১
বিজনের হাতের ট্যাবে ফুটেজটা চলছিল। টাইম স্ট্যাম্প রাত আটটা আটচল্লিশ, ২৪ ফেব্রুয়ারি। সাগরকে আগে থেকেই এটিএমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। বাইক, বেগুনি রঙের জামা। হাবেভাবে অস্থিরতা। বারবার পিছন ঘুরে দেখছে। আটটা পঞ্চাশ নাগাদ চুমকি এসে পৌঁছোচ্ছে। হলদে সালোয়ার- কামিজ, চুল পনিটেল করে বাঁধা। মেয়েটি সাগরের বাইকের পিছনে এসে দু’সেকেন্ড দাঁড়ায়, কিছু একটা চিন্তা করে, যেন কোনও ব্যাপারে মনস্থির করছে। তারপর দ্রুতপায়ে সাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সাগর চুমকিকে দেখে রাগে ফেটে পড়ছে, চুমকি হাত-পা নাড়িয়ে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে। আশেপাশের পথচারী যেতে যেতে ওদের দিকে তাকাচ্ছে। চুমকিও কথা বলতে বলতে বার বার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ওর আর সাগরের কথাবার্তা ওর কাছে ক্রমশ অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে। ও সাগরকে কাটিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে, সাগর ওকে কনুই ধরে জোরে টেনে, বাইকে বসতে নির্দেশ করছে। পাঁচ মিনিট চল্লিশ সেকেন্ডের মাথায় বাইক ফ্রেম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
“এর পরের টাওয়ার লোকেশন, বালিগঞ্জ কেএমসি অফিস?”
“হ্যাঁ।” বিজন বললেন।
“সেটা এই লোকেশন থেকে কত দূর?”
“খুব কাছে। বাইকে দশ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। চুমকির ফোন ওখানেই বন্ধ হয়।” বিজন গাড়ির কাচ নামিয়ে বললেন।
“প্রায় ছ’মিনিট সময়। কী নিয়ে এদের দু’জনের এত তর্ক হচ্ছিল সেটা কিছু জানা গেছে?”
বিজন মাথা নাড়িয়ে বললেন, “না। প্রত্যক্ষদর্শী কারওর স্টেটমেন্ট পাইনি। কে আর ঝামেলায় জড়াতে চায়। এটিএমটা বন্ধ, না হলে ওটার সিসিটিভি ফুটেজ থেকে কিছু বোঝা যেত। রাস্তার ওপারের দোকান, ফলে শুধু জেসচার ছাড়া কী বুঝবেন?”
লালবাজারের গাড়ি সিগন্যাল থেকে ডানদিকে ঘুরে গেল। একডালিয়া এভারগ্রিনকে বাঁ দিকে রেখে, ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনস হয়ে ডানদিকে যে রাস্তা ঢুকেছে, সেটির নাম কর্নফিল্ড রোড। কাছেই সাউথ পয়েন্টের জুনিয়র স্কুল, আর্ট অফ লিভিংয়ের গড়িয়াহাট সেন্টার। দেবদারু, ঝাউয়ের সারি দিয়ে সাজানো পথ। আবাসনের ফাঁকে ফাঁকে বুটিক, বেসকিন রবিন্স, টাইটনের শোরুম।
“আর পাঁচ মিনিট।” বিজন পা চালিয়ে বললেন।
বিভাবরী পনেরো তলার একটা বিরাট অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। আটটা ব্লক। স্বস্তিকার মতো আয়তনে না হলেও বেশ বড়ো মাপের। আমার মন বলছিল, প্রমিতের আর চুমকির কাজের বাড়ির ঠিকানা একই হওয়াটা একটা আশ্চর্য সমাপতন। মনকে প্রবোধ দিচ্ছিলাম, পৃথিবীতে কাকতালীয় ঘটনা কি ঘটে না?
বিভাবরীর স্পার্টেক্স লাগানো উঠোনে বড়ো বড়ো গাছ— বোধহয় জমিটিতে ফ্ল্যাটবাড়ি ওঠার আগে থেকেই ছিল। কুল, বকুল, জাম, কাঠচাঁপা, এই ক’টা চিনতে পারলাম। পাতা ঝরে যাতে উঠোন নোংরা না হয়, সেজন্য গাছের কাগুগুলোর সঙ্গে নেট বাঁধা। কমপ্লেক্সে ঢোকার মুখে সিকিউরিটি অফিস। অচেনা গাড়ি দেখলে থামিয়ে, গাড়ির নম্বর নোট করছে একজন সিকিউরিটি গার্ড। কলকাতা পুলিশের গাড়ি দেখে স্যালুট করে ছেড়ে দিল।
“এতদূর আসত কীভাবে? অটোতে?” আমি ডি ব্লকের লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। প্রতিটা ফ্লোরে চারটে করে ফ্ল্যাট বিভাবরীতে। দুটো লিফ্ট। প্রতিটা ব্লকের বাইরে আলাদা সিকিউরিটি বসে পাহারা দিচ্ছে। নিরাপত্তার নিরিখে বেশ কড়া ব্যবস্থা।
“সাইকেলে।” বিজন আমার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন।
“ক’টা থেকে ক’টা কাজ করত এখানে?”
“দুপুরে দুটো থেকে রাত সাড়ে ন’টা।”
“অনেকক্ষণ তো!” আমি অস্ফুটে বললাম।
“সেই তুলনায় মাইনে কত, সেটাই যাচাই করার বিষয়।” বিজন আমার দিকে হেসে বললেন।
ডি ব্লকের সেকেন্ড ফ্লোরে ডি ৩-এর বাইরে বেল বাজালেন বিজন প্রথমবার বাজিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা, তারপর আবার। দিনের ব্যস্ত সময়। ডি ওয়ান থেকে একটি কলেজ পড়ুয়া মেয়ে লিফটে উঠল। ডি ২-এর এক সৌম্যদর্শন যুবক, হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামলেন। ডি ফোর বন্ধ। বোধহয় কেউ থাকেন না। কোলাপসিবলে ধুলো জমেছে। ডি থ্রি-র বাইরে কোনও নেমপ্লেট নেই। সম্প্রতি খোলা হয়েছে তা দরজার উপর বিবৰ্ণ চৌখুপ দেখে বোঝা যায়। বেল বাজানোর প্রায় দু’মিনিট পর ফ্ল্যটের দরজা খুললেন সুবেশা এক মহিলা। কোথাও বেরোবেন বলে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, আমাদের দেখে উদ্বিগ্ন চোখে তাকালেন। আসার কারণ জানাতে ইতস্তত হয়ে ভিতরে ডাকলেন।
বসার ঘরটি প্রশস্ত। গতানুগতিক সোফার বদলে সব কাঠের আসবাব। একটি কারুকাজ করা কাশ্মীরি কাঠের প্যানেল আড়াআড়ি রাখা। দেওয়ালে গ্রে-স্কেলের ফ্রেম করা কলকাতা কোলাজ, টেবিলে অনেক বিষয়ের বই, ঘরের কোণে প্রায় চারফুট উচ্চতার কাঠের প্যাঁচা আর সুদৃশ্য প্ল্যান্টারে রাখা ইনডোর প্ল্যান্ট— সুরুচি আর স্বচ্ছলতার ছাপ ঘরটির সর্বাঙ্গে।
মহিলাকে মন দিয়ে দেখলাম। বয়স পঁয়তাল্লিশের ওপারে। তন্বী, শ্যামা। শিখরদশনা বলা যাবে না বোধহয়। দাঁতগুলি একটু আকারে বড়ো। সাধারণ চেহারা। কিন্তু বয়সোচিত গাম্ভীর্য আর পরিপাটি ভাব আছে ব্যক্তিত্বে। একটু অপ্রস্তুতভাবে বললেন, “একটু বেরোচ্ছিলাম আসলে। পরে যদি কথা বলা যেত।”
ঘরে ঢুকে এককোণে জুতো ছাড়ার জায়গা। গোড়ালি থেকে জুতো খুলতে খুলতে বললাম, “ক’টা প্রশ্ন আছে। আপনাদের ফ্ল্যটেই তো চুমকি কাজ করত?”
“হ্যাঁ! থানার সিদ্ধার্থবাবু একদফা জিজ্ঞাসাবাদ করে গিয়েছিলেন তো!”
মহিলা একটা কাঠের ফোল্ডিং সোফায় গিয়ে বসলেন। একটি ছয়-সাত বছরের ছেলে ড্রয়িং কপিতে এক মনে প্যাস্টেল রং ঘষে যাচ্ছিল। নীল, কালো আর বেগুনি রঙের প্যাস্টেলে কী ছবি ফুটে উঠছে, এখান থেকে দেখা যায় না। মা পাশে বসাতে ছেলেটি পা গুটিয়ে নিল। আমাদের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে আবার খাতায় রং ঘষতে লাগল। ছেলেটার পায়ের কাছে, সোফার নীচে অনেক সাদা পাতা ছড়ানো। দু’-একটা আঁচড় কেটে ফেলে দিয়েছে। মিসেস দত্ত আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি কী জিজ্ঞেস করছিলেন?”
বাচ্চাটার থেকে চোখ সরালাম। গলা খাঁকরে বললাম, “হ্যাঁ, আমি আসলে চুমকির বয়ফ্রেন্ড সাগর মণ্ডলের মার্ডার ইনভেস্টিগেশনে এসেছি। পুরুলিয়া থেকে।”
মহিলা চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালেন। তারপর বললেন, “সাগর? ওই অসভ্য ছেলেটা?”
রেকর্ডার অন করার পারমিশন নিয়ে বললাম, “কী অসভ্যতা করেছিল?”
“চুমকিকে সন্দেহ করত খুব। ফোন করে করে উত্ত্যক্ত করে মারত। কখন আসছে, কখন বেরোচ্ছে, কেন আধঘণ্টা বেশি লাগল… কাজ করতে করতে
অত ফোন আসলে কাজ করবে কখন?”
“আপনি আপত্তি জানাননি?”
মহিলা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “জানাব না কেন? কাজ ছেড়ে দিতেও বলেছিলাম। অন্য লোক দেখছিলাম। পা ধরে পড়ল। গরিব মানুষ। কাজ চলে গেলে অসুবিধে। আমার বাড়ির কাজে সবচেয়ে বেশি মাইনে পায়। বলে সাগর আর কাজের সময় করবে না। আমিও তারপর নরম হয়ে যাই। এমনিতে মেয়েটা কাজের। আমায় কোনওদিকে তাকাতে হয় না। আমার ছেলেটাও খুব ন্যাওটা। এত টাকা মাইনে দিলেও সেটা উসুল হয়ে যায়।”
“কত মাইনে দিতেন?”
“দশ হাজার।”
“আপনার এখানে কতদিন কাজ করছে চুমকি?”
“তা অনেকদিন। তিন বছর হতে চলল।”
“বিশ্বস্ত? হাতটান বা কিছু?”
ভদ্রমহিলা ভুরুতে ভাঁজ ফেলে বললেন, “দেখুন, খাবারদাবারের দিকে ঝোঁক ছিল খুব। ফ্রিজে বাসি কেক টেক থাকলে আগে চেয়ে চিনতে ভাইয়ের জন্য নিয়ে যেত। ওর ভাই হারানোর পর সেটা আর নেয়নি। তবে টাকাপয়সা কোনওদিন সরায়নি। অবশ্য সুযোগও পেত না। আমি আর আমার হাজব্যান্ড খুব সাবধানি। বাড়িতে ক্যাশ রাখি না বললেই চলে।”
বিজন জল খাচ্ছিলেন। গ্লাসটা জোরে ঠক করে নামিয়ে রাখলেন। আমি শব্দটা উপেক্ষা করে বললাম, “আচ্ছা, এই যে সাগরের ফোন করা, বিরক্ত করা,
এসব কবেকার কথা?”
“অত মাস-দিনের হিসেব মনে নেই। রেগুলার ফোন করত। রিসেন্টলি একটু থেমেছিল।”
“আপনার এখান থেকেই তো লাস্ট কাজ সেরে বেরোয়?”
ভদ্রমহিলার মুখে একটা বিরক্তির ছাপ পড়ল।
“হ্যাঁ। আশ্চর্য কাণ্ড করেছিল সেদিন। রুটি করে রেখে যায়নি। পাশের বাড়িতে চাবি দিয়ে চলে গেছে।”
“পাশের বাড়ি কেন? বাড়িতে কেউ ছিল না?”
“ছিল বলতে আমার ছোটোছেলে। সন্ধেবেলা পাশের ফ্ল্যাটে পড়তে যায়। ওই সময়টা ফ্ল্যটে কেউ থাকে না।”
“ওখানেই চাবি দিয়ে গিয়েছিল?”
