ঘুর্ণি – ১৫

১৫

“আপনাদের এদিকটা বেশ লেপাপৌঁছা, মাকুন্দে ধরনের।”

“মানে?”

“মানে ফ্ল্যাটগুলো বেশ দূরে দূরে, অনেক গাছপালা, রাস্তার ধারে পাঁচিলগুলোতে পর্যন্ত নির্বাচনী ইস্তাহার নেই। আমি ঢাকুরিয়ায় বড়ো হয়েছি আজন্মকাল, গায়ে গায়ে বাড়ি না দেখলে কেমন অস্বস্তি হয়।”

“তাই বলে মাকুন্দে বলবেন? এটা একটা বিশেষণ হল?”

“বিশেষণের সৌন্দর্য ব্যাপারটা, ম্যাডাম আপেক্ষিক। এই যেমন আপনাকে কাল আহত সিংহের মতো লাগছিল, আজ কেমন কোমল নরমসরম দেখাচ্ছে। সেটা অবশ্য এই ভোরবেলার আলোছায়ায়… কী যেন বেশ বলে…”

“কিয়োরোস্কউরো।”

বিজন একগাল হেসে আমার দিকে তাকালেন। ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজে। আমি সপ্রশ্ন ওর দিকে তাকালাম। আধঘণ্টা আগে ফোন করে বলেছেন, আসছেন। জরুরি দরকার আছে। কিন্তু আসার পর দু’কাপ চা খাওয়া ছাড়া আর কোনও কাজ হয়নি।

“আপনার কি কাল নাইট ছিল?”

“ছিল না। হয়ে গিয়েছিল। ফরেনসিকের একটা রিপোর্ট আসতে দেরি করল। সেইসব নিয়ে ফেঁসেছিলাম।”

“বলুন। আমার একটু তাড়া ছিল।”

বিজন চায়ের কাপটা ডাস্টবিনে ফেললেন। রুমালে মুখ মুছে কীসের যেন প্রস্তুতি নিলেন।

“আপনার কালকের খবরটা তন্ময়দাকে বললাম। সাগরের পুজোর সময় না থাকার ব্যাপারটা…

“হুম। ব্যাপারটা কিন্তু ওর এমপ্লয়ারও ভেরিফাই করেছে।”

“বুঝেছি। কিন্তু টুম্পার জবানবন্দিটা তন্ময়দা আর-একবার খুঁটিয়ে পড়তে বললেন। ওতে আসলে লেখা, নবমীর দিন টুম্পা, চুমকির গলায় দাগ দেখেছিল। তার মানে এই নয় যে নবমীর দিনই ও অ্যাসল্টেড হয়েছিল।”

বিজন আমার দিকে তাকালেন। আমার ঠোঁটের কোণে বোধহয় হাসি এসে গিয়েছিল, সেটা সামলে বললাম, “আর কী বললেন?”

“এই যে জিঙ্গোর ফুলস্লিভ জামা পরে থাকলে বডিতে ডিফেন্সিভ উন্ড না-ও থাকতে পারে। মুখে না থাকাটা রেয়ার, তবে অসম্ভব নয়। হয়তো মাস্ক পরে ছিল…’

“সিসিটিভি ফুটেজে কি মাস্ক ছিল?”

বিজন মাথা ঝাঁকালেন। চায়ের কাপের উপর বিজবিজ করে একটা মাছি ঘুরছিল, আমি সেটা তাড়িয়ে বললাম, “বিজন, আমি জানি না আপনি নিজে তন্ময় সামন্তর কথা কতটা বিশ্বাস করেন। তবে কথাগুলো বলতে এই ভোর-

সকালে যখন ছুটে এসেছেন, তখন বুঝতে পারি আপনার উপর কথাগুলো বিশ্বাস করার একটা চাপ আছে। তন্ময়বাবু কোনওভাবেই চুমকি হত্যার দায় থেকে সাগরকে মুক্ত করতে চান না। আমারও আলাদা করে কোনও দুর্বলতা নেই কিন্তু। আমি কিন্তু এখনও মনে করি সাগর, চুমকির খুনি হতেই পারে।”

বিজন হাসলেন। বললেন, “আপনি শুধু চাপটাই দেখছেন, এটা ভাবছেন না যে আমাদের মুভগুলো আপনাকে না বললেও আমার কিছু এসে যায় না। সাগর যদি চুমকির খুনি না হয়, তবে কে, এই প্রশ্নটা আপনিই আমার মাথায় ঢুকিয়েছেন। সাগর একটা সম্ভাবনা, কিন্তু একমাত্র নয়। এটা আপনার সঙ্গে সঙ্গে আমিও ভাবি। না হলে এত কথা বলতাম কি?”

বিজন আমাকে অপ্রস্তুত করে ফেললেন। সেটা কাটাতে বললাম, “সাগরের ফেসবুক প্রোফাইল দেখেছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“এই ছবিটা দেখেননি?”

বিজন সাগর-চুমকির ছবিটা জুম করে দেখলেন।

“ক্যামেরার টাইম-স্ট্যাম্পটা খেয়াল করুন।”

“বাইশে অক্টোবর, সকাল সাড়ে দশটা।”

“বুঝতে পারছেন না? ওইদিন সপ্তমী ছিল। মেয়েটার গলাটা খেয়াল করুন। স্পটলেস।”

“ওহ্!”

পাটুলির ঝিলের উপর দিয়ে এক ঝাঁক পাখি উড়ে গিয়ে মেট্রো স্টেশনের পিছন দিকটায় চলে গেল। লাগোয়া লোকাল ট্রেনের প্ল্যাটফর্মের দিকে অনেক

গাছপালা। এই সময় পথে হাঁটেন অনেকেই। পরিচ্ছন্ন রাজপথ, পলাশ নেই, তবে কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে। এখনও ফুল আসেনি। চায়ের দোকানে সাইকেল আরোহীদের ভিড় বাড়ছিল। ক্রিং করে বেল বাজিয়ে দশটা দুধের প্যাকেট দিয়ে গেল দোকানিকে। স্টোভের কেরোসিন বাষ্প, আর গতকালের বাসি চা-পাতার মজে যাওয়া গন্ধ মিলিয়ে একটা হাওয়া দিল, তাতে পরের চা-টা আর খেতে ইচ্ছা করল না। একটা ঘেঁয়ো কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে ছিল, তাকে বিস্কুট খেতে দিলে শুঁকে মুখ ফিরিয়ে নিল। বিজন একটা সিগারেট ধরালেন।

“সাগর যে মুদির দোকানে কাজ করত, ওটায় ভিজিট করেছিলেন?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

“হ্যাঁ। ও তো আমার বাড়ির কাছে। ওখানেই প্রথম গিয়েছিলাম ওকে তুলতে।”

“কী বুঝলেন?”

“কী বুঝব! দোকানে আরও একটি ছেলে কাজ করে, সে বলল সাগর কাজে আসেনি। পেয়ারাবাগানেও নেই। তারপর তো পুরুলিয়া গেলাম।

আপ সোনারপুর লোকালের সময় হয়ে গিয়েছিল। বিজন হাতের ঘড়ি দেখে উসখুস করে বললেন, “আপনার লজিক বিসর্জন দিতে পারছি না দর্শনা। দুই নৌকায় পা দিয়েই চালাব, যতটা সম্ভব। তবে আমার শিরদাঁড়া স্টিলের নয়। কলেজে টুকটাক রাজনীতি করতাম, আসলে বেজায় ভিতু। চাকরি বাঁচাতে আর প্রোমোশন পেতে আগ্রহী। বুঝতেই পারছেন।”

ঘেঁয়ো কুকুরটা নিজের লেজটাকে কামড়ানোর চেষ্টায় ছিল। ওটার মুখের কাছে আরও দুটো বিস্কুট রেখে বিজন চলে গেলেন। কুকুরটা শুঁকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। লোকটাকে কতটা বিশ্বাস করা যায়, বুঝছিলাম না। ওঁদের পক্ষের খবরগুলো আমায় না দিলে কিছু যায় আসে না— কথাটা আংশিক ঠিক। আমি পরিবর্তে ওঁকে কী জানাচ্ছি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

অতনু চক্রবর্তী মেসেজ করে জানিয়েছেন, প্রতিটা জোনে দুই থেকে তিন হাজার ছেলে ডেলিভারির কাজ করে। আমি ঠিক কার নম্বর চাইছি সেটা না বললে ওদের পক্ষে আমার অনুরোধ রাখা সম্ভব নয়। ভেবেচিন্তে পেয়ারাবাগান বস্তির কাছাকাছি ঠিকানা এমন কোনও ডেলিভারি এগজিকিউটিভের নম্বর চেয়েছিলাম। অতনুবাবু স্বর্ণাভ বেরা নামের একজনের নম্বর পাঠিয়েছিলেন, বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে বাড়ি। ছেলেটির শিফ্‌টও রাতের। বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে আমার জন্য দাঁড়াবে বলেছিল সকাল আটটা নাগাদ। বিজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বেশ খানিকটা দেরি হয়েছিল, আমি দ্রুত স্নান করে রওনা হলাম।

স্বর্ণাভ বিকম পড়ে। বাইশ-তেইশ বছর বয়স। সাগরের থেকে ছোটোই হবে। সাগরকে চেনে, আগেই ফোনে জানিয়েছিল। বালিগঞ্জ স্টেশনের ওভারব্রিজের উপর দেখা হল। আমি প্রশ্ন করার আগেই ছেলেটা আমায় প্রশ্ন করল।

“সাগরদাকে কে মারল কিছু জানা গেল?”

“তদন্ত চলছে। তুমি কতদিন ধরে চিনতে ওকে?”

“অনেক দিন। আগে তো আমার কাছাকাছি থাকত। পরে জিঙ্গোতে জয়েন করে দেখি, ও-ও আছে।”

“তোমার সঙ্গে খুব ক্লোজ ছিল?”

স্বর্ণাভ মাথা নাড়িয়ে বলল, “না ম্যাডাম। সাগরদা খিটমিট মেজাজের ছিল। একটু রুড ধরনের। সবাই ওকে এড়িয়ে চলতাম। আমার সঙ্গেও ওই যা একটু আগের পরিচয়ের সুবাদে খাতির ছিল।”

“কোনও বিষয়ে আলাদা আগ্রহ, অন্য কোনও কাজের কথা এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে কোনওদিন?”

“অন্য কোনও কাজ? কখন করবে? এই ডেলিভারিতেই সারাদিন কেটে যায়।”

আমি ছেলেটাকে সাগরের প্রাইম টাইমে লগ আউট করার কথা জানালাম। মাথা চুলকে বলল, “কে জানে এমন কেন করত ম্যাডাম, ইনসেনটিভ প্রচুর কমে যাওয়ার কথা। আমরা তো হাজার কাজ থাকলেও ওই সময়ের ডেলিভারি মিস করতে পারি না।”

স্বর্ণাভর কাছ থেকে আর কিছু জানার ছিল না। যাওয়ার আগে ও বলল, “সাগরদার সঙ্গে লাস্ট দেখা হওয়ার দিন ভুলতে পারব না।”

“কেন, কী হয়েছিল?”

“সেরকম কিছু নয়। সেদিন একটা রেস্টুরেন্টের সামনে আমরা দু’জনেই দাঁড়িয়েছিলাম। পেপারে বেরিয়েছে কোন একটা সুইগির ছেলে কাস্টমারের খাবার মেরেছে। ইয়ার্কি মেরে সাগরদার ব্যাগটার ঢাকনা খুলে বলেছি, দেখি শালা, তুমিও কারওর খাবার মেরেছ নাকি। তাতে ও ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে প্রচুর মুখ খিস্তি করেছিল। শাঁসিয়েছিল, আমি যেন কোনওদিন ব্যাগে হাত না দিই। শেষদিনের স্মৃতিটা অমন না হলেই ভালো হত।”

.

বালিগঞ্জ ওভারব্রিজ থেকে দুটো সিঁড়ি দু’দিকে নেমে গেছে। আমি গড়িয়াহাটের দিকটায় পা চালালাম। হাতে মাত্র একটা ব্লু, সাগরের সিডিআর টাওয়ার লোকেশন। প্রথমটা রাসবিহারীতে। কাছেই। আর্বান এরিয়ায় ঘন ঘন টাওয়ার থাকায়, এগজ্যাক্ট লোকেশন পাওয়া সুবিধে হয়। রুরাল হলে একটা টাওয়ার লোকেশনে কখনও কখনও পাঁচ-সাত কিমি এরিয়া পড়ে যায়। উপায় একটাই। সাগরের ছবি দেখিয়ে টাওয়ার সংলগ্ন অঞ্চলে ওকে কেউ চেনে কি না খুঁজে দেখা। লেক মার্কেটের কাছাকাছি এরিয়ায় টাওয়ার দেখাচ্ছে। সাগর এদিকে

খাবার ডেলিভারি করতে আসেনি সেটা নিশ্চিত। আবার ব্যক্তিগত কাজের জন্য অনেক সময় নিয়ে এসেছে, এমনটা নয়। তা হলে এক ঘণ্টার মধ্যে ফ্রেশ লগ ইন করত না।

আমি লেক মার্কেট সংলগ্ন ফুলের দোকান, স্টেশনারি, ইলেকট্রিকের দোকান, লন্ড্রি সর্বত্র সাগরের ছবি দেখালাম। অর্ধেক লোক ভালো করে ছবি দেখতে চায় না। আই কার্ড দেখালে ঢোক গিলে দেখে। তবুও উত্তর ‘না’ এল।

এর পরের গন্তব্য কসবা বোসপুকুর। টাওয়ার দেখাচ্ছে ডিআইঅফিস, কসবা। এ তল্লাট লেক মার্কেটের মতো কমার্শিয়াল নয়। সরকারি অফিস আর আবাসনে ভর্তি। সরকারি অফিস সন্ধেবেলা বন্ধ থাকে। আবাসনের সিকিউরিটি গার্ডরা ছবি খুঁটিয়ে দেখল, কিন্তু সাগরকে কেউই চিনতে পারল না।

ক্যাবের বিল হু হু করে চড়ছিল। যাদবপুর, ঢাকুরিয়াসহ পনেরোটা লোকেশন সারা হয়ে গেছে। সাগরকে কেউ চেনেনি। চিনবে এমন ক্ষীণ আশাটুকু না রাখাই ভালো। লোকেশন রিপিট হলে তাও একটা সম্ভাবনা ছিল। হাতে আর মাত্র একটা দিন। পুরুলিয়া ফিরতে হবে। মন বলছে, এই টাকাপয়সার অসঙ্গতির ব্যাপারটা খুঁচিয়ে দেখা দরকার। অথচ দিন শেষ হতে চলল, লিড নেই। ক্যাবকে লাস্ট লোকেশন দিলাম রুবি হাসপাতাল।

আমার ভালোবাসার ১০৮ নম্বর মোড়ের ডান দিকে রাস্তা ক্রস করলেই অনেকগুলো গুমটি। পান, কোল্ড ড্রিংকের দোকান। রুবি হাসপাতালের উলটো ফুটে ওষুধের দোকান। প্রথমে দোকানগুলোতে খোঁজ নেব ঠিক করেছিলাম। খোঁজ না পেলে একটা অপশন বাঁচে, আগামিকাল আবার লোকেশনগুলোতে গিয়ে ট্র্যাফিকের থেকে ওই দিনের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাওয়া। একটা টিম দরকার। একার কাজ নয়। এসিপি পুরকায়স্থকে বলে কতটা কাজ হবে জানি না, তবে মনস্থির করলাম এটা শেষ না করে আমি কলকাতা ছাড়ব না।

ওষুধের দোকানগুলো নিরাশ করল। কোল্ড ড্রিংকের দোকানের সামনে ভিড়। ঠেলে ঠুলে দোকানির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। সাগরের ছবিটা মোবাইল থেকে বের করে ধরতে ছেলেটা ভুরু কুঁচকে তাকাল। হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ ভাবল, তারপর বলল, “হ্যাঁ দেখেছি মনে হচ্ছে। স্প্রাইট কিনেছিল। খুচরো ছিল না। অন্য এক কাস্টমার ইউপিআই করে দিল।”

“অন্য কাস্টমার টাকা দেবে কেন!”

