১০
“যাকে লিফ্ট দিয়েছিলে, চিনতে?”
ঘাড় নাড়িয়ে নেতিবাচক উত্তর এল। সুনীল মাহাত বিছানায় এলিয়ে পড়েছিল। ডাক্তার বলে গেলেন, অ্যালকোহলের সঙ্গে মিশ্রিত ভ্যালিয়াম জাতীয় কড়া কোনও সিডেটিভের প্রভাব থেকে সুনীল প্রায় মরতে বসেছিল। অ্যালকোহলের সঙ্গে মিশিয়ে সিডেটিভ দিলে, তা এমনিতেই প্রাণঘাতী হয়। সুনীলের মতো অসংযমী মাতাল হলে তো কথাই নেই। প্রচুর পরিমাণে স্যালাইন আর অ্যান্টিডোট দিয়ে কোনওমতে প্রাণ বাঁচানো গেছে। তবে শরীর নিজে থেকে মলমূত্র ত্যাগ করে সিডেটিভের প্রভাব মুক্ত হবে— তারপর স্বাভাবিক অবস্থা আসবে। আমাকে পাঁচ মিনিট জেরা করার অনুমতি দিয়েছেন ডাক্তার।
“কোথা থেকে লিফ্ট দিয়েছিলে?”
খুব নিচু স্বরে, বার বার থেমে থেমে সুনীল মাহাত যা বলল, তা আমাকে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে শুনতে হল। মর্মার্থ হল, সুনীল গ্রামের কয়েকজনের ধান কিষাণমণ্ডিতে সরকার-নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে নিয়ে যায়। দাম ভালো পাওয়া গেলেও, অনেকক্ষণ লাইন দিতে হয় বলে, অনেক চাষিই সুনীলকে বকলমে নিযুক্ত করে। গতকাল ভোর সাড়ে ছ’টা নাগাদ, সুনীল যখন গাড়ি বের করছিল, তখন এক মাঝারি উচ্চতার ব্যক্তি লিফ্ট চায়। টুপি আর মাফলার জড়ানো চেহারা, পরনে সবুজ শার্ট আর কালো টেরিকটনের প্যান্ট। গায়ের রং কালো না ফরসা মনে পড়ে না সুনীলের। লোকটি চাণ্ডিল অবধি লিফ্ট চেয়েছিল, সুনীল তাকে বাস স্টপ অবধি ছেড়ে দেবে বলে। চাণ্ডিল যাওয়ার বাস স্টপ আতনা থেকে পনেরো কিলোমিটার মতো দূরে, কিষাণমণ্ডি যাওয়ার রাস্তায়। লোকটি তাতেই রাজি হয়। গাড়িতে উঠে, ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে কিছুক্ষণ চলার পর ঠান্ডা বিয়ার খাওয়ার প্রস্তাব দেয়। লোকটির ব্যাগে দু’টি ক্যান ছিল। একটিতে সে নিজে, অন্যটিতে সুনীল চুমুক দেয়। তার মিনিট দশেক পরেই সুনীল বুঝতে পারে, স্টিয়ারিংয়ের উপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই। চোখের পাতা বুজে আসছে। মাথা ভারী। আর তারপর কী হয়, সুনীলের কিছু মনে নেই।
“জানা নেই, চেনা নেই লিফ্ট দিয়ে দিলে? সত্যি কথা বলো সুনীল। তোমার গ্রামে সাগর মণ্ডল খুন হয়েছে। এই লোকটাই খুন করেছে। লোকটাকে পালাতে তুমি সাহায্য করেছ। কত টাকা দিয়েছে তোমাকে?”
সুনীলের চোখে বিস্ময় আর ত্রাস একসঙ্গে দেখা দিল।
“আমি খুনের ব্যাপারে কিচ্ছু জানি না স্যার। বিশ্বাস করুন।” সর্বশক্তি দিয়ে বলে উঠল সুনীল।
“টাকা কত দিয়েছিল ঠিক করে বলো?” আবার প্রশ্ন করলাম।
সুনীল কোনও উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ ফ্যাকাশে মুখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, “পাঁচশো দেবে বলেছিল।”
“শুধু পাঁচশো! এত অল্পেতেই পালানোয় সাহায্য করতে রাজি হয়ে গেলে?”
“না… না… আমি শুধু লিফ্ট দেব বলেই…” সুনীলের গলা বুজে এল…
“এই তো বললে, লিফ্ট চেয়েছিল? এখন বলছ তুমি অফার করেছিলে? ঠিক করে বলো। খুনে সাহায্য করলে!
“বিশ্বাস করুন স্যার। আমি কিছুই জানি না। গাড়ির কাছে এসে বলল, আতনায় ব্যাবসার কাজে এসেছিল। নতুন জায়গা, লোকটোক চিনা নাই। বাড়িতে ইমার্জেন্সি হয়েছে। তাড়াতাড়ি চাণ্ডিল যেতে হবে।”
“আতনার কোথায় এসেছিল জিজ্ঞেস করোনি?’
“না স্যার। আসলে আগেরদিন অনেক রাত অবধি মাল খেয়েছিলাম। মাথাটা টান ছিল না।” সুনীল চোখ নামিয়ে বলল।
“চাণ্ডিল থেকে কোথায় যাবে জিজ্ঞেস করোনি?”
“চাণ্ডিলেই তো বাড়ি বলেছিল স্যার।”
“চেহারার ডিটেল বলো? পুলিশ-আর্টিস্ট ছবি আঁকবে।”
“মুখ ঠিকমতো মনে নেই। মাফলারে আর টুপিতে ঢাকা ছিল।” সুনীল ফের ধীরে ধীরে উত্তর দিল।
“মুখ মনে নেই, না মনে করতে চাইছ না?”
“এরকম কিছু না স্যার। বিশ্বাস করুন।” সুনীল প্রায় কেঁদে বলল।
“কেঁদে লাভ নেই সুনীল। লোকটাকে আমাদের চাই। তুমি সময় নাও। মনে করো। লোকটাকে দেখতে কেমন, চুলে রং করা ছিল কি না, হাতে-পায়ে কোনও ট্যাটু ছিল কি না, হাতের আঙুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ভাবো। কিছু না কিছু পাবেই।”
সুনীল অসহায়ভাবে এদিক-ওদিক মাথা নাড়িয়ে দেখল। বাইরের আলো ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। আমার গাট ফিলিং বলছে সুনীল মাহাত, সাগর মণ্ডলের খুনিকে সত্যিই লিফ্ট দিয়েছিল। পাঁচশোর বদলে এক হাজার হতে পারে টাকার পরিমাণ। কিন্তু খুনিকে এ জেনেশুনে পালাতে সাহায্য করবে এমন সরল লাগছে না বিষয়টা। সাগরের কাকা, বাপি মণ্ডল যদি সত্যিই বাইরে থেকে হিটম্যান ভাড়া করে ভাইপোকে খুন করায়, সে তার পালানোর আরও শক্তপোক্ত ব্যবস্থা করবে। নিজের গাঁয়ের ছেলেকে গেট-অ্যাওয়ে ভেহিকলের দায়িত্বে রাখবে না। কথা পাঁচকান হওয়ার ঝুঁকি নেবে না। সুনীল যেরকম মাতাল, তাতে পরবর্তীতে এই খুনের ধুঁয়ো তুলে ব্ল্যাকমেল করবে না, তার-ই বা কি নিশ্চিত্তি আছে?
সুনীলের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমি আবার কাল আসব। হাসপাতালকে বলা আছে, আমাকে না জানিয়ে তোমায় রিলিজ দেবে না। লোকটার চেহারা, কথা বলার টোন, হাঁটার কায়দা, যা মনে পড়বে সঙ্গে সঙ্গে আমায় ফোন করে জানাবে। আপাতত থানায় না জানিয়ে পুরুলিয়া ছাড়বে না।”
সুনীল হুব্বা হয়ে কীসব যেন ভাবছিল। আমার কথা কতটা শুনেছে বুঝলাম না।
“লোকটাকে দেখলে চিনতে পারবে?” বেশ জোরেই জিজ্ঞাসা করলাম এবার।
উত্তরে সুনীল মাহাত এমনভাবে মাথা নাড়াল, যার অর্থ হ্যাঁ বা না দুই-ই হতে পারে। হোপলেস কেস! কান্দরার কাছে গাড়ি দাঁড় করিয়ে লোকটা নির্ঘাত অন্য কোনও গাড়ির লিফ্ট নিয়েছে। যতদূর জানি, ছোটো টাউন। কাছেই টাটানগর। কাজেই এসকেপ রুট ও-পথে হতেই পারে।
বেরিয়ে আসার আগে সুনীল পিছন থেকে ডাকল।
“একটা কথা মনে পড়েছে ম্যাডাম। লোকটার কাছে বার বার ফোন আসছিল। লোকটা বিরক্ত হয়ে কেটে দিচ্ছিল। চার-পাঁচ বার পরে ফোন তুলে কাকে একটা খিস্তি দিল, তারপর থালা না থালি কী একটা বলেছিল।”
থালা! সুনীল নির্ঘাত ভুল শুনেছে। তবে, কল যেহেতু হয়েছে, তাই ট্রেস করার একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। পঁচানব্বই ভাগ কেসে, এসব হিটম্যানদের একাধিক সিম থাকে। অথবা সিম অন্যের নামে তোলা থাকে। ট্র্যাক করে কিছু লাভ হবে কি না জানা নেই।
একটা টাটা সুমো তুমুল জোরে হর্ন বাজিয়ে, আমার চিন্তাসূত্র কেটে দিয়ে বাঘমুণ্ডির দিকে এগোল। পিছনের কাচে লেখা প্রেস। সাগরের কেসটা কভার করতে যাচ্ছে কি? অসম্ভব নয়। জেলা শহরের খবরে পয়লা সারিতে আসতে পারে, এমন রাজনৈতিক বা বিনোদনমূলক খবর আপাতত নেই। ফলে সাগর মণ্ডলের খুনকে ঘিরে সেনশেনসাল একটা স্টোরি মন্দ কী! মিডিয়ার উপস্থিতি আজকাল এক আশ্চর্য প্যারাডক্সের মতো লাগে। তবে ঘটনা যা-ই হোক, বিজনের একটা ফোন আশা করেছিলাম। তদন্তের গতিপ্রকৃতি ওদিকে কী এগোল, জানি না। উনিও এদিককার ব্যাপারটা নিয়ে একেবারেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। শেষে কপু আর রাজ্য পুলিশের খিটিমিটি সামলাতে হবে নাকি কে জানে!
.
শিমুলিয়া মোড়ের কাছে ট্রাক উল্টে জ্যাম হয়েছিল। সেই জ্যাম ঠেলে থানায় পৌঁছোতে লাগল পাক্কা তিন ঘণ্টা। যা আশা করেছিলাম তাই। নিউজ ২৪/৭- এর সুমোটা থানার চৌহদ্দি থেকে কিছুটা দূরে পার্ক করা। আপাতত বুম হাতে কোনও সাংবাদিককে দেখছি না। বাপি মণ্ডলকে কাল রাতে ফোনে পাওয়া গিয়েছিল। থানায় হাজিরা দিয়েছে ঘণ্টাখানেক আগে। থানার একটা পুরোনো স্টোররুম আছে— সেটাকেই জেরার জন্য ব্যবহার করা হয়। ঘরটার সিলিং-এ লাগানো একটা ইউ থেকে একটা এস শেপের লোহা ঝোলে। ফ্যান ঝুলত এককালে। চ্যাংড়া ক্রিমিনাল হলে ভাবে তাকে ওখান থেকে ঝুলিয়ে থার্ড ডিগ্রি দেওয়া হবে। কাজটা কিছুটা সহজ হয়। কিন্তু বাপি মণ্ডল পোড়খাওয়া লোক, সে বিরক্তমুখে আমার অপেক্ষা করছিল। থানায় হাজিরা দিয়ে কৃতার্থ করেছে হাবভাব। বছর পঞ্চাশ বয়স, কোঁকড়া চুল, মোটা ভুরু, চ্যাপটা ঠোঁট আর নাক। মুখের গড়নে ভাইপোর সঙ্গে মিল নেই। সাগর শ্যামবর্ণ, ধারণা হয় সে সুদর্শন ছিল। দরজা খুলতেই বাপি মণ্ডল খিচিয়ে উঠে বলল, “সকালবেলা থেকে বিনা কারণে এখানে বসিয়ে রেখেছেন। এসব কি ইয়ার্কি হচ্ছে? যা ইচ্ছা করবেন ভেবেছেন?”
চেয়ার টেনে লোকটার সামনে বসে বললাম, “চা খাবেন?”
“না।”
“চা খাবেন না? তা হলে কি শরবত? আসলে গরম এখনও তেমন তো পড়েনি। ভোরবেলার দিকটা ঠান্ডাই থাকে।” আমি শান্তভাবে বললাম। জেরার সময় অপরপক্ষ উত্তেজিত থাকলে, নিস্তেজ থাকা কর্তব্য।
লোকটার মুখ আরও কুঁচকে গেল।
“এসব নাছল্লা বন্ধ করুন তো ম্যাডাম। আমাকে এভাবে ডেকে পাঠানোর মানে কী?”
“আপনার মাফলার ক’টা?”
“মাফলার!”
“হ্যাঁ।”
“আছে গোটা তিনেক। কেন?”
“কিছু না। হঠাৎই মনে পড়ল, সাগরের খুনি সাগরকে নিকেশ করে মাফলার জড়িয়ে পালিয়েছে। চেনেন নাকি লোকটাকে?’
“হ্যা। আমার সাঙাত হয় বটে! খুনি পাচ্ছেন না তো আমার উপর তোপ দাগবেন? পেরে উঠবেন?
“সাগরেকে খুন করালেন কেন?”
“সাগরকে আমি খুন করিয়েছি? চাঙ্গা জোক দিলেন তো আপনি?”
“খুন করেছেন বা করিয়েছেন। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।”
“কী করে?
“খুন করে পালিয়েছিলেন। গোটা ফ্যামিলি সমেত সরডিহা।”
“কে বলল পালিয়েছিলাম?” বাপি মণ্ডল চিৎকার করে বলল, “ইঁদুর মরলে গন্ধে টিকতে না পেরেও লোকে ঘর খালি করে, এ কি নতুন কথা নাকি?”
“আস্তে কথা বলুন। এটা আপনার গুদাম ঘর নয়। থানার কাজের অসুবিধা করলে আপনাকে লকআপে পুরব। কাকে ইঁদুর বলছেন, নিজের ভাইপোকে?”
“ভাইপো… শালা ঢ্যামনা! ও আমার সঙে কী করছে, জানেন নাই।” বাপি মণ্ডল খেঁকিয়ে বলল।
“সে জেন্যে নিব। কিন্তু যা-ই করে থাকুক, তার জন্য আপনি ভাইপোকে খুন করে ফেলবেন?”
“আমি খুন করি নাই। করাই নাই।”
“গত পরশু সকালবেলা সাগর-খুনের সময় আপনি কোথায় ছিলেন?”
“বাড়িতে। ঘুম্যেছিলাম। সাতটার সময় ছেলে খবর দিল সাগর ফেঁসে গেছে।”
“ভাইপোর ডেড বডি দেখতে যাননি কেন?”
“কেন যাব? উ মরাতে আমার চেয়ে বেশি খুশি কে হব্যেক? লোকে এস্যে বিরক্ত করবে, সেজন্য বউয়ের বাপের বাড়ি গিয়ে উঠেছিলাম।”
“তার মানে সাগরকে আপনি মারিয়েছেন, স্বীকার করে নিচ্ছেন?”
বাপি মণ্ডল অধৈর্য হয়ে উঠছিল। টেবিল চাপড়ে বলল, “শুনেন ম্যাডাম, দাদা মারা যাওয়ার পর সাগর পুরো গায়ের জোরে আমার মাকে দিয়ে পৈতৃক জমির সত্তর ভাগের দানপত্র করায়। মা আমার কাছে থাকত। সে-সময়টা আমি পুরুলিয়া ছিলাম না। দুই বিঘা জমি, তার এক টাকাও আমায় দিত না। কেস তো আমি করতামই। কেস করে ওই জমি বিক্রিতে স্টে অর্ডার না লাগালে বাকি জমিতেও ও হাত দিত। এখনও সে-কেস চলছে। ওই ওর উকিল অখিল মিশ্রা, এক নম্বরের ঢ্যামনা। কিন্তু এসব ব্যাপার না, সাগর যা করেছে, তাতে পারলে ওকে নিজে হাতে খুনও করতাম। আমার নিজের দাদার ছেলে। দাদা আমার ভালো লোক ছিল। আমি ফেমিলির সম্মানের জন্য আমার আর ওর ব্যাপারটা রাষ্ট্র করিনি। পাড়াতেও কেউ তেমন জানে না। কিন্তু সাগর সে মর্যাদাটা রাখেনি।”
“পরিষ্কার করে বলুন।”
“গত কাত্তিকের প্রথম হপ্তায়, সাগরের পাঠানো চারটে ছেলে, আমার ছেলেকে বেধড়ক মারে। পলাশ গুঁড়ি রিসর্টের রাস্তায়। ওকে শাসিয়ে বলে, বাপকে বল কেস-টেস তুলে নিতে। না হলে পৈতে করে দেবে।”
পৈতে অর্থাৎ ছুরি দিয়ে আড়াআড়ি চিড়ে ফেলা। বাপি মণ্ডলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। হাত টেবিলের উপর রাখা, হাতের মুঠো খোলা। দৃষ্টি আমার দিকে নিবদ্ধ। কথা বলার সঙ্গে হাত-পা একই সঙ্গে চলছে। কথার ঝাঁঝ একইরকম। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলছে লোকটা সত্যি বলছে।
“তবে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে ম্যাডাম। ওই অখিল মিশ্রা, ওর কোর্টে অ্যাপিয়ারেন্স ফি, পার অ্যাপিয়ারেন্স পনেরো হাজার টাকা। আমার থেকে জমিজমা কেড়ে নিতে যাকে ডেকেছিল, সে নিজেই একটা কুমির। সাগরের খালটা ও-ই কাটত। মামলা চালাতে পারত নাকি?” বাপি মণ্ডল ব্যঙ্গ করে হেসে বলল।
“ছেলেগুলো কারা? আপনার ছেলে চিনতে পেরেছিল?”
“না। লোকাল কেউ নয়।”
“কোন ভাষায় কথা বলছিল?”
“হিন্দি আর বাংলায়। তবে আমাদের এদিককার নয়। কলকাতার ছেলেপুলে হবে।”
“থানায় জানিয়েছিলেন?”
“নাহ্। থানায় জানালে কাজ হতে যা সময় লাগবে, পঞ্চায়েত ধরলে তার চেয়ে আগে কাজ হবে। সেটাই করেছিলাম। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমার ছোটোবেলার বন্ধু।”
“জানালে ভালো করতেন। এখন আপনি যে গল্পটা বলছেন, তার কোনও প্রমাণ আছে, আপনার কাছে?”
বাপি মণ্ডলের মুখ ঝুলে গেল।
“আপনি তো গুটি কেঁচিয়েই দিয়েছেন। সাগর মণ্ডলকে খুন করার একটা নয়, দুটো কারণ ছিল আপনার। এক, জমিজমার মামলা দুই, ছেলের প্রাণের ভয়।
বাপি মণ্ডল এতক্ষণে ওর বিরুদ্ধে গজিয়ে ওঠা কেসের গুরুত্ব বুঝতে পারছিল। চিন্তিত মুখে আমার দিকে তাকাল।
“আপনার ফোনটা আমরা জমা নেব। ওটার একটা রিসিট নিয়ে যাবেন।”
দরজার বাইরে দিব্য খটখট করছিল। আমি বেরোতেই টিভির দিকে আঙুল দেখাল। নিউজ ২৪/৭-এর কেতাদুরস্ত মহিলা সাংবাদিক বুম হাতে থানার সামনে দাঁড়িয়ে। নিউজ স্কুলে দেখাচ্ছে- পেয়ারাবাগান-খুনের মামলায় চাঞ্চল্যকর মোড়। চুমকি প্রামাণিক খুনের মামলায় সন্দেহভাজন আসামি খুন। পুলিশি জেরার মুখে কাকা।
বিরক্তিকর চড়া সুরে মহিলা বলে চলেছেন, “এই মুহূর্তের চাঞ্চল্যকর খবর। কলকাতা পুলিশ, মিনিট পনেরো আগে প্রেস বিবৃতি দিয়েছে যে পেয়ারাবাগান বস্তির চুমকি প্রামাণিক খুনের প্রধান সন্দেহভাজন সাগর মণ্ডলের বিরুদ্ধে একাধিক প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। সাগর মণ্ডল শনিবার রাত থেকে ফেরার ছিল। তার সন্ধানে কলকাতা পুলিশের একটি টিম গতকাল পুরুলিয়ায় যায়। আর তারপরেই চাঞ্চল্যকর টুইস্ট আসে। সাগর মণ্ডল, যিনি কিনা চুমকি প্ৰামাণিক খুনের প্রধান সন্দেহভাজন, তার মৃতদেহ উদ্ধার হয় পুরুলিয়ায় তার বসতবাড়ির খুব কাছে। জমিজমা সংক্রান্ত ঝামেলায় সাগর মণ্ডলে তার কাকা বাপি মণ্ডলের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে ছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। পুলিশের অনুমান, সাগর খুনে তার কাকা বাপি মণ্ডলের যোগ থাকতে পারে। বাপি মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এদিকে সাগরের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে কী প্রমাণ আছে, তা নিয়ে সরাসরি জানা না গেলেও, কাল গভীর রাতে টুম্পা নামের এক মহিলার জবানবন্দি নিয়েছে কলকাতা পুলিশ। এই জবানবন্দিতেই চুমকি হত্যা রহস্যের সমস্ত চাবিকাঠি আছে বলে অনুমান করা যায়। গোটা দক্ষিণ কলকাতায় সাড়া ফেলে দেওয়া চাঞ্চল্যকর কেসের এমন রোমাঞ্চকর পরিণতি কি সত্যিই কোনও পোয়েটিক জাস্টিস? খুন করে খুনের-ই বলি হতে হল সাগরকে!”
আবেগে সাংবাদিকের গলা প্রায় চিরে যাচ্ছিল।
আমি দিব্যর দিকে তাকালাম। আমার দিকে তাকিয়ে ও কাঁধ ঝাঁকাল। বিজন বসু ভালোই খেললেন তবে। ডেড মেন ক্যান নেভার ডিফেন্ড। কিন্তু একবারও রাজ্য পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ না করে এই দুমদাম বিবৃতি দেওয়ার অর্থ কী?
এটা ঠিক, সাগরকে মারার একাধিক কারণ ছিল বাপি মণ্ডলের কাছে। কিন্তু একমাত্র বাপির কাছেই কি? বিজনবাবু তাড়াতাড়ি কেস গোটাতে পারেন, কিন্তু আমার যে অ্যাজ এন ইনভেস্টিগেটিং অফিসার, জল আরও ঘোলা করতেই হবে।
বড়োবাবুর ঘরে উঁকি মারলাম। ফ্যান চলছে। ভদ্রলোক এখনও বেরোননি লাঞ্চে। বাপি মণ্ডলের ব্যাপারটা বললে, উল্লসিত হবেন জানি। পাকাপোক্ত কেস দেওয়া সুবিধে সব দিক থেকেই। কিন্তু জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাপি মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ, সেটা জানলে মর্জি পাল্টাবে হয়তো। আমি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম। শেষের পয়েন্টটা এখনই কানে তুলব। বাপি মণ্ডলকে প্রধান সন্দেহভাজন দাগিয়ে দেওয়ার আগে কলকাতা যাওয়ার দরকার। কালই।
১১
আমার ঘরের দেওয়ালটি গোলাপি। তাতে নোনা ধরে নানা নকশা ফুটে উঠেছে। কোনওটা দেখলে মনে হয়, বিরাট মাপের একটা ইগল ডানা মেলে অপেক্ষা করছে উড়ে যাওয়ার। কোনওটায় বা ঝাঁকড়াচুলো এক মেয়ে— সে কী করছে বুঝতে পারার আগেই নকশা দুর্বোধ্য হয়ে যায়। বাড়িওয়ালার এক ছোটো মেয়ে আছে। তাকে এই নকশাগুলো দেখালে সে প্রজাপতি আর হাতি দেখেছে।
রোরশ্যাক ইঙ্কব্লট টেস্টের কথা মনে পড়ে যায়। আমরা কী দেখছি তার উপর বিচার করে আমাদের চিন্তাভাবনার গতিপ্রকৃতি বলে দিতে পারেন মনস্তাত্ত্বিকরা। হাতের তালুতে অসংখ্য রেখা পড়ে নাকি ভাগ্য বলে দিতে পারেন জ্যোতিষীরা। আবার, শুধুমাত্র বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে, কোনও ব্যক্তি আদৌ সত্যি বলছে না মিথ্যা, তা বিচার করতে আমাদের শিখতে হয় কোল্ড রিডিং। কিন্তু আসল ব্যাপার হল, মানুষকে আগাপাশতলা পড়ার এতরকম পদ্ধতি থাকলেও, কোনওটাই প্রশ্নাতীত নয়। এমনকি নারকো পরীক্ষার ফলাফল প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়াতে পারে কোর্টে। যে-কোনও অপরাধ ঘটিয়ে ফেলতে যতটা সময় লাগে, তার থেকে অনেক বেশি সময় আর পরিকল্পনা লাগে তা গোপন করতে। মাঝে মাঝে মনে হয় এই কানামাছি খেলার ব্যাপারটা না থাকলে, মানুষের সবথেকে বড়ো অ্যাসেট— তার মস্তিষ্কের এত দ্রুত আর চমকপ্রদ বিবর্তন হত না।
হোমো ইরেকটাসের ৬০০ সিসি ব্রেন, চার লক্ষ বছর পর আধুনিক হোমো সেপিয়েন্সের ১৪০০ সিসি ব্রেনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মধ্যিখানে রয়ে গেছে বিবর্তনের এক আশ্চর্য ধাঁধা। হোমো সেপিয়েন্সের ঠিক আগের ধাপ, নিয়ান্ডারথালদের ব্রেন ছিল আরও বড়ো। প্রায় ১৭০০ সিসি। ‘বিগার বাট নট বেটার’। বায়ো পাসের পাণিগ্রাহী স্যার বলতেন। বড়ো ধাঁধা গুটিয়ে আছে ক্ষুদ্রতর জায়গায়। মানুষের ইতিহাসের যা রহস্য, মানুষের মনেরটিও তেমন।
সাগর মণ্ডলের ফেসবুক প্রোফাইলটির ইতিহাস এক বিঘত লম্বা। দুটো স্ক্রোলেই শেষ। বাইশের অক্টোবরে খোলা, মাত্র ছয় থেকে সাতটা পোস্ট। প্রোফাইল পিকচারে শিবদুর্গা, গণেশ, হনুমান ইত্যাদির ছবি। ছবির অ্যালবামে চারটে ছবি। একটিতে একটি মেয়ে। চুমকি প্রামাণিক কি! গত বছর বাইশে অক্টোবরের ফোটো। জুম করে দেখলাম ছবিটা। যুগলের হাসিখুশি ছবি। সাগরের বয়স আর পেশা অনুযায়ী তার ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট, সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কম বলতেই হবে। চুমকি প্রামাণিক নামে সার্চ দিলে একাধিক প্রোফাইল আসে, কিন্তু কোনটি সাগরের প্রেমিকা, তা জুকারবার্গ জানে না। বিজন বসু জানতে পারেন। কিন্তু যে-জন সবথেকে আগে আমায় জানাতে পারবে, সে আছে হাতের কাছেই। সাগরের প্রোফাইল হ্যাক করা দিব্যর কাছে ছেলেখেলা। মেসেজ পাঠাতেই সে থামস-আপ ইমোজি পাঠিয়ে লিখল-
বাপি মণ্ডল আগাম জামিনের আবেদন করেছে। আশা করছিলাম করবে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ফোন এসেছিল থানায়। সাগরের খুনে বাপির কতটা হাত থাকতে পারে, খুঁটিয়ে জানতে চেয়েছেন। বাপির মাথায় তাঁর হাত ভবিষ্যতে না-ও থাকতে পারে। বাপির বিরুদ্ধে ভাইপোর সঙ্গে আকছাআকছির বিস্তর সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে। সাগরের বিরুদ্ধে যে-অভিযোগ করেছে, তা হয়তো সত্যি। কিন্তু লোকটা নিজেও সাগরকে ধমকেছে, ওর পরিবারকে চমকেছে। ঝাড়খণ্ডের হিস্ট্রিশিটারকে যোগাযোগ করেছে কি না, তা একমাত্র ফরেনসিক বলতে পারবে। সিআইডির সাইবার ফরেনসিকে ফোন দিতে যাব বলে কলকাতা যাওয়া এত সহজে স্যাংশন করেছেন বড়োবাবু। একটা নীল রঙের পোলো অ্যাসাসিনের ব্যাগ, তিরিশ বছরের জন্মদিনে বন্ধুরা দিয়েছিল, সেটা চার বছর পর একটু ছেঁড়াখোড়া হয়েছে। তাতে ইউনিফর্ম ছাড়াও দুটো জিন্স, তিনটে শার্ট, একটা ফরমাল ট্রাউজার, চার্জার আর টয়লেটারিজ, মোটামুটি এই সম্পত্তি ভরলাম।
বাইরে দরজায় একটা ঠকঠক হচ্ছিল। বাড়িওয়ালার মেয়ে ফিক করে হেসে বলল, “কলকাতা যাচ্ছ? আমার জন্য কিছু এনো।”
“আনব। এত সকালে এটা বলতে এসেছিলি?” ঘড়ি দেখলাম। ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজে।
“না। নীচে একটা মেয়ে তোমায় খুঁজছে। বেল বাজাচ্ছিল।”
ফুলছাপ কামিজ আর জিন্স পরা ঝুমা আমার জন্য উদ্বিগ্নমুখে অপেক্ষা করছিল। কোনও কথা না বলে ওর দিকে তাকালাম। প্রশ্নহীন শীতল দৃষ্টি মানুষকে ভিতরে ভিতরে নিরাশ্রয় করে। ঝুমা বাচ্চা মেয়ে। হাউহাউ করে কেঁদে বলল, “থানায় বলল আপনি কলকাতা চলে গেছেন নাকি! আমি কাল রাতেই আসতে চেয়েছিলাম।”
“কী হয়েছে?”
“দাদা কাউকে খুন করতে পারে না দিদি। খবরটা টিভিতে দেখার পর মাকে সামলাতে পারছি না। আগে কান্নাকাটি করছিল, এখন আর কিছুই বলছে না। চুপচাপ বসে আছে। সাড়া নেই। এসব কীভাবে কাটবে দিদি?”
“দেখা যাক।” নিস্পৃহভাবে উত্তর দিলাম।
“আমার দাদা নির্দোষ। বিশ্বাস করো।”
“তোমার কাকার সঙ্গে তোমাদের ঝামেলা… একথা জানাওনি কেন?”
“জানাতাম…আসলে…” ঝুমা ঠোঁট চেপে ধরে কথা গিলে নিল ভয়ে ভয়ে।
“সাগর তোমার খুড়তুতো ভাইকে ধমকেছিল, সেটাও তা হলে বলতে হত, তাই না? আর কী কী লুকিয়েছ?”
“আর কিচ্ছু না। দাদা আসলে খুব বেশি কথা বলত না। জমিজমার মামলায় মা কিছু বললে বলত, আমি সামলে নেব। আমি কিছু জানতামও না। পরে কাকার কাছে…”
“উকিলের খরচা কে দিত?”
“দাদা।”
“এখনও পর্যন্ত মামলায় কত টাকা খরচা হয়েছে?”
“আমি জানি না দিদি,” ঝুমা অসহায়ভাবে তাকিয়ে বলল।
“দাদার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে পুরুলিয়ায়?”
“আছে। এসবিআইতে।”
“সেটার পাশবইয়ের প্রথম পাতার ছবি তুলে আমায় পাঠাবে। আজই।”
ঝুমা ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। কিছুক্ষণ থম মেরে রইল। তারপর মোবাইল খুলে একটা পুরোনো চ্যাট বের করে আমাকে দিয়ে বলল, এটা একটু দেখুন।
হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট। ঝুমাকে সাগর লিখেছে, বিরজু বলে একটা ছেলে দুটো নাগাদ আসবে। ওকে কাকার বাড়িটা দেখিয়ে দিবি।
“এটা কাকার ছেলের উপর হামলা হওয়ার সকাল বেলা পাঠিয়েছিল। এটার কথা তোমাকে বললে…”
“তুমি নিজেও ফেঁসে যেতে।”
ঝুমা আমার কুঁচকানো ভুরু দেখে মাথা নিচু করল।
“মা আসলে এসবের কিছু জানে না।”
“কাকা তোমার দাদাকে মারিয়েছে, এ সন্দেহ তোমার হয়নি?”
ঝুমা নিরুত্তর রইল।
“বিরজু ছেলেটাকে দেখলে চিনবে?”
“হ্যাঁ। কোঁকড়া চুল, আর গালে ভর্তি মেচেতার দাগ।”
“হাইট কেমন?”
“দাদার মতোই।”
“ছেলেটা তোমায় যোগাযোগ করেছিল কীভাবে?”
“ফোন করেছিল।”
“সেই নম্বরটা দাও।”
ঝুমার কল হিস্ট্রি ঘেঁটে নম্বর পাওয়া গেল। কিন্তু ফোনটা একবারও বাজল না।
“কলকাতায় যে খুন হয়েছে সে তোমার দাদার গার্লফ্রেন্ড। চুমকি প্রামাণিককে গলা টিপে মেরে ফেলেছে তোমার দাদা। কলকাতা পুলিশ থেকে কী বলেছে দেখেছ তো?”
“দিদি…” ঝুমার গলাটা সিরিয়াস শোনাল, “ওই মেয়েটা কোন দিন খুন হয়?”
“ফেব্রুয়ারির চব্বিশ তারিখ।”
“রাতের বেলা?”
“হ্যাঁ।”
ঝুমা আবার মোবাইল বের করে সাগর আর ওর চ্যাট দেখাল। চব্বিশ তারিখ রাত দশটায় ঝুমা দাদাকে মেসেজ পাঠিয়েছে, গ্যাস বুক করে দিস। ফুরিয়েছে। সাড়ে বারোটায়, মানে পঁচিশের আর্লি আওয়ার্সে সাগর বোনকে লিখছে, নেটফ্লিক্সের পাসওয়ার্ড দে। ঘুম আসছে না।
ঝুমার চোখের পাতা ঘনঘন পড়ে। সেটা টেনশনে আরও বেড়েছে কি না বুঝলাম না। শুকনো মুখে ও বলল, “আর-একটা ব্যাপার দিদি। দাদা আমার কাছে একটা ছোটো ব্যাগ চেয়েছিল সেদিন রাতে। সেটা বাড়িতে নেই। আমি আগের দিন ভুলে গিয়েছিলাম বলতে।”
“কীরকম ব্যাগ?”
“লাল রঙের। ছোটো তাকিয়ার মতো দেখতে।”
ঝুমা চলে গেল। সাগরের সঙ্গে ওর যাবতীয় চ্যাট কপি করে নিয়েছি। ওকে কোনও আশ্বাস দিতে পারিনি। সাগর মণ্ডলের প্রোফাইল ক্রমশ পরিষ্কার হচ্ছিল। ধোয়া তুলসীপাতা সে ছিল না। তার বন্ধুবান্ধব সঙ্গ বেশ ধূসর। বাইরে থেকে লোক ডাকিয়ে প্রভাবশালী কাকার ছেলেকে চমকানোর ধক রাখে। কিন্তু আমাদের ন্যায়ের দেবীর চোখ বাঁধা। শুনেছি তিনি গ্রিক দেবী থেমিসের ভারতীয় রূপ। সেই থেমিস, যাঁর পিতা হলেন ইউরেনাস। গ্রিক মিথোলজিতে ইউরেনাস মহাকাশের ঈশ্বর। থেমিসের মা হলেন গেইয়া, অর্থাৎ পৃথিবী। থেমিস বলেছেন, মহাকাশ আর পৃথিবীর মাঝামাঝি যে বিরাট ধূসর জগৎ, তাতে অন্যায় একটাই। কেউ অন্যায় করেছে ধরে নিয়ে ন্যায়বিচার করতে বসা।
সাগর আর নেই। সে একটা মৃতদেহ। ধূসর হলেও তার অধিকার আছে সুবিচার পাওয়ার। গতকাল রাতে ওর পিএম রিপোর্ট এসেছে। ডাক্তার উমানাথন পোস্টমর্টেম করেছেন, এবং খুব ডিটেলে পিএম রিপোর্ট লিখেছেন। যেমনটা উনি করে অভ্যস্ত। মৃত্যুর সময় ছ’টা থেকে সাতটা। কজ অফ ডেথ- এর কলামে লেখা, ‘এক্সস্যাঙ্গুয়েশন অ্যান্ড এয়ার এম্বোলাইজেশন কজড বাই ট্রান্সঅ্যাকশন অফ রেনাল আর্টারি।’
গুগল করে মেডিক্যাল টার্মিনোলজির মানে করলে যা দাঁড়ায় তা হল কিডনির ধমনি কেটে প্রচুর রক্তপাত, এবং বাতাসের বুদ্বুদ ধমনিতে ঢুকে ব্লকেজ করায় মৃত্যু। পেটে একটাই স্ট্যাব উন্ড, স্ট্যাব অ্যান্ড ড্রাগ। চার ইঞ্চি মতো শরীরের গভীরে ছুরি ঢুকিয়ে চামড়া চিরে টানা হয়েছে। সাগর প্রবল রক্তপাতে প্রথমে নিস্তেজ হয়েছে, মৃত্যু এসেছে তার কিছুক্ষণ পরেই।
গোটা কেসটায় এই প্রথমবার নিজেকে নীরব দর্শক ভেবে গ্লানি হল। সাগরের বডি তুলে দিতে হবে আজ। থানার কেউ এই অস্বস্তিকর কাজটা করবে। কার হাতে দেওয়া হবে? নাবালিকা ঝুমার হাতে? না শোকে পাথর সাগরের মা’র হাতে?
.
বিরজুর ফোনে আবার রিং করলাম। এবারও কল ব্ল্যাঙ্ক গেল।
১২
আর্মেনিয়ান ঘাটের দিকে ফেরি গড়াতে শুরু করলে কলকাতার বাতাস গঙ্গা উজিয়ে বয়ে আসে। প্রায় শতাব্দী গড়াতে চলল, পুরোনো হাওড়া ব্রিজ তার মহানাগরিক সত্ত্বাটি নিয়ে পতিতউদ্ধারিণীর সাগরযাত্রার সাক্ষী। নতুনটির চেহারায় পুরোনোটির মতো জীর্ণ অথচ অভিজ্ঞ ছাপ নেই। এই দুপুরেও, মল্লিকঘাট আর মতি শীলের ঘাটে মানুষের ঢল নেমেছে। আজ তিন তারিখ। ছুটির দিন। তাই ঘাটের কাছে অহরহ গল্প বলে চলেছে নদীর জল। মা বলত, কীর্তিবাস কলকাতা।
যখন পুলিশ হব ঠিক করিনি, তখন ভেবেছিলাম ভূ-পর্যটক হব। ‘সহজ পাঠ’-এ লেখা অক্ষর চোখের সামনে ভেসে উঠত- ‘আর্মানি গির্জের কাছে আপিস। যাওয়া মুশকিল হবে। পূর্ব দিকের মেঘ ইস্পাতের মতো কালো।’ লর্ড ক্যানিং নামাঙ্কিত বিরাট গুদামের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে শুনতে চেষ্টা করতাম আর্মানি গির্জার ঘণ্টা। কলকাতা শহরের ধনী আর্মেনিয়ান সুকিয়াসের বিবি রেজারীবেহ সুকিয়াস শুয়ে আছেন এরই কাছাকাছি অঞ্চলে। তাঁর কবর ছুঁয়ে গির্জার ঘণ্টার শব্দ গঙ্গার জলে যে ঢেউ তুলত, স্ট্র্যান্ড রোডের কোলাহলে সেই তরঙ্গদোল পৌনে এক শতাব্দী আগে বিদায় নিয়েছে। গঙ্গার জলের ঢেউ এখন শুধু জোয়ারের সময় দৃশ্যমান।
চড়া রোদ, আর তার মাঝে মাঝে বসন্তকালীন হাওয়ার হালকা পায়ের টহল— ইস্পাতধূসর রাস্তায় সাদা নীল ছুপানো রেলিং, ক্বচিৎ-কদাচিৎ দৃশ্যমান প্রায় বিরল হলদে রঙের চারচাকা আর উঁচুতে তাকালে দু’সারি সমান্তরাল অট্টালিকাদের মাথা ছুঁয়ে, দইয়ের ঘোলের মতো সাদা আকাশ। যেন ফেসবুক রিল দেখছি কোনও। লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরের সামনে চায়ের দোকানের নাম ভাঁড়ে মা ভবানী। মালিক রসিক মানুষ। ভাঁড়ে চা দিয়ে বললেন, “ভালো সিগারেট আছে।” চা-সিগারেট ক্ষুধানিবৃত্তি করে। বিজন একবারে ফোন তুলেছিলেন। কেজো গলায় আসছি জানিয়ে, মিনিট দশেক পরে, হলদে নয়, সাদা ট্যাক্সিতে চেপে বললাম, “লালবাজার।”
.
“আপনি কি ক্ষুব্ধ?” বিজন পাশ থেকে জিজ্ঞেস করলেন। লালবাজারে পৌঁছে সবে পাঁচ মিনিট হয়েছিল। বিজন নীচেই অপেক্ষা করছিলেন।
বিরক্তিটা যথাসম্ভব চেপে বললাম, “কেন বলুন তো?”
“প্রেস ব্রিফিং করা হয়েছে, অথচ আপনাদেরকে কো-অর্ডিনেট করা হয়নি।” বিজন মিনমিন করে বললেন। আমি উত্তর দিচ্ছি না দেখে গলা খাঁকরে বললেন, “আমি কিন্তু বলেছিলাম একবার বাঘমুণ্ডিতে জানাতে। আসলে সব এমন দ্রুত হল।”
“প্রেস ব্রিফিং কে করেছিলেন?” আমি বিজনকে জিজ্ঞেস করলাম।
“তন্ময়দা, মানে স্যার করেছিলেন। আপনি বরং ওঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন।”
ওসি হোমিসাইড তন্ময় সামন্ত, পুলিশ কনফারেন্স রুমে মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। প্রায় কুড়ি মিনিট অপেক্ষার পর কনফারেন্স রুমের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন। আমাকে এক ঝলক দেখলেন। তারপর বিজনের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন।
“ইনি দর্শনা বসু। সিনিয়র সাব-ইনস্পেক্টর, বাঘমুণ্ডি থানা।”
তন্ময় সামন্তর নাক স্ফুরিত হল। চোখ ভাবলেশহীন রইল। ওঁর চোখে একটা কালো মেটাল ফ্রেমের চশমা। চাপা নাক, গোলাকার চিবুক। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়স। কাঁচাপাকা চুল। স্ফীতোদর কিন্তু হাঁটাচলা অস্বাভাবিক ক্ষিপ্ৰ।
“ওহ, আপনি দর্শনা বোস? কী সৌভাগ্য! শুনেছি আপনার ভয়ে পুরুলিয়ায় মাও আর ম্যাও এক ঘাটে জল খায়?” তন্ময় সামন্ত আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। হাসলে লোকটার ঠোঁট হাসে, চোখ হাসে না।
“সাগর মণ্ডল খুনের কেসটায় কিছু ইনফরমেশন লাগত। আমি পুরকায়স্থ স্যারের[৬] সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আপনাদের ভবানী ভবন থেকে মেল পাঠিয়েছে হয়তো।”
[(৬) এসিপি পুরকায়স্থ দর্শনার পূর্বপরিচিত, ‘বৃশ্চিকচক্র’ উপন্যাসে বর্ণিত।]
“তাই? তা হবে। আমি ভাই অত মেল-টেল চেক করি না। তা বিজন আপনাকে ব্রিফ করেনি?”
“খুব সামান্য। বললেন বাকি রিপোর্ট আপনার কাছে। আপনি অফিশিয়ালি না বললে…” বিজনের দিকে তাকিয়ে বললাম।
“ওহো হো। সে-সব তো মিডিয়ার কথা ভেবে বলেছিলাম। তারা তো পারলে গোটা কপুকে স্টক মার্কেটে নিলাম করে দেয়। আপনি তো যাকে বলে আত্মীয়বন্ধু… আসুন আসুন… তা বিজন কফি-টফি খাইয়েছে?”
“না। আমি খেয়েই এসেছি। সাগর মণ্ডলের চার্জশিটে ঠিক কী কী ধারা দেওয়া হয়েছিল যদি একটু জানান।”
“চার্জশিট তো রেডি হয়নি। হচ্ছিল। এখন তো তার আর প্রয়োজন নেই। তা আপনি এত সিরিয়াস কেন?”
আমি তন্ময় সামন্তর দিকে তাকালাম। লোকটার রিভলভিং চেয়ারে ডাইনে- বাঁয়ে ঘুরছে। ঠোঁটে বিদ্রূপ-মেশানো হাসি।
“প্রয়োজন নেই একথা বলা মুশকিল। ও খুন হয়েছে। সেখানে চুমকির খুনে ও কতটা কী ইনভলভ ছিল, সেটা আপনারাই ডিটেলে জানবেন।”
“চুমকির খুনটা সাগরই করেছে। আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত। বাকি ওকে কে খুন করল, ওর কাকা না জ্যাঠা, সেটা আপনারা দেখে নিন। এমনিতে আপনার থানার ওসি রাজেশ অধিকারীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি একপ্রকার নিশ্চিত, বাপি মণ্ডল, সাগরকে খুন করিয়েছে।”
“কিন্তু চুমকির কেসটা বিশদে না জানলে কোনও কনক্লিউশনে আসা মুশকিল।”
“না। এ দুটো একদম সেপারেট কেস। আমাদের কেসটা ক্লোজড কারণ অভিযুক্ত মৃত।” তন্ময় সামন্ত মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললেন।
“ইনিশিয়ালি আমারও তা-ই মনে হয়েছিল। কিন্তু একবার পুরোটা নাড়াচাড়া করে দেখতে চাই। সাগরের সামাজিক রেপুটেশনটাও ম্যাটার করে।”
তন্ময় সামন্ত বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে ফেললেন।
“শুনুন ম্যাডাম, কলকাতা পুলিশে ঢুকে রগড়ানি খাওয়ার আগে নাটক থিয়েটারের খুব শখ ছিল। ছোটোবেলায় মনে আছে, অ্যাকাডেমিতে সাগিনা মাহাতো[৭] অভিনয়ের সময় কারেন্ট চলে গেসল। তা, দর্শকের জমায়েত কী করল জানেন? হাতের লাইটার আর দেশলাই ধরিয়ে শো চালাল পাক্কা তিন মিনিট। আপনার পারফরম্যান্সটা সেই রকম বিস্ময়বিহ্বল লেভেলের খোরাক দিল মাইরি। কিছু মনে করবেন না, অ্যাঁ?”
[(৭) রোববার, সংবাদ প্রতিদিন থেকে সংগৃহীত।]
আমি ওঁর দিকে একঝলক তাকালাম। ঠোঁটের এককোণ বিদ্রুপে বেঁকে আছে। বললাম, “অ্যাকাডেমিতে নাটক দেখার সৌভাগ্য বিশেষ হয়নি স্যার। তবে গ্ল্যাডিয়েটরের একটা কেস মনে আছে। অলিভার রিড, মানে যিনি প্রোক্সিমোর চরিত্রে ছিলেন, তিনি শ্যুট চলাকালীন মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু শোনা যায়, মরে গেলেও বাকি রোলটা নাকি উনিই করেছিলেন।”
তন্ময় সামন্ত আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। আমি ওঁর চোখে চোখ রেখে বললাম, “তখন সিজিআই[৮]-এর প্রথম দিককার জমানা। অন্য একটা বডি ডাবলকে অলিভারের ডিজিটাল মুখোশ পরিয়ে কাজ চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কেউ কি ধরতে পারেনি। ভাবুন একবার, বডি ডাবল প্রোক্সিমো সেজে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ রিড বেচারা কি জানতেই পারছে না। মরে গেছে কি না!”
[(৮) কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজারি।]
তন্ময় সামন্তর মুখে মেঘ করলে তাকে হিংস্র লাগে। চাপা ফ্যাসফেঁসে গলায় বললেন, “আপনার ইঙ্গিত দেওয়ার কায়দাটা ঈর্ষাজনক। তবে তন্ময় সামন্তর টিম অত কাঁচা কাজ করে না। বিজন, এঁকে টুম্পার ব্যাপারটা ব্রিফ করো। আর ম্যাডাম, ডিসির পারমিশন ছাড়া কোনও কাগজপত্রের অফিশিয়াল অ্যাক্সেস আপনাকে আমি দিতে অক্ষম। তবুও, দেখছি কী করা যায়।”
তন্ময় সামন্ত ওঁর কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। বিজন থতমত খেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ম্যাডাম, একটা কথা বলব? নীচে ক্যান্টিনে খুব ভালো কফি আর শিঙারা পাওয়া যায়। স্যান্ডউইচটাও দিব্যি বানায়। ওখানে একবার যাবেন?
.
খিদে পেয়েছিল। তিনটে শিঙারা আর দু’কাপ কফি অর্ডার করে বিজন বললেন, “ম্যাডাম, ছোটোবেলায় রচনায় পড়তাম মনে আছে? ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই মিসআন্ডারস্ট্যান্ড?”
আমার একটুও হাসি পাচ্ছিল না। বিরক্ত-গলায় বললাম, “মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ব্যাপার নয়। এই টুম্পার জবানবন্দির ব্যাপারটা কী? নতুন কিছু ঘটলে আপনি জানাবেন, এটা আশা করেছিলাম।”
“পুরো ব্যাপারটা ঘটেছে এখানে ফেরার পর। আর এত দ্রুত ঘটেছে যে আপনাকে জানানোর ফুরসত পাইনি।”
“হয়েছেটা কী?”
“ঘটনাটা ঘটিয়েছেন ডাক্তার রূপক গুইন। ভিক্টিমের পোস্টমর্টেম যিনি করেছিলেন। ওর বডিতে কিছু পুরোনো উন্ডের কথা রিপোর্টে ছিল, মনে আছে?”
“হ্যাঁ। পয়েন্টেড অবজেক্ট দিয়ে।”
“ঠিক। রূপক গুইন ব্যাপারটা নিয়ে একটা রায় দিয়েছেন। উন্ডগুলো সেক্সুয়াল হলেও হতে পারে।”
“সেক্সুয়াল! অ্যাবিউজ?”
“সেটা শিওর হতে পারছেন না। ভিক্টিমের জেনিটাল পার্টেও এরকম পিয়ার্সিং পেয়েছেন গুইন স্যার। কিছু আঁচড়ের দাগ, নিপল্ সের চারপাশে কাট মার্কস, গলায় শুকিয়ে যাওয়া কিছু বাইটের দাগ, পিঠে কিছু গোলাকার চ্যাপটা ধরনের ক্ষত… আর ক্ষতগুলো সবকটা একই সময়ের নয়। কিছু পুরোনো, কিছু নতুন।”
“কতটা নতুন?”
“সেটা জানা হয়নি।” বিজন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, “ভিক্টিম বেশ অনেকবারই এ ধরনের সেক্সুয়াল অ্যাক্টে জড়িয়ে ছিল, স্যারের ধারণা।”
“বুঝতে পারছি না। আপনি কি মনে করছেন, সাগরের সঙ্গে চুমকির সেক্সুয়াল অ্যাক্ট এরকম ভায়োলেন্ট ছিল?”
শিঙারা দিয়ে গিয়েছিল। বিজন আমার অপেক্ষা না করেই এক কামড় বসালেন।
“আমরা কিন্তু একবারে এই সিদ্ধান্তে আসিনি ম্যাডাম। সংশয় ছিল। টুম্পার ফোনটা না এলে সংশয় থেকেই যেত।”
আমি শিঙারা তুলে নিয়ে বিজনের দিকে তাকালাম।
“টুম্পা আমায় ফোন করে গত পরশু রাতে। সবে বাড়িতে ঢুকেছি। ওকে অলরেডি একবার জেরা করেছি আগে। তখন ভিক্টিমের উন্ডগুলোর ব্যাপারে কিছু বলতে পারেনি। এবারে গত পুজোর সময়কার একটা গল্প শোনাল।”
“কী গল্প?”
“গত বছর নবমীর দিন, ভিক্টিমের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাবে বলে ওর ঘরে গিয়েছিল টুম্পা। ঘরের দরজা খোলা ছিল। চুমকি নাকি একটা বোরোলিনের টিউব নিয়ে বুকের উপর লাগাচ্ছিল। টুম্পাকে দেখে জামা নামিয়ে নেয়। চুমকির গলাতেও কালশিটে দাগ ছিল, পরে লক্ষ করে টুম্পা। গলার ডানদিকে চওড়া কালচে দাগ। প্রথমে ভিক্টিম কিছু বলতে চায়নি, পরে চাপাচাপিতে বলে সাগর নাকি আদর করার সময় ব্যথা দিয়ে ফেলেছে।”
“গলায় ছাড়া আর অন্য কোনও ক্ষত দেখেছিল টুম্পা?”
“না। দেখলে হয়তো আগেই মনে পড়ত। টুম্পা আগের বারের জেরায় জানিয়েছিল, সাগর প্রবল সন্দেহবাতিক ছিল। আমি কিন্তু আপনাকে আগেই বলেছিলাম ব্যাপারটা প্রেমঘটিত টক্সিসিটি থেকে হতে পারে। সাগরের মোটিভটা এখন ক্লিয়ার হল তো?”
“কী?” আমি কফিতে চুমুক দিয়ে বললাম।
বিজন ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন।
“যৌন ঈর্ষা। চুমকির সাগরের সঙ্গে অনেক দিনের স্টেডি সম্পর্কে ছিল। একই প্যাটার্নের ক্ষত ওর সারা গায়ে। বহুবারের ক্ষত। যে ছেলের যৌনতার সময় প্রেমিকাকে অমন আঁচড়ানো কামড়ানোর স্বভাব আছে, স্বভাবগত সন্দেহবাতিক আছে, তার পক্ষে যৌন ঈর্ষার কারণে খুন করাটা অস্বাভাবিক কি?”
“চুমকির অন্য কোনও পার্টনারের খোঁজ পেয়েছেন?”
“না। অন্য পার্টনার থাকলে তার কিছু হদিশ তো থাকবে। হোয়াটসঅ্যাপ, ফোনকল সব খতিয়ে দেখা হয়ে গেছে।”
“হোয়াটসঅ্যাপে অন্য কোনও ছেলে নেই?”
“নাহ্। চ্যাটলিস্ট খুব ছোটো। চন্দন বলে একটাই ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে, দু’-তিনটে মেসেজ। সব ক্যাজুয়াল। সেও ছ’মাস আগে।”
“আশ্চর্য! তা হলে সন্দেহটা করত কাকে নিয়ে?”
“আরে, আপনি অবাক করছেন,” বিজন বিরক্তভাবে বললেন, “সন্দেহ করার জন্য কোনও পার্টনার কেন থাকতে হবে? ওটা তো একটা রোগ!”
“কিন্তু বিজন, আপনাকে বাবু ডাকার ফর্মালিটিটা বাদ দিলাম… তা হলে ডিফেন্সিভ উন্ডের ব্যাপারটার কী হবে?”
“ডিফেন্সিভ উন্ড?”
“হ্যাঁ। চুমকি প্রামাণিকের পিএম রিপোর্ট সে-রকমই বলছে বলেছিলেন। ওর হাতে ডিফেন্সিভ উন্ড ছিল। সাধারণত ভিক্টিমের হাতে-পায়ে ডিফেন্সিভ উন্ড থাকার মানে সে মৃত্যুর সময় খুনিকে আঁচড়েছে-কামড়েছে। সাগর মণ্ডলের পিএম রিপোর্টে সে-রকম আঁচড়-টাচড়ের উল্লেখ নেই। নট ইভেন অন ফেস।” আমি কফির কাপটা নামিয়ে বললাম।
“ওহজ!”
“আপনার ঊর্ধ্বতন, বাপি মণ্ডলের ব্যাপারটা নিয়ে যতটা খোঁজতল্লাশ করেছেন, পিএম রিপোর্ট নিয়ে ততটা করেননি বুঝতে পারছি। কাজটা কিন্তু বেশ কাচাই রয়ে গেছে।”
১৩
লালবাজার থেকে সিআইডির সাইবার ফরেনসিক অ্যান্ড ডিজিটাল এগজামিনেশন ল্যাবের সেক্টর ফাইভের অফিস যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে শিয়ালদহ থেকে সোজা গ্রিন লাইন মেট্রোয় উঠে পড়া। গোটা দিনের উষ্ণতাকে ধীরে ধীরে বিকেল, তার নরম মুঠোয় ভরে ফেলছে। শিয়ালদহ স্টেশনে যাওয়ার সরু গলিপথ জুড়ে হরেক পশরা, খেলনার দোকান, লটারি টিকিট, সেলুন, জামাকাপড়, কাঁচি ছুরি, নারকেল দড়ি থেকে শুরু করে অ্যারিস্টোক্র্যাট স্যুটকেস — গত কুড়ি বছরে এই মধ্যবিত্ত পরিবেশটি গায়ে- গতরে বড়ো হয়েছে, কিন্তু তার আটপৌরে ব্যাপারটি হারায়নি দেখে বড়ো ভালো লাগে। এই চরিত্রটুকু তার একান্ত নিজস্ব, এ পথ মাড়িয়ে যাওয়া হাজার হাজার পদক্ষেপের নুন আর ঘামের মতো সত্যি।
লোকাল ট্রেনের বেসরকারি টিকিট কাউন্টারের পিছনদিকটায় বড়ো ঝাঁকড়া শিরীষগাছের টগবগে লাল ফুল ঝরে পথ লাল হয়ে ছিল। পাশ দিয়ে যারা হেঁটে চলেছে, ভ্রুক্ষেপ নেই। বসন্ত আক্ষরিক অর্থেই পথে বসেছে। চোখ তুলে একবার পথচলতি জনতার দিকে তাকালাম। ঘড়িতে এখন আড়াইটে বাজে। অফিসফেরতা লোকজনের ভিড় নেই। সুরেন্দ্রনাথ বা ভিক্টোরিয়ার ছেলেমেয়েদের সংখ্যাই বেশি। যতদূর মনে আছে, যুগল অথবা গ্রুপের জটলা পেরিয়ে বা দিকের গলির ভিতর তাকালে একটা ওয়ো চোখে পড়বে। চার বছর আগে, ওখান থেকে একটি মেয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল কলকাতা পুলিশ। মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড পুলিশের কাছে কবুল করে, যৌন উত্তেজনায় সে প্রেমিকার গলা টিপে ধরেছিল। শ্বাসরোধ হয়ে মেয়েটি কখন মারা গেছে, ছেলেটি বোঝেনি।
মারা যাওয়ার পর যখন চেতনা ফেরে, গার্লফ্রেন্ডের শরীর আঁকড়ে বসে ছিল। সে নিজেই পুলিশে খবর দেয়। যৌনতার প্রকাশ কোনও কোনও ক্ষেত্রে এত আলাদা হয় যে, একজন মানুষ আর তার যৌনতার আয়না একদম আলাদা হয়। উত্তেজনায় শুধু শ্বাসরোধ নয়, চাবুক মারা থেকে শুরু করে ছুরি দিয়ে চিরে রক্তদর্শন— সবই চলে। এই আচরণগুলোর একটা অভিধানসিদ্ধ তকমা আছে। বিডিএসএম। প্রেমিক-প্রেমিকার সম্মতিতে তুমুল আমিষগন্ধী যৌনতা, যার ভাষা যন্ত্রণা দিয়ে শুরু, যন্ত্রণায় শেষ।
ভারতীয় সমাজের যৌনতার নিরিখে বিডিএসএম প্যারাফিলিয়ার পর্যায়ে পড়ে। প্যারাফিলিয়া অর্থাৎ অস্বাভাবিক যৌন আচরণ। মুশকিল হয় যখন এসব কেস পুলিশের হাতে পড়ে। ধর্ষণ করে খুনের চার্জ দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ পার্টনারের সম্মতি ছিল কি না বুঝবে কীভাবে।
সাগরের প্রোফাইল থেকে সাগরকে উগ্র, উদ্ধত, অশালীন মনে হয়। কিন্তু সে বিছানায় তা নাও হতে পারে। চোখ বুজে চুমকির মুখ ভাবার চেষ্টা করলাম। রোগা পাতলা মিষ্টিমতো মেয়ে, গলার কাছে দু’টি কণ্ঠার হাড় উঁচু হয়ে আছে। চোখ দুটো আহামরি বড়ো নয়, কিন্তু জোড়া ভুরুর জন্য আকর্ষণীয় লাগে। ফোটোতেও চেহারার ক্লান্তি স্পষ্ট। এই মেয়েটির যৌনতার ভাষা যন্ত্রণা ছিল? নাকি সেক্সুয়াল অ্যাবিউজকে ভালোবাসা ভেবে সহ্য করে যেত? পিএম রিপোর্টে চুমকির দেহের আঘাতগুলো নিয়ে মন্তব্য নেই। ডাক্তার গুইন পরে একটা অ্যানেক্সচার দেবেন, যা শুনলাম। আপাতত, সাগরকে ওর তেড়িয়া স্বভাবের জন্য আগ্রাসী যৌন উৎপীড়ক ভাবাটা সিনেমার স্ক্রিপ্টের মতো লাগছে।
.
সাইবার সেলে ফোন জমা দিতে সময় লাগল আধঘণ্টার সামান্য বেশি। সল্টলেকে এলাম প্রায় বছর পাঁচেক পরে। তখন যেমন গোলমেলে লাগত পথঘাট, এবারেও তেমন লাগল। চোখ এখনও অমুক মুখার্জি লেন বা তমুক রায়চৌধুরী সরণি থেকে সোজা স্ট্রিট নম্বর ১৩ বা ১৫-এর মতো তন্বী লজে অভ্যস্ত নয়। কলেজ মোড়ের ব্যস্ত পথঘাট পেরিয়ে আর ডিবি সিনেমার পিছন দিকে একটা কমপ্লেক্সের তিনতলায় জিঙ্গোর অফিস। সাগর মণ্ডলের মতো হাজারো ডেলিভারি এগজিকিউটিভকে নিয়োগকারী ফুড ডেলিভারি কোম্পানিটির রেটিং গোটা ভারতে সবচেয়ে বেশি। সেই অনুপাতে অফিসের আয়তন ছোটো। ফ্রন্ট ডেস্কে আই কার্ড দেখিয়ে পরিচয় আর প্রয়োজন বলতে, অতনু চক্রবর্তী বলে এক মধ্যতিরিশের ভদ্রলোক এসে তাঁর কেবিনে নিয়ে বসালেন। পিতলের নেমপ্লেটে নামের নীচে লেখা টেকনিকাল হেড, প্রসেস অ্যান্ড সেল্স। জানালেন, কাস্টমার কেয়ারের সিংহভাগ কর্মী ওয়ার্ক ফ্রম হোম করেন। উইকলি পেমেন্ট। অফিস বড়ো রাখার দরকার পড়ে না। নিয়মনিষ্ঠ চেহারার ভদ্রলোক চা বা কফির ফর্মালিটি করেননি। ব্যস্তভাবে মোবাইলে সময় দেখে বললেন, “ইয়েস ম্যাম। হাউ মে আই হেল্প ইউ?”
“একটি ছেলের ব্যাপারে কিছু ইনফরমেশন দরকার ছিল।”
“কীরকম ইনফরমেশন?”
“২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ছেলেটির লগ-ইন ডিটেলস লাগবে। কোথায় কোথায় খাবার ডেলিভার করেছিল, ক’টার সময় লগ-আউট করেছিল তার ডিটেলস।”
“দ্যাটস ইজি। ডেলিভারি পার্টনারের আইডিটা বলবেন।”
সাগর মণ্ডলের আই কার্ড বাড়িয়ে বললাম, “আপনাদের এই গোটা প্রসেসটার অ্যালগরিদমটা একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
অতনুবাবু সিস্টেম ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমার দিকে একঝলক তাকিয়ে বললেন, “পুরোটাই রিয়েল-টাইম। অ্যাপ বেসড মনিটরিং, রেস্টুরেন্ট আর কাস্টমার দুই তরফেই ট্র্যাক করতে পারবে।”
“সেটা জানি। আপনাদের সার্ভারেও ডেলিভারি এগজিকিউটিভদের লোকেশন ট্র্যাক হয় নিশ্চয়ই?”
“একদম। অসুবিধা দেখলে কাস্টমার কেয়ার এগজিকিউটিভ কনট্যাক্ট করে।”
“তার মানে ডেলিভারি স্টেটাসগুলো আপডেটেড হয়?”
“অফকোর্স। সেগুলো আমাদের সার্ভারেই থাকে। যখন অর্ডার আসে, দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে অ্যাকসেপ্ট করতে হয়। ওটা লোকেশনের প্রক্সিমিটি ওয়াইজ হয়। যে যত কাছে থাকবে, সে অর্ডার পাবে।”
“২৪ তারিখে সাগর মণ্ডল কোথায় কোথায় খাবার ডেলিভারি করেছিল জানা যাবে?”
“নিশ্চয়ই।” অতনুবাবু সিস্টেম থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাকে ছেলেটির ২৪ তারিখের লগ-ইন ডিটেলসের ট্র্যান্সক্রিপ্ট প্রিন্ট করে দেব, না সফ্ট কপি নেবেন?” অতনুবাবু জিজ্ঞাসা করলেন।
“সফ্ট দেবেন। অসুবিধা নেই। আর-একটা ব্যাপার, আপনাদের এই ডেলিভারি এগজিকিউটিভদের পেমেন্ট কীসের ভিত্তিতে হয়?”
“শিটের উপর। রাতের শিফটে টাকা বেশি, ইনসেনটিভ বেশি।”
“আর এদের ডেলিভারি জোনটা কী?”
“সাউথে আমাদের তিনটে জোন। সাগর মণ্ডল জোন বি-তে ছিল। মোটামুটি আপনার বাড়ির লোকেশন থেকে রেস্তোরাঁর লোকেশন দশ কিমি রেডিয়াসের মধ্যে হলে আপনি সেই একই জোন থেকে খাবার আনাতে পারেন।”
“অন্য জোন থেকে আনাতে হলে?”
“এখনও সেই ফিচার স্টার্ট করতে পারিনি আমরা। তবে খুব শিগগিরই আপগ্রেড হবে।”
“সাগর মণ্ডল, প্রতি মাসে কত টাকা রোজগার করত, তার একটা হিসেব পাওয়া যাবে?”
“যাবে। কিন্তু ম্যাডাম আমাকে এখন একটা মিটিংয়ে বসতে হবে। আপনি সিস্টেম থেকে দেখে নিতে পারেন। অন্য একটি ছেলেকে আপনার কাছে পাঠাচ্ছি। কিন্তু প্লিজ রিলিজ হিম উইদিন হাফ অ্যান আওয়ার। আমাদের স্টাফ শর্ট, বুঝতেই পারছেন।”
অতনুবাবুর হেল্পিংহ্যান্ড ছেলেটি, মিনিট দশেকের মধ্যে সাগরের অ্যাকাউন্ট দেখে জানাল, ফেব্রুয়ারিতে সে শেষ কাজ করেছে ২৪ তারিখ অবধি। লগ আউট করেছে রাত ন’টায়। ফেব্রুয়ারি মাসের রোজগার ইনসেনটিভ মিলিয়ে আট হাজার মতো।
“ওর শিফট ক’টা অবধি ছিল?”
“সন্ধে ছ’টা থেকে রাত একটা অবধি।”
“এই শিফ্টটাই কি গোটা মাস থাকে?”
“হ্যাঁ। শিফ্ট মাসের মধ্যিখানে বদলানো যায় না।”
“কিন্তু মধ্যিখানে লগ-আউট করে বেরোনো যায়?”
“তা যায়। কিন্তু সেটা বেশ লস। প্রথমত রাতের শিফটে পরপর অর্ডার থাকে। মধ্যিখানে লগ-আউট করলে ডেলিভারিগুলো লস করবে, ইনসেনটিভও পাবে না।”
“হুম। আচ্ছা ওই অঞ্চলে বিরজু নামের কোনও ডেলিভারি বয় আছে?”
ছেলেটি দ্রুত সিস্টেম চেক করে বলল, “বিরজু? নাহ… ব্রজগোপাল আছে, চলবে?”
“না। সাগরের পারফরম্যান্স কেমন ছিল? রেগুলার?”
ছেলেটি ভুরু কুঁচকে আবার সিস্টেম ঘাঁটতে লাগল। কিন্তু কোনও উত্তর দিল না।
“কিছু পেলেন?” আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম।
“না। ঠিক বুঝছি না। এই ডেলিভারি বয় জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারিতে এমনকি ডিসেম্বরেও হপ্তায় ছ’দিন কাজ করেছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী ওর যা রেটিং হওয়া উচিত, তা দেখাচ্ছে না।”
“হয়তো কেউ কমপ্লেন করেছিল? ডেলিভারি পৌঁছোতে দেরি হয়েছিল হয়তো?”
“না। সেটা কাস্টমার এন্ডের কমপ্লেন। তার উইন্ডো আলাদা। আমাদের নিজস্ব একটা রেটিং থাকে। যখন অর্ডার ঢোকে, তখন তার অ্যাভেলেবিলিটি, পিক টাইমে কত তাড়াতাড়ি পৌঁছোতে পারল, কোনও সমস্যা হলে উপরমহল অবধি এসক্যালেটেড হল কি না, এ সবকিছুর উপর ডিপেন্ড করে একটা রেটিং দেওয়া হয়… অ্যাপে যেটা দেখা যায় সেটা কাস্টমারদের রেটিং…” ছেলেটা একইভাবে সিস্টেম ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল, “ওহ… পেয়েছি…”
“কী পেলেন?”
“সাগর মণ্ডল গতবছর পুজোর সময় ডেলিভারি করেনি। সিস্টেমে লগ-ইন করেনি। অথচ শিফ্ট শিডিউলড ছিল। পিক সিজন ছিল… তাই পারফরম্যান্স রেটিং কমে গেছে।”
“পুজোর সময়!”
“হ্যাঁ।”
“কারণ কিছু জানা যাবে?”
ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। “না, ম্যাডাম। এই চাকরিতে সিএল, এমএলের কোনও ব্যাপার তো নেই যে অ্যাপ্লিকেশন দিতে হবে?”
“হুম। সাগর গত ছ’মাসে মোট কত টাকা ইনকাম করেছে এই বাবদ, সেটা নিশ্চয়ই জানা যাবে?”
ছেলেটা ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলে অ্যাকাউন্টস দেখে জানাল, “ছ’মাসের ব্রেক আপ তো নেই। তবে অন অ্যান অ্যাভারেজ মাসে দশ-বারো হাজার মতো রোজগার করেছে।”
সজলের কথা মনে পড়ছিল। যোধপুক পার্কে পার্সেল ডেলিভারি করার সময় সাগর অস্বস্তিতে পড়েছিল ওকে দেখে। সেটা কেন? ডেলিভারি বয়ের স্টেটাস বন্ধুর থেকে লুকোতে চেয়েছিল? তা হলে ঠিকানা ভুল দেবে কেন? অতনু চক্রবর্তীর থেকে সাগরের গত একবছরের ডেলিভারি স্টেটাস রিপোর্ট চাইলাম। ভদ্রলোক চোখ কপালে উঠিয়ে বললেন, “ছ’মাসেরটা হতে পারে। হার্ড কপি করিয়ে নেবেন।”
বৃষ্টি নেমেছিল হঠাৎ। ছাতা ছিল না, বোস ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসের সামনে একটা গুমটিতে আশ্রয় নিতে হল বাধ্য হয়ে। রাস্তার উল্টোদিকে সুইগি ডেলিভারি বয় যাকে এগজিকিউটিভ নামে ডাকার চল আজকাল, বৃষ্টিতাড়িত ট্র্যাফিকে ফাঁকতাল খুঁজে আগে এগোনোর চেষ্টা করছিল। সার সার চারচাকার মধ্যে তার রোগা চেহারাটা হারিয়ে গেল। আমার একটা কবিতা মনে পড়ল।
এ শহরের মধ্যে আছে আর-একটা কলকাতা। কবিতা কেন বলছি, ঘোর বাস্তব। বাস্তব দিয়ে কি কবিতা হয় না? ভাববাদীরা বলেন, হয় না। তাতে প্রাণের আরাম নেই। গুমটিটার নীচে আরও অনেকেই আশ্রয় নিলেন। পান বিড়ি সিগারেটের ছোট্ট গুমটি। সন্ধে নামছিল। বিপণির গ্লোসাইনের চড়া আলো, বাতাসের ঈষৎ আর্দ্রতায় একটু অপ্রতিভ হয়েছে। গুমটিতে আশ্রয় নিতে এসে লোকে সিগারেট কিনছিল। নারকেল দড়ির নীচটায় আগুন, খুচরো পয়সার ঠুংঠাং, দড়ি তুলে ধরে সিগারেট ধরিয়ে সুখটান দেওয়া ক’টা ক্লান্ত চেহারা, হঠাৎ মাথার মধ্যে একটা সমান্তরাল পৃথিবীর জন্ম দেয়। ধন্দ হয় কোনটা আসল! এই দৃশ্য, গন্ধ, ঘর্মাক্ত চেহারায় দু’দণ্ড জিরিয়ে নিতে চাওয়া মানুষ- এদের আমি চিনি, কিন্তু এসবের অন্তরালে অন্য যে পৃথিবী মাথা গুঁজে পড়ে আছে— আমার মনে হয় আমি সেই পৃথিবীর। অপরাধ, আর অপরাধের পঙ্কিলতা আমাকে আকর্ষণ করে। তার তল অবধি না পৌঁছোতে পারলে অস্থির লাগে। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি, সত্যি করে বলো তো দর্শনা বোস, এই পরিণতি তোমার বাঞ্ছিত ছিল কি না!
১৪
পেয়ারাবাগান বস্তিতে ঢোকার দুটো উপায়। হয় গুরুসদয় রোডের বাঁ দিকে ঘুরে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড হয়ে ঢোকো, নইলে শরৎ বোস রোড হয়ে যাও। খুব কাছেই ম্যাডক্স স্কোয়ারের পুজো হয় বলে এ তল্লাটে কলেজে থাকতে বহু এসেছি। সাত-আট বছরের ব্যবধানে পেয়ারাবাগান বস্তিকে বেশ পরিপাটি লাগল। মোটর ভেহিকসের অফিসের সামনে বিরাট তোরণ, আর তার বাঁ দিকে জয় মোহনবাগান ছাপ্পা দেওয়া বেদি, এ-দুটো আদি-অকৃত্রিম আছে। বেদিটায় নিয়মিত রংচং হয় দেখে বোঝা যায় মোহনবাগান আজকাল ভালোই খেলছে।
সাগর মণ্ডলের ঠিকানায় নিয়ে গেলেন এক প্রৌঢ়। মুদির দোকানদার। সাগরকে চেনেন কারণ সে আর তার দলবল মাঝে মাঝে দোকানের সামনে আড্ডা দিত। টিনের চাল দেওয়া সারি সারি ঘর পেরিয়ে সাগরের ভাড়ার ঘর, একটা খোলা চাতালের পাশে। মুদি দোকানি পানের পিক ফেলে বললেন, “অগ্রণী ক্লাব। দুগ্গাপুজো হয়, সরকারি শিবিরটিবির বসে। খেয়াল করলে চাতালের পিছন দিকটায় একটা কাঠের দরজার, আর তার উপর ঝুলন্ত সাইনবোর্ড দেখা যাবে। ক্লাবের নাম আর ইংরেজিতে তার ইএসটিডি, ঝাপসা এত দূর থেকে। গেটের কাছে একটা পোস্টে ঝুলানো হ্যালোজেনের হলদে আলো চাতাল পেরিয়ে সাগরের ঘরের সামনেটায় ঘোলাটে একটা বৃত্ত তৈরি করেছে।” দরজায় ঠকঠক করতে সেই বৃত্তের মধ্যে একটি ছেলে এসে দাঁড়াল।
“সাগর মণ্ডল এখানেই থাকত? আমি বাঘমুণ্ডি থানা থেকে আসছি।”
ছেলেটা নীল রঙের দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে গেল। দরজা আধখোলা, ভিতরে ঝোলানো একটা তারে ডাঁই করা আকাচা জিন্স আর শার্টের বহর। বোটকা গন্ধ ঘরটায়। দুটো তক্তাপোশ। সস্তার চাদর দিয়ে ঢাকা। একটাই ঘর। টয়লেট আছে অ্যাটাচড। দেওয়ালে বজরংবলির সিঁদুর লেপ্টানো ক্যালেন্ডার আর একটা প্লাস্টিক ফ্রেমের চার বাই চার মাপের আয়না। ছেলেটা একটা প্লাস্টিকের টুল টেনে বসতে বলল। নাম বলল তারক, মেদিনীপুরের ছেলে। ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করে। আরও দু’জন ছেলে থাকে এ-ঘরে। তারক ফোন করে তাদের ডাকল। বিয়েবাড়ির সিজনে তারক নিজে কাজ তোলে, আর অফ-অন সব সিজনেই রাসবিহারী মোড়ে একটা দোকানে বসে। হাজার, পাঁচশো টাকা দিনের রোজগার। সিজনে আর-একটু বেশি। তা হলে এই আট বাই দশের ঘরে চারজনের সঙ্গে থাকা হয় কেন, প্রশ্ন করলে তারক হাসে।
“বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়। এখানে সে-জন্যেই সবাই কষ্ট করে থাকে।”
“সাগরকে কবে থেকে চিনতে?”
“মেটিয়াবুরুজ থেকে আমিই ওকে নিয়ে এসেছিলাম। একটা অনুষ্ঠান বাড়িতে আলাপ হয়েছিল। কাজ খুঁজছিল তখন। আমাদেরও একটা ছেলে ছেড়ে দিয়েছিল। রুমমেট খুঁজছিলাম।”
“কাজের ব্যবস্থাও তুমি করে দিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ। চতুর্বেদীরা লোক খুঁজছিল। আমার ওদের দোকানে যাতায়াত আছে। ওদের মুদির দোকানের জন্য বিশ্বাসী, কর্মঠ ছেলে খুঁজে দিতে বলেছিল।”
“সাগর বিশ্বাসী হবে কি না কী করে বুঝলে?”
“বুঝিনি। বিশ্বাসী হলে কাজ টিকবে, না হলে সুইপারের কাজ করতে হবে, এই বুঝিয়েছিলাম ওকে।”
চতুর্বেদীর ঠিকানা, ফোন নম্বর লিখে ডায়েরিটা ফেরত দিল তারক। সাগরের মৃত্যুর খবর পেয়েছে টিভি দেখে। মাথা নাড়িয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলল, “কী থেকে কী হয়ে গেল ম্যাডাম! ভেবেছিলাম কলকাতায় এসে দাঁড়িয়ে যাবে। পরিশ্রম করতে পারত, বাড়িতে কীসব কেস কামারির চক্করে টাকা জলের মতো খরচা হচ্ছিল, টাকার দরকারও ছিল খুব।”
তারককে থামিয়ে বললাম, “চতুর্বেদীর দোকানে কত মাইনে পেত?”
“দশ হাজার।”
আমি মনে মনে হিসেব করলাম, জিঙ্গো আর মুদির দোকানের কাজ মিলিয়ে মাসে বাইশ হাজার টাকার বেশি রোজগার নয়। ছেলেটা মামলা কীভাবে টানার কথা ভেবেছিল কে জানে। তারক উসখুস করছিল, ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “তোমাদের কাছে মামলা টানার জন্য ধারটার চাইত নাকি?”
তারক ঘাড়ের পিছনে হাত বুলিয়ে বলল, “ধার আমরা কোত্থেকে দেব ম্যাডাম। নিজেদেরই দিন চলে না।”
“বিরজু বলে কাউকে চেনো?”
তারক উঠে জলের বোতল থেকে জল খেয়ে বলল, “বিরজু? নাহ্! এ নামে তো কাউকে চিনি না।”
“সাগরের সঙ্গে কার কার মেলামেশা ছিল? ওকে খুঁজতে কেউ কখনও এখানে আসত?”
“বলতে পারব না। আমার সঙ্গে দেখাই হত খুব কম। সকালের দিকে সবাই কাজে বেরিয়ে যেতাম। আর সাগর ঢুকত সবার থেকে লেটে। ঠিক থাকত না টাইমের।”
“সেদিনও তাই ঢুকেছিল?”
তারক চমকে আমার দিকে তাকাল। কথার উত্তর দিল না।
“চুমকি যেদিন খুন হল, সে-রাতে সাগর ক’টায় ঢুকেছিল?”
আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম।
“আগেও অনেকবার বলেছি। একই সময়ে। আমি নিজে দরজা খুলে দিয়েছিলাম। থানা থেকে সিদ্ধার্থ স্যার কমসে কম পনেরো বার এ প্রশ্ন করেছেন। প্রতিবারই একই উত্তর দিয়েছি।”
তারক আবার এক ঢোকে অনেকটা জল খেল।
“সাড়ে এগারোটার পর আর বেরোয়নি?”
“সে-কথা হলফ করে কী করে বলি? রাতে বিছানায় পড়লে আমরা মরার মতো ঘুমোই। হুঁশ থাকে না। সকালে ঘুম ভেঙে দেখেছি সাগর ঘরেই ছিল। সেদিন কাজে বেরোয়নি। বলছিল শরীর খারাপ। তারপর তো চুমকির খবরটা…”
“২৭ তারিখ বাড়ি যাচ্ছে বলে গিয়েছিল?”
“কিচ্ছু না। সকালে উঠে দেখি নেই।”
“স্বস্তিকার কনস্ট্রাকশন সাইটে বস্তির লোকজন ঝামেলা করেছিল, সাগর গিয়েছিল?”
“নাহ্। ঘরেই পড়ে ছিল। গার্লফ্রেন্ড খুন হলে কার আর মাথার ঠিক থাকে?” ঘরের দরজাটা খুলে অন্য দু’টি ছেলে ভিতরে ঢুকল। দু’জনেরই পরনে গেঞ্জি, বারমুডা। একজনের মাথার চুলে লাল হাইলাইট করা। লাল হাইলাইটের নাম সূরজ। হাবিব’স-এ কাজ করে। অন্যজন নিশিকান্ত। দু’জনেই বিহারের ছেলে। নিশিকান্ত ভাড়ার ট্যাক্সি চালায়।
সাগরকে নিয়ে নতুন তথ্য তাদের কাছে নেই। “সাগর খিটখিটে ধরনের ছেলে ছিল, নিজের মধ্যেই থাকত। সির্ফ দারু খেলে ভকভক করে কথা বলত, “ বলল নিশিকান্ত।
“কীরম কথা?”
“কাকাকে খিস্তি দিত, চুমকিকে ফোন করত, বেশি পিয়ে নিলে উল্টি করে লুড়কে যেত।”
“চুমকিকে মারধোর করত? সন্দেহ করত কারওর সঙ্গে?”
নিশিকান্ত আর তারক চোখাচোখি করল। সূরজ বলল, “কথা কাটাকাটি তো হত ম্যাডাম। সে আর নতুন কী! গার্লফ্রেন্ড মানে ঝক্কিরই কেস আছে। মেয়েদের অনেক নখরা।”
“কী নিয়ে কথা কাটাকাটি হত?”
সূরজ মাথা নাড়িয়ে বলল, “কেয়া পতা ম্যাডাম। ফোন উন এলে বাইরে গিয়ে কথা বলত। কখনও উঁচি আওয়াজে কথা বললে বুঝতাম ঝগড়া হচ্ছে। অওর, দোপহরে তো এখানে ও ফিরত। রাতের শিফটে যাওয়ার পহলে। তখন চুমকি এখানে আসতে পারে। পেয়ার, মোহব্বত, বেহস সবই পসিবল মেডাম… আমরা কি আর দেখতে এসেছি?”
“চুমকি কেমন মেয়ে ছিল? মানে বলতে চাইছি সাগরকে ছাড়া আর কোনও প্রেমটেম…”
“কেয়া মালুম ম্যাডাম। ভোজপুরিমে একঠো বাত হ্যায়, জেকর বনরি উহে নচায়ে, দোসর নচায়ে তো কাটে ধায়ে- মতলব সমঝে কে নেহি? যিসকা বন্দরি হ্যায়, উসিকোহি নচানা আতা হ্যায়। হমে কা পতা?”
সূরজ কর্পোরেশনের মাথা ভাঙা কলের মতো কথা বলে। তোড়ে জল বেরিয়ে যাচ্ছে। সমস্যা একটাই, হাজার কথার ভিড়ে আসল কথা খুঁজে বের করা। তারকের দিকে তাকিয়ে বললাম, “পুজোর সময় সাগর কোথায় ছিল? ডিউটি করেনি?”
“পুজোর সময়? এখানেই তো ছিল মনে হয়…” তারক আমতা আমতা করে বলল। সূরজ মাথার চুলে আঙুল চালাচ্ছিল। তারককে থামিয়ে বলল, “বুড়বককে তরাহ বতিয়া রহে হো। সাগর পুজোর সময় মুম্বই গেল, ভুলে গেলে? সপ্তমীকা সুবহে থা না… বোল না নিশিকান্ত…”
তারক গাল চুলকোচ্ছিল। সূরজ বলল, “সাগর মুম্বই গিয়েছিল কাজে। কী কাজ সে-সব ডিটেলে বলেনি।
বজরংবলির ক্যালেন্ডারের লাল সিঁদুর ঘরের অল্প পাওয়ারের আলোয় কালচে লাগছিল। আমার শরীর সিগন্যাল দিচ্ছিল, রেস্ট দরকার। সাগর মণ্ডলের বাইক দেখাল তারক। ঘরের বাইরে আরও অনেক স্কুটি আর বাইকের সঙ্গে পার্ক করা। পুরুলিয়া যাওয়ার আগে চাবি নিয়ে যায়নি। তারকের হাতে সেই গোছায়, সবুজ আর লাল রঙের হার্ট ঝুলছে। সবুজ হার্টে এস আর লাল হার্টে সি… নেলপলিশ দিয়ে লেখা। আর আছে একটা ব্যাগ। সাগরের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের। সেটি তারক আমার হাতে তুলে দিল। জানাল, পেয়ারাবাগানের আগে সাগর বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে ভাড়ায় থাকত। সাগরের ঘর থেকে বেরিয়ে শরৎ বোস রোডের দিকে পাঁচশো পা হাঁটলে ‘জো ক্যাফে’ বলে একটা রেস্টুরেন্ট। তারপর থেকে বিত্তবানদের পাড়া শুরু হচ্ছে। নিভু নিভু আলো- আঁধারি পেরিয়ে বড়ো কমপ্লেক্সগুলোর চোখ জুড়োনো আলোভুবন। এখানেই কোথাও স্বস্তিকা হবে কি? তারক অবশ্য উল্টোদিক দেখাল। গড়চা রোডের দিকে মেহতার বিতর্কিত আবাসন কমপ্লেক্স
“তুমিও যেতে নাকি ওখানে?” প্রশ্নের উত্তরে তারক মাথার পিছনে হাত বুলিয়ে দার্শনিক হাসি হাসে।
“যারা মোটর ভেহিকসের সামনে গাড়ি লাগালেই ঘণ্টায় একশো টাকা করে তোলে, তাদের গিয়ে জিজ্ঞেস করুন ম্যাডাম। আমাদের ওসব সময় কোথায়?”
বসন্তের রাতে হঠাৎ গা শিরশির করে উঠল। আলগা একটা ঠান্ডা আছে বাতাসে। পেয়ারাবাগান বস্তিতে কোথাও একটা কীর্তন হচ্ছে। আগামিকাল ডার্বি ম্যাচ। মোহনবাগানের পতাকাস্তম্ভকে ঘিরে ম্যারাপ বেঁধে বিশাল স্ক্রিন লাগানো হয়েছে। লাইভ ম্যাচ দেখা হবে। লোকাল ক’জন ম্যারাপের নীচে বসে তাস পেটাচ্ছিল। আমাকে মাথা ঘুরিয়ে দেখে ফের খেলাতে মগ্ন হয়ে গেল। শরৎ বোস রোডের ট্র্যাফিকে আর পেট্রোলের ঝাঁঝালো বাষ্পে বাতাসে হিমের আলগা আমেজটা দ্রুত চলে গেল। বিজনকে একবারেই ফোনে পেলাম।
“আপনার টুম্পা হয় মিথ্যে কথা বলছে, অথবা চুমকি ওকে মিথ্যে বলেছিল।”
“কী হয়েছে?”
“সাগর মণ্ডল পুজোর সময় কলকাতায় ছিল না। সপ্তমীর দিন বেরিয়ে বিজয়া দশমীর পর ফিরেছে।”
.
ট্যাক্সি হাজরা মোড়ের দিকে টার্ন নিল। যতীন দাস পার্ক থেকে মেট্রো ধরলে কবি সুভাষ মোটামুটি কুড়ি মিনিট। পাটুলির গভর্মেন্ট কো-অপারেটিভের আবাসনে আমার জন্য একটা ফ্ল্যাট ফাঁকা রাখাই থাকে। বাল্যবন্ধু এবং প্রবাসী অপরাজিতা, হোটেলে থাকব জেনে, হাঁ হাঁ করে আপত্তি জানিয়েছিল। একবাক্যে মেনে নিয়েছি। আমার জীবনে এমন কেউ আর নেই যে বকে বা ভালোবেসে অধিকার ফলাতে পারে। যারা এখনও পুরোনো অভ্যেস ছাড়েনি, তাদের কথা মাথায় করে রাখি। পুরোনো অভ্যেসগুলো নস্ট্যালজিক। যেমনটা আমরা ছোটোবেলায় ভাবি, আশা করি— মানুষের কাছে ভালোবাসা, মানুষের কাছে স্বীকৃতি। তারপর বড়ো হতে হতে বুঝি, ‘ভালোবাসা’ শব্দটা যতটা কাগজে কলমে ঐশ্বরিক ক্ষমতা পায়, প্রয়োগের দিক থেকে ওর অস্তিত্ব ততটাই নড়বড়ে, ততটাই অনৈশ্বরিক, যাকে ঈশ্বরের মতোই ধরতে বা ছুঁতে পারি না।
প্রায় সোয়া ন’টা বাজে। মেট্রোয় তেমন ভিড় নেই। সাদা পলিকোটেড দেওয়ালে, গয়না, শাড়ি আর স্বাস্থ্যবিমার বিজ্ঞাপন পাশাপাশি থেকে কাস্টমারকে আশ্বস্ত করছে। বিজ্ঞাপনী ভাষা পড়তে পড়তে কখন যান্ত্রিক শীতলতায় চোখ লেগে এসেছিল। দিব্যজ্যোতির ফোনটা যখন এল, তখন আমি প্রায় নামার মুখে।
“ঠিক টাইমে ফোন করেছিস। না হলে দক্ষিণেশ্বর চলে যেতাম ঘুরে।”
“সাগর মণ্ডলের মেসেঞ্জার হ্যাক করেছি।” দিব্য চাপা গলায় বলল।
“কী পেলি?
“দু’-একটা মেয়ের সঙ্গে নির্দোষ চ্যাট। কিন্তু সেটার জন্য ফোন করিনি।”
দিব্য একটা স্ক্রিনশট পাঠাল। মেট্রোর খারাপ নেটওয়ার্কে সেটা ডাউনলোড হতে সময় লাগল। প্ল্যাটফর্মে নেমে দেখি, ফেসবুক প্রোফাইলের সঙ্গে সাগরের কথোপকথন। রোমান হিন্দিতে লেখা, পরেশান হো? পয়সা চাহিয়ে? লগ ইন করো— একটা লিংক দেওয়া।
সাগরের সঙ্গে কার এই কথোপকথন বুঝতে দেরি হল না। ব্ল্যাঙ্ক প্রোফাইল পিকচারের নীচে প্রোফাইল নেমটি হল বিরজুর।
লিংকটা এখন এক্সপায়ার্ড ম্যাডাম। কোনওভাবেই ট্র্যাক করা যাবে না। দিব্যর লাস্ট মেসেজটা ঢুকল আরও ঘণ্টাখানেক পর। টিভিতে তখন ‘দ্য ডে অফ দ্য জ্যাকাল’ চলছিল। ‘৭৩ সালের ভিন্টেজ ক্লাসিক। ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট চার্লস ডি গলকে মারার জন্য ওএএস নামের এক প্রো-আলজেরিয়ান সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, এডওয়ার্ড ফক্সকে ভাড়া করেছে। সে প্রতিষ্ঠিত হিটম্যান, ছবিতে তার কোডনেম জ্যাকাল। বহুবারের দেখা সিনেমা, তবু মিউট করে চালিয়ে রাখলাম। কাগজ ঘাঁটার মতো দাফতরিক কাজকর্মে একজন সঙ্গী লাগে। আপাতত জ্যাকাল রয়েছেন। ফরাসি পুলিশের অবিরাম নজরদারিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্যারিসে ঢুকে পড়ছেন। জাল পাসপোর্ট, জাল অস্তিত্ব।
আমার সামনে ১২০ পাতার পিডিএফ খোলা। তাতে অনেকগুলি কলাম। অর্ডার নম্বর, কাস্টমার নেম, অর্ডার ডিটেলস, রেস্টুরেন্ট নেম, অর্ডারড আইটেমস, পিক আপ টাইম, ডেলিভারি টাইম, কাস্টমার ফিডব্যাক ইত্যাদি। দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সাগর অর্ডার ডেলিভার করেছে। টালিগঞ্জ-গড়িয়া রুট থেকে শুরু করে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত ডেলিভারি স্টেটাসে দেখাচ্ছে।
কুড়ি-পঁচিশ পাতা উল্টে হতাশ লাগছিল। মার্কার পেনটা বন্ধ করে ক্যাপুচিনো পানে মন দিলাম। টিভিতে তখন ডিটেকটিভ থমাস, জ্যাকালের কোডনেম ব্রেক করার চেষ্টা করছেন। জ্যাকাল মানে শিয়ালের ফ্রেঞ্চ হল চ্যা ক্যা ল। আমি জানি, জ্যাকাল সন্দেহে এরপর যাকে শনাক্ত করা হবে, তার নাম চার্লস হ্যারল্ড ক্যালগ্রুপ। সি এইচ এ আর এল ই এস। আদ্যনামের প্রথম তিনটে অক্ষর, আর পদবির প্রথম তিনটে অক্ষর জুড়ে দিলে হয় চ্যা ক্যা ল। অদ্ভুত এবড়োখেবড়ো লজিক, কিন্তু ডিটেকটিভ থমাস অল্পদিনের মধ্যেই বুঝবেন লজিকটা ঠিক।
কফির একটা গোল দাগ কাগজগুলোর উপর লেগেছিল। সেটা হাত দিয়ে মুছতে চোখ আটকাল একটা হরাইজন্টাল বারে। এ ফোর শিটের সবুজ রঙের বারটা স্প্লিট হয়ে গেছে। ডেটটা ১১ ডিসেম্বর। সন্ধে সাতটা সতেরো… সাগর সিস্টেম থেকে লগ আউট করেছে। লগ-ইন করেছে ঘণ্টাখানেক পর…
“কোনও ইমার্জেন্সি এসেছিল নাকি?”
“পরের পাতায় গেলাম…”
“গড়িয়াহাট… যাদবপুর… গড়িয়া…’”
চার নম্বর পাতায়, আশ্চর্য! আবার স্প্লিট। এবার সময়টা বেড়ে পঁয়তাল্লিশ মিনিট…
গতবারের লগ আউটের সাত দিন পর ঠিক এই ঘটনা ঘটেছে।
সাত নম্বর পাতা, আবার লগ-আউট! প্রাইম টাইমে ইনসেনটিভ লস করে সাগর কেন লগ আউট করেছে এতবার! জিঙ্গোতে ওর পারফরম্যান্স রেটিং এইজন্য এত কম দেখাচ্ছিল। তাড়াহুড়োয় ছেলেটা ঠিক করে দেখেনি।
পরের পাতাগুলোয় কী খুঁজতে হবে জানতাম। তন্ন তন্ন করে একশো কুড়ি পাতা জুড়ে সাগর কখন লগ আউট করেছে তার হিসেব।
টিভিতে এডওয়ার্ড ফক্সের মুখ ভেসে উঠল। ব্লন্ড চুল, ঘন ভুরু, খাড়া নাক, পাতলা ঠোঁট। চোখের ভাষা পড়া যায় না। আত্মবিশ্বাসী? নিষ্ঠুর? প্রেমিকাকে খুন করছেন মসৃণ হাতে। একটা ভারী কালো টেলিফোন সেট জোরে বেজে উঠল। টিভির স্ক্রিনে ঝিঁ-ঝিঁ করে আওয়াজ হল। ফক্সের চোখ দু’টির ক্লোজআপ ছোটো হতে হতে বড়ো হয়ে ক্রমশ স্ক্রিন জুড়ে ফেলল। তাতে বিচিত্রভাবে গোল চক্কর খেতে লাগল, ডিটেকটিভ থমাস, ডিকেটটিভ লেবেল, ফরাসি প্রেসিডেন্ট, আর ফক্সের প্রেমিকার ছবি। তারপর সবকিছু ফেড। আর কোনও শব্দ নেই, দৃশ্য নেই। আচমকা টিভি সেট থেকে আর্ত চিৎকার করে উঠল কেউ। ভিক্টর রোডেন্সকি নামের ওএএস সদস্যকে অকথ্য অত্যাচার করে জ্যাকালের নিশানা জানতে চেষ্টা করছে ফরাসি ইনটেলিজেন্স। চোখ খুবলে গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে। রোডেন্সকি নির্যাতন সহ্য করতে না পারে “জ্যাক” শব্দটা বলে ইন্টারোগেশন টেবিলেই শেষ নিশ্বাস ফেলছেন। ভিক্টর রোডেন্সকির মুখটা বদলে ধীরে ধীরে সাগরের হয়ে গেল। পেটে একটা বড়ো হাঁ-মুখ ক্ষত। ভলকে ভলকে রক্ত বেরোচ্ছে। ওর শরীরের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল সুনীল মাহাত। পাশে একটা লোক, তারা আগাপাশতলা মাফলারে মোড়া। লোকটার শুধু দাঁতগুলো দেখা যায়। আমাকে দেখে সে ট্রাকের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, “শালি থুল্লা!’
ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। টেবিলে ছড়ানো একরাশ কাগজ। গত ছ’মাসে মোট ষোলোবার প্রাইম টাইমে সিস্টেম থেকে লগ-আউট করেছে সাগর। সাগরের সিডিআর রিপোর্টের সঙ্গে মিলিয়ে পিডিএফের পাতায় সার্কল করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেছি। সিডিআর-এ সাগরের ওই সময়কার টাওয়ার লোকেশন স্ট্যাটিক নয়। লগ-আউট করে কখনও যাদবপুর, কখনও কসবা, কখনও টালিগঞ্জ গেছে। অদ্ভুত ব্যাপার!
কফি উলটে মেঝেতে পড়ে একসা হয়েছিল। খাকি রঙের স্পট মুছতে মুছতে মাথায় ঘুরে এল সেই শব্দটা, ‘থুল্লা”। মনে পড়ে গেল, সুনীল মাহাত, থালা বা থালি কোনও একটা শব্দের কথা বলেছিল। সে শব্দটা যদি থুল্লা হয়! থুল্লা মানে পুলিশ। চটের থলির খাকি রং থেকে বোধহয় পুলিশের এমন কোড নেম হয়েছে। ডাকে সমগ্র উত্তর ভারত আর বিহার-ঝাড়খণ্ড সংলগ্ন অঞ্চলের ক্রিমিনালরা। উদ্ভট স্বপ্নকে বড়ো বেশি প্রশয় দিয়ে ফেলছি কি! মাথাটা দপদপ করছিল। অপরাজিতার বারান্দায় সুন্দর হাওয়া দেয়। দক্ষিণ খোলা বারান্দা। কো-অপারেটিভ বলে অনেকটা জমিতে বাগান করা। বড়ো বড়ো গাছপালায় বারান্দার নীচটা ঝুপসি অন্ধকার হয়ে থাকে। পাঁচিলের ওপাশে মেন রোডের লাইটপোস্টে হলদে রঙের হ্যালোজেন জ্বলছে। হলদে নরম আলোয় রাতের জনবিরল পাটুলি যেন এক টুকরো অয়েলপেন্টের ক্যানভাস। সিনেমায় দেখা ভারী টেলিফোন সেটের মতো ভিন্টেজ।
স্বপ্নের আততায়ী কি থুল্লা বলেছিল? বলে থাকলে তার অর্থ একটাই। সাগরের সন্ধানে কলকাতা পুলিশ আসছে, ওরা তা জানত। পুলিশ আসার আগে কাজ শেষ করে গেছে ওরা। হ্যাঁ, আপাতত এটা একটা হাঞ্চ, এ ভেরি ভেরি ওয়াইল্ড হাঞ্চ। কিন্তু প্রোবেবিলিটির অঙ্কে তো একটা সম্ভাবনাই জেতে! সাগর মার্ডার হওয়ার কারণ বুঝতে না পারলেও, এটা স্পষ্ট বুঝছিলাম ছেলেটার টাকা রোজগারের প্যাটার্নে অসঙ্গতি আছে। দিব্য পুরুলিয়া থেকে সাগরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট পাঠিয়েছে। তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। একটা মাসে বাইশ হাজার টাকার মাইনের ছেলের যেমন নুন আনতে পান্তা ফোরায় অবস্থা সেরকমই ফুটিফাটা দশা ওর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের। শুধু অস্বাভাবিক হল ওর কোর্ট কেস। অখিল মিশ্রা আটবার অ্যাপিয়ার করেছেন কোর্টে, গত এক বছরে। শুধু অ্যাপিয়ারেন্স ফিতেই এক লাখ কুড়ি হাজার টাকা। বাকি আনুষঙ্গিক তো আছেই। এই কেস চালানোর মতো সাহস সাগর পেল কোথায়?
অতনু চক্রবর্তীকে মেসেজ করলাম। সাগরের সঙ্গে একই জোনে কাজ করে এমন কারওর নম্বর লাগবে। যারা ওকে কাজের সূত্রে চিনত।