“না, না। দিলীপবাবু ভীষণ অন্যমনস্ক লোক। চাবিটাবি হারিয়ে ফেলেন। ডি ওয়ানে শর্মাদের কাছে চাবি দিয়ে গিয়েছিল। ওখানেই দেয় কোনও ইমার্জেন্সিতে।”
“এরকম কি আগেও করেছে ও?”
“নাহ্।”
আমি মহিলার দিকে তাকালাম। ওঁর হাবভাবে একটা ডাঁটো ব্যাপার আছে। মা হিসেবেও মনে হয় খুব কড়া।
“চুমকিকে কে খুন করল, কিছু বলতে পারবেন? মানে কারওর সঙ্গে শত্রুতা, হুমকি, ঝগড়াঝাটি… বস্তিতে কিছু সমস্যা… কিছু বলেছিল কখনও?”
“ওসব কিচ্ছু না।” মহিলা জোর গলায় বলে উঠলেন, “ওই সাগর…ওই মেয়ের খুনি সাগর ছাড়া আর কেউ নয়। আজকাল পেপারে কীসব বেরোয়, দেখেন না? সন্দেহ করে মেরে ট্রাংকে ভরে গঙ্গায় ফেলে দিয়েছে। ওই ছেলে ওই জিনিস।”
“আচ্ছা। বুঝতে পেরেছি। আজ আর আপনাকে আটকাব না। পরে আবার আসতে হতে পারে।”
হাঁফ ছেড়ে ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়ালেন। ওঁর নাম মৌলি দত্ত। কসবায় একটা বুটিক চালান। এগারোটা থেকে ন’টা অবধি ওখানেই থাকেন। হাজব্যান্ড গৌরকিশোর দত্ত, জগদ্বিখ্যাত ওষুধ কোম্পানির রিজিয়োনাল সেল্স ম্যানেজার। বেশিরভাগ সময়েই টুরে থাকেন। তবে এখন কলকাতায় আছেন।
মৌলি দত্ত আমাদের এগিয়ে দিতে গিয়ে প্যাসেজে একটা ছবির সামনে দাঁড়ালেন। ফ্যামিলি ফোটাগ্রাফ। তার পাশে চাবির রিং-এ ফ্ল্যাটের চাবি ঝুলছে। মহিলা চাবির দিকে হাত বাড়ালেন। আমরা বেরোলে উনিও বেরোবেন। বিজন দরজার বাইরে চলে গিয়েছিলেন। আমার পা ছবির সামনে আটকে দিয়েছিল কেউ। ছবির দিকে নির্দেশ করে বললাম, “ইনি কে?”
ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফে চারজনের ছবি। মিস্টার আর মিসেস দত্ত আর দুই ছেলে। বড়োটির দিকে তাকিয়ে মৌলিদেবী বললেন, “ও বাবাই, আমার বড়োছেলে। ভালো নাম প্রমিত দত্ত।”
“উনি… উনি কী করেন?”
“ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে, পায়োনিয়রে… কেন?” মৌলি ভুরু কুঁচকালেন।
“ওঁকে দেখলাম না তো,” আমি কোনওক্রমে বললাম।
“এখানে নেই, সেমিনারের জন্য শিলিগুড়ি গেছে। সামনের মঙ্গলবার ফিরবে।”
মৌলি দত্ত ভিতর থেকে লক পুশ করে দরজা টেনে দিলেন। লিফটে উঠে গেলেন। আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি দেখে, বিজন বললেন, “আপনি কি পাশের বাড়িগুলোতেও জিজ্ঞাসাবাদ করবেন?”
আমি সাময়িক ধাক্কা কাটিয়ে মাথা নাড়ালাম।
“এই ভদ্রমহিলার ছোটো ছেলে আমার বাচ্চাদের সহপাঠী। গোলপার্কের গার্ডেন ভ্যালি স্কুলে পড়ে। আগের বার এসে জেনেছিলাম। মহিলা বোধহয় পিটিএমে যাচ্ছেন। আমার স্ত্রীও আজ গেছেন। মার্চের মাঝামাঝি ফাইনাল পরীক্ষা। প্রতি পরীক্ষার আগে বাবা-মাকে গলায় গামছা দিয়ে দাঁড়াতে হবে। কী জ্বালা বলুন তো? আরে আপনি এমন চুপ মেরে গেলেন কেন!”
.
বিভাবরীর চারধারটা ঘুরিয়ে দেখালেন বিজন। প্রতিটি ব্লকে ঢোকার মুখে দুটো করে সিসিটিভি ইনস্টলড আছে। লিফ্ট লবিতেও তাই। একটা ডেস্ক বসানো আছে, যেখানে দু’জন বসে এন্ট্রি রেজিস্টার সামলান। দেওয়ালে একটা বোর্ডে ফ্ল্যাটমালিকদের নাম ও ফ্ল্যাট নম্বর লেখা। ক’টা চাবির গোছা দেওয়ালে ঝুলছে। সিকিউরিটি দু’জনের ডোরাকাটা জামায় নেম-ট্যাগ সেলাই করা। প্রতুল বলে যাকে অপেক্ষাকৃত চটপটে মনে হল, সে খাতা খুলে দেখালো।
“চব্বিশ তারিখ রাতে কে ডিউটিতে ছিল?”
“আমিই ছিলাম ম্যাডাম।” প্রতুল জানাল।
“প্রতিটা এন্ট্রি আর এক্সিট নোট করেন তো?”
“নিশ্চয়ই ম্যাডাম।”
“যারা রোজ এখানে আসে, মালি, কাজের লোক, ড্রাইভার সবার?”
“একদম। সই করে ঢোকে, বেরোয়। শুধু তাই নয়, এখন ফ্ল্যাট কমিটি থেকে নিয়ম করেছে, পরিচিত মুখ না হলে আগে ফোন করে ফ্ল্যাটে জানাতে। তারপর এন্ট্রি দিতে।”
“আগে এটা ছিল না?”
“না ম্যাডাম। পুজোর পরপরই এটা স্টার্ট হয়েছে। তখন সবে কাজে লেগেছি।”
“নিয়মটা কেন বদলাল জানো?”
“শুনেছি বি ব্লকে কিছু একটা ঝামেলা হয়েছিল। ঠিক জানি না। কমিটির প্রেসিডেন্ট এসে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।”
“তোমার সঙ্গে উনি?” অন্য সিকিউরিটি গার্ডের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম। “আমি নতুন ম্যাডাম। এই মাসেই জয়েন করেছি।”
বিজন আমার পাশে পাশে হাঁটছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মাত্র দশ হাজার। সাত সাড়ে সাত ঘণ্টার কাজ। সকালে একটা ঠিকের কাজ করত। সেখানে পেত বারোশো। মোটামুটি এগারো হাজার টাকা। এদিকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রতি দু’-তিন মাস অন্তর পঁয়তাল্লিশ হাজার, চল্লিশ হাজার করে ব্যালান্স দেখাচ্ছে।”
“ক্যাশ ডিপোজিট?”
“হ্যাঁ। আবার সে-টাকাও এটিএম থেকে তুলেছে ঘন ঘন।”
“টাকা জমা, তোলার কোনও রেগুলার প্যাটার্ন আছে? মানে আমি বলতে চাইছি, এক মাসের বা পনেরো দিনের কোনও সাইকেল?”
বিজন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নের মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, “নাহ্। সাত দিন, দশ দিন, বাইশ দিন এরকম। কোনও প্যাটার্ন নেই।”
“কোথাও কোনও ধারকর্য? কুলতলিতে জমিটমি বিক্রি?”
“না ম্যাডাম। কুলতলিতে আমরা খোঁজ নিয়েছি। চাষবাস করা ফ্যামিলির মেয়ে। জমিজমা সেরকম কিছু ছিল না। কোভিডে রোজগার ছিল না। যতটুকু ছিল বেচে খেয়েছে। তারপর বাপ-মা মরতে এখানে…”
প্রমিত দত্ত মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। বিজনের দিকে তাকিয়ে বললাম, “সাগরের সঙ্গে অ্যাটাচমেন্টের এটাও একটা কারণ হতে পারে।”
“অ্যাটাচমেন্টের ব্যাপারগুলো বেশ রহস্যজনক বুঝলেন— দাদু বলেছেন, শুনেছিনু, প্রেমের কুঞ্জে অনেক বাঁকা গলিঘুঁজি।”
“বটে?”
“আলবাত। এই যেমন ধরুন, কানাই, চুমকির কাকা, সে মাল যে এমন ক্যাসানোভার নাতি, দেখে বুঝতেই পারবেন না।”
“বলেন কী?”
“হ্যাঁ। স্টেটমেন্ট তো পড়বেনই। এখন পথে যেতে যেতে গল্প শুনুন।”
২
বিজন বসুর স্মৃতি থেকে
চুমকি খুন হয়েছে আজ দু’দিন হল। পেয়ারাবাগান বস্তির পিছনদিকটায় ওর ভাড়ার ঘর। এদিকটায় একটা রাবিশ ফেলার ভ্যাট আছে, আর একটা পাবলিক টয়লেট কমপ্লেক্স। লোকে বালতি হাতে লাইন দিয়েছে, বালতির মধ্যে সাবান আর শ্যাম্পুর পাতা ফেলা। পায়খানা আর স্নান একেবারে করে বেরোবে। যাদের তাড়া আছে, তারা ভ্যাটটার দিকে যায়। টয়লেটের দিকে পিছন দেখিয়ে হাগা-মোতা দুই-ই চলে। সে-দৃশ্যের সাক্ষী বিড়াল, কুকুর, ষাঁড়, শুয়োর আর চোখ সরিয়ে নিতে অভ্যস্ত নয় এমন মানুষ— যেমনটি আমি।
.
চুমকির কাকা টয়লেট কমপ্লেক্সের কেয়ারটেকার। ঢোকার মুখের দরজাটার কাছে পাহারা দেয়। এমনিতে ডিউটি ভোর পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা। কিন্তু তার মর্জিতে না কুলোলে টয়লেটের দরজায় চাবি দিয়ে ঘণ্টাখানেক বেপাত্তা থাকে। লোকটার নাম কানাই। চল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছর বয়স হবে। এককালে চাম্পাহাটিতে বাজি কারখানায় কাজ করত। বিস্ফোরণে ডান হাতের আঙুল উড়ে যায়। সরকারি ক্ষতিপূরণ পেয়েছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা। কিন্তু ওই টাকায় তো আজীবন পেট চলে না। লোককে ধরে করে সে এই সরকারি টয়লেট কম্পপ্লেক্সের চাকরি জুটিয়েছে। বিয়ে করেনি। তার দরকারও পড়েনি। লোকাল মস্তান মেহতাব আলম ওরফে ছিটকুর দেওয়া ইনফরমেশন অনুযায়ী, কানাইয়ের চারটে পাকাপাকি গার্লফ্রেন্ড। চারটে চার বয়সের। তারাও পেয়ারাবাগান বস্তির আশেপাশের বাসিন্দা। ও যে একসঙ্গে চারজনের সঙ্গে খেলে বেড়ায়, সেটা কেউ-ই টের পায় না। ছিটকুর দল বাদে। ওরা ওকে লুডো কানাই বলে ডাকে। কানাই সেয়ানা মাল, চার রঙের ঘুঁটি খেলায় যাতে সমস্যা না আসে, তাই ছিটকুর দলবলের জন্য স্পেশাল একটা টয়লেট বরাদ্দ আছে। সেটা আলাদা করে তালা মারা থাকে।
কানাই তখন ডিউটিতে ছিল। আকাশি নীল রঙের শার্ট, বাদামি রঙের প্যান্ট। তাতাপোড়া গরমের জন্য মাথায় টুপি। তিনশো পঁয়ষট্টি দিন ও নীল শার্ট পরে। ছিটকু আমাকে পাবলিক টয়লেটের দিকটা দেখিয়ে দিয়েছিল। মেহতার সঙ্গে বস্তির লোকেদের বিরোধ তুঙ্গে তখন। ওদের বক্তব্য বস্তির লোককে খামোকা ‘পরেশান’ করছে পুলিশ, মেহতাকে তুলে থানায় আনুক। দু’দিন ব্যাটম দিক। দেখা যাবে, ও শালা সত্যিটা বমি করে উগরোবেই! ওই চশমখোর মালই চুমকিকে মারিয়েছে।
“মেহতা চুমকিকে মারিয়েছে?” আমি ছিটকুর কাছ থেকে ওর উত্তরটা জানতে চেয়েছিলাম।
ছিটকু ঠোঁট উল্টে ঘাড়ের পিছনে হাত বুলোল।
“হতেও পারে স্যার। আমি কি আর পুলিশ?”
“হুম। কাকে দিয়ে?’
“হবে শালা কোনও হারামির বাচ্চা! পয়সা ছড়ালে কাকের অভাব হয় নাকি?” ছিটকু মুখ থেকে গুটকার থুতু ফেলে বলল।
“তা এরকম কাক তোদের বস্তিতে নেই?”
ছিটকু চমকে আমার দিকে তাকাল। তারপর মাথার গম্ভীরস্বরে বলল, “কী যে বলেন স্যার! এরকম কেউ থাকলে এই শর্মাই তাকে হিড়হিড় করে টেনে আপনাদের কাছে হাজির করত না?”
“হুম। তা ঠিক। আচ্ছা চুমকির সঙ্গে বস্তিতে কারওর খার ছিল?”
“খার? এখানে সব মিলেজুলে থাকে। কোনও লাফড়া নেই।”
“আগেরদিন থানায় চুমকির কাকা বলেছে, কোন ফ্ল্যাটবাড়ির কাজ নিয়ে কার সঙ্গে যেন চুলোচুলি হয়েছিল গত মাসে?”
ছিটকু একটু থমকাল। তারপর বলল, “চুলোচুলি তো মেয়েরা করেই থাকে স্যার। ওটাকে কি লাফড়া বলা যায়?”
“তাইলে কাকে লাফড়া বলে?”
“লোকের হক ছিনে নেওয়া, তাকে বেইজ্জত করা, দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া।”
“যেমন, মেহতা?”
“একদম। আমরা তো ছোট্ট ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলাম। এতদিন খৈতানদের বাগানবাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে। কবে বেহাত হয়ে যেত। হয়নি কেন বলুন?”
“কেন?”
“এই ছিটকুর জন্য। আমার দলের ছেলেদের জন্য। আমরা পাহারা দিয়ে রেখেছি বলে খৈতানের বাড়ির ইট কাঠ খুলে বিক্কিরি হয়ে যায়নি। নইলে কম লোকের নজর ছিল?”
“খৈতানদের বাড়ির ভিতরে কোনওদিন ঢুকেছিস?”
ছিটকু থতমত খেয়ে বলল, “না তো। মা কসম স্যার, আমরা পুকুরপাড়ে বসে একটু তাসটাস খেলতাম, গানটান শুনতাম, সিগারেট-বিড়ি ফুঁকতাম।”
“সাট্টা আর গাঁজা?”
ছিটকু জিভ কেটে বলল, “মাক্কালী বলছি, ওসব কিছু না। বিশ্বাসদাকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন।”
“তিনি কে?”
“বালিগঞ্জ থানার হাবিলদার। আমাদের খুব চেনেন। খুব উৎসাহ-টাহ দেন।”
“চুমকির বডি যখন উদ্ধার হয়, তুই ছিলি সেই দলে?”
“ছিলাম স্যার। আমরা তো সকাল থেকেই ওই ম্যাডামদের সঙ্গে ছিলাম।”
“চুমকির বডি ওখানে কীভাবে এল জানিস?”
ছিটকু বিরক্ত হল। ভুরু কুঁচকে বলল, “স্যার আপনি সেই এক ঘোঁট পাকাচ্ছেন। চুমকিকে হারামি মেহতা সরিয়েছে। আপনি জানেন না, এই কেসের আগে তিনটে মিটিং হয়েছে ওর সঙ্গে আমাদের। ধিরাজ ভটচাজ, মানে কাউন্সিলার ওকে বলেছিল, বস্তিতে আরও দুটো পাবলিক টয়লেট বানানোর টাকা দিতে। চাকরি দিতে। সেসব ও দেয়নি। পুকুর বুজিয়ে ফেলার পর চুমকি হেব্বি ঝামেলা করেছিল মালটার সঙ্গে। তখন থেকে ও চুমকির উপর খার খেয়ে আছে।”
“মানে পুকুর বোজানোর ব্যাপারটা যে বেআইনি সেটা চুমকি জানত?”
“জানত স্যার। চুমকি ঠিক ঝিঙ্কু মামণি টাইপ ছিল না। একটু পড়াশুনা জানত। ডাঁটও ছিল।”
“তুই এত কথা কী করে জানলি?”
“সাগরের থেকে স্যার। সাগর মণ্ডল, চুমকির বিএফ। আমার হেব্বি ফেরেন্ড।”
“ও আচ্ছা।”
আমি রুমাল বের করে ঘাম মুছলাম। ছিটকুর কথায় তন্ময়দার কথা মনে পড়ে গেল। মাঝে মাঝে টুকটাক যে জ্ঞানগুলো দেয়, সেগুলোকে আমি বলি শ্লোক। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে লোকটা বিরাট ইনফো রাখে। ছিটকুকে বললাম, “রশিদ খানকে চিনিস?”
“সে কে?”
“সে কে বলতে নেই; বল, তিনি কে?” তন্ময়দার স্টাইলে ছিটকুকে বললাম। “তিনি কে?”
“পূজনীয় লোক। নব্বইয়ের দশকে সাট্টা ডন। শোনা যায়, সে-সময়ের পলিটিকাল দাদাদের সঙ্গে খুব ইয়ারিদোস্তি ছিল। তখন আবার আগে গুন্ডা হিসেবে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হত, পরে দাদারা ক্যালিবার দেখে মাথায় হাত রাখতেন। তো এই রশিদ খান বউবাজারে বোমা ব্লাস্টের মহড়া করতে গিয়ে সত্তর জন পথচলতি লোককে মেরে ফেলেছিল। বাড়িটাড়ি ধসে গিয়েছিল।”
“কিন্তু তার কথা আমাকে কেন বলছেন স্যার?”
“সব লাইনেই কিছু গুরু থাকে। গুরুদের নাম জেনে রাখতে হয়। কিন্তু আমি ওঁর কথা তোকে বলছি সম্পূর্ণ অন্য কারণে।
এত পলিটিকাল কানেকশন থাকা সত্ত্বেও রশিদ খানের যাবজ্জীবন হয়েছিল। এখন এমন শুনতে পাস?”
“না। জমানা বদল গয়া স্যার। কিন্তু আমি তাও বুঝলাম না, রাশিদ খানের কথা কেন বললেন?”
.
ছিটকুর কথায় উত্তর দিলাম না। সবে ও দাদাদের চোখে পড়েছে। বস্তির মস্তান আর প্রোফেশনাল মস্তানের মধ্যে ফারাকটা বোঝেনি। তবে বুঝতে কতক্ষণ? ক্রিমিনাল-পলিটিশিয়ান নেক্সাস এখন যে কত বড়ো হারামি জিনিস! সঙ্গে মেহতার মতো পার্স মোটা ব্যবসায়ীরা থাকলে তো কথাই নেই।
সুলভ টয়লেট কমপ্লেক্স কাছাকাছি এসে পড়েছিল। ছিটকুকে পরে ডেকে পাঠাব বলে লুডো কানাইয়ের মুখোমুখি হলাম। লোকটার চেহারা ভেঙে গেছে, কিন্তু কলপ করা চুল আর গোঁফ ঝিলিক দিচ্ছে। লোকটা আমাকে দেখে, বুক চওড়া করে, স্যালুট ঠুকে উঠে দাঁড়াল।
“গুড মর্নিং স্যার।”
“মর্নিং। আজ টয়লেটে তালা পড়েনি?”
কানাইয়ের চওড়া হাসিমুখ নিভে আসল। ক্ষুব্ধ গলায় সে বলল, “তালা দিই না আমি। কে বলেছে আপনাকে এসব?”
“সে যে-ই বলুক। তোমায় ক’টা প্রশ্ন করার আছে।”
“করুন না। কালকে চাকলাদারবাবুও অনেক প্রশ্ন করেছেন। সব উত্তর দিয়েছি।”
“আমিও অনেক প্রশ্ন করব।”
“করুন না। পুলিশের সঙ্গে কোঅপারেট করব না?”
আমি কানাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। লোকটা কি মজা নিচ্ছে? নাকি এসব লব্জ এখন বস্তি অঞ্চলে মানুষ শিখছে টিভি সিরিজের কল্যাণে? কোঅপারেট শব্দটা বেশ ভারী।
“চুমকি ক’টা বাড়িতে কাজ করত?
“দুটো বাড়িতে।”
“কী কাজ?”
“সকালের বাড়িটায় বাসন মাজত। আর ওই দত্তদের বাড়িতে যাবতীয়। রান্নাবান্না, ছোটো ছেলেটাকে দেখে রাখা, ম্যাডামের বাড়ি ফিরতে দেরি হলে বাড়ি পাহারা দেওয়া।”
“বাহ্! তুমি দেখছি ভাইঝির কাজকর্মের খবর নখদর্পণে রাখতে।”
কানাই হে হে করে হেসে ঘাড়ের পিছনে হাত বুলাল।
“চুমকি কেমন মেয়ে ছিল?” আমি কানাইকে মাপতে মাপতে জিজ্ঞেস করলাম।
“ভালো মেয়ে ছিল স্যার। কাজকর্মের ছিল।”
“শুনেছি, তোমার সঙ্গে রোজ ঝগড়া হত? কী নিয়ে ঝগড়া করতে?”
কানাই জিভ বের করে বলল, “কী যে বলেন। সোমখ মেয়ে, মাসে দশ- বারো হাজার রোজগার করছে। মাথা যাতে ঘুরে না যায়, সেটা দেখার দায়িত্ব তো আমারই? নাকি? সামলেসুমলে থাকতে বলতাম। মুখে মুখে তর্ক করত। আমি গুরুজন, আশ্রয়দাতা। মানতে চাইত না। তাই লেগে যেত।”
“চুমকি ওর মাইনের টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে রাখত?”
“হ্যাঁ স্যার। ওর টাকাপয়সার খবর আমি জানি না।”
“বটে?”
“হ্যাঁ স্যার। আমার মরা মা-বাপের কসম।”
“এই বস্তির ঘরভাড়া কত?”
“স্যার ছ’হাজার টাকা।”
“সেটা কে দিত?”
“ওই স্যার মিলিয়ে জুলিয়ে… কাকা-ভাইঝি মিলিয়ে…”
“কী করে কুলোতে? তুমি কত টাকা পাও এখানে পাহারাদারি করে?”
“ওই তো স্যার, হাজার ছয়েক।”
‘তাতে চলে যায়?”
“আমরা স্যার গরিব মানুষ। কষ্ট করার ধাত।”
কানাইয়ের গলায় দ্রবভাব দেখা দিল। সেটা কি অভিনয়? ও ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়েছিল।
“চুমকি চার বছর আগে কুলতলি থেকে এখানে আসে?” আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম।
“হ্যাঁ। ওখানে কাজকর্ম ছিল না। মা ছোটোতে মারা গেছিল। বাপেও গেল করোনায়। তারপর আমার কাছে এসে উঠল। বলল, কাকা কাজ খুঁজে দাও।”
“কিন্তু তুমি ওকে ঘরে ঢুকতে দাওনি। ছাউনি টাঙিয়ে বাইরে থাকত ও।”
“সে তো স্যার কোভিডের সময় এক ফুট গ্যাপ রাখতে হত। এত ছোটো ঘর আমার। কী করে সরকারি নির্দেশ অমান্য করি বলুন। তবে আমি কশাই নই স্যার। ভাইপোটা সঙ্গদোষে বয়ে যাচ্ছিল। ওকে চায়ের দোকানে কাজে লাগাই তো আমিই। দু’-চার টাকা যা রোজগার হয়।”
“বটে? অত ছোটো ছেলেকে কাজে লাগানোর সময় তোমার সরকারি নির্দেশ মনে ছিল না? চোদ্দো বছরের নীচে কাউকে দিয়ে কাজ করানো যায় না, জানতে না?”
“টাকাপয়সার খুব টানাটানি ছিল স্যার।” কানাই হাতজোড় করে তাকায়। “তুমি তো বিয়ে করোনি?”
“না স্যার।”
“কেন?”
“স্যার আমি বিয়েতে বিশ্বাস করি না। বিয়ের অনেক হ্যাপা।” লুডো কানাই স্মার্টলি বলল।
“বটে!”
“হ্যাঁ স্যার। বিয়ে করলেই ক্যালাকেলি, চুলোচুলি। জীবনে শান্তিটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট স্যার।”
“চুমকির বিয়ে দেখছিলে?”
“চুমকির তো ফিক্সড ছিল। ওই যে সাগর বলে ছেলেটা। মহাদেব ভাণ্ডারে কাজ করে।”
“ওরা বিয়ে করবে ঠিক করেছিল?”
“করেছিল নিশ্চয়ই। এখনকার ছেলেপিলেরা সব কিছু খুলে বলে না।”
“কিন্তু তুমি তো চুমকির অভিভাবক। তোমার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল।”
“করেছি স্যার। বহুবার। চুমকিকে, সাগরকে। এক বছরের সম্পর্ক, তাতেই দু’জন একেবারে লায়েক হয়ে উঠেছিল। সাগর ছেলেটা খুব টেটিয়া টাইপ ছিল স্যার। কথার উত্তর দিত না। বেশি প্রশ্ন করলে বাইকের হ্যান্ডল ঘুরিয়ে গরগর করে আওয়াজ তুলত। রাতবিরেতে চুমকিকে নিয়ে সিনেমাটিনেমায় যেত। বহু বারণ করেছি। শুনলে তো?”
“সেদিন রাতে চুমকিকে নিয়ে সাগরের কোথাও বেরোনোর কথা ছিল?” কানাই এই প্রথমবার অপ্রস্তুত হল। মাথা চুলকে বলল, “আমি সে-রাতে ছিলাম না স্যার। আমি কালই বড়োবাবুকে বলেছি থানায়।”
“কোথায় গিয়েছিলে?”
“একটু ব্যক্তিগত ব্যাপার স্যার।”
“মার্ডার ইনভেস্টিগেশনে ব্যক্তিগত কিছু হয় না। সেদিন রাত বারোটা থেকে দুটোর সময় তুমি ছিলে কই?”
“আমি থানার বড়োবাবুকে বলেছি স্যার। কথাটা পাঁচকান হলে নানা সমস্যা আছে।”
“একটা কানকে বলেছ। আর-একটা শুনবে। পাঁচ হতে আরও তিন লাগে।”
“ও স্যার, স্নিগ্ধা বলে একজন আছে।”
“নাইট ডিউটি ছিল? মহিলা বিবাহিত?’
কানাই উত্তর দিল না। চুপ করে কান চুলকাল।
“কতক্ষণ ছিলে?”
“সারারাত স্যার। ভোরে বাড়ি ফিরি।”
“আর গেলে কখন?”
“ন’টা নাগাদ।”
“চুমকির সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”
“না স্যার। তখনও ও ফেরেনি।”
“ওই মহিলা, কী যেন নাম বললে তোমার হয়ে সাক্ষী দেবে?”
“তা বলতে পারি না স্যার।” কানাইয়ের চোখে ত্রাসের ছাপ পড়ল। বলল, “আপনি কি আমায় সন্দেহ করছেন নাকি? আমি চুমকি-খুনের কিছুই জানি না।”
“ভোরে বাড়ি ফিরে তুমি চুমকিকে দ্যাখোনি। ওকে খোঁজোনি?”
“না স্যার। চুমকিও তো ভোরবেলা কাজে বেরোয়। ভেবেছি কাজের বাড়ি গেছে। আমি স্নানটান সেরে এখানে ডিউটিতে আসি।”
“তোমার সে-রাতের জামাকাপড় থানায় জমা আছে কানাই। ফরেনসিকে যাবে। খুনে জড়িত থাকলে ধরা পড়ে যাবে। সত্যি কথা বলো।”
“মায়ের দিব্যি স্যার। আমি কিচ্ছু জানি না।”
“চুমকির কার কার সঙ্গে শত্রুতা ছিল? কার সঙ্গে ফ্ল্যাটের কাজ নিয়ে হাতাহাতি হয়েছে বলেছিলে?”
“ও তো টুম্পা স্যার। আগে গলায়-গলায় বন্ধুত্ব ছিল। এখন হেবি খার।”
“টুম্পাকে কোথায় পাওয়া যাবে?”
“এই রাস্তাটা ধরে সোজা চলে যান। বজরংবলির একটা মন্দির পড়বে। তার বাঁ দিকে দুটো খুপরি ছেড়ে তিন নম্বরটা টুম্পার।”
.
টুম্পা চুমকির থেকে বয়সে বড়ো হবে। বিবাহিত। বাইশ-তেইশ বছর বয়স। টানটান চেহারা। হলদে রঙের সালোয়ার-কামিজ। কপালে একটা কালো টিপের নীচে আর-একটা ফুটকি। গলায় কারের সঙ্গে লকেট বাঁধা। হাতে পলা আর লোহার বালা। টুম্পা কাজে বেরোচ্ছিল। আমি গিয়ে পড়াতেও বিরক্ত হল না। বরং ঘরে ডেকে চেয়ারে বসতে দিল। ওকে এর আগে কোনওদিন জেরা করা হয়নি। তবে মেয়েটিকে দেখে মনে হল সে জানত, পুলিশ তার খোঁজে আসবে।
টুম্পার ঘরের ছাদের অ্যাসবেস্টসে চারটে ফুটো। সেখান থেকে আলো ঢুকে ঘরের শান বাঁধানো মেঝেতে চারটে এক টাকার আলোকিত কয়েনের মতো দেখাচ্ছে। দেওয়ালে গণেশের ক্যালেন্ডার। তার নীচে একটা ড্রাম। জল ভরে রাখে বোধহয়। বস্তির সব ক’টা ঘরের মতো এরও ঘরের বাইরে এক চিলতে রকে মেক-শিফ্ট রান্নাঘর। গ্যাস সিলিন্ডার পেতে রান্না করবে সে- জায়গা ঘরে নেই। চৌকি আর দরজা প্রায় সেঁটে আছে এতটাই ছোটো ঘর। কোণের দিকে একটা স্টিলের দেরাজে প্লাস্টিকের ফুল, বোন চায়নার কাপপ্লেট, ফারের ছোটো টেডি সাজানো। বিছানার চাদর টানটান, পরিচ্ছন্ন। টুম্পা আমার দিকে সপ্রশ্ন মুখে তাকিয়ে রইল।
“চুমকি প্রামাণিককে কতদিন চিনতে?”
“যবে থেকে এখানে ছিল। চার বছর হল।”
“খুব বন্ধু ছিলে?”
টুম্পা মাথা নামাল। তারপর অস্ফুটে বলল, “হ্যাঁ।”
“কিন্তু কী নিয়ে একটা ঝগড়া বেঁধেছিল যেন?”
“একটা… একটা কাজের ব্যাপারে।”
“পুরোটা খুলে বলো। কিচ্ছু লুকোবে না।”
“ওর একটা কাজের বাড়িতে আমাকে রাখতে চেয়েছিল। তাতেই ও খেপে গিয়ে বাড়িতে চরাও হয়। গায়ে হাত তোলে।”
“তুমিও তো তুলেছ?”
“আমি পরে তুলেছিলাম। ও-ই আগে ঘরে ঢুকে কোনও কথা না শুনে এলোপাথাড়ি খিস্তি দিচ্ছিল। আমি উল্টে বলাতে আমাকে থাপ্পড় মেরেছিল।”
“চুমকির কি মাথা গরম স্বভাব ছিল? আগেও এরকম করেছে?”
“আমার সঙ্গে কোনওদিন করেনি। ওই প্রথম বার। তবে ওর মাথা গরমই থাকত। মুখে মুখে চোপা করত।”
“বস্তিতে আর কার সঙ্গে হাতাহাতি করেছে?”
“হাতাহাতি করেনি। কিন্তু খুব মুখরা ছিল তো। বিশেষ করে প্লাবন, চলে গেলে ওর সঙ্গে লোকে মুখ লাগতে ভয় পেত।”
“প্লাবন কে?”
“ওর ভাই।”
“তাকেও কি মারধোর করত নাকি?”
“মারধর করবে কি, অন্ধ ছিল ভাইকে নিয়ে। প্লাবনকে এখানে এনে স্কুলে ভর্তি করেছিল চুমকি। প্রাইমারিতে। ক্লাস টু-তে। স্কুলের পর চায়ের দোকানে কাজ করত। ছ’মাস কাজ করার পর ভেগে গেল। পড়াশুনায় মনটন বসত না। চুমকি আহ্লাদ দিয়ে মাথা বিগড়ে রেখেছিল। আর খালি এটা-ওটা শেখানোর চেষ্টা করত। সুচেতনাতেও ভর্তি করে দিয়েছিল।”
“সুচেতনা?”
“ওই তো বস্তির বাচ্চাদের দিয়ে ছবি আঁকায়, গান শেখায়, কম্পিউটার শেখায়, হাতের কাজ শেখায়।”
“ও আচ্ছা।”
“আমি বারণ করিছিলাম। এত লাই দিসনি। শুনত না, প্লাবন যখন যা চাইত কিনে দিত। বলত আট বছরের ছোটো ভাই। তা সে কি আর থাকল?”
“খোঁজ করেছিল?”
“প্রচুর। থানায় দৌড়াদৌড়ি করেছিল। যেখানে যেখানে পেরেছে গেছে। একবার তো খবরের কাগজে ছবি দেবে বলে গিয়েছিল। চার হাজার টাকা খরচ জেনে ফিরে এসেছিল।”
“কীসে ছবি? নিরুদ্দেশ কলামে?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ ওই।”
“কোনও খবরই আসেনি?”
“না। সবাই বলে মুম্বইতে পাচার করে দিয়েছে। ওখান থেকে দুবাই নে গেছে।”
“কে পাচার করেছে?”
টুম্পা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “কে জানে। সে-সব জানি না। চুমকির কাছেই শুনতাম। নানা লোক নানা বুদ্ধি দিচ্ছে।”
“হুম। আচ্ছা তুমি তো চুমকির বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলে। ওর কাকা লোকটা কেমন?”
“এক নম্বরের খানকির ছেলে।” টুম্পা ফোঁস করে উঠল, “চুমকির পিছনে রাতদিন লেগে থাকত। খিটখিট করত।”
“ওর কাকার স্বভাবদোষ ছিল কোনও? চুমকির গায়ে কোনওদিন হাতটাত দিয়েছে?”
টুম্পা ভুরু কুঁচকে বলল, “নাহ্। সেরকম কোনওদিন শুনিনি। তাছাড়া ও যেমন রণচণ্ডী মেয়ে ছিল, কাকা হাতফাত দিতে আসলে কেটে রেখে দিত দু’ফালি করে।”
“তাও তো তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল?
টুম্পা বিষণ্ন চোখে আমার দিকে তাকাল।
“কী যে হয়েছিল ওর সেদিন। এমনটা আগে দেখিনি। আমি দত্তবাড়ির কাজটা নিজে থেকে নিতে যাইনি। বউদিই ডেকে বলেছিল। ওই কমপ্লেক্সে আমার দুটো কাজ। সময় নেই। আমি রাজিও হইনি। ভেবেছিলাম, চুমকির সঙ্গে কথা বলে ওদের বলব। তা ও সে-সব কথা শুনার আগেই ঝাড়পিট শুরু করে দিল।”
“এটা কতদিন আগের কথা?”
“মাস দেড়েক হবে। পৌষ মাসের শেষ দিকে।”
“তারপর থেকে তোমাদের মধ্যে কথা ছিল না?”
“না। চুমকি শলা করতে এসেছিল। আমি রাজি হইনি।”
টুম্পার দিকে তাকালাম। বন্ধুকে অস্বীকার করার জেনুইন অপরাধবোধ আছে চোখেমুখে। শলা করলে কি চুমকির মৃত্যু ওর কাছে সহনীয় হত? গলা খাঁকরিয়ে বললাম, “টুম্পা। এবার একটা প্রশ্ন করছি। ভেবেচিন্তে উত্তর দেবে।”
“বলুন।”
“খুন হওয়ার আগে তুমি চুমকিকে শেষ কবে দেখেছিলে?”
“ওই দিন দুপুরবেলা। দেড়টার সময়। বোধহয় দত্ত বাড়ির কাজে যাচ্ছিল।”
“টাইমটা এত পারফেক্ট মনে আছে!”
“হ্যাঁ। তখন বধূমঙ্গল হচ্ছিল টিভিতে। স্টার্ট হয়েছিল। আমি টিভিটা অন করতে গিয়ে দেখি ও রাস্তা পেরোচ্ছে।”
খেয়াল করে দেখলাম টুম্পার বাড়ির টিভিসেট দরজার পাশেই রাখা। অন করতে গেলে মেন দরজা চোখে পড়বেই।
“ওর সঙ্গে আর কেউ ছিল?”
“না। একাই ছিল।”
“সাগরকে চেনো?”
“চিনি। চুমকির বয়ফ্রেন্ড।”
“আলাপ আছে? কথাবার্তা হয়?”
“নাহ্। চুমকি একবার আলাপ করে দিয়েছিল। আর কথা হয়নি।”
“চুমকি সাগরের গল্প করত? কীরকম সম্পর্ক ছিল দু’জনের?”
“সম্পর্ক ভালোই ছিল স্যার… চুমকি বলত, এমনিতে ছেলেটা ভালো, কিন্তু সন্দেহ করে। ফোনের মেসেজটেসেজ ঘেঁটে দেখে।”
“এ নিয়ে ওদের মধ্যে কোনও ঝামেলা হত না?”
“ঝামেলার কী আছে? ওরম সব সম্পর্কেই একটু হয়।”
“চুমকিও তা-ই বলত?”
“আমিই বলতাম ওকে। মাঝে মাঝে ঝগড়া করে বলত, আর পারছে না।
আমি বলতাম, তাই বলে সম্পর্ক ভাঙবি? মেয়েদের কত কিছু সহ্য করতে হয়!”
“ওহ্। তা তোমার স্বামী কী করে?”
“বাইক সারানোর দোকান আছে। হাজরায়।”
“আর তোমার ছেলেমেয়ে?”
“একটাই। টাইনি টটে পড়ে। ওয়ান ক্লাসে।”
.
বিজন থামলেন। দত্তবাড়ির কাজটা তা হলে চুমকির যায়নি। আমি স্বগতোক্তি করলাম।
“নাহ্।” বিজন বললেন।
“এই কানাই লোকটাকে সুবিধের লাগছে না। এর অ্যালিবাই চেক হয়েছিল?”
“হ্যাঁ। ওর গার্লফ্রেন্ড ওর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
গার্লফ্রেন্ডরা অনেক সময়ে গোপন খবর জানেন। বিজনকে সে-কথা বলাতে বললেন, খোঁচড় লাগানো আছে। জানালেন, চুমকির অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক ক্যাশ ফ্লো নিয়ে, পাড়া প্রতিবেশীর কাছ থেকে কোনও তথ্য আসেনি।
“আজকাল তো অনলাইন সাট্টার ব্যাপারট্যাপার থাকে।” আমি ওঁর দিকে তাকিয়ে বললাম।
বিজন মাথা নাড়িয়ে বললেন, “নাহ্ ম্যাডাম। তাছাড়া সেগুলোর তো ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থাকবে। চুমকির ফোন একদম ক্লিন। কল লিস্টে টুম্পা, ওর কাকা কানাই, সাগর, আর ওর কাজের বাড়ি— এছাড়া ফোনে তেমন কিছুি নেই নেই। আমরা ফরেন্সিকেও ফেলে দেখেছি। সোশাল মিডিয়াতে অ্যাক্টিভ ছিল না। হোয়াটসঅ্যাপ ছাড়া আর কোনও চ্যাটবক্সও নেই ফোনে।”
“হু। সেটাই খটকা জাগাচ্ছে বুঝলেন।”
“খটকার কিছু নেই। এসব নারকোটিক্সের কারবারের ক্যাশ হাওয়ালায় ঘোরে। আমাদের শুধু সেই কানেকশনটা প্রমাণ করতে হবে। আরও মাছ ধরা পড়ার চান্স আছে।”
.
আমি বিজনের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলাতে পারলাম না। ওঁকে প্রমিতের কথা এখনও বলিনি। বললে, নারকোটিক্স অ্যাঙ্গলটা আরও পাকাপোক্ত হবে। কিন্তু একটা মেয়ে, যদি ধরে নিই, সে হাওয়ালার ক্যাশ হ্যান্ডল করত, তার ফোনে সেসবের কোনও প্রতিচ্ছবি থাকবে না! না কল রেকর্ডসে, না চ্যাটে, না হিডেন কোনও অ্যাপে?
৩
দেশপ্রাণ শাসমল রোডের উপর ইমামবাড়ার একটা বিরাট তোরণ আছে। টিপু সুলতানের নির্বাসিত পুত্র গুলাম মহম্মদ শাহের তৈরি। আজ বস্তি থেকে ফিরে ঠিক করেছিলাম, এখানে আসব। তোরণের ভিতর ঢুকে চওড়া রাস্তা ক্রমশ সরু কতগুলো গলিতে ভাগ হয়ে যায়। শেষ ডানহাতের গলিতে কৃষ্ণমোহন নিয়োগীর বাড়ি। সাউথ সিটি যখন দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম তীর্থক্ষেত্র হয়ে ওঠেনি, নবীনাতে যখন শুধুই বি-গ্রেড বাংলা, ইংরেজি, আর হিন্দি সিনেমা দেখানো হত, জয় ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস যখন উষা সেলাই মেশিন তৈরি করত, উষা কোম্পানির বাসস্টপকে যখন কেউ সাউথ সিটি স্টপ নামে চিনত না, কৃষ্ণমোহন এই তল্লাটে তখন থেকে আছেন। সাতচল্লিশের দেশভাগে বিপুল অর্থক্ষয়, পরিবারের সম্ভ্রমহানি সহ্য করে পায়ে হেঁটে চলে এসেছিলেন এপারে। যেখানে আশ্রয় পেয়েছিলেন, ঘটনাচক্রে সেটি একটি মুসলিম পাড়া। টিপুর বংশধর আর তস্য বংশধরেরা ততদিনে কলকাতায় এক শতাব্দীর অধিক অতিক্রম করে ফেলেছিলেন।
বাস্তচ্যুত মিনি ওপার বাংলা, এমন এক জায়গায় তাঁদের ক্ষত নিরাময়ের সাধন খুঁজে পেলেন, যা কার্যত তাদেরও ধারণাতীত ছিল। দাদাপীর সাহেবের মাজারে, দাদাপীরের শিষ্য দাদু বাবার ভক্ত হয়ে উঠলেন হিন্দুরা। কৃষ্ণমোহন নিয়োগীর নিকট-আত্মীয়, নৃপেন্দ্রনারায়ণ নিয়োগী ছিলেন মাজারের খাদেম। প্রথম যখন এ গল্প শুনেছিলাম, অবিশ্বাস্য লেগেছিল। কৃষ্ণমোহনের সঙ্গে কথা যত এগিয়েছিল, বুঝেছিলাম কলকাতা শহরের সত্যিগুলোকে হয়তো এমনই জাদুবাস্তব লাগে। শেষবার যখন দেখা হয়েছিল, বছর দশেক আগে, কৃষ্ণমোহন তখনও জায়গা বেদখল করে গড়ে তোলা বস্তি রক্ষার্থে লড়ে যাচ্ছেন। দক্ষিণ কলকাতায় হেন কোনও বস্তি নেই, যাননি। প্রভাব কমতির দিকে, কিন্তু তাঁর ঘরের সাদা দেওয়াল জুড়ে সুফি পীরদের ছবি, ফুলদানিতে রাখা মাজারের ফিরঙ্গিপানি গাছের ফুল, খাটে ছড়ানো অজস্র বইপত্তর, পত্রপত্রিকা, সাদা ইঞ্চি পারের ধুতি আর অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গ জুড়ে বয়স নয়, স্পর্ধা কথা বলছিল। গণেশদা আলাপ করিয়েছিল। প্রণাম করাতে বলেছিলেন, “পুলিশ ক্যান? শেষে মাইনে পাওয়া গুন্ডা হবে?”
আনোয়ার শাহ রোডের চারধারে গজিয়ে ওঠা ফ্ল্যাট বাড়ি, কমপ্লেক্সের ব্যাবসার প্রোমোটারদের প্রথমদিকের একমাত্র গন্তব্য ছিলেন কৃষ্ণমোহন। ঠিকঠাক টাকাপয়সা দিয়ে বন্দোবস্ত না করলে, প্রোজেক্ট আটকে যেত। গুন্ডাবাহিনী পুষতেন রীতিমতো। কাটমানি খেতেন, এমন অভিযোগ আছে ভূরি ভূরি। কিন্তু বস্তির লোকেরা পুনর্বাসন পায়নি এমনটা হয়নি।
জীর্ণ দোতলা বাড়িটার উপরতলায় থাকেন কৃষ্ণমোহন। নীচের ঘরগুলোয় ধুলো আর হাবিজাবি কাগজের স্তূপ পেরিয়ে উপরে ওঠার সময় বুক ধুকপুক করে উঠল। সিংহ বৃদ্ধ হয়েছেন, প্রতিপত্তি খুইয়েছেন। যে-কাজে এসেছি, আদৌ তা হবে তো?
ঘোলা চোখের উপর মোটা চশমা ফিট করে কৃষ্ণমোহন আমায় দেখলেন। কথায় এখনও দ্ব্যর্থহীন বাঙাল টোন। স্মৃতিশক্তি প্রখর। খ্যারখেরে গলায় বললেন, “মুটিয়েছ ক্যান এত? সকালে বিকেলে একশোবার উঠবোস করবা।”
চেয়ার টেনে বসে বললাম, “কেমন আছেন? একটা কাজে এসেছিলাম।”
কৃষ্ণমোহন মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
“কী কাজ? আমার লগে এহন কার কী কামকাজ থাকতে পারে?”
“পেয়ারাবাগান বস্তির ক’টা ইনসাইড ইনফরমেশন চাই। আপনি ছাড়া আর কেউ পারবে না।”
বৃদ্ধ হঠাৎ খেপে উঠলেন। প্রায় কাপতে কাপতে বিছানায় উঠে বসে বললেন, “বস্তির কোনও খবর জানি না। হারামজাদা, চুন্নুখোরের দল, গুয়ের পোদ না চেটে ঘুম আসে না রোজ। শালা, খানকির ছেলে সব। কোনও খবর নাই, যাও যাও। আমারে কি পুলিশের খোঁচড় ভাবলা নাকি? যাও, বেরোও।”
উষ্মা প্রকাশ করবেন মোটের উপর জানতাম। কিন্তু বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। বস্তির উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন বহুদিন। প্রোমোটাররা আজকাল কৃষ্ণবাবুদের মতো লোক ধরে না, রাজনীতিবিদরা রয়েছেন অনেক সহজ সমাধান নিয়ে। কয়েকজনকে খোরাক দিলেই যখন চলে তখন দেশোদ্ধারের ভেকের বালাই কেন-ই বা থাকবে। বৃদ্ধের বুক হাপরের মতো ওঠানামা করছিল। পাশের টেবিলে, আঢাকা জলের গ্লাসের নীচে চুমকি প্রামাণিকের নাম, ফোন নম্বর, ছবির কপি চাপা দিয়ে বললাম, “আপনার নেটওয়ার্ক কাজে লাগাতে চাইছি। একটা আঠেরো-উনিশ বছরের মেয়ে খুন হয়েছে। মেহতা নামের এক প্রোমোটারের কমপ্লেক্সে। কলকাতা পুলিশ সন্দেহ করছে, সাগর মণ্ডল বলে একটি ছেলে চুমকিকে খুন করেছে। সাগরকে ধরতে যাওয়ার আগে সে-ও খুন হয়ে গেছে পুরুলিয়ায়। আমার মনে হচ্ছে, কেসটা এতটা সহজ নয়, যতটা উপর উপর মনে হচ্ছে। ভিতরের খবর লাগবে।”
কৃষ্ণমোহন উত্তর দিলেন না। ঝুলপড়া ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওঠার আগে বললাম, “সিংহ বুড়ো হলেও সিংহই থাকে কৃষ্ণদা। তাঁর শক্তি শুধু তো পেশিতে নয়, মস্তিষ্কেও। আমার ফোন নম্বর থেকে আপনাকে একটা মিসড কল দিয়ে রাখলাম। আর আমার ঠিকানাটা এই কাগজে।”
সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসার সময় রেলিংয়ে বসা পায়রাগুলো উড়ে গেল। পরিত্যক্ত সম্রাটের প্রাসাদে গতবারের স্মৃতি বলছে, গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণমোহন বলেছিলেন, “শহুরে হওয়া কিসু খারাপ নয়, বুইলে? খারাপডা হল, শহুরে হতে গিয়া নিজের নিজের চরিত্তির খুইয়ে বসা। বাঙাল থাকুম, মুসলিম থাকুম, কেস্টান থাকুম, ঘটি থাকুম, মিইলামিইশা থাকুম। এখনকার লোকে, চায় কলকাতা শহরটারে হোমিয়োপ্যাথির শিশির মতো বান্ধে ফেলতে, সব ফোঁটায় একই টেস্ট… তা কি হয়? হবেও না… যত দিন যাবে তত কাটাকুটি খেলবে… তত কাজরা বাড়বে…”
সকালে চুমকির ঘরের দরজার তালা খুলে ঢুকতেই একটা গন্ধ নাকে এসে লেগেছিল। ভ্যাপসা নয়, ঘরের নিজস্ব গন্ধ। যেন কেউ এই মাত্র বিছানা ছেড়ে উঠে গেছে। বালিশে তার শরীরের গন্ধ লেগে আছে। ওর ঘরে বোরোলিন, জিরে, ধনে, তেজপাতা, মাথার তেল আর শ্যাম্পুর মিশ্রিত গন্ধ। ঘরের এককোণে রান্নার জায়গা। দেওয়ালে তাক। তাতে বাবা-মা’র ছবি, আর কালীঘাটের মা কালী পাশাপাশি স্থান পেয়েছেন। ফোটোতে রজনীগন্ধার মালা শুকিয়ে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে।
পাশের লাগোয়া ঘরটা কানাইয়ের। সেটায় তালা দেওয়া। পাহারাদারের কাজে গেছে।
বিজন এক কোণে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, “যা যা দরকারি মনে হয়েছে, তার সবটাই সিজার করা হয়েছে ম্যাডাম। এখন আর এ ঘরে কিছু পাবেন না।”
আমি চুমকির আয়না কাম ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেওয়ালে লাগানো তিন ফুটের প্লাস্টিক ফ্রেমের আয়নার নীচে মোল্ডেড প্লাস্টিকের দু’ধাপ ড্রয়ার। তার ভিতরে কাঁটা, ক্লিপ, টিপের পাতা। দ্বিতীয় ড্রয়ার টানলে আটকে যাচ্ছিল। জোরে টানতে বোঝা গেল, তুলো আর গজ ব্যান্ডেজ, আর মাইক্রোপোর টেপের প্যাকেট রয়েছে নীচে। আমি বিজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এটা কী?”
বিজন এগিয়ে এসে দেখে বললেন, “তুলো আর ব্যান্ডেজ তো, কেন? এসব ওই ক্ষতটততে লাগাতে হত আর-কি!”
“হুম।”
আমি খাটের দিকে এগিয়ে গিয়ে তোশক উঠিয়ে দেখলাম। তোশকের নীচে হাবিজাবি কাগজ। সিইএসসির বিল, ওষুধের দোকানের পুরোনো রিসিট, মুদিখানার খুচরো হিসেব।
“কী খুঁজছেন বলুন তো? এভাবে এখানে কিছু পাবেন না। সব থানার মালখানায় জমা।”
“হুঁ। সে তো দেখবই। যা ঘর থেকে পেয়েছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল?”
“না। সেরকম কিছু না। আপনি কি বিশেষ কিছু খুঁজছেন?”
আমি খাটের তলাটায় একবার দেখলাম। ওঁর দিকে না তাকিয়েই বললাম, “কিচ্ছু ছিল না? কন্ট্রাসেপটিভও না?”
কয়েক সেকেন্ড কোনও সাড়া শব্দ এল না। বিজনের দিকে তাকিয়ে দেখি, একটু সংশয় আর দ্বিধা নিয়ে তাকিয়ে আছেন। ইতস্তত করে বললেন, কই সেরকম কিছু মনে পড়ছে না।
“আশেপাশের ওষুধের দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়েছিলেন? এতে দেখছি গ্লুকোন ডি-এর বিলও আছে। কিন্তু কন্ট্রাসেপটিভ নেই।”
বিজন গাল চুলকে বললেন, “আরে ওসব ওভার দ্য কাউন্টার বলে নিয়ে আসে। বিলটিল ফেলে দিয়েছে।”
“দোকানের সিস্টেমে তো থাকবে? একটু খোঁজ নিতে হবে, দু’জনেই যখন লোকাল, কাছাকাছি জায়গা থেকে কিনবে নিশ্চিত।
“কিন্তু এটায় এত জোর দিচ্ছেন কেন?”
“সম্পর্কের ইন্টেনসিটিটা বোঝার চেষ্টা করছি। চুমকি সাগরের উপর নির্ভর করে এরকম সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজড হয়েছিল, না বাধ্য হয়ে।”
বিজন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, “আরে ম্যাডাম, সিম্পলি হাত খুলে পেটাত। চুমকি সেটাকেই আদর সোহাগ ভাবত। এরকম বহু দেখেছি।”
“কে পেটাত?”
“সাগর। আবার কে? এক নম্বরের খানকির ছেলে, দেখলেন না, কীরকম ইম্প্রেশন চারিদিকে। শিওর চুমকি বলেছিল, আর শোবে না, রেগে মেরে দিয়েছে।”
আমি মুচকি হেসে বললাম, “আপনার কাছে সাগরের ইম্প্রেশনটা কবীর সিংয়ের চেয়েও টক্সিক।”
“আবার না তো কী, প্রেমটেম-এ এসব মারামারি আমার পোষায় না। তবে কিনা পাপ বাপকেও ছাড়ে না, দেখলেন তো কেমন নিজের দলের লোকের কাছেই বিলা হয়ে গেল।”
আমি বিজনের কথার উত্তর দিলাম না। এখনই এই পয়েন্টে জোর গলায় বলার মতো তথ্য আমার কাছে নেই। যা আছে তা শুধুই খটকা। সাগরের খুনে জড়িত ওর দলের কেউ ধরা পড়লে আমার থিয়োরি নিয়ে নিশ্চিত হতে পারি। সে-সময় এখনও আসেনি।
বিজন গলা খাঁকরে বললেন, “আবার কী ভাবছেন এত?”
বোধহয় অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। বিজনের কথায় সংবিৎ ফিরল। মুচকি হেসে বললাম, “ফিফটি শেডস অফ গ্রে দেখেছেন?”
“হ্যাঁ। ওই তো… মোস্টলি পাওয়ার প্লে। দু’জন পার্টনারের একজন সাবমিসিভ, অন্যজন ডমিন্যান্ট। চাবুক আছে, চেন আছে, হাতকড়াও আছে। ওই যাকে বলে, মেরে মেরে পাট করে আনন্দ দেওয়া।” বিজন জিভ কেটে আমার দিকে তাকালেন।
“অ্যানাসটেশিয়া আর ক্রিশ্চিয়ান গ্রে, এদের দু’জনের সম্পর্ককে অ্যাবিউজিভ বলা যায়?”
“না। দু’জনের সম্মতি ছিল।”
“হু। চুমকি কোনও অভিযোগ করেনি এবং সম্পর্ক চালিয়ে গেছে, মানে ওরও সম্মতি ছিল ধরে নিচ্ছি।”
“ছিলই তো। ইয়ে আপনি কী বলতে চাইছেন বলুন তো?”
“পিএম রিপোর্ট বলছে, নেচার অফ উন্ড সাজেস্ট ইনটেনশনাল পিয়ার্সিং ইন জেনিটাল পার্ট। উন্ডগুলোয় একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে, ঠিক মারধোর করার মতো নয় ব্যাপারটা। শরীরের কিছু বিশেষ অংশে ইচ্ছাকৃত যন্ত্রণা দেওয়া। বিশেষত নিপলের চারপাশে পিনের দাগ আছে, গোলাকার রিং-এর আকারে।”
“হ্যাঁ দেখেছি।” বিজন আমার দিকে তাকালেন।
“শার্প পয়েন্টেড অবজেক্ট, আলাদা করে লেখা রিপোর্টে। এই অবজেক্টটা কোথায়?”
বিজন ভুরু কুঁচকোলেন। ওর মুখের ভাব দেখে মনে হল বলতে চাইছেন, না পেলে কী এসে যায়। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “ব্যাপারটা হচ্ছে আঘাতগুলো ঠিক এলোমেলো ব্লেড চালানোর মতো নয়, এ ধরনের অ্যাক্টিভিটি যারা করে, তারা কিছু স্পেসিফিক ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করে। না তো চুমকির কাছে তা আছে, না সাগরের কাছে। অস্বাভাবিক নয়?”
বিজনের মুখে তাচ্ছিল্য আর বিরক্তি একসঙ্গে মিশে গিয়ে নাকটা কুঁচকে গেল।
“রাখুন তো ম্যাডাম। এত জটিল করার কিছু নেই। তবু বলছেন যখন, মালখানায় গিয়ে একবার দেখব।”
প্রতিবেশীদের সঙ্গে আর-এক দফা কথা বলে, চুমকির পাড়া থেকে যখন বেরোলাম, খিদেয় পেট চুঁ-চুঁ করছে। শরৎ বোস রোডের ক্রসিংয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকল ঠায় সাত মিনিট। ট্র্যাফিকের শব্দ আকাশের চাঁদি ফাটিয়ে দিচ্ছিল। শব্দে উত্তাপ বাড়ে। বিজনের বিরক্তি বাড়ছিল। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে বললেন, “স্ট্রেসড আউটও লাগছে বুঝলেন। এই কেস কবে যে মিটবে। বাড়িতে একদম সময় দিতে পারছি না।”
“একটা দিন অফ নিতে পারবেন না?”
“খেপেছেন? সিটের মেম্বারদের সিটে সিটেড থাকতে গেলে বকাসন জানতে হয়।” বিজন এতক্ষণে হাসলেন।
“বাচ্চারা কেমন আছে?” আমিও হেসে বললাম।
“আছে মোটামুটি। এই বয়সে পড়াশুনোর যা চাপ! আরে বাচ্চাদের কথায় মনে পড়ল, দত্তবাড়ির ছোটো ছেলে ত্রিদীপ নাকি ক’দিন আগে, টয়লেটে যাওয়ার সময় নার্সারির একটা বাচ্চাকে অ্যাবিউজ করেছিল। সেই বাচ্চাটি ওকে ঠেলে পালানোর চেষ্টা করে। তখন ফ্লোর থেকে ফিনাইলের বোতল খুলে বাচ্চাটির মাথায় ঢেলে দেয়। সেদিনের পিটিএমে কাউন্সিলারম্যাম, মৌলি দত্তকে ডেকেছিলেন। বেচারা বাচ্চাটা আপাতত সাসপেন্ডেড।”
দুই ছেলেরই বিহেবিয়ারাল ইস্যুজ! মনে মনে ভাবলাম। প্রমিতের চেহারাটা মনে পড়ে গেল। কপালে একটা কাটা দাগ, আর ঠোঁটের কাছে নীল কালশিটে। উগ্র, দুর্বিনীত স্বভাব। সেই তুলনায় ছোটোটা চাপা, অমিশুকে। অন্যমনস্কভাবে বললাম, “ছেলেটা কিন্তু ওর বয়স অনুপাতে বেশ চুপচাপ। চুমকির সঙ্গে তো বেচারার অনেকক্ষণ সময় কাটত?”
“হ্যা। শেষ দিনও তো স্কুলের পরে চুমকির কাছেই ছিল।” বিজন বললেন।
“বাচ্চাটাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন?’
“টুকটাক। কথাই বলাতে পারিনি। মুখ টিপে বসেছিল।”
.
বিজন ক্রাইম সিন নিয়ে যাবেন বলেছিলেন। গড়িয়াহাটের বেদুইনে দুটো এগরোল সাঁটিয়ে স্বস্তিকায় যখন গেলাম, তখন ওখানে শ্মশানবৈরাগ্য। বিরাট আয়তনের জমি, সম্পূর্ণ নিরাভরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশের দু’জন কনস্টেবল ডিউটিতে ছিলেন। আমাদের দেখে স্যালুট করে উঠে দাঁড়ালেন। পড়ন্ত বিকেলে বিজনের পিছন পিছন হাঁটলাম। পুকুরের ধারটা ঢালু হয়ে নীচে নেমেছে ঠিকই, তবে দীর্ঘদিনের অব্যবহারে পুকুর দুর্ভেদ্য ঘাসে আর আগাছায় সম্পূর্ণ ঢেকে গেছে। পুকুর না বলে ঘাসজমি বলে ভ্রম হয়।
বিজন দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালেন। হাত দিয়ে নির্দেশ করে বললেন, ওদিকটায় এনক্লোজার, যেটা দিয়ে বডি ঢুকিয়েছিল। যাবেন নাকি জিজ্ঞেস করাতে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললাম। ঘাসজমির উপর ক’টা প্রজাপতি উড়ছিল। ফুরফুরে, নির্ভয়। চুমকির মুখটা মনে পড়ে গেল। ওর প্রোফাইলটা কর্মঠ, স্নেহপ্রবণ, বাস্তুচ্যুত একটি মেয়ের। কলকাতা শহরে দু’মুঠো ভাতের জোগাড় করা, আর ভাইকে স্নেহযত্নে আগলে রাখা, পড়াশুনা শেখাতে চেষ্টা করা- চার বছর আগে কুলতলি থেকে কলকাতায় আসার পরে ওর আর কোনও উচ্চাশার কথা কেউ হলফ করে বলতে পারেনি। না, ওর পরিচিতরা, না ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। সাগরের মতো অপরাধ প্রবণতার বীজ ওর মধ্যে ছিল না। সেই মেয়ের গত আট-ন’মাসে জীবনযাপনে কী এমন পরিবর্তন হল, যে হাজার হাজার হিসাববহির্ভূত টাকা ওর অ্যাকাউন্টে এল, গেল? বিজন সিগারেট শেষ করে পা দিয়ে মাড়িয়ে নিভিয়ে দিচ্ছিলেন।
আমি ওঁকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, “চুমকির ভাই যেন কবে নিখোঁজ হয়েছে বলেছিলেন?”
“বছর দেড়েক আগে।”
“আর ওর অ্যাকাউন্টের এই ক্যাশ ফ্লো? এটা কবে শুরু হয়েছে?”
“প্রায় এক বছর ধরুন।”
.
স্বস্তিকায় আর বিশেষ কিছু দেখার ছিল না। এনক্লোজারের গায়ে গাঢ় ধুলো জমেছিল। এটা নতুন একটা করোগেটেড শিট। পুরোনোটি ফরেনসিকের জিম্মায়। সেটিতে এত জনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সুপারইম্পোজ হয়ে আছে, যে আলাদা করে খুনি চিহ্নিত করা কোনওদিনই সম্ভব হবে না। বিজন ফেরার পথে বহু কেজো খবর দিলেন। এনসিবির অফিসাররা প্রবল তৎপরতায় আমার লিড ফলো করছেন, বিরজু বা তারকের কোনও হদিশ এখনও পাওয়া যায়নি এবং খুব তাড়াতাড়ি কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে রেইড হবে।
মেট্রোয় আজ বসার জায়গা পাইনি। নেমে দেখি, আমার মোবাইলে একটা মেসেজ এসেছে। নিরঞ্জনের উকিল বাবু পাঠিয়েছেন। নিউজ ২৪*৭ এর অনলাইন পোর্টালের একটা লিংক। নিরঞ্জন আমাকে শেয়ার করতে বলেছিলেন। রাতে বিছানায় কাত হয়ে, খবরের কাগজের পাতা উল্টোতে উল্টোতে লিংকটা চালালাম। এক ইউটিউব ব্লগারকে দক্ষিণ কলকাতার একটি আবাসন থেকে গত সেপ্টেম্বরে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করার খবর। ব্লগিংয়ের নামে আবাসনের বাসিন্দাদের প্রাইভেসি ভঙ্গের দায় দিয়ে থানায় নালিশ করেছেন বিল্ডিংয়ের সেক্রেটারি। খবরটায় একটাই চোখে পড়ার বিষয়। আবাসনটির নাম বিভাবরী। ব্লগারের নাম সাকিব। ইনভেস্টিগেটিভ সাকিব নামের এক ইউটিউব চ্যানেলের ওঁর।
উকিলবাবু লিংকের তলায় লিখে পাঠিয়েছেন, সাকিবকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন নিরঞ্জন। বেআইনি ওষুধ কারখানার খোঁজ দিয়ে ইউটিউবে ব্লগ বানিয়েছিল সাকিব। নিরঞ্জন ন্যাশানাল মিডিয়ার পাশাপাশি স্থানীয় লেভেলে যারা কাজ করে, তাদের চ্যানেল ফলো করতেন। সেইভাবেই আলাপ। এখন আর যোগাযোগ নেই। ইউটিউবে সার্চ দিলাম। চ্যানেল খুলল। লাস্ট পোস্ট গত নভেম্বরের। তেরো হাজার আটশো সাবস্ক্রাইবার। মন্দ নয়। ভিডিয়োগুলোও নানা ধরনের টপিক নিয়ে। পুকুর বুজিয়ে ফ্ল্যাট, সাট্টা-জুয়ার আড্ডা, বেআইনি মদের ভাটি, সিভিক ভলান্টিয়ারের টাকা খাওয়া সবই আছে। সবথেকে সাম্প্রতিক ভিডিয়োগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং। গোটা ভারতে সাড়া ফেলে দেওয়া কিছু খুনের তদন্ত নিয়ে গোটা দশেক এপিসোড আপলোড করেছে সাকিব। এক ঝলক চোখ বুলোলেই বোঝা যায়, বেশ খেটে করা কাজ।
সিরিজের সবথেকে জনপ্রিয় কেস সুদর্শিনী মাটুর। পাঁচ পার্টের সিরিজ। সাকিব গড়ে প্রায় দশ হাজার লাইক পেয়েছেন ভিডিয়োগুলোয়। তারপরেও একটা সিরিজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেটি অসমাপ্ত। ‘দিব্যা আগরওয়াল রেপ অ্যান্ড মার্ডার’ নামের সিরিজটায় মাত্র একটাই পার্ট রয়েছে। নভেম্বরের পর আর পোস্ট নেই। কিন্তু এসবের সঙ্গে বিভাবরীর সম্পর্ক কী? বিভাবরীতে কোন তদন্ত করতে গিয়েছিলেন সাকিব? বেশিক্ষণ লিংকটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার শক্তি পেলাম না। ঘুমে চোখ ঢুলে আসছিল। ভোরবেলা যখন ঘুম ভাঙল, তখন ঘড়িতে সাড়ে ন’টা আর দরজায় ঘন ঘন কলিং বেল।
৪
“কেষ্টদা পাঠিয়েছে।”
একটা বেঁটে, চৌকোনা চেহারার লোক, দেওয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। অপরিচ্ছন্ন জামাকাপড়। মুখে তিন-চারদিনের না-কামানো দাড়ি। ভক ভক করে দিশি দারুর গন্ধ আসছে শরীর থেকে।
“ওহ।” আমি অস্বস্তি চেপে বললাম।
“আমার নাম গ্যাঁড়া। শুনলাম পেয়ারাবাগান বস্তি নিয়ে কীসব খোঁজখবর চাইছিলেন?” গ্যাড়া ফ্ল্যাটে ঢুকে চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে বলল। লোকটা ঠিক বেরোনোর সময় আচমকা চলে এসেছে। বিরক্তি চেপে বললাম, “আমার ফোন নম্বর দেওয়া ছিল। ফোন না করে এলে নাও পেতে পারতেন।”
“এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম দেখি চান্স নিয়ে।” গ্যাঁড়া দাঁত বের করে বলল।
“খবর বলতে… সাগর আর চুমকি বলে দু’জন খুন হয়েছে। এদের ব্যাপারে কোনও ইনফরমেশন…”
“চুমকি?” গ্যাঁড়া খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলল, “যাকে টিভিতে দেখাচ্ছে… ভালো রে ভালো মাগি, বেঁচে থাকতে টিভিতে মুখ দেখাতে পারত না…”
“কাজের কথা কিছু থাকলে বলুন, আমার তাড়া আছে।”
“কাজের কথা বলতেই এসেছি। পেয়ারাবাগান কেন, সবরকম বাগানের খবর পাবেন আমার কাছে। জোড়াবাগান, হাতিবাগান, এমনকি কারওর বিছানার বাগান, খাটের তলার বাগান।” লোকটা বিচ্ছিরি হেসে বলল।
“আপনি আসুন। খবর থাকলে ফোন করবেন।” আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম।
গাড়া উঠে দাঁড়িয়ে একটা আড়মোড়া ভেঙে বলল, “অ, আপনি ভদ্দরমহিলা! তাইলে পুলিশে কী করচেন? যাউকগিয়া, আমার কী? শুনুন মেডাম, এ তল্লাটে এরকম ঘটনা পোথম নয়। ঢাকুরিয়া বস্তিতে ক’মাস আগেও একটা মেয়েকে লাশ করে দিয়েছিল। তার কোনও আতাপাতা পুলিশের খাতায় পাবেন না। পাবেন এই গ্যাঁড়ার কাছে। চলি। মাল্লু রেডি রাখবেন। চুল্লু আর মাল্লু ছাড়া গ্যাঁড়া কাজ করে না।”
গ্যাঁড়া সেলাম ঠুকে চলে গেল। আমার রাগে গা রি রি করছিল। কৃষ্ণমোহন কি জেনেবুঝে এমন লোক পাঠালেন?
.
মেট্রোতে আজ ভিড় কম। অফিসবেলা পেরিয়ে গেছে। লেডিস সিটে এক দিদি, তার ভাইয়ের পাশে বসে, চিপ্স ভাগ করে খাচ্ছে। সিনিয়র সিটিজেনদের সিটে দু’জন মাত্র যাত্রী। একজন বিরক্তমুখে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন, অন্যজন খবরের কাগজ খুঁটিয়ে পড়ছেন। আমার চোখ খবরের কাগজের হেডলাইনে চলে গেল। চুমকি প্রামাণিকের কেস এখন আর শিরোনামে নেই। হয়তো দ্বিতীয় বা তৃতীয় পাতায় আছে। যদি উল্লেখযোগ্য মোড় না আসে, ক্ৰমশ খবর থেকে চুমকি নির্বাসন পাবে চিরতরে। এত বড়ো দেশে, চাপান-উতোরের ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ওকে। খবরের কাগজের পাতা ভাঁজ করলেন বয়স্ক ভদ্রলোক। আমারও গন্তব্য এসে গেল। আজ প্রথমেই ঠিক করেছিলাম, ত্রিদীপ নামের বাচ্চাটিকে একটু প্রশ্ন করে দেখব। ডোমেস্টিক হেল্পের মার্ডার কেসের ক্লু, তার কাজের জায়গা থেকেই উঠে আসে, ডিপার্টমেন্টে তার ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে।
বিভাবরীর গেটে আজও প্রতুল নামের সিকিউরিটি ছেলেটি ছিল। আমাকে দেখে একটা স্যালুট ঠুকল। পুলিশকে কেন একটা প্রাইভেট হাউজিংয়ের সিকিউরিটি স্যালুট ঠুকবে, কারণটা আমার জানা নেই। হয়তো ইউনিফর্ম ওকে এমন একটা অথরিটির স্বাদ দেয়, যেটা ও নিজে পেতে চায়। সিকিউরিটি নিজেকে দারোগা ভাবতে ভালোবাসে, আর দারোগা নিজেকে কোতোয়াল। “আপনাকে ইউনিফর্ম পরলে বেশ কিরণ বেদী লাগে,” বিজন গতকাল বলছিলেন। “নিধিরাম সর্দারের কেসটা জানেন তো,” হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আসলে ছিল চৌকিদার, হাবভাব দেখে লোকে ভাবত না-জানি কত বড়ো কোতোয়াল।
মিসেস দত্ত বাড়ি ছিলেন না। ফোনে জানিয়েছেন, বাড়িতে লোক থাকবে। ফ্ল্যাট ডি ৩-এর বন্ধ দরজার সামনে বেল বাজাতে গিয়ে থমকে গেলাম। ভিতর থেকে কর্কশ গলায় একটা চিৎকার ভেসে আসছে। পুরুষ কণ্ঠের বকাবকির আওয়াজ। আর একটা অবরুদ্ধ গোঙানি। একটু পরে দরজা খুললেন যিনি, তিনি বোধহয় গৌরকিশোর দত্ত। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। বিরলকেশ, কালচে গায়ের রং, শক্তসমর্থ মেদহীন লম্বা চেহারা। নাকের ডগায় একটা বড়ো মাপের তিল। পুরু ঠোঁট। ভদ্রলোক দরদর করে ঘামছিলেন। আমার পরিচয় দেওয়াতে ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “এখনও আপনাদের জেরা শেষ হয়নি?”
ঘরের ভিতর টানা গোঙানির শব্দটা বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু একটা ফুঁপানোর শব্দ আসছিল। ড্রয়িংরুমে পৌঁছোতে বুঝলাম, ত্রিদীপকে বকছিলেন ওর বাবা। ছেলেটা হাঁটু মুড়ে সোফায় বসেছিল। আমি হেসে “হাই” বলাতে আমার দিকে তাকাল, কিন্তু চোখের পাতাও পড়ল না। ছেলেটার চোখে জল নেই, হয় মুছে ফেলেছে বা কাঁদার সময় ওর চোখের জল পড়ে না। গৌরকিশোর দত্ত, সোফায় ছেলের পাশে বসলেন। ত্রিদীপ পা মুড়ে দূরে সিঁটিয়ে গেল।
“বলুন?”
“চুমকি প্রামাণিকের ব্যাপারে একটু কথা বলতাম।”
“কী জিজ্ঞেস করা বাকি আছে?” ভদ্রলোক তিক্তস্বরে বললেন, “আপনারা না, গতপরশুও এসেছিলেন?”
“হ্যাঁ, তদন্তের ব্যাপারে একটু সময় লাগে।” আমি ওঁর বিরক্তি উপেক্ষা করে বললাম।
“দেখুন, আমি বা আমার পরিবার চুমকির মার্ডারের ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ জানি না। আমাদের উত্ত্যক্ত করে, আপনারা সময় নষ্ট করছেন। বস্তিতে খোঁজখবর করুন। দ্যাট উইল সেভ ইয়োর টাইম।”
“সেটা আমাদেরই বুঝে নিতে দিন?” আমি ঠান্ডা গলায় বললাম। আগের দিনের থেকে আজ ফ্ল্যাটটা অগোছালো লাগছিল। ডাইনিং স্পেসে খাবার পড়ে আছে টেবিলে। অন্য ঘরের দরজাগুলো হাট করে খোলা। কোণের ঘরটা সম্ভবত প্রমিতের। একটা বুক কেস আর টেবিলের উপর একটা ল্যাপটপ চোখে পড়ে এখান থেকে।
গৌরবাবু আমার দৃষ্টি অনুসরণ করছিলেন। আমি ওঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, “চুমকি মেয়ে হিসেবে কেমন বলে আপনার মনে হত?”
গৌরকিশোর দত্ত ঠোঁট উল্টোলেন। নিকোটিনে পুড়ে যাওয়া কালো ঠোঁট- দাঁতগুলোও সামান্য হলদেটে।
“কাজের ছিল। চালাকচতুর। আমি বাড়িতে অল্পই থাকি। খুব একটা অবজার্ভ করার সুযোগ নেই। তবে আমার মিসেস অনেকটাই ওর উপর ছেড়ে নিশ্চিন্ত ছিল। এতটা না হলেও পারত।”
“চুমকি যেদিন মারা যায়, সেদিন আপনি ক’টায় বাড়ি ফেরেন?”
“আমি কলকাতায় ছিলাম না। পরের দিন ফিরি।”
“কোথায় গিয়েছিলেন?”
“খড়্গাপুর। অফিসের কাজে।”
“সাগরের সঙ্গে চুমকির খিটিমিটির ব্যাপারটা জানতেন?”
“না।”
“বাড়ির বাকিদের সঙ্গে চুমকির কীরকম সম্পর্ক ছিল?”
“মানে?”
“মানে ধরুন আপনার স্ত্রী, আপনার ছেলেরা… কতটা ঘনিষ্ঠতা ছিল?”
গৌরবাবু অত্যন্ত বিরক্তভঙ্গিতে বললেন, “ঘনিষ্ঠতা কীসের? আমি সেল্ফ মেড ম্যান। পিছনে দেখার কেউ ছিল না। পরিশ্রম করে দাঁড়ানোর অর্থ বুঝি। চুমকি কাজ করত, ভদ্রস্থ মাইনে দিতাম আমরা। এর বাইরে আর কী থাকবে?”
“ত্রিদীপ, মানে আপনার ছোটো ছেলে, সে চুমকির খুব ন্যাওটা ছিল শুনেছি।”
“হ্যাঁ ছিল। সে ছোটোবেলায় ওরকম অনেক অ্যাটাচমেন্ট থাকে। তাতে কী এসে যায়?”
“সেদিন চুমকি যখন বাড়ি থেকে বেরোয়, ও বোধহয় পাশের ফ্ল্যাটে ছিল? “হ্যাঁ। দিলীপবাবুর কাছে সন্ধেবেলা পড়তে যায়।”
“ক’টার সময়?”
“ওই ধরুন, রাত আটটা নাগাদ।”
“ওকে একটু ডাকুন। ওর সঙ্গে কথা বলব।”
“ওকে কেন? ও খুব ছোটো। এসবের কিছু বোঝে না। এমনিতেই চুমকি যাওয়ার পর আমরা লোক পাচ্ছি না। কারওর সঙ্গে টিটোর অ্যাডজাস্টমেন্ট হচ্ছে না। সামনের হপ্তায় আমায় দিল্লি যেতে হবে, ফর ফিফটিন ডেজ। ওর মা’র বুটিকে পয়লা বৈশাখের চাপ। উই আর ইন ডায়ার মেস।”
“বুঝতে পারছি। তবু বাচ্চারা অনেকসময় এমন কিছু দেখে বা জানে, যা আমরা বড়োরা পারি না। এমনিতে ত্রিদীপ ছাত্র হিসেবে কেমন? স্কুলে কীরকম পারফরম্যান্স?”
“খুব ভালো। কোনও সমস্যা নেই।” গৌরবাবু খুব দ্রুত উত্তর দিলেন। আমি ওঁর দিকে তাকালাম। ভদ্রলোক চোখ সরিয়ে নিলেন।
“বেশ। তার মানে ও বুদ্ধিমান বাচ্চা। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমি ত্রিদীপকে আলাদা করে জিজ্ঞাসা করতে চাই।”
“দ্যাট আই কান্ট অ্যালাও ইউ অফিসার। আপনি যা জিজ্ঞাসা করার আমার সামনে করুন।”
ত্রিদীপ একইভাবে সিঁটিয়ে বসে পায়ের নখ খুঁটছিল। এতক্ষণে খেয়াল করলাম ওর পায়ের আঙুলে লাল রঙের নেলপালিশ। গৌর দত্ত দু’হাত বুকের কাছে জড়ো করে সোফায় হেলান দিলেন।
“হাই ত্রিদীপ। আমার নাম দর্শনা। আমি তোমার নতুন বন্ধু।” বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
ত্রিদীপ আমার দিকে তাকাল না। উত্তর দিল না। মাথা গুঁজে একমনে নখ খুঁটল।
‘তোমার ডাক নাম কী? বন্ধুরা কী বলে ডাকে?”
“টিটো।” উত্তর দিলেন গৌরবাবু।
“নেলপালিশ পরেছিলে? ভালো লাগে পরতে?”
ছেলেটা নখ খোঁটা বন্ধ করল আমার প্রশ্নে। কিন্তু মুখ তুলে তাকাল না।
“হ্যাঁ। আর বলবেন না। মায়ের ড্রেসিং টেবিল থেকে নেলপালিশের শিশি নিয়ে আঙুলে পরেছে। কী এমব্যারাসিং ব্যাপার!” গৌরবাবুর মুখ সত্যিই লজ্জায় লাল হয়েছিল
“এমব্যারাসিং কেন!”
“কী বলছেন! কীসব মেয়েলি ব্যাপার। এসব আগে ছিল না। গত কয়েকমাস ধরে…” গৌরবাবু আরও কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
টিটো এবার চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। সাদা দেওয়াল তুলে দেওয়া দৃষ্টি। অভিব্যক্তি নেই।
“প্রমিতের সঙ্গে ওর বয়সের গ্যাপ কত?” গৌরবাবুকে প্রশ্ন করলাম।
“প্রায় তেরো বছর।”
“কিছু মনে করবেন না, গ্যাপটা খুব বেশি নয়?”
“হ্যাঁ। টিটো আনপ্ল্যানড ছিল। ওর মা প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারেনি।”
“দাদার সঙ্গে খেলে টিটো?”
“না। দাদার সঙ্গে তেমন ভাব নেই।”
“আপনি ওকে উত্তরটা দিতে দিন মিস্টার দত্ত। টিটো… চুমকিদিদিকে কেমন লাগত তোমার? খেলত তোমার সঙ্গে?”
.
আচমকা ঘরের পরিস্থিতিতে একটা বদল এল। ছেলেটা সোজা হয়ে বসল। ওর চোখমুখ কুঁচকে গেল। আর তারপরেই, ও প্রায় আর্তনাদ করে কেঁদে উঠল। যেমন হঠাৎ কেঁদে উঠেছিল, তেমনই হঠাৎ সোফা থেকে উঠে দৌড়ে ভিতরদিকে চলে গেল। গৌরবাবু পিছন পিছন গেলেন। ত্রিদীপকে আর কোনও প্রশ্ন করার পরিস্থিতি নেই বুঝছিলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে বিদায় দেওয়ার সময় গৌরবাবু বললেন, “এভাবে আর প্রশ্ন করতে চলে আসবেন না। চুমকির মৃত্যুতে টিটো ট্রমাটাইজড। যাতে ট্রমা না বাড়ে, সেই চেষ্টা করছি আমরা।”
.
পাশেই ডি ২। নেমপ্লেটে লেখা ডি. চক্রবর্তী। টিটোর প্রাইভেট টিউটর। কাঠের পাল্লা বন্ধ, কোলাপসিবল খোলা। ভদ্রলোক আছেন কি নেই ভাবতে ভাবতে পাল্লা ভিতর থেকে খুলে গেল। সৌম্যদর্শন, আমাদেরই বয়েসি ভদ্রলোককে আগেও দেখেছি মনে পড়ল। ভদ্রলোক কোথাও একটা বেরোচ্ছিলেন। খোলা দরজার সামনে আমাকে দেখে অবাক হলেন।
“কিছু বলবেন?” প্রশ্ন করলেন।
“গুড মর্নিং। আমি এসআই দর্শনা বোস। চুমকি প্রামাণিক মার্ডার কেসটা দেখছি।”
“গুড মর্নিং।” ভদ্রলোকের চেহারায় সংশয়ের ছাপ পড়ল।
“চুমকিকে চিনতেন নিশ্চয়ই?”
“হ্যাঁ, ওই মুখ চিনতাম। কোনওদিন কথা হয়নি।”
“আপনি তো টিটোকে পড়ান?”
“হ্যাঁ। কেন বলুন তো?” ভদ্রলোক ঘাবড়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
“ছাত্র হিসেবে কেমন ও?”
“ভালোই। ইদানীং একটু অমনোযোগের সমস্যা হচ্ছে।”
“চুমকির মৃত্যুর পর ওর হাবভাবে কিছু বদল দেখেছেন?”
“মুষড়ে ছিল। এছাড়া আলাদা করে…” ভদ্রলোক একটু দ্বিধা নিয়ে বললেন।
ওঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। ইংরেজিতে মাস্টার্স। বহুবছর প্রবাসে ছিলেন। এখন বিজ্ঞাপনী এজেন্সিতে ওভারসিজ কর্পোরেটদের জন্য কনটেন্ট রাইটিংয়ের কাজ করেন। বেশিটাই ওয়ার্ক ফ্রম হোম। বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। গতবছর বাবা মারা গেছেন। ফাঁকা সময়ে ত্রিদীপকে পড়ান। প্রাইভেট টিউশন পেশা নয়, ভালো লাগে পড়াতে তাই পড়ান। সাকিব নামের কোনও ইনভেস্টিগেটিভ ব্লগার এখানে কোনও ঝামেলা করেছিল কি না জানতে চাওয়ায় বললেন, এরকম একটা সমস্যার কথা শুনেছিলেন। বিল্ডিংয়ের সেক্রেটারি ভালো বলতে পারবেন। বালিগঞ্জ থানাতেও কমপ্লেন গিয়েছিল। বিভাবরীর সেক্রেটারির ফোন নম্বরটি হস্তগত করে সিঁড়ি ধরলাম। লিফ্ট কাজ করছিল না। ডি ৩-এর দরজার পিছনে টিটো একদম নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল।
লবিতে নেমে দেখলাম, প্রতুল নাইলন ব্যাগে করে জিনিসপত্র একটা অটোয় তুলে দিচ্ছে। আমাকে স্যালুট করে দাঁত বের করে হাসল।
“এসব কী?”
“এসব সুচেতনায় যাবে ম্যাডাম। ফ্ল্যাটের স্যার-ম্যাডামরা দেন। যখন যে যেমন পারেন।”
আমি লক্ষ করে দেখলাম, অটোর পিছনে সুচেতনার ব্যানার লাগানো। অ্যান ইনিশিয়েটিভ ফর স্লাম ডুয়েলার কিডস। অটোতে পাঁচ-ছ’টা নাইলন ব্যাগ। কোনওটায় পুরোনো জামাকাপড়, কোনওটায় চাল-ডাল, কোনওটায় খেলনা।
“দত্তবাবুদের ফ্ল্যাট থেকেও দেয়। ফ্রি-তে প্রচুর ওষুধ দেন দত্তস্যার।”
অটোওয়ালা একটা কাপড় দিয়ে গাড়ির কাচ মুছছিল। তার দিকে তাকিয়ে প্রতুল বলল, “লিটনদা, ম্যাডামকে একটু বড়ো রাস্তা অবধি ছেড়ে দাও। আজ ওঁর গাড়ি নেই।”
অটোতে উঠে পড়ি। লিটন বলে, “কোন জায়গায় যাবেন ম্যাডাম?”
“থানায় যাব। আপনি আমাকে মেন রোডে ছেড়ে দিলেই হবে।”
লিটন দিলখুশ ভঙ্গিতে বলে, “আরে বসুন না। আপনাকে থানা অবধিই দিয়ে আসব। আমার বাড়ি ঢাকুরিয়া। এই লাইনে ট্র্যাফিকের সব স্যারেরা আমাকে চেনেন। কোনও অসুবিধা হবে না।”
আমি অটোয় গা এলিয়ে বসে পড়ি। অটোটা নতুন। ভিতরটা সাজানো। সাইড প্যানেলে শাহরুখ খান দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছেন। কালো টাক্সেডো, সাদা শার্ট আর কালো বো-টাই। খানকে মুগ্ধ চোখে দেখি। লোকটা সেরেফ কনফিডেন্সে খেলে যাচ্ছে এতগুলো বছর। বুদ্ধিমান, গ্রেট সেন্স অফ হিউমর, বডি-শডি আছে, কিন্তু তা নিয়ে শো-অফ নেই। খানের কালো টাক্সেডোর তলার দিকের অনেকেটা অংশ ফেডেড। বেমানান লাগছে। উল্টো দিকে সোনাক্ষী সিনহার লাল টুকটুকে জামা একটু বেশিই গ্ল্যামারাস। শাহরুখের প্লাস্টিক কোটিংটা ঘষা লেগে উঠে গেছে বোধহয়। আমি হাত বাড়িয়ে সেটাকে সমান করার চেষ্টা করি। অটো হু হু করে বালিগঞ্জ থানার দিকে এগোয়।