“তা জানি না। দু’জনে চিনত বোধহয় দু’জনকে। কথাবার্তায় মনে হচ্ছিল।”

“সিসিটিভি আছে দোকানে?”

ছেলেটা সুদৃশ্য র‍্যাকের উপর সিসিক্যামের দিকে নির্দেশ করল। সিডিআর বলছে, এই লোকেশনে সাগর এসেছে ২২ ফেব্রুয়ারি। সময় সন্ধে সাড়ে আটটা।

“সিসিটিভি ফুটেজ দেখব।” ছেলেটাকে বললাম। ছেলেটা ওর মোবাইলে ইনস্টলড অ্যাপ খুলে এগিয়ে দিল। রেকর্ডেড স্ক্রিন দেখাচ্ছে সাগরকে। বেগুনি রঙের ইউনিফর্ম। ক্লান্ত চেহারা। পাশেই একটি চেক শার্ট পরা অল্পবয়স্ক ছেলে। ফরসা, ছিপছিপে, এক মাথা চুল। তাকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “এ?”

“হ্যাঁ। এই ছেলেটাকে আগেও দেখেছি। আমার দোকানে আগেও এসেছে।”

“নামধাম জানেন?”

“না, না। এদিকে অনেক কলেজ, কোনও একটায় পড়ে। এরকম তো কতই আসে। তবে এ শুধু ডায়েট কোক নেয়। আর সিগারেট নিলে শুধু ডানহিল সুইচ। তাই একে চিনি।”

“সেদিনও কিছু কিনেছিল?”

“হ্যাঁ। এক প্যাকেট ডানহিল সুইচ।”

“কীভাবে পেমেন্ট করেছিল?”

কোল্ড ড্রিংক-বিক্রেতা এবার আমার প্রশ্নে বিরক্ত হচ্ছিল। দোকানে কাস্টমার জমছে। আমি ওর বিরক্তিকে উপেক্ষা করে বললাম, “ক্যাশ না ইউপিআই?”

“মনে নেই।” ছেলেটা আমাকে এড়াতে বলল। আমি সিসিটিভি রেকর্ডিং আর-একটু ফরোয়ার্ড করে দেখলাম, ছেলেটা মোবাইল তুলে স্ক্যান করছে।

“আপনার পেমেন্ট হিস্ট্রিটা দেখব।” আমি ছেলেটাকে বললাম।

“আরে এ তো আচ্ছা মুশকিল হল।”

“মার্ডার কেস। ফাস্ট।”

দোকানির মুখে একটা উদ্বেগের ছাপ পড়ল। ফোনে ফোনপের পেমেন্ট হিস্ট্রি খুলে আমার হাতে দিল। সারা দিনে অজস্র ট্রানজ্যাকশন। কিন্তু সিসিটিভির টাইম স্ট্যাম্প অনুযায়ী ওই সময় একটাই নম্বর থেকে ট্রানজাকশন হয়েছে। ৯৮৪১৯২৪২৪২। প্রমিত দত্তের নামে রেজিস্টার্ড। ডিপিতে একই মুখের ছবি।

নম্বরটা আর ট্রানজ্যাকশনের ছবি তুলে দিব্যকে ফরোয়ার্ড করলাম। ওর তিনটে কাজ। সার্ভিস অপারেটার থেকে ছেলেটার অ্যাড্রেস বের করা, একটা সিডিআর চাওয়া আর সাগরের লগ আউট টাইম এবং লোকেশনের সঙ্গে ছেলেটার সিডিআর ম্যাচ করা। কাজটা আনঅফিশিয়ালি করতে হবে ওকে। একটা সুতোর মতো ক্ষীণ আশা দিনের শেষে আমায় স্বস্তি দিল। দোকানিকে এ ব্যাপারে টু শব্দ না করার হুঁশিয়ারি দিয়ে বেরিয়ে এলাম। রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে দেখলাম রবি ঠাকুরের মোড়ের রবীন্দ্রনাথ স্ট্যাচুবদ্ধ হয়ে একা একা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে ঘিরে যাবতীয় আনাগোনা। ক্লিশে হলেও, এই মুহূর্তে আমার একটাই গান মনে পড়ল, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।’ কে বলে রবীন্দ্রনাথ শুধু জুঁইয়ের মালা, হারমোনিয়াম আর তারকাখচিত সভাগৃহের? আমার মতো ধ্বস্ত, ক্লান্ত লোকেদের জন্যও তিনি আছেন, থাকবেন।

১৬

গিজারের জল আজ একটু বেশিই গরম হয়ে গিয়েছিল। হাতে-পায়ে ছ্যাঁকা লাগল। বাইরের ঘরে টিভিতে সংবাদপাঠিকা মোলায়েম স্বরে খবর পড়ছিলেন। মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপনী ঝংকার ভেসে আসছিল। ইমামি হেলদি অ্যান্ড টেস্টি, বোরোলিন আর পন্ডস-এরগুলো চোখ বন্ধ করে চেনা যায়। বাকি জিঙ্গলগুলো চিনি না।

গতকাল থেকে ইনবক্স চেক করা হয়নি। অনেকগুলো মেসেজ জমেছিল। অফিস থেকে লিখে পাঠিয়েছে, বিরজুর ফেসবুক প্রোফাইল পার্মানেন্টলি ডিলিটেড। কোন নম্বর ব্যবহার করে ফেসবুক প্রোফাইল খোলা হয়েছিল জানার চেষ্টা চালাচ্ছে। খোচরদের কাছে অজ্ঞাত আততায়ী সম্পর্কে কোনও খবর এখনও অবধি নেই। সিসিটিভি ফুটেজ ঘেঁটে এটা বোঝা যাচ্ছে না, সাগরের খুনি কীভাবে পালাল। বড়োবাবু এককারি সরকারি ডকুমেন্ট পাঠিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে বলেছেন। এসপি অফিসে জমা পড়বে। “পরশু ফিরছ তো” বলে এদিককার পাট তাড়াতাড়ি গোটাবার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অপরাজিতার মেসেজ, কলেজ বন্ধুদের গ্রুপ মেসেজ স্ক্রল করে একটা মেসেজে এসে স্থির হলাম। নিরঞ্জনের উকিল মেসেজ করেছেন, কাল কোর্টে শুনানি আছে। নিরঞ্জন জানতে চেয়েছেন, আমি আসছি কি না। ফোনটা আচমকা উষ্ণ হয়ে উঠল হাতে। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কী হল যাবে? উত্তর পেলাম না।

ব্রেকফাস্টে আজকে ব্রেডটোস্ট, কলা। নিজে হাতে যেটুকু বানিয়ে নেওয়া যায়। অপরাজিতার কিচেন ছোটো কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ। পাউরুটিতে কামড় বসিয়ে দেখলাম মুচমুচে হয়েছে। আজকের পরিকল্পনা ছকে ফেলা দরকার। দিব্যর সার্ভিস প্রোভাইডারকে ম্যানেজ করতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। সমস্যা তখনই হবে, যখন এই লিংকটা কাকতালীয় হবে। অপেক্ষা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সময় নেই। বরং আজ দিনের শুরুটা ষোলোটা লোকেশনের ট্র্যাফিকের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা থেকে শুরু করা যেতে পারে। বাইক আছে যখন সিগন্যালে ধরা পড়বেই। গতিবিধিটা বোঝা যাবে।

মন বলছে, সাগরের এই অস্বাভাবিক গতিবিধি শুধু শহরে নয়, শহরের বাইরেও রয়েছে। সিডিআরে গত বছর পুজোর সময়কার টাওয়ার লোকেশন মুম্বই দেখাচ্ছে। মূলত পালঘর, নান্দোরে, কামারে এই সব এলাকা। কোনওটাই টুরিস্ট স্পট নয়, তার থেকেও বড়ো কথা জায়গাগুলো নিকটবর্তী। সাগর কোনও কাজের সূত্রে গিয়েছিল বোঝা যায়। মুম্বইতে পাকাপাকি চলে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা বাড়ির লোকেদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল। যে-কোনও টেলিকম কোম্পানি দু’বছরের বেশি সিডিআর, সার্ভারে স্টোর করে না। গত বছর বা তার আগের বছরের লোকেশন ডিটেইল ঘাঁটলে সাগরকে হয়তো পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আরও কিছু জায়গায় চিহ্নিত করা যেতে পারে।

টিভিতে সংবাদপাঠিকার গলার আওয়াজ হঠাৎ মোলায়েম থেকে বদলে কাঁসর-ঘণ্টার মতো হয়ে গেল। চোখ ফিরিয়ে দেখলাম, টিভি ২৪/৭-এর পরদায় খবরটা ভেসে আসছে— পেয়ারাবাগান বস্তির বাসিন্দাদের কাছে অবশেষে স্বস্তির খবর। স্বস্তিকা কনস্ট্রাকশন সাইটে, কোর্টের নির্দেশে বন্ধ হল নির্মাণকার্য। এই আবাসন কমপ্লেক্স তৈরি হওয়া কালীন এর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সম্পর্কে দর্শক ইতিমধ্যে অবগত। স্থানীয় বাসিন্দা চুমকি প্রামাণিকের মৃতদেহ আবিষ্কারের পর, আবাসনটি নিয়ে দানা বেধেছিল নানা বিতর্ক। পুকুর ভরাট করে অবৈধ নির্মাণ তোলার অভিযোগ করেছিলেন পেয়ারাবাগান বস্তির বাসিন্দারা। অবশেষে জলাদর্শ নামে এনজিও-র তরফে করা জনস্বার্থ মামলায় সমস্ত নির্মাণকার্য স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে গ্রিন ট্রাইবুনাল। আমাদের স্টুডিয়োয় উপস্থিত আছেন, জলাদর্শের চেয়ারম্যান শ্রীমতী নীতি মুখোপাধ্যায়, নিহত চুমকি প্রামাণিকের কাকা শ্রী কানাই প্রামাণিক এবং স্থানীয় বাসিন্দা মেহতাব ওরফে ছিটকু। প্রথমেই যাব নীতিদেবীর কাছে…

আমি রিমোট বাড়িয়ে টিভির ভলিউম কম করলাম। বড়োবাবুর পাঠানো ডকুমেন্টের কথা মনে পড়ল। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহকে হরিয়ালি ধরিত্রীমাতা সপ্তাহ বলে ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রালয়। এই অবস্থায় এই রায় আসবে এটাই স্বাভাবিক। ঠোঁটের কোণে একটা হাসি এসে গেল। এই দেশে পূর্ব নির্দিষ্ট ব্যাপারগুলোকে আজকাল চিহ্নিত করতে পারি। মেহতার এবার ভাগ্যটা খারাপ। এককালে ব্যাবসা করতে গেলে পর্যবেক্ষণ লাগত। কিন্তু এক লোকশ্রুতির অলৌকিক গল্পকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে প্রতিষ্ঠা করে ফেলে ফ্ল্যাটের চাহিদা ও দাম বাড়িয়ে ফেলা— একে পর্যবেক্ষণ শুধু নয়, দূরদর্শিতা বলে। মেহতার দূরদর্শিতা এবার ব্যাকফায়ার করেছে।

চায়ে চুমুক দিয়ে মনে পড়ল, পুরকায়স্থস্যার কলকাতা ছাড়ার আগে লালবাজারে একবার দেখা করে যেতে বলেছেন। অথচ আমি ম্যানপাওয়ার চেয়ে যে সাহায্য চেয়েছিলাম, সে-বিষয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। বিজনও কালকের পরে আর যোগাযোগ করেননি। আমার তরফে মেসেজ করা হয়নি। অসৌজন্য হচ্ছে কি না ভাবার সময় নেই। হাতে অনেকটা কাজ, একাই করতে হবে। বড়োকর্তাদের গোটা পরিস্থিতি বুঝাতে গেলে হাতে কিছু শক্তপোক্ত প্ৰমাণ থাকার দরকার।

ফোনে টুং করে নোটিফিকেশন ঢুকল। একটা মেসেজ। দিব্যর কী! আমি দুরুদুরু বুকে হোয়াটসঅ্যাপ খুললাম। দিব্যরই মেসেজ! ও লিখে পাঠিয়েছে, গুড মর্নিং ম্যাডাম। ইটস এ ম্যাচ!

প্রমিতের সিডিআরের কপি ছাড়াও ও একটা এক্সেল শিটে সাগর আর প্রমিতের ডেটা ম্যাচ করিয়ে একটা রিপোর্ট বানিয়ে পাঠিয়েছে। ষোলোটা লোকেশনের মধ্যে ছ’টাতে প্রমিত দত্তর সঙ্গে সেল টাওয়ার মিলছে সাগরের। বাকি দশটায় কোশ্চেন মার্ক। আমি খুশিতে টেবিলে হাত চাপড়ে উঠলাম। এই মিল কাকতালীয় কোনওভাবেই হতে পারে না পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। সাগর প্রমিতের সঙ্গে একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বার বার দেখা করেছে। সময়টা সামান্য। যাতায়াত বাদ দিলে মুলাকাত পাঁচ মিনিটও স্থায়ী হয়েছে কি না সন্দেহ অথচ দেখা প্রায়শই হয়েছে, কোল্ড ড্রিংকের বিল মেটানোর মতো ঘনিষ্ঠতাও আছে। বাকি দশটা লোকেশনে যেখানে প্রমিত নেই, সেখানে সাগর অন্য কারওর সঙ্গে দেখা করেছে। একই রকম অল্পসময়ের জন্য। প্যাটার্নটা চেনা লাগছে এবার, তবে আর-একটু গভীরে না গেলে অথৈ জলে মাছ পালানোর সম্ভাবনা।

এক্সেল শিটের নীচে দিব্য ছেলেটির বাড়ির অ্যাড্রেস লিখে পাঠিয়েছে। বিভাবরী অ্যাপার্টমেন্ট, কর্নফিল্ড রোড, কলকাতা ১৯। কর্নফিল্ড রোড মানে একডালিয়া এভারগ্রিন ক্লাবের কাছে। অভিজাত জায়গা। প্রমিত দত্তের সিডিআরে ক’টা রো দিব্যর হাইলাইট করা। সেটা মিলিয়ে দেখে বুঝলাম, ছেলেটা নির্ঘাত পায়োনিয়র ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি নামের কালিকাপুর স্থিত কোনও এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের স্টুডেন্টে। সপ্তাহের পাঁচ দিন এগারোটা টু তিনটে, কখনও চারটে অবধি লোকেশন স্ট্যাটিক। ঘড়িতে এখন সাড়ে দশটা। এখন গেলে ছেলেটাকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে।

কালিকাপুরগামী বাসে ভিড় বেশ। বাইপাস জুড়ে অসংখ্য কর্পোরেট হাসপাতাল, স্কুল, কলেজের কর্মী, পড়ুয়া, পড়ুয়াদের অভিভাবকের ভিড়ে একটা সিট কোনওমতে জুটেছিল। প্রায় ঘাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন এক অল্পবয়স্ক মা, তার এক হাতে খুদে ছানা, আর-এক হাতে গোটা তিন পলিব্যাগ ভর্তি পেনসিল বক্স। বাচ্চাটিকে বসিয়ে প্যাকেটটা নিজেই হাত বাড়িয়ে চাইলাম। আসন্ন জন্মদিন উপলক্ষ্যে রিটার্ন গিটের ব্যবস্থা, তরুণী নিজেই জানালেন। বাসের বুকে নানা গন্ধ থাকে। ছোটোবেলায় বাসে উঠলে পেট্রোলের ঝাঁঝে বমি পেত। তারপর বড়ো হলে পানের পিক, দোক্তা মশলা, আতর, টিফিন বক্স খুলে খাওয়া ডিমের ওমলেট, ঘুগনি-মুড়ি, বাসি রুটি, সিগারেট আর মায়ের গায়ের চেনা গন্ধ সব ক’টাই আলাদা আলাদা চিনতে পারতাম। এই বাসটা তেমন নয়। এসি চলছে ফলে হাওয়ায় একটা যান্ত্রিক গন্ধ। শীতল, শান্ত। মানুষ একমনে মোবাইল দেখছেন। পায়োনিয়র ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং বলে হেঁকে কন্ডাকটর এমন একটা জায়গায় দাঁড় করালেন, যেটা বাইপাসের থেকে পূর্বদিকে প্রায় চারকিমি। অটো ছাড়ে, দেখিয়ে দিলেন এক ভদ্রলোক। চারজন সওয়ারি নিয়ে অপেক্ষা করে অটো ছাড়ল পনেরো মিনিট পর।

পায়োনিয়রের গেটটি রাজকীয়। রাজভবনে যেমনটি দেখে আমরা অভ্যস্ত ছোটোবেলা থেকে, হুবহু সেটির রেপ্লিকা। অফিসে প্রমিতের নাম আর ফোন নম্বর দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই, দাপ্তরিক সিস্টেম ঘেঁটে জানালেন, প্রমিত দত্ত, মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের, তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগটি কলেজের দক্ষিণতম প্রান্তে। বিশাল মাপের ওয়ার্কশপের পাশে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ঝাঁ-চকচকে। আসার পথে মোবাইলে পড়ে এসেছি প্লেসমেন্টও খুব ভালো। প্রাইভেট কলেজ, কিন্তু জেইই মেনে ভালো স্কোর এবং পকেটে টাকা না থাকলে ভর্তি হওয়া যায় না। প্রমিত ক্লাস করছিল। প্রিন্টার মেশিনের ক্রমাগত বিপ বিপ শব্দ জানান দিচ্ছিল, কলেজে এখন ব্যস্ততম সময়। একটু পরে যে তরুণ আমার কাছে এসে দাঁড়াল, নিশ্চিত হলাম একেই সিসিটিভিতে দেখেছি। চৌকো ধরনের মুখে দু’-তিনদিনের না- কামানো দাড়ি, আর একমাথা এলোমেলো চুল— বয়সের তুলনায় পরিণত চেহারা। সামান্য লালচে ভাব চোখে, আর চোখের মণি সাধারণের চেয়ে বড়ো। ঠোঁটের কোনায় লক্ষ করলে একটা কালশিটে চোখে পড়ে। কয়েকদিনের পুরোনো কিন্তু নীলচে ভাবটা মেলায়নি।

প্রমিত চুলের মধ্য দিয়ে হাত চালাল। লক্ষ করলাম, ওর চওড়া কপালের ডানদিকের এক কোণে আর একটা ক্ষত। লম্বাটে। নখ দিয়ে চিরে দিলে যেমন হয়। আমার দিকে তাকিয়ে ছেলেটা বলল, “হ্যাঁ বলুন? কী ব্যাপার?”

“আমি বাঘমুণ্ডি থানার এসআই দর্শনা বোস। একটা কেসের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।”

“বাঘ… হোয়াট? এটা কোথায়?” প্রমিত হেসে ফেলল।

“পুরুলিয়া।”

“বাপ রে!” প্রমিতকে একটু দ্বিধাগ্রস্ত দেখাল, যেন ও আমার আসার উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারছে না।

“সাগর মণ্ডল নামের কাউকে চিনতেন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

ছেলেটা চমকে তাকাল। কিন্তু মাত্র এক-দু’সেকেন্ডের বিচল, ও নিজেকে স্থির করে নিল। গলায় জোর এনে বলল, “না।”

“জিঙ্গো বলে একটা ফুড ডেলিভারি অ্যাপে কাজ করত। এই ছেলেটি…” আমি মোবাইল খুলে সাগরের ছবি বের করে প্রমিতের মুখের সামনে তুলে ধরলাম। প্রমিত ছবিটার দিকে না তাকিয়েই আমাকে বলল, “বললামই তো চিনি না।”

“এই ছেলেটি গত আঠাশে ফেব্রুয়ারি পুরুলিয়াতে খুন হয়েছে।” আমি প্রমিতের দিকে তাকিয়ে বললাম। ওর মুখে ভাবান্তর হল না। দেখে মনে হল, সাগরের মৃত্যুর খবর ওর কাছে ইতিমধ্যেই আছে। তবু গলায় বিস্ময় ঢেলে ছেলেটা বলল, “ওহ মাই গড!”

আমি মনে মনে স্থির করে এসেছিলাম প্রমিতকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখিয়ে সতর্ক করব না। যা সন্দেহ করছি, তা যদি সত্যি হয়, প্রমিতকে সতর্ক করার মানে জেতা গুঁটি কেঁচে যাওয়া। নিজের গলায় যথাসম্ভব দ্বিধা ঢেলে বললাম,

“আসলে ওর কল লিস্টে আপনার নম্বরটা দেখাচ্ছে। আমরা সবাইকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।’

প্রমিত চমকে নিজের মোবাইলে হাত দিল। সাগরের কল লিস্টে প্রমিতের নম্বর নেই। সম্ভবত ইন্টারনেট কলে যোগাযোগ হত। আমার কথায় ওর বিস্ময় আর উদ্বেগ হওয়া স্বাভাবিক। গলায় সংশয় ঢেলে ও আমাকে বলল, “আমার নম্বর?”

“হ্যাঁ। ৯৮৪১৯২৪২৪২। এটা আপনার নম্বর তো?”

“হ্যাঁ।”

“আপনি কি কোনওসময় খাবার অর্ডার করার জন্য ওকে কোম্পানির ফ্রি কলে না করে, ব্যক্তিগত নম্বরে করেছিলেন? দুটোরই অপশন থাকে তো আসলে?”

প্রমিতের মুখে একটা স্বস্তির ছাপ পড়ল। যেন অজুহাত দেওয়ার নির্দিষ্ট উপায় খুঁজে পেয়েছে। হালকা হেসে বলল, “তা হতে পারে। আমার মনে নেই।”

“না মনে থাকাটাই স্বাভাবিক। আসলে সিডিআরে আছে, আপনাকে তাই বিরক্ত করে ফেললাম।” আমি একটু হেসে বললাম।

“না, না ঠিক আছে।” প্রমিত কাষ্ঠ হেসে বলল।

“আপনি থাকেন কোথায়?”

“কনফিল্ড রোডে।”

“ওহ্! কসবা, যাদবপুর, রুবি এদিকগুলোও যাওয়া হয় বুঝি?”

প্রমিতের চেহারায় ফের সংশয়ের ছাপ পড়ল।

“কেন বলুন তো?”

“আসলে কলটা আপনার মোবাইল থেকে এসেছে, যখন ও কসবায়। তাই ঠিক বুঝছি না, আপনি ঠিক কোথা থেকে অর্ডার করেছেন।”

“না, ওসব দিকে যাই না।” প্রমিত গলা খাঁকরে বলল, “কলেজের পর সময় থাকে না। বাড়ি থেকেই অর্ডার করেছি। কসবার কোনও রেস্টুরেন্টের হবে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ তা-ও ঠিক।” আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, “ঠিক আছে প্রমিত, আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। অনেকটা সময় দিলেন। ধন্যবাদ।”

ও ঘড়ি দেখে বলল, “না, ঠিক আছে।”

“দরকারে আবার আপনাকে বিরক্ত করতে পারি কিন্তু।” আমি হেসে বললাম।

“আমি থাকছি না। আজই কলেজের পর সেমিনারের জন্য শিলিগুড়ি যাচ্ছি।”

“ফোন তো নিয়ে যাচ্ছেন?”

“হ্যাঁ, তা যাচ্ছি।”

প্রমিত ফের চুলের ভিতর দিয়ে হাত চালাল। আমি ওর কপালের দিকে নির্দেশ করে বললাম, “এটা কীভাবে হল?”

প্রমিত চমকে কপালে হাত দিল। “ও কিছু না। পড়ে গিয়েছিলাম।”

“কোথায়?”

“রাস্তায়। বাইক থেকে।”

“আহা! ঠোঁটের কাছেও চোট পেয়েছেন তো।”

“হ্যাঁ।”

প্রমিত ঘন ঘন মোবাইল দেখছিল। ওকে বিদায় দিয়ে অফিসের দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু পিছনে না ঘুরেও বুঝলাম প্রমিত ওখানেই দাঁড়িয়ে আমাকে মেপে যাচ্ছে। দৃষ্টির একটা ধর্ম আছে। মুখে মানুষ যতই ডোন্ট-কেয়ার ভাব দেখাক, দৃষ্টি সময়মতো প্রতারণা করে।

কলকাতার বাতাস সকাল এগারোটার পর যেরম উষ্ণ হয়ে ওঠে, এবছরটা এখনও অবধি হয়নি। বিলম্বিত শীত মানে দীর্ঘায়িত গ্রীষ্ম। পায়োনিয়রের একদল ছাত্রছাত্রী একটা গুলঞ্চ গাছের নীচে গুলতানি করছিল। মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কেউ আছে কি না জানতে চাওয়ায় ছেলেমেয়েদের দল থেকে একজন হাত তুলল। বাচ্চা বাচ্চা মুখের মেয়েটা ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। প্রমিত দত্তের নাম বলাতে বলল চেনে। প্রমিত খুব পপুলার কলেজে।

“কেন?”

“আইভি স্যার ব্যাচে পরীক্ষার আগে পঞ্চাশটা কোয়েশ্চেনের সেট দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সেমিস্টারে সব কমন পড়বে। একটাও কমন আসেনি বলে প্রমিতদা স্টাফরুমে গিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিল। খুব হ্যাপ ছেলে। ইনস্টা প্রোফাইলে কুড়ি হাজার ফলোয়ার।”

“কুড়ি হাজার!”

“তার একটা কারণ আছে অবশ্য।” মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “জিয়ামিতা ওকে ডিচ করার পর ইনস্টাতে জিয়া-মিতাকে ট্যাগ করে নিজেদের স্মুচের ভিডিয়ো আপলোড করে দিয়েছিল। সেটা ভাইরাল হয়েছিল।”

“জিয়ামিতা কে!”

“ফাইনাল ইয়ার মেকানিকাল। নর্থ ইস্টের মেয়ে। হেব্বি দেখতে। হেব্বি ফিগার।”

“আই সি। তাকে এখন পাওয়া যাবে?”

“না। আমার সঙ্গেই পিজিতে থাকে। এখন আসাম গেছে। পরশু ফিরবে।”

“ফোন নম্বর আছে?”

মেয়েটা নিজের ফোন ঘেঁটে জিয়ামিতার ফোন নম্বর দিল। কলেজ থেকে বেরিয়ে একটা রিকশা ধরলাম মেন রোড অবধি।

খাল-বিল সমৃদ্ধ জায়গা। বিলে কচুরিপানা আর হাঁসের এরিয়া ভাগ করা আপাত বিরোধ নেই। তবে কচুরিপানার বহর ধীরে ধীরে হাঁসেদের উৎখাত করবে, সে-কথা বেচারারা জানে না। রিকশার হ্যাঁচড়প্যাঁচড়ের সঙ্গে চোখ বুজলে দু’-একটা পাখির ডাক ভেসে আসে। এক বৃদ্ধ ভ্রামণিকের স্মৃতিচারণায় পড়েছিলাম, কলকাতা শহরে নেই নেই করে অন্তত সত্তর প্রজাতির পাখি আছে। নীল রঙের যে বাসটায় চাপলাম, সেটির গায়েও পাখি আঁকা। জ্যাম পেরিয়ে তার ডানায় ভর করে, কলকাতা শহরের যেখানটায় নিয়ে গিয়ে আমাকে নামাল, সেখানে আদৌ আসতে চাইনি! বাবুঘাটের হাওয়া এসে মাথার চুলে বিলি কেটে দিলে বুঝলাম, এ দৈবের হাত থেকে নিস্তার নেই। না হলে, সল্টলেকের সাইবার ফরেনসিক অফিস যাব বলে স্ট্র্যান্ড রোড-গামী বাসে উঠে পড়ব, এমন মূর্খ কি কোনওদিন ছিলাম?

বাবুঘাটের বাবু[৯] সেই কোনকালে মরে ভূত হয়ে গেছেন, তাঁর বসানো রাস্তাটি চলেছে চৌরঙ্গীর দিকে। এসপ্ল্যানেড রো-তে গিজগিজে দোকান আর কালো কোটের আধিক্য দেখলে কোথাও একটা অস্বস্তি হয়। একই কেসের শুনানিতে নিরঞ্জন আর আমার ডাক পড়ে। এখনও পর্যন্ত দেখা হওয়ার সম্ভাবনা হয়নি। শুনানির পরের ডেট জেনে নিশ্চুপে বেরিয়ে এসেছি। বিচারপতি এস কে ভট্টাচার্যের ফের বসবেন বেলা আড়াইটেয়। এখন লাঞ্চ টাইম। নিরঞ্জন পুলিশ প্রহরায় একটা টুলে বসেছিলেন। আমাকে দেখতে পাননি। আমিও সামনে যাওয়ার আগে মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম। কিছু বলতে না-পারার প্রস্তুতি অনেকসময় অনেক কিছু বলতে চাওয়ার প্রস্তুতির থেকে কঠিন হয়। নিরঞ্জন ওজন কমিয়েছেন প্রায় কেজি পাঁচেক। মাথার সাদা-কালো চুলে সাদার ভাগ বেড়েছে। আমাকে দেখে হেসে দাঁড়িয়ে পড়লেন।

[(৯) বাবুঘাটের বাবু; ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, রানি রাসমণির অনুরোধে গঙ্গার পাড়ে একটি ঘর ও পাকা ঘাট তৈরি করে দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী রাজচন্দ্র। ঘাটে প্রবেশের আগে বড়ো বড়ো করে একটি ফলকে লেখাও রয়েছে সে কথা – …. দিস ঘাট কনস্ট্রাক্টেড ইন দ্য ইয়ার ১৮৩০ অ্যাট দ্য এক্সপেন্স অফ বাবু রাজচন্দ্র দাস শ্যাল হেয়ার আফটার বি কলড বাবু রাজচন্দ্র দাস ঘাট।’ সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা]

“ভাবছিলাম, আপনি কি আসবেন? সময় কি আদৌ পাবেন?”

“কেমন আছেন?”

“বেশ ভালো আছি। কাজকর্ম বিশেষ নেই। পড়াশুনা করে দিন কাটছে।”

“লাইব্রেরি থেকে বই পান?”

“অপর্যাপ্ত। জেল সুপারিনটেন্ডেন্ট বন্ধুমানুষ হয়ে গেছেন, ক’টা বই আনিয়ে দিয়েছেন।”

“সে কী! সিস্টেমকে ফর্দাফাই করে দেওয়া খুনি সাংবাদিকের সঙ্গে এ কী ব্যবহার? উনি সাসপেন্ড হবেন না?” আমি অবাক হওয়ার ভান করে বললাম।

নিরঞ্জন হো হো করে হাসলেন।

“সিস্টেম যে চালায় আর যে নিরঞ্জন দাশগুপ্তর বন্ধু, তারা দু’জন এক নন। চাবুক হাতে উঠলে হেনরি সিক্সও রাজা, বুঝলেন কি না?”

“খুব বুঝছি। তা কেসের কী খবর?”

“খবর আর কী। খবর তো সানি দেওল জানেন। আমি শুধু পরের তারিখটা জেনে খোপে ফিরব। আপনি কী করে বেড়াচ্ছেন? বেশ শুকনো লাগছে। কিছু খাননি?”

“খাব। এ পাড়ায় ভালো ডিম টোস্ট পাওয়া যায়। একটা কেসে ফেঁসে আছি। সেই সূত্রেই কলকাতায় আসা।”

“সে তো শুনলাম উকিলবাবুর কাছে। আপনার বড়োবাবু ওঁকে বলেছেন। আপনি মেসেজের রিপ্লাই দেননি বলে খুব রেগে আছেন কিন্তু।”

“আপনি রেগে নেই তো?” কথাটা মুখ থেকে বের হতেই বুঝলাম, বিচ্ছিরি ব্যাপার করে ফেলেছি। নিরঞ্জন চমকে তাকালেন। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল। কিন্তু তারপরেই অসামান্য হাসিতে ওঁর চোখমুখ ভরে উঠল। মজার গলায় বললেন, “রাগ তো বেশ ভালো জিনিস। খুব পিওর ইমোশন। অন্যান্য পিওর ইমোশনের জন্ম দেয়। তা কোন কেস? ডিটেলস শুনি।”

সাগর আর চুমকির যৌথ কেসের বর্ণনা দিলাম। নিরঞ্জনের ভুরু কুঁচকে ছিল, বললেন, “বেশ ঘোরালো ব্যাপার। আপনি সাপের গর্তে ঢুকে ডিম বের করে আনার তালে আছেন, যা বুঝছি। কিন্তু এই বিভাবরীর নামটা কোথায় যেন একটা শুনেছি আগে, মনে করতে পারছি না।”

“অন্য কোনও বিভাবরী নয় তো?”

“নাহ্। এটাই। একডালিয়া এভারগ্রিনের কাছে। মনে পড়লে আপনাকে জানাচ্ছি পরে। এখন যান, ডিম টোস্ট কিনে আনুন।”

“আপনার সঙ্গে শেয়ার করতে পারব না তো। নিয়ম নেই।”

“সে জানি। কিন্তু পরশুরাম কী বলে গেছেন জানেন না, ক্ষুধারসই হল আদিরস। আপনি খাবেন, আমি দেখব। সেটা-ই বা কম কী!”

১৭

“এ দেশে বার্নার ফোনের[১০] কনসেপ্টটা একটু অন্যরকম। আপনার মনে আছে কি না জানি না, আধার কার্ড আসার আগে, দু’হাজার দশ-বারোর কথা বলছি, সে-সময় মোবাইল নম্বর আগেই অ্যাক্টিভেট হয়ে যেত। পরে ভেরিফিকেশন ঠিকঠাক না হলে, ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিত কোম্পানিগুলো। সেটার সুযোগে শর্ট-টার্ম ইউজের জন্য সিম কার্ড কিনে ব্যবহার করত অনেক ক্রিমিনাল।” সাইবার ফরেনসিকের অফিসার বললেন।

[(১০) বার্নার ফোন: গোপনীয়তা বজায় রাখা, ট্র্যাকিং এড়ানো, বা স্বল্পমেয়াদি ব্যবহারের জন্য ব্যবহৃত একটি প্রিপেইড সেল ফোন, যা ক্যারিয়ারের সঙ্গে পোস্ট পেইড চুক্তিতে আবদ্ধ নয় এবং ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া বা রিসাইকেল করা যায়। বিদেশে যাবতীয় রিটেলে বার্নার ফোন ঢালাও বিক্রি হয়।]

“হ্যাঁ মনে আছে। তখন স্টেশনগুলোতে সিম বেচার কিয়স্ক বসত।”

“তারপর কড়াকড়ি শুরু হল। আগে ডকুমেন্টস মিলবে, তারপর ফোন নম্বর অ্যাক্টিভ হবে। কিন্তু যারা এ ঘটনার আঁচ আগেই পেয়েছিল, তারা বেশ ক’টা সিম আগে থেকে তুলে রেখেছিল। পরে এগুলো নানাসময়ে ব্যবহার করেছে। চাঁদনিতে অল্প ক’টা টাকা দিলেই ফিচার ফোনের আইএমইআই-এর রিড অনলি চিপ প্যাচ করে অন্য নম্বর বসিয়ে দিত লোক। সেই ফোনেও সিম ভরে ব্যবহার করলে ফোন ডিটেক্ট করা অসম্ভব। এখন এসব শিল্পীরা প্রকাশ্যে আর কেউ নেই। তবে গোপনে কেউ না কেউ কাজ নিশ্চয়ই করছেন।”

“আপনি বলতে চাইছেন, বিরজুর ফোনটা অমনই কোনও দিশি বার্নার ফোন?”

“মোস্ট প্রোবেবলি। সিডিআরে কিছু আছে?”

“না। এগারোটা ফোন করা হয়েছে। একটা তার মধ্যে ভিক্টিমের বোনকে। আর-একটা ভিক্টিমকে। বাকি নম্বরগুলোর এত বছর পরে আর অ্যাক্টিভ নেই।”

“হুম। হুইচ ইনডিকেটস ইটস এ বার্নার ফোন। কিন্তু আপনার বাপি মণ্ডলের

ফোনের রিপোর্ট ক্লিন। সব জেনারেল মেসেজ। কোনও গোপন অ্যাপট্যাপও নেই। বা এমন কিছু যা পরে ডিলিট করা হয়েছে। নাথিং আনইউজুয়াল। আমি হার্ড কপিটা দিয়ে দিচ্ছি। সফ্‌টটা আপনাকে মেল করা আছে।”

“থ্যাংকস।”

“হাল ছাড়বেন না।” অফিসার হেসে বললেন, “টেকনোলজি আপগ্রেডেড হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু ফলো আপের কোনও বিকল্প নেই। আদিকাল থেকে আজ অবধি এর কোনও অন্যথা হয়নি। লেগে থাকলে লিড পেয়ে যাবেন।”

ভদ্রলোকের সঙ্গে করমর্দন করে বেরিয়ে এলাম। সল্টলেকের এই অঞ্চলটা ভেড়ি প্রধান। নলবন ভেড়ির যে-দিকটা পার্ক হিসেবে উন্মুক্ত নয়, সেদিকটা রাস্তার ধার জুড়ে নারকেল গাছ লাগানো। ভেড়ির জলের উপর রুক্ষ শরীর আর একমাথা ঝাঁকড়াচুলো গাছেরা প্রায় শুয়ে পড়ছে। বিকেলের মরা আলোয় ভেড়ির জল ঈষৎ ঘোলাটে দেখায়। জলে দোলা নেই। একপ্রান্তে গিয়ে জল শুকিয়ে গেছে। তলার কাদামাটি উঠে এসেছে। ওদিকটা ছায়া। দু’জন প্ৰেমিক- প্রেমিকা নিশ্চিন্তে ঘনিষ্ঠ আলাপ করছে। নিশ্চিন্তি ব্যাপারটা গত তিনদিন ধরে জীবন থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। অ্যালার্ট থাকতে থাকতে শরীর এমন প্রোগাম্‌ হয়ে গেছে, যে ঘুমালেও মনে হয় জেগে আছি। গতকাল ঘড়ির অ্যালার্মকে প্লিজ এখন না বলে ফেলেছিলাম। ঘুম ভাঙতে দেখি, অ্যালার্ম তখনও বাজেইনি। আরও কুড়ি মিনিট দেরি।

ফোনটা মাঝে অনেকবার বেজেছিল। সাইলেন্ট করে রেখেছিলাম। আবারও পকেটে ভাইব্রেট করে উঠল। দিব্য প্রায় চেঁচিয়ে ওপার থেকে বলল, “হ্যালো ম্যাডাম, শুনতে পাচ্ছেন?”

হুশ হাশ করে রাস্তায় গাড়ি চলছিল। উভমুখী ট্র্যাফিক। একদিকে নিউ টাউন, আর-একদিকে কলেজ মোড়। আমি ওকে কলটা ধরতে বলে অপেক্ষাকৃত নির্জন জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। পরের দশ মিনিটে ও ঝড়ের গতিতে বলে গেল।

সাগরের বন্ধু, সজল আজ সকালে হন্তদন্ত হয়ে থানায় আসে। ওর গুগল মেল খুলে দেখায়। মেলে একটি নোটিফিকেশন এসেছে, গুগল ফাইন্ড মাই মোবাইল অ্যাপ থেকে। ২০২০ সালে সাগরের স্মার্ট ফোনটি যখন কেনা হয়, তখন সজল তার ফোনে অ্যাপটি ইনস্টল করে দেয়। সাগরের জিমেল অ্যাকাউন্ট ছিল না বলে সজল ওর জিমেল অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়, অলটারনেট কনট্যাক্ট অপশনে নিজের মেল আইডি দেয়।

অ্যাপটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, হারিয়ে যাওয়া ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করা যায়, এমনকি, ফোনে নতুন সিম ব্যবহৃত হলে অ্যাপটি নতুন সিমটিকে চিহ্নিত করতে পারে। গুগলের যে মেল আইডি ব্যবহার করে অ্যাপটি খোলা হয়েছিল, সেখানে নোটিফিকেশন যায়। নোটিফিকেশন যায় অলটারনেট মেল আইডিতেও। শর্ত একটাই, ফোন সুইচড অন অবস্থায় থাকতে হবে। সাগরের ফোন আজ সকালে সুইচড অন হয়েছে। নতুন সিম ঢোকানো হয়েছে। ফলত সজলের মেলে নোটিফিকেশন এসেছে। সজল জানিয়েছে, এই অ্যাপটি যে সে ইনস্টল করেছিল, সেটাই তার মাথায় ছিল না। মেলের নোটিফিকেশন দেখাচ্ছে, সাগরের ফোনের বর্তমান লোকেশন রঝৌল, বিহার। ফোন সাত মিনিটের জন্য অন হয়ে ফের সুইচড অফ হয়ে গেছে।

“নতুন সিম নম্বর গ্রুপে পাঠিয়েছি। সাবস্ক্রাইবার ডিটেলস অনুযায়ী লোকটার নাম ধনেশ রুইদাস। বাড়ি আসানসোল। আমি এখনই একবার আসানসোল যাচ্ছি।”

“যাক। অবশেষে একটা লিড পাওয়া গেল।”

“সে-রকমই আশা করছি ম্যাডাম।” দিব্যর গলায় উত্তেজনা ফিরে এল, “আর-একটা ব্যাপার হয়েছে। যেহেতু সাগরের জিমেলের ব্যাপারটা জানতে পারলাম, সেহেতু একটা চান্স নিয়ে গুগল ক্লাউডে ওর স্টোরেজটা দেখার চেষ্টা করেছিলাম।”

“সেটা কী করে করলি? গুগল ক্লাউড অ্যাক্সেস করতে তো আইডি পাসওয়ার্ড লাগে?”

“সজলের মনে ছিল। সহজ পাসওয়ার্ড রাখতে বলেছিল সাগর, যাতে মনে রাখতে পারে। পাসওয়ার্ডটা হল seventeenth0997@sagar, সাগরের ডেট অফ বার্থ।”

“বাহ্!”

“কল লগ, মেসেজ আর ফোটো ব্যাক-আপ আছে ক্লাউডে। আমি লগ-ইন করে সেগুলো অ্যাক্সেস করেছি। জানি না, কাজে লাগবে কি না, তবু পাঠাচ্ছি আপনাকে।”

দিব্যর পাঠানো ফাইল হাতড়ে চব্বিশ আর পঁচিশে ফেব্রুয়ারির ভোরের করা কলগুলো দেখলাম। নতুন কিছু নেই। সিডিআরে যা ছিল তা-ই। ছবি আর ভিডিয়ো খুব সামান্য। বাড়ির ছবি, বোন আর মায়ের ছবি, চুমকির সঙ্গে তোলা সেই ছবিটা, একটি শ্রাদ্ধকার্যের ছবি— সম্ভবত সাগরের বাবার আর ক’টা ফরোয়ার্ডেড হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিয়ো। কিছুই উল্লেখযোগ্য নয়। মেসেজের আইকনটা খুললাম। ৪৬৬ কেবির স্টোরেজ স্পেস। স্ক্রল করে পঁচিশ তারিখের মেসেজগুলো দেখলাম। গুগল কোম্পানি সদ্য হায়দরাবাদের একদল টুরিস্টকে ভুলভাল ম্যাপ দেখিয়ে এসইউভি সহ খালে ফেলেছিল। বিস্তর ট্রোলিং হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু এখন গুগল ক্লাউডে সেভ করা, মেসেজ-লগ দেখে সুন্দর পিচাইকে একটা চুমু খেতে ইচ্ছা হচ্ছিল।

সল্টলেক থেকে মেট্রো ধরলাম। গন্তব্য শিয়ালদহ। ইনস্টাতে প্রমিত দত্তের সত্যিই কুড়ি হাজার ফলোয়ার। প্রচুর ক্লাবিং আর নৈশপার্টির ছবি। জিয়ামিতার সঙ্গে চুমুর ছবি ডিলিটেড। তবে মেয়েটিকে ট্যাগ করে ক’টা ছবি আছে। জিয়ামিতার মুখে প্রত্যাশিতভাবেই আসামি ডৌলের। মেয়েটি সুন্দরী। কিন্তু সেক্সি বলতে আজকালকার প্রজন্ম কী বোঝে জানি না, আমার চেহারায় ব্যক্তিত্বের অভাব মনে হল। প্রমিতের পাশে, গলা জড়িয়ে ধরে পোজ দিয়েছে। প্রমিত আর জিয়ামিতা দু’জনেরই ক্লাবিংয়ের নেশা। ছবিগুলো সবই নৈশ অভিযান জাতীয়। প্রায় প্রতিদিন বা তিন-চারদিন অন্তর প্রোফাইল আপডেটেড হয়েছে। সঙ্গে বিভিন্ন ক্লাবের খাদ্য ও পানীয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে ভিডিয়ো আপলোড করেছে প্রমিত। জিয়ামিতার প্রোফাইলে গিয়ে দেখলাম, গত বছর এপ্রিলের পর থেকে প্রোফাইলটা আর অ্যাক্টিভ নয়। প্রমিতের সঙ্গে ওর শেষ ছবিও এপ্রিলে। অনুমান করা যায়, চুম্বনদৃশ্যটিও তখনই আপলোড করা হয়েছিল। কিন্তু ব্রেকআপের কারণ কী? ইনস্টা ফিড থেকে আন্দাজ করা যায়, এমন কোনও কারণ দৃশ্যমান নয়।

লালবাজার যখন ঢুকছি তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে। বিজনকে কি পাব, এই ভাবতে ভাবতে লিফটের সামনে দেখা হয়ে গেল। ওঁকে বেশ টেন্সড লাগছিল। আমাকে দেখে হাতের ইশারায় ক্যান্টিনের দিকে যেতে বললেন। দু’জন অফিসার ছিলেন ওঁর সঙ্গে। কথা মিটাচ্ছেন দেখে দিব্যকে ফোন করলাম। হতাশ গলায় ফোনটা ধরল ও।

“মেসেজ করেছি অনেকক্ষণ, কোনও উত্তর নেই। ফোনও করছিস না, কী ব্যাপার তোর?”

“গুড নিউজ হলে তো করব। এ লিডটাও বোধহয় গেল।”

“কী হয়েছে?”

“ধনেশ রুইদাসের বাড়িতে তাকে পাওয়া গেছে। লোকটা বলছে ও নম্বরটা ওর নয়।”

“কাগজ তো ওরই?”

“হ্যাঁ। কিন্তু লোকটাকে থানায় তুলে এনেছি চার ঘণ্টা হল। রগড়ে যাচ্ছি। কিন্তু বয়ান বদলাচ্ছে না।”

“এখন কোন ফোন ইউজ করছে?”

“অন্য একটা নম্বর। সেটাও ওর নামেই রেজিস্টার্ড।”

“বিহার, ঝাড়খণ্ড বা ইউপিতে লোকটার কানেকশন আছে?”

“না। সোনার দোকানে কাজ করে। গত এক মাস আসানসোল থেকে বেরোয়নি। একেবারে ছাপোষা টাইপ। আমি চেক করে দেখেছি।”

“কোন দোকান থেকে সিম নিয়েছিল?”

“কলকাতার ঢাকুরিয়ার কাছে কোনও একটা জায়গার কথা বলছে। আগে ওখানে কাজ করত। আসানসোলে বাড়ির কাছে কাজ পেয়ে চলে আসে।”

“ঢাকুরিয়া!”

“হ্যাঁ।”

দিব্যকে দোকানের মোটামুটি একটা ঠিকানা টেক্সট করতে বলে ফোন কাটলাম। বিজন পিছনে দু’কাপ কফি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

“সরি, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। আসলে চুমকির কেসটা নিয়ে বড়োকর্তাদের ড্রিল চলছিল।”

“ও আচ্ছা।”

বিজন গলা নামিয়ে বললেন, “আপনার বলা পয়েন্টগুলোয় লজিক আছে। সেগুলো ডিপার্টমেন্ট না গিলতে পারছে, না ফেলতে পারছে, কেসটা নিয়ে আবার নেড়ে ঘেঁটে দেখতে হচ্ছে তাই।”

“কীরকম এগোচ্ছে?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

“আর বলেন কেন? মেহতার ফ্ল্যাটে কাজ বন্ধ, শুনেছেন নিশ্চয়ই?”

“আবছা আবছা।”

“হুম। মেহতা অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোর্ট শোনেনি।”

“পুকুরটা কি ফের খোঁড়া হবে? কোর্ট কী বলছে?”

“বলেছে তো রি-সারফেস করাতে। বস্তি এখন মোটামুটি শান্ত। ওদের ধারণা চুমকি, ইয়ে ভিক্টিম বিচার পেয়ে গেছে।”

“কেন!” আমি অবাক হয়ে বললাম।

“চুমকির ভাই, মানে যে-ভাই নিখোঁজ তার এ জায়গাটা পছন্দের ছিল। গ্রাম থেকে এসে এখানেই দু’জন বসে থাকত কোভিডের সময়। সে-জন্যই পুকুর বুজোনোর ব্যাপারে চুমকি এককাট্টা ছিল। বস্তির লোকেদেরও নিজেদের স্বার্থ ছিল, বুঝতেই পারছেন।”

“হুম।”

বিজনের ফোনে মেসেজ ঢুকল। খুলে পড়ে আমাকে বললেন, “তন্ময়দা লিখেছে যে কফি ডেট শেষ হয়ে গিয়ে থাকলে ম্যাডামকে নিয়ে উপরে এসো।”

.

তন্ময় সামন্ত হাতে একগাদা খাম নিয়ে ফাইলে রাখছিলেন। ঘরটায় চারটে টেবিল চেয়ার। এক সারি দিয়ে রাখা আলমারি আর শেল্ফ। তাতে রাশি রাশি ফাইল রাখা। অধিকাংশই হলদে। কিছু গোলাপি আর সবুজ। এসি আছে। কিন্তু বন্ধ। ঘরের পাখা দুটো ঘটঘট শব্দে ঘুরছিল। তার তালে তাল মিলিয়ে একটা লক্ষ্মীনারায়ণের ক্যালেন্ডার দেওয়ালে কিছুটা দূর পেন্ডুলামের মতো উঠে গিয়ে ফিরে আসছিল আবার। তন্ময় সামন্তর সামনে একটা পলিথিনের প্যাকেটে মুড়ি আর বাদাম রাখা। তাতে এক খাবলা চানাচুর মিশিয়ে উনি ডাকলেন, “আরে আসুন আসুন।”

টেবিলের উপর ওসি হোমিসাইড লেখা নেমপ্লেটটা টেবিলের উপর উল্টো করে শোওয়ানো। সেদিকে চোখ পড়ল আগে।

“খাবার সময় ওটা উল্টে রাখি। খিদের সময় কোনও তকমা-টকমা ভালো লাগে না মশাই। অনেক তো হল…” তন্ময় সামন্ত মন দিয়ে মুড়ি চিবোতে চিবোতে বললেন।

“তা হলে পরে আসি?”

“আরে না না। আমিই তো লিফটে ওঠার সময় দেখলাম কফির পাত্র প্রায় শেষ করে এনেছেন। তাই ডাকলাম। আমাদের ক্যান্টিনের কফি খুব একটা সুবিধার নয়। বলেন তো স্পেশালটা আনিয়ে দিই?”

“না না। এই তো খেলাম।”

“আরে খান খান। আরে বিজন, বসে না থেকে সরোজ ক্যাফেকে ফোন করো…”

“আপনি কী জন্য ডেকেছিলেন?” ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম।

“ডাকিনি তো। একটু আলাপ আর-কি। ভবানী ভবন থেকে আবার একটা মেল এসেছে, কেসের কতদূর কী এগোল জানতে চেয়ে। কথায় কথায় বড়ো অভিযোগ করেন আপনারা, প্রোগ্রেস কী হল জানাতে গেলে প্রোগ্রেসটা তো হতে হবে নাকি?”

লক্ষ্মীনারায়ণের ক্যালেন্ডার আর-একবার পতপত করে শব্দ করল। সকালের পুরকায়স্থ স্যারের মেসেজের অর্থ বুঝলাম।

“আমার প্রোগ্রেসটা আমি আজই মেল করব। আপনি কি জয়েন্ট রিপোর্ট ধরনের চাইছেন?”

“প্রোটোকল তো তা-ই বলে।” তন্ময় সামন্ত রুমাল দিয়ে মুখ মুছে আমার দিকে তাকালেন।

“আমাদের এন্ডটা তো বিজন নিশ্চয়ই এতদিনে আপনাকে ছবির মতো বুঝিয়ে দিয়েছে, আপনাদের এন্ডটা সম্পর্কে কিসুই না জেনে… কী বিজনবাবু?”

বিজন অপ্রস্তুত হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। আমি ওঁকে থামিয়ে বললাম, “চুমকি প্রামাণিকের কেসে আমার যতটুকু ইনফরমেশন দরকার আমি নিজেই ওঁর কাছে পুরুলিয়ায় জেনেছি। এ ব্যাপারে সমস্ত তথ্য উনি আমাকে দিয়েছেন। মেলের বয়ানে আমার তদন্তের ডিটেলের সঙ্গে আপনাদের সহযোগিতার কথাও লেখা থাকবে। আপনি মেল অ্যাড্রেসটা দিলে আপনাকে সিসি করতে পারি।”

তন্ময়দা মুড়ি চিবোতে চিবোতে এমন ভাব করলেন যেন শুনতেই পাননি, বললেন, “সাগরের খুনের ব্যাপারটায় কাকে পেলেন?”

“এখনও কাউকে নয়। সাগরের খুনটা ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য নয়। ও কোনও অরগানাইজড ক্রাইমের ভিক্টিম। কী সেই ক্রাইম তা নিশ্চিত হতে আরও তদস্ত লাগবে। তবে কলকাতা থেকে বিজনবাবুরা পুরুলিয়া যাচ্ছেন, এ খবর সম্ভবত খুনিদের কাছে ছিল।”

“কাকা ইনভলভড নয় জেনেছেন বুঝি?”

“হ্যাঁ।”

“আর তাতেই এই অরগানাইজড ক্রাইমের চাষটা করে ফেললেন?”

“সাগরের ফোনের লাস্ট লোকেশন রঝৌলে। সাগরকে যে খুন করতে এসেছিল সে লোকাল নয়। পুরুলিয়ার সব ক’টা থানা, এমনকি জামশেদপুর আর চান্ডিল পর্যন্ত সব ক’টা চেক পোস্ট থেকে ওর সম্পর্কে কোনও ইনফরমেশন নেই। বিরাট সাপোর্টিং নেটওয়ার্ক না হলে এটা সম্ভব নয়, আপনিও জানেন, আমিও জানি। সাগরকে লোকটা খুন করেছে রেনাল আর্টারি কেটে ফেলে। কাজটা পাকা হাতের কাজ। এগুলো কোনদিকে ইঙ্গিত করছে বলে আপনার মনে হয়?”

“আর চুমকির মৃত্যুতে সাগরের ভূমিকা?” তন্ময়বাবু একটা বাদামের খোসা হাতের তেলোতে পিষতে পিষতে বললেন।

“নেই। ছিল না।” আমি সংক্ষেপে বললাম।

“বটে? আমরা কিন্তু এখনও ওর নামটা স্ট্রাইক আউট করিনি।”

“করতেই পারতেন। কিন্তু যে মরে গেছে, তার পিছনে বেশি খাটেননি।”

তন্ময় সামন্তর কপালের পাশের শিরা দপদপ করে উঠল। কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।

আমার কান মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছিল। দিব্যর পাঠানো ফাইলটা খুললাম।

“সাগরের মোবাইল রাত সাড়ে এগারোটার পর লোকেশন বদলায়নি। পেয়ারাবাগান বস্তিতেই আছে।”

“তাতে কিছু প্রমাণ হয় না। মোবাইল হাতে নিয়ে খুন করতে যায় না এমন কেস ভূরি ভূরি।”

“ঠিক। কিন্তু এই মেসেজদুটো বলছে ও নিজেও সে-সময় ওর ফোনের কাছেই ছিল।”

তন্ময় সামন্ত ঝুঁকে মেসেজগুলো দেখলেন। একটা, রাত সোয়া বারোটায় গ্যাস বুকিং করার মেসেজ। আর-একটা, দেড়টার সময় ডেটা প্যাক কেনার জন্য অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কাটার মেসেজ।

“সাগর ওর বোন ঝুমার থেকে নেটফ্লিক্সের পাসওয়ার্ড চেয়েছিল। প্রোবেবলি দেখতে দেখতে ওর ডেটা প্যাক এক্সপায়ার করে যায়।”

তন্ময় সামন্ত মেসেজগুলো মন দিয়ে পড়লেন। ডায়েরিতে কীসব নোট নিলেন। তারপর মাথার পিছনে হাত দিয়ে চেয়ারে কাত হলেন। চোখ আধবোজা অবস্থায় বললেন, “আপনার এখন কী প্ল্যান? আজ পুরুলিয়া ফিরছেন?”

ওঁর গলায় আচমকা একটা নরম সুর বাজছিল। ঘড়িতে এখন সাড়ে ছ’টা। চক্রধরপুর এক্সপ্রেস রাত এগারোটা পঞ্চান্নতে। ঢাকুরিয়াতে সিমের দোকানটায় একবার ঘুরে গেলে হত। কিন্তু পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করলে দেরি হয়ে যাবে।

“আপনাদের একটা গাড়ি পাওয়া যাবে? ঢাকুরিয়া যেতাম। সঙ্গে একজন কনস্টেবল দিলে ভালো হয়।”

তন্ময়বাবু সোজা হয়ে বসে বললেন, “বলে দিচ্ছি। কিন্তু কনস্টেবল কেন? বিজনই যাক আপনার সঙ্গে। ও তো ঢাকুরিয়ারই ছেলে।”

১৮

“আপনার বয়স কি চল্লিশ?” বিজন পাশ থেকে জিজ্ঞেস করলেন। গাড়িটা গড়িয়াহাট ছুঁই ছুঁই করছিল। রাস্তায় তুমুল ট্র্যাফিক। চার চাকার চেয়েও বেশি অটোর লাইন। আমি ব্যস্ত হয়ে সময় দেখছিলাম। বিজনের কথায় ভুরু কুঁচকে বললাম, “এখনও কিছু বছর বাকি। কেন বলুন তো?”

“না। ভাবছিলাম। আসলে অনেক আগে একটা গপ্পো শুনেছিলাম। তখন কবীর সুমনের লাইভ শুনতে যেতাম।”

“কী গল্প?”

“খুব ফেমাস গপ্পো। আপনিও জানেন।”

“আরে কী বলবেন?”

“একবার এক ইস্কুলে এক ইনস্পেক্টর গেছে। গেছে তো গেছে অঙ্ক ক্লাসে। বাচ্চাদের পড়া ধরেছে। হেবি শক্ত প্রশ্ন, আমার বাড়ির উপর দিয়ে একটি এরোপ্লেন ৬০০ মাইল প্রতি ঘণ্টায় চলে গেলে আমার বয়স কত?”

“এরকম কোনও অঙ্ক হয় না।”

“হয় হয়, জানেন না। তো সারা ক্লাসের পোড়োরা নাজেহাল। কেউ উত্তর দিতে পারে না। শেষে লাস্ট বেঞ্চ থেকে এক মক্কেল হাত তুলেছে। যেই না হাত তোলা, মাস্টার এই মারে কি সেই মারে। বলে তুই যোগ বিয়োগ পারিস না, তুই অঙ্ক সলভ করবি কীভাবে?”

“তারপর?”

“ইনস্পেক্টর অবশ্য খুব উৎসাহ দিয়েছেন। বলছেন, আহা হাত তুলেছে যখন বলতেই দিন না। ছেলেটাও উৎসাহ পেয়ে বলেছে, স্যার আপনার বয়স চল্লিশ। স্যার তো আপ্লুত। বললেন কী করে জানলি? ছেলে আমাদের ওস্তাদ। কী বলল জানেন?”

“কী?”

“বলল, স্যার আমাদের বাড়িতে একজন কাজ করে। সে আধপাগল। তার বয়স কুড়ি। আপনি স্যার ফুলপাগল, তাই আপনার বয়স দু’গুণ বেশি।”

পেট গুলিয়ে হাসি এল। তারপরেই চোখ পাকিয়ে বললাম, “আপনি কী বলতে চাইছেন বলুন তো?”

“না, তন্ময়দাকে যেমন খ্যাকালেন, অমন তো কোনও সুস্থ হুঁশে থাকা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আপনার কি ভয়টয় লাগে না?”

“আমার তো ওঁকে খুশি করার দরকার নেই, তাই ভয় পাওয়ারও দরকার নেই। তবে সব বিভাগের হেডুদেরই অমন জলাতঙ্ক রোগের উপসর্গ আছে। খেঁকিয়েই থাকে। আমার অভ্যেস আছে।”

“ইয়ে, আপনারও কিন্তু বেশ খ্যাঁকানোর অভ্যেস আছে।”

“বাজে কথা না বলে বলুন আর কত সময় লাগবে?”

বিজন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জায়গাটা বলছে ঢাকুরিয়া, কিন্তু গরফার দিকে। রেললাইন পেরোতে হবে। একবার স্টেশন রোডের দিকটায় ঢুকে পড়লে নিশ্চিন্ত।”

গাড়ি জীবনানন্দ সেতুতে উঠে পড়েছিল। কলকাতার রাতের রহস্য অনেকদিন নষ্ট হয়ে গেছে চড়া স্ট্রিট লাইটের কল্যাণে। এমনকি আকাশে বহু উঁচুতে তাকালেও বহুতল থেকে ছিটকে আসা আলো, সমস্ত অন্ধকারের ষড়যন্ত্র ছারখার করে দেয়। এখন বেঁচে থাকলে, চাঁদের আলোয় কারওর গোপন ঠিকানা কীভাবে খুঁজতেন জীবনানন্দ? এখন অন্ধকার বলতে ব্রিজের তলদেশ, খালপাড় আর শহরায়নের ধ্বংসলীলা মাত দিয়ে বেঁচে যাওয়া প্রাচীন কিছু গাছের অন্তরাল। যত ধাঁধিয়ে গেছে চোখ, তত কলকাতা চড়া আলোয় হেসে উঠেছে। আর তার দগ্ধ গালটি সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে অন্য কোনও পাশে। জালে জালে কাতর হয়েছে, আর তার শরীরে বিসূচিকার মতো গজিয়ে উঠেছে এমন সব চিহ্ন, যাকে আমরা মহানগরীয় বিউটিস্পট বলি।

গরফায় আগে কোনওদিন আসিনি। ঢাকুরিয়া স্টেশন রোডের গায়ে গায়ে ভর দেওয়া সাবেকি বাড়িগুলো থেকে জোরদার শব্দে টিভি সিরিয়ালের কুশীলবেরা সংলাপ আওড়াচ্ছিলেন। ইথারে তাদের বিলাপ আর আলাপের স্রোত। দুরন্ত ফ্যাশনের ফ্ল্যাটবাড়ির পাশে, কিছু নিভু নিভু একতলা বাড়ি। দরজায় খাপছাড়া ঘন নীল রং। জানালায় ছোটো ছোটো বিবর্ণ ফুলছাপের পরদা। বাইরে ডাঁই করা আবজর্নার ভ্যাট। বিড়াল নিশ্চিন্তে রাস্তা পেরোয়। লাল গোল বেদিতে ঘেরা অশ্বত্থের নীচে সিঁদুরলেপা ভগবান- তিনি হনুমানও হতে পারেন, আবার সন্তোষী মা-ও। আর-একটু পেরিয়ে পাড়ার রিকশাস্ট্যান্ড। স্টেশনারি দোকানের সামনে বয়স্কদের ভিড়। যত লেভেল ক্রসিং এগিয়ে আসে, আবার

শহুরে আলো ফিরে আসে। চড়া সাদা ফ্ল্যাশলাইটে শাড়ির দোকান, জেরক্স আর প্রিন্ট, লন্ড্রি, চুলের কাঁটা ক্লিপ আর টিপের বিপণি দাঁত বের করে হাসে। বিজন গাড়ির ড্রাইভারকে একদিকে গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। দোকানের নাম মা তারা কমিউনিকেশন।

সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত অল্পবয়সি মালিক নম্বর দেখে চেক করলেন। বড়ো রুল টানা খাতায় ডিটেলস লেখা। চার নম্বর খাতায় পৌঁছোতে আস্তে আস্তে পাতা ওল্টাচ্ছিলেন, হাত কাঁপছিল।

“খুব ভুল হয়ে গেছে স্যার। ২১ সালের কার্ড। একই আধারে দুটো দিয়ে ফেলেছি।”

“ভুল? ফাজলামি মারছিস?

“সরি স্যার।”

“কাকে বেচেছিস?”

লোকটা মাথার চুল ধরে টানে, যেন মনে করার বহু চেষ্টা করছে।

“স্যার তখন এখানে অনেকগুলো কনস্ট্রাকশন হচ্ছিল, মিস্ত্রিরা কাজ করছিল। কেউ একজন এসে ওদের জন্য কিনে নিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল সবার আধার নেই। বিহার ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছে।”

“তাই তুই দাতা কর্ণ হয়ে অন্যের আধার দিয়ে দিলি? জেরক্স রাখা ছিল?”

ছেলেটা আর উত্তর দিল না। বিজন উত্তেজিত হয়ে আরও কিছু বলছিলেন। হয়তো চড়চাপড়ও দেবেন। আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। লেভেল ক্রসিং ছাড়িয়ে রাস্তা এঁকেবেঁকে মফস্সলি গন্ধের পেটে ঢুকে যাচ্ছে। দূরে একটা ইস্ত্রিওয়ালা বসেছে, ল্যাম্পপোস্টের ঠিক নীচে। তার মুখোমুখি একটি মুদির দোকান। কোল্ড ড্রিংক কিনব। পেটের মধ্যে অ্যাসিডে পাঁক দিচ্ছে। তবু কোল্ড ড্রিংক খাব। জ্বালাতে জ্বালা জুড়োয় আগে দেখেছি। দোকানটার সাইনবোর্ড বাঁকা হয়ে ঝুলছে। পুরোনো বড়ো দোকান। সাইনবোর্ডে আলো পড়েনি। শাটারের উপরে ঘুপচি অন্ধকারে বসানো। গুনে গুনে তিনটে খদ্দের দোকানে। পাশ কাটিয়ে চেঁচালাম, “একটা দুশো এমএল পেপসি।”

দোকানের মালিক টিকাধারী। তিনি ক্যাশে বসে গম্ভীর মুখে রেজগি গুনছিলেন। উল্টোদিকে ফ্রিজ থেকে পেপসি বের করে আনল যে ছেলেটি তার মাথায় কোকড়া চুল, গালে ভর্তি মেচেতার দাগ। পাশ থেকে এক পুরুত বামুন হাতে তামার বাটি নিয়ে মালিককে টিকা পরাতে এল। “জয় সিয়ারাম চতুর্বেদীজি” বলে চটি ছাড়ল। আমার হাতে পেপসির ক্যান— জমাট শীতল। গালে মেচেতা, ছেলেটি পিছন ঘুরছিল। আমি আচমকা ডেকে উঠলাম, “বিরজু?”

ছেলেটা চমকে তাকাল। চোখে চোখ পড়লে বিড়ালও বোঝে, তাকে কে ও কেন ডাকছে। ছেলেটা স্প্রিন্ট করল। ফ্রিজের দরজায় এমন জোরে লাগল যে পুরো ফ্রিজ কেঁপে উঠল। বিস্কুট আর কেকের প্যাকেট স্তূপ করে রাখা ছিল একটা বেঞ্চে, সেটা টপকে আমার গায়ের উপর এসে পড়ল। আমি একটা পা বাড়িয়ে ছিলাম। হোঁচট খেয়ে পাশে মুখ থুবড়ে পড়ল, তারপর দুই হাতের ভর দিয়ে উঠে আমার মুখের উপর থাবা দিয়ে আঁচড়ে দিল। আমার পা ফোল্ড হয়ে এসেছিল, হাঁটু থেকে ভাঁজ হয়ে ছেলেটার তলপেটে গিয়ে পৌঁছোল। ছেলেটার মুখ থেকে লালা বেরোচ্ছিল। আঘাতটা খেতে হাঁ-মুখ বড়ো করল। আমি ওর দাঁত আর জিভ দেখতে পেলাম। কালচে দাঁত, ঘোলাটে নর্দমার মতো জিভ। আমাকে ঠেলে দিয়ে ও ওঠার চেষ্টা করল। দূর থেকে বিজন ছুটে আসছেন টের পেলাম। ছেলেটার চিবুক ধরে মুখটা ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। বেকায়দায় পড়ে ও হাত দিয়ে আমার চোখ আঁচড়ে দিল। জ্বলন্ত শিসের মতো ব্যথা নেমে এল পাতা জুড়ে, আর একটা ভারী তরল। ও সুযোগ পেয়ে গেল।

আমার উপর ওর হাতের বাঁধন আলগা হয়ে যেতে বুঝছিলাম, সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে। চোখের উপর থেকে রক্তের স্রোত মুছতে মুছতে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। শুধু নখ নয়, চাকুর আগা বিঁধেছে মনে হল। বিরজুর পায়ের শব্দ কানের গণ্ডির বাইরে যাচ্ছে ক্রমশ। বিজনকে ডেকে চ্যাঁচালাম। ভারী বুটের শব্দে বুঝলাম বিজন পিছনে তাড়া করেছেন। রুমাল দিয়ে চোখ চেপে ধরে দাঁড়িয়ে দেখলাম, দোকানের পাশে একটা সরু নর্দমা, আর তার ধার ঘেঁষে গলি। ব্লাইন্ড নয়। পাঁচিল টপকে ওপাশে পিছন দিকের পাড়া। রাস্তাটা কাঁচা, স্টোন চিপস ছিটিয়ে আছে। বিজনের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। ওয়ারলেসে পেট্রোলিং ভ্যানকে ধরছেন নিশ্চিত। আমি শব্দ শুনে দৌড়ের গতি বাড়ালাম। পায়ের তলায় স্টোন চিপস ছিটকে গেল। বালির স্তূপ, ইটের পাঁজা — সামনে বাঁ দিকে। নির্মীয়মাণ বাড়ির একতলা। সূঁচ ঢোকে না এমন অন্ধকার। পায়ের শব্দ হঠাৎই থেমে গেল। তারপর জোরে একটা লাফানোর শব্দ। সেটা অনুসরণ করে বাইরে ছুটে এলাম। চারধারে ঝাঁ ঝাঁ করছে চড়া আলো। একটা মোড়, তার চারদিকে রাস্তা। বিরজু কোনওদিকেই নেই!

বিজন হাঁপাতে হাঁপাতে পিছনে এসে দাঁড়ালেন। ওঁর ওয়ারলেসে স্ট্যাটিক কেটে মেসেজ আসছিল। আমার চোখের উপরের পাতা দপদপ করছিল। মনে হচ্ছিল চোখের মণি খুলে বেরিয়ে আসছে। ব্যথা চেপে কোনওমতে বিজনকে বললাম, “তারক… পেয়ারাবাগান বস্তির তারক… ফোর্স পাঠান।”

মাথাটা ঘুরছিল। অন্ধের মতো হাত বাড়ালাম। বিজন হাত ধরে নিলেন।

.

“চারটে স্টিচ পড়েছে। আপনার কালকের দিনটা রেস্ট নেওয়া উচিত।” বিজন বলে উঠলেন। মেজাজ তেতো হয়ে ছিল। বিজনের প্রস্তাবে আরও তেতো হয়ে গেল। বাঘাযতীন স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তারবাবু বস্তা সেলাইয়ের মতো করে চোখের উপরের চামড়া সেলাই করে দিয়েছেন। নখ নয়, বিরজু পুশ ড্যাগার জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার করেছে। হাতের তালুতে ধরে যায় এমন ছুরি। মোক্ষম সময়ে মুখটা ঘুরিয়ে নেওয়ায় মণিটা বেচে গেছে। ফোনে যথারীতি ঊর্ধ্বতনদের জানানোর প্রক্রিয়া শেষ। পরিস্থিতি বর্ণনা করে পুরুলিয়া থেকে অ্যাডিশনাল ফোর্স পাঠাতে বলা- পরবর্তী প্ল্যান অফ অ্যাকশন কী হতে পারে তা সংক্ষিপ্ত ভাবে জানানো— সব করা হয়েছে। এসপি অফিস থেকে এখনও কোনও উত্তর আসেনি। ঢাকুরিয়া থানায় চতুর্বেদীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যতটুকু জানা গেছে, বিরজু এখানে গগনের নামে কাজ করছিল। বাড়ি বলেছিল, বিহারের সিওয়ানে। এখানে কাজ করছে আঠেরো সাল থেকে। আধার কার্ডের জেরক্স কপি জমা দিয়েছেন চতুর্বেদী। তাতে ছবিটা ওর, ঠিকানা অবশ্যই ভুয়ো। থানাগুলোকে অ্যালার্ট করা হয়েছে। কিন্তু বিরজু যেন কপূর। উবে গেছে মুহূর্তে।

রাত এগারোটা বাজছিল। হাসপাতালের বাইরের করিডরে রুগিদের বসার বেঞ্চগুলোয় কয়েকজন আত্মীয় বসে আছেন। দু’জন সিকিউরিটি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে কড়া বিড়ির গন্ধ নাকে আসে।

“বক কেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে জানেন?” বিজনকে বললাম।

“কেন? একপাটি জুতো কি কেউ ঝেড়ে দেয়?”

উত্তর দেওয়ার সময় পেলাম না। আমাকে হাসানোর জন্য বিজন একটা চেষ্টা করছিলেন, একটা ফোন আসায় ওঁর মুডটা বদলে গেল।

“ফেরেইনি! বলো কী?” ফোনে কথা বলতে বলতে চিন্তিত মুখে বিজন আমার দিকে তাকালেন।

“তারকও পালিয়েছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“হুম। খোঁজ নেই।”

“এটাই ভাবছিলাম। দেরি হয়ে গেল। পালিয়ে যাবে।”

বিজন একবার সময় দেখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপাতত কি পাটুলি যাবেন?”

“হ্যাঁ।”

“আমি ছেড়ে দিচ্ছি।”

“ট্যাক্সি পেয়ে যাব। আপনি বাড়ি যান।”

পুরোনো একটা হলদে ট্যাক্সি, আর তার প্রাচীন ড্রাইভার ঘড়ঘড় শব্দ ছেড়ে, পাটুলির দিকে আমায় নিয়ে দৌড়োল মিনিট দশেক পর। অ্যাম্বাসাডরের সিটগুলো যখন ডিজাইন করেছিলেন হিন্দমোটর কর্তৃপক্ষ, তখনও অটোমোবাইলে রেকলাইনিং ব্যাকসিটের কনসেপ্ট আসেনি। ফলত অ্যাম্বাসাডরে হেলান দেওয়ার সময় মনে হয় পিঠে কেউ স্কেল বেঁধে দিয়েছে। অনুতাপ হচ্ছে প্রবল। বিরজুকে ওভাবে ডাকাটা ভুল হয়ে গেছে। উচিত ছিল আর-একটু লক্ষ রেখে ফোর্স পাঠিয়ে তুলে আনা। ক্ষণিকের উত্তেজনায় ওকে বড়ো সুযোগ দিয়ে ফেললাম। বক মাছ ধরার সময়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পায়ে ওদের পালক থাকে না। ছোট্ট শরীরে যতটা শক্তির প্রয়োজন পালকহীন চামড়া তা সহজেই হারিয়ে ফেলতে পারে। তাই কাজ হল একটা পা-কে পেটের তলায় ঢুকিয়ে নিশ্চুপে শিকারের জন্য অপেক্ষা করা। যা আছে সব খরচা করে ফেলা নয়। তারকের মুখ মনে পড়ল, “চতুর্বেদীর দোকানে আমিই কাজে লাগিয়েছিলাম সাগরকে। আমার পরিচিত জায়গা… না, বিরজু কে, আমি জানি না…”

এই গল্পটা তবে অউরোবোরসের। সেই সাপ যে তার নিজের লেজকে গিলে নেয়। যেখানে গোড়ার কথা, সেখানেই লুকিয়ে আছে অস্তিম। তারকই যদি সাগরকে চতুর্বেদীর দোকানে কাজে লাগিয়ে থাকে, তবে বিরজুকে চিনবে না কেন? বিরজু সাগরকে ফেসবুকে যে কাজের লিংক দিয়েছিল, সে কাজ নিশ্চয়ই মুদির দোকানের হেল্পারের কাজ নয়? সে কাজের কথা তারক জানত না?

রাস্তা ফাঁকা। গাড়ি রাজপথে পিছলে পিছলে চলছিল। বিজন বলেছেন, সাগরের ভাড়াবাড়ির বাকি ভাড়াটেদের থানায় তুলে আনা হবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কিন্তু যারা এখনও পালায়নি, এই কেসে তারা আদৌ কিছু জানে কি না সন্দেহ। যাদের রোজ প্রত্যক্ষ করেছে ওরা, তাদের একজন মৃত, একজন পলাতক। কিন্তু এরা কেউই এ চক্রের মাথা নয়। যারা মাথা, তাদের আগে কলকাতার তলপেটগুলোয় খুঁজে পাওয়া যেত। এখন আর যায় না। ডিপ, ডার্ক ওয়েবের দুনিয়া যে-কোনও শহরের আন্ডারবেলির থেকে ভয়াল। যে-কোনও চক্রের মাথাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সাগর, তারক আর বিরজু প্রকাশ্যের লোক। ক্ষমতা কম, ঝুঁকি বেশি। প্রমিতের আমাকে সন্দেহ হয়নি বা হলেও সে আজ কোনওভাবে বাকিদের সতর্ক করতে পারেনি। না হলে তারক আর বিরজু ধরা পড়ত না।

বাইরের দিকে তাকালাম। এত রাতেও কলকাতা ঝকঝক করছে। তবে এই গ্ল্যামারে উল্লসিত হতে পারি না। আগে খুনি, অপরাধীদের নিজস্ব বৃত্ত ছিল। ক্রমশ সে বৃত্ত ভাঙছে। আসলে ভাঙছে না। সাধারণের মধ্যে মিশে যাচ্ছে। যে-কেউ অপরাধী হতে পারে। যাঁর সঙ্গে রোজ কাজ করেন, একই বাসে ট্রামে যাতায়াত করেন, রোজ ভাগ করে খাবার খান, একই বিছানায় শোন! অউরোবোরস তার মাথা দিয়ে শক্ত করে লেজ গিলে রাখছে। ক্রমে ক্রমে গোটা শহর গিলে নিতে পারে, এ সংশয় হয়।

চোখের পাতা আর মাথা জুড়ে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল। পেনকিলার ছ’ঘণ্টা কাজ করে। তিন ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই প্রভাব কমে আসছে। জলের বোতল থেকে কলকল করে ঠান্ডা জল খেলাম, সঙ্গে আর-একটা হাজার মিলিগ্রাম ট্যাবলেট। ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসার আগে ফোনে মেসেজটা ঢুকল। আমাদের এসপি সাহেব লিখে পাঠিয়েছেন। কাল সকালে বড়োকর্তাদের মিটিং। সিআইডি আর কলকাতা পুলিশের যৌথ অ্যাজেন্ডা। উনি স্বয়ং থাকবেন। রিপোর্ট শার্প অ্যাট ইলেভেনের নির্দেশটা এসেছে মিনিট পাঁচেক আগে। শিওর স্যার, লিখে বিছানায় টানটান হলাম। একটা উষ্ণ বিছানায় বাকি রাতটা বেঘোরে ঘুমোব, মস্তিষ্ক তাতে যথেষ্ট খুশি হতে পারছিল না। অজানা উৎকণ্ঠা হচ্ছিল।

দেওয়ালে একটা টিকটিকি টিকটিক করে উঠল। হাওয়া এসে জানালার পরদা দোলাচ্ছিল। দেওয়ালে তার ছায়া বার বার কেঁপে উঠছিল। টিকটিকিটা পরদার পিছনে লুকিয়ে গেল। আমি শুধু ওর লেজের ডগাটা দেখতে পাচ্ছিলাম। গোটা শরীর পরদার আড়ালে চলে গেল। ভোরবেলা যখন ঘুম ভাঙল, তখন পরদার পিছনে সূর্য। ঘড়িতে সাতটা।

১৯

প্রোজেক্টরে একটা পাওয়ারপয়েন্ট চলছিল। কলকাতা পুলিশের অ্যাচিভমেন্ট নিয়ে একটা রংচঙে প্রেজেন্টেশন। এআই-এর কল্যাণে এত ভালো পিপিটি তৈরি হয় আজকাল যে, দেখে তাক লেগে যায়। সার দেওয়া চেয়ারের দ্বিতীয় সারিতে বসে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপারের চেয়ারগুলো নিরাপদ দূরত্বের মনে হয়। প্রেজেন্টেশন দেখতে দেখতে নিজের বক্তব্যগুলো একটু গুছিয়ে নেওয়া যায়।

ডিআইজি সিআইডি সুদেষ্ণা মিত্র, কলকাতা পুলিশের সিপি সাহেবের পাশে বসে আছেন। তন্ময় সামন্ত, বিজন বসু, আরও দু’-তিনজন নাম না জানা অফিসার রয়েছেন। ডিসিডিডি আর এসপি পুরুলিয়া বসে আছেন সেক্রেটারিয়েট টেবিলের একদম দুই প্রান্তে।

সিপিই প্রথমে মুখ খুললেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন কেমন আছেন?”

আমি ঘাড় নাড়িয়ে “ফাইন, থ্যাংক ইউ স্যার” বলাতে উনি চশমা খুলে আমার দিকে তাকালেন। যেন, আমি একজন পর্যবেক্ষণ করার মতো বিষয়বস্তু। ধীরে ধীরে বললেন, “আপনি বেশ রিস্ক নিয়ে ফেলেছেন। কাউকে একটু ইনফর্ম করতে হত।”

ভবানী ভবনের কাছে ম্যানপাওয়ার চেয়েছিলাম একথা এই মিটিংয়ে বলে লাভ নেই। যারা জানার, তারা জানেনই। আমি চুপ করে থেকে হাসলাম।

সিপি বললেন, “এমনিতে আমরা এই জয়েন্ট মিটিং কল করেছি শুধুমাত্র গতকালের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নয়। আমাদের সিনিয়র অফিসার তন্ময় সামন্ত জানিয়েছেন, গত রাতের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ওঁর কিছু জানানোর আছে। আয়াম শিওর, এসআই বোসও গতকালের ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের ব্রিফ করবেন। বিরজুর ব্যাপারে কলকাতা পুলিশ আর সিআইডি ইতিমধ্যে যৌথ তদন্ত শুরু করেছে, সেটাও আপনাদের জানার দরকার।”

আমি তন্ময় সামন্তর দিকে তাকালাম। প্রথম সারির চেয়ারে বসে আছেন। এখান থেকে স্রেফ ওঁর স্রেফ পৃষ্ঠদেশ দেখা যায়। বিরজুর ধরা পড়াতে ওঁর কী জানানোর থাকতে পারে, বুঝতে পারলাম না।

পরের ব্রিফিংটা ডিআইজি সিআইডি করলেন। সুদেষ্ণা মিত্র টেবিলের উপর সামনের দিকে একটু ঝুঁকে বললেন, “কালকের অ্যাবস্কন্ডিং, বিরজুকে নিয়ে আমাদের ইনটেলিজেন্সের রিপোর্ট এসেছে আজ সকালে। রিপোর্টটা অরিজিনালি ক্রাইম ব্রাঞ্চ, বিহারের। কাঠমান্ডুতে ‘১৮ সালের অগস্টে লাল মহম্মদ বলে একজন খুন হয়। লোকাল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক। স্কুটারে করে দু’জন এসে শুট আউট করে মেরে ফেলে ওকে। বিরজু ওই শুটারদের একজন। আইডেন্টিফিকেশনের পর বিরজুকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাঠমান্ডু পুলিশ ইনফর্ম করে যে, লাল মহম্মদের পাস্ট বেশ শ্যাডো। কাউন্টারফিট কারেন্সি, ড্রাগস, আর্মস সবেতেই হাতেখড়ি আছে। বিরজু সিওয়ানের ছেলে। ২০১৬ থেকে কাঠমান্ডুতে থাকত। লাল মহম্মদের মতো বিরজুর ইতিহাসও সোনায় বাঁধানো। ওর এগেন্সটে লুক-আউট নোটিশ জারি হয়ে আছে কাঠমান্ডুতে, এদিকে বিহারের রক্সৌল বর্ডারে।

ইনটেলিজেন্স বলছে ও রক্সৌল বর্ডার হয়ে নেপাল থেকে ইন্ডিয়ায় ঢুকেছিল। আমাদের তরফ থেকে নেক্সট প্ল্যান অফ অ্যাকশন আপাতত একটাই। বিরজু আর তারককে আটকানো। এরা যদি রক্মৌল হয়ে নেপালের দিকে চলে যায়, আমাদের সমস্যা বাড়বে। লুক আউট নোটিশ জারি করা, একটা এপিবি[১০] বের করা আর মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে এদের নামদুটো অ্যাড করা- এগুলো প্রিলিমিনারি। লোকাল থানাগুলোকে হাই অ্যালার্টে থাকার কথা কনভে করে দেবেন স্যার।” সুদেষ্ণা মিত্র সিপি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন।

[(১০) এপিবি: অল পার্টি বুলেটিন]

“এফেক্টিভ অ্যাজ অফ রাইট নাও। কিন্তু এদের নেচার অফ ক্রাইম সম্পর্কে কিছু জানা গেল?” সিপি উত্তর দিলেন।

ডিআইজি মিত্র আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন। বললেন, “এসআই বোস, আজ সকালে এসপি পুরুলিয়াকে মেল করেছেন, উইদ রেলিভেন্ট ডকুমেন্টস অ্যান্ড অবজারভেশন। আয়াম শিওর, শি হ্যাজ অলরেডি পুলড থ্রু ইয়েস্টারডে’স সিচুয়েশন। বোস, আর ইউ কমফোর্টেবল এনাফ টু ব্রিফ?”

“ইয়েস ম্যাম।” আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম।

সিপি হা হা করে উঠে বললেন, “প্লিজ হ্যাভ ইয়োর সিট। প্লিজ কনসিডার দিজ সেট-আপ অ্যাজ ইনফর্মাল অ্যাজ পজিবল।”

“থ্যাংক ইউ স্যার, কিন্তু আমি দাঁড়িয়েই বেশি স্বচ্ছন্দ,” বলে আমি দম নিলাম। গোটা কনফারেন্স রুমের মনোযোগ আমার দিকে। বিজন পিছন ঘুরে একবার তাকিয়ে সামনে দেখলেন। আমি ধীরে ধীরে বলা শুরু করলাম, “গত আঠাশে ফেব্রুয়ারি বাঘমুণ্ডি পিএসের জুরিসডিকশনে সাগর মণ্ডল নামের এক ছাব্বিশ বছরের যুবক খুন হন। ভিক্টিমের লাস্ট রিপোর্টেড লোকেশন আতনা গ্রাম। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় সে স্পোর্টস শু পরে বেরোয়, যেটা সাধারণত সে বাড়ি থেকে দূরে গেলে পরত। সঙ্গে একটি ব্যাগ ছিল। ব্যাগ এবং মোবাইল ক্রাইম সিন থেকে মিসিং ছিল। আমরা ঘটনাস্থল থেকে একটা রক্তমাখা টি-শার্ট উদ্ধার করি, ফরেনসিক জানিয়েছে, ব্লাড প্রোফাইল ভিক্টিম সাগর মণ্ডলের সঙ্গে ম্যাচ করে যাচ্ছে। আমার সন্দেহ ছিল, কিন্তু পিএম রিপোর্ট পড়ে নিশ্চিত হই যে, ভিক্টিমকে বিন্দুমাত্র ডিফেন্সের সুযোগ না দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। খুনি ভিক্টিমের পূর্ব পরিচিত বা অন্য কোনও ঘনিষ্ঠের পাঠানো, যাকে ভিক্টিম বিশ্বাস করে বেরিয়ে থাকতে পারে। খুনি স্থানীয় একটি ট্রাক ড্রাইভারকে মদের সঙ্গে সিডেটিভ মিশিয়ে খাইয়ে, অচেতন করে ট্রাক থেকে নেমে যায়। যেখানে নামে, সেখানে সম্ভবত তার জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল। খুনি কোনও ট্রেল রাখতে চায়নি।

এই গোটা ঘটনায়, আমার সবথেকে বেশি সন্দেহ হয় ভিক্টিমের নিখোঁজ ব্যাগটিকে নিয়ে। মোবাইল এবং ব্যাগ নিয়ে চলে যাওয়া মানে খুনির শুধু হত্যা করাই উদ্দেশ্য ছিল না। ভিক্টিমের কিছু অস্বাভাবিক ক্যাশ ফ্লো দেখে আমার ধারণা হয়, এর ব্যাকগ্রাউন্ড খতিয়ে দেখা দরকার। কলকাতায় আসার পর আমি প্রথম লিড পাই ভিক্টিমের এমপ্লয়ি রেকর্ড থেকে। সে জিঙ্গো বলে একটা ফুড ডেলিভারি কোম্পানির হয়ে কাজ করত। গত ছ’মাসের লগ ইন রিপোর্ট খতিয়ে দেখলে একটা অদ্ভুত প্যাটার্ন দেখতে পাই। কিছুদিন পরপর ভিক্টিম প্রাইম টাইমে লগ-আউট করে অন্যত্র গেছে। আধ বা বড়োজোর এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরেছে। গত ছ’মাসে এরকম ষোলোবার ঘটে। আমার ধারণা হয়, ছেলেটি এই সময়ে কারওর সঙ্গে দেখা করতে যায়। উদ্দেশ্য কী জানতাম না। নিঃসন্দেহ হই ওর এক সহকর্মীর বয়ানে। ভিক্টিম নিজের ফুড ডেলিভারি ব্যাগটি নিয়ে খুব সচেতন ছিল। অন্য কেউ ধরুক পছন্দ করত না। আমি ভিক্টিমের টাওয়ার লোকেশন ম্যাচ করে লোকেশনগুলোতে যাই এবং খোঁজখবর করা শুরু করি। এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকেই আইডেন্টিফাই করতে পেরেছি, যে ভিক্টিমের সঙ্গে ছ’টি লোকেশনে একই সময়ে উপস্থিত ছিল। কিন্তু আয়াম শিওর, আরও এক বা দু’জন আছে, যাদের সঙ্গে ভিক্টিম নিয়মিত দেখা করত।”

কনফারেন্স রুমে একটা গুঞ্জন উঠেছিল। সুদেষ্ণা মিত্র এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা খাঁকরে বললেন, “এটা একটু প্রোজেক্টরে চালাতে অনুরোধ করব। ২০২২-এর ইনটেলিজেন্স রিপোর্ট। এই ধরনের গ্যাং বেঙ্গালুরু আর হায়দরাবাদে প্রথম অ্যাক্টিভ হয়। ইনিশিয়ালি এরা কুরিয়র সার্ভিস মারফত মাল পাঠাত। কোভিডের সময় এসেনশিয়াল সার্ভিস হিসেবে কিছু জিনিসের কুরিয়র বা হোম ডেলিভারি অ্যালাউড ছিল। তখন এই গ্যাংগুলো প্রচণ্ড অ্যাক্টিভ হয়ে ওঠে। মূল অর্ডারগুলো হত ডার্ক ওয়েব মারফত। তারপর নানা কনট্যাক্ট ঘুরে সেন্ডার আর রিসিভারের মধ্যে কথা চালাচালি হত। বেঙ্গালুরু পুলিশ গত বছর ডিসেম্বরে ১৪০ কোটির একটা বেআইনি কনসাইনমেন্ট ধরেছিল। তারপর নিয়মের কড়াকড়ি শুরু হয়। কনসাইনমেন্টে কী আছে তার ডিটেলস কুরিয়র কোম্পানি আর ডেলিভারি এগজিকিউটিভদের কাছে থাকা কম্পালসরি হয়।”

“প্লিজ ইলাবোরেট।” সিপি বললেন।

“কুরিয়রে মাল পাঠানো বন্ধ হলে, এরা ফুড ডেলিভারি চেনে শিফ্‌ট করে। অপেক্ষাকৃত সেফ। প্লাস ফুড ডেলিভারি এগজিকিউটিভদের, রাস্তাঘাট হাতের তালুর মতো চেনা। এসআই বোস আমাদের যা ইনফরমেশন দিয়েছেন, তাতে উই সাসপেক্ট একটা নারকোটিক্স গ্যাং কলকাতায় অ্যাক্টিভ হয়েছে। কতদিন অপারেট করছে জানা নেই, কিন্তু এদের মাধ্যমে নারকোটিক্স-এর ডোরস্টেপ ডেলিভারি হচ্ছে। তারক, বিরজু, ভিক্টিম সাগর মণ্ডল এই র‍্যাকেটের মেম্বার।” সুদেষ্ণা মিত্র বললেন।

“ম্যাম, সাগরের কাছে যে ব্যাগটা ছিল, তাতে স্ট্যাশ ছিল বলে আমার ধারণা। ওকে মারার পর, খুনি ব্যাগ এবং মোবাইল নিয়ে যায়।

“তার মানে ভিক্টিম এবং মোস্ট প্রোবেবলি আরও কিছু ছেলেপিলে পোটেনশিয়াল কাস্টমারদের এভাবে পার্সোনালি ড্রাগস সাপ্লাই দিচ্ছে?” ডিসিডিডি বললেন।

“সম্ভাবনা সেটাই। কলেজ, ক্লাব, পাব এগুলোতে এনসিবির নজরদারি। তাই ঘুরপথে পার্সোনাল ডোরস্টেপ ডেলিভারি। ক্লায়েন্ট একটা কনভেনিয়েন্ট লোকেশন চুজ করে, এরা গিয়ে ডেলিভারি দেয়। পুরো কমিউনিকেশনটা কোনও অ্যাপ মারফত হয়ে থাকে। এসআই বোস আমাদের যে সাসপেক্টের নাম পাঠিয়েছেন, সে কলকাতার একটি নামকরা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের স্টুডেন্ট। সে নিজে ড্রাগস নিত অথবা বিক্রি করত।”

“ইউ মিন এ পেডলার।” ডিসিডিডি বললেন।

“আমি অন্য কথা ভাবছি। যদি এটা সত্যি হয়, এরা জিঙ্গোর অনেককেই কাজে লাগাতে পারে। বেশ বড়োসড়ো মাথা আছে পিছনে।” সিপি গম্ভীর হয়ে বললেন।

“রাইট স্যার।”

“কিন্তু এটা এখন কোনওভাবেই মিডিয়ায় লিক হলে মুশকিল। এরা সতর্ক হয়ে গেলে কিচ্ছু করা যাবে না। আই হোপ ইউ মেনটেন্ড ডিসক্রিশন ইন দিজ ম্যাটার, মিস বোস?” সিপি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।

“অ্যাবসুলিউটলি স্যার।”

“আমি আমাদের তরফে ছ’-সাতটা রেইড টিম তৈরি করতে বলছি। তারকের আর বিরজুর খোঁজে জেলাগুলোয় যাক। সিআইডির সঙ্গে কো- অর্ডিনেট করে কাজ করুক। আর নারকোটিক্স ব্যুরোকে ইনফর্ম করছি অ্যাসাপ। জিঙ্গোর ডেলিভারি এগজিকিউটিভদের উপর ভিজিলেন্স রাখা হবে।” সিপি বললেন।

আমি সুদেষ্ণা মিত্রের দিকে তাকালাম। টেকনিকালি এই কেসে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। রেইড টিমে কলকাতা পুলিশের অফিসাররা থাকবেন, আর সিআইডির অভিজ্ঞ অফিসাররা তাঁদের সাহায্য করবেন। আমাকে থানায় ফিরে যেতে হবে। সাগরের খুনি এখনও অধরা। তার মানে অফিশিয়ালি কেস ক্লোজ হল না।

তন্ময় সামন্ত এতক্ষণে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছিলেন। ডিসিডিডি এবং সিপির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার কিছু কথা বলার ছিল স্যার।”

“হ্যাঁ বলুন। চুমকি প্রামাণিক মার্ডার কেসের কত দূর এগোল?”

“জাস্ট ওটা নিয়েই কথা বলব স্যার। ইনফ্যাক্ট ম্যাডাম বোস যেখানে শেষ করলেন, আমি সেখান থেকেই শুরু করব।”

সিপি ঘড়ি দেখে বললেন, “কাম টু দি পয়েন্ট সামন্তবাবু।”

“ইয়েস স্যার। প্রথমেই আমি ম্যাডাম বোসকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাব। এই পুরো ইনভেস্টিগেশনে নানা ইনফরমেশন দিয়ে উনি আমাদের প্রভূত সাহায্য করেছেন। আমরা তো অলমোস্ট বিশ্বাসই করে ফেলেছিলাম, সাগর মন্ডল, চুমকি প্রামাণিক মার্ডার কেসের আসামি নয়। কিন্তু কালকের ঘটনার পর বলতে বাধ্য হচ্ছি আমাদের পারসেপশন পাল্টেছে।”

“পারসেপশন নিয়ে এত ল্যাজেগোবরে অবস্থা হলে দু’দিনের মধ্যে প্রেস করেছিলেন কেন?” সিপি বিরক্তমুখে জিজ্ঞাসা করলেন।

তন্ময় সামন্ত ডিসিডিডির দিকে তাকালেন। তিনি উত্তর দিলেন না কোনও। “আমি পুরো রিপোর্টটা পড়েছি। হাইলি ডিসঅ্যাপয়েন্টিং। একটা মেয়ে রাত পৌনে ন’টায় তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বাইকে বেরোয়। লাস্ট লোকেশন রিপোর্টেড বালিগঞ্জ কেএমসি অফিসের সামনে। খুন হয় বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে। খুনের আগে মেয়েটাকে মাথায় মারা হয়। ব্লান্ট ফোর্স ট্রমা। তারপরেও মেয়েটা প্রায় তিন ঘণ্টা বেঁচে ছিল। এই সময়টুকুর মধ্যে মেয়েটা কোথায় ছিল, কোথায় তাকে আটকে রাখা হয়েছিল কিছুই জানা যায়নি!”

“স্যার, নিয়ারবাই লোকেশনে একটাই সিসিটিভি। সেটা অকেজো। শরৎ বোস রোড আর বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ক্লোজেস্ট লোকেশনে অন্য সিসিটিভিগুলো মনিটর করে ওদের কোনও ট্রেস পাওয়া যায়নি।” ডিসিডিডি মিনমিন করে বললেন।

“সাগর মণ্ডলের মোবাইল লোকেশন কী দেখাচ্ছিল?”

“স্যার, সাড়ে ন’টার সময় সাগরও কেএমসি অফিসের সামনেই ছিল,” ডিসিডিডি নাকের উপর চশমা ঠিক করতে করতে বললেন। “আমি ভাবছিলাম

যে, ইট ওয়জ কোয়ায়েট পসিবল যে সাগর মেয়েটাকে আহত করে কোথাও আটকে রেখেছিল, পরে খুন করে। মানে জাস্ট টু ক্রিয়েট এন অ্যালিবাই।”

“কী ভেবেছিলেন বাদ দিন, জায়গাটা কি পেয়েছেন যেখানে মেয়েটাকে আটকে রাখা হয়েছিল?”

“নো স্যার।”

“এক্সেলেন্ট!”

তন্ময় সামন্ত একইভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একটু সামনের দিকে ঝুঁকে ঠান্ডা গলায় বললেন, “প্লিজ অ্যালাও মি টু কাম টু দা পয়েন্ট স্যার। ম্যাডাম বোস একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। সাগর মণ্ডলের হাতে অস্বাভাবিক ক্যাশ ফ্লো ছিল। স্বাভাবিক আয়পাতির বাইরে আর-কি। গতকাল আমরা চুমকি প্রামাণিকের ব্যাংক স্টেটমেন্ট তুলি। তাকে দেখা যায় চুমকি ওর অ্যাকাউন্টে মাঝে মাঝেই বেশ বড়ো অ্যামাউন্টের ক্যাশ জমা করেছে। আবার সেটা তুলেও নিয়েছে। আমাদের মনে হয় সাগরের অস্বাভাবিক ক্যাশ-ফ্লোর সঙ্গে চুমকির অ্যাকাউন্টের ক্যাশ-ফ্লোর সম্বন্ধ আছে। চুমকি আর সাগর হয় যুক্ত ছিল অথবা সাগর চুমকিকে ব্যবহার করছিল।”

“সাগর কোনওভাবেই খুনি হতে পারেনা। তার একাধিক প্রমাণ আছে।” আমি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করি।

তন্ময় সামন্ত আমার দিকে পিছন ঘুরে হাসেন। বলেন, “আহা! সাগর যে খুনি, তা আমি বলছি না ম্যাডাম। কিন্তু সে-রাতে সে যে চুমকিকে বাইরে ডেকে এনেছিল, এটা তো সত্যি? আপনি অস্বীকার করতে পারেন?”

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, “না।”

“তা হলে বাইরে ডেকে এনে, খুন যে অন্য কাউকে দিয়ে করায়নি, সেটা কীভাবে শিওর হচ্ছেন?”

কনফারেন্স রুমে একটা নৈঃশব্দ্য নামে। একটা অনভিপ্রেত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সকলেই বুঝতে পারছিলেন। হাল ধরলেন সিপি স্যার। ডিসিডিডির দিকে তাকিয়ে বললেন “একটা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম তৈরি করে দাও। চুমকি প্রামাণিক হত্যার যৌথ তদন্ত করুক। স্টেট পুলিশ, লালবাজার আর সিআইডি একসঙ্গে কাজ করুক। অনলি ফিউ সিলেক্টেড কমপিটেন্ট অফিসার্স। আমি পারমিশন আনানোর ব্যবস্থা করছি।”

আমার বুক ধুকপুক করছিল। ডিসিডিডি, এসপি পুরুলিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের তরফে কে থাকছেন?”

“দর্শনাই থাকুন না। এসপি সাহেবের আপত্তি না থাকলে?” সুদেষ্ণা মিত্ৰ এসপি পুরুলিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন।

“উনি অনেকটা জুনিয়র। সিনিয়র কাউকে ট্যাগ করে দিন। কিছু গড়বড় হলে আমরা কিন্তু কোনও রেসপনসিবিলিটি নেব না।” ডিসিডিডি ব্যাজারমুখে বললেন।

“আমার ওঁর কমপিটেন্সে কোনও সন্দেহ নেই। আমি পার্সোনালি মনিটর করব ওঁকে। প্রয়োজনে সিনিয়র কাউকে ট্যাগ করব। কিন্তু দর্শনা হ্যাজ এ প্রায়র এক্সপেরিয়েন্স ইন বর্ধমান সিআইডি। হিউম্যান ট্র্যাফিকিং, পরে বোধহয় হোমিসাইড? তাই তো?” সুদেষ্ণা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

“ইয়েস ম্যাম।”

“বেশ, লালবাজারের তরফে আমি তন্ময় সামন্ত আর বিজন বসুকে রাখছি। নারকোটিক্সের ত্যাগীও থাকবেন। সিআইডির তরফে কে থাকবেন?”

“আমি দেখে কাল জানাচ্ছি স্যার।” সুদেষ্ণা মিত্র বললেন।

.

কনফারেন্স রুমের বাইরে বেরোলে গরমের হলকা এসে চামড়া পুড়িয়ে দেয়। তন্ময় সামন্ত আমার দিকে তাকিয়ে এই প্রথমবার হাসলেন। হাসিটা তাচ্ছিল্যের নয়, আবার বন্ধুত্বপূর্ণ— তাও বলা যায় না। বিজন পিছন পিছন বেরিয়ে এসেছিলেন। একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ার শব্দ পেলাম। আমি বিজনের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আপনি কিন্তু এখনও আমাকে সেই সিসিটিভি ফুটেজটা পাঠাননি।

“কোনটা?”

“ওই তো ওষুধের দোকানের।”

বিজন একগাল হেসে বললেন, “এখন তো আর পাঠানোর কিছু নেই। গোটা সংসারই আপনার। আপনি রাঁধুন, বাড়ুন, কি সেদ্ধ করুন, সবেতেই আছি।”

“স্পষ্ট ফুটেজ?”

“একদম ঝকঝকে। তল্লাটটাই ঝকঝকে। বিভাবরী থেকে বেরিয়ে বাঁ হাতে কুড়ি কদম হাঁটলেই ওষুধের দোকান।”

“বিভাবরী!”

“হ্যাঁ তো। চুমকি প্রামাণিকের কাজের বাড়ি। কর্নফিল্ড রোডে, একডালিয়া এভারগ্রিনের কাছে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *