৫
“দ্যাখ, পরিচিত লোক তো নিশ্চয়ই। খুনটা পরিকল্পনা করে করেছে, বডি ডাম্প করার স্পট খুঁজেছে। তারপর গভীর রাতে এসে বডি ফেলে দিয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখলি?”
“হ্যাঁ। ফুটেজ ক্লিয়ার। রাত বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে দুই ধারের গেট দিয়ে কেউ ঢোকেনি। আমি দু’জন মিস্তিরির কথা ভাবছিলাম, যদি ওরা কোনওভাবে মেয়েটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু ফ্রন্ট গেটের ফুটেজটা থেকে প্রথম বিল্ডিংটার ফার্স্ট ফ্লোর দেখা যায়, ওরা দু’জন ওখানেই শোয়। টাইমটাও ম্যাচ করে যাচ্ছে। মানে সাড়ে দশটায় রান্না সেরে দোতলায় উঠেছে, তারপর…”
তন্ময়দা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললেন, “ধুস, ওরা নয়। বডি তা হলে ওখানে ফেলত না। কী বলছে জেরায়, মোবাইল দেখছিল?”
“হ্যাঁ। অ্যামাজন প্রাইম।”
“অলিগলি দিয়ে ঘুরছিস বিজন। কেসটায় সেক্সুয়াল অ্যাঙ্গল নেই। তা হলে আর কী হতে পারে? টাকাপয়সা জনিত কোনও বখেরা কারওর সঙ্গে? বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে কেঁচে যাওয়া সম্পক্কো? রিভেঞ্জ অ্যাঙ্গল? পেয়ারাবাগানে ভালো করে খোঁজ নে। কাকার সঙ্গে ভাইঝির সম্পর্ক খতিয়ে দ্যাখ। লোকাল পিএসকে ইনভল্ভ কর। মেয়েটা তো লোকের বাড়ি কাজ করত বললি। বাড়িগুলোতে জিজ্ঞাসাবাদ কর। হাতটান ছিল নাকি জান। অনেকসময় ছিঁচকে স্বভাবগুলো দিয়ে বড়ো খেপের লফড়া ধরা যায়।”
“দেখব। আসলে খোঁজখবর করার বেশি সময় তো পাইনি। গতকাল বিকেল থেকে রাত তো বেসিক ইনফর্মেশন নিতেই কেটে গেল।”
“কী বেসিক ইনফর্মেশন নিলি? তোকে বলেছিলাম বডি কোন দিক দিয়ে ঢুকছে সেটা বের কর।”
“আমি জাস্ট ওই পয়েন্টগুলোতেই আসব ঠিক করেছিলাম স্যার।”
“আসব আসব করিসনে, এসে পড়। ডিসি আজ ফোন করেছিলেন। পুকুর বোঝাই নিয়ে কাউন্সিলার পেয়ারাবাগান বস্তি কমিটি ঝামেলা লেগেছে। ভিক্টিম নাকি মেহতার সঙ্গে যে ক’টা মিটিং হয়েছে বস্তিবাহিনীর, তাতে লিড করছিল। ওদের ধারণা, মেহতা মেয়েটাকে মারিয়েছে। কাউন্সিলারকে চাপ দিচ্ছে কমিটি। মেহতার থেকে আরও বেশি টাকার ভাগ চাইছে এখন। মেয়েটার খুনের জন্য এক্সট্রা ক্ষতিপূরণ। মেহতা রাজি হলে ভালো, না হলে জলাকল্প, না কী যেন বেশ…”
“জলাদর্শ।”
“হ্যাঁ, ওই হল। জলাদর্শ আর কমিটি এক হয়ে গেলে, মেহতার পিছন খুলে হাতে চলে আসবে। গ্রিন ট্রাইবুনালে কেস উঠবে, এ তো শিওর। মেহতা এখন কাউন্সিলরের মাধ্যমে উপরতলা ধরেছে। তাড়াতাড়ি ব্রেক-থ্রু চাইছে।” তন্ময়দা মোবাইলে কার একটা নম্বর ডায়াল করতে করতে বললেন।
“কালপ্রিট ধরা পড়লে মেহতার কী সুবিধা হবে?”
তন্ময়দা মোবাইলটা কেটে চোখ সরু করে আমার দিকে তাকালেন। “কালপ্রিট পেয়ারাবাগান বস্তির হলে খানিক সুবিধা হবে বই-কি।”
“হুম।” তন্ময়দার কথাগুলো আত্মস্থ করতে সময় লাগল না। উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিয়ে বললাম, “চুমকির মোবাইল ঘেঁটে কিছু লিড আসবে আশা করি।” তন্ময়দা রিভলভিং চেয়ারটায় ডানদিক-বাঁদিক ঘুরে ফিরে আবার ফোনে কাকে যেন চেষ্টা করছিলেন। এবার সম্পূর্ণ পিছনদিকে ঘুরে গেলেন। এর মানে একটাই হয়, ভদ্রভাষায় যাকে বলে এবার কাটো।
.
স্বস্তিকার পুরো এরিয়াটা ছ’হাজার স্কোয়ার মিটার জায়গা। পুরোনো পাঁচিল বেশিরভাগ জায়গাতেই অক্ষত। শুধু সামনে দিয়ে মাল আসার সুবিধার জন্য পাঁচিল ভেঙে চওড়া করে নতুন গেট তৈরি করেছে। পিছনদিকের গেট বলতে খৈতানদের আমলের বিশাল আকারের লোহার গেট। তাতে দু’কেজি ওজনের ব্রিটিশ আমলের তালা ঝুলছে। এত বড়ো গেট পিছনে কেন রেখেছিল, বলা মুশকিল। বোধহয় কোনও গুদাম ঘর ছিল পিছনে, ব্যবসার মালপত্র রাখত। সামনের গেটটা খুলছে ভদ্রপাড়ার মধ্যে। রাস্তার দু’ধারে অজস্র ফ্ল্যাট। পিছন দিকের গেট খুলছে মেন রোডে। মাঝরাতেও যথেষ্ট অ্যাক্টিভিটি থাকে সেখানে। সিসিটিভি ফুটেজ যদি না-ও থাকত, এখান দিয়ে ডেডবডি নিয়ে কেউ ঢুকবে না— সেকথা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
বুজোনো পুকুরটার সামনে দাঁড়িয়ে তন্ময়দার কথা মনে পড়ল। দু’জন হোমগার্ডকে নামিয়েছি জলাটা ভালো করে হাতড়ে দেখার জন্য। যদি কিছু পাওয়া যায়। চারপাশে তাকালাম। পাঁচিলটা ফুট পাঁচেক উঁচু। বডিটাকে বাইরে থেকে ভিতরে ফেলে দেওয়ার চান্স নেই। তাই ভিতরে ঢুকে টেনে আনতে হয়েছে। কিন্তু ঢুকল কোদ্দিয়ে? এদিকটায় পাঁচিল ঘেঁষে বড়ো বড়ো গাছগুলো এখনও কাটা পড়েনি। রাবিশে রাবিশে ছয়লাপ মাটি। কোণে পাঁচিল-সাঁটানো একটা বাবলা গাছ। সেখানে একটা টিনের শেড দিয়ে একটা ছাদবিহীন এনক্লোজার। লেবারদের মলমূত্র ত্যাগের জন্য বানানো। কনস্টেবল বিল্টু দাস সেখান থেকে প্রস্রাব করে বেরিয়ে একটা সিগারেট পায়ের তলায় পিষে নেভালো। শেডের পিছনে বাবলা গাছের পাতা স্থির। পাঁচিলের পিছনে রাস্তা। পাড়ার ভিতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে মেন রোডে এসেছে। একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের গাড়ি জিনিসপত্র নিয়ে হুশ করে বেরিয়ে গেল। বোধহয় কারওর জন্মদিনের পার্টি শেষ। অনেক লালচে-গোলাপি ফেস্টুন উড়ছে ট্র্যাকে। পাঁচিলের এপাশ থেকে গোলাপি রেশটুকু চোখে এক সেকেন্ডের জন্য ধাঁধা লাগায়। একটা লাল চুড়ি পরা হাত, জলার মধ্যে নিস্পন্দ শুয়ে আছে-দৃশ্যটাকে নিষ্ঠুর ভাবে ফিরিয়ে আনে।
এনক্লোজারটা এত পলকা যে রাস্তায় ভারী গাড়ি গেলে কেঁপে ওঠে। তার দিয়ে বাবলা গাছের সঙ্গে বাঁধা। আমারও থলিতে চাপ পড়ছিল। ভিতরটা এত নোংরা যে গা গুলিয়ে উঠল। বাবলা গাছের পিছন দিকটায় জল ছাড়তে কী অসুবিধা! প্যান্টের জিপ নামিয়ে নিশ্চিত হওয়ার আগেই, একটা ক্যাটকেটে সবুজ রং চোখে পড়ল। বাইরের রাস্তায় একটা রিকশা ভ্যাপো ভ্যাপো করে চলে গেল। লালবাজারে পৌঁছোলাম ঘণ্টা দেড়েক পরে।
.
“ওটা বোধহয় মেথর বেরোনোর রাস্তা ছিল। পুরোনো লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলে বলে দেবে। আর কী দেখলি বল?” তন্ময়দার মেজাজটা এখন ফুরফুরে লাগছিল।
“সরু দেড় ফুট মতো পথ একটা। করোগেটেড শিট দিয়ে আলগা করে বন্ধ রাখা। গাছটার পিছনে প্রায় চাপা পড়ে গেছিল। বাইরে একটা স্টেশনারি দোকান আছে- বিড়ি সিগারেট কোল্ড ড্রিংক, মোবাইল রিচার্জ। মেন রোড দিয়ে বা পাড়ার মধ্যে দিয়ে ঘুরে আসতে গেলে অনেকটা পথ ঘুরতে হবে। মিস্তিরিরা এটা খুলে বাইরে আসত, যেত বলে কনফার্ম করেছে।”
“ওদিকটায় সিসিটিভি নেই?”
“নাহ্।”
“হুম। তার মানে কালপ্রিট স্বস্তিকার পরিসরটাকে হাতের তালুর মতো চেনে। গেটটায় হাতের ছাপ নেওয়া আবশ্যক। ফরেন্সিককে বলেছিস?”
“হ্যাঁ। ফোন করেছি।”
“আর চুমকির ব্যাকগ্রাউন্ড?”
“কিছুটা জেনেছি। চার বছর আগে কুলতলি থেকে ভাইয়ের হাত ধরে পেয়ারাবাগানে উপস্থিত হয়। কাকার কাছে থাকতে চায়। কাকাও হারামি স্যার। কোভিডের অজুহাতে ভাইঝি আর ভাইপোকে ঘরে ঢুকতে দেয়নি। চাতালে প্লাস্টিক খাটিয়ে ওরা থাকছিল। কোভিড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাইঝিকে রান্নার কাজে লাগিয়ে দেয়। শুনেছি ভাইঝির সঙ্গে রোজই মাল খেয়ে ঝগড়া করত।”
“মেয়েটার লাইফস্টাইল? বয়ফেরেন্ড?”
“চুমকির ঘর খুব সাধারণ। আলাদা করে শখ, শৌখিনতা কিছু নেই।”
“কী করে বুঝলি? বিবর্ণ দেওয়াল-টেওয়াল বলে ন্যাকামো করিস না। তুই লালফৌজের সদস্য ছিলি কলেজে, জানি। ওতে কি প্রমাণ হয় না।”
“আরে না, না। চুমকির দেওয়ালের রং বেশ চকচকেই। সদ্য করেছে। কিন্তু টেবিলে একটাই লিপস্টিক, একটা ক্ষয়ে যাওয়া ফেস পাউডারের কৌটো, তাকে গোটা দশেক জামাকাপড় ঠুসে ঠুসে রাখা। একটা সুটকেসে পুরোনো কিছু ছবি, আর শীতের জামাকাপড়।”
“ন্যাপথালিন দেওয়া?”
“না। একটা ভাঙা তুবড়োনো প্লাস্টিকের ব্যাট, ফালাফালা হয়ে যাওয়া একটা ক্যাম্বিস বল, একটা চার্জ আউট স্মার্টওয়াচ, আর-একটা গ্রুপ ছবি, বোধহয় ওর হারিয়ে যাওয়া ভাই আছে তাতে, সেগুলো প্লাস্টিকে মুড়িয়ে যত্ন করে রাখা।”
“গ্রুপ? পাসপোর্ট নয়!”
“নাহ্। কোনও একটা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, ক’জন ফরেনারের সঙ্গে।”
“অ। তা পাশের লোকজনের জেরা কমপ্লিট?”
“কিছুটা। এখনও উল্লেখযোগ্য কিছু পাইনি। একজন সোর্স লাগানো আছে। মেয়েটা এমনিতে কাজ আর বাড়ি, এই নিয়েই থাকত। কোনও কোনও সময় বয়ফ্রেন্ড নিতে আসত।”
“সে মাল কোথায়? কী করে?”
“একটা ফুড ডেলিভারি অ্যাপে কাজ করে। কাল রাত ন’টা নাগাদ কথা হয়েছে ফোনে, নাকতলায় গিয়েছিল খাবার পৌঁছোতে। আজ থানায় আসবে।”
“জিজ্ঞাসাবাদে আর কাকে কাকে ডেকেছিস?”
“বাড়িওয়ালা, চুমকির কাকা, প্রতিবেশী দু’জন, আর সাগর মণ্ডল, মানে চুমকির বয়ফ্রেন্ড।”
তন্ময়দা আমার মুখের দিকে না তাকিয়ে, খানিকক্ষণ দেওয়ালে ঝুলন্ত ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর অদ্ভুতভাবে বললেন, “চুমকি কে?”
“চুমকি, চুমকি প্রামাণিক!” আকাশ থেকে পড়ে বললাম।
“হুম। তুই কিন্তু ভিক্টিমের সঙ্গে সিমপ্যাথাইজ করছিস বিজন। রিলেট করছিস। ট্রেনিংয়ে কী শিখেছিলি মনে আছে? চুমকি প্রামাণিক কিন্তু ভিক্টিম। আর ভিক্টিমকে ভিক্টিম বলেই ডাকবি। নাম ধরলে পুরো নাম। কারণটা আশা করি তোকে মনে করিয়ে দিতে হবে না।”
আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললাম।
“বয়ফ্রেন্ডটাকে বাজিয়ে দেখ। আঠেরো-উনিশ বছরের মেয়ের গায়ে কাটাকুটি ভালো লক্ষণ নয়।” তন্ময়দা উপদেশ দিলেন।
ঘড়িতে এগারোটা বাজছিল। বাইকটা স্টার্ট দিয়ে মুখে উঠে আসা একটা টক স্বাদ গিলে নিলাম। অ্যাসিডটা জ্বালাচ্ছে বেশ কয়েকদিন। ব্যাগের মধ্যে রাখা র্যানটাকের পাতা খতম হয়েছে, আজ কিনতে হবে। তন্ময়দার সাবধান বাণী মনে পড়ল। থিয়োরিতে ভিক্টিম প্রেসিপিটেশন[৪] বলে একটা বিষয়বস্তু আছে। মদখোর মাতালদের কেসে ভিক্টিম প্রেসিপিটেশন খুব কমন ব্যাপার। গ্যাং ওয়ারেও তাই। আবার যেসব ক্ষেত্রে ভিক্টিম নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে আনে, তাদের ক্ষেত্রেও একই থিয়োরি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই কেসের ভিক্টিম কি নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছিল!
.
[(৪) অপরাধবিদ্যার প্রেক্ষাপটে, ভিক্টিম প্রেসিপিটেশন বলতে এমন পরিস্থিতি বোঝায় যেখানে একজন ভিক্টিমের কর্মকাণ্ড বা বৈশিষ্ট্য অপরাধ সংঘটনে অবদান রাখে। এটি একটি বিতর্কিত তত্ত্ব কারণ অনেকে মনে করেন, এটি ভিক্টিমকে দোষারোপ করার একটা কায়দা, এমনকি তাদের কর্মকাণ্ড অনিচ্ছাকৃত হলেও তারা দোষী বলে প্রতিপন্ন হয়ে যান।]
৬
“হুম। এই পুরো ঘটনায় এখন মেহতার স্ট্যান্ডপয়েন্ট কী?” আমি বিজনকে জিজ্ঞাসা করলাম।
“হে হে। মেহতা সেঁটে আছে পুরো ম্যাডাম। বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র গান্ধী। ওর বক্তব্য হচ্ছে চুমকির খুনে ওর দূর দূর পর্যন্ত কোনও কানেকশন নেই। তো রুপিয়া খামোকা ও কেন দেবে? দিতে হলে পুকুর বুজোনোর ব্যাপারটা চেপে দেওয়ার জন্য কর্পোরেশনকে দেবে। তাই না?”
“বস্তির লোকজন তো সেই দাবি মানছে না নিশ্চয়ই?”
“না। এই নিয়েই তো মিডিয়াতে উত্তাল বাইট দিচ্ছে। খবরে দেখাচ্ছে তো।”
“দেখেছি। আসলে মিডিয়ায় এখনও মেয়েটার নাম লিক হয়নি। ফলে শিওর হচ্ছিলাম না, এটাই সেই কেস কি না। কিন্তু আইনত বস্তি কমিটির দাবি ধোপে টিকবে বলে তো মনে হয় না। তা সত্ত্বেও ঝামেলা, যখন করছে… আচ্ছা, অন্য
কোনও খার আছে মেহতার সঙ্গে? জানেন?”
“অন্য খার? একটু হিন্ট দিন কী বলতে চাইছেন?”
“মেহতা কি কোনওসময় বস্তি উচ্ছেদের চেষ্টা করেছিল?
বিজন একটু চিন্তা করে বললেন, “ঠিক জানি না। তবে খোঁজ নেব।”
“সে নিন। তবে এটুকু শুনে মেহতার অ্যাঙ্গেলটা দুর্বল লাগছে। তাছাড়া কাউকে সরাতে হলে মেহতা তাকে খুন করে নিজের জমিতেই ফেলে রেখে দেবে এটা অবাস্তব। মেরে ফেলার একশো এক কায়দা আছে।”
“সে আর কে কাকে বোঝাবে ম্যাডাম!”
“তবে, কেসটায় একটা অন্য ইন্টারেস্টিং অ্যাঙ্গল আছে কিন্তু।” আমি বিজন বসুর দিকে তাকিয়ে বললাম।
“কোনটা বলুন তো?” ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে বললেন।
“এই যে ভিক্টিমের মোবাইল ক্রাইম সিন থেকেই উদ্ধার হওয়ার ব্যাপারটা। বিরল নয় বেশ?”
“তা বটে। হয়তো পুলিশ যে সিডিআর বের করে কল ডিটেলস সব জেনেই যায়, খুনিরা শেষ পর্যন্ত রিয়ালাইজ করেছে। অযথা পরিশ্রম করেনি।”
ভদ্রলোকের কথা বলার ধরনে হেসে ফেললাম।
“তা না-ও হতে পারে। মনে হয় খুনির সঙ্গে ফোনে সরাসরি ভিক্টিমের যোগাযোগ ছিল না। তাই মাথা ঘামায়নি। অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে বডির সঙ্গে ফেলে গেছে।”
“এমন ইচ্ছাটা হল কেন বলুন তো?” বিজন চিন্তিতভাবে বললেন।
“কল রেকর্ডস ফোনে ডিলিটেড ছিল না নিশ্চয়ই?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“না, না। ব্যাপারটা হচ্ছে মোবাইলটা সুইচড অফ ছিল। খুলে অবশ্য দেখলাম কল লিস্টে সব নম্বরই জ্বলজ্বল করছে। লাস্ট কল রাত সাতটা বেজে চল্লিশ মিনিটে। সাগর মণ্ডলের মোবাইল থেকে।”
“এক মিনিট। ফোনে চার্জ ছিল?”
“হ্যাঁ। চল্লিশ পার্সেন্ট ব্যাটারি ছিল।”
“স্ট্রেঞ্জ! ফোন তবে কেন সুইচড অফ ছিল!” আনমনে বললাম।
“কিছু বললেন?” বিজন পাশ থেকে প্রশ্ন করলেন।
“নাহ্! তা হলে সাগর মণ্ডলকে আপনারা বয়ফ্রেন্ড হিসেবে সন্দেহ করেই তুলবেন ঠিক করলেন?”
“না। তা নয়। সাগর মণ্ডলের সম্পর্কে বেশি ইনফর্মেশন ছিল না আমাদের কাছে। তিন বছর আগে, মানে কোভিডের পর পরই ও কলকাতায় আসে। আগে থাকত মেটিয়াবুরুজের দিকটায়। বছরখানেক হল পেয়ারাবাগানে আরও দুটো ছেলের সঙ্গে থাকে। সকাল আর দুপুর বেলায় গরফাতে একটা মুদির দোকানে কাজ করে। আর বিকেলে ছ’টার পর জিঙ্গোর ফুড ডেলিভারির কাজ করে।”
“ছ’টা থেকে?”
“কোনও ঠিক নেই, যতক্ষণ অর্ডার আসে। ইনকাম ভেরিয়েবল হয়, বুঝতেই পারছেন। কখনও পাঁচ হাজার, কখনও দশ হাজার, কখনও আর-একটু বেশি।”
“হুম। সেদিন লাস্ট ডেলিভারি ক’টায় করেছিল?”
“রাত আটটা আঠাশ।”
“আর তার প্রায় এক ঘণ্টা আগে চুমকিকে কল করে? “ “হুম। হ্যাঁ ওটাই চুমকির ফোনে লাস্ট রিসিভড কল।”
“সাগরের অ্যালিবাই কিছু ছিল?”
“প্রথমে বলেছিল, রাত বারোটার পর ও ওর ভাড়াবাড়িতে ছিল। ওর ঘরের অন্য ভাড়াটেরা তা-ই বলেছিল। তাই ওকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সিদ্ধার্থ চাকলাদার, মানে বালিগঞ্জ থানার আইসি গতকাল বিকেলে একটা সিসিটিভি ফুটেজ পাঠায়। সেটাই এই কেসের ব্রেক-থ্রু বলতে পারেন।”
বিজনের কথা শেষ হল না। সাগর মণ্ডলের বাড়ির সামনে বিরাট জটলা দেখে উনি থেমে গেলেন। সুরতহাল করে মৃতদেহ মর্গে চালান করতে কেটে গেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা। এর মধ্যে সারা গ্রাম ভেঙে পড়েছে সাগরের বাড়ির সামনে। ভিড় এড়িয়ে আমরা বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। বাড়ির দাওয়ায় কর্ডের খাটিয়া পাতা ছিল। তারে মেলা সাগরের মা’র বেগুনি আর সবজে রঙের শাড়ি দুলছিল হাওয়ায়। উঠোনে বড়ি শুকোতে দেওয়া আছে। দরজার কোণটায় একটা মুড়ো ঝ্যাটা উল্টো করে রাখা। মা বলত, ঝ্যাটা উল্টো রাখা অলক্ষুণে। বিশ্বাস করি না। কিন্তু কোনও কোনও দৃশ্যের অভিঘাত এসব পুরোনো কথা মনে পড়িয়ে দেয়। ঘরের দরজার কাছে জমায়েত আর ভিতর থেকে ভেসে আসা মরাকান্না বাদ দিলে পরিবেশ যেন প্যাস্টেল কালারে আঁকা গ্রামের বাড়ির ছবি। আকাশের উপর মেঘের ঘোড়া খুর দাপিয়ে দৌড়ে চলেছে এদিক-ওদিক। মাটির উপর কার বাড়িতে সময় থেমে গেছে, তাতে প্রকৃতির কিছু আসে যায় না।
সাগরের মা’র বয়স বেশি নয়। চল্লিশের কোঠায় হবে। সিঁদুর নেই দেখে বুঝলাম স্বামী গত। নতুন কোনও মুখ ঘরে ঢুকলেই তার দিকে এক পলক ফেলে ডুকরে উঠছেন, যন্ত্রের মতো বার বার ক’টা কথা বিড়বিড় করছেন, “এই তো কালকেই এই দরজাটার কাছে দাঁড়িয়ে জল চাইল… মরে গেছে কী বলছ… মরেনি মরেনি, মরতে পারে না… ও বাবা সাগর…”
শোক বেশিক্ষণ স্তিমিত থাকছে না। হাত পা ছুড়ে নিজেকে ছাড়িয়ে ছেলের কাছে যেতে চাইছেন। তাকে বসিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রতিবেশী মহিলারা।
সাগরের পিএম রিপোর্ট পেতে পেতে পরশু। সুরতহালের সময় সার্জেন জানিয়েছেন, মৃত্যুর আনুমানিক সময় সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে সাতটা। বিজনবাবুর ফেরার তাড়া ছিল। উনি বার বার ঘড়ি দেখছিলেন। কলকাতা ফেরার ট্রেন দুপুর সাড়ে তিনটেয়। কিন্তু এ যাত্রায় ভদ্রলোক যে নিষ্পত্তি আশা করে এসেছিলেন, তা আর সম্ভব নয়। ওঁকে আরও বেশ কয়েকবার পুরুলিয়া আসতে হতে পারে এই ভেবে মুষড়ে রয়েছেন।
সাগরের একমাত্র বোন, হাতে একটা প্লেট নিয়ে ঢুকল ঘরে। তার চোখ- মুখ ফোলা, কিন্তু কিশোরী বলেই হয়তো, সে তার মায়ের মতো চরম বিপন্নতায় ডুবে যায়নি। তার হাতের প্লেটের উপর পাঁচ-ছ’টা চায়ের কাপ। ঘরে যারা ছিলেন, তারা দ্রুত হাতে তুলে নিলেন সেগুলো। সম্ভবত আমরা আসার আগেই, উপস্থিত পরিজনদের জন্য এই শোকার্ত মেয়েটিকে চা করতে হয়েছে। হাত খালি হতে, মেয়েটি অসহায় চোখে তাকাল আমাদের দিকে।
“আমাদের কিছু লাগবে না। তুমি বসো।” মেয়েটাকে আশ্বস্ত করে বললাম। সে মাথা নিচু করেই থাকল।
“নাম কী?”
“ঝুমা মণ্ডল।”
“কোন ক্লাসে পড়ো?”
“টেন।”
“দাদার ব্যাপারটা কখন জানতে পারলে?”
ঝুমা একবার চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “সকালেই। তমোজিতের কাছে।”
“তমোজিৎ কে?”
“ওরা… ওরা টিউশনি থেকে ফেরার সময় দাদাকে দেখেছিল।” ঝুমার ডান চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। “তমোজিৎ আর কে?”
“তমোজিৎ আর তপা… তপন।”
“তোমার বন্ধু বুঝি?”
ঝুমা ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে বলল, “একই স্কুলে। ওদেরও টেনে পড়ার কথা। গতবছর ফেল করেছে।”
“তোমার দাদা গতকাল ফেরে কলকাতা থেকে?”
“হ্যাঁ। কাল দুপুরে।”
“দাদা ওখানে কী কাজ করত জানতে?”
“মুদির দোকানে কাজ করত একটা।”
“ফুড ডেলিভারির কাজও তো করত রাতে?”
“হ্যাঁ। পার্টটাইম করত।”
“তোমাদের সংসার কীভাবে চলে? মানে দাদা বাদে, বাবা…”
“বাবা মারা গেছেন আমার তেরো বছর বয়সে। কিছু জমি ছিল। সেসব বিক্রি করে টাকা জমানো আছে জানি। আর দাদা মাসে মাসে টাকা পাঠায়।”
“দাদার পড়াশুনা কত দূর?”
“ক্লাস টুয়েলভ অবধি পড়েছে।”
“তারপর?”
“পুরুলিয়াতে একটা হোটেলে কাজ করেছিল তিন বছর। তারপর কলকাতা যায়।”
“তোমাদের পরিচিত কেউ কলকাতায় থাকেন? কাজের ব্যবস্থা কে করে দেয়?”
“ওই হোটেলেই একজন ট্যুরিস্টের কারখানায় কাজ নিয়ে মেটিয়াবুরুজ গিয়েছিল।”
“আর মুদির দোকানের কাজটা?”
“মেটিয়াবুরুজে থাকতে থাকতেই জোটায়। ওখানে মাইনে বাড়াচ্ছিল না।”
আমি ঝুমাকে খুব ভালো করে লক্ষ করলাম। দোহারা গড়ন। পরনের সালোয়ার-কামিজ খুব কেতাদুরস্ত না হলেও সস্তা নয়। হাতে একটা লাল পাথর বসানো সোনার আংটি। মেয়েটা কথা বলতে বলতে আংটির পাথরটাকে খুটছিল। ঘরের অবস্থা দেখে বোঝা যায় একেবারে ঝড়তি পড়তি অবস্থা ছিল না একসময়ে।
“দাদা কাল কলকাতা থেকে আসার কথা আগে জানিয়েছিল?” বিজন প্রশ্ন করলেন।
“নাহ্। কাল ভোরে ফোন করে বলে যে আসছে।”
“ক’টা নাগাদ পৌঁছেছিল এখানে?”
“ঠিক জানি না। বোধহয় তিনটে নাগাদ।”
বিজন আর আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। তিনটেয় আতনা পৌঁছেছে মানে ভোরের রূপসি বাংলা ধরে কলকাতা ছেড়েছে।
“তুমি তখন ছিলে? যখন দাদা আসে?
“না স্কুলে ছিলাম।”
“কাল দাদার সঙ্গে কী কী কথা হয়েছিল?”
ঝুমা একটু থমকে তাকাল। ইতস্তত করে বলল, “দাদা কথা বলতে চায়নি বেশি। জিজ্ঞেস করাতে বলল মুম্বই যাওয়ার কাজটা পিছিয়ে গেছে, তাই মনমরা লাগছে। বাড়ি থেকে বেরোতেও চায়নি।”
“সাগর মুম্বই যাচ্ছিল?”
“যাচ্ছিল তো। বৈশাখ মাসে বলেছিল যাবে।”
“কেন? নতুন কোনও কাজ?”
“হ্যাঁ। ওর এক বন্ধু জুটিয়ে দেবে বলেছিল। মুম্বইতে মাইনে বেশি।”
“দাদা এখানে কত মাইনে পেত জানো?”
ঝুমা ঘাড় নাড়িয়ে না বলল।
“চুমকি বলে কারওর কথা কোনওদিন শুনেছ?”
ঝুমা অবাক হয়ে তাকাল। বলল, “না।”
“দাদা কোনও গার্লফ্রেন্ডের কথা কোনওদিন বলেছে?”
“না!”
“তুমি কোনওদিন বালিগঞ্জে গেছ?”
“না। আমি আর মা অনেকবার যেতে চেয়েছি। দাদার ভাড়া বাড়িতে থাকার জায়গা নেই বলে দাদা বারণ করেছে।”
“বেশ। আজ সকালের কথা বলো। দাদা কখন বেরিয়েছিল?”
“আমি আর মা কেউই জানি না। সাড়ে ছ’টায় আমার পড়তে যাওয়া থাকে, আমি উঠে দেখি দাদা বেরিয়েছে। মা তখনও ওঠেনি। দাদা মাকেও কিছু বলে বেরোয়নি। দাদাকে একবার ফোন করলাম, ফোন সুইচড অফ বলল। তখনও জানি না…” ঝুমা এবার ফুঁপিয়ে উঠল।
“জানতে পারলে ক’টায়?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“স্কুলে বেরোনোর জন্য রেডি হচ্ছিলাম। তমোজিৎ আর তপা এসে খবর দিল।”
“মাকে তখনই জানালে?”
“না। মা’র হাই প্রেশার। গত পরশু মাথা ঘুরে পড়ে গেছিল। আমি তখনই জানাতে পারিনি।” ঝুমা চোখমুখ চেপে অন্তর্গত আবেগ রোধ করার চেষ্টা করছিল। মেয়েটি বয়সের তুলনায় বেশ পরিণত।
“তারপর?”
“আমি ওদের সঙ্গে সিদ্ধেশ্বরীর দিকে যাই। ওখানে তখন অনেক লোকের
ভিড়। সনাতনকাকা ছিল, ভজনদা ছিল, আরও কারা কারা পঞ্চায়েতের লোক। ওরা কেউ আমাকে দাদাকে দেখতে দিতে চাইছিল না। আমিই জোর করে…
প্রথম নরহত্যা দেখার বীভৎসতা মেয়েটার মুখের উপর ছাপ ফেলল। এই স্মৃতি থেকে আজীবন ওর নিষ্কৃতি নেই।
“সাগরের সঙ্গে কারওর কোনওরকম শত্রুতা ছিল? এমন শত্রুতা যার জন্য ওকে খুন হতে পারে?”
ঝুমা একটু যেন আড়ষ্ট হয়ে গেল। ঢোক গিলল, মুখের মাংসপেশি টান টান হয়ে গেল এক মুহূর্তে। দু’-এক সেকেন্ডের অন্তর, উত্তর এল, “না। তেমন কিছু জানি না।”
“সাগর কলকাতা থেকে যে ব্যাগটা এনেছিল, সেটা দেখা যায়?” আমি ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম।
ঝুমা কিছুক্ষণের মধ্যে নীল কালো একটা রেক্সিনের ব্যাগ এনে দিল। ব্যাগে দু’-চারটে জামাকাপড়, গামছা, একটা টেক-অ্যাওয়ে জয়েন্টের খাবারের বাক্স, তাতে আধ-খাওয়া দুর্গন্ধ ছড়ানো রুটি তরকারি উদ্ধার হল।
সাগরের ঘরে উঁকি মেরে দেখলাম। বিছানায় ওলটপালট চাদর দেখলে বোঝা যায় সে এই ঘরে রাতে শুয়েছিল। ছেলেটার মোবাইল মিসিং। ক্রাইম সিন থেকে ওটা খুনির সঙ্গে গায়েব হয়েছে, বোঝাই যাচ্ছে। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এলাম। জুতোর র্যাকে মেয়েদের স্যান্ডেল ছাড়াও, একটা জেন্টস কিটো রাখা।
“সাগরের জুতো?” ঝুমা সামনেই দাঁড়িয়েছিল। মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল।
“এটা পরে তো বেরোয়নি আজ?”
ঝুমা একটু ভেবে বলল, “ঠিক জানি না। এটা বাড়িতেই থাকে। এখানে আসলে পরে। এটা না হলে হাওয়াই।”
ঝুমার কাঁধে হাত রেখে বললাম, “জাস্ট একটা কথা ঝুমা। তোমার দাদার কেসটা খুনের। পুলিশ নিজে থেকে এফআইআর করবে। তোমার মাকে থানায় এসে একবার সইসাবুদ করে যেতে হবে। এটা আমার নম্বর। একটা মিসড কল কোরো। আমি তোমায় আর তোমার মাকে পরে থানায় ডেকে নেব। আর যদি কখনও মনে হয়, তুমি কিছু জানাতে ভুলে গেছ, আমাকে নির্দ্বিধায় ফোন করবে।”
ঝুমার ফোন নম্বর সেভ করে ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ঝুমা বলল, “মা যাতে কোনওভাবে দাদাকে ওই অবস্থায় দেখতে না পায়, সেই ব্যবস্থা করবেন?”
৭
“ডাবল হোমিসাইডের কেস আগে সলভ করেছেন?” বিজন প্রশ্ন করলেন। আমি হেসে ওর দিকে তাকালাম। উত্তর দিলাম না।
“কী ফ্যাসাদে পড়া গেল বলুন তো!” বিজন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন। সঙ্গী দু’জন কনস্টেবল একটু দূরে সিগারেট ফুঁকছে। থানার পাশে একটা চায়ের দোকানে জিপ দাঁড় করিয়েছিলাম। সাগরের পাড়া-প্রতিবেশীর প্রাথমিক জেরা শেষ হয়েছে। যে দু’জন ক্লাস নাইনের ছাত্র বডি প্রথম দেখেছিল তারাও তাদের জবানবন্দি দিয়েছে।
“আমার মনে হয় আপনার আজকের দিনটা এখানে থেকে গেলে ভালো হয় কাল আর-একবার ফ্রেশ ইনভেস্টিগেশন করে দেখলে নতুন কিছু তথ্য পাওয়া যেত।” ব্যাগ থেকে একটা বাপুজি কেক বের করে বিজনের দিকে বাড়ালাম। নিঃসংকোচে সেটি হাতে তুলে নিয়ে বিজন বললেন, “ঠিকই বলেছেন। কিন্তু বাড়িতে ছেলে দুটোর জ্বর। মনটা ওদিকেই পড়ে আছে।”
“একসঙ্গে জ্বর?”
“হুম। যমজ তো। এ ওর কাঁধেপিঠে চড়ে থাকে। একটার হলে আর-একটার হয়।”
“ওহ্। কত বয়স?”
“ছয় পেরিয়ে সাতে পড়ল।” ছেলেদের কথায় ওঁর চোখমুখ চকচক করে ওঠে। কেক চিবোতে চিবোতে বললেন, “আপনার এখানেই বাড়ি?”
“হ্যাঁ। ওই আর-কি।”
“বিয়েটিয়ে করেননি নিশ্চয়ই?”
“বিয়ে করলে ডাবল হোমিসাইড সল্ভ করতে পারতাম বলছেন?”
“এ হে, লজ্জা দেবেন না। আসলে ওভাবে কথাটা বলতে চাইনি। বুঝতে চাইছিলাম আপনি ফোর্সে কদ্দিন আছেন।”
“তা হল বছর দশেক। ট্রেনিং পিরিয়ডটাকে যদি অভিজ্ঞতা ধরেন। কিন্তু একটা জিনিস আমি বুঝতে পারছি না। আপনি কি এই দুটো খুনের মধ্যে আলাদা করে কোনও যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন?”
“দুটো খুন কানেক্টেড নয় বলছেন!” বিজন চোখ কপালে তুলে বললেন।
“না। তা বলছি না। তবে, ভিক্টিম আর সাসপেক্ট দু’জনের মৃত্যু পরপর হলে বেশ একটা স্পাইরাল এফেক্ট তৈরি হয়। তার উপর নির্ভর করে দুটো খুনে যোগসূত্র আছে কি না বলতে পারাটা একটু কঠিন। হতেও পারে। না-ও পারে।”
“স্পাইরাল এফেক্টটা আবার কী জিনিস?”
“মানে একটাই কেস, আলাদা আলাদা অ্যাঙ্গল। প্রথমে শুধু ভিক্টিম ছিল, এখন সাসপেক্ট নিজেই ভিক্টিম। আর সেক্ষেত্রে টাকাপয়সা নিয়ে ঝামেলা, পারিবারিক কোনও শত্রুতা, জমিজমা নিয়ে পুরোনো কোনও বিবাদ, কত কিছুই তো হতে পারে। কলকাতার অ্যাঙ্গলটাই একমাত্র, তা না-ও হতে পারে।”
“হুম।”
“বিশেষত ছেলেটার বাবা নেই। পারিবারিক আয়ের সোর্স কি একা ও, না আর কিছু ছিল সেটা জানতে চেষ্টা করছি। জমিজমা নিয়ে বিবাদ এ অঞ্চলের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। মা একটু স্বাভাবিক হলে জেরা করা যেতে পারে। অবশ্য সাগরকে আপনি কেন গ্রেফতার করতে এসেছিলেন, সেটা অফিশিয়ালি জানলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।”
বিজন আমাকে ভুরু কুঁচকে মাপছিলেন। আমি সেটায় পাত্তা না দিয়ে বলে চললাম, “এখনও পর্যন্ত যা তথ্য আমাদের কাছে আছে, তা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার যে সাগর মণ্ডল আর যাই হোক, পুরুলিয়ায় ছুটি কাটাতে আসেনি। বাড়ি থেকে সে এক পাও বেরোয়নি। সেই ছেলে আজ ভোরবেলা কাউকে কিচ্ছুটি না বলে বেরোয় এবং খুন হয়। তমোজিৎ আর তপন দু’জনেই জানিয়েছে, ন’টা নাগাদ যখন ওরা ডেড বডি দেখে, আশেপাশে আর কোনও জনমানুষ ছিল না। কারখানা চত্বর নির্জন ছিল। সাগরের মোবাইলটা কিন্তু ক্রাইম সিন থেকে রিকভার হয়নি। উন্ড দেখে মনে হচ্ছে পাকা হাতের কাজ। এদিকে ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই।”
“হত্যাকারী একাধিক ছিল দলে। হয়তো খুব সহজেই কাবু করে ফেলেছে।” বিজন একটু ভেবে উত্তর দিলেন।
“হতে পারে। কিন্তু এই অ্যাঙ্গলে ঢোকার আগে আমার প্রথম প্রশ্ন, দল বেঁধে যারা সাগরকে খুন করতে এল, তারা এতটা রিস্ক নিল কেন? খুব ভোরেও রাস্তায় লোক থাকে এখানে। জনবিরল নয় সে-অর্থে। ধরা পড়ে যাওয়া বা কেউ দেখে ফেলার সম্ভাবনা তো ছিলই। আমি শিওর আর-একবার জিজ্ঞাসাবাদ করলে কিছু না কিছু বেরোবেই।”
“হয়তো সাগরকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজনটা যে-কোনও ঝুঁকির থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”
“আপদকালীন পরিস্থিতি বলছেন?”
বিজন কাঁধ ঝাঁকালেন। বললেন, “হতে পারে না?”
“পারে। আচ্ছা একটা কথা বলুন, চুমকির হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট কি ডিলিটেড ছিল? আমি ইন জেনারেল বলছি, পার্টিকুলারলি সাগরের সঙ্গে চ্যাট নয়।”
“নাহ্। সব চ্যাট লগই আছে।”
“তবুও।” আমি একটু থেমে বললাম, “চুমকি প্রামাণিকের সেলফোনের সিডিআর রিপোর্ট কী বলছে? লাস্ট লোকেশন কী?”
“বালিগঞ্জ কেএমসি অফিসের চৌহদ্দিতে। লাস্ট লোকেশন রিপোর্ট হচ্ছে তখন রাত সাড়ে ন’টা। তারপরেই ফোন বন্ধ।”
“হুম। তবে একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? আপনার যমজ দুই ছেলের মতো আমরা কিন্তু যমজ কেসে বাঁধা পড়ে গেছি। আপনি আজ পুরুলিয়া ছাড়ছেন। আমাকে হয়তো কাল-পরশুই কলকাতা যেতে হতে পারে।”
“আসুন, আসুন। ওয়েলকাম। আমি যথাসাধ্য করব।” বিজন হেসে বললেন।
“ওই সিসিটিভি ফুটেজটা পাওয়া যাবে তো?”
“কেন নয়? আপনি চাইলে আমি আজই আপনাকে মেল করে দেব। ব্যাপারটা হচ্ছে, মেহতাদের ফ্ল্যাটের চৌহদ্দি থেকে শুরু করে বস্তি অবধি যত সিসিটিভি ফুটেজ আছে সব খতিয়ে দেখছিল লোকাল থানা। শেষে চুমকি যে বাড়িতে কাজ করত, তার কাছে একটা ওষুধের দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে চুমকিকে লাস্ট দেখা যায়। ডিবিএইচ ব্যাংকের বন্ধ এটিএমের সামনে অপেক্ষা করছিল। রাত পৌনে ন’টা নাগাদ সেখানে সাগর মণ্ডল আসে, দু’জনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। তারপর চুমকি সাগরের বাইকে করে বেরিয়ে যায়।”
“অথচ এই দেখা হওয়ার কথা সাগর ওর জেরায় কিছু বলেনি?”
“এক বিন্দুও নয়।”
“কথা কাটাকাটির ব্যাপারটা কী করে বুঝলেন?”
“সাক্ষী আছে। ওষুধের দোকানের দু’-একজন দেখেছে ওদের ঝগড়া করতে। তাছাড়া সিসিটিভি ফুটেজেও বোঝাই যাচ্ছে। চুমকিকে একপ্রকার জোর করেই সাগর তুলে নিয়ে যায়।”
“আচ্ছা। বুঝতে পারছি। কিন্তু খুনের সময়ে ওর অ্যালিবাইটা…”
“ওর রুমমেট গুলোকে তুলে ভালো করে গুঁতোলেই বোঝা যাবে।”
“মানে, আপনি নিশ্চিত সাগরই চুমকিকে খুন করেছে?”
বিজন নাকের ডগা চুলকে বললেন, “ধুর, নিশ্চিত ভেবেই তো এসেছিলাম। এখন আবার নতুন করে ভাবতে হবে। তবে সাগরের উপর সন্দেহ না-হওয়ার কারণ নেই।”
“কিন্তু এতক্ষণ সময় চুমকিকে আটকে রাখল কোথায়? খুনটা করল কখন?”
“সেটা এখুনি জানতে গেলে তো ওকে জীবন্ত পেতে হত ম্যাডাম?”
“মোটিভ কী ভেবেছেন?”
“নট শিওর। বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডের ঝগড়া হতে পারে… এদের ক্লাসে প্রেমটা টক্সিক লেভেলের হয় সাধারণত।”
“সে আর কোন ক্লাসে হয় না বিজনবাবু? তবে আমি একটা জিনিস বুঝিনি।” আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম।
“কী?”
“আপনার কথামতো, সাগর চুমকি প্রামাণিক খুনের প্রধান সাসপেক্ট।”
“হ্যাঁ।”
“চুমকি খুন হয় রাত বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে। তার আগে ওর মোবাইল সুইচড অফ হয়। ইন অল প্রোবেবিলিটি, চুমকির ফোন যখন বন্ধ হয়, তখন ও সাগরের সঙ্গে ছিল। সাগরই কি ওকে ফোন বন্ধ করতে বাধ্য করে? যদি তা-ই হয়, তবে চুমকির বডি ডাম্প করার আগে মোবাইলটাকে গুছিয়ে ব্যাগে ভরে দেবে? যেখানে লাস্ট কল ওর করা, সেই কলটাকে ডিলিটও করবে না? এতটা ক্যাজুয়াল তো কুল হেডেড ক্রিমিনালরাও হয় না বিজনবাবু। ওর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডও বেশ ছাপোষা। স্ট্রেঞ্জ নয় ব্যাপারটা?”
বিজনের জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন অধিকারী স্যার। কলকাতায় তদন্তের স্বার্থে গেলে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে ভদ্রলোক বাঘমুণ্ডি থানা ছাড়লেন। আমার মনে এককাড়ি প্রশ্ন গজগজ করছিল। যৌন ঈর্ষা যদি মোটিভ হয়, তবে বেশিরভাগ সময়েই খুন হয় আচমকা। রেগে গিয়ে। যাকে আমরা মার্ডার আউট অফ প্যাশন বলে থাকি। রাত ন’টা থেকে রাত দুটো— একটা বিরাট টাইম স্প্যান। চুমকির সঙ্গে সাগরের ঝগড়া হওয়ার পর, মিনিমাম তিন ঘণ্টা পরে চুমকি মারা গেছে। প্যাশনেট ক্রাইমে এতখানি সময় নেয় না কেউ। সাগর যদি সত্যিই চুমকিকে মেরে থাকে, তবে নিছক ঝগড়া তার কারণ হতে পারে কি? মেয়েটার গায়ের দাগগুলো-ই বা কীসের? সংশয় আছে। প্রচুর সংশয় আছে। কিন্তু যাগগে বলে উড়িয়ে দিতে পারছি না। তার একটাই কারণ, সাগর মণ্ডলের খুনের কেসটা আমাকেই দেখতে হবে। সাগর মণ্ডল এখন আর তরতাজা যুবক নয়, কাটা পেট নিয়ে মর্গে শুয়ে থাকা ভিক্টিম। ভিক্টিমকে ভক্টিম নয়, নাম ধরে ডাকতেই আমি স্বচ্ছন্দ। বিজনবাবু বা তাঁর ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে এক্ষেত্রে আমি একমত নই। মানুষের নাম তো শুধু নাম নয়, তার সমগ্র অস্তিত্ব। সাগর-তার মা-তার ছোটো বোন-চুমকির সঙ্গে সম্পর্ক-কলকাতায় খেটে খাওয়া—মুম্বই যেতে চাওয়া… আর, আর-একটা তীক্ষ্ণ বুকফাটা কান্নার শব্দ। রুপোলি নিকোনো উঠোনে ঝুলন্ত শাড়ির শাস্ত গার্হস্থ্য ছবিটিকে যে-শব্দ মুহূর্তে তছনছ করে দিতে পারে।
.
সাগর মণ্ডলকে খুন করল কে? কেন? প্রেমিক-প্রেমিকা জোড়ার খুনের কারণ কি কোনও একা মেঘনাদ?
৮
“সাগর মণ্ডলের বাড়ির লোকেশনে কোথাও কোনও সিসিটিভি নেই ম্যাডাম। ইনফ্যাক্ট পুরো আতনাতে সিসিটিভি নেই।” দিব্যজ্যোতি বাইক থেকে নেমে বলল। হাতে দুটো গরম শিঙারা, ঠোঙায় মোড়া। শিঙারায় কামড় দিয়ে বললাম, “হ্যাঁ সেরকমটাই আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু এই ঘটনার কোনও প্রতক্ষ্যদর্শী নেই, সেটা হজম করতে অসুবিধা হচ্ছে। আর-একটু খোঁজখবর করা দরকার। সিদ্ধেশ্বরীর পাঁচ কিলোমিটার রেডিয়াসের মধ্যে কেউ কিছু দেখেনি, এটা হতে পারে না।”
“সে এখন আর-একবার জেরা করব। পাবলিক জানলেও যে সবসময় বলে, তা তো নয়? গত মাসের আলকুশির কেসটা দেখলেন না? সিসিটিভি থাকলে সুবিধে হত।” দিব্য আমাকে থামিয়ে বলল।
“রেডিয়াস বাড়ালেও থাকবে না তা হয়? আতনায় ঢোকার তিনটে রাস্তা। একটা বাঘমুণ্ডি থেকে কুশালডি হয়ে আতনায় ঢুকছে, আর-একটা চাণ্ডিল হয়ে যাচ্ছে সিধা টাটা, তৃতীয়টা চাণ্ডিল থেকেই বেঁকে গেছে চক্রধরপুরের দিকে। এই গোটা রাস্তাগুলোর পেট্রোলপাম্প, এটিএম, বা বাসস্ট্যান্ডগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে দেখতে হবে।
“প্রচুর টাইম লাগবে।” দিব্য বলল।
“সে লাগুক। দরকারে আর-একজনকে নে। অধিকারী স্যারকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছি এইমাত্র। বাই দ্য ওয়ে, সাগরের সিডিআরের[৫] কতদূর?
[(৫) সিডিআর; কল ডিটেইল রেকর্ড]
“শাসমল গেছে ম্যাডাম। ডিটেলটা পায়নি হাতে তবে লাস্ট লোকেশন রিপোর্টেড আতনা, সকাল সাড়ে ছ’টা। তারপর ফোন সুইচড অফ।
“তার মানে টাইম অফ ডেথ ভোর সাড়ে ছ’টা থেকে সাতটা। সিসিটিভি নিয়ে তোকে খুব বেশি খাটতে তো হবে না। ছ’টার পর হাইওয়েতে বড়ো ট্রাক চলে না। অত সকালে এই রুটে কোনও পাবলিক বাসও তো চলে না?”
“নাহ্। প্রথম বাস সাতটা পঁয়তাল্লিশ। সেটাও আতনার ভিতর ঢোকে না। মেন রোড থেকে হেঁটে বা বাইকে গ্রামে ঢুকতে হবে।”
“তা হলে আরও সহজ। টাইম লিমিট ছ’টা থেকে সাতটা। লাইট ভেহিকল্স – বাইক, ছোটো টেম্পো, দরকারে অ্যাম্বুলেন্স দেখবি। তাছাড়া তুই কি পুরো রুট ধরে চেক করবি নাকি? জাস্ট আতনায় ঢোকার আগে ও পরের সিসিটিভি দেখবি, সবচেয়ে কাছের যেটা। মেলালেই বুঝবি আতনা থেকে নতুন কোনও ভেহিকল বেরিয়েছে কি না। তিনটে রুট মিলিয়ে খুব বেশি হলে পঁচিশটা গাড়ি হবে।”
দিব্যজ্যোতি ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে।
“একটা জিনিস বোঝ, খুনি রক্তলাগা জামা ফেলে রেখে গেছে। তার মানে নিজস্ব ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা তার ছিল না। পাবলিকের সামনে আইডেন্টিফিকেশন এড়াতে জামা বদলেছে। সঙ্গে করে জামা আনা ছিল। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট আতনাতে তখন চলে না। উপায় একটাই, লিফ্ট।”
“হুম।”
“বাহন অ্যাপে লাইসেন্স প্লেট ফেলে ওনারের নাম ধাম ফোন নম্বর লিখবি, প্রতিজনকে ফোন করে চেক করবি। তুই চাণ্ডিলের দিকটা দিয়ে শুরু কর। দেখি আর কাকে পাওয়া যায়।”
“সে যাচ্ছি। তবে এই সাগর ছেলেটার রেপুটেশন পাড়ায় বিশেষ ভালো না বুঝলেন।” দিব্য চিত্তিতস্বরে বলল।
“কী ফিডব্যাক?”
“ফিডব্যাক বলতে, পাড়াতে খুব একটা মিশত না। নিজের একমাত্র কাকা, তার সঙ্গে মুখ দেখাদেখি নেই। সাগরের মা নাকি লক্ষ্মীপুজোয় প্রসাদ দিতে গিয়েছিল, কাকা দূরদূর করে তাড়িয়েছে। কাকার এ অঞ্চলে প্রভাব প্রতিপত্তি আছে। বহুদিনের ব্যাবসাদার। আগে দুই পরিবারে ওঠাবসা ছিল। সাগরের বাপের মৃত্যুর পর সম্পর্ক কেঁচে যায়। প্রতিবেশীদের ধারণা, সেটা সাগরের উদ্ধত স্বভাবের জন্য। সজল নামের ওর এক বন্ধু আছে, ছোটোবেলার। আতনাতেই থাকে। তার সঙ্গেও সাগরকে আজকাল দেখা যায় না।”
“তা হলে তাকে দিয়ে জেরাটা শুরু করব।”
বাইকটা ছেড়ে দিলাম। এ জিনিস পুরুলিয়া টাউন থেকে কিনেছি গতবছর। ইয়ামাহা এমটি ফিফটিন। মাসে মাসে সাড়ে চার হাজার টাকা ইনস্টলমেন্ট কাটে। শেষ হবে পাঁচ বছর পর। তবে হাওয়ায় প্রজাপতির মতো গতি বাইকটার। টাকা তখন গায়ে লাগে না। তাছাড়া গাড়ি চালাতে চালাতে চিন্তা করতে পারাটা এই অঞ্চলে থাকার বিশেষ সুবিধা। ফাঁকা ন্যাশনাল হাইওয়ে, পথে ক্বচিৎ-কদাচিৎ গাড়ির ভিড়। ফাঁকা মাঠ, বাইক সারানোর দোকান, পেট্রোল পাম্প ছাড়িয়ে ইয়ামাহা চলল আতনার দিকে। সকালবেলার ক্রাইম সিন মনে পড়ে যাচ্ছিল বার বার। পুরো ব্যাপারটাই নিখুঁতভাবে ছকা মনে হচ্ছে। খুনি আতনাতে আসার সময় চকোলেট ব্রাউন শার্ট পরেছিল, এ বাদে আর কোনও ক্লু এই মুহূর্তে নেই।
.
বাইক আতনাতে ঢুকে পড়েছিল। দিগন্তজোড়া ধানখেত, খোলা মাঠ, ইতিউতি রাস্তার ধারে গজিয়ে ওঠা ফণীমনসা, আর রাস্তার ধারে ধারে পলাশ আর শিরীষ গাছের ছায়ার মধ্য দিয়ে সরু রাস্তা চলে গেছে গ্রামের ভিতর। দু’-একটা টালির, আর অ্যাসবেস্টসের ছাদ দেওয়া বাড়িঘর ছাড়িয়ে এফপি স্কুল। এখান থেকে সিদ্ধেশ্বরী কারখানার মাঠ বড়োজোর পাঁচশো মিটার হবে। এফপি স্কুলের পাশে একটা চা-জলখাবারের দোকান।
বৃদ্ধ দোকানি তিতিবিরক্ত মুখে চায়ের বাসন মাজছে। বাইকটা ওখানেই থামালাম। দোকানির দিকে তাকালাম। সে একইরকম বিরক্তমুখে বাসন মেজে চলেছে।
“সাগর মণ্ডলকে চেনেন?”
লোকটা যেন কিছু শুনতেই পেল না। ফাটা ঠোঁট নাড়িয়ে বিড়বিড করে অস্পষ্ট কিছু বলল। তোবড়ানো রোগা গাল, আধপাকা চুল দাড়ি, ময়লা, হেম গুটিয়ে খাটো হয়ে যাওয়া শার্ট পরনে লোকটার চেহারা বিশেষত্বহীন।
“সাগর মণ্ডল। আজ সকালে যে ছেলেটার ডেড বডি পাওয়া গেছে, কাকা… চিনো উকে?”
“কাউকে চিনি না। এখন যাও, মাথা খেয়ো না।” লোকটা খিটমিট করে উঠল।
“একটা চা খাওয়াও তাইলে?” আমি বেঞ্চের উপর মাথার টুপি খুলে বসলাম।
“ছোটো কাপ পাঁচ। বড়ো কাপ দশ। দুধ ফুরিয়েছে। লিকার হবে।”
“আচ্ছা তাই দাও। তোমার দোকান কি বন্ধের সময় হল নাকি?”
“বন্ধ হবে সেই সন্ধে সাতটায়। বন্ধ হলে পেট চলবে?”
“দোকান তুমি একাই চালাও?”
“ছেল্যা লায়েক হয়েছে, দুকানি করতে শরম লাগে। পেটের তো লাজ-শরম লাই।”
লোকটার মেজাজের কারণ এতক্ষণে বুঝলাম। কাচের বয়াম থেকে একটা বিস্কুট বের করে কামড়ে বললাম, “তোমার ক’টা ছেল্যা? কী করে?”
“এক ব্যাটা। এক বিটি। বিটির বে দিয়েছি গত বছর। ছেল্যা টেরাক চালায়, গাড়ি উড়ি চালায়। যখন যেমন পায়। আর মদ গিলে।” লোকটা আমার হাতে চা ধরিয়ে বলল।
“তোমার ছেলে সাগর মণ্ডলকে চিনত?”
“সব্বাইকে চিনত। একই ইস্কুলে পড়েছে। তাছাড়া ছোটো গাঁ। এখানে কে কাকে চেনে না?”
“তুমিও চিনতে তার মানে?” আমি হেসে তাকালাম।
লোকটার মেজাজ একটু নরম হয়েছিল। চুলায় বিরাট মাপের হাঁড়ি বসিয়ে বলল, “একটু রগচটা ছেলে। তবে, ছোটো থেকে দেখছি, ইচিকবিচিক মন নেই। স্কুল পাশ করল, কাজের ধান্ধায় গেল। বাপটো মরে গেলে উ ব্যাটা একা ঘর সাম্ভালত। এখন উ তো মরে গেল, সংসারটার কী হবে, কে জানে!”
“তোমার ছেল্যার ফোন নম্বরটা দাও। ফোন করে দেখব, যদি কিছু জানতে পারি।”
“নম্বর লিবে লাও। কিন্তু ফোনে ধরতে পারবে না। ফোন বন্ধ আছে।”
“কেন?”
“জানি না। সকালে ধানের টেরাক নিয়ে গেছে। কিষাণমণ্ডি। বারোটার মধ্যে ফেরার কথা। এখন ফোন বন্ধ আসছে। মদটদ গিলে পড়ে আছে হবেক।”
“তাইলে সাগরের কাছের বন্ধুটন্ধু কে আছে দেখেছ? তাদের নাম বলো।”
“অত জানি না। তবে গুণধর মাহাতর ছেলে সজলের সঙ্গে ঘুরত। যখন গ্রামে ছিল। দোকানে এসে চা-সিগারেটটা খেত।”
“এবার দোকানে এসেছিল?”
“নাহ্।”
“তোমার নাম কী কাকা?”
লোকটা হাতের কাজ ফেলে এবার আমার দিকে স্পষ্ট তাকাল।
.
জলখাবারের দোকানি দয়ারাম মাহাত, সজলের বাড়ির নির্দেশ দিয়েছিল ছবির মতো। এফপি স্কুল ছাড়িয়ে সিদ্ধেশ্বরীর পাশ দিয়ে রাস্তা গেছে সাগরদের বাড়ির দিকে। সে পথে বাঁ দিকে পুকুর আর সরষের খেত ছাড়ালে পরপর চার ঘর লোকের বাস। দুই নম্বর বাড়ি সজলের। নাম ধরে ডাকতে সে বাইরে এল। সকালবেলার ভিড়ে ছেলেটাকে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।
“সাগর মণ্ডলের ব্যাপারে খোঁজখবর করতে এসেছি।”
ছেলেটা বেজার মুখে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল।
“সাগর তো তোমার বন্ধু? কতদিন ধরে চেনো ওকে?”
“ক্লাস ওয়ান থেকে। প্রাইমারি স্কুলে একসঙ্গে পড়তাম।” সজল চোখ নামিয়ে বলল।
“তোমার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল শুনলাম।”
“ছিল। তা প্রায় বছর দেড়-দুই আগের কথা বলছেন আপনি।”
“কেন রিসেন্টলি? ও গ্রামে আসলে কথা হত না? হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ?”
“নাহ্।”
“কেন?”
সজল একটু ইতস্তত করে বলল, “আমিই কথা বলা বন্ধ করেছিলাম।”
“কেন?”
“শহর সবাইকে বদলে দেয় ম্যাডাম। ও নিজেই সম্পর্ক রাখতে চায়নি। তাই আমিও আর…”
“কী নিয়ে মতান্তর হয়েছিল?”
“মতাস্তর হয়নি। ও চিনতে অস্বীকার করেছিল।” সজল মুখটা নিচু করে বলল।
“একটু ডিটেলে বলবে?”
“দেড় বছর আগের কথা। আমি যোধপুর পার্ক গিয়েছিলাম একটা কাজে। সাগরকে পুরুলিয়া ছাড়ার আগে দু’-তিনবার হোয়াটসঅ্যাপ করেছিলাম। উত্তর দেয়নি। যোধপুর পার্কের কাজ সেরে বেরোচ্ছি, তখন দেখি সাগর একটা ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে বেরোচ্ছে। খাবার ডেলিভারির অ্যাপের জামা গায়ে। বাইরে বাইক রাখা ছিল, ওটায় উঠতে যাওয়ার আগে আমি ওকে গিয়ে ধরি। ভেবেছিলাম চমকে দেব। কিন্তু ও আমাকে দেখে কেমন যেন করল, যেন এড়াতে পারলে বাঁচে।”
“তারপর?”
“আমি ওকে ওর কলকাতার ঠিকানা জিজ্ঞেস করলাম। তাতে ও মেটিয়াবুরুজের একটা ঠিকানা বলল কোনওমতে। তারপর বলল ওর খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে, সময়মতো খাবার না পৌঁছোতে পারলে টাকা কাটবে। আমি কিছু বলার আগেই ও বাইক চালিয়ে চলে গেল।”
“তারপর থেকেই আর কথা নেই?”
সজল বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়িয়ে বলল, “নাহ্। তা ঠিক না। আমার পরের দিন রাত বারোটার ট্রেন ছিল হাওড়া থেকে। আমি সন্ধে সাতটা নাগাদ ওর দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে দেখি, ওখানে সাগর থাকত ঠিকই, কিন্তু ছ’মাস আগে। এর পরে আমি আর কোনও যোগাযোগ রাখিনি, ও-ও আর মেসেজ করেনি।”
“হুম। সাগরের ডেড বডি দেখতে গিয়েছিলে?”
“নাহ্।”
“সাগরের বাড়ির আর্থিক পরিস্থিতি কেমন?”
“মোটামুটি ভালোই ছিল। সাগরের বাবার পুরুলিয়া সদরে মুদির দোকান ছিল। পৈতৃক জমিজমা ছিল। ওর বাবা কোভিডে মারা যান। খুব ভুগেছিলেন। সেসময় টাকাপয়সা জলের মতো খরচা হয়, যা ডিপোজিট ছিল শুনেছি সব শেষ হয়ে যায়। সাগর তখন ক্লাস টুয়েলভ। টানা দু’বছর ওদের কোনও আয় ছিল না। ওর এক কাকা ছিল, সেও কোনও সাহায্যটাহায্য করেনি। উল্টে জমিজমা নিয়ে কীসব কেসটেস করেছিল শুনেছিলাম। তারপর তো কোভিডের পরপর সংসার চালাতে ও বাঘমুণ্ডির রিসর্টে কাজ নেয়।”
“ওর কাকা কি এখানেই থাকে?”
“হ্যাঁ। সাগরদের বাড়ির পাঁচ-ছ’টা বাড়ি পর। বড়ো ব্যাবসা, সার, কীটনাশক এসবের। গুদাম আছে, গেলেই বুঝবেন।”
“হুম। চুমকি বলে কারওর কথা কখনও বলেছে সাগর?”
“চুমকি?” সজল ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট উল্টে বলল, “না।”
“কোনও মেয়েবন্ধুর নাম করেনি কোনওদিন?”
“নাহ্।”
.
সাগরের কাকার বাড়ি আকারে বেশ বড়োসড়ো। সাগরদের বাড়ির তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ। দোতলা বাড়ি। একতলায় গুদাম আর গ্যারাজ। সব শাটার ফেলা। এমনকি উপর তলার দরজা জানালা সাঁটিয়ে বন্ধ। গুদামের সামনে প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে একটা ষণ্ডা মতো লোক বসেছিল। আমি এগিয়ে যেতে খ্যারখেরে গলায় বলল, “বাড়িতে কেউ নেই।”
“এটা সাগরের কাকার বাড়ি তো?”
“হ্যাঁ।” লোকটা মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দিল।
“আমি থানা থেকে আসছি। সাগরের কাকাকে কোথায় পাওয়া যাবে?”
“বলতে পারছি না।” লোকটা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল।
“বাড়িতে আর কে কে আছে?”
“কেউ নেই এখন। গোটা ফ্যামিলি সরডিহা গেছে। কবে ফিরবে বলে যায়নি।”
“কখন বেরিয়েছে?”
“আজ সকালে।”
“সাগরের কাকার ফোন নম্বরটা দিন।”
লোকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পকেট থেকে ফোন বের করে নম্বর দিল। আমি ফোন রিং করলাম, বেজে গেল কেউ তুলল না। ফোনে আর-একটা কল ঢুকছিল।
কনস্টেবল শাসমল থানার পুরোনো লোক। তাও একটা সিডিআর রিপোর্ট আনতে সারা দিন কাবার করে দিল। আমি একটু বিরক্ত হয়ে ফোন তুলে বললাম, “কী সংবাদ?”
“লাস্ট কল রিসিভড গতকাল রাত এগারোটা। ভেরিফাই করে দেখলাম, তারক বলে একজনের নম্বর। ওর সঙ্গে কলকাতায় ভাড়ায় থাকত। লাস্ট আউটগোয়িং কল গেছে তার গত পরশু দুপুর তিনটেয়। লোকেশন আতনা। সেটাও আতনারই একজনের নম্বর। সাগরকে বাইকে করে বাসস্টপ থেকে নিয়ে এসেছে। আর-একটা নম্বর…” শাসমল একটু থেমে বলল, “সেটাতে প্রতি হপ্তায় প্রায় বার দশেক ফোন হয়েছে।”
“কে, চুমকি প্রামাণিক?”
“না না। সেও আছে। কিন্তু এর মতো এত ঘন ঘন না। নম্বরটা ভেরিফাই করেছি। পুরুলিয়ারই এক উকিলের নম্বর। নাম অখিল কুমার মিশ্রা। নম্বরটা আপনাকে পাঠাচ্ছি।”
শাসমল ফোন কেটে দিল। সিডিআরে আজ সকালের কোনও কল রেজিস্টার্ড নেই শুনে একটু অবাক লাগল। তা হলে কি সাগরের সঙ্গে খুনির হঠাৎই দেখা হয়েছে? কেউ ওকে ফোন করে ডাকেনি? অবশ্য হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামে কল হলে সিডিআরে রেজিস্টার্ড হয় না। সার্ভিস প্রোভাইডার ডিটেলস শেয়ার করতে চায় না। তারপর রেকর্ডেড থাকারও কোনও চান্স নেই। আইপিডিআর রিকোয়েস্ট মানে যেটায় ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিটি লগ থাকে সেটা প্রসেস হতে অনেক হ্যাপা। ইন্টারনেট এসে রুটিন পুলিশ কাজের জটিলতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনেক অ্যাপেই চ্যাট হিস্ট্রি পার্মানেন্ট ডিলিট করা যায়। সার্ভারে থাকে না। এমনকি ফরওয়ার্ডেড মেসেজ যদি বিরাট সংখ্যক লোকের কাছে পৌঁছোয়, তার উৎসটা কোথায় ছিল বের করা সমস্যাজনক। সাগরের খুনির সঙ্গে ওর যোগাযোগ ইন্টারনেট কল মারফত হয়ে থাকলে ট্র্যাক করা মুশকিল হয়ে যাবে।
অখিল কুমার মিশ্রার নম্বরে ফোন লাগালাম। এটা বোধহয় কাকা-ভাইপোর জমিজমা সংক্রান্ত ব্যাপার। সাগরের প্রোফাইলটা বেশ ভাবিয়ে তুলছে। একটি সদ্য বাপ-হারানো অল্পবয়স্ক ছেলে, টাকাপয়সাওয়ালা কাকার সঙ্গে দাঁতে দাঁত চেপে জমিজমার লড়াই লড়ছে এমনটা দেখা যায় না। এত মানসিক আর আর্থিক শক্তি ও পাচ্ছে কোথা থেকে? জমিজমা বিক্রি হলে এককালীন কিছু
টাকা আসতে পারে, কিন্তু মামলা-মোকদ্দমা চালানোর খরচা অনেক। ওর বোন ঝুমা, সে-ও কেন যেন মনে হচ্ছে কিছু কথা চেপে যাচ্ছে।
অখিল মিশ্রা দু’-তিনটে রিং-এই ফোন তুললেন। নাম আর প্রয়োজন জানাতে, ওপারে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা নেমে এল। তারপর একটা গম্ভীর গলা বলল, “আমি এইমাত্র থানা থেকেই ঘুরে এলাম। যা জানানোর, রাজেশবাবুকে জানিয়েছি।”
৯
বাঘমুণ্ডি থানার বড়োবাবু, আইসি রাজেশ অধিকারীর সঙ্গে রাজেশ খান্না এবং রাজেশ শর্মা- এই দুই জনপ্রিয় অভিনেতার অন্তত একটা করে মিল আছে। প্রথমত তিনি রাজেশ খান্নার মতো ফরসা, দ্বিতীয়ত তাঁর চুলের ছাটটি রাজেশ শর্মার মতো। ক্রমশ তরাই থেকে শিবালিকের দিকে খাড়া হয়ে গেছে। অত্যন্ত হৃদয়বান বস। শাসমলের মা কলকাতায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন দেড় মাস। চারদিনের ছুটি স্যাংশন করেননি। খুব মেপে জুকে কাজ করেন। পেপার ওয়ার্কে একশোতে দেড়শো। বাকি ফিল্ড ওয়ার্ক শুধু এসপির কাছে হাজিরাতেই সীমাবদ্ধ। আমি ছুটির আবেদন করি না। ফলে আমায় ঘাঁটান না। আবার উৎসাহও দেন না। এমন বীত-রাগ, বীত-ভয়, বীত-লাজ স্থিতধী মানুষ পুলিশে ঠিক দেখা যায় না।
আইসির কেবিনের দরজা খুলে তাঁকে স্যালুট করে দাঁড়ালাম। স্যার কম্পিউটারে কীসব টাইপ করছিলেন।
“তোমার থেকে একটা ফোন এক্সপেক্ট করেছিলাম।” চোখের তলার ভাঁজটা একটু গভীর হল অধিকারী স্যারের।
“সরি স্যার। পরপর অনেকগুলো জায়গায় যেতে হয়েছিল।”
“হুম। তা কদ্দূর এগোল?”
“এখনও পর্যন্ত কিছু পাইনি স্যার। অল পসিবল লোকেশনের সিসিটিভি
ট্যাপ করা হচ্ছে। সোর্স লাগানো আছে। আশা করি, দু’-এক দিনের মধ্যে ব্রেক-থ্রু পাব।”
“হোয়াট অ্যাবাউট মোটিভ?”
“এখনও শিওর নই স্যার। সাগর মণ্ডলের কাকার সঙ্গে একটা ঝামেলার খবর পেলাম, হতে পারে সেটা…”
“তুমি শিওর নও, আমি শিওর।” অধিকারী আমাকে থামিয়ে বললেন। “সরি স্যার?”
আমার কথার উত্তর না দিয়ে বেল বাজিয়ে পিওনকে ডাকলেন অধিকারী।
“বাইরে যে বয়স্ক কাকা বসে আছে, তাকে নিয়ে এসো।”
কেবিনের দরজা খুলে যিনি ঢুকলেন তার সঙ্গে প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা আগে সাক্ষাৎ হয়েছিল। দয়ারাম মাহাত এসে হাতজোড় করে এক পাশে দাঁড়ালেন।
“এর ছেলে আজ সকাল থেকে মিসিং ছিল। ইনি বলছেন আজ দুপুরে থানার এক মেয়েছেলে অফিসারকে জানিয়েছিলেন। ইজ দ্যাট টু?”
“মিসিং!” আমি আকাশ থেকে পড়লাম, “না মানে…”
“একটা মার্ডারের ইনভেস্টিগেশনে নেমে এসব ক্যাজুয়াল কাজকর্ম করে বেড়াচ্ছ?”
“স্যার…”
“নো আর্গুমেন্টস প্লিজ। দয়ারামবাবু আমাদের থানায় এফআইআর লিখিয়েছেন। এঁর ছেলে সুনীল মাহাতকে চান্ডিল-চক্রধরপুর রোডের উপর, কান্দরার কাছে পাওয়া গেছে। ওঁর ট্রাকে অচৈতন্য অবস্থায় পড়েছিলেন। প্রোবেবলি স্ট্রং ডোজ অফ সিডেটিভ। এখন পুলিশ প্রোটেকশনে সদর হাসপাতালে ভর্তি। একবারই সেন্স এসেছিল। বলেছেন, সকালে কোনও একজন অজ্ঞাতপরিচয়কে আতনা থেকে লিফ্ট দিয়েছিলেন।”
“ওহ মাই গড!”
বড়োবাবু আমার দিকে কড়া চোখে তাকালেন। হাতের পেপার-ওয়েট ঘুরিয়ে বললেন, “কাকে সিসিটিভি মনিটরিংয়ের ভার দিয়ে রেখেছ? দিব্যজ্যোতিকে? ইজ হি কেপেবল এনাফ?”
“স্যার আধঘণ্টার ফুটেজ বেসিকালি, ও একা। ফলে হয়তো সময় লাগছিল।”
“থামো। এনাফ অফ এক্সকিউজেজ। শোনো, অখিল মিশ্রা বলে একজন উকিল এসেছিলেন। ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে বসেন। সাগর মণ্ডলের কাকা বাপি মণ্ডলের সঙ্গে সাগরের দীর্ঘদিনের আকচাআকচি। কোভিডের সময় ওর বাপ মরে গেলে জমিজমা নিয়ে ক্যাচাল হয়। সাগর দু’বিঘে জমি বিক্রি করে রিসর্টকে চার লাখ টাকার বিনিময়ে। সেই টাকার ভাগ চেয়ে কাকা, সাগরের উপর কেস করেন। এখনও সে কেসের নিষ্পত্তি হয়নি। অখিল মিশ্রা জানিয়েছেন, সাগর মণ্ডল কেস জেতার মুখে। তাতে বাপির সাগরের উপর খার বেড়ে চলছিল। এরকম চলতে থাকলে, বাকি জমি জমাটুকুও সাগর কবজা করতে পারে, এই ভয় পাচ্ছিল।”
“ওহ্!”
“বহুদিনের খার বুঝলে। সাগর আচমকা পুরুলিয়ায় আসায় সুযোগ পেয়ে গেছে। ঝাড়খণ্ডে এখন দশ হাজার টাকায় খুনি ভাড়া পাওয়া যায়। বাপি মণ্ডল শিওর সেরকমই কাউকে হায়ার করে ভাইপোকে মারিয়েছে। ভাইপোর বডি পাওয়াতে কোনও হেলদোল নেই। বউদির সঙ্গেও দেখা করেনি। একদম নর্মাল। টেক দ্যাট ম্যান ইন কাস্টডি। স্পেশাল খাতিরযত্ন করো, সব উগড়ে দেবে।”
“স্যার বাপি মণ্ডল গোটা পরিবার সমেত সরডিহা গেছে। আমি ওর বাড়ি থেকেই হয়ে এলাম। ও যে খুন করিয়েছে, সেটা নিশ্চিত করতে আর-একটু তলিয়ে দেখতে হবে স্যার। নিড সাম মোর টাইম।”
বড়োবাবুর চোখের তলার ভাঁজ আরও গভীর হল। যেন শালবনের আঁধার করা ক্যানোপি। শীতল গলায় বললেন, “ম্যাডাম অফিসার, থানার গোটা একটা কর্মদিবস নষ্ট করে আপনি যে-সব তথ্য খুঁজে নিয়ে এসেছেন, তার একটাও খুনি কে, কোথায় কীভাবে পালাল তা জানায় কি?”
“নো স্যার।”
“প্রিসাইজলি। এবার আমি এই থানায় বসে দয়ারাম মাহাতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যা জানতে পেরেছি, তাতে সাগর মণ্ডল খুনের চার্জশিট দিতে আমাদের বিশেষ অসুবিধে হবে না। সো প্রসিড অ্যাজ আই সেইড।”
“ইয়েস স্যার।” ফের স্যালুট করে আইসির ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসলাম। দিব্য ফিরেছিল। ধানের ট্রাক বলে অত সিরিয়াসলি নেয়নি। ওকে অনুতপ্ত দেখাচ্ছিল। আর আমার মনে হচ্ছিল, বুকের ভিতর কে যেন জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরেছে। বড়োবাবুর আর্মচেয়ার কায়দায় অপরাধী ধরার পন্থাটা আমার পছন্দ নয়। ইন্টারোগেশনে খুব একটা লাভ হয় না। সত্যিকারের কর্মদিবস নষ্ট হয়। কিন্তু বাপি মণ্ডল ফোন তুলছে না এটা ঘটনা। গোটা ফ্যামিলি সরডিহা কেটে পড়েছে, তাও আজকের দিনে— এটা অবজ্ঞা করার বিষয় নয়।
“কী ভাবছেন এত?” দিব্য পাশ থেকে বলল।
“কিছু না।”
“চলুন আপনাকে বাড়িতে ড্রপ করে আসি। আপনি ক্লান্ত।”
“আমি যেতে পারব দিব্য। তুই বাড়ি যা। কাল সকালে আমি একাই সদর হাসপাতালে যাব। দয়ারাম মাহাতর ছেলের জবানবন্দি লাগবে। আর এই বাপি লোকটা যদি আজ ফোন তোলে ভালো, না হলে কাল ওয়ারেন্ট ইস্যু করতে হবে। তুই আমার সঙ্গে লাইনে থাকবি।
“ওকে ম্যাডাম।”
বড়োবাবুর ঘর থেকে ঘোঁ-ঘোঁ শব্দে ফ্যানের আওয়াজ আসছিল। ফোন বেজে উঠল। “গুড ইভনিং স্যার” বলে, ফোন ধরে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন বড়োবাবু। ওপারে বোধহয় এসপি স্যার। চারপাশের কথা, দৃশ্য, আলো ক্ৰমশ ফিকে হয়ে আসছিল। একটা ঘোরের মধ্যে বাইক চালিয়ে রুমে পৌঁছোলাম। ভোররাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম। সাদা শার্ট আর ব্লু-জিসের নিরঞ্জন হেঁটে আসছেন আমার দিকে। গভীর অপরাধবোধে ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল, কে যেন ঘুমের মধ্যে বিষ ঢেলে দিয়েছিল কানে। শিয়ালকাঁটা ছুঁয়ে দিয়েছিল চোখে। বরফের চাইয়ের উপর শুইয়ে জীবন যাকে বেধড়ক মেরে এসেছে, তার কাছে ভোরের পাখি কেন গান গায়?
