মারা গেছে দেখাব।”
কল্লোল একটা হাত দিয়ে মুঠো করে লিটনের কলার ধরে তুলে বলে, “চল।”
“আমি সত্যি কিছু জানি না স্যার।”
কল্লোল ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে হাত পিছনে নিয়ে হাতকড়া পরাতে থাকে। লিটন ছটফট করে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বলি, “মরার পর বডি কার হাতে দেবে কোনও নাম ঠিকানা আছে? নাকি বেওয়ারিশ পুড়িয়ে দিতে বলব?”
“এত সময় নষ্ট করবেন না ম্যাডাম। কেসটা শালা এক মাস ধরে ঘুম বরবাদ করে দিয়েছে। সোনারপুরে লোক গেছে। বাচ্চাটার বাপ-মাকে তুলবে। এমনিতেও গেঁথে গেছে। বাকিটা আমরা সালটে নেব। চল বানচোদ, তোর দিন শেষ।” বিজন লিটনের পিছনে ক্যাক করে একটা লাথি মেরে বলেন।
লিটনের হাঁটু কাঁপছিল। পা মুড়ে মাটিতে বসে বলে, “আমি কিছু জানি না বিশ্বাস করুন। আমি শুধু ওদেরকে লজে নিয়ে যেতাম। আবার ফিরিয়ে আনতাম। ওখান থেকে ওরা কোথায় যেত, কিচ্ছু জানি না।”
“কোন লজ?” বিজন বাঘের মতো গর্জে ওঠেন, “বল কোন লজ?”
“গণপতি লজ স্যার। বোসপুকুরে রাজকৃষ্ণ চ্যাটার্জি রোডের উপর। ওখানে
ওদের নামাতে হত। কাস্টমার পছন্দ করলে ওখান থেকে কাস্টমারের দায়িত্ব। কাজ শেষ হলে আবার লজ থেকেই তুলে আনতাম।”
“কাস্টমারের দায়িত্ব? অ্যাঁ? হারামজাদা! বিজন এবার ঠেসে চড় কষিয়ে বলেন, “কোন কাস্টমার?”
“আমি জানি না স্যার। মাইরি বলছি।”
“ঢাকুরিয়া বস্তির বাচ্চাটা কোন কাস্টমারের কাছে গিয়েছিল?”
“মায়ের দিব্যি স্যার। আমি জানি না। লজ থেকে ফেরত এনেছিলাম তখনই খুব খারাপ অবস্থা। আমি চন্দনকে বলেছিলাম। ও পাত্তা দেয়নি…”
“তুই ওদের ছুঁতিস না?”
“না, না স্যার, বিশ্বাস করুন।”
“আর চন্দন?”
“না স্যার। ওসব কিছু না। ও খালি বস্তির বাচ্চাদের মধ্যে থেকে কয়েকজনকে…”
“থেমে গেলি কেন? বল?” বিজন লিটনের টুটি চেপে ধরে বললেন।
“স্যার অনেকেই জেনেবুঝে পাঠাত। টাকার লোভ দেখালেই রাজি হয়ে যেত। ভালো খেলনা, খাবার এসব দিলে বাচ্চারা চলে আসত…” লিটন ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে বলে।
“তুই আর চন্দন কদ্দিন ধরে এসব করছিস?” আমি ঠান্ডা গলায় বলি।
লিটন ক্রমাগত চড়-থাপ্পড় খেয়ে ধোঁকে। নিস্তেজ গলায় বলে, “বছর দুয়েক আগে চন্দন প্রস্তাব দেয়। ভালো টাকা দিত। না করতে পারিনি।”
“ক’টা বাচ্চাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছিস?”
লিটন বোবা চোখে আমার দিকে তাকায়। মাথা নিচু করে নেয়। আমার যাবতীয় রাগ হাঁটুর কাছে কেন্দ্রীভূত হয়। গায়ে উর্দি না থাকলে, ওর বুক লক্ষ্য করে লাথি চালাতাম। তার বদলে আমারও হাত ওঠে। চুলের মুঠি ধরে বলি, “প্লাবন প্রামাণিক, চুমকি প্রামাণিকের ভাই, ওকে কোথায় পাচার করেছিস?”
লিটন ব্যাথায় ছটফট করতে করতে বলে, “ওকে লজে পৌঁছে দিয়েছিলাম। ফেরত আনিনি। চন্দনকে জিজ্ঞেস করায় বলল, লাফড়া হয়েছে। কিন্তু ও ম্যানেজ করে নিয়েছে।”
“কী লাফড়া?”
“আমি জানতাম না বিশ্বাস করুন ম্যাডাম। চুমকি এসে বার বার ওকে জিজ্ঞেস করত, ভাইয়ের খোঁজ করত। আমি জিজ্ঞাসা করাতেও কিছু বলেনি। তারপর…”
“তারপর?”
লিটন দম নিয়ে বলে, “একদিন রাতে চন্দন খুব মাল খেয়েছিল। আলবাল বকছিল। চুমকি খুব বিরক্ত করছে বলছিল। বলছিল বুঝিয়ে কাজ হচ্ছে না। ভাইয়ের খোঁজ নেওয়া বন্ধই করছে না চুমকি।”
“আরে কী করেছিস বাচ্চাটাকে বল?” বিজন আবার ঠাঁটিয়ে থাপ্পড় মারেন।
“স্যার বাচ্চাটা খুব চেঁচিয়েছিল, রক্তও থামছিল না… কাস্টমার ভয় পেয়ে গিয়েছিল, তারপর…” লিটন শেষ করে না। দু’জোড়া বুটের লাথি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে। কঁকিয়ে কঁকিয়ে বলে, “চন্দন বলছিল, ও টাকাপয়সা দিয়ে ম্যানেজ করেছে… আমি সত্যি বলছি স্যার, আমি ওখানে ছিলাম না… কখন হয়েছে, কী হয়েছে জানি না।”
“আহা, সতী আমার!” বিজন হিসহিস করে চন্দনের গেঞ্জি ধরে বলে ওঠেন, “তোর অটোতে করে চুমকির বডি নিয়ে গিয়ে মেহতার ফ্ল্যাটের কাদাপুকুরে ডাম্প করেছিস, আর এখন ন্যাকা সাজছিস?”
লিটনের মাথা নুইয়ে গিয়েছিল। কোনওক্রমে হাঁপাতে হাঁপাতে ও বলে, “আমি না স্যার। চন্দন করে থাকবে। আমি তখন সত্যি মিদনাপুর গিয়েছিলাম। ভাইঝির বিয়ে ছিল। গাড়ির চাবি ওর কাছে ছিল। ও নিজেও অটো চালাত এককালে। লাইসেন্স আছে। আপনি বাইরে খোঁজ নিয়ে দেখুন স্যার। আপনাদের দু’পায়ে পড়ি স্যার, আমি কোনও খুন করিনি।”
“কোথায় মেরেছিল চুমকিকে? বল?” বিজন লিটনের কাঁধ ঝাঁকান। “স্যার। সুচেতনাতে, ওর অফিসেই।” লিটন হাপরের মতো একটা নিশ্বাস নিয়ে বলে।
লিটনকে ফোর্সের গাড়িতে তুলে বিজন একটা সিগারেট ধরান। আমাকে আর কল্লোলকে অফার করতে ভুলে গিয়েছিলেন, আমরা চেয়ে নিই। অস্বস্তিকর প্রশ্নটা আমাদের সবার মনেই ঘুরছিল, বিজন সেটা উচ্চারণ করে
ফেলেন, “প্লাবন তার মানে…”
একটা লম্বা নীরবতা নামে। আমরা চুপচাপ সিগারেট খাই।
বিজন চুলের মধ্যে হাত চালিয়ে বলেন, “কেঁচো খুঁড়তে কেউটে কেস পুরো। চন্দন দাশকে কি চুমকি ওর ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ করত?”
“চন্দনকেই যদি সন্দেহ করবে, তবে শরীর বিক্রি করে টাকা রোজগার করবে কেন?” আমি শান্ত গলায় বলি।
“তবে?”
“টিটোর অপরাধীকে শনাক্ত করতে পেরে গিয়েছিল। মনে প্রবল সন্দেহ ছিল, প্লাবনের অপরাধীও একই লোক। অসম্ভব কিছু নয়। চুমকির সঙ্গে প্লাবন বিভাবরীতে যেত। ওই পথেই ও ভাইকে সুচেতনায় নিয়ে যেত, আসত। বিভাবরীর একাধিক সদস্য সুচেতনায় যাতায়াত করেন,” আমি একটু থেমে বলি, “ও চন্দনকে ভয় দেখাতে নয়, সাহায্য চাইতে গিয়েছিল। অপরাধীর সোশ্যাল স্টেটাস তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দ্বিধা, সংশয় কাজ করছিল।”
“তার মানে রিকনস্ট্রাকশন করলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এমন— সেদিন রাতে চুমকি সুচেতনায় যায়। চন্দন আর চুমকির মধ্যে এমন কিছু কথা হয়, যাতে চন্দন নিজের বিপদ বুঝতে পারে। চন্দন সাহায্য না করলেও, চুমকি লোকটার নাম রাষ্ট্র করবে, চন্দন জানত। রাত তখন প্রায় সাড়ে ন’টা কি পৌনে দশটা। চুমকিকে ও মাথায় আঘাত করে। কিন্তু সেই আঘাতে চুমকির প্রাণ যায় না। আরও প্রায় তিন-চার ঘণ্টা পরে ও চুমকিকে গলা টিপে মারে। কিন্তু মধ্যিখানের এই সময়টা নিল কেন?”
“অনেক কারণ থাকতে পারে। অ্যালিবাই তৈরি করতে চেয়েছিল বা কোনও বাধা পড়েছিল, বা হয়তো প্রথম আঘাতেই প্রাণ গেছে ভেবে নিয়েছিল, পরে রাত গভীর হলে যখন বডি ডাম্প করতে আসে, তখন নিশ্চিত মেরে ফেলতে গলা টেপে।” আমি ভেবে বলি।
“ঠিক। তার মানে নেক্সট কর্তব্য হচ্ছে সুচেতনায় ফরেনসিক টিম পাঠানো। লিটনের অটোটাকে ফরেনসিক করা। অনেক দিন কেটে গেছে। অটো আর অফিস দুটোই ধুয়েমুছে সাফ করেছে। তবু যদি কিছু পাওয়া যায়।”
“সিসিটিভি! ক্লোজেস্ট সিসিটিভিতে দেখতে হবে যদি অটোটাকে চিহ্নিত করা যায়।”
“আমি দেখে নিচ্ছি।” কল্লোল বলে, “বিজনদা, ফরেনসিককে বললে কতক্ষণের মধ্যে আসবে?”
বিজন হাতে ঘড়ি দেখে বলেন, “দেখছি। যতটা তাড়াতাড়ি পারে।”
লিটন ফোর্সের গাড়িতে মুখে কাপড় ঢাকা দিয়ে বসে থাকে। ধীরে ধীরে চারপাশে ভিড় বাড়ে। পাড়াপ্রতিবেশী এতক্ষণে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। বিজন অস্ফুটে বলেন, “মিডিয়া এল বলে।” লিটনের ঘর সিল করে দেন দু’জন কনস্টেবল। বহু দূরে কোথাও একটা সাইরেন বাজে। আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখি, জনতার কৌতূহলী চোখে পুলিশের কার্যকলাপ কীভাবে ধরা পড়ে। অধিকাংশই সকালবেলার বিনিপয়সার বিনোদন দেখে, কেউ কেউ গাড়িতে বসা লিটনকে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করে, কেউ নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে।
.
কল্লোলের ফোন বেজে ওঠে। ফোন ধরে ও ওপারের কথা শোনে, তারপর অবাক হয়ে বলে, “কখন! যাহ্, শালা!”
আমরা ওর দিকে তাকাই। কল্লোলের চোখে সংশয়। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ও বলে, “চন্দন দাশকে ওর বাড়ি থেকে সেন্সলেস অবস্থায় পাওয়া গেছে। যে টিম ওকে তুলতে গিয়েছিল, ওরা ওকে পিজিতে নিয়ে গেছে।”
“মানে! সেন্সলেস! কেন!” আমরা বলে উঠি।
কল্লোলও অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকায়। ওর হাতে লিটনের চার্জ দিয়ে আমি আর বিজন ঠিক করি, পিজি যাব।
.
এসএসকেএম-এ পৌঁছোতে দু’জন অফিসার আমাদের অভিবাদন করেন। বিজন আর আমার সঙ্গে করমর্দন করে বলেন, “বার্ন ইউনিটে ভর্তি। ইলেকট্রোকিউশন।”
আমি আর বিজন দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে দেখি। বিজন প্রশ্ন করেন, “কী করে শক লাগল?”
“ঠিক জানি না। দরজা খোলাই ছিল। আমরা ওর নাম ধরে ডেকে, দরজা ঠেলা মেরে ঢুকে দেখি, মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। ওয়াশিং মেশিনের জল চারিদিকে ছড়িয়ে। আর প্লাগপয়েন্ট সমেত পুরো বোর্ড উড়ে গেছে।”
আমি আর বিজন সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত উঠতে থাকি। বার্ন ইউনিটের ভিজিটিং ডাক্তার বেরিয়ে যাবেন এখনই, নীচে অফিসাররা বলেন। রাশভারী ডাক্তার আমাদের দেখে থমকে দাঁড়ান।
“ইন্টারন্যাল অরগান ড্যামেজ হয়েছে। হার্ট, লাংস রেসপন্ড করছে না। নেহাত বয়স কম বলে যুঝছে। তবে বেশি আশা নেই। জবানবন্দির তো প্রশ্নই নেই। আই ও’ন্ট অ্যালাউ এনিবডি ক্লোজ টু হিম, অ্যাটলিস্ট ফর ফর্টি এইট আওয়ার্স।”
সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে ডাক্তার বিদায় নেন। বিজন কী যেন ভাবছিলেন, কিছুক্ষণ পর বলেন, “ইলেকট্রোকিউশন। সাকিব আর চন্দন দু’জনের ক্ষেত্রেই প্যাটার্ন মিলে যাচ্ছে। বারুইপুরের অমল বাঁড়ুজ্জে কী বলেছিল মনে আছে?”
“আলিপুরে ড্রাইভারির আগে, গোবিন্দ নস্কর ইলেকট্রিক ফিউজের কারখানায় কাজ করত। ইলেকট্রিকের কাজ জানত।” আমি বললাম।
“ঠিক। আমি ধরে নিচ্ছি চন্দনেরটা প্ল্যানড হোমিসাইড। ওর মুখ বন্ধ করা দরকার ছিল। কিন্তু দর্শনা, একটা পূর্ণবয়স্ক যুবককে সম্পূর্ণ কবজায় না করে কীভাবে তাকে ইলেকট্রোকিউট করবে? আগে অন্তত সেন্সলেস করে ফেলতে হবে। তারপর না হয় এসব নকশা করা যায়। একটা বাহাত্তর বছরের লোকের পক্ষে…”
“অস্বাভাবিক। অসম্ভব হয়তো নয়।” আমি বলে উঠি। বুকের মধ্যে একটা প্রশ্ন খচখচ করে। দ্বিধা কাটিয়ে বলে উঠি, “চন্দন দাশের অ্যাক্সিডেন্ট প্ল্যানড হোমিসাইড হলে অপরাধী ইতিমধ্যে সতর্ক হয়ে গেছে। আমরা যে পিডোফাইল রিং বার্স্ট করতে চলেছি, এ-কথা কারা কারা জানত?”
“ডিসি সাউথের আন্ডারে যত থানা আছে, সব ক’টাই।” বিজন চিন্তিতস্বরে বলেন।
“এটা হায়ার অথরিটিকে জানাবেন তো?” আমি প্রশ্ন করি।
“তন্ময়দা ফিরুক। যা করার ও করবে। আমি কানে তুলে দেব।” বিজন বলেন। ওর আর আমার ফোনে একই সঙ্গে একটা মেসেজ ঢোকে। সিপি সাহেব মিটিং কল করেছেন। ডিসি সাউথ নির্দেশ পাঠিয়েছেন, ড্রপ এভরিথিং। কাম শার্প।”
.
কনফারেন্স রুমে একটা হালকা মেজাজের হাওয়া ঘুরছিল, বড়োকর্তাদের হাবভাব দেখেই বোঝা যায়। কানাঘুষোয় শুনলাম, করিমপুরায় তারক ওর একাধিক সঙ্গী সহ ধরা পড়েছে। তন্ময়দারা আগামিকাল ভোরের ফ্লাইটে বেরিলি থেকে তারককে নিয়ে আসছেন লালবাজারে। বাকিরা আপাতত বাদাউনের এসপির নেমন্তন্ন খাচ্ছে জেলে। আপাতত জানা গেছে, ড্রাগ মাফিয়ার জাল ছড়িয়েছিল কাঠমাণ্ডু থেকে দেশের সব ক’টা বড়ো শহরে। ডার্ক ওয়েবেই অর্ডার প্লেস, অর্ডার ডেলিভারির টাকাপয়সার লেনদেন। সাগরের মতো কয়েকটি লোকাল ছেলে টাকার বিনিময়ে পার্সেল ডেলিভারি করত। পার্সেল শুধু কলকাতায় নয়, ডেলিভার হত আমেদাবাদ, মুম্বই, ভোপাল সহ নানা শহরে। কখনও সরাসরি কাস্টমারের হাতে, কখনও প্রমিতের মতো ডিলারের হাতে।
.
সিপি স্যার আমাকে আর বিজনকে দেখে উৎফুল্ল ভঙ্গিতে বললেন, “এসো, এসো। তোমাদেরই অপেক্ষা করছিলাম। শুনলাম, একটা পেডোফিলিক রিং ব্রেকথ্রু করেছ?”
প্রদীপ বর্মা সিপি সাহেবের পাশে বসেছিলেন। ডিসি সাউথ তাঁর পাশে। সিপি হাত দেখিয়ে আমাকে আর বিজনকে চেয়ারে বসতে বললেন। ডিসি সাউথ গলা খাঁকরে বললেন, “স্যার, ব্রেক থ্রু এখনও ঠিক বলা যাচ্ছে না। গণপতি টুরিস্ট লজের মালিক আর কেয়ারটেকারকে তুলে আনা হয়েছে। দে হ্যাভ অ্যাডমিটেড। বাচ্চাদের ওখানে আনা হত। কিন্তু ক’টা বাচ্চা, কোথায় তাদের বাড়ি এসব কিছুই এরা জানে না। লিটন, যাকে আমরা আজ সকালে গ্রেফতার করেছি, সে-ও এদের হালহদিশ চেনে না। অ্যাটলিস্ট সে-রকম দাবি করছে। নাটের গুরু চন্দন দাশ ইজ ফাইটিং এ ব্যাটল অফ লাইফ অ্যান্ড ডেথ।” সিপি সাহেব চা খাচ্ছিলেন। কাপ নামিয়ে বললেন, “হ্যাঁ শুনলাম। জবানবন্দির ব্যবস্থা করা যাবে না?”
“ডাক্তার স্ট্রিক্টলি না করছেন স্যার।”
“প্রেশারাইজ হিম। উই নিড এ টেন মিনিটস উইন্ডো টু গেট এ কনফেশন ফ্রম দ্যাট বাস্টার্ড। আমি নিজে দেখছি ব্যাপারটা। তদন্ত আরও এগোলে বাচ্চাগুলোর নামধাম, কাস্টমার বেস বের করা অসুবিধা হবে না।” সিপি সাহেব আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন।
প্রদীপ বর্মা একটু উসখুস করে উঠলেন। বিজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এনি লিড ইন গোবিন্দ নস্কর কেস? ইজ হি এনিহোয়ার ইনভলভড ইন অল অফ দিজ?”
“এখনও পর্যন্ত যা এভিডেন্স আছে, তাতে উই আর নট শিওর স্যার।” বিজন বলে ওঠেন। প্রদীপ বর্মা দৃশ্যত ক্ষুব্ধ হন। টেবিল চাপড়ে বলে ওঠেন, “গোবিন্দ নস্কর ছাড়া আর কে? মোটিভ, মোডাস অপারেন্ডি সব মিলে যাচ্ছে। বয়স হয়েছে বলে ওকে উইক ভেবো না। পিডোফিলিয়ার মতো মানসিক বিকার কিন্তু কোনওদিন সারে না। আমি তোমাদের বলছি, হি ইজ এ মনস্টার। এই পুরো পেডোফিলিক রিংটায় ও কোথাও না কোথাও আছে, তোমরা খুঁটিয়ে খোঁজো। এবারটা ওকে যেতে দিয়ো না।”
কনফারেন্স রুমের দরজা ঠেলে কল্লোল ঢোকে। স্যালুট ঠুকে জানায়, সুচেতনায় ফরেনসিক পৌঁছে গেছে। কিচেন থেকে নোড়া উদ্ধার হয়েছে একটা। লুমিনল টেস্ট করে ব্লাডস্পট দেখা হচ্ছে। সুচেতনার ক্লোজেস্ট লোকেশনে একটা সিসিটিভি পাওয়া গেছে। কল্লোল সেই ফুটেজ দেখতে যাওয়ার জন্য পারমিশন চেয়ে লালবাজার ছাড়ে। আমি চুপ করে থাকি। বিজন পাশে বসে হাসপাতালে পোস্টেড অন ডিউটিকে ফোন করেন। চন্দনের হুঁশ আসেনি বলে খবর আসে। সিপিস্যার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, “ওকে অফিসার্স। আই উইল টেক এ লিভ নাও। ক্র্যাক দিজ, অ্যান্ড এ বিফ স্টেক ফ্রম মোকাম্বো উড বি অন মি। গোরু খাও তো? আমি তো বামুন হয়েও চাঁড়াল, সব খাই।”
.
সিপিস্যার চেয়ার ছেড়ে উঠে বিদায় নেন। ওঁর বলা শেষ কথাগুলো আমার মাথার মধ্যে ঘোরে। জট পাকায়। আবার ঘোরে। মন্ত্রবিদ্ধ সাপের মতো আমি করিডরে এসে দাঁড়াই। বিজন দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন। আমি চুপ করে দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছি দেখে বলেন, “কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”
আমি ওর দিকে তাকাই। শূন্য লাগে চারধার। তন্ময়দার কথা মনে পড়ে যায়– যে-কোনও তদন্তকারীর জীবনে এমন মুহূর্ত আসে, যখন বিশ্বাসের জায়গাটুকু ছুঁয়ে রাখা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। তোর ক্ষেত্রেও আসবে। মনে রাখিস, তুই যে বিশ্বাসটুকু ছুঁয়ে থাকছিস, গোটা পৃথিবীর কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও সেই একই বিশ্বাস ছুঁয়েছিল। গোদা বাংলায় আমরা একে ভাগ্য বলি। ভাগ্য কিন্তু একটা কালেক্টিভ থট, গোষ্ঠীগত বিশ্বাস।
আমি বিজনের হাত আঁকড়ে ধরে বলি, “পিটার পার্কারকে কে মুখোশ পরতে বাধ্য করেছিল বিজন?”
৬
“প্রদীপ বর্মা গোবিন্দ নস্করকে নিয়ে অবসেড বিজন। গোবিন্দ নস্করকে এই কেসটার ক্রিমিনাল প্রোফাইলে আঁটতে গিয়ে একটা ভুল হয়ে যাচ্ছে, সেটা খেয়াল করেননি। তাতে আমি অন্যায্য কিছু দেখছি না। ওঁর আবেগপ্রবণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। অন্তত রিটায়ারমেন্টের ঠিক আগে।”
আমি আর বিজন তন্ময়দার ঘরে বসেছিলাম। এসিটা মাঝে মাঝে ঘরের দাপ্তরিক গাম্ভীর্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কটকট করে উঠছে।
“কিন্তু ভুল হলেও, বর্মাস্যার যে লজিক দিচ্ছেন তাতে ভুল নেই। এই কেসে সত্যিই আমরা এমন একজনকে খুঁজছি, যাকে সাকিব ব্যক্তিগতভাবে চিনত। যার দিব্যা আগরওয়ালের কেসের সঙ্গে যোগ ছিল। এমন একজন যার চন্দন দাশকে সরিয়ে ফেলার পিছনে যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু এই প্রোফাইলটি গোবিন্দ নস্কর হতে পারে না।”
“কে তবে!” বিজন অবাক হয়ে বললেন।
“‘কে’ এই প্রশ্নের আগে ‘কেন’তে আসি। ডিডাকটিভ রিজনিংয়ের প্রথম ধাপ প্যাটার্ন চিহ্নিত করা, দ্বিতীয় ধাপ প্যাটার্ন থেকে বিশ্লেষণে আসা। এই ধাপে আমরা যে ক’টা প্যাটার্ন পেয়েছি, তার থেকে ক’টা প্রশ্ন করি আপনাকে।”
“হ্যাঁ।”
“গোবিন্দ নস্করের পুরো ক্রিমিনাল কেরিয়ারে কোথাও ইলেকট্রিক শক দিয়ে ভিক্টিম বা উইটনেসকে মারার উল্লেখ পেয়েছেন?”
“না।” বিজন উত্তর দিলেন।
“ঠিক। দ্বিতীয় প্রশ্ন, সাকিব যদি গোবিন্দকে আইডেন্টিফাই করে তাতে গোবিন্দর নতুন করে ভয় পাওয়ার কারণ কী? ওর মতো রুথলেস ক্রিমিনাল যে এতবার ইমিউনিটি পেয়েছে, এত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে, সে সাকিবের রিসার্চকে এত পাত্তা দেবে? ও কি নিজের পাবলিক ইমেজ নিয়ে আদৌ চিন্তিত ছিল?”
বিজন সংশয়ে মাথা নাড়ান।
“বয়সটাকে যদি বর্মাস্যারের কথামতো পাত্তা না-ও দিই, যদি ধরে নিই গোবিন্দ এই বাহাত্তর বছর বয়সেও সত্যি সত্যি একজন মনস্টার, তবুও একটা প্রশ্ন বাকি থেকে যায়। ডিডাকটিভ রিজনিংয়ের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।”
“কী?” বিজন টেবিলের ওপার থেকে জিজ্ঞেস করেন। ঘরের ভিতরটা এত শীতল হয়ে উঠেছে, যে আমার গায়ে কাঁটা দেয়।
আমি সেভ দ্য চিলড্রেনের ওয়েবসাইট খুলে বের করি, ওকে দেখাই। কী কী লক্ষণ দেখলে বাচ্চাদের উপর সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ হচ্ছে, আন্দাজ করা যায়। যখন তখন ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠা, নিজেকে পারিপার্শ্বিক থেকে গুটিয়ে নেওয়া, অ্যানাল পেনিট্রেশনের কারণে গুহ্যদ্বারের পেশি দুর্বল হয়ে গিয়ে যখন তখন মলত্যাগ করে ফেলা— চেকলিস্টের ক’টা পয়েন্ট দেখাই।
বিজন মাথার রগ দুটো টিপে সেগুলো পড়েন।
“এই ক্রিমিনাল প্রোফাইলের মালিক গোবিন্দ নস্করের মতো আত্মবিশ্বাসী নয় বিজন। সে ভিতু। আশঙ্কার বিন্দুমাত্র কারণ দেখলে সে মাথার ঠিক রাখতে পারে না। চন্দনের বাড়িতে পুলিশ রেইড করতে পারে এমন আশঙ্কা সে চন্দনের থেকেই জানতে পারে। চন্দন বোধহয় একে গা-ঢাকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে নিজেও আন্ডারগ্রাউন্ড হতে যাচ্ছিল। লোকটা সেই সুযোগ রাখতে চায় না। চন্দনের বাড়িতে ঢুকে চন্দনকে খুন করে। সাকিবের ক্ষেত্রেও সে কোনও ঝুঁকি নিতে চায়নি। গোবিন্দ নস্করের খবর ইউটিউবে বেরিয়ে লোকটা পপুলার হয়ে যাক, সে চায়নি। কারণ, গোবিন্দ নস্কর থাকুক বা না-থাকুক, সে আছে। আর তার মধ্যে বিষাক্ত ভাইরাসের মতো ঢুকে গেছে একই রোগ।”
“কে?” বিজন রুদ্ধকণ্ঠে বলেন।
“১৯৯৭ সাল। দিব্যা আগরওয়াল রেপ অ্যান্ড মার্ডার কেস। রুমালে প্রাপ্ত এক আট বছরের ছেলের লালা। ডিএনএ রিপোর্ট ভুল নয়, অ্যানালিসিসে ভুল ছিল। যে রুমাল দিব্যার মুখে গুঁজে ওর চিৎকার থামিয়েছিল গোবিন্দ, সেই একই রুমাল আট বছরের একটি বালকের মুখে গুঁজে ছিল সে। তার উপরও একই রকম অত্যাচার করে গেছে। দিনের পর দিন। বাচ্চাটির পাঁচ বছর বয়স থেকে বারো বছর বয়স অবধি। যতদিন না সেই বালক অতিষ্ঠ হয়ে পালায়।”
বিজন বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকান। ওর কণ্ঠার কাছের ওঠানামা দেখতে পাই।
“সেই ছেলেটি যখন বড়ো হয়, তখন সে দেখে তার যাবতীয় সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন ঘেঁটে গেছে। জৈবিক প্রবৃত্তি তাকে তাড়িত করে নিয়ে যায়। কিন্তু সে মুক্তি পায় ভায়োলেন্সেই, তৃপ্তি পায় পায়ুসঙ্গমেই, চূড়ান্ত মুহূর্তে সে খুঁজে বেড়ায় একটা নরম, ছোট্ট শরীরকে একদা তার নিজের শরীর যেভাবে পিষে গিয়েছিল, সে চায় অন্য এক শরীরকেও পিষে দিতে। ট্র্যাজেডিটা জানেন? এদের অনেকেই এটাকে আদর করা, আগলে রাখা হিসেবে আইডেন্টিফাই করেন। অপরাধ করে ফেলার পর অপরাধবোধ হয়তো হয়, কিন্তু সেটা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। বাঁচতে গেলে জীবনের থেকে যে উজ্জীবন আমরা চাই, তা এরা পান একমাত্র এভাবেই। পেডোফাইল্স আর নট বর্ন, মোস্টলি দে আর মেড। অ্যাকাডেমিতে কী পড়েছিলেন মনে আছে?”
বিজন কোন এক খাদ থেকে যেন কথা বলে ওঠেন, “কিন্তু বিভাবরীতে নস্কর নামের ম্যাচ নেই যে!”
“গোবিন্দ নস্করের স্ত্রীর এটা দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। সন্তান প্রথম পক্ষের। প্রথম পক্ষের স্বামী খুব সম্ভবত ব্রাহ্মণ। দ্বিতীয়বার ইন্টারকাস্ট বিয়ে করায় অমলবাবু খেপে গিয়েছিলেন, মনে আছে?”
“তার মানে…’
“আততায়ীর পদবি নস্কর না-ই হতে পারে। বায়োলজিকাল ফাদারের পদবি ব্যবহার করছে, এটাই স্বাভাবিক। অমলবাবুকে একবার ফোন করুন। গোবিন্দ নস্করের স্ত্রীর আগের পক্ষের পদবি জানতে চান।”
বিজন ছটফট করে উঠে দাঁড়ান। অমলবাবুকে ফোন লাগান। ফোন সুইচড অফ আসে। কল্লোল একটা ল্যাপটপ নিয়ে ঘরে ঢোকে। বিজয়ীর হাসি হেসে বলে, শালা চন্দন দাশকে বাগে পেয়ে গেছি। সুচেতনা সে-রাতে ফাঁকাই ছিল। দুটো-তিনটে বাচ্চা কম্পিউটারে খুটখাট করে সাতটা অবধি। ফুটেজটা দ্যাখো। একটা স্ট্যান্ড অ্যালোন বাড়ির সিসিটিভি থেকে ধরা পড়েছে। চুমকিকে সুচেতনার দিকে যেতে দেখা যাচ্ছে। রাত দশটা বাইশে চন্দন বাইক চালিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, একা। ফিরে আসছে একটা সতেরোয়। এবার অটো নিয়ে বেরোচ্ছে। অটোর পিছনের সিটে একটা বস্তা। অটোর ফরেনসিকটা এসেছে, খোঁজ নিলে বিজনদা?”
“পরে উত্তর দিচ্ছি এসে।” বিজন উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, “এক্ষুনি আর- একবার বারুইপুর যেতে হবে।”
কল্লোল অবাক হয়ে বিজনের দিকে দেখে। এত বড়ো ব্রেক-থ্রুতে ও আমাদের কাছে অন্যরকম প্রতিক্রিয়া আশা করেছিল। প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে ও বলে, “সে যেয়ো। কিন্তু সাইবার ফরেনসিকের ছেলেটা বলল, তোমরা একটা কী ঘড়ি দিয়েছিলে। অনেক কষ্টে কয়েকটা ডেটা রিকভারী করতে পেরেছে। ঘড়িটা সরাসরি ওয়াইফাই কানেক্ট করা যায়। ফোন লাগে না। যখন প্রথম ওয়াইফাই ইনস্টল করেছিল, সরাসরি রাউটার থেকে করেছিল। তাই বোধহয় ডেটাটা পাওয়া গেছে।”
আমি নিজের বুকে ফের ধুকপুক শুনতে পাই। কল্লোল বলে, “ঘড়িটা যে ওয়াইফাই রুটারের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তার অ্যাড্রেস আইডেন্টিফাই করা গেছে। ম্যাক অ্যাড্রেসটাও পাওয়া যাবে। আপাতত ইউজার নেমটা দিয়েছে। শিপিশবয় ১৯৮৯।”
৭
ওয়াইফাই সিগন্যাল কোথায় সবথেকে শক্তিশালী সেটা বোঝার জন্য দিব্য আমাকে একটা অ্যাপের নাম বলেছিল। পাবলিক ডোমেনে থাকা ওয়াইফাইয়ের শক্তি বুঝতে সুবিধা হয়। সেটায় শিপিশবয় ইউজার নেম টাইপ করলে, ওয়াইফাই নেটওয়ার্কের পাসওয়ার্ড চায়। বিভাবরীর লিফটে চড়তে চড়তে আমি ভাবি, অ্যাপটার আসলে কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই। ম্যাক অ্যাড্রেস ম্যাচ করারও দরকার নেই। মা-বাবা ছাড়াও, মানুষের জীবনে সবথেকে বেশি প্রভাব আরও একজনের থাকে… কারওর কারওর ক্ষেত্রে এই প্রভাব থাকে আজীবন। টিটো কি সারাজীবনেও তাকে ভুলতে পারবে?
লিফ্ট থেকে নেমেই করিডর। করিডরের চারদিকে চারটি ফ্ল্যাট। আমি জানি, কোথায় গিয়ে দাঁড়ালে ১৯৮৯-কে ধরা যাবে। নামেই সংকেত দিয়ে রেখেছে অপরাধী। ফ্ল্যাটের বাইরে দাঁড়িয়ে ওয়াইফাই সিগন্যালের স্ট্রেন্থ দেখলাম। চারটে বার পূর্ণশক্তিতে জানান দিচ্ছে ডি চক্রবর্তীর ফ্ল্যাটের ওয়াইফাই রুটার, শিপিশবয় ১৯৮৯!
দিলীপ চক্রবর্তীর ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে বিজন আমার দিকে তাকান, পরপর চার-পাঁচবার বেল বাজান। দরজা খোলে না। আমি আর বিজন এবার দরজা ধাক্কাতে থাকি। ভিতর থেকে সাঁটিয়ে আটকানো দরজা আমাদের উদ্বেগ, আর উত্তেজনাকে বিচিত্র ব্যঙ্গ করে সিক্কিম দাঁড়িয়ে থাকে। ধাক্কাধাক্কির আওয়াজে টিটোদের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে মৌলি দত্ত উঁকি মারেন। বিস্মিত হয়ে বলেন, “কী হয়েছে, বলুন তো।”
আমরা ডি চক্রবর্তী কোথায় জানতে চাই। মৌলি সংশয় মাখা মুখে বলেন, “দিলীপবাবু তো এই মাত্র টিটোকে নিয়ে ছাদে গেছেন। কী একটা পাখি দেখাবেন।”
আমি আর বিজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। ফ্ল্যাটের গেটে পুলিশের গাড়ি, সিকিউরিটির সঙ্গে দু’-চারটে কথা, আমাদের সদলবলে ডি ব্লকে ঢুকে পড়া, সবটাই দিলীপ চক্রবর্তীর চোখে পড়েছে তবে। আমি আর বিজন লিফ্ট দিয়ে উপরে উঠি। বাকি ফোর্স সিঁড়ি বেয়ে অনুসরণ করে। বিজন আমার পাশে দাঁড়িয়ে হাপরের মতো নিশ্বাস টানেন। শেষ রক্ষা বোধহয় হল না। বিজনের প্রতিটা নিশ্বাস-প্রশ্বাস বলে। আমার শ্বাসক্রিয়া বিজনের সঙ্গে একই হারমোনিতে বাজে। উদ্বেগ আর অসহ্য আশঙ্কা। টিটো নিরাপদে নেই। এ কথা জলের মতো নিশ্চিত স্বতঃস্ফূর্ততায় আমাদের কোশে কোশে ছড়িয়ে পড়ে।
ছাদের ঠিক এক ফ্লোর নীচে লিফ্ট থেমে যায়। চিলেকোঠায় দরজা খোলা। আমরা পায়ে পা টিপে সিঁড়ি বেয়ে উঠি। এত তন্নিষ্ঠ হয়ে থাকে দৃষ্টি এবং মন যে, দেওয়ালের গায়ে ওর বয়সের বলিরেখা পর্যন্ত গুনতে পাই।
দরজা খুলে হা হা করে খোলা ছাদ। ডি ব্লকের প্রায় দশ হাজার স্কোয়ারফিটের ছাদ। চারিদিকে তাকিয়ে দেখি। টিটোকে কোথাও দেখি না। দিলীপকেও না। একটা পাখি ডেকে ওঠে। বিজন আর আমার সর্বাঙ্গ ঘামে জবজব করে।
বিজন ডাকতে যান, টিটো…। আমি ওর মুখ চেপে ধরে থামাই। ছাদের মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখি। কোথাও কোনও ফুটপ্রিন্ট নেই। দূরে জলের ট্যাংকের নীচে কিছু হাবিজাবি ড্রাম, বোতল, বড়ো কন্টেনার রাখা। সারি দিয়ে সাজানো। হঠাৎ চোখে পড়ে একদম ডানদিকের সারির চার পাঁচটা কন্টেনার খাপছাড়াভাবে উল্টে পড়ে আছে। আমি বিজনকে হাত দিয়ে নির্দেশ করি। আমরা মার্জার ছন্দে জলের ট্যাংকের দিকে এগোই। যত এগোই, আমার শরীরের ভিতর দুমড়োতে থাকে। যেন কেউ হাওয়ার চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্যাংকের কাছাকাছি পৌঁছে দুটো লাল রঙের স্লিপার পরা পা দেখি। পূর্ণবয়স্ক পা। বিজন এক নিশ্বাসে জলের ট্যাংকের পাটাতনের পিলার টপকে পিছনদিকে চলে যান। আমিও প্রায় একইসঙ্গে লাফ দিই। একবারের জন্য চোখের পলক পড়ে। টিটোর মুখটা ভেসে ওঠে। বিজনের গলা শুনতে পাই। এ ফাইনাল কল। আমি দম চেপে চোখ মেলে সামনের বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হই।
দিলীপ চক্রবর্তী, গোবিন্দ নস্করের সৎ ছেলে চিবুকের ঠিক নীচে একটা ধারালো ছুরির অগ্রভাগ ঠেকিয়ে বিস্ফারিত চোখে আমাদের দিকে তাকায়। নিজেরই শরীরের রক্তস্রোতে লোকটার বুক ভিজে গেছে। প্রথমবারের মতো লক্ষ করি, দিলীপের পায়ের সব ক’টা আঙুলে নেলপালিশ! আদিম কালের ভয় আর নৃশংসতা মিশছে ওর দৃষ্টিতে। অতলের ডাক সেখানে। রক্ত আর ঘামে মাখামাখি শরীরটা দেখে আমার একই সঙ্গে দু’রকম দৃশ্য দেখার অনুভূতি হয়। সস্তা দাগের কোনও সিরিয়ালের মহাকাব্যিক পরিণতি।
দিলীপ ছুরিটা ওভাবেই ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। টুপ টুপ করে রক্ত ঝরে। নিজেই বোধহয় নিজের অন্তিম বেছে নেবে ভেবেছিল। সাহসে কোলায়নি। আমার ওকে দেখে প্রবল ঘেন্না হয়, ক্রোধ হয়, ভয় খাওয়া চেহারা দেখে মনে হয় জাঁতাকলে ফেঁসে যাওয়া ইঁদুর। অন্যায়, পাপ, অপরাধ আর প্রবৃত্তির সীমারেখাটা বড্ড ধোঁয়াটে লাগে। মনে পড়ে যায়, এই একই আর্তমুখের লোকটা বিকট উল্লাসে দিনের পর দিন ত্রিদীপকে ধর্ষণ করেছে। প্লাবনকে অত্যাচার করে মেরে ফেলেছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে ও কাঁপতে থাকে। ওর গলাটা কেমন পাল্টে যায়। প্রায় কিশোরকণ্ঠে ও বলে ওঠে, “অ্যাম আই ফিনিশড?”
বিজন ওকে জাপটে ধরেন। ওর হাতের ছুরির ফলা বিপজ্জনক ভাবে ওর শরীরের আনাচেকানাচে ঘোরে। ফোর্সের একজন ছুটে এসে হাত থেকে এক চাপড়ে ছুড়ে ফেলে দেন। ট্যাংকের জলে একটা অস্বাভাবিক ছলাৎ-ছল শব্দ ওঠে। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিদ্যুৎবেগে প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রায় সাতফুট উঁচু কংক্রিটের ট্যাংক। পিলারের উপর দাঁড়িয়ে আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠি। দেখি। ট্যাংকের মুখের ঢাকনা আলগা করে লাগানো। দ্রুত সরিয়ে ভিতরে উঁকি দিই। টিটো ভিতরের জলে হাত-পা চালিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সত্যিকারের পিটার পার্কার নেই। গল্পটির প্রতি ওর বড়ো হয়ে কী প্ৰতিক্ৰিয়া হবে, জানি না, আপাতত আমি ফোর্সের বাকিদের চিৎকার করে ডাকি, “একটা দড়ি। প্লিজ। ফাস্ট।”
৮
“আহা, মোকাম্বোতে এমন স্টেক পাওয়া যায়, জানতাম না রে!” তন্ময়দা মুখ চালাতে চালাতে আরামে চোখ বন্ধ করে বলেন।
বিজন উৎফুল্ল মুখে হুইস্কি খাচ্ছিলেন। আমার দিকে চোখ মটকে তন্ময়দাকে বললেন, “‘কত অজানারে জানাইলে তুমি’ নামের একটা রবীন্দ্রসংগীত আছে। ওটা কি রবি ঠাকুর এখানে বসে লিখেছিলেন?”
তন্ময়দার মুখটা অসময়ে গাছ থেকে পড়ে ফেটে যাওয়া কাঁঠালের মতো দেখায়। খেঁকিয়ে বলেন, “মূর্খ।” সাদা শার্ট, কালো ওয়েস্টকোট পরা কেতাদুরস্ত পরিবেশকরা এসে জানতে চান, আর কী নেব। তন্ময়দা একটা ডেভিলড ক্র্যাব আর চিকেন আলাকিয়েভ অর্ডার করেন। বিজন পাশ থেকে ফোঁড়ন কেটে বলেন, “সিপি কিন্তু শুধু স্টেকের টাকা দেবে।”
তন্ময়দা বিজনকে পাত্তা দেন না। আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, “তোর তারক জেরায় কী বলল খোঁজ নিবি না?”
আমি খাওয়া থামিয়ে বলি, “জেরায় তো ছিলাম না। খোঁজটা নেব কীভাবে?”
তন্ময়দা আমার ক্ষোভ বুঝতে পারেন। তবে সান্ত্বনা দেন না। আমার জ্বলুনিটা তাই একটু পর নিজে থেকেই প্রশমিত হয়। তন্ময়দা নিজেই বলতে থাকেন, “মালটা আজ জেরায় বলেছে, সাগরের চুমকির উপর অনেকদিন ধরে সন্দেহ ছিল। কিছুতেই বুঝতে পারছিল না দ্বিতীয় মালটা কে। ঘটনার দিন সন্ধেবেলা তারকের সঙ্গে ওর মদ খেতে যাওয়ার কথা ছিল। সাগর না করে। বলে চুমকির সঙ্গে দেখা করতে যাবে। এই নিয়ে ওর পিছনে লাগতে গিয়ে তারক বলে বসে, প্রমিতের সঙ্গে চুমকির শোয়াশুয়ি চলছে।”
“টাকার বিনিময়ে শুচ্ছে বলেছিল?” বিজন প্রশ্ন করেন।
“নাহ্। সেসব তারক জানত না। তারকের কথায় সাগর হেবি খেপে গিয়ে গার্লফ্রেন্ডকে ফোন করে জবাবদিহি চায়। দেখা করার জন্য জোর করে। পাবলিক প্লেসে লাফড়া না করে কেএমসি অফিসের কাছে নিরিবিলিতে দু’জন যায়। দু’জনের মধ্যে ঝগড়া হয়। চুমকি রেগে মেগে ফোন অফ করে দেয়, যাতে সাগর
আর ফোন করতে না পারে। ফোন বন্ধ পেয়ে সাগরের আরও মাথা খারাপ হয়ে যায়। ভাবে চুমকি অবজ্ঞা করছে। মেল ইগো তো! প্রমিত পয়সাওয়ালা, দেখতে সুন্দর, ওকে এমনিতেই প্রতিযোগী ভেবে ঝাঁট জ্বলে গিয়েছিল। চুমকি মরে গেলে একেবারে উন্মাদ হয়ে যায়। পুরো রাগটা প্রমিতের উপর গিয়ে পড়ে। তারকের দলবল বহু বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সাগর ৩০০ গ্রাম কোকেন নিয়ে কাউকে কিছু না বলে পুরুলিয়া চলে যায়। তারকের মারফত গোটা গ্যাংকে ব্ল্যাকমেল করে। দাবি, প্রমিতকে এক্সপোজ করতেই হবে। না হলে ও নিজে পুলিশকে সব বলে দেবে। ডেভিডের সঙ্গে গোলিয়াথের পাঙ্গা আর-কি, বাস্তবে কি আর ডেভিডরা জেতে!” তন্ময়দা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন।
“কিন্তু তারককে কে জানাল প্রমিতের ব্যাপারে?” বিজন বলেন।
“ছিটকু।” আমি ভদকার গ্লাসে চুমুক দিয়ে মন্তব্য করি, “তারকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।”
“অ। তুই জানিস! এতটাও আশা ছিল না তোর থেকে।” তন্ময়দা আলা কিয়েভের প্লেট আমার দিকে এগিয়ে বলেন।
“লেডি লেসট্রেড অফ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড অফ ইস্ট।” বিজন ফোড়ন কাটেন।
আমি হাসি। বিজনের মশকরার উত্তর দিই না। চোখের সামনে যেন রিলে চলে।
টিটো আর চুমকি… কড়া এবং উদাসীন বাবা মা… একজন শিক্ষক যাকে টিটো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চায়, আঁকড়ে ধরতে চায়, অথচ তার আচরণে তার গা ঘিনঘিন করে, নিজেকে নোংরা লাগে, শরীর প্রবল ব্যথা জানান দেয়… অথচ, অথচ মনে হয় একে না বলে দিলে, দূরে চলে এলে আর কেউ আপন থাকবে না। বাড়িতে বললে চড় থাপ্পড় জুটবে…চুমকিদিকে ভরসা করা যায় কি? সে অন্তত জানতে চায়… প্রশ্ন করে…
চুমকিকে মানসচোখে দেখতে পাই। একটা অন্ধকার গলিপথ দিয়ে ছুটে চলেছে… প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত, রাগের, ক্ষোভের আঁচে পুড়ে যাচ্ছে শরীর, কিন্তু একইসঙ্গে দ্বিধা কাজ করছে, লোকটাকে একা কি টেনেহিঁচড়ে নামানো যায়… যদি ও একা না পারে… যদি লোকে ওকে অবিশ্বাস করে দূর দূর করে, ও আর যদি বিভাবরীতে না-ই ফিরতে পারে, তবে কি লোকটা টিটোকে আর বাঁচিয়ে রাখবে…
বিজন আর তন্ময়দা ফরেনসিকের রেজাল্ট নিয়ে আলোচনা করেন। লুমিনল টেস্ট পজিটিভ। চন্দনের রিকভারি নিয়ে কথা হয়। ডাক্তার জানিয়েছেন, আর ২৪ ঘণ্টা কাটলে চন্দন বিপদমুক্ত। জেরা করা যাবে। প্লাবনের লাশটাকে কোথায় গতি করেছিল, মিলবে তার সন্ধান। টিটোর জবানবন্দি এখনও নেওয়া সম্ভব হয়নি। ওর কাউন্সেলিং চলছে। শুনেছি, মিলি আর গৌর দত্তই ছেলেকে নিয়ে দু’বেলা দৌড়োদৌড়ি করছেন।
আমাকে আশ্চর্যজনকভাবে এসব ঘোর পাটিগণিত— চার্জশিট, ক্লজ, টেস্টিমনি, অ্যালিবাই আর আকর্ষণ করে না। আমি মোকাম্বোর লাল আলোয় মাখামাখি অভ্যন্তর থেকে বাইরের কলকাতার দিকে তাকাই। সুবেশ, সরেশ, সমুজ্জ্বল কলকাতা। অথচ যার সামনে নিজের আসল চেহারাটা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করার মতো বোকামি আর দ্বিতীয় হয় না। নিজের ক্ষত, দ্বন্দ্ব, প্রবৃত্তি থেকে নিষ্কৃতি চাইতে কারওর দিকে হাত বাড়ানো যায় না। থালায় নুনের বদলে নির্মমতার স্বাদ পেতে পেতে মানুষ ভেবে নেয়, ওই একটি প্রবৃত্তি নিয়েই সে জন্মেছে। একটা মানুষ হাত বাড়িয়ে দিলে যে নিষ্কৃতি পাওয়া যেত, সেটা না পেয়ে সে পিটার পার্কারকে বিশ্বাস করে। মুখোশের পিছনে আত্মগোপন করে। কিন্তু পিটারের মতো রূপকথার জন্ম দেয় না। মুখোশ তাকে নির্মম, নৃশংস করে তোলে। সে খুনি হয়ে ওঠে। গোবিন্দ নস্কর গতবছর মারা গেছেন, দিলীপ প্রথম মুলাকাতে জানিয়েছিল। জানতে খুব ইচ্ছা হয়েছিল, নিজের নির্যাতকের শেষ পরিণতি কি দিলীপ নিজে হাতে বেছে নিতে পেরেছিল? জানতে ইচ্ছা করে, দিলীপের আপন মা, তার সন্তানের উপর এই অকথ্য অত্যাচার নিয়ে কিছুই জানতেন না? প্রতিবাদ করেননি কোনওদিন? জিজ্ঞাসা করিনি। কিছু প্রশ্নের উত্তর অজানা থাকা ভালো।
মোকাম্বোর লালচে কমলা আলোয় দুলতে থাকে বিনোদনের পশরা। প্রায় অলৌকিক মাপের খাটে শুয়ে থাকা কৃষ্ণমোহনকে মনে পড়ে আমার। ফিরিঙ্গিপানির ফুল মনে পড়ে। মনে পড়ে কতবার, দেখা হলে বলেছেন, “কলকাতা আর আগের মতো নাই রে ছেমড়ি। বদলে গেসে বিলকুল। পচে গেসে।”
(সমাপ্ত)
.
তথ্যসূত্র:
এই বই একটি সামাজিক গবেষণার ফসল। বইতে উল্লিখিত প্রতিটি অপরাধ, সমকালীন সমাজে ঘটে যাওয়া অপরাধের কাল্পনিক বিনির্মাণ। বাস্তব অপরাধ, বাস্তব অপরাধী এবং খবরের কাগজের শিরোনাম— এসবই বইটির উপজীব্য।
ফলে কৃতজ্ঞতা জানাতে গেলে উল্লিখিত সূত্রগুলি উল্লেখ করা প্রয়োজন। পাঠক আন্তর্জালেও এই তথ্য সুলভে পাবেন।
১. ফুড ডেলিভারি এজেন্টদের কিয়দাংশের জগৎ
২. বিডিএসএম ও অপরাধ
৩. অ্যাডাল্ট-ওনলি
৪. কৃষ্ণমোহন চরিত্রের অনুপ্রেরণা
৫.পশ্চিমবঙ্গে শিশুনিগ্রহ
৬. অপরাধ থেকে অপরাধী, না অপরাধী থেকে অপরাধ
৭. আর্বান ইন্ডিয়াজ ইনভিজিবল চিলড্রেন– অ্যান এনডিটিভি রিপোর্ট
৮. দ্য ফরগটেন স্ট্রিট চিলড্রেন– অ্যাবসোলিউট ডকুমেন্টারিজ
.
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
১. সি. আই. এ টেকনিকস টু ইন্টারোগেট, ম্যাক্স ফ্লয়েড
২. কোল্ড রিডিং, ম্যাক্স ফ্লয়েড
৩. হু এভার ফাইটস মনস্টারস, রবার্ট কে রেসলার
৪. বিটার চকোলেট, পিঙ্কি ভিরানি
৫. পিডোফিলিয়া–বায়োসোশ্যাল ডিমেনশন, ফেয়ারম্যান
৬.আইজ অফ এ পিডোফাইল, বেটি কাফেল
তথ্যপ্রযুক্তিগত পরামর্শ: সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, রকি আহমেদ।

অসাধারণ!
খুব ভালো লাগলো। তবে দর্শনার চোখের উপর সেলাই হলো, কিন্তু ব্যান্ডেজ হলো না, চোখ ঢাকা পড়ল না এটা একটু অস্বাভাবিক মনে হলো।