ভ্রম – ১০

১০

“আমরা তখন সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি বুঝলি, পোস্টিং হয়েছে স্পেশাল ব্রাঞ্চে। ট্রেনি অফিসার। খবর এল মিশনারিজ অফ চ্যারিটিতে লেডি ডায়ানা আসবেন। বিরানব্বুই সাল, ফেব্রুয়ারি মাস। ফেব্রুয়ারির শীত মানে তখন জব্বর শীত। বড়ো সাহেব হুকুম দিলেন ডায়ানা আসার আগে নির্মলা শিশু ভবনের ইঞ্চি বাই ইঞ্চি টহল দিয়ে মেপে নিতে হবে। সিআরপিএফের ভিআইপি সিকিউরিটি টিম, আসল দায়িত্বে। আমরা ক’জন চ্যাংড়া অফিসার তাঁদের ল্যাংবোট। সাজো সাজো রব। পেঁচো ট্রেনিদের তো বটেই, সিনিয়র অফিসারদেরও লিভ ক্যানসেল।

এমন সময় এক কনস্টেবল এসে কেঁদে পড়ল। তার নাকি ওই দিন ছুটি লাগবেই। অ্যাকাউন্টস আর লিভ সেকশনের তনুময়দার হাত পা ধরে সে কী কান্নাকাটি! সে ব্যাটা বিহারের সমস্তিপুরের লোক। হাসি আর কান্না পেলে চোস্ত বিহারিতে কথা বলে। তনুময়দা কোনওমতে হাত-পা ছাড়িয়ে বলেছে, আচ্ছা অ্যাপ্লিকেশন রেখে যান, দেখছি। আমি বিকেলে বেরোনোর আগে একবার আড্ডা মারতে গেছি, দেখি তনুময়দা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। সামনে সেই কনস্টেবলের অ্যাপ্লিকেশন রাখা। কজ অফ লিভ— মাই ওয়াইভ’স ম্যারেজ।”

“অ্যাঁ?” বিজন পাশ থেকে বললেন।

“হ্যা। তখন মোবাইল ফোনটোন নেই, যে ফোন করে ক্রস ভেরিফাই করা হবে। আমি আর তনুময়দা ততক্ষণে সেই মহান বিহারিপুঙ্গবের অমল ধবল প্রেমিক হৃদয়ের প্রতি শ্রদ্ধায়, ঈর্ষায় প্রায় থরথর। তনুময়দা আবার বলছে, দ্যাখ আমরা বাঙালিরা এত সাম্যটাম্যর গান গাই, এ মাল তো জেন্ডার ইকুইটিতে গ্লোরিয়া স্টেইনেমকেও হার মানাবে। শালা নিজে দাঁড়িয়ে বউয়ের বিয়ে দেবে বলে ছুটি নিচ্ছে!”

“লোকটার ছুটি মঞ্জুর হয়েছিল?”

“অগত্যা।”

এদিকে ডায়ানা পর্ব মিটে যাওয়ার পর, কনস্টেবল খোশরাম পাসোয়ান কাজে জয়েন করলে তাকে ডেকে পাঠাল তনুময়দা। উদ্দেশ্য মহতি প্রগতির রহস্যটা বুঝে নেওয়া। সে ব্যাটা এসে দাঁত বের করে সেলাম ঠুকে দাঁড়াল। তনুময়দা সমব্যথী চোখে খোশরামের দিকে তাকিয়ে বলল, “সালাম তো আমার তোমাকে করা উচিত ভাই। এতদিন ধরে বিহারি খোট্টা ভেবে তোমাদের জাতটাকে ছোটো করে এসেছি। তুমি আজ সেই ভ্রম কাটিয়ে দিলে।”

খোশরাম এত শক্ত বাংলা বোঝে না। সে স্যালুট-দেওয়া পজিশনেই বলল, “স্যার সব কিছু ঠিকঠাক মিটে গেছে। আপকি বহত বহত মেহেরবানি। বউ ও খুশি হয়েছে যে ডেট ফেল হয়নি।” তনুময়দার তখন বিস্ময় কেটে গিয়ে রাগ হচ্ছে। এত ঔদার্য তো আর নেওয়া যাচ্ছে না! খিঁচিয়ে বলল, “বউ তো খুশি বুঝলাম, তুমি এত খুশি কীভাবে হচ্ছ? লজ্জাশরম কি পাতার আড্ডায় জ্বালিয়ে এসেছ?”

খোশরাম হেসে বলল, “স্যার বিয়ে হয়েছিল যখন ও আট আর আমি এগারো। রেজিস্ট্রেশন টেজিস্ট্রেশন কুছু নহি থা বা। এত্তদিন পরে কলকাতায় একটা মাথা গোঁজার জগা হবে, তার কাগজপত্তর দু’জনের নামে। ওকিল বোলা রেজিস্ট্রি কর লো। ই সব কে অন্দর উ ডায়ানা মেমসাব এসে পড়ল…”

“মানে! ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন করাবে তো শুধু বউয়ের নাম লিখেছ কেন!” তনুময়দা প্রায় চেঁচিয়ে বললেন। খোশরাম মাথার পিছনে হাত বুলিয়ে হাসল। বলল, “কেয়া বোলে স্যার, এত উমরে ফিরসে নিজের শাদির বারে মে লিখব? লোকে কী ভাববে?”

বিজন হো হো করে হেসে ফেললেন। তন্ময়দা চা খাচ্ছিলেন, গোঁফের কোণে মুচকি হাসি। কাপ নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোর কি পেট ব্যথা করছে?”

আমি একটা পেনের পিছন দিক চিবোচ্ছিলাম। টেবিলে বহু কাগজপত্র। গত রাতে সাকিবের ফাইলের ডকুমেন্টের কপি, আর আর্কাইভ থেকে সারা সকাল জুড়ে খুঁজে আনা ভিগ্নেশ আগরওয়ালের নাতনি দিব্যা আগরওয়ালের কেস ফাইল। প্রচুর কাগজ। কলকাতা পুলিশ, সিআইডি এবং সর্বশেষে সিবিআইয়ের তদন্ত রিপোর্ট। তন্ময়দার দিকে তাকিয়ে বললাম, “না। পেট ব্যথা করবে কেন?”

“তা হলে মাথা?”

“না। আপনি সেক্টর ফাইভে গতকাল কী হল, কিছু বলছেন না।”

তন্ময়দা একটা ঢেকুর তুলে আড়মোড়া ভাঙলেন। বললেন, “দাঁড়া বাপু। কাল খুব কষ্ট হয়েছে। এই বয়সে এ ধরনের পরিশ্রম কি আর পোষায়? এখন ধৰ্ম্মেকম্মে মন দেওয়ার সময়, নেহাত তোরা ক’টা কচি লেগে আছিস বলে আমাকেও জোর করে পাঁকে নামতে হচ্ছে।”

“আরে, কী হল বলবেন তো?” আমি অধৈর্য হয়ে বললাম।

“বলব, বলব। এভিডেন্স সমেত বলতে হবে, তা হলে ব্যাপারটা বুঝতে তোর সুবিধা হবে। সেগুলো এখনও এসে পৌঁছোয়নি। তুই বল, তুই সকাল থেকে চিত্রগুপ্তের দরবার খুলেছিস কেন?”

“দিব্যা আগরওয়ালের কেসটা নেড়েচেড়ে দেখছিলাম।” উত্তর দিলাম।

“দর্শনা মোটামুটি জল ধরো, জল ভরোর আইডিয়োলজি নিয়ে চলেন তন্ময়দা। কোথাও একটু লিক দেখলেই বালতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন।”

আমার বিজনের উপর রাগ হচ্ছিল। কান মাথা গরম হয়ে লাল হয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু চট করে কথা জোগাল না।

তন্ময়দা গুলি গুলি চোখ করে দু’জনকে মাপলেন। মাথা নাড়িয়ে বললেন, “না, বুঝতে পারছি। সেটা খারাপ কিছু না। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, বালতিটায় যেন লিক না থাকে। তা, দিব্যা আগরওয়ালের কেসে কী খুঁজছিস?”

“কিছুই না। জাস্ট কৌতূহল। আসলে সাকিবের আগ্রহের কারণটা ভাবছিলাম। এটাকেই তুলল কেন? কত রেপ আর মার্ডারের কেস রয়েছে। মাইনরদেরও। প্লাস এটা এখনও ওপেন কেস। কেউ ধরা পড়েনি। এর আগে যতগুলো ব্লগ করেছে, কোনওটাই ওপেন কেস নয়।”

“সাধারণত কেউ ওপেন কেস নিয়ে করে না। পাবলিকের এসব কেসে একটা মব লিঞ্চিং মানসিকতা থাকে, অপরাধী জানা না গেলে উৎসাহ কমে যায়। ভিউ কমে যেতে পারে।” তন্ময়দা ভেবে বললেন।

“সাকিব কিন্তু কেসটা নিয়ে রীতিমতো পড়াশুনা করছিল। পুরোনো খবরের কাগজের কাটিং জোগাড় করে রাখা। ল দেখো ডট কম থেকে কেসের হিয়ারিং রিপোর্ট ডাউনলোড করে প্রিন্ট করেছে। এগুলো সবই ওঁর মৃত্যুর আগে আগে।” আমি তন্ময়দার দিকে সাকিবের ফাইল বাড়ালাম।

“হুম। বিজনের কাছে ওর মৃত্যুর ব্যাপারটা শুনলাম। স্বাভাবিক দুর্ঘটনা মনে হচ্ছে না।”

“ডিএনএ এভিডেন্স কি ফলস হতে পারে না?” বিজন প্রশ্ন করলেন, “মানে দিব্যা আগরওয়ালের কেসে, আট বছরের বাচ্চার ডিএনএ পাওয়া গিয়েছিল এটা শিওর?”

“শিওর। অ্যানালিস্টের রিপোর্ট আছে। রুমালে দিব্যা আগরওয়াল আর আট বছরের আনআইডেন্টিফায়েড মেলের স্যালাইভা আর সোয়েট।” আমি বললাম।

“দ্যাখ, ডিএনএ অ্যানালিসিসের ব্যাপারটা আমাদের দেশে বেশ কঠিন। বার্ডেন অফ প্রুফের নাম শুনেছিস তো?” তন্ময়দা আমাদের বললেন।

“হ্যাঁ, ওই তো, বাদি পক্ষকেই অপরাধ প্রমাণ করার যাবতীয় দায়িত্ব নিতে হবে। ক্রিমিনাল কেসে সেটা পিপির উপর বর্তায়।”

“রাইট। এবার আমাদের দেশে সাসপেক্ট ফাইনাল করার পদ্ধতিটায় কোনও সমস্যা নেই। প্রথমে একটা বড়ো লিস্ট করা হয়, তাতে অনেকগুলো নাম থাকে। তারপর ইন্টারভিউ, এভিডেন্স কালেকশন আর ইন্টারোগেশন, একে একে নাম ক্যানসেল। যেগুলো পড়ে থাকে, সেগুলোতে জিরো ইন করার সবথেকে কম ব্যবহৃত কিন্তু মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে ডিএনএ ম্যাচ। যেমনটা মাটুর কেসে হয়েছিল। এবার ধরো, ডিএনএ সাসপেক্টের সঙ্গে মিলল না। তখন কী করবে?”

“জেনেটিক প্রোফাইলিং।” বিজন উত্তর দিলেন।

“’৯৭ সালে জেনেটিক প্রোফাইলিং খায় না মাথায় দেয়, কেউ জানে না। ব্যস, গল্প ওখানেই শেষ। বিদেশে হলে কী করত জানিস?”

“ডিএনএ ডেটাবেসের সঙ্গে মেলাত। বেশিরভাগ দেশে পুলিশের কাছে ডিএনএ-এর ডেটাপুল থাকে। শুনেছি ইন্টারপোলের কাছে সাতাশিটা দেশের ডিএনএ ডেটাপুল আছে। আমাদেরটা এখনও নেই।”

তন্ময়দা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তা হলেই বোঝ, দিব্যা আগরওয়ালের কেসে কেন জাস্টিস হয়নি। ডিএনএ ডেটাপুল থাকলে এই আট বছরের বালকের হিস্ট্রি-জিয়োগ্রাফি বের করা সহজ হত।”

“কিন্তু ডিএনএ কি ১০০ শতাংশ সঠিক ডিটেকশন দেয়?”

“দিচ্ছে তো। স্যাম্পল কোয়ালিটি, কোয়ান্টিটি আর প্রিজার্ভেশন পদ্ধতি ঠিকঠাক থাকলে ডিএনএ এভিডেন্স কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা শক্ত।”

.

দিব্যা আগরওয়ালের ফাইলের পাতা হলদে হয়ে এসেছে। কলকাতা পুলিশ যে প্রধান সাসপেক্টের লিস্ট তৈরি করেছিল, সিবিআই-ও তা থেকে বিচ্যুত হয়নি। গোবিন্দ নস্কর নামের এক ড্রাইভার, হরিনাথ সাঁপুই নামের এক মালি প্ৰধান দুই সন্দেহভাজন।

“এই দুটো লোককে সাসপেক্ট লিস্টে রাখা হয়েছিল তন্ময়দা।” আমি কাগজটা দেখিয়ে বললাম।

“হয়েছিল তো। কিন্তু সব সারক্যামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স। এই কেসের জাস্টিসে সলিড এভিডেন্স দরকার ছিল। এই দু’জনের হোয়ারঅ্যাবাউট, কমপ্লেক্সে ইন টাইম আর আউট টাইম দিব্যার মিসিং হওয়ার সময়ের সঙ্গে ম্যাচ করছিল। বাট দ্যাট ওয়জ নট এনাফ। হাতে নাতে প্রমাণ হতে পারত ডিএনএ। কিন্তু…” তন্ময়দা কাঁধ ঝাঁকালেন।

বিজনের ফোন বাজছিল। চেয়ার থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে ফোন ধরলেন।

তন্ময়দা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এত কী ভাবছিস?”

ওঁকে প্লাবনের মর্যড ছবিটার কথা বলে বললাম, “একটা আবছা বিশ্বাস

ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে তন্ময়দা। মনে হচ্ছে, চুমকি প্রামাণিকের হত্যারহস্য ওর ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়ার একটা বড়ো যোগ আছে। এভিডেন্স চোখের সামনে, অথচ কালপ্রিটকে ধরার ওয়ে-আউট পাচ্ছি না।”

“ইউরোপে একটা কাস্টম আছে জানিস তো,” তন্ময়দা স্মিত হেসে বললেন, “ইতালিতে ওরা জুলিয়েটের ব্রোঞ্জস্ট্যাচুকে বক্ষদেশে স্পর্শ করে। এই বিশ্বাসে যে বুক ছুঁলে নাকি প্রেম হয়। আবার নিউ ইয়র্কে চার্জিং বুলকে শিং আর ইয়ে, গোপন অঙ্গে ছুঁয়ে লোকে টাকাপয়সা হবে বলে বিশ্বাস করে। আমাদের দেশেও ঠাকুরের মূর্তির পা-হাত ছুঁয়ে লোকে আশীর্বাদ নেয়। মূর্তিগুলো কালের নিয়মে কালচে হয়ে গেলেও, এই বিশেষ জায়গাগুলো বহু বহু বছর ধরে ছোঁয়ার ফলে বেশ পালিশের ভাব আসে।”

আমি তন্ময়দার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালাম।

“যে-কোনও ইনভেস্টিগেটরের জীবনে এমন মুহূর্ত আসে, যখন বিশ্বাসের জায়গাটুকু ছুঁয়ে রাখা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। তোর ক্ষেত্রেও আসবে। মনে রাখিস, তুই যে বিশ্বাসটুকু ছুঁয়ে থাকছিস, গোটা পৃথিবীর কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও সেই একই বিশ্বাস ছুঁয়েছিল। গোদা বাংলায় আমরা একে ভাগ্য বলি। ভাগ্য কিন্তু একটা কালেক্টিভ থট, গোষ্ঠীগত বিশ্বাস।”

তন্ময়দা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বিজন জানালার পাশ থেকে হস্তদন্ত হয়ে এসে বললেন, “সোর্স ফোন করেছিল। মনে হচ্ছে একটা ছোট্ট অ্যাকশন করতে হবে।”

“মালটা কে?” তন্ময়দা নড়েচড়ে বসে জিজ্ঞাসা করলেন।

“স্নিগ্ধা।”

“কে ওই কানাইয়ের গার্লফ্রেন্ড?”

“হ্যাঁ।”

“অ্যাকশনটা কোথায়?”

“আপাতত কে সি পল অ্যান্ড সনস নামে এক সোনার দোকানে।”

“এর কাছাকাছি কিছু একটা আন্দাজ করেছিলাম, ঠিক এটাই বুঝতে পারিনি যদিও।” তন্ময়দা শিস দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “তোরা এগো তা হলে?”

“সে কী! আপনি যাবেন না?” বিজন প্রশ্ন করলেন।

“নাহ্। এই বয়সে আর দৌড়ঝাপ পোষায় না। আমি বরং ছবির খোঁজে যাই।” কীসের ছবি প্রশ্ন করার আগেই তন্ময়দা বড়ো বড়ো পা ফেলে করিডর দিয়ে হাঁটা লাগালেন।

লালবাজারের ড্রাইভার দক্ষ হাতে বেশ ক’টা ট্র্যাফিক সিগন্যাল ভেঙে গড়িয়াহাট ফ্লাইওভার ধরলেন। গড়িয়াহাট মোড়ে গাড়ি ঢুকতেই বিজন বললেন, “বিজন সেতুর দিকে নাও। ব্রিজে ওঠার আগে বাঁ দিক করে দাঁড় করাবে।” গাড়িটা একটা ভাঙা গুমটির সামনে পার্ক করলেন ড্রাইভার। এই অঞ্চলটায়

রাস্তার বাঁ দিক ঘেঁষে সার দেওয়া সোনার দোকান। বাঁ দিকের সরু রাস্তাটা চলে গেছে, ম্যাজিক আচার্য সিনিয়র পি সি সরকারের বাড়ির দিকে। কোন দিকটায় এগোব ভাবতে না ভাবতেই বিজনের ফোন এল।

“বাঁ দিকের ফুট ধরে এগোতে বলছে। কে সি পল জুয়েলার্স। রুবির অটো স্ট্যান্ডের দিকে।” বিজন ফোন কেটে বললেন।

একের পর এক অটো পাশ কাটিয়ে হু হু করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। গড়িয়াহাটের এই জায়গাটায় মফস্সলি গন্ধ। রাস্তার উপরে খাওয়ার দোকানের পাতা বেঞ্চ, খোলা জায়গায় কাটা সবজি, সাবানের ফেনা আর নোংরা জল পেরিয়ে সোজা হাঁটলাম। সোনার দোকানগুলোতে গত সত্তর বছরেও কোনও প্রসাধনের প্রলেপ পড়েনি। কিছু বাঁধা খদ্দের আছে, সঙ্গে বন্ধকী কারবার। এভাবেই চলে যায়। কে সি পল খুঁজতে অসুবিধা হল না। সোর্স একটা গলির মধ্যে বটতলায় দাঁড়িয়েছিলেন। দেখে হাত নাড়ালেন। পানের পিক ফেলে বললেন, দেরি করে ফেলেছেন। একটু আগেই চিড়িয়া উড়েছে। বাকিটা দোকানের মালিকের রিসিট বইতে আছে। লাস্ট রিসিট। ও বেরোনোর পর আর কেউ ঢোকেনি।

কে সি পলের দোকানি মাঝবয়েসি। স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত, গুঁফো। দোকানে একজনই কারিগর। বিজন চাইতে একটা খাতা খুলে দেখালেন। রিসিট বই। কার্বনের তলায় মোটামুটি স্পষ্ট হাতের লেখায় একটি দশ গ্রামের নেকলেসের বিল। দাম আশি হাজার সাতশো টাকা।

“বিলটা কার নামে পড়া যাচ্ছে?” বিজন আমার দিকে খাতা এগিয়ে দিয়ে তাকালেন।

আমি বিলের নামের অংশটার দিকে তাকালাম। জড়ানো হাতের লেখায় হলেও নামটা পড়া যায়। স্নিগ্ধা পাল!

“এই মালের অর্ডার কবে দেওয়া ছিল?” বিজন স্যাকরাকে জিজ্ঞাসা করলেন।

“অর্ডার দেওয়া ছিল মাস দেড়েক আগে। কিছুক্ষণ আগে মাল তুলে নিয়ে গেছে। কেন স্যার?”

“মাল কীসে নিয়েছে? ক্যাশে না চেকে?”

“ক্যাশে। আমরা কোনও বেআইনি কিছু করিনি। জিএসটি সহ রসিদ আছে। দেখে নিতে পারেন।”

“আপাতত আপনি এটা দেখুন তো,” বিজন ফোন খুলে স্নিগ্ধার ছবি বের করলেন।

স্যাকরা ছবির কাছে এসে ঝুঁকে মুহূর্তেই বলল, “আজ্ঞে, ইনিই তো।”

ক্যাশ মেমো বই আর স্নিগ্ধার দেওয়া ক্যাশ রিসিট কেটে বাজেয়াপ্ত করা হল। স্যাকরা অত্যন্ত অখুশি মনে রাজি হলেন। বিজন দোকানের বাইরে বেরিয়ে এসে বললেন, “স্নিগ্ধা পালের গতিবিধির উপর নজর ছিল। মহিলার হাজব্যান্ড ভিন্ রাজ্যের শ্রমিক। জলঙ্গির দিকে বাড়ি। দেশে চার দেওর ননদ আর শাশুড়ি থাকে স্নিগ্ধার। বর যা টাকাপয়সা রোজগার করে তাতে আশি হাজারের নেকলেস ক্যাশ দিয়ে কেনার ক্ষমতা হওয়ার কথা নয়।”

“হয়তো টাকা জমাচ্ছিল।”

“উঁহু। গত দেড়-দু’মাস ধরেই বিরাট খরচের হাত হয়েছে। নতুন শাড়ি, ফ্রিজ, আর এখন এই গয়না।” বিজন চিন্তিতভাবে বললেন।

“অ্যাকশনটা কখন?”

“এখনই। স্নিগ্ধাকে তুলতে হবে। চলুন।”

“কান টানলে মাথা আসবে বলছেন?”

“আলবাত।” বিজন গাড়িতে উঠে বললেন।

.

সবুজ রঙের পলেস্তারা খসা পাঁচিল ধরে টানা বাড়ির সারি। প্রত্যেকটা ঘরের বাইরে তারে রাশি রাশি জামাকাপড় শুকোচ্ছে। ঘরগুলোর ভিতর চোখ পড়লে, ভাঙা চেয়ার, বাতিল সোফা, পেট ফাটা টেডি বেয়ার দেখা যায়। চৌকির পায়া প্রায় দরজার সঙ্গে ঠেকে যায় এতটাই ছোটো মাপের ঘর। দুপুর সাড়ে তিনটে। মহিলাদের এখন বিশ্রামের সময়। অনেকেই স্নান সেরে চুল মেলে ঘরের দাওয়ায় বসে ছিলেন। আমাদের দিকে একঝলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন। চুমকির মৃত্যুর পর ইউনিফর্মের লোকজন দেখে সয়ে গেছে। স্নিগ্ধার ঘরের দরজা বন্ধ ছিল। বিজন জোরে ধাক্কালেন। ভিতর থেকে মহিলাকণ্ঠ “কে” বলে চিৎকার করে উঠল।

বিজন উত্তর দিলেন না। আবার দরজা ধাক্কালেন। ভিতর থেকে কাঁচা খিস্তি দিয়ে দরজাটা খুলে যে দাঁড়াল, সে নিশ্চয়ই স্নিগ্ধা। মারমুখো চেহারাটা ঝাঁঝিয়ে ওঠার আগেই আমাদের দেখে চুপসে গেল। মেয়েটার বয়স ত্রিশের নীচে। ধারালো চেহারা। হাইলাইটস করা চুল, চওড়া কপাল, ঘন ভুরু, পাতলা ঠোঁট। কটা চোখের নীচে একটা আঁচিল।

“কী ব্যাপার স্যার?” স্নিগ্ধার গলা দিয়ে মাখন কোমল স্বর বেরোচ্ছিল।

“ভিতরে চল। কথা আছে।”

“কী কথা? এখানেই বলুন না।” স্নিগ্ধা দরজার ধারে বিজনের গা ঘেঁষে এল। আমি হাত দিয়ে মেয়েটাকে ঘরের ভিতরে ঠেলে দিলাম। দরজায় ছিটকানি দিলাম। বিজন একটা চেয়ার টেনে বসে বললেন, “গয়নাটা বের কর।”

“কোন গয়না?”

“যেটা কানাই তোকে গিফ্‌ট দিয়েছে।”

স্নিগ্ধার মুখে একটা সতর্ক হওয়ার ছাপ পড়ল। তুতলিয়ে বলল, “কোনটা স্যার?”

“দশ গ্রামের নেকলেসটা যেটা দেড় মাস আগে অর্ডার দিয়েছিলি,” আমি বলে উঠলাম, “ডিজাইনটা দেখব, বের কর।”

“মাক্কালীর দিব্যি ও নেকলেস আমার বিয়েরটা বদলে কেনা। কানাই কিচ্ছু দেয়নি আমায়।”

“বদলেছিস কোথায়?”

স্নিগ্ধা নিজের জালে নিজে জড়িয়ে গিয়েছিল। চট করে উত্তর দিতে পারল না।

“আশি হাজার ক্যাশ কীভাবে পেলি? কানাই দিল?” বিজন বলে উঠলেন।

“না… না।”

“শোন, তোর বরের নম্বর আমাদের কাছে আছে। তোর নেকলেস, নতুন শাড়ি, ফ্রিজ এসব কেনার খবর জানে?”

“মাক্কালী বলছি স্যার। সব জমানো টাকায় কেনা।” স্নিগ্ধা মরিয়া চেষ্টা করল।

“এই যে বললি গয়না বদলে কিনেছিস?” বিজন হিসহিস করে উঠলেন। সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন, “শোন, কানাই যে তোকে টাকা দিয়েছে তা আমরা জানি। কেন দিয়েছে, কত দিয়েছে, তা নিয়ে মাথা ঘামাব না যদি তুই সাক্ষী দিস।”

“আমাকে কিচ্ছু দেয়নি স্যার কানাইদা। বিশ্বাস করুন।” স্নিগ্ধা কাঁদোকাঁদো মুখে বলল।

বিজন উত্তর দিলেন না। পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটা ছবি দেখালেন স্নিগ্ধাকে। একটা লোকের সঙ্গে স্নিগ্ধার ছবি। লোকটা কানাই নয়। একটা বন্ধ গ্যারাজের সামনের ছবিটা মোবাইলে একটু দূর থেকে তোলা। স্নিগ্ধা হাসতে হাসতে লোকটার বুকে ঢলে পড়ছে।

“এর কথা কানাই জানে? এ তোর নতুন নাগর? গত দু’হপ্তা ধরে কথা বলছিস।”

স্নিগ্ধার মুখ কালো হয়ে গেল। বিজনের দিকে তাকাল।

“কানাইয়ের ঘুড়ি কাটবে তুই জানতিস, তাই সাইডে আর-একটা রাখছিস তাই না?”

“মাইরি বলছি স্যার, বিশ্বাস করুন, শুধু ফ্রেন্ডশিপ আছে। আপনি যেমন ভাবছেন তেমন নয়।”

“হুম,” বিজন পায়ের উপর পা তুলে বললেন, “তুই যে এত ফ্রেন্ডশিপ করিস, তোর বর জানে? বলিস তো, একবার বলে দেখতে পারি…”

“না না, ওকে এসবের মধ্যে জড়াবেন না স্যার। রাগি টাইপের লোক…”

“কখন কী করে বসে…” বিজন যেন শূন্যস্থান পূরণ করলেন। স্নিগ্ধার চোখমুখ পাল্টে গিয়েছিল। অস্ফুট গলায় বলল, “কী করতে হবে আমায়?”

“আপাতত আমাদের সঙ্গে লালবাজার যাবে মামণি। এছাড়া ক’টা সই। ক’টা প্রশ্নের উত্তর। কোর্টে যখন ডাকবে, তখন হাজিরা। না হলে এসব ছবি গুজরাটে পাঠাতে আমার দু’মিনিট লাগবে।”

১১

লালবাজার স্ট্রিটে দাড়ালে তন্ময়দার ঘরটা দেখা যায়। ভরা বিকেলেও জানালা বন্ধ। অর্থাৎ এসি চলছে। ঔপনিবেশিক ছাপ থাকলেও এই বাড়িটার উপর আমার একটা আলাদাই মোহ ছিল। প্রাচীন লাল দিঘি, পুরোনো জেল, জেলবন্দিদের গল্প— লালবাজার শুধু স্থাপত্য নয়, ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে চোখের উপর ছেয়ে যেত।

স্নিগ্ধা আর কানাইকে লালবাজারে তুলে আনা হয়েছে ঘণ্টা চারেক হল। দু’জনের কাউকেই অন্যজনের গ্রেফতারির কথা বলা হয়নি। মেডিক্যাল হয়ে গেছে, খবর পেয়েছিলাম। লিফ্‌ট অকেজো থাকায় আমি আর বিজন দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ধরলাম। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে, বাবা এই একই বাড়িতে, এই একই সিঁড়ি বেয়ে উঠতেন। তখন লালবাজার স্ট্রিটে ছোটো ছোটো পাথর ফেলা ছিল, পুলিশ ডে-তে বাবা এখানে নিয়ে আসলে আমার সস্তা জুতোয় টক টক আওয়াজ উঠত। ঘোলাটে হলদে হ্যালোজেন বাতির তলায় দাঁড়ালে রাস্তায় কালো দীর্ঘ ছায়া পড়ত। লালবাজারের পুরোনো বাড়ির প্রাচীন কার্নিশ আর জানালার নীচে গাঢ় অন্ধকার, মিশমিশে কালো পুলিশ ভ্যানে বসে থাকা আমার বাবার সহকর্মীরা, আর এই সিঁড়ি বেয়ে কোন স্বর্গে উঠে যাওয়া কতগুলো কালো বুটের সারি, আমার আট বছরের বালিকা চোখ সেই রহস্যের অনুসন্ধান করতে করতে কখন যে পুলিশের আটপৌরে রূপটি দেখে ফেলেছিল, আজ আর মনে নেই।

ট্রেনিংয়ে আমাদের টিম ওয়ার্কের গুরুত্ব পড়ানো হত। আট পেরিয়ে চব্বিশে যখন ট্রেনিং শেষ করেছি, তখন সেসব ফালতু জার্গন মনে হত। আজ প্রায় দশ বছর পর, টিম-ওয়ার্কের চেয়ে আর কোনও গুরুত্বপূর্ণ শব্দ মনেই করতে পারি না। ব্যক্তিগত মেধা, দক্ষতা, ধৈর্য এসবই অর্থহীন যদি না যথা সময়ে টিম-মেম্বারদের ভরসার হাত পাওয়া যায়। তন্ময়দা আমাকে অল রোজেস অফ ডার্কের কতগুলো ছবি হোয়াটসঅ্যাপ করেছেন। আর উনি না থাকলে, এই ছবি জোগাড় করা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল।

তন্ময়দার ঘরে ভিড় ছিল। কিন্তু চেয়ারে আশ্চর্যজনকভাবে উনি ছিলেন না। হোমিসাইডের কল্লোলকে চিনতাম। মুখ কালো করে কীসব লিখছিল। বিজন গিয়ে দাঁড়াতে মুখ তুলে বলল, “ডিপার্টমেন্ট কখন কী চায় বুঝি না। দু’ঘণ্টা ধরে কানাইয়ের পিছনে রগড়ে যাচ্ছি, শালা টুটি টিপে বসে আছে। এত ঝুলাবে আগে চেহারা দেখে বুঝিনি।”

কল্লোলের সমস্যাটা বুঝতে পারছিলাম। মিথ্যা কথা বলা পাপ— এই মিথ পড়ে আমরা যারা বড়ো হই, এবং জীবনের একটা বয়স অবধি এই মিথে প্রবল বিশ্বাস করি, তারাই বালি থেকে মুখ তুলে দেখি, জীবনে মিথ্যের চেয়ে বড়ো সত্যি আর কিছু নেই। প্রতি সেকেন্ডে মানুষ মিথ্যে বলে। অন্যকে এবং নিজেকে। জেরার চেয়ারে বসার আগে তাই মিথ্যের মিথ ভাঙতে শেখানো হয়। আর উল্টোদিকের লোকটা যদি কিছুই না বলে, ‘যা করবি করে নে’ অ্যাটিচিউড দেখায়, তখন আমাদের যাবতীয় পাওয়ার সেন্টারে ধাক্কা লাগে। আমি পুলিশ, অথচ আমারই সামনে বসে আমায় নাকে দড়ি দিয়ে কেউ নাচাচ্ছে এটা মানতে অসুবিধা হয়। অপরাধী বেশিরভাগ সময়ে তা-ই চায়। জেরা বানচাল হয়ে যায় এভাবেই। কল্লোল প্রশিক্ষিত ইন্টারোগেটর হওয়া সত্ত্বেও সমস্যাটা হচ্ছিল। কানাই ওকে লুজ বল দেয়নি।

বিজন কল্লোলের হাত থেকে একতাড়া কাগজ নিয়ে চোখ বুলোলেন। ভুরু কুঁচকে বললেন, “নতুন কোনও ইনস্ট্রাকশন আছে? ডিসি সাহেব কিছু বলেছেন?”

“না। আপাতত স্নিগ্ধার স্টেটমেন্ট পেয়েছি। কানাই ওকে রেগুলার টাকা দিত, সেটুকু স্বীকার করেছে।”

“সে-সব টাকাটা কোথা থেকে আসত?”

“না। জানে না বলছে।”

“মার্ডারের রাতের কানাইয়ের অ্যালিবাই?”

“মেনটেন করছে। বলছে, কানাই ওর কাছেই ছিল।”

“মালটা হেবি প্রেমের জাল বুনেছে।” কল্লোল তিক্ত হাসি হেসে বলল।

বিজন বললেন, “মনে হয় না শুধুই প্রেম। অপরাধের পার্টনার বলে কথা।”

“তা ঠিক। টাকার সোর্সটা নিয়ে ইনফরমেশন না পেলে কোনও জাজমেন্ট করা যাচ্ছে না।”

মোবাইল খুলে, তন্ময়দার পাঠানো ছবিগুলো আর-একবার দেখলাম। চুমকির টাকা কোন উদ্দেশ্যে খরচা হয়েছে, কোথা থেকে এসেছে, আজকের পর আর সংশয় নেই। তন্ময়দাকে মনে মনে একটা ধন্যবাদ দিলাম। আর

তার সঙ্গে সঙ্গেই, দরজার বাইরে তন্ময়দা লম্বাটে চেহারাটা চোখে পড়ল। কল্লোল, বিজন আর অন্যান্য তরুণ অফিসাররা অভিবাদন জানালেন। তন্ময়দা ঘামছিলেন। কলারের কাছে একটা রুমাল দেওয়া। লালচে মুখ গরমে গনগন করছিল। কল্লোলকে খিঁচিয়ে বললেন, “তোমার সার্জিকাল স্ট্রাইকের জন্য ডিসি সাহেবের কাছে কথা শুনতে হল। তোমার কি কোষ্ঠকাঠিন্য আছে?”

কল্লোল আচমকা আক্রমণে খেই হারিয়ে ফেলছিল। কাঁচুমাচু মুখে বলল, “কেন স্যার?”

“তা আমি কি জানি, ডিসি সাহেব বললেন, তোমার মুখ দেখেই মনে হয়, পিছনে হাতকড়া গুঁজে ঘুরছ। ওতে পেঁচো ফার্স্ট টাইমাররা চমকাতে পারে, কানাইয়ের মতো ঘাঘু মালেদের জন্য অন্য পদ্ধতি লাগবে। তোমরা তিনজন থাকো এ-ঘরে। বাকিরা এই মুহূর্তে কাটো।” তন্ময়দা তর্জনী দেখিয়ে আমায়, বিজন আর কল্লোলকে নির্দেশ করলেন। ঘর ফাঁকা হয়ে গেল নিমেষে। তন্ময়দা কনুই অবধি শার্টের হাতা গুটিয়ে একটা মার্কার পেন নিয়ে দেওয়ালে টাঙানো হোয়াইট বোর্ডের উপর ঘষঘষ করে লেখা শুরু করলেন। নীল অক্ষরে ফুটে উঠল এল স্কোয়ার।

“এর মানে জানা আছে?”

আমরা তিনজনেই মাথা নাড়ালাম।

“এর অর্থ লিসেন অ্যান্ড লুক। মানুষ কথা বলার সময় মিনিটে ১২৫ থেকে ১৫০টা শব্দ বলে। ভাবে তার থেকেও দশগুণ বেশি গতিতে। তোমাদের আর কানাইয়ের মাঝখানে একটা মাত্র টেবিল। তোমাদের ওঁকে প্রশ্ন করতে হবে। প্রশ্ন হবে ইন্টারভিউ নেওয়ার মতো, ইন্টেরোগেশনের মতো নয়। যেন দুই ভাই দারুর আড্ডায় বসে সিপ নিচ্ছ। প্রতিটা প্রশ্নের শেষে পাঁচ সেকেন্ড সময় পর্যন্ত

কানাইয়ের চেহারার দিকে খেয়াল রাখবে, একই সঙ্গে কী বলছে সেটা শুনবে। যদি কানাই মিথ্যে বলে, ওই পাঁচ সেকেন্ডে ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে তোমাদের ওকে ধরতে হবে। স্টিমুলাস দুর্বল হয়ে গেলে ওর মস্তিষ্ক ডাইভার্টেড হয়ে যাবে। ও সুট করে কাটিয়ে দেবে।”

“তারপর?” বিজন বললেন।

“তারপরেরটা নিখুঁত সুইপ মানিক। সাক্ষাৎকার থেকে জেরায় ঢুকে যেতে হবে এমনভাবে, যেন মালটা মোটে বুঝতেই না পারে।”

“এসব কি আমাদের দ্বারা হবে? আপনি যদি সঙ্গে থাকতেন!”

“আমাকে ডিসি অন্য মিটিংয়ে থাকতে বলেছেন। তোরা ম্যানেজ কর। আর ক’দিন তোদের মন্টেসরি ট্রেনিং দেব?”

কল্লোল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “অগত্যা।”

তন্ময়দা কটমট করে কল্লোলের দিকে তাকালেন। বললেন, “আফটারশেভ মাখো?”

“হ্যাঁ স্যার।” কল্লোল আবার থতমত খেল।

“কেন? ফিটকিরিতে কাজ হয় না?”

“ইয়ে মানে…”

“প্রথম যে আফটারশেভ কিনেছিল, সে কেন কিনেছিল জানো?”

“কেন স্যার?”

“তাকে কিনতে বাধ্য করা হয়েছিল। ফিটকিরি ব্যবহার করে সন্তুষ্ট একটা গোটা পূর্ব এশিয়ান জনসংখ্যা ওল্ড স্পাইস ব্যবহার করতে শুরু করল মূলত একটাই কারণে— লং টার্ম পয়সা খরচের কথা চিন্তা না করে লোকে শর্ট টার্ম ভাবতে শিখল। শর্ট টার্মের বেনিফিট— সুন্দর গন্ধ, চকচকে গাল, সুন্দরী মহিলার এগিয়ে এসে গালে চুমু খাওয়া। ওটাকে ইংরেজিতে যেন কী বলে?”

“পেকিং, স্যার।” কল্লোল বলল।

“বাহ্।” তন্ময়দা কল্লোলের দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “তোমাদেরও একইভাবে কানাইকে আফটারশেভ কেনাতে হবে। এমন প্রশ্ন করো যেগুলোর উত্তর শর্ট টার্মে আসবে। অনেকগুলো শর্ট টার্ম থেকে তোমরা লংটার্মে আসবে— কানাইকে বুঝতে দেওয়া চলবে না। মনে রাখো, এখন তোমাদের হাতে স্নিগ্ধার জবানবন্দি আছে। কিন্তু কানাই সেটা জানে না। এটার বেনিফিট নাও। ইজ দ্যাট আন্ডারস্টুড?”

.

ডিসির ঘরে তন্ময়দার আবার ডাক পড়ল। কল্লোল একতাড়া কাগজ নিয়ে এসে আমাদের ধরাল- ২৪ তারিখ সারাদিন ও রাতে কানাইয়ের হোয়ারঅ্যাবাউটস, ফোনের টাওয়ার লোকেশন, মোবাইল চ্যাটের ট্রান্সক্রিপশন ইত্যাদি।

“চারটে গার্লফ্রেন্ডকেই সমান অ্যাটেনশন দিত। বাকিদের থেকেও চাট্টি সোনার গয়না পাওয়া যেতে পারে।” বিজন বললেন।

“মনে হয়, না। সোনা তাকেই দেবে যাকে লংটার্মে রাখলে লাভ আছে।” আমি বললাম।

বিজন কাগজপত্র উল্টে দেখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দর্শনা আপনি লিড করুন। মহিলার উপস্থিতি কানাইকে একটু রিল্যাক্সড রাখবে। আমরা মাঝপথে ঢুকব। বাইরে থেকে মনিটরিং করছি ততক্ষণ।”

লালবাজারের ইন্টেরোগেশন রুমে আগে কখনও ঢুকিনি। খুব একটা বড়ো মাপের নয়। ৫ বাই ৫ মাপের ঘর। প্রায়ান্ধকার, ঘুপচি। চোখে সয়ে যেতেই ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল চোখে পড়ে। ওপারে ঝিমিয়ে পড়া এক মূর্তি। এপাশে আরও দুটো ফাঁকা চেয়ার। টেবিলের বাঁ দিকে একটা ল্যাম্পশেড। সন্দেহভাজনের মুখে চড়া আলো ফেলে নির্বাক প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়াও জেরা রেকর্ডের জন্য ট্রাইপডে ক্যামেরা বসানো। এই পুরো রেকর্ডিং ঘরের বাইরে একটা এলইডি-তে অটো প্লে-তে চলে। সিনেমার সঙ্গে বাস্তবের এটুকু মিল।

শর্ট টার্ম চিন্তার প্রথম ধাপ তন্ময়দা বলে দিয়েছিলেন। মানুষ প্রভাবিত হতে চায়। প্রভাব খাটাও। আমি ঘরে ঢুকে দেওয়ালগুলোর দিকে তাকালাম। ইচ্ছে করে এই ঘরগুলোতে রং করা হয়নি। নোনায় ধরা, বিষণ্ণ একটা পরিবেশ। বাঁ দিকে সুইচবোর্ড। আমি হাতড়ে ল্যাম্পশেডের লাইট অফ করলাম। আন্দাজে পরপর চারটে সুইচ টিপে দিলাম। পাখা আর একটা এলইডি জ্বলল। কানাই চড়া আলো বন্ধ করতেই ধড়মড় করে উঠে বসেছিল। আমাকে দেখে ও অবাক হয়েছিল, বুঝতে পারলাম।

“জল খাবেন?” প্রশ্ন করলাম ওকে।

ও মাথা ঝাঁকিয়ে না বলল। চেয়ার টেনে বসতে বসতে লোকটাকে লক্ষ করলাম, ছোটো গোলাকার মুখ। মাথার চুল তো বটেই, কানের উপর জুলপিতে পর্যন্ত কলপ করা। ঢালু কপাল, চোখের আকারে সামান্য চৈনিক ছাপ। নাকের ধার আর চোখের কোলে বয়সের ভাঁজ দৃশ্যমান। মুখের আকারের সঙ্গে মানানসই ছোটো মাপের নাক। সরু করে কাটা গোঁফের উপর একটা মাঝারি সাইজের আঁচিল। খাটো গলা, রংচঙে একটা টি-শার্ট আর জিন্‌স পরনে। বিজনের কাছ থেকে ওর বিবরণ শুনে মনে হয়েছিল, লোকটা বেশি কথা বলে। কিন্তু চেয়ারে হাত-পা গুটিয়ে থাকা এই কানাইকে দেখে মনে হল, চারপাশে একটা কচ্ছপের খোল পরে নিয়েছে ও।

“আমার নাম দর্শনা বোস। আপনাকে চুমকি প্রামাণিককে নিয়ে ক’টা প্ৰশ্ন করব। আপনাকে কানাইদা বলে ডাকলে আপনার আপত্তি আছে?” আমি বললাম।

কানাই আমার দিকে ভাবলেশহীন চোখে তাকাল। বলল, “বলতে পারেন। সবাই তো সেই নামেই ডাকে।”

“কানাইদা, আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড একটু বলুন। মানে জাস্ট জানতে চাইছি আর-কি।”

“ব্যাকগ্রাউন্ড?”

“হ্যাঁ, মানে কোথায় বড়ো হয়েছিলেন, কী কাজ করতেন, পেয়ারাবাগানে কীভাবে এলেন, এসব আর কি। আপনার জীবনের গল্প।”

কানাইয়ের চোখে সংশয়ের ছাপ পড়ল।

“আমার গল্প শুনে কী হবে?”

“দেখুন, আপনার ফ্যামিলিতে একটা খুনের ঘটনা ঘটে গেছে। কে করল, কীভাবে হল, এসব জানতে গেলে একটু ফ্যামিলি হিস্ট্রি জানতে হয়। কথায় কথায় হয়তো আপনি এমন কোনও পয়েন্ট আমাদের জানাতে পারলেন, যাতে চুমকির বিশেষ কোনও অভ্যাস আমরা জানতে পেরে গেলাম। আপনাদের পরিবারের সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক কেমন ছিল, কার কার সঙ্গে ওঠাবসা ছিল, এইসব আর-কিক… বুঝলেন না?”

“আমাকে কি ফ্যামিলি হিস্ট্রি শোনানোর জন্য তুলে আনা হয়েছে?”

আমি জিভ কেটে বললাম, “ছি, ছি তোলা হবে কেন? এ সামান্য কথাবার্তা।”

“থানার বড়োবাবু যে বললেন, চুমকির ব্যাপারে আমাকে অ্যারেস্ট করছেন?” কানাই আমার দিকে তীব্র চোখে তাকাল।

“না, না। কোনও মিসকমিউনিকেশন হয়েছে। অ্যারেস্ট করা কি অত সহজ? দেশে আইনকানুন নেই? আপনার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আছে বলুন তো, যে আপনাকে অ্যারেস্ট করবে? আপনার ফোন রেকর্ড, লোকেশন সব মিলিয়ে দেখেছি আমরা।”

“তা হলে আগের জন এসে এত হম্বিতম্বি করছিল কেন?” কানাই সন্দিগ্ধভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করল।

আমি সামনের দিকে ঝুঁকে প্রায় ফিসফিস করে বললাম, “লালবাজারের অবস্থা, বুঝতেই তো পারছেন। ধরে আনতে বললে, বেঁধে আনে। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, চুমকি খুনে আমরা যে ক’জনকে সন্দেহ করছি, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে চুমকির রেগুলার কথাবার্তা হত। আমরা বোঝার চেষ্টা করছি, চুমকি এদের কোথা থেকে চিনত। সম্ভবত কুলতলি থেকেই পরিচয় ছিল। কলকাতা এসে সাগরের সঙ্গে প্রেম করত বলে প্রতিশোধ নিতে খুন করে গেছে।”

“কিন্তু আমি তো এসব ব্যাপারে কিছুই জানি না।” কানাই ভুরু কুঁচকে বলল।

“সে আমরা জানি। কিন্তু পারিবারিক দিকটা বোঝার চেষ্টা করছি। বাবা মা, পাড়া প্রতিবেশী। লোক কেমন ছিল ওরা? আপনার সঙ্গে ওদের কেমন সম্পর্ক ছিল?”

“সম্পর্ক আর কী? সব পরিবারেই যেমন হয়,” কানাই কথা বলতে শুরু করেছিল, “চাষ করতে রাজি ছিলাম না। লায়েক হতে বাবা দূরদূর করে তাড়িয়ে দিল। এঘাটে ওঘাটে জল খেয়ে চাম্পাহাটিতে বাজি কারখানায় ম্যানেজারের কাজ নিলাম। তারপর তো মশলায় আগুন লেগে বিরাট আগুন ধরল। একশোটা তুবড়ি আর বোমার বাক্স রাখা ছিল, সব একসঙ্গে ফাটল। দু’জন মারা গেল। আমি বেঁচে গেলাম। কিন্তু ডান হাতটা অকেজো হয়ে গেল।”

কানাই ওর ডান হাত তুলে দেখাল। তর্জনীর অংশে একদলা মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছু নেই। বুড়ো আঙুলও বিস্ফোরণের অভিঘাতে বেঁকে গিয়ে অদ্ভুত শেপ নিয়েছে।

“টাকাপয়সা জমানো ছিল?”

“কিচ্ছু না। ক’টাকা-ই বা আর মাইনে পেতাম। এই বস্তির কাজটা না হলে না খেতে পেয়ে মরে যেতাম।”

“আপনার বাড়িতে আর কে কে ছিল?”

“বাবা মা, দাদা বউদি, ভাইপো ভাইঝি।”

“তারা সাহায্য করেনি?”

“বাবা আমি বাড়ি ছাড়ার চার বছরের মাথায় মারা যায়। মা আরও দু’বছর বেঁচে ছিল। আমার সঙ্গে দেখা হয়নি।” কানাই মাথা নিচু করল।

“আর দাদা বউদি?”

“যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত।”

“হুম, তা হলে চুমকি যখন প্লাবনকে নিয়ে আপনার কাছে এল, তখন আপনার খারাপ লেগেছিল নিশ্চয়ই।”

“খুউব।” কানাই মধ্যম বর্ণের উপর অকারণ জোর দিল।

“ঠিক কী মনে হয়েছিল?”

“বাপ-মা হারা ছেলে মেয়ে। দেখে মন গলে গিয়েছিল।”

“দাদা বউদি তো আপনাকে দেখেনি। আপনার ইচ্ছা হয়নি ওদের খেদিয়ে দিতে?”

কানাই জিভ কেটে বলল, “না না।”

“আপনার চরিত্রের এই দিকটা আমায় আশ্চর্য করল। চারপাশে যত মানুষ দেখি, সবাই প্রতিশোধ নিতে মুখিয়ে আছে। আপনাকে চুমকি খুব মান্য করত নিশ্চয়ই?”

“প্রথম প্রথম খুব মান্য করত। কোভিড মিটলে কাজ জোগাড় করে দিলাম। টাকাপয়সার মুখ দেখল, অল্প বয়সের মেয়ে।”

“খুব শখ শৌখিনতা করত বুঝি?”

“না, তা নয়। টাকা জমাতে চাইত। হিসেবি ছিল।”

“আপনার বিপদেআপদে দেখত? টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করত?”

কানাই মাথা ঝাঁকিয়ে না বলল।

“সে কী! আপনার বিপদেও দেখত না। অকৃতজ্ঞ মেয়ে তো!”

কানাই গোবেচারার মতো হাসল।

“আর প্লাবন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“প্লাবন কী?” কানাই একটু অন্যমনস্ক হল যেন।

“প্লাবন কেমন ছিল? আপনাকে মানত?”

“খট্টাশ ছেলে ছিল। খালি জিনিসের ধান্ধা। দিদিকেই মানত না। ও ছেলের একদিন না একদিন ভোগে যাওয়া নিশ্চিত ছিল।”

আমি কানাইয়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালাম। এতক্ষণ পরে ও একটা লুজ বল দিয়েছে। কিন্তু সেটা ওকে এত সহজে বুঝতে দিলে চলবে না।

“আজকালকার বাচ্চাদের খুব জেদ। দেখি তো চারধারে।” আমি টেবিলের উপর থেকে জলের গ্লাস তুলে বললাম।

“আপনি জল বা চা কিছু খাবেন?”

“চা?” কানাইয়ের চোখ চকচক করে উঠল।

“হ্যাঁ। আনিয়ে দিচ্ছি।” আমি চেয়ার থেকে উঠে বাইরে গিয়ে কল্লোলকে ইশারা করে চা পাঠাতে বললাম। ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছিল কানাই আমাকে পিছন থেকে লক্ষ করছে না। ওর কচ্ছপের খোলাটা আস্তে আস্তে গলে যাচ্ছিল। তন্ময়দার হিসেব মতো প্রথম ধাপ সফল। দ্বিতীয় ধাপ রিপিটেশন বা পুনরাবৃত্তি। “তা প্লাবন কী ধরনের জেদ করত?” আমি কানাইকে জিজ্ঞেস করলাম। “নানা জিনিস নিয়ে। কখনও বন্দুক, কখনও বল, কখনও গাড়ি।”

“এসব দেখত কোথায়? আশেপাশের বাচ্চাদের এসব ছিল?”

“না, সুচেতনায় প্লাবনকে দিয়েছিল চুমকি। মাঝে মাঝে ওখানে বড়োলোকেদের বাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া খেলনা, পুতুল এসব আসত। যত বাচ্চা, তার চেয়ে কম জিনিস। কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। প্লাবন কোনওবারই কিছু পায়নি। বড়ো বাচ্চারা মারধোর করে কেড়ে নিত। বাড়ি এসে মুখ গোঁজ করে বসে থাকত ল্যাওড়ার বাচ্চা। খাবে না, দাবে না, সে কী জেদ। চুমকির জন্যই এসব বাড়াবাড়ি হয়েছিল। বার বার বলেছিলাম, এসব শখের দানছত্রে পাঠাস না।” কানাই একটু দম নিতে থামল।

“হুম। প্লাবনের কাছে একটা দামী স্মার্টওয়াচ পাওয়া গিয়েছিল?”

“হ্যাঁ। সে নিয়েই তো চুমকি ফেটে পড়ল। পিটাতে পিটাতে বলল, কার কাছ থেকে চুরি করে এনেছিস বল। লাটের বাট মুখই খুলল না। রাতভোর হতে বাড়ি ছেড়ে গেল। তখনই জানতাম ও মাল মায়ের ভোগে গেছে। আর ফিরবে না।”

“প্লাবন বাড়ি থেকে কিছু নিয়ে যায়নি?”

কানাই দু’দিকে মাথা নাড়াল। বিতৃষ্ণা ভরা গলায় বলল, “ওইটুকু লংকাকে লাই দিয়েছিল চুমকি। ওকে খোঁজার জন্য জলের মতো টাকাপয়সা ওড়াচ্ছিল।”

“কোথায়?”

“ওই তো ওই খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে চেয়েছিল। স্টেশনে স্টেশনে পোস্টার দেবে বলেছিল। বলুন তো আপনি, এসবে কাজ হয়?”

আমি জিভ দিয়ে চুকচুক করে বললাম, “এ হে! সেরেফ পয়সা নষ্ট। আপনি বারণ করেননি?”

“আরে বহুত বারণ করেছি। ইচ্ছে হত চাঁটি মেরে খানকির মুখ উড়িয়ে দিই। শালা মাটি কামড়ে পড়ে থাকত, আর ভাই ভাই করত। এক টাকা ধার চাইলে দিত না এদিকে।”

“কী আশ্চর্য না! অথচ আপনারই বাড়িতে থাকত, আপনি মাথা গোঁজার জায়গা না দিলে ভেসে যেত। রাস্তায় রাস্তায় গিয়ে খানকিগিরি করতে হত।”

“তা কি আর করতে বাকি রেখেছিল? দেড় লাখ টাকা না হলে একবছরে জমল কী করে!” কানাই কষের গোড়ায় জমে থাকা থুতু গিলে বলল।

“দেড় লাআআআখ টাকা! বলেন কী? কই ওর অ্যাকাউন্টে তো এখন এত টাকা নেই?”

কানাই আমার মুখের উপর চকিত দৃষ্টি ফেলল। গুলি বন্দুক থেকে বেরিয়ে গেছে, আর ফেরত নেওয়ার উপায় নেই, বুঝতে পারছিল। তিন নম্বর স্টেপ আর চার নম্বর স্টেপ কখন পার করে ফেলেছি, নিজেই বুঝতে পারিনি। সফল

জেরার অর্থ সামনের লোককে ভাবতে সময় না দেওয়া, কথার স্রোতে ভূত- ভবিষ্যৎ ভুলিয়ে দেওয়া। মন বলছিল, কানাই আফটারশেভ কিনে ফেলেছে। দরজায় একটা আওয়াজ হল। বিজন ঢুকলেন। হাতে এক তাড়া কাগজ।

“সোমালি কে গো কাকা?” বিজন চেয়ার টেনে বসে বললেন। ওঁর হাতে কানাইয়ের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের প্রতিলিপি।

“আমার বন্ধু।” কানাই ঢোক গিলে বলল।

“হুম, খুব আইসক্রিম খাইয়েছ। আর এটা কে? রেণু? সে-ও বন্ধু?”

“ওই একটু-আধটু কথা হয়।”

“তোমার কিন্তু হেবি ক্যালমা বস। কী দিয়ে এমন বশ করেছিলে?”

কানাই উত্তর দিল না। বিজন চ্যাটের পাতা উল্টে বললেন, “অ। রেণু বিরিয়ানি খেতে ভালোবাসে। তা-ও আবার আর্সেলানের। সে তো অনেক দাম না কাকা?”

কানাই একইরকম নিরুত্তর রইল।

“আহ্, বিজন! গার্লফ্রেন্ড রাখা আইনে বারণ নাকি? বিয়ে তো আর করেনি? কী বলুন কানাইদা?” আমি কানাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম। ও ফিকে হাসল। আদৌ হাসা উচিত হবে কি না বুঝতে পারছিল না।

“তাও ঠিক।” বিজন ঠোঁট উল্টে বললেন, “কাকা, একদম ফ্র্যাঙ্কলি বলো তো, এই সোমালি, রেণু, অদিতি আর স্নিগ্ধার মধ্যে কাকে তোমার সবচেয়ে আপনার লাগত? মানে একদম প্রাণের মনের তনের?”

কানাই ঠোঁটের উপর হাত বুলোল। ওকে নার্ভাস লাগছিল।

“কেউই আলাদা করে নয়… এসব এমনি কথাবার্তা…”

“কানাইদাকে যেমন ভাবছেন বিজন, লোকটা তেমন নয়। হেল্পফুল। হেল্পফুল লোকেদের নামে অমন গুজব ছড়ায়। আপনি সত্যি করে বলুন তো, গত মাসের মাঝামাঝি আপনি স্নিগ্ধা পালকে তিরিশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন নাকি? বিপদে পড়েছিল, বলে জোগাড় করে দিয়েছিলেন তো?” আমি বললাম।

“না, না।” কানাই প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল।

“লোকে তো তেমনই বলছে।” আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম।

“কোন লোক?”

“স্নিগ্ধা ওর পাশের বাড়ির বউকে বলেছে ওর বিপদে আপনি সাহায্য করেছিলেন। আবার পই পই করে বলেছেন আপনার নাম যেন চাউর না হয়।”

“তারপর ধরো, গত পয়লা রাত আটটার সময় স্নিগ্ধার বাড়ি গিয়েছিলে। সারারাত কাটিয়েছ। ভোরে বেরোনোর সময় পঞ্চাশ হাজার দিয়ে এসেছ। স্নিগ্ধা গাল বাড়িয়ে দরজার গোরে দাঁড়িয়ে তোমার চুমু নিয়েছে।” বিজন বলে উঠলেন।

কানাইয়ের কণ্ঠার কাছটা ওঠানামা করছিল।

“পঞ্চাশ আর তিরিশ, মোট আশি। বাকি সত্তর হাজার কোথায় গো কাকা?” আমি কানাইকে জিজ্ঞেস করলাম।

“কোনও টাকাপয়সার কথা আমি জানি না। স্নিগ্ধা ভুল বলছে।”

“যাহ্! কী যে বলো? স্নিগ্ধা আজই গিয়ে একতাড়া টাকা নিয়ে গয়না কিনে এনেছে। আমাদের কাছে বিল বইয়ের কাগজ আছে।”

“স্নিগ্ধা মিথ্যে বলছে।”

“ধ্যাৎ।” বিজন গলায় মধু ঢেলে বললেন, “টাকার বান্ডিলে তোমার হাতের ছাপ নেই বলছ? ও তো দু’মিনিটে বের করে নেওয়া যাবে।”

কানাইয়ের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। ওর চেহারায় একটা পরিবর্তন আসছিল।

বিজন শেষ বুলেটটা ছেড়ে দিলেন, তুই-তোকারিতে নেমে এসে বললেন, “চুমকির কাছ থেকে এত টাকা কেন নিয়েছিলি?”

বুনো শুয়োরের মতো দাঁতে দাঁত ঘষে কানাই বলল, “বেশ করেছি। শালা হারামি খানকি বেশ্যা। তেমনি ওর ঢ্যামনা ভাই। ওকে জিলিপির মতো ঝুলিয়ে রেখে টাকা নিয়েছি, বেশ করেছি।”

বিজন চেয়ার ছেড়ে উঠে কানাইয়ের কলার ধরে ফেলেছিলেন। কড়কড়ে গলায় বললেন, “নিজের ভাইঝিকে এভাবে ছিবড়ে করেছিস, লজ্জা লাগেনি?”

কানাইয়ের চোখ কটকটে লাল হয়ে গিয়েছিল। ওই অবস্থাতেই বলল, “কীসের ভাইঝি? খানকিদের আবার জাতকুল থাকে নাকি? শালা, এই তল্লাটে এমন কোনও ওয়ো নেই, মাগি গিয়ে দত্তবাড়ির ছেলেকে দিয়ে নিজের চুত মারায়নি।”

কানাইয়ের মুখ থেকে ভলকে ভলকে বিষ উঠে আসছিল। বিজন হকচকিয়ে বললেন, “মানে! কোন দত্ত? কীসব বলছিস?”

বিজনের দিকে তাকালাম। ওঁকে তন্ময়দার পাঠানো মেসেজগুলো দেখানোর সময় হয়ে গিয়েছিল। চেয়ার থেকে উঠে বললাম, “বাইরে চলুন, কথা আছে।”

১২

একটা কার্ডবোর্ডের বাক্সের মধ্যে চুমকির ঘর থেকে বাজেয়াপ্ত যাবতীয় জিনিস রাখা ছিল। যেরকমটা বিজন আগে বলেছিলেন। চুমকির ফোন, প্লাস্টিকে মুড়োনো একটা চার্জ আউট স্মার্টওয়াচ আর সেই ফেক ছবি। বাক্স তন্ন তন্ন করে হাতড়েও স্পাইডারম্যানের লাল মুখোশ পেলাম না।

প্লাবন কি তার কষ্টমুক্তির যন্ত্রটি পকেটে করে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল! বাক্সটার মধ্য থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ আসছিল। যেমনটা আধশুকনো কাপড়, ভিজে মাথার চুল, ঝাড়মোছ না হওয়া ঘরদোর থেকে আসে। নিম্নমধ্যবিত্ত আটপৌরে গেরস্থালিতে যেন কেউ হাতের কাজ থামিয়ে দূরে চলে গেছে।

ক্রাইম সিনের প্রথম ছবি মনে পড়ে গেল। জলাভূমির মধ্য থেকে চুমকির হাত আকাশপানে তাক করে আছে। আমি ওর হাতের রেখা দেখিনি, মৃত শরীর দেখিনি, বন্ধ চোখের পাতার নীচে অচঞ্চল মণি দেখিনি। অথচ ওর গ্লানি, তাড়না, ভাইকে বকাবকি করার জন্য অপরাধবোধ, নিজেকে নিঃশেষ করে ভাইকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা, সবটাই বড্ড স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিলাম। চামড়ার নীচে রক্ত আর রক্তের মধ্যে বয়ে চলা জীবনস্রোত। আপনজনের জন্য প্রাণপণ উজাড় করে দেওয়া। এ সাহস কি আমার হত!

এত আপন কি কখনও কেউ ছিল আমার?

তন্ময়দার ঘরে বসে গায়ে কাঁপুনি দিচ্ছিল। বিজন তন্ময়দার পাঠানো ছবিগুলো দেখছিলেন। অল রোজেস আর ডার্ক থেকে পাঠানো ছবি। প্লেফুল হোটেল রুমস বলে বিদেশে একধরনের হোটেল সেগমেন্ট হয় জানতাম। যারা যৌন সম্পর্কে অভিনবত্ব চান, তাদের জন্য বিশেষ করে বানানো

ঘরগুলিতে সব রকমের ব্যবস্থা থাকে। অল রোজেস আর ডার্ক কলকাতায় কবে থেকে এ ব্যবস্থা চালু করেছিল জানা নেই। তবে লাইসেন্স রেগুলার ওয়োর।

তন্ময়দা একটা আলোছায়া ঘরের ছবি পাঠিয়েছেন। ঘরটার ইন্টেরিয়র বিডিএসএম থিমড। চেনে বাঁধা দোলনা, দেওয়াল থেকে চেনে ঝুলন্ত কলার, বন্ডেজ হার্নেস, নিপল ক্ল্যাম্প, স্প্যাঙ্কিং টয়েজ, আরও অনেক নাম না জানা সামগ্রীর ছবি ফরোয়ার্ড করেছেন তন্ময়দা। বিডিএসএম ছাড়াও অল রোজেস আর ডার্কে, অতিরিক্ত পয়সার বিনিময়ে নানা ধরনের থিমড রুম ব্যবহার করা যায়। অল কিনক অ্যান্ড লাক্সারি। রুমগুলো সাধারণের জন্য নয়, বেশিরভাগ কাস্টমার এসব ব্যাপারে জানেন না। তবে প্রমিত আর জিয়ামিতার মতো কেউ কেউ জানেন।

তন্ময়দার ভয়েজ মেসেজ প্লে করেছিলেন বিজন। পোটেনশিয়াল কাস্টমার সেজেও এই ঘরগুলোর অ্যাক্সেস পাননি তন্ময়দা। পয়সার বিনিময়ে ছবি তুলে পাঠিয়েছে ওখানকার এক কর্মী।

“প্রমিত আর জিয়ামিতা সাকুল্যে দু’দিন গিয়েছিল। দ্বিতীয় দিন দু’জনে বিডিএসএম থিমড রুম বুক করে। কিন্তু ক্যাচাল হয় আধঘণ্টা পরে। জিয়ামিতার মুখে ঠুলি পরানো ছিল, ওটাকে বোধহয় এদের ভাষায় ‘মাউথ গ্যাগ’ বলে। সে অবস্থায় প্রমিত মেয়েটার উপর নির্যাতন শুরু করে। প্রথমে স্প্যাঙ্কিং করে, তারপর ব্লেড চালাতে থাকে ওর গায়ে। জিয়ামিতা বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে সেক্সে থ্রিল খুঁজতে গিয়েছিল। কিন্তু থ্রিল বদলে লাইফ থ্রেটনিং সিচুয়েশন হয়ে যায়।

জিয়ামিতা অঝোরে ব্লিড করছিল। আনকনশাস হয়ে পড়ে। সেই অবস্থায় প্রমিত ভয় পেয়ে যায়। হোটেলের লোক ডাকে। ওরা বিপদ দেখে এদের দু’জনকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেয়। নো ফার্স্ট এইড। অবভিয়াসলি এটা নিয়ে হোটেলের তরফে কিছু থানায় জানানো হয়নি। জিয়ামিতার ফ্যামিলি এরপর মধ্যস্থতা করে, প্রমিতকে হুমকি দিয়ে জিয়ামিতার সঙ্গে ব্রেক-আপ করায়।”

ভয়েস রেকর্ড শেষ হয়। বিজন আমার দিকে তাকান।

“প্রমিত দত্ত রক্তপাত না দেখলে সেক্সুয়াল অ্যারাউজাল পায় না।” আমি ওঁর দিকে তাকিয়ে বললাম। বিজনের ব্যাপারটা আত্মস্থ করতে সময় লাগছিল। ছবিগুলোর উপর বার বার চোখ বুলোচ্ছিলেন।

“প্রমিত স্যাডো ম্যাসোচিস্টিক স্পেকট্রামে স্যাডিজমের দিকে ঝুঁকে আছে। যৌন সম্পর্কে তুমুল ভায়োলেন্স না হলে এদের তৃপ্তি হয় না। চুমকির সিডিআরে যত কল, কাজের বাড়ি থেকে এসেছে, এই প্রমিতই করেছে মনে হচ্ছে। কাছাকাছি ওয়োগুলোতে দু’জনের আধার কার্ডের কপি নিয়ে খোঁজখবর করলেই প্রমাণ পেয়ে যাবেন। প্রচুর ক্যাশ ছিল, চুমকিকে হাতে হাতেই দিত নিশ্চয়ই।”

“গাঁড় মেরেছে। বানচোদ শালা।” বিজন মাথার রগদুটো টিপে বললেন।

মিনিট দশেক আগে কানাইয়ের জেরা শেষ হয়েছে। কানাই ওর অপরাধ স্বীকার করেছে। প্লাবন হারিয়ে যাওয়ার পরে ছকটা করে ও আর ছিটকু। চুমকির উপর কানাইয়ের রাগ ছিলই। এই সুযোগে ভাইঝিকে ছিবড়ে করে নেওয়া সহজ হয়েছিল।

ছিটকু চুমকিকে বোঝায়, প্লাবন মুম্বই পাচার হয়ে গেছে। এর পর এমন জায়গায় পাচার হয়ে যাবে, যেখান আর হদিশ পাওয়া যাবে না। চুমকি বিশ্বাস করতে ইতস্তত করে। ছিটকু আর কানাই কিছু মিথ্যে সোর্স তৈরি করে, কিছু ফেক ভয়েস রেকর্ড। তুরুপের তাস হিসেবে ফেক ছবিটি ফেলে। চুমকিকে আশ্বাস দেয় টাকাপয়সার বিনিময়ে, ছিটকু আর ওর দলবল প্লাবনের খোঁজ এনে দেবে।

টাকার পরিমাণটা বড়ো। শুধুই লোকের বাড়ি কাজ করে ও টাকা তোলা অসম্ভব। চুমকি প্রমিতের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। একবছরে প্রমিতের অকথ্য নির্যাতন সহ্য করে রোজগার করে আনা লাখ দেড়েক টাকা কানাই আর ছিটকু নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। কানাই পায় এক লাখ, ছিটকু পঞ্চাশ হাজার। প্লাবন কিন্তু ফেরে না।

“তার মানে প্লাবন আসলে কোথায় এরা জানে না?” বিজন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন।

“না।”

“এত শিওর হচ্ছেন কীভাবে?”

“আসল ছবির খবর থাকলে ফেক বানাত না। এরা জাস্ট সুযোগ নিয়েছে।”

“চুমকিকে মারতে তো পারে?”

“মোটিভ কী? সোনার মুরগি মারবে কেন?”

“চুমকি ওদের চালাকি ধরে ফেলেছিল?”

আমি হেসে মাথা নাড়ালাম, “চুমকি তা হলে চুপ করে থাকত নাকি? ওখানেই কেটে রেখে দিত। তাছাড়া কানাইয়ের পক্ষে চুমকিকে খুন করা সম্ভব নয়। ওর হাত কমজোরি, চুমকির মাথায় আঘাত বা শ্বাসরোধ করা, কোনওটাই ওর পক্ষে সম্ভব নয়।”

“হ্যাঁ, সেটা তো জানি। কিন্তু ভেবেছিলাম ছিটকুকে সঙ্গে নিয়ে…”

“মনে হয় না। অ্যালিবাই চেক করে দেখতে পারেন।” আমি বিজনের দিকে তাকিয়ে বললাম।

“তার মানে প্রমিত ছাড়া আর কেউ নয়!” বিজন টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন, “মেয়েটাকে ইউজ করছিল। শিওর কিছু ঘাপলা হয়েছিল রিসেন্টলি। আপনি না সেদিন বলছিলেন, প্রমিতের কপালে আর ঠোঁটে দুটোয় ক্ষত দেখেছিলেন?”

“হ্যাঁ।” আমি বললাম।

“ইয়েস, ইয়েস, ইয়েস। সব তো মিলে যাচ্ছে।” বিজন উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে উঠলেন।”

“মৃত্যুর আগে প্রমিত চুমকিকে সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজ করেনি, পিএম রিপোর্টে সেরকম কিছু নেই। মানে ভায়োলেন্সের কারণে মৃত্যু…”

“আরে না না ম্যাডাম,” বিজন টেবিলে একটা মুঠো পাকিয়ে বললেন, “ওর মুখের ওই ইনজুরিগুলো শিওর ডিফেন্সিভ উন্ড। তাছাড়া, এসব কেসে কতরকমের মোটিভ হয়। জাস্ট আর শুতে চায়নি বলে মেরে দিয়েছে এমনও হতে পারে।”

“চুমকি কিন্তু সে রাতে প্রমিতের ডাকে বেরোয়নি, সাগরের ডাকে বেরিয়েছিল।” আমি বিজনকে মনে করালাম।

“ওই একটাই খটকা ম্যাডাম।” বিজন উত্তেজিত ভঙ্গিতে বললেন, “তবে ভাববেন না। সব বের করে নেব। টানা আট-ন’ঘণ্টার জেরা তো আর দেখেনি বাপধন। এনসিবির ত্যাগীর সঙ্গে কথা হল, সেকশন ২১, ২৭ সব চাপাচ্ছে। মালটা হেবি ফেঁসেছে। ক্ষত দেখিয়ে অর্গাজম কী করে হয়, আমিও দেখাব বানচোদটাকে।”

“নারকোটিক্স প্রমিতকে তুলেছে?”

বিজন ঘড়ি দেখে বললেন, “এতক্ষণে খবর চলে আসা উচিত ছিল। আমি একবার নীচ থেকে ঘুরে আসি। তন্ময়দাকে জানাই। আপাতত অনেক কাজ। অ্যাবেটমেন্টের চার্জে স্নিগ্ধাকে অ্যারেস্টের ব্যবস্থা করতে হবে। বালিগঞ্জ থানাকে দিয়ে ছিটকুকে তোলাতে হবে।”

আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললাম। উইন্ডো এসিতে মাঝেমাঝে একটা কটকট আওয়াজ হচ্ছিল। বৃদ্ধ খোলনলচে জানান দিচ্ছিল, ওর বিশ্রাম প্রয়োজন। আমার বহু পুরোনো একটা গল্প মনে পড়ল। প্রাচীন জেরুজালেমের এক নারীকে তাঁর সতীত্বের প্রমাণ দিতে এক পুরোহিতের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। একপাত্র বিষপান করে যদি বেঁচে থাকেন, তবেই তিনি সতী।

গোটা বিশ্বের ধর্মশাস্ত্র ঘাঁটলে বোঝা যায়, অগ্নিপরীক্ষা একমাত্র আমাদের সীতাকে দিতে হয়েছিল, ব্যাপারটা তেমন নয়। চুমকি সে অর্থে দেবী ছিল না। টাকার প্রয়োজনে ও একটা বিপজ্জনক খেলায় জড়িয়ে গিয়েছিল। এমন একটা খেলা, যেটা শুরু তো ও করেছিল, কিন্তু শেষ করা ওর হাতে ছিল না।

এভিডেন্স বাক্স থেকে প্লাবনের স্মার্টওয়াচ উঁকি দিচ্ছিল। চুরি করে এনেছিল কি? নাকি উপহার পেয়েছিল? কে দিল উপহার প্লাবনকে? ঘড়িটাকে প্লাস্টিকে মোড়া অবস্থায় বের করে আনলাম। নির্জীব পড়ে আছে। এটাকে কেউ কখনও চার্জে দেওয়ার কথা ভাবেইনি। ফরেনসিকে দিলে কোন ফোনের সঙ্গে পেয়ার্ড ছিল, সেটা বের করা কঠিন হবে না। প্লাবনের নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা মন থেকে কেন জানি মুছতে পারছিলাম না। চুমকি মরে গিয়ে দুটো বহুদূরের বিন্দুকে যোগ করে দিয়ে গেছে। দেড় বছর আগে নিখোঁজ প্লাবন, আর এখনকার টিটো।

কতক্ষণ সময় কেটেছিল জানি না, তন্ময়দার ঘরের দরজা ঠেলে একজন মুখ বাড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি দর্শনা বোস? আপনাকে কনফারেন্স রুমে ডাকছে।”

“কে?”

“তন্ময়স্যার ডাকতে বললেন। বড়োসাহেবদের মিটিং চলছে। আপনাকে এক্ষুনি যেতে বললেন।”

.

লম্বা করিডরের দু’ধারে সারি দেওয়া ঘর, কোনওটার দরজা খোলা, কোনওটার বন্ধ। কিন্তু দাপ্তরিক ক্যাকোফোনি একেবারে মুছে গেছে। শুধু ইতস্ততভাবে ক’টা মোবাইলের রিং শোনা যায়। দু’-একটা হালকা ও ভারী গলায়, হ্যালো। কনফারেন্স রুম তিনতলায়। চওড়া কাঠের প্যানেল ঠেলে ঢুকে পড়ি। দু’জন কনস্টেবল, দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা অপাঙ্গে তাকান। মিটিং প্রায় শেষের পর্যায়ে। টেবিলের উপর কফির কাপ, আর মাফিনের প্লেট ফাঁকা। তন্ময়দা আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় অপেক্ষা করতে বলেন। মিটিংয়ে ডিসিডিডি, আর সিআইডির একজনকে চিনতে পারি। অন্য সকলেই অজানা।

ডিসিসাহেব মুখ মুছে তন্ময়দার দিকে তাকিয়ে বলেন, “তা হলে ওটাই ঠিক হল সামন্তবাবু। বাদাউন থেকে প্রায় একশো কুড়ি কিলোমিটার উত্তরে করিমপুরা। তারকের কনফার্মড লোকেশন, অ্যাজ অন টুডেস মর্নিং। ওর ফোন অফ, কিন্তু ওর এক ক্লোজ এইডের নম্বর খোলা। করিমপুরায় তারক আগেও গিয়েছিল, এটা কনফার্ম করেছে সোর্স। পুরোনো হাইড আউট বোধহয়। আপনি এখনই দলবলের সঙ্গে বেরিয়ে যান। নারকোটিক্সেরও দু’জন থাকবেন টিমে।”

“ওকে স্যার।” তন্ময়দা উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট করেন।

“করিমপুরা মাইনরিটি বেল্ট। নটোরিয়াস অ্যান্ড অলমোস্ট ইনফিল্টারেবল। লোকাল পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে যা করার করবেন। বাদাউনের সুপারের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। ট্র্যানজিট রিমান্ডের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ওয়ন্স ইউ ন্যাব তারক, টেক দ্য আর্লিয়েস্ট ফ্লাইট অ্যাভেলেবল টু কলকাতা।”

আমার অদ্ভুত লাগছিল। তন্ময়দা আমাকে জানি না কেন এই মিটিংয়ে ডেকেছেন। তারকের খোঁজ পাওয়া গেছে, সেটুকু পর্যন্ত আমি অফিশিয়ালি জানি না। রেইড টিমে ঠাঁই পাওয়ার নিশ্চয়ই প্রশ্ন নেই।

সাহেবরা খুব তাড়াহুড়ো ছিলেন। তন্ময়দা তাঁদের মধ্যে একজনকে পিছন থেকে ডেকে মাথা ঝুঁকিয়ে কীসব যেন বললেন। ভদ্রলোক আমার দিকে তাকালেন একবার। তন্ময়দাকে উত্তর দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।

“তারকের খবরটা আমিও জানতাম না বিশ্বাস কর।” তন্ময়দা আমার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, “তবে এনসিবিতে তোর দেওয়া লিডের খুব প্রশংসা করেছেন সুদেষ্ণা মিত্র। চক্রটা কোভিডের পরপর কলকাতায় অ্যাকটিভ হয়। জাল ছড়িয়েছে নেপাল থেকে, সে তো জানিসই। তারকের গ্রেফতারিটা হলে, জাস্ট দশ পার্সেন্ট ব্রেক-থ্রু। আসল কাজ এখনও অনেক বাকি। তুই যাতে পরবর্তীতে টিমে থাকিস, আমি সেটা আলাদা করে দেখব।”

“প্রমিতকে কি তোলা হয়েছে?” আমি তন্ময়দাকে প্রায় থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তারকের বিষয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না।

“হ্যাঁ। ঘণ্টাখানেক হল। আগেই তুলত, তবে বুঝতেই পারছিস, প্রমিতকে ওঠানো আর কানাইকে ওঠানোর মধ্যে ফারাক আছে। বড়োলোকের ছেলে, যথেষ্ট আট-ঘাঁট বেঁধে না নামলে, ফেস লস হবে।”

“মানে আপনি মেনেই নিচ্ছেন, আইন সকলের জন্য সমান নয়?”

“খোঁচা মারিস না। এ তো রিয়েলিটি পাগলা। এসব অস্বীকার করব, আমাকে কি ক্ষুদিরাম ঠাওরালি নাকি?” তন্ময়দা চোখ মটকালেন। বললেন, “প্রমিতের আজ শিলিগুড়িতেই মেডিক্যাল হবে। কাল কলকাতায় নিয়ে এসে জেরা। তাতে ফার্স্ট প্রায়োরিটি এনসিবির। আমি আমাদের দিকটাও ব্রিফ করে দিয়েছি। তুই আর বিজন ওঁদের সঙ্গে কো-অর্ডিনেট করবি।”

“বুঝেছি, কিন্তু আমাকে কী এই জন্য ডেকেছিলেন?”

“অ্যাই যা,” তন্ময়দা জিভ কেটে বললেন, “আসল কথাই বলতে ভুলে গেছি। ওই ভদ্রলোককে দেখলি তো?”

“কোন ভদ্রলোক?”

“প্রদীপ বর্মা, যার সঙ্গে কথা বললাম। এখন সিআইডির এসএস হেডকোয়ার্টার। নেক্সট ইয়ার রিটায়ার করবেন।”

“হ্যাঁ, দেখলাম তো।”

“সিটের নতুন মেম্বার। সিআইডি পাঠিয়েছে।”

“এখন নতুন মেম্বার!”

তন্ময়দা গলা নিচু করে বললেন, “বাদাউনেরই লোক। ওদিকে বিরাট সোর্স। কিন্তু সেটা বড়ো কথা নয়, প্রদীপ বর্মা, এককালে দিব্যা আগরওয়ালের কেসে অ্যাসিস্ট করেছিলেন। সাকিবের ব্যাপারটা বললাম, আগ্রহ দেখালেন। বললেন, খোঁজখবর নেবেন। আমার প্ল্যান ছিল, তোর সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়া, কিন্তু ব্যাড লাক, স্যারের আজ তাড়া ছিল।”

তন্ময়দা প্রদীপ বর্মার নম্বর দিলেন। প্রমিতের ফ্ল্যটের উদ্দেশে নারকোটিক্সের রেইড টিম বেরিয়েছে ঘণ্টা দেড়েক আগে। ওঁরা নিশ্চয়ই

এতক্ষণে ওয়ার্ম আপ সেশন শেষ করে ফেলেছেন। তন্ময়দা আর কথা না বাড়িয়ে বিদায় নিলেন। ওঁকে করিমপুরা যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হত।

কনফারেন্স রুমের চড়া এসিতে অস্বস্তি হচ্ছিল। করিডরে বেরিয়ে এসে, নীচে চলমান কলকাতার দিকে তাকালাম। কত সহস্র মানুষ রোজ এই পথ ধরে চলেছে। ভিড়ে মিশে আছে আরও কত প্রমিত, তারক, কানাই, ছিটকু, চুমকি, সাগর। প্লাবনের ছবিটা গ্যাড়া সিন করেছে, কোনও উত্তর পাঠায়নি। আপাতত চুমকি খুনে সব এভিডেন্স প্রমিতের বিপক্ষে। কিন্তু গল্প কি এখানেই শেষ? কতগুলো হিসেব যে মিলল না! আমি ঠিক করলাম, বিভাবরী থেকে একবার ঘুরে আসব।

পিটার পার্কার মাথার মধ্যে রহস্যময় হেসে বললেন, “উই হ্যাভ টু বি গ্রেটার দ্যান হোয়াট উই সাফার।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *